#Article 1: বাংলা ভাষা (2856 words)


বাংলা ভাষা (বাঙলা, বাঙ্গলা, তথা বাঙ্গালা নামগুলোতেও পরিচিত) একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা। মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পঞ্চম ও মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। বাংলা সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষা বাংলা। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, উড়িষ্যা রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাভাষী জনগণ রয়েছে। ভারতে হিন্দির পরেই সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা বাংলা। এছাড়াও মধ্য প্রাচ্য, আমেরিকা ও ইউরোপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাভাষী অভিবাসী রয়েছে। সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে ২৬ কোটির অধিক লোক দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ব্যবহার করে। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ও স্তোত্র বাংলাতে রচিত।

বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলা ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে শব্দগত ও উচ্চারণগত সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রন্থনে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে তথা বাংলাদেশ গঠনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব বাংলায় সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা শহিদদের সংগ্রামের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

বাংলা ভাষার ইতিহাসকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: 

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে বাংলায় হিন্দু ব্রাহ্মণগণ সংস্কৃত ভাষার চর্চা করত, কিন্তু স্থানীয় বৌদ্ধরা প্রাকৃত ভাষার কোন কোন রূপে (ভ্যারাইটি) কথা বলত, যাকে ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন মাগধী প্রাকৃতের পূর্ব রূপ বা ভ্যারাইটি হিসেবে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়, বাংলা ছিল হিন্দু যাজক বা পুরোহিতদের জন্য সংস্কৃত সাহিত্যের একটি কেন্দ্র, যা স্থানীয়দের কথ্য ভাষাকে প্রভাবিত করে। প্রথম সহস্রাব্দে বাংলা যখন মগধ রাজ্যের একটি অংশ ছিল তখন মধ্য ইন্দো-আর্য উপভাষাগুলি বাংলায় প্রভাবশালী ছিল। এই উপভাষাগুলিকে মাগধী প্রাকৃত বলা হয় এবং এটি আধুনিক বিহার, বাংলা ও আসামে কথিত হত। এই ভাষা থেকে অবশেষে অর্ধ-মাগধী প্রাকৃতের বিকাশ ঘটে। প্রথম সহস্রাব্দের শেষের দিকে অর্ধ-মাগধী থেকে অপভ্রংশের বিকাশ ঘটে। সময়ের সাথে সাথে বাংলা ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিকশিত হয়। 

অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহের মতো বাংলাও সংস্কৃত ও মগধী প্রাকৃত থেকে ১০০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দে বিকশিত হয়। সেসময় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় আপভ্রংশ ছিল পূর্ব অপভ্রংশ বা অবহট্‌ঠ (অর্থহীন ধ্বনি), সেটা থেকেই অবশেষে আঞ্চলিক উপভাষাসমূহের বিকাশ ঘটে, এক্ষেত্রে তিনটি ভাষাদল গঠিত হয় - বাংলা–অসমিয়া ভাষাসমূহ, বিহারি ভাষাসমূহ এবং ওড়িয়া ভাষাসমূহ। অনেকে যুক্তি দেখান যে, এই ভাষাদলগুলোর পৃথকীকরণ অনেক আগেই ঘটেছে, কেউ কেউ ৫০০ খ্রিস্টাব্দের কথাও বলেন। অনেকে বলেন, মধ্যযুগে প্রাচীন সাহিত্যসমূহের অনেকগুলোকেই আর পাওয়া যায়না, যার ফলে সেসময়কার অনেক শব্দই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু ভাষা স্থির ছিল না: সেসময় ভাষার বিভিন্ন রূপ বা ভ্যারাইটির সহাবস্থান ছিল, আর সেসময়ে লেখকগণ প্রায়ই একাধিক উপভাষায় লিখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ষষ্ঠ শতাব্দীর আশেপাশে অর্ধ-মাগধী থেকে অবহট্‌ঠ ভাষার বিকাশ ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়, এই অবহট্‌ঠ ভাষা কিছুসময়ের জন্য বাংলা ভাষার পূর্বপুরুষ প্রোটো-বাংলার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। প্রোটো-বাংলা ছিল পাল সাম্রাজ্য এবং সেন রাজবংশের ভাষা।   

চৈতন্য মহাপ্রভুর যুগে ও বাংলার নবজাগরণের সময় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃত ভাষা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল। সংস্কৃত থেকে যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ করা হয়, তাদের উচ্চারণ অন্যান্য বাংলা রীতি মেনে পরিবর্তিত হলেও সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়।

বাংলা ভাষার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন বাংলার মুসলিম শাসকগোষ্ঠী। ফার্সির পাশাপাশি বাংলাও বাংলার সালতানাতের দাফতরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো এবং ব্যাপক হারে ব্যবহার হতো। এছাড়াও প্রত্ন বাংলা ছিলো পাল এবং সেন সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা।

মধ্য স্তরের বাংলা ভাষায় দুইটি সুস্পষ্ট উপস্তর দেখা যায়, আদি-মধ্য আর অন্ত্য-মধ্য। আদি-মধ্য বাংলার স্থিতিকাল আনুমানিক ১৩৫০ খ্রীঃ হতে ১৪৫০ খ্রীঃ পর্যন্ত। চতুর্দশ শতাব্দে ও পঞ্চদশ শতাব্দে লেখা বলে নিশ্চিতভাবে নেওয়া যেতে পারে এমন কোন রচনা মিলে না। সুতরাং ১৩৫০ হতে ১৪৫০ অবধি শতাব্দ কালের কতটা প্রাচীন বাংলার অন্তর্গত ছিল এবং কতটা আদি-মধ্য বাংলার অন্তর্গত ছিল তা নিশ্চয় করে বলবার উপায় নাই। সব প্রাচীন রচনায় অষ্টাদশ শতাব্দীর নকল করা উচিত এ পাওয়া গিয়েছে। তাই পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দের ভাষার পরিপূর্ণ রূপটি এগুলিতে প্রতিফলিত নয়। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথি তেমনি পুরানো না হলেও মূলে হস্তক্ষেপ খুব বেশি না পড়ায় আদি-মধ্য বাংলার পরিচয় খানিকটা পাওয়া যায়।

অন্ত্য-মধ্য বাংলার স্থিতিকাল ১৬০১ হতে ১৮০০ খ্রীঃ পর্যন্ত। মনে রাখতে হবে যে এই কালসীমা অত্যন্ত আনুমানিক। সাধু ভাষার পরিবর্তনের কথা মনে রাখলে অন্ত্য-মধ্য উপস্তরের শেষসীমা ১৭৫০ খ্রীঃ ধরাই সঙ্গত। তবে সেই সঙ্গে সাহিত্যে ব্যবহারের দিকেও লক্ষ্য রাখলে ১৮০০ খ্রীঃ ধরতে হয়।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে নদিয়া অঞ্চলে প্রচলিত পশ্চিম-মধ্য বাংলা কথ্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য বাংলা ভাষা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে অনেকখানি পার্থক্য রয়েছে। ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ () নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়।  বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে  গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্ () নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন।

১৯৫১–৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগণের প্রবল ভাষা সচেতনতার ফলস্বরূপ বাংলা ভাষা আন্দোলন নামক একটি ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নিকট বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি দাবি করা হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস পালিত হয়। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করে।

 

বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকম ভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংঘ ভাষা বঙ্গ অঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীর মাতৃভাষা। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এছাড়া ভারতের অসম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও এই ভাষা বহুল প্রচলিত। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।

বাংলা ভাষা বঙ্গভূমির অধিবাসীদের মাতৃভাষা, যা ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং বর্তমান জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত।
 
মূল অঞ্চলের পাশাপাশি ত্রিপুরা,দক্ষিণ আসাম এবং ভারতীয় সংযুক্ত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বসবাসরত বাঙালীদেরও মাতৃভাষা বাংলা। উরিসা, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের প্রতিবেশী রাজ্যসমূহের বাংলা ভাষায় কথা বলা হয় এবং  দিল্লি, মুম্বাই, বারাণসী এবং বৃন্দাবন সহ  বঙ্গের বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর  মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইতালিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাঙালি বসবাস করেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা বাংলা। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষাও।

ভারতে ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা হল বাংলা এছাড়াও বাংলা ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস হতে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা রূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচী শহরের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা রূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ ওই রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫,৩০০ বাংলাদেশি সৈনিকের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন।

নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুইটি বাংলা কবিতা ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। অধিকন্তু, অনেকে মনে করেন যে, শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত (শ্রীলঙ্কা মাতা) মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বাংলা কবিতার প্রভাবে লেখা হয়েছিল, আবার অনেকে এমনটাও মনে করেন যে জাতীয় সঙ্গীতটি প্রথমে বাংলায় রচিত হয়েছিল এবং তারপর তা সিংহলিতে অনুবাদ করা হয়েছিল।

২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার দাবী জানান।

বাংলার কথ্য ও লেখ্য রূপের মধ্যে বিবিধতা বর্তমান। বিভিন্ন শব্দভাণ্ডার দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে বাংলায় দুই ধরনের লিখনপদ্ধতি তৈরি হয়েছে।

সাধু ভাষা বাংলার এক ধরনের লেখ্য রূপ, যেখানে সংস্কৃত ও পালি ভাষাসমূহ থেকে উদ্ভূত তৎসম শব্দভাণ্ডার দ্বারা প্রভাবিত অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ ক্রিয়াবিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই ধরনের ভাষা বাংলা সাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সাহিত্যে এই ভাষারূপের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

চলিতভাষা, যা ভাষাবিদদের নিকট মান্য চলিত বাংলা নামে পরিচিত, বাংলার এক ধরনের লেখ্য রূপ, যেখানে মানুষের কথ্য বাগধারা স্থান পায়। এই লিখনশৈলীতে অপেক্ষাকৃত ছোটো আকারের ক্রিয়াবিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের শৈলী অনুসরণ করা হয়ে থাকে। উনবংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরে দুলাল প্রভৃতি রচনাগুলিতে এই ধরনের শৈলী সাহিত্যে জায়গা করে নেয়। এই শৈলী নদিয়া জেলার শান্তিপুর অঞ্চলে প্রচলিত কথ্য উপভাষা থেকে গঠিত হয়েছে, ফলে একে অনেক সময় শান্তিপুরি বাংলা বা নদিয়া উপভাষা বলা হয়ে থাকে।
মান্য চলিত বাংলায় অধিকাংশ বাংলা সাহিত্য রচিত হলেও, কথ্য বাংলা ভাষার উপভাষাসমূহ মধ্যে যথেষ্ট বিবিধতা রয়েছে। কলকাতাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরা মান্য চলিত বাংলায় কথা বলে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলগুলির কথ্য ভাষা মান্য চলিত বাংলার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের কথ্য ভাষার সঙ্গে মান্য চলিত বাংলার খুব সামান্যই মিল রয়েছে। তবে অধিকাংশ বাঙালি নিজেদের মধ্যে ভাব আদানপ্রদানের সময় মান্য চলিত বাংলা সহ একাধিক উপভাষায় কথা বলতে সক্ষম বলে মনে করা হলেও অনেক ভাষাবিদ তা স্বীকার করেন না।

কথ্য বাংলাতে আঞ্চলিক প্রকরণ একটি উপভাষার ধারাবাহিকতা গঠন করে।  ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই উপভাষাগুলি চারটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত করেছেন - রাঢ়ী, বঙ্গ, কামরূপী উপভাষা এবং বরেন্দ্র; তবে অনেক বিকল্প শ্রেণীকরণ প্রকল্পও প্রস্তাব করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমা উপভাষাগুলি (রাঢ়ী বা নদীয়া উপভাষা) আধুনিক মান্য ভাষাগত বাঙালির ভিত্তি তৈরি করে।  পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের বেশিরভাগ উপাখ্যানগুলিতে (বাংলাদেশের বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং সিলেট বিভাগ), পশ্চিমবঙ্গে শোনা অনেক যতি ও সুস্পষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনিকে উষ্ম ব্যঞ্জনধ্বনি হিসাবে উচ্চারণ করা হয়। পাশ্চাত্য তালব্য-মূর্ধন্য ঘোষ ব্যঞ্জনধ্বনি চ ,  ,   যথাক্রমে প্রাচ্যের  ,  ,   এর সাথে সম্পর্কিত। বাংলার কিছু উপভাষা বিশেষত চট্টগ্রাম এবং চাকমা ভাষার সুর রয়েছে বৈপরীত্য ; বক্তার কণ্ঠের উচ্চারণের তীক্ষ্মতা শব্দগুলোকে পৃথক করতে পারে। রংপুরী, খারিয়া থাট এবং মাল পাহাড়িয়া ভাষা পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলা উপভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও সাধারণভাবে তাদেরকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়। উত্তরাঞ্চলীয় বাংলা উপভাষার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও হাজং কে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

উনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বাংলা ভাষার প্রমিতীকরণের সময় ব্রিটিশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলকাতা ছিল বঙ্গভূমির সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। বাংলাদেশের সীমানার পাশে অবস্থিত নদীয়া জেলার পশ্চিম-মধ্য উপভাষার উপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে বর্তমান প্রমিত রূপটি গৃহীত হয়েছে। মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও পশ্চিমবঙ্গের একজন বক্তা  আদর্শ বাংলায়  যে শব্দ ব্যবহার করবেন তা বাংলাদেশের একজন বক্তা ব্যবহার নাও করতে পারেন।  উদাহরণস্বরূপ  পশ্চিমাঞ্চলে ব্যবহৃত  নুন শব্দটির পরিবর্তে পশ্চিমপ্রান্তে লবণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। 

বেশিরভাগ লেখা প্রমিত বাংলায় (এসসিবি) থাকলেও কথ্য উপভাষাগুলি বৈচিত্র‍্য প্রদর্শন করে। কলকাতা সহ দক্ষিণ-পূর্ব পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা এসসিবিতে কথা বলে॥ প্রমিত চলিত থেকে কিছুটা স্বল্প পরিবর্তনের সাথে সাথে অন্যান্য উপভাষাগুলি পশ্চিমবঙ্গ এবং পশ্চিম বাংলাদেশের অন্যান্য অংশে যেমন মেদিনীপুরের উপভাষায় কিছু নিজস্ব শব্দ রয়েছে। তবে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোক উপভাষায় কথা বলেন, এসসিবি থেকে আলাদা কিছু উপভাষা বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকেরা প্রমিত চলিতরূপেই লেখেন  চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপভাষাটি সাধারণ বাঙালী জনসাধারণের কাছে সহজে বোধগম্য হয় না।   

এমনকি এসসিবিতেও বক্তার ধর্ম অনুসারে শব্দভাণ্ডার পৃথক হতে পারে: হিন্দুরা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত শব্দ এবং মুসলমানরা দেশীয় শব্দের পাশাপাশি ফারসি এবং আরবি ভাষার শব্দ ব্যবহার করার সম্ভাবনা বেশি।  উদাহরণস্বরূপ: 

বাংলা ভাষায় প্রচুর স্বরদ্যোতনা রয়েছে ; একই অক্ষরে একাধিক স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়।  এর মধ্যে  এবং  দ্বয় কেবলমাত্র একটি করে স্বরবর্ণ  এবং  দ্বারা লেখা হয়। সর্বমোট যৌগিক স্বরধ্বনির সংখ্যা ১৭ থেকে ৩১ এর মধ্যে রয়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন। সরকার (১৯৮৫) কর্তৃক প্রদত্ত একটি লেখ নিচে দেয়া হল:

আদর্শ বাংলায় সাধারণত শুরুতে শ্বাসাঘাত  লক্ষ করা যায়। বাংলা শব্দগুলো বিমুর্তভাবে দ্বিপর্ববিশিষ্ট ; শব্দের প্রথম অক্ষরে মুখ্য শ্বাসাঘাত পড়ে এবং প্রায়ই বিজোড় অবস্থানের অক্ষরগুলোতে গৌণ শ্বাসাঘাত লক্ষ করা যায়। ফলে  শব্দটি উচ্চারিত হয় shô-hô-jo-gi-ta cooperation, যেখানে মোটাদাগ মুখ্য এবং গৌণ শ্বাসাঘাত নির্দেশ করে।

স্থানীয় বাংলা ভাষায় শব্দের শুরুতে যুক্তবর্ণ থাকে না; সর্বোচ্চ ব্য-স্ব-ব্য আকারের অক্ষর হতে পারে(স্বরধনির দুপাশে ব্যঞ্জনধ্বনি)। অনেক বাঙালি এমনকি ইংরেজি কিংবা সংস্কৃত থেকে  ধারকৃত শব্দ উচ্চারণের ক্ষেত্রেও এই ধারাটি বজায় রাখে যেমন গ্রাম (ব্য-ব্য.ব্য-স্ব-ব্য) উচ্চারণ করেন গেরাম(ব্য-স্ব.ব্য-স্ব-ব্য),  স্কুল(ব্য-ব্য-স্ব-ব্য) উচ্চারণ করেন ইস্কুল(স্ব-ব্য.ব্য-স্ব-ব্য) হিসেবে।

সাধারণভাবে বাংলা লিপির তুলনামূলক বানানতাত্ত্বিক গভীরতা বেশি নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাঙালীদের ধ্বনি এবং বর্ণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে উচ্চারণ-বানান অসঙ্গতি ঘটে।

এক ধরনের অসঙ্গতি হল একই শব্দের জন্য লেখায় বেশ কয়েকটি বানানের উপস্থিতি। উনবিংশ শতাব্দীতে কিছু পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও, বাংলা বানান পদ্ধতি সংস্কৃত ভাষার জন্য ব্যবহৃত বানানরীতির উপর ভিত্তি করেই রচিত হচ্ছে  এবং এভাবে কথ্য ভাষায় কিছু শব্দ সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে না। উদাহরণস্বরূপ,অঘোষ দন্তমূলীয়-তালব্য ব্যঞ্জন -এর জন্য তিনটি বর্ণ (  ,  , এবং  রয়েছে  যদিও  বর্ণটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেমন -এ ব্যবহৃত হয়। তখন অঘোষ দন্তমূলীয় ঊষ্মধ্বনি  শব্দ ধরে রাখে; যেমন  স্কুল,    ইত্যাদি।  বর্ণটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র যেমন -এ ব্যবহৃত হয়। তখন অঘোষ মূর্ধন্য ঊষ্মধ্বনি  শব্দ ধরে রাখে; যেমনঃ  ,    ইত্যাদি। একইভাবে,ঘোষ তালব্য-দন্তমূলীয় ব্যঞ্জনধ্বনি  প্রকাশ করার জন্য দুটি অক্ষর রয়েছে (  এবং )। তাছাড়া, আগে উচ্চারিত  এবং লিখিত মূর্ধন্য অনুনাসিক  কে এখন সাধারণ আলাপচারিতায় দন্তমূলীয়  হিসেবে উচ্চারণ করা হয় (যখন উচ্চারণ করা হয় তখন পার্থক্য বোঝা যায়) (যদি না অপর একটি মূর্ধন্যধ্বনির যেমন   ,   এবং -এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে), তবে বানানে এই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। অর্ধ-সংবৃত সম্মুখ স্বরবর্ণ  বানানতাত্ত্বিকভাবে একাধিক উপায়ে নিরূপিত হয়। উদাহরণস্বরূপ:    ,   ,   ,   ,   ,   ।

অন্য ধরনের অসঙ্গতিটি লেখায় যথেষ্ট ঔচ্চারণিক তথ্যের ঘাটতিসম্পর্কিত। পূর্ববর্তী ধ্বনির স্বরসঙ্গতির উপর নির্ভর করে লেখায় প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে জড়িত অন্তর্নিহিত স্বরবর্ণটি  কিংবা  হতে পারে;কিন্তু লেখায় স্পষ্টভাবে প্রকাশ না পাওয়ায় তা পাঠকের জন্য দ্ব্যর্থতা তৈরি করে। তাছাড়া অন্তর্নিহিত স্বরটি প্রায়শই শব্দের শেষে উহ্য থাকে (যেমন:   ;তবে তা বানানে প্রতিফলিত না হওয়ায় নতুন পাঠকের পক্ষে এটি কঠিন করে তোলে।

অনেক যুক্তব্যঞ্জন তাদের মূল ব্যঞ্জনবর্ণের চেয়ে আলাদা রূপে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যঞ্জনবর্ণের    এবং    যুক্ত হয়ে  গঠন করে  এবং তা  ( উচ্চারিত হয় ) কিংবা  ( - ) অথবা  (যেমন  এর উচ্চারণ ) হিসেবে উচ্চারিত হতে পারে যা কোনও শব্দে যুক্তব্যঞ্জনটির অবস্থানের উপর নির্ভর করে। বাংলা লেখার ব্যবস্থাটি তাই সর্বদা উচ্চারণের সত্যিকারের সহায়ক নয়।

বাংলা, অসমিয়া এবং অন্যান্য ভাষার জন্য ব্যবহৃত লিপিটি বাংলা লিপি হিসাবে পরিচিত। বাংলা এবং তার উপভাষায় বাংলা বর্ণমালা হিসেবে এবং কিছু ছোটখাট পরিবর্তনের সঙ্গে অসমিয়া ভাষায় অসমিয়া বর্ণমালা হিসেবে পরিচিত। নিকটবর্তী অঞ্চলের অন্যান্য সম্পর্কিত ভাষা যেমন ভারতীয় রাজ্য মণিপুরে মৈতৈ মণিপুরী ভাষাও  বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে, যেখানে মৈতৈ ভাষা বহু শতাব্দী ধরে বাংলা বর্ণমালায় রচিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মৈতৈ লিপি প্রচার করা হয়েছে।

বাংলা লিপি এক ধরনের আবুগিডা, যেখানে ব্যঞ্জনধ্বনির জন্য বর্ণ, স্বরধ্বনির জন্য কারচিহ্ন এবং  যদি কোন কার চিহ্ন না থাকে তবে স্বয়ংক্রিয় স্বরবর্ণ হিসেবে অ ধরে নেওয়া হয়। 
 সমগ্র বাংলাদেশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলে (আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা) বাংলা বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। আনুমানিক ১০০০ অব্দে ( অথবা ১০ম থেকে ১১শ শতাব্দীতে) ব্রাহ্মী লিপির পরিবর্তিত রূপ থেকে বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়।  এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এটি পাকিস্তানে ব্যবহৃত শাহমুখি লিপির মত আরবি ভিত্তিক বর্ণমালার পরিবর্তে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে।

বাংলা ভাষায় বক্রলিপিতে নয়টি স্বরধ্বনি এবং দুটি  যৌগিক স্বরধ্বনি  নির্দেশ করার জন্য ১১ টি প্রতীক বা চিহ্ন  এবং ব্যঞ্জনধ্বনি ও অন্যান্য প্রভাবকের জন্য ৩৯ টি প্রতীক ব্যবহৃত হয়।  এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে  বড় হাতের এবং ছোট হাতের বর্ণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বর্ণগুলো  বাম থেকে ডানে লেখা হয় এবং  ফাঁকা স্থান গুলো  লিখিত শব্দসমূহ পৃথক করতে ব্যবহৃত হয়। বাংলা লেখায় দুটি বর্ণকে পাশাপাশি যুক্ত করার জন্য একটি সমান্তরাল রেখা টানা হয়  যাকে মাত্রা বলা হয়। 

বাংলা লিপি আবুগিদা হওয়ায় ব্যঞ্জনবর্ণ গুলো  সাধারণত  উচ্চারণগত ভাষাতত্ত্ব  নির্দেশ করে না বরং  উহ্যভাবে  স্বরধ্বনি ধরে রাখে। ফলে এগুলো প্রকৃতিগতভাবে অক্ষর। উদ্ধৃত্ত স্বরধ্বনি সাধারণত একটি পশ্চাৎ স্বরধ্বনি। কোন রূপ স্বরধ্বনি উচ্চারণ ব্যতীত কোন একটি ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণে জোর প্রদান  করতে মূল  ব্যঞ্জনবর্ণের নিচে  হসন্ত () নামক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এই চিহ্নটি সব সময় পাওয়া যায় না ;তবে যখন উচ্চারণের বৈপরীত্য দেখা যায় তখন এটি ব্যবহৃত হয়।

বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনির চিত্রমূলের আবুগিডা প্রকৃতি সর্বদা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।  প্রায়শই ব্যঞ্জনান্ত  অক্ষরসমূহে হসন্ত না থাকলেও কোন স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয় না।

সহজাত  ব্যতীত কিছু স্বরধ্বনির পরে একটি ব্যঞ্জনাত্মক ধ্বনি উপরের, নিচে, আগে, পরে বা ব্যঞ্জনবর্ণের চিহ্নের চারপাশে বিভিন্ন স্বরবর্ণ ব্যবহার করে সর্বব্যাপী ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বর লিখনরূপের নিয়ম গঠন করে শব্দস্বরূপাত্মকভাবে উপলব্ধি করা যায়।  ‘কারচিহ্ন’ নামে পরিচিত এই শব্দস্বরূপগুলি স্বররূপ এবং এগুলি স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না।

বাংলায় স্বরবর্ণগুলো দুটি রূপ নিতে পারে: লিপির মূল তালিকাতে পাওয়া স্বতন্ত্র রূপ এবং নির্ভরশীল, সংক্ষিপ্তরূপ (উপরে বর্ণিত কারচিহ্ন)।  কোনও পূর্ববর্তী বা নিম্নলিখিত ব্যঞ্জনবর্ণ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে একটি স্বরকে উপস্থাপন করতে, স্বরবর্ণের স্বতন্ত্র রূপ ব্যবহার করা হয়।

অন্তর্নিহিত-স্বর-দমনকারী হসন্তের পাশাপাশি, আরও তিনটি চিহ্ন সাধারণত বাংলাতে ব্যবহৃত হয়।  এগুলি হল উর্ধ্বধাবিত চন্দ্রবিন্দু (ঁ) দ্বারা স্বরবর্ণের অনুনাসিক এর অনুপস্থিতিকে বোঝানো হয় (যেমন চাঁদ), পশ্চাদ্ধাবিত অনুস্বার পশ্চাত্তালব্য নাসিক্যধ্বনি (ঙ) ইঙ্গিত করে (যেমন বাংলা ; বাঙলা) এবং পশ্চাদ্ধাবিত বিসর্গ (ঃ) অঘোষ কণ্ঠনালীয় ঊষ্মধ্বনি (হ) (যেমন উঃ! [উঃ] আউচ! ) বা পরবর্তী ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব (যেমন দুখখ [দুকু] দুঃখ ) ইঙ্গিত করে।

বাংলা যুক্তব্যঞ্জনসমূহ (লিখিত যুক্তব্যঞ্জন) সাধারণত সংযুক্ত হিসাবে লেখা হয়, যেখানে প্রথমে যে ব্যঞ্জনবর্ণ আসে তা পরবর্তীটির উপরে বা বাম দিকে যুক্ত হয়। এই সংযুক্তিতে মাঝেমাঝে মূল রূপের চেয়ে এতটাই বিকৃত হয় যে তাকে আলাদা করে চেনা যায় না। বাংলা লিপিতে, এমন প্রায় ২৮৫টি যুক্তব্যঞ্জন রয়েছে।  তবে যুক্তাক্ষর গঠনের কিছু বাহ্যিক নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ছোটবেলা থেকে রপ্ত করতে হয়।

সম্প্রতি, তরুণ শিক্ষার্থীদের উপর এই বোঝা হ্রাস করার লক্ষ্যে, দুটি মূল বাংলা-ভাষা অঞ্চল (পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ) এর বহু যুক্তাক্ষরের অস্পস্ট আকৃতির সমাধানের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি চেষ্টা করেছে এবং ফলস্বরূপ, আধুনিক  বাংলা পাঠ্যপুস্তকে যুক্তবর্ণগুলোর আরও বেশি স্বচ্ছ রূপ ধারণ করা শুরু হয়েছে, যেখানে একটি যুক্তাক্ষরের ব্যঞ্জনবর্ণগুলি বাহ্যিক রূপ সহজেই প্রকাশ পায়।  তবে, যেহেতু এই পরিবর্তনটি তত বিস্তৃত নয় এবং বাকী বাংলা মুদ্রিত সাহিত্যের মতো একইভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না, তাই আজকের বাংলা-শিক্ষিত বাচ্চাদের সম্ভবত নতুন স্বচ্ছ এবং পুরাতন অস্বচ্ছ উভয় রূপই চিনতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত শেখার বোঝা পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে।

বাংলা বিরামচিহ্ন, । (দাড়ি) - একটি ফুলস্টপ এর বাংলা সমতুল্য -  যা পশ্চিমা লিপি থেকে গৃহীত হয়েছে এবং ব্যবহারও তাদের অনুরূপ।

নিম্নলিখিত বাংলা ভাষাতে মানবাধিকার সনদের প্রথম ধারার নমুনা পাঠ্য:

বাংলা লিপিতে বাংলা ভাষা

বাংলার রোমানীকরণ

আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালাতে বাংলা ভাষার উচ্চারণ

বাংলা ভাষার সাথে নেপালি ভাষার ৪০ শতাংশ সাদৃশ্য রয়েছে । এছাড়া অসমীয়া ভাষা, সাদরি ভাষা প্রায় বাংলার অনুরূপ। অনেকেই অসমীয়াকে বাংলার উপভাষা বা আঞ্চলিক রীতি হিসেবে বিবেচনা করেন। সাঁওতালি ভাষা, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার সাথেও বেশ সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।




#Article 2: বাংলাদেশ (7099 words)


বাংলাদেশ () দক্ষিণ এশিয়ার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়, পূর্ব সীমান্তে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মায়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণ উপকূলের দিকে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের সিংহভাগ অঞ্চল জুড়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় ছেয়ে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ও দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ও ধ্রুপদী যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলটিতে বঙ্গ, পুণ্ড্র, গৌড়, গঙ্গাঋদ্ধি, সমতট ও হরিকেল নামক জনপদ গড়ে উঠেছিল। মৌর্য যুগে মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল অঞ্চলটি। জনপদগুলো নৌ-শক্তি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। মধ্য প্রাচ্য ও রোমান সাম্রাজ্যে মসলিন ও সিল্ক রপ্তানি করতো জনপদগুলো। প্রথম সহস্রাব্দিতে বাংলাদেশ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পাল সাম্রাজ্য, চন্দ্র রাজবংশ, সেন রাজবংশ গড়ে উঠেছিল। বখতিয়ার খলজীর গৌড় জয়ের পরে ও দিল্লি সালতানাত আমলে অত্র অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পরে। ইউরোপবাসীরা শাহী বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বাণিজ্য দেশ হিসেবে গণ্য করতো।

মুঘল আমলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের (জিডিপির) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হতো সুবাহ বাংলায়, যা সে সময় সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডটি প্রেসিডেন্সি বাংলার অংশ ছিল। ১৯৪৭-এর ভারত ভাগের পর বাংলাদেশ অঞ্চল পূর্ব বাংলা (১৯৪৭–১৯৫৬; পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৫৬–১৯৭১) নামে নবগঠিত পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিবিধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তায় গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ঘটেছে দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ; এছাড়াও প্রলম্বিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পুনঃপৌনিক সামরিক অভ্যুত্থান এদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বারংবার ব্যাহত করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি বিদ্যমান। সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি ও সমৃদ্ধি সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

জনসংখ্যায় বিশ্বে অষ্টম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ, যদিও আয়তনে বিশ্বে ৯২ তম ৬টি ক্ষুদ্র দ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলেরও কম এই ক্ষুদ্রায়তনের দেশটির প্রাক্কলিত (২০১৮) জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে জনবসতি ২৮৮৯ জন (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১১৫ জন)। দেশের জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা; সাক্ষরতার হার ৭৪.৭ শতাংশ।

২০১৭–১৮ অর্থবছরে চলতি বাজারমূল্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ২২,৫০,৪৭৯ কোটি টাকা (২৬১.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা ২০১৮–১৯ অর্থবছরে বৃদ্ধি লাভ করে ২৮৫.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উন্নীত হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় বার্ষিক আয় ছিল ১ হাজার ৭৫২ ডলার। সরকার প্রাক্কলন করেছে যে, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৫৬ ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৯২ টাকা। দারিদ্রের হার ২৬.২০ শতাংশ, অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১১.৯০ শতাংশ, এবং বার্ষিক দারিদ্র হ্রাসের হার ১.৫ শতাংশ। এই উন্নয়নশীল দেশটি প্রায় দুই দশক যাবৎ বার্ষিক ৫ থেকে ৬.২ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনপূর্বক পরবর্তী একাদশ অর্থনীতিসমূহের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরের পরিবর্ধন বাংলাদেশের এই উন্নতির চালিকাশক্তিরূপে কাজ করছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে কাজ করেছে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ত্বরিত বিকাশ এবং একটি সক্ষম ও সক্রিয় উদ্যোক্তা শ্রেণির আর্বিভাব। বাংলাদেশের রপ্তানীমুখী তৈরি পোশাক শিল্প সারা বিশ্বে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। জনশক্তি রপ্তানীও দেশটির অন্যতম অর্থনৈতিক স্তম্ভ। বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্কলন এই যে ২০১৮–২০ এই দুই অর্থ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতি বছর গড়ে ৬.৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি লাভ করবে।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের উর্বর অববাহিকায় অবস্থিত এই দেশটিতে প্রায় প্রতি বছর মৌসুমী বন্যা হয়; আর ঘূর্ণিঝড়ও খুব সাধারণ ঘটনা। নিম্ন আয়ের এই দেশটির প্রধান সমস্যা পরিব্যাপ্ত দারিদ্র গত দুই দশকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রুত, জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অর্জিত হয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানব সম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে যার মধ্যে রয়েছে পরিব্যাপ্ত পরিবারতন্ত্র, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে তলিয়ে যাবার শঙ্কা। তাছাড়া একটি সর্বগ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার রূপ নিয়ে নতুন ভাবে সামাজিক বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ও বিমসটেক-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া দেশটি জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্ব শুল্ক সংস্থা, কমনওয়েলথ অফ নেশনস, উন্নয়নশীল ৮টি দেশ, জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসি, ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংঘের সক্রিয় সদস্য।

বাংলাদেশ শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত নম নম নম বাংলাদেশ মম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে এর ন্যায় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মাধ্যমে সাধারণ পরিভাষা হিসেবে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। অতীতে বাংলাদেশ শব্দটিকে দুটি আলাদা শব্দ হিসেবে বাংলা দেশ আকারে লেখা হত। ১৯৫০ দশকের শুরুতে, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীরা শব্দটিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল ও সভা-সমাবেশে ব্যবহার করতো। বাংলা শব্দটি বঙ্গ এলাকা ও বাংলা এলাকা উভয়ের জন্যই একটি প্রধান নাম। শব্দটির প্রাচীনতম ব্যবহার পাওয়া যায় ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দের নেসারি ফলকে। এছাড়াও ১১-শতকের দক্ষিণ-এশীয় পাণ্ডুলিপিসমূহে ভাংলাদেসা পরিভাষাটি খুঁজে পাওয়া যায়।

১৪শ শতাব্দীতে বাংলা সালতানাতের সময়কালে পরিভাষাটি দাপ্তরিক মর্যাদা লাভ করে। ১৩৪২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রথম শাহ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। উক্ত অঞ্চলকে বোঝাতে বাংলা শব্দটির সর্বা‌ধিক ব্যবহার শুরু হয় ইসলামী শাসনামলে। ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা অঞ্চলটিকে বাঙ্গালা নামে উল্লেখ শুরু করে।

বাংলা বা বেঙ্গল শব্দগুলোর আদি উৎস অজ্ঞাত; ধারণা করা হয় আধুনিক এ নামটি বাংলার সুলতানি আমলের বাঙ্গালা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক ধারণা করেন যে, শব্দটি বং অথবা বাং নামক একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি বা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বং জাতিগোষ্ঠী ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকদের মতে, বং ছিলেন হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র, যেখানে হিন্দ ছিলেন হামের প্রথম পুত্র আর হামের পিতা ছিলেন নবী নূহ।

অন্য তত্ত্ব অনুযায়ী শব্দটির উৎপত্তি ভাঙ্গা (বঙ্গ) শব্দ থেকে হয়েছে, যেটি অস্ট্রীয় শব্দ বঙ্গা থেকে এসেছিল, অর্থাৎ অংশুমালী। শব্দটি ভাঙ্গা এবং অন্য শব্দ যে বঙ্গ কথাটি অভিহিত করতে জল্পিত (যেমন অঙ্গ) প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেদ, জৈন গ্রন্থে, মহাভারত এবং পুরাণে। ভাঙ্গালাদেসা/ ভাঙ্গাদেসাম (বঙ্গাল/বঙ্গল)-এর সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ ৩-এর নেসারি ফলকে উদ্দিষ্ট (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দের আগে), যেখানে ভাঙ্গালার রাজা ধর্মপালের বৃত্তান্ত লেখা আছে।

২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর পূর্বে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। আর্য জাতির আগমনের পর খ্রিষ্টীয় চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং পরবর্তী চারশ বছর ধরে শাসন করে। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। দ্বাদশ শতকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১২০৫-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী নামের একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন রাজবংশের পতন ঘটান। ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা স্থানীয় সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মুঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ হয় জাহাঙ্গীর নগর।

বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের  আগমন  ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে বহুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।

১৯০৫ থেকে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়। তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধর্ম গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পুনর্বার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশভুক্ত হয়; অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশভুক্ত হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়।
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিস্বত্ব সংস্কারের মাধ্যমে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈরিতার প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়। পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এসময় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে, এবং দলটি বাঙালি জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে যার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বাধিকার আদায়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কারাবন্দী করা হয়। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চাপিয়ে আবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়; কিন্তু ঊনসত্তরের তুমুল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন ঘটে এবং মুজিব মুক্তি পান।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টাল-বাহানা করতে থাকে। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লাখ হতে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। দুই থেকে চার লক্ষ নারী পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়।

আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। এই সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা’র কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয় ও শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে শুরুতে মুজিব সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দেশে বাকশাল নামীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট তারিখে সেনাবাহিনীর কিয়দংশ ও স্বীয় দলের কিছু রাজনীতিবিদের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন।

পরবর্তী ৩ মাসে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান চলতে থাকে, যার পরিসমাপ্তিতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় প্রবর্তন করেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রাম সফরের সময় আরেকটি অভ্যুত্থানে নিহত হন। অতঃপর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পরবর্তী শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতবিহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হয় এবং তিনি ক্ষমতা ত্যাগ করলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ হতে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দারিদ্র ও দুর্নীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসাবে তার অবস্থান সমুন্নত রেখেছে।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর নানা নাটকীয় পালা বদলের মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। এই সরকার প্রায় দুই বৎসর ক্ষমতায় থাকে এবং সেনা সমর্থিত সরকার হিসাবে সমালোচিত হয়। তবে ফখরুদ্দিন সরকার ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক মহাজোট সরকার গঠন করে এবং শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব লাভ করেন। এরপর ২০১৪ সালে ও ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বা‌চনে পুনরায় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক মহাজোট সরকার গঠন করে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ২০°৩৪´ থেকে ২৬°৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১´ থেকে ৯২°৪১´ দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশটির পূর্ব-পশ্চিমে সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৪৪০ কিলোমিটার এবং উত্তর-উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৭৬০ কিলোমিটার। দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দুটি নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানেই কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠে পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র মোহনা অঞ্চলে প্রায় ৩০০০ বছর বা তারও পূর্ব থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তা-ই ইতিহাসের নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের স্বাধীন রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” রূপে। ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে। এর ভূখণ্ড ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল (২২.২২ কিমি) এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০.৪০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর, আর পূর্ব সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভারত। তবে পূর্বে ভারত ছাড়াও মিয়ানমারের (বার্মা) সাথে সীমান্ত রয়েছে; দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। ভারতের ৫টি রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম) এর সাথে বাংলাদেশের আন্তঃর্জাতিক সীমানা রয়েছে। বাংলাদেশের পশ্চিমে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য; উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য এবং পূর্বে রয়েছে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৭ কিলোমিটার যার ৯৪ শতাংশ (৯৪%) ভারতের সাথে এবং বাকি ৬ শতাংশ মিয়ানমারের সাথে। বাংলাদেশের সমুদ্রতটরেখার দৈর্ঘ্য ৫৮০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম অনবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম।

বাংলাদেশের উচ্চতম স্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোডক পর্বত, সমুদ্রতল থেকে যার উচ্চতা ১,০৫২ মিটার (৩,৪৫১ ফুট) এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্গ “বিজয়” (তাজিং ডং)-এর উচ্চতা ১,২৮০ মিটার যা রাঙ্গামাটি জেলার সাইচল পর্বতসারির অন্তর্ভূক্ত। বঙ্গোপসাগর উপকূলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের অনেকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল (টাইগার) বাঘ, চিত্রল হরিণ সহ নানা ধরনের প্রাণীর বাস। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই এলাকাকে বিলুপ্তির সম্মুখীন বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ৮টি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। এগুলো হল: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ। প্রতিটি বিভাগে রয়েছে একাধিক জেলা। বাংলাদেশের মোট জেলার সংখ্যা ৬৪টি। জেলার চেয়ে ক্ষুদ্রতর প্রশাসনিক অঞ্চলকে উপজেলা বলা হয়। সারাদেশে ৪৯২টি উপজেলা (সর্বশেষ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা) রয়েছে। বাংলাদেশে মোট ৪,৫৫৪টি ইউনিয়ন; ৫৯,৯৯০টি মৌজা এবং ৮৭,৩১৯টি গ্রাম রয়েছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনে কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তা নেই; সরকার নিযুক্ত প্রশাসকদের অধীনে এসব অঞ্চল পরিচালিত হয়ে থাকে। ইউনিয়ন বা পৌরসভার ওয়ার্ডগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি রয়েছে। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে মহিলাদের জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়।

এছাড়া শহরাঞ্চলে ১২টি সিটি কর্পোরেশন (ঢাকা-উত্তর, ঢাকা-দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ) এবং ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এগুলোর সবগুলোতেই জনগণের ভোটে মেয়র ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম শহর। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শহরের মধ্যে রয়েছে – চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, যশোর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী,নাটোর,    বগুড়া ও দিনাজপুর।

বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে ৬টি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে যথা: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। বছরে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১৫০০-২৫০০ মি.মি./৬০-১০০ ইঞ্চি; পূর্ব সীমান্তে এই মাত্রা ৩৭৫০ মি.মি./১৫০ ইঞ্চির বেশি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াস। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষীয় প্রভাব দেখা যায়। নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এসময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, ও জলোচ্ছ্বাস প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশের কোনো না কোনো স্থানে আঘাত হানে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র সমতল হতে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সমুদ্র সমতল মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পেলেই এদেশের ১০% এলাকা নিমজ্জিত হবে বলে ধারণা করা হয়।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এই আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.২ শতাংশ। সরকারি সংস্থা পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী জুন ২০১৪-এ জনসংখ্যা ১৫৬,৪৯৯,৬৭৩ জন বা ১৫.৬৪ কোটি। অন্য একটি প্রাক্কলন অনুসারে মার্চ ২০১৪-এ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫.৯৫ কোটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রাক্কলন ১৫.৮৫ কোটি। এই হিসাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮ম জনবহুল দেশ। জনঘনত্ব প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ২৪৯৭ জনের বেশি।

২০১১-এর আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী পুরুষ ও নারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৭ কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার এবং ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার অর্থাৎ নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০:১০৩। জনসংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম দেশ। এখানে জনবসতির ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১,০৫৫ জন, যা সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ (কিছু দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র বাদে)। দেশের অধিকাংশ মানুষ শিশু ও তরুণ বয়সী: যেখানে ০–২৫ বছর বয়সীরা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ, সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা মাত্র ৩ শতাংশ। এদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের গড় আয়ু ৭১.৫ বছর।

জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। বাকি ২ শতাংশ অধিবাসী বিভিন্ন উপজাতি এবং বিহারী বংশোদ্ভূত। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩টি উপজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা ও মারমা উপজাতি প্রধান। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের উপজাতিগুলোর মধ্যে গারো ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, কক্সবাজার এলাকায় বার্মা থেকে বিতাড়িত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে; বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী।

সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে দারিদ্র বিমোচন ও জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক গড়ে দৈনিক মাত্র ১ মার্কিন ডলার আয় করে (২০০৫)। সরকারি হিসেব অনুযায়ী মাথাপিছু আয় বর্তমানে ১ হাজার ৫শ মার্কিন ডলারের বেশি। আর্সেনিকজনিত বিষক্রিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৯০ দশকের শেষভাগে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলা বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষাও। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বৈদেশিক যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সরকারি কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে, তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

জনগোষ্ঠির প্রধান ধর্মবিশ্বাস ইসলাম ধর্মে (৮৬.৬ শতাংশ); এরপরেই রয়েছে হিন্দু ধর্ম (১২.১ শতাংশ), বৌদ্ধ ধর্ম (০.৬ শতাংশ), খ্রিষ্ট ধর্ম (০.৪ শতাংশ), এবং অন্যান্য (০.৩ শতাংশ)। মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ সুন্নি মতাদর্শী। ইসলাম হল বাংলাদেশের বৃহত্তম ও দাপ্তরিক রাষ্ট্রধর্ম, যা হল মোট জনসংখ্যার ৮৬.৬ শতাংশ। দেশটি অধিকাংশ বাঙালি মুসলিমের আবাসস্থল, যা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয়-বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী। অধিকাংশ বাংলাদেশি মুসলিম হল সুন্নি, এরপর রয়েছে শিয়া ও আহমাদিয়া। এর প্রায় চার শতাংশ হল উপাধিবিহীন মুসলিম। বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের চতুর্থ-বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা এবং দেশটি হল ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর বিশ্বের তৃতীয়-বৃহত্তম মুসলিম-সংখ্যাধিক্যের দেশ। এই অঞ্চলে সুফিবাদের সুদীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। বাংলাদেশে মুসলিমদের বৃহত্তম সমাবেশ হয় তাবলীগ জামাআত আয়োজিত বার্ষিক বিশ্ব ইজতেমায়, যা হজের পর মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত।

হিন্দুধর্ম হল জনসংখ্যার দিক থেকে মোট জনসংখ্যার ১২.১ শতাংশ; এদের অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু, এবং কিছু অংশ হল সংখ্যালঘু নৃত্বাত্তিক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশি হিন্দুগণ হল নেপাল ও ভারতের পর বিশ্বের দ্বিতীয়-বৃহত্তম হিন্দুধর্মীয় সম্প্রদায়। বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী সমভাবে ও বহুলভাবে বিস্তৃত, যারা আবাসিক ঘনত্বের দিক থেকে গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোর, চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম পাহড়ি এলাকায় সংখ্যাধিক। জনসংখ্যার দিক থেকে ক্রমশ হ্রাসপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও, হিন্দু সম্প্রদায় হল মুসলিমদের পর ঢাকার দ্বিতীয়-বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায়।

বৌদ্ধধর্ম হল দেশটির তৃতীয়-বৃহত্তম ধর্ম, শতাংশের দিক থেকে ০.৬ শতাংশ। আবাসিক ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশী বৌদ্ধগণ চট্টগ্রাম পাহাড়ি এলাকার আদিবাসী গোষ্ঠীদের (বিশেষত চাকমা, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী) মধ্যে অধিক ও উপকূলীয় চট্টগ্রামে ব্যাপকসংখ্যক বৌদ্ধ বাস করে। খ্রিষ্টধর্ম হল দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম, সংখ্যায় ০.৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের সংবিধান ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। এতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও সকল ধর্মের মানুষের সমান স্বীকৃতি নিশ্চিত করে। ১৯৭২ সাল থেকে, বাংলাদেশ হল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাংবিধানিক-ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।

বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ক্রমবর্ধমান। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে বাংলাদেশে স্বাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৪১ শতাংশ। ইউনিসেফের ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে পুরুষদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৩১ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০০৯ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫২ শতাংশ। চার বছর পর ২০১৩ সালে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে তা ৭১ শতাংশ হয়। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে তা আরও বৃদ্ধি লাভ করে ৭২.৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭২.৯ শতাংশ। ২০০৭ এর তুলনায় সাক্ষরতার হার ২৬.১০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে সাক্ষর নারী ছিল জনসংখ্যার ৫২.২ শতাংশ এবং পুরুষ ৬১.৩ শতাংশ। ২০১৬ তে সাক্ষর নারীর হার ৬৯.৯০ শতাংশে এবং সাক্ষর পুরুষের হার ৭৫.৬২ শতাংশে উন্নীত হয়। সরকার বাস্তবায়িত বিবিধ সাক্ষরতা কর্মসূচীর ফলে দেশে শিক্ষার হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এছাড়া মেয়েদের শিক্ষার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবর্তিত বৃত্তি প্রদান কর্মসূচী নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নিচ্ছে। ২০১৮ সালে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭২.৯ শতাতম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্টাটিসটিকস-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে শিক্ষার হার বর্তমানে ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা তিন সারির এবং বহুলাংশে ভর্তুকিপুষ্ট। বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বহু বিদ্যালয়ের পরিচালনা ব্যয় সর্বাংশে বহন করে। সরকার অনেক ব্যক্তিগত স্কুলের জন্য অর্থায়ন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা খাতে, সরকার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমে ১৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থায়ন দিয়ে থাকে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সরকার মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে আসছে। শিক্ষা বছরের প্রথম দিনের মধ্যেই ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে নতুন ক্লাসের বই তুলে দেয়ার ঐতিহ্য প্রবর্তিত হয়েছে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তিন পদ্ধতি প্রচলিত। প্রথমত সাধারণ পদ্ধতির স্কুলগুলোতে সরকারি পাঠ্যক্রম অনুসৃত হয়। এসব স্কুলে শিক্ষাপ্রদানের ভাষা বাংলা। দ্বিতীয়ত রয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। এগুলোতে পশ্চিমা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয়। তুলনামূলকভাবে সীমিত সংখ্যক হলেও উচ্চ মানের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই স্কুলগুলো প্রসিদ্ধ। তৃতীয়ত রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা। শেষোক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা। তবে ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, ব্যবসায় ইত্যাদি সকল বিষয়ও পাঠ্য।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে তিনভাগে ভাগ করা যায়: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশে ৩৭টি সরকারি, ৮৩টি বেসরকারি এবং দুটো আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় বৃহত্তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত) প্রাচীনতম। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি আন্তর্জাতিক সংস্থা ওআইসি-র একটি অঙ্গসংগঠন, এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকা উপমহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এশিয়ার ১৪টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। ফ্যাকাল্টির সদস্যবৃন্দ এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি স্থানের বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছেন। বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, বুটেক্স এবং ডুয়েট দেশের ছয়টি সরকারি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও বাংলাদেশে রয়েছে। তাদের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ শুরু হয়। এর ফলে ব্যক্তিখাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হতে শুরু করে। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ বাংলাদেশে ব্যক্তিখাতে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৮টি।

দারিদ্রপীড়িত বাংলাদেশে অপুষ্টি একটি দুরূহ সমস্যা যা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। অপুষ্টিজনিত কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসাবে পরিচিত শিশুরা বিশ্ব ব্যাংকের জরীপে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করেছে যা মোটেই কাঙ্খিত নয়। মোট জনগোষ্ঠীর ২৬% অপুষ্টিতে ভুগছে।
৪৬% শিশু মাঝারি থেকে গভীরতর পর্যায়ে ওজনজনিত সমস্যায় ভুগছে। ৫ বছর বয়সের পূর্বেই ৪৩% শিশু মারা যায়। প্রতি পাঁচ শিশুর একজন ভিটামিন এ এবং প্রতি দুইজনের একজন রক্তস্বল্পতাজনিত রোগে ভুগছে।

তবে গত দুই শতকে মানুষের খাদ্যগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে (২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী: ২০৪০ গ্রাম দৈনিক) এবং সুষম খাদ্যাভাস গড়ে উঠেছে যার ফলস্বরূপ অকাল মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে এবং জনগণের গড় আয়ু ৭১ দশমিক ৬ বৎসরে (২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী) উন্নীত হয়েছে। বহু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং ১৩ হাজার কমিউনিটি হাসাপাতালে মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান অনেকাংশে উন্নীত হয়েছে। জন্মকালে শিশু মৃত্যু হার (২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী: হাজারে ৫৩ জন) ও মাতৃমৃত্যুর হার (২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী: হাজারে ১৪৩ জন) উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত হয়। পরবর্তীকালে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সর্বমোট ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থার সরকার পদ্ধতি প্রচলিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি শাখা: সংসদ, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এক কক্ষবিশিষ্ট। এতে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ জন সদস্য ছাড়াও নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন আছে। প্রতিটি সংসদের নির্ধারিত মেয়াদকাল ৫ বছর। বাংলাদেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এছাড়াও, জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৮ বছর বা তদুর্ধ্ব সব নাগরিকের ভোটাধিকার রয়েছে।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি চালু হয় যা ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে সংশোধনক্রমে সংবিধানে গৃহীত হয়। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৯ম জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচনের পূর্বে কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে। এই ব্যবস্থায় সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হত। এ সময় সরকারি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলীর মাধ্যমে। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন মর্মে সংবিধানে প্রবিধান রয়েছে। সংসদীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১-এ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনপূর্ব নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি বাতিল করা হয়। আবার, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে সংবিধানের ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতিদের অভিশংসন প্রথা চালু হয়। প্রধান বিচারপতিদের ইচ্ছে করলে সংসদ অভিশংসন করতে পারবে। আর ২০১৮ সালে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে শুধুমাত্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়।

রাষ্ট্রপতি এদেশের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান। তার সীমিত ক্ষমতা রয়েছে; কেননা কয়েকটি ক্ষেত্র ব্যতীত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে তিনি সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য। তবে সংসদ নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল ক্ষমতার অধিকারী হলেন প্রধানমন্ত্রী, যিনি সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই সংসদ সদস্য হতে হয়। মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হলো বাংলাদেশ সচিবালয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যাবলী পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিযুক্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীরা মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী পদমর্যাদায় বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। উপদেষ্টামণ্ডলী মন্ত্রী সভার বৈঠকে অংশ গ্রহণ করেন। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে সরকার গঠনের পরও প্রধানমন্ত্রীর চার জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন একজন স্থায়ী সচিব। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে ৪১টি মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। বড় মন্ত্রণালয়, যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়, একাধিক “বিভাগ”-এ বিভক্ত। প্রতিটি জেলা এবং উপজেলায় সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ নীতিমালা প্রণয়ন যা বিভিন্ন সংযুক্ত বিভাগ, সংস্থা, বোর্ড, কমিশন, একাডেমী প্রভৃতির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির জন্য পৃথক কার্যালয় রয়েছে। ২০১১-এর হিসাবে দেখা যায়, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭৬৫। এর বাইরে শূন্যপদ রয়েছে প্রায় দেড় লাখ। কর্মরতদের মধ্যে প্রথম শ্রেণীর সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৫২২, দ্বিতীয় শ্রেণীর ৭৩ হাজার ৩২১, তৃতীয় শ্রেণীর ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১ এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬১১ জন।

সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর দুটি স্তর রয়েছে যথা হাইকোর্ট ডিভিশন (উচ্চ আদালত বিভাগ) ও অ্যাপিলাত ডিভিশন (আপিল বিভাগ)। রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। দেশের আইন-কানুন অনেকটা প্রচলিত ব্রিটিশ আইনের আদলে প্রণীত। তবে বিবাহ এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগুলো ধর্মভিত্তিক। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে প্রশাসন থেকে পৃথক করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক বা পররাষ্ট্রনীতি হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও আচরণের নীতিমালা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়', এই নীতি অনুসরণ করে বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই বিংশ শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহের পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত থেকেছে। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ার কারণে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী কারও ইসরায়েলে প্রবেশাধিকার নেই তেমনি কোন ইসরায়েল নাগরিকেরও বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার নেই।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘ সনদের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং বিশ্বসম্প্রদায়ভুক্ত একটি জাতি হিসেবে সকল দায়-দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ সন্নিবেশিত হয়। সংবিধানের প্রস্তাবনায় “মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্ক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন” করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। এরই অনুসৃতিতে সংবিধানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ নির্ধারণ করে ৪টি মূল স্তম্ভ উল্লেখ করা হয়েছে:

২০১৫ সালের হালনাগাদ হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের ৫৩টি দেশে বাংলাদেশের ৬৯টি মিশন রয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংযুক্ত বিভাগসমূহ, বিশ্বের ৫৩টি দেশে থাকা ৬৯টি দূতাবাস/মিশনসমূহের মাধ্যমে পররাষ্ট্র বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন আন্তর্জাতিক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি; বরং এদেশের নিরাপত্তা বাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত-সংকুল দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৮০-এর দশক থেকে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সাংবিধানিক বাধা না থাকলে একজন বাংলাদেশী দ্বিতীয় একটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন। কোন প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিক উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা), অস্ট্রেলিয়া অথবা ইউরোপের কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে সে-দেশের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির জন্য পঠিতব্য শপথ বাক্যে বা স্বাক্ষরিত কোন দলিলে যদি বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহারের শপথ না-থাকে, তাহলে তার বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। এক্ষেত্রে বিদেশী নাগরিকত্বধারী প্রবাসী বাংলাদেশী তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারবেন। বাংলাদেশী নাগরিক ইসরায়েল ব্যতীত পৃথিবীর যে-কোন দেশে ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন।

২০১২ এর হিসাবে, সেনাবাহিনীর বর্তমান শক্তি প্রায় ৩০০,০০০ (রিজার্ভসহ) এবং নৌবাহিনী ১৯,০০০। ২০২০ সালের হিসাবে বিশ্বের ১৩৮টি দেশের সামরিক বাহিনীর শক্তিমত্তার র‌্যাঙ্কিং তৈরিকারী “গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স” নামক এক বৈশ্বিক সুচকে বাংলাদেশ ৪৬ তম স্থান দখল করেছে। প্রথাগত প্রতিরক্ষা ভূমিকা ছাড়াও, সামরিক বাহিনীকে দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে ত্রাণ ও অভ্যন্তরীণ নাগরিক নিরাপত্তার জন্য কর্তৃপক্ষ ডাক দিতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে সক্রিয় কোনো চলমান যুদ্ধে নেই, কিন্তু এটি ১৯৯১ সালে অপারেশন মরুভূমি ঝড় () যুদ্ধে ২,৩০০ সৈন্য প্রেরণ করে এবং বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে সারা বিশ্বে একটি শীর্ষ অবদানকারী (১০,৭৩৬) শান্তিরক্ষা বাহিনী। মে ২০০৭ সালে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, লাইবেরিয়া, সুদান, পূর্ব তিমুর এবং আইভরি কোস্ট রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সরকার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অস্ত্র ক্রয় করছে। ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে সরকার প্রায় ১৫ হাজার ১০৪ কোটি টাকা মূল্যের অস্ত্র ক্রয় করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক আধুনিকায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে ফোর্সেস গৌল ২০৩০ শীর্ষক একটি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ২০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে চীন থেকে ২টি সাবমেরিন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কুতুবদিয়া চ্যানেলে একটি সাবমেরিন পোতাশ্রয় গড়ে তোলা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের Mi-17 হেলিকপ্টার, প্রশিক্ষণ বিমান, ট্যাংক-বিধ্বংসী মিযাইল, আরমার্ড ক্যারিয়ার ক্রয়ের বিশাল অস্ত্র ক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। চীন ও রাশিয়া ছাড়াও বাংলাদেশ জার্মানি, ফ্রান্স, বেলারুশ, সার্বিয়া, জাপান, ইংল্যান্ড ও ইতালি থেকে সমরাস্ত্র ক্রয় করে থাকে।

দুর্নীতি হল বাংলাদেশের একটি চলমান সমস্যা, এছাড়াও দেশটি ২০০৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক প্রকাশিত তালিকায় পৃথিবীর তৎকালীন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে স্থান লাভ করে। ২০১১ এবং ২০১২ সালে দেশটি তালিকার অবস্থানে যথাক্রমে ১২০ এবং ১৪৪ তম স্থান লাভ করে, যেখানে কোন দেশ নম্বরের দিক থেকে যত উপরের দিকে যাবে ততই কম দুর্নীতিগ্রস্থ হিসেবে গণ্য হবে। প্রধানত অতিরিক্ত ভোগবাদী মানসিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও অবমূল্যায়ন দুর্নীতির পেছনে দায়ী, পাশাপাশি দরিদ্রতাও ক্ষেত্রবিশেষে দুর্নীতির প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে সব শ্রেণির ব্যক্তির ঘুষ গ্রহণের নজির রয়েছে। তবে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘুষ গ্রহণের নজির বেশি, যার কারণ স্ব‌ল্প সময়ের ব্যাবধানে জীবনযাত্রার মান মধ্যবিত্ত হতে বিলাসবহুল পর্যায়ে উন্নীতকরণের মানসিকতা। এছাড়াও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তগণ তাদের জীবনযাত্রা মান উন্নয়নে ঘুষ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ যার অর্থনীতি কৃষি নির্ভর। জাতিসংঘের শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী এটি একটি স্বল্পোন্নত দেশ। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে বাংলাদেশের মাথাপিছু ছিল ১২.৫৯৯২ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালের আগষ্ট মাসে মাথাপিছু বেড়ে ২০৬৪ ডলারে (১ ডলার=৮৪ টাকা) এসে দাঁড়ায়। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১.৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

সুইজার‌্যলান্ডের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইসের বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৩৩২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০০ সালে বাংলাদেশের মানুষের সম্পদের সর্বমোট মূল্যমান ছিল ৭,৮০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ ছিল ১,১৩৮ মার্কিন ডলার। সম্পদের সর্বমোট মূল্যমান বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-এ ২৪,০০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ১০,২৭,৯৩,০০০ জন ধরে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক খানাজরীপ অনুযায়ী সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের আয় দেশের সর্বমোট আয়ের মাত্র ০.২৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে আয়বণ্টনের অসমতা গত এক দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে কেননা ২০০০ সালে দেশের সর্বমোট আয়ে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল ০.৭৮ শতাংশ। একইভাবে দেশের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের আয় ২০০০-এ মোট জাতীয় আয়ের ২৪.৬১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৭.৮৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দেশের অনতম অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আয় বণ্টনের অসমতার সূচক জিনি সহগের মান বৃদ্ধি পেয়ে ০.৪৮ এ পৌঁছেছে।

১৯৮০'র দশক থেকে শিল্প ও সেবা খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি অদ্যাবধি কৃষিনির্ভর কারণ দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষিজীবী। দেশের প্রধান কৃষিজ ফসলের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট এবং চা। দেশে আউশ, আমন, বোরো এবং ইরি ধান উৎপন্ন হয়ে থাকে। পাট, যা বাংলাদেশের ‘সোনালী আঁশ’ নামে পরিচিত, এক সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস ছিলো।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশ আসে রফতানিকৃত তৈরি পোশাক থেকে, এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগ ব্যয় হয় একই খাতের জন্য কাঁচামাল আমদানীতে। সস্তা শ্রম ও অন্যান্য সুবিধার কারণে ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে এই খাতে যথেষ্ট বৈদেশিক ও স্থানীয় বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তৈরী পোশাক রপ্তানীর পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ১৫ বিলিয়ন কোটি মার্কিন ডলার।

তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের ৯০%-ই নারী শ্রমিক।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি বড় অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ হতে। পরিবর্তিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নানা অর্থনৈতিক সূচকে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবস্থান পিছনের সারিতে, তবে বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৫ সালের দেশভিত্তিক আলোচনায় এদেশের শিক্ষা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য সামাজিক খাতে উন্নয়নের প্রশংসা করা হয়েছে।

১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশ গড়ে ৫% থেকে ৬.২% শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এসেছে। মধ্যবিত্ত ও ভোক্তা শ্রেণীর প্রসারণ ঘটেছে দ্রুত। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে আগামী ১১ দেশ এর মধ্যে গণ্য করা হয়েছে।

২০১৬-১৭ অর্থবৎসরের প্রাক্কলন অনুযায়ী এবছর প্রায় ৬.৮% জিডিপি প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সারা দেশে চালু হওয়া ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা। ১৯৯০ এর দশকের শেষভাগে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ; ব্র্যাকসহ অন্যান্য সাহায্য সংস্থারও প্রায় ২৫ লাখ সদস্য রয়েছে।

দেশের শিল্প ও রফতানির উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা (ইপিজেড) স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের রফতানি ও আমদানি বাণিজ্যর সিংহভাগ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর, মংলা সমুদ্র বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

বাংলাদেশে দুই ধরনের মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলিত আছে, ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোট। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন লিমিটেডের (SPCBL) অধিনে (শিমুলতলী, গাজীপুর) কাগুজে নোট গুলো মুদ্রিত হয়। নোট গুলো প্রচলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ টাকার নোট সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন লিমিটেড কর্তৃক মুদ্রিত প্রথম নোট। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড, বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান। ১ টাকা এবং ১০০ টাকার নোট এ দেশে প্রথম মুদ্রিত নোট। বাংলাদেশের প্রথম টাকা ও মুদ্রার নকশাকার কে জি মুস্তফা। বর্তমানে নয়টি কাগুজে নোট এবং তিনটি ধাতব মুদ্রা চালু আছে।

বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পিট, চুনাপাথর, কঠিন শিলা। এছাড়াও দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরে লোহার খনি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং কক্সবাজারের সৈকতের বালিতে ভারি মণিক (জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, মোনাজাইট, লিউককসেন, কায়ানাইট ইত্যাদি) পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা মূলত ছিলো ডাক আদান-প্রদানভিত্তিক। কিন্তু কালের আবর্তনে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন এবং পরবর্তিতে মোবাইল ফোনের প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সংঘটিত হয়।বাংলাদেশে নৌপথ, স্থলপথ, আকাশপথ এই তিন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০,০০০ কিলোমিটার পাকা সড়কপথ, ২,৮৯১ কিলোমিটার রেলপথ এবং ৮,৯০০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। তাই বাংলাদেশের প্রাচীনতম যাতায়াত পথ হিসেবে গণ্য করা হয় নৌপথ বা জলপথকে। নৌপথের নদীপথ এবং সমুদ্রপথ উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় নদীপথ গুরুত্বপূর্ণ, তবে বহির্বিশ্বের সাথে যাতায়াত ব্যবস্থায় সমুদ্রপথ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৮৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ নাব্য জলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪০০ কিলোমিটার সারা বছর নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার শুধু বর্ষাকালে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের নদীগুলো নৌচলাচলের জন্য বেশি উপযোগী। এ অঞ্চলেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলো অবস্থিত: ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, খুলনা প্রভৃতি। নদীপথে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই (৯৪%) নৌকা ও লঞ্চে এবং বাকিরা (৬%) স্টিমারে যাতায়াত করেন। দেশের সমুদ্রপথ মূলত ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তিনটি সমুদ্র বন্দর রয়েছে। এগুলো হল চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর, মোংলা সমুদ্র বন্দর এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর।

বাংলাদেশের স্থল যোগাযোগের মধ্যে সড়কপথ উল্লেখযোগ্য। সড়কপথের অবকাঠামো নির্মাণ এদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভৌগোলিক অবকাঠামোর মধ্যে বেশ ব্যয়বহুল। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশে পাকা রাস্তার পরিমাণ ছিলো ১৯৩১.১৭ কিলোমিটার, ১৯৯৬-১৯৯৭ সালের দিকে তা দাঁড়ায় ১৭৮৮৫৯ কিলোমিটারে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে দেশের জাতীয় মহাসড়ক ৩৪৭৮ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪২২২ কিলোমিটার এবং ফিডার/জেলা রোড ১৩২৪৮ কিলোমিটার। দেশের সড়কপথের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে উন্নত করতে যমুনা নদীর উপরে ৪.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু ১৯৯৮ সালের জুন মাসে উদ্বোধন করা হয় যা রাজধানী ঢাকাকে উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করে। এছাড়াও ৬.১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলছে যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজধানী ঢাকা ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ সংযুক্ত হবে। অন্যান্য বৃহৎ সড়ক সেতু হচ্ছে: জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু, মেঘনা-গোমতী সেতু, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সেতু, ত্বরা সেতু, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু ১, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু ২, শীতলক্ষ্যা সেতু, কর্ণফুলি সেতু ইত্যাদি। সড়কপথে প্রায় সব জেলার সাথে যোগাযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো (ব্রিজ, কালভার্ট) নির্মিত না হওয়ায় ফেরি পারাপারের প্রয়োজন পরে। সড়কপথে জেলাভিত্তিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় বড় যানবাহন যেমন: ট্রাক, বাস ব্যবহৃত হলেও আঞ্চলিক বা স্থানীয় পর্যায়ে ট্যাক্সি, সিএনজি, মিনিবাস, ট্রাক ইত্যাদি যান্ত্রিক বাহন ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বহু পুরাতন আমলের অযান্ত্রিক বাহন যেমন: রিকশা, গরুর গাড়ি, ঠেলাগাড়িও ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে স্থলভাগে রেলপথ সবচেয়ে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশে রেলপথ ছিলো ২৮৫৭ কিলোমিটার। ২০০৮-২০০৯ সালের হিসাব মতে, বাংলাদেশে রেলপথ ছিল ২৮৩৫ কিলোমিটার। এদেশে মিটারগেজ এবং ব্রডগেজ-দু'ধরনের রেলপথ রয়েছে। রেলপথ, রেলস্টেশনের দ্বারা পরিচালিত হয়, এছাড়া বিভিন্ন স্টেশনকে জংশন হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। রেলপথকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে প্রায় ৫০টিরও অধিক যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। বাংলাদেশকে ট্রান্স এশীয় রেলওয়ে জালের সঙ্গে সংযোজনের জন্য চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ অবধি ১২৮ কিলোমিটার রেলসড়ক স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে (২০১৩)। এই রেলসড়ক মিয়ানমারের গুনদুম রেলস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। রেলপথে সারা বাংলাদেশকে সংযুক্ত করার জন্য সরকারি উদ্যোগে কিছু রেল সেতু স্থাপন করা হয়েছে। এদের মধ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভৈরব সেতু, তিস্তা সেতু উল্লেখযোগ্য।

দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে বাংলাদেশে আকাশপথে বা বিমানপথে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিমান যাতায়াত ব্যবস্থায় দেশের ভিতরকার বিভিন্ন বিমানবন্দরে যাতায়াত করা যায়, আর আন্তর্জাতিক বিমান যাতায়াত ব্যবস্থায় শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বহির্দেশে গমনাগমন করা যায়। ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের অন্যতম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট এবং কক্সবাজারেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সচল অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরগুলো হল- যশোর বিমান বন্দর, বরিশাল বিমান বন্দর, রাজশাহী বিমান বন্দর, সৈয়দপুর বিমান বন্দর, ঈশ্বরদী বিমান বন্দর ইত্যাদি।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের যোগাযোগ ও পর্যটন খাত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। আগস্ট, ১৯৭৫ সালে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় হিসাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়। জানুয়ারি, ১৯৭৬ সালে এটি পুনরায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিভাগে পরিণত হয়। ডিসেম্বর, ১৯৭৭ সালে পৃথকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় খোলা হয়। ২৪ মার্চ, ১৯৮২ সালে এ মন্ত্রণালয়কে বিলুপ্ত করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করা হয়। এরপর ১৯৮৬ সাল থেকে উক্ত মন্ত্রণালয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা অদ্যাবধি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি পুরনো। ৭ম শতাব্দীতে লেখা বৌদ্ধ দোহার সঙ্কলন চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ বাংলা ভাষায় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলার লোক সাহিত্যও সমৃদ্ধ; মৈমনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়।

নৃত্যশিল্পের নানা ধরন বাংলাদেশে প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে উপজাতীয় নৃত্য, লোকজ নৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ইত্যাদি। দেশের গ্রামাঞ্চলে যাত্রা পালার প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশের সংগীত বাণীপ্রধান; এখানে যন্ত্রসংগীতের ভূমিকা সামান্য। গ্রাম বাংলার লোক সঙ্গীতের মধ্যে বাউল গান, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, গম্ভীরা, কবিগান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গ্রামাঞ্চলের এই লোকসঙ্গীতের সাথে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে মূলত একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশে মোট প্রায় ২০০টি দৈনিক সংবাদপত্র ও ১৮০০টিও বেশি সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তবে নিয়মিতভাবে পত্রিকা পড়েন এরকম লোকের সংখ্যা কম, মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫%। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ জনপ্রিয়। গণমাধ্যমের মধ্যে রেডিও অঙ্গনে বাংলাদেশ বেতার ও বিবিসি বাংলা জনপ্রিয়। সরকারি টেলিভিশন সংস্থা বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে বেসরকারি ১০টির বেশি উপগ্রহভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ও ৫টির বেশি রেডিও সম্প্রচারিত হয়। ঢাকা-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র শিল্প হতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হতে ১০০টি বাংলা চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের রান্না-বান্নার ঐতিহ্যের সাথে ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের রান্নার প্রভাব রয়েছে। ভাত, ডাল ও মাছ বাংলাদেশীদের প্রধান খাবার, যেজন্য বলা হয়ে থাকে মাছে ভাতে বাঙালি। দেশে ছানা ও অন্যান্য প্রকারের মিষ্টান্ন, যেমন রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, কালোজাম বেশ জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের নারীদের প্রধান পোশাক শাড়ি। তবে অল্পবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে, বিশেষত শহরাঞ্চলে সালোয়ার কামিজেরও প্রচলন রয়েছে। পুরুষদের প্রধান পোশাক লুঙ্গি। তবে শহরাঞ্চলে পাশ্চাত্যের পোশাক শার্ট-প্যান্টই বেশি প্রচলিত। বিশেষ অনুষ্ঠানে পুরুষরা পাঞ্জাবী-পায়জামা পরিধান করে থাকেন।

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত উৎসবগুলোকে মূলত ধর্মীয় ও সর্বজনীন এই দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসব ঈদুল ফিত্‌র, ঈদুল আজহা, মিলাদুন্নবী, শবে বরাত, শবে কদর ও মুহররম। হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোর মধ্যে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মী পূজা, সরস্বতী পূজা, দোলযাত্রা, হোলি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব হল বুদ্ধ পূর্ণিমা, আর খ্রিষ্টানদের বড়দিন।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব হচ্ছে দুই ঈদ, অর্থাৎ ঈদুল ফিত্‌র ও ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতরের আগের দিনটি বাংলাদেশে ‘চাঁদ রাত’ নামে পরিচিত। ছোট ছোট বাচ্চারা এ দিনটি অনেক সময়ই আতশবাজির মাধ্যমে পটকা ফাটিয়ে উদযাপন করে। ঈদুল আজহার সময় শহরাঞ্চলে প্রচুর কোরবানির পশুর আগমন হয় এবং এটি নিয়ে শিশুদের মাঝে একটি উৎসবমুখর উচ্ছাস থাকে। এই দুই ঈদেই বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকা ছেড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের জন্মস্থল গ্রামে পাড়ি জমায়।

এছাড়া বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসবের মধ্যে পহেলা বৈশাখ প্রধান। গ্রামাঞ্চলে নবান্ন, পৌষ পার্বণ ইত্যাদি লোকজ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে শহীদ দিবস ঘটা করে পালিত হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু বা কাবাডি। এই খেলার মতোই বাংলাদেশের অধিকাংশ নিজস্ব খেলাই উপকরণহীন কিংবা উপকরণের বাহুল্যবর্জিত। উপকরণবহুল খুব কম খেলাই বাংলাদেশের নিজস্ব খেলা। উপকরণহীন খেলার মধ্যে এক্কাদোক্কা, দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, কানামাছি, বরফ-পানি, বউচি, ছোঁয়াছুঁয়ি ইত্যাদি খেলা উল্লেখযোগ্য। উপকরণের বাহুল্যবর্জিত বা সীমিত সহজলভ্য উপকরণের খেলার মধ্যে ডাঙ্গুলি, সাতচাড়া, রাম-সাম-যদু-মধু বা চোর-ডাকাত-পুলিশ, মার্বেল খেলা, রিং খেলা ইত্যাদির নাম করা যায়। যেহেতু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে সাঁতার শিখতে হয় তাই সাঁতার বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায় ছাড়া জনসাধারণের কাছে আলাদা ক্রীড়া হিসেবে তেমন একটা মর্যাদা পায় না। গৃহস্থালী খেলার মধ্যে লুডু, সাপ-লুডু, দাবা বেশ প্রচলিত। এছাড়া ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো বিভিন্ন বিদেশী খেলাও এদেশে বেশ জনপ্রিয়। অন্যান্য খেলার মধ্যে হকি, হ্যান্ডবল, সাঁতার, কাবাডি, গলফ, আর্চারি এবং দাবা উল্লেখযোগ্য। এ যাবৎ ৫জন বাংলাদেশী- নিয়াজ মোর্শেদ, জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব এবং এনামুল হোসেন রাজীব দাবায় গ্র্যান্ড মাস্টার খেতাব লাভ করেছেন। বাংলাদেশের খেলাধুলা নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ২৯টি খেলাধুলা সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন ফেডারেশন নিয়ন্ত্রণ করে।

১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয় করে, যার ফলে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবারের মতো তারা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। সেবার প্রথম পর্বে বাংলাদেশ স্কটল্যান্ড ও পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে পরাজিত করে। এছাড়া ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট ক্রিকেট খেলার মর্যাদা লাভ করে। ক্রিকেট দলের মধ্যে ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব থাকলেও তারা বিশ্বের প্রধান ক্রিকেট দলগুলোকে যেমন: অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলংকাকে হারিয়ে এসেছে। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি দল ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে এবং ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নাটকীয়ভাবে পরাজিত করে বিশ্বক্রিকেটে বিশেষ আলোচনার ঝড় তোলে। টেস্ট ক্রিকেট খেলার মর্যাদা লাভ করার পর এপর্যন্ত বাংলাদেশ তিনটি টেস্ট সিরিজ জয় করেছে। প্রথমটি জিম্বাবুয়ের সাথে ২০০৪-'০৫ খ্রিষ্টাব্দে, দ্বিতীয়টি জুলাই ২০০৯-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপরীতে এবং তৃতীয়টি ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে জিম্বাবুয়েকে।
বাংলাদেশের খেলোয়াড় সাকিব আল হাসান ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সব ফরম্যাট ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের মর্যাদা অর্জন করেন। বাংলাদেশ ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে যৌথভাবে ভারত ও শ্রীলংকার সাথে আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ এককভাবে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন করে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম ও চা-শিল্পের জন্য বিখ্যাত সিলেটে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়।

সরকার

সাধারণ জ্ঞাতব্য




#Article 3: দুর্গা (1107 words)


দুর্গা (; অর্থাৎ যিনি দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন; ও, যে দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন) হলেন হিন্দু দেবী পার্বতীর এক উগ্র রূপ। তিনি একজন জনপ্রিয় দেবী। হিন্দুরা তাকে মহাশক্তির একটি উগ্র রূপ মনে করেন।তিনি দেবী পার্বতীর উগ্র রূপ, তার অন্যান্য নামসমূহ হল চণ্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহারিণী নারায়ণী, মহামায়া, কাত্যায়নী ইত্যাদি। দেবী দুর্গার অনেকগুলি হাত। তার অষ্টাদশভুজা, ষোড়শভুজা, দশভুজা, অষ্টভুজা ও চতুর্ভূজা মূর্তি দেখা যায়। তবে দশভুজা রূপটিই বেশি জনপ্রিয়। তার বাহন সিংহ (কোনো কোনো মতে বাঘ)। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরতা অবস্থায় দেখা যায়।তার অনেক রূপ তার মধ্যে কালী রূপটি অনেক জনপ্রিয়‌।

হিন্দুধর্মে দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ। তিনি শিবের স্ত্রীপার্বতীর উগ্র রূপ, কার্তিক ও গণেশের জননী, এবং কালীর অন্যরূপ। বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলিতে এবং আগমনী গানে দুর্গারূপে শিবজায়া হিমালয়দুহিতা পার্বতীর সপরিবারে পিতৃগৃহে অবস্থানের আনন্দময় দিনগুলির (দুর্গাপূজা) এবং তার বিবাহিত জীবনের অপূর্ব বর্ণনা পাওয়া যায়।
দেবী পার্বতী দেবতাদের অনুরোধে দুর্গম অসুর কে বধ করেন তাই দেবী পার্বতী দুর্গা নামে অভিহিত হন।

দুর্গার আরাধনা বাংলা, অসম, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলিত। ভারতের অন্যত্র দুর্গাপূজা নবরাত্রি উৎসব রূপে উদযাপিত হয়। বছরে দুইবার দুর্গোৎসবের প্রথা রয়েছে – আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শারদীয়া এবং চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বাসন্তী দুর্গাপূজা। সম্ভবত খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় দুর্গোৎসব প্রবর্তিত হয়। জনশ্রুতি আছে, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম মহাআড়ম্বরে শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন। কূর্ম, মৎস, বরাহ,দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে ঋষি মতন্ড কুমার কার্তিক, গণেশ কে প্রশ্ন করেন যে তাদের মাতার নাম দুর্গা কন? তারা বলে হিরণাক্ষ পুত্র রুরুর বংশধর দুর্গম সমুদ্র মন্থনে অসুরদের সাথে ছলনা করার প্রতিশোধ রূপে ব্রহ্মার কাছে বর চায় যে তাকে এমন এক নারী বধ করবে যে অনাবদ্ধ কে আবদ্ধ করে। দুর্গম অসুর চতুর্বেদ কে হস্তগত করলে সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষায় দেবী পার্বতী এক দশভুজরূপী মঙ্গলময় দেবী রূপে আবির্ভূত হন তারপর দুর্গম কে শূলের আঘাতে বধ করেন। কিন্তু ভাবপ্রবণ বাঙালি মহিষবধিনী চণ্ডীকে ও দুর্গমনাশিনী দুর্গা কে এক মূর্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছে।

দুর্গা মূলত শক্তি দেবী। ঋগ্বেদে দুর্গার বর্ণনা নেই, তবে ঋগ্বেদোক্ত দেবীসূক্তকে দেবী দুর্গার সূক্ত হিসাবেই মান্যতা দেওয়া হয়।দেবী দূর্গা নির্গুণ অবস্থায় এই জগৎসংসারে বিরাজ করেন।তার জন্ম হয়না,আবির্ভাব ঘটে,যাকে বলা হয় প্রাকত্ব।দূর্গা সপ্তশতী তে বর্ণিত আছে, যে মহাশক্তি ব্রহ্মার ব্রহ্মত্ব,শিবের শিবত্ব,বিষ্ণুর বিষ্ণুত্ব প্রদান করেছেন ,সেই দেবী দেবতাদের সমষ্টিভূত ত্বেজপুঞ্জ থেকে স্বরূপ ধারণ করেন।  দুর্গার বিশেষ আলোচনা ও পূজাবিধি তন্ত্র ও পুরাণেই প্রচলিত। যেসকল পুরাণ ও উপপুরাণে দুর্গা সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে সেগুলি হল: মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ ও দেবী ভাগবত। তিনি জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদুর্গা, চণ্ডী, নারায়ণী, শিবানী, কালী, গৌরী, উমা  প্রভৃতি নামে ও রূপে পূজিতা হন।তিনি কখনো বা নিমুণ্ডমালিনি চামুন্ডা,তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি।শত্রুদহনকালে তিনি অগ্নিবর্ণা,অগ্নিলোচনা।তিনিই জগদীশ্বরী,আপন মহিমায় এই পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন প্রতিটি জীবের শরীরে।তিনি ঘটন -অঘটন পটিয়সী ,দূর্গা দুর্গতিনাশিনী।তিনিই জগৎকে চালান ও প্রতিপালন করেন জগদ্ধাত্রী রূপে,আবার প্রলয়কালে তিনিই হয়ে উঠেন প্রলয়ংকারী দেবী কালিকা। 
দেবী দুর্গা শাক্ত ধর্মে সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবী, বৈষ্ণব ধর্মে তাকে ভগবান বিষ্ণুর অনন্ত মায়া হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয় এবং শৈবধর্মে দুর্গাকে শিবের অর্ধাঙ্গিনী পার্বতী । বৈদিক সাহিত্যে দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। কেনোপনিষদে বর্ণিত উমা(পার্বতী)হৈমাবতীকে দুর্গা হিসাবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে; ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের যোগমায়াকে দুর্গার একটি স্বরূপ আখ্যা দেওয়া হয়েছে যিনি হরির সহায়িনী তথা শিবভক্তিপ্রদায়িনী। এইসমূহ ছাড়াও দুর্গাদেবীর বর্ণনা মহাভারতের বিরাট পর্ব ও অন্যান্য পুরাণে পাওয়া যায়। পার্বতীরূপী দুর্গাদেবীর ভিন্ন ভিন্ন অবতার সমূহ হল: কালিকা, নন্দা, ভ্রামরী, শাকম্ভরী, রক্তদণ্ডিকা, কৌশিকী ইত্যাদি।

জাপানি দুর্গা বা  “জুনতেই ক্যানন (Juntei Kannon)” ১৮ হাতের দুর্গা রূপ।মহাযান পরিব্রাজকদের হাত ধরে দেবীর এই রূপ জাপানে পৌঁছায় ৭০০ শতাব্দীর কাছাকাছি।ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃ-তান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের, তারা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। সিন্ধু সভ্যতায় তথা ব্যবিলনীয় সভ্যতায় উল্লেখ পাওয়া যায় এই মাতৃ পূজার। মাতৃপূজাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির আদি পর্ব থেকে শুরু সিংহবাহিনী দেবীর পূজা। মেসপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় খোঁজ পাওয়া যায় সিংহবাহিনী দেবী ইনান্না-র।কুশান রাজা কনিষ্কের মুদ্রাতেও খোঁজ পাওয়া যায় সিংহবাহিনী দেবী নানা-র। তুর্কমেনিস্তান ও আফগানিস্তানে প্রচলিত ছিল এই দেবীর মাহাত্ম্য। এখনও দেবী চণ্ডী “বিবি নানা” হিসাবে এইসব অঞ্চলে পূজিত হন।

শাক্ত ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ হয় খ্রিষ্টীয় ৪০০ – ৫০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। খ্রিষ্টীয় ৪০০ অব্দে রচিত হয় শাক্ত মহাপুরাণের অন্যতম গ্রন্থ দেবীমাহাত্ম্যম্।  এই সময়েই মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১-৯৩ অধ্যায়গুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় এই গ্রন্থ। দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থেই প্রথম বিভিন্ন নারী দেবতা সংক্রান্ত নানান পুরাণ-কথা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক উপাদানগুলি একত্রিত করা হয়। দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থে বৈদিক পুরুষতান্ত্রিক দেবমণ্ডলীর সঙ্গে সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব নবম সহস্রাব্দ থেকে বিদ্যমান নৃতাত্ত্বিক মাতৃপূজা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির এক সম্মিলনের প্রয়াস লক্ষিত হয়। এর পরবর্তী হাজার বছর এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। মহাযান বৌদ্ধধর্মের হাত ধরে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, তিব্বত, ভুটান, মালয়েশিয়া ও মঙ্গোলিয়ায়।কম্বোডিয়া আর ইন্দোনেশিয়া দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য পূজিত হতে শুরু করে হিন্দু ধর্মের প্রসারের সাথে।অ্যাংকর যুগের (১০১০ শতাব্দের) পূর্বে কম্বোডিয়ায় মহিষাসুরমর্দিনীর পূজার প্রচলন ছড়িয়ে পরে হিন্দুধর্মের হাত ধরে। এই সময়ের যে দুর্গা মূর্তিগুলি কম্বোডিয়া থেকে উদ্ধার হয়েছে, অধিকাংশ চতুর্ভুজা এবং মহিষাসুরমর্দিনী। মূর্তিগুলির বৈশিষ্ট্যাবলি যে এখানে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা বিষ্ণুর ক্ষমতা ধারণ করেছেন যা তার চতুর্ভুজের শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম থেকে প্রতিষ্ঠিত।

জাভা ও ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য অংশ থেকে উদ্ধার হয়েছে অনেক মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির প্রত্নতাত্ত্বিকধ্বংসাবশেষ। এই মূর্তিগুলো মধ্যে প্রাচীনতমর তারিখ অনুমান অষ্টম শতাব্দীর। ইন্দোনেশিয়ার সেন্ট্রাল জাভাতে রয়েছে নবম শতাব্দীর বিখ্যাত হিন্দু মন্দির প্রাম্বানান। এই মন্দিরে রয়েছে এক জগৎবিখ্যাত মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। এটি একটি ইউনেস্কো-স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, ইন্দোনেশিয়ায় বৃহত্তম হিন্দু মন্দির, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় মন্দির প্রাঙ্গণ।১৫শ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইসলামের আগমনের পর দুর্গার আরাধনা পাড়ি জমায় আরও পূর্বদিকে হিন্দু বালিতে।

দুর্গাপূজা হল শক্তির অধিষ্ঠাত্রী পার্বতীদেবীর দুর্গা রূপের উপাসনার উৎসব। দুর্গাপূজা শরৎ (আশ্বিন) এবং বসন্ত (চৈত্র) ঋতুর শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অনুযায়ী, দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন হয়েছিল বসন্ত ঋতুতে রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি কর্তৃক। 
দেবী ভাগবত ও কালিকাপুরাণে উল্লেখ আছে, শরৎকালে শ্রীরামচন্দ্র দেবী পার্বতীর দুর্গতিনাশিনী দুর্গা রূপের পূজা করেছিলেন রাবণ বধের নিমিত্তে; এজন্য একে, ‘অকালবোধন’ও বলা হয়ে থাকে।

পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ডে দুর্গাপূজা বহুলভাবে উদযাপন করা হয়; উত্তর ভারতে এটি নবরাত্রি হিসাবে পালন করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের একাধিক রাষ্ট্র দুর্গাপূজা পালন করে এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরাও সকলে দুর্গাপূজা পালন করে। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন তথা ষষ্ঠীর থেকে আরম্ভ করে দশমী পর্যন্ত হয়ে থাকে এই দুর্গোৎসব। এই পাঁচ দিন যথাক্রমে দুর্গা ষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। এই পক্ষটিকে দেবীপক্ষ নামেও জানা যায়। পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন এই দেবীপক্ষের সূচনা হয়, একে মহালয়াও বলা হয়ে থাকে; আর পূর্ণিমার দিনটিকে লক্ষ্মী পূজার দিন হিসাবে গণ্য করা হয় ।

হিন্দুশাস্ত্রে দুর্গা শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:

অর্থাৎ, দ অক্ষরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, গ অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং অ-কার শত্রু নাশ করে। এর অর্থ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম বলেছে, দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা। অর্থাৎ, যিনি দুর্গ নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনি সব সময় দুর্গা নামে পরিচিত। দেবী পার্বতী দেবগণের অনুরোধে ও শিবের আদেশে এক উগ্র রূপ ধারণ করে দুর্গম অসুর কে বধ করেন তাই তিনি দুর্গা নামে অভিহিত হন।

 




#Article 4: আনন্দমঠ (447 words)


আনন্দমঠ ঊনবিংশ শতাব্দীর ঔপন্যাসিকবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি বাংলা উপন্যাস। এর প্রকাশকাল ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই উপন্যাসটি ছাপার বিরূদ্ধে ব্রিটিশ সরকার আইন পাশ করে, তবে এর হস্তলিখিত গুপ্ত সংস্করণ জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। উপন্যাসটি মুসলমান-বিরোধী মতধারার জন্য কিছুটা বিতর্কিত। এই উপন্যাসের কাহিনী ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত উত্তর বঙ্গের সন্ন্যাসী আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এই উপন্যাসেই বঙ্কিমচন্দ্র বন্দে মাতরম গানটি লেখেন।  পরবর্তীতে ভারতীয় স্বদেশপ্রেমীরা বন্দে মাতরম বাক্যটি জাতীয়তাবাদী শ্লোগান হিসাবে গ্রহণ করে।

এটি মহেন্দ্র এবং কল্যাণী নামে এক দম্পতির পরিচয় দিয়ে শুরু হয়েছিল, যারা দুর্ভিক্ষের সময়ে খাবার ও জল ছাড়াই তাদের গ্রাম পদাচিনহে আটকে রয়েছে।  তারা তাদের গ্রাম ছেড়ে পরবর্তী নিকটতম শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেখানে বেঁচে থাকার আরও ভাল সম্ভাবনা রয়েছে।  ঘটনা চলাকালীন, দম্পতি আলাদা হয়ে যায় এবং ডাকাতদের হাতে ধরা না পড়তে দৌড়াতে থাকে এবং এক পর্যায়ে   নদীর তীরে চেতনা হারায়। সত্যানন্দ নামে একজন হিন্দু সন্ন্যাসী তাকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে যান এবং তিনি এবং অন্যান্য সন্ন্যাসীরা তার স্বামীর সাথে পুনরায় মিলন না হওয়া পর্যন্ত তার এবং তার সন্তানের যত্ন নেন।

স্বামী মহেন্দ্র এই মুহুর্তে সন্ন্যাসীদের ভ্রাতৃত্বে যোগদান এবং মাতৃ জাতির সেবা করার দিকে ঝুঁকছেন।  কল্যাণী নিজেকে হত্যা করার চেষ্টা করে তার স্বপ্ন অর্জনে সহায়তা করতে চায়, ফলে তাকে পার্থিব কর্তব্য থেকে মুক্তি দেয়।  এই সময়ে সত্যানন্দ তার সাথে যোগ দেন তবে তিনি তাকে সাহায্য করার আগে তাকে ব্রিটিশ সেনারা গ্রেপ্তার করেছিল, কারণ অন্যান্য সন্ন্যাসী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিল।  টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অন্য এক সন্ন্যাসীকে দাগ দিতেন যিনি তাঁর স্বতন্ত্র পোশাক পরিধান করেন না এবং গান করেন,

অন্য সন্ন্যাসী গানটি ডিক্রি করে, কল্যাণী এবং শিশুটিকে উদ্ধার করে বিদ্রোহী সন্ন্যাসীর আস্তানায় নিয়ে যায়।  একই সাথে কল্যাণীর স্বামী মহেন্দ্রকেও ভিক্ষুরা আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তাদের আবার একত্রিত হয়।  বিদ্রোহীদের নেতা মহেন্দ্রকে ভারত-মাতার (মাদার ইন্ডিয়া) তিনটি মুখ দেখিয়েছেন যে পর পর তিনটি ঘরে তিনটি দেবদেবীর পূজা করা হচ্ছে:

ধীরে ধীরে, বিদ্রোহী প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং তাদের র‌্যাঙ্কগুলি ফুলে যায়।  উত্সাহিত হয়ে, তারা তাদের সদর দফতরে একটি ছোট ইটের দুর্গে স্থানান্তরিত করে।  ব্রিটিশরা একটি বিশাল বাহিনী দিয়ে দুর্গে আক্রমণ করেছিল।  বিদ্রোহীরা নিকটবর্তী নদীর উপর ব্রিজ অবরোধ করলেও তাদের কোনও আর্টিলারি বা সামরিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।  লড়াইয়ে ব্রিটিশরা সেতুর উপরে কৌশলগত পশ্চাদপসরণ করে।  সন্ন্যাসীদের অপ্রস্তুত সেনা, সামরিক অভিজ্ঞতার অভাবে ব্রিটিশদের ফাঁদে ফেলে।  ব্রিজটি বিদ্রোহীদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেলে, ব্রিটিশ আর্টিলারি গুলি চালিয়ে দেয় এবং গুরুতর হতাহতের শিকার হয়।

তবে কিছু বিদ্রোহী কিছু কামান দখল করে এবং আগুনটিকে ব্রিটিশ লাইনে ফিরিয়ে দেয়।  ব্রিটিশরা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়, বিদ্রোহীরা তাদের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে।  মহেন্দ্র এবং কল্যাণী আবার বাড়ি তৈরির মধ্য দিয়ে গল্পটি শেষ হয়েছে, মহেন্দ্র বিদ্রোহীদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছিলেন।

এই উপন্যাসটিতে ভান্দে মাতরম গানটি গাওয়া হয়েছে।  বন্দে মাতরমের অর্থ মা, আমি তোমাকে প্রণাম করি মা।  এটি বিংশ শতাব্দীতে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে এবং এর প্রথম দুটি স্তবক স্বাধীনতার পরে ভারতের জাতীয় গানে পরিণত হয়।




#Article 5: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (695 words)


সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা সৌরভ গাঙ্গুলী (; জন্ম ৮ জুলাই ১৯৭২) একজন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার এবং ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ৮ই জুলাই, ১৯৭২ সালে, কলকাতার বেহালায় একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারে। তিনি বিসিসিআই এর বর্তমান সভাপতি এবং উইসডেন ইন্ডিয়ার সভাপতি। তার বাবার নাম চণ্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় ও মাতার নাম নিরুপা গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভ মূলত তার দাদার সাহায্যে ক্রিকেট জীবনে প্রতিষ্ঠিত হন।

বাঁহাতি ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় অদ্যাবধি ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক বলে বিবেচিত হন; তার অধিনায়কত্বে ভারত ৪৯টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ২১টি ম্যাচে জয়লাভ করে। ২০০৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে তার অধিনায়কত্বেই ভারত ফাইনালে পৌঁছে যায়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কেবলমাত্র একজন আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন অধিনায়কই ছিলেন না, তার অধীনে যে সকল তরুণ ক্রিকেটারেরা খেলতেন, তাদের কেরিয়ারের উন্নতিকল্পেও তিনি প্রভূত সহায়তা করতেন। ২০০৮ সালের ২১ অক্টোবর সৌরভ তার সর্বশেষ প্রথম-সারির ক্রিকেট ম্যাচটি খেলেন।

৮ জুলাই, ১৯৭২ সালে, চন্ডীদাস ও নিরুপা গঙ্গোপাধ্যায় দম্পতির কনিষ্ঠ পুত্র সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা, চন্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় মুদ্রণ এর ব্যবসা ছিল এবং তিনি শহরের অন্যতম ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন।সৌরভের শৈশবকাল অত্যন্ত সুখকর ছিল এবং তাঁর ডাক নাম ছিল 'মহারাজা'। তাঁর পিতা, চন্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান।

কলকাতা শহরে বেশির ভাগ লোকের প্রিয় খেলা 'ফুটবল' ছিল এবং তার ফলে সৌরভও প্রাথমিকভাবে এই খেলায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে খেলাধুলার প্রতি তাঁর ভালবাসায় বাধ সাধল পড়াশুনো এবং তাঁর মা ক্রিকেট বা কোনও খেলাধুলা পেশা হিসাবে গ্রহণের পক্ষে সৌরভকে খুব একটা সমর্থন করেননি।  তবে ততক্ষণে তাঁর বড় ভাই স্নেহাশিস ইতিমধ্যে বেঙ্গল ক্রিকেট দলের একজন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটার ছিলেন। তিনি সৌরভের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে সমর্থন করেছিলেন এবং তাঁদের পিতাকে গ্রীষ্মের ছুটিতে সৌরভকে একটি ক্রিকেট কোচিং শিবিরে ভর্তি করতে বলেন, সেই সময় সৌরভ দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিলেন।

ডানহাতি হওয়া সত্ত্বেও সৌরভ বাম হাতে ব্যাটিং করতে শিখেছিলেন যাতে তিনি তাঁর ভাইয়ের ক্রিকেট সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেন। ব্যাটসম্যান হিসাবে কিছু প্রতিশ্রুতি দেখানোর পরে, তাঁকে একটি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করা হয়েছিল সাথে সাথে সৌরভের বাড়িতে একটি ইনডোর মাল্টিম-জিম এবং কংক্রিট উইকেট নির্মিত হয়েছিল যাতে তিনি এবং স্নেহাশিস ক্রিকেটের অনুশীলন করতে পারেন। দুই ভাই অনেকগুলি পুরানো ক্রিকেটের ম্যাচের ভিডিওগুলি দেখতেন, বিশেষত সৌরভের পছন্দ ছিল ডেভিড গাওয়ারের ভিডিওগুলি। ওড়িশার অনূর্ধ্ব ১৫ দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার পরে সৌরভকে তাঁর স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্সের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক করা হয়েছিল, যেখানে তাঁর বেশ কয়েকজন সতীর্থ অভিযোগ করেছিলেন যে সৌরভ অধিনায়ক ছিল বলে তাঁর অহংকার ছিল।  কোনও এক সময় জুনিয়র দলের সাথে সফরকালে, সৌরভে দ্বাদশতম ব্যক্তি হিসাবে দলে থাকতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে খেলোয়াড়দের জন্য সরঞ্জাম এবং পানীয় সরবরাহ করার দায়িত্ব, তাঁর কাজ নয়।  তাঁর  কাছে তাঁর দলীয় সতীর্থদের এমনভাবে সহায়তা কাজগুলির করা মানে হল তাঁর সামাজিক মর্যাদা থাকবে না এবং তিনি এমন কাজগুলি করতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।  তবে তাঁর খেলোয়াড়ীত্ব তাকে ১৯৮৯ সালে বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দিয়েছিল এবং একই বছরই তাঁর ভাই বাংলার দল থেকে বাদ পড়েছিলেন।

তিনি শুধু একজন খেলোয়াড়ই নন, একজন বিখ্যাত অধিনায়কও ছিলেন। তিনি তার ক্রিকেট জীবনে সর্বমোট ৩১১টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং ১১,৩৬৩ রান সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি তিনি ১১৩টি টেস্ট খেলেছেন ও ৭,২১২ রান সংগ্রহ করেছেন। ভারতকে তিনি ৪৯টি টেস্ট ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যার মধ্যে ভারত জিতেছিল ২১টি ম্যাচে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ভারতকে ১৪৬টি একদিনের আন্তজার্তিক ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যার মধ্যে ভারত জিতেছিল ৭৬ টি ম্যাচে। তিনি ভারতের একজন মিডিয়াম পেসার বোলারও ছিলেন। তিনি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি এবং টেস্টে ৩২টি উইকেট দখল করেন। এছাড়া তিনি একদিনের আন্তর্জাতিকে ১০০টি ও টেস্টে ৭১টি ক্যাচ নিয়েছেন।
    
২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলার পর তিনি ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।
এরপরে ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০-এ আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলেন এবং ২০০৮ ও ২০১০-এ এই দলকে নেতৃত্ব দেন। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত আইপিএলের চতুর্থ সিজনে নিলামে তিনি অবিক্রীত থেকে গেলেও শেষ পর্যন্ত পুনে ওয়ারিয়র্সের দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের মেন্টর।

বর্তমানে সৌরভ গাঙ্গুলী সিএবি (CAB) এর সভাপতি এবং  - উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। সৌরভ আইএসএল ফুটবল দল অ্যাটলেটিকো দি কলকাতার (ATK) অন্যতম কর্ণধর।
 
সৌরভ গাঙ্গুলী বর্তমানে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল-এর প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করছেন সেই সাথে তিনি ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। এর আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সফল এই অধিনায়ক বিসিসিআইয়ের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন।

জি বাংলার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো দাদাগিরিতে তিনি উপস্থাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। বকুল কথা জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাকে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল বকুলের আইডল হিসাবে৷ অভিনয়ে তার অবদান খুব একটা বেশি নেই৷

সৌরভ মোট ৩১টি আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান।




#Article 6: শেখ হাসিনা (1652 words)


শেখ হাসিনা ওয়াজেদ (জন্ম: ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭) বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তার রাজনৈতিক কর্মজীবন প্রায় চার দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী বিস্তৃত। তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ ও ১৯৯১-১৯৯৫ পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতা এবং ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮১ সালে থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৮ সালে জনগণের বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একটি বিরোধীদলবিহীন নির্বাচনে তিনি তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হন, যে নির্বাচনটি বিরোধীদল কর্তৃক বর্জিত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি সহিংসতায় দুষ্ট ও বিরোধীদল কর্তৃক সাজানো নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত একটি নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন।

হাসিনা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত, ফোর্বস সাময়িকীর দৃষ্টিতে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় ২০২০ সালে তার অবস্থান ৩৯তম, ২০১৯ সালে তার অবস্থান ছিল ২৯তম, ২০১৮ সালে ২৬তম এবং ২০১৭ সালে ৩০তম। 
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ফরেইন পলিসি নামক সাময়িকীর করা বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০০ বৈশ্বিক চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বিশ্ব নারী নেত্রী পরিষদ-এর একজন সদস্য, যা বর্তমান ও প্রাক্তন নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শাসনামল বহু কেলেঙ্কারি ও স্বৈরাচারী চর্চা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার সময়ের কেলেঙ্কারির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, হলমার্ক-সোনালি ব্যাংক কেলেঙ্কারি, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, রানা প্লাজা ধ্বস, ও বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন ২০১৮। তিনি তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও প্রশংসিত।

শেখ হাসিনা পূর্ব পাকিস্তানের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান  এবং মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা। তিনি টুঙ্গিপাড়াতে বাল্যশিক্ষা নেন। ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় পরিবারের সাথে মোগলটুলির রজনী বোস লেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে স্থানান্তরিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে থাকা শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ও তার বোন শেখ রেহানা বাদে পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়। বোনদ্বয় সেইসময় পড়াশোনার জন্য পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

শেখ হাসিনা ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় ১৯৬৭ সালে এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তার বিয়ে হয় এবং ওয়াজেদ মিয়া ৯ মে, ২০০৯ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের সংসারে সজীব ওয়াজেদ জয় (পুত্র) ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল (কন্যা) নামে দুই সন্তান রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ১৯৮১ সালে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। 
ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতায় আরোহণকে অবৈধ ঘোষণা করলেও তার দল ১৯৮৬ সালে এই সামরিক শাসকের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। 

পরবর্তীকালে তিনি এবং তার দল এরশাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেন ও ১৯৯০ সালে অভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।

১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের তৎকালীন বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে প্রকাশ পায়। ১৯৯১ সালের স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেন। 

১৯৯৬ সালে তার দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বামপন্থী দলগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাধ্য করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে তার দল আন্দোলনে জয়ী হওয়ায় পরবর্তীতে তার দল জাতীয় নির্বাচনেও জয়লাভ করে এবং ঐ বছর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বড় ব্যবধানে হেরে যায়।

বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (নাজিউর রহমান মঞ্জু) ও ইসলামী ঐক্যজোট এর নির্বাচনী জোটের কাছে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। শেখ হাসিনা দলের এই পরাজয়ের জন্য দায়ী করেন তারই মনোনীত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদকে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় এক জনসভায় বক্তৃতাদানকালে গ্রেনেড হামলায় এই নেত্রী অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। উক্ত হামলায় তার ঘনিষ্ঠজন এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ১৯ জন মৃত্যুবরণ করেন ও শতাধিক আহত হন। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এই হামলাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয়। এই গ্রেনেড হামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে করার জন্য 'জজ মিয়া' নাটক সহ বেশকিছু প্রহসন সৃষ্টি করেছিল তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোট প্রশাসন। পরবর্তীতে দেশি ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সুষ্ঠু তদন্তে বেরিয়ে আসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা নাসিরুদ্দিন আহমেদ পিন্টু, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (বর্তমানে বাংলাদেশে বিলুপ্ত) নেতা মুফতি হান্নান সহ বেশকিছু তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালে তিনি পুনরায় আন্দোলন শুরু করেন কিছু নতুন সমস্যা নিয়ে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন ২০০৭ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৭:৩১-এ যৌথ বাহিনী শেখ হাসিনাকে তার বাসভবন সুধা সদন থেকে গ্রেফতার করে। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেখানে আদালত তার জামিন আবেদন না-মঞ্জুর করে। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে সাব-জেল হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে অন্তরীণ রাখা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে যান। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুইটি অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। একটি হল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য হত্যা মামলা এবং অন্যটি হল প্রায় তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা। এর মাঝে একটির বাদী ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলাটি তুলে নেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের পরে তিনি চিকিৎসার্থে কয়েক মাস বিদেশে অবস্থান করেন। এরপর দেশে ফিরে দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। বিজয়ী দলের সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে তিনি জানুয়ারি ৬, ২০০৯-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ২৬০টি আসন লাভ করে। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পায় মাত্র ৩২টি আসন।

ইতোপূর্বে সপ্তম, অষ্টম এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ড.ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ক্ষমতা ধরে রাখা এবং রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমনের নামে মামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক এ ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষিত হওয়া প্রভৃতি কারণে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিলের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে নবম সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাশের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। ৫ই জানুয়ারি ২০১৪ সালে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই বর্জন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচনটি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ৫ই জানুয়ারি রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাকী ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।  এর আগে গত ১৮ নভেম্বর, ২০১৩ নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠিত হয়। 

আওয়ামী লীগ ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৮টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করলে শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মত নির্বাচনে জয়ী হন। এটি ছিল একাধারে তৃতীয়বারের জন্য তার মেয়াদকাল। বিরোধীদলীয় প্রধান নেতা কামাল হোসেন নির্বাচনকে প্রহসনমূলক বলে ঘোষণা করেন এবং ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। নির্বাচনের পূর্বে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য অধিকার সংগঠন সরকারকে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয় নির্বাচনকে প্রহসনমূলক বলে বর্ণনা করে, সম্পাদকীয়তে বলা হয়, পরিস্থিতি এমন ছিল যে, ভোট কারচুপি ছাড়াই হয়তো হাসিনা জিতে যেতেন, তবে কেন তিনি এমন করলেন?

পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি হল বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরকারের শাসনামলে সংঘটিত একটি ঘটনা, যাতে সরকার কানাডীয় কনস্ট্রাকশন কম্পানি এসএনসি-লাভালিনকে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। অভিযোগটি পরবর্তীকালে ভুল ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয় এবং কানাডার আদালত এরপর মামলাটি খারিজ করে দেয়। 

অভিযোগের একটি ফলস্বরূপ, বিশ্ব ব্যাংক দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করে ৬কিমি লম্বা বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর রেলপথ ও মহাসড়ক বিশিষ্ট  পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প হতে নিজেদের ১.২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থায়ন পরিকল্পনা বাতিল করে। মামলা খারিজ হওয়ার তিন মাস পর শেখ হাসিনা যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে পদ থেকে অপসারণ করেন। ২০১২ সালের ১১ জুলাই, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত বিশ্বব্যাংকের পাঠানো চিঠিটি প্রকাশ করা, যেখানে বিশ্বব্যাংক শেখ হাসিনা এবং অন্য তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ এনেছে। ২০১৬ সালের ১৭ই জানুয়ারি, শেখ হাসিনা দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাংকের একজন এমডি বিশ্বব্যাংকে ঋণ বাতিল করার জন্য উসকানি দিয়েছে।

২০১৭ সালের ২৪শে জানুয়ারি, সংসদে নিজ বক্তব্যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প থেকে  বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ সহায়তা তুলে নেওয়ার জন্য মুহাম্মদ ইউনুসকে দায়ী করেন। তার মতে, ইউনুস প্রাক্তন যুক্তরাজ্যের সেক্রেটারি অফ স্টেট হিলারি ক্লিনটন-এর সঙ্গে তদবির করেছিলেন বিশ্বব্যাংককে লোন বাতিল করতে প্ররোচিত করার জন্য।  ২০১৭ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি কানাডার অন্টারিওতে সুপিরিয়র কোর্টের বিচারপতি ঘুষ-ষড়যন্ত্রের এই কেসটি কোন প্রমাণের অভাবে খারিজ করে দেয়।

রাজনীতির বাইরে লেখক হিসেবে শেখ হাসিনার অবদান রয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি রচনা ও সম্পাদনা করেছেন প্রায় ৩০টি গ্রন্থ।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো;

যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন ইউনিভার্সিটি, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া ফ্রান্সের ডাওফি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিপ্লোমা প্রদান করে।

শেখ হাসিনা ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় ৭ম স্থানে ছিলেন। তার পূর্বে এবং পশ্চাতে ছিলেন যথাক্রমে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট অ্যালেন জনসন সার্লেফ এবং আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জোহানা সিগার্ডারডটির । যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরিপে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারী নেতৃত্বের ১২জনের নাম নির্বাচিত করে।

উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে তিনি বিশ্বের সেরা দশ ক্ষমতাধর নারীদের মধ্যে ৬ষ্ঠ স্থানে ছিলেন। ঐ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের ঠিক পিছনে ছিলেন এবং ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করেছিলেন।
২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৯তম স্থানে আছেন। ২০১৪ সালে এই তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল ৪৭তম। 

২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। উক্ত তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা।




#Article 7: শেখ মুজিবুর রহমান (10850 words)


শেখ মুজিবুর রহমান (১৭ই মার্চ ১৯২০–১৫ই আগস্ট ১৯৭৫), সংক্ষিপ্তাকারে শেখ মুজিব বা মুজিব, ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে শুরু করে ভারত বিভাজন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। শুরুতে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি, এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রয়াস এবং পরবর্তীকালে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুজিবকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে কৃতিত্ব দেয়ার পাশাপাশি প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এসকল কারণে, তাকে বাংলাদেশের “জাতির জনক” বা “জাতির পিতা” হিসেবে গণ্য করা হয়। জনসাধারণের কাছে তিনি “শেখ মুজিব” বা “শেখ সাহেব” নামে এবং তার উপাধি “বঙ্গবন্ধু” হিসেবেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। পরবর্তীকালে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। সমাজতন্ত্রের পক্ষসমর্থনকারী একজন অধিবক্তা হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন যাকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রধান ছিল–প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, যার কারণে তিনি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অন্যতম বিরোধী পক্ষে পরিণত হন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকারের সাথে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে প্রধান আসামি করে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়; তবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে; তা সত্ত্বেও তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হয়নি। 

পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে শেখ মুজিবের আলোচনা বিফলে যাওয়ার পর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা চালায়। ফলশ্রুতিতে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একই রাতে তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খানের সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেও, তা কার্যকর হয়নি। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদ্বয় ঘটে। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি তিনি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মতাদর্শগতভাবে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিলেন; যা সম্মিলিতভাবে মুজিববাদ নামে পরিচিত। এগুলোর উপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়ন এবং তদানুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা সত্ত্বেও তীব্র দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সর্বত্র অরাজকতাসহ ব্যাপক দুর্নীতি মোকাবেলায় তিনি কঠিন সময় অতিবাহিত করেন। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে বাধ্য হন। এর সাত মাস পরে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসি কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ (৩রা চৈত্র, ১৩২৭ বঙ্গাব্দ) রাত ৮টায় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের বাইগার নদী তীরবর্তী টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ বংশের গোড়াপত্তনকারী শেখ বোরহানউদ্দিনের বংশধর তিনি। শেখ মুজিবের বাবা শেখ লুৎফুর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের হিসাব সংরক্ষণকারী বা সেরেস্তাদার ছিলেন এবং মায়ের নাম ছিল সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শেখ মুজিবুর রহমানের বড় বোনের নাম ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী এবং তার ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের।

তার নানা শেখ আব্দুল মজিদ তার নাম রাখেন “শেখ মুজিবুর রহমান”। ছোটবেলায় তার ডাকনাম ছিল “খোকা”। ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের প্রতি সহমর্মী স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় নিজের গোলা থেকে ধান বিতরণ করতেন। সমিতি করে অন্যদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে, গরিব ছাত্রদের মধ্যে বিলি করতেন।

১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে সাত বছর বয়সে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। নয় বছর বয়সে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ পাবলিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতার বদলিজনিত কারণে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে মাদারীপুর ইসলামিয়া বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেরিবেরি নামক জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং তার হৃৎপিণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তার চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে ও অস্ত্রোপচার করাতে হয় এবং এ থেকে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করতে বেশ সময় লেগেছিল। এ কারণে তিনি ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চার বছর বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সুস্থ হবার পর গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ সময়ে ব্রিটিশবিরােধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী এবং বহু বছর জেল খাটা কাজী আবদুল হামিদ (হামিদ মাস্টার) নামীয় জনৈক ব্যক্তি তার গৃহশিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তিনি ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান নাম মৌলানা আজাদ কলেজ) থেকে আই.এ এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালীন তিনি বেকার হোস্টেলের ২৪ নং কক্ষে থাকতেন। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার সম্মানার্থে ২৩ ও ২৪ নম্বর কক্ষকে একত্রিত করে “বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ” তৈরি করে। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি কক্ষটির সম্মুখে তার আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভারত বিভাজনের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হন। তবে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে তাকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে, ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটেছিল ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে। ঐ বছরই বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বাংলা প্রদেশ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। ঐ সময় বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে একটি দল তাদের কাছে যায়। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ মুজিব স্বয়ং। ব্যক্তিগত রেষারেষির জের ধরে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার করা হয়। ৭ দিন হাজতবাস করার পর তিনি ছাড়া পান। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রমুখ যোগদান করেন। শেখ মুজিব এই সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ছিলেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এখানে অধ্যয়নকালীন তিনি বাংলার অগ্রণী মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এম. ভাস্করণ তাকে ‘সোহ্‌রাওয়ার্দীর ছত্রতলে রাজনীতির উদীয়মান বরপুত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই বছর কলকাতায় ছাত্রনেতা আবদুল ওয়াসেক প্রমুখের নেতৃত্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ঐ সময় থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন। এখানে তার ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য বিষয় ছিল–পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিব বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কলকাতায় বসবাসরত ফরিদপুরবাসীদের নিয়ে গঠিত “ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের” সেক্রেটারি মনোনীত হন। এর দুই বছর পর ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের মহাসচিব নির্বাচিত হন।

১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের পর মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মাঠে নেমে পড়ে। মুসলিম লীগের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এ সময় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। “পাকিস্তান দাবির পক্ষে গণভোট” খ্যাত ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে শেখ মুজিব বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে লীগের ওয়ার্কার ইনচার্জের দায়িত্বে থেকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ কৃষক সমাজের কাছে গিয়ে তিনি পাকিস্তান দাবির ন্যায্যতার বিষয়ে প্রচার করে ভোট চান। এই নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে মুসলিম লীগ বিজয় লাভ করে। তবে একমাত্র বাংলায় তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সোহ্‌রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়।                              

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের সময় কলকাতায় ভয়ানক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। মুজিব মুসলিমদের রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হন। ঐ সময় সোহ্‌রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখের নেতৃত্বে ভারত ও পাকিস্তান কর্তৃত্বের বাইরে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠনের যে “যুক্তবঙ্গ আন্দোলন” সংগঠিত হয়, শেখ মুজিব তাতেও যুক্ত হন। পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি নিশ্চিত হলে আসাম প্রদেশের বাঙালি মুসলমান অধ্যুষিত সিলেট জেলার ভাগ্য নির্ধারণে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব সিলেট গণভোটে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে সংগঠক ও প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। তিনি এসময় প্রায় ৫০০ কর্মী নিয়ে কলকাতা থেকে সিলেট গিয়েছিলেন। গণভোটে জয়লাভ সত্ত্বেও করিমগঞ্জ পাকিস্তান অংশে না থাকা এবং দেশভাগের সীমানা নির্ধারণের সময় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ভৌগোলিক অপ্রাপ্তির বিষয় নিয়ে স্বীয় আত্মজীবনীতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান ও ভারত পৃথক হবার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে তিনি উক্ত প্রদেশের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন। এ সময় তিনি সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সমাজতন্ত্রকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে মনে করতে থাকেন।

বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আন্দোলনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক তৎপরতার সূচনা ঘটে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়ার প্রস্তাব নাকচ করেন পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেসের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করার দাবি তুলে ধরেন। ঐ সময় পাকিস্তানের প্রধাননন্ত্রীর লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলা ভাষার বিরোধিতা করলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। 

এছাড়াও ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার  ঘোষণা দেন। এতে পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদী শেখ মুজিব অবিলম্বে মুসলিম লীগের এই পূর্ব পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। একই বছরের ২রা মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশগ্রহণে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করা হয়। শেখ মুজিব একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যা থেকে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঐ পরিষদের আহ্বানে ১১ই মার্চ ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট পালনকালে শেখ মুজিবসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীকে সচিবালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ছাত্রসমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৫ই মার্চ শেখ মুজিব এবং অন্যান্য ছাত্র নেতাকে মুক্তি দেয়া হয়। তাদের মুক্তি উপলক্ষে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শোভাযাত্রা হয় যাতে শেখ মুজিব সভাপতিত্ব করেন। তবে পুলিশ এই শোভাযাত্রা অবরোধ করে রেখেছিল। ১৫ই মার্চ মুজিবের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। পুলিশি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব অবিলম্বে ১৭ই মার্চ ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। ১৯শে মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। একই সময়ে ফরিদপুরে কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় সেই বছরেরই ১১ই সেপ্টেম্বর তারিখে তাকে আবার আটক করা হয়। এরপর ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আবার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন যার জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জরিমানা করা হয়। কিন্তু তিনি এই জরিমানাকে অবৈধ ঘোষণা করে তা প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬শে এপ্রিল ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগ বিরোধী প্রার্থী শামসুল হক টাঙ্গাইলের উপ-নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। শেখ মুজিব তার সেই আন্দোলনের সফলতার জন্য উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অনশন ধর্মঘট করেন যার জন্য তাকে পুণরায় আটক করা হয়। এ সময়েই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, মৃত্যু-পরবর্তীকালে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই আগস্ট তার হৃত ছাত্রত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে দেয়।

১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে এবারও শেখ মুজিবকে আটক করা হয় এবং দুই বছর জেলে আটক করে রাখা হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি মুজিবের জেলমুক্তির আদেশ পাঠ করার কথা থাকলেও খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” এ ঘোষণার পর জেলে থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে পরোক্ষভাবে পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আয়োজনে তিনি সাহসী ভূমিকা রাখেন। এরপরই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষার দাবি আদায়ের দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সময়ে শেখ মুজিব জেলে অবস্থান করেই ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তার এই অনশন ১৩ দিনব্যাপী স্থায়ী ছিল। ২৬শে ফেব্রুয়ারি তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে সমাজতান্ত্রিক চীনের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২রা অক্টোবর থেকে ১২ই অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানী পিকিংয়ে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান চীন সরকারের আমন্ত্রণে ৩০ সদস্যবিশিষ্ট পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে এই সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে নয়াচীন সফর করেন।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জুন হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলে শেখ মুজিব মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে এই নতুন দলে যোগ দেন। তাকে দলের পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তিনি ২৬শে জুন জেল থেকে ছাড়া পান। মুক্তি পাবার পরপরই চলমান খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে সাময়িকভাবে আটক করে রাখা হলেও অচিরেই ছাড়া পেয়ে যান। একই বছরের অক্টোবর মাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে যুক্ত থেকে লিয়াকত আলি খানের কাছে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের চেষ্টা করায় উভয়কেই আটক করা হয়।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জুলাই শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছরের ১৪ই নভেম্বর পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে বিপুল ব্যবধানে বিজয় অর্জন করে যার মধ্যে ১৪৩টি আসনই আওয়ামী লীগ লাভ করেছিল। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জে আসনে ১০,০০০ ভোটের ব্যবধানে বিজয় লাভ করেন। সেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামান। ৩রা এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলা প্রদেশে সরকার গঠন করে এবং ১৫ই মে শেখ মুজিব উক্ত সরকারে যোগ দিয়ে কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২৯শে মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ৩১শে মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমান বন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়। ২৩শে ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন তিনি। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জুন শেখ মুজিব প্রথমবারের মতো গণপরিষদের সদস্য হন। ১৭ই জুন আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক সম্মেলনে ২১ দফা দাবি পেশ করে, যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২৩শে জুন দলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জিত না হলে আইনসভার সকল সদস্য পদত্যাগ করবেন। ২৫শে আগস্ট পাকিস্তানের করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশনে শেখ মুজিব বলেন:

১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১-২৩শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেয়া হয় ও শেখ মুজিবকে পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ৩রা ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আওয়ামী লীগের বৈঠকে দল থেকে খসড়া সংবিধানে স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। ১৪ই জুলাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব রাখা হয় যা তিনিই সরকারের কাছে পেশ করেন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর তার নেতৃত্বে একটি দুর্ভিক্ষ বিরোধী মিছিল বের হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের কারণে এই মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে কমপক্ষে চারজন নিহত হয়। ১৬ই সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব প্রাদেশিক সরকারে যোগ দিয়ে একসাথে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তি সম্মেলনে যোগদান করার জন্য নয়াদিল্লি যান। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সময় ব্যয় করার জন্যে তিনি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে মে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট তিনি সরকারি সফরে চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন করেন। এই দুই সমাজতান্ত্রিক দেশের নাগরিক জীবন-যাপনের সুবিধা শেখ মুজিবুর রহমানকে সমাজতন্ত্রের প্রতি উজ্জ্বীবিত করে তোলে। ১৯৫৭-৫৮ অর্থবছরের জন্য তিনি পাকিস্তান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশে সামরিক আইন জারি করেন। আইয়ুব খানের সমালোচনা করার জন্য ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই অক্টোবর তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই অক্টোবর তারিখে তাকে মুক্তি দেওয়া হলেও, তার উপর নজরদারিতে রাখা হয়। ১৯৬০ ও ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কার্যত গৃহবন্দি হিসেবে থাকেন। এ সময় আইয়ুব খান ৬ বছরের জন্য সকল ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। জেলে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়। ১২ই সেপ্টেম্বরে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৪ মাস একটানা আটক থাকার পর তাকে মুক্তি দেয়া হলেও জেলের ফটক থেকে পুনরায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করার মাধ্যমে তিনি ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ২২ সেপ্টেম্বর জেল থেকে ছাড়া পান। জেল থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি গুপ্ত রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। অন্যান্য সাধারণ ছাত্রনেতাকে নিয়ে গোপনে নিউক্লিয়াস ও স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করা। শেখ মুজিব ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার স্বাধীনতার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা জানুয়ারি সামরিক সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান দলকে পুনরায় সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাকে আবার আটক করা হয়। ২রা জুন তারিখে চার বছরব্যাপী বহাল থাকা সামরিক আইন তুলে নেয়ার পর ১৮ই জুন তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৫শে জুন তিনি অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মিলে আইয়ুব খান আরোপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন। ৫ই জুন তিনি পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক সম্মেলনে আইয়ুব খানের সমালোচনা করেন। ২৪শে সেপ্টেম্বর তিনি লাহোরে যান এবং সেখানে শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে মিলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। এটি মূলত বিরোধী দলসমূহের একটি সাধারণ কাঠামো হিসেবে কাজ করেছিল।

পুরো অক্টোবর মাস জুড়ে শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে মিলে যুক্তফ্রন্টের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থান সফর করেন। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে লন্ডন যান। শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন ও একই বছরের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি মুজিবের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংহত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঐ বৈঠকের প্রস্তাবের ভিত্তিতে শেখ মুজিবকে আওয়ামী লীগের মহাসচিব ও মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যার মাধ্যমে মুজিব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সেনাশাসক রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, রাজনীতির নামে মৌলিক গণতন্ত্র (বেসিক ডেমোক্রেসি) প্রচলন এবং পাকিস্তানের কাঠামোতে এক-ইউনিট পদ্ধতির বিরোধী নেতাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন শেখ মুজিব। মৌলিক গণতন্ত্র অনুযায়ী সারা দেশ থেকে ৮০ হাজার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হতো ও তাদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন। এ পদ্ধতি অনুযায়ী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং প্রদেশগুলোকে একত্রে জুড়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ঐ সময় সামরিক বাহিনীর গণহত্যা আর বাঙালিদের ন্যায্য দাবী পূরণে সামরিক শাসকদের উদাসীনতা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে মুজিব আইয়ুববিরোধী সর্বদলীয় প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন করেন। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পূর্বে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বর তারিখে ভারতের দালাল অভিযুক্ত করে তাকে আটক করা হয়। শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং আপত্তিকর প্রস্তাব পেশের অভিযোগে অভিযুক্ত করে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অবশ্য উচ্চ আদালতের এক রায়ে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই তিনি মুক্তি পেয়ে যান।

জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (যেমন পাট) পূর্ব পাকিস্তান থেকে হবার পরও এতদাঞ্চলের জনগণের প্রতি সর্বস্তরে বৈষম্য করা হতো। এছাড়াও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা আনুপাতিক হারে ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিকভিত্তিতে ক্রমাগত বৈষম্যের শিকার হওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এরফলে, অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা বৈষম্য সম্পর্কে প্রশ্ন বাড়াতে শুরু করেন। বৈষম্য নিরসনে শেখ মুজিব ছয়টি দাবি উত্থাপন করেন, যা ছয় দফা দাবি হিসেবে পরিচিত। বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষিত এই দাবি পরবর্তীকালে বাঙালির “প্রাণের দাবি” ও “বাঁচা মরার দাবি” হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যা ছিল কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা। ছয় দফার দাবিগুলো ছিল নিম্নরূপ–

শেখ মুজিব এই দাবিকে “আমাদের বাঁচার দাবী” শিরোনামে প্রচার করেছিলেন। এই দাবির মূল বিষয় ছিল–একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত পাকিস্তানি ফেডারেশনে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। এই দাবি সম্মেলনের উদ্যোক্তারা প্রত্যাখান করেন এবং শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ কারণে তিনি উক্ত সম্মেলন বর্জন করে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন।

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের পহেলা মার্চে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের পর তিনি ছয় দফার পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী প্রচার কার্য পরিচালনা করেন ও প্রায় পুরো দেশই ভ্রমণ করে জনসমর্থন অর্জন করেন। এই ভ্রমণের সময় তিনি সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকায় বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে বন্দি হন। বছরের প্রথম-চতুর্থাংশেই তাকে আটবার আটক করা হয়েছিল। ঐ বছরের মে মাসের ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জে পাট কারখানার শ্রমিকদের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। তার মুক্তির দাবিতে ৭ই জুন দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। পুলিশ এই ধর্মঘট চলাকালে গুলিবর্ষণ করে যার কারণে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে আনুমানিক তিনজনের মৃত্যু হয়।

সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক হয়ে জেলে দুই বছর থাকার পর ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবসহ ৩৫ জন বাঙালি সামরিক ও সিএসপি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে যা ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে সুপরিচিত। ৬ই জানুয়ারি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ২ জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতার সম্পর্কে সরকারি প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয় যে,

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই ষড়যন্ত্রকে “আগরতলা ষড়যন্ত্র” নামে অভিহিত করে। এই অভিযোগে ১৮ই জানুয়ারি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। মামলায় পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১ ও ১৩১ ধারা অনুসারে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, শেখ মুজিবসহ এই কর্মকর্তারা ভারতের ত্রিপুরা অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত আগরতলা শহরে ভারত সরকারের সাথে এক বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছে। এতে শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামি করা হয় এবং পাকিস্তান বিভক্তিকরণ ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অভিযুক্ত সকল আসামিকে ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরীণ করে রাখা হয়। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জুন ঢাকা সেনানিবাসের এক বিশেষ ট্রাইবুনালে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। বিচারকার্য চলাকালীন ২৬ জন কৌশলী ছিলেন। শেখ মুজিবের প্রধান কৌশলী ছিলেন আব্দুস সালাম খান। একটি অধিবেশনের জন্য ব্রিটেন থেকে আসেন আইনজীবী টমাস উইলিয়ামস। তাকে সাহায্য করেন তরুণ ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ও মওদুদ আহমেদ। মামলাটিতে মোট ১০০টি অনুচ্ছেদ ছিল। ১১ জন রাজসাক্ষী ও ২২৭ জন সাক্ষীর তালিকা আদালতে পেশ করা হয়। মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের, এম আর খান ও মুকসুদুল হাকিম। এর অব্যবহিত পরেই সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। মামলাটিকে মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করে সর্বস্তরের জনসাধারণ শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারকার্য চলাকালীন ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগারো দফা দাবি পেশ করে, তন্মধ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফার সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত ছিল। উক্ত পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গৃহীত হয়। আন্দোলনটি এক পর্যায়ে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। পরবর্তীতে এই গণআন্দোলনই “ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান” নামে পরিচিতি পায়। মাসব্যাপী প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, কারফিউ, পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং বেশ কিছু হতাহতের ঘটনার পর আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করলে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে এক গোলটেবিল বৈঠকের পর এই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। একই সাথে শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐ বছরেরই ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। উপাধি প্রদানের ঘোষণা দেন তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। স্বীয় বক্তৃতায় শেখ মুজিব ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবির পক্ষে তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত একটি সর্বদলীয় সম্মেলনে মুজিব তার ছয়-দফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দাবীগুলো উপস্থাপন করেন। কিন্তু, তা প্রত্যাখ্যাত হলে সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় মুজিব ঘোষণা করেন:

মুজিবের এই ঘোষণার ফলে সারা দেশে ব্যাপক গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং সামরিক কর্মকর্তারা তাকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন। মুজিবের বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের বিতর্কে নতুন মাত্রা এনে দেয়। অনেক বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিত্বের মতে, যে দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে, বাঙালিদের আন্দোলন দ্বিজাতিতত্ত্বকে অস্বীকার করার নামান্তর। বাঙালিদের জাতিগত ও সংস্কৃতিগত এই আত্মপরিচয় তাদেরকে একটি আলাদা জাতিসত্তা প্রদান করে। তবে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সমর্থ হন এবং ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ কার্যত ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

গণঅভ্যুত্থানের বিরূপ প্রভাবে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মার্চ আইয়ুব খান রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া খান উক্ত পদে আসীন হন। তিনি ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে মার্চ এক ঘোষণায় পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই নভেম্বর ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রায় ১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ১০ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে। এতে জনগণ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের দুর্বল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে ‘স্থানীয় নেতাদের ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে। এসময় শেখ মুজিব বাস্তুহারাদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে থাকেন। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য নির্বাচনের সময়সূচি পিছিয়ে দেয়া হয়। পরে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর (জাতীয়) ও ১৭ই ডিসেম্বর (প্রাদেশিক) “এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে” নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সময় জাতীয় পরিষদে সদস্য সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। তন্মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১৪৪ জন প্রতিনিধি থাকতেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ২টি আসন ছাড়া বাকি সবগুলোতে জয়ী হওয়ায় জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করে আওয়ামী লীগ। ১৭ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো, মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির প্রবল বিরোধিতা করেন। ভুট্টো অধিবেশন বয়কট করার হুমকি দিয়ে ঘোষণা দেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালে তিনি ঐ সরকারকে মেনে নেবেন না। অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো শেখ মুজিবের আসন্ন প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের প্রবল বিরোধিতা করেন। এসময় শেখ মুজিব কিংবা আওয়ামী লীগের কেউই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা চিন্তা করেননি, যদিও কিছুসংখ্যক জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি করতে থাকে।

জুলফিকার আলি ভুট্টো গৃহযুদ্ধের ভয়ে শেখ মুজিব ও তার ঘনিষ্ঠজনদেরকে নিজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য একটি গোপন বার্তা পাঠান। পাকিস্তান পিপলস পার্টির মুবাশির হাসান শেখ মুজিবকে ভুট্টোর সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠনে প্ররোচনা দেন; যেখানে শেখ মুজিব হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং ভুট্টো থাকবেন রাষ্ট্রপতি। সেনাবাহিনীর সকল সদস্যের অগোচরে সম্পূর্ণ গোপনে এই আলোচনা সভাটি পরিচালিত হয়। একইসময়ে, ভুট্টো আসন্ন সরকার গঠনকে বানচাল করার জন্য ইয়াহিয়া খানের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।

আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সামরিক শাসকগোষ্ঠী দলটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, যে-কোনভাবে ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখা। এরূপ পরিস্থিতিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে ১লা মার্চ উক্ত অধিবেশনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। এরফলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, মুজিবের দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না। এই সংবাদে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সারাদেশে একযোগে হরতাল পালিত হয়। তিনি ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ৬ই মার্চ এক বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে সকল প্রকার দোষ তার উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালান। এ ধরনের ঘোলাটে পরিস্থিতিতেই ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বিপুলসংখ্যক লোক একত্রিত হয়। সাধারণ জনতা এবং সার্বিকভাবে সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান তার সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি ঘোষণা দেন -

এর কয়েক ঘণ্টা পূর্বে কেন্দ্রীয় সরকার গণমাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সেনাবাহিনীর চাপ থাকা সত্ত্বেও ইএমআই মেশিন ও টেলিভিশন ক্যামেরায় ভাষণের অডিও এবং ভিডিও চিত্র ধারণ করে রাখা হয়। ৮ই মার্চ জনতার চাপে ও পাকিস্তান রেডিও’র কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে পাকিস্তান সরকার বেতারে এই ভাষণ পুনঃপ্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।

১০ই মার্চ নির্বাচিত ১২ জন সংসদীয় শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ইয়াহিয়া খান বৈঠকের আমন্ত্রণ জানালে শেখ মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ১৫ই মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের জন্য সুনির্দিষ্ট ৩৫টি নির্দেশনা জারি করেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং ১৬ই মার্চ শেখ মুজিবের সঙ্গে সরকার গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু একই সঙ্গে সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে ঢাকায় প্রেরণের পাশাপাশি সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো হতে থাকে। ১৯শে মার্চ ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২১শে মার্চ আলোচনায় যোগ দিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ১২ জন উপদেষ্টাকে সফরসঙ্গী করে ঢাকা আসেন। ২২শে মার্চ ভুট্টো-মুজিবের ৭০ মিনিটের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করা সত্ত্বেও ভুট্টো-মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক সফল হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানে ২৩শে মার্চ প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। ২৫শে মার্চ ভুট্টো-ইয়াহিয়া রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে বাঙালি নিধনযজ্ঞের সবুজ সংকেত অপারেশন সার্চলাইট প্রদান করে সন্ধ্যায় গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান যাত্রা করেন। উইং কমান্ডার এ. কে. খন্দকার শেখ মুজিবকে বিষয়টি জানান। ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ঐদিনই রাত ১টা ১০ মিনিটে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। তন্মধ্যে বিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারাভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের প্রায় ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন।

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে সহপাঠী বন্ধু আবদুল মালেককে মারপিট করা হলে শেখ মুজিবুর রহমান সেই বাড়িতে গিয়ে ধাওয়া করেন। সেখানে হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে হিন্দু মহাসভার নেতাদের কৃত মামলায় শেখ মুজিবকে প্রথমবারের মতো আটক করা হয়। সাত দিন জেলে থাকার পর মীমাংসার মাধ্যমে মামলা তুলে নেওয়া হলে শেখ মুজিব মুক্তি পান। এছাড়া ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগের ফরিদপুর জেলা শাখার সহসভাপতি থাকা অবস্থায় বক্তব্য প্রদান এবং গোলযোগের সময় সভাস্থলে অবস্থান করায় শেখ মুজিবুর রহমানকে দুইবার সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ থেকে ১৫ই মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ই সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল আবারও তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় ও ৮০ দিন কারাভোগ করে ২৮শে জুন মুক্তি পান। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে অক্টোবর থেকে ২৭শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও শেখ মুজিবকে ২০৬ দিন কারাভোগ করতে হয়। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ই অক্টোবর শেখ মুজিব আবার গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ই জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা প্রস্তাব দেয়ার পর তিনি যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।

ইয়াহিয়া খান ২৭ মার্চ পাকিস্তান রেডিওতে এক ঘোষণায় সামরিক আইন জারি করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে মুজিবুর রহমান ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ি থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয়। মূল ঘোষণার অনুবাদ নিম্নরূপ:

এর কিছুক্ষণ পর তিনি বাংলায় একটি ঘোষণা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন–

টেক্সাসে বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত নথি সংগ্রাহক মাহবুবুর রহমান জালাল বলেন, “বিভিন্ন সূত্র ও দলিল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটিই প্রমাণিত হয় যে, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যা ছিল তার বা অন্য কারো হয়ে ঘোষণা দেওয়ার অনেক পূর্বে।”

স্বাধীনতা ঘোষণার পরই রাত ১টা ৩০ মিনিটের সময় শেখ মুজিবকে সেনাবাহিনীর একটি দল তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ও সামরিক জিপে তুলে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐ রাতে তাকে আটক রাখা হয় আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে। পরদিন তাকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিমানে করে করাচিতে প্রেরণ করা হয়। করাচি বিমানবন্দরে পেছনে দাঁড়ানো দুই পুলিশ কর্মকর্তার সামনের আসনে বসা অবস্থায় শেখ মুজিবের ছবি পরদিন প্রায় সব দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়। এর আগে জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে শেখ মুজিবকে ক্ষমতালোলুপ দেশপ্রেমবর্জিত লোক আখ্যা দিয়ে দেশের ঐক্য ও সংহতির ওপর আঘাত হানা এবং ১২ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ তোলেন ও বলেন যে এই অপরাধের শাস্তি তাকে (শেখ মুজিবকে) পেতেই হবে।

লাহোর থেকে ৮০ মাইল দূরে পাকিস্তানের উষ্ণতম শহর লায়ালপুরের (বর্তমান ফয়সালাবাদ) কারাগারে শেখ মুজিবকে কড়া নিরাপত্তায় আটকে রাখা হয়। তাকে নিঃসঙ্গ সেলে (সলিটারি কনফাইন্টমেন্ট) রাখা হয়েছিল। এদিকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমানে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর) প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাজউদ্দিন আহমেদ হন প্রধানমন্ত্রী। পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী বড় রকমের বিদ্রোহ সংঘটিত করে। মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তান বাহিনীর মধ্যকার সংঘটিত যুদ্ধটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নামে পরিচিত।

১৯শে জুলাই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সামরিক আদালতে মুজিবের আসন্ন বিচারের বার্তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করে। পাকিস্তানি জেনারেল রহিমুদ্দিন খান এই আদালতের নেতৃত্ব দেন। তবে মামলার প্রকৃত কার্যপ্রণালী ও রায় কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। লায়ালপুর কারাগারেই সামরিক আদালত গঠন করা হয়। তাই মামলাটি “লায়লপুর ট্রায়াল” হিসেবে অভিহিত। এই মামলার শুরুতে সরকারের দিক থেকে প্রবীণ সিন্ধি আইনজীবী এ. কে. ব্রোহিকে অভিযুক্তের পক্ষে মামলা পরিচালনায় নিয়োগ দেয়া হয়। আদালতের কার্যক্রমের শুরুতে ১২ দফা অভিযোগনামা পড়ে শোনানো হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল– রাষ্ট্রদ্রোহ, সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ইত্যাদি। ছয়টি অপরাধের জন্য শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। আদালতে ইয়াহিয়া খানের ২৬শে মার্চ প্রদত্ত ভাষণের টেপ রেকর্ডিং বাজিয়ে শোনানো হয়। সেই বক্তব্য শোনার পর শেখ মুজিব আদালতের কোনো কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং তার পক্ষে কৌঁসুলি নিয়োগে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এই বিচারকে প্রহসন আখ্যা দেন। গোটা বিচারকালে তিনি কার্যত আদালতের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছিলেন। আদালত কক্ষে যা কিছু ঘটেছে, তা তিনি নিস্পৃহতা দিয়ে বরণ করেছিলেন। বিচার প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থন তো দূরের কথা, কোনো কার্যক্রমেই অংশ নেননি তিনি।

৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের কয়েকটি সামরিক বিমানঘাঁটি আক্রমণ করলে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। পরদিন, ৪ঠা ডিসেম্বর সামরিক আদালত বিচারের রায় ঘোষণা করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে তাকে নেওয়া হয় মিয়ানওয়ালি শহরের আরেকটি কারাগারে। সেখানে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার ব্যবস্থা চলতে থাকে। বলা হয়ে থাকে, যে কারাগার কক্ষে তিনি অবস্থান করেছিলেন, তার পাশে একটি কবরও খোঁড়া হয়েছিল। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানি সরকার মুজিবকে ছেড়ে দিতে এবং তার সাথে সমঝোতা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধে ভারতের সরাসরি অংশগ্রহণের ফলে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গড়া যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় ফিরে সরকার গঠন করেন।

পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়বরণ করার ফলশ্রুতিতে ২০শে ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতাচ্যুত হলে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ক্ষমতা হস্তান্তরকালেও ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে মুজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ভুট্টো নিজের স্বার্থ, বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের পরিণতি ও আন্তর্জাতিক চাপের কথা চিন্তা করে শেখ মুজিবের কোন ক্ষতি করতে চাননি। শেখ মুজিবের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোন স্থানে সরিয়ে ফেলতে চান এবং মিঁয়াওয়ালী কারাগারের প্রধান হাবিব আলীকে সেরূপ আদেশ দিয়ে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন। ২২শে ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানকে মিঁয়াওয়ালী কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এরপর ২৬শে ডিসেম্বর সিহালার পুলিশ রেস্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুট্টো ঐদিন সেখানে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেন। ডিসেম্বরের শেষের দিকে (২৯ অথবা ৩০ ডিসেম্বর) পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমেদের সাথে এবং ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে আবার ভুট্টোর সাথে মুজিবের বৈঠক হয়। ভুট্টো তাকে পশ্চিম পাকিস্তান ও নবগঠিত বাংলাদেশের সাথে ন্যূনতম কোন “লুস কানেকশন” রাখার অর্থাৎ শিথিল কনফেডারেশন গঠন করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শেখ মুজিব ঢাকায় এসে জনগণের মতামত না জেনে কোন প্রকার প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকার করেন।  

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারি ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তান ত্যাগের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। সেদিন রাত ২টায় অর্থাৎ ৮ই জানুয়ারির প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি কার্গো বিমান লন্ডনের উদ্দেশ্যে রাওয়ালপিন্ডি ছাড়ে। ভুট্টো নিজে বিমানবন্দরে এসে শেখ মুজিবকে বিদায় জানান। লন্ডনে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি লন্ডন থেকে নয়াদিল্লিতে ফিরে আসেন এবং ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের পর জনসমক্ষে ইন্দিরা গান্ধী ও “ভারতের জনগণ আমার জনগণের শ্রেষ্ঠ বন্ধু” বলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে এসে তিনি সেদিন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সামনে বক্তৃতা দেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শেখ মুজিবুর রহমান অল্পদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান আইনসভার জন্য নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জানুয়ারি তারিখে নতুন রাষ্ট্রের প্রথম সংসদ গঠন করেন। ১২ই জানুয়ারি সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নিকট হস্তান্তর করেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান তার অন্তর্বর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে শেখ মুজিব স্বাক্ষর করেন। ১৫ই ডিসেম্বর শেখ মুজিব সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের ঘোষণা দেন। ১৬ই ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের মতে, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তাধারার চারটি বৈশিষ্ট্য হলো বাঙালি জাতিসত্তা, সমাজতন্ত্র, জনসম্প্রীতি এবং অসাম্প্রদায়িকতা । সংবিধানের চারটি মূলনীতি–জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র,  গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে চারটি বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই চারটি মূলনীতিকে একসাথে মুজিববাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।’

৭ই মার্চ, ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ মুজিব ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিচালিত নয় মাসব্যাপী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর সমগ্র বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। শেখ মুজিব এই ধ্বংসযজ্ঞকে “মানব ইতিহাসের জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ” উল্লেখ করে ৩০ লাখ মানুষ নিহত ও ২ লাখ নারীর ধর্ষিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিব মাত্র এক বছরের মধ্যে দেশ পুনর্গঠনের জন্য উল্লেখযােগ্য কর্মসূচি হাতে নেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ ৪০,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, দুঃস্থ মহিলাদের কল্যাণের জন্য নারী পুনর্বাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযােদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা এবং ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যা মোকাবেলাপূর্বক একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালান। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে আঁতাতের অভিযোগে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুনরায় চালু করেন। ইসলামি গোত্রগুলোর জোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মদ তৈরি ও বিপণন এবং জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেন। অত্যন্ত অল্প সময়ে বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় ও ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ ছিল শেখ মুজিব সরকারের উল্লেখযােগ্য সাফল্য। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া হয়। ১০০ বিঘার বেশি জমির মালিকদের জমি এবং নতুন চর বিনামূল্যে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা হয়। গ্রাম বাংলার ঋণে জর্জরিত কৃষকদের মুক্তির জন্য তিনি “খাই-খালাসী আইন” পাশ করেন। গ্রাম বাংলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিল্প-কৃষি উৎপাদনের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বাের্ড প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ মুজিবুর রহমান স্থানীয় সরকারগুলোতে গণতন্ত্রায়নের সূচনা করেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভায় প্রত্যক্ষ ভােটে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে প্রশাসনে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি নাগাদ ১৩ মাসে ১০ কোটি টাকা তাকাবি ঋণ বণ্টন, ৫ কোটি টাকার সমবায় ঋণ প্রদান, কৃষিক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন, ১০ লাখ বসতবাড়ি নির্মাণ, চীনের কয়েক দফা ভেটো সত্ত্বেও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, ৩০ কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে মিত্রবাহিনীর সৈন্য প্রত্যাবর্তন শুরুসহ দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে শেখ মুজিব বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়ােজন করেন। মুজিব শতাধিক পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন এবং ভূমি ও মূলধন বাজেয়াপ্ত করে ভূমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের জন্য বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। এরফলে, অর্থনৈতিক সঙ্কটের অবসান হতে শুরু করে এবং সমূহ দুর্ভিক্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। এছাড়াও তিনি প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটান। শেখ মুজিবের নির্দেশে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুন সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে পূর্বের ১৯টি বৃহত্তর জেলার স্থলে ৬১টি জেলা সৃষ্টি করা হয়। ১৬ই জুলাই শেখ মুজিব ৬১ জেলার প্রতিটির জন্য একজন করে গভর্নর নিয়োগ দেন।

নব নির্বাচিত মুজিব সরকার গুরুতর কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তন্মধ্যে ছিল–১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর পুনর্বাসন, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ সরবরাহ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়াবলি। এছাড়া ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এবং যুদ্ধের ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল। অর্থনৈতিকভাবে, মুজিব একটি বিস্তৃত পরিসরের জাতীয়করণ কার্যক্রম হাতে নেন। বছর শেষ হতে না হতেই, হাজার হাজার বাঙালি পাকিস্তান থেকে চলে আসে ও হাজার হাজার অবাঙালি পাকিস্তানে অভিবাসিত হয়। তাসত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ শরণার্থী শিবিরগুলোতে রয়ে যায়। প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করার জন্য বৃহৎ সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে এবং দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কাকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (১৯৭৩–১৯৭৮) কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও কুটির শিল্প উন্নয়নে প্রাধিকারমূলক সরকারি অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেয়া হয়। তারপরও ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে চালের দাম আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবার ফলে দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়, যা ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। উক্ত দুর্ভিক্ষের সময় রংপুর জেলায় খাদ্যাভাব ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের অব্যবস্থাপনাকে সেসময় এর জন্যে দোষারোপ করা হয়। মুজিবের শাসনামলে দেশবাসী শিল্পের অবনতি, বাংলাদেশি শিল্পের উপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ এবং জাল টাকা কেলেঙ্কারি প্রত্যক্ষ করে।

চার বছরের কম সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে যে সাফল্য এনেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অদ্বিতীয় হয়ে আছে। যেসব দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের সঙ্গেও তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এমনকি পাকিস্তানের স্বীকৃতিও আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। “কারো সাথে বৈরিতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব” ছিল মুজিব সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ ১১৩টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। শেখ মুজিবের সিদ্ধান্তক্রমে বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সদস্যপদ গ্রহণ করে। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের পর শেখ মুজিব পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং ওআইসি, জাতিসংঘ ও জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ভ্রমণ করে বাংলাদেশের জন্য মানবীয় ও উন্নয়নকল্পের জন্য সহযোগিতা চান। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট-নিরপেক্ষ দেশসমূহের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। দেশটির শীর্ষ চার নেতা পোদগর্নি, কোসিগিন, ব্রেজনেভ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো তাকে অভ্যর্থনার জন্য ক্রেমলিনে সমবেত হন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তিনি জাপান সফর করেন। জাপানের সম্রাট হিরোহিতো শেখ মুজিবকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সম্মেলন সংস্থার সম্মেলনে যোগ দেন। উক্ত সম্মেলনে মুজিবের চরমতম প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী ভুট্টো তার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন যা পাকিস্তানের সাথে কিছুমাত্রায় সম্পর্ক উন্নয়ন ও স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করে। তিনি একই বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করেন এবং জাতিসংঘের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি ৫০টি সমস্যা তুলে ধরেন।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন যাতে অর্থনৈতিক ও মানব সম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুজিব ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। মুজিবের জীবদ্দশায় দুই সরকারের মধ্যে পারষ্পরিক আন্তরিকতাপূর্ণ সমঝোতা ছিল। শেখ মুজিবের অনুরোধক্রমে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড থেকে ভারতীয় বাহিনীকে নিজ দেশে ফেরৎ নিয়ে যান।

শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী গড়ে ওঠে। নবগঠিত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষাকল্পে তিনি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বিস্তৃত প্রকল্প গ্রহণ করেন। শেখ মুজিব খাদ্য ক্রয়ের পাশাপাশি বিদেশ থেকে সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়ােজনীয় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করেন। যুগোস্লাভিয়ায় সামরিক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে পদাতিক বাহিনীর জন্য ক্ষুদ্র অস্ত্রশস্ত্র এবং সাজোঁয়া বাহিনীর জন্য ভারি অস্ত্র আনা হয়। ভারতের অনুদানে ৩০ কোটি টাকায় সেনাবাহিনীর জন্য কেনা হয় কাপড় ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি। সােভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তৎকালে উপমহাদেশের সবচেয়ে আধুনিক আকাশযান মিগ বিমান, হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফলে মিসর থেকে সাজোঁয়া গাড়ি বা ট্যাংক আনা সম্ভব হয়েছিল। উন্নত প্রযুক্তি ও উন্নত জ্ঞান লাভ করে দেশ যাতে আধুনিক সেনাবাহিনী গড়তে পারে সে উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব সামরিক কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে প্রেরণ করেন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ব্রিটেন, সােভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত প্রভৃতি দেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিব সরকার সেনাবাহিনীর জন্য নগদ অর্থে আধুনিক বেতারযন্ত্র ক্রয় করে এবং সিগন্যাল শাখাকে আরও আধুনিক করে গড়ে তােলে। শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনকারী আরও ত্রিশ হাজারের অধিক সামরিক কর্মকর্তা ও জওয়ানদেরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করেন। প্রত্যাবর্তনকারী বাঙালি কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩০০। এই সকল কর্মকর্তা ও জওয়ানদের নিয়ে অর্ধ লক্ষের অধিক সদস্যের দেশের প্রথম সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল। সামরিক সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য শেখ মুজিবের নির্দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে “দীঘিনালা”, “রুমা”, “আলীকদমের” ন্যায় ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ছাউনি গড়ে তোলা হয়।

শেখ মুজিবের ক্ষমতালাভের পরপরই, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সশস্ত্র বিভাগ গণবাহিনী কর্তৃক সংগঠিত বামপন্থী বিদ্রোহীরা মার্ক্সবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা রোধে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৪শে জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকার জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের ব্যাপারে একটি আদেশ জারি করেন। এরপর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনের সরকারি আদেশ জারি করা হয়। রক্ষীবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল সেনাবাহিনীর এক-ষষ্ঠাংশ। শুরুরদিকে রক্ষীবাহিনী বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে অনেক অস্ত্রশস্ত্র, চোরাচালানের মালামাল উদ্ধার করে এবং মজুতদার ও কালোবাজারীদের কার্যকলাপ কিছুটা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু খুব শীঘ্রই ঐ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হতে থাকে। এর কারণ রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম, গোলাগুলি, এবং ধর্ষণের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। তাদের যথেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কার্যকলাপের জবাবদিহিতার আইনগত কোন ব্যবস্থা ছিল না। অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য গ্রেফতারকৃত লোকদের প্রতি অত্যাচার, লুটপাট এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়। রক্ষীবাহিনীর সদস্যদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ন্যায় জলপাই রঙের পোশাক এবং বাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। গণ অসন্তোষ সত্ত্বেও মুজিব সরকার ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই অক্টোবর জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৭৩ জারি করে রক্ষীবাহিনীর সকল কার্যকলাপ আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করেন। এতে জনগণের মধ্যে মুজিব সরকারের প্রতি সুপ্ত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। সেইসাথে রক্ষীবাহিনীর বিভিন্ন অনাচারের কারণে জনগণের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। রক্ষীবাহিনীকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া এবং সেনাবাহিনীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর অভিযোগে সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যেও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

স্বাধীনতার পর অচিরেই মুজিবের সরকারকে ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাল দিতে হয়। তার রাষ্ট্রীয়করণ ও শ্রমভিত্তিক সমাজতন্ত্রের নীতি প্রশিক্ষিত জনবল, অদক্ষতা, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি আর দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুজিব অতিমাত্রায় জাতীয় নীতিতে মনোনিবেশ করায় স্থানীয় সরকার প্রয়োজনীয় গুরুত্ব লাভে ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ করায় গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় তৃণমূল পর্যায়ে কোন নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে কমিউনিস্ট এবং ইসলামপন্থীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করায় ইসলামপন্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনজনদের নিয়োগ দেয়ার জন্য মুজিবের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনা হয়। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষ খাদ্য সংকট আরও বাড়িয়ে দেয় এবং অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষিকে ধ্বংস করে ফেলে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব, দ্রব্যমূল্যের অসামঞ্জস্যতা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতার কারণে মুজিবকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকায় মুজিবও তার ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মুজিব জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি শেখ মুজিব নতুন যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনে উদ্যোগী হন, একে তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিপ্লব বলে আখ্যা দেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির মধ্যে দুটি দিক ছিল–সরকার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্মসূচি এবং আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির স্থলে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এ সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরিবর্তিত সংবিধানের আওতায় ৬ জুন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল, সরকারি-বেসরকারি এবং অন্যান্য সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্য নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিবিশেষকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ নামে একটি জাতীয় দল গঠন করা হয়। এ সময় শেখ মুজিব নিজেকে আমৃত্যু রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। বাকশাল প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসাধারণ, কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের বিবেচিত করে এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে থাকে। বাকশাল বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারপন্থী চারটি সংবাদপত্র বাদে সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ মুজিব জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সহায়তায় বাকশাল বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করেন এবং সারাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। অনেকের মতে, তার এই নীতির ফলে অস্থিতিশীল অবস্থা আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং দুর্নীতি, কালোবাজারী ও অবৈধ মজুদদারি অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। তবে রক্ষীবাহিনী এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যাচার ও রাজনৈতিক হত্যার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও মুজিব নীরব ভূমিকা পালন করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারীরা মুজিবের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন এবং তার কর্মকাণ্ডকে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার বিরোধী বলে গণ্য করেন। মুজিব ও বাকশাল বিরোধীরা গণঅসন্তোষ এবং সরকারের ব্যর্থতার কারণে মুজিব-সরকারের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট প্রত্যূষে একদল সেনা কর্মকর্তা ট্যাঙ্ক দিয়ে রাষ্ট্রপতির ধানমন্ডিস্থ বাসভবন ঘিরে ফেলে এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার এবং ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করে। শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্য–বেগম ফজিলাতুন্নেসা, শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকী, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী পারভীন জামাল রোজী, শেখ রাসেল, শেখ মুজিবের ভাই শেখ আবু নাসের হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার স্ত্রী বেগম আরজু মনি, শেখ মুজিবের ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতনি সুকান্ত বাবু, বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত ও এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করা হয়। এছাড়া শেখ মুজিবের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জামিল উদ্দিন আহমেদ, এসবি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ও সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক নিহত হন। কেবলমাত্র তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। তাদের বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

শেখ মুজিবের শরীরে মোট ১৮টি বুলেটের দাগ দেখতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে, একটি বুলেটে তার ডান হাতের তর্জনী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেখ মুজিব ও তার পরিবারের মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করতে সেনা সদর থেকে ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল এম এ হামিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি গিয়ে আবিষ্কার করেন নির্দিষ্ট কফিনে শেখ মুজিবের মরদেহ মনে করে তার ভাই শেখ নাসেরের মরদেহ রাখা হয়েছে। দায়িত্বরত সুবেদার এর ব্যাখ্যা দেন যে, দুই ভাই দেখতে অনেকটা একরকম হওয়ায় ও রাতের অন্ধকারের কারণে মরদেহ অদল-বদল হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন ১৬ আগস্ট শেখ মুজিবের মরদেহ জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সামরিক তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয়। অন্যান্যদেরকে ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের সদস্য এবং সামরিক কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিবের প্রাক্তন সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমেদ, যিনি পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতির পদে স্থলাভিষিক্ত হন।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর মুজিব হত্যাকাণ্ডের বিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে খন্দকার মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (দায়মুক্তির অধ্যাদেশ) জারি করেন এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান ও পাকিস্তানপন্থী প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে তার বৈধতা দেয়া হয়, যা ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই আগস্ট তারিখে জাতীয় সংসদে রহিত করা হয়। সংবাদ মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের ইন্ধনদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)-কে দায়ী করা হয়। লরেন্স লিফশুলজ বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বুস্টারের সূত্রে সিআইএ-কে সামরিক অভ্যুত্থান ও গণহত্যার জন্য দোষারোপ করেন। মুজিবের মৃত্যুর পর বাংলাদেশে বহু বছরের জন্য চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা ঘটে। সেনা অভ্যুত্থানের নেতারা অল্পদিনের মধ্যে উচ্ছেদ হয়ে যান এবং অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দেশে চলমান অচলাবস্থা তৈরি হয় ও সেনাবাহিনীতে ব্যাপক অরাজকতা দেখা দেয়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বর তৃতীয় সেনা অভ্যুত্থানের ফলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা আসীন হয়। তিনি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে সমর্থন করে মুজিব হত্যার বিচার স্থগিত করে দেন এবং মুজিবপন্থী সেনাসদস্যদের গ্রেফতার করেন। সেনা অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ১৪ জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাকিরা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মুজিব হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করেন এবং ১২ই নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বিচারক কাজী গোলাম রসুল শেখ মুজিব হত্যার বিচারের এজলাস গঠন করেন। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে রায়ের বিরুদ্ধে কৃত আপিলে হাইকোর্টের দুইটি বেঞ্চ ভিন্ন ভিন্ন রায় দেয়। ফলে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে মামলাটি তৃতীয় বেঞ্চে পাঠানো হয় এবং সেখানে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে এ বিচারের চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ৫ জন আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই এপ্রিল অন্যতম আসামি আব্দুল মাজেদকে ভারত থেকে বাংলাদেশে এনে গ্রেফতার করা হয় এবং ১২ই এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।

১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দাদা আব্দুল হামিদের আদেশে শেখ মুজিবের বাবা ১৪ বছর বয়সী শেখ মুজিবকে তার ৩ বছর বয়সের সদ্য পিতৃ-মাতৃহীন চাচাতো বোন বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে বিয়ে দেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছার বাবা শেখ জহিরুল হক ছিলেন মুজিবুর রহমানের চাচা। বিয়ের ৯ বছর পর ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিব ২২ বছর বয়সে ও ফজিলাতুন্নেসা ১২ বছর বয়সে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়–শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেল।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের পহেলা অক্টোবর থেকে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত শেখ পরিবারকে এই বাড়িতেই গৃহবন্দি করে রাখে। শেখ কামাল ও জামাল পাহারারত সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান এবং মুক্তি সংগ্রামে যোগ দেন। শেখ কামাল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধের একজন সমন্বয়ক ছিলেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন কমিশন লাভ করেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি ছিলেন। তাকে শেখ মুজিবের শাসনামলে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শেখ জামাল যুক্তরাজ্যের রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টে প্রশিক্ষণ নেন এবং এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার পদে যোগ দেন।

শেখ মুজিবের প্রায় পুরো পরিবারই ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট রাতে সেনা অভিযানে নিহত হন। কেবলমাত্র দুই কন্যা–শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঐসময় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থানের কারণে বেঁচে যান। শেখ হাসিনা দেশে প্রত্যাবর্তন করে পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে এবং ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবেও তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেখ রেহানার কন্যা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ টিউলিপ সিদ্দিক ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যুক্তরাজ্যের হাউস অফ কমন্স এর সদস্য (গ্রেটার লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে নির্বাচিত)। শেখ মুজিবের ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত শ্রমিকনেতা ও তার মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন। ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুজিব বাহিনীর প্রধান নেতা ছিলেন ও ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন (উভয়েই ১৫ আগস্ট নিহত হন)। বর্তমানে শেখ মুজিবের ভাগ্নে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং  ভ্রাতৃষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল বাংলাদেশের সাংসদ। শেখ ফজলে নূর তাপস, মজিবুর রহমান চৌধুরী, নূর-ই-আলম চৌধুরী, আন্দালিব রহমান, শেখ তন্ময়, সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, শেখ ফজলে শামস পরশ, এবং শেখ ফজলে ফাহিম–বাংলাদেশের প্রথমসারির রাজনীতিবিদ ও সম্পর্কে তার নাতি হন।

শেখ মুজিব দুই খণ্ডে তার আত্মজীবনী লিখেছিলেন, যেখানে তিনি স্বীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনাও দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি তার চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও লিখে রেখেছিলেন। এইসব রচনা তার মৃত্যুর পর তার কন্যা শেখ হাসিনা গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করেন। তার রচিত বইগুলোর রচনাশৈলীতে সাহিত্যের গুণগতমান খুঁজে পাওয়ায় তাকে লেখক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

ব্রিটিশ আমলে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন। এই সময় থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মুসলিম লীগে তিনি ছিলেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন উপদলে, যারা প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলেন। তবে মুসলিম লীগের প্রতি দলীয় আনুগত্যের তুলনায় সোহ্‌রাওয়ার্দীর প্রতি তার ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রবল ছিল। আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতে, শেখ মুজিব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শিষ্য হিসেবে পরিচিত হলেও তার রাজনৈতিক চরিত্র গড়ে উঠেছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল হাশিম, সুভাষ বসু ও মাওলানা ভাসানীর রাজনীতির প্রভাব বলয়ে থেকে। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন; আবার তিনি যুক্তবঙ্গ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও সামিল হন। অনেক ঐতিহাসিক শেখ মুজিবের তৎকালীন জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে প্রকৃতপক্ষে বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী তারা, অর্থাৎ শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সমাজ লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলা ও আসাম নিয়ে ভারতের বাইরে পৃথক রাষ্ট্রের ধারণার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন বাস্তবতায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের ভবিষ্যৎ গড়তে বাধ্য হন।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকলাপ পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, ভাষাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। মুসলিম লীগ নেতৃত্বের  বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে আরো অনেকের সাথে শেখ মুজিব এই দল থেকে সরে দাঁড়ান। ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের অর্ধেকটা সময় কারাগারে এবং দু-এক বছর ছাড়া পুরোটা সময় জুড়ে বিরোধীদলে অবস্থান করেই তিনি কাটিয়ে দেন। একক পাকিস্তান ধারণার ভঙ্গুরতার বিষয়টি তার লেখা ডায়েরি ও অসংখ্য বক্তৃতায় উঠে এসেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা “পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছেন” এমন অভিযোগ তুলে তাকে প্রায়ই পাকিস্তানের দুশমন, ভারতের দালাল ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক গুরু সোহ্‌রাওয়ার্দীর মতোই শেখ মুজিব ছিলেন পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক। পাকিস্তান আমলের পুরোটা সময় জুড়ে তজ্জন্যে আন্দোলন সংগ্রাম করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতা গ্রহণ করে প্রথমদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি ক্রমাগত সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে দুইবার গণচীন ও একবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে জনগণের জীবনমান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাদের প্রদর্শিত সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রতি শেখ মুজিবের আগ্রহ বাড়তে থাকে। তিনি আওয়ামী লীগকে ব্রিটিশ লেবার পার্টির মতো সামাজিক গণতন্ত্রী দল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইতেন। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের একটি মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেন।  তবে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের দমন-নিপীড়ন ও বাকশাল প্রবর্তন করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন; সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য জেল-জুলুম সহ্য করে শেষে নিজেই তা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ায় অনেকে একে আদর্শচ্যুতি হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের এক জনসভায় শেখ মুজিব বলেন:
         

মুসলিম লীগের মাধ্যমে রাজনীতির হাতেখড়ি হলেও শেখ মুজিব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পরবর্তী জীবনে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাজনীতি করেন। তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক বৈষম্যমূলক নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করতেন। তার দল আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার সকল ধর্মের বাঙালির সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই দল ও পরবর্তীকালে মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থাকা স্বত্ত্বেও মুজিব ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ইসলামি অনুশাসনের পথে অগ্রসর হন। জনসাধারণের সামনে উপস্থিতি এবং ভাষণের সময় শেখ মুজিব ইসলামিক সম্ভাষণ ও শ্লোগান ব্যবহার বাড়িয়ে দেন এবং ইসলামিক আদর্শের কথা উল্লেখ করতে থাকেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে মুজিব তার স্বভাবসুলভ “জয় বাংলা” অভিবাদনের বদলে ধার্মিক মুসলিমদের পছন্দনীয় “খোদা হাফেজ” বলতেন। শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন, মানুষ ভুল থেকেই শেখে। তার মতাদর্শ নিজের ভুল স্বীকার ও সংশোধনের পক্ষে ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ “জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কারে” ভূষিত করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় শান্তি ও নিরাপত্তা সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। এটি বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক পদক।

১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ফিরে আসার পর ১৫ই আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। তবে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে এ ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন বাতিল করে দেয়। পরে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবারও রাষ্ট্রীয়ভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসলে আবারও ১৫ই আগস্টকে শোক দিবস ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশি প্রতিটি ধাতব মুদ্রা ও টাকায় শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি রয়েছে এবং বাংলাদেশের বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমান এখনও আওয়ামী লীগের আদর্শগত প্রতীক হয়ে আছেন এবং দলটি মুজিবের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ধারণ করে চলেছে। তিনি তার রাজনৈতিক প্রচারণায় যে কোট পরতেন, সেটিকে “মুজিব কোট” নামে ডাকা হয় এবং আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলের রাজনীতিবিদগণ আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিব কোট পরিধান করে থাকেন। শেখ মুজিবুরের আদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীবৃন্দ নিজেদের মুজিব সেনা বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। তিনি বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং গোষ্ঠীগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বাঙালিদের আন্দোলনকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজউইক পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির কবি বলে আখ্যায়িত করে লিখে যে:

কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্বকে হিমালয় পর্বতমালার সাথে তুলনা করে বলেন:

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর, ইউনেস্কো শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কো) নির্বাহী পরিষদের ২১০তম অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে দ্বিবার্ষিক “ইউনেস্কো-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ইন দ্য ফিল্ড অব ক্রিয়েটিভ ইকোনমি” (সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে ইউনেস্কো-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক পুরস্কার) প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ অধিবেশনকাল থেকে পুরস্কারটি প্রদান করা হবে।

১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের একরোখা কার্যকলাপকে দায়ী করা হয়। আবার, পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের দলীয় মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সাথে অন্তর্বিরোধে লিপ্ত হন তিনি, যা শেষ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে অমোচনীয় বিভেদ তৈরি করে। অনেক সহকর্মী তার বিরুদ্ধে নিজের প্রাধান্যপ্রীতির অভিযোগ তোলেন। এদের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ তার সমালোচনা করে লেখেন -

এছাড়াও কিছু কিছু ঐতিহাসিকদের মতে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতরের সংঘাত এবং বৈষম্যগুলোকে শেখ মুজিব ও তার দল অতিরঞ্জিত করেছিল এবং স্বাধীনতা বাংলাদেশকে শিল্প ও মানবসম্পদের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন করে। সৌদি আরব, সুদান, ওমান ও চীন প্রভৃতি দেশের সরকার শেখ মুজিবের সমালোচনা করে এবং মুজিবের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

বাংলাদেশের নেতা হিসেবে শাসনকালে, মুসলিম ধর্মীয় নেতারা মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির কারণে তার সমালোচনা করেন। ভারতীয় সরকারের কাছ থেকে ব্যাপক সহযোগিতা গ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সাথে একাত্মতার কারণে অনেকে মুজিবের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। সমালোচকদের অনেকে আশঙ্কা করেন, বাংলাদেশ ভারতের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে একটি স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে শেখ মুজিবের শাসন দক্ষতার জন্যই তা বাস্তবায়িত হয়নি। মুজিবের একদলীয় শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন জনগণের একটি বড় অংশের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যা বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে দীর্ঘসময়ের জন্য কক্ষচ্যুত করে। স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবের শাসনের এক বছর পর, টাইম সাময়িকী লিখে:

যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকী ২৫শে আগস্ট ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যুর দশ দিন পর “১৫ই আগস্ট ১৯৭৫: মুজিব, স্থপতির মৃত্যু” শিরোনামে লিখে:

২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রন্টলাইন সাময়িকীর একটি প্রবন্ধে লেখক ডেভিড লুডেন তাকে একজন “ফরগটেন হিরো” বা বিস্মৃত বীর বলে উল্লেখ করেন।

১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে মুজিবের মৃত্যুর পরবর্তী সরকারগুলোর মুজিব বিরোধিতা ও মুজিবের স্মৃতিচারণ সীমিতকরণের কারণে তার সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর শেখ মুজিবুরের ভাবমূর্তি আবার ফিরে আসে। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ডিজিটাল আইন-২০১৬ মোতাবেক যে-কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদালত কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত মীমাংসিত কোনো বিষয় এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা চালালে বা অবমাননা করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অসংখ্য ফিকশন ও নন-ফিকশন বই, পুস্তিকা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়েছে। তার কন্যা শেখ হাসিনা রচনা করেছেন শেখ মুজিব আমার পিতা। তাকে ঘিরে স্মৃতিচারণামূলক বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - এ বি এম মূসার বই মুজিব ভাই, বেবী মওদুদ রচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার। মুজিবহত্যা নিয়ে গবেষণামূলক বইয়ের মধ্যে রয়েছে মিজানুর রহমান খানের মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড, এম আর আখতার মুকুল রচিত মুজিবের রক্ত লাল প্রভৃতি। শেখ মুজিবের শাসনামলের বিবরণ উঠে এসেছে এমন বইয়ের মধ্যে রয়েছে মওদুদ আহমেদ রচিত বাংলাদেশ : শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস কর্তৃক রচিত , হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস দেয়াল, নিয়ামত ইমাম রচিত উপন্যাস দ্য ব্ল্যাক কোট প্রভৃতি।

শেখ মুজিবকে নিয়ে বিখ্যাত দুটি গান হল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ভারতীয় গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত “শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ” এবং ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে হাসান মতিউর রহমান কর্তৃক রচিত “যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই”। গান দুটিতে সুরারোপ করেন যথাক্রমে অংশুমান রায় ও মলয় কুমার গাঙ্গুলী। এর বাইরেও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অনেক কবিতা ও গান রচিত হয়েছে।

২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনস্থিত শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টারের অর্থায়নে লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী তার লিখিত রাজনৈতিক উপন্যাস “পলাশী থেকে ধানমন্ডি” অবলম্বনে একই নামে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এতে শেখ মুজিব চরিত্রে অভিনয় করেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতের পরিচালনায় “যুদ্ধশিশু” নামক একটি ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রে প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে “আগস্ট ১৯৭৫” নামে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনা নিয়ে একটি বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট তারিখে মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও করোনা মহামারিজনিত জটিলতার কারণে সেটি পিছিয়ে যায়। এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় ও বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক “বঙ্গবন্ধু” নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণাধীন রয়েছে। চলচ্চিত্রটি বাংলা, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হবে। তাছাড়াও শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ অবলম্বনে “চিরঞ্জীব মুজিব” নামক একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা কেন্দ্রের অর্থায়নে শেখ হাসিনা লিখিত “মুজিব আমার পিতা” গ্রন্থ অবলম্বনে একই নামে একটি অ্যানিমেটেড কার্টুন চলচ্চিত্রও নির্মাণাধীন রয়েছে।

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের সামসময়িক প্রধানমন্ত্রী ও শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বৈঠকে ২০২০-২১ খ্রিষ্টাব্দকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী পালনের জন্য মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ থেকে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ পর্যন্ত এ বর্ষ উদযাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে অধিকাংশ কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ে সম্পাদিত না হওয়ায় মুজিব বর্ষের সময়সীমা ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ইউনেস্কোর ১৯৫টি সদস্য দেশে এই মুজিব বর্ষ পালন করা হয়।

বাংলাদেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে; যার প্রায় সবই শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা। মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম উৎক্ষেপিত কৃত্রিম উপগ্রহ “বঙ্গবন্ধু-১” এর নামকরণ শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু যমুনা বহুমুখী সেতুর নাম পরিবর্তন করে “বঙ্গবন্ধু সেতু” করা হয়। এছাড়াও ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে গুলিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়াম “ঢাকা স্টেডিয়ামের” নাম পরিবর্তন করে “বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম” রাখা হয়। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার শেরে বাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে অবস্থিত চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে “বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র” নামে পুনর্বহাল করা হয়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে “ভাসানী নভোথিয়েটারের” নাম পরিবর্তন করে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার” রাখা হয়।

১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার “ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ” (আইপিজিএমআর)-কে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়” নাম রাখা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই “জিন্নাহ সড়কের” নাম পরিবর্তন করে “শেখ মুজিব সড়ক” নামে চট্টগ্রাম শহরের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়। এছাড়াও ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একটি সড়কের নাম “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মার্গ” রাখা হয়। কনট প্লেসের নিকটবর্তী স্থানটি ইতোপূর্বে “পার্ক স্ট্রিট” নামে পরিচিত ছিল।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন “বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ” নামে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগকে (বিপিএল) “বঙ্গবন্ধু বিপিএল” নামে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এছাড়াও মুজিব বর্ষ উপলক্ষে শেখ মুজিবের নামে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশ গেমসের ৯ম আসরের নামকরণ “বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস” করা হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন গেমস স্থগিত ঘোষণা করে।

শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) মুজিব ১০০ টি২০ কাপ বাংলাদেশ ২০২০ নামে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে এশিয়া একাদশ বনাম বিশ্ব একাদশের মধ্যকার দুইটি টুয়েন্টি২০ আন্তর্জাতিক (টি২০আই) খেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) স্বীকৃত ঐ খেলাগুলোকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক খেলার মর্যাদা দিলেও, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।




#Article 8: ইউনিকোড (617 words)


ইউনিকোড একটি আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থা। ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম সংস্থা এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। যেকোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ফি দিয়ে সংস্থাটির সদস্য হতে পারে। বর্তমানে ইউনিকোডে ১০,০০০ এর বেশি বর্ণ তালিকাভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব প্রধান কম্পিউটার সফ্টওয়্যার ও হার্ডওয়্যার প্রতিষ্ঠানসমূহ সংস্থাটির বর্তমান সদস্য, যেমন , , , , ,  এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান যারা টেক্সট্-প্রসেসিং স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে আগ্রহী। ইউনিকোড কনসোটিয়াম একটি অলাভজনক সংগঠন যেটি ইউনিকোডের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এই সংগঠনের মূল লক্ষ হচ্ছে সকল ভাষাকে একটি নির্দিষ্ট মানদন্ডে নিয়ে আসা।

১৯৮৭ সালে ইউনিকোডের কাজ শুরু করেছিলেন জেরোক্স (Xerox) এর জো বেকার (Joe Becker) এবং অ্যাপল (Apple) এর লি কলিন্স (Lee Collins) ও মার্ক ডেভিস (Mark Davis)। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সকল ভাষাকে একটি সার্বজনীন সংকেতায়নের মানদন্ডে নিয়ে আসা।ফলশ্রুতিতে পরবর্তী বছরের আগস্ট মাসে জো বেকার International/multilingual text character encoding system, tentatively called Unicode. (অনুবাদ : আন্তর্জাতিক/বহুভাষিক বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থা) নামে একটি খসড়া প্রস্তবনা তৈরি করেন। এই প্রস্তাবনাটি ছিল একটি ১৬ বিট এর বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থা:

Unicode is intended to address the need for a workable, reliable world text encoding. Unicode could be roughly described as wide-body ASCII that has been stretched to 16 bits to encompass the characters of all the world's living languages. In a properly engineered design, 16 bits per character are more than sufficient for this purpose.

১৬ বিট এর বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থার কারণ ছিল তিনি মনে করেছিলেন শুধুমাত্র আধুনিক ভাষার বর্ণগুলি ব্যবহৃত হবে।

Unicode gives higher priority to ensuring utility for the future than to preserving past antiquities. Unicode aims in the first instance at the characters published in modern text (e.g. in the union of all newspapers and magazines printed in the world in 1988), whose number is undoubtedly far below 214 = 16,384. Beyond those modern-use characters, all others may be defined to be obsolete or rare; these are better candidates for private-use registration than for congesting the public list of generally-useful Unicodes.

পরবর্তীতে অনেক পুরাতন ভাষার জন্য ও তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে। এদের মাঝ এমন ভাষাও রয়েছে যেগুলি বর্তমানে আর ব্যবহৃত হয় না। (যেমন: মিশরীয় চিত্রলিপি, লিনিয়ার-এ, লিনিয়ার-বি ইত্যাদি)

১৯৮৯ সালে মেটাফোর (Metaphor)-এর কেন হুইস্লার (Ken Whistler) এবং  মাইক কার্নাগান (Mike Kernaghan), আর.এল.জি (RLG)-এর ক্যারেন স্মিথ-ইয়োশিমুরা (Karen Smith-Yoshimura) ও জোয়ান আলিপ্র্যান্ড (Joan Aliprand) এবং সান মাইক্রোসিস্টেমস্ (Sun Microsystems)-এর গ্লেন্ রাইট (Glenn Wright) ইউনিকোডের গ্রুপে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে মাইক্রোসফ্ট (Microsoft)-এর মিচেল সুইগনার্ড (Michel Suignard) ও অ্যাস্মাস ফ্রেইট্যাগ (Asmus Freytag) এবং NeXT এর রিক ম্যাকগোয়ান (Rick McGowan) যোগদান করেন। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ইউনিকোডের খসড়া প্রস্তাবনা সম্পন্ন হয়। ১৯৯১ এর অক্টবরে ইউনিকোডের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালের জুনে ইউনিকোডের দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়।

বুলীয় বীজগণিতের নিয়মে গণনা করায় কম্পিউটার কেবলমাত্র শূন্য বা ০ বা অফ এবং এক বা ১ বা অন এই দুটি অবস্থা বোঝে । এক-একটি সংখ্যাকে বোঝানোর জন্য কম্পিউটারে ০ এবং ১ এর বিভিন্ন ক্রম ব্যবহার করা হয় । কম্পিউটারে লিপি বা অন্যান্য অক্ষর সংরক্ষিত হয় সেই অক্ষরগুলির প্রতিটির জন্য ০ ও ১-এর অদ্বিতীয় একটি ক্রম দিয়ে । একটি বর্ণ সংকেতায়ন ব্যবস্থা এরূপ একটি অদ্বিতীয় ক্রমের সঙ্গে একটি অক্ষরকে সংযুক্ত করে । এই সমস্ত ক্রমগুলিকে একত্রে বলা হয় কোডস্পেস্ এবং কোডস্পেসের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি ক্রমকে ক‌োড পয়েন্ট বলা হয় । কম্পিউটারে ব্যবহারের জন্য একাধিক বর্ণসংকেতায়ন ব্যবস্থা রয়েছে । প্রত্যেকটি অক্ষরের জন্য বিভিন্ন বর্ণসংকেতায়ন ব্যবস্থায় ওই অদ্বিতীয় সংখ্যার মান ভিন্ন হওয়ায় তথ্য আদানপ্রদানে অসুবিধা দেখা দেয় । ইউনিকোডে প্রত্যেকটি পরিচিত অক্ষরের জন্য একটি করে কোডপয়েন্ট বরাদ্দ করা হয় এবং প্রত্যেকটি কোডপয়েন্টকে একটি অদ্বিতীয়  বিশিষ্ট পূর্ণসংখ্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয় । U+ এর পর কোডপয়েন্টটির ষষ্ঠদশনিধান বিশিষ্ট সংখ্যাটিকে লিখে কোডপয়েন্টটিকে চিহ্নিত করা হয় ।  ইউনিকোডে বর্তমানে ১১,১৪,১১২ সংখ্যক ক‌োডপয়েন্ট রয়েছে, যেগুলিকে 016 থেকে 10FFFF16 পর্যন্ত সংখ্যগুলি দ্বারা চিহ্নিত করা হয় । যদিও প্রত্যেকটি কোডপয়েন্ট লিখনযোগ্য অক্ষরকে নির্দেশ করে না । উদাহরণস্বরূপ, U+200F কোডপয়েন্টটি Zero Width Non-Joiner অক্ষরটিকে চিহ্নিত করে, যেটিকে মুদ্রিত করা বা কম্পিউটারের মনিটরে দেখানো সম্ভব নয় ।




#Article 9: ক্রিকেট (2186 words)


ক্রিকেট হচ্ছে ব্যাট ও বলের একটি দলীয় খেলা যাতে এগারোজন খেলোয়াড়বিশিষ্ট দুইটি দল অংশ নেয়। এই খেলাটির উদ্ভব হয় ইংল্যান্ডে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোসহ অন্যান্য দেশগুলোতে এই খেলা ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার লাভ করে চলছে। বর্তমানে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ৫ দিনের টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ খেলে থাকে। ২০০৫ সাল থেকে জিম্বাবুয়ে স্বেচ্ছায় টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে ২০১১ সালে আবার খেলায় ফিরে আসে। এছাড়া, আরো বেশ কিছু দেশ ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিসি'র সদস্য। টেস্টখেলুড়ে দেশগুলি ছাড়াও আইসিসি অনুমোদিত আরো দু’টি দেশ অর্থাৎ মোট ১২টি দেশ একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। খেলোয়াড় হিসেবে যিনি ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণ করেন বা খেলে থাকেন, তিনি ক্রিকেটার নামে পরিচিত।

ক্রিকেট খেলা ঘাসযুক্ত মাঠে (সাধারণত ওভাল বা ডিম্বাকৃতির) খেলা হয়, যার মাঝে ২২ গজের ঘাসবিহীন অংশ থাকে, তাকে পিচ বলে। পিচের দুই প্রান্তে কাঠের তিনটি করে লম্বা লাঠি বা স্ট্যাম্প থাকে। ঐ তিনটি স্ট্যাম্পের উপরে বা মাথায় দুইটি ছোট কাঠের টুকরা বা বেইল থাকে। স্ট্যাম্প ও বেইল সহযোগে এই কাঠের কাঠামোকে উইকেট বলে।

ক্রিকেটে অংশগ্রহণকারী দু’টি দলের একটি ব্যাটিং ও অপরটি ফিল্ডিং করে থাকে। ব্যাটিং দলের পক্ষ থেকে মাঠে থাকে দুইজন ব্যাটসম্যান। তবে কোন কারণে ব্যাটসম্যান দৌড়াতে অসমর্থ হলে ব্যাটিং দলের একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় মাঠে নামতে পারে। তিনি রানার নামে পরিচিত। ফিল্ডিং দলের এগারজন খেলোয়াড়ই মাঠে উপস্থিত থাকে। ফিল্ডিং দলের একজন খেলোয়াড় (বোলার) একটি হাতের মুঠো আকারের গোলাকার শক্ত চামড়ায় মোড়ানো কাঠের বা কর্কের বল বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের (ব্যাটসম্যান) উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করে। সাধারণত নিক্ষেপকৃত বল মাটিতে একবার পড়ে লাফিয়ে সুইং করে বা সোজাভাবে ব্যাটসম্যানের কাছে যায়। ব্যাটসম্যান একটি কাঠের ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে ডেলিভারীকৃত বলের মোকাবেলা করে, যাকে বলে ব্যাটিং করা। যদি ব্যাটসম্যান না আউট হয় দুই ব্যাটসম্যান দুই উইকেটের মাঝে দৌড়িয়ে ব্যাটিং করার জন্য প্রান্ত বদল করে রান করতে পারে। বল নিক্ষেপকারী খেলোয়াড়বাদে অন্য দশজন খেলোয়াড় ফিল্ডার নামে পরিচিত। এদের মধ্যে দস্তানা বা গ্লাভস হাতে উইকেটের পিছনে যিনি অবস্থান করেন, তাকে বলা হয় উইকেটরক্ষক। যে দল বেশি রান করতে পারে সে দল জয়ী হয়।

একদিনের ক্রিকেটে জয়লাভ দু'ধরনের হয়:-
(ক) রানের ব্যবধানে এবং (খ) উইকেটের ব্যবধানে।

রানের ব্যবধানে জয়লাভের উদাহরণ হচ্ছে - 

উইকেটের ব্যবধানে জয়লাভের উদাহরণ হচ্ছে - 

কয়েকশ’ বছর ধরে ক্রিকেট একটি দলীয় খেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটির আধুনিক রূপের সূত্রপাত হয় ইংল্যান্ডে এবং কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যেই এই খেলা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও  শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেটই অধিক জনপ্রিয় খেলা। বিভিন্ন অঞ্চল যেমনঃ ইংল্যান্ড ও ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, বারমুডা এবং ক্যারিবিয়ানের ইংরেজিভাষী দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহে ক্রিকেট একটি প্রধান খেলা। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো একত্রে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে বিশ্বে ক্রিকেট খেলে থাকে। নেদারল্যান্ড, কেনিয়া, নেপাল ও আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন অ-পেশাদার ক্রিকেট ক্লাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া একশর বেশি ক্রিকেট-খেলুড়ে দেশ রয়েছে যারা বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসি'র সদস্য।
 
ক্রিকেটে বিভিন্ন সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হচ্ছে ব্যাসিল ডি’অলিভিয়েরা কেলেঙ্কারি যার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিশ্ব ক্রিকেট থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের বডিলাইন সিরিজ এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে আন্ডারআর্ম বোলিংয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

ব্যাটিং দলের  উদ্দেশ্য হচ্ছে যত বেশি ও যত দ্রুত পারা যায় রান করা। রান হয় যখন উভয় ব্যাটসম্যান উইকেটে নিজেদের মধ্যে প্রান্ত পরিবর্তন করেন। (সাধারণত ব্যাটসম্যান বল মোকাবেলার পরই রান নিতে চেষ্টা করেন, তবে এটি জরুরি নয়।) এছাড়া ব্যাটসম্যান যদি বলকে মাঠের সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারেন তখনও রান হয়। যদি মাঠ স্পর্শ না করে বল সীমানার বাইরে চলে যায় তবে ছয় রান এবং মাঠ স্পর্শ করে সীমানা পার হলে চার রান দেয়া হয়। এছাড়া বোলার নিয়ম মোতাবেক বল না করলেও রান দেয়া হয়।

বোলিং দলের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাটিং দলের সব ব্যাটসম্যানদের আউট (উইকেট, অথবা ডিসমিসাল নামেও পরিচিত) করে দেয়া। ব্যাটসম্যান বিভিন্নভাবে আউট হতে পারে। সবচেয়ে ভাল পথ হচ্ছে বোলারের এমনভাবে বল নিক্ষেপ করা যাতে ব্যাটসম্যান বলকে ঠিকমত খেলতে পারে না এবং বল স্ট্যাম্পে আঘাত করে বেইল ফেলে দেয়। এ ধরনের আউটকে বোল্ড বলে। ব্যাটসম্যানেরা যখন দৌড়ে রান নেয় তখন ফিল্ডাররা বল নিক্ষেপ করে ব্যাটসম্যান কর্তৃক ঠিকমত ক্রিজে পোঁছার আগেই স্ট্যাম্প থেকে বেইল ফেলে দেয়ার চেষ্টা করে। এটি রান আউট নামে পরিচিত। অন্যান্য আউট করার পদ্ধতির মধ্যে আছে ব্যাটসম্যানের মোকাবেলাকৃত বল মাটিতে পরার আগেই ক্যাচ ধরা যা কট আউট নামে পরিচিত এবং ব্যাটসম্যানের পায়ে বল লাগানোর ফলে এল.বি.ডব্লিউ. বা লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে ফেলে আউট করা হয়। কোন বল মোকাবেলা ও রান নেয়ার পর ব্যাটসম্যান যখন আর কোন রান করার চেষ্টা করেন না তখন বলকে মৃত (dead) ঘোষণা করা হয় এবং এর পরিবর্তে আরেকটি বল নিক্ষেপ করা হয়।

খেলাটি ছয়টি (বৈধ) বলের ওভারে খেলা হয়। বিভিন্ন ধরনের খেলায় ওভারসংখ্যার বিভিন্নতা রয়েছে। ওভার শেষে ব্যাটিং ও বোলিং করা দল প্রান্ত বদল করে এবং ফিল্ডিং দলকে বোলার পরিবর্তন করতে হয়। এসময় আম্পায়ারদ্বয় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন।

একজন ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলে তার স্থানে আরেকজন ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামে। যখন ব্যাটিং দলের দশম ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যায় তখন সে দলের ইনিংস শেষ হয়। দশ জন ব্যাটসম্যান আউট হওয়াকে বলে অল আউট। (সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ইনিংস শেষ হয় যদি কোন দল অলআউট হয় অথবা দল পূর্বনির্ধারিত সংখ্যক ওভার খেলে ফেলে।) ইনিংস শেষে ব্যাটিং করা দল ফিল্ডিং এবং ফিল্ডিং করা দল ব্যাটিং করতে নামে।

সাধারণত যে দল বেশি রান করে সে দল বিজয়ী হয়। তবে বিভিন্ন অবস্থায় জয়ের সংজ্ঞা বিভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় বৃষ্টির কারণে সীমিত ওভারের খেলার ওভার সংখ্যা কমিয়ে আনা হতে পারে, অথবা ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি অবলম্বন করে বিজয়ী নির্ধারন করা হতে পারে।

যদি শেষে ব্যাট করা দলের বিপক্ষ দলের করা রানের চেয়ে কম রান করে সবাই আউট হয়ে যায় তবে সে দল (n) রানে হেরেছে বলা হয় (যেখানে (n) দুই দলের রানের পার্থক্য নির্দেশ করে)। যদি শেষে ব্যাট করা দল সবাই আউট হওয়ার আগেই বিপক্ষ দলের করা রানের চেয়ে বেশি রান করে তখন সে দল (n) উইকেটে জিতেছে বলা হয় (যেখানে (n) ১০ ও জয়ী দলের কতটি উইকেট পড়েছে তার পার্থক্য নির্দেশ করে)।

যেসব খেলায় প্রতি দলের দু'টি ইনিংস থাকে তাদের ক্ষেত্রে যদি কোন দল প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংস মিলিয়ে বিপক্ষ দলের প্রথম ইনিংসের সমান রান করতে না পারে তবে এবং ২য় ইনিংসে সবাই আউট হয়ে যায় তবে বিপক্ষ দলকে আর ব্যাট করতে হয় না ও তারা ইনিংস ও (n) রানে জিতেছে বলা হয় (যেখানে (n) দুই দলের রানের পার্থক্য নির্দেশ করে)।

যদি সব ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পর দুই দলের রান সমান হয় তাহলে টাই হয়। প্রতি দলে দুই ইনিংসের খেলাতে টাই প্রায় দেখাই যায় না। গতানুগতিক খেলাতে যদি বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কোন দল জিততে না পারে তবে খেলাটিকে ড্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

যেসব খেলায় একটি দল কেবল একটি ইনিংস খেলে সেসব খেলাতে সাধারণত নির্দিষ্ট সংখ্যক ওভারের বাধ্যবাধকতা দেয়া থাকে। এগুলো সীমিত ওভারের অথবা একদিনের খেলা হিসেবে পরিচিত। এতে যে দল বেশি রান করে তারাই জিতে এবং এই খেলার ফলাফলে উইকেটের কোন মূল্য নেই বলে এসব খেলায় ড্র হয় না। যদি আবহাওয়ার কারণে এই খেলায় সাময়িক বিঘ্ণ ঘটে তাহলে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি নামে একটি সূত্রের মাধ্যমে খেলার জেতার লক্ষ্যমাত্রা পুনঃনির্ধারিত হয়। একদিনের খেলার ফলাফল অমীমাংসিত হতে পারে যদি কোন দলই একটি সর্বনিম্ন সংখ্যক ওভার খেলতে না পারে। আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণেই সাধারণত এ ঘটনা ঘটে।

ক্রিকেট খেলায় ৪২টি ক্রিকেট আইন আছে, যা বিভিন্ন প্রধান ক্রিকেট-খেলুড়ে দেশের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণয়ন করেছে মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব। কোন বিশেষ খেলাতে দলগুলো সর্বসম্মতিক্রমে কোন আইন পরিবর্তন বা লঙ্ঘন করতে পারে। অন্যান্য আইনগুলো প্রধান আইনের সম্পূরক এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলাতে ব্যবহৃত হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত ওভারের খেলায় পুরনো আদল থেকে বেরিয়ে ক্রিকেটকে আরো আকর্ষনীয় করতে ফিল্ডিং দলের ওপর কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হচ্ছে।

 
একটি দল এগারজন খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত হয়। খেলার দক্ষতার উপর নির্ভর করে এদেরকে বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান অথবা বোলার হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়। যে-কোন ভারসাম্যপূর্ণ দলে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় জন বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান এবং চার থেকে পাঁচ জন বিশেষজ্ঞ বোলার থাকে। প্রতি দলেই একজন বিশেষজ্ঞ উইকেট রক্ষক থাকে। সাম্প্রতিককালে বিশেষজ্ঞ ফিল্ডারের ধারণা চালু হয়েছে এবং সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতি দলে একজন অধিনায়ক থাকেন যিনি মাঠে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।

যে খেলোয়াড় বোলিং এবং ব্যাটিং উভয় ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শী তিনি অল-রাউন্ডার হিসেবে পরিচিত। যিনি ব্যাটসম্যান ও উইকেটরক্ষণের কাজে পারদর্শী তিনি উইকেট-রক্ষক কাম ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত, যা কখনও কখনও বিশেষ ধরনের অল-রাউন্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়। সত্যিকারের অল-রাউন্ডার দলের মূল্যবান খেলোয়াড় তবে এদের দেখা কমই মেলে। অধিকাংশ খেলোয়াড়ই হয় ব্যাটিং, না হয় বোলিংয়েই বেশি মনোযোগ দেন।

প্রতি খেলায় মাঠে দুইজন আম্পায়ার থাকেন যারা খেলা পরিচালনা করেন। একজন আম্পায়ার (ফিল্ড আম্পায়ার) বোলার যে প্রান্ত থেকে বল করেন সেই প্রান্তে উইকেটের পিছনে অবস্থান করেন। মাঠে তিনিই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অন্য আম্পায়ার (স্কয়ার লেগ আম্পায়ার) মাঠে স্কয়ার লেগ অবস্থানে থাকেন, যাতে তিনি ব্যাটসম্যানকে পাশ থেকে দেখতে পারেন এবং তিনি যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফিল্ড আম্পায়ারকে সাহায্য করেন। পেশাদার খেলায় মাঠের বাইরে একজন অতিরিক্ত আম্পায়ার থাকেন যিনি তৃতীয় আম্পায়ার বা থার্ড আম্পায়ার নামে পরিচিত। মাঠের আম্পায়ারেরা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনবোধে তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য নিতে পারেন যিনি টেলিভিশনে পুণঃপ্রচার দেখে সিদ্ধান্ত নেন। আন্তর্জাতিক খেলাগুলোতে মাঠের বাইরে একজন ম্যাচ রেফারি থাকেন, যিনি খেলাটি ক্রিকেটের আইনানুযায়ী হচ্ছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করেন।

সাধারণত প্রতিটি দল একজন করে দুইজন স্কোরার নিয়োগ করে থাকে। ক্রিকেটের আইন অনুসারে অফিসিয়াল স্কোরার কত রান হয়েছে, কত উইকেট পড়েছে, এবং কত ওভার খেলা হয়েছে তা লিপিবদ্ধ করে রাখে। তারা আম্পায়ারের সংকেত দেখে এবং খেলার বিরতিতে আম্পায়ারের সাথে স্কোর মিলিয়ে দেখে তা ঠিক আছে কিনা। বাস্তবে স্কোরাররা আরো অনেক ব্যাপার লিপিবদ্ধ করে, যেমনঃ বোলারের বোলিং পরিসংখ্যান, কোন দল কি হারে বোলিং করেছে এবং দলগুলোর বিভিন্ন গড় ও পরিসংখ্যান ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় গণমাধ্যমকে বিভিন্ন রেকর্ড ও পরিসংখ্যান জানতে হয়, তাই ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক ও সম্প্রচারের জন্য বিভিন্ন সময়ে আনঅফিসিয়াল স্কোরার রাখা হয়। অফিসিয়াল স্কোরাররা মাঝে মাঝে ভুল করে, তবে আম্পায়ারের ভুলের সাথে এটির তফাৎ হলো ঘটনার পর এটিকে সংশোধন করা যায়। 

ক্রিকেট মাঠ একটি বিশাল বিশাল বৃত্তাকার অথবা ডিম্বাকার ঘাসবহুল জমিনের উপর নির্মিত হয়। যদিও মাঠের আকারের বেলায় সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই তবে এটির ব্যাস সাধারণত ৪৫০ ফুট (১৩৭ মি) থেকে ৫০০ ফুট (১৫০ মি) এর মধ্যে হয়ে থাকে। অধিকাংশ মাঠেই দড়ি দিয়ে মাঠের পরিসীমা ঘেরা দেয়া থাকে যা সীমানা নামে পরিচিত। 

ক্রিকেট খেলার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে থাকে মাঠের মাঝে যা সাধারণত ছোট করে ছাটা ঘাস অথবা ঘাসবিহীন চতুর্ভুজাকৃতির অংশ। এটিকে পিচ বলা হয়। পিচের পরিমাপ হচ্ছে ১০ × ৬৬ ফুট (৩.০৫ × ২০.১২ মি)।

পিচের দুইপ্রান্তে তিনটি করে খাড়া কাঠের দন্ড মাটিতে গাঁথা থাকে, যা স্টাম্প নামে পরিচিত। স্টাম্পের উপরে দুটি কাঠের টুকরা থাকে যা বেইল নামে পরিচিত।, তিনটি স্ট্যাম্পের উপর দুটি বেইল স্ট্যাম্পগুলোকে সংযুক্ত করে। ক্রিকেটে স্ট্যাম্পে লেগে আউট হওয়ার ক্ষেত্রে যেকোন একটি বেইল ফেলা বাধ্যতামূলক। তিনটি স্ট্যাম্প ও দুটি বেইলের সমষ্টিগত সেট নামে উইকেট নামে পরিচিত। পিচের একপ্রান্তের নাম ব্যাটিং প্রান্ত, যে প্রান্তে ব্যাটসম্যান দাঁড়ায় এবং অপর প্রান্তের নাম বোলিং প্রান্ত যেখান থেকে বোলার দৌড়ে এসে বল করে। দুটি উইকেটের সংযোগকারী রেখার মাধ্যমে মাঠটি দুটি অংশে বিভক্ত হয়; তার মধ্যে যেদিকে ব্যাটসম্যান ব্যাট ধরেন সেদিকটিকে অফ সাইড এবং যে দিকে ব্যাটসম্যানের পা থাকে সেদিকটিকে বলে অন সাইড। অন্যভাবে বলা যায় ডান-হাতি ব্যাটসম্যানের ডান দিক এবং বাম-হাতি ব্যাটসম্যানের বাম দিক হচ্ছে অফ সাইড এবং অন্যটি অন সাইড বা লেগ সাইড।

পিচে যে রেখা আঁকা থাকে তাকে বলে ক্রিজ। ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন কিনা তা যাচাই করার জন্য ক্রিজ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বোলার বৈধ বল করেছেন কি না তা যাচাইয়ের জন্যও ক্রিজ ব্যবহৃত হয়। 

খেলার শুরুতে মুদ্রার নিক্ষেপের মাধ্যমে কোন দল আগে ব্যাটিং করবে এবং কোন দল বোলিং করবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। একে টস বলে।

প্রতি ৬ বৈধ বলে একটি ওভারের সফল সমাপ্তি ঘটে। ছয়টি বল করার পর আম্পায়ার ‘ওভার’ বলে থাকেন; তাই ওভার নামকরণ করা হয়েছে। পিচের একপ্রান্তে অবস্থান নিয়ে বোলার বোলিং করেন। ওভার শেষে উইকেটের অপর প্রান্ত থেকে অন্য আরেকজন বোলার বল করার জন্য প্রস্তুত থাকেন। এরফলে ফিল্ডিংয়ের অবস্থান পরিবর্তনসহ স্কয়ার লেগে অবস্থানকারী আম্পায়ারও পরিবর্তন হয়ে উইকেটের পিছনে অবস্থান করেন। তবে, ব্যাটসম্যান তার নিজ অবস্থানে থেকেই বোলারকে মোকাবেলা করে থাকেন। তখন ব্যাটসম্যান ‘স্ট্রাইকার’ ও পিচের অন্য প্রান্তে অবস্থানকারী ব্যাটসম্যান ‘নন-স্ট্রাইকার’ নামে পরিচিত। কোনো বোলার পরপর ২ ওভার বোলিং করতে পারেন না। কিন্তু একপ্রান্তে থেকে তিনি অসংখ্য ওভার করতে সক্ষম। ৫০-ওভারের একদিনের আন্তর্জাতিকে একজন বোলার সর্বোচ্চ ২০% বা ১০ ওভার এবং ২০-ওভারের টুয়েন্টি২০ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ২০% বা ৪ ওভার করতে পারে। তবে, টেস্ট ক্রিকেটে ওভার সংখ্যা অসীম থাকায় ওভার সংখ্যার কোন সীমারেখা নেই।

১৯৯১ সালে প্রথম এ নিয়ম চালু করা হয় তবে সাম্প্রতিক সময় এ নিয়মের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এটি শুধুমাত্র একদিনের ম্যাচে প্রযোজ্য। প্রথম ১০ ওভারের পাওয়ার প্লেতে সর্বোচ্চ দুজন ফিল্ডার ৩০গজ বৃত্তের বাইরে থাকতে পারে। এরপর ১৬ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যে যেকোনো সময় ব্যাটিং দল ৫ ওভার এবং বোলিং দল ৫ ওভার পাওয়ার প্লে বেছে নিতে পারে,এ সময় সর্বোচ্চ ৩ জন ৩০ গজের বাইরে থাকতে পারে।

যদি কোন ব্যাটসম্যান ব্যাট করার জন্য সক্ষম কিন্তু দৌড়াতে অসমর্থ হয় তবে আম্পায়ার ও ফিল্ডিং দলের অধিনায়ক ব্যাটিং দলের আরেক খেলোয়াড়কে অসমর্থ খেলোয়াড়ের রানার হিসেবে মাঠে নামার অনুমতি দেন। সম্ভব হলে রানারকে অবশ্যই আগে ব্যাট করে আউট হয়েছে এমন হতে হয়। রানারের একমাত্র কাজ উইকেটের মাঝে দুর্বল খেলোয়াড়ের বদলে দৌড়ানো। রানারকে অবশ্যই যে ব্যাটসম্যানের হয়ে মাঠে নেমেছে, সেই ব্যাটসম্যানের ব্যবহৃত সকল উপকরন ধারণ করতে হয়।  ২০১১ সালের জুনে, আইসিসির এক ঘোষণার ফলে ১ অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রানার প্রথাটি বাতিল হয়ে যায়। 

টেষ্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক নিয়মে (২০১৯) আইসিসি অনুমোদন করেছে কোনো খেলোয়াড়ের  মাথায় আঘাত লাগলে তার বদলে আরেকজন পূর্ণ খেলোয়াড় নামতে পারে।কিন্তু কোনো খেলোয়াড় বিশ্রামের জন্য মাঠ থেকে উঠে বদলি খেলোয়াড় নামলে সে শুধু ফিল্ডিং করতে পারে।

এর তেমন কোনো ইতিহাস জানা যায়নি।তবে প্রথম ইংল্যান্ডে এ খেলা হয় বলে জানা যায়।

বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলা হয়; আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাদার ক্রিকেটের মধ্যে টেস্ট, ওডিআই ও টি২০আই উল্লেখযোগ্য।

টেস্ট ক্রিকেট সাধারণত ৫ দিনে হয়। প্রতি দল দু’টি করে ইনিংস খেলে। এ খেলায় ৪ রকমভাবে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়।

একদিনের আন্তর্জাতিকে দুই দল ৫০ ওভার করে ব্যাটিং করে থাকে। এ খেলাগুলোয় সাদা রঙের বল ব্যবহার করা হয়।

টুয়েন্টি২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার নবীনতম সংস্করণ। এখানে প্রতিটি দল ২০ ওভার করে ব্যাটিং করে।




#Article 10: বাংলা সাহিত্য (4413 words)


বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্য নামে পরিচিত। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোহা-সংকলন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরও তিনটি গ্রন্থের সঙ্গে চর্যাগানগুলি নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থের নাম দেন  হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা । মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্যপ্রধান। হিন্দুধর্ম, ইসলাম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই সময়কার বাংলা সাহিত্য। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্তপদাবলি, বৈষ্ণব সন্তজীবনী, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ, পীরসাহিত্য, নাথসাহিত্য, বাউল পদাবলি এবং ইসলামি ধর্মসাহিত্য ছিল এই সাহিত্যের মূল বিষয়। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয় খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের যুগে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এই সময় থেকে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বদলে মানুষ, মানবতাবাদ ও মানব-মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বাংলা সাহিত্যও দুটি ধারায় বিভক্ত হয়: কলকাতা-কেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ও ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাহিত্য। বর্তমানে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের একটি অন্যতম, সমৃদ্ধ সাহিত্যধারা হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।

বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস প্রধানত তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত: 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো নির্দিষ্ট সালতারিখ অনুযায়ী সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাজন করা সম্ভব নয়। যদিও সাহিত্যের ইতিহাস সর্বত্র সালতারিখের হিসেব অগ্রাহ্য করে না। সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে নির্দিষ্ট যুগের চিহ্ন ও সাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটি বিশ্লেষণ করেই সাহিত্যের ইতিহাসে যুগবিভাগ করা হয়ে থাকে।

বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের পূর্বে বাংলায় সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্‌ঠ ভাষায় সাহিত্য রচনার রীতি প্রচলিত ছিল। এই সাহিত্যের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের আদি অধ্যায়ের সূচনা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি আক্রমণের বহু পূর্বেই বাঙালিরা একটি বিশেষ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উন্মেষ ঘটে বাংলা ভাষারও। তবে প্রথম দিকে বাংলায় আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও অনার্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেনি। সংস্কৃত ভাষায় লেখা অভিনন্দ ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতি ধরের কাব্যকবিতা, জয়দেবের গীতগোবিন্দম্, কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় ও সদুক্তিকর্ণামৃত নামক দুটি সংস্কৃত শ্লোকসংগ্রহ; এবং অবহট্‌ঠ ভাষায় রচিত কবিতা সংকলন প্রাকৃত-পৈঙ্গল বাঙালির সাহিত্য রচনার আদি নিদর্শন। এই সকল গ্রন্থ বাংলা ভাষায় রচিত না হলেও সমকালীন বাঙালি সমাজ ও মননের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালের বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে গীতগোবিন্দম্ কাব্যের প্রভাব অনস্বীকার্য।

বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যা পদাবলি ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যমূল্যের বিচারে কয়েকটি পদ কালজয়ী।

মধ্যযুগ ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। আনুমানিক চৌদ্দ শতকের শেষার্ধে বা পনেরো শতকের প্রথমার্ধে বড়ু চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি অবলম্বনে এ কাব্য রচনা করেন। এ সময় মৈথিলি কবি বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক পদ রচনা করেছিলেন। মধ্যযুগের প্রথম মুসলমান কবি শাহ মুহম্মদ সগীর পঞ্চদশ শতকে প্রণয়োপখ্যান জাতীয় কাব্য “ইউসুফ-জোলেখা” রচনা করেন। এর বাইরে অনুবাদসাহিত্য মধ্যযুগের অনেকখানি অংশজুড়ে আছে। এ ধারার সূত্রপাত হয় কবি কৃত্তিবাস কর্তৃক রামায়ণের বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বাংলায় আরও অনূদিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। মধ্যযুগের বিশাল পরিসর জুড়ে ছিলো মঙ্গলকাব্য। দেবদেবীর মাহাত্ম্যসূচক এই কাব্যধারার সূত্রপাত হয় পনের শতকে। তবে ষোল শতকে এর সর্বাধিক প্রসার ঘটে। ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, শিবমঙ্গল বা শিবায়ন, চণ্ডীমঙ্গল ইত্যাদি এ পর্যায়েরই নানা শাখা। এই ধারার অন্যতম কবি মাণিক দত্ত, কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখ। শ্রীচৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) আবির্ভাবের ফলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সমৃদ্ধির পথে অনেকখানি এগিয়ে যায়। মধ্যযুগেই আরাকানের রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা আরম্ভ হয়। এছাড়া শাক্ত পদাবলী, নাথসাহিত্য, বাউল ও অপরাপর লোকসঙ্গীত, ময়মনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ-গীতিকা  ইত্যাদি অমূল্য সাহিত্য মধ্যযুগেরই সৃষ্টি।

বাংলা সাহিত্যের ১২০১-১৩৫০ খ্রি. পর্যন্ত সময়কে “অন্ধকার যুগ” বা “বন্ধ্যা যুগ” বলে কেউ কেউ মনে করেন। হুমায়ুন আজাদ তার “লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী” গ্রন্থে (পৃ. ১৭) লিখেছেন- “১২০১ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত কোন সাহিত্য কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়না বলে এ-সময়টাকে বলা হয় ‘অন্ধকার যুগ’। পণ্ডিতেরা এ-সময়টাকে নিয়ে অনেক ভেবেছেন, অনেক আলোচনা করেছেন, কিন্তু কেউ অন্ধকার সরিয়ে ফেলতে পারেন নি।এ- সময়টির দিকে তাকালে তাই চোখে কোন আলো আসেনা, কেবল আঁধার ঢাকা চারদিক।”
কিন্তু, ওয়াকিল আহমদ তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের পুরাবৃত্ত’ (পৃ. ১০৫)-এ লিখেছেন- “বাংলা সাতিহ্যের কথিত ‘অন্ধকার যুগ’ মোটেই সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের যুগ ছিল না। ধর্ম -শিক্ষা শিল্প চর্চার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত ছিল, তারা সীমিত আকারে হলেও শিক্ষা সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে, কি হিন্দু কি মুসলমান কেউ লোকভাষা বাংলাকে গ্রহণ করেননি। বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন না থাকার এটাই মুখ্য কারণ।”

এসময়ের সাহিত্য নিদর্শন:
১. প্রাকৃত ভাষার গীতি কবিতার সংকলিত গ্রন্থ ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’
২. রামাই পন্ডিত রচিত ‘শূন্যপুরাণ’ (গদ্যপদ্য মিশ্রিত)
৩. হলায়ুধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়া’ (গদ্যপদ্য মিশ্রিত)
৪. ডাক ও খনার বচন

মূলত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগ নিয়ে মত পার্থক্য থাকলেও,মোটামুটি ভাবে ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে ভারত চন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকেই  বাংলা সাহিত্যের আধুনিক  যুগের সূত্রপাত বলে নানা সমালোচক   মতপ্রকাশ করেছেন। কালের দিক থেকে আধুনিক যুগকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়-
১৭৬০-১৭৯৯খ্রিঃ(আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব)
১৮০০-১৮৫৮খ্রিঃ(আধুনিক যুগের দ্বিতীয়  পর্ব)
১৮৫৯-১৯০০খ্রিঃ(আধুনিক যুগের তৃতীয়  পর্ব)
১৯০১-১৯৪৭খ্রিঃ(আধুনিক যুগের চতুর্থ  পর্ব)
১৯৪৮-২০০০খ্রিঃ(আধুনিক যুগের পঞ্চম পর্ব)
২০০১খ্রিঃ- বর্তমানকাল(আধুনিক যুগের ষষ্ঠ পর্ব)

চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন। নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতম রচনা এটি। খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ়ার্থ সাংকেতিক রূপবন্ধে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই তারা পদগুলি রচনা করেছিলেন। বাংলা সাধন সংগীতের শাখাটির সূত্রপাতও এই চর্যাপদ থেকেই। এই বিবেচনায় এটি ধর্মগ্রন্থ স্থানীয় রচনা। একই সঙ্গে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্রাবলি এই পদগুলিতে উজ্জ্বল। এর সাহিত্যগুণ আজও চিত্তাকর্ষক। ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে চর্যার একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চর্যাপদের সঙ্গে বাংলা ভাষার অনস্বীকার্য যোগসূত্র বৈজ্ঞানিক যুক্তিসহ প্রতিষ্ঠিত করেন। চর্যার প্রধান কবিগণ হলেন লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ প্রমুখ।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বড়ুচণ্ডীদাস নামক জনৈক মধ্যযুগীয় কবি রচিত রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কথা বিষয়ক একটি আখ্যানকাব্য।  ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে এই কাব্যের একটি পুথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে তারই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে পুথিটি প্রকাশিত হয়। যদিও কারও কারও মতে মূল গ্রন্থটির নাম ছিল শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। কৃষ্ণের জন্ম, বৃন্দাবনে রাধার সঙ্গে তার প্রণয় এবং অন্তে বৃন্দাবন ও রাধা উভয়কে ত্যাগ করে কৃষ্ণের চিরতরে মথুরায় অভিপ্রয়াণ – এই হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল উপজীব্য। আখ্যানভাগ মোট ১৩ টি খণ্ডে বিভক্ত। পুথিটি খণ্ডিত বলে কাব্যরচনার তারিখ জানা যায় না। তবে কাব্যটি আখ্যানধর্মী ও সংলাপের আকারে রচিত বলে প্রাচীন বাংলা নাটকের একটি আভাস মেলে এই কাব্যে। গ্রন্থটি স্থানে স্থানে আদিরসে জারিত ও গ্রাম্য অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট হলেও আখ্যানভাগের বর্ণনানৈপূণ্য ও চরিত্রচিত্রণে মুন্সিয়ানা আধুনিক পাঠকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন। বাংলা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে এর গুরুত্ব তাই অপরিসীম। অপরদিকে এটিই প্রথম বাংলায় রচিত কৃষ্ণকথা বিষয়ক কাব্য। মনে করা হয়, এই গ্রন্থের পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির পথ সুগম হয়।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে অনুবাদ সাহিত্যের চর্চা হয়েছিল এবং পরিণামে এ সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধনে অনুবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অপরিসীম।সকল সাহিত্যের পরিপুষ্টিসাধনে অনুবাদমূলক সাহিত্যকর্মের বিশিষ্ট ভূমিকা আছে।বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতীক্রম পরিলক্ষিত হয় না।সমৃদ্ধতর নানা ভাষা থেকে বিচিত্র নতুন ভাব ও তথ্য সঞ্চয় করে নিজ নিজ ভাষার বহন ও সহন ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলাই অনুবাদ সাহিত্যের প্রাথমিক প্রবণতা।ভাষার মান বাড়ানোর জন্য ভাষার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয়,আর তাতে সহায়তা করে অনুবাদকর্ম।উন্নত সাহিত্য থেকে ঋণ গ্রহণ করা কখনো অযৌক্তিক বিবেচিত হয়নি।উন্নত ও সমৃদ্ধ ভাষা-সাহিত্যের সান্নিধ্যে এলে বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিশব্দ তৈরি করা সম্ভব হয়,অন্য ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দও গ্রহণ করা যায়।অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বক্তব্য আয়ত্তে আসে।ভাষা ও সাহিত্যের যথার্থ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ ও সম্পদশালী ভাষায় উৎকর্ষপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টির অনুবাদ একটি আবশ্যিক উপাদান।

জ্ঞানবিজ্ঞানের বিষয়ের বেলায় শুদ্ধ অনুবাদ অভিপ্রেত।কিন্তু সাহিত্যের অনুবাদ শিল্পসম্মত হওয়া আবশ্যিক বলেই তা আক্ষরিক হলে চলে না।ভিন্ন ভাষার শব্দ সম্পদের পরিমাণ, প্রকাশক্ষমতা ও বাগভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন ভাষায় ব্যক্ত কথায় সংকোচন, প্রসারণ, বর্জন ও সংযোজন আবশ্যিক হয়।মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে অনুবাদের ধারাটি সমৃদ্ধি লাভ করে তাতে সৃজনশীল লেখকের প্রতিভা কাজ করেছিল।সে কারণে মধ্যযুগের এই অনুবাদকর্ম সাহিত্য হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে।

বুলিকে লেখ্য ভাষার তথা সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত করার সহজ উপায় হচ্ছে অনুবাদ।অন্যভাষা থেকে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞান-মননের বিভিন্ন বিসয় অনুবাদ করতে হলে সে বিষয়ক ভাব-চিন্তা-বস্তুর প্রতিশব্দ তৈরী করা অনেক সময় সহজ হয়,তৈরী সম্ভব না হলে মূল ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করতে হয়।এভাবেই সভ্য জাতির ভাষা-সাহিত্য মাত্রই গ্রহণে-সৃজনে ঋদ্ধ হয়েছে।এ ঋণে লজ্জা নেই।যে জ্ঞান বা অনুভব আমাদের দেশে পাঁচশ বছরেও লভ্য হত না,তা আমরা অনুবাদের মাধ্যমে এখনই পেতে পারি।যেমনঃ বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলো,শ্রেষ্ঠ দার্শনিক চিন্তাগুলো,বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো,সমাজতত্ত্বগুলো-মানবচিন্তার শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলো এভাবে আয়ত্তে আসে।

চৌদ্দ পনেরো শতকে আমাদের লেখ্য সাহিত্যও তেমনি সংস্কৃত-অবহটঠ থেকে ভাব-ভাষা-ছন্দ গ্রহণ করেছে,পুরাণাদি থেকে নিয়েছে বর্ণিত বিষয় ও বর্ণনাভঙ্গি এবং রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবত-প্রণয়োপাখ্যান-ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতি সংস্কৃত-ফারসী-আরবী-হিন্দি থেকে অনূদিত হয়েছে আমাদের ভাষায়।এভাবেই আমাদের লিখিত বা শিষ্ট বাংলা ভাষাসাহিত্যের বুনিয়াদ নির্মিত হয়েছিল।

আদর্শ অনুবাদকের একটা বিশেষ যোগ্যতা অপরিহার্য। ভাষান্তর করতে হলে উভয় ভাষার গতিপ্রকৃতি, বাকভঙ্গি ও বাকবিধির বিষয়ে অনুবাদকের বিশেষ ব্যুৎপত্তির দরকার।তাহলেই ভাষান্তর নিখুঁত ও শিল্পগুণান্বিত হয়।তাই ভাষাবিদ কবি ছাড়া অন্য কেউ কাব্যের সুষ্ঠু অনুবাদে সমর্থ হয় না।মধ্যযুগে অ-কবিও অনুবাদ কর্মে উৎসাহী ছিলেন।তাই অনুবাদে নানা ত্রুটি দেখা যায়।এছাড়া এঁরা নিজেদের সামর্থ্য রুচিবুদ্ধি ও প্রয়োজন অনুসারে মূল পাঠের গ্রহণ-বর্জন ও সংক্ষেপ করেছেন।এজন্য মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় কোন তথাকথিত অনুবাদই নির্ভরযোগ্য নয়।সবগুলোই কিছু কায়িক,কিছু ছায়িক,কিছু ভাবিক অনুবাদ এবং কিছু স্বাধীন রচনা।কাব্য সাহিত্যের অনুবাদ আক্ষরিক হতেই পারে না।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য একটি বিস্তৃত কালপর্ব জুড়ে বিন্যস্ত। প্রাকচৈতন্যযুগে বিদ্যাপতি,চণ্ডীদাস এবং চৈতন্য ও চৈতন্য পরবর্তী যুগে গোবিন্দদাস,জ্ঞানদাস বিশেষভাবে খ্যাতিমান হলেও আরও বহু কবি বৈষ্ণব ধর্মাশ্রিত পদ লিখেছেন। তবে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে পদাবলি চর্চার এই ইতিহাস চৈতন্যের ধর্মান্দোলনের পরই ছড়িয়েছিল। বৈষ্ণব পদাবলির মূল বিষয়বস্তু হল কৃষ্ণের লীলা এবং মূলত মাধুর্যলীলা। অবশ্য এমন নয় যে কৃষ্ণের ঐতিহ্যলীলার চিত্রণ হয়নি। তবে সংখ্যাধিক্যের হিসেবে কম। আসলে বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা স্তরে স্তরে এমন গভীর ও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে যে অনেকের ধারণা বাংলা সাহিত্যে এ আসলে একটি রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের নমুনা। বস্তুত পৃথিবীর অন্যান্য মধ্যযুগীয় সাহিত্যের মতনই এও বিশেষভাবে ধর্মাশ্রিত ও বৈষ্ণব ধর্মের তত্ত্ববিশ্বের উপরে প্রতিষ্ঠিত। তবে যে কোন ধর্মের মতনই বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বেরও আনেকগুলি ঘরানা ছিল। এর মধ্যে তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল বৃন্দাবনের বৈষ্ণবগোষ্ঠী। এদের ধর্মীয় দর্শনের প্রভাব পড়েছে চৈতন্যপরবর্তী পদকর্তাদের রচনায়। প্রাকচেতন্যযুগের পদাবলিকারদের রচনায় তন্ত্র  বা নানা সহজিয়া সাধনপন্থার প্রভাব রয়েছে।
ভারতীয় সাধনপন্থা মূলত দ্বিপথগামী- স্মার্ত ও তান্ত্রিকী। শশীভূষণ দাশগুপ্ত এই দুই পথকেই বলেছেন উল্টাসাধন  তন্ত্রও হল এই উল্টাসাধনই। দেহভান্ডই হল ব্রহ্মান্ড এই বিশ্বাস সহজিয়া ও তান্ত্রিক পন্থীদের। সেই কারণে চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতির সঙ্গে জ্ঞানদাস বা গোবিন্দদাসদের মূলগত প্রভেদ রয়েছে।
বৃন্দাবনের বৈষ্ণবগোষ্ঠী যে তত্ত্ববিশ্ব নির্মাণ করলেন তাতে কৃষ্ণলীলার মূল উৎস ভাগবত ও আন্যান্য পুরাণ হলেও,আসলে কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা, সর্বোপরি রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা প্রাধান্য পেল। কেননা এঁদের মতে কৃষ্ণের দুই রূপ। প্রথমটি ঐশ্বর্যস্বরূপ ঈশ্বর, যিনি সর্বশক্তিমান। কৃষ্ণের ঘনিষ্ঠ প্রতিটি লোক সে তার মাতা-পিতা বা, স্ত্রী বা সখা যেই হোক না কেন- কৃষ্ণকে তারা ভগবান বলে জানেন, সেভাবেই তাকে দেখেন। দ্বিতীয়টি হল মাধুর্যস্বরূপ কৃষ্ণ। এইরূপে কৃষ্ণের লীলার যে বিচিত্র প্রকাশ অর্থাৎ প্রভুরূপে,পুত্ররূপে,সখারূপে, প্রেমিকরূপে সর্বোপরি রাধামাধবরূপে তাতে কোথাও কৃষ্ণের মনে বা কৃষ্ণলীলাসহকারদের মনে কৃষ্ণের ঐশ্বর্যমূর্তির জাগরণ ঘটেনা। ঐশ্বর্যমূর্তি নেই বলে কৃষ্ণভক্তি এখানে শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হয়ে শুদ্ধতম হয়েছে। তাই এই মতাবলম্বী বৈষ্ণব কবিসাধকরা কেউ প্রভু, কেউ পুত্র, কেউ সখা, আর কেউবা প্রেমিকরূপে কৃষ্ণকে প্রার্থনা করেছেন। শেষোক্ত কবিসাধকের সংখ্যাই বেশি।

বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীর অন্যতম রূপ গোস্বামী উজ্জ্বলনীলমণি-তে কৃষ্ণভক্তিকেই একমাত্র রসপরিনতি বলা হয়েছে। এর স্হায়ীভাব হল দুপ্রকারের-

আবার এই দুটি প্রকারও আবার চারটি করে উপবিভাগে বিন্যস্ত।

বিপ্রলম্ভ 

সম্ভোগ

বৈষ্ণব পদাবলিতে কৃষ্ণের লীলাবিলাস এই বিষয়পর্যায়ে বিন্যস্ত। অবশ্য,উপরোক্ত চারটি ছাড়াও বিপ্রলম্ভকে আরও সূক্ষাতিসূক্ষভাগে ভাগ করা হয়েছে নানাসময়। যেমন- অনুরাগ, আক্ষেপানুরাগ কিংবা, বিপ্রলব্ধা, খন্ডিতা বা, বাসরসজ্জিতা অথবা অভিসার।
পুরাণ ছাড়া সাহিত্যে বা কাব্যে বাংলা বৈষ্ণব পদাবলির উৎস হল- সংস্কৃত পদসংকলন গ্রন্থগুলি। যথা, গাথা সপ্তশতী,....... তাছাড়া জয়দেবের গীতগোবিন্দের কথা তো এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়।
বিদ্যাপতি মূলত মৈথিলি ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেছেন। তবে অনেকে এই পদাবলিগুলির ভাষার বিশেষ মাধুর্যের জন্য একে ব্রজবুলি ভাষা বলে কল্পনা করতে চেয়েছেন। প্রাচীন এই মতটিকে পরবর্তীকালের আধুনিক সমালোচক শংকরীপ্রসাদ বসু স্বীকার করে নিয়েছেন এবং বিদ্যাপতিকে একটি সাহিত্যিক ভাষার মহান সর্জক বলে মনে করেছেন। সে যাই হোক ভাষাগত এই প্রভাব যে পরবর্তীকালের কবিদেরও বিরাট প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ গোবিন্দদাস। জ্ঞানদাসের কিছু কিছু পদও এই তথাকথিত ব্রজবুলি ভাষাতেই রচিত। মধ্যযুগের বহু কবি এই ভাষাতেই পদরচনা করেছেন। এমনকি আধুনিক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যখন ' ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ' লেখেন তখন তিনি লেখেন ব্রজবুলি ভাষাতেই।
বৈষ্ণব পদাবালি সাহিত্যে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস ছাড়াও যশোরাজ খান, চাঁদকাজী, রামচন্দ বসু, বলরাম দাস, নরহরি দাস, বৃন্দাবন দাস, বংশীবদন, বাসুদেব, অনন্ত দাস, লোচন দাস, শেখ কবির, সৈয়দ সুলতান, হরহরি সরকার, ফতেহ পরমানন্দ, ঘনশ্যাম দাশ, গয়াস খান, আলাওল, দীন চণ্ডীদাস, চন্দ্রশেখর, হরিদাস, শিবরাম, করম আলী, পীর মুহম্মদ, হীরামনি, ভবানন্দ প্রমুখ উল্লেখ্যযোগ্য কবি।
বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যিক গুণে আসামান্য। বিভিন্ন কবির লেখা কিছু পদ এখানে উল্লেখ করা হল-
১.সই কেমনে ধরিব হিয়া।/আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়/ 
আমার আঙিনা দিয়া।।/সে বধুঁ কালিয়া না চাহে ফিরিয়া/ এমতি করিল কে।/আমার অন্তর যেমন করিছে/তেমনি করুক সে।।/যাহার লাগিয়া সব তেয়াগিনু/ লোকে অপযশ কয়।/সেই গুণনিধি ছাড়িয়া পিরীতি/আর যেন কার হয়।।/যুবতী হইয়া শ্যাম ভাঙাইয়া/এমত করিল কে।/আমার পরাণ যেমতি করিছে/তেমতি হউক সে।। (চণ্ডীদাস)
২.চলে নীল সাড়ি নিঙারি নিঙারি/পরান সহিতে মোর।/সেই হৈতে মোর হিয়া নহে থির/মন্মথ জ্বরে ভোর । (চণ্ডীদাস)
৩.এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/শূন্য মন্দির মোর।।/ঝম্পি ঘণ গন — জন্তি সন্ততি/ভুবন ভরি বরি খন্তিয়া।/কান্ত পাহুন কাম দারুন/সঘনে খন শর হন্তিয়া।।/কুলিশ শত শত পাত-মোদিত/ময়ূর নাচত মাতিয়া।/মও দাদুরী ডাকে ডাহুকী/ফাটি যাওত ছাতিয়া।।/তিমির দিক ভরি ঘোর যামিনী/অথির বিজুরিক পাঁতিয়া।/বিদ্যাপতি কহ কৈছে গোঙায়াবি/হরি বিনে দিন রাতিয়া।। (বিদ্যাপতি)

মধ্যযুগের বাংলা কাব্যধারার একবিশিষ্ট শাখা হল মঙ্গলকাব্য। মঙ্গল শব্দের আভিধানিক অর্থ হল কল্যাণ। মধ্যযুগে বিভিন্ন দেব-দেবীর মহিমা ও মাহাত্ম্যকীর্তন এবং পৃথিবীতে তাদের পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনী নিয়ে যেসব কাব্য রচিত হয়েছে সেগুলোই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গল কাব্য নামে পরিচিত।মঙ্গলকাব্যের তিনটি প্রধান ঐতিহ্যের মধ্যে মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল ছিল অন্যতম । এই কাব্য তিনটির প্রধান চরিত্র হল যথাক্রমে মনসা, চণ্ডী ও ধর্মঠাকুর যারা বাংলার সকল স্থানীয় দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও কিছু ছোট মঙ্গলকাব্য রয়েছে, যেমন- শিবমঙ্গল, কালিকা মঙ্গল, রায় মঙ্গল, শশী মঙ্গল, শীতলা মঙ্গল ও কমলা মঙ্গল প্রভৃতি নামে পরিচিত। মঙ্গলকাব্যের প্রচলিত প্রধান কবিরা হলেন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বিজয়গুপ্ত, রূপরাম চক্রবর্তী প্রমুখ।

রাজসভার সাহিত্য হল রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত সাহিত্য। মধ্যযুগের প্রধান রাজসভার কবি ছিলেন আলাওল (১৫৯৭-১৬৭৩) এবং ভারত চন্দ্র প্রমুখ। মহাকবি আলাওল ছিলেন আরাকান রাজসভার প্রধান কবি। তিনি আরবি ও ফার্সি ভাষায় কাব্য রচনা করেছিলেন। ব্রজবুলি ও মঘী ভাষাও তার আয়ত্তে ছিল। প্রাকৃতপৈঙ্গল, যোগশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, অধ্যাত্মবিদ্যা, ইসলাম ও হিন্দু ধর্মশাস্ত্র-ক্রিয়াপদ্ধতি, যুদ্ধবিদ্যা, নৌকা ও অশ্ব চালনা প্রভৃতিতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে আলাওল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। আলাওলের পদ্মাবতী (১৬৪৮ খৃ:) ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্য। তাছাড়া :

মধ্যযুগের শেষ এবং আধুনিক যুগের প্রধান কবি ছিল ভারত চন্দ্র। তিনি তার অন্নদামঙ্গল কাব্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। এই কাব্যের বিখ্যাত উক্তি হল, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

শিবায়ন কাব্য মধ্যযুগীয় বাংলা আখ্যানকাব্যের একটি ধারা। শিব ও দুর্গার দরিদ্র সংসার জীবন কল্পনা করে মঙ্গলকাব্যের আদলে এই কাব্যধারার উদ্ভব। শিবায়ন কাব্যে দুটি অংশ দেখা যায় – পৌরাণিক ও লৌকিক। মঙ্গলকাব্যের আদলে রচিত হলেও শিবায়ন মঙ্গলকাব্য নয়, মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে এক কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই কাব্যের দুটি ধারা দেখা যায়। প্রথমটি মৃগলুব্ধ-মূলক উপাখ্যান ও দ্বিতীয়টি শিবপুরাণ-নির্ভর শিবায়ন কাব্য। শিবায়নের প্রধান কবিরা হলেন রতিদেব, রামরাজা, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, রামচন্দ্র কবিচন্দ্র ও শঙ্কর কবিচন্দ্র।

শাক্তপদাবলী হল কালী-বিষয়ক বাংলা ভক্তিগীতির একটি জনপ্রিয় ধারা। এই শ্রেণীর সঙ্গীত শাক্তপদাবলীর একটি বিশিষ্ট পর্যায়। শাক্তকবিরা প্রধানত তন্ত্রাশ্রয়ী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন বলে শাক্তপদাবলীতে তন্ত্রদর্শন নানাভাবে দ্যোতিত। শাক্তপদাবলীর পদগুলিতে কালী বা শ্যামা মাতৃরূপে ও ভক্ত সাধক সন্তানরূপে কল্পিত। ভক্তের প্রাণের আবেগ, আকুতি, আবদার, অনুযোগ, অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার নিবেদন ছন্দোবদ্ধ হয়ে গীতধারায় প্রকাশিত হয়েছে এই পর্যায়ে। এই কারণে সাধনতত্ত্বের পাশাপাশি আত্মনিবেদনের ঘনিষ্ঠ আকুতি শাক্তপদাবলীর পদগুলিতে অপূর্ব কাব্যময় হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সমাজজীবন ও লৌকিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ এই পদাবলির অধ্যাত্মতত্ত্ব শেষাবধি পর্যবসিত হয়েছে এক জীবনমুখী কাব্যে।

শাক্তপদাবলী ধারাটি বিকাশলাভ করে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এই সময় বঙ্গদেশে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকালে বৈষ্ণব ধর্মানুশীলনের পরিবর্তে শাক্তদর্শন ও শক্তিপূজা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। তার কারণ দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার সতীরুপের শক্তিপীঠগুলির অনেকগুলিই বঙ্গদেশে। সেই শক্তিপীঠগুলিকে কেন্দ্র করে প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে এসেছে শক্তিসাধনা। তারই ফলশ্রুতিতে উদ্ভূত হয় শাক্তসাহিত্য। শাক্তপদাবলীর শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন এবং  তার পরেই স্থান কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের। এই দুই দিকপাল শাক্তপদকর্তা  ছাড়াও অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট পদকর্তা এই ধারায় সংগীতরচনা করে শাক্তসাহিত্য ও সর্বোপরি শাক্তসাধনাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – কৃষ্ণচন্দ্র রায়, শম্ভুচন্দ্র রায়, নরচন্দ্র রায়, হরুঠাকুর অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু), কালী মির্জা, দাশরথি রায় (দাশুরায়) প্রমুখ। অনেক মুসলমান কবিও শাক্তপদাবলী ধারায় নিজ নিজ কৃতিত্ব স্থাপন করে গেছেন। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে এই শতাব্দীর জনপ্রিয় শ্যামাসঙ্গীত গায়কদের অন্যতম হলেন পান্নালাল ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, রামকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

বাংলা  সাহিত্যে মধ্যযুগে নাথধর্মের কাহিনি অবলম্বনে রচিত আখ্যায়িকা কাব্য।প্রাচীনকালে শিব উপাসক এক সম্প্রাদয় ছিল,তাদের ধর্ম ছিল নাথধর্ম।হাজার বছর আগে ভারতে এই সম্প্রাদয় খ্যাতি লাভ করেছিল। তাদের গতিবিধির ব্যাপকতার জন্য সারা ভারতবর্ষে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। নাথ অর্থ প্রভু,দীক্ষালাভের পর নামের সাথে তারা নাথ শব্দটি যোগ করত। তারা বিশেষ ক্ষমতার অধিকারি ছিল। বৌদ্ধ ও শৈব ধর্মের সমন্বয়ে এ ধর্ম গরে ওঠে। এই নাথ পন্থা বৌদ্ধ মহাযান আর শূন্যবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। অবিদ্যা ও অজ্ঞান থেকে মুক্তির জন্য এবং মহাজ্ঞান লাভ করাই নাথগনের লক্ষ্য ছিল।সাধনার মাধ্যমে দেহ পরিশুদ্ধ করে মহাজ্ঞান লাভের যোগ্য করলে তাকে পক্ক দেহ বলা হত। এই মতের প্রতিষ্ঠাতা মীননাথ। আর শিব হল আদি নাথ। সব নাথ তার অনুসারী। দশম-একাদশ শতকে নাথধর্মের প্রভাব বিস্তার লাভ করে। অই সময়ে নাথ সাহিত্য বিস্তার লাভ করে। প্রধান প্রধান নাথগন হলেন- মীননাথ,গোরখনাথ,প্রমুখ।

বাউল মতবাদের উপর ভিত্তি করে রচিত সাহিত্যই হল বাউল সাহিত্য। বাউল সাধকদের সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছেন জগন্মোহন গোসাঁই ও লালন সাঁই। লালন তার বিপুল সংখ্যক গানের মাধ্যমে বাউল মতের দর্শন এবং অসাম্প্রদায়িকতার প্রচার করেছিলেন। এছাড়াও বাউল কবিদের মধ্যে জালাল খাঁ, রশিদ উদ্দিন, হাছন রাজা, রাধারমণ, সিরাজ সাঁই, পাঞ্জু সাঁই, পাগলা কানাই, শীতলং সাঁই, দ্বিজদাস, হরিচরণ আচার্য, মনোমোহন দত্ত, লাল মাসুদ, সুলা গাইন, বিজয় নারায়ণ আচার্য, দীন শরৎ (শরৎচন্দ্র নাথ), রামু মালি, রামগতি শীল, মুকুন্দ দাস, আরকুন শাহ্‌, সিতালং ফকির, সৈয়দ শাহ্‌ নূর, শাহ আব্দুল করিম, উকিল মুন্সি, চান খাঁ পাঠান, তৈয়ব আলী, মিরাজ আলী, দুলু খাঁ, আবেদ আলী, উমেদ আলী, আবদুল মজিদ তালুকদার, আবদুস সাত্তার, খেলু মিয়া, ইদ্রিস মিয়া, আলী হোসেন সরকার, চান মিয়া, জামসেদ উদ্দিন, গুল মাহমুদ, প্রভাত সূত্রধর, আবদুল হেকিম সরকার, ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমেদ, ফকির দুর্বিন শাহ, শেখ মদন, দুদ্দু সাঁই,কবি জয়দেব, কবিয়াল বিজয়সরকার, ভবা পাগলা, নীলকণ্ঠ, দ্বিজ মহিন, পূর্ণদাস বাউল, খোরশেদ মিয়া, মিরাজ উদ্দিন পাঠান, আব্দুল হাকিম, মহিলা কবি আনোয়ারা বেগম ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের মাধ্যমেই বাউল মতবাদ বা বাউল সাহিত্য বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশের লোক সাহিত্য বাংলা সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যদিও এর সৃষ্টি ঘটেছে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রসার ঘটেছে মৌখিকভাবে, তথাপি বাংলা সাহিত্যকে এ লোক সাহিত্য ব্যাপ্তি প্রদান করেছে, করেছে সমৃদ্ধ। পৃথক পৃথক ব্যক্তি-বিশেষের সৃষ্টি পরিণত হয়েছে জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে যার মাধ্যমে প্রকাশ ঘটেছে ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা চেতনার।
লোক সাহিত্য মূলত মৌখিক সাহিত্য। ফলে এধরনের সাহিত্য স্মৃতিসহায়ক কৌশল, ভাষার গঠনকাঠামো এবং শৈলীর উপরও নির্ভর করে। এদেশের লোক সাহিত্য সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করছে। এগুলো হচ্ছে মহাকাব্য, কবিতা ও নাটক, লোক গল্প, প্রবাদ বাক্য, গীতি কাব্য প্রভৃতি। লোক সাহিত্যের এই সম্পদগুলো সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে অথবা অন্য কোন উপায়ে এখনো এই অঞ্চলে টিকে রয়েছে। বহুবছর ধরে এদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। বাংলাদেশের লোক সাহিত্য এই জাতিগোষ্ঠীগুলো দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। ফলশ্রুতিতে বর্তমান বাংলাদেশের বহুমুখী বৈচিত্র্যপূর্ণ বিশাল লোক সাহিত্যের একাংশের ব্যাখ্যায় ইতিহাসের প্রয়োজন পরে।

বাংলাদেশের লোক সাহিত্য লোক সাহিত্যের প্রচলিত সকল শাখায় নিজেকে বিস্তার করেছে। এগুলো হচ্ছে গল্প, ছড়া, ডাক ও খনার বচন, সংগীত, ধাঁধা, প্রবাদ বাক্য, কুসংস্কার ও মিথ।
লোকগীতি বাংলা লোক সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের সংগীত মূলত কাব্যধর্মী। এদেশীয় সংগীতে বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে মৌখিক সুরের দক্ষতার উপর অধিক নির্ভরশীলতা লক্ষ করা যায়। লোকগীতিকে আমরা সাতটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করতে পারি। এগুলো হচ্ছেঃ প্রেম, ধর্মীয় বিষয়, দর্শন ও ভক্তি, কর্ম ও পরিশ্রম, পেশা ও জীবিকা, ব্যাঙ্গ ও কৌতুক এবং এসবের মিশ্রণ। অন্যদিকে এদেশীয় লোকসাহিত্যে আমরা গানের বিভিন্ন শাখা দেখতে পাই। এগুলো হচ্ছেঃ বাউল গান, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, কবিগান, জারিগান, সারিগান, ঘাটু গান,যাত্রা গান ,ঝুমুর গান, জাগের গান প্রভৃতি।

বাংলা লোক সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হল:

চিঠিপত্র লেখা এবং দলিল-দস্তাবেজ লেখার প্রয়োজনে বাংলা গদ্যের সূত্রপাত। দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদি সংস্কৃত ও পার্সি - এই দুই ভাষার প্রভাবে পরিকীর্ণ। আদি সাহিত্যিক গদ্যে কথ্যভাষার প্রতিফলন সুস্পষ্ট। পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারক মানোএল দা আস্‌সুম্পসাঁউ-এর রচনা রীতি বাংলা গদ্যের অন্যতম আদি নিদর্শন। ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ গ্রন্থ থেকে নিম্নরূপ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। লক্ষ্যণীয় এই অংশে বৃহত্তর ঢাকা এলাকার কথ্য ভাষা প্রতিফলিতঃ–

প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত আলালের ঘরে দুলাল বাংলা ভাষায় রচিত আদি গদ্যসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এটি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ভাষা 'আলাল ভাষা' নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে কথ্যরূপী গদ্য একটি পৃথক লেখ্য রূপে উন্নীত হয়।

বাংলা গদ্য শুরুতে ছিল সংস্কৃতি গদ্যের চালে রচিত যার প্রমাণ বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ। বলা যায়, বিশিষ্ট গদ্যকার প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। লেখার ভাষাকে জনবান্ধব ও সহজবোধ করে তোলা অর্থাৎ সাহিত্যে চলিত ভাষা প্রচলনের কৃতিত্ব অনেকাংশেই তার।

বাংলা সাহিত্যের মূল ধারা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই হয়েছিলো; ১৮৩৮ সালে জন্মগ্রহণকারী বঙ্কিম মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে ১৮৬২ সালে একটি উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছিলেন, ঐ বছরই এক ইংরেজ নারী হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (এটাকে ধরা হয় প্রথম বাংলা ভাষার উপন্যাস) নামের একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন তা দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বঙ্কিম এবং ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয় প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাস যেটা ছিলো একজন বাঙালি রচিত প্রথম বাংলা ভাষার উপন্যাস। বঙ্কিমের প্রথম উপন্যাসের খসড়া শেষ হতে হতে তিন বছর লেগে যায় এবং তিনি ১৮৬৫ সালে দুর্গেশনন্দিনী নামের একটি উপন্যাস প্রকাশ করতে সক্ষম হন, তারপর তিনি পান 'বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক'-এর মর্যাদা কারণ দুর্গেশনন্দিনী ছিলো বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম যৌগিকতাময়, পরিস্রুতময়, সূচিতাযুক্ত বাংলা ভাষার শক্তির সীমামুক্ত উপন্যাস; উপন্যাসটিকে বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক উপন্যাস ধরা হচ্ছে সেই উনবিংশ শতক থেকে এখন পর্যন্ত।

বঙ্কিম একজন সফল প্রেমমূলক উপন্যাসের রচয়িতা ছিলেন; তার উপন্যাস ভারতীয় বাঙালি তরুণ-তরুণীর মাঝে প্রেমবোধ জাগ্রত করতো সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই।

বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই আগস্ট, ১৯৪১) (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ - ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) কথা অবধারিতভাবেই স্বতন্ত্র। তার জীবন ও সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তিনি ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। তার প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। তবে বাঙালি সমাজে তার জনপ্রিয়তা প্রধানত সংগীতস্রষ্টা হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধের বই এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন।

১৮০০- বর্তমান, চলমান। মধ্য ও আধুনিক যুগের মধ্যে যিনি সেতুবন্ধন তৈরি করেন তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, মধ্যযুগের তিরোভাব এবং আধুনিক যুগের আবির্ভাবের সীমারেখার সময়ে কাব্যচর্চাকারীই হচ্ছেন যুগসন্ধিক্ষণের কবি। অর্থাৎ লেখায় মধ্যযুগের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব এবং আধুনিককালের ঈষৎ আভাস, দু'য়েরই উপস্থিতি লক্ষণীয়। উল্লেখযোগ্য যুগসন্ধিক্ষণের কবি হচ্ছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) মধ্যযুগীয় পয়ারমাত্রার ভেঙে কবি প্রবেশ করেন মুক্ত ছন্দে।রচনা করেন সনেট। লাভ করেন, আধুনিক কবিতার জনকের খ্যাতি। ইউরোপীয় ভাবধারার রোমান্টিক ও গীতি কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪) ভোরের পাখি নামে পরিচিত ছিলেন। মহিরুহ বৃক্ষের ন্যায় বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। মহাকাব্য ব্যতিত সাহিক্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তিনি খ্যাতির স্তম্বটি প্রতিষ্ঠা করেননি। রবীন্দ্রানুসারী ভাবধারার অন্যান্য কবিরা হলেন: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রমোহন বাগচী বিশ শতকের শুরুতে কবিতায় পঞ্চপুরুষ রবীন্দ্রবিরোধিতার করেন, তারা হলেন: মোহিতলাল মজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। আধুনিক কবিতার স্বর্ণযুগ: রবীন্দ্র ভাব ধারার বাইরে এসে দশক প্রথার চলু করেন তিরিশের পঞ্চপান্ডব কবি: অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৭), জীবননান্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪), বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০)।

বাংলা উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের নতুনতম অঙ্গ। এর সূত্রপাত ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরে দুলাল প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে। এর আখ্যানভাগে এবং রচনাশৈলীতে উপন্যাসের মেজাজ পরিলক্ষিত হয়। বাংলা উপন্যাসের একটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে দীর্ঘ কাল বাংলা উপন্যাসে ইউরোপীয় উপন্যাসের ধাঁচ ছায়া ফেলেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি বাংলা সাহিত্যের সকল শাখাকে ঋদ্ধ করেছেন তার হাতেও উপন্যাস নতুন মাত্রা লাভ করেছে যদিও সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসকে রসোত্তীর্ণ মনে করেন না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর আরেকজন প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক। তবে এরা সবাই মানুষের ওপর তলের ওপর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

বিংশ শতকের প্রথমভাগে বুদ্ধদেব বসু, অচ্যিন্তকুমার সেন প্রমুখের হাতে বাংলা কথাসাহিত্য একটি দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। তবে বাংলা উপন্যাস নতুন মাত্রা লাভ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত ও কমলকুমার মজুমদারের হাতে। এদের হাতে উপন্যাস বড় মাপের পরিবর্তে মানবিক অস্তিত্বের নানা দিকের ওপর আলোকপাত করে বিকশিত হয়। বস্তুত: রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় সম্ভবত সবচেয়ে কুশলী উপন্যাস শিল্পী। তারই পদরেখায় আমরা দেখতে পাই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কে। এরা উপন্যাসকে মানবিক অস্তিতের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক জটিলতার ওপর নিবিড় আলোকপাত করেছেন, লেখনীশৈলীর জোরে উপন্যাসকে সাধারণ পাঠকের কাছকাছি নিয়ে গেছেন এবং একই সঙ্গে উপন্যাসের শিল্পশৈলীতে এনছেন দৃঢ় গদ্যের সক্ষমতা।

সুমথনাথ ঘোষ  ও গজেন্দ্রকুমার মিত্রের বাংলা কথাসাহিত্য নতুন মাত্রা লাভ করে  ৷  সুমথনাথ ঘোষ শুধু সাহিত্যস্রষ্টাই ছিলেন না , প্রকাশক হিসাবেও ছিলেন স্বনামধন্য ৷ একশোরও বেশি বই লিখেছেন সুমথনাথ৷ প্রথম উপন্যাস , ‘বাঁকা স্রোত ’৷  তিনিই অভিন্নহূদয় বন্ধু ও সুসাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করলেন ‘মিত্র ও ঘোষ ’ প্রকাশনা ৷ শিশু -কিশোরদের জন্য লিখেছেন ‘মোহন সিং -এর বাঁশি ’, ‘ছোটদের বিশ্বসাহিত্য ’র মতো বই৷ অনুবাদ করেছেন আলেকসান্দার দুমার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’, ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভ্যান হো ’ বা চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড ’।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলা উপন্যাসে সম্পূর্ণ নতুন করণকৌশল নিয়ে আবির্ভূত হলেন বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলা উপন্যাসকে নতুন খাতে প্রবাহিত করলেন। বাংলা উপন্যাস দীর্ঘকাল পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিকদের হাতে পরিপুষ্ট হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ একাই শত বর্ষের খামতি পূরণ করে দিলেন। তার উপন্যাসের অবয়ব হলো সবজান্তা লেখকের বর্ণনার পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীদের মিথস্ক্রিয়া অর্থাৎ সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে ছোট এবং স্বল্প পরিসরে অনেক কথা বলার পদ্ধতি প্রবর্তন করলেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদ দেখালেন যে ইয়োরোপীয় আদলের বাইরেও সফল, রসময় এবং শিল্পোত্তীর্ণ উপন্যাস লেখা সম্ভব।

১৯৮০’র দশকে হুমায়ূন আহমেদের সবল উপস্থিতি অনুভব করার আগে বাংলা উপন্যাস মূলত পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিকদের হাতে গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের অবদান ছিল তুলনামূলক ভাবে কম, গুণগত মানও প্রশ্নাতীত ছিল না। এ সময়কার কয়েকজন প্রধান লেখক হলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বাণী রায়, হর্ষ দত্ত প্রমুখ।

একবিংশ শতাব্দী শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগের উত্তরাধিকার বহন করে। এ সময় কিছু কিছু নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাসের স্বাক্ষর রেখেছেনি কতিপয় লেখক। উত্তরআধুনিক ধ্যানধারণা অবলম্বন করেও লিখেছেন কেউ কেউ। তবে নতুন কোন ধারা প্রবল বেগে ধাবিত করার মতো নতুন কারো আবির্ভাব এখনো হয় নি। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নাসরীন জাহান, ইমদাদুল হক মিলন, আবুল বাশার,শহিদুল জহির, আবদুল মান্নান সৈয়দ সহ প্রমুখ শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের সবল উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও অনেক নতুন নতুন ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব লক্ষ্য করা গেছে যদিও প্রচলিত রীতির বাইরে যাওয়ার শক্তিশালী হাতের দেখা পাওয়া যায়নি। এই একই সময়ে কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা ১৪টি উপন্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি ১৯৩০-১৯৫০ কালপরিসরে লিখিত। জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস সম্পূর্ণ নতুর ধাঁচের, চিন্তা-মননে এবং শৈলীতে।

সাহিত্যে বর্ণনামূলক গদ্যকে প্রবন্ধ বলা হয়। প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম একটি শাখা। এর সমার্থক শব্দগুলো হল - সংগ্রহ, রচনা, সন্দর্ভ। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু শৈল্পিক, কাল্পনিক, জীবনমুখী, ঐতিহাসিক কিম্বা আত্মজীবনীমূলক হয়ে থাকে। যিনি প্রবন্ধ রচনা করেন তাকে প্রবন্ধকার বলা হয়। প্রবন্ধে মূলত কোনো বিষয়কে তুলে ধরে তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য খুবি সমৃদ্ধ। যুগে যুগে অনেক প্রাবন্ধিক তাদের প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল
বজ্ঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিবিধ প্রবন্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র প্রবন্ধ এবং প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহ । তাছাড়া আরও অনেক প্রাবন্ধিক আছেন, যেমন- কাজী আবদুল ওদুদ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আবদুল হক প্রমুখ।

মধ্যযুগের সমগ্র পরিসর জুড়েই কাব্যের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষণীয়। বিবিধ শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত ছিলো এই সাহিত্যচর্চা। এখানে এ সময়ের বিভিন্ন শাখার উল্লেখযোগ্য কবির একটি সম্মিলিত তালিকা দেয়া হলো। তালিকা প্রস্তুতে কোনো ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি।

এখানে সেসব কবি ও লেখকদের নাম দেয়া হয়েছে, যাঁরা লেখালেখির মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন দেশভাগের আগেই; যদিও এঁদের অনেকেই দেশবিভাগের পরও সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু এরপরও এঁদেরকে আধুনিক যুগের শুরুর দিককার সাহিত্যিক হিসেবেই ধরা যেতে পারে। তালিকাটি করা হয়েছে সাহিত্যিকদের জন্মসালের ক্রম অনুযায়ী।

দেশবিভাগের পর দুই বাংলাতেই সাহিত্যচর্চার স্বতন্ত্র বলয় তৈরি হয়। তবে সাহিত্যের জগৎ সবসময়ই বৈশ্বিক, বিশেষতঃ ভাষার মিলের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রকট।
দেশভাগের পর থেকে শুরু করে অদ্যাবধি দুই বাংলার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের সম্মিলিত নামের তালিকা এটি। প্রসঙ্গতঃ এই তালিকাটি করা হয়েছে বর্ণানুসারে, এবং এতে বিভিন্ন নাম প্রতিনিয়তই সংযুক্ত হচ্ছে এবং হবে।




#Article 11: ঢাকা (3811 words)


ঢাকা (, পূর্বে Dacca) দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। প্রশাসনিকভাবে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রধান শহর। ভৌগোলিকভাবে এটি বাংলাদেশের মধ্যভাগে বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে একটি সমতল এলাকাতে অবস্থিত। ঢাকা একটি অতিমহানগরী বা মেগাসিটি; ঢাকা মহানগরী এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ। জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা শহর দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম শহর। 

ঢাকা শহর মসজিদের শহর নামে সুপরিচিত। এখানে এক হাজারেরও বেশি মসজিদ আছে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি, শিক্ষা ও বাণিজ্যকেন্দ্র।

ঢাকা শহরের জলবায়ু ক্রান্তীয় আর্দ্র ও শুষ্ক প্রকৃতির। গড় তাপমাত্রা এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং জানুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন প্রায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ঢাকা শহরে বর্ষাকাল, সেসময় প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়। 
 
সপ্তদশ শতাব্দীতে পুরান ঢাকা মুঘল সাম্রাজ্যের সুবহে বাংলা (বাংলা প্রদেশ) এর প্রাদেশিক রাজধানী ছিলো। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এই শহর জাহাঙ্গীর নগর নামে পরিচিত ছিলো। বিশ্বব্যাপী মসলিন বাণিজ্যের একটি কেন্দ্র ছিলো ঢাকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীগণ এখানে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসতেন। ঢাকাতে বিশ্বের সেরা মসলিন কাপড় উৎপাদিত হতো। যদিও আধুনিক ঢাকা শহরের বিকাশ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসন আমলে, এই সময় নবাবগণ ঢাকা শাসন করতেন। এই সময় কলকাতার পরেই ঢাকা বাংলা প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পরে ঢাকা নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানীতে পরিণত হয়। ১৯৫০-১৯৬০ সালের মধ্যে এই শহর বিভিন্ন সামাজিক, জাতীয়তাবাদী ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে ঢাকা “স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজধানী” ঘোষিত হয়। ইতিপূর্বে সামরিক আইন বলবৎ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, সামরিক দমন, যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তাণ্ডবলীলার মতো একাধিক অস্থির ঘটনার সাক্ষী হয় এই শহর।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটা প্রশংসিত জাতীয় দর্শনীয় স্থানগুলো যেমন জাতীয় সংসদ ভবন, ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, লালবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, হাতিরঝিল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, তারা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনীয় গির্জা

ঢাকার নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। কথিত আছে যে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভ্রমণকালে সন্নিহিত জঙ্গলে হিন্দু দেবী দুর্গার একটি বিগ্রহ খুঁজে পান। দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ রাজা বল্লাল সেন ঐ এলাকায় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যেহেতু দেবীর বিগ্রহ ঢাকা বা গুপ্ত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো, তাই রাজা, মন্দিরের নাম রাখেন ঢাকেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের নাম থেকেই কালক্রমে স্থানটির নাম ঢাকা হিসেবে গড়ে ওঠে।

আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন; তখন সুবাদার ইসলাম খান আনন্দের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ শহরে “ঢাক” বাজানোর নির্দেশ দেন। এই ঢাক বাজানোর কাহিনী লোকমুখে কিংবদন্তির রূপ নেয় এবং তা থেকেই শহরের নাম ঢাকা হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, মোঘল সাম্রাজ্যের বেশ কিছু সময় ঢাকা সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিলো।

ঢাকা নগরীকে বর্তমানে দু'ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে - ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর। ঢাকা দক্ষিণই হলো পুরাতন মূল নগরী। ঢাকা উত্তর ঢাকার নবীন বর্ধিত উপশহরগুলো নিয়ে গঠিত।

ধারণা করা হয়, কালের পরিক্রমায় ঢাকা প্রথমে সমতট, পরে বঙ্গ ও গৌড় প্রভৃতি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। খ্রিষ্টীয় ১৩শ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলমানেরা ঢাকা দখল করে। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান অনুযায়ী ১৬ জুলাই ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী ঘোষণা করা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর নাম অনুসারে রাজধানীর নাম জাহাঙ্গীরনগর রাখা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের জীবিতকাল পর্যন্ত এ নাম বজায় ছিলো।

এর আগে সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার প্রাদেশিক রাজধানী ছিলো বিহারের রাজমহল। সুবা বাংলায় তখন চলছিলো মোঘলবিরোধী স্বাধীন বারো ভূইঁয়াদের রাজত্ব। বারো ভূইয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে বাংলাকে করতলগত করতে ১৫৭৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বারবার চেষ্টা চালানো হয়। এরপর সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম খান চিশতীকে রাজমহলের সুবেদার নিযুক্ত করেন। তিনি ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে ঢাকায় স্থানান্তর করেন।

সুবেদার ইসলাম খান চিশতী দায়িত্ব নেবার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বারো ভূঁইয়ার পতন ঘটে ও বর্তমান চট্টগ্রামের কিছু অংশ বাদে পুরো সুবে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে।

১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানী হলেও সুবাহ বাংলার রাজধানী বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শাহ সুজা রাজধানী আবার রাজমহলে স্থানান্তর করেছিলেন। শাহ সুজার পতনের পর ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার মীর জুমলা আবার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। এরপর বেশ কিছুকাল ঢাকা নির্বিঘ্নে রাজধানীর মর্যাদা ভোগ করার পর ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। এরপর ঢাকায় মোঘল শাসনামলে চলতো নায়েবে নাজিমদের শাসন, যা চলেছিল ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসন শুরু হবার আগে পর্যন্ত। ব্রিটিশরা রাজধানী হিসেবে কলকাতাকে নির্বাচিত করলে ঢাকার গুরুত্ব আবারো কমতে থাকে। 

এরপর দীর্ঘকাল পরে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা আবার তার গুরুত্ব ফিরে পায়। বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৫ সালে ঢাকাকে আসাম ও বাংলার রাজধানী করা হয়। কংগ্রেসের বাধার মুখে ব্রিটিশ রাজ আবার ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতায় ফিরিয়ে নেয়।

ঢাকা মধ্য বাংলাদেশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ২৩°৪২' থেকে ২৩°৫৪' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°২০' থেকে ৯০°২৮' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমিতে অবস্থিত এই শহরের মোট আয়তন । ঢাকায় মোট ৪৬ টি থানা আছে। এগুলো হলো -চকবাজার, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, হাজারীবাগ, রমনা, মতিঝিল, পল্টন, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গুলশান, মিরপুর, পল্লবী, শাহ আলী, তুরাগ, সবুজবাগ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ডেমরা, শ্যামপুর, বাড্ডা, কাফরুল, কামরাঙ্গীর চর, খিলগাঁও ও উত্তরা। ঢাকা শহরটি মোট ১৩০টি ওয়ার্ড ও ৭২৫টি মহল্লায় বিভক্ত। ঢাকা জেলার আয়তন ১৪৬৩.৬০ বর্গ কিলোমিটার (৫৬৫ বর্গমাইল)। এই জেলাটি গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলা দ্বারা বেষ্টিত। 

ক্রান্তীয় বৃক্ষ, আর্দ্র মৃত্তিকা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে সমান সমতলভূমি এই জেলার বৈশিষ্ট্য। এই কারণে বর্ষাকালে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঢাকা জেলায় প্রায়শই বন্যা দেখা যায়।

ঢাকার জলবায়ু প্রধানত উষ্ণ, বর্ষণমুখর এবং আর্দ্র গ্রীষ্মমন্ডলীয়। কোপেন জলবায়ু শ্রেণীবিভাগ এর অধীনে, ঢাকার জলবায়ু ক্রান্তীয় সমভাবাপন্ন। এই শহরের একটি স্বতন্ত্র মৌসুম রয়েছে, এখানে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস(৮১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং জানুয়ারী থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে তাপমাত্রা ১৯.৫ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের(৬৭ থেকে ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) মধ্যে থাকে। মে থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে গড়ে প্রায় ২১২১ মিলিমিটার(৮৩.৫ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে, যা সারাবছরের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮৭%। যানজট এবং এবং শিল্প কারখানার অপরিকল্পিত বর্জ্য নির্গমনের ফলে প্রতিনিয়ত বায়ু এবং পানি দূষণ বাড়ছে, ফলে শহরের জনস্বাস্থ্য এবং জীবন মান মারাত্বকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ঢাকার চারপাশে জলাশয় এবং জলাভূমি গুলি ধ্বংসের সম্মুখীন কারণ, এগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবন এবং অন্যান্য আবাসন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। দূষণের ফলে প্রকৃতির যে ক্ষতি হচ্ছে তার ফলে এই এলাকার জীববৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন। যদিও বর্তমানে ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা হচ্ছে।

ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১ আগস্ট, ১৮৬৪ সালে এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে এটি কর্পোরেশন-এ উন্নীত করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নামের ২ টি স্ব-শাসিত সংস্থা ঢাকা শহরের পরিচালনের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। এই শহর অনেকগুলি প্রশাসনিক ওয়ার্ডে বিভক্ত এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন কমিশনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন। প্রতি ৫ বছর পরপর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে উভয় সিটি কর্পোরেশনে একজন করে মেয়র নির্বাচন করা হয়, যিনি প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী প্রধান হিসাবে কাজ করেন। ওয়ার্ড কমিশনারও ৫ বছরের জন্য সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এছাড়াও মহিলাদের জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে ৩০টি সংরক্ষিত কমিশনার পদ রয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সকল সরকারী স্কুল এবং অধিকাংশ বেসরকারী স্কুলের প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছে। তবে মাদ্রাসা এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলসমূহ এই বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশের সকল মাদ্রাসা একটি কেন্দ্রীয় বোর্ডের মাধ্যমে এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল সমূহ একটি পৃথক শিক্ষাবোর্ড এবং প্রশাসনিক কাঠামোর অধিনে পরিচালিত হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোট ১২টি পুলিশ স্টেশনে প্রায় ৬০০০ এরও বেশি পুলিশ সদস্য ছিলেন। শহরের জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুলিশবাহিনীতে সদস্য সংখ্যা ৩৪০০০ এ উন্নীত করা হয়, এবং এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় ৫০টি পুলিশ স্টেশন রয়েছে।

ঢাকা শহর ২৫টি সংসদীয় এলাকায় বিভক্ত। এখানে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল হল আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। রমনায় সচিবালয় অবস্থিত এবং এখানেই সরকারের প্রায় সকল মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এবং ঢাকা হাই কোর্ট এই শহরে অবস্থিত। বঙ্গভবন ভারতের গভর্নর-জেনারেল ও পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর এর বাসভবন হিসেবে ব্যবহার হতো এবং বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশ সরকারের এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ কার্যক্রমের কাজে ব্যবহৃত হয়। খ্যাতনামা স্থপতি লুইস কান এই জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি ছিলেন।বায়তুল মুকাররম এদেশের জাতীয় মসজিদ, মক্কার কাবা শরিফের নকশায় অনুপ্রাণিত হয়ে এই মসজিদের ডিজাইন করা হয়েছে। এই শহরের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান সমূহের মধ্যে রয়েছে বড় কাটরা, লালবাগ কেল্লা, হোসেনী দালান, আহসান মঞ্জিল, বাহাদুর শাহ পার্ক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইত্যাদি।

ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকলেও মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৫% এই ব্যবস্থার আওতাভুক্ত , এর পাশাপাশি আরও ৩০% এই সুবিধা ব্যবহার করে সেপটিক ট্যাঙ্কের মাধ্যমে। মাত্র দুই তৃতীয়াংশ লোক শহরে সরবরাহকৃত পানি ব্যবহার করতে পারে। এখানে প্রতি বছর ৯৭ লক্ষ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। সরকারী এবং বেসরকারী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফলতার সাথে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করা হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয়ভাবে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বেশ কয়েকটি স্থান রয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো কাছাকাছি নিচু এলাকায় অথবা জলাশয়ে ফেলা হয়ে থাকে।

ঢাকা পৌরসভা ১৮৬৪ সালের ১ই আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এবং ১৯৭৮ সালে কর্পোরেশন অবস্থা উন্নীত হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের একটি স্বায়ত্ত কর্পোরেশন যা শহর বিষয়াবলি চালায় (অর্থাত ২০১১ সাল থেকে), ঢাকা সিটি করপোরেশন বর্তমানে দুই প্রশাসনিক অংশে বিভক্ত করা হয়েছে - এইগুলো হলো (১) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং (২) ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন - ভাল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। এই দুটি কর্পোরেশন প্রশাসকদের দ্বারা চালিত হয়। অন্তর্ভূক্ত এলাকায়গুলো কয়েকটি পৌরসভায় বিভক্ত করা হয়েছে, যা কমিশনার নির্বাচিত করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্ব ও নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত সরকারী স্কুল এবং অধিকাংশ বেসরকারী স্কুলগুলো চালানো হয়, শুধুমাত্র ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো এবং মাদ্রাসাগুলো ছাড়া। বাংলাদেশে সকল মাদ্রাসা একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড দ্বারা পরিচালিত যখন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো পৃথক শিক্ষা ও শাসন কাঠামোর অধীনে হয়ে থাকে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইসময় ৬,০০০ পুলিশ-বাহিনী মোট ১২টি পুলিশ থানায় কর্মরত ছিল। শহর দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, বর্তমানে পুলিশ-বাহিনী উত্থাপিত হয়েছে প্রায় ৩৪০০০ জনে এবং ৫০টি পুলিশ থানা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান যানজট এবং জনসংখ্যা সমস্যার মোকাবিলায়  জাতীয় সরকার সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী এলাকার দ্রুত নগরায়নের একটি নীতি বাস্তবায়ন করেছে। ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে বিশেষত বর্তমানে দ্রুত জনবিষ্ফোরণের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে নগরীর জনসংখ্যা ৩ কোটিকেও ছুঁয়ে ফেলতে পারে। ফলে স্বাভাবিক নাগরিক পরিষেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। তাই ঢাকা শহরকে ঘিরে একদিকে বর্তমানে বিভিন্ন উপনগরীর প্রবর্তন করে ও অন্যদিকে সমগ্র দেশ জুড়েই দারিদ্রের যথাসাধ্য মোকাবিলা করে নগরমুখী লাগামছাড়া জনস্রোতকে কিছুটা মোকাবিলা করাই এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।

ঢাকা বিশ্বের অন্যান্য মেগা শহরগুলো থেকে ভিন্ন, ঢাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চার বার সরকার প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সেবা নিয়েছে। দুই কর্পোরেশন, উত্তর এবং দক্ষিণ, দুই ক্ষমতাহীন মেয়রদের নেতৃত্বে চালিত হয় যখন তাদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাছাড়া, তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সকল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং তারা শহর রক্ষণাবেক্ষণ চালিয়ে যায়।

ঢাকায় একটি জলবাহিত নিকাশী ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু ঢাকার জনসংখ্যার মাত্র ১৫% এই সেবা পায় এবং অপরদিকে ৩০% সেপ্টিক ট্যাঙ্ক সেবা পায়। 

ঢাকা বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শহরে উঠতি মধ্যবিত্ত জনসংখ্যা বাড়ছে পাশাপাশি আধুনিক ভোক্তা এবং বিলাস পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই এই শহরে অভিবাসী শ্রমিকদের আকৃষ্ট করে আসছে। হকার, ছোটো দোকান, রিকশা, রাস্তার ধারের দোকান শহরের মোট জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ। শুধুমাত্র রিকশা চালকের সংখ্যাই ৫ লাখ এর বেশি। কর্মপ্রবাহের প্রায় অর্ধেকই গৃহস্থালি অথবা অপরিকল্পিত শ্রমজীবী হিসাবে কর্মরত আছেন। যদিও টেক্সটাইল শিল্পে প্রায় ৮০০,০০০ এরও বেশি মানুষ কাজ করছেন। তারপরও এখানে বেকারত্বের হার ছিলো প্রায় ১৯%। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ঢাকা শহরের স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১৪২ বিলিয়ন ডলার। যার প্রবৃদ্ধি ৬.৪%। ঢাকার বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১৩০০ মার্কিন ডলার এবং এখানে প্রায় ১৫% মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে  বসবাস করে। এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে এবং এদের অনেকেরই দৈনিক আয় ৫ মার্কিন ডলারের কম।

শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলো হলো মতিঝিল, চকবাজার, নবাবপুর, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট ইত্যাদি এবং প্রধান শিল্প এলাকা গুলো হল তেজগাঁও, হাজারীবাগ ও লালবাগ। বসুন্ধরা-বারিধারা একটি উন্নয়নশীল অর্থনৈতিক এলাকা এবং আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই এলাকায় উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পকারখানা, কর্পোরেশন এবং শপিং মল তৈরী করা হবে। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রধানত গার্মেন্টস, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে উদ্বুদ্ধ করর লক্ষ্যে তৈরী করা হয়েছিল। ঢাকায় মোট দুটি ইপিজেড-এ মোট ৪১৩টি শিল্প স্থাপনা রয়েছে। এখানকার অধিকাংশ কর্মীই নারী। এই শহরের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহত স্টক এক্সচেঞ্জ, এখানে তালিকাভুক্ত বৃহত্তম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটিগ্রুপ, এইচএসবিসি ব্যাঙ্ক বাংলাদেশ, জেপি মর্গান চেজ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্ক (বাংলাদেশ), আমেরিকান এক্সপ্রেস, শেভরন, এক্সন মবিল, টোটাল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ইউনিলিভার, নেসলে, ডিএইচএল, ফেডএক্স, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো ইত্যাদি। স্থানীয় বড় আকারের শিল্পগ্রুপ যেমন কনকর্ড গ্রুপ, র‌্যাংগস গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, টি কে শিল্প গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, নাভানা গ্রুপ, জামান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, রহিম আফরোজ ইত্যাদি প্রতিষ্টানের প্রধান বাণিজ্যিক কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত। এই শহরেই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক এবং বাংলাদেশের প্রথম ভূমি উন্নয়ন ব্যাংক প্রগতি কো-অপারেটিভ ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (প্রগতি ব্যাংক) এর প্রধান কার্যালয় ঢাকা বিভাগেই অবস্থিত। নগরায়নের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে শহরের উন্নয়ন চলছে, নতুন নতুন বহুতল ভবন তৈরী হচ্ছে ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের পরিবর্তন হয়েছে। ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, শিল্পোৎপাদন, টেলিযোগাযোগ এবং সেবা খাতে বিশেষভাবে উন্নয়ন হচ্ছে। পাশাপাশি শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যটন এবং হোটেল রেস্তোরাঁর উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

ঢাকা বিশ্বের মধ্যে রিক্সার রাজধানী নামে পরিচিত। প্রতিদিন গড়ে এখানে প্রায় ৪,০০,০০০ রিক্সা চলাচল করে।
রিক্সা এবং ইঞ্জিন চালিত অটো রিক্সা ঢাকার অন্যতম প্রধান বাহন, আর এই শহরে যে প্রায় ৪০০০০০০ এর বেশি রিক্সা চলাচল করে, তা অন্য সকল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ যদিও সরকারি হিসাব মতে ঢাকা শহরের জন্য মোট ৮৫,০০০ রিক্সার নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। রিক্সা ঢাকা শহরের রাস্তার যানজটের অন্যতম কারণ এবং কিছু বড় বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন পরিচালিত বাস ঢাকা শহরের পরিবহনের আরেকটি জনপ্রিয় উপায়। এছাড়া রয়েছে বহু বেসরকারী বাস সার্ভিস। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে ঢাকা শহরে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত কিছু যানবাহন (বেবি ট্যাক্সি, টেম্পো ইত্যাদি) বন্ধ করে দেওয়া হয় ও পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাস (Compressed Natural Gas - CNG) বা সিএনজিচালিত সবুজ অটোরিক্সা চালু হয়। এর ফলে পরিবেশ দূষণ অনেক কমে এসেছে।

স্কুটার, ট্যাক্সি এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন যানবাহনগুলো শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সরকার দুই স্ট্রোক ইঞ্জিন বিশিষ্ট অটো রিকশার প্রতিস্থাপন করে সবুজ অটোরিকশা চালু করেছে যা সিএনজি অটোরিকশার  বা বেবি-ট্যাক্সি  নামে পরিচিত এগুলোতে পরিবেশ বান্ধব সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ঢাকা রাস্তা চলাচলকারী ট্যাক্সিগুলো দুই ধরনের হয়। হলুদ ট্যাক্সিগুলো কিছুটা উচ্চ মান সম্পন্ন হয়ে থাকে যদিও এটি ব্যয়বহুল। এই ট্যাক্সিগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত; টয়োটা করোলা এর, টয়োটা প্রিমিও এর এবং টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়িগুলো ট্যক্সি হিসাবে ব্যবহার করা হয় এখানে। ২০১৩ সালে এই সেবাটি প্রথমে ২০০-২৫০০ টি ট্যক্সি নিয়ে শুরু করা হয়েছিলো। সরকার ১,৫০০সিসি ক্ষমতা বিশিষ্ট ইঞ্জিনের আরও ৫,০০০ নতুন ট্যাক্সি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই ধরনের ট্যাক্সির সংখ্যা ১৮,০০০ পর্যন্ত বাড়ানো হবে।

 , ঢাকার  রাস্তাগুলো  বাঁধানো ছিলো। সড়কপথ, রেলপথের মাধ্যমে ঢাকা শহর দেশের অন্যন্য অংশের সাথে সংযুক্ত আছে। ঢাকা থেকে ভারতের কলকাতা ও আগরতলা ​​শহরে যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি পরিচালিত নিয়মিত বাস সার্ভিস রয়েছে।

ঢাকার  রেলওয়ে স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে, বনানী রেলওয়ে স্টেশনে, তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন, ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে এবং গ্যান্ডারিয়া রেলওয়ে স্টেশন, রাষ্ট্র পরিচালিত বাংলাদেশ রেলওয়ে শহরতলি এবং জাতীয় রুটে সেবা প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে একটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করে থাকে। ঢাকা থেকে অন্যান্য শহরতলি এলাকায় রেল যোগাযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে DEMU ট্রেনের মাধ্যমে নিয়মিত রেলসেবা  পরিচালনা করে আসছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সদরঘাট বন্দরের মাধ্যমে নদীর অপর পারে এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বিভিন্ন স্থানে যাত্রী এবং মালপত্র পরিবহন করা হয়।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা শহরের কেন্দ্রে থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত, এটি দেশের বৃহত্তম এবং ব্যস্ততম বিমানবন্দর। দেশের মোট বিমান আগমন এবং প্রস্থানের ৫২% পরিচালনা করা হয় এখানে। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, কক্সবাজার, যশোর, বরিশাল, সৈয়দপুরে অভ্যন্তরীণ সেবা এবং এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উগাণ্ডা এবং পশ্চিম ইউরোপের প্রধান শহরগুলোতে আন্তর্জাতিক সেবাপরিচালনা করা হয়।

ঢাকায় নাগরিক পরিষেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে। ঢাকা শহরের পানির চাহিদা পূরণের জন্য ঢাকা ওয়াসা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য ডেসা এবং ডেসকো, গ্যাস সরবারহ করার জন্য তিতাস গ্যাস প্রভৃতি সেবামূলক সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে।

ঢাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শহর যা বাঙালি সংস্কৃতির একটি ছবিও বলা চলে। ঢাকায় বসবাসকারীদের কিছু অংশের পূর্বপুরুষরা ভারতীয়। তারা অনেকেই ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের সময় ভারত থেকে এসেছিলেন। এদের মধ্যে কিছু বিহারী মুসলমানও ছিলেন। এদের সংখ্যা বর্তমানে কয়েক লক্ষ। এখানকার বেশিরভাগ লোক মুসলমান সম্প্রদায়ের, এদের সংখ্যা শতকরা ৯০% । কিন্তু সাথে বহু হিন্দু এরা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শতকরা ৭%, খ্রিস্টান , বৌদ্ধ এবং শিখ ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করেন। ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর মাঝে হরিজন, ঋষি ও বাহাই সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। ঢাকায় বসবাসকারী প্রায় সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলেন, পুরান ঢাকা'র লোকেরা উর্দুতেও কথা বলে থাকেন। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকেই ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে। ঢাকা নগরী অনেকগুলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে যারা ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। কিছু ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীরা হিন্দি, তামিল, তেলেগু ও ভোজপুরী ভাষাও ব্যবহার করে।

পুরান ঢাকার স্থানীয় আদি অধিবাসীদের 'ঢাকাইয়া' বলা হয়। তাদের আলাদা উপভাষা এবং সংস্কৃতি রয়েছে। ঢাকা রাজধানী হওয়ায় সারা বাংলাদেশ থেকেই এখানে লোকজন উন্নত জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কে মূল ধরে তার পার্শ্ববর্তী এলাকা হচ্ছে ঢাকা শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় গণ গ্রন্থাগার ও জাতীয় জাদুঘর এলাকা সংস্কৃতি-কর্মীদের চর্চা ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মূল ক্ষেত্র। এর বাইরে বেইলি রোডকে নাটকপাড়া বলা হয় সেখানকার নাট্যমঞ্চগুলোর জন্য। এছাড়াও নবনির্মিত শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল এবং অন্যান্য মঞ্চসমূহ নাট্য ও সঙ্গীত উৎসবে সব সময়ই সাংস্কৃতিক চর্চাকে অব্যাহত ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বছরের বিভিন্ন সময়ে নাট্যোৎসব ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পুরোটা জুড়ে বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলার আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে পহেলা বৈশাখে রমনা পার্কে ছায়ানটের অনুষ্ঠানসহ সারাদিন গোটা অঞ্চলে সাংস্কৃতিক উৎসব চলে। সাংস্কৃতিক হৃদ্যতার ধারাবাহিকতায় সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও সারা বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের সময় হতেই ঢাকা এই প্রাদেশিক রাজধানীর শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই সময়ই ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯৮০'র দশক পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এর আশেপাশের এলাকাকে এডুকেশন ডিস্ট্রিক্ট বলা হতো। এই এডুকেশন ডিস্ট্রিক্টের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে  আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ , গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ভিকারুননেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ, উইলস্ লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা কলেজ,ঢাকা সিটি কলেজ,হলিক্রস কলেজ,   নটর ডেম কলেজ, তেজগাঁও কলেজ (পূর্বে নাইট কলেজ), ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুল, ইডেন মহিলা কলেজ, ইষ্ট এন্ড হাই স্কুল, অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়, আজিমপুর গার্লস স্কুল, বেগম বদরুন্নেসা কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, ঢাকা আর্ট কলেজ (চারুকলা ইন্সটিটিউট) প্রভৃতি।

ঐতিহ্যগতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম সৃষ্টি হয়েছিলো ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো। বুদ্ধদেব বসুর মতো ছাত্র এবং বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের মতো শিক্ষক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে উচ্চ শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলটি সভ্যতার স্বাক্ষর বহন করে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয় বর্ণিল শোভাযাত্রা। অন্যদিকে পুরান ঢাকায় ১৮৫৮ সাল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে চলে আসছে। সাভারে অবস্থিত ৬৯৭.১৩ একর জায়গাসম্পন্ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি, যেখানে দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনারটি অবস্থিত।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধানত তিনটি মূল ধারা রয়েছে; এগুলোর প্রথমটি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত পাঠক্রম (যা বাংলা অথবা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশোনা করা যায়), দ্বিতীয়টি হচ্ছে বেসরকারি কেজি লেভেল হতে এ লেভেল পর্যন্ত ইংরেজি মিডিয়ামের ব্রিটিশ পাঠক্রম এবং তুতীয়টি হচ্ছে মূলত আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষানির্ভর মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। মাদ্রাসাভিত্তিক এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনোটি সরকার নির্ধারিত পাঠক্রম এবং কোনো কোনোটি নিজস্ব পাঠক্রম ব্যবহার করে শিক্ষা প্রদান করে। শেষোক্ত এশ্রেণীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর সরকারের কোনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই। এই একই চিত্র ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রায় একশভাগ প্রযোজ্য।

বলা বাহুল্য নয় যে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ঢাকায় অবস্থিত। আশির দশক পর্যন্ত ঢাকাসহ বাংলাদেশে পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই শিক্ষাক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি ছিলো। এর পর হতেই বেসরকারি খাতে কিন্ডারগার্টেন ও স্কুলের প্রসার হতে শুরু করে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তার সংশোধন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে এক বাঁধভাঙ্গা জোয়ার নিয়ে আসে। এযাবত প্রায় ৫৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। লক্ষণীয় বিষয় হলো এর মধ্যে প্রায় ৪৫টিই হলো ঢাকা বিভাগে।

ঢাকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ
বাংলাদেশে বর্তমানে সর্বমোট ৩৫টি পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭টি হচ্ছে ঢাকায়। এগুলো হলো:

বাংলাদেশে বর্তমানে সর্বমোট ৭০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪৫টিই হলো ঢাকা বিভাগে।

ঢাকার উল্লেখযোগ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ

ঢাকা থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বাংলা দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইত্তেফাক, সংবাদ, প্রথম আলো, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, আমার দেশ, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত, সমকাল, মানবজমিন, পূর্বাঞ্চল, সংগ্রাম, কালের কণ্ঠ‌।ইংরেজি দৈনিক পত্রিকাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ অবজারভার, বাংলাদেশ টুডে, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, নিউ এইজ, নিউ নেশন, ডেইলি স্টার, নিউজ টুডে। ঢাকায় অবস্থিত সংবাদ সংস্থাগুলো হলো বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ, (ইউ.এন.বি)।

সাহিত্য পত্রিকা গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কালি ও কলম, সমুদিত (ত্রৈমাসিক সাহিত্য ডাক), সমধারা, অণুপ্রাণন, নান্দিক, কালাঞ্জলি, কথা, বাংলার কবিতাপত্র, জলধি।

অনলাইন পত্রিকার গুলোর মদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিডিনিউজ২৪.কম, বাংলানিউজ২৪.কম ।

স্থানীয় টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি। এছাড়া স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিটিভি ওয়ার্ল্ড, মাই টিভি, চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, বৈশাখী টিভি, বাংলাভিশন, দিগন্ত টিভি, দেশ টিভি, একুশে টেলিভিশন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, 	একাত্তর টিভি । ঢাকার রেডিও চ্যানেল (সরকারি ও বেসরকারি) বাংলাদেশ বেতার (সরকারি রেডিও চ্যানেল),রেডিও ভূমি, রেডিও ফুর্তি, রেডিও টুডে, রেডিও আমার, এবিসি রেডিও, বাংলাদেশ বেতারের ট্রাফিক সম্প্রচার কার্যক্রম।

ক্রিকেট এবং ফুটবল ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। এই খেলাগুলো শুধুমাত্র ঢাকাতেই নয়, বরং পুরো বাংলাদেশেই এই খেলাগুলোর জনপ্রিয়তা রয়েছে। মোহামেডান এবং আবাহনী  ঢাকার দুটি বিখ্যাত ক্লাব যারা ফুটবল এমন ক্রিকেটে নিয়মিত সাফল্য অর্জন করে আসছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট জাতীয় ক্রিকেট লীগে ঢাকার দল হিসাবে ঢাকা মেন্ট্রোপলিটন ক্রিকেট দল অংশ নিয়ে থাকে। এছাড়া ঘরোয়া টুয়েন্টি২০ প্রতিযোগিতা  বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে এই শহরের দল ঢাকা প্লাটুন অংশ নিয়ে থাকে।

সারা বাংলাদেশের খেলাধুলার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) (সাবেক ঢাকা স্টেডিয়াম) ও এর আশেপাশের এলাকা। বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি হলেও ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, হকি, হ্যান্ডবল সহ আরো অনেক খেলা ঢাকায় নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

এক সময় প্রতি বছর ঢাকা স্টেডিয়ামে আগা খান গোল্ড কাপ-এর মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট সারাদেশের মানুষকে উদ্দীপিত করে রাখতো। অল্প কিছু সময় প্রেসিডেন্টস গোল্ড কাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এছাড়াও ঢাকা স্টেডিয়ামে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হয়েছিলো এশিয়া কাপ, অনূর্ধ্ব ২১ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

বর্তমানে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তায় অন্যান্য খেলাধুলা ম্রীয়মান হয়ে গেছে বলা যায়। স্বাধীনতা পূর্বের ন্যায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম পুনরায় আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়াও শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই স্টেডিয়ামগুলোতে এখন নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলাসমূহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের খেলাধুলার সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে জাতীয় ক্রীড়া কাউন্সিল। এর সদর দপ্তর হচ্ছে ঢাকায়। এছাড়াও প্রায় ৩০টি ক্রীড়া ফেডারেশন ঢাকার সদরদপ্তর হতেই জেলা ক্রীড়া সমিতিগুলোর মাধ্যমে সারা দেশের খেলাধুলার কার্যক্রম দেখাশোনা ও পরিচালনা করে। এই ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন যার সদরদপ্তরও ঢাকায় অবস্থিত। উল্লেখযোগ্য ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো হলো: বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন, বাংলাদেশ বাস্কেটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ শ্যুটিং ফেডারেশন, বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন, বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন, বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন, বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশন, বাংলাদেশ আর্চারী ফেডারেশন, বাংলাদেশ এ্যামেচার এথলেটিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ খো খো ফেডারেশন, বাংলাদেশ তাইকুন্ডু ফেডারেশন।

ঢাকার উল্লেখযোগ্য খেলাধুলার কেন্দ্রগুলো হচ্ছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকা সংলগ্ন আউটার স্টেডিয়াম, ন্যাশনাল সুইমিংপুল, মাওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম, মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়াম, উডেনফ্লোর জিমনেশিয়াম, ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতি; মিরপুর জাতীয় ষ্টেডিয়াম ও তা সংলগ্ন সুইমিংপুল কমপ্লেক্স; মিরপুর জাতীয় ইনডোর স্টেডিয়াম; বনানীর আর্মি স্টেডিয়াম ও নৌবাহিনীর সুইমিং কমপ্লেক্স। এছাড়াও ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাব মাঠ, ধানমন্ডি ক্লাব মাঠ এবং কলাবাগান ক্লাব মাঠেও সারা বছর ধরে বিভিন্ন লীগ ও টুর্নামেন্টের খেলা চলে।

ঐতিহাসিক স্থানসমূহ: লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারিবাজার, হোসেনী দালান, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, কার্জন হল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ভবন (পুরাতন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন), ঢাকেশ্বরী মন্দির, তারা মসজিদ, মীর জুমলা গেট, পরীবিবির মাজার

পার্ক , বিনোদন ও প্রাকৃতিক স্থানঃ রমনা পার্ক, বাহাদুর শাহ্‌ পার্ক- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা শিশু পার্ক, বুড়িগঙ্গা নদী, ঢাকা চিড়িয়াখানা, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, বলধা গার্ডেন

স্মৃতিসৌধ ও স্মারকঃ জাতীয় শহীদ মিনার, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, (রায়ের বাজার), অপরাজেয় বাংলা-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ ভাস্কর্য আসাদ গেইট

আধুনিক স্থাপত্যঃ জাতীয় সংসদ ভবন, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন, ভাসানী নভো থিয়েটার, বসুন্ধরা সিটি,যমুনা ফিউচার পার্ক, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ।

হ্রদঃ 
ধানমন্ডী হ্রদ, গুলশান হ্রদ, বনানী হ্রদ, ডিয়া বাড়ি হ্রদ,

ঝিল
হাতিরঝিল




#Article 12: চট্টগ্রাম (3122 words)


চট্টগ্রাম (ঐতিহাসিক নাম: পোর্টো গ্র্যান্ডে এবং ইসলামাবাদ) বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বন্দরনগরী নামে পরিচিত শহর, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়, সমুদ্রে এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত। ঢাকার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ শহর হচ্ছে চট্টগ্রাম। এখানে দেশের সর্ববৃহৎ বন্দর ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এটি এশিয়ায় ৭ম এবং বিশ্বের ১০ম দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শহর।

চট্টগ্রামের বুৎপত্তি অনিশ্চিত। একটি ব্যাখ্যার কৃতিত্ব প্রথম আরব ব্যবসায়ীদের শাত (ব-দ্বীপ) ও গঙ্গা (গঙ্গা) আরবি শব্দসমূহের সমন্বয়ের জন্য।

সীতাকুণ্ড এলাকায় পাওয়া প্রস্তরীভূত অস্ত্র এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট প্রস্তর খণ্ড থেকে ধারণা করা হয় যে, এ অঞ্চলে নব্যপ্রস্তর যুগে অস্ট্রো-এশীয়াটিক জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তবে, অচিরে মঙ্গোলদের দ্বারা তারা বিতাড়িত হয়। লিখিত ইতিহাসে সম্ভবত প্রথম উল্লেখ গ্রিক ভৌগোলিক প্লিনির লিখিত পেরিপ্লাস। সেখানে ক্রিস নামে যে স্থানের বর্ণনা রয়েছে ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে সেটি বর্তমানের সন্দ্বীপ। ঐতিহাসিক ল্যাসেনের ধারণা সেখানে উল্লিখিত পেন্টাপোলিশ আসলে চট্টগ্রামেরই আদিনাম। মৌর্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত নয় তবে পূর্ব নোয়াখালির শিলুয়াতে মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী লিপিতে একটি মূর্তির পাদলিপি পাওয়া গেছে।

তিব্বতের বৌদ্ধ ঐতিহাসিক লামা তারানাথের একটি গ্রন্থে চন্দ্রবংশের শাসনামলের কথা দেখা যায় যার রাজধানী ছিল চট্টগ্রাম। এর উল্লেখ আরাকানের সিথাং মন্দিরের শিলালিপিতেও আছে। তারানাথের গ্রন্থে দশম শতকে গোপীনাথ চন্দ্র নামের রাজার কথা রয়েছে।। সে সময় আরব বণিকদের চট্টগ্রামে আগমন ঘটে। আরব ভূগোলবিদদের বর্ণনার ‘সমুন্দর’ নামের বন্দরটি যে আসলে চট্টগ্রাম বন্দর তা নিয়ে এখন ঐতিহাসিকরা মোটামুটি নিশ্চিত। সে সময় পালবংশের রাজা ছিলেন ধর্মপাল। পাল বংশের পর এ অঞ্চলে একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃষ্টি হয়।

৯৫৩ সালে আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজা সু-লা‌-তাইং-সন্দয়া চট্টগ্রাম অভিযানে আসলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি বেশি দূর অগ্রসর না হয়ে একটি স্তম্ভ তৈরি করেন। এটির গায়ে লেখা হয় ‘চেৎ-ত-গৌঙ্গ’ যার অর্থ ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’। সে থেকে এ এলাকাটি চৈত্তগৌং হয়ে যায় বলে লেখা হয়েছে আরাকানি পুঁথি ‘রাজাওয়াং’-এ। এ চৈত্তগৌং থেকে কালক্রমে চাটিগ্রাম, চাটগাঁ, চট্টগ্রাম, চিটাগাং ইত্যাদি বানানের চল হয়েছে।

চন্দ্রবংশের পর লালবংশ এবং এরপর কয়েকজন রাজার কথা কিছু ঐতিহাসিক উল্লেখ করলেও ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন তালিশের মতে ১৩৩৮ সালে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের‌ চট্টগ্রাম বিজয়ের আগ পর্যন্ত ইতিহাস অস্পষ্ট। এ বিজয়ের ফলে চট্টগ্রাম স্বাধীন সোনারগাঁও রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময়ে প্রায় ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম আসেন বিখ্যাত মুর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি লিখেছেন - “বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রবেশ করলাম তা হল সোদকাওয়াঙ (চট্টগ্রাম)। এটি মহাসমূদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর, এরই কাছে গঙ্গা নদী- যেখানে হিন্দুরা তীর্থ করেন এবং যমুনা নদী একসঙ্গে মিলেছে এবং সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে তারা সমুদ্রে পড়েছে। গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য জাহাজ ছিল, সেইগুলি দিয়ে তারা লখনৌতির লোকেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ...আমি সোদওয়াঙ ত্যাগ করে কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার দিকে রওনা হলাম।”

১৩৫২‌-১৩৫৩ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে হত্যা করে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার মসনদ দখল করলে চট্টগ্রামও তার করতলগত হয়। তার সময়ে চট্টগ্রাম বাংলার প্রধান বন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর হিন্দুরাজা গণেশ ও তার বংশধররা চট্টগ্রাম শাসন করেন। এরপরে বাংলায় হাবশি বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৯২ সালে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বাংলার সুলতান হন। চট্টগ্রামের দখল নিয়ে তাকে ১৪১৩-১৪১৭ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরার রাজা ধনমানিকের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজা ধনমানিকের মৃত্যুর পর হোসেন শাহ‌ের রাজত্ব উত্তর আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার সময়ে উত্তর চট্টগ্রামের নায়েব পরবগল খানের পুত্র ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের একটি পর্বের বঙ্গানুবাদ করেন।

১৫১৭ সাল থেকে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে আসতে শুরু করে। বাণিজ্যের চেয়ে তাদের মধ্যে জলদস্যুতার বিষয়টি প্রবল ছিল। বাংলার সুলতান প্রবলভাবে তাদের দমনের চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সময় আফগান শাসক শের শাহ বাংলা আক্রমণ করবেন শুনে ভীত হয়ে গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ পর্তুগিজদের সহায়তা কামনা করেন। তখন সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ১৫৩৭ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। একই সঙ্গে তাদেরকে বন্দর এলাকার শুল্ক আদায়ের অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১৫৩৮ সালে শের শাহ‌ের সেনাপতি চট্টগ্রাম দখল করেন। তবে ১৫৮০ সাল পর্যন্ত আফগান শাসনামলে সবসময় ত্রিপুরা আর আরাকানিদের সঙ্গে যুদ্ধ চলেছে।

১৫৮১ সাল থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে আরাকানের রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। তবে পর্তুগিজ জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য এ সময় খুবই বৃদ্ধি পায়। বাধ্য হয়ে আরাকান রাজা ১৬০৩ ও ১৬০৭ সালে শক্ত হাতে পর্তুগিজদের দমন করেন। ১৬০৭ সালেই ফরাসি পরিব্রাজক ডি লাভাল চট্টগ্রাম সফর করেন। তবে সে সময় পর্তুগিজ জলদস্যু গঞ্জালেস সন্দ্বীপ দখল করে রেখেছিলেন। পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানরিক ১৬৩০-১৬৩৪ সময়কালে চট্টগ্রামে উপস্থিতকালে চট্টগ্রাম শাসক আলামেনের প্রশংসা করে যান। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মুঘলদের হস্তগত হয়।

চট্টগ্রামে আরাকানি শাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম আরাকানিদের কাছ থেকে অনেক কিছুই গ্রহণ করে। জমির পরিমাণে মঘী কানির ব্যবহার এখনো চট্টগ্রামে রয়েছে। মঘী সনের ব্যবহারও দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল। সে সময়ে আরাকানে মুসলিম জনবসতি বাড়ে। আরকান রাজসভায় মহাকবি আলাওল, দৌলত কাজী এবং কোরেশী মাগণ ঠাকুর এর মতো বাংলা কবিদের সাধনা আর পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি হয়। পদ্মাবতী আলাওলের অন্যতম কাব্য।

১৬৬৬ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানকে চট্টগ্রাম দখলের নির্দেশ দেন। সুবেদারের পুত্র উমেদ খানের নেতৃত্বে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আরাকানিদের পরাজিত করেন এবং আরাকানি দুর্গ দখল করেন। যথারীতি পর্তুগিজরা আরাকানিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুঘলদের পক্ষ নেয়। মুঘল সেনাপতি উমেদ খান চট্টগ্রামের প্রথম ফৌজদারের দায়িত্ব পান। শুরু হয় চট্টগ্রামে মুঘল শাসন। তবে মুঘলদের শাসনামলের পুরোটা সময় আরাকানিরা চট্টগ্রাম অধিকারের চেষ্টা চালায়। টমাস প্রাট নামে এক ইংরেজ আরাকানিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে মুঘলদের পরাজিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কোলকাতার গোড়াপত্তনকারী ইংরেজ জব চার্নকও ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দখলের ব্যর্থ অভিযান চালান। ১৬৮৮ সালে ক্যাপ্টেন হিথেরও অনুরূপ অভিযান সফল হয় নি। ১৬৭০ ও ১৭১০ সালে আরাকানিরা চট্টগ্রামের সীমান্তে ব্যর্থ হয়।

১৭২৫ সালে প্রায় ৩০ হাজার মগ সৈন্য চট্টগ্রামে ঢুকে পড়ে চট্টগ্রামবাসীকে বিপদাপন্ন করে তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলার নবাব তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। এই সময় বাংলার নবাবদের কারণে ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দর কোনভাবেই দখল করতে পারেনি। বাংলার নবাবরা পার্বত্য এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে, বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সদ্ভাব বজায় রাখেন।

পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নবাব মীর জাফরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে, মীর জাফর কোনভাবেই ইংরেজদের চট্টগ্রাম বন্দরের কর্তৃত্ব দিতে রাজি হন নি। ফলে, ইংরেজরা তাকে সরিয়ে মীর কাশিমকে বাংলার নবাব বানানোর ষড়যন্ত্র করে। ১৭৬১ সালে মীর জাফরকে অপসারণ করে মীর কাশিম বাংলার নবাব হয়ে ইংরেজদের বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম হস্তান্তরিত করেন। চট্টগ্রামের শেষ ফৌজদার রেজা খান সরকারিভাবে চট্টগ্রামের শাসন প্রথম ইংরেজ চিফ ভেরেলস্ট-এর হাতে সমর্পণ করেন। শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন।

কোম্পানির শাসনামলে চট্টগ্রামবাসীর ওপর করারোপ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। তবে ১৮৫৭ সালের আগে চাকমাদের বিদ্রোহ আর সন্দ্বীপের জমিদার আবু তোরাপের বিদ্রোহ ছাড়া ইংরেজ কোম্পানিকে তেমন একটা কঠিন সময় পার করতে হয়নি। সন্দ্বীপের জমিদার আবু তোরাপ কৃষকদের সংগঠিত করে ইংরেজদের প্রতিরোধ করেন। কিন্তু ১৭৭৬ সালে হরিষপুরের যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হলে সন্দ্বীপের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে। অন্যদিকে ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত চাকমারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সম্মুখ সমরে চাকমাদের কাবু করতে না পেরে ইংরেজরা তাদের বিরুদ্ধে কঠিন অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে শেষ পর্যন্ত চাকমাদের কাবু করে।

ইংরেজরা আন্দরকিল্লা জামে মসজিদকে গোলাবারুদের গুদামে পরিণত করলে চট্টগ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মসজিদের জন্য নবাবি আমলে প্রদত্ত লাখেরাজ জমি ১৮৩৮ সালের জরিপের সময় বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে চট্টগ্রামের জমিদার খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান কলিকাতায় গিয়ে গভর্নরের কাছে আবেদন করে এটি উদ্ধার করার ব্যবস্থা করেন।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় পুরো ভারতবর্ষের বিদ্রোহের ঢেউ চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ৩৪তম বেঙ্গল পদাতিক রেজিমেন্টের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ কোম্পানীগুলি তখন চট্টগ্রামে মোতায়েন ছিল। ১৮ নভেম্বর রাতে উল্লিখিত তিনটি কোম্পানী হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা ব্রিটিশ জেলখানায় আক্রমন করে সকল বন্দীকে মুক্ত করে।  সিপাহী জামাল খান ছিলেন রজব আলীর অন্যতম সহযোগী।  সিপাহিরা ৩টি সরকারি হাতি, গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্ন রসদ নিয়ে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে। তারা পার্বত্য ত্রিপুরার সীমান্ত পথ ধরে এগিয়ে সিলেট ও কাছাড়ে পৌঁছে। স্বাধীনতাকামী হিসেবে ত্রিপুরা রাজের সমর্থন কামনা করেন কিন্তু ত্রিপুরা রাজ ইংরেজদের হয়ে তাদের বাঁধা দেন। একই অবস্থা হয় আরো বিভিন্ন যায়গায়।  এভাবে বিভিন্ন স্থানে লড়াই করতে গিয়ে একসময়  রসদের অভাবে বিদ্রোহীরা শক্তিহীন হয়ে পড়ে। শেষে ১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি সিলেটের মনিপুরে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে এক লড়াই-এই বিদ্রোহের অবসান হয়।

বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বে ২০°৩৫’ থেকে ২২°৫৯’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°২৭’থেকে ৯২°২২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বরাবর এর অবস্থান। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপকূলীয় পাদদেশকে বিস্তৃত করে। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহর সহ ব্যবসায় জেলা দক্ষিণ তীর ধরে বয়ে চলেছে। নদীটি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে এবং ১২ কিলোমিটার মোহনা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মুল শহর বিস্তুৃত। সীতাকুন্ড পাহাড় চট্টগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ শিখর, যার উচ্চতা ৩৫১ মিটার (১,১৫২ ফুট)। বাটালি পাহাড় শহরের মধ্যকার সর্বোচ্চ স্থান, যার উচ্চতা ৮৫.৩ মিটার (২৮০ ফুট। চট্টগ্রামে অনেকগুলি হ্রদ রয়েছে যা মুঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল। ১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং দল ফয়েস হ্রদটি খনন করেছিল। চট্টগ্রামের উত্তরে সিলেট বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মেঘনা নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য, ত্রিপুরা ও মায়ানমার এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ। এছাড়াও চট্টগ্রামের পূর্বে পার্বত্য জেলাসমূহ এবং দক্ষিণে কক্সবাজার জেলা রয়েছে। চট্টগ্রাম শহর উত্তরে ফৌজদারহাট, দক্ষিণে কালুরঘাট এবং পূর্বে হাটহাজারী পর্যন্ত বিস্তৃত।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত চট্টগ্রামেও ছয় ঋতু দেখা যায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এ অঞ্চলে শীতকাল, মার্চ, এপ্রিল, মে-তে গ্রীষ্মকাল দেখা যায়। জুন, জুলাই, আগস্ট পর্যন্ত বর্ষাকাল। তবে ইদানীং আবহাওয়ার কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়।

কোপেন জলবায়ু শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী চট্টগ্রামে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু (অ্যাম) বিদ্যমান।

১৯৯১ প্রানঘাতী ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামের ১৩৮০০০ জন নিহত এবং ১০ মিলিয়নের বেশি গৃহহীন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে।

চট্টগ্রাম শহর এলাকা ১৬টি থানার অধীনঃ চান্দগাঁও, বায়জীদ বোস্তামী, বন্দর, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, কর্ণফুলী, হালিশহর, খুলশী থানা এবং নবগঠিত চকবাজার, আকবরশাহ, সদরঘাট ও ইপিজেড ।

চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে ৪১টি ওয়ার্ড এবং ২৩৬টি মহল্লা। শহরের মোট এলাকা হলো ১৬৮.০৭ বর্গ কিলোমিটার।

১৮৬৩ সালের ২২শে জুন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি'র যাত্রা শুরু। তবে এর প্রশাসন ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৮ জন কমিশনার সমন্বয়ে পরিষদ গঠন করা হয় ১৮৬৪ সালে। ঐসময়ে চট্টগ্রাম শহরের সাড়ে চার বর্গমাইল এলাকা মিউনিসিপ্যালিটির আওতাধীন ছিল। প্রথমে ৪টি ওয়ার্ড থাকলেও ১৯১১ সালে ৫টি ওয়ার্ড সৃষ্টি করা হয়। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিটি কর্পোরেশনে রুপান্তরিত হয়। বর্তমানে ওয়ার্ড সংখ্যা ৪১টি। চট্টগ্রাম শহর এলাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর অধীনস্থ। শহরবাসীদের সরাসরি ভোটে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং ওয়ার্ড কমিশনারগণ নির্বাচিত হন। বর্তমানে এই শহরের মেয়র আ.জ.ম নাছির। শহরের আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিযুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এর সদর দপ্তর দামপাড়ায় অবস্থিত। চট্টগ্রামের প্রধান আদালতের স্থান লালদীঘি ও কোতোয়ালী এলাকায় ঐতিহাসিক কোর্ট বিল্ডিং এ।

চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যা ২৫০০০০ জনেরও বেশি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জনসংখ্যা ৪,০০৯,৪২৩ জন। ২০০২ সালের তথ্য অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা ৫৪.৩৬% হল পুরুষ এবং ৪৫.৬৪% হল মহিলা, এবং শহরে সাক্ষরতার হার ৬০% শতাংশ ছিল। মুসলমানরা ৮৬% জনসংখ্যার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বাকী ১২% হিন্দু এবং ২% অন্যান্য ধর্ম লোক বসবাস করে।

বাংলায় সুলতানি ও মুঘল শাসনামলে চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠীর একটি বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। সপ্তম শতাব্দীর প্রথমদিকে মুসলিম অভিবাসন শুরু হয়েছিল এবং মধ্যযুগীয় সময়ে উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনবসতি গড়ে উঠেছিল। পারস্য ও আরব থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী, শাসক এবং প্রচারকরা প্রথমদিকে মুসলমান বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তাদের বংশধররা এই শহরের বর্তমান মুসলিম জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ। শহরে ইসমাইলিস এবং যাযাবর শিয়া সহ অপেক্ষাকৃত ধনী এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। এই শহরে অনেক জাতিগত সংখ্যালঘুও রয়েছে, বিশেষত চাকমা, রাখাইন এবং ত্রিপুরী সহ চট্টগ্রাম বিভাগের সীমান্তবর্তী পাহাড়ের আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্য; এবং তার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছে। বারুয়াস নামে পরিচিত এ অঞ্চলের বাংলাভাষী থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্মের সর্বশেষ অবশেষ। প্রায়শই ফায়ারিংস নামে পরিচিত, পর্তুগিজ জনগোষ্ঠীর বংশোদ্ভূত চট্টগ্রামের প্রাচীন ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়, যারা পাতেরঘাটা পুরানো পর্তুগিজ ছিটমহলে বাস করেন। এখানে একটি ছোট্ট উর্দুভাষী বিহারি সম্প্রদায়ও রয়েছে, যারা বিহারি কলোনি নামে পরিচিত জাতিগত ছিটমহলে বসবাস করে।

দক্ষিণ এশীয়ার অন্যান্য প্রধান নগর কেন্দ্রগুলির মতো, এ মহানগরেরও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলমুখি মানুষের ঢলের ফলস্বরূপ চট্টগ্রামের বস্তিগুলোর অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকাশনার তথ্য অনুসারে, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১,৮১৪ টি বস্তি রয়েছে, যাতে প্রায় ১৮০,০০০ বস্তিবাসী বসবাস করে, যা রাজধানী ঢাকার পরে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বস্তিবাসীরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রায়শই উচ্ছেদের মুখোমুখি হন এবং তাদের সরকারি জমিতে অবৈধ আবাসনের জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

চট্টগ্রামের মানুষ ভোজন রসিক হিসেবে পরিচিত। তারা যেমন নিজেরা খেতে পছন্দ করেন, তেমনি অতিথি আপ্যায়নেও সেরা। চট্টগ্রামের মেজবান হচ্ছে তার বড় উদাহরণ। শুঁটকি, মধুভাত, বেলা বিস্কুট, বাকরখানি, লক্ষিশাক,গরুর গোস্ত ভুনা, পেলন ডাল, কালাভুনা, বিরিয়ানি, মেজবানি মাংস, আফলাতুন হালুয়া, তাল পিঠা, নোনা ইলিশ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য।

চট্টগ্রামে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয় ষোড়শ শতকে। সে সময়কার চট্টগ্রামের শাসক পরাগল খাঁ এবং তার পুত্র ছুটি খাঁর সভা কবি ছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী। কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের একটি সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ করেন। আর শ্রীকর নন্দী জৈমিনি সংহিতা অবলম্বনে অশ্বমেধ পর্বের বিস্তারিত অনুবাদ করেন।

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। জানা ইতিহাসের শুরু থেকে চট্টগ্রামে আরাকানী মঘীদের প্রভাব লক্ষনীয়। ফলে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সে সময় এখানকার রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হওয়ায় তার প্রভাবও যথেষ্ট। সুলতানি, আফগান এবং মোগল আমলেও আরাকানীদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত মঘীদের প্রভাব বিলুপ্ত হয়নি। এছাড়া চট্টগ্রামের মানুষ আতিথেয়তার জন্য দেশ বিখ্যাত।

চট্টগ্রামের বর্তমান সংস্কৃতির উন্মেষ হয় ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক ধানোৎপাদন ও বণ্টনে পদ্ধতিগত আমূল পরিবর্তন হয়। অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও একটি নতুন মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। নতুন এরই ফাঁকে ইংরেজরা প্রচলনা করে ইংরেজি শিক্ষা। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাস সমৃদ্ধ। শেফালী ঘোষ এবং শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবকে বলা হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞি। আর অসংখ্য আঞ্চলিক গান ও মাইজভান্ডারী গান এর রচয়িতা আবদুল গফুর হালী বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে গীত দরিয়া বা গানের সাগর নামে পরিচিত । আঞ্চলিক গান, মাইজভান্ডারী গান ও কবিয়াল গান চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য। কবিয়াল রমেশ শীল একজন বিখ্যাত কিংবদন্তি শিল্পী। জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলস, এল আর বি, রেঁনেসা, নগরবাউল এর জন্ম চট্টগ্রাম থেকেই। আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, নকীব খান, পার্থ বডুয়া, সন্দিপন, নাসিম আলি খান, মিলা ইসলাম চট্টগ্রামের সন্তান। নৃত্যে চট্টগ্রামের ইতিহাস মনে রখার মত। রুনু বিশ্বাস জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত নৃত্যগুরু। চট্টগ্রামের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন হল দৃষ্টি চট্টগ্রাম, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা, অঙ্গণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমি, প্রাপন একাডেমি, উদিচি, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, ফু্লকি, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, রক্তকরবী, আর্য সঙ্গীত, সঙ্গীত পরিষদ। মডেল তারকা নোবেল, মৌটুসি, পূর্ণিমা,শ্রাবস্তীর চট্টগ্রামে জন্ম ।
সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি, মুসলিম হল, থিয়েটার ইন্সটিটিউটে।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের অর্থনীতিও কৃষি ও বাণিজ্য নির্ভর।দরিদ্রতা, দারিদ্রর হার ৪০ শতাংশ। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা EPZ চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়।

চট্টগ্রামের কৃষির প্রধান শস্য ধান। এছাড়া শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ব্যাপক শাকসবজির চাষ হয়। উল্লেখযোগ্য শাকসবজির মধ্যে রয়েছে- বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, সাদা কুমড়া, লাউ, ঢেড়শ, ঝিংগা, চিচিংগা, শশা, বরবটি, সীম, মটরশুঁটি, টমেটো, মুলা, বীট, গাজর, শালগম, ফুলকপি, বাধাকপি, পটল করলা, বিভিন্ন রকমের শাক ইত্যাদি। ফলমূলের ক্ষেত্রে নারিকেলই মুখ্য। তবে, আম, কলা ও কাঁঠালের উৎপাদনও হয়ে থাকে।

১৯৬০ এর দশকে শংখ ও মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকায় তামাক চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি (এখন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানী) রাঙ্গুনিয়াতে তামাক চাষের ব্যবস্থা করে এবং পরে লাভজনক হওয়ায় চাষীরা তা অব্যাহত রাখে।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় লবণ চাষ লাভজনক। ইতিহাসে দেখা যায় ১৭৯৫ সালে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে গড়ে বার্ষিক ১৫ লাখ টন লবণ উৎপন্ন হতো। 

চট্টগ্রাম জেলায় মাছচাষের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। সমুদ্র এবং নদী-নালার প্রাচূর্য এর মূল কারণ। শহরের অদূরের হালদা নদীর উৎসমুখ থেকে মদুনাঘাট পর্ষন্ত মিঠা পানির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হিসাবে বেশ উর্বর। বৃহত্তর চট্টগ্রামে দিঘি, বিল ও হাওড়ের সংখ্যা ৫৬৮, পুকুর ও ডোবার সংখ্যা ৯৫,৯৪১। মোট আয়তন ৮৫,৭০০ একর (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ১৯৮১), কর্ণফুলী নদীর মোহনায় প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার একর বিস্তৃত মাছ ধরার জায়গা হিসাবে চিহ্নিত।

রপ্তানির ক্ষেত্রে সামুদ্রিক মাছ হাঙ্গর, স্কেট, রে, হেরিং, শার্কফিন এবং চিংড়ি উল্লেখ্য।

চট্টগ্রামের মাছ চাষ ও আহরণের একটি উল্ল্যেখযোগ্য দিক হলে শুঁটকি (মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ করা)। সোনাদিয়া, সন্দ্বীপ প্রভৃতি দ্বীপাঞ্চল থেকে শুঁটকি মাছ চট্টগ্রামের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়। ব্রিটিশ আমলে শুঁটকি রেঙ্গুনে রপ্তানি করা হতো।

বন্দর নগরী হিসাবে ব্রিটিশ-পূর্ব, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান পর্বে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। বন্দরভিত্তিক কর্মকান্ড ছাড়াও ব্রিটিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়। পাকিস্তান পর্বে চট্টগ্রামে ভারী শিল্প যেমন - ইস্পাত, মোটরগাড়ি, পাট, বস্ত্র, সুতা, তামাক, ম্যাচ ও ঔষধ শিল্পের কারখানা গড়ে ওঠে। তাছাড়া কিছু বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তরও চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে।

চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ভারতের অন্যান্য স্থানের মতো ধর্ম ভিত্তিক তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। আরবি নির্ভর মুসলমানদের জন্য মক্তব-মাদ্রাসা, সংস্কৃত ভাষা নির্ভর হিন্দুদের জন্য টোল-পাঠশালা‌-চতুষ্পাঠী এবং বৌদ্ধদের জন্য কেয়াং বা বিহার। সে সময় রাষ্ট্রাচারের ভাষা ছিল ফার্সি। ফলে হিন্দুদের অনেকে ফার্সি ভাষা শিখতেন। আবার রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনসংযোগের জন্য মুসলিম আলেমদের সংস্কৃত জানাটা ছিল দরকারি। এ সকল প্রতিষ্ঠানে হাতে লেখা বই ব্যবহৃত হতো। ইংরেজদের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার আগ পর্যন্ত এই তিন ধারাই ছিল চট্টগ্রামের শিক্ষার মূল বৈশিষ্ট্য।

১৭৬০ সালে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠত হলেও ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের কোন উদ্যোগ দেখা যায় নি, সমগ্র ভারত বর্ষে। ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মাদ্রাসা ছাড়া শিক্ষা বিস্তারে কোম্পানির আর কোন উদ্যোগ ছিল না। ১৮১৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আইন পাশ করে। এর পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে মিশনারী স্কুলের সংখ্যা বাড়ে তবে ১৮৩৬ এর আগে চট্টগ্রামে সে মাপের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে নি। ১৮৩৬ সালে জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন চট্টগ্রাম জেলা স্কুল নামে প্রথম ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান চালু করে। এলাকার খ্রীস্টান মিশনারীরা ১৮৪১ সালে সেন্ট প্লাসিড্‌স হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৪৪ সালে ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ রাজকার্যে নিয়োগ পাওয়ার জন্য ইংরেজি জানা আবশ্যক ঘোষণা করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ে। ১৮৫৬ ও ১৮৭১ সালে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেগুলো ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠত হয়। ১৮৮৫ সালে শেখ‌-ই-চাটগাম কাজেম আলী চিটাগাং ইংলিশ স্কুল নামে একটি মধ্য ইংরেজি স্কুল (অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৮ সালে এটি হাই স্কুলে উন্নীত হয়।

এছাড়া শহরে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ইউএসটিসি, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ, সাউদার্ন মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম ডেন্টাল কলেজ রয়েছে।

চট্টগ্রাম শহরের মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ

ইত্যাদি

উল্লেখযোগ্য কলেজের মধ্যে রয়েছে-

ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে আছে

শহরের একমাত্র আমেরিকান কারিকুলাম ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উইলিয়াম কেরি একাডেমি।

এছাড়াও এখানে সুন্নি(বেরলভী) আক্বিদা ভিত্তিক  জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা  অবস্থিত। আরেকটি উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসা হলো বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা।

বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামে বিভিন্ন জনপ্রিয় খেলা যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, বিলিয়ার্ড, টেবিল টেনিস, অ্যাথলেটিক্স, সকার, দাবা, বাস্কেটবল , হকি, কাবাডি, ভলিবল ইত্যাদি প্রচলিত রয়েছে। ব্যাডমিন্টনও একটি অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিকগণ অবশ্য বেশ কিছু প্রাচীন খেলার কথা উল্লেখ করে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে বলীখেলা, গরুর লড়াই. তুম্বুরু, চুঁয়াখেলা, ঘাডুঘাডু, টুনি ভাইয়র টুনি, তৈইক্যা চুরি, হাতগুত্তি, কইল্যা, কড়ি, নাউট্টা চড়াই, ডাংগুলি, নৌকা বাইচ ইত্যাদি। এর মধ্যে জব্বারের বলীখেলার কারণে বলীখেলা, কুস্তি এবং নৌকা বাইচ এখনও চালু আছে। গ্রামাঞ্চলে বৈচি, ডাংগুলি এখনো দৃষ্টি আকর্ষন করে। তবে, অন্যগুলোর তেমন কোন প্রচলন দেখা যায় না।

জাতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রামের খেলোয়াড়দের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। দেশের বাইরে থেকে সুনাম আনার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের ক্রীড়াবিদদের অবদান উল্লেখযোগ্য। আইসিসি ট্রফি জেতা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দলনেতা ছিলেন আকরাম খান। কমনওয়েলথ গেমস থেকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম স্বর্ণপদক অর্জনকারী চট্টগ্রামের শুটার আতিকুর রহমান।

চট্টগ্রামের স্প্রিন্টার মোশাররফ হোসেন শামীম জাতীয় পর্যায়ে পরপর ৭ বার ১০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন হোন। এ কারণে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ দল যখন প্রথম বিশ্ব অলিম্পিকে অংশ নেয় তখন মোশাররফ হোসেন শামীম বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র ক্রীড়াবিদ ছিলেন।

চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গণের মূল কেন্দ্র চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়াম । চট্টগ্রামের প্রধান ক্রীড়া সংগঠন চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া পরিষদের প্রধান কার্যালয় এই স্টেডিয়ামে। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম দেশ এর অন্যতম ক্রিকেট স্টেডিয়াম ।

চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য দৈনিক পত্রিকার মধ্যে রয়েছে দৈনিক আজাদী, দৈনিক পূর্বকোণ , দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ এবং দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ।
এছাড়া জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর চট্টগ্রাম সংস্করন বের হয়। সাপ্তাহিক পত্রিকা : সাপ্তাহিক চট্টগ্রাম দর্পণ, সাপ্তাহিক চাটগাঁর সংবাদ, সাপ্তাহিক চট্টলা,সাপ্তাহিক শ্লোগান,সাপ্তাহিক ইসতেহাদ,সাপ্তাহিক রায়হান।

বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মূল স্টুডিও আগ্রাবাদে অবস্থিত। এছাড়া কালুরঘাটে একটি বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনএর চট্টগ্রাম কেন্দ্র পাহাড়তলীতে অবস্থিত।
বেসরকারি এফএম রেডিও রেডিও ফুর্তি এবং রেডিও টুডের চট্টগ্রাম সম্প্রচার কেন্দ্র রয়েছে।

ঐতিহাসিক স্থানসমূহঃ

পার্ক , বিনোদন ও প্রাকৃতিক স্থানঃ

স্মৃতিসৌধ ও স্মারকঃ




#Article 13: রাজশাহী (850 words)


 

 
 
রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐত্যিহবাহী মহানগরী। এটি উত্তরবঙ্গের সবথেকে বড় শহর। রাজশাহী শহর পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। যা রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় শহর। রাজশাহী শহরের নিকটে প্রাচীন বাংলার বেশ কয়েকটি রাজধানী শহর অবস্থিত। এদের মাঝে লক্ষণৌতি বা লক্ষনাবতি, মহাস্থানগড় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রাজশাহী তার আকর্ষণীয় রেশমীবস্ত্র, আম, লিচু এবং মিষ্টান্নসামগ্রীর জন্য প্রসিদ্ধ। রেশমীবস্ত্রের কারণে রাজশাহীকে রেশমনগরী নামে ডাকা হয়। রাজশাহী শহরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের অনেকগুলোর খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। নামকরা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাজশাহী শহর শিক্ষানগরী নামেও পরিচিত। রাজশাহী শহরে এবং এর আশেপাশে বেশ কিছু বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয় তথা ঐতিহাসিক স্থাপনা  রয়েছে।
শহরটি নওহাটা এবং কাটাখালী এ দুটি স্যাটেলাইট টাউন বা উপগ্রহ শহর দ্বারা বেষ্টিত। এ দুটি শহর এবং রাজশাহী শহর একসাথে প্রায় ১ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটি মহানগর এলাকায় পরিণত হয়েছে। রাজশাহী বাংলাদেশের শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ। 

রাজশাহী সুপ্রাচীন ঐতিহ্য মণ্ডিত একটি শহর। অনেক আগে থেকে এই শহরটি প্রাচীন বাংলায় পরিচিত ছিল।

রাজশাহী ছিল প্রাচীন বাংলার পুন্ড্র সাম্রাজ্যের অংশ। বিখ্যাত সেন বংশের রাজা বিজয় সেনের সময়ের রাজধানী বর্তমান রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে অবস্থিত ছিল। মধ্যযুগে বর্তমান রাজশাহী পরিচিত ছিল রামপুর বোয়ালিয়া নামে। এর সূত্র ধরে এখনও রাজশাহী শহরের একটি থানার নাম বোয়ালিয়া।

রাজশাহী শহরকে কেন্দ্র করে ১৭৭২ সালে জেলা গঠন করা হয়। ১৮৭৬ সালে গঠিত হয় রাজশাহী পৌরসভা। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হয়।

ব্রিটিশ রাজত্বের সময়েও রাজশাহী বোয়ালিয়া নামে পরিচিত ছিল। তখন এটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের অর্ন্তগত রাজশাহী জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। রাজশাহীকে সে সময়ে রেশম চাষের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। তখন রাজশাহীতে একটি সরকারী কলেজ ও রেশম শিল্পের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। সেসময় থেকে দেশবিভাগের পূর্ব পর্যন্ত পদ্মা নদীর উপর দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীবাহী স্টিমার চলাচল করত।

১২ জুন ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে রাজশাহী শহরের বেশীরভাগ ভবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে অনেক ভবন আবার নতুন করে স্থাপিত হয়।

রাজশাহী শহরটি দীর্ঘদিন ধরে পুরনো সংস্কৃতি বজায় রেখে এক প্রকার অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিলো । কিন্তু প্রাচীন এই শহরটি আধুনিকতার পরশে নতুন রুপে সজ্জিত হয় ২০০৯ সালের পর থেকে । জনাব খাইরুজ্জামান লিটন 
যখন রাজশাহীর মেয়র পদে অধিষ্ট হন তখন দৃশ্যপটের পরিবর্তন হতে শুরু করে। ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার পাড়কে সংস্কার করে পার্কের রুপ দান করেন । যেখানে শহরের বাসিন্দারা বিকেলে পরিবারের সবার সাথে একান্তে কিছু সময় কাটাতে পারেন । আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে পদ্মার ধারে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধাও দেওয়া হয় তার  প্রচেষ্টায় ।

রাজশাহীতে এখন প্রায় ১৫টি সফটওয়ার ফার্ম আছে। তাছাড়া এখানে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রায় ১০টি ট্রেনিং সেন্টার আছে; যা দিন দিন বাড়ছে। এখানে বড় দুইটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় আইটির লোকবলের কোন অভাব নেই।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজশাহী তথা সারা বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মরণীয় এবং গৌরবময় অধ্যায় হচ্ছে রাজশাহী পুলিশ লাইনের রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ যুদ্ধ। ১৯৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি জনপদে আন্দোলনরত ছাত্র জনতার সাথে সকল স্তরের পুলিশ সদস্যগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। এ সকল ঘটনা সমূহ জেলা, মহকুমা ও থানা পর্যায়ের সংগ্রামী জনগণকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে তোলে। ২৫শে মার্চের কালো রাত্রে রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণের সংবাদ সারাদেশে ছড়িয়ে পরে। রাজশাহী পুলিশ লাইন সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা বাঙালী পুলিশ সদস্যদের মনের মধ্যে কাজ করেছিল। এ সকল কারণে আগে থেকেই রাজশাহী পুলিশ লাইনের পুলিশ সদস্যগণ মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাজশাহী পুলিশ লাইনের বাঙালী পুলিশ সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য পুলিশ লাইনের চতুর্দিকে পরিখা খনন করেন। কয়েকটি বাংকারও তৈরি করা হয়।

রাজশাহী মহানগর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন যা রাসিক নামে পরিচিত। রাজশাহী মহানগরকে রাসিক এর আওতায় ৩০ টি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম জাদুঘর হচ্ছে রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল এটি উদ্বোধন করেন। বাঙালি ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্থাপত্যশিল্পের বিশাল সম্ভার রয়েছে এই বরেন্দ্র যাদুঘরে। এই জাদুঘর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা। প্রতিদিন প্রাচীন হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন দেখতে কয়েকশ' দর্শনার্থী আসেন এখানে। ১৯৬৪ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এই জাদুঘর পরিচালনা করে আসছে।   শনিবার থেকে বুধবার ১০টা থেকে সাড়ে ৫ টা এবং শুধু মাত্র শুক্রবার জাদুঘর দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘরটি। বর্তমানে টিকিট কেটে ঢুকতে হয় এই যাদুঘরে যার মূল্য ৫ টাকা।

গ্রেটার রোড,শেরশাহ্ রোড,কাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গির রোড,স্টেশন রোড,কাজী নজরুল ইসলাম স্বরণী,বিমান-বন্দর রোড,বেগম রোকেয়া রোড,দোশর মন্ডল রোড,রাণীবাজার-টিকাপাড়া রোড,সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট-নিউমার্কেট নতুন সড়ক,তালাইমারি রোড,টিবি রোড,রাজশাহী সিটি বাইপাস সড়ক,অালিফ লাম মিম ভাটা-বাইপাস সড়ক,ক্যান্টনম্যান্ট রোড,টিটিসি রোড,প্যারা মেডিকেল রোড,মহিলা কলেজ রোড,সিএনবি রোড,পুরাতন নাটোর রোড,মালোপাড়া-রাণীবাজার ভায়া সষ্টিতলা কানেকটিং রোড,ভদ্রা-কামরুজ্জামান চত্বর রোড,এছাড়াও অারো রাস্তা রয়েছে।উপরে উল্লেখিতত রাস্তা সমূহ ৪ লেন ও মাঝখানে ডিভাইডার রয়েছে।

রাজশাহী -ঢাকা, খুলনা, রংপুর, চিলাহাটি, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া,পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, বগুড়া, সৈয়দপুরে প্রতিদিন আন্তঃনগর, লোকাল, মেইল ট্রেন চলে।

রাজশাহী শহরে ৩ টি রেলওয়ে  স্টেশন রয়েছে- রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন,বিশ্ববিদ্যালয় রেলওয়ে স্টেশন, ও কোর্ট স্টেশন।

রাজশাহী শহর শিক্ষা নগরী হিসাবে পরিচিত।  দেশের বেশ কিছু নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই শহরে অবস্থিত।

রাজশাহী শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত। রাজশাহীর  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা

রাজশাহী জেলাতে মোট ৩ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলো হলো

রাজশাহী জেলাতে মোট ৪ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলো হলো

রাজশাহী জেলাতে বেসরকারি ভাবে গড়ে উঠা স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ৩ টি মেডিকেল কলেজ, ১ টি ডেন্টাল কলেজ, ৫ টি নার্সিং কলেজ, ১১টি নার্সিং ইনস্টিটিউট, ১ টি ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি এবং ১ টি কমিউনিটি প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট রয়েছে।




#Article 14: আফ্রিকা (521 words)


আফ্রিকা আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় বিচারে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মহাদেশ (এশিয়ার পরেই)। পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোকে গণনায় ধরে মহাদেশটির আয়তন ৩০,২২১,৫৩২ বর্গ কিলোমিটার (১১,৬৬৮,৫৯৮ বর্গমাইল) । এটি বিশ্বের মোট ভূপৃষ্ঠতলের ৬% ও মোট স্থলপৃষ্ঠের ২০.৪% জুড়ে অবস্থিত।  এ মহাদেশের ৬১টি রাষ্ট্র কিংবা সমমানের প্রশাসনিক অঞ্চলে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ, অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার ১৪% বসবাস করে। নাইজেরিয়া আফ্রিকার সর্বাধিক জনবহুল দেশ। আফ্রিকার প্রায় মাঝখান দিয়ে নিরক্ষরেখা

চলে গেছে। এর বেশির ভাগ অংশই ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। মহাদেশটির উত্তরে ভূমধ্যসাগর, উত্তর-পূর্বে সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর, পূর্বে ভারত মহাসাগর, এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। উত্তর-পূর্ব কোনায় আফ্রিকা সিনাই উপদ্বীপের মাধ্যমে এশিয়া মহাদেশের সাথে সংযুক্ত।

আফ্রিকা একটি বিচিত্র মহাদেশ। এখানে রয়েছে নিবিড় সবুজ অরণ্য, বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, জনমানবহীন মরুভূমি, সুউচ্চ পর্বত এবং খরস্রোতা নদী। এখানে বহু বিচিত্র জাতির লোকের বাস, যারা শত শত ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে জীবন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই রয়ে গেছে, অন্যদিকে অনেক শহরে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।

আফ্রিকায় ৩৯০০ এর বেশি ভাষা আছে। এতে আছে আরবী,রুস, ইংরাজি। এগুলো অন্যতম। 
আফ্রিকা মানবজাতির আতুড়ঘর। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় বিশ্বের প্রথম মহান সভ্যতাগুলির একটি, মিশরীয় সভ্যতা, জন্মলাভ করে। এরপর আফ্রিকাতে আরও বহু সংস্কৃতি ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও পতন হয়েছে। ৫০০ বছর আগেও সারা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে সমৃদ্ধ নগর, বাজার, এবং শিক্ষাকেন্দ্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

বিগত ৫০০ বছরে ইউরোপীয় বণিক ও ঔপনিবেশিকেরা ক্রমান্বয়ে আফ্রিকার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। ইউরোপীয় বণিকেরা লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানদের দাস হিসেবে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের প্ল্যান্টেশনগুলিতে পাঠায়। ইউরোপীয়রা আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের দেশের কলকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিষ্কাশন করা শুরু করে। ১৯শ শতকের শেষ নাগাদ ইউরোপীয়রা প্রায় সমস্ত আফ্রিকা মহাদেশ দখল করে এবং একে ইউরোপীয় উপনিবেশে পরিণত করে।

কোথাও সহিংস যুদ্ধ, আবার কোথাও বা ধীর সংস্কারের মাধ্যমে প্রায় সমস্ত আফ্রিকা ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করে। বিশ্ব অর্থনীতিতে উপনিবেশ-পরবর্তী আফ্রিকার অবস্থান দুর্বল। এখানকার যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা অণুন্নত এবং রাষ্ট্রগুলির সীমানা যথেচ্ছভাবে তৈরি। নতুন এই দেশগুলির নাগরিকদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে একতা বলতে তেমন কিছুই ছিল না।

আফ্রিকাতে ৫৩টি রাষ্ট্র আছে। এদের মধ্যে ৪৭টি আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে এবং ৬টি আশেপাশের দ্বীপগুলিতে অবস্থিত। সাহারা মরুভূমির মাধ্যমে মহাদেশটিকে দুইটি অংশে ভাগ করা হয়। সাহারা বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমি; এটি আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর অংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে বিস্তৃত। সাহারার উত্তরে অবস্থিত অঞ্চলকে উত্তর আফ্রিকা বলা হয়। সাহারার দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকাকে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা বলা হয়। সাহারা-নিম্ন আফ্রিকাকে অনেক সময় কৃষ্ণ আফ্রিকাও বলা হয়। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে আছে আলজেরিয়া মিশর লিবিয়া মরক্কো সুদান এবং তিউনিসিয়া। সাহার-নিম্ন আফ্রিকাকে আবার পশ্চিম আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা অঞ্চলগুলিতে ভাগ করা হয়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি হল বেনিন বুর্কিনা ফাসো ক্যামেরুন চাদ আইভরি কোস্ট ঘানা গিনি গিনি-বিসাউ লাইবেরিয়া মালি মৌরিতানিয়া নাইজার নাইজেরিয়া সেনেগাল সিয়েরা লিওন গাম্বিয়া এবং টোগো। পূর্ব আফ্রিকাতে আছে বুরুন্ডি জিবুতি ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়া কেনিয়া মালাউই মোজাম্বিক সোমালিয়া তানজানিয়া এবং উগান্ডা। মধ্য আফ্রিকাতে আছে অ্যাঙ্গোলা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র বিষুবীয় গিনি গাবন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং রুয়ান্ডা। দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে আছে বতসোয়ানা লেসোথো নামিবিয়া দক্ষিণ আফ্রিকা সোয়াজিল্যান্ড জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ে। আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রগুলির মধ্যে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের কেপ ভার্দ এবং সাঁউ তুমি ও প্রিন্সিপি; ভারত মহাসাগরের কোমোরোস মাদাগাস্কার মরিশাস এবং সেশেল।

আফ্রিকায় ৫০০ টির বেশি ধর্ম আছে। এর মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী বেশি।  যারা মোট জনসংখ্যায় ৪৭%।আরো আছে আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী ধর্ম।যারা জনসংখ্যায় ৬%।এ ছাড়া খ্রিষ্টানরা  জনসংখ্যায় ৩৯%।




#Article 15: অ্যান্টার্কটিকা (710 words)


অ্যান্টার্কটিকা ( বা , ) হল পৃথিবীর সর্বদক্ষিণে অবস্থিত মহাদেশ। ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরু এই মহাদেশের অন্তর্গত। দক্ষিণ গোলার্ধের অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে প্রায় সামগ্রিকভাবেই কুমেরু বৃত্তের দক্ষিণে অবস্থিত এই মহাদেশটি দক্ষিণ মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত।  আয়তন-বিশিষ্ট অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ এবং আয়তনে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশটি এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সর্বনিম্ন জনবসতিপূর্ণ মহাদেশ। এই মহাদেশের জনঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ০.০০০০৮ জন। অ্যান্টার্কটিকার ৯৮% অঞ্চল গড়ে  পুরু বরফে আবৃত। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তরপ্রান্তে অবস্থিত অংশগুলি বাদ দিয়ে সর্বত্রই এই বরফের আস্তরণ প্রসারিত।

সামগ্রিকভাবে অ্যান্টার্কটিকা হল পৃথিবীর শীতলতম, শুষ্কতম এবং সর্বাধিক ঝটিকাপূর্ণ মহাদেশ। বিশ্বের সকল মহাদেশের মধ্যে এই মহাদেশটির গড় উচ্চতা সর্বাধিক। আন্টার্কটিকার অধিকাংশ অঞ্চলই একটি মেরু মরুভূমির অন্তর্গত। এই মহাদেশের উপকূলভাগে এবং উপকূল-সমীপস্থ অঞ্চলগুলিতে বার্ষিক পরিচলন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ । অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা −৮৯.২ °সেন্টিগ্রেড (−১২৮.৬ °ফারেনহাইট) পর্যন্ত (অথবা মহাকাশ থেকে পরিমাপকৃত হিসাব অনুযায়ী, −৯৭.৭ °সেন্টিগ্রেড অর্থাৎ −১৩৫.৮ °ফারেনহাইট পর্যন্ত) নামতে পারে। যদিও মহাদেশের তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চলের (বছরের শীতলতম অংশ) গড় তাপমাত্রা −৬৩ °সেন্টিগ্রেড (−৮১ °ফারেনহাইট)। সমগ্র মহাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গবেষণা কেন্দ্রগুলিতে সারা বছরই ১,০০০ থেকে ৫,০০০ লোক বসবাস করে। এখানকার স্থানীয় জীবজগতের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, উদ্ভিদ, প্রোটিস্ট এবং মাইট, নেমাটোডা, পেঙ্গুইন, সিল ও টারডিগ্রেড বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর নাম উল্লেখযোগ্য। অ্যান্টার্কটিকের তুন্দ্রা অঞ্চলেই গাছপালা দেখা যায়।

বিশ্বের নথিবদ্ধ ইতিহাসে অ্যান্টার্কটিকাই হল সর্বশেষ আবিষ্কৃত অঞ্চল। ১৮২০ সালে ভস্তক ও মার্নি নামে দুই রাশিয়ান রণতরীর অভিযাত্রী ফেবিয়ান গোটলিয়েব ফন বেলিংশসেন ও মিখাইল লাজারেভ কর্তৃক ফিমবুল তুষার সোপান আবিষ্কারের পূর্বে এই মহাদেশটির অস্তিত্বের কথা কেউই জানত না। অবশ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর পরবর্তী পর্যায়েও প্রতিকূল পরিবেশ, সহজলভ্য প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব ও দুর্গমতার কারণে এই মহাদেশটি মোটামুটি উপেক্ষিতই ছিল। ১৮৯৫ সালে নরওয়েজীয় অভিযাত্রীদের একটি দলই প্রথম এই মহাদেশে অবতরণ করে বলে নিশ্চিতভাবে জানা যায়।

অ্যান্টার্কটিকা একটি ডি ফ্যাক্টো কন্ডোমিনিয়াম। অ্যান্টার্কটিকা চুক্তি অনুযায়ী ‘কনসাল্টিং’ মর্যাদাপ্রাপ্ত পক্ষগুলির দ্বারা এই মহাদেশ শাসিত হয়। ১৯৫৯ সালে বারোটি দেশ এবং তারপর আরও আটত্রিশটি দেশ এই চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির দ্বারা অ্যান্টার্কটিকায় সামরিক কার্যকলাপ, খনিজ উত্তোলন, পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও পারমাণবিক বর্জ্য নিক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় এবং সমগ্র মহাদেশের জৈবভৌগোলিক ক্ষেত্রটি রক্ষা করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের চার হাজারেরও বেশি বৈজ্ঞানিক এই মহাদেশে গবেষণায় রত।

অ্যান্টার্কটিকা নামটি প্রকৃতপক্ষে গ্রিক যৌগিক শব্দ আন্তার্কতিকে-এর (গ্রিক: ἀνταρκτική) রোমান রূপ। এই শব্দটি গ্রিক আন্তার্কতিকোস (গ্রিক: ) শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গবাচক প্রতিশব্দ, যার অর্থ আর্কটিকের বিপরীত বা উত্তরের বিপরীত।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দ নাগাদ অ্যারিস্টটল তাঁর মেতেওরোলজিকা গ্রন্থে একটি অ্যান্টার্কটিক অঞ্চল-এর কথা উল্লেখ করেন।  কথিত আছে, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে তিরের মারিনোস তাঁর অসংরক্ষিত বিশ্ব মানচিত্রে এই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। রোমান লেখক হাইজিনাস ও এপুলিয়াস (খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতাব্দী) দক্ষিণ মেরু অর্থে রোমানীকৃত গ্রিক পোলাস আন্তার্কতিকাস (লাতিন: polus antarcticus) নামটিকে গ্রহণ করেন। এই নামটি থেকে ১২৭০ সালে প্রাচীন ফরাসি পোলে আন্তার্তিকে (প্রাচীন ফরাসি: pole antartike; আধুনিক ফরাসি ভাষায়: pôle antarctique) নামটির উদ্ভব ঘটে। এই ফরাসি শব্দটি থেকে ১৩৯১ সালে জিওফ্রে চসার একটি পরিভাষাগত সনদে মধ্য ইংরেজি পোল আন্টার্কটিক (মধ্য ইংরেজি বানান: pol antartik; বর্তমান ইংরেজি বানান: Antarctic Pole) নামটি গ্রহণ করেন।

বর্তমান ভৌগোলিক নামটি অর্জনের আগে এই শব্দটি উত্তরের বিপরীত অর্থে একাধিক স্থানের নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রাজিলে স্থাপিত স্বল্পকাল স্থায়ী ফরাসি উপনিবেশটিকে বলা হত ফ্রান্স আন্তার্কতিকে।

১৮৯০-এর দশকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মহাদেশের নাম হিসাবে অ্যান্টার্কটিকা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। স্কটিশ মানচিত্রাঙ্কনবিদ জন জর্জ বার্থেলোমিউকে এই নামকরণের হোতা বলে মনে করা হয়।

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের কোন স্থায়ি অধিবাসী নেই এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্য্যন্ত কোন মানুষ এই স্থানকে দেখেছিলেন বলে কোন প্রমাণ নেই। এতৎসত্ত্বেও প্রথম শতাব্দী থেকেই একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, পৃথিবীর দক্ষিণে টেরা অস্ট্রালিস নামক এক বিশাল মহাদেশ উপস্থিত থাকতে পারে। টলেমি মনে করতেন যে, ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা নিয়ে গঠিত তৎকালীন যুগে পরিচিত পৃথিবীর ভূমিসমষ্টির সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য এই মহাদেশ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এমনকি সপ্তদেশ শতাব্দীর শেষার্ধে অভিযাত্রীরা দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পর যখন জানা যায়, এই দুইটি মহাদেশ প্রবাদ হিসেবে প্রচলিত অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের অংশ নয়, তখনও ভৌগোলিকরা বাস্তবের থেকে দ্বিগুণ আকারের মহাদেশের অস্তিত্বের কথা বিশ্বাস করতেন।

অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পর এই মহাদেশের নামকরণ টেরা অস্ট্রালিস শব্দটি থেকে করা হয়, কারণ তখন ম্যাথিউ ফ্লিন্ডার্স নামক অভিযাত্রী সহ বেশ কিছু মানুষ মনে করতেন অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণে উল্লেখযোগ্য মাপের কোন মহাদেশ পাওয়া সম্ভব নয়। সেই কারণে অ্যান্টার্কটিকার প্রবাদের সঙ্গে প্রচলিত হলেও টেরা অস্ট্রালিস নামটি এই মহাদেশের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

১৯৫৯ সালে ১২টি দেশের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যাতে বর্তমানে ৪৬টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে অ্যান্টার্কটিকায় সামরিক কর্মকান্ড এবং খনিজ সম্পদ খনন নিষিদ্ধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সহায়তা এবং মহাদেশটির ইকোজোন সুরক্ষিত করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের ৪,০০০ এরও বেশি বিজ্ঞানী অ্যান্টার্কটিকায় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন।




#Article 16: এশিয়া (4435 words)


এশিয়া ( বা ) পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ, প্রাথমিকভাবে পূর্ব ও উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। এটি ভূপৃষ্ঠের ৮.৭% ও স্থলভাগের ৩০% অংশ জুড়ে অবস্থিত। আনুমানিক ৪৩০ কোটি মানুষ নিয়ে এশিয়াতে বিশ্বের ৬০%-এরও বেশি মানুষ বসবাস করেন। অধিকাংশ বিশ্বের মত, আধুনিক যুগে এশিয়ার বৃদ্ধির হার উচ্চ। উদাহরণস্বরূপ, বিংশ শতাব্দীর সময়, এশিয়ার জনসংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়ে গেছে, বিশ্ব জনসংখ্যার মত।

এশিয়ার সীমানা সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয়, যেহেতু ইউরোপের সাথে এর কোনো স্পষ্ট ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নেই, যা এক অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের গঠন যাকে একসঙ্গে ইউরেশিয়া বলা হয়। এশিয়ার সবচেয়ে সাধারণভাবে স্বীকৃত সীমানা হলো সুয়েজ খাল, ইউরাল নদী, এবং ইউরাল পর্বতমালার পূর্বে, এবং ককেশাস পর্বতমালা এবং কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগরের দক্ষিণে। এটা পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে উত্তর মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত। ইউরাল পর্বতমালা, ইউরাল নদী, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগর দ্বারা এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ দুটি পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন। এছাড়া লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এশিয়া মহাদেশকে আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সংকীর্ণ বেরিং প্রণালী একে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে। উল্লেখ্য, বেরিং প্রণালীর একদিকে অবস্থান করছে এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত রাশিয়ার উলেনা এবং অপর পাশে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা। এই প্রণালীটির সংকীর্ণতম অংশটি মাত্র ৮২ কি•মি• চওড়া, অর্থাৎ বেরিং প্রণালীর এই অংশ হতে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দূরত্ব মাত্র ৮২ কি•মি•।

এর আকার এবং বৈচিত্র্যের দ্বারা, এশিয়ার ধারণা – একটি নাম ধ্রুপদি সভ্যতায় পাওয়া যায় - আসলে ভৌত ভূগোলের চেয়ে মানবীয় ভূগোলের সাথে আরো বেশি সম্পর্কিত। এশিয়ার অঞ্চল জুড়ে জাতিগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, পরিবেশ, অর্থনীতি, ঐতিহাসিক বন্ধন এবং সরকার ব্যবস্থার মাঝে ব্যাপকভাবে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সীমান্ত ঐতিহাসিকভাবে শুধুমাত্র ইউরোপীয়দের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। দুইয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য প্রাচীন গ্রিক দ্বারা তৈরি করা হয়। তারা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সীমানা হিসেবে এজিয়ান সাগর, দারদানেলেস (Dardanelles), মার্মারা সাগর, বসফরাস, কৃষ্ণ সাগর, কেরচ প্রণালী (Kerch Strait), এবং আজভ সাগর ব্যবহার করে। নীল নদ প্রায়ই এশিয়া এবং আফ্রিকার মধ্যে সীমানা হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যদিও কিছু গ্রিক ভূগোলবিদ লোহিত সাগরকে একটি ভাল সীমানা হিসেবে মনে করে থাকে। নীল নদ এবং লোহিত সাগরের মধ্যে দারিউসের খাল এই ধারণায় যথেষ্ট প্রকরণ সৃষ্টি করে। রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে, দন নদী কৃষ্ণ সাগরে পড়ত, যা এশিয়ার পশ্চিম সীমান্ত। এটি ইউরোপীয় তীরে উত্তরদিকের নাব্য বিন্দু। ১৫ শতাব্দীতে লোহিত সাগর নীল নদের বদলে আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে সীমা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।

নদ-নদী উত্তর ইউরোপীয়দের কাছে অসন্তোষজনক হয়ে ওঠে, যখন রাশিয়ার রাজা পিটার পূর্ব খন্ডে প্রতিপক্ষ সুইডেন ও উসমানীয় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন, এবং সাইবেরিয়ার উপজাতিদের সশস্ত্র প্রতিরোধ দমন করেন। এর দ্বারা ১৭২১ সালে একটি নতুন রাশিয়ান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত  হয়, যা ইউরাল পর্বতমালা ও তার পরেও ব্যপ্ত ছিল। সাম্রাজ্যের প্রধান ভৌগোলিক ত্বাত্তিক আসলে ছিল একজন প্রাক্তন সুইডিশ যুদ্ধবন্দী, যাকে ১৭০৯ সালের পোল্টাভা যুদ্ধ থেকে বন্দী করা হয়। তাকে তোবলস্কে নিযুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি পিটারের সাইবেরিয়ার সরকারী, ভাসিলি তাতিসচেভ-এর সাথে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং যে তাকে বইয়ের প্রস্তুতির জন্য ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করার অনুমতি ও স্বাধীনতা দেয়।

সুইডেনে, পিটারের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর, ১৭৩০ সালে ফিলিপ জোহান ভন স্তারাহলেনবেরগ এশিয়ার সীমানা হিসেবে ইউরালকে প্রস্তাব করে একটি নতুন মানচিত্রাবলী প্রকাশ করে। রাশিয়ানরা ভূগোলে তাদের ইউরোপীয় পরিচয় রাখা অনুমোদিত করার ধারণা সম্পর্কে  উৎসাহি  ছিল। তাতিসচেভ ঘোষণা করেন যে, তিনি ভন স্তারাহলেনবেরগ ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তীরা নিম্ন সীমা হিসাবে এমবা নদী প্রস্তাব করে। মধ্য-১৯ শতকে ইউরাল নদী প্রকাশ হবার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়। কৃষ্ণ সাগরে থেকে কাস্পিয়ান সাগরে সীমানা সরানো হয়। সেই সময়কার মানচিত্রে, ট্রান্সককেশিয়া এশিয়ান বলে গণ্য হত। সেই অঞ্চলের অধিকাংশই সোভিয়েত ইউনিয়ন-এ অন্তর্গত হওয়া দক্ষিণ সীমানার মতামতকে প্রভাবিত করে। ইউরোপ থেকে তাদের পৃথক কল্পিত সীমানা নির্ধারণে এশিয়ান সংস্কৃতির কোনো ভূমিকা নেই।

এশিয়া ও ঢিলেঢালাভাবে সংজ্ঞায়িত অঞ্চল ওশেনিয়ার মধ্যকার সীমানা সাধারণত মালয় দ্বীপপুঞ্জের কোনো এক খানে স্থাপন করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়া শব্দের উৎপত্তি থেকেই বিভিন্ন ভৌগোলিক অর্থ বহন করে। মালয় দ্বীপপুঞ্জের কোন দ্বীপ এশিয়ার, তার প্রধান নির্ণয়াক হলো তার উপনিবেশিক অবস্থান বিভিন্ন সাম্রাজ্যের মধ্যে (সব ইউরোপীয় নয়)। লুইস এবং উইগেন বলেন তার বর্তমান গণ্ডিতে 'দক্ষিণপূর্ব এশিয়া'-র কমিয়ে আনার একটি চলমান প্রক্রিয়া।

ভৌগলিক এশিয়া একটি সাংস্কৃতিক বস্তু, যা বিশ্বের ইউরোপীয় ধারণা অন্যান্য সংস্কৃতির উপর আরোপিত, একটি যথাযথ নয় ধারণা যার ফলে এটার মানে নিয়ে বিবাদ হয়। এশিয়া ইউরোপ চেয়ে বড় এবং আরো সাংস্কৃতিকভাবে বিচিত্র। এটা ঠিক বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সীমানার উপাদানসমূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

সাধারণ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভৌগোলিক মানের উপরন্তু, এশিয়া আরো সীমাবদ্ধ আগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও কার্যক্রমে সংস্থা ভেদে নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি সার্ভিস অব কানাডা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রশাসনিক বিভাগ ব্যবহার করে, তাদের এশিয়া সংজ্ঞা বৃহত্তর সংজ্ঞা থেকে যথেষ্ট ভিন্ন, এবং তা একইভাবে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এশিয়া কিছু বিভিন্নমুখী ব্যবহার বর্তমান ঘটনা প্রতিবেদনের সময় সংবাদ মাধ্যম দ্বারা ঘোষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিবিসি নিউজের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগ আছে, যা অস্ট্রালেশিয়া, ওশেনিয়া বা আমেরিকার প্রশান্ত অংশ (প্যাসিফিক) থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে।

হিরোডোটাস-এর সময় থেকে, এক দল ক্ষুদ্র ভূগোলবিদ তিন-মহাদেশ ব্যবস্থা (ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া) প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে তাদের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক বিচ্ছেদ নেই। উদাহরণস্বরূপ, স্যার ব্যারি চুনলিফ, অক্সফোর্ডের ইউরোপীয় পুরাতত্ত্বের এমেরিটাস অধ্যাপক, যুক্তি দেন যে, ইউরোপ ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিছক এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম বর্ধিতাংশ। ভৌগোলিকভাবে, এশিয়া ভূখন্ডের – বা আফ্রো-ইউরেশিয়ার অংশ ইউরেশিয়ার পূর্ব অংশ, যেখানে ইউরোপ উত্তর পশ্চিমাংশের উপদ্বীপ; ভূতাত্ত্বিকভাবে, এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা (সুয়েজ খাল ছাড়া) একটি একক অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড গঠন করে এবং একটি সাধারণ মহীসোপান ভাগ করে। প্রায় সব ইউরোপ এবং এশিয়ার বেশির ভাগ অংশ ইউরেশীয় পাত-এর উপর অবস্থিত, দক্ষিণে আরবীয় ও ভারতীয় পাত দ্বারা সংযুক্ত এবং সাইবেরিয়ার পূর্বপ্রান্তিক অংশ উত্তর আমেরিকার পাতের উপর অবস্থিত।

এশিয়া মূলত গ্রিক সভ্যতার একটি ধারণা। এশিয়া, অঞ্চলের নাম, আধুনিক ভাষার বিভিন্ন আকারের মাঝে এর চূড়ান্ত উৎপত্তিস্থল অজানা। এর বুৎপত্তি এবং উৎপত্তির ভাষা অনিশ্চিত। এটা নথিভুক্ত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন নামের একটি। অনেকগুলো তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ল্যাটিন সাহিত্য থেকে ইংরেজি সাহিত্যের গঠন হওয়ার সময়কালে ইংরেজি এশিয়ার খোঁজ পাওয়া যায়, তখনও একই গঠন ছিল এশিয়া। সমস্ত ব্যবহার এবং নামের গঠন রোমান সাম্রাজ্যের ল্যাটিন থেকে আহরণ করা কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

ল্যাটিন এশিয়া ও গ্রিক Ἀσία একই শব্দ বলে মনে করা হয়। রোমান লেখকগণ Ἀσία-র অনুবাদ এশিয়া করেছেন। রোমানরা একটি প্রদেশশের নামকরণ এশিয়া নামে করেছেন, যা প্রায় আধুনিক তুরস্কের কেন্দ্রীয় পশ্চিম অংশ। আধুনিক ইরাকে এশিয়া মাইনর ও এশিয়া মেজর অবস্থিত। নামটির প্রাচীনতম প্রমাণ গ্রিক, এটি সম্ভবত অবস্থাগতভাবে Ἀσία থেকে এশিয়া এসেছিল, কিন্তু প্রাচীন অনুবাদে, আক্ষরিক প্রসঙ্গের অভাবে, তা খুঁজে বের করা কঠিন। প্রাচীন ভূগোলবিদ এবং ঐতিহাসিকদের কাছেই জানা যায়, যেমন হিরোডোটাস, যারা সবাই গ্রিক ছিলো। রোমান সভ্যতা ব্যাপকভাবে গ্রীকের বশবর্তী ছিলো। প্রাচীন গ্রিক অবশ্যই নামের প্রাথমিক এবং সমৃদ্ধ ব্যবহারের নজির রাখে।

হেরোডোটাস এশিয়ার প্রথম মহাদেশীয় ব্যবহার করেছেন (প্রায় ৪৪০ খ্রিস্টপূর্ব), তিনি তা উদ্ভাবন করেন সেই কারণে নয়, বরং তার  ইতিহাস প্রাচীনতম পাওয়া গদ্য, যা তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে। তিনি সতর্কতার সাথে এটিকে সংজ্ঞায়িত করেন, পূর্ববর্তী ভূগোলবিদদের উল্লেখ করে  যাদের লেখা তিনি পড়েছিলেন, কিন্তু যার কাজ এখন হারিয়ে গেছে। এর দ্বারা আনাতোলিয়া ও পারস্য সাম্রাজ্যকে বোঝান, গ্রিস ও মিশরের বিপরীতে। হেরোডোটাস আরোও বলেন, তিনি বিভ্রান্তবোধ করেন যে কেন তিন জন নারীর নামে ভূভাগের নামকরণ করা হবে ইউরোপা, এশিয়া, এবং লিবইয়া, আফ্রিকাকে নির্দেশ করে), অধিকাংশ গ্রিক মনে করেন দেবতা প্রমিথিউসের স্ত্রীর নামে (অর্থাৎ হেসিওয়ান, Hesione) এশিয়ার নামকরণ করা হয়, কিন্তু লিডিয়ানরা মনে করে, কট্যাসের (Cotys) ছেলে এশিজের (Asies) নামে এর নামকরণ করা হয়। গ্রিক পুরাণে, এশিয়া (Ἀσία) বা এশিয় (Asie) (Ἀσίη) নাইম্ফ বা লিডিয়ার দেবী তিতান-এর নাম।

হেরোডোটাসের ভৌগোলিক বিভ্রান্তি সম্ভবত দ্বিমত প্রকাশ করার একটি রূপ, সকল শিক্ষিত লোকের মত তিনিও যেহেতু গ্রীক কাব্য পড়েছেন, তাই তিনি ভালভাবেই বুঝে থাকবেন যে, কেন অঞ্চলগুলোর নামে নারীদের নামে হবে। এথেন্স, মাইসিন, থিবেত এবং আরো অন্যান্য স্থানগুলোর নাম নারীদের নামে ছিলো। প্রাচীন গ্রিক ধর্মে, অঞ্চলগুলো নারী দেবদূতের অধীনে ছিলো, যা অভিভাবক দেবদূতের সমান্তরাল। কবিরা তাদের কার্যকলাপ বর্ণনা করেন এবং পরের প্রজন্ম তা রূপকধর্মী ভাষায় বিনোদনের গল্পে পরিণত করে, যা পরবর্তীকালে নাট্যকাররা ধ্রুপদী গ্রিক নাটক রুপান্তরিত করে এবং গ্রিক পুরাণ হয়ে উঠে।

উদাহরণস্বরূপ, হেসিওড (Hesiod) তেথুস ও অকেয়ানোসের মেয়েদের কথা উল্লেখ করেন, যাদের মাঝে একটি পবিত্র সঙ্গ আছে, যারা প্রভু অ্যাপোলোর সাথে এবং নদীরা তাদের তারুণ্য রেখে দিয়েছে। এদের অনেকে ভৌগলিক: ডোরিস, রোডা, ইউরোপ, এশিয়া। হেসিওড ব্যাখ্যা করেনঃ

ইলিয়াড (প্রাচীন গ্রিক দ্বারা হোমার-এর উপর আরোপিত) ট্রোজান যুদ্ধে দুই ফ্রিজিয়ান (লিডিয়ায় লুভিয়ানের স্থলাভিষিক্ত গোত্র) কথা উল্লেখ করেঃ আসিউস (একটি বিশেষণ, অর্থ এশিয়ান); এবং লিডিয়ার একটি পানিবদ্ধ জলাভূমি বা নিম্নভূমি ασιος হিসেবে।

গ্রিক কবিতার আগে, এজিয়ান সাগর গ্রিক অন্ধকার যুগে ছিলো, যার প্রারম্ভে  দলমাত্রিক লেখা হারিয়ে গেছে এবং বর্ণানুক্রমিক লেখা শুরু হয়নি। এর আগে ব্রোঞ্জ যুগের নথিতে আসিরীয়া সাম্রাজ্য, হিট্টিট সাম্রাজ্য ও গ্রিসের মাইসেরিয়ান রাজ্যের কথা উল্লেখ আছে, যা নিঃসন্দেহে এশিয়া, অবশ্যই আনাতোলিয়ায়, লিডিয়া সহ যদি অভিন্ন না হয়। এসব নথি প্রশাসনিক এবং কবিতায় অন্তর্ভুক্ত নয়।

১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে অজানা অক্রমণকারী দ্বারা মাইসেরিয়ান রাজ্য ধ্বংস হয়। একদল চিন্তাবিদের মতে, একই সময়ে চলা ডরিয়ান আক্রমণ দায়ী করা হয়। প্রাসাদে পোড়ানোর ঘটনা, দৈনিক প্রশাসনিক নথির নিদর্শন গ্রিক দলমাত্রিক লিপিতে (লিনিয়ার বি) পোড়ামাটিতে লেখা আছে, যা অনেকে পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তরুণ সাংকেতিক লিপিকর মাইকেল ভেন্ট্রিস, সহায়তা করেন বিদ্বান জন চাদউইক। প্রাচীন পাইলস স্থলে কার্ল ব্লেজিন একটি উল্লেখযোগ্য গুপ্তভান্ডার আবিস্কার করেন, যাতে বিভিন্ন পদ্ধতি দ্বারা গঠিত পুরুষ ও মহিলা নামের শত শত নমুনা অন্তর্ভুক্ত।

এর মধ্যে কিছু মহিলাকে দাসত্বে বন্দী করে রাখা হত (সমাজের গবেষণায় বিষয়বস্তু হিসাবে প্রকাশিত)। তাদের কাজে লাগানো হতো, যেমন কাপড় তৈরি, ও বাচ্চাসহ আসত। তাদের মধ্যে কিছু মহিলাদের সাথে যুক্ত বিশেষণ লাওইয়াইয়াই (lawiaiai), বন্দী, তাদের উৎসকে নির্দেশ করে। তাদের কিছু জাতিগত নাম। বিশেষ করে, আশ্বিনি (aswiai), এশিয়ার নারী বলে চিহ্নিত। সম্ভবত তারা এশিয়ায় বন্দী হয়, কিন্ত অন্যান্য ক্ষেত্রে, মিলাতিয়াই (Milatiai), মিলেটাস থেকে আগত, একটি গ্রিক উপনিবেশ, যেখানে গ্রীক দ্বারা ক্রীতদাসদের জন্য অভিযান চালানো হয়নি। চাদউইক মনে করেন যে নামগুলো তাদের অবস্থান উল্লেখ করে, যেখান থেকে বিদেশি নারী কেনা হয়েছে। নামটি একবচন, আশ্বিয়া (Aswia), যা দ্বারা একটি দেশ ও তার অধিবাসী নারী উভয়কেই বোঝায়। এর একটি পুংলিঙ্গ আছে, আশ্বিওস (aswios)। এই আশ্বিয়া (Aswia) শব্দটি, হিট্টিটদের কাছে পরিচিত আশুয়া (Assuwa) নামের অঞ্চল থেকে আগত, লিডিয়ায় কেন্দ্রীভূত, বা রোমান এশিয়া। এই নাম, আশুয়া (Assuwa) থেকেই মহাদেশ এশিয়া নামের উৎপত্তি। আশুয়া লীগ পশ্চিম আনাতোলিয়ার একটি কনফেডারেশন রাজ্য, যা প্রথম তুদহালিয়ার নেতৃত্বে হিট্টিটদের কাছে প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পরাজিত হয়।

অথবা, শব্দটির উৎপত্তি আক্কাদীয় শব্দ , যার অর্থ 'বাইরে যাওয়া' বা 'আরোহণ করা', মধ্যপ্রাচ্যে সূর্যোদয়ের সময়ে সূর্যের দিক নির্দেশ করা এবং খুব সম্ভবত ফিনিশীয় শব্দ asa এর সাথে যুক্ত যার মানে পূর্ব। বিপরীতভাবে একই রকম উৎপত্তির ধরন ইউরোপের জন্য প্রস্তাব করা হয়, আক্কাদীয় শব্দ erēbu(m) 'প্রবেশ করা' বা 'ডোবা' (সূর্য)।

টি.আর. রিড শব্দের উৎপত্তির দ্বিতীয় ধারণাটি সমর্থন করেন, asu শব্দটি থেকে প্রাচীন গ্রিক নামটি নামটি এসেছে, যার অর্থ আসিরীয়ায় 'পূর্ব' (ereb ইউরোপ-এর জন্য, অর্থ 'পশ্চিম'). পাশ্চাত্য  (Occidental) ধারণাটি (লাতিন রূপ Occidens 'ডুবন্ত') এবং প্রাচ্য (Oriental) (লাতিন Oriens থেকে, অর্থ 'উঠন্ত') ইউরোপীয় উদ্ভাবন, পশ্চিমা ও পূর্ব এর সমার্থক। রিড আরও জোর দেন যে, এটি এশিয়ার সমস্ত মানুষ ও সংস্কৃতিকে একক শ্রেণীবিভাগে ফেলার পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যাখ্যা করে, প্রায় যেন ইউরেশীয় মহাদেশের পশ্চিম এবং পূর্ব সভ্যতাগুলোর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের প্রয়োজন। এই বিষয়ে ওগুরা কুজকো ও তেনশিন ওকাকুরা দুই জন স্পষ্টভাষী জাপানি ব্যক্তিত্ব।

File:Silkroutes.jpg|thumb|left|220px|সিল্ক রোড এশিয়া জুড়ে সভ্যতাগুলোকে যুক্ত করে।

এশিয়ার ইতিহাস বিভিন্ন প্রান্তিক উপকূলীয় অঞ্চলের স্বতন্ত্র ইতিহাস হিসেবে দেখা যায়ঃ পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য, যা এশিয়ার মধ্য প্রান্তর দ্বারা যুক্ত।

এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পৃথিবীর প্রাচীনতম পরিচিত সভ্যতাগুলোর বিকাশস্থল, যা উর্বর নদী উপত্যকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। সভ্যতাগুলোতে মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু উপত্যকা ও হুয়াংহো অনেক মিল রয়েছে। এই সভ্যতাগুলো প্রযুক্তি এবং ধারনা বিনিময় করতে পারে, যেমন গণিত ও চাকা। অন্যান্য উদ্ভাবন, যেমন লিখন রিতি, প্রতিটি সভ্যতায় পৃথকভাবে বিকশিত হয়েছে বলে মনে হয়। শহর, রাজ্য এবং সাম্রাজ্য এসব নিম্নভূমিতে বিকশিত হয়।

কেন্দ্রীয় প্রান্তীয় অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে অশ্বারোহী যাযাবর দ্বারা অধ্যুষিত ছিল, যারা কেন্দ্রীয় প্রান্তীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার সব অঞ্চল পৌঁছাতে পারতো। কেন্দ্রীয় প্রান্তীয় অঞ্চল থেকে প্রাচীনতম বংশের বিস্তার হলো ইন্দো-ইউরোপীয়, যারা তাদের ভাষা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, চীনের সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলো। এশিয়ার উত্তরদিকের শেষ সীমায় অবস্থিত সাইবেরিয়া প্রান্তীয় যাযাবরদের জন্য দুর্গম ছিলো মূলত ঘন বন, জলবায়ু এবং তুন্দ্রার জন্য। এই এলাকা খুব জনবিরল ছিল।

মধ্য এবং প্রান্তীয় অঞ্চল অধিকাংশই পর্বত ও মরুভূমি দ্বারা পৃথক ছিল। ককেশাস, হিমালয় পর্বতমালা ও কারাকোরাম, গোবি মরুভূমি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যা প্রান্তীয় অশ্বারোহী কেবল পার হতে পারে। যখন শহুরে নগরবাসী আরো উন্নত ছিলো প্রযুক্তিগতভাবে ও সামাজিকভাবে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রান্তীয় অশ্বারোহীর আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক ভাবে সামান্যই করতে পারতো। যাইহোক, এসব নিম্নভূমিতে যথেষ্ট উন্মুক্ত তৃণভূমি নেই যা বিশাল অশ্বারোহী বাহিনীর যোগান দিতে পারবে; এই এবং অন্যান্য কারণে, যাযাবরেরা চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ জয় করে তাদের স্থানীয় সমৃদ্ধিশালী সমাজে মিশে যেতে পেরেছিলো।

৭ম শতকে মুসলিম বিজয় চলাকালে, ইসলামিক খিলাফত মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া জয় করে। পরবর্তিতে ১৩শ শতকে মোঙ্গল সাম্রাজ্য এশিয়ার অনেক বড় অংশ জয় করে, যা চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত। মোঙ্গল আক্রমণ করার আগে, চীন এ প্রায় ১২০ মিলিয়ন মানুষ ছিল; আক্রমণের পরবর্তি আদমশুমারিতে ১৩০০ সালে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ ছিল।

ব্ল্যাক ডেথ, পৃথিবীব্যাপী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী মৃত্যু, মধ্য এশিয়ার অনুর্বর সমভূমিতে উদ্ভব হয়ে এটা সিল্ক রোড বরাবর চলে গেছে।

রাশিয়ান সাম্রাজ্য ১৭শ শতক থেকে এশিয়া বিস্তৃত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ১৯শ শতকের শেষ নাগাদ সাইবেরিয়া এবং অধিকাংশ মধ্য এশিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ১৬শ শতক থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্য আনাতোলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং বলকান অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ১৭শ শতকে, মাঞ্চুরা চীন জয় করে এবং চিং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। এদিকে ১৬শ শতক থেকে ইসলামী  মুঘল সাম্রাজ্য অধিকাংশ ভারত শাসন করতে থাকে।

এশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশ। এটা পৃথিবীর মোট ভূপৃষ্ঠের ৮.৮% ভাগ (বা ৩০% ভাগ স্থল), এবং বৃহত্তম তটরেখা । এশিয়া সাধারণত ইউরেশিয়ার পাঁচ ভাগের চার ভাগ নিয়ে পূর্ব দিকে অবস্থিত। এটা সুয়েজ খাল ও ইউরাল পর্বতমালার পূর্বে, ককেশাস পর্বতমালা, কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের দক্ষিণে অবস্থিত। এটা পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত, এবং উত্তরে উত্তর মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত। এশিয়া মহাদেশে ৪৮টি দেশ আছে, তাদের দুটি (রাশিয়া ও তুরস্ক) দেশের ইউরোপে অংশ আছে।

এশিয়ার অত্যন্ত বিচিত্র জলবায়ু এবং ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য আছে। জলবায়ুর পরিধি আর্কটিক, উপআর্কটিক (সাইবেরিয়া) থেকে দক্ষিণ ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় অবধি বিস্তৃত। এর দক্ষিণ-পূর্ব অংশ জুড়ে আর্দ্র ও অভ্যন্তরে শুষ্ক। পশ্চিম এশিয়ায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দৈনিক তাপমাত্রা পরিসর দেখা যায়।হিমালয় পর্বমালার কারণে মৌসুমি সঞ্চালন দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ জুড়ে প্রাধান্য পায়। মহাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অংশ উষ্ণ। উত্তর গোলার্ধের মধ্যে সাইবেরিয়া অন্যতম শীতলতম অঞ্চল, এবং উত্তর আমেরিকা জন্য আর্কটিক বায়ুভরের একটি উৎস হিসাবে কাজ করে। ট্রপিকাল সাইক্লোনের জন্য পৃথিবীতে সবচেয়ে সক্রিয় জায়গা উত্তরপূর্বে ফিলিপাইন ও দক্ষিণ জাপান। মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমি ও আরব মরুভূমি মধ্যপ্রাচ্যের অনেকটা জুড়ে প্রসারিত। চীনের ইয়ানজে নদী মহাদেশের দীর্ঘতম নদী। নেপাল ও চীনের মধ্যকার হিমালয় পর্বতমালা বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা পর্বতশ্রেণী। বৃষ্টিপ্রধান ক্রান্তীয় বনাঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রসারিত ও সরলবর্গীয়, পর্ণমোচী বনাঞ্চল  উত্তরে প্রসারিত।

ম্যাপলক্রফট, বৈশ্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান, ২০১০ সালে সম্পাদিত একটি জরিপ ১৬টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। প্রত্যেক জাতির ঝুঁকি ৪২টি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত সূচক দ্বারা নির্ণিত, যা পরবর্তী ৩০ বছর সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে। এশিয়ার দেশগুলো বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা, ১৬টি দেশের মধ্যে ছিল যারা জলবায়ু পরিবর্তনে চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যেই ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের ক্রান্তীয় অংশে আধা-শুষ্ক জলবায়ুতে, তাপমাত্রা ১৯০১ থেকে ২০০৩-এর মধ্যে ০.৪ °​সে বেড়েছে। ২০১৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর সেমি-এ্যারিড ট্রপিক্স (ICRISAT) দ্বারা একটি গবেষণায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এশিয়ার কৃষি ব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক পন্থা ও কৌশল খোঁজার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, যার ফলে দরিদ্র ও অসহায় কৃষকদের উপকার হবে। গবেষণায় সুপারিশ করা হয় স্থানীয় পরিকল্পনার মধ্যে জলবায়ু তথ্য ব্যবহারের উন্নতি এবং আবহাওয়া ভিত্তিক কৃষি পরামর্শ সেবা শক্তিশালীকরণ, গ্রামীণ পরিবারের আয়ের বহুমুখীকরণ উৎসাহী করা,  উন্নত প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ তথা ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি পূর্ণ করা, বন আচ্ছাদন করা, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করার জন্য কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান।

এশিয়া দ্বিতীয় বৃহত্তম নমিনাল জিডিপি সব মহাদেশগুলোর মধ্যে ইউরোপের পরে, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা সমতায় বৃহত্তম। ২০১১ সালের হিসাবে, এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। 
বৈশ্বিক অফিস অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ২০১১-এ, অফিসে অবস্থানে এশিয়ার আধিপত্য ছিল, শীর্ষ ৫-এ ৪টিই এশিয়ার হংকং, সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিওল ও সাংহাই। প্রায় ৬৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থার হংকং-এ অফিস আছে।

১৯৯০ দশকের শেষ দিকে এবং ২০০০-এর শুরুতে, চীনের অর্থনীতি এবং ভারতের অর্থনীতি দ্রুত হারে বাড়ছে, উভয়ের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৮% এর বেশি।

এশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক খুব উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেশগুলোঃ ইসরায়েল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান, সাইপ্রাস ও ফিলিপাইন, এবং খনিজ সমৃদ্ধ দেশগুলির মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ইরান, ব্রুনাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন এবং ওমান।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস মাড্ডিসন তার বই দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি: এ মিলেনিয়াম পারর্স্পেক্টিভ-এ উল্লেখ করেন, ভারত ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ও ০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি ছিল। মধ্য ১৯ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (ব্রিটিশ ভারত বাদে) দখল করা আগ পর্যন্ত।

বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কয়েক দশক ধরে, জাপান এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং পৃথিবীর যেকোন একক জাতির দ্বিতীয় বৃহত্তম, ১৯৮৬-তে সোভিয়েত ইউনিয়নকে অতিক্রম করার পরে (নেট বস্তুগত পণ্য পরিমাপে) এবং ১৯৬৮-তে জার্মানিকে। (বিশেষ দ্রষ্টব্য: কিছু অতিপ্রাকৃত অর্থনীতি বৃহত্তম, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফটা) অথবা এপেক)। এটা ২০১০-এ শেষ হয় যখন চীন জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হয়।
১৯৮০ দশকের শেষভাগ ও ১৯৯০ দশকে শুরুতে, জাপানের জিডিপি শুধুমাত্র (বর্তমান বিনিময় হার পদ্ধতি), বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির সমান ছিলো। ১৯৯৫ সালে জাপানের অর্থনীতি, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান হয়ে গেছিলো এক দিনের জন্য, জাপানি মুদ্রা পরে ৭৯ ইয়েন/মার্কিন $ উচ্চ রেকর্ডে পৌঁছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৯০ দশক পর্যন্ত, এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জাপান কেন্দ্রীভূত ছিলো, এছাড়াও প্রশান্ত রিমের চারটি অঞ্চলে বিস্তৃত ছিলো, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুর। এই চারটি অঞ্চল এশিয়ান টাইগার্স পরিচিত, যারা সকলে উন্নত দেশ এবং এশিয়ার মাথাপিছু সর্বোচ্চ জিডিপি অর্জনকারী।

পূর্বানুমান অনুসারে, ২০২০ সালে ভারত নমিনাল জিডিপিতে জাপানকে অতিক্রম করবে। গোল্ডম্যান শ্যাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে চীন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হবে। বিভিন্ন বাণিজ্য ব্লক আছে, যার মাঝে আসিয়ান সবচেয়ে উন্নত।

এশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম মহাদেশ এবং এটা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ যেমন পেট্রোলিয়াম, বন, মৎস্য, পানি, তামা ও রূপা। এশিয়ায় উৎপাদন, পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী বিশেষ করে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুর। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বহুজাতিক কর্পোরেশনের আধিপত্য আছে, কিন্তু চীন ও ভারত ক্রমবর্ধমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে বহু কোম্পানি সস্তা শ্রমের প্রচুর যোগান এবং তুলনামূলকভাবে উন্নত অবকাঠামোর সুযোগ গ্রহণ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

সিটিগ্রুপ অনুসারে, ১১-র মধ্যে ৯ টি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি উত্পাদক দেশ এশিয়ার, জনসংখ্যা এবং আয় বৃদ্ধির দ্বারা চালিত। তারা হলো বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনাম। এশিয়ার চারটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র আছেঃ টোকিও, হংকং, সিঙ্গাপুর ও সাংহাই। কল সেন্টার ও ব্যবসা প্রসেস আউটসোর্সিং (BPOs) ভারত ও ফিলিপাইনে প্রধান নিয়োগকারী হয়ে উঠছে, অত্যন্ত দক্ষ, ইংরেজি ভাষাভাষী কর্মীর সহজলভ্যতার কারণে। আউটসোর্সিং বর্ধিত ব্যবহারের কারণে আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে ভারত ও চীনের উত্থানকে সহায়তা করে। বড় এবং প্রতিযোগিতামূলক তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের কারণে, ভারত আউটসোর্সিং জন্য প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০১০ সালে, এশিয়ায় ৩৩ লক্ষ মিলিওনেয়ার ছিল (বাড়ি ব্যতীত মার্কিন $১ মিলিয়ন বেশি আয়করা মানুষ), উত্তর আমেরিকার সামাণ্য নিচে ৩৪ লক্ষ মিলিওনেয়ার। গত বছর এশিয়া ইউরোপকে অতিক্রম করে। সম্পদ প্রতিবেদন ২০১২-এ সিটি গ্রুপ উল্লেখ করে যে এশীয় সেন্তা-মিলিওনেয়ার উত্তর আমেরিকার সম্পদ কব্জা করে প্রথমবারের মত, তা পূর্বে পাঠানো অব্যাহত থাকে। ২০১১-এর শেষ নাগাদ, ১৮,০০০ এশীয় মানুষ বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, চীন ও জাপানের যাদের কমপক্ষে $১০০ মিলিয়ন নিষ্পত্তিযোগ্য সম্পদ, যখন উত্তর আমেরিকায় তা ১৭,০০০ জন এবং পশ্চিম ইউরোপে ১৪,০০ জন।

মাস্টারকার্ড বৈশ্বিক গন্তব্য শহর সূচক ২০১৩ প্রকাশ করে, যেকানে ২০টি শহরের মধ্যে ১০টি এশিয়ার এবং এশিয়ার কোনো শহর (ব্যাংকক) শীর্ষস্থানীয় অবস্থায় ছিলো, ১৫.৯৮ আন্তর্জাতিক পর্যটক নিয়ে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয় তথ্য প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়া সার্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) পৃথিবীর যেকোন অঞ্চলের চেয়ে বেশি উন্নতি সাধন করে, যা গত ৪০ বছরে দ্বিগুণ হয়।

চীন, এইচডিআই উন্নতিতে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্জনকারী ১৯৭০ সাল থেকে, টপ টেন মুভার্স তালিকার একমাত্র দেশ যা স্বাস্থ্য বা শিক্ষার সফলতা জন্য নয় আয়ের কারণে। শেষ চার দশকে এর মাথাপিছু আয় অত্যাশ্চর্য ২১ গুণ বেড়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়ের দারিদ্যতা থেকে মুক্তি দেয়। তবুও এটা স্কুল তালিকাভুক্তি এবং প্রত্যাশিত আয়ুতে অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় নয়।

নেপাল, একটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ, প্রধানত কারণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বের দ্রুততম অগ্রসরমান। এর বর্তমান প্রত্যাশিত আয়ু ১৯৭০ সালের তুলনায় ২৫ বছর বেশি। নেপালে প্রতি পাঁচ জন শিশুদের মধ্যে চার জনের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়, যা ৪০ বছর আগে ১ জন ছিলো।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মানব উন্নয়ন সূচকে সর্বোত্তম (১১ ও ১২ নং, যা খুব উচ্চ মানব উন্নয়ন বিভাগে পড়ে), অনুসরণ করে হংকং (২১) ও সিঙ্গাপুর (২১)। আফগানিস্তান (১৫৫) মূল্যায়ন ১৬৯টি দেশ থেকে, যা এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন স্থান।

এশিয়া বিভিন্ন ভাষা পরিবার এবং বিচ্ছিন্ন ভাষার আবাস। বেশিরভাগ এশিয়ার দেশগুলোতে স্থানীয়ভাবে একাধিক ভাষায় কথা বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ এথ্‌নোলগ অনুযায়ী, ৬০০-র অধিক ভাষা ইন্দোনেশিয়ায়, ও ৮০০-র অধিক ভাষা ভারতে প্রচলিত। এবং ১০০-এর বেশি ফিলিপাইনে প্রচলিত। চীন বিভিন্ন প্রদেশে অনেক ভাষা এবং উপভাষা রয়েছে।

 ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্মের জন্য একটি পবিত্র শহর।

বিশ্বের অনেক প্রধান ধর্মের উত্স এশিয়ায়। এশীয় পুরাণ জটিল এবং বিচিত্র। উদাহরণস্বরূপ মহাপ্লাবনের ঘটনা, খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত, যা মেসপোটেমিয় পুরাণের প্রথম নিদর্শন। হিন্দু পুরাণে বলা আছে, অবতার বিষ্ণু মাছের বেশে মনুকে একটি ভয়ানক বন্যা সম্পর্কে সতর্ক করে।

প্রাচীন চীনা পুরাণে, শান হ্যায় জিং, চীনা শাসক দা ইউ ১০ বছর অতিবাহিত করে মহাপ্লাবন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, যা প্রাচীন চীনের বেশির ভাগ অঞ্চল প্লাবিত করেছিলো।  নুয়া দেবীর সহায়তায় আক্ষরিকভাবেই ভাঙা আকাশ ঠিক করে।

ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলো ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম এবং বাহাই ধর্ম পশ্চিম এশিয়ায় উত্পত্তি। ইহুদি ধর্ম, ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম, ইসরায়েলের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চর্চা করা হয়, যা হিব্রু জাতির জন্মস্থান এবং ঐতিহাসিক স্বদেশ।  ইহুদিদের বনী ইসরাঈল বলা হয়, তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এশিয়া/উত্তর আফ্রিকা, প্রবাসী ইউরোপীয়, উত্তর আমেরিকায়, এবং অন্যান্য অঞ্চল।

খ্রিস্ট ধর্ম এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত। ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুরে, রোমান ক্যাথলিক প্রধান ধর্ম; যা যথাক্রমে স্পেনীয় ও পর্তুগীজ দ্বারা পরিচিতি লাভ করে। আর্মেনিয়া, সাইপ্রাস, জর্জিয়া এবং এশীয় রাশিয়ায়, প্রাচ্যের অর্থোডক্স প্রধান ধর্ম। বিভিন্ন খ্রিস্টান গোষ্ঠীর প্রচারের জন্য এর অনুসারী মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও ভারতেও আছে। সন্ত টমাস ভারতে ১ম শতাব্দীতে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের চিহ্ন খুঁজে বের করেন।

ইসলাম, সৌদি আরবে উদ্ভব, এশিয়ার বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ছড়ানো ধর্ম। বিশ্ব মুসলিম জনসংখ্যার ১২.৭%, বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া, ক্রমহ্রাসমানভাবে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, ইরান এবং তুরস্ক এশিয়ায় অবস্থিত। মক্কা, মদিনা এবং জেরুজালেম সারা বিশ্বে ইসলামের জন্য মহা পবিত্র শহর। এসব পবিত্র শহর সারা বিশ্বের অনুসারীদের প্রধান আকর্ষণ, বিশেষ করে হজ্জ ও উমরাহ মৌসুমে। ইরান বৃহত্তম শিয়া দেশ ও পাকিস্তানে বৃহত্তম আহমদীয়া জনসংখ্যা রয়েছে।

বাহাই ধর্ম এশিয়ার ইরানে উদ্ভব, এবং সেখানে থেকে অটোমান সাম্রাজ্য, মধ্য এশিয়া, ভারত, এবং বার্মায় বাহাউল্লাহর জীবনদশায় ছড়িয়ে যায়। বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে অনেক মুসলিম দেশেই বাহাই-এর প্রচার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে কর্তৃপক্ষ দ্বারা ব্যাঘত হয়। লোটাস মন্দির নামে ভারতে বড় একটি বাহাই মন্দির রয়েছে।

প্রায় সব এশীয় ধর্মের দার্শনিক চরিত্র আছে এবং দার্শনিক চিন্তা এবং লেখার বৃহদাংশ এশীয় দার্শনিক ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত করে। হিন্দু দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন ভারতীয় দর্শনের অন্তর্ভুক্ত। এখানে অবস্তুগত উপাদানের সাধনার কথা বলা হয়েছে, অন্য দিকে আরেকটি ভারতীয় দর্শন চার্ভাকা, বস্তুগত বিশ্বের উপভোগ প্রচার করে থাকে। হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম এবং শিখধর্ম ভারত, দক্ষিণ এশিয়া থেকে উদ্ভূত। পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে চীন ও জাপানে কনফুসীয় ধর্ম, তাওবাদ ও জেন বৌদ্ধ ধর্ম বিকাশ লাভ করে।

২০১২ সালের হিসাবে, হিন্দুধর্মের অনুসারী প্রায় ১.১ বিলিয়ন মানুষ। এই ধর্মবিশ্বাস এশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ২৫% প্রতিনিধিত্ব করে এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। তবে, এটি বেশিরভাগই দক্ষিণ এশিয়ায় ঘনীভূত। ভারত ও নেপালের জনসংখ্যার ৮০% লোক এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও বালি, ইন্দোনেশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও বার্মা, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে অনেক বিদেশী ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

দক্ষিণ পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখন্ডে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর প্রাধান্য রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এমন দেশ গুলো হলোঃ কম্বোডিয়া (৯৬%), থাইল্যান্ড (৯৫%), মায়ানমার (৮০%-৮৯%), জাপান (৩৬%–৯৬%), ভূটান (৭৫%-৮৪%), শ্রীলঙ্কা (৭০%), লাওস (৬০%-৬৭%) এবং মঙ্গোলিয়া (৫৩%-৯৩%)। এছাড়াও বৃহৎ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী রয়েছে এমন দেশগুলো হলোঃ সিঙ্গাপুর (৩৩%-৫১%), তাইওয়ান (৩৫%–৯৩%), দক্ষিণ কোরিয়া (২৩%-৫০%), মালয়েশিয়া (১৯%-২১%), নেপাল (৯%-১১%), ভিয়েতনাম (১০%–৭৫%), চীন (২০%–৫০%), উত্তর কোরিয়া (১.৫%–১৪%), এবং ভারত ও বাংলাদেশে ছোট সম্প্রদায়।

অনেক চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে, মহায়ানা বৌদ্ধ ধর্ম সহজে তাওবাদের সাথে সমন্বয় সাধন হয়েছে। ফলে সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান বের করা কঠিন এবং তা কম বা বেশি হতে পারে। চীন, ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট-শাসিত দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নাস্তিক,  তাই বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কম উল্লেখিত হতে পারে।

জৈন ধর্ম মূলত ভারত এবং বিদেশী ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমনঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মালয়েশিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। শিখধর্ম উত্তর ভারত এবং এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিদেশি ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।
কনফুসীয় ধর্ম চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং বিদেশী চীনা জনসংখ্যার মধ্যে প্রধানত পাওয়া যায়। তাওবাদ প্রধানত চীন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অধিবাসীদের মধ্যে পাওয়া যায়। তাওবাদ সহজে মহায়ানা বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সমন্বয় সাধন হয়েছে। ফলে সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান বের করা কঠিন এবং তা কম বা বেশি হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তিকালীন সময়ে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে কেন্দ্রীভূত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা হলোঃ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভারতীয় বাঙ্গালী কবি, নাট্যকার, এবং লেখক, ১৯১৩ সালে প্রথম এশীয় হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকার  জাতীয় সঙ্গীতের লেখক।

অন্যান্য এশীয় লেখকদের মধ্যে যারা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছে তারা হলোঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (জাপান, ১৯৬৮), কেন্‌জাবুরো ওহয়ে (জাপান, ১৯৯৪), কাও শিংচিয়েন (চীন, ২০০০), ওরহান পামুক (তুরস্ক, ২০০৬), এবং মো ইয়ান (চীন, ২০১২)। অনেকে মার্কিন লেখক, পার্ল এস বাককে, একজন এশিয়ান নোবেল বিজয়ী বিবেচনা করে। একজন ধর্মপ্রচারকের কন্যা হিসেবে চীনে উল্লেখ্যযোগ্য সময় কাটিয়েছেন, এবং তার উপন্যাস, যথা দ্য গুড আর্থ (১৯৩১) এবং মাদার (১৯৩৩) এছাড়াও তার বাবা-মার চীনে থাকাকালীন সময়ের জীবনী, দ্য এক্সসাইল ও ফাইটিং এঞ্জেল চীন প্রবাসের উপ ভিত্তি করে লেখা, যা তাকে ১৯৩৮ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়।

এছাড়াও, ভারতের মাদার টেরিজা এবং ইরানের শিরিন এবাদি  গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তাদের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকারের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এবাদি প্রথম ইরানী এবং প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত।

আরেকজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মায়ানমারে অং সান সু চি সামরিক একনায়কতন্ত্র বিরুদ্ধে তার শান্তিপূর্ণ ও অহিংস সংগ্রামের জন্য। তিনি একজন অহিংস গণতন্ত্রপন্থী কর্মী, ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমক্রেসি ইন বার্মা-এর নেতা এবং একজন উল্লেখ্যযোগ্য কারাবন্দী। তিনি একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। অতি সম্প্রতি, চীনা ভিন্নমতাবলম্বী লিউ জিয়াবো নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন, চীনে মৌলিক মানবাধিকারের জন্য তার দীর্ঘ ও অহিংস সংগ্রামের জন্য। তিনি চীন মধ্যে বসবাস করার সময় নোবেল পুরস্কার লাভকারী প্রথম চীনা নাগরিক।

স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া প্রথম এশীয়। তিনি আলোর বিক্ষিপ্ততার উপর তাঁর কাজের জন্য এবং রামন বিক্ষিপ্ততার আবিষ্কারের জন্য, (যা তাঁর নিজের নামে নামকরণ করা হয়) পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

অমর্ত্য সেন, (জন্ম ৩ নভেম্বর, ১৯৩৩) একজন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, যিনি  কল্যাণ অর্থনীতি ও সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে তার অবদানসমূহের জন্য অর্থনীতিতে ১৯৯৮ সালে নোবেল স্মারক পুরস্কার লাভ করেন। তার আগ্রহের বিষয়বস্তু সমাজের দরিদ্রতম সদস্যদের সমস্যা।

অন্যান্য এশীয় নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছে সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর, আবদুস সালাম, রবার্ট আউমান, মেনাসেম বেগিন, এ্যারন চিচানোভার, আভরাম হেরর্সকো, ড্যানিয়েল কাহনেমান, শিমন পেরেজ, ইতযাক রাবিন, এডা ইয়োনাথ, ইয়াসির আরাফাত, হোজে র‍্যামন-হোর্তা, পূর্ব তিমুরের বিশপ কার্লোস ফিলিপ জিমেনেস বেলো, কিম দায়ে জং, এবং আরোও ১৩ জাপানি বিজ্ঞানী। বেশিরভাগ পুরস্কারপ্রাপ্ত জাপান এবং ইসরাইল থেকে, চন্দ্রশেখর ও রামন (ভারত), সালাম (পাকিস্তান), আরাফাত (ফিলিস্তিন), কিম (দক্ষিণ কোরিয়া), হোর্তা ও বেলো (পূর্ব তিমুর)।
ব্যতীত।

২০০৬ সালে, বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক, যা একটি গোষ্ঠী উন্নয়ন ব্যাংক, (যা দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মহিলাদের টাকা ধার দেয়) প্রতিষ্ঠার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ডঃ ইউনুস শহরের ভ্যান্দারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষুদ্র ঋণ ধারণার জন্য পরিচিত, যার মাধ্যমে সামান্য অথবা কোন সমান্তরালের সঙ্গে দরিদ্র ও নিঃস্ব লোক টাকা ধার করতে পারবে। সাধারণত ঋণগ্রহীতারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দেয় এবং ঋণ খেলাপের হার খুব কম।

দালাই লামা তার আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কর্মজীবনে প্রায় চুরাশিটি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৬ সালের ২২ জুন, তিনি কানাডার গভর্নর জেনারেল কর্তৃক কানাডার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব লাভ করেন, যা তার আগে মাত্র তিন জন লাভ করে। ২০০৫ সালের ২৮ মে, তিনি যুক্তরাজ্যের বৌদ্ধ সোসাইটি থেকে ক্রিসমাস হামফ্রে পুরস্কার পান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৮৯ সালের ১০ ডিসেম্বর তারিখে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ।

বিশেষ বিষয়:

তালিকা:




#Article 17: ইউরোপ (123 words)


Infobox Continent

 

 | align     = right
 | direction = vertical
 | width     = 200
 | image1    = Europe around 650.jpg
 | caption1  = ইউরোপ সি. ৬৫০

 | footer  = ৮১৪-এ শার্লেমেন সাম্রাজ্য: , 

 | align     = left
 | direction = vertical
 | width     = 150
 | image1    = rolandfealty.jpg
 | caption1  = পবিত্র রোমান সম্রাট চার্লেমাগনের প্রতি 
রোল্যান্ডের আনুগত্য পোষণের অঙ্গীকার
 | image2    = Delegation of Croats and Serbs to Emperor Basil I, Skylitzes.jpg
 | footer    = প্রথম বাসিলের বাইজেন্টাইন দরবারে ক্রোট ও সার্বের প্রতিনিধি

 | শেষাংশ = Hunt
 | প্রথমাংশ = Shelby D.
 | শিরোনাম = Controversy in marketing theory: for reason, realism, truth, and objectivity
 | ইউআরএল = 
 | প্রকাশক = M.E. Sharpe
 | বছর = 2003
 | পাতা = 18



#Article 18: ক্রীড়া (704 words)


ক্রীড়া হচ্ছে একটি সংগঠিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বিনোদনধর্মী এবং দক্ষতাসূচক শারীরিক কার্যকলাপ প্রদর্শনের উত্তম ক্ষেত্র। শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, কলা-কৌশল এবং সুস্থ ক্রীড়া প্রদর্শন করে একজন বিজয়ী তার অপূর্ব ক্রীড়াশৈলীর নিদর্শন রাখতে পারেন। এটি পরিচালিত হয় একগুচ্ছ নিয়ম-কানুন বা নিজস্ব চিন্তা-চেতনার মাধ্যম। খেলার প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে শারীরিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও মর্যাদা যাতে বিজয়ী এবং বিজিত পক্ষ নির্ধারিত হয়। শারীরিক সক্ষমতা হিসেবে মানুষ, প্রাণীসহ বল, যন্ত্র ইত্যাদি সরঞ্জামাদি জড়িত। এছাড়াও মনঃস্তাত্তিক খেলাধুলা হিসেবে কার্ড গেম এবং বোর্ড গেম রয়েছে। এগুলোর কিছু আবার আন্তর্জাতিক অলিম্পিক ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত।

শারীরিক ইভেন্টগুলো যেমন গোল করা কিংবা নির্দিষ্ট রেখা অতিক্রম করলে খেলায় ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও, ডাইভিং, ফিগার স্কেটিংয়ে খুব ভাল করার দক্ষতা যাচাই ও প্রদর্শন করা অন্যতম বিচার্য বিষয়। ব্যতিক্রম হিসেবে বডি বিল্ডিংয়ের মতো ইভেন্টগুলোয় দক্ষতা প্রদশর্নকে গণ্য করা হয় না।

প্রতিটি খেলার ফলাফলই রেকর্ড হিসেবে রাখা হয় এবং সর্বদাই অধিকাংশ খেলাগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার মাধ্যমে খেলাধূলার সংবাদে প্রচার করা হয়। বেশীরভাগ খেলাধূলাই শুধুমাত্র নিছক আনন্দ, মজা অথবা মানুষের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শারীরিক সক্ষমতার লক্ষ্যে ব্যয়ামের জন্য করা হয়। অধিকন্তু, পেশাদারী খেলাধূলা বিনোদনের অন্যতম মাধ্যমও বটে।

খেলাধূলা চর্চার ফলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সুন্দর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলোয়ারসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আচরণগুলোর মধ্যে - ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তনসহ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, বিচারক(বৃন্দ)কে ধন্যবাদজ্ঞাপন এবং হেরে গেলে বিজয়ীকে অভিনন্দন প্রদান করা অন্যতম।

ক্রীড়া শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফরাসী শব্দ ডিস্পোর্টস থেকে যার অর্থ হচ্ছে অবসর। আমেরিকানরা স্পোর্টস শব্দটিকে নিছক বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ক্রীড়ার একবচন শব্দ হিসেবে স্পোর্টস নামকরণ করেছে। ফার্সি শব্দ হিসেবে ক্রীড়ার ভাবার্থ দাঁড়ায় জয়ী। ক্রীড়াকে চীনা ভাষায় শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক গ্রীক শব্দে দৌঁড়বিদ হিসেবে দাবী করছে।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র ঘেটে জানা গেছে, সর্বপ্রথম চীনের নাগরিকেরা খ্রীষ্ট পূর্ব ৪০০০ বছর আগে থেকে খেলাধূলার সাথে জড়িত। জিমন্যাস্টিকস্ প্রাচীন চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে স্থান পেয়েছিল। কয়েক হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন মিশরের ফারাও সাম্রাজ্যে বেশকিছু খেলা প্রচলিত ছিল। তন্মধ্যে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা অন্যতম। এছাড়াও, মিশরীয় খেলাধূলার মধ্যে জ্যাভেলিন বা বর্শা নিক্ষেপ, উচ্চ লম্ফ এবং কুস্তির ব্যাপক প্রচলন ছিল। প্রাচীন ফারসী খেলার মধ্যে ইরানীয় মার্শাল আর্ট হিসেবে জোরখানে যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়াও, প্রাচীন ফারসী খেলা হিসেবে পোলো এবং জস্টিং রয়েছে।

খেলোয়াড়সূলভ মনোভাব হচ্ছে এমন একটি ধারা যা সুস্থ, সুন্দর খেলার অংশবিশেষ। এতে দলীয় সঙ্গীর সাথে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ প্রদর্শনসহ প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের নৈতিক আচরণ, স্বাধীনতা এবং জয়ী বা পরাজিত হলেও ব্যক্তি বা দলকে সম্মান দেখানো হয়ে থাকে।

অখেলোয়াড়োচিত আচরণ সুস্থ, সুন্দর খেলাকে কলুষিত করে, খেলার মর্যাদাকে ধুলিস্মাৎ করে। ক্রীড়াবিদ, কোচ, সমর্থক, শুভ্যানুধ্যায়ীরাই মূলতঃ এর সাথে জড়িত। ফলে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নষ্টসহ সংক্ষুদ্ধ জনতা সুন্দর সমাজ ও পরিবেশকে ধ্বংস করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমস্যা তৈরী করে, দেশ ও দশের ভাবমূর্ত্তি ক্ষুণ্ন করে।
 

এককালে খেলাধূলার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মূলতঃ চিত্ত বিনোদন। কিন্তু গণমাধ্যম এবং অবসর সময় কাটানোয় পেশাগত খেলার জুড়ি মেলা ভার। এর ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে অর্থ উপার্জনই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেশাগত খেলায় বিনোদন নয়, বরং আর্থিকভাবে লাভবান এবং নিজ নিজ জনপ্রিয়তাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যা প্রাচীন রীতি-নীতি হিসেবে ক্রীড়া চর্চার নির্মল বিনোদনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। 
এছাড়াও, চিত্ত বিনোদনের নতুন মাত্রা হিসেবে পুরুষ এবং মহিলা - উভয় খেলোয়াড়কেই জনপ্রিয় ও শীর্ষস্থানীয় তারকা খ্যাতি এনে দিয়েছে বর্তমানকালের গণমাধ্যম। 

ফুটবলই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। এছাড়াও, হকি, ক্রিকেট, হ্যান্ডবল, ভলিবল, সাঁতার, দৌঁড়, পোলভল্ট, পোলো, রাগবি, টেনিস, টেবিল টেনিস, খোঁ খোঁ, রোয়িং, ব্যাডমিন্টন, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ, দাবা, জুডু, ফ্যান্সিং, বাস্কেটবল ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় খেলা।

বিজয়ী ও বিজিত নির্ধারণে এক বা একাধিক বিচারক থাকেন। খেলার ধরন অনুযায়ী রেফারী বা মধ্যস্থতাকারীর নাম নির্ধারিত হয়। যেমনঃ হকি ও ক্রিকেটে আম্পায়ার, ফুটবলে রেফারী, দৌঁড়ে বিচারক ইত্যাদি। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত এবং খেলোয়াড়দের অবশ্য পালনীয়।

প্রতিটি ক্রীড়াতেই কিছু লিখিত আকারে রুলস্ বা নিয়ম লিপিবদ্ধ থাকে, যা কোড অব কন্ডাক্ট নামে পরিচিত। নিয়ম বিরুদ্ধ কিছু ঘটলে রেফারী কর্তৃক সতর্কীকরণ চিহ্ন হিসেবে লাল, হলুদ কিংবা সবুজ রংয়ের কার্ড দেখানো হয়। খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে কার্ড প্রদর্শনের উপর নির্ভর করে যে পরবর্তী খেলায় খেলোয়াড়টি অংশ নিতে পারবে কি-না।

দৌঁড়জাতীয় খেলাগুলোতে নির্দিষ্ট একটি স্ট্যাণ্ডে ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারীর মর্যাদা দিয়ে পদক প্রদান করা হয়। পূর্বে অলিম্পিক খেলায় খেজুর পাতার মুকুট পড়িয়ে মূল্যায়িত করা হতো। দলীয় খেলা হিসেবে ফুটবল, হকি, ক্রিকেটে সোনা, রূপার কাপ বা ট্রফি প্রদান করার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা হিসেবে নির্দিষ্ট পুরস্কার প্রদান করা হয়। পাশাপাশি চেকের মাধ্যমে অর্থ কিংবা মোটর গাড়ীসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি উপহার হিসেবে দেয়া হয়।

সম্পূর্ণ দেশীয় খেলা হিসেবে কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলার মর্যাদা লাভ করেছে। তবে আইসিসি ট্রফি জয়ের পরবর্তী সময়ে ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশের সমধিক পরিচিত ও ব্যাপকভাবে প্রচলিত খেলারূপে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।




#Article 19: দাবা (1790 words)


দাবা একটি জনপ্রিয় খেলা যা বোর্ড বা ফলকের উপর খেলা হয়। দাবা খেলার সর্বপ্রথম সূচনা হয় ভারতবর্ষে। যিনি দাবা খেলেন তাকে দাবাড়ু  বলা হয়। দাবায় দু’জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে। দাবা খেলায় জিততে হলে বোর্ডের ওপর ঘুঁটি সরিয়ে বা চাল দিয়ে বিপক্ষের রাজাকে কোণঠাসা করে  এমন স্থানে আনতে হয় যেখান থেকে রাজা আর স্থানান্তরিত হতে পারে না, দাবার পরিভাষায় একে বলে ‘কিস্তিমাত’ ()।

যুদ্ধংদেহী ফলকক্রীড়া রূপে দাবা খেলার সুনাম রয়েছে। খেলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষের ঘুঁটি আয়ত্তে আনার মাধ্যমে নতস্বীকারে বাধ্য করা। ফলকের উপর খেলা যায় এমন খেলাগুলোর মধ্যে এ খেলার বিশ্বব্যাপী অসম্ভব জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসরতা ও আক্রমণ চিহ্নিত করার দক্ষতার মাধ্যমে দাবাড়ুর শক্তিমত্তা যাচাই করা সম্ভবপর। প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই রাজা, মন্ত্রী, হাতি, ঘোড়া, নৌকা ও বোড়ের সমন্বয়ে গঠিত ১৬ ঘুঁটির সৈনিকদল একে-অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়। প্রত্যেক ঘুঁটিরই ক্রীড়াফলকে স্থানান্তরের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। কোন কারণে ঘুঁটির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ঘুঁটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে তা অধিকৃত স্থানের পর্যায়ে পৌঁছে ও ক্রীড়াফলক থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়।

বেশির ভাগই ঐতিহাসকগণ মনে করেন যে প্রাচীণ ভারতবর্ষেই দাবা খেলার জন্ম।
ঠিক কোথায় সর্বপ্রথম দাবা খেলার উৎপত্তি, সেটি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কিছু প্রাচীন আমলের হরফে দাবা খেলার প্রারম্ভিক কাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, পাশাপাশি খেলাটির আদি অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ কিছু কিছু দাবার গুটিরও হদিশ মেলে। কিন্তু এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, তত্ত্ব ও মতামতের অভাব নেই। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের ধারণা ভারত, পারস্য কিংবা চীনই দাবার জন্মস্থল। তবে দাবা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখানেই সীমিত নয়। ইউরোপে দাবার যে রূপ অনুপ্রবেশ করে তা আদপে প্রায় ১,৩৫০ বছর আগেই পারস্যে খেলা হতো। সেই সময় তথা সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সেই অঞ্চলে মুসলিম সেনাশক্তির অধীনে ছিল। মুসলিম বিশ্বে এই খেলাটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং ইসলামের প্রচারের সাথে সাথে খেলাটি ছড়িয়ে যেতে যেতে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপেও চলে যায়।

বিভিন্ন জাতির পক্ষেই নানারকম দাবি থাকলেও হলেও বহু গবেষণার পর গবেষকগণ একমত হয়েছেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশেই খেলাটির আদি উৎপত্তি স্থান। দাবার মতো এক ধরনের খেলার সন্ধান পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে খ্রিস্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দে, যার নাম ছিল শতরঞ্জ। তবে ভারত বর্ষে চতুরঙ্গ নামক দাবা খেলাটির সূচনা হয় ষষ্ঠ শতাব্দীর আগেই, ভারতবর্ষে তখনও গুপ্ত সাম্রাজ্য বিরাজমান। তখন দাবাকে চতুরঙ্গ বলার কারণ ছিলmdash;খেলাটিতে হাতি, ঘোড়া, রথ ও সৈন্য এই চারটি অংশ ছিল। কিন্তু চতুরঙ্গ খেলাটা ‘দাবা’ হয়ে উঠতে অনেক সময় চলে গেছে, পাড়ি দিতে হয়েছে সমুদ্র। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তাহলে খেলাটা ছড়িয়ে পড়ল কীভাবে?

আসলে ওই সময়ে পারস্যের সঙ্গে ভারতের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল দারুণ। পারস্যের বণিকেরা খেলাটি দেখেন, এবং বেশ পছন্দ করে ফেলেন। অতি উৎসুক কয়েকজন বেশ শোরগোল করে নিয়মকানুন শিখেও ফেলেন। পরবর্তীতে পারস্যে এই খেলার উন্নয়ন সাধিত হয়, এবং চতুরঙ্গ নামটা বদলে সেটিই হয়ে ওঠে ‘শতরঞ্জ’ (, ফার্সী: شترنگ‎)। নাহ, নামটা বদলে গেছে বলাটা ঠিক হলো না। আসলে পারস্য বর্ণমালাতে ‘চ’ এবং ‘গ’ না থাকায় সেটাই কালক্রমে ‘শ’ এবং ‘জ’-তে পরিণত হয়।

তবে প্রায় একই সময় ভারত থেকে খেলাটি চীনেও পাড়ি দেয়। চীনারা এই খেলার নামকরণ করে জিয়ানকি বা শিয়াংচি (চীনা: 象棋, পিনয়িন: xiàngqí; ইংরেজি: Xiangqi), যা কিনা দাবারই আরেক নামান্তর! তবে চীন দাবি করে, জিয়ানকি তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত খেলা। শুধু তাই নয়, দাবা খেলাটাও নাকি ভারতে নয়, চীনেই উদ্ভাবিত হয়েছে! যদিও ইতিহাসবিদেরা চীনের সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাননি।

অন্যদিকে শতরঞ্জ কিন্তু পারস্যে অলস বসে ছিলো না, সুযোগ বুঝে ঠিক পাড়ি জমিয়েছিলো স্পেনে! সে সময় স্পেনে ছিলো মুসলিম শাসনামল, যার বদৌলতে পারস্য থেকে খেলাটি খুব সহজেই স্পেনে শক্ত আসন গেঁড়ে বসে। তবে নামটা এখানে এসে বদলে যায় আরেকবার, এবার সেটা পর্তুগীজ ভাষায় হয়ে যায় ‘Xadrez’, যাকে ইংরেজিতে ‘Ajedrez’, ‘Acedrex’, ‘Axedrez’ বিভিন্নভাবে লেখা হয়।

পারস্যের ‘শাহ-মাৎ’ নামটিও রেহাই পায়নি রূপান্তর থেকে। গ্রিসে ‘শাহ’ তথা রাজা শব্দটির পরিভাষা হচ্ছে ইয়াট্রিকিওন (Zatrikion), আর এই নামেই খেলাটি সেখানে প্রচলিত হয়। এছাড়া ল্যাটিন ভাষায় Ludus Scacchorum, ইতালিয়ান ভাষায় scacchi, কাতালান ভাষায় escacs, ফ্রেঞ্চ ভাষায় échecs, ওলন্দাজ ভাষায় schaken, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে দাবা বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে। পরে ইউরোপে ও রাশিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এই খেলা, তবে এখানে নতুন নাম ‘চেস’। শব্দটি পুরাতন ফরাসি ভাষা ‘échecs’ (অর্থ চেক) থেকে উদ্ভূত। তবে শুধু নামেই নয়, খেলাটিতেও পরিবর্তন আসে অনেকটাই। ইউরোপে আসার পরই দাবায় প্রথমবারের মতো ‘বিশপ’ (হাতি) যুক্ত হয়, আরও পরে যোগ হয় ‘কুইন’ (রানি)। ধীরে ধীরে ‘চেস’ বা দাবা ইউরোপীয়দের মাধ্যমেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

দাবা বোর্ডে বর্গাকৃতি ৬৪টি সাদা-কালো ঘর থাকে। ঘরগুলোতে প্রতিটি খেলোয়াড়ের একটি করে রাজা বা কিং, মন্ত্রী বা কুইন, দু’টি করে - নৌকা বা রুক, ঘোড়া বা নাইট ও গজ বা বিশপ এবং ৮টি করে পন বা বোড়ে সহ মোট ১৬টি গুটি থাকে। অর্থাৎ, দু'জন খেলোয়াড়ের সর্বমোট ৩২টি গুটি থাকে। র‌্যাঙ্ক বা সারিগুলোকে ইংরেজি 'ওয়ান' (1) থেকে 'এইট' (8) সংখ্যা দিয়ে এবং ফাইল বা স্তম্ভগুলোকে ইংরেজি 'এ' (a) থেকে 'এইচ' (h) বর্ণ দিয়ে নির্দেশ করা হয়। ফলে দাবার ছকের প্রতিটি ঘরকেই একটি অনন্য বর্ণ-সংখ্যা প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করা যায়। দাবার নোটেশন বা লিপিবদ্ধকরণের এই পদ্ধতি খুবই কাজে আসে, কেননা এটি ব্যবহার করে যে-কোন দাবা খেলার সমস্ত চাল লিপিবদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে নিজের ভুলগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়।

প্রতিপক্ষের রাজার বিরুদ্ধে কিস্তি বা চেক দেবার পর যদি রাজা চেক সরাতে না পারে এবং পরবর্তীতে যদি নড়াতে না পারে তবে কিস্তিমাৎ হয়ে খেলা শেষ হবে।

দাবা খেলার জন্ম ভারতবর্ষে বলে সর্বাধিক প্রচলিত মতবাদ । এছাড়া, পারস্য (বর্তমান ইরান) দেশে ৩য় শতাব্দীতে প্রচলিত শতরঞ্জ এবং চীন -এ ২য় শতাব্দীতে প্রচলিত শিয়াংছী নামক খেলাকে দাবার পূর্বসূরী হিসেবে গণ্য করার পক্ষেও মতামত আছে। কথিত আছে যে রাবনের স্ত্রী চিত্রাঙ্গদা যুদ্ধে নিবৃত করার জন্য রাবনের সাথে দাবা খেলতেন । প্রাচীন ভারতীয় খেলা হিসেবে দাবার সংস্কৃত শব্দ শতরঞ্জ খেলাটি পরিবর্তিতরূপে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে পরিমার্জিত হয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। ক্রীড়াবিদেরা দাবার কৌশল এবং বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগে খেলাটির ধারাই পরিবর্তন করে দিয়েছেন। অনেক বছর ধরে দাবা খেলার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে কম্পিউটারের সহযোগিতা নিচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। তেমনি একটি হলো – ডীপ ব্লু। এটিই ১ম যন্ত্রচালিত প্রোগ্রাম যা তৎকালীন বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে ১৯৯৭ সালে পরাজিত করে।

সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত ক্রীড়া হিসেবে দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ষোড়শ শতকে। বিশ্ব দাবা প্রতিযোগিতায় ১৮৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ১ম শিরোপাধারী হন উইলিয়াম স্টেইনজ। বর্তমান শিরোপাধারী হলেন –নরওয়ের
ম্যাগনাস কার্লসন।

দাবা প্রতিযোগিতা হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের পাশাপাশি প্রমিলা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ, জুনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ, বিশ্ব সিনিয়র চ্যাম্পিয়নশীপ, করেসপন্ডেন্স দাবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ, বিশ্ব কম্পিউটার দাবা চ্যাম্পিয়নশীপ এবং ব্লিটজ এন্ড র‌্যাপিড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশীপ (দ্রুতগতির দাবা) অন্যতম। তবে দাবা অলিম্পিয়াডে দলগতভাবে বিভিন্ন দেশের মধ্যেকার খেলা জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। অনলাইনভিত্তিক দাবা শৌখিন ও পেশাধারী প্রতিযোগিতা হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

দাবা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত খেলা। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ও ফিদে আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বর্তমানে দাবা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাড়ীতে, ক্লাবে, টুর্ণামেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় লক্ষ লক্ষ দাবাড়ু অংশগ্রহণ করে। নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরেও বিভিন্ন ধরনের নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করে খেলা হয়ে থাকে।

বিশ্ব দাবা ফেডারেশন বা ফিদে কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম-কানুন দাবা খেলায় প্রয়োগ করা হয়। স্বীকৃত দাবা প্রতিযোগিতাগুলো ফিদে হ্যাণ্ডবুকে বর্ণিত নিয়মে পরিচালিত হয়। দাবা টুর্নামেন্টের নিয়মকানুন দিয়ে যেভাবে খেলতে হয় অনেক টুর্নামেন্টে সাধারণ ও একই রকম কিছু নিয়ম অনুসরণ করা হয়। বাসায় বা অনলাইনে খেলার ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো সাধারণত মানা হয়না, কিন্তু আপনি সেগুলো যেকোনো উপায়ে অনুশীলন করতে চাইতে পারেন।

স্পর্শ-চাল- যদি কোনো খেলোয়াড় তার নিজের কোনো গুটি ধরেন, তাহলে তাকে ঐ গুটিই চালাতে হবে যদি কোনো বৈধ চাল থাকে। যদি একজন খেলোয়াড় তার প্রতিপক্ষের কোনো গুটি ধরেন তাহলে তাকে ঐ গুটি খেতে হবে। যদি কোনো খেলোয়াড় বোর্ডে সমন্বয় করার জন্য গুটি ধরতে চান, তাহলে তার ইচ্ছার কথা ঘোষণা দিয়ে নিতে হবে, সাধারণত ধরার আগে সমন্বয় বলে।

ঘড়ি ও সময়ের মানদণ্ডঅধিকাংশ টুর্নামেন্টে ঘড়ি ব্যবহার করা হয় প্রতিটি খেলার সময় বেঁধে দেওয়ার জন্য, নির্দিষ্ট চালের সময় মাপার জন্য জন্য নয়। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পুরো খেলা শেষ করার জন্য সমান সময় বরাদ্দ করা হয় এবং তিনি নিজের ইচ্ছেমতো তা ব্যবহার করতে পারেন। একজন খেলোয়াড় নিজের চাল দেবার পর একটি বোতাম টিপে অথবা একটি হাতলে চাপ দিয়ে প্রতিপক্ষের ঘড়ি সচল করে দেন। যদি কোনো খেলোয়াড়ের নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে যায় এবং তার প্রতিপক্ষ সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তাহলে যার সময় শেষ হয়ে গেছে তিনি পরাজিত হবেন (এক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষের কাছে কিস্তিমাত করার মতো যথেষ্ট গুটি থাকতে হবে, নইলে খেলাটি ড্র হবে)।

দাবা খেলা বর্গাকৃতি ৮টি রো ও ৮টি কলামে মোট ৬৪টি ঘরের সমষ্টিতে তৈরী বোর্ডে হয়ে থাকে। রো-গুলো রেংক বা ‍সারি হিসেবে ১ থেকে ৮ সংখ্যায় নির্ধারিত এবং কলামগুলো ফাইল হিসেবে যা ইংরেজি অক্ষর এ থেকে এইচ পর্যন্ত হয়ে থাকে। দাবা বোর্ড কাগজের, কাঠের, প্লাস্টিকের তৈরী হয়ে থাকে। 

৬৪টি বর্গাকৃতি ঘরগুলো দু’ধরনের হয়। একটি হালকা এবং অন্যটি গাঢ় কিংবা একটি সাদা এবং অন্যটি কালো। সাধারণতঃ ঘরগুলোর সাথে মিল রেখে ঘরগুলোর রং হয়। তবে দু’দলের মন্ত্রী বা কুইনের রং হবে নিজ ঘরের রংয়ে। 
গুটিগুলো দুই অংশে বিভক্ত। তাহলো সাদা এবং কালো সেট। খেলোয়াড়দের পরিচিতি হয় ‘সাদা’ এবং ‘কালো’।

পাশ্চাত্য নিয়ম মতে সাদা গুটি সর্বদা প্রথম চালানো হয়। এরপর থেকেই একটি গুটির পর অন্য দলের গুটি চালানো হয়। ব্যতিক্রম হিসেবে ক্যাসলিঙের সময় দু’টি গুটি পরিচালিত হয়। খালি জায়গায় গুটি চালাতে হয় অথবা প্রতিপক্ষের গুটি দখল করে ঘর থেকে বাইরে উচ্ছেদ করা হয়। একমাত্র এন পাসান্ট নিয়ম ছাড়া, বাকি সব ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের গুটিকে উচ্ছেদ করতে গুটিটির অধিকৃত ঘর দখল করা হয়। যদি কোন কারণে গুটি পরিচালনা করা না যায় তাহলে অমীমাংসিত ভাবে খেলা শেষ হয়। প্রতিপক্ষের রাজা আক্রান্ত হয়ে কোন ঘরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে কিস্তিমাত বা চেকমেটের সাহায্যে খেলা শেষ করা হয়।

প্রতিটি দাবার গুটির নিজস্ব চলাচলের শর্ত রয়েছে।

যখন একটি বোড়ে ৮ম রাঙ্কে যায়, তখনই খেলোয়াড় ইচ্ছে করলে এর পরিবর্তে নিজ দলের মন্ত্রী, নৌকা, হাতি কিংবা ঘোড়ার গুটি বোর্ডে আনতে পারেন। সাধারণতঃ বোড়ে উত্তরিত হয়ে মন্ত্রীতে রুপান্তরিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি অন্য গুটি পছন্দ করা হয়, তখন তা আণ্ডার প্রমোশন নামে পরিচিত হয়।

যখন একটি বোড়ে তার শুরুর দানে দুই ঘরে এগিয়ে যায় এবং সেই ঘরের পাশের ফাইলে প্রতিপক্ষের বোড়ে থাকে, তখন এন পাসেন্ট দানের সাহায্যে প্রতিপক্ষের বোড়ে প্রথম বোড়েকে উচ্ছেদ করতে পারে। এই দানে প্রতিপক্ষের বোড়েটিকে প্রথম বোড়ের পেছনের ঘরে আড়াআড়ি ভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দান প্রথম বোড়ের ঠিক পরের দানেই সম্ভব।

রাজা সাধারণতঃ শুধু তার ঘরের সাথে সংযুক্ত যে কোন একটি ঘরে যেতে পারে। তবে বিশেষ শর্তে প্রতি খেলায় মাত্র একবারের জন্য ক্যাসলিং নামক এক বিশেষ চালের সুযোগ পায়। প্রথম সারিতে থাকা রাজা প্রথম সারিতে থাকা নৌকার দিকে দুই ঘর যেতে পারে এবং ঐ একই দানে নৌকা রাজা দানটির সময় যে ঘর অতিক্রম করছিল, সেই ঘরে চলে যেতে পারে। ক্যাসলিং তখনই সম্ভব যখন নিম্নলিখিত পূর্বশর্তগুলি বজায় থাকে

আবার ক্যসলিং ২ প্রকারের হয়ে থাকে। 
১) শর্ট/কিংসাইড  ক্যাসলিংঃ রাজা তার নিজ পাশের নৌকার সাথে যখন ক্যাসলিং সম্পন্ন করে। এর নোটেশন O-O ভাবে করা হয়।
২) লং/কুইনসাইড  ক্যাসলিংঃ রাজা যখন মন্ত্রীর পাশের নৌকার সাথে ক্যাসলিং সম্পন্ন করে। এর নোটেশন O-O-O ভাবে করা হয়। 

অপেশাদার এবং ঘরোয়া দাবা খেলাতে কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। কিন্তু পেশাদার দাবা খেলায় নির্দিষ্ট সময় দেয়া থাকে।

বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে আছেন কাজী মোতাহার হোসেন। তাকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়।

নিয়াজ মোরশেদ, জিয়াউর রহমান,রাণী হামিদ ও রিফাত বিন সাত্তার (বাংলাদেশ); বিশ্বনাথন আনন্দ (ভারত); ববি ফিশার (যুক্তরাষ্ট্র); নাইজেল শর্ট (ইংল্যান্ড), কাসপারভ ও কারপভ (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন), ম্যাগনাস কার্লসেন (নরওয়ে) ।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশসমূহ দাবাড়ুদের দেশ হিসেবে চিহ্নিত। সাধারণতঃ গণিতে অভিজ্ঞরাই দাবা খেলায় উন্নতি করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা দাবী করে থাকেন। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এ খেলায় নারীদের তুলনায় পুরুষদের অংশগ্রহণের হার খুব বেশি। শতকরা ৯৮ জন পুরুষ দাবা খেলায় অংশ নেন; যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ২%।

কিস্তি, বড়ে, পন, কিং, কুইন, রুক, বিশপ, ক্যাসলিং, নাইট, চেক, স্টেলমেট, গামবিট, র‌্যাংক, অঁ পাঁসা, বোর্ড।




#Article 20: ধর্ম (193 words)


ধর্ম বলতে বোঝায় কোনো প্রাণী বা বস্তুর বৈশিষ্ট্য। মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাণী এবং বস্তুর স্ব স্ব ধর্ম অর্থাৎ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বস্তুর যেমন মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে ঠিক তেমনি প্রাণীদেরও মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের প্রাণীদের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। তবে Homo sapiensদের (মানুষ) ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু ভিন্ন ধরনের। মানুষ হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী প্রাণী। একমাত্র মানুষ দের ক্ষেত্রেই এ ধর্ম কিংবা বৈশিষ্ট্য দুই ধরনের হয়ে থাকে।

প্রাণী সুলভ ধর্ম অথবা বৈশিষ্ট্যঃ পৃথিবীর অন্য সকল প্রাণীর মতই স্যাপিয়েন্স দেরও কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেমন_খাওয়া, ঘুম, মলত্যাগ, যৌন সম্ভোগ, বিবাদ, আত্মরক্ষা, পরিবেশে টিকে থাকার আয়োজন।

মনুষ্য সুলভ ধর্ম অথবা বৈশিষ্ট্যঃ যে কারণে তারা মানুষ অর্থাৎ তাদের অর্জিত জ্ঞান, যা কেবল অনুভবই করা যায়, দেখা যায়না। এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারাই মানুষ তার প্রাণী সুলভ ধর্ম অথবা বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কেবলমাত্র সমাজে বেড়ে ওঠা হোমো স্যাপিয়েন্স-এর মাঝেই এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যেমন_
পরিচিতি, ভাবের আদান-প্রদানের জন্য ভাষা জ্ঞান, সামাজিকতা, পঞ্চ ইন্দ্রিয় কে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি, চিন্তা করে আবিষ্কারের ক্ষমতা, বিশ্লেষণাত্মক মন, স্ব প্রতিফলনের ক্ষমতা, চেতনা ও বোধশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, আবেগ ও অনুভূতি, ধৈর্য্য, বিবেক, ক্ষমা।
এই মনুষ্য সুলভ ধর্ম অথবা বৈশিষ্ট্যের জন্য কালে কালে বিভিন্ন দর্শন, নিয়মকানুন এবং পথনির্দেশনা এসেছে।




#Article 21: চাঁদ (1640 words)


চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার (প্রায় ২৩৮,৮৫৫ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস ৩,৪৭৪.২০৬ কিলোমিটার (২,১৫৯ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর অর্থ দাড়াচ্ছে, চাঁদের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয় তা হলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ পাউন্ড। এটি প্রতি ২৭.৩২১ দিনে পৃথিবীর চারদিকে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। প্রতি ২৯.৫ দিন পরপর চন্দ্র কলা ফিরে আসে অর্থাৎ একই কার্যক্রম আবার ঘটে। পৃথিবী-চাঁদ-সূর্য তন্ত্রের জ্যামিতিতে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের কারণেই চন্দ্র কলার এই পর্যানুক্রমিক আবর্তন ঘটে থাকে।

বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায়। যতদিন না পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে।

প্রাচীনকালে সংস্কৃতি ছিল বিরল, বেশির ভাগ মানুষেরই নির্দিষ্ট কোনো বাসস্থান ছিল না। তারা মনে করত, চাঁদ প্রত্যেক রাত্রি মরে ছায়ার জগতে চলে যায়। অন্যান্য সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করত যে চাঁদ সূর্যকে পিছু করছে। পিথাগোরাসের সময়ে, চাঁদকে একটি গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মধ্যযুগে কিছু মানুষ বিশ্বাস করত যে চাঁদ হয়তো একটি নির্ভুলভাবে মসৃণ গোলক যা অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব সমর্থন করত এবং অন্যান্যরা মনে করত সেখানে সাগর আছে (সাগর বলতে চাঁদের উপরিতলের অন্ধকার অঞ্চলকে বোঝায় যা চিত্র শব্দতে এখনও ব্যবহার করে)। ১৬০৯ সালে গ্যালিলিও যখন তাঁর দূরবীক্ষণ চাঁদের দিকে ধরলেন, তিনি দেখলেন যে চাঁদের উপরিতল মসৃণ ছিল না। তা ক্ষুদ্র কালো রেখা, উপত্যকা, পর্বত এবং খাদের গঠিত হয়। সেই মুহূর্ত থেকে তিনি অনুভব করতে শুরু করেন যে এটি পৃথিবীর মতোই একটি কঠিন গলিত পদার্থ ছিল যা পরে এই রূপ নেয়। ১৯২০ সালেও মনে করত যে চাঁদের শ্বাস গ্রহণের উপযোগী বায়ুমণ্ডল আছে (অথবা ঐ সময় বিজ্ঞানের কাল্পনিক বানোয়াট গল্প বলত) এবং কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি ক্ষুদ্র বায়ু স্তরের উপস্থিতি আছে বলে অনুমান করত কারণ চাঁদ পর্যবেক্ষণ সময় তারা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু উড়ন্ত বস্তু দেখে ছিল। উদাহরণ হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলফন্স ফ্রেসার তাঁর গবেষণামূলক আলোচনা-গ্রন্থে চাঁদের অনাকাঙ্ক্ষিত উড়ন্ত বস্তু সম্পর্কে লিখেন: 

চাঁদের বসবাস করার সাথে জড়িয়ে আছে অমোচনীয় পানি এবং বায়ু অনুপস্থিতির সমস্যার এবং আলফন্স ফ্রেসা এই শর্তাবলিতে প্রতিবেদন করেছিলেন: 

চাঁদই একমাত্র জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু যাতে মানুষ ভ্রমণ করেছে এবং যার পৃষ্ঠতলে মানুষ অবতরণ করেছে। প্রথম যে কৃত্রিম বস্তুটি পৃথিবীর অভিকর্ষ অতিক্রম করেছিল এবং চাঁদের কাছ দিয়ে উড়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল তা হল সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা ১। লুনা ২ প্রথবারের মত চাঁদের পৃষ্ঠতলকে প্রভাবান্বিত করেছিল। চাঁদের দূরবর্তী যে অংশটা স্বাভাবিকভাবে লুকায়িত থাকে তার প্রথম সাধারণ ছবি তুলেছিল লুনা ৩। এই তিনটি ঘটনাই সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিচালনায় ১৯৫৯ সালে সংঘটিত হয়। ১৯৬৬ সালে লুনা ৯ প্রথমবারের মত চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে এবং লুনা ১০ প্রথমবারের মতো চাঁদের কক্ষপথ পরিক্রমণ করতে সমর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পাল্লা দিতে অ্যাপোলো প্রকল্প শুরু করে। পরে ১৯৬৯ সালে, অ্যাপোলো-১১ অভিযান প্রথমবারের মতো চাঁদে মনুষ্যবাহী নভোযান অবতরণ করাতে সমর্থ হয়। নিল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন ছিলেন প্রথম মানুষ যাঁরা চাঁদে হেঁটেছেন । পরে আরও ১০ মানুষ কেবল চাঁদে হেঁটেছিল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ছয়টি নভোযান চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে। অ্যাপোলো অভিযানের পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চাঁদে মানুষ পাঠানোর সকল পরিকল্পনা ত্যাগ করে। ২০০৯ সালে প্রথম দিকে ভারত, চন্দ্রযান নামে একটি মহাকাশযান চাঁদে পাঠায়। কিন্তু প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। মহাকাশযান চাঁদে পৌঁছার পর পরেই তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু অল্প সময়ে যে তথ্য পাঠিয়েছে তা মানব জাতিকে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে চাঁদে জীবের অস্তিত্ব থাকার কারণ সেখানে পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে৷
তবে ২০১৯ সালের ২২ জুলাই ভারতের ইসরো, চন্দ্রযান-২ নামে পুনরায় একটি মহাকাশযানের সফল উৎক্ষেপণ করে।

চাঁদের আবর্তনের পর্যায়কাল এবং তার কক্ষপথের পর্যায়কাল একই হওয়ায় আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ সবসময় দেখতে পাই। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে ২৭ দিন ৭ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড সময় নেয়। কিন্তু সমসাময়িক আবর্তনের ফলে পৃথিবীর পর্যবেক্ষকরা প্রায় ২৯.৫ দিন হিসেবে গণনা করে। একটি ঘণ্টা আবর্তনের পর্যায়কাল অর্ধেক ডিগ্রি দূরত্ব অতিক্রম করে। চাঁদ পৃথিবীকে যে অক্ষরেখায় পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে, সে অক্ষরেখায় চাঁদ একদিন বা ২৪ ঘণ্টায় ১৩°কোণ অতিক্রম করে। সুতরাং পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে চাঁদের সময় লাগে ২৭ দিন ৭ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড। এই জন্য আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের একই পৃষ্ঠ দেখে থাকি। পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দেখতে পেয়ে থাকি। চাঁদ আকাশের সবসময় একটি অঞ্চল থাকে তাকে জৌডিঅ্যাক (zodiac) বলে। যা ক্রান্তিবৃত্তের প্রায় ৮ ডিগ্রি নিচে এবং গ্রহণরেখার উপরে অবস্থান করে। চাঁদ প্রতি ২ সপ্তাহে একে অতিক্রম করে ৷

বাংলায় চাঁদ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চন্দ্র থেকে এসেছে।  এছাড়াও শশধর, শশী প্রভৃতিও চাঁদের সমার্থক শব্দ। চন্দ্র পৃষ্ঠের ভূমিরূপকে পৃথিবী থেকে খালি চোখে খরগোশ বা শশকের ন্যায় লাগে। তাই শশক ধারক রূপে কল্পনা করে শশধর নামটি দেওয়া হয়েছে।
ইংরেজি ভাষায় পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহটির The Moon ছাড়া অন্য কোনো নাম নেই। অবশ্য অন্যান্য গ্রহের উপগ্রহের আরও নাম থাকতে দেখা যায়। মুন শব্দটি জার্মান ভাষাগোষ্ঠীর কোনো একটি থেকে এসেছে যার সাথে সম্পর্কিত রয়েছে লাতিন শব্দ mensis। মেনসিস শব্দটি মূলত প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার মূল me- থেকে এসেছে। এই একই মূল থেকে আবার ইংরেজি measure শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে। মিজার শব্দটিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে, কারণ এর সাথে শব্দের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিমাপের প্রকাশের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন: Monday, month এবং menstrual। ১৬৬৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত ইংরেজি ভাষায় মুন বলতে কেবল মাত্র চাঁদকেই বুঝাত। কিন্তু ১৬৬৫ সালে তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত অন্যান্য গ্রহের প্রাকৃতিক উপগ্রহের ক্ষেত্রেও এই মুন শব্দটি প্রয়োগ করা শুরু হয়। মুনা শব্দের লাতিন প্রতিশব্দ হচ্ছে Luna। অন্য গ্রহের প্রাকৃতিক উপগ্রহের সাথে পৃথিবীর প্রাকৃতিক উপগ্রহের পার্থক্য করার জন্য চাঁদকে ইংরেজিতে মুন না বলে তাই অনেক সময়েই লুনা বলা হয়ে থাকে। ইংরেজিতে চাঁদের বিশেষণ হিসেবে লুনার শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একই সাথে চাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষণগত উপসর্গ হিসেবে seleno- এবং অনুসর্গ হিসেবে -selene ব্যবহৃত হয়। এই উপসর্গ এবং অনুসর্গ গ্রিক ভাষার শব্দ selene থেকে এসেছে যা এখন গ্রিক দেবতার নাম।

পৃথিবীর সাথে চাঁদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দূরত্বের দিক থেকে চিন্তা করলে এরা একে-অপরের বেশ নিকটে অবস্থিত, আর তাই মহাকর্ষীয় আকর্ষণজনিত প্রভাবও বেশি। এই প্রভাবের প্রধানতম অবদান হচ্ছে জোয়ার-ভাটা।

পৃথিবী-চন্দ্র সমাহারের অবিরত পরিবর্তন হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। চাঁদের আকর্ষণে চাঁদের দিকে অবস্থিত সমুদ্রের পানি তার নিচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত পানি বেশি ফুলে উঠে। আবার পৃথিবীর যে অংশে অবস্থিত পানি চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নিচের মাটি তার উপরের পানি অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক অধিক জোরে আকৃষ্ট হয়। কারণ এই মাটি পানি অপেক্ষা চাঁদের বেশি নিকটবর্তী। ফলে সেখানকার পানি মাটি থেকে দূরে সরে যায় অর্থাৎ ছাপিয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ফুলে উঠার কাহিনীটিই ঘটে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (এক দিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যে-কোন অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যে-কোন স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়।

তবে জোয়ার-ভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের পানি বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ভরা কাটাল বা উঁচু জোয়ার বলা হয়। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এবং চাঁদের মধ্য কৌণিক দূরত্ব যখন এক সমকোণ পরিমাণ হয় তখন একের আকর্ষণ অন্যের আকর্ষণ দ্বারা প্রশমিত হয়। তাই সবচেয়ে নিচু জোয়ার হয় যাকে মরা কাটাল বলে আখ্যায়িত করা হয়। জোয়ার বলতে আমরা শুধুমাত্র সমুদ্রের পানির স্ফীতিকেই বুঝি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাঁদ-সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবীর স্থলভাগেও অনুরূপ প্রভাবের সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায় , জোয়ার -ভাটার ক্ষেত্রে 
চাঁদ  ও সূর্য এবং এদের মধ্যকার আকর্ষন বল ও   অবস্থান মুখ্য ভুমিকা পালন করে।

চাঁদের ঘূর্ণনটি সঙ্কালিক অর্থাৎ ঘূর্ণনের সময় সবসময় চাঁদের একটি পৃষ্ঠই পৃথিবীর দিকে মুখ করা থাকে। চাঁদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর ঘূর্ণন ধীরতর হতে হতে একটি নির্দিষ্ট গতিতে এসে locked হয়ে যায়। পৃথিবী দ্বারা সৃষ্ট জোয়ার-ভাটা সংক্রান্ত বিকৃতির সাথে সম্পর্কিত ঘর্ষণ ক্রিয়ার কারণেই এই লকিং সৃষ্টি হয়। উপরন্তু, চান্দ্র কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা থেকে যে ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সৃষ্টি হয় তার কারণে পৃথিবী থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এই পরিবর্তনের ক্রিয়াটিকে লাইব্রেশন বলা হয়।

চাঁদের যে পৃষ্ঠটি পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে তাকে নিকট পার্শ্ব বলা হয় এবং এর বিপরীত পৃষ্ঠটিকে বলা হয় দূর পার্শ্ব। দূর পার্শ্বের সাথে আবার অন্ধকারাচ্ছন্ন পার্শ্বের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। চাঁদের যে গোলার্ধে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলো পৌঁছায় না সে গোলার্ধকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পার্শ্ব বলা হয়। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা ৩ নামক নভোযান প্রথমবারের মতো চাঁদের দূর পার্শ্বের ছবি তুলেছিল। এই পার্শ্বের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে একেবারেই কোনো মারিয়া (চাঁদের বিশেষ ভূমিরূপ, আক্ষরিক অর্থে সাগর) নেই।
 

পূর্ণিমার সময় মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে চাঁদের অপেক্ষাকৃত অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং স্বতন্ত্র ধরনের যে পৃষ্ঠগুলো দেখতে পায় তাদেরকে বলা হয় মারিয়া (maria, একবচন – mare)। লাতিন ভাষায় মারে শব্দের অর্থ সাগর। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই অংশগুলো পানি দ্বারা পূর্ণ বলে ভাবতেন বিধায়ই এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আর নামের পরিবর্তন করা হয়নি। সুপ্রাচীন ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত কঠিন লাভার পুকুর হিসেবে এগুলোকে আখ্যায়িত করা যায়। চাঁদের পৃষ্ঠের সাথে উল্কা এবং ধূমকেতুর সংঘর্ষের ফলে অনেক ইমপ্যাক্ট অববাহিকার সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদের ব্যাসাল্টিক লাভার অধিকাংশ উৎক্ষিপ্ত হয়ে এই অববাহিকাগুলোর সাথে সম্পর্কিত নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হল Oceanus Procellarum। কারণ এর সাথে কোন ইমপ্যাক্ট অববাহিকার সম্পর্ক নেই। মারিয়ার অধিকাংশ চাঁদের নিকট পার্শ্বে অবস্থিত।

১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের অ্যাপোলো অভিযানে চাঁদ থেকে আনা পাথরখণ্ড পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা প্রথম দাবি করেছিলেন যে, চাঁদে পানি রয়েছে। তারপর ভারত তাদের প্রথম চন্দ্রাভিযানের (চন্দ্রযান-১) পর একই দাবি করে। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা চন্দ্রযান-১ ছাড়াও দুটো মার্কিন নভোযানের (ডিপ ইমপ্যাক্ট ও ক্যাসিনি) পাঠানো উপাত্ত বিশ্লেষণ নিশ্চিত হয়ে এমন দাবি উত্থাপন করেন। ভারতীয় নভোযানটি নাসা'র সরবরাহকৃত চন্দ্রপৃষ্ঠের ২-৩ ইঞ্চি গভীরে অনুসন্ধানক্ষম মুন মিনারেলজি ম্যাপার (এম৩) নামক একটি যন্ত্রের সহায়তায় চন্দ্রপৃষ্ঠের মেরু অঞ্চলে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরীক্ষা করে প্রমাণ পায় যে চাঁদের মাটির ১০,০০,০০০ কণায় পানির কণা হলো ১,০০০। গবেষণায় চন্দ্রপৃষ্ঠের পাথর ও মাটিতে প্রায় ৪৫% অক্সিজেনের প্রমাণ মিলেছে। তবে হাইড্রোজেনের পরিমাণ গবেষণাধীন রয়েছে (২০০৯)। অবশ্য গবেষণায় এও বলা হয় যে, চাঁদের মেরু অঞ্চলের নানা গর্তের তলদেশে বরফ থাকলেও চাঁদের অন্য অঞ্চল শুষ্ক।




#Article 22: পৃথিবী (8346 words)


পৃথিবী সূর্য থেকে দূরত্ব অনুযায়ী তৃতীয়, সর্বাপেক্ষা অধিক ঘনত্বযুক্ত এবং সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ। এটি সৌরজগতের চারটি কঠিন গ্রহের অন্যতম। পৃথিবীর অপর নাম বিশ্ব বা নীলগ্রহ। ইংরেজি ভাষায় পরিচিত আর্থ (Earth) নামে, গ্রিক ভাষায় পরিচিত গাইয়া (Γαῖα) নামে, লাতিন ভাষায় এই গ্রহের নাম ।

পৃথিবী হলো মানুষ সহ কোটি কোটি প্রজাতির আবাসস্থল। পৃথিবী এখন পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র মহাজাগতিক স্থান যেখানে প্রাণের অস্তিত্বের কথা বিদিত। ৪৫৪ কোটি বছর আগে পৃথিবী গঠিত হয়েছিল। এক বিলিয়ন বছরের মধ্যেই পৃথিবীর বুকে প্রাণের আবির্ভাব ঘটে। পৃথিবীর জীবমণ্ডল এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও অন্যান্য অজৈবিক অবস্থাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে একদিকে যেমন বায়ুজীবী জীবজগতের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে, অন্যদিকে তেমনি ওজন স্তর গঠিত হয়েছে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে একযোগে এই ওজন স্তরই ক্ষতিকর সৌর বিকিরণের গতিরোধ করে গ্রহের বুকে প্রাণের বিকাশ ঘটার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ ও এর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও কক্ষপথ এই যুগে প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, আরও ৫০ কোটি বছর পৃথিবী প্রাণধারণের সহায়ক অবস্থায় থাকবে।

পৃথিবীর উপরিতল একাধিক শক্ত স্তরে বিভক্ত। এগুলিকে ভূত্বকীয় পাত বলা হয়। কোটি কোটি বছর ধরে এগুলি পৃথিবীর উপরিতলে এসে জমা হয়েছে। পৃথিবীতলের প্রায় ৭১% লবণাক্ত জলের মহাসাগর দ্বারা আবৃত। অবশিষ্টাংশ গঠিত হয়েছে মহাদেশ ও অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে। স্থলভাগেও রয়েছে অজস্র হ্রদ ও জলের অন্যান্য উৎস। এগুলি নিয়েই গঠিত হয়েছে বিশ্বের জলভাগ। জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় তরল জল এই গ্রহের ভূত্বকের কোথাও সমভার অবস্থায় পাওয়া যায় না। পৃথিবীর মেরুদ্বয় সর্বদা অ্যান্টার্কটিক বরফের চাদরের কঠিন বরফ বা আর্কটিক বরফের টুপির সামুদ্রিক বরফে আবৃত থাকে। পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ সর্বদা ক্রিয়াশীল। এই অংশ গঠিত হয়েছে একটি আপেক্ষিকভাবে শক্ত ম্যান্টেলের মোটা স্তর, একটি তরল বহিঃকেন্দ্র (যা একটি চৌম্বকক্ষেত্র গঠন করে) এবং একটি শক্ত লৌহ আন্তঃকেন্দ্র নিয়ে গঠিত।

মহাবিশ্বের অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষ করে সূর্য ও চাঁদের সঙ্গে এই গ্রহের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবী নিজ কক্ষপথে মোটামুটি ৩৬৫.২৬ সৌর দিনে বা এক নক্ষত্র বর্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবী নিজ অক্ষের ৬৬.১/২ ডিগ্রি কোণে হেলে রয়েছে। এর ফলে এক বিষুবীয় বছর (৩৬৫.২৪ সৌরদিন) সময়কালের মধ্যে এই বিশ্বের বুকে ঋতুপরিবর্তন ঘটে থাকে। পৃথিবীর একমাত্র বিদিত প্রাকৃতিক উপগ্রহ হল চাঁদ। ৪.৩৫ বিলিয়ন বছর আগে চাঁদ পৃথিবী প্রদক্ষিণ শুরু করেছিল। চাঁদের গতির ফলেই পৃথিবীতে সামুদ্রিক জোয়ারভাঁটা হয় এবং পৃথিবীর কক্ষের ঢাল সুস্থিত থাকে। চাঁদের গতিই ধীরে ধীরে পৃথিবীর গতিকে কমিয়ে আনছে। ৩.৮ বিলিয়ন থেকে ৪.১ বিলিয়ন বছরের মধ্যবর্তী সময়ে পরবর্তী মহাসংঘর্ষের সময় একাধিক গ্রহাণুর সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষে গ্রহের উপরিতলের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।

গ্রহের খনিজ সম্পদ ও জৈব সম্পদ উভয়ই মানবজাতির জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। এই গ্রহের অধিবাসীরা প্রায় ২০০টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সমগ্র গ্রহটিকে বিভক্ত করে বসবাস করছে। এই সকল রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক কূটনৈতিক, পর্যটন, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। মানব সংস্কৃতি গ্রহ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণার জন্মদাতা। এই সব ধারণার মধ্যে রয়েছে পৃথিবীকে দেবতা রূপে কল্পনা, সমতল বিশ্ব কল্পনা এবং পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্ররূপে কল্পনা। এছাড়া একটি সুসংহত পরিবেশ রূপে বিশ্বকে কল্পনা করার আধুনিক প্রবণতাও লক্ষিত হয়। এই ধারণাটি বর্তমানে প্রাধান্য অর্জন করেছে।

সৌরজগৎ সৃষ্টির মোটামুটি ১০০ মিলিয়ন বছর পর একগুচ্ছ সংঘর্ষের ফল হলো পৃথিবী। আজ থেকে ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী নামের গ্রহটি আকৃতি পায়, পায় লৌহের একটি কেন্দ্র এবং একটি বায়ুমণ্ডল। আজ থেকে ৪.৫৪ শত কোটি বছর আগে পৃথিবীর আদিমতম রূপটি গঠিত হয়। সূর্যের পাশাপাশি সৌরজগতের অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুগুলিও গঠিত হয় ও এগুলোর বিবর্তন ঘটতে থাকে। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি আণবিক মেঘ থেকে একটি সৌর নীহারিকা মহাকর্ষীয় ধসের মাধ্যমে কিছু আয়তন বের করে নেয়, যা ঘুরতে শুরু করে এবং চ্যাপ্টা হয়ে তৈরি হয় পরিনাক্ষত্রিক চাকতিতে, এবং এই চাকতি থেকেই সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহের উৎপত্তি ঘটে। একটি নীহারিকাতে বায়বীয় পদার্থ, বরফকণা এবং মহাজাগতিক ধূলি (যার মধ্যে আদিম নিউক্লাইডগুলিও অন্তর্ভুক্ত) থাকে। নীহারিকা তত্ত্ব অনুযায়ী সংযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র গ্রহগুলি গঠিত হয়। এভাবে আদিম পৃথিবীটি গঠিত হতে প্রায় ১ থেকে ২ কোটি বছর লেগেছিল।

চাঁদের গঠন নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে এবং বলা হয় চাঁদ প্রায় ৪.৫৩ বিলিয়ন বছর পূর্বে গঠিত হয়। একটি গবেষণারত অনুমানের তথ্য অনুসারে, মঙ্গল গ্রহ আকারের বস্তু থিয়ার সাথে পৃথিবীর আঘাতের পরে পৃথিবী থেকে খসে পড়া বস্তুর পরিবৃদ্ধি ফলে চাঁদ গঠিত হয়। এই ঘটনা থেকে বলা হয়ে থাকে যে, থিয়া গ্রহের ভর ছিল পৃথিবীর ভরের প্রায় ১০%, যা পৃথিবীকে আঘাত করে কৌনিক ভাবে, এবং আঘাতের পরে এটির কিছু ভর পৃথিবীর সাথে বিলীনও হয়ে যায়। প্রায় ৪.১ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে অজস্র গ্রহাণুর আঘাত যা ঘটে, যার ফলে চাঁদের বৃহত্তর পৃষ্ঠতলের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, আর এর কারণ ছিল পৃথিবীর উপস্থিতি।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সাগরসমূহ আগ্নেয়গিরির উৎগিরণ ও জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ গ্যাসের অতিনির্গমনের (Outgassing) ফলে সৃষ্টি হয়েছে। গ্রহাণুপুঞ্জ, ক্ষুদ্র গ্রহ, ও ধুমকেতু থেকে আসা ঘনীভূত জল ও বরফের সম্মিলনে পৃথিবীর সাগরসমূহের উৎপত্তি হয়েছে। ফেইন্ট ইয়ং সান প্যারাডক্স মডেলে বলা হয়, যখন নব গঠিত সূর্যে বর্তমান সময়ের চেয়ে মাত্র ৭০% সৌর উজ্জ্বলতা ছিল তখন বায়ুমণ্ডলীয় গ্রিনহাউজ গ্যাস সাগরের পানি বরফ হওয়া থেকে বিরত রাখে। ৩.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র গঠিত হয়, যা সৌর বায়ুর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।

পৃথিবীর শক্ত বহিরাবণ সৃষ্টি হয়েছে যখন পৃথিবীর গলিত বাইরের অংশ ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হয়। দুটি মডেলে ব্যাখ্যা করা হয় যে, ভূমি ধীরে ধীরে বর্তমান অবস্থায় এসেছে, বা পৃথিবীর ইতিহাসের শুরুতে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে মহাদেশীয় অঞ্চলসমূহ গঠিত হয়েছে। মহাদেশসমূহ পৃথিবীর অভ্যন্তরে লাগাতার তাপ হ্রাস পাবার ফলে ভূত্বকীয় পাত গঠিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক সময় শত-মিলিয়ন বছর যাবত চলে এবং এ সময়ে মহামহাদেশসমূহ একত্রিত হয়েছে ও ভেঙ্গে আলাদাও হয়েছে। প্রায় ৭৫ কোটি বছর পূর্বে সবচেয়ে প্রাচীন মহামহাদেশ রোডিনিয়া ভাঙ্গতে শুরু করে। মহাদেশটি পরে পুনরায় ৬০ কোটি বছর থেকে ৫৪ কোটি বছর পূর্বে একত্রিত হয়ে প্যানোটিয়া, পরবর্তীতে প্যানজিয়ায় একত্রিত হয়, যাও পরে ১৮ কোটি বছর পূর্বে ভেঙ্গে যায়।

বরফ যুগের বর্তমান রূপ শুরু হয় প্রায় ৪ কোটি বছর পূর্বে এবং ৩০ লক্ষ বছর পূর্বে প্লেইস্টোসিন সময়ে তা ঘনীভূত হয়। ৪০,০০০ থেকে ১০০,০০০ বছর পূর্বে হিমবাহ ও বরফ গলার কারণে উচ্চ-অক্ষাংশ অঞ্চলসমূহের উচ্চতা কমতে থাকে। শেষ মহাদেশীয় হিমবাহ শেষ হয় ১০,০০০ বছর পূর্বে।

রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্রায় ৪০০ কোটি বছর পূর্বের প্রথম অণুর সন্ধান পাওয়া যায়। আরও ৫০ কোটি বছর পরে, সকল জীবের শেষ একক পূর্বপুরুষের সন্ধান মিলে। সালোকসংশ্লেষণের বিবর্তনের ফলে সৌর শক্তি সরাসরি জীবের জীবনধারণ ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ফলে অক্সিজেন (O2) বায়ুমণ্ডলে একীভূত হয় এবং সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির সাথে মিথষ্ক্রিয়ার কারণে এ থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য বায়ুমণ্ডলের উপরে রক্ষাকারী ওজোন স্তর (O3) সৃষ্টি হয়। বৃহৎ কোষের সাথে ক্ষুদ্র কোষের একত্রিত হওয়ার ফলে জটিল কোষ গঠিত হয় যাকে সুকেন্দ্রিক বলা হয়। কলোনির মধ্যে কোষসমূহ আরও বিশেষায়িত হতে থাকলে বহুকোষী জীব গঠিত হয়। ওজোন স্তরে ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ শোষণের ফলে ভূপৃষ্ঠে জীবসমূহ একত্রিত হতে থাকে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন জীবের জীবাশ্মসমূহ হল পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্ত ৩.৪৮ বিলিয়ন বছর পূর্বের স্যান্ডস্টোন মাইক্রোবায়াল ম্যাট জীবাশ্ম, পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে প্রাপ্ত ৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বের মেটাসেডিমেন্ট জৈব গ্রাফাইট, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্ত জৈব শিলার অংশবিশেষ।

৭৫ থেকে ৫৮ কোটি বছর পূর্বে নিউপ্রোটেরোজোয়িক সময়ে, পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশ বরফাচ্ছাদিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই ধারণাকে স্নোবল আর্থ বলা হয় এবং এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কারণ এর পরে যখন জটিলভাবে বহুকোষী জীব গঠিত হওয়া শুরু হয় তখন ক্যাম্ব্রিয়ান বিস্ফোরণ হয়েছিল। ক্যাম্ব্রিয়ান বিস্ফোরণের পরে ৫৩৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে আরও পাঁচটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। সবচেয়ে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ হল ক্রেটাশাস-টার্টিয়ারি বিলুপ্তি, যা ৬৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে সংগঠিত হয়। এ সময়ে গ্রহাণুর প্রভাবে যেসব ডাইনোসর উড়তে পারে না এবং অন্যান্য বৃহৎ সরীসৃপসমূহ বিলুপ্ত হতে থাকে, কিন্তু ছোট প্রজাতির প্রাণীকুল, যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণীসমূহ বেঁচে যায়। ৬৬ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত, স্তন্যপায়ীদের জীবনে ভিন্নতা দেখা দেয় এবং আরও কয়েক মিলিয়ন বছর পূর্বে আফ্রিকান বানর-সদৃশ্য প্রাণী, যেমন অরোরিন টিউজেনেন্সিস সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা লাভ করে। কৃষিকাজের উন্নয়ন এবং পরে সভ্যতার উন্নয়নের ফলে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর মানুষের প্রভাব বাড়তে থাকে এবং বর্তমান অবস্থায় আসে।

পৃথিবীর প্রত্যাশিত দীর্ঘ-মেয়াদি ভবিষ্যৎ সূর্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আগামী ১.১ বিলিয়ন বছরের মধ্যে (১ বিলিয়ন বছর= ১০৯ বছর) সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা আরো ১০% বৃদ্ধি পেতে পারে এবং আগামী ৩.৫ বিলিয়ন বছরের তা আরও ৪০% বৃদ্ধি পেতে পারে। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা অজৈব কার্বন চক্রকে তরান্বিত করবে, যার ফলশ্রুতিতে বায়ুতে এটির ঘনত্ব উদ্ভিদের জন্য মারাত্নক ভাবে কমে আসবে (সি৪ ফটোসিন্থেসিসে মাত্র ১০পিপিএম হবে) প্রায় ৫০০ - ৯০০ মিলিয়ন বছর পরে (১ মিলিয়ন বছর= ১০৬ বছর)।  উদ্ভিদহীনতার কারণে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন থাকবে না, এবং প্রাণী জগৎ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পরবর্তী বিলিয়ন বছরের মধ্যে ভূ-পৃষ্ঠের উপরের সকল পানি শুকিয়ে যাবে এবং সারা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭০°সে (১৫৮°ফা)। এই সময়ের পর থেকে, আশা করা হয় পরবর্তী ৫০০ মিলিয়ন বছর পৃথিবী বসবাসযোগ্য থাকবে, এটা ২.৩ বিলিয়ন বছর পর্যন্তও সম্ভব যদি বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন না থাকে। এমনকি যদি সূর্য শাশ্বত ও স্থিতিশীল থাকে, আধুনিক মহাসাগরগুলোতে থাকা ২৭% পানি ভূ-অভ্যন্তরের গুরুমন্ডল স্তরে হারিয়ে যাবে, এটির কারণ সাগরের মধ্যে অবস্থিত শৈলশ্রেণী থেকে নির্গত হওয়া বাষ্পের পরিমাণ কমে যাওয়া।

৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে সূর্যের আকারের পরিবর্তন হয়ে একটি রেড জায়ান্ট বা লোহিত দানবে পরিনত হবে। বিভিন্ন মডেল থেকে এটা অনুমান করা যায় সূর্যের আকৃতি বৃদ্ধি পাবে প্রায় ১ এইউ (১৫,০০,০০,০০০ কি.মি), যা এটির বর্তমান পরিধির তুলনায় ২৫০ গুন বেশি। পৃথিবীর ভাগ্য খুব ভালভাবে পরিষ্কার এই সময়ে। লোহিত দানব হিসাবে, সূর্য এই সময় তার ভরের প্রায় ৩০% হারাবে। তাই, জোয়ার-ভাটা বিহীন পৃথিবী, একটি কক্ষপথে সূর্যকে প্রায় ১.৭ এইউ দূরত্বে প্রদক্ষিণ করবে, এই সময় নক্ষত্রটি তার সর্বোচ্চ পরিধিতে পরিণত হবে। বেঁচে থাকা বাকি জীব বৈচিত্র্যে বেশিরভাগ গুলো, কিন্তু সব নয় সূর্যের বাড়তে থাকা উজ্জ্বলতা কারণে মারা যাবে (উজ্জ্বলতার সর্বোচ্চ সীমা বর্তমান সীমার থেকে ৫,০০০ গুণ বেশি হবে)। ২০০৮ সালে করা একটি সিমুলেশনের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, জোয়ার-ভাটার প্রভাব না থাকার কারণে পৃথিবীর কক্ষপথ এক সময় হ্রাস পাবে এবং সূর্য এটিকে টেনে নিবে নিজের দিকে, ফলাফলস্বরূপ পৃথিবী সূর্যের পরিমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং এক সময় বাষ্পে পরিণত হবে।

পৃথিবী দেখতে পুরোপুরি গোলাকার নয়, বরং কমলালেবুর মত উপর ও নিচের দিকটা কিছুটা চাপা এবং মধ্যভাগ (নিরক্ষরেখার কাছাকাছি) স্ফীত। এ'ধরনের স্ফীতি তৈরি হয়েছে নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে এটির ঘূর্ণনের কারণে। একই কারণে বিষুব অঞ্চলের ব্যাস মেরু অঞ্চলের ব্যাসের তুলনায় প্রায় ৪৩ কি.মি. বেশি।

পৃথিবীর আকৃতি অনেকটাই কমলাকার উপগোলকের মত। ঘূর্ণনের ফলে, পৃথিবীর ভৌগলিক অক্ষ বরাবর এটি চ্যাপ্টা এবং নিরক্ষরেখা বরাবর এটি স্ফীত। নিরক্ষরেখা বরাবর পৃথিবীর ব্যাস মেরু থেকে মেরুর ব্যাসের তুলনায়  বৃহৎ। তাই, পৃথিবী পৃষ্ঠের উপর পৃথিবীর ভরকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বটি হল নিরক্ষরেখার উপর অবস্থিত চিম্বরাজো আগ্নেয়গিরির সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি। আদর্শ মাপের উপগোলকের গড় ব্যাস হল । স্থানীয় ভূসংস্থানে ব্যাসের মান আদর্শ উপগোলকের ব্যাসের মানের চেয়ে ভিন্ন হয়, যদিওবা সারা বিশ্বের কথা বিবেচনা করলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় এই বিচ্যুতির মান যৎ সামান্য: সর্বোচ্চ পরিমাণ বিচ্যুতির মান হল মাত্র ০.১৭%, যা পাওয়া যায় মারিয়ানা খাতে (যা  সমুদ্র পৃষ্ঠতল থেকে নিচে), আর অপরদিকে মাউন্ট এভারেস্টে ( যা সমুদ্র পৃষ্ঠতলের থেকে উঁচুতে) বিচ্যুতির মান ০.১৪%।

জিওডেসি প্রকাশ করে যে, পৃথিবীতে সমুদ্র তার প্রকৃত আকার ধারণ করবে যদি ভূমি ও অন্যান্য চাঞ্চলতা যেমন ঢেউ ও বাতাস না থাকে, আর একে সংজ্ঞায়িত করা হয় জিওইড দ্বারা। আরো স্পষ্ট ভাবে, জিওইডের পরিমাণ হবে গড় সমুদ্র পৃষ্টতলের উচ্চতায় অভিকর্ষীয় মানের সমান।

পৃথিবীর ভর হল প্রায় ৫.৯৭ x ১০২৪ কিলোগ্রাম (৫,৯৭০ ইয়াটোগ্রাম)। এটি গঠিত যে সকল উপাদান দিয়ে তার মধ্যে সবচাইতে বেশি হল লোহা (৩২.১%), অক্সিজেন (৩০.১%), সিলিকন (১৫.১%), ম্যাগনেসিয়াম (১৩.৯%), সালফার (২.৯%), নিকেল (১.৮%), ক্যালসিয়াম (১.৫%), এবং অ্যালুমিনিয়াম (১.৪%), এ ছাড়া বাকি ১.২% এর মধ্যে রয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি। ভরের পৃথকীকরণ ঘটার ফলে, অনুমান করা হয় পৃথিবীর কেন্দ্র অঞ্চলটি প্রধানত গঠিত লোহা (৮৮.৮%) দ্বারা, এর সাথে অল্প পরিমাণে রয়েছে নিকেল (৫.৮%), সালফার (৪.৫%), এবং এছাড়া অন্যান্য উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে ১% এরও কম।

সাধারণত পৃথিবীর ভূত্বকের শিলাগুলোর উপাদানসমূহের সবগুলোই হয়ে থাকে অক্সাইড ধরনের: তবে এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হল এতে ক্লোরিন, সারফার, এবং ফ্লোরিনের উপস্থিতি এবং সাধারণত কোন শিলায় এগুলোর পরিমাণ হয়ে থাকে মোট পরিমাণের ১% এরও কম। মোট ভূত্বকের ৯৯% গঠিত হয়ে থাকে ১১ ধরনের অক্সাইড দ্বারা, যার মধ্যে প্রধান উপাদানগুলো হল সিলিকা, অ্যালুমিনা, আয়রন অক্সাইড, লাইম, ম্যাগনেসিয়া (ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড), পটাশ এবং সোডা। 

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো অন্যান্য বহুজাগতিক গ্রহের মত বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত, স্তরগুলোর গঠন এগুলোর রাসায়নিক ও ভৌত (রিওলজি) বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। সবচেয়ে বাইরের স্তরটি রাসায়নিকভাবে স্বতন্ত্র নিরেট সিলিকেট ভূত্বক, যার নিচে রয়েছে অধিক সান্দ্রতা সম্পন্ন নিরেট ম্যান্টেল বা গুরুমণ্ডল। ভূত্বকটি গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক রয়েছে মোহোরোভিচিক বিচ্ছিন্নতা (Mohorovičić discontinuity) অংশ দ্বারা। ভূত্বকের পুরুত্ব মহাসাগরে নিচে প্রায় ৬ কিলোমিটার এবং মহাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০-৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়ে থাকে। ভূত্বক এবং এর সাথে ঠান্ডা, দৃঢ় উপরের দিকের উর্দ্ধ গুরুমণ্ডলকে একসাথে বলা হয়ে থাকে লিথোস্ফিয়ার এবং লিথোস্ফিয়ার সেই অংশ যেখানে টেকটনিক প্লেটগুলো সংকুচিত অবস্থায় থাকে। লিথোস্ফিয়ারের পরের স্তরটি হল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার, এটা এর উপরের স্তর থেকে কম সান্দ্রতা সম্পন্ন, এবং এর উপরে অবস্থান করে লিথোস্ফিয়ার নড়াচড়া করতে পারে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪১০ কি.মি. থেকে ৬৬০ কি.মি. গভীরতার মধ্যে গুরুমণ্ডলের ক্রিস্টাল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়, এখানে রূপান্তর অঞ্চলের একটি বিস্তারে পাওয়া যায়, যা উর্দ্ধ গুরুমণ্ডল ও নিম্ন গুরুমণ্ডলকে পৃথক করে। গুরুমণ্ডলের নিচে, অত্যন্ত সান্দ্রতা পূর্ণ একটি তরল বহিঃ ভূকেন্দ্র থাকে, যা একটি নিরেট অন্তঃ ভূকেন্দ্রের উপরে অবস্থান করে। পৃথিবীর অন্তঃ ভূকেন্দ্রের ঘূর্ণনের কৌণিক বেগ বাদবাকি ভূখন্ডের তুলনায় সামান্য বেশি হতে পারে, এটি প্রতি বছর ০.১–০.৫° বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অন্তঃ ভূকেন্দ্রের পরিধি পৃথিবীর পরিধির তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে।

পৃথিবীর উৎপত্তির সময় এটি ছিল একটি উত্তপ্ত গ্যাসের পিন্ড। উত্তপ্ত অবস্থা থেকে এটি শীতল ও ঘনীভূত হয়। এ সময় ভারী উপাদানগুলো এটির কেন্দ্রের দিকে জমা হয় আর হালকা উপাদানগুলো ভরের তারতম্য অনুসারে নিচ থেকে উপরে স্তরে স্তরে জমা হয়। পৃথিবীর এ সকল স্তর এক একটি মণ্ডল নামে পরিচিত। সবচেয়ে উপরে রয়েছে অশ্মমণ্ডল স্তর। অশ্মমণ্ডলের উপরের অংশকে ভূত্বক বলে। ভূত্বকের নিচের দিকে প্রতি কি.মি. বৃদ্ধিতে ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ভূত্বকের উপরের ভাগে বাহ্যিক অবয়বগুলো যেমন -পর্বত, মালভূমি, সমভূমি ইত্যাদি থেকে থাকে। পৃথিবীর বাহ্যিক গঠন পৃথিবীর উপরিভাগের বৈচিত্রময় ভূমিরুপসমূহ নিয়ে সজ্জিত। পৃথিবীর প্রধান ভূমিরূপগুলো ভূপৃষ্ঠে সর্বত্র সমান নয়। আকৃতি, প্রকৃতি এবং গঠনগত দিক থেকে বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। ভূপৃষ্ঠে কোথাও রয়েছে উঁচু পর্বত, কোথাও পাহাড়, কোথাও মালভূমি। ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে পৃথিবীর সমগ্র ভূমিরূপকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়।

এগুলো হলোঃ (১) পর্বত (২) মালভূমি (৩) সমভূমি।

সমুদ্রতল থেকে অন্তত ১০০০ মিটারের বেশি উঁচু সুবিস্তৃত ও খাড়া ঢালবিশিষ্ট শিলাস্তূপকে পর্বত বলে। সাধারণত ৬০০ থেকে ১০০০ মি. উঁচু স্বল্প সুবিস্তৃত শিলাস্তূপ কে পাহাড় বলে। পর্বতের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পর্বতের ভূপ্রকৃতি সাধারণত বন্ধুর প্রকৃতির হয়ে থাকে, এগুলোর ঢাল খুব খাড়া এবং সাধারণত চূড়াবিশিষ্ট হয়ে থাকে। পূর্ব আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারোর মত কিছু পর্বত বিছিন্নভাবে অবস্থান করে। আবার হিমালয় পর্বতমালার মত কিছু পর্বত অনেকগুলো পৃথক শৃঙ্গসহ ব্যাপক এলাকা জুড়ে অবস্থান করে।

পর্বতের থেকে উঁচু কিন্তু সমভূমি থেকে উঁচু খাড়া ঢালযুক্ত ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ সমতলভূমি কে মালভূমি বলে। মালভূমির উচ্চতা শত মিটার থেকে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পৃথিবীর বৃহত্তম মালভূমির উচ্চতা ৪,২৭০ থেকে ৫,১৯০ মিটার।

সমুদ্রতল থেকে অল্প উঁচু মৃদু ঢালবিশিষ্ট সুবিস্তৃত ভূমিকে সমভূমি বলে। বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যেমন -নদী, হিমবাহ ও বায়ুর ক্ষয় ও সঞ্চয় ক্রিয়ার ফলে সমভূমির সৃষ্টি হয়েছে। মৃদু ঢাল ও স্বল্প বন্ধুরতার জন্য সমভূমি কৃষিকাজ, বসবাস, রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য খুবই উপযোগী। তাই সমভূমিতে সবচেয়ে বেশি ঘন জনবসতি গড়ে উঠেছে।

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপের উৎপত্তি হয় গ্রহের পরিবৃদ্ধির (প্রায় ২০%) ফলে সৃষ্ট তাপের অবশিষ্ট অংশ এবং তেজস্ক্রিয়তার (৮০%) ফলে সৃষ্ট তাপের সংমিশ্রণে। পৃথিবীতে থাকা সবচেয়ে বেশি তাপ উৎপাদনকারী আইসোটোপ গুলো হল পটাশিয়াম-৪০, ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং থোরিয়াম-২৩২ পৃথিবীর কেন্দ্রে তাপমাত্রা হতে পারে  বা তারও বেশি, এবং চাপ গিয়ে পৌছাতে পারে ৩৬০ গিগা প্যাসকেল। যেহেতু অধিকাংশ তাপ সৃষ্টির মূল কারণ তেজস্ক্রিয়তা, তাই বিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে পৃথিবীর ইতিহাসের শুরুর দিকে, তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ গুলোর অর্ধ-জীবন হ্রাসপাওয়ার পূর্বে, পৃথিবীর তাপ উৎপাদন ক্ষমতা আরও বেশি ছিল। প্রায় ৩ বিলিয়ন বছর আগে, বর্তমান সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন তাপ উৎপন্ন হত, ফলাফলস্বরূপ গুরুমণ্ডলীয় পরিচলন ও ভূত্বকীয় পাতসমূহের গঠন প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়েছিল, এবং একই সাথে কিছু বিরল আগ্নেয় শিলা যেমন কোমাটিটে তৈরি হয়েছিল, যা বর্তমানে কদাচিৎই তৈরি হয়।

পৃথিবীর থেকে গড় তাপ হ্রাসের পরিমাণ হল , সারা বিশ্বের তাপ হ্রাসের মান যেখানে । কেন্দ্রের তাপীয় শক্তির একটি অংশ ভূত্বকের দিকে পরিবাহিত হয় গুরুমণ্ডলীয় তাপীয় শিলা দ্বারা, এটা হল এক ধরনের পরিচলন পদ্ধতিতে উচ্চতাপমাত্রার পাথরের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের উপরের দিকে তাপের প্রবাহ। এই তাপীয় শিলাগুলো হটস্পট এবং আগ্নেয় শিলার বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবীর তাপ আরও নিঃসৃত হয় টেকটনিক প্লেটগুলোর ফাটলের মধ্য দিয়ে, মধ্য-সমুদ্র রিগের যে সকল স্থানের ক্ষেত্রে গুরুমণ্ডল উপরের দিকে ওঠে গেছে। তাপ হ্রাসের সর্বশেষ মাধ্যম হল লিথোস্ফিয়ার দিয়ে পরিবহন পদ্ধতিতে, আর এটির অধিকাংশটাই হয় সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যেহেতু মহাদেশীয় ভূত্বকের তুলনায় সমুদ্রের ভূত্বকের পুরুত্ব কম হয়ে থাকে।

পৃথিবীর কাঠামোর বাহিরের দিকের দৃঢ় অনমনীয় স্তর, যা লিথোস্ফিয়ার নামে পরিচিত, বেশ কিছু টুকরায় বিভক্ত, এগুলো হল টেকটনিক পাত বা ভূত্বকীয় পাত। এই পাতগুলি হল সুদৃঢ় অংশবিশেষ যা নড়াচড়া করতে পারে একটির সাপেক্ষে আরেকটি, মোট তিন ধরনের যে কোন এক ধরনের পাত সীমার মধ্যে থেকে, এই পাত সীমা গুলো হল: অভিসারমুখী সীমা, এ ক্ষেত্রে দুটি পাত একটি অপরটির দিকে পরস্পরগামী ভাবে অগ্রসর হয়, বিমুখগামী সীমা এ ক্ষেত্রে দুটি পাত পরস্পরের বিপরীতমুখী ভাবে অগ্রসর হতে থাকে এবং পরিবর্তক সীমা, দুটি টেকটনিক পাত যখন সমান্তরাল ভাবে একে অন্যের বিপরীতে সরতে থাকে। ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত, পর্বত গঠন, এবং মহাসাগরীয় খাতের গঠন প্রক্রিয়া ঘটে থাকে এই তিনটি ধরনের পাত সীমার ক্রিয়ার ফলে। ভূত্বকীয় পাতগুলো চলাচল করে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার অঞ্চলের উপরে, এটি উর্দ্ধ গুরুমণ্ডলের কঠিন কিন্তু কম সান্দ্রতাপূর্ণ অংশ, যা সঞ্চালিত হতে পারে ও নড়াচড়া করতে পারে পাতগুলোর সাথে।

ভূত্বকীয় পাতগুলোর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চালনের সাথে সাথে, মহাসাগরীয় ভূত্বকে সাবডাকশন ঘটে অভিসারমুখী সীমায় ক্রিয়ারত পাতগুলোর সম্মুখভাগের চাপে। ঠিক একই সময়ে, গুরুমণ্ডলের উপাদানের প্রবাহের ফলে মধ্য-সমুদ্র রিগের সৃষ্টি হয় বিমুখগামী সীমার ক্রিয়ার ফলে। এই প্রক্রিয়াগুলির সংমিশ্রণ মহাসাগরীয় ভূত্বকের রিসাইকেল করে আবার গুরুমণ্ডলে পাঠিয়ে দেয়। এই রিসাইকেলের ফলে, মহাসাগরীয় ভূত্বকের বেশিরভাগের বয়স ১০০ মিলিয়ন বছরের বেশি নয়। সবচেয়ে পুরাতন মহাসাগরীয় ভূত্বকটির অবস্থান ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিকে যার অনুমানিক বয়স ২০০ মিলিয়ন বছর। তুলনা করা হলে যেখানে সবচেয়ে পুরাতন মহাদেশীয় ভূত্বকের বয়স প্রায় ৪০৩০ মিলিয়ন বছর।

সাতটি প্রধান টেকটনিক বা ভূত্বকীয় পাত হল প্রশান্ত মহাসাগরীয়, উত্তর আমেরিকান, ইউরেশীয়, আফ্রিকান, অ্যান্টার্কটিক, ইন্দো-অস্ট্রেলীয়, এবং দক্ষিণ আমেরিকান। অন্যান্য কিছু অপ্রধান পাত হল, আরবীয় পাত, ক্যারিবীয় পাত, নাজকা পাত যা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এবং দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের স্কটিয়া পাত। ৫০ থেকে ৫৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে অস্ট্রেলীয়ান পাতটি ভারতীয় পাতটির সাথে সুদৃঢ় ভাবে সংযুক্ত হয়ে যায়। সবচেয়ে দ্রুত সঞ্চলনশীল পাত হল মহাসাগরীয় পাত, যেমন কোকোস পাত, এটি সঞ্চালিত হচ্ছে ৭৫ মিলি/বছর বেগে ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত, যা সঞ্চালিত হচ্ছে ৫২–৬৯ মিলি/বছর বেগে। অপর দিকে, সবচেয়ে ধীর সঞ্চালনশীল পাত হল ইউরেশীয় পাত, এটির সঞ্চালনের সাধারণ গতি বেগ হল ২১ মিলি/বছর।

পৃথিবীর মোট পৃষ্ঠতলের আকার হল প্রায় ৫১০ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. (বা ১৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল)। যার মধ্যে, ৭০.৮%, বা ৩৬১.১৩ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. (১৩৯.৪৩ মিলিয়ন বর্গ মাইল), হল সমুদ্র পৃষ্ঠতলের নিচে ও এই অংশ সমুদ্রের পানি দ্বারা আচ্ছাদিত। সমুদ্র পৃষ্ঠতলের নিচেই রয়েছে অধিকাংশ মহীসোপান, পর্বতমালা, আগ্নেয়গিরি, সামুদ্রিক খাত, ডুবো গিরিখাত, সামুদ্রিক মালভূমি, গভীর সামুদ্রিক সমতল, এবং সারা পৃথিবী ব্যাপী বিসৃত মধ্য-সমুদ্র রিগ সিস্টেম। আর বাকি ২৯.২% অংশ বা ১৪৮.৯৪ বর্গ কি.মি. (বা ৫৭.৫১ মিলিয়ন বর্গ মাইল) যা পানি দ্বারা আচ্ছাদিত নয় ভূখণ্ডটি স্থানে স্থানে পরিবর্তিত এবং এতে রয়েছে পর্বত, মরুভূমি, সমতল, মালভূমি ও অন্যান্য ভূমিরূপ। অপসারণ ও অবক্ষেপণ, বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বন্যা, মৃত্তিকা আবহবিকার, হিমবাহ ক্ষয়ীভবন, প্রবালপ্রাচীরের বৃদ্ধি এবং উল্কা পিন্ডের আঘাত ইত্যাদি হল সেই সকল ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের আকার পরিবর্তন ঘটছে ভূতাত্ত্বিক সময় যাওয়ার সাথে সাথে।

মহাদেশীয় ভূত্বকে কম ঘনত্বের উপাদান পাওয়া যায়, আগ্নেয় শিলা যেমন: গ্রানাইট ও অ্যান্ডেসাইট। সবচেয়ে কম পাওয়া যায় ব্যাসল্ট, যা হল অধিক ঘনত্বের আগ্নেয় শিলা, এটি হল মহাসাগরীয় ভূত্বক গঠনের মূল উপাদান। পাললিক শিলা গঠনের ক্ষেত্রে, পলি ক্রমানয়ে সঞ্চিত হয়ে এক সময় অন্য শিলার চাপে দেবে যায় এবং এরপর এক সাথে জমাট বাঁধে যায়। মহাদেশীয় ভূত্বকের প্রায় ৭৫% পাললিক শিলা দ্বারা আচ্ছাদিত, যদিও তা পৃথিবীর মোট ভূত্বকের মাত্র ৫% অংশ। আর পৃথিবীতে পাওয়া যাওয়া তৃতীয় ধরনের শিলা হল রূপান্তরিত শিলা, উচ্চ চাপে, উচ্চ তাপে কিংবা উভয়ের একসাথে ক্রিয়ার ফলে আগ্নেয় শিলা ও পাললিক শিলা রূপান্তরিত হয়ে এটি গঠিত হয়। পৃথিবীতে অজস্র পরিমাণে পাওয়া যাওয়া যে সকল সিলিকেট খনিজ সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কোয়ার্জ, ফেল্ডস্পার, অ্যাম্ফিবোল, মাইকা, পাইরক্সিন এবং অলিভিন। সাধারণত পাওয়া যাওয়া কার্বনেট খনিজ গুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যালসাইট (যা পাওয়া যায় চুনাপাথর) ও ডলোমাইট উভয়ে।

পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তিত হতে পারে সর্বনিম্ন ৪১৮ মিটার যার অবস্থান মৃত সাগর এবং সর্বোচ্চ উচ্চতা হতে পারে ৮,৮৪৮ মিটার হিমালয় পর্বতের চূড়ায়। সমুদ্র পৃষ্ঠতলের উপরে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ৮৪০ মিটার।

প্যাডোস্ফিয়ার হল পৃথিবীর মহাদেশীয় পৃষ্ঠের বাইরের সর্বোচ্চ স্তর এবং এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত মাটি ও মাটির গঠন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়। মোট ভূপৃষ্ঠের ১০.৯% ভূমি হল আবাদী জায়গা, এর মধ্যে ১.৩% হল স্থায়ী শস্যভূমি। পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের প্রায় ৪০% অংশ ব্যবহার করা হয় শষ্যভূমি ও চরণভূমি হিসাবে, আবার অরেকটি হিসাব থেকে জানা যায় ১.৩ x ১০৬ কি.মি.২ হল শষ্যভূমি ও ৩.৪ x ১০৬ কি.মি.২ হল চরণভূমি।

পৃথিবী পৃষ্ঠে পানির প্রাচুর্য হল সেই অনন্য বৈশিষ্ট্য যা সৌর জগতের অন্যান্য গ্রহ থেকে এই নীল গ্রহটিকে পৃথক করেছে। পৃথিবীর জলমণ্ডলের মধ্যে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত মহাসাগরগুলো, কিন্তু যৌক্তিকভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠের সকল পানি জলমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত, এটির মধ্যে রয়েছে ভূমির ভেতর দিকে থাকা সমুদ্র, লেক, নদী এবং এমনকি মাটির নিচের ২,০০০ মিটার নিচে থাকা পানিও এটার অন্তর্ভুক্ত। পৃষ্ঠতলের নিচে থাকা পানির সবচেয়ে গভীরতমটি হল প্রশান্ত মহাসাগরে থাকা মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপ যার গভীরতা হল ১০,৯১১.৪ মিটার।

মহাসাগরগুলোর অনুমানিক ভর হল প্রায় ১.৩৫ মেট্রিক টন যা মোটামুটি পৃথিবীর মোট ভরের ১/৪৪০০ অংশ। মহাসাগরগুলোর মোট পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল হল ৩.৬১৮ কি.মি.২ , আর গড় গভীরতা হল ৩৬৮২ মিটার, ফলাফল হিসাবে এটির আয়তন হল ১.৩৩২ কি.মি.৩। যদি পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলের পৃষ্ঠের উচ্চতা সব জায়গায় সমান হত মসৃণ উপগোলকের মত, তাহলে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর গভীরতা হত ২.৭ থেকে ২.৮ কি.মি.

পৃথিবীর মোট পানির প্রায় ৯৭.৫% হল লবণাক্ত; আর বাদবাকি ২.৫% হল মিঠা পানি। বেশিরভাগ মিঠা পানি, প্রায় ৬৮.৭%, উপস্থিত রয়েছে বরফ হিসাবে আইস ক্যাপে এবং হিমবাহ রূপে।

পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর গড় লবণাক্ততা হল প্রায় ৩৫ গ্রাম লবণ প্রতি কিলোগ্রাম লবণাক্ত পানিতে (৩.৫% লবণ)। এই লবণের বেশিরভাগ পানিতে সংযুক্ত হয়েছে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনার ফলে বা নির্গত হয়েছে ঠান্ডা আগ্ন্যেয় শীলা থেকে। মহাসাগরগুলি দ্রবীভূত বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাসগুলোর একটি আধারও বটে, যেগুলো অত্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন জলজ জীবন ধারণের জন্য। সাগরের পানি বিশ্বের জলবায়ুর উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে, যেখানে এটি কাজ করে একটি বৃহৎ তাপীয় আধার হিসাবে। মহাসাগরের তাপমাত্রার বণ্টনের ক্ষেত্রে যে কোন পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য ভাবে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন করতে পারে, উদাহারণস্বরূপ এল নিনো।

বায়ুমণ্ডল গ্যাসের একটি আস্তরণ যা পর্যাপ্ত ভরসম্পন্ন কোন বস্তুর চারদিকে ঘিরে জড়ো হয়ে থাকতে পারে। বস্তুটির অভিকর্ষের কারণে এই গ্যাসপুঞ্জ তার চারদিকে আবদ্ধ থাকে। বস্তুর অভিকর্ষ যদি যথেষ্ট বেশি হয় এবং বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা যদি কম হয় তাহলে এই মণ্ডল অনেকদিন টিকে থাকতে পারে। গ্রহসমূহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস জড়ো হতে দেখা যায়। এ কারণে গ্রহের বায়ুমণ্ডল সাধারণ অপেক্ষাকৃত ঘন এবং গভীর হয়। পৃথিবীর চারপাশে ঘিরে থাকা বিভিন্ন গ্যাস মিশ্রিত স্তরকে পৃথিবী তার মধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা ধরে রাখে, একে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা আবহমণ্ডল বলে। এই বায়ুমণ্ডল সূর্য থেকে আগত অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব রক্ষা করে। এছাড়ও তাপ ধরে রাখার মাধ্যমে (গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়ায়) ভূপৃষ্টকে উওপ্ত রাখে এবং দিনের তুলনায় রাতের তাপমাত্রা হ্রাস রোধ করে।

৮.৫ কি.মি. উচ্চতা স্কেলযুক্ত বায়ুমণ্ডল পৃথিবী পৃষ্ঠে গড় বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রয়োগ করছে ১০১.৩২৫ কিলো প্যাসকেল। এটা গঠিত হয়েছে ৭৮% নাইট্রোজেন এবং ২১% অক্সিজেন দ্বারা, এর সাথে সামান্য পরিমাণে রয়েছে জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্যাসীয় উপাদান। ট্রপোস্ফিয়ারের উচ্চতার পরিবর্তন হয় অক্ষাংশ পরিবর্তনের সাথে সাথে, যার মান হতে পারে মেরু অংশে  ৮ কি.মি. ও নিরক্ষরেখার ক্ষেত্রে ১৭ কি.মি.। তবে এই মানের কিছু বিচ্যুতি হয়ে থাকে আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তনের কারণে।

পৃথিবীর জীবমণ্ডল উল্লেখযোগ্যভাবে এটির বায়ুমণ্ডলের পরির্তন সাধন করেছে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের উৎপাদন বিকাশ লাভ করে ২.৭ বিলিয়ন বছর আগে, গঠন করে আজকের মূল নাইট্রোজেন-অক্সিজেন বায়ুমণ্ডল। এর ফলশ্রুতিতে বায়ুজীবী জীবদের বিকাশ লাভ তরান্বিত হয় এবং পরোক্ষভাবে, এটি ওজোন স্তর গঠন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, এটির কারণ হল পরবর্তীতে ঘটা বায়ুমণ্ডলীয় O2 থেকে O3 তে পরিবর্তন। ওজন স্তর সৌর বিকিরণের অতিবেগুনী রশ্মিকে আটকিয়ে দিয়ে, ভূমিতে প্রাণের বিকাশে সহায়তা করে। অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় কর্মকাণ্ড যা জীবন ধারণের জন্য জরুরি তার মধ্যে রয়েছে জলীয় বাষ্পের সঞ্চালন, অতিপ্রয়োজনীয় গ্যাসগুলির সরবরাহ, ছোট উল্কাপিন্ড পৃথিবী পৃষ্ঠে আঘাত হানার পূর্বে তা পুড়িয়ে ফেলা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। সর্বশেষ কর্মকান্ডটি পরিচিত গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া নামে: বায়ুমণ্ডলের চিহ্নিত কিছু গ্যাসীয় অনু ভূ-পৃষ্ঠ হতে বিকীর্ণ তাপ শক্তি শোষন করে পুনরায় বায়ুমণ্ডলের অভ্যন্তরে বিকিরিত করে, বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, এবং ওজন হল বায়ুমণ্ডলের মূল গ্রীনহাইজ গ্যাস। এই তাপ ধারণের ঘটনাটি না থাকলে, ভূ-পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হত −১৮ °সে, বিপরীত দিকে বর্তমান তাপমাত্রা হল +১৫ °সে, এবং এটা এর বর্তমান অবস্থায় না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ঘটত না। মে ২০১৭ সালে, কক্ষপথে থাকা একটি স্যাটেলাইট থেকে এক মিলিয়ন মাইল দূরে হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য একটি আলোর ঝলকানি দেখা যায়, পরে জানা যায় বায়ুমণ্ডলে থাকা বরফ স্ফটিক থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে এটি ঘটেছিল।

আবহাওয়া হলো কোনো স্থানের স্বল্প সময়ের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা। সাধারণত এক দিনের এমন রেকর্ডকেই আবহাওয়া বলে। আবার কখনও কখনও কোনো নির্দিষ্ট এলাকার স্বল্প সময়ের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাকেও আবহাওয়া বলা হয়। আবার কোনো স্থানের দীর্ঘ সময়ের আবহাওয়ার উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি হয় সে স্থানের জলবায়ু। আবহাওয়া নিয়ত পরিবর্তনশীল একটি চলক।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কোন সুনির্দিষ্ট সীমানা নেই, ধীরে ধীরে পাতলা এবং হালকা হয়ে বহিঃমহাকাশের সাথে মিশে গেছে। বায়ুমণ্ডলের তিন চতুর্থাংশের ভর রয়েছে এটির মোট অংশের প্রথম  এর মধ্যে। এর সবচেয়ে নিচের স্তরটির নাম হল ট্রপোস্ফিয়ার। সূর্য থেকে আসা তাপের প্রভাবে এই স্তরটি এবং এর নিচে থাকা ভূ-পৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়, ফলশ্রুতিতে বাতাসের সম্প্রসারণ ঘটে। এই নিম্ন ঘনত্বের বাতাস উপরের দিকে উঠে যায় এবং এটির জায়গা দখল করে ঠান্ডা, উচ্চ ঘনত্বের বাতাস। ফলে বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়, যা তাপমাত্রার পুনঃবিন্যাস করে আবহাওয়া ও জলবায়ুকে বিভিন্ন স্থানে সঞ্চালিত করে।

মূল বায়ুপ্রবাহের ধারার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত অয়ন বায়ু (Trade Wind), নিরক্ষীয় অঞ্চলের ৩০° অক্ষাংশ নিচে এবং পশ্চিমা বায়ু (westerlies) মধ্য-অক্ষাংশ বরাবর ৩০° থেকে ৬০° এর মধ্যে। মহাসাগরীয় স্রোত জলবায়ু নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক, থার্মোহ্যালাইন প্রবাহ (thermohaline circulation) যা তাপ শক্তিকে বিতরণ করে নিরক্ষীয় সমুদ্র অঞ্চল থেকে ঠান্ডা মেরু অঞ্চলে।

ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে যে জলীয় বাষ্প উৎপন্ন হয় তা কিছু বিন্যাস অনুসরন করে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে সঞ্চালিত হয়। যখন বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশ গরম, আদ্রর্তাযুক্ত বাতাসকে, উপরের দিকে উঠার সুযোগ করে দেয়, তখন এই পানি ঘনীভূত হয় এবং ভূ-পৃষ্ঠের দিকে অধ:ক্ষিপ্ত ভাবে পতিত হয়। বেশির ভাগ পানি এরপর নিম্নভূমির দিকে ধাবিত হয় নদী নালার মাধ্যমে এবং সাগরে পুনরায় পৌছায় কিংবা এটি জমা হয় কোন হ্রদে। ভূমিতে জীবন ধারণের জন্য এই পানি চক্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া এবং কোন একটি ভূতত্ত্বিক সময়ের মধ্যে ভূ-পৃষ্ঠের বিভিন্ন গঠনের ভূমিক্ষয়ের জন্য এটি মূল কারণ। বৃষ্টিপাত পতনের বিন্যাস পরিবর্তিত হয় ব্যাপক ভাবে, যার মাত্রা হতে পারে প্রতি বছর কয়েক মিটার থেকে এক মিলিমিটারের থেকেও কম। বায়ুপ্রবাহ, অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য ও তাপমাত্রার পার্থক্য - নির্ধারন করে কোন অঞ্চলে পতিত হওয়া গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ।

পৃথিবী পৃষ্ঠে সৌর শক্তির পরিমাণ কমতে থাকে অক্ষাংশের মান বাড়তে থাকার সাথে সাথে। উচ্চ অক্ষাংশে, সূর্যের আলো ভূ-পৃষ্ঠে পৌছায় নিম্ন কোণে, এবং এটিকে পার করতে হয় বায়ুমণ্ডলের পুরু স্তর। ফলাফলস্বরূপ, নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে প্রতি ডিগ্রী অক্ষাংশ পরিবর্তনে সমুদ্র সমতল থেকে গড় বার্ষিক বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস পায় প্রায় । পৃথিবী পৃষ্ঠকে কিছু সুনির্দিষ্ট অক্ষ রেখায় উপবিভাজন করা যায় যেখানে মোটামুটি একই রকম  জলবায়ু বিরাজ করে। নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চল পর্যন্ত বিরাজমান এই জলবায়ুগুলো হল ক্রান্তীয় জলবায়ু (বা নিরক্ষীয়),উপক্রান্তীয় জলবায়ু  (subtropical), নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু এবং পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের জলবায়ু।

এই অক্ষাংশ নিয়মের কিছু ব্যতয় রয়েছেঃ

বহুল ব্যবহৃত কোপ্পেন জলবায়ু শ্রেণীবিভাগ (Köppen climate classification) পাঁচটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত (আর্দ্র ক্রান্তীয়, শুষ্ক, আর্দ্র মধ্য অক্ষাংশ, মহাদেশীয় এবং ঠান্ডা মেরু), যা পরবর্তীতে আরও বিভাজন করা হয় বিভিন্ন উপভাগে। কোপ্পান ব্যবস্থায় বিভিন্ন ভূ-অঞ্চলের মান প্রদান করে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের উপর পর্যবেক্ষণ করে।

পৃথিবীতে বায়ুর সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল  ফুরনেসা ক্রিক, ক্যালিফর্নিয়ার, ডেথ ভ্যালিতে, ১৯১৩ সালে। পৃথিবীতে কখনো সরাসরি মাপা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল  ভোস্টোক স্টেশন ১৯৮৩ সালে। কিন্তু উপগ্রহে থাকা রিমোট সেন্সর ব্যবহার করে পরিমাপ করা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল  পূর্ব অ্যান্টারর্টিকা। এই তাপমাত্রার রেকর্ড হল শুধুমাত্র কিছু পরিমাপ যা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ২০শ শতকের শুরু থেকে মান নেয়া শুরু করা হয় এবং সৌভাগ্য বশত এটা পৃথিবীর তাপমাত্রা পূর্ণ মাত্রা প্রকাশ করে না।

ট্রপোমণ্ডলের উপরের বায়ুমণ্ডলকে সাধারণত স্ট্রাটোমণ্ডল, মেসোমণ্ডল ও তাপমণ্ডলে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রতিটি স্তরের ভিন্ন ভিন্ন ল্যাপস রেট থাকে, যা দ্বারা উচ্চতা পরিবর্তনের সাথে তাপমাত্রার পরিবর্তন নির্দেশ করে। এরপর থেকে এক্সোমণ্ডল হালকা হতে হতে চৌম্বকমণ্ডলে মিলিয়ে যায়, যেখানে ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রসমূহ সৌরবায়ুর সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে থাকে। স্ট্রাটোমণ্ডলের মধ্যে রয়েছে ওজন স্তর, এটা হল সেই উপাদান যা ভূ-পৃষ্ঠকে সূর্যের অতিবেগুণী রশ্মির হাত হতে প্রকৃত পক্ষে রক্ষা করে এবং তাই, পৃথিবী প্রাণী জগতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্মান রেখা, টিকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে, এটি পৃথিবী পৃষ্ঠ হতে ১০০ কি.মি. উপরে থাকে, এবং এটা হল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং মহাকাশের মধ্যে কার্যকর সীমা রেখা।

তাপশক্তির কারণে বায়ুমণ্ডলের বাইরের প্রান্তে থাকা কিছু অনুর ভেতর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং এক পর্যায়ে এগুলো পৃথিবীর অভিকর্ষ শক্তিকে ছিন্ন করে মহাকাশে বেড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই ঘটনার ফলে ধীরে কিন্তু নিয়মিতভাবে বায়ুমণ্ডল মহাকাশে হারিয়ে যায়। যেহেতু মুক্ত হাইড্রোজেনের আণবিক ভর সবচাইতে কম, এটা অতি দ্রুত নির্দ্ধিধায় মুক্তিবেগ অর্জন করতে পারে, এবং এটির অন্যান্য গ্যাসের তুলনায় অধিক হারে বাইরের মহাকাশে বহির্গমন ঘটে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের পিছনে মহাকাশে হাইড্রোজেন গ্যাসের হারিয়ে যাওয়া একটি অন্যতম কারণ এবং এটা প্রাথমিকভাবে ঘটে একটি জারণ বিক্রিয়া থেকে এটির বর্তমান বিজারণ বিক্রিয়ায় আসায়। সালোকসংশ্লেষনের ফলে অক্সিজেনের সৃষ্টি হয়, কিন্তু ধারণা করা হয় জারণের ফলে নির্গত উপাদান যেমন হাইড্রোজেন হল বায়ুমণ্ডলে ব্যাপক হারে অক্সিজেনের সঞ্চয়নের পেছনে মূল পূর্বশর্ত। অতএব, হাইড্রোজেনের বায়ুমণ্ডল থেকে মুক্ত হওয়ার ঘটনা হয়তোবা পৃথিবীতে প্রাণের যে বিকাশ ঘটেছে তার গতি-প্রকৃতির উপর প্রভাব রেখেছে। বর্তমানে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলের বেশিরভাগ হাইড্রোজেন পরিণত হয় পানিতে, এটি বায়ুমণ্ডল থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবার আগেই। এটির বদলে, হারিয়ে যাওয়া বেশিরভাগ হাইড্রোজেন উৎপন্ন হয় উচ্চতর বায়ুমণ্ডলে পুড়ানো মিথেনের ফলশ্রুতিতে।

পৃথিবীর অভিকর্ষজ বল হল সেই ত্বরণ যা পৃথিবীর সাথে কোন একটি বস্তুর উপর ক্রিয়া করে বস্তুটির ভরের কারণে। ভূ-পৃষ্ঠের উপর, অভিকর্ষজ ত্বরণ হল প্রায় । কোন স্থানের ভূসংস্থান, ভূতত্ত্ব এবং গভীর ভূত্বকীয় গঠনের পার্থক্যের কারণে স্থানীয় ও বৃহৎ অঞ্চলের পৃথিবীর অভিকর্ষজ বলের মানের পরিবর্তন হয়ে থাকে, যাকে বলা হয়ে থাকে মাধ্যাকর্ষীয় ব্যত্যয়।

পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মূল অংশটি উৎপন্ন হয় এর ভূ-কেন্দ্রে, ডায়নামো প্রক্রিয়ার, তাপীয় ভাবে ও গাঠিনিক ভাবে উৎপন্ন গতিশক্তির পরিবর্তন ঘটে পরিচলন পদ্ধতিতে পরিবাহিত হয় তড়িৎ শক্তি ও চৌম্বক শক্তিতে। চৌম্বক ক্ষেত্রটি ভূ-কেন্দ্রে থেকে পৃথিবীর বাইরের দিকে ছড়িয়ে যায়, গুরুমণ্ডল ভেদ করে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যন্ত, যেখানে এটা মোটামুটি একটি ডাইপোল। ডাইপোলের মেরুগুলোর অবস্থান পৃথিবীর ভৌগোলিক মেরুর কাছাকাছি। ভূ-পৃষ্ঠের উপর নিরক্ষরেখা বরাবর, চৌম্বক ক্ষেত্রটির চৌম্বক শক্তির পরিমাণ হল , একই সাথে বৈশ্বিক চৌম্বকীয় ডাইপোল মোমেন্ট হল । ভূ-কেন্দ্রে হতে পরিচলন পদ্ধতিতে প্রবাহিত চৌম্বক শক্তি সুশৃঙ্খল ভাবে চারিদিকে ছড়ায় না; চৌম্বকীয় মেরুর স্থান পরিবর্তন হয় এবং পর্যায়ক্রমে এটির অ্যালাইনমেন্টের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলশ্রুতিতে স্যাকুলার পরিবর্তন ঘটে মূল চৌম্বক ক্ষেত্রের এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের বিপর্যয় ঘটে একটি অনিয়মিত সময়ের ভেতরে, গড়ে প্রতি মিলিয়ন বছরে একবার। সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে ঘটা বিপর্যয়টি হয়েছিল প্রায় ৭০০,০০০ বছর আগে।

মহাকাশে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের বিস্তৃতি দ্বারা চৌম্বকমণ্ডলকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সৌর বায়ুর আয়ন এবং ইলেকট্রনগুলি পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডল দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়; সৌর বায়ুর চাপে দিনের আলোর দিকে থাকা চৌম্বকমণ্ডলের দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়, প্রায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধের ১০ গুণ পর্যন্ত এবং অন্ধকারের দিকের চৌম্বকমণ্ডলটি লম্বা করে প্রসারিত করে তোলে। এর কারণ হল তরঙ্গ যে বেগে সৌর বায়ুর দিকে অগ্রসর হয় তার থেকে সৌর বায়ুর গতিবেগ অনেক বেশি, একটি সুপারসনিক প্রচন্ড-আঘাত দিনের আলোর দিকে থাকা চৌম্বকমণ্ডলকে সৌর বায়ুর মধ্যে মিশিয়ে দেয়। চৌম্বকমণ্ডল আধানযুক্ত কণাগুলোকে ধারণ করে; প্লাসমামণ্ডলটিকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে, এটি নিম্ন শক্তি সম্পন্ন কণা দ্বারা পূর্ণ থাকে যা পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে চৌম্বকমণ্ডলের রেখাগুলোকে অনুসরণ করে; রিং কারেন্টকে সংজ্ঞায়িত করা হয় এভাবে, এটি মধ্যম-শক্তির কণা দ্বারা পূর্ণ থাকে যা পৃথিবীর ভূচৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে তাল মিলিয়ে প্রবাহিত হয়, কিন্তু তা স্বত্তেও এটির প্রবাহ পথের উপর আধিপত্য রাখে চৌম্বক ক্ষেত্রটি, এবং ভ্যান এলেন রেডিয়েশন বেল্ট গঠিত হয় উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন কণা দ্বারা, যার গতি প্রধানত এলোমেলো ধরনের হয়, কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এটির অবস্থান চৌম্বকমণ্ডলের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত।

চৌম্বকীয় ঝড় ও সাবস্ট্রোম যখন ঘটে, তখন বাইরের দিকের চৌম্বকমণ্ডল থেকে এবং বিশেষ করে ম্যাগনিটোটেইল থেকে আধানযুক্ত কণাগুলো বেরিয়ে যায়, যার দিক হতে পারে আয়নমণ্ডলের দিকে, যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় অনুগুলো হয়ে থাকে উত্তেজিত ও আধানযুক্ত, এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় আরোরা।

পৃথিবী নিজের অক্ষের চারিদিকে ঘূর্ণনকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলে। এই গতি পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত অভিমুখে হয়ে থাকে। পৃথিবীর আহ্নিক গতির অক্ষ উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠকে ছেদ করে।

সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সময়কালকে — এটির গড় সৌর দিন বলা হয়—এটা হল ৮৬,৪০০ সেকেন্ড গড় সৌর সময় (৮৬,৪০০.০০২৫ এস আই সেকেন্ড)। এর কারণ হল পৃথিবীর সৌর দিন আজ সামান্য বড় ১৯ শতকের তুলনায় যার কারণ হল টাইডাল মন্দন, প্রতিটি দিন পরিবর্তিত হয়ে বড় হয়ে থাকে ০ থেকে ২ এস আই মিলি সেকেন্ড পর্যন্ত।

পৃথিবীর আহ্নিক গতির পর্যায়কাল হিসাব করা হয় স্থির নক্ষত্র সমূহের সাপেক্ষে, যেটাকে ইন্টারন্যাশনাল আর্থ রোটেশন এন্ড রেফারেন্স স্টিস্টেম সার্ভিস (আই.ই.আর.এস) কর্তৃক বলা হয় এটির নাক্ষত্রিক দিন (stellar day), যা হল ৮৬,১৬৪.০৯৮৯ সেকেন্ড গড় সৌর দিন (ইউটি১), বা ২৩ ৫৬ ৪.০৯৮৯। অয়নকাল বা ঘূর্ণনরত গড় মহাবিষুবকালের সাপেক্ষে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সময়কালকে, পূর্বে ভুলনামে প্রচলিত ছিল নাক্ষত্র দিন (sidereal day) হিসাবে, যার মান হল ৮৬,১৬৪.০৯০৫ সেকেন্ড গড় সৌর সময় (ইউটি১) (২৩ ৫৬ ৪.০৯০৫)  হতে। ফলাফল স্বরূপ, নাক্ষত্র দিন নাক্ষত্রিক দিনের তুলনায় ছোট প্রায় ৮.৪ মিলিসেকেন্ড। আই.ই.আর.এস কর্তৃক গড় সৌর দিনের দৈর্ঘ্যের মানের হিসাব এস.আই এককে পাওয়া যায় ১৬২৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৬২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উল্কাপিন্ড ও নিম্ন কক্ষীয় স্যাটেলাইট ছাড়া, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুর (celestial bodies) আপাত মূল গতি লক্ষ্য করা যায় পৃথিবীর আকাশের পশ্চিম দিকে যার গতির হার হল ১৫°/ঘণ্টা = ১৫'/মিনিট। বস্তু যেগুলো খ-বিষুবের (celestial equator) কাছাকাছি থাকে, তা সূর্য বা চাঁদের আপাত পরিধির সমান হয়ে থাকে প্রতি দুই মিনিট অন্তর অন্তর; পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে, সূর্য ও চাঁদের আপাত মাপ প্রায় সমান হয়ে থাকে।

যে গতির ফলে পৃথিবীতে দিনরাত ছোট বা বড় হয় এবং ঋতু পরিবর্তিত হয় তাকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলে। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে প্রায়  গড় দূরত্বে প্রতি ৩৬৫.২৫৬৪ গড় সৌর দিন পরপর, বা এক সৌর বছরে। এর মাধ্যমে অন্যান্য তারার সাপেক্ষে পূর্বদিকে সূর্যের অগ্রসর হওয়ার একটি আপাত মান পাওয়া যায় যার হার হল প্রায় ১°/দিন, যা হল সূর্য বা চাঁদের আপাত পরিধি প্রতি ১২ ঘণ্টায়। এই গতির কারণে, গড়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগে—একটি সৌর দিনে—পৃথিবীকে তার অক্ষ বরাবব একটি পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে, যাতে করে সূর্য আবার মেরিডিয়ানে ফেরত যেতে পারে। পৃথিবীর গড় কক্ষীয় দ্রুতি হল , যা যথেষ্ট দ্রুত, এই গতিতে পৃথিবীর পরিধির সমান দূরত্ব, প্রায় , মাত্র সাত মিনিটে অতিক্রম করা যাবে, এবং পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব , অতিক্রম করা যাবে প্রায় ৩.৫ ঘণ্টায়।

চাঁদ ও পৃথিবীর ঘূর্ণন করে একই বেরিকেন্দ্রকে অনুসর করে, প্রতি ২৭.৩২ দিনে এটির আশেপাশের তারাগুলোর সাপেক্ষে একবার চাঁদের প্রদক্ষিণ সম্পন্ন হয়। যখন সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী ও চাঁদের যৌথ সাধারণ কক্ষপথ হিসাব করা হয়, এই সময়কালকে বলা চঁন্দ্র মাস, একটি পূর্ণিমা হতে অপর পূর্ণিমা পর্যন্ত, যা হল ২৯.৫৩ দিন। যদি খ-উত্তর মেরুর সাপেক্ষে হিসাব করা হয়, তাহলে পৃথিবীর গতি, চাঁদের গতি, এবং এদের কক্ষীয় নতি হবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে। যদি সূর্য বা পৃথিবীর উপরের কোন সুবিধাজনক অবস্থান থেকে দেখা হয়, তাহলে মনে হবে, পৃথিবী ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক দিয়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। ঘূর্ণন তল এবং অক্ষীয় তল পরিপূর্ণভাবে সরলরৈখিক ভাবে সারিবদ্ধ নয়: পৃথিবীর অক্ষ বাঁকা রয়েছে প্রায় ২৩.৪৪ ডিগ্রী পৃথিবী-সূর্যের পরিক্রম পথ (ক্রান্তিবৃত্ত) থেকে উলম্ব বরাবর, এবং পৃথিবী-চাঁদের তল বাঁকা রয়েছে প্রায় ±৫.১ ডিগ্রী পর্যন্ত পৃথিবী-সূর্যের তলের তুলনায়। যদি এই বাঁকা ভাব না থাকত, তাহলে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে গ্রহণ ঘটত, হয় চঁদ্রগ্রহণ হত, নয়তবা সূর্যগ্রহণ হত।

হিল স্ফিয়ার, বা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবের ব্যাসার্ধ হল প্রায় । এটা হল সর্বোচ্চ দূরত্ব যেখান পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব আরও দূরে থাকা সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এই ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা প্রতিটি বস্তু পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে বাধ্য, অথবা তারা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে ছিটকে যেতে পারে।

পৃথিবী, এবং একই সাথে সৌর জগৎ, অবস্থান করছে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে এবং এর কেন্দ্রে থেকে প্রদক্ষিণ করছে প্রায় ২৮,০০০ আলোক বর্ষ জুড়ে। এটার অবস্থান অরিয়ন আর্মের গ্ল্যাক্‌টিক তল হতে প্রায় ২০ আলোক বর্ষ উপরে।

পৃথিবীর অক্ষীয় ঢালের পরিমাণ হল প্রায় ২৩.৪৩৯ ২৮১°, যার কক্ষতলের অক্ষটি, সর্বাদা খ-মেরুর দিকে তাক হয়ে থাকে। পৃথিবীর অক্ষীয় ঢাল বা অক্ষ রেখাটি হেলানো থাকার কারণে, কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে যে পরিমাণ সূর্যের আলো আসে, তা সারা বছর ধরে সমান থাকে না, এর মান পরিবর্তিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রকৃতি তথা জলবায়ুতে ঋতুর পরিবর্তন হয়, উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালের সূচনা হয় যখন সূর্য সরাসরি কর্কটক্রান্তি রেখার দিকে তাক হয়ে থাকে এবং একই জায়গায় শীতকালের সূচনা ঘটে সূর্য যখন দক্ষিণ গোলার্ধে থাকা মকরক্রান্তি রেখার দিকে তাক হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে, দিনগুলো অনেক লম্বা হয়, ও সূর্য আকাশের অনেক উপরের দিকে থাকে। অপরদিকে শীতকালে, জলবায়ু ঠান্ডা হয়ে যায় ও এ সময় দিনগুলো হয় ছোট। উত্তরের নাতিশীতোষ্ণ অক্ষাংশে, গ্রীষ্মকালের অয়তান্ত-বিন্দু অংশে সূর্য উদয় হয় উত্তরের সঠিক পূর্ব দিকে এবং অস্ত যায় উত্তরের সঠিক পশ্চিম দিকে, যার ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে শীতকালে। গ্রীষ্মকালের অয়তান্ত-বিন্দু অংশে সূর্য উদয় হয় দক্ষিণের সঠিক পূর্ব দিকে, দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ অক্ষাংশে এবং অস্ত যায় দক্ষিণের সঠিক পশ্চিম দিকে।

আর্কটিক সার্কেলের উপরে, একটি চরম অবস্থা দাঁড়ায় যেখানে বছরের কিছু সময় দিনের আলো পৌছায় না, শুধুমাত্র উত্তর মেরুতেই প্রায় ৬ মাসের উপরে এই অবস্থা থাকে, এটি মেরু রাত্রি নামে পরিচিত। দক্ষিণ গোলার্ধে, এই সময় এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ বিপরীত থাকে, দক্ষিণ মেরুর অবস্থান ও দিওক এসময় উত্তর মেরুর অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে থাকে। ছয় মাস পরে, এই মেরুটি অনুভব করে মধ্যরাতের সূর্য (midnight sun), যেখানে এক একটি দিন হয় ২৪ ঘণ্টা লম্বা, একই সময় বিপরীত ঘটনা ঘটে দক্ষিণ মেরুতে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের রেওয়াজ থেকে, অয়তান্ত-বিন্দু অনুসারে চারটি ঋতুর হিসাব করা যায়—এটা হল সেই বিন্দু যা থেকে পৃথিবীর অক্ষ রেখার অক্ষীয় ঢাল সূর্যের কত কাছে রয়েছে বা সূর্য থেকে কত দূরে রয়েছে তার হিসাব পাওয়া যায়—এবং বিষুব অনুসারে, যখন অক্ষীয় ঢালের দিক ও সূর্যের দিক সমান্তরালে থাকে। উত্তর গোলার্ধে, শীতকালীন অয়তান্ত-বিন্দু (winter solstice) বর্তমানে হয়ে থাকে ২১ ডিসেম্বর; গ্রীষ্মকালীন অয়তান্ত-বিন্দু হয়ে থাকে ২১ জুনের কাছাকাছি সময়ে, বসন্ত বিষুব হয়ে থাকে ২০ মার্চের কাছাকাছি এবং হেমন্তকালীন বিষুব হ্যে থাকে ২২ বা ২৩ সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে থাকে, যেখানে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অয়তান্ত-বিন্দু গুলো নিজের মধ্যে পাল্টিয়ে যায় এবং বসন্ত বিষুব ও শারদীয় বিষুবের দিনও নিজেদের মধ্যে পাল্টিয়ে যায়।

পৃথিবীর অক্ষীয় ঢালের মান আপেক্ষিকভাবে অনেক লম্বা সময় ধরে অপরিবর্তনীয় রয়েছে। গড়ে ১৮.৬ বছরে পৃথিবীর অক্ষীয় ঢালের অক্ষবিচলন ঘটে, সাধারণত অতি সামান্য, অনিয়মিত গতি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও পৃথিবীর অক্ষের অভিমুখ (এর কোণের মান নয়) সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়, এটির অয়নচলনের বৃত্তটি পরিপূর্ণভাবে শেষ হয় প্রতি ২৫,৮০০ বছরে একবার; এই অয়নচলন গতিটি নাক্ষত্র বছর থেকে ট্রপিক্যাল বছর পৃথক হবার কারণ হিসাবে কাজ করে। এই উভয় গতি সৃষ্টি হয় পৃথিবীর নিরক্ষরেখার স্ফীতি বরাবর সূর্য ও চঁন্দ্রের ভিন্ন ধর্মী আকর্ষণের কারণে। মেরু দুটিও ভূপৃষ্ঠের জুড়ে কয়েক মিটার স্থানন্তরিত হতে পারে। এই মেরু গতির বেশ কিছু, পর্যায়ক্রমিক উপাদান রয়েছে, যেগুলোকে একসাথে বর্ণনা করা যায় কোয়াসিপিরিওডিক গতি হিসাবে। এই গতির বার্ষিক উপাদান ছাড়াও, ১৪ মাস সাইকেলের আরো একটি উপাদান রয়েছে যা চ্যান্ডলার উবল নামে পরিচিত। পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে দিন-রাত্রি ছোট বড় হবার ঘটনাও ঘটে থাকে।

বর্তমান সময়ে, পৃথিবী অণুসূরবিন্দুতে অবস্থান করে ৩রা জানুয়ারির কাছাকাছি সময়ে, এবং অপসূরবিন্দুতে ৪ঠা জুলাইয়ের কাছাকাছি সময়ে। অয়নচলনের কারণে ও অক্ষীয় বিভিন্ন ঘটনার কারণে সময়ের সাথে সাথে এই দিনগুলো পরিবর্তিত হয়, যা চক্রাকার একটি প্যাটার্ন অনুসরণ করে যা মিলানকোভিটচ সাইকেল নামে পরিচিত। পৃথিবী ও সূর্যের এই পরিবর্তনশীল দূরুত্বের কারণে পৃথিবী পৃষ্ঠে পৌছানো সৌর শক্তি প্রায় ৬.৯%  বৃদ্ধি পায় অণুসুরের অপেক্ষা অপসূরে। এর কারণ দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুকে থাকে ঠিক যখন পৃথিবী ও সূর্যের সবচাইতে কাছাকাছি বিন্দুতে পৌছায়, সারা বছর ব্যাপী পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ এটির উত্তর গোলার্ধের থেকে কিছুটা বেশি তাপ গ্রহণ করে সূর্য থেকে। এই ঘটনাটির তাৎপর্য পৃথিবীর অক্ষীয় ঢালের কারণে মোট শক্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার তুলনায় খুবই যৎসামান্য, এবং বেশিরভাগ অতিরিক্ত শক্তি গ্রহণ করে দক্ষিণ গোলার্ধে বেশি পরিমাণে থাকা সমুদ্রের পানি।

যে গ্রহে প্রাণী-জগৎ টিকে থাকতে পারে বসবাসযোগ্য বলা হয়, যদিওবা সেই গ্রহে প্রাণের সঞ্চার না ঘটে তাহলেও। পৃথিবীতে রয়েছে পানির প্রাচুর্য্য যা জটিল জৈব যৌগের পরস্পরের সাথে সংযুক্তি ও সংমিশ্রণের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে, ও একই সাথে বিপাক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব, একই সাথে এর অক্ষীয় উপকেন্দ্রীকতা, কক্ষীয় ঘূর্ণনের গতি, অক্ষীয় ঢাল, ভূ-প্রাকৃতিক ইতিহাস, সহনীয় বায়ুমণ্ডল, ও চৌম্বকক্ষেত্র সবগুলো একসাথে ভূ-পৃষ্ঠের সামুগ্রিক বর্তমান জলবায়ু ও পরিবেশ বজায় থাকার পিছনে কাজ করছে।

জীবমণ্ডল হচ্ছে পৃথিবীর সমগ্র ইকোসিস্টেমগুলির যোগফল। এটিকে বলা যেতে পারে পৃথিবীর জীবনের এলাকা, একটি সংযুক্ত প্রক্রিয়া (পৃথিবীর অভ্যন্তরের সৌর এবং মহাবৈশ্বিক রেডিয়েশন এবং তাপ থেকে বিযুক্ত) এবং বৃহত্তরভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। অন্য কথায় পৃথিবীর বাইরের স্তরে অবস্থিত বায়ু, ভূমি, পানি ও জীবিত বস্তুসমূহের সমষ্টিকে জীবমণ্ডল বোঝায়। জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গেই জীবমণ্ডলের সম্পর্ক। জীবমণ্ডলের বিস্তৃতি ওপর-নিচে ২০ কিলোমিটারের মতো ধরা হলেও মূলত অধিকাংশ জীবনের অস্তিত্ব দেখা যায় হিমালয় শীর্ষের উচ্চতা থেকে ৫০০ মিটার নিচের সামুদ্রিক গভীরতার মধ্যেই। এখানে জীবকুল ৪.১ বিলিয়ন বছর পূর্বে বসবাস শুরু করে।

গ্রহের প্রাণী জগৎ একটি বাসযোগ্য বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে, কখন কখনও এই সবগুলোকে একসাথে বলা হয়ে থাকে জীবমণ্ডল। ধারণা করা হয়ে থাকে পৃথিবীর জীবমণ্ডলের গঠন শুরু হয় প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে। এই জীবমণ্ডলটি বেশ কিছু বায়োম দ্বারা বিভক্ত, প্রচুর পরিমাণে একই ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণি একই বায়োমে বসবাস করে। ভূমিতে, মূলত বায়োমকে বিভক্ত করা যায় অক্ষাংশের পার্থক্য থেকে, সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা থেকে এবং আর্দ্রতা থেকে। সুমেরু অঞ্চলের বা অ্যান্টারর্টিক বৃত্তের স্থলজ বায়োসের ক্ষেত্রে, অধিক উঁচু অক্ষাংশে বা অত্যন্ত শুষ্ক এলাকায় প্রাণি ও উদ্ভিদ তুলনামুলকভাবে নেই বললেই চলে বা এগুলো হল বিরান অঞ্চল; প্রজাতির বৈচিত্র্য সবচাইতে বেশি পরিমাণ দেখা যায় নিরক্ষীয় অঞ্চলের আদ্রতাপূর্ণ নিম্নভূমিতে।

জুলাই ২০১৬তে, বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সকল জীবিত জীবের উপর নিরীক্ষা চালিয়ে ৩৫৫ সেট জিনকে চিহ্নিত করেছেন লাস্ট ইউনিভার্সাল কমন এনসেস্টর হিসাবে।

মানুষ পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেছে। এদের মধ্যে যেগুলিকে অনবায়নযোগ্য সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি, এগুলি কেবল মাত্র ভূতাত্ত্বিক সময়ের নিরিখে পুনর্নবায়িত হয়।

ভূত্বকে জীবাশ্ম জ্বালানির বিশাল ভাণ্ডার আহরণ করা হয়। এগুলির মধ্যে কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উল্লেখযোগ্য। এই মজুদগুলি মানুষ কেবল শক্তি উৎপাদন নয়, রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করে। এছাড়া আকরিক সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূত্বকে খনিজ আকরিক মজুদও গঠিত হয়েছে। লাভা, ভূমিক্ষয় এবং পাতভিত্তিক ভূত্বকীয় গঠনের ফলে এই আকরিকগুলি তৈরি হয়েছে। এই আকরিক মজুদগুলি অনেক ধাতু এবং অন্যান্য উপকারী মৌলিক পদার্থের ঘনীভূত উৎস হিসেবে গণ্য হয়।

পৃথিবীর জীবমণ্ডল মানুষের জন্য প্রচুর জীবতত্ত্বিক উপাদান তৈরি করে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত খাদ্য, কাঠ, ঔষধপত্র, অক্সিজেন, এবং বিভিন্ন জৈব বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। ভূমি ভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র নির্ভর করে মাটির উপরের দিকের উপর ও পরিষ্কার পানির উপর, এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র নির্ভর করে এতে মিশ্রিত নিউট্রিয়েন্টের উপর যা ভূমি থেকে ধুয়ে সমুদ্রের পানিতে পৌছায়। ১৯৮০ সালের হিসাব অনুসারে, ৫,০৫৩ মেগাহেক্টর (৫০.৫৩ মিলিয়ন কি.মি.২) পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের এলাকা জুড়ে ছিল বনভূমি ও বনাঞ্চল, ৬,৭৮৮ মেগাহেক্টর (৬৭.৮৮ মিলিয়ন কি.মি.২) এলাকা ছিল তৃণভুমি ও চরণভুমি, এবং ১,৫০১ মেগাহেক্টর (১৫.০১ মিলিয়ন কি.মি.২) এলাকা ছিল খাদ্যশষ্য চাষের শষ্যভূমি। আনুমানিক সেচ ভূমির পরিমাণ ১৯৯৩ সালে ছিল । মানুষ ভূমিতে বসবাস করার জন্য নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে বাড়ি ঘর তৈরি করে।

পৃথিবী পৃষ্ঠের একটি বৃহত্তম এলাকায় চরম আবহাওয়া যেমন উষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, হ্যারিকেন, বা টাইফুন দেখা যায়, যা ঐ সকল এলাকার জীবনযাত্রার উপর গাঢ় প্রভাব ফেলে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত, এই ধরনের ঘটনায় প্রতি বছর গড়ে ১১,৮০০ জন মারা যায়। অসংখ্য স্থান রয়েছে যেখানে প্রায়শই ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সুনামি, অগ্নুৎপাত, টর্নেডো, ভূমি চ্যুতি, প্রবল তুষারপাত, বন্যা, খরা, দাবানল ও অন্যান্য জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘটে।

বিভিন্ন স্থানের বাতাস ও পানির দূষণ মানব সৃষ্ট দূষণ ঘটে থাকে, ফলে সৃষ্টি হয় অ্যাসিড বৃষ্টি  ও বিষাক্ত উপাদান, বনভূমি ধ্বংসের কারণে (অধিক পশুচারণ ভূমি, অরণ্যবিনাশ, মরুকরণ, বণ্যপ্রাণীর বিনাশ, প্রজাতির বিলুপ্তি, মাটির অধঃপতন, ভূমির বিনাশ ও ভূমিক্ষয়।

একটি বৈজ্ঞানিক ঐক্যমত্য রয়েছে মানব জাতির শিল্পায়নের ফলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের কারণে বৈশ্বিক ভূমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটছে। ধারণা করা হয় যে এর ফলশ্রুতিতে জলবায়ুর পরিবর্তন যেমন হিমবাহ এবং বরফের স্তর গলে যাচ্ছে, আরও চরম তাপমাত্রার সীমা দেখা যাচ্ছে, একইসাথে আবহাওয়ারও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে এবং বিশ্বব্যাপী গড় সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা, মানচিত্র তৈরির অধ্যয়ন ও অনুশীলনের একটি বিদ্যা এবং ভূগোল হল ভূমি, বৈশিষ্ট্য, বাসবাসকারী এবং পৃথিবীর ঘটনাসমূহের অধ্যয়ন, একই সাথে এটি ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীকে চিত্রিত করার একটি নিয়মে পরিনত হয়েছে। মাপজোপ (Surveying), হল অবস্থান ও দুরত্বের পরিমাপ ব্যবস্থা, এবং ন্যাভিগেশন হল সুক্ষ পরিমাপ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে অবস্থান ও দিক পরিমাপ করা যায়, মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা ও ভূগোলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা এবং যথাযথভাবে নির্ণয়ের জন্য এটির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে।

৩১ অক্টোবর ২০১১ তারিখ পর্যন্ত পৃথিবীতে মানব সংখ্যার পরিমাণ আনুমানিক গিয়ে দাঁড়িয়েছে সাত বিলিয়ন। ভবিষ্যত বাণীগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যার পরিমাণ ৯.২ বিলিয়ন হবে। ধারণা করা হয় সবচাইতে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। মানুষের জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বের সব জায়গায় সমান নয়, কিন্তু একটি বেশির ভাগ অংশ বাস করে এশিয়া মহাদেশে। ২০২০ সাল নাগাদ, আশা করা হয় বিশ্বের ৬০% মানুষ বাস করবে শহর এলাকায়, গ্রাম্য এলাকায় না থেকে ।

হিসাব করা যায় যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের আট ভাগের এক ভাগ জায়গা মানুষের বসবাসের জন্য উপযুক্ত – যেহেতু পৃথিবীর উপরিভাগের চার ভাগের তিন ভাগ সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত, এর ফলে এর মাত্র এক ভাগ অংশ হল ভূমি। এই ভূমির অর্ধেক স্থান জুড়ে রয়েছে মরুভূমি (১৪%), উচ্চ পর্বতমালা (২৭%), বা অন্যান্য অনুপযুক্ত খাদ এলাকা। পৃথিবীর সর্বোচ্চ উত্তর দিকের স্থায়ী স্থাপনাটি রয়েছে এলার্টে, যা নুনাভুট, কানাডার এললেসমেয়ার আইল্যান্ডে অবস্থিত (৮২°২৮′ উত্তর), পৃথিবীর সর্বোচ্চ দক্ষিণ দিকের স্থায়ী স্থাপনাটি হল আমুন্ডসেন- স্কট সাউথ পোল স্টেশন, অ্যান্টারটিকায়, একেবারেই প্রায় দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি, (৯০°দক্ষিণ)।

স্বাধীন সার্বভৌম দেশগুলো শুধু মাত্র কিছু অংশ বাদ দিয়ে গ্রহটির প্রায় পুরো ভূমির সবটাই নিজেদের বলে দাবী করে, বাদ দেয়া অংশ গুলোর মধ্যে হল অ্যান্টারটিকার কিছু অংশ, দানিউব নদীর পশ্চিম তীর বরাবর কয়েক খন্ড জমি, মিশর ও সুদানের সীমান্তের অদাবীকৃত এলাকা বির টাউইল। , ১৯৩ টি সার্বভৌম রাষ্ট্র রয়েছে পৃথিবীতে যা জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসাবে অন্তর্ভূক্ত, এছাড়াও দুটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র ও ৭২ টি নির্ভরশীল অঞ্চল এবং সীমিত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রাষ্ট্র রয়েছে। পৃথিবীতে কখনই একটি একক সার্বভৌম সরকার তৈরি হয়নি যার পুরো বিশ্বের উপর কর্তৃত ছিল, যদিও বা কিছু জাতি-রাষ্ট্র বিশ্ব আধিপত্যের জন্য যুদ্ধ করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।

জাতিসংঘ বিশ্ব ব্যাপী আন্ত-রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসাবে কাজ করে, এটা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দেশগুলো মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার লক্ষ্যে নিয়ে, সশস্ত্র বিরোধ যাতে না ঘটে। ইউএন প্রধানত আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ফোরাম হিসাবে কাজ করে। যদি সদস্য রাষ্ট্র সমূহ সম্মতি প্রদান করে, এটি সশস্ত্র হস্তক্ষেপের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা প্রথম মানুষ হলেন ইউরি গ্যাগারিন, ১২ এপ্রিল ১৯৬১ সালে। , সর্বমোট, প্রায় ৪৮৭ জন মানুষ মহাকাশে ও পৃথিবীর কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন, এবং, এদের মধ্যে, বার জন চাঁদের মাটিতে হেঁটেছেন। সাধারণ ভাবে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করা মানুষরাই একমাত্র মহাকাশের অবস্থান করা মানুষ। এই স্টেশনের কর্মীদলটি, গঠন করা হয় ৬ জন মানুষ নিয়ে, যাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়। পৃথিবী থেকে মানুষ সবচাইতে দূরের দূরত্ব ভ্রমণ করেছে ৪০০,১৭১ কি.মি., যা অর্জন করা হয়েছে অ্যাপোলো ১৩ অভিযানে ১৯৭০ সালে।

পৃথিবীর প্রায় এক চতুর্থাংশ ব্যাসার্ধ-বিশিষ্ট চাঁদ একটি অপেক্ষাকৃত বড় শিলাময় প্রাকৃতিক উপগ্রহ। গ্রহের আকার বিবেচনায় এটিই সৌরজগতের বৃহত্তম চাঁদ; যদিও ক্যারন তার বামন গ্রহ প্লুটো থেকে আপেক্ষিকভাবে বৃহত। পৃথিবীর ন্যায় অন্যান্য গ্রহের প্রাকৃতিক উপগ্রহগুলোকেও চাঁদ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহৎ উপগ্রহ। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৪০৩ কিলোমিটার (২৩৮,৮৫৭ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস ৩,৪৭৪ কিলোমিটার (২,১৫৯ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর অর্থ দাড়াচ্ছে, চাঁদের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ পাউন্ড হয় তা হলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ পাউন্ড। এটি প্রতি ২৭.৩ দিনে পৃথিবীর চারদিকে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। প্রতি ২৯.৫ দিন পরপর চন্দ্রকলা ফিরে আসে অর্থাৎ একই কার্যক্রিয় আবার ঘটে। পৃথিবী-চাঁদ-সূর্য তন্ত্রের জ্যামিতিতে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের কারণেই চন্দ্রকলার এই পর্যানুক্রমিক আবর্তন ঘটে থাকে।

বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায়। যতদিন না পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে।

পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষীয় বলের ক্রিয়ার ফলে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। এই সমরূপ ঘটনার ফলে চাঁদের টাইডাল লকিং তৈরি হয়: চাঁদের নিজের অক্ষে ঘূর্ণনের জন্য যে সময় লাগে সেই একই পরিমাণ সময় প্রয়োজন হয় পৃথিবীর কক্ষপথে আবর্তনের জন্য। যার ফলে পৃথিবীর দিকে সব সময় এটির একই পৃষ্ঠ থাকে। চাঁদের পৃথিবীকে আবর্তনের সময়, এটির বিভিন্ন অংশ সূর্যের আলো দ্বারা আলোকিত হয়, ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় চন্দ্রকলার; এটির অন্ধকারচ্ছন্ন অংশটি আলোকিত অংশ থেকে পৃথক হয়ে থাকে সৌর টারমিনেটর দ্বারা।

পৃথিবী ও চাঁদের আকর্ষণ ক্রিয়ায় সৃষ্ট জোয়ার-ভাটার ঘটনার ফলে, চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৩৮ মিমি/বছর হারে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যায়। মিমিয়ন বছর ধরে, এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনের ফলে—এবং পৃথিবীর দিন বৃদ্ধি পাওয়া ২৩ মাইক্রোসেকেন্ড/বছর—পরিশেষে বৃহত্তর পরিবর্তন করেছে। ডেভোনিয়ান সময় কালে, উদাহারণস্বরূপ (প্রায় ৪১০ মিলিয়ন বছর আগে) এক বছর পূর্ণ হতে ৪০০ দিন লাগত, যেখাবে প্রতিটি দিন ছিল ২১.৮ ঘণ্টার।

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন সাধনে সহায়তা করে, এতে প্রাণের বিকাশ ঘটাতে চাঁদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জীবাশ্ম থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও কম্পিউটার সিমুলেশন থেকে জানা যায় যে, চাঁদের সাথে জোয়ার-ভাটার ঘটনার কারণে পৃথিবীর অক্ষীয় ঢালটি সুস্থির রয়েছে। কিছু ত্বাত্তিক এটি ধারণা করে যে, পৃথিবীর নিরক্ষীয় স্ফিতি বরাবর অন্যান্য গ্রহ ও সূর্য দ্বারা প্রয়োগ করা সুস্থির টর্ক না থাকলে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের অক্ষটি এলোমেলো ও অস্থির প্রকৃতির হত, প্রতি মিলিয়ন বছরে বিশৃঙ্খল পরিবর্তন নজরে আসত, যেটা দেখা যায় মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে।

পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে দেখা হলে, চাঁদ ও সূর্য প্রায় সম দূরত্বে থাকা প্রায় একই আকারের গোলাকার চাকতির মত দেখায়। এই দুটি বস্তুর কৌনিক আকার (বা ঘনকোণ) মিলে যায় কারণ, যদিও বা সূর্যের চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড়, একই সাথে সূর্য চাঁদের তুলনায় পৃথিবী থেকে ৪০০ গুণ দূরে অবস্থিত। এর ফলে পৃথিবীতে পূর্ণ এবং বলয়াকার (আংটির মত) সূর্য গ্রহণ হয়ে থাকে।

চাঁদের গঠন সম্পর্কে প্রচলিত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো বৃহদায়তন-প্রভাব তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়েছে যে এটি গঠিত হয়েছে মঙ্গল গ্রহের সমান আকৃতির 'থিয়া' নামক একটি মহাজাগতিক কণার সাথে সংঘর্ষের ফলে। এই মতবাদটি ব্যাখ্যা করে (অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে) চাঁদে লৌহ এবং অস্থির উপাদানগুলির আপেক্ষিক অভাব এবং এর গঠন প্রকৃতি পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় অনুরূপ।

গ্রহাণু হল প্রধানত পাথর দ্বারা গঠিত বস্তু যা তার তারাকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে। আমাদের সৌরজগতে গ্রহাণুগুলো ক্ষুদ্র গ্রহ (Minor planet অথবা Planetoid) নামক শ্রেণীর সবচেয়ে পরিচিত বস্তু। এরা ছোট আকারের গ্রহ যেমন বুধের চেয়েও ছোট। বেশিরভাগ গ্রহাণুই মঙ্গল এবং বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত গ্রহাণু বেল্টে থেকে নির্দিষ্ট উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে আবর্তন করে। ধারণা করা হয় গ্রহাণুগুলো ভ্রূণগ্রহীয় চাকতির (Protoplanetary disc) অবশিষ্টাংশ। বলা হয় গ্রহাণু বেল্টের অঞ্চলে সৌরজগতের গঠনের প্রাথমিক সময় যেসকল ভ্রূণগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিলো তাদের অবশিষ্টাংশ বৃহস্পতির আবেশ দ্বারা সৃষ্ট মহাকর্ষীয় অক্ষ বিচলনের কারণে গ্রহের সাথ মিলিত হবার সুযোগ পায়নি। আর এই অবশিষ্টাংশই গ্রহাণু বেল্টের উৎপত্তির কারণ। কিছু গ্রহাণুর চাঁদও রয়েছে।

প্রতি বিশ বছর অন্তর ক্ষুদ্রতর নিকটতর-পৃথিবীর গ্রহাণু “২০০৬ আরএইচ১২০” (2006 RH120) পৃথিবী-চঁন্দ্র পদ্ধতিকে জটিল করে তোলে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন, এটি পৃথিবীকে প্রযোজ্য সময়ের চেয়েও সংক্ষিপ্তকালে আবর্তন করতে পারে।

কৃত্রিম উপগ্রহ হলো মহাকাশে উৎক্ষেপিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবিত উপগ্রহ। এটা চাঁদের মতোই কিন্তু পার্থক্য কেবল এই যে চাঁদ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত আর কৃত্রিম উপগ্রহ মানুষ তৈরি করেছে। , পৃথিবীর কক্ষপথে ১,৪১৯টি মানব কর্তৃক সৃষ্ট কার্যকরী কৃত্রিম উপগ্রহ ছিল। এছাড়াও সেখানে বর্তমানে আরো আছে সবচেয়ে প্রাচীন কৃত্রিম উপগ্রহ ভ্যানগার্ড-১ সহ ১৬,০০০ খন্ড অক্ষম উপগ্রহ এবং মহাকাশের জঞ্জাল।  পৃথিবীর সর্ববৃহত কৃত্রিম উপগ্রহটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র।

পৃথিবীর আদর্শ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রতীক হল বৃত্তের অভ্যন্তরে একটি ক্রস চিহ্ন, ; যা পৃথিবীর চার কোণকে নির্দেশ করে।

মানব সংস্কৃতিতে এই গ্রহকে নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। পৃথিবীকে কখনো কখনো শ্বর হিসেবে ব্যক্তিরূপে প্রকাশ করা হয়। অনেক সংস্কৃতিতে পৃথিবী হল দেবমাতা, যা সন্তান জন্মদানের প্রাথমিক শ্বর হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, গাইয়া তত্ত্বে পৃথিবীর পরিবেশ ও জীবনকে একক স্ব-নিয়ন্ত্রণকারী জীবের সাথে তুলনা করা হয় যা বসবাসযোগ্যতার স্থায়িত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ধর্মের সৃষ্ট পুরাণে বলা হয় একজন অতিপ্রাকৃত শ্বর বা শ্বরবৃন্দ পৃথিবী সৃষ্টি করেছে।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফলে এই গ্রহ সম্পর্কিত মানবীয় মতামতসমূহের কতক সাংস্কৃতিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। পশ্চিমে সমতল পৃথিবীর ধারণা পরিবর্তিত হয়ে গোলাকার পৃথিবী ধারণা সৃষ্টি হয়েছে; যা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পিথাগোরাস কর্তৃক প্রবর্তিত। এছাড়া ১৬শ শতাব্দীর পূর্বে পৃথিবীকে ভূকেন্দ্রিক মডেল-এ মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে বিশ্বাস করা হত; পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা প্রথম তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে এটি একটি আবর্তনকারী বস্তু এবং সৌর জগতের অন্যান্য গ্রহের সাথে তুলনীয়। বাইবেলের বংশতালিকা বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর বয়স নির্ণয়-কারী জেমস উশার এবং আরো কয়েকজন খ্রিস্টান পণ্ডিত ও পাদ্রীর কারণে ১৯শ শতাব্দীর পূর্ব-পর্যন্ত পশ্চিমারা ধারণা করতো যে, পৃথিবীর বয়স কয়েক হাজার বছর। ১৯শ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে পৃথিবীর বয়স কমপক্ষে কয়েক মিলিয়ন বছর। ১৮৬৪ সালে লর্ড কেলভিন তাপগতিবিজ্ঞান ব্যবহার করে হিসাব করে দেখান যে পৃথিবীর বয়স ২০ মিলিয়ন থেকে ৪০০ মিলিয়ন বছর, যা বিতর্কের জন্ম দেয়; কিন্তু পরবর্তীতে ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে ও ২০শ শতাব্দীর প্রথম দিকে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি রেডিওএক্টিভিটি ও রেডিওমেট্রিক ডেটিং আবিষ্কারের পর প্রমাণিত হয় পৃথিবীর বয়স বিলিয়ন বছরেরও বেশি। পৃথিবী সম্পর্কিত মানুষের ধারণা পুনরায় পরিবর্তন হয় যখন ২০শ শতাব্দীতে মানুষ প্রথম কক্ষপথ থেকে পৃথিবীকে দেখে এবং বিশেষত অ্যাপোলো মহাশূন্য মিশনে তোলা ছবিগুলো দেখার পর।




#Article 23: পরিবেশ (308 words)


পরিবেশ (Environment) : কোনো ব্যবস্থার ওপর কার্যকর বাহ্যিক প্রভাবকসমূহের সমষ্টিকে পরিবেশ বলে। যেমন: চারপাশের ভৌত অবস্থা, জলবায়ু ও প্রভাব বিস্তারকারী অন্যান্য জীব ও জৈব উপাদান ইত্যাদির সামষ্টিক রূপই হলো পরিবেশ। পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের দ্বারাই একজন ব্যক্তি বা প্রাণী এমনকি উদ্ভিদ প্রভাবিত হয়ে থাকে। এই প্রভাবকসমূহের মধ্যে থাকে প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পারিপার্শ্বিক উপাদানসমূহ।

পরিবেশের  উপাদানসমূহের মধ্যে রয়েছে- যেমন: গাছ-পালা , নদী-নালা , খাল-বিল , রাস্তা-ঘাট , ঘর-বাড়ি , জল , সূর্য , মাটি ,বায়ু , নৌকা ,পশু-পাখি , বিদ্যালয় , দালান-কোঠা  ইত্যাদি তথা আমাদের চারপাশের সকল কিছুই পরিবেশের অংশ ।

প্রাকৃতিক পরিবেশ :প্রাকৃতিক পরিবেশ হচ্ছে সেই পরিবেশ যা প্রকৃতি নিজে নিজে তৈরি করে। এগুলো হচ্ছেঃগাছ,পাহড়-পর্বত,ঝর্ণা,নদী ইত্যাদি। এগুলো মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। এগলো প্রাকৃতিক ভাবেই সৃষ্টি হয়।

মানুষের তৈরি পরিবেশ :মানুষের তৈরি পরিবেশ হচ্ছে দালান-কোঠা,নগরায়ন,বন্দর ইত্যাদি। এগুলো মানুষ নিজের প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি করে।

পরিবেশের প্রতিটা উপাদানের সুসমন্বিত রূপই হলো সুস্থ পরিবেশ। এই সুসমন্বিত রূপের ব্যত্যয়ই পরিবেশের দূষণ ঘটায় এবং পরিবেশের স্বাভাবিক মাত্রার অবক্ষয় দেখা দেয়। পরিবেশ বিভিন্ন কারণে দূষিত হতে পারে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও এর সাথে দায়ী। পরিবেশ দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ১২টি মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্যকে একত্রে ডার্টি ডজন বা নোংরা ডজন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে ৮টি কীটনাশক অলড্রিন (aldrin), ডায়েলড্রিন (dieldrin), ক্লোরডেন (chlordane), এনড্রিন (endrin), হেপ্টাক্লোর (heptachlor), ডিডিটি (DDT), মিরেক্স (mirex), এবং টক্সাফেন (toxaphene); দুটি শিল্পজাত রাসায়নিক দ্রব্য পিসিবি (PCBs) এবং হেক্সাক্লোরোবেনজিন (hexachlorobenzene); এবং অন্য দুটো হলো কারখানায় উৎপন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত: ডাইওক্সিন (dioxin) এবং ফিউরান (furan)। খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে পৃথিবীব্যাপী সব পরিবেশের সব ধরনের জীবজন্তুর উপর তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটায় এই বিষাক্ত পদার্থগুলো। ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম, ক্যান্সার উৎপাদন, ভ্রুণ বিকাশের নানাবিধ সমস্যার মূলেই দায়ী থাকে এই ডার্টি ডজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিপন্ন পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিবেশ আইন। মূলত পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণের আইনই পরিবেশ আইন। এই আইন স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য বিশ্ব আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাগরিক ও সরকারি সংস্থাসমূহের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।




#Article 24: ভাষা (1626 words)


ভাষা ধারণাটির কোন সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও অবিতর্কিত সংজ্ঞা দেয়া কঠিন, কেননা যেকোন কিছুর সংজ্ঞা ভাষার মাধ্যমেই দিতে হয়। তাই ভাষার আত্মসংজ্ঞা প্রদান দুরূহ। তবে ভাষার একটি কার্যনির্বাহী সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায় যে ভাষা মানুষের মস্তিষ্কজাত একটি মানসিক ক্ষমতা যা অর্থবাহী বাকসংকেতে রূপায়িত (বাগযন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বনিভিত্তিক রূপে বা  রূপে) হয়ে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করতে এবং একই সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে।

ভাষা মানুষে-মানুষে যোগাযোগের প্রধানতম বাহন। ভাষার কতটুকু মানুষের কোন জন্মগত বৈশিষ্ট্য আর কতটুকু পরিবেশনির্ভর সে ব্যাপারে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের মতভেদ আছে। তবে সবাই একমত যে স্বাভাবিক মানুষমাত্রেই ভাষা অর্জনের মানসিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়, এবং একবার ভাষার মূলসূত্রগুলি আয়ত্ত করে ফেলার পর বাকী জীবন ধরে মানুষ তার ভাষায় অসংখ্য নতুন নতুন বাক্য সৃষ্টি করতে পারে। এরকম অসীম প্রকাশক্ষমতাসম্পন্ন ভাষা একান্তই একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য; মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণী এই ক্ষমতার অধিকারী নয়। প্রতিটি মানুষ ভাষা আয়ত্ত করার সহজাত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেয় এবং ঐ মানুষটি যে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্যায়ের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশ-বেষ্টিত ভাষিক সমাজের অন্তর্গত, সেই সমাজে সে দৈনন্দিন ভাষাপ্রয়োগের মাধ্যমে তার নিজস্ব ভাষাজ্ঞান বিকশিত করে।

ভাষা মূলত বাগযন্ত্রের মাধ্যমে কথিত বা বলা হয়, কিন্তু একে অন্য মাধ্যমে তথা লিখিত মাধ্যমেও প্রকাশ করা সম্ভব। এছাড়া প্রতীকী ভাষার মাধ্যমেও ভাবের আদান-প্রদান হতে পারে। ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল একটি ভাষিক প্রতীক এবং এর দ্বারা নির্দেশিত অর্থের মধ্যকার সম্পর্ক যাদৃচ্ছিক। একই বস্তু বা ধারণা কেন বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ধরনের ধ্বনিসমষ্টি দ্বারা নির্দেশিত হয় (যেমন - একটি গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণীর নাম বাংলা ভাষায় গরু, ইংরেজি ভাষায় Cow কাও, ফরাসি ভাষায় Vache ভাশ্‌, ইত্যাদি কেন হয়), তার পেছনে একেকটি ভাষার বক্তাসমাজের ভেতর সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রীতিনীতি ছাড়া আর কোন কারণ নেই। মানুষের ভাষার সাথে অন্য প্রাণীদের যোগাযোগের ভাষার একটা বড় পার্থক্য হল ভাষার সাহায্যে মানুষ বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে, যা প্রাণীরা পারে না। যেমন - মৌমাছিদের নাচ কেবল মধু আহরণের সুবিধার জন্যই কাজে লাগে। আর উল্লুক জাতীয় বানরদের ভাষিক দক্ষতা অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে বেশি হলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে সামগ্রিকভাবে তাদের ভাষা একটি দুই বছরের মনুষ্য শিশুর ভাষার চেয়ে উন্নত নয়।

সব মানুষই অন্তত একটি ভাষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। বিভিন্ন ধ্বনি পরপর সাজিয়ে তৈরি হয় শব্দ, আর অনেক শব্দ নানা বিন্যাসে সাজিয়ে গড়া অসংখ্য সব বাক্য নিয়ে তৈরি হয় একটি ভাষা। কিন্তু কোন ভাষায় কতগুলি বাক্য হতে পারে, তার কোনও সীমাবদ্ধতা নেই। ভাষার বক্তারা কতগুলি সীমিত সংখ্যক সূত্রকে কাজে লাগিয়ে অসীমসংখ্যক বাক্য বলতে ও বুঝতে পারেন। আধুনিক চম্‌স্কীয় ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই সূত্রগুলিকে বলা হয় বক্তার মানসিক ব্যাকরণ। বক্তা যখন ছোটবেলায় ভাষা অর্জন করে, তখন তার মধ্যে এই মানসিক ব্যাকরণের বোধ গড়ে ওঠে। এই ব্যাকরণের অংশ হিসেবে আছে ভাষাটির ধ্বনিব্যবস্থা (ধ্বনিতত্ত্ব), শব্দের গঠন (রূপমূলতত্ত্ব), কীভাবে একাধিক শব্দ সংযুক্ত হয়ে পদগুচ্ছ বা বাক্য গঠন করে (বাক্যতত্ত্ব), ধ্বনি ও অর্থের মধ্যে সম্পর্ক (অর্থবিজ্ঞান), এবং ভাষার শব্দভাণ্ডার। ভাষার শব্দগুলির ধ্বনি ও অর্থের মধ্যে সম্পর্ক যাদৃচ্ছিক। ভাষা হল সেই ব্যবস্থা যা ধ্বনির সাথে অর্থের সম্পর্ক স্থাপন করে। ভাষা সম্পর্কে কোন মানুষের এই মানসিক বোধ, বাস্তব জীবনে তার ভাষার প্রয়োগ অপেক্ষা স্বতন্ত্র। মানুষ বাক বৈকল্যের শিকার হয়ে বা অন্য যেকোন কারণে ভাষাপ্রয়োগে ভুল করতে পারে, কিন্তু এতে তার ভাষাবোধের কিছু হয় না।

ভাষার ব্যাকরণ বিভিন্ন রকম হতে পারে। বর্ণনামূলক ব্যাকরণে ভাষার বক্তার অচেতন ভাষিক জ্ঞানের একটি বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটি ভাষার বক্তার মানসিক ব্যাকরণের একটি মডেল হিসেবে গণ্য করা যায়। বিধানমূলক ব্যাকরণে ভাষার ব্যাকরণ কী রকম হওয়া উচিত, তার বিধিবিধান দেয়ার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় বিদেশী ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে শিক্ষামূলক ব্যাকরণ লেখা হয়।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্বের হাজার হাজার ভাষা নিয়ে গবেষণা করে বের করেছেন যে এদের মধ্যে বহু পার্থক্য থাকলেও এই পার্থক্যের পরিমাণ সীমিত। সব ভাষার ব্যাকরণেই কিছু বিশ্বজনীন অংশ আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষাসমূহের এই বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্যগুলিকে কতগুলি নিয়মনীতির সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। এই নিয়মনীতিগুলির সমষ্টিগত নাম দেয়া হয়েছে বিশ্বজনীন ব্যাকরণ। ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিশ্বজনীন ব্যাকরণ সব ভাষার ব্যাকরণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং এর মানুষের সহজাত ভাষা অর্জন ক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক আছে।

শিশুদের ভাষা অর্জনের পদ্ধতি বিশ্বজনীন ব্যাকরণের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। শিশুদেরকে জোর করে ভাষা শেখানো লাগে না। যেকোন মানব ভাষার উন্মুক্ত সংস্পর্শে আসলেই শিশুরা দ্রুত তা শিখে ফেলতে পারে। শিশুরা কতগুলি নির্দিষ্ট ধাপে ভাষা শেখে। খুব কম বয়সেই ভাষা অর্জনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। চার বা পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুরা ভাষার সম্পূর্ণ ব্যাকরণ (এখানে ব্যাকরণ বলতে স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ বই নয়, ভাষার বাক্য গঠনের অন্তর্নিহিত মানসিক নিয়মগুলি বোঝানো হয়েছে) আয়ত্ত করে ফেলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, শিশুরা বংশগতভাবেই ভাষা অর্জন ও ব্যবহারের ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়, এবং এই ক্ষমতা বিশ্বজনীন ব্যাকরণের অংশ।

বধির শিশুরা প্রতীকী ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও অনুরূপ দক্ষতা দেখায়। অর্থাৎ ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে ধ্বনি শোনা বা উৎপাদন করা পূর্বশর্ত নয়। প্রতীকী ভাষাগুলি দৃষ্টি ও ইঙ্গিতভিত্তিক হলেও এগুলি কথ্য ভাষাগুলির চেয়ে কোন অংশে অনুন্নত বা গাঠনিক দিক থেকে কম জটিল নয়।

ভাষাকে যদি কেবলমাত্র যোগাযোগের একটি উপায় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে এটি মানুষের একান্ত নিজস্ব কোনও বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের ভাষার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্য প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলিতে দেখা যায় না। মানুষের ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সৃষ্টিশীলতা বা সঞ্জননী ক্ষমতা, অর্থাৎ মৌলিক ভাষিক এককগুলিকে (ধ্বনি, ধ্বনিদল, রূপমূল, শব্দ) সংযুক্ত করে অসীম সংখ্যক বৈধ বাক্য সৃষ্টির ক্ষমতা, যে বাক্যগুলির অনেকগুলিই হয়ত আজও কেউ বলেনি বা শোনেনি।

ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষা সম্পর্কে গবেষণা করে অনেকগুলি সত্য বের করেছেন, যেগুলি সব ভাষার জন্য প্রযোজ্য: 

মানুষের মুখের ভাষা অনেকগুলি ধ্বনি নিয়ে গঠিত। এই ধ্বনিগুলির নিজস্ব কোন অর্থ নেই। যেমন - ক্‌, অ, প্‌, আ, ল্‌ --- এই ধ্বনিগুলি উচ্চারণ করলে কোন কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু ধ্বনিগুলি একত্রে যখন কপাল শব্দ হিসেবে উচ্চারণ করা হয়, তখন একজন বাংলাভাষী লোক এদের মধ্যে অর্থ খুঁজে পান। ভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর জটিল আন্বয়িক বা বাক্যিক ব্যবস্থা, যার নিয়মগুলি ভাষার শব্দগুলি কোন্‌টির পর কোন্‌টি কী ক্রমে বসে বিভিন্ন পদগুচ্ছ, খণ্ডবাক্য ও বাক্য গঠন করবে, তার দিকনির্দেশ দেয়।

ভাষা অর্জন বলতে সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায় যার মাধ্যমে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা এক বা একাধিক ভাষা শিখে থাকে। এটি ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র।

মাতৃভাষা অর্জন একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং ভাষাবিজ্ঞানী এর প্রকৃতি সম্পর্কে এখনও পুরোপুরি জানতে পারেননি। ছোট শিশুদের মধ্যে প্রবৃত্তিগতভাবেই কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাদেরকে শিশু বয়সেই মাতৃভাষা অর্জনের উপযোগী করে তোলে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে আছে বাগনালীর গঠন, যার মাধ্যমে শিশু তার মাতৃভাষার বিভিন্ন শব্দ উৎপাদন করে। এছাড়া শিশুদের সাধারণ ব্যাকরণিক মূলনীতিগুলি এবং বাক্যগঠনের স্তরগুলি বোঝার ক্ষমতা থাকে। শিশুরা কোন নির্দিষ্ট ভাষা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। বরং যে ভাষা তাদের আশেপাশে বলা হয়, তারা সেই ভাষাই শিখে ফেলে, এমনকি যদি তাদের পিতামাতা অন্য কোন ভাষাতে কথা বলে, তা হলেও। প্রাথমিক ভাষা অর্জনের একটি কৌতূহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্য হল শিশুরা প্রথম প্রথম বাক্যের গঠনের চেয়ে অর্থের উপর বেশি জোর দেয়। যেই পর্যায়ে তারা সচেতনভাবে সুসংগঠিত বাক্য বলতে আরম্ভ করে, সেই পর্যায়েই মনুষ্য শিশুরা ভাষিক দক্ষতায় এপ (Ape) জাতীয় প্রাণীদের ছাড়িয়ে যায়।

যদিও দ্বিতীয় ভাষা অর্জন বলতে আক্ষরিকভাবে মাতৃভাষা অর্জনের পরে অপর একটি ভাষা অর্জনকে বোঝায়, প্রায়শই এই পরিভাষাটি দিয়ে বয়ঃসন্ধিকালের পরে দ্বিতীয় একটি ভাষা অর্জনের ঘটনাকে বোঝানো হয়ে থাকে। শিশুরা একাধিক ভাষা অর্জনে তেমন কোন কষ্টের সম্মুখীন হয় না। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পরে দ্বিতীয় কোন ভাষা শিখতে মানুষকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রায়শই সেই ভাষাতে সে উচ্চ স্তরের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। মানুষ যদি দ্বিতীয় ভাষাটি বক্তা সম্প্রদায়ে ও তাদের সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়, তবেই সে ভাষাটি সবচেয়ে সফলভাবে আয়ত্তে আনতে পারে। এছাড়া যেসমস্ত সংস্কৃতিতে দ্বিতীয় ভাষা শেখার উপর জোর দেওয়া হয়, সেখানেও দ্বিতীয় ভাষা অর্জন সহজ হয়। উদাহরণস্বরূপ আফ্রিকান বহু দেশে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি অর্জনের ঘটনাকে উল্লেখ করা যায়।

দ্বিভাষিকতা বলতে দুইটি ভাষা দক্ষভাবে প্রয়োগের ক্ষমতা এবং বহুভাষিকতা বলতে দুইয়ের বেশি ভাষার দক্ষ প্রয়োগের ক্ষমতাকে বোঝায়। বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলেই দ্বিভাষিকতা প্রচলিত। দ্বিভাষী বা বহুভাষী মানুষদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার দক্ষতার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়: কেউ হয়ত একটি ভাষায় ভাল লিখতে এবং অপরটিতে ভাল বলতে পারেন, ইত্যাদি।

মানুষের মুখে মুখে বলা বা কথা বলার নতুন উপায় আবিষ্কারের ফলে সকল ভাষাতেই পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তন এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে এমনকি অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যেও স্থানান্তরিত হয়। ধ্বনিগত দিক থেকে শুরু করে শব্দভান্ডার, অঙ্গসংস্থানবিদ্যা, পদবিন্যাস ও বক্তৃতায় ভাষার পরিবর্তন হয়ে থাকে। যদিও ভাষার এই পরিবর্তনকে শুরুর দিকে নেতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো এবং ভাষা বিষয়ক বক্তারা মনে করতেন এই পরিবর্তনের ফলে ভাষা ব্যবহারের বিনাশ হচ্ছে বা মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে, তবু এই পরিবর্তন প্রাকৃতিক উপায়ে সংঘটিত হয় এবং তা এড়ানো দুস্কর।

পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট শব্দ বা সম্পূর্ণ ধ্বনিগত পদ্ধতিতে প্রভাব দেখা যায়। শব্দগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে অন্য কোন শব্দ বা ধ্বনিগত বৈশিষ্ট দিয়ে একটি শব্দকে পুনঃস্থাপন, প্রভাবিত হওয়ার শব্দ সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কিংবা যেখানে কোন শব্দ ছিল না সে স্থানে নতুন কোন শব্দ যুক্ত করা। যেমন - নিজেই নিজের ছবি তোলাকে সেলফি বলা হয়ে থাকে, যা পূর্বে ছিল না।

বিশ্বের ১১টি সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা হল চীনা, ইংরেজি, হিন্দি-উর্দু, স্পেনীয়, আরবি, পর্তুগিজ, রুশ, বাংলা, জাপানি, জার্মান ও ফরাসি। চীনা ও জাপানি ভাষা ব্যতীত বাকি ৯টি ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং বিশ্বের ৪৬% মানুষ এই সব ভাষায় কথা বলেন।

সবচেয়ে বেশি ভাষার আঁতুড়ঘর দুটি দেশ: পাপুয়া নিউ গিনি, যেখানে ৮৫০টিরও বেশি ভাষা রয়েছে; অপরটি ইন্দোনেশিয়া, যেখানে ৬৭০টি ভাষা লোকমুখে ফেরে। মহাদেশের বিচারে বিশ্বের ৬০০০টির মধ্যে ১৫ শতাংশ ভাষায় কথা বলা হয় দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকায়, আফ্রিকায় ৩০ শতাংশ, এশিয়াতেও শতাংশের হিসেব ৩০, সবচেয়ে কম ইউরোপে, সেখানে মাত্র ৩ শতাংশ।

এদের মধ্যে অনেকগুলিই ভাষাই পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। আবার অনেকগুলি ভাষা আছে যেগুলি একটিই ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষই ব্যবহার করতেন। বংশধরদের অভাবে সেই ভাষা শেষ হয়ে গিয়েছে।

প্রতিনিয়ত ভাষা ও ভাষায় শব্দের ব্যবহার পাল্টে যাচ্ছে। অনেক ভাষা অস্তিত্ব রক্ষায় অন্যের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে খর্ব হচ্ছে ভাষার স্বাতন্ত্র্যতা। সমীক্ষা বলছে, প্রতি ১৫ দিনের একটি করে ভাষা মুছে যাচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে। কয়েকটি ভাষা অবশ্য সরকারী বদান্যতায় স্বমহিমায় ফিরেও এসেছে। যেমন ওয়েলস, মাওরির মত ভাষা সরকারী আনুকূল্য পেয়েছে।

ইশারা ভাষা বা সাংকেতিক ভাষা বা প্রতীকী ভাষা (ইংরেজি: Sign language) বলতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশেষ করে হাত ও বাহু নড়ানোর মাধ্যমে যোগাযোগ করার পদ্ধতিকে বোঝানো হয়। মুখের ভাষাতে যোগাযোগ করা অসম্ভব বা অযাচিত হলে এই ভাষা ব্যবহার করা হয়। সম্ভবত মুখের ভাষার আগেই ইশারা ভাষার উদ্ভব ঘটে। মুখের বিকৃত ভঙ্গিমা, কাঁধের ওঠানামা কিংবা আঙুল তাক করাকে এক ধরনের মোটা দাগের ইশারা ভাষা হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে প্রকৃত ইশারা ভাষাতে হাত ও আঙুল দিয়ে সৃষ্ট সুচিন্তিত ও সুক্ষ্ম দ্যোতনাবিশিষ্ট সংকেত সমষ্টি ব্যবহৃত হয়, এবং এর সাথে সাধারণত মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তিও যুক্ত করা হয়। মূক ও বধির লোকেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইশারা ভাষার ব্যবহার করে থাকেন




#Article 25: উত্তর আমেরিকা (2927 words)


উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর উত্তর ও পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত একটি মহাদেশ। একে কখনো কখনো আমেরিকার উত্তর উপমহাদেশও ধরা হয়।  মহাদেশটি উত্তরে উত্তর মহাসাগর, পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর,  দক্ষিণে ও পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, এবং দক্ষিণ-পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয়ান সাগর পরিবেষ্টিত।

উত্তর আমেরিকার আয়তন ২৪,৭০৯,০০০ বর্গ কি.মি. (৯,৫৪০,০০০ বর্গ মাইল), যা পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় ৪.৮% এবং ভূ-পৃষ্ঠের ১৬.৫%। ২০০৭ সালে এই মহাদেশে প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ কোটি। আয়তনের দিক থেকে উত্তর আমেরিকা এশিয়া ও আফ্রিকার পরে ৩য় বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার বিচারে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের পরে ৪র্থ বৃহত্তম মহাদেশ।

২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে, নিকটবর্তী ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চলসহ উত্তর আমেরিকার জনসংখ্যা ছিল ৫৬৫ মিলিয়ন। অন্যভাবে বলা যায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭.৫ ভাগ।

সর্বশেষ বরফ যুগের সময় বেরিং ভূসেতু অতিক্রম করে উত্তর আমেরিকাতে প্রথম মানব বসতি শুরু হয়। তথা-কথিত প্রত্ন-ভারতীয় যুগের সমাপ্তি হয়, প্রায় ১০,০০০ বছর পূর্বে মধ্য-ভারতীয় যুগের শুরুতে। ধ্রুপদী যুগ ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ১৩তম শতাব্দী পর্যন্ত স্হায়ী হয়েছিল। প্রাক-কলাম্বীয় যুগের সমাপ্তি ঘটে ইউরোপীয়দের আগমনের সাথে সাথে, আবিষ্কার যুগ এবং আধুনিক যুগের শুরুতে। বর্তমান যুগের সাস্কৃতিক ও জাতিগত বিন্যাসে  ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক, আদিবাসী আমেরিকান, আফ্রিকান দাস এবং তাদের বংশধরদের প্রভাব বিদ্যমান। তন্মধ্যে মহাদেশটির উত্তরাংশে ইউরোপীয় প্রভাব এবং দক্ষিণাংশে আদিবাসী আমেরিকান ও আফ্রিকান প্রভাব সুস্পষ্ট। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে অধিকাংশ উত্তর আমেরিকানরা মূলত ইংরেজি, স্পেনীয় এবং ফরাসি ভাষায় কথা বলে। তাছাড়া সেখানকার সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো সাধারণত পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে।

জার্মান মানচিত্রবিদ মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার এবং ম্যাথিয়াস রিংম্যান, ইতালীয় পরিব্রাজক আমিরিগো ভেসপুচ্চির নামানুসারে এই অঞ্চলটির নামকরণ করেন দ্যা আমেরিকাস। ভেসপুচ্চি ১৯৪৭ এবং ১৫০২ সালের কোন এক সময়ে দক্ষিণ আমেরিকা পরিভ্রমণ করেন, তিনি ছিলেন প্রথম ইউরোপিয়ান পরিব্রাজক যিনি আমেরিকা এসেছিল। তার মতে, আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র ভূমি যেটি ইউরোপিয়ানদের কাছে অজানা ছিল। ১৫০৭ সালে, ওয়াল্ডসিমুলার প্রদত্ত পৃথিবীর মানচিত্রে তিনি বর্তমান দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল অংশটিকে সর্বপ্রথম আমেরিকা নামকরণ করেন। তিনি তার কসমোগ্রাফি ইনট্রোডাকটো বইয়ে এই নামকরণের কারণ যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা সহ বর্ণনা করেন এভাবে:

  (অর্থঃ পরিব্রাজক ্আমেরিকাস হতে বর্ণিত .. এটি ছিল আমেরিকাসের ভূমি, নাম আমেরিকা।)।

ওয়াল্ডসিমুলারের নামকরণের পর এটা নিয়ে আর কেউ আপত্তি জানায়নি। যদিও তিনি ভেসপুচ্চির ল্যাটিন নামানুসারে (আমেরিকাস ভেসপুচ্চিয়াস), নামকরণ করেছিলেন তথাপি ইউরোপা, এশিয়া এবং আফ্রিকার মতো স্ত্রীবাচক নামকরণ করে আমেরিকা নামে বদলে ফেলা হয়।

পরবর্তিতে অন্যান্য মানচিত্রবিদরা উত্তরের শেষ বিন্দু পর্যন্ত মহাদেশের নাম আমেরিকা প্রদান করে। ১৫৩৮ সালে, জেরার্ড মার্কেটোর তার প্রণিত মানচিত্রে পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধের পুরোটাকেই আমেরিকা নামে চিহ্নিত করেন।

আমেরিকার নামকরণ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে আমেরিকার নামকরণ আমেরিগো ভেসপুচ্চির নামানুসারে হয়েছে, যদিও এই তত্ত্বে অনেকে বিশ্বাসী নয়। ১৯৪৯ সালে, রিকার্ডো পাল্মা একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, মধ্য আমেরিকার আমেরিক পর্বতমালা এবং দক্ষিণ আমেরিকা উভয়য়েরই আবিস্কারক ভেসপু্চ্চি যা কিনা ক্রিস্টোফার কলোম্বাস এর আবিস্কারের সাথে মিলে গেছে।

আলফ্রেড ই. হুডের ১৯০৮ সালের তত্ত্ব মতে- মহাদেশগুলোর নামকরণ করা হয় রিচার্ড আমরিক নামের এক ব্রিস্টলের অধিবাসী বণিকের নামানুসারে, কেননা তিনি ১৪৯৭ সালে জন কবেট এর ইংল্যান্ড থেকে নতুন এলাকা আবিস্কারের প্রকল্পে অর্থায়ন করেন। আরেকটি বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বলা হয় আমেরিকার নামকরণ করা হয়েছিল একজন স্পানিশ নাবিক যিনি কিনা প্রাচিন ভিসিগোথিক গোষ্ঠীর আমেরিক। আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয় আদিবাসী আমেরিকান ভাষার শব্দ থেকেই মহাদেশটির নামকরণ করা হয়েছে।

ইরানসহ বেশকিছু রোমান ভাষাভাষী সংস্কৃতিতে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ বলতে বোঝান হয়ে থাকে  মূলত কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং মাঝে মাঝে গ্রীনল্যান্ড, সেইন্ট প্যারি এট মিক্যুইলন এবং বারমুডাকে।

উত্তর আমেরিকাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে ডাকা হত। যেমন স্পেনীয় নর্থ আমেরিকা(নিউ স্পেন) ছিল উত্তরাঞ্চলীয় আমেরিকার পূর্বনাম, এবং এটি ছিল মেক্সিকোর প্রথম সাংবিধানিক নাম।

ভৌগলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশটি বেশকিছু অঞ্চল এবং উপঅঞ্চলে বিভক্ত। এদের মধ্যে সাস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং ভৌগোলিক অঞ্চল অবস্থিত। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ মূলত বিভিন্ন ট্রেড ব্লক দিয়ে গঠিত, যেমন:  নর্থ আমেরিকান ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ব্লক এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান ট্রেড   অ্যাগ্রিমেন্ট। ভাষাগত এবং সাস্কৃতিকভাবে, মহাদেশটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় অ্যাঙ্গলো-আমেরিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকা। অ্যাঙ্গলো-আমেরিকা বলতে বুঝায় উত্তরাঞ্চলীয় আমেরিকা, বেলিজ, এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ সাথে ইংরেজি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী(যদিও উপআঞ্চলিক এলাকা, যেমন লুইজিয়ানা এবং কিউবিক, আর ফ্রান্সোফনিক জনগোষ্ঠী এর আওতাধীন নয়।)

উত্তর আমেরিকা মহাদেশটির দক্ষিণাংশকে দুটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল। একইভাবে মহাদেশটির উত্তরাংশকেও কিছু অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকার সংঙ্গানুযায়ী পুরো মহাদেশটিকেই বোঝায়। পাশাপাশি উত্তর আমেরিকা বলতে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং গ্রীনল্যান্ডকেও বোঝায়।

নর্দান আমেরিকা পরিভাষা দ্বারা বোঝায় পুরো উত্তরাঞ্চলীয় দেশসমূহ এবং উত্তর আমেরিকার অধীনস্থ অঞ্চলসমূহসহ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, গ্রীনল্যান্ড, বারমুডা, এবং সেন্ট প্যারি ও ম্যাকুইলন। যদিও খুব কম ব্যবহ্ত, মিডল আমেরিকা বলতে মধ্য পশ্চিম আমেরিকা অর্থাৎ মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং মেক্সিকোকে বোঝায় না।

মহাদেশটির সর্ববৃহৎ দেশ কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সুনির্দিষ্ট অঞ্চল। যেমন কানাডার অঞ্চলগুলো হলো ব্রিটিশ কলম্বিয়া কোস্ট, কানাডিয়ান প্রেইরি, মধ্য কানাডা, আটলান্টিক কানাডা এবং উত্তর কানাডা। এই অঞ্চল গুলোর আবার কিছু উপাঞ্চল আছে। তেমনি ইউএস পরিসংখ্যান ব্যুরো মতে যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চলগুলো হলো: নিউ ইংল্যান্ড, মিড-আটলান্টিক, ইস্ট নর্থ সেন্ট্রাল স্টেস্টস্, ওয়েস্ট নর্থ সেন্ট্রাল স্টেস্টস্, সাউথ আটলান্টিক স্টেস্টস্, ই্স্ট সাউথ সেন্ট্রাল স্টেস্টস্, ওয়েস্ট সাউথ সেন্ট্রাল স্টেস্টস্, মাউন্টেইন স্টেস্টস্ এবং প্যাসিফিক স্টেস্টস্। দেশ দুটির মধ্যবর্তি অঞ্চলটি হলো গ্রেট লেক রিজিওন। প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট এবং গ্রেট লেক মেগারিজিওন এর মধ্যর্বতি মেগাপলিস গুলো মূলত কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশ নিয়েই গড়ে উঠেছে।

নিচের  ৪৮টি মার্কিন রাজ্যকে পাঁচটি প্রাকৃতিক প্রদেশে ভাগ করা যায়:

আলাস্কার বেশির ভাগ অঞ্চলই কর্ডিলেরা, অন্যদিকে হ্ওায়াইয়ের বেশির ভাগ দ্বীপ নিওজিন আগ্নেয়শিলার উদগিরনে তৈরী একটি উষ্ণস্থান।

অর্থনৈতিক ভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা হলো উত্তর আমেরিকার  সবচেয়ে ধনী এবং উন্নত দেশ, এরপরেই আছে মেক্সিকো, যেটি নতুন শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত। মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশ গুলোতে বৈচিত্রপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানব উন্নতি সূচক বিদ্যমান। উদাহরন স্বরূপ, ছোট ছোট ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর (যেমনঃ বার্বাডোস, ট্রিনিদাদ এন্ড টোবাকো এবং অ্যান্টিগুয়া এন্ড বারমুডা) জিডিপি (পিপিপি) মেক্সিকোর চেয়েও বেশি, কারণ এসব দেশগুলোর জনসংখ্যা অনেক কম।  অন্যদিকে পানামা এবং কোস্টারিকার মানব উন্নতি সূচক এবং জিডিপি অন্যান্ন ক্যারিবিয়ান দেশ গুলোর তুলনায় বেশী। উপরন্তু, গ্রীনল্যান্ডের খনিজ তেল এবং অন্যান্ন দামি খনিজদ্রব্য থাকা স্বত্ত্বেও দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে ডেনমার্কের মাছ ধরা, পর্যটন ইত্যাদির ওপর নির্ভর করতে হয়, কেননা গ্রীনল্যান্ডের খনিজদ্রব্যগুলো এখনও উত্তোলনের উদ্দোগ নেওয়া হয়নি, যদিও দ্বীপাঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে উন্নত।।

জনসংখ্যার ভিত্তিতে উত্তর আমেরিকায় অনেক জাতিগত বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়। এখানকার প্রধান তিনটি  জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম হল ককেশিয়ান, মেস্টিজো এবং কৃষ্ণাঙ্গরা। অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মধ্যে ইন্ডিজিনিয়াস আমেরিকান এবং এশিয়ানরা উল্লেখযোগ্য।

উত্তর আমেরিকার প্রধান ভাষা গুলোর মধ্যে অন্যতম হল ইংরেজি, স্প্যানিস এবং ফ্রেঞ্চ। গ্রীনল্যান্ড এবং এর আশেপাশের অঞ্চল গুলোর প্রধান ভাষা ডেনিস, অন্যদিকে ডাচ ক্যারিবিয়ানরাও স্থানীয় ভাষা হিসেবে ডেনিস ভাষা ব্যবহার করে। অ্যাঙ্গো-আমেরিকান শব্দটি ব্যবহার করা হয় সেই সব দেশ সমূহকে বোঝাত যাদের প্রধান ভাষা ইংরেজি: বিশেষত কানাডা (ইংরেজি এবং ফ্রেঞ্চ সেখানকার দুটি সরকারী ভাষা) এবং যুক্তরাষ্ট্র, এছাড়াও মধ্য আমেরিকা এবং ক্রান্তীয় দেশসমূহকে (যেমন কমনওয়েলথ ক্যারিবিয়ান)। ল্যাটিন আমেরিকা বলতে বোঝানো হয় সাধারনত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলকে (প্র্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের অঞ্চল), যেখানে ল্যাটিন, স্প্যানিস এবং পর্তূগীজ ভাষা হতে উদ্ভূত রোমান ভাষা প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত। এসব অঞ্চল গুলো হলো: মধ্য আমেরিকার কিছু দেশ (সবসময় ইংরেজি যাদের প্রধান ভাষা নয়), ক্যারিবিয়ানের কিছু দেশ (ডাচ, ইংরেজি এবং ফেঞ্চ ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহ বাদে), মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকার বেশির ভাগ অঞ্চল (গায়ানা, সুরিনাম এবং ফ্রেঞ্চ গুইয়ানা (ফ্রান্স) এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপূঞ্জ(ব্রিটিশ)।

ফেঞ্চ ভাষাটি উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ভাষা, এমনকি কিছু কিছু ধর্মে এই ভাষাটি্কে মর্যাদার আসনে অধীন করা হয়েছে। কানাডার ২টি সরকারী ভাষা। কিউবিক প্রদেশের প্রধান ভাষা ফেঞ্চ, সেখানকার ৯৫% মানুষ হয় ফ্রেঞ্চ অথবা ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। অন্যদিকে নিউ ব্রুন্সইউক প্রদেশে ইংরেজির পাশাপাশি ফেঞ্চ প্রধান ভাষা। অন্যান্য ফেঞ্চ ভাষাভাষী অঞ্চল গুলো হলোঃ অন্টারি‌ও প্রদেশ (সেখানকার সরকারী ভাষা ইংরেজি হলেও ৬০০,০০০ মানুষের ভাষা ফ্রেঞ্চো-অন্টারিয়ান), ম্যানিটোবা প্রদেশ (সেখানকার ইংরেজির পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ সরকারী ভাষা), ফ্রেঞ্চ ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং সেইন্ট প্যারি এট মিকুইলন, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা (এখানে ফ্রেঞ্চ একটি সরকারী ভাষা)। হাইতিকে ফ্রেঞ্চ ভাষা-ভাষীদেশ বলা যায় ঐতিহাসিক কারণে যদিও সেখানকার লোকেরা ফ্রেঞ্চের পাশাপাশি ক্রিওলি ভাষাতেও কথা বলে। একইভাবে ইংরেজির পাশাপাশি ফেঞ্চ এবং ফ্রেঞ্চ অ্যান্টিলিয়ান ক্রিওলি ভাষাতে কথা বলে সেন্ট লুসিয়া এবং ডমিনিকার কমনওয়েলথভূক্ত অঞ্চলসমূহ।

২০১২ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপানুযায়ী উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ ধর্ম খ্রিষ্টান। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর প্রায় ৭৭.৪% মানুষের ধর্ম খ্রিষ্টান। তাছাড়া এই মহাদেশের বাকি ২৩ টি দেশের বেশিরভাগ মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে  বেশী, প্রায় ২৪৭ মিলিয়ন (৭০%) খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের আবাসস্থল। যদিও কিছু কিছু দেশে মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশী(শতকরা হারে) খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বসবাস। ব্রাজিলের পর মেক্সিকোই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী  ক্যাথলিক খ্রিষ্টান জনগোষ্টির আবাসস্থল।

এছাড়া কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৭.১% মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়(নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদীসহ)। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার যথাক্রমে ২২.৮% এবং ২৩.৯% মানুষের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে উদাসিন( অর্থাৎ তারা সুনির্দিষ্ট কোন ধর্মের অণুসারী নয়)। 

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর প্রায় ৬ মিলিয়ন (১.৮%) মানুষ ইহুদি, প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন (১.১%) মানুষ বৌদ্ধ এবং প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন (১%) মানুয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস যুক্তরাষ্ট্র (৫.৪মিলিয়ন), কানাডা (৩৭৫,০০০) এবং মেক্সিকোতে (৬৭,৪৭৬)। উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বেশী ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস (প্রায় ২.৭ মিলিয়ন বা ০.৯%) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অন্যদিকে কানাডায় প্রায় ১ মিলিয়ন ( মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.২%) মুসলিম বসবাস করে এবং মেক্সিকোতে বসবাস করে ৩,৭০০জন।  ২০১২ সালের ইউ-টি সান ডিয়াগোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ১.২ মিলিয়ন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রায় ৪০% এর বসবাস দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াতে।

মধ্য আমেরিকার প্রধান ধর্ম খ্রিষ্টান  (প্রায় ৯৫.৬%)। বিংশ শতাব্দীর পূর্বপর্যন্ত, ১৬শ শতকে মধ্য আমেরিকায় স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কল্যাণে রোমান ক্যাথলিক ধর্ম অন্যতম প্রধান ধর্মে পরিণত হয়।  ১৯৬০ এর দশকে অন্যান্য খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী বিশেষত প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদীদের ধর্মীয় সংগঠনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, পাশাপাশি ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে উদাসীন মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।তাছাড়া ক্যারিবিয়ান দেশসমূহে প্রধান ধর্ম  খ্রিস্ট ধর্ম (প্রায় ৮৪.৭%)  । ক্যারিবিয়াদের অন্যান্য ধর্মসমূহ হলো  হিন্দুধর্ম, ইসলাম, রাস্তাফারি(জামাইকাতে )এবং অ্যাফ্রো–আমেরিকান ধর্মসমূহ যেমন সান্টারিয়া এবং ভোদোও।

উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ৩১৮.৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে প্রধান জনবহুল দেশ। দ্বিতীয় জনবহুল দেশ মেক্সিকো (জনসংখ্যা প্রায় ১১২.৩২ মিলিয়ন) অন্যদিকে কানাডা তৃতীয় (জনসংখ্যা ৩২.৬২ মিলিয়ন)। কিউবা, ডোমিনিক রিপাবলিক, হাইতি, পুওটারিকো (যুক্তরাষ্ট্রের অধিনস্ত অঞ্চল), জ্যামাইকা এবং ট্রানিদাদ এন্ড টোবাকো ব্যতিত অন্যান্য ক্যারিবিয়ান দেশ গুলোর জনসংখ্যা ১ মিলিয়নের কম। যদিও গ্রীনল্যান্ডের আয়তন বিশাল (২,১৬৬,০০০ বর্গকি.মি.), তবুও সেখানকার জনসংখ্যা ঘনত্ব (০.০৩জন/বর্গকি.মি.) পৃথিবীর সবচেয়ে কম এবং গ্রীনল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৫৫,৯৮৫ জন।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, এবং মেক্সিকোর জনসংখ্যা ঘনত্ব উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বেশী এবং বড় বড় শহর গুলো এই দেশগুলোতেই অবস্থিত। ক্যারিবিয়ান দেশ গুলোতেও বেশকিছু বড় শহর অবস্থিত। উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ শহর যথাসম্ভব মেক্সিকো সিটি এবং নিউ ইয়র্ক্। এই দু’টি শহরই হলো উত্তর আমেরিকার ৮ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যা বসবাসকারী শহর, যদিও আমেরিকা অঞ্চলে এরকম আরো শহর রয়েছে। আয়তনের হিসেবে সবচেয়ে বড় শহর গুলো হলো লস অ্যাঞ্জেলস্, টরেন্টো, শিকাগো, হাভানা, সান্ট ডোমিংগ এবং মন্ট্রিল। যুক্তরাষ্ট্রের সানবেল্ট অঞ্চলসমূহের শহর গুলো (যেমন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, হুস্টন, ফনিক্স, মিয়ামী, আটলান্টা এবং লাস ভেগাস) দ্রুত বর্ধনশীল শহর হিসেবে পরিচিত। ফলশ্রুতিতে শহর গুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ১৯৪৫ দশকের বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী মেক্সিকোর শহরগুলিও দ্রুত বর্ধনশীল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসবের মধ্যে টিযুয়ানা শহর (সান ডিয়াগো সীমান্তবর্তী) এ শহরে পুরো ল্যাটিন আমেরিকার অভিবাসী পাশাপাশি ইউরোপ এবং এশিয়ার অভিবাসীরা অবস্থান গেড়েছে। ফলাফল হিসেবে এসব শহর গুলিতে পানিস্বল্পতা দেখা দিচ্ছে।

উত্তর আমেরিকার দশটি মেট্রোপলিটনের আটটিই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। মেট্রোপলিটন শহর গুলোর জনসংখ্যা ৫.৫ মিলিয়নের বেশি, তেমনি কিছু শহর হলো নিউ ইয়র্ক সিটি মেট্রোপলিটন এলাকা, লস অ্যাঞ্জেলস মেট্রোপলিটন এলাকা, শিকাগো মেট্রোপলিটন এলাকা এবং ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ মেট্রোপ্লেক্স । গ্রেটার মেক্সিকো সিটি হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যবর্তি সর্বাধিক জনবহুল মেট্রোপলিটন শহর । অন্যদিকে কানাডার টরেন্টো মেট্রোপলিটন এলাকা দশটি বৃহৎ উত্তর আমেরিকান মেট্রোপলিটনের মধ্যে অন্যতম যার জনসংখ্যা ছয় মিলিয়ন। কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত এবং মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তবর্তী শহর গুলোতে আন্তর্জাতিক মেট্রোপলিটন শহর গড়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী শহরগুলোর মধ্যে ডেট্রয়েট-উইন্ডসোর এবং সান ডিয়াগো-টিযুয়ানা মেট্রোপলিটন গুলোর বাণিজ্যিক, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক উন্নতি উল্লেখযোগ্য। এসব মেট্রোপলিটন গুলো মিলিয়ন ডলার বাণিজ্যের জন্য বিশেষ উপযোগী। ২০০৪ সালের যোগাযোগ অংশিদারিত্ব গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ডেট্রয়েট-উইন্ডসোর সীমান্ত দিয়ে প্রায় $১৩ বিলিয়ন বাণিজ্য এবং সানডিয়াগো-টিযুয়ানা সীমান্ত দিয়ে $২০ বিলিয়ন বাণিজ্য হয়েছে।
 
উত্তর আমেরিকা মহাদেশ হল মেট্রোপলিটন শহর গুলোর উন্নতির প্রত্যক্ষদর্শী। যুক্তরাষ্ট্রে এগারোটি বড় অঞ্চল  আছে যেগুলো কিনা মেক্সিকো এবং কানাডার সাথে সীমান্ত বিনিময় করে। এই অঞ্চল গুলো হলো অ্যারিজোনা সান করিডোর, কাসাডিয়া, ফ্লোরিডা, ফ্রন্টরেঞ্জ, গ্রেট লেক মেগারিজিয়ন, গালফ কোস্ট মেগারিজিয়ন, উত্তর-পূর্ব মেগারিজিয়ন, উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া, পিডমন্ট আটলান্টিক, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং টেক্সাস ট্রায়াঙ্গেল। কানাডা এবং মেক্সিকোতেও মেগারিজিয়ন রয়েছে। এদের মধ্যে কিউবিক সিটি- উইন্ডসোর করিডোর, গোল্ডেন হর্সহো দুটিকে ধরা হয় গ্রেট লেক মেগারিজিওন এবং মেগাপলিস অব সেন্ট্রাল মেক্সিকো। অন্যদিকে ঐতিহ্যগতভাবে মেগারিজিওন হিসেবে ধরা হয় বোস্টন ওয়াশিংটন ডিসি করিডোরকে। ২০০০ সালের মেগারিজিয়নের বৈশিষ্ট্য অনুসারে গ্রেটলেক মেগাপলিস এর জনসংখ্যা হলো প্রায় ৫৩,৭৬৮,১২৫ জন।

২০১৩ সালের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর জনমিতি অনুসারে উত্তর আমেরিকার প্রধান দশটি মেট্রেপলিটন শহর গুলো হলোঃ

কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বহুমূখী এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এই তিনটি দেশ, এমনকি সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। ২০১৪ সালের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু বার্ষিক আয় (জিডিপি, পিপিপি) ৫৪,৯৮০ ডলার এবং বাকি তিনদেশের তুলনায় অর্থনীতিতে প্রযুক্তিগতভাবেও উন্নত। ২০১০ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির  ৭৬.৭% অবদান সেবাখাতের, ২২.২% অবদান বিভিন্ন শিল্পকারখানার এবং ১.২% অবদান কৃষিখাতের।

কানাডা সেবাখাত, খনি এবং উৎপাদন খাতে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। ২০১৪ সালে ২০১৪ সালের তথ্যমতে, কানাডার মাথাপিছু আয় ছিল ৪৪,৬৫৬ ডলার এবং দেশটির ন্যুনতম জিডিপি ছিল সারা বিশ্বের মধ্যে ১১তম। ২০১০ সালের প্রাক্কলন অনুসারে, কানাডার জিডিপির শতকরা ৭৮ভাগ আসে সেবাখাত থেকে, ২০ ভাগ আসে কলকারখানার উদ্ভূত পণ্য থেকে এবং শতকরা ২ ভাগ আসে কৃষিখাত থেকে। অন্যদিকে ২০১৪ সালের তথ্যমতে, মেক্সিকোর মাথাপিছু আয় ছিল ১৬,১১১ ডলার এবং দেশটির ন্যুনতম জিডিপি ছিল সারা পৃথিবীর মধ্যে ১৫ তম। নতুন একটি শিল্পায়িত দেশ হিসেবে, মেক্সিকো তার অগ্রগতি ধরে রেখেছে আধুনিক এবং পুরাতন কারখানা, কৃষিপ্রযুক্তি এবং সেবাখাতের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে। দেশটির আয়ের প্রধান  উৎসগুলো হলো খনিজ তেল, কারখানাজাত দ্রব্যাদির রপ্তানী, মোটরগাড়ী নির্মাণ, ভারি কারখানা, খাদ্যদ্রব্য, ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেবাখাত।

উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূলত তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। এই তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গুলো হলো: নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এনএএফটিএ), ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি এন্ড কমন মার্কেট(ক্যরিকম) এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান কমন মার্কেট(সিএসিএম)। এই তিনটি অঞ্চলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দুইটি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলো ছাড়াও আরো একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে, নাম কানাডা-কোস্টারিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এটি বাদে বাকি অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত, অবশ্য এই জোন গুলোতে ট্রেড ভূক্ত অন্যান্য দেশসমূহও রয়েছে, যেমন- মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশসমূহ।

নর্থ আমেরিকান ফ্রী ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এনএএফটিএ) হলো পৃথিবীর প্রধান চারটি বাণিজ্যিক অঞ্চলের একটি। ১৯৯৪ সালে এই অঞ্চলটি গঠিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক সমতা এবং দেশগুলোর মাঝে আন্তঃবাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজতর করার লক্ষে। কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইতিমধ্যে একটি দ্বিজাতী বাণিজ্যিক চুক্তি (পৃথিবীর সর্ববৃহৎ) বিদ্যমান রয়েছে, যার নাম কানাডা ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিলেশান, এই চুক্তির আওতায় দেশ দুটি নিজেদের মধ্যে বিনাশুল্কে আমদানি রপ্তানী করে থাকে, এনএফটিএ মেক্সিকোকেও বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার সুবিধা প্রদান করেছে। এই মুক্ত বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে বাণিজ্যকে বিনা শুল্কের পর্যায়ে উন্নিত করেছে। দেশগুলোর মধ্যে এই মুক্ত বাণিজ্যের পরিমাণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে , ২০১০ সালের তথ্য মতে, এনএফটিএ এর তিনটি দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়ে সর্বাধিক ২৪.৩% প্রবৃদ্ধি বা ৭৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌছায়। এনএফটিএ ভূক্ত অঞ্চলসমূহের জিডিপি (পিপিপি)- পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ প্রায় ১৭.৬১৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সাথে বলা যায়,  ২০১০ এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হলো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি, পাশাপাশি দেশটির ন্যুনতম জিডিপির পরিমাণ ১৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এনএএফটিএ দেশ গুলো হলো নিজেদের মধ্যে সর্বাধিক বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশিদার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো মেক্সিকো এবং কানাডার সবচেয়ে বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার, যখন কিনা কানাডা এবং মেক্সিকো হলো নিজেদের তৃতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার।

ক্যারিবিয়ান বাণিজ্যিক অঞ্চল বা ক্যারিকম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৭৩ সালে, ১৫ টি ক্যারিবিয়ান দেশ সমূহের মধ্যে। ২০০০ সালের তথ্য মতে, ক্যারিকমের বাণিজ্যের পরিমাণ দাড়িয়েছে $৯৬ বিলিয়ন। ক্যারিকম দেশগুলো নিজেদের মধ্যে একটি সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করে। বিগত দশক গুলোতে এই বাণিজ্যিক এলাকাটি মূলত মুক্ত বাণিজ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং ক্যারিকম অফিস অব নেগোশিয়েশান (ওটিএন) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দেশগুলোর জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

মধ্য আমেরিকার অর্থনীতিকে একত্রিত করার কাজ শুরু হয় মূলত, ১৯৬১ সালের সেন্ট্রাল আমেরিকান কমন মার্কেট চুক্তির আওতায়; এই চুক্তিটি ছিল প্রথম অর্থনৈতিক চুক্তি, যা কিনা দেশগুলোর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য করা হয়। বর্তমানে এই সেন্ট্রাল আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএএফটিএ) চুক্তির ভবিষ্যত খুব একটা পরিষ্কার নয়। সিএএফটিএ  চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল পাঁচটি মধ্য আমেরিকান দেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ডোমিনিকা রিপাবলিকের মধ্যে। চুক্তিটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এনএএফটিএ এর মতো একটি মুক্ত বাণিজ্যিক অঞ্চল গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডাও এই বাণিজ্যিক অঞ্চলের অংশ। বর্তমানে প্রস্তাবিত কানাডা-সেন্ট্রাল আমেরিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএ৪) এর কাজ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মতোই হবে।

এই দেশগুলো আন্ত:মহাদেশীয় বাণিজ্যিক এলাকার অংশ। মেক্সিকো যেমন কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলার সাথে জি৩ ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে যুক্ত সাথে সাথে ইইউ এর সাথেও চুক্তিবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র কতৃর্ক প্রস্তাবিত এবং রক্ষনাবেক্ষনকৃত বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো  মূলত ট্রান্স-আটলান্টিক ফ্রি ট্রেড এরিয়া এবং ইইউ এর সাথে সম্পর্কিত, অন্যদিকে ইউএস-মধ্যপ্রাচ্য ফ্রি ট্রেড এরিয়া মূলত বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা দেয়, এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক স্ট্যাটেজিক ইকোনমিক পার্টনারশিপ মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান।

পুরো আমেরিকা জুড়ে বিদ্যমান প্যান আমেরিকান হাইওয়ে ছিল প্রায় ৪৮,০০০ কি.মি. (৩০,০০০ মাইল) লম্বা। রাস্তাটিকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো সরকার কখনোই স্বীকৃতি প্রদান করেনি, কেননা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত বরাবর একাধিক সংযোগ সড়ক রয়েছে। তথাপি রাস্তাটি মেক্সিকো থেকে উত্তর আমেরিকার উত্তরের প্রান্তবিন্দু পর্যন্ত প্রায় ২৬,০০০ কি.মি. (১৬,০০০ মাইল) লম্বা।

১৮৬০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম 'আন্তঃমহাদেশীয় রেললাইন' নির্মাণ করে। রেললাইনটি পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো নির্মাণ কাজ শেষ হয়, ১৮৬৯ সালের ১০ মে। সেদিন বিখ্যাত গোল্ডেন স্পাইক অণুষ্ঠানের মাধ্যমে ইউটার প্রমেন্টরি সামিটে উদ্বোধন করা হয়। এই আন্তঃমহাদেশীয় রেললাইনটি পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণ এবং অর্থনীতির জন্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করে এবং পূর্ববর্তি দশকের ওয়াগণ রেলকে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নিত করে। যদিও রেললাইনটি আমেরিকা মহাদেশে দৈর্ঘ্যের দিক দিয়ে পৃথিবীর সর্বাধিক লম্বা রেলপথ ছিলনা।  ১৮৬৭ সালে নির্মিত তৎকালীন কানাডিয়ান গ্রান্ডট্রাঙ্ক রেলওয়ে (জিটিআর)  লম্বা, অন্টারিও থেকে কানাডিয়ান আটলান্টিক প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত সেই রেললাইনটি ছিল পৃথিবীর সর্বাধিক লম্বা রেল লাইন। জিটিআর রেলপথটি অবশ্য পোর্টহুরন (মিশিগান) এবং সেরিনা (অন্টারিও) দিয়েও অতিক্রম করে।

উত্তর আমেরিকার ২৪টি দেশ, অঞ্চল এবং অধীনস্থ অঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্র এবং এর অধীনস্থ অঞ্চল, কানাডা, বারমুডা এবং ১৭টি ক্যারিবিয়ান দেশসমূহের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করার  লক্ষে একটি সমন্বিত টেলিফোন নাম্বারিং প্লান হাতে নেওয়া হয়েছে যার নাম নর্থ আমেরিকান নাম্বারিং প্লান (এনএএনপি)।

কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র একসময় ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলশ্রুতিতে ইংরেজি ভাষাভাষী কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে পারস্পারিক সাদৃশ্য লক্ষণীয়। যদিও গ্রীনল্যান্ডের সংস্কৃতিতে কানাডার ইন্ডিজেনিয়াস জনগনের  সামান্য প্রভাব রয়েছে, তবে ডেনমার্ক ঔপনিবেশিকদের শতবর্ষী শাসনের ফলে প্রবল ডেনিশ প্রভাব বিদ্যমান। স্থানীয় ভাষাভাষী উত্তর আমেরিকানদের মধ্যে স্প্যানিস ঔপনিবেশিক প্রভাব লক্ষনীয়।  মধ্য আমেরিকার দেশসমূহ এবং মেক্সিকোর জনগোষ্ঠির মধ্যে মায়া সভ্যতা এবং ইন্ডিজেনিয়াস জনগনের প্রভাব বিদ্যমান।  মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশ সমূহের স্প্যানিস ভাষাভাষীদের ভূতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের কারণে বেশ মিল খুজে পাওয়া যায়।

উত্তর মেক্সিকো বিশেষকরে মন্ট্রে, টিজুয়ানা, চিউড্যাড ওয়ারেজ এবং মেক্সিক্যালি শহরগুলোর সংস্কৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় জীবনধারা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাজব্যবস্থা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। উপরিউক্ত শহরগুলোর মধ্যে মন্ট্রেকে সবচেয়ে বেশী আমেরিকান শহর বলে ধরা হয়।  যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বেশিরভাগ অভিবাসীগণ দেশসমূহের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী দেশ থেকে আসা। অ্যাগ্রোফোন ক্যারিবিয়ান দেশসমূহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন এবং তাদের ওপর ব্রিটিশ শাসনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক  প্রভাবের প্রত্যক্ষদর্শী। ইংরেজি ভাষাভাষী বেশিরভাগ ক্যারিবিয়ান জনগনই নিজ দেশের বাইরে (প্রবাসে)  অবস্থান করে এবং বাকিরা যারা রয়েছে তারা দেশে অবস্থান বসবাস করে।

নিচের টেবিলে যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর (সর্বাধিক আয়ের ভিত্তিতে) উল্লেখযোগ্য কিছু স্পোর্টস লীগের তালিকা:

সংগঠন এবং চুক্তিসমূহ:




#Article 26: দক্ষিণ আমেরিকা (272 words)


দক্ষিণ আমেরিকা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম মহাদেশ। মহাদেশটির আয়তন ১,৭৮,২০,৯০০ বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ১২%। আয়তনের দিকে থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার পরেই এর স্থান। বিষুবরেখা ও মকরক্রান্তির দুই পাশ জুড়ে এর বিস্তৃতি। মহাদেশটি উত্তরে পানামা স্থলযোটকের মাধ্যমে মধ্য ও উত্তর আমেরিকার সাথে যুক্ত। উত্তরে ক্যারিবীয় সাগর থেকে দক্ষিণে হর্ন অন্তরীপ পর্যন্ত মহাদেশটির দৈর্ঘ্য ৭,৪০০ কিলোমিটার। আর পূর্ব-পশ্চিমে এর সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য, আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত ব্রাজিলের পুন্তা দু সেইক্সাস থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত পেরুর পুন্তা পারিনিয়াস পর্যন্ত, ৫,১৬০ কিলোমিটার।

২০০৬ সালে দক্ষিণ আমেরিকার প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৬০ লক্ষ, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬%। এই মহাদেশে ১২টি রাষ্ট্র আছে। এদের মধ্যে ১০টি রাষ্ট্র লাতিন: আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, এবং ভেনেজুয়েলা। দুইটি রাষ্ট্র লাতিন নয়। এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে গায়ানা যুক্তরাজ্যের এবং সুরিনাম নেদারল্যান্ডসের প্রাক্তন উপনিবেশ ছিল। ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, এবং ভেনেজুয়েলা এই ৯ টি দেশ ছিল স্পেনের উপনিবেশ। এসব দেশের ভাষাও স্পেনিস। ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগিজ, সুরিনামের ভাষা ডাচ এবং গায়ানার ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকাতে ফ্রেঞ্চ গায়ানা বা গুইয়ান নামে ফ্রান্সের একটি জেলা সমমর্যাদার দেপার্ত্যমঁ রয়েছে। এটি এক সময় ফ্রাঞ্চের উপনিবেশ ছিল। মহাদেশটি থেকে বিরাট দূরত্বে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত অনেকগুলি প্রশাসনিক অঞ্চল আছে, যেগুলি দক্ষিণ আমেরিকান বিভিন্ন রাষ্ট্রের অংশ। এদের মধ্যে আছে চিলির হুয়ান ফের্নান্দেস দ্বীপপুঞ্জ ও ইস্টার দ্বীপ, এবং ইকুয়েডরের গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। উপকূলের কাছে অবস্থিত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলির মধ্যে আছে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ব্রাজিলের ফের্নান্দু দি নোরোনিয়া দ্বীপপুঞ্জ। দক্ষিণে আছে যুক্তরাজ্যের ফকল্যাণ্ড দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জটিকে আর্জেন্টিনা ইসলাস মালবিনাস নামে ডাকে এবং এগুলিকে নিজেদের বলে দাবী করে। দক্ষিণ আমেরিকার তটরেখা তুলনামূলকভাবে নিয়মিত প্রকৃতির, তবে একেবারে দক্ষিণে ও দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেক ফিয়ডের্র উপস্থিতির কারণে তটরেখা অত্যন্ত ভগ্ন।




#Article 27: মহাসাগর (648 words)


মহাসাগর (বা মহাসমুদ্র, মহাসিন্ধু) অতি প্রকাণ্ড ও লবণযুক্ত বিপুল জলরাশি যা পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ওসেন শব্দটির উৎস হল 
প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘ওকিআনোজ’ (Ὠκεανός)। স্বীকৃত ৫ টি মহাসাগর : প্রশান্ত, আটলান্টিক, ভারতীয়, আর্টিক, এবং দক্ষিণ। মহাসাগরগুলি একত্রে পৃথিবীর মোট আয়তনের (৩.৬১×১০১৪ বর্গ মিটার) প্রায় ৭০.৯% স্থান দখল করে আছে। এ বিপুল জলরাশি আবার অনেকগুলো মহাসাগর ও ছোট ছোট সমুদ্রে বিভক্ত।

মহাসাগরের অর্ধেকেরও বেশি জায়গার গড় গভীরতা ৩,০০০ মিটারেরও (৯,৮০০ বর্গফুট) বেশি। মহাসাগরের জলের গড় লবণাক্ততা ৩.৫% এবং প্রায় সকল সমুদ্রের গড় লবণাক্ততা ৩% থেকে ৩.৮%৮। বৈজ্ঞানিকেরা হিসেব করে দেখেছেন যে, মহাসাগরে প্রায় ২,৩০,০০০ সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণী রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা নির্ণিত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।

প্রচলিতভাবে আমরা বিভিন্ন ধরনের মহাসাগরের নাম দেখতে পাই। একসময় বর্তমানকালের মহাসাগরগুলোর আন্তঃসংযোগকৃত লবণাক্ত জলরাশি ‘বৈশ্বিক মহাসাগর’ হিসেবে নির্দেশ করতো। মহাসাগর মূলতঃ একটি। এ ধারণাটি অবিচ্ছেদ্য ও পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এবং মুক্ত জলরাশির আন্তঃসংযোগে মহাসাগরীয়বিদ্যার মৌলিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে। 
পাশ্চাত্ত্য ভূগোলবিদরা তাদের নিজেদের সুবিধার্থে মহাসাগরকে ৫টি অংশে বিভক্ত করেছেন। মহাসাগরীয় বিভাজনসমূহ সংজ্ঞায়িত এবং মূল্যায়িত হয়েছে - মহাদেশ, মাটির স্তর এবং অন্যান্য শর্তাবলীর আলোকে। 
সেগুলো হলোঃ-

প্রশান্ত এবং আটলান্টিক মহাসাগর বিষুবরেখা কর্তৃক উত্তরাংশ ও দক্ষিণাংশকে আন্তঃবিভাজন করেছে। ক্ষুদ্রতম এলাকাগুলোয় মহাসাগরকে সাগর, উপসাগর, উপত্যকা, প্রণালী ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে মহাসাগর বলতে সুবিশাল মহাসাগরীয় জলাধারকে বুঝায়। মহাসাগরীয় জলাধার হচ্ছে আগ্নেয়গিরির বাসাল্টের পাতলা স্তর যা পৃথিবীর অগ্নিকুণ্ডস্বরূপ। মহাসাগরীয় প্লেটের কঠিন আবরণের তুলনায় এর আবরণ পুরু হলেও কম ঘণপূর্ণ। এ দৃষ্টিকোণে পৃথিবীতে তিনটি মহাসাগর আছে যা বিশ্ব মহাসাগর, কাস্পিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণ সাগর বা ব্ল্যাক সি নামে পরিচিত। শেষোক্ত দু’টি লওরেসিয়াসহ কাইমেরিয়া এলাকায় একত্রিত হয়েছে। ভূ-মধ্যসাগর ঐ সময়েই মহাসাগর থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, টেকটোনিক প্লেট নড়াচড়ার ফলে জিব্রাল্টার প্রণালী থেকে বিশ্ব মহাসাগরের সাথে সম্পর্কচ্যুত হয়। কৃষ্ণ সাগর বসফরাস প্রণালীর মাধ্যমে ভূ-মধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত হয়। কিন্তু বসফরাস প্রণালীর প্রাকৃতিক খালটি মহাদেশীয় শিলাচ্যুতির কারণে প্রায় ৭,০০০ বছর পূর্বে বিচ্ছিন্ন হয় এবং মহাসাগরীয় সাগরতলের একটি টুকরো জিব্রাল্টার প্রণালীর উদ্ভব ঘটে।

ভূ-মণ্ডলে মহাসাগরের বিপুল প্রভাব লক্ষ করা যায়। মহাসাগরীয় বাষ্পীভবন যা পানিচক্রের একটি ধাপ, তা অনেক বৃষ্টিপাতের উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত তা মহাসাগরীয় তাপমাত্রা জলবায়ু ও বাতাসের গতিপথের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। এটি ভূ-স্থিত জীবন ও জীবনধারায় বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। মহাসাগর গঠনের ৩ বিলিয়ন বছরের মধ্যে ভূ-স্থিত জীবন গড়ে উঠে। উপকূলের গভীরতা এবং দূরত্ব উভয়ই বিরাটভাবে প্রভাবান্বিত করেছে বলেই সাগর উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা জন্মেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রাণীকূল বসবাস করছে।

বৈশ্বিক মহাসাগরের আয়তন প্রায় ৩৬১*১০৬ বর্গকিলোমিটার (১৩৯*১০৬ বর্গমাইল)। প্রতি ঘণকিলোমিটারে পানির আয়তন হচ্ছে ১,১১১ কিলোমিটার। মহাসাগরের গড় গভীরতা ৩,৭৯০ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১০,৯২৩ মিটার। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জলরাশি ৩০০০ মিটারেরও গভীরে রয়েছে। 
মোট বাষ্পীভবন হচ্ছে ১.৪*১০২১ কেজি যা পৃথিবীর মাত্র ০.০২৩%। ৩ শতাংশের কম স্বাদুপানি; বাকী লবণাক্ত পানির প্রায় সবই মহাসাগরের।

সাধারণের ধারণা যে, মহাসাগরের পানির রং নীল। এছাড়াও, পানিতে খুবই কম পরিমাণে নীল রং থাকে এবং যখন বিপুল জলরাশিকে একত্রে রাখা হয় তখনই মহাসাগরের পানি নীল দেখায়। এছাড়াও, আকাশে নীল রংয়ের প্রতিফলন এর জন্য দায়ী, যদিও তা মূখ্য বিষয় নয়। মূল কারণ হচ্ছে - পানির পরমাণুগুলোতে লাল রংয়ের নিউক্লিয়ার কণা থাকে যা আলো থেকে আসে এবং প্রকৃতি প্রদত্ত রংয়ের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ইলেকট্রনিক, ডাইনামিক বিষয়গুলোর তুলনায় প্রাকৃতিক অণুকম্পনকে ফলাফলকে ধরা হয়।

নাবিক এবং অন্যান্য নৌ-বিদদের প্রতিবেদনে জানা জায়, মহাসাগরে প্রায়শঃই দৃশ্যমান রক্তিম আভা, আলোকছটা মাইলের পর মাইল রাত্রে দেখা যায়। ২০০৫ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেন যে, আলোকচিত্রের মাধ্যমে গ্লো’র উপস্থিতি তারা নিশ্চিত করেছেন। এটি জৈব-আলোকছটার সাহায্যে ঘটতে পারে।

মহাসাগরে ভ্রমণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অতিপ্রাচীনকাল থেকেই নৌকা যোগাযোগের একটি প্রধান পরিবহন হিসেবে সু-খ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে জলের নীচ দিয়েও ভ্রমণ করা সম্ভবপর হয়েছে। গভীরতম স্থান হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ হিসেবে নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপের মারিয়ানা খাতের স্থান নির্ণিত হয়েছে। এর গভীরতা ১০,৯৭১ মিটার। ব্রিটিশ নৌযান চ্যালেঞ্জার-২ ১৮৫১ সালে স্থানটি জরিপ করে এবং সবচেয়ে গভীর স্থানকে নামকরণ করেছে ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ হিসেবে। ১৯৬০ সালে ট্রিস্ট দু’জন ক্রু-সহ ‘চ্যালেঞ্জার-২’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছতে সফলকাম হন।
অধিকাংশ মহাসাগরের কেন্দ্রস্থল এখনো আবিস্কৃত হয়নি এবং স্থানও নির্ণিত হয়নি। ১৯৯৫ সালে মহাকর্ষীয় সূত্র প্রয়োগ করে ১০ কিলোমিটারেরও অধিক বৃহৎ ভূ-চিত্রাবলীর দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে।

মহাসাগরবিশারদরা ভূ-গঠন এবং জীবনধারার উপযোগী পরিবেশকে উপজীব্য করে মহাসাগরকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করেছেন।




#Article 28: উত্তর মহাসাগর (1149 words)


উত্তর মহাসাগর বা সুমেরু মহাসাগর উত্তর গোলার্ধের সুমেরু অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের ক্ষুদ্রতম এবং সর্বাপেক্ষা কম গভীর একটি মহাসাগর। এটি পৃথিবীর পাঁচটি প্রধান মহাসাগরের অন্যতম। ইন্টারন্যাশানাল হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশন (আইএইচও) তথা আন্তর্জাতিক জললেখচিত্রন সংস্থা এটিকে মহাসাগরের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে কোনো কোনো সমুদ্রবিদ এটিকে সুমেরু ভূমধ্যসাগর (Arctic Mediterranean Sea) বা সুমেরু সাগর (Arctic Sea)। তাদের মতে এটি আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ভূমধ্যসাগর। অন্যমতে, উত্তর মহাসাগর সব মহাসাগরের সমষ্টি বিশ্ব মহাসাগরের সর্ব-উত্তরে অবস্থিত অংশ।

উত্তর মহাসাগরের প্রায় সমগ্র অংশই ইউরেশিয়া ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশ দ্বারা বেষ্টিত। বছরের অধিকাংশ সময় এই মহাসাগরের অংশবিশেষ সামুদ্রিক বরফে ঢাকা থাকে। শীতকালে সম্পূর্ণ মহাসাগরটিই বরফে ঢাকা পড়ে যায়। উত্তর মহাসাগরের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা ঋতু অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়। সমুদ্রের বরফের আবরণীর গলন ও জমাট বাঁধার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। পাঁচটি প্রধান মহাসাগরের তুলনায় এই মহাসাগরের জলের লবণাক্ততা কম। এর কারণ, বাষ্পীভবনের নিম্ন হার, বিভিন্ন বড়ো ও ছোটো নদী থেকে এসে মেশা মিষ্টি জলের প্রবাহ এবং পার্শ্ববর্তী উচ্চ লবণাক্ততাযুক্ত মহাসাগরগুলির সঙ্গে সীমাবদ্ধ সংযোগ ও বহির্গমন স্রোত। গ্রীষ্মকালে প্রায় ৫০% বরফ গলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশানাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টার (এনএসআইডিসি) উপগ্রহ তথ্যের মাধ্যমে গড় সময়কাল ও নির্দিষ্ট পূর্ববর্ষের সঙ্গে তুলনা করার জন্য উত্তর মহাসাগরের বরফাবরণী ও বরফ গলনের দৈনিক তথ্য রাখে।

ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাসে উত্তর মেরু অভিযানের নজির বিশেষ নেই। এই অঞ্চলের ভূগোল সম্পর্কে সঠিক ধারণাও সে যুগে কারো ছিল না। মাসিলিয়ার পাইথিয়াস ৩২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তরদিকে এসচ্যাট থাল নামে একটি স্থানে যাত্রার একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এই অঞ্চলে সূর্য প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য অস্ত যেত এবং জল এখানে এমন এক থকথকে পদার্থে পরিণত হত যার উপর দিয়ে হাঁটাও যেত না, আবার নৌকা চালানোও যেত না। সম্ভবত তিনি গ্রাওলার বা বার্গি বিটস নামে পরিচিত হালকা সামুদ্রিক বরফের কথা লিখেছেন। তার বিবরণীর থাল সম্ভবত আইসল্যান্ড। যদিও কোনো কোনো মতে তিনি নরওয়ের কথা লিখেছেন।

প্রথম যুগের মানচিত্রকারেরা সঠিকভাবে জানতেন না যে, উত্তর মেরু সংলগ্ন অঞ্চলটি জলভাগ (যেমন, মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলারের ) না স্থলভাগ (যেমন, জোহানেস রুইসের , গেরার্ডাস মেরক্যাটরের )। ক্যাথে (চীন) পৌঁছানোর একটি উত্তরমুখী রাস্তা আবিষ্কারের প্রত্যাশায় অত্যুৎসাহী একদল নাবিকের আগ্রহে শেষপর্যন্ত এই অঞ্চলটিকে জলভাগ আখ্যা দেওয়া হয়। ১৭২৩ সাল নাগাদ জোহান হোম্যান প্রমুখ মানচিত্রকারেরা তার মানচিত্রের উত্তর সীমায় একটি Oceanus Septentrionalis আঁকতে শুরু করেন।

এই যুগে সুমেরু বৃত্তের ভিতরে অল্প কয়েকটি অভিযান হলেও, তা কয়েকটি ছোটো দ্বীপেই সীমাবদ্ধ ছিল। নোভায়া জেমল্যা দ্বীপে একাদশ শতাব্দীতে এবং স্পিটসবার্গেন দ্বীপে ১৫৯৬ সালে অভিযান চলে। কিন্তু এই সব দ্বীপ বরফ-পরিবৃত থাকায় এগুলির উত্তরসীমা সে সময় জানা যায়নি। সমুদ্র-মানচিত্র নির্মাতারা কোনো কোনো কল্পনাপ্রবণ মানচিত্রকারের ধারণার ধার ধরতেন না। তারা মানচিত্রে এই অঞ্চলটিকে শূন্য রেখে দিতেন। কেবল জ্ঞাত উপকূলরেখাটির স্কেচ আঁকতেন।

বরফের সঞ্চরণশীল ব্যারিয়ারের ওপারে কী আছে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকায়, এই সম্পর্কে নানারকম গালগল্প ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড সহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে মুক্ত মেরু সাগর ধারণাটি জনপ্রিয়তা পায়। ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল্টির দীর্ঘকালের সেকেন্ড সেক্রেটারি জন বারো এই সমুদ্রের সন্ধানে ১৮১৮ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে একাধিক মেরু অভিযান প্রেরণ করেছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৫০-এর ও ১৮৬০-এর দশকে এলিশা কেন ও আইজ্যাক ইজরায়েল হায়েস নামে দুই অভিযাত্রী এই রহস্যময় বিরাট জলভাগ দেখেছেন বলে দাবি করেন। এই শতাব্দীর শেষভাগেও ম্যাথিউ ফনটেইন মুরে তার দ্য ফিজিক্যাল জিওগ্রাফি অফ দ্য সি (১৮৮৮) গ্রন্থে মুক্ত মেরু সাগরের এক বৃত্তান্ত অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে সকল অভিযাত্রীই, যাঁরা মেরু অঞ্চলের দিকে আরও বেশি অগ্রসর হয়েছিলেন, তারা জানান যে মেরু অঞ্চলের বরফের টুপিটি বেশ মোটা এবং তা সারাবছরই বজায় থাকে।

১৯৩৭ সাল নাগাদ সোভিয়েত ও রাশিয়ান মানবচালিত ভাসমান বরফ স্টেশনগুলি উত্তর মহাসাগরের উপর ব্যাপক নজরদারি শুরু করে। এই সব ভাসমান বরফের উপর বৈজ্ঞানিক বসতিও স্থাপিত হয়।

উত্তর মহাসাগর মোটামুটি একটি বৃত্তাকার বেসিন জুড়ে অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় , যা রাশিয়ার প্রায় সম আয়তনবিশিষ্ট। এর উপকূলরেখার আয়তন । উত্তর মহাসাগর ইউরেশিয়া, উত্তর আমেরিকা, গ্রিনল্যান্ড এবং একাধিক দ্বীপ দ্বারা বেষ্টিত। এই মহাসাগরের অন্তর্ভুক্ত সাগরগুলি হল বাফিন উপসাগর, ব্যারেন্টস সাগর, বিফোর্ট সাগর, চুকচি সাগর, পূর্ব সাইবেরীয় সাগর, গ্রিনল্যান্ড সাগর, হাডসন উপসাগর, হাডসন প্রণালী, কারা সাগর, ল্যাপটেভ সাগর, শ্বেত সাগর ও অন্যান্য শাখা জলধারা। বেরিং প্রণালী দ্বারা এই মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত। গ্রিনল্যান্ড সাগর ও লাব্রাডর সাগর আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে উত্তর মহাসাগরের সংযোগ রক্ষা করছে।

লোমোনোসোভ শৈলশিরা নামে একটি সমুদ্রগর্ভস্থ শৈলশিরা গভীর সমুদ্রের তলায় অবস্থিত উত্তর মেরু সামুদ্রিক অববাহিকাটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একটি হল ইউরেশীয় সামুদ্রিক অববাহিকা; এর গভীরতা । অপরটি হল আমেরেশীয় সামুদ্রিক অববাহিকা (এটি উত্তর আমেরিকান বা হাইপারবোরিয়ান সামুদ্রিক অববাহিকা নামেও পরিচিত); এর গভীরতা । সমুদ্রের তলদেশে অনেক ফল্ট-ব্লক শৈলশিরা, নিতলীয় সমভূমি, খাত ও অববাহিকা দেখা যায়। উত্তর মহাসাগরের গড় গভীরতা । গভীরতম বিন্দুটি অবস্থিত ইউরেশীয় অববাহিকায়; এর গভীরতা ।

দুটি প্রধান অববাহিকা একাধিক শৈলশিরা দ্বারা ক্ষুদ্রতর অংশে বিভক্ত। এগুলি হল কানাডা সামুদ্রিক অববাহিকা (কানাডা/আলাস্কা ও আলফা শৈলশিরার মধ্যে অবস্থিত), মাকারোভ সামুদ্রিক অববাহিকা (আলফা ও লোমোনোসোভ শৈলশিরার মধ্যে অবস্থিত), ফ্রাম সামুদ্রিক অববাহিকা (লোমোনোসোভ ও গেক্কেল শৈলশিরার মধ্যে অবস্থিত) ও নানসেন সামুদ্রিক অববাহিকা (অ্যামান্ডসেন সামুদ্রিক অববাহিকা) (গেক্কেল শৈলশিরা ও ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ডের মহীসোপানের মধ্যে অবস্থিত)।

উত্তর মহাসাগরের দক্ষিণ চুকচাই সাগরে একটি প্রধান রুদ্ধক বিন্দু রয়েছে। এই বিন্দুর মাধ্যমে আলাস্কা ও পূর্ব সাইবেরিয়ার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালী দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করা যায়। বরফের অবস্থা ভেদে, উত্তর মহাসাগর হল পূর্ব ও পশ্চিম রাশিয়ার মধ্যে নিকটতম সামুদ্রিক যোগসূত্র। উত্তর মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অনেকগুলি ভাসমান গবেষণা স্টেশন রয়েছে।

আন্টর্কটিক মহাসাগর থেকে আসা জলের সবচেয়ে বড়ো অন্তঃপ্রবাহটি হল নরওয়েজিয়ান স্রোত। উত্তর মহাসাগরে এই স্রোতটি ইউরেশীয় উপকূল বরাবর প্রবাহিত হয়। প্রশান্ত মহাসাগর থেকেও বেরিং প্রণালী হয়ে জল ঢোকে। পূর্ব গ্রিনল্যান্ড স্রোতটি হল প্রধান বহিঃপ্রবাহ।

সারা বছরই এই মহাসাগরের উপরিতলের অধিকাংশ স্থান বরফে আবৃত থাকে। এর ফলে বায়ুর উষ্ণতাও হিমশীতল হয়। বিষুবরেখার দিকে প্রবাহিত শীতল বায়ুর একটি প্রধান উৎস হল উত্তর মহাসাগর। ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে মিলিত হয়ে এই বায়ু বৃষ্টি ও তুষারপাত ঘটায়। মুক্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ জলভাগে, প্রচুর সামুদ্রিক জীবজন্তু দেখা যায়। এই মহাসাগরের প্রধান বন্দরগুলি হল মুরমানস্ক, আরখানগেলস্ক ও প্রুডহো বে।

উত্তর মহাসাগরের বৃহত্তর অংশের উপরিতলে (৫০-৫০ মিটার) উষ্ণতা ও লবণতার হার অপরাপর অংশের চেয়ে কম। এটি আপেক্ষিকভাবে স্থির। কারণ গভীরতার উপর লবণতার প্রভাব উষ্ণতার প্রভাবের চেয়ে বেশি। বড়ো বড়ো সাইবেরীয় ও কানাডীয় নদীর (ওব, ইয়েনিসে, লেনা, ম্যাককেঞ্জি) মিষ্টি জল এই মহাসাগরে পতিত হয়। এই মিষ্টি জল মহাসাগরের অধিক লবণাক্ত, অধিক ঘন ও অধিক গভীর জলের উপর ভেসে থাকে। এই কম লবণতাযুক্ত তল ও মহাসাগরীয় লবণাক্ত জলের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত তথাকথিত হ্যালোক্লিন। এই অংশে লবণতা ও উষ্ণতা গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। এই মধ্যবর্তী স্তরটি জলের নিম্নতলের উষ্ণতাকে উপরে উঠতে বাধা দেয়। এই স্তরটি না থাকলে উত্তর মহাসাগরে সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ অনেক কম হত। উত্তর মহাসাগরের উষ্ণতা ও লবণতার ধরনটি বেশ জটিল। উত্তর মেরু অঞ্চলে আগত ও এখান থেকে বহির্গত স্রোতগুলির উপর এই উষ্ণতা ও লবণতার ধরন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

Image:Plot arctic sea ice volume.svg|thumb|right| উত্তর মহাসাগরীয় সামুদ্রিক বরফের ঘনত্বের ঋতুভিত্তিক হ্রাসবৃদ্ধি ও দীর্ঘকালীন হ্রাস।

উত্তর মহাসাগরের অধিকাংশ অঞ্চল একটি বরফের টুপি দ্বারা আবৃত থাকে। এটির ঋতু অনুযায়ী হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে থাকে। এই টুপির প্রসারক্ষেত্রটির (যা মূলত সামুদ্রিক বরফ দ্বারা গঠিত) আকার ১৯৮০ সালে ছিল । ২০১০ সালে তা কমে হয় । ঋতুভিত্তিক পার্থক্য প্রায় । সর্বোচ্চ প্রসার এপ্রিল মাসে এবং সর্বনিম্ন প্রসার সেপ্টেম্বরে। বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত বরফের বিরাট অঞ্চলকে স্থানান্তর বা ঘোরাতে সক্ষম হয়। চাপ অঞ্চলও সৃষ্টি হয়। সেখানে বরফের স্তুপ জমে প্যাক আইস গঠন করে। উত্তর মহাসাগরীয় সামুদ্রিক বরফের প্রসার ও গভীরতা এবং বরফের মোট ঘনত্ব বিগত দশকগুলিতে হ্রাস পেয়েছে।

উত্তর মহাসাগর একাধিক উত্তর মেরু মহীসোপান দ্বারা বেষ্টিত। এগুলির মধ্যে সাইবেরীয় মহীসোপানটি বিশ্বের বৃহত্তম মহীসোপান।




#Article 29: ভারত মহাসাগর (364 words)


ভারত মহাসাগর হল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। পৃথিবীর মোট জলভাগের ২০ শতাংশ এই মহাসাগর অধিকার করে আছে। এই মহাসাগরের উত্তর সীমায় রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশ; পশ্চিমে রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা; পূর্বে রয়েছে ইন্দোচীন, সুন্দা দ্বীপপুঞ্জ ও অস্ট্রেলিয়া; এবং দক্ষিণে রয়েছে দক্ষিণ মহাসাগর সংজ্ঞান্তরে অ্যান্টার্কটিকা।

ভারত মহাসাগর বিশ্ব মহাসাগরগুলির সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। ২০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা আটলান্টিক মহাসাগর থেকে এবং ১৪৬°৫৫' পূর্ব দ্রাঘিমা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ভারত মহাসাগরের সর্ব-উত্তর অংশটি পারস্য উপসাগরের ৩০ ডিগ্রি অক্ষরেখায় অবস্থিত। দক্ষিণভাগে (আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত) ভারত মহাসাগরের প্রস্থ প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার (৬,২০০ মাইল)। লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরসহ এই মহাসাগরের মোট আয়তন ৭৩,৫৫৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার (২৮,৩৫০,০০০ বর্গ মাইল)। মহাসাগরের মহাদেশীয় প্রান্তসীমায় অনেক ছোটো ছোটো দ্বীপ অবস্থিত। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্রগুলি হল মাদাগাস্কার (বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দ্বীপ), রিইউনিয়ন দ্বীপ, কোমোরোস, সেশেল, মালদ্বীপ, মরিশাস ও শ্রীলঙ্কা। ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জ এই মহাদেশের পূর্ব সীমায় অবস্থিত।

কমপক্ষে ১৫১৫ সাল থেকে ভারত মহাসাগরের নামকরণ করা হয়েছে ভারত নাম থেকে (ওশেনাস ওরিয়েন্টালস ইনডিকাস)। ভারত, তখন, সিন্ধু নদীর অঞ্চল এর গ্রীক / রোমান নাম।

প্রাচীন ভারতীয়রা একে সিন্ধু মহাসাগর বা সিন্ধুর বিশাল সমুদ্র বলে ডাকত, এই মহাসাগরকে বিভিন্ন ভাষায় হিন্দু মহাসাগর, ভারতীয় মহাসাগর ইত্যাদি বলা হত। আগে ভারত মহাসাগর 'পূর্ব মহাসাগর' নামেও পরিচিত ছিল, ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই শব্দটি ব্যবহৃত হত। বিপরীতভাবে, যখন ১৫শ শতাব্দীতে চীন ভারত মহাসাগরে অন্বেষণ করছিল, তারা এটিকে পশ্চিম মহাসাগর বলে অভিহিত করেছিল।

প্রাচীন গ্রীক ভূগোল অনুযায়ী গ্রীকরা ভারত মহাসাগর অঞ্চলটিকে এরিথ্রিয়ান সাগর বলে জানত। ভারত মহাসাগর বিশ্ব এর তুলনামূলকভাবে নতুন ধারণা অনুযায়ী এবং এর ইতিহাস পুনরায় লেখার চেষ্টার ফলস্বরূপ নতুন নামের প্রস্তাব হয়েছে, যেমন 'এশিয়ান সাগর' এবং 'আফরাশিয়ান সাগর'।

এর উত্তর দিকে রয়েছে বাংলাদেশ,  ভারত, পাকিস্তান ও ইরান; পশ্চিমে আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকা; পুর্বে রয়েছে মালয় উপদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা দ্বীপ এবং দক্ষিণ দিকে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ। ভারত সাগরের তিনটি প্রধান বাহু হচ্ছে: আরব সাগর, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর।

এই দেশগুলির মাঝে দ্বীপ দেশ হচ্ছে শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, বাহরাইন, কমোরোস, মাদাগাস্কার, মরিশাস ও সেশেল।

 

ভারত মহাসাগরের সমুদ্র লেনগুলি বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হয়। ভারত মহাসাগর এবং এর অত্যাবশ্যক চোকপয়েন্টগুলির মধ্য দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রসীমায় ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল পরিবহনের বাণিজ্য সম্পূর্ণ হয়। এই মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে  ৪০ শতাংশ, মালাক্কা প্রণালীর মধ্য দিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং বাব-মান্দাব প্রণালীর মধ্য দিয়ে ৮ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়।




#Article 30: প্রশান্ত মহাসাগর (711 words)


প্রশান্ত মহাসাগর () () পৃথিবীর প্রথম বৃহত্তম মহাসাগর। এটি দক্ষিণে অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত বিস্তৃত; পশ্চিমে এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া ঘেরা; এবং এর পূর্বে রয়েছে দুই আমেরিকাt
 মহাদেশ। প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন ১৬৯.২ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (৬৫.৩ মিলিয়ন বর্গমাইল), যা পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৩২ শতাংশ, সমস্ত জলভাগের ৪৬%  এবং পৃথিবীর সমস্ত ভূমি পৃষ্ঠের চেয়ে আয়তনে বেশি। ভু-মধ্যরেখা একে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে ভাগ করেছে। এর গভীরতা  এবং পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত সাগরের     মারিয়ানা টেঞ্চ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম বিন্দু যার গভীরতা 

প্রশান্ত মহাসাগরে মোট দ্বীপের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার, যা বাকি চারটি মহাসাগরের সম্মিলিত দ্বীপের সংখ্যার চেয়ে বেশি। বেশির ভাগ দ্বীপ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরে মাইক্রোনেশিয়া, পলিনেশিয়ার মতো ছোট দ্বীপ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাইওয়ান, নিউ গায়ানার মতো বড় দ্বীপ। 
নাম প্রশান্ত হলেও বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ আগ্নেয়গিরি এই মহাসাগরে অবস্থিত। গ্রেট বেরিয়ার রিফ বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোরাল রিফ, যা প্রশান্ত মহাসাগরের অন্তর্গত।
প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৌ রুট ও বন্দর। বন্দরগুলোর মধ্যে সিডনি হারবার, সাংহাই, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, সানফ্রান্সিসকো ও লস অ্যাঞ্জেলেস অন্যতম।

প্রশান্ত মহাসাগরকে দেখতে অনেকটা ত্রিভূজের মতো । প্রশান্ত মহাসাগরের স্রোতগুলির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায়ঃ ১. এই মহাসাগরের উত্তরভাগের স্রোতসমূহ ঘড়ির কাঁটার দিকে আবর্তিত হয় । ২.  কিন্তু দক্ষিণভাগের স্রোতসমূহ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে আবর্তিত হয় ।

১। কুমেরু স্রোত (শীতল): কুমেরু মহাসাগরের একটি শীতল স্রোত পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে শীতল কুমেরু স্রোত রূপে পশ্চিমদিক থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়।

২। পেরু স্রোত বা হ্যামবোল্ড স্রোত (শীতল): পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে পূর্ব অষ্ট্রেলীয় স্রোত বা নিউ সাউথ ওয়েলস স্রোত দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে পৌঁছায় এবং দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে বাধা পেয়ে চিলির উপকূল ধরে উত্তরদিকে পেরু উপকূলে এসে পেরু স্রোত বা শীতল হ্যামবোল্ড-স্রোত নামে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়।

৩। দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত (উষ্ণ): পেরু স্রোত বা শীতল হ্যামবোল্ড স্রোত ক্রমশ উত্তরদিকে এগিয়ে নিরক্ষরেখার কাছাকাছি পৌঁছুলে দক্ষিণ-পূর্ব আয়নবায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত নামে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল থেকে পশ্চিমদিকে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়।

৪। নিঊ সাউথ ওয়েলস স্রোত বা পূর্ব অস্ট্রেলীয় স্রোত (ঊষ্ণ): উষ্ণ দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত পশ্চিমদিকে গিয়ে ওশিয়ানিয়ার কাছে পৌঁছোলে এই স্রোত দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে এর একটি শাখা দক্ষিণদিকে ঘুরে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল ও নিঊজিল্যান্ডের মধ্যে দিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস স্রোত বা পূর্ব অস্ট্রেলীয় স্রোত নামে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে কুমেরু স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়। এর অপর শাখাটি উত্তর-পশ্চিমদিকে গিয়ে এশিয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে এবং পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে বাধা পায় এবং উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়।

৫। উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত (উষ্ণ): উত্তর-পূর্ব আয়নবায়ুর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের উৎপত্তি হয়েছে। এই স্রোতটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল থেকে এশিয়া মহাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়।

৬। জাপান স্রোত বা কুরোশিয়ো (উষ্ণ): উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ইন্দোনেশিয়ার কাছে এসে উত্তরমুখী হয়ে এশিয়া মহাদেশের জাপান ও তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল ধরে উষ্ণ জাপান স্রোত বা কুরোশিয়ো স্রোত নামে উত্তরে প্রবাহিত হয় । জাপান স্রোত বা কুরোশিয়ো স্রোতের একটি শাখা জাপানের পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তর দিকে সুসিমা স্রোত নামে অগ্রসর হয়।

৭। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত (উষ্ণ): পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে জাপান স্রোত বা কুরোশিয়ো স্রোতের অপর শাখাটি উষ্ণ উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত নামে জাপানের পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয়।

৮। ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত (শীতল): উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছানোর পর ক্যালিফোর্নিয়ার কাছে দক্ষিণমুখী হয়ে শীতল ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত নামে প্রবাহিত হয়।

৯। আলাস্কা বা অ্যালুশিয়ান স্রোত (উষ্ণ): উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতের একটি শাখা আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে আলাস্কা বা অ্যালুশিয়ান স্রোত নামে আলাস্কা উপকূল ও অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ বরাবর প্রবাহিত হয়। এই স্রোত পরে শীতল বেরিং স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়।

১০। বেরিং স্রোত (শীতল): অতি শীতল মেরুবায়ুর প্রভাবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সুমেরু অঞ্চল থেকে আগত শীতল বেরিং স্রোতটি বেরিং প্রণালীর মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোতের উত্তর শাখার সঙ্গে মিলিত হয়। দুটি আলাদা উষ্ণতার বাঊর মিলনে এই অঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও ঝড়বৃষ্টির সৃষ্টি হয়।

১১। নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত বা প্রতিস্রোত (উষ্ণ): উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে একটি অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও ক্ষীণ স্রোত পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় যা নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত বা প্রতি স্রোত নামে পরিচিত।

১২। প্রশান্ত মহাসাগরীয় শৈবাল সাগর: উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত, জাপান স্রোত, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্রোতের ডিম্বাকৃতি গতিপথের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সৃষ্টি হওয়া সারকুলার কারেন্ট বা ঘূর্ণস্রোতের অভ্যন্তর ভাগের জলাবর্ত একেবারে স্রোতবিহীন সমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। এই স্রোতহীন সমুদ্রের স্থির জলে নানারকম শৈবাল, আগাছা, তৃণ, উদ্ভিদ এবং অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ জন্মায়। স্রোতহীন শৈবালে পরিপূর্ণ অঞ্চলকে শৈবাল সাগর বলে।




#Article 31: টেনিস (503 words)


টেনিস () বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া হিসেবে পরিচিত। লন টেনিস নামেও বিশ্বের অনেক দেশে এ খেলার পরিচিতি রয়েছে। যিনি এ খেলায় অংশগ্রহণ করেন, তিনি 'টেনিস খেলোয়াড়' নামে পরিচিতি পান। টেনিস খেলার জন্য প্রয়োজন হয় তারযুক্ত একটি দণ্ড যা 'র‌্যাকেট' নামে পরিচিত, একটি বল এবং জাল। উইম্বলেডন চ্যাম্পিয়নশীপ, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন এবং ইউএস ওপেন - টেনিসের চারটি বড় প্রতিযোগিতা, যা প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রত্যেক প্রতিযোগিতাই গ্র্যান্ড স্ল্যাম প্রতিযোগিতা নামে পরিচিত।

রাফায়েল নাদাল, পিট সাম্প্রাস, ইভান ল্যান্ডল, বরিস বেকার, রজার ফেদেরার, নোভাক জকোভিচ, ভেনাস উইলিয়ামস, সেরেনা উইলিয়ামস, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা, স্টেফি গ্রাফ, মনিকা সেলেস, মারিয়া শারাপোভা, মার্টিনা হিঙ্গিস প্রমূখ বিশ্বের খ্যাতনামা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন স্ব-মহিমায়।

সাধারণত দুইভাবে টেনিস খেলা হয়:-

এছাড়াও, ডাবলসে পুরুষ ও নারী নিয়ে গঠিত দল মিক্সড ডাবলস নামে পরিচিত।

টেনিস খেলা যেখানে অনুষ্ঠিত হয় সেই জায়গাটিকে বলা হয় টেনিস কোর্ট। টেনিস বিভিন্ন কোর্টে খেলা হয়ে থাকে:-

টেনিস কোর্ট দৈর্ঘ্যে ৭৮ ফুট এবং প্রস্থে ৩৯ ফুট হয়ে থাকে। তবে সিঙ্গেল কোর্ট প্রস্থে ২৭ ফুট হয়ে থাকে। চতুর্ভূজ আকৃতির কোর্টকে দুই ভাগে ভাগ করে মাঝে জাল টাঙানো হয় মাঝ খানে যার উচ্চতা ৩ ফুট। জালের দুই পাশে দু'টি করে চারটি সার্ভিস কোর্ট থাকে জাল থেকে যাদের দৈর্ঘ্য ২১ ফুট। লম্বায় দুই পাশে দুইটি নির্দিষ্ট মাপের ট্রাম লাইন থাকে।

টেনিস খেলায় দুই পক্ষের খেলোয়াড় জালের বিপরীত দিকে একে-অপরের মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একদিকের খেলোয়াড় বলটি প্রথমে মারে তার অপর দিকের বিপরীত পাশের খেলোয়াড়ের দিকে। একে সার্ভ করা বলে। যে বল মারে তাকে সার্ভার এবং বিপরীত প্রান্তের খেলোয়াড়কে রিসিভার বলে। 'সার্ভার'-কে তার বেস লাইনের বাইরে থেকে বল মারতে হয়। তবে রিসিভার যে কোন জায়গায় অবস্থান নিতে পারে। সার্ভিসের বল খেলোয়াড়ের অপর পাশের বিপরীত দিকের সার্ভিস কোর্টে জাল না ছুঁয়ে পাঠাতে হয়। যদি সার্ভিসে কোনো ধরনের ভুল হয়, তবে 'সার্ভার' দ্বিতীয় সুযোগ পায় সার্ভিস করার। দ্বিতীয় সার্ভিস ভুল হলে 'ডবল ফল্ট' বলে এবং রিসিভার পয়েন্ট পায়।

সঠিক সার্ভিস হলে খেলার মূল অংশ (র‌্যালী) শুরু হয় যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় বল মেরে ফেরত পাঠায় বিপক্ষ দলের কোর্টে। এভাবে বল দেয়া-নেয়া করে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেষ্টা করে যাতে প্রতিপক্ষ বলটি সঠিক ভাবে তাকে ফেরত পাঠাতে না পারে। যদি প্রতিপক্ষ সঠিকভাবে বল পাঠাতে ব্যর্থ হয় তবে খেলোয়াড় পয়েন্ট পায়। সঠিকভাবে বল পাঠাতে হলে খেলোয়াড়কে একবার আঘাত করে বল প্রতিপক্ষের কোর্টে নিয়ে ফেলতে হবে এবং সেটা করতে হয় প্রতিপক্ষের পাঠনো বল দুইবার মাটিতে পড়ার আগে।

টেনিস খেলার জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় সেট জয়ের সংখ্যা দ্বারা। টেনিস খেলায় পয়েন্ট প্রাপ্তির ক্রম হয় ০,১৫, ৩০, ৪০ এভাবে যেখানে খেলোয়াড় ৪০ এর পর পয়েন্ট পেলে তার গেম জেতা হয়। যদি দুই খেলোয়াড় এক সাথে ৪০ পয়েন্ট পায়। তবে গেম জেতার জন্য কোনো খেলোয়াড়কে পর পর দুই পয়েন্ট পেতে হয়। এভাবে কোনো খেলোয়াড় যদি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সাথে কমপক্ষে দুই গেম ব্যবধান রেখে ছয়টি গেম জয় করতে পারে তবে সে একটি সেট জিতে নিতে সক্ষম হয়। যদি তারা সমান সংখ্যক গেমে জয়ী হয় তবে টাইব্রেকারের মাধ্যমে সেটের বিজয়ী নিশ্চিত হয়। এভাবে সর্বোচ্চ সেট জয়ী খেলোয়াড় খেলায় বিজয়ী হয়।

টেনিস বল উত্তাপের দ্বারা পশম জমা করে প্রস্তুত বস্ত্রের আবরনযুক্ত ফাঁপা রাবার দিয়ে তৈরি। টেনিস খেলার ঐতিহ্যে বলের রং ছিল সাদা, যা বিংশ শতাব্দীর শেষোক্ত সময়ে দৃষ্টি-সম্বন্ধীয় কারণের জন্য হলুদ রঙে পরিণত হয়।




#Article 32: রজার ফেদেরার (524 words)


রজার ফেদেরার (জন্ম ৮ই আগস্ট, ১৯৮১) একজন সুইস পেশাদারী টেনিস খেলোয়াড়। তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে সফল টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম। তিনি বর্তমানে এটিপি র‌্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের ২ নম্বর খেলোয়াড় । পিট সাম্প্রাস সহ অনেক টেনিস কিংবদন্তী, টেনিস সমালোচক, তার সমসাময়িক খেলোয়াড়সহ অনেকেই মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা টেনিস খেলোয়াড় । তিনি ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ তারিখ ত্থেকে ২০০৮ সালের শেষভাগ পর্যন্ত টানা ২৩৭ সপ্তাহ বিশ্বের ১ নম্বর খেলোয়াড় ছিলেন, যা একটি রেকর্ড ।

২০০৪ সালে ফেদেরার ম্যাট্‌স উইলান্ডারের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একই বছরে তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব দেখান। ২০০৬ ও ২০০৭ সালে তিনি এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি এ পর্যন্ত ২০ টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম, ৪টি টেনিস মাস্টার্স কাপ, ও ১৫টি টেনিস মাস্টার্স সিরিজ শিরোপা জিতেছেন। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পরপর পাঁচ বছর উইম্বলডন (২০০৩-২০০৭) ও ইউ এস ওপেন (২০০৪-২০০৮) শিরোপা জিতেছেন। ফেদেরার ষষ্ঠ পুরুষ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামই জয়ের কৃতিত্ব দেখান ।

২০০৯ সালের উইম্বলডন ছিল তার ক্যারিয়ারের ১৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়। এর মাধ্যমে ওপেন যুগে পুরুষ এককে সাবেক নাম্বার ওয়ান পিট সাম্প্রাসের ১৪টি গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ের রেকর্ড তিনি ভেঙ্গে ফেলেন।
বছরের পর বছর একের পর এক অবিস্মরণীয় অর্জনের কারণে তাকে ফেড এক্সপ্রেস বা সুইস জাদুকর হিসেবেও ডাকা হয়।

ফেদেরার সুইজারল্যান্ডের বাজেলের বাজেল ক্যান্টনাল হাসপাতালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা রবার্ট ফেদেরার একজন সুইজারল্যান্ডীয়, বার্নেক থেকে, যা সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও জার্মানির সীমান্তের কাছে, এবং তার মা, লাইনেট ফেদেরার (জন্ম ডুরান্ড), ক্যম্পটন পার্ক, গুতেঙ থেকে, একজন সাউথ আফ্রিকান যার পূর্বপুরুষ ডাচ ও ফরাসি প্রটেস্ট্যান্ট। ফেদেরার একজন বড় বোন আছে, ডায়ানা। তিনি সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বৈত নাগরিক। তার শৈশব কাটে  বিরস্ফেলদেন, রিহেন ও পরে মুনচেস্তেন, ফরাসি ও জার্মান সীমান্তের কাছে এবং তিনি সুইস জার্মান, ফরাসি, জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় স্বাচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন।

ফেদেরার রোমান ক্যাথলিক হিসেবে বড় হন এবং ২০০৬ রোম মাস্টার্সে খেলার সময় ষোড়শ পোপ বেনেডিক্টের  সাথে রোমে দেখা করেন। প্রত্যেক সুইস পুরুষ নাগরিকের মত, ফেদেরারও সুইস সশস্ত্রবাহিনীতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা দান করেন। যদিও তিনি ২০০৩ সালে অনুপযুক্ত গণ্য হন, পিঠের সমস্যার কারণে ও পরবর্তীকালে তার সামরিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করা আবশ্যক নয়। তিনি ছোট থেকেই এফসি বাজেল ও সুইজারল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থণ করে বড় হয়েছেন। ফেদেরার শিশুকালের নানা পরিধির খেলাধুলা করতেন। তিনি তার হাতে চোখের সমন্বয়ের জন্য ব্যাডমিন্টন এবং বাস্কেটবল খেলেছেন। ফেদেরার নানা সাক্ষাৎকারে নিজেকে একজন ক্রিকেটপ্রেমী বলে উল্লেখ করেছে এবং শচীন তেন্ডুলকরের তার দুই বার দেখা হয়। তিনি বলেন আমি সবসময় অনেক বেশি আগ্রহী যদি একটি বল জড়িত থাকে,। অধিকাংশ টেনিস প্রতিভাবান, বিপরীতভাবে,  অন্যান্য সব খেলা বর্জন করে টেনিস খেলে। পরবর্তি জীবনে, ফেদেরারের সাথে গলফ ফেলোয়াড় টাইগার উডস-এর সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে।

সাবেক ডব্লিউটিএ খেলোয়াড় মিরোস্লাভা মিরকা ফেদেরার (মিরোস্লাভা ভাভরিনেচ) এর সাথে প্রায় ১০ বছর প্রণয়ের পর ১১ এপ্রিল,২০০৯ তারিখে বাসেলে ঘনিষ্ঠ কিছু পরিচিতজনের সান্নিধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফেদেরার। তাদের বর্তমানে দুটি যমজ মেয়েসন্তান রয়েছে,মিলা রোজ ও শারলিন রিভা। মিরকা বর্তমানে তার স্বামীর জনসংযোগ কাজের তত্ত্বাবধান করেন।

সাবেক ওয়ার্ল্ড নাম্বার ওয়ান টেনিস গ্রেট জিমি কনরস ফেদেরারের খেলার ধরন সম্পর্কে একবার বলেছিলেনঃ হয় তুমি একজন হার্ডকোর্ট স্পেশালিস্ট, না হয় একজন ক্লে কোর্ট স্পেশালিস্ট, না হয় একজন গ্রাসকোর্ট স্পেশালিস্ট....... অথবা তুমি রজার ফেদেরার ! 
ফেদেরার একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ খেলোয়াড় যার বিশেষ খ্যাতি আছে দুর্দান্ত শট খেলার ক্ষমতা ও শৈল্পিক ছন্দের জন্যে। জন ম্যাকেনরোর মতে, ফেদেরারের ফোরহ্যান্ড টেনিসের সেরা শট।

~চারবার লরিয়াস বর্ষসেরা খেলোয়াড় : ২০০৫-২০০৮

~আটবার এটিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর Fans' Favourite : ২০০৩-২০১০




#Article 33: ফুটবল (545 words)


ফুটবল একটি দলগত খেলা। এটি বৈশ্বিকভাবে ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় খেলা। এটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) কর্তৃক পরিচালিত ক্রীড়ার আনুষ্ঠানিক নাম। কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় খেলাটি সকার নামে পরিচিত। এটি দুই দলের মধ্যে খেলা হয়, যার প্রতিটি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় থাকে। একবিংশ শতকে এসে ফুটবল খেলা দুই শতাধিক দেশের ২৫০ মিলিয়নেরও অধিক খেলোয়াড় খেলে থাকেন। এর ফলে ফুটবল বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রচলিত খেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

ফুটবল খেলার স্তর এবং দেশভেদে কোচের ভূমিকা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের রূপরেখা ভিন্নতর হতে পারে। যুব ফুটবলে কোচের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে খেলোয়াড়দেরকে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের দক্ষতাকে কাগজে-কলমে দেখিয়ে উত্তরণ ঘটানো। শারীরিক অথবা কৌশলগত উত্তরণের তুলনায় প্রাণবন্তঃ এবং সুন্দর খেলা উপহার দেয়াকে প্রাধান্য দেয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন দেশের ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো তাদের প্রশিক্ষণের ছকে এ সংক্রান্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কোচদেরকেও খেলোয়াড়দের উন্নয়ন এবং বিজয়ের লক্ষ্যে আনন্দ উপভোগের জন্যে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলেছে।

প্রতিযোগিতামূলক খেলায় তিনি মাঠের বাইরে কৌশলগত কারণে সুবিধাজনক যে-কোন জায়গায় অন্যান্য অতিরিক্ত খেলোয়াড় সহযোগে অবস্থান করতে পারেন; কিন্তু তার ঐ অবস্থান আইন-কানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়।

প্রত্যেক দেশের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা প্রতি মৌসুমে ঘরোয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সাধারণত এতে বেশ কয়েকটি বিভাগ থাকে এবং দলগুলো পুরো মৌসুম জুড়ে খেলার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পয়েন্ট অর্জন করে থাকে। দলগুলোকে একটি তালিকায় তাদের অর্জিত পয়েন্টের ক্রমানুসারে সাজানো হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দলগুলো প্রতি মৌসুমে তার লীগের অন্য সকল দলের সাথে ঘরের মাঠে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠে ম্যাচ খেলে। এরপর মৌসুমের শেষে শীর্ষ দলটিকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। শীর্ষ কয়েকটি দল এমনকি উপরের বিভাগে খেলার সুযোগও পেতে পারে। অনুরূপভাবে, একেবারে পয়েন্ট তালিকার নিচে মৌসুম শেষ করা কয়েকটি দল নিচের বিভাগে অবনমিত হয়। শীর্ষ এক বা একাধিক দল পরবর্তী মৌসুমে আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগও পেতে পারে। এই নিয়মের প্রধান ব্যতিক্রম দেখা যায় লাতিন আমেরিকার কয়েকটি লীগে। বেশিরভাগ দেশেই লীগ ব্যবস্থার সাথে এক বা একাধিক কাপ প্রতিযোগিতা যুক্ত থাকে।

কিছু দেশের সর্বোচ্চ বিভাগে বিপুল পারিশ্রমিকে তারকা খেলোয়াড়েরা খেলেন। তেমনি কিছু দেশে এবং নিচু বিভাগের খেলোয়াড়েরা অ-পেশাদার এবং মৌসুমভিত্তিক হয়ে থাকতে পারেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লীগ হল - প্রিমিয়ার লীগ (ইংল্যান্ড), লা লিগা (স্পেন), সিরি এ (ইতালি), বুন্দেসলিগা (জার্মানি) এবং লিগ ১ (ফ্রান্স)। এই লীগগুলো বিশ্বের বেশিরভাগ শীর্ষ খেলোয়াড়কে আকর্ষণ করে এবং এদের প্রত্যেকটিতে খরচ হয় ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড-স্টার্লিং বা ৭৬৩ মিলিয়ন ইউরো বা ১.১৮৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

একজন রেফারীর মাধ্যমে ফুটবল খেলা পরিচালিত হয়। তিনি খেলায় মূল কর্তৃপক্ষ হিসেবে যাবতীয় আইন-কানুন প্রয়োগ করেন। দুইজন সহকারী রেফারী বা লাইন্সম্যান এবং কখনো কখনো চতুর্থ রেফারীও তাকে খেলায় সহায়তা করে থাকেন। তবে ইউইএফএ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ৬জন রেফারী অংশগ্রহণ করেন। দুইজন গোলপোস্টের বাইরে থেকে বলের অবস্থান চিহ্নিত করেন যে তা গোল লাইন অতিক্রম করেছে কি-না (এদেরকে গোললাইন রেফারীও বলা হয়)।

খেলা নির্দিষ্ট সময়ে সমাপণ কিংবা অতিরিক্ত সময় যুক্তকরণ তার দায়িত্ব। মাঠে অবস্থানকালে যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় পরখপূর্বক খেলোয়াড় সংখ্যার সঠিকতা, অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের সংশ্লিষ্টতা, ইত্যাদি ঘটনার বিবরণ নোটবহিতে লিপিবদ্ধসহ খেলাশেষে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পেশ করেন। এছাড়াও, খেলোয়াড় আহত ও এর গুরুত্বতা অণুধাবনপূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মাঠে তিনি কোন খেলোয়াড়, এমনকি দলীয় কোচকে হলুদ কিংবা লাল কার্ডের প্রয়োগের মাধ্যমে যথাক্রমে সতর্কীকরণ, শাস্তি কিংবা বহিস্কার করতে পারেন।

বিশ্বব্যাপী ফুটবল খেলার মানোন্নয়নে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থা ফিফা ১৭টি আইনের কথা উল্লেখ করেছে। তন্মধ্যে ৫নং ধারার মাধ্যমে খেলা পরিচালনার জন্য রেফারী এবং সহকারী রেফারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে।

যথাযথভাবে খেলা পরিচালনার জন্য প্রতিযোগিতা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলে রেফারীদের প্যানেল সৃষ্টি করতে পারেন। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে ফুটবলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ ম্যাচ রেফারীকে সাহায্য করার জন্য ৫ম বিচারকের ব্যবস্থা রেখেছিল।




#Article 34: হকি (159 words)


হকি দুই দলের মধ্যে খেলা হয় এমন খেলার গোত্রীয় একটি খেলা।

ফিল্ড হকি নুড়ি, প্রাকৃতিক ঘাস, বালি বা পানি আচ্ছাদিত কৃত্রিম মাটির উপর ৭৩ মিলিমিটার পরিসীমা বিশিষ্ট ছোট ও শক্ত বল দিয়ে খেলা হয়। এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আর্জেন্টিনায় পুরুষ ও নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি খেলা। বেশির ভাগ দেশেই যেকোন এক লিঙ্গের অর্থাৎ পুরুষ বা নারীদের মধ্যে আলাদা আলাদাভাবে খেলা হয়, যদিও খেলাটি দুই লিঙ্গের সমন্বয়েও খেলা যায়।

আইস হকি বৃহৎ বরফাচ্ছাদিত এলাকায় তিন ইঞ্চি পরিসীমা বিশিষ্ট তাপ দিয়ে সংযুক্ত রাবার ডিস্ক দিয়ে স্কেটারদের দুই দলের মধ্যে খেলা হয়ে থাকে। এই রাবার ডিস্ককে পাক বলা হয়। এই পাকটিকে উচ্চ স্তরের খেলার পূর্বে ঠাণ্ডা করা হয় যাতে এর বাউন্সিংয়ের মাত্রা কমে ও বরফে ঘর্ষণ কম হয়। এই খেলাটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিভিন্ন মাত্রায় খেলা হয়। এই খেলাটি কানাডা, ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয়। আইস হকি লাটভিয়ার জাতীয় খেলা এবং কানাডার শীতকালীন জাতীয় খেলা।




#Article 35: ভারত (4859 words)


ভারত () দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। দেশটির সরকারি নাম ভারতীয় প্রজাতন্ত্র। ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। অন্যদিকে জনসংখ্যার বিচারে এই দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল এবং পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান উত্তর-পূর্বে চিন, নেপাল, ও ভূটান এবং পূর্বে বাংলাদেশ ও মায়ানমার অবস্থিত। এছাড়া ভারত মহাসাগরে অবস্থিত শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া ভারতের নিকটবর্তী কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত ভারতের উপকূলরেখার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৭,৫১৭ কিলোমিটার (৪,৬৭১ মাইল)।

সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। ঐতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতা এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এখানেই স্থাপিত হয়েছিল বিশালাকার একাধিক সাম্রাজ্য। নানা ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যপথ এই অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রক্ষা করত। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ—বিশ্বের এই চার ধর্মের উৎসভূমি ভারত। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে জরথুষ্ট্রীয় ধর্ম (পারসি ধর্ম), ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম এদেশে প্রবেশ করে, ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে ভারতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চল নিজেদের শাসনাধীনে আনতে সক্ষম হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই দেশ পুরোদস্তুর একটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। অতঃপর এক সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে ভারত একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে ভারত একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

বর্তমানে ভারত ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বিশিষ্ট একটি সংসদীয় সাধারণতন্ত্র। ভারতীয় অর্থব্যবস্থা বাজারি বিনিময় হারের বিচারে বিশ্বে দ্বাদশ ও ক্রয়ক্ষমতা সমতার বিচারে বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম। ১৯৯১ সালে ভারত সরকার গৃহীত আর্থিক সংস্কার নীতির ফলশ্রুতিতে আজ আর্থিক বৃদ্ধিহারের বিচারে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলির মধ্যে দ্বিতীয়। তবে অতিমাত্রায় দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও অপুষ্টি এখনও ভারতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত একটি বহুধর্মীয়, বহুভাষিক, ও বহুজাতিক রাষ্ট্র। আবার বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের নানা বৈচিত্র্যও এদেশে পরিলক্ষিত হয়।

ভারত নামটির উৎপত্তি চন্দ্রবংশীয় পৌরাণিক রাজা ভরতের নামানুসারে। কথিত আছে এই বর্ষ বা অঞ্চলটি রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল বলে এর নাম ভারতবর্ষ। ইংরেজি ইন্ডিয়া (India) শব্দটি এসেছে সিন্ধু নদের আদি ফার্সি নাম হিন্দু থেকে। এছাড়াও প্রাচীন গ্রিকরা ভারতীয়দের ইন্দোই (Ινδοί; অর্থাৎ, ইন্দাস (সিন্ধু) নদী অববাহিকার অধিবাসী) নামে অভিহিত করতেন। স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধানে ও লোকমুখে ভারত নামটিই প্রচলিত হয়। এছাড়া মধ্যযুগে উত্তর ভারত অর্থে ফার্সি হিন্দুস্তান (বা হিন্দুস্থান;  সিন্ধুনদের দেশ) শব্দটিও ব্যবহৃত হত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই শব্দটি সমগ্র ভারত অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভীমবেটকা প্রস্তর ক্ষেত্র ভারতে মানববসতির প্রাচীনতম নিদর্শন। এক লক্ষ বছর আগেও এখানে মানুষের বসবাস ছিল। প্রায় ৯০০০ বছর আগে এদেশে স্থায়ী মানববসতি গড়ে উঠে; যা কালক্রমে পশ্চিম ভারতের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ সিন্ধু সভ্যতার রূপ ধারণ করে। এই সভ্যতার আনুমানিক সময়কাল ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এরপর ভারতে বৈদিক যুগের সূত্রপাত হয়। এই যুগেই হিন্দুধর্ম তথা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলির আবির্ভাব ঘটে। বৈদিক যুগের সমাপ্তিকাল আনুমানিক ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আনুমানিক ৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় মহাজনপদ নামে অনেকগুলি স্বাধীন রাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজ্য।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রতিষ্ঠিত ও মহামতি অশোকের শাসিত মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে দক্ষিণ এশিয়ার সিংহভাগ অঞ্চল একত্রিত হয়।

খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে গুপ্ত সম্রাটদের শাসনকাল প্রাচীন ভারতের সুবর্ণ যুগ নামে আখ্যাত হয়। এছাড়া পূর্ব ভারতে পাল এবং দাক্ষিণাত্যে চালুক্য, চোল ও বিজয়নগর প্রভৃতি সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। এই সকল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পকলা, সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শন সমৃদ্ধি লাভ করে।

খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে। এর ফলে সমগ্র উত্তর ভারত প্রথমে সুলতানি ও পরে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মহামতি আকবরের রাজত্বকালে দেশে একাধারে যেমন সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচনা হয়, তেমনই প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় সম্প্রীতি। ক্রমে ক্রমে মুঘল সম্রাটগণ উপমহাদেশের এক বৃহৎ অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হন। যদিও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রাধান্যকারী অসমের অহোম রাজশক্তি এবং আরও কয়েকটি রাজ্য মুঘল আগ্রাসন সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল।

ষোড়শ শতক থেকে পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলি ভারতে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগের সুযোগ নিয়ে তারা ভারতে উপনিবেশ স্থাপন করতেও সক্ষম হয়। 

১৮৫৬ সালের মধ্যেই ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তগত হয়েছিল। এর এক বছর পরেই ঘটে ভারতীয় সিপাহি ও দেশীয় রাজ্যগুলির সম্মিলিত এক জাতীয় গণ-অভ্যুত্থান। ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহি বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা দেশে কোম্পানির শাসনের দুর্বলতার দিকগুলি উন্মোচিত করে দেয়। তাই ভারতকে আনা হয় ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে। 

বিংশ শতকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলি দেশজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। ভারতীয় নেতা মহাত্মা গান্ধী লক্ষাধিক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অহিংস গণ-আইন অমান্য জাতীয় আন্দোলন শুরু করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষলগ্নে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসনজাল থেকে মুক্তিলাভ করে। একই সঙ্গে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি বিভক্ত হয়ে গঠন করে পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি নতুন সংবিধান প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়।
 
স্বাধীনতার পরে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতপাত, নকশালবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভুত্থান দেশে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ভারতের শহরাঞ্চলগুলি এই হানাহানির শিকার হতে থাকে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের ফলে চীনের সঙ্গে এবং ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। ভারত রাষ্ট্রসংঘ (ব্রিটিশ ভারত হিসাবে) ও জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৭৪ সালে একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষণ ও ১৯৯৮ সালে আরও পাঁচটি পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে ভারত নিজেদের একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ করে। ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বর্তমানে পৃথিবীর অতিদ্রুত-বর্ধনশীল এক অর্থব্যবস্থা হিসাবে ভারত সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেও সক্ষম হয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের সিংহভাগ নিয়ে গঠিত ভারতীয় ভূখণ্ডটি ভারতীয় টেকটোনিক পাত ও ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাতের মধ্যস্থিত একটি গৌণ পাতের উপর অবস্থিত। এই ভূখণ্ড গঠনের প্রধান ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটি শুরু হয় আজ থেকে ৭৫ কোটি বছর পূর্বে, যখন দক্ষিণের অতিমহাদেশ গন্ডোয়ানার অংশ হিসাবে ভারতীয় উপমহাদেশ উত্তর-পূর্ব দিকে সরতে শুরু করে। তৎকালীন অসংগঠিত ভারত মহাসাগরব্যাপী এই সরণ স্থায়ী হয় ৫০ কোটি বছর। এর পরে উপমহাদেশটির সঙ্গে ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষ ঘটে এবং উপমহাদেশের পাতটি ইউরেশীয় পাতের তলায় অবনমিত হয়ে পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতমালা হিমালয়ের উত্থান ঘটায়। এই পর্বতমালা বর্তমানে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক বেষ্টন করে আছে। উত্থানশীল হিমালয়ের দক্ষিণ পাদদেশে অবস্থিত সমুদ্রে পাতসঞ্চরণের ফলে একটি বৃহৎ খাত সৃষ্টি হয়, এবং কালক্রমে নদীর পলি জমে এই খাতটি গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে পরিণত হয়। এই সমভূমির পশ্চিমে আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী কর্তৃক বিচ্ছিন্ন হয়ে অবস্থান করছে থর মরুভূমি। মূল ভারতীয় পাতটি আজ ভারতীয় উপদ্বীপ রূপে অবস্থান করছে। এটিই ভারতের প্রাচীনতম ও ভৌগোলিকভাবে সর্বাপেক্ষা দৃঢ় অংশ। উত্তরদিকে মধ্য ভারতে অবস্থিত সাতপুরা ও বিন্ধ্য পর্বতমালা পর্যন্ত এই উপদ্বীপ বিস্তৃত। এই সমান্তরাল পর্বতমালাদুটি পশ্চিমে গুজরাটের আরব সাগর উপকূল থেকে পূর্বে ঝাড়খণ্ডের কয়লা-সমৃদ্ধ ছোটনাগপুর মালভূমি পর্যন্ত ব্যাপ্ত। দক্ষিণে উপদ্বীপীয় ভূখণ্ডে দাক্ষিণাত্য মালভূমি বামে ও ডানে যথাক্রমে পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালাদ্বয় দ্বারা উপকূলীয় সমভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন। এই মালভূমিতেই ভারতের প্রাচীনতম প্রস্তরগঠনটি পরিলক্ষিত হয়; যার কিয়দংশের বয়স ১০০ কোটি বছরেরও বেশি। এইভাবে ভারত বিষুবরেখার উত্তরে ৬°৪৪' ও ৩৫°৩০' উত্তর অক্ষাংশ ও ৬৮°৭' ও ৯৭°২৫' পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।

ভারতীয় উপকূলরেখার দৈর্ঘ্য ৭,৫১৭ কিলোমিটার (৪,৬৭১ মাইল)। এর মধ্যে ৫,৪২৩ কিলোমিটার (৩,৩৭০ মাইল) ভারতীয় উপদ্বীপের এবং ২,০৯৪ কিলোমিটার (১,৩০১ মাইল) আন্দামান, নিকোবর ও লাক্ষাদ্বীপের অন্তর্গত। ভারতীয় নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট অনুসারে মূল অঞ্চলের উপকূলভূমি ৪৩% বালুকাময় সৈকত, ১১% পাথুরে উপকূল ও ভৃগু (উঁচু খাড়া পাড় বা ক্লিফ), ৪৬% জলাজমিপূর্ণ উপকূল দ্বারা গঠিত।

হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদনদীগুলির মধ্যে প্রধান গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র। উভয়েই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। গঙ্গার প্রধান উপনদীগুলি হল যমুনা ও কোশী নদী। কোশী নদীতে নাব্যতা অত্যন্ত কম থাকায় প্রতি বছর ভয়াল বন্যা দেখা দেয়। উপদ্বীপের প্রধান নদীগুলি হল গোদাবরী, মহানদী, কৃষ্ণা, ও কাবেরী। এই নদীগুলির খাত অত্যন্ত নাব্য হওয়ায় বন্যা কম হয়ে থাকে। এই নদীগুলিও বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। অন্যদিকে নর্মদা ও তাপ্তি পতিত হয়েছে আরব সাগরে। ভারতীয় উপকূলভূমির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল পশ্চিম ভারতে কচ্ছের রাণ ও পূর্বভারতে সুন্দরবনের পলিগঠিত বদ্বীপ অঞ্চল, যা ভারত ও বাংলাদেশে বিস্তৃত। ভারতে দুটি দ্বীপপুঞ্জ দেখা যায়: ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলভাগের নিকটে প্রবালদ্বীপ লাক্ষাদ্বীপ এবং আন্দামান সাগরের আগ্নেয় দ্বীপমালা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।

ভারতের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক উপাদানগুলি দেশের জলবায়ুকে অনেকাংশেই প্রভাবিত করে। কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মাঝবরাবর প্রসারিত। কিন্তু দেশের উত্তর সীমান্ত বরাবর অবস্থিত হিমালয় পর্বতমালা মধ্য এশিয়া থেকে আগত ক্যাটাবেটিক বায়ুপ্রবাহকে প্রতিরোধ করে দেশে ক্রান্তীয় জলবায়ু বজায় রাখতে সহায়তা করে। 
হিমালয় পর্বতমালা ও থর মরুভূমি দেশে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহকেও নিয়ন্ত্রণ করে। থর মরুভূমি গ্রীষ্মকালীন আর্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমি বায়ুকে আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। জুন থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যবর্তী সময়ে আগত এই বায়ুপ্রবাহই ভারতে বর্ষার মূল কারণ। ভারতে চারটি প্রধান ঋতু দেখা যায়: শীত (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি), গ্রীষ্ম (মার্চ থেকে মে), বর্ষা (জুন থেকে সেপ্টেম্বর), এবং শরৎ ও হেমন্ত (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর)।

ক্রান্তীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুসারে বর্ষা ও অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতি দেশে খরা, বন্যা, সাইক্লোন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। এর ফলে প্রতি বছর দেশটি লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও সম্পত্তিহানির কারণ হয়। বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে ভারতের জলবায়ুতে নানাপ্রকার অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।

ইন্দোমালয় পরিবেশক্ষেত্রে অবস্থিত ভারত জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ১৮টি মহাবৈচিত্র্যপূর্ণ রাষ্ট্রের একটি এই দেশ পৃথিবীর ৭.৬% স্তন্যপায়ী, ১২.৬% পাখি, ৬.২% সরীসৃপ, ৪.৪% উভচর, ১১.৭% মাছ ও ৬.০% সপুষ্পক উদ্ভিদের বাসস্থান। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার শোলা বর্ষণারণ্যের মতো ভারতের অনেক অঞ্চলেই স্বাভাবিক উদ্ভিদের প্রাচুর্য দেখা যায়। ৩৩% ভারতীয় বৃক্ষপ্রজাতি স্বাভাবিক উদ্ভিদশ্রেণীর অন্তর্গত। ভারতের প্রধান অরণ্যক্ষেত্রগুলি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিষুবীয় বর্ষণারণ্য থেকে হিমালয়ের চিরহরিৎ অরণ্যক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া পূর্ব ভারতের শাল-অধ্যুষিত, মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের টিক-অধ্যুষিত ও মধ্য দাক্ষিণাত্য ও গাঙ্গেয় সমভূমির বাবুল অধ্যুষিত বনাঞ্চলও উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ ভারতে নিম গাছ ওষধি রূপে ব্যবহৃত হয়। পিপল গাছ মহেঞ্জোদাড়োর প্রতীকচিহ্নে দেখা গেছে। এই গাছের তলাতেই গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধি বা বোধিলাভ করেছিলেন ও তার নাম হয়েছিল 'গৌতম বুদ্ধ' । তাই বু্দ্ধগয়ায় অবস্থিত ওই বৃক্ষটিকে বলা হয় 'বোধিবৃক্ষ' ।

বহু ভারতীয় প্রজাতি গন্ডোয়ানায় জাত টেক্সা থেকে উদ্ভূত। উপদ্বীপীয় ভারতের ক্রমসরণ ও ইউরেশীয় ভূমিভাগের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে প্রজাতিগুলির মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। যদিও অগ্ন্যুৎপাত ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে বিগত ২ কোটি বছরে বহু দেশজ প্রজাতিই অবলুপ্ত হয়ে যায়। এর ঠিক পরেই দুটি প্রাণীভৌগোলিক পথে উত্থানশীল হিমালয়ের দুই পাশ দিয়ে ভারতে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা প্রবেশ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতের মোট স্তন্যপায়ী ও পাখিদের যথাক্রমে মাত্র ১২.৬% ও ৪.৫% দেশজ; যেখানে দেশের সরীসৃপ ও উভচরদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫.৮% ও ৫৫.৮%। উল্লেখযোগ্য দেশীয় প্রাণী হল নীলগিরি লেঙ্গুর, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বাদামি ও গাঢ় লাল রঙের বেডোমি ব্যাঙ। ভারত ১৭২টি (২.৯%) আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ-গণিত লুপ্তপ্রায় প্রাণীর আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে এশীয় সিংহ, বাংলা বাঘ, ভারতীয় শ্বেতপৃষ্ঠ শকুন (বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত)।

বিগত দশকগুলিতে মানুষের অরণ্য আগ্রাসন বন্যপ্রাণী অবলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১৯৩৫ সালে চালু হওয়া জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত স্থানের ব্যবস্থাটিকে ব্যাপ্ত করা হয়। ১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও বাঘ সংরক্ষণের জন্য ব্যাঘ্র প্রকল্প চালু হয়। এর সঙ্গে ১৯৮০ সালে প্রবর্তিত হয় অরণ্য সংরক্ষণ আইন ভারতে অভয়ারণ্যের সংখ্যা পাঁচশোর অধিক। সঙ্গে দেশে ১৩টি জৈবক্ষেত্র সংরক্ষণও করা হয়। এর মধ্যে চারটি বিশ্ব জৈবক্ষেত্র সংরক্ষণ নেটওয়ার্কের অন্তর্গত। রামসর কনভেনশন অনুসারে ভারতে পঁচিশটি জলাভূমি আছে; যার একটি কলকাতা মহানগরীর পূর্বভাগে অবস্থিত।

ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। স্বাধীনোত্তর কালে অধিকাংশ সময় জুড়েই এদেশের শাসনকর্তৃত্ব ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আওতাধীন। অন্যদিকে ভারতের রাজ্য-রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) (সিপিআই(এম)) প্রভৃতি জাতীয় দল ও একাধিক আঞ্চলিক পার্টি। দুটি সংক্ষিপ্ত পর্যায় বাদে ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল অবধি জাতীয় কংগ্রেস সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মর্যাদা ভোগ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত জরুরি অবস্থা-জনিত গণঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে জনতা পার্টি সরকার গঠন করে। ১৯৮৯ সালে জনতা দলের নেতৃত্বে জাতীয় ফ্রন্ট বামফ্রন্টের সহযোগিতায় নির্বাচনে জয়লাভ করে দু-বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। ১৯৯১ সালে কোনও পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ না করতে পারায় কংগ্রেস পি ভি নরসিমা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে। এই সরকার অবশ্য পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সক্ষম হয়। 

১৯৯৬-১৯৯৮ সালটি কেন্দ্রীয় সরকারের অস্থিরতার যুগ। এই সময় একাধিক স্বল্পকালীন জোট কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত সময়কালের জন্য বিজেপি সরকার গঠন করে। তারপর কংগ্রেস ও বিজেপি-বিরোধী যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) ক্ষমতা দখল করে। এই সরকারই ভারতের প্রথম পূর্ণ সময়কালের অকংগ্রেসি সরকার। ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) লোকসভায় বিপুল সংখ্যক আসনে জয়লাভ করে এবং বিজেপি-বিরোধী বাম সাংসদদের সহায়তায় সরকার গঠন করে। ইউপিএ ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। তবে বামদলগুলি আর এই জোটের সমর্থক নয়।

১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি প্রবর্তিত ভারতীয় সংবিধান বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক বিস্তারিত ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ সংবিধান। সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে বর্ণিত হয়েছে। ভারতে প্রচলিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ওয়েস্টমিনিস্টার-ধাঁচের একটি সংসদ ব্যবস্থা। এদেশের সরকার প্রথাগতভাবে ‘আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়’ সরকার ব্যবস্থা হিসাবে বর্ণিত হয়; যার বৈশিষ্ট্য হল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল একাধিক রাজ্য সরকারের সহাবস্থান। যদিও ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংস্কার ও পরিবর্তনের ফলে রাজ্য সরকারগুলির ক্ষমতার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি দেশকে চালিত করছে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দিকে।

ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি পরোক্ষভাবে একটি নির্বাচক মণ্ডলী কর্তৃক পাঁচ বছরের সময়কালের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ভারতের সরকার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। অধিকাংশ শাসনক্ষমতা ন্যস্ত থাকে তার হাতেই। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীকে প্রথাগতভাবে সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ট আসনপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল বা জোটের সমর্থন লাভ করতে হয়। রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রী পরিষদ (যার কার্যনির্বাহী সমিতি হল ক্যাবিনেট)—এই নিয়ে গঠিত ভারতের শাসনবিভাগ। দপ্তরযুক্ত মন্ত্রীদের সকলকেই সংসদের কোনও না কোনও কক্ষের সদস্য হতে হয়। ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় শাসনবিভাগ আইনবিভাগের অধস্তন। সেই কারণে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রী পরিষদকে সংসদের নিম্নকক্ষের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়।

ভারতের আইনবিভাগ হল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এটি গঠিত হয়েছে রাজ্যসভা নামক একটি উচ্চকক্ষ ও লোকসভা নামক একটি নিম্নকক্ষ নিয়ে। রাজ্যসভার সদস্যসংখ্যা ২৪৫; এঁদের দপ্তরকাল ছয় বছর। এঁদের অধিকাংশই রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির বিধানসভা থেকে রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন। অন্যদিকে লোকসভার ৫৪৫ জন সদস্যের মধ্যে ৫৪৩ জন পাঁচ বছরের মেয়াদে নিজ নিজ নির্বাচন কেন্দ্র থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এছাড়া রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে সংসদে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের যথেষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধি নেই, তবে তিনি দুই জন সদস্যকে উক্ত সম্প্রদায় থেকে সাংসদ মনোনীত করতে পারেন।

ভারতে এককেন্দ্রিক ত্রি-স্তর বিচারব্যবস্থা প্রচলিত। এই বিচারব্যবস্থা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট, ২১টি হাইকোর্ট ও অসংখ্য বিচারবিভাগীয় আদালতের সমন্বয়ে গঠিত। মৌলিক অধিকার, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে বিবাদ ও হাইকোর্টের আপিল বিচার এলাকা সংক্রান্ত মামলাগুলির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের মূল বিচার এলাকার অন্তর্গত। এই বিচারব্যবস্থা স্বতন্ত্র এবং আইন ঘোষণা এবং সংবিধান-বিরোধী কেন্দ্রীয় বা রাজ্য আইন প্রতিহত করার ক্ষমতাযুক্ত। সংবিধানের অভিভাবকত্ব ও ব্যাখ্যাদান সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অন্তর্গত।

ভারত ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলবিশিষ্ট একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সাধারণতন্ত্র। ভারতে প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচিত রাজ্য সরকার অধিষ্ঠিত রয়েছে; নির্বাচিত সরকার রয়েছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরি ও দিল্লিতেও। অপর পাঁচটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন; এই অঞ্চলগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রশাসক নিয়োগ করে থাকেন। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইন বলে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলি স্থাপিত হয়। তারপর থেকে এই কাঠামোটি মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। তৃণমূল স্তরে শাসন ও প্রশাসন পরিচালনার লক্ষ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি মোট ৭৩৯টি জেলায় বিভক্ত। জেলাগুলি আবার মহকুমা বা তহসিলে এবং গ্রামে বিভক্ত।

ভারতের রাজ্যসমূহ ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলসমূহের মানচিত্র

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আন্তরিক। ১৯৫০-এর দশকে ভারত আফ্রিকা ও এশিয়ার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলির স্বাধীনতার স্বপক্ষে সওয়াল করে। শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণ ও মালদ্বীপে অপারেশন ক্যাকটাস—এই দুই ক্ষেত্রে ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সামরিক মধ্যস্থতায় অংশ নেয়। কমনওয়েলথের এক সদস্য ভারত, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ভারত-চীন যুদ্ধ ও ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আন্তরিক হয়ে ওঠে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়। ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত সেই সম্পর্ক একই রকম থাকে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের তিনটি যুদ্ধ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের   স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশকে সহায়তা করে। এছাড়াও ১৯৮৪ সালে সিয়াচেন হিমবাহ ও ১৯৯৯ সালে কার্গিলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

বর্তমানকালে, ভারত যে সকল প্রতিষ্ঠানে নিজ প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে সেগুলি হল অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান) , সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওন্যাল কো-অপারেশন (সার্ক) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। ভারত চারটি মহাদেশে রাষ্ট্রসংঘের ৩৫টি শান্তিরক্ষা অভিযানে প্রায় ৫৫,০০০ সেনা ও পুলিশ প্রেরণ করেছে। ব্যাপক সমালোচনা ও সামরিক অনুমোদন সত্ত্বেও পরমাণু কর্মসূচির উপর সার্বভৌমত্ব রক্ষার খাতিরে ভারত কম্প্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার-টেস্ট-ব্যান ট্রিটি (সিটিবিটি) ও নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি (এনপিটি)-তে সই করতে উপর্যুপরি অস্বীকার করছে। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার ফলে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলির সঙ্গেও ভারত সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে।

স্থলসেনা, বায়ুসেনা ও নৌসেনা নিয়ে গঠিত ভারতের সামরিক বাহিনী বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। এই সামরিক বাহিনীর সমান্তরালে কাজ করে থাকে একাধিক সহকারী বাহিনী; যথা: আধাসামরিক বাহিনী, উপকূলরক্ষী বাহিনী ও স্ট্রাটেজিক ফোর্সেস কম্যান্ড। রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরায়েল ভারতের প্রধান অস্ত্রসরবরাহকারী রাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সহকারী দেশ। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংগঠন (ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গ্যানাইজেশন বা ডিআরডিও) ব্যালিস্টিক মিসাইল, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধট্যাঙ্ক সহ দেশজ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজ তত্ত্ববধান করে, যাতে সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ভারতকে অধিক মাত্রায় বিদেশি আমদানির উপর নির্ভর করতে না হয়। ১৯৭৪ সালে স্মাইলিং বুদ্ধ ও ১৯৯৮ সালে পোখরান-২ নামে মোট ছয়টি প্রাথমিক পরমাণু পরীক্ষণের মাধ্যমে ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যদিও ভারতের ঘোষিত পরমাণু নীতি হল “প্রথম প্রয়োগ নয়”। ১০ অক্টোবর, ২০০৮ তারিখে ভারত-মার্কিন বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সাক্ষরিত হয়। তার পূর্বেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ারস গ্রুপ ভারতের উপর থেকে পরমাণু প্রযুক্তি ক্রয়বিক্রয়ের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফলে ভারত কার্যত পরিণত হয় বিশ্বের ষষ্ঠ পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে।

 
১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত ভারত সমাজতান্ত্রিক-ধাঁচের অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে চলে। 
স্বাধীনতা-উত্তর যুগের অধিকাংশ সময় জুড়ে ভারতে যে আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তাতে বেসরকারি উদ্যোগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কঠোর সরকারি বিধিনিষেধ আরোপিত থাকত। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ভারত তার বাজার উন্মুক্ত করে দেয়। বিদেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপর সরকারি কর্তৃত্ব শিথিল করা হয়। এর ধনাত্মক প্রভাবে মার্চ ১৯৯১ সালে ৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় ৪ জুলাই, ২০০৮ তারিখে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ঘাটতি কমে আসে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বাজেটগুলিতে। যদিও সরকারি মালিকানাধীন সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণ এবং কোনও কোনও সরকারি খাত বেসরকারি ও বৈদেশিক অংশীদারদের নিকট মুক্ত করে দেওয়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

ভারতের মোট স্থুল আভ্যন্তরীক উৎপাদন বা জিডিপি ১.২৪৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ক্রয়ক্ষমতা সমতার (পিপিপি) পরিমাপে ৪.৭২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতূল্য। জিডিপি'র মানদণ্ডে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। চলতি মূল্যে ভারতের মাথাপিছু আয় ৯৭৭ মার্কিন ডলার (বিশ্বে ১২৮তম) যা ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) ভিত্তিক পরিমাপে ২,৭০০ মার্কিন ডলারের সমতূল্য (বিশ্বে ১১৮তম)। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে কৃষি প্রধান দেশ হিসাবে পরিচিত ভারতের বর্তমান জিডিপিতে পরিষেবা খাতের অবদান ৫৪ শতাংশ ; ইতিমধ্যে কৃষিখাতের অবদান হ্রাস পেয়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং শিল্পখাতের অবদান মাত্র ১৮ শতাংশ। বিগত দুই দশকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ভারতের গড় বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৭ শতাংশ।

৫১৬.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমশক্তির দেশ। এই শক্তির ৬০ শতাংশ নিয়োজিত কৃষিখাতে ও কৃষিসংক্রান্ত শিল্পগুলিতে, ২৮ শতাংশ পরিষেবা ও পরিষেবা-সংক্রান্ত শিল্পে এবং ১২ শতাংশ নিযুক্ত শিল্পখাতে। প্রধান কৃষিজ ফসলগুলি হল ধান, গম, তৈলবীজ, তুলা, পাট, চা, আখ ও আলু। প্রধান শিল্পগুলি হল অটোমোবাইল, সিমেন্ট, রাসায়নিক, বৈদ্যুতিন ভোগ্যপণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, যন্ত্রশিল্প, খনি, পেট্রোলিয়াম, ভেষজ, ইস্পাত, পরিবহন উপকরণ ও বস্ত্রশিল্প। ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদগুলি হল আবাদি জমি, বক্সাইট, ক্রোমাইট, কয়লা, হিরে, আকরিক লৌহ, চুনাপাথর, ম্যাঙ্গানিজ, অভ্র, প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোলিয়াম ও টাইটানিয়াম আকরিক। ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শক্তির চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, ভারত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ষষ্ঠ বৃহত্তম ও কয়লার তৃতীয় বৃহত্তম ভোক্তা।

বিগত দুই দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারত বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্র। শিশু-অপুষ্টির হারও বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ভারতে সর্বাধিক: ২০০৭ সালের হিসেব অনুযায়ী ৪৬ শতাংশ)। তবে বিশ্বব্যাঙ্ক নির্ধারিত দৈনিক ১.২৫ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখার (২০০৪ সালের হিসেব অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতা সমতা নামমাত্র হিসেবে নগরাঞ্চলে দৈনিক ২১.৬ টাকা ও গ্রামাঞ্চলে দৈনিক ১৪.৩ টাকা) নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১৯৮১ সালে ৬০ শতাংশ থেকে ২০০৫ সালে ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে।  সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ভারত মন্বন্তর প্রতিরোধ করতে পারলেও, দেশের অর্ধেক শিশু ওজন ঘাটতিতে ভুগছে। এই হার সারা বিশ্বের নিরিখে কেবল উচ্চই নয়, এমনকী সাব-সাহারান আফ্রিকার হারের প্রায় দ্বিগুণ।

সাম্প্রতিককালে, ভারতের বহুসংখ্যক শিক্ষিত ইংরেজি-পটু প্রশিক্ষিত পেশাদারগণ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা, মেডিক্যাল ট্যুরিজমে ও আউটসোর্সিং-এর কাজে নিযুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে ভারত সফটওয়্যার ও অর্থসংক্রান্ত, গবেষণাসংক্রান্ত ও প্রকৌশলগত পরিষেবার এক বৃহৎ রপ্তানিকারক।

২০০৭ সালে রপ্তানি ও আমদানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ২১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বস্ত্র, রত্ন, ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্যাদি ও সফটওয়্যার ভারতের প্রধান রপ্তানি পণ্য। প্রধান প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত তেল, যন্ত্রপাতি, সার ও রাসায়নিক দ্রব্য। ভারতের প্রধানতম বাণিজ্য সহযোগী হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সদর দপ্তর দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী নামে খ্যাত মুম্বই মহানগরীতে অবস্থিত।

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। ২০১৮ সালে দেশটির আনুমানিক জনসংখ্যা প্রায় ১৩৫ কোটি। ভারতের জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জন সংখ্যার প্রায় ১৭.৭৪ শতাংশ। সাম্প্রতিক কালে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রতি হাজার জনে ১১.১০ জন বা ১.১১ শতাংশ। গড়ে প্রতি দুই সেকেণ্ডে জনসংখ্যা একজন করে বাড়ে। যদিও সাম্প্রতিক দশকগুলিতে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতে শহরাঞ্চলীয় জনসংখ্যা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তথাপি প্রায় ৬৬.৮০ শতাংশ ভারতবাসী গ্রামাঞ্চলে বাস করেন। জনসংখ্যার ৩৩.২০ শতাংশ শহরে বসবাস করে। এ দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনবসতি ৪৫৫ জন।  ভারতের বৃহত্তম মহানগরগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মুম্বই (পূর্বনাম বম্বে বা বোম্বাই), নতুন দিল্লি, বেঙ্গালুরু (পূর্বনাম ব্যাঙ্গালোর), কলকাতা, হায়দ্রাবাদ ও আহমদাবাদ।
২০১৩-১৫ কালপর্বে জাতীয় পর্যায়ে লিঙ্গানুপাত প্রতি হাজার পুরুষের বিপরীতে ৯০০ জন নারী। ২০১১-এর জনমিতি অনুযায়ী ভারতে সাক্ষরতার হার ৭৪.০৪ শতাংশ, যা পুরুষদের মধ্যে ৮২.১৪ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৬৫.৪৬ শতাংশ। সাক্ষরতার সর্বনিম্ন হার বিহার রাজ্যে: ৬৩.৮২ শতাংশ। শহর-গ্রাম স্বা‌ক্ষরতার পার্থ‌ক্য ২০০১ সালে ছিল ২১.২ শতাংশ, যা ২০১১ সালে নেমে আসে ১৬.১ শতাংশে। গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে স্বা‌ক্ষরতা বৃদ্ধির হার শহর এলাকার তুলনায় দ্বিগুণ। সাক্ষরতার হার সর্বাধিক কেরল রাজ্যে (৯১%)।

ভারতের দুটি প্রধান ভাষাগোষ্ঠী হল ইন্দো-আর্য (মোট জনসংখ্যার ৭৪%) ও দ্রাবিড় (মোট জনসংখ্যার ২৪%)। অপরাপর ভাষাগোষ্ঠীগুলি হল অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও তিব্বতি-বর্মী ভাষাগোষ্ঠী। ভারতের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীয় ভাষা হিন্দি যা কি-না কেন্দ্রীয় সরকারের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে নির্ধারিত। “সহকারী দাপ্তরিক ভাষা” ইংরেজি প্রশাসন ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ইংরেজির প্রাধান্য প্রশ্নাতীত। ভারতের সংবিধান বাংলা-সহ ২২টি ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। এগুলি হয় প্রচলিত, নয় ধ্রুপদি ভাষা। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা পেয়ে আসা তামিল ও সংস্কৃত এবং কন্নড় ও তেলুগু ভাষাকে ভারত সরকার নিজস্ব একটি যোগ্যতাসূচকবলে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা দান করেছে। ভারতে উপ-ভাষার সংখ্যা ১,৬৫২টি।

৮০ কোটিরও বেশি (৮০.৫%) ভারতবাসী হিন্দু, যদিও হিন্দু বলতে সিন্ধু নদের অববাহিকায় বসবাসরত সকলকেই বোঝায়। অন্যান্য ধর্মসম্প্রদায়গুলির মধ্যে রয়েছে মুসলমান (১৩.৪%), খ্রিস্টান (২.৩%), শিখ (১.৯%), বৌদ্ধ (০.৮%), জৈন (০.৪%), ইহুদি, পারসি ও বাহাই ধর্মাবলম্বী মানুষ। উল্লেখ্য, ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু, শিখ, জৈন, জরাথ্রুষ্টবাদী ও বাহাই ধর্মা‌বলম্বী জনসংখ্যা রয়েছে এবং ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা সমগ্র বিশ্বের নিরিখে তৃতীয়-বৃহত্তম এবং অ-মুসলমান প্রধান দেশগুলির মধ্যে বৃহত্তম। দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা ৮.১%।

আফ্রিকা মহাদেশের পরেই ভারত সংস্কৃতি, ভাষা ও জাতিগতভাবে বিশ্বে সর্বাধিক বৈচিত্র্যপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতীয় সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই সংস্কৃতি স্বকীয় ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক আক্রমণকারী ও বহিরাগত জাতিগুলির থেকে গ্রহণ করা রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও ধারণা অঙ্গীভূত করে এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের সংস্কৃতির ওপর নিজ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতীয় স্থাপত্য এমন একটি বিষয় যার মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যময় রূপটি ধরা পড়ে। তাজমহল ও অন্যান্য মুঘল স্থাপত্য নিদর্শন তথা দ্রাবিড় স্থাপত্য নিদর্শনগুলির মধ্যে ভারত ও বহির্ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সম্মিলন লক্ষিত হয়। ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীগুলিও দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক স্থাপত্য-বৈচিত্র্যের সাক্ষী।

ভারতীয় সঙ্গীতের জগৎটি গঠিত হয়েছে ধ্রুপদি ও আঞ্চলিক সংগীত ধারার সংমিশ্রণে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত দুটি ধারায় বিভক্ত – উত্তর ভারতের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটিক সংগীত। এই দুই প্রধান সংগীত ধারা থেকে আবার উৎসারিত হয়েছে অনেক উপধারা। আঞ্চলিক জনপ্রিয় সঙ্গীতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্র সংগীত, হিন্দি ফিল্মি গান ও ইন্ডি-পপ এবং বাউল ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রকার লোকসংগীত।

ভারতীয় নৃত্যকলাও “লোক” ও “ধ্রুপদী”—এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত। ভারতের বিখ্যাত লোকনৃত্যগুলি হল পাঞ্জাবের ভাংড়া, অসমের বিহু নৃত্য, পশ্চিমবঙ্গের ছৌ নাচ এবং রাজস্থানের ঘুমার। ভারতের সঙ্গীত নাটক অকাদেমি দেশের আটটি নৃত্যকলাকে ধ্রুপদি ভারতীয় নৃত্য আখ্যা দিয়েছে। এগুলি হল তামিলনাড়ুর ভরতনট্যম, উত্তর প্রদেশের কত্থক, কেরলের কথাকলি ও মোহিনীআট্টম, অন্ধ্রপ্রদেশের কুচিপুডি, মণিপুরের মণিপুরি, ওডিশার ওডিশি এবং অসমের সত্রিয় নাচ। এই নৃত্যশৈলীগুলি বর্ণনাত্মক ও পৌরাণিক ঘটনাকেন্দ্রিক।

ভারতীয় নাটকের বৈশিষ্ট্য হল সংগীত, নৃত্য ও তাৎক্ষণিক বা লিখিত সংলাপের যুগলবন্দি। এর বিষয়বস্তু কখনও পুরাণ থেকে, কখনো মধ্যযুগীয় প্রেমকাহিনিগুলি থেকে, কখনো আবার একালের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি থেকে গৃহীত। ভারতের লোকনাট্যের মধ্যে গুজরাটের ভাবাই, পশ্চিমবঙ্গের যাত্রা, উত্তর ভারতের নৌটঙ্কি ও রামলীলা, মহারাষ্ট্রের তামাশা, অন্ধ্রপ্রদেশের বুরাকথা, তামিলনাড়ুর তেরুককুত্তু ও কর্ণাটকের যক্ষগণ উল্লেখযোগ্য।

ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য প্রথমে মৌখিকভাবে ও পরে লিখিত আকারে প্রচলিত হয়। এই রচনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেদ, ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত, নাটক অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ ইত্যাদি সংস্কৃত সাহিত্যের ধ্রুপদী কীর্তিসমূহ এবং তামিলে রচিত সঙ্গম সাহিত্য। আধুনিক কালের ভারতীয় সাহিত্যিকদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য হলেন ১৯১৩ সালে দেশের প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এছাড়াও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যরচনার জন্য ভারতীয় অথবা ভারতীয় বংশোদ্ভুত যেসকল লেখকগণ সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছেন তারা হলেন অমিতাভ ঘোষ, মার্কিন-প্রবাসী বাঙালি সাহিত্যিক ঝুম্পা লাহিড়ী, নোবেলজয়ী ব্রিটিশ-ভারতীয় সাহিত্যিক ভি এস নাইপল প্রমুখ।

ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম চলচ্চিত্র শিল্প। বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমা প্রস্তুতকারক বলিউড বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সৃষ্টিশীল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এছাড়াও বাংলা, কন্নড়, মালয়ালম, মারাঠি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় ঐতিহ্যবাহী চলচ্চিত্র শিল্পের আছে। ভারতের প্রথম সারির চলচ্চিত্র শিল্প কেন্দ্রগুলি হল বলিউড (হিন্দি), টলিউড (বাংলা ও তেলুগু), কলিউড (তামিল), মলিউড (মালয়ালম), স্যান্ডেলউড বা চন্দনবন (কন্নড়), ও ভোজিউড (ভোজপুরি)।

ভারতীয় রন্ধনশৈলীর বিশেষত্ব হল বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ আঞ্চলিক রন্ধনপ্রণালী এবং ভেষজ ও মশলার অভিজাত প্রয়োগ। দেশের প্রধান খাদ্য ভাত (পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে) ও রুটি (মূলত উত্তর ভারতে)।

ভারতে পোষাকের ঐতিহ্য রং, ধরন ও জলবায়ুর মতো বিভিন্ন কারণে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন। থানকাপড়ের পোশাক হিসাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে শাড়ি ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ধুতি বা লুঙ্গি বিশেষ জনপ্রিয়। এছাড়া সেলাই-করা পোষাকের মধ্যে মহিলাদের সালোয়ার-কামিজ ও পুরুষদের কুর্তা-পাজামা বা ইউরোপীয়-ধাঁচে ট্রাউজার্স ও শার্ট বিশেষভাবে প্রচলিত।

ভারতে উৎসব প্রকৃতিগতভাবে ধর্মীয়। যদিও অনেক ধর্ম ও জাতি নিরপেক্ষ উৎসবও পালিত হয়ে থাকে। দীপাবলি, গণেশ চতুর্থী, উগাদি, পোঙ্গল, দোলযাত্রা, ওনাম, দশেরা, দুর্গাপূজা, কালীপূজা, জন্মাষ্টমী, ঈদুল ফিত্‌র, ঈদুল আজহা, বড়দিন, বুদ্ধজয়ন্তী, বৈশাখী প্রভৃতি কয়েকটি জনপ্রিয় উৎসব। ভারতে তিনটি জাতীয় উৎসব পালিত হয়; এগুলি হল স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস ও গান্ধী জয়ন্তী। এছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক উৎসবও যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। ধর্মাচরণও দৈনন্দিন ও গণজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়।

ভারতে সনাতন পারিবারিক মূল্য বিশেষ সম্মানের অধিকারী। একাধিক প্রজন্মের মিলনক্ষেত্র পিতৃতান্ত্রিক যৌথ পরিবারগুলিই ভারতীয় পরিবারতন্ত্রের আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। যদিও আজকাল নগরাঞ্চলগুলিতে ছোটো ছোটো নিউক্লিয়ার পরিবারের উদ্ভব ঘটতে দেখা যায়। ভারতে বিবাহ আয়োজিত হয় পাত্র ও পাত্রীর পিতামাতা ও অন্যান্য গুরুজনস্থানীয় আত্মীয়বর্গের সম্মতিক্রমে। আয়োজিত বিবাহ ভারতে এক অতিমাত্রায় লক্ষিত বিবাহরীতি। বিবাহবন্ধন সারাজীবনের বন্ধন বলে বিবেচিত হয়। তাই এদেশে বিবাহবিচ্ছেদের হারও অত্যন্ত কম। ভারতে বাল্যবিবাহ প্রথা আজও প্রচলিত যদিও বাল্যবিবাহের হার ক্রমহাসমান। ইউনিসেফের স্যাম্পেল সার্ভে এবং ভারতের জনগণনা অনুযায়ী ২০০৬-এ যেখানে ৪৭% নারীর বিবাহ হত ১৮ বছর বয়সের আগে, ২০১৬ সালে সেই স্ংখ্যা ২৭%।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে অতি প্রাচীন কাল থেকেই ভারত তার নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে এসেছে। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে ভারতীয় ধাতুবিদগণ দিল্লির লৌহস্তম্ভটি নির্মাণ করেন। বেদাঙ্গ জ্যোতিষ গ্রন্থে সেযুগের মহাকাশ পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিকতাবাদ প্রস্তাবনার ১০০০ বছর আগেই ভারতীয় গণিতবিদ তথা জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট প্রাচীন বিশ্বধারণার ভ্রান্ততা প্রমাণ করেছিলেন। প্রাচীন বিশ্বে একমাত্র ভারতেই গড়ে উঠেছিল হীরের খনি। ভারতীয় গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের অন্যতম বলে বিবেচিত হন। ১৯২৮ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ভারতীয় পদার্থবিদ চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন।

স্বাধীনোত্তর ভারতকে একটি দরিদ্র রাষ্ট্র বলে বিবেচনা করা হলেও, স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশকের মধ্যেই এই দেশ প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার এক মহাশক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সাক্ষরতার হার ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নগরকেন্দ্রের উদ্ভব ভারতের এই প্রযুক্তিগত উত্থানের কারণ। ১৯৭৫ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ আর্যভট্টের উৎক্ষেপণ, তার পূর্ববর্তী বছরে স্মাইলিং বুদ্ধ নামে এক ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষণ, দূরসংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পারমাণবিক চুল্লি ও হোমি জাহাঙ্গির ভাবা পরিচালিত বিএআরসি-এর মতো গবেষণা কেন্দ্রের বিকাশ ভারতের উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক সাফল্য বলে বিবেচিত হয়। লো-আর্থ, মেরু ও জিওস্টেশনারি কক্ষপথে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের এক দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ভারত। এএসএলভি, পিএসএলভি, জিএসএলভি ও সর্বোপরি ইনস্যাট কৃত্রিম উপগ্রহ সিরিজগুলি ভারতের সফল মহাকাশ-কর্মসূচির স্বাক্ষর। ২০০৮ সালে চাঁদের মাটিতে অবতীর্ণ হয় প্রথম ভারতীয় মহাকাশযান চন্দ্রযান-১। চন্দ্রযানের পাঠানো তথ্য থেকে নাসার তত্ত্বাবধানে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে মুন মিনারেলজি ম্যাপার যন্ত্রে বিস্ময়করভাবে প্রভূত পরিমাণ হাইড্রক্সিল আয়ন এবং বরফের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। দেশীয় বিমানশক্তির ক্ষেত্রে বৈকল্পিক শক্তি হিসেবে অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার ও এলসিএ তেজস-এর নাম করা যায়। লারসেন অ্যান্ড টাব্রো, ডিএফএল-এর মতো কোম্পানিগুলির সাহায্যে আবাসন ও পরিকাঠামো শিল্পেও ভারত আজ উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর।

২০০৩ সালে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং তৈরি করে ভারতের প্রথম সুপারকম্পিউটার পরম পদ্ম। এটি পৃথিবীর দ্রুততম সুপারকম্পিউটারগুলির অন্যতম। ১৯৯০-এর দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লব তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় এক অগ্রণী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে বিশ্বের মঞ্চে উপস্থাপিত করে। বর্তমানে আই বি এম, মাইক্রোসফট, সিসকো সিস্টেমস, ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস, উইপ্রো ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলি ভারতের বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, চেন্নাই প্রভৃতি শহরে তাদের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেছে।

ভারতের সুনির্দিষ্ট জাতীয় খেলা নেই। আনেকে একে কাবাডি কিংবা ফিল্ড হকি মনে করেন। কিন্তু বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়।
কাবাডি বিশ্বকাপে ভারত জয়ের হ্যাটট্রিকও করেছে। 
ইন্ডিয়ান হকি ফেডারেশনের উপর এদেশের হকি পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। ভারতীয় হকি দল ১৯৭৫ সালের পুরুষদের হকি বিশ্বকাপ এবং পুরুষদের অলিম্পিক গেমসে পাঁচবার স্বর্ণপদক বিজয়ী। ফুটবল খেলা ভারতে জনপ্রিয়। ২০১৮-তে কলকাতার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম অনূর্ধ্ব ১৭ যুব বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলায় ইংল্যান্ড বিজয়ী হয়। আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত খেলতে পেয়েও উল্লেখযোগ্য ফল পায়নি। ভারতের ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলো হল: জাতীয় ফুটবল সন্তোষ ট্রফি, আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ, নেহরু কাপ, ডুরান্ড কাপ এবং ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। ভারতে ফুটবল খেলা পরিচালনা করে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। যদিও ভারতে সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা হল ক্রিকেট। ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দল ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ২০০৭ সালের আইসিসি বিশ্ব টোয়েন্টি-২০ এবং ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ বিজয়ী। এছাড়াও ২০০৩ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও ২০১৪ সালে আইসিসি বিশ্ব টোয়েন্টি-২০ তে ফাইনালে পরাজিত হয়। ভারতে ক্রিকেট পরিচালিত হয় বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই) কর্তৃক। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রঞ্জি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, দেওধর ট্রফি, ইরানি ট্রফি ও চ্যালেঞ্জার সিরিজ। ভারতের জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা দেশে প্রভূত জনপ্রিয়তা ও নানাবিধ বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী।

ভারতীয় দলের ডেভিস কাপ বিজয়ের পর থেকে ভারতে টেনিসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ফুটবল পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর-পূর্ব ভারত, গোয়া ও কেরলে বেশ জনপ্রিয়। ভারত জাতীয় ফুটবল দল বহুবার সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন কাপ জিতেছে। ভারত ১৯৫১ ও ১৯৮২ সালে এশিয়ান গেমস আয়োজন করেছিল। এছাড়াও ভারত ছিল ১৯৮৭ ও ১৯৯৬ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ ছিল; ভারত ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ। দাবা খেলার উদ্ভবও হয়েছিল ভারতে। দেশে গ্রান্ডমাস্টার দাবাড়ুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আজ দাবা ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় একটি খেলা। এছাড়াও দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় খেলা হল কাবাডি, খো খো, ও গুলি ডান্ডা ইত্যাদি। ভারতে প্রাচীন যোগব্যায়াম এবং বিভিন্ন ভারতীয় মার্শাল আর্ট, কালারিপ্পায়াত্তু, বার্মা কলাই ইত্যাদি আজও জনপ্রিয়। ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক ক্রীড়া পুরস্কার হল রাজীব গান্ধী খেলরত্ন ও অর্জুন পুরস্কার (খেলোয়াড়দের জন্য) এব দ্রোণাচার্য পুরস্কার (কোচিং-এর জন্য)।




#Article 36: পাকিস্তান (1064 words)


পাকিস্তান (), সরকারিভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান (), দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। ২১,২৭,৪২,৬৩১ এর অধিক জনসংখ্যা নিয়ে এটি জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং আয়তনের দিক থেকে ৩৩তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। পাকিস্তানের দক্ষিণে আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরীয় উপকূলে ১০৪৬ কিলোমিটার (৬৫০ মাইল) উপকূল রয়েছে এবং এটি পূর্ব দিকে ভারতের দিকে, আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমে, ইরান দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং উত্তর-পূর্ব দিকে চীন সীমান্তে অবস্থিত। এটি উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোরের দ্বারা তাজিকিস্তান থেকে সংকীর্ণভাবে বিভক্ত এবং ওমানের সাথে সমুদ্রের সীমান্ত ভাগ করে।

ফার্সি ও উর্দু ভাষায় 'পাকিস্তান' অর্থ- পবিত্র স্থান বা এলাকা। ফার্সি ও পশতু শব্দ 'পাক' অর্থ- পবিত্র। আর শব্দাংশ ـستان (-স্তান) একটি তৎসম-ফার্সি শব্দ যার অর্থ স্থান বা এলাকা। চৌধুরী রহমত আলী নাউ অর নেভার পুস্তকে এ নামটির প্রস্তাব দেন।
আরবি ভাষায় এর অর্থ মদিনা-এ-তৈয়্যাবা বা পবিত্র স্থান, মদিনা শব্দের অর্থ এলাকা এবং তৈয়্যাবা অর্থ পবিত্র। আর একটি মত অনুসারে , অর্থাৎ PAKISTAN  ইংরাজি বানানে এইরূপে পাকিস্তানের নামকরণ করা হয়েছে ।

অর্থাৎ এই কয়টি নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে হিন্দুস্তান থেকে পৃথক হওয়া রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ায় এর নাম হয় 'পাকিস্তান' ।

প্রাচীন সিন্ধু অঞ্চল যা মোটামুটি বর্তমান পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ছাড়া বাকিটা নিয়ে গঠিত, প্রাচীন কালে নব্য প্রস্তর যুগীয় মেহেরগড় সহ অনেক উন্নত সভ্যতার উৎপত্তিস্থল ছিল। ব্রোঞ্জ যুগে সিন্ধু সভ্যতায় (২৮০০- ১৮০০খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)  হরপ্পা ও মহেঞ্জো-দাড়ো নামে দুটি উন্নত নগর ছিল। 
বৈদিক যুগে (১৫০০ - ৫০০খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ইন্দো আর্যদের মাধ্যমে এখানে হিন্দুদের গোড়াপত্তন হয়, যা পরবর্তীতে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। মুলতান শহর হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থযাত্রা কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ভারতীয় অঞ্চলে  ঔপনিবেশিক আমলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় যথা:
১.  ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল,
২. ব্রিটিশ সরকারের শাসনামল। 
তবে পাকিস্তান প্রথম থেকেই ইংলিশ ইস্ট  ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে যায়নি। কারণ তখনও এই অঞ্চলে স্বাধীনভাবে রাজারা শাসন করতো । তারপর ধীরে ধীরে  পাকিস্তান অঞ্চল ব্রিটিশ অধিভুক্ত হয়।

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান এ' দুটি দেশের জ‌ন্ম হয়। তারমধ্যে ছিল পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। 

তারপর পূূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এর সাথে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে যুদ্ধ শুরু হয়ে টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান পরাজিত হয়। 

পাকিস্তানের রাজনীতি বর্তমানে একটি অর্ধ-রাষ্ট্রপতিশাসিত যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সম্পাদিত হয়, যদিও অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রধানত আইনসভার উপর ন্যস্ত।

দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান । এযাবৎ কোনো প্রধানমন্ত্রী তার কার্যকাল সম্পূর্ণ করতে পারেনি। দীর্ঘ মেয়াদি প্রধানমন্ত্রীরা হলেন বেনজীর ভুট্টো , নওয়াজ শরীফ ও ইউসুফ রেজা গিলানি।

২০১৩ সালের মে মাসের ১১ তারিখে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন বর্তমান ক্ষমতাসীন নওয়াজ শরীফ।
একই বছরের জুলাইয়ের ৩১ তারিখ হতে পাকিস্তানের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মামনুন হোসাইন ।  পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একসময়কার বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ইমরান খান।

পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডটি কয়েকটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। যথা-

পাকিস্তানকে তিনটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়: উত্তরের উচ্চভূমি, সিন্ধু নদের অববাহিকা (যেটিকে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে উপবিভক্ত করা যায়) এবং বেলুচিস্তান মালভূমি।

বনাঞ্চল কম—এশিয়ার এমন দেশের তালিকায় একদম পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটির মোট আয়তনের মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ বনাঞ্চল। ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বনাঞ্চল নিয়ে পাকিস্তানের সামনেই রয়েছে মঙ্গোলিয়া। পেছন থেকে তৃতীয় অবস্থান বাংলাদেশের।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, এডিবির তালিকায় সর্বশেষ অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে খোয়া গেছে ৮ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের বনভূমি। গড়ে বছরপ্রতি এই হ্রাসের হার ৪২ হাজার হেক্টর।

পাকিস্তান একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বিবেচিত হয় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, ২০১৩-এর দশক ধরে সামাজিক অস্থিতিশীলতার পরে, রেল পরিবহন এবং বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন, যেমন মৌলিক পরিষেবায় ম্যাক্রোম্যানেজমেন্ট এবং ভারসাম্যহীন সামষ্টিক অর্থনীতিতে গুরুতর ঘাটতিগুলি বিকাশ লাভ করেছে। সিন্ধু নদীর তীরে বর্ধনকেন্দ্রগুলি'সহ দেশের অর্থনীতিকে অর্ধ-শিল্পোন্নত বলে মনে করা হয়। করাচী এবং পাঞ্জাবের নগর কেন্দ্রগুলির দেশের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষত বেলুচিস্তানে কম উন্নত অঞ্চলের সাথে বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি রয়েছে। অর্থনৈতিক জটিলতা সূচক অনুসারে, পাকিস্তান বিশ্বের ৬৭ তম বৃহত্তম রফতানি অর্থনীতি এবং ১০৬ তম সবচেয়ে জটিল অর্থনীতি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের রফতানি দাঁড়িয়েছে ২০.৮১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আমদানি হয়েছে ৪৪.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ফলে নেতিবাচক বাণিজ্য ভারসাম্য হয়েছে ২৩.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০১৬ সালের হিসাবে, পাকিস্তানের আনুমানিক নামমাত্র জিডিপি $২৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পিপিপির জিডিপি ৯,৪৬,৬৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাথাপিছু জিডিপি আনুমানিক নামমাত্র $১,৫৬১ মার্কিন ডলার, মাথাপিছু মার্কিন জিডিপি (পিপিপি) ৫,০১০ ডলার (আন্তর্জাতিক ডলার) এবং ঋণ ও জিডিপি অনুপাত ৬৬.৫০%। বিশ্বব্যাংকের মতে, পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ ও উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানের যুবকের ক্রমবর্ধমান অনুপাত দেশকে একটি সম্ভাব্য জনসংখ্যার উপাত্ত এবং উভয়ই পর্যাপ্ত পরিষেবা এবং কর্মসংস্থান সরবরাহ করে। জনসংখ্যার ২১.০৪% আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যাদের  প্রতিদিনের আয় ১.২৫ মার্কিন ডলারের কম। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫.৫%। পাকিস্তানের প্রায় ৪০ মিলিয়ন মধ্যবিত্ত নাগরিক রয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ কোটিতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ক্রয়ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বিশ্বের ২৪ তম বৃহত্তম ও পরম শর্তে ৪১ ম বৃহত্তমের স্থান দিয়েছে। 

দেশটির স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মান ভারতের এক দশমাংশ ।

২০১৭ সালের আদমশুমারীর প্রদেশের তথ্য অনুসারে, বর্তমান জনসংখ্যা ২০.৭৮ কোটি যা গত ১৯ বছরে ৫৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। যা পৃথিবীর জনসংখ্যায় ২.৬% অবদান রেখেছে।

পাকিস্তানে জন-অনুপ্রবেশ ও বঃহির্গমন দুই ধরনেরই অভিবাসন দেখা যায়। অনুপ্রবেশ মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠীর যারা আফগানিস্তান , বাংলাদেশ ও ভারত থেকে। প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন অনুপ্রবেশ ও ৬.৩ মিলিয়ন বঃহির্গমন পর্যবেক্ষিত হয়েছে।

পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ইংরেজি এবং জাতীয় ভাষা উর্দু। এছাড়াও দেশটিতে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, সারাইকি, পাশতু, বেলুচি, ব্রাহুই  ইত্যাদি ভাষা প্রচলিত। অনেক ভাষাই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের বিভিন্ন শাখার অন্তর্গত। উর্দু, পাঞ্জাবি ও সিন্ধি -আর্য ভাষাসমূহ, পশতু ও বেলুচি ইরানীয় ভাষাসমূহ, ব্রাহুই দ্রাবিড় ভাষাসমূহের অন্তর্গত। এছাড়া উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে বিভিন্ন দার্দীয় ভাষা যেমন খোওয়ার ও শিনা প্রচলিত।

পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার নকশা প্রণয়ন করেন সৈয়দ আমিরুদ্দিন কেদোয়াই। এই নকশাটি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ১৯০৬ সালের পতাকার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করার ৫ দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট তারিখে এই পতাকাটির নকশা গৃহীত হয়।

পতাকাটিকে পাকিস্তানে সাব্‌জ হিলালি পারচাম বলা হয়। উর্দু ভাষার এই বাক্যটির অর্থ হলো নতুন চাঁদ বিশিষ্ট সবুজ পতাকা। এছাড়াও এটাকে পারচাম-ই-সিতারা আও হিলাল অর্থাৎ চাঁদ ও তারা খচিত পতাকা বলা হয়ে থাকে।

পতাকাটির খুঁটির বিপরীত দিকের গাঢ় সবুজ অংশটি ইসলাম ধর্মের প্রতীক। খুঁটির দিকে সাদা অংশ রয়েছে, যা পাকিস্তানে বসবাসরত সংখ্যালঘু অমুসলিমদের প্রতীক। পতাকার মধ্যস্থলে রয়েছে একটি সাদা নতুন চাঁদ, যা প্রগতির প্রতীক; এবং একটি পাঁচ কোনা তারকা, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতীক।

পাকিস্তানের নাগরিক সমাজ মূলত শ্রেণিবদ্ধ, স্থানীয় ও সাংস্কৃতিক শিষ্টাচার এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মূল্যবোধের উপর জোর দেয়। প্রাথমিক ভবে পারিবারিকগুলি হ'ল বৃহৎ পরিবার, যদিও আর্থ-সামাজিক কারণে ক্ষুদ্র পরিবার গঠনের দিকে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের জন্য ঐতিহ্যবাহী পোশাক হ'ল শালওয়ার কামিজ; ট্রাউজার্স, জিন্স এবং শার্টগুলিও পুরুষদের মধ্যে জনপ্রিয়।




#Article 37: নেপাল (1012 words)


নেপাল (; ) হিমালয় অধ্যুষিত একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ যার সাথে উত্তরে চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। এর শতকরা ৮১ ভাগ জনগণই হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বেশ ছোট আয়তনের একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও নেপালের ভূমিরূপ অত্যন্ত বিচিত্র। আর্দ্র আবহাওয়া বিশিষ্ট অঞ্চল, তরাই থেকে শুরু করে সুবিশাল হিমালয়; সর্বত্রই এই বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। নেপাল এবং চীনের সীমান্ত জুড়ে যে অঞ্চল সেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১০ টি পর্বতের ৮ টিই অবস্থিত। এখানেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অবস্থিত।

নেপাল নামটির সঠিক উৎপত্তি সম্বন্ধে জানা যায়নি, তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মত অনুসারে নেপাল নামটি দুটি শব্দ নে এবং পাল থেকে এসেছে যাদের অর্থ যথাক্রমে পবিত্র এবং গুহা। তাহলে নেপাল শব্দের অর্থ দাঁড়াচ্ছে পবিত্র গুহা।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উপত্যকায় প্রাপ্ত নিওলিথিক যুগের বেশকিছু উপাদান এটিই নির্দেশ করে যে হিমালয়ান অঞ্চলে প্রায় ৯০০০ বছর থেকে মানুষ বসবাস করছে। এটি প্রতিষ্ঠিত যে প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে নেপালে তিব্বতী-বার্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ১৫০০ খৃস্টপূর্বাব্দে ইন্দো ইরানীয় বা আর্য জাতিগোষ্ঠী এই হিমালয়ান উপত্যকায় প্রবেশ করে। ১০০০ খৃস্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র রাজ্য ও কনফেডারেশন গড়ে উঠে। এরকমই একটি কনফেডারেশন ছিল সাকিয়া যার একসময়কার রাজা ছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম (৫৬৩-৪৮৩ খৃস্টাপূর্বাব্দ) যিনি গৌতম বুদ্ধ বা শুধু বুদ্ধ নামেই পরিচিত। তিনি পবিত্র ও সাধনাময় জীবনযাপনের জন্য তার রাজত্ব ত্যাগ করেছিলেন। ২৫০ খৃস্টপূর্বাব্দে এই অঞ্চলটি উত্তর ভারতের মৌর্য সম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং পরবর্তীতে ৪র্থ শতাব্দীতে এটি গুপ্ত সম্রাজ্যের অধীনে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পঞ্চম শতাব্দীর শেষ হতে শুরু করে পরবর্তী বেশ কিছুটা সময় শাসন করে একদল শাসক যারা সাধারণভাবে লিচ্ছবি নামে পরিচিত। লিচ্ছভি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে অষ্টম শতাব্দীতে এবং এরই সাথে শুরু হয় নেওয়ারি যুগের। ৮৭৯ সালে নেওয়ারিদের রাজত্ব শুরু হলেও সমগ্র রাষ্ট্রের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই অনিশ্চিত ছিল। একাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে নেপালের দক্ষিণাংশ দক্ষিণ ভারতের চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। চালুক্যদের রাজত্বকালে নেপালের ধর্মে ব্যাপক পরিবর্তন আসে কারণ সব রাজাই হিন্দু ধর্মের পৃ্ষ্ঠপোষকতা করতেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের বিপরীতে হিন্দু ধর্মের প্রচারে অবদান রাখেন।

দ্বাদশ শতাব্দীতে যেসব রাজা অধিষ্ঠান করেন তাদের নামের শেষে সাধারণ একটি শব্দ ছিল আর তা হল মল্ল যার অর্থ হচ্ছে কুস্তীগীর।

গোর্খারাজ পৃথ্বীনারায়ণ শাহ কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের পর কাঠমান্ডু উপত্যকা দখল করে ছোটবড় রাজ্যে বিভক্ত নেপালকে একটি রাষ্ট্রীয় সংহতি দান করেন। নেপালের ইতিহাসে এই সময় থেকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে হিমালয় কন্যা নেপালের যাত্রা শুরু বলা যায়। এই পৃথ্বীনারায়ণ শাহকে আজকের নেপালের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়।

বর্তমানে নেপালের রাজনীতি একটি বহুদলীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোতে সংঘটিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকার প্রধান। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। আইনসভার উপর আইন প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত। বর্তমানে বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারী নেপালের রাষ্ট্রপতি এবং খালেদ প্রসাদ শর্মা নেপাল প্রধানমন্ত্রী।

২০০৮ সালের মে মাস পর্যন্ত নেপাল একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ছিল। ঐ মাসের ২৮ তারিখে নেপালের আইনসভা সংবিধানে সংশোধন আনে এবং নেপালকে একটি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।

নেপালের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল গুলো হলো:

নেপালী সেনাবাহিনী ১৭৬২ সালে গঠিত হয় এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত নেপালের সেনাবাহিনীর নাম 'রাজকীয় নেপালি সেনা' ছিলো। নেপালে কোনো বিমান বাহিনী নেই আর যেহেতু নেপালের কোনো সমুদ্র সীমানা নেই তাই নৌবাহিনীও নেই।

নেপালকে ১৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে (নেপালি ভাষায় अञ्चल) ভাগ করা হয়েছে, যেগুলি আবার ৭৫টি জেলায় (নেপালি ভাষায় जिल्ला) বিভক্ত। নেপাল ১৪ টি জোনে ভাগ করা। ৭৫ টি জেলা।

নেপালের ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ নেপালের আকৃতি অনেকটা চতুর্ভুজের মত, প্রায় ৮০০ কিমি (৫০০মাইল) দৈর্ঘ্য এবং ২০০ কিমি (১২৫ মাইল) প্রস্থ। নেপালের মোট আয়তন প্রায় ১৪৭,১৮১ বর্গকিমি (৫৬,৮২৭ বর্গমাইল)। ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুসারে নেপাল তিন ভাগে বিভক্ত- পর্বত, পাহাড়ী উঁচু ভূমি(Hill and Siwalik region) এবং নিচু সমতল ভূমি অর্থাৎ তরাই।প্রধান ভৌগোলিক ক্ষেত্র-

দক্ষিণে ভারতের সীমান্তঘেঁষা তরাই নিম্নভূমি নারায়ণী ও কর্ণালী নদীবিধৌত।

নেপালের অর্থনীতি মূলত পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো মানুষ নেপাল ভ্রমণ করে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর লোক দক্ষিণের সমতল ভূমি অর্থাৎ তরাই-এ বসবাস শুরু করলেও এখনো দেশের সিংহভাগ মানুষ বাস করে মধ্য উচ্চভূমিতে। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল জনবিরল। রাজধানী কাঠমান্ডু দেশের সবচেয়ে বড় শহর এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৮০০,০০০ (মেট্রোপলিটন এলাকায়: ১৫ লক্ষ)।

নেপালি ভাষা নেপালের সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় ৬০% লোক নেপালি ভাষাতে কথা বলেন। এছাড়াও নেপালে আরও প্রায় ১২০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে মৈথিলী ভাষা (প্রায় ১১% বক্তা), ভোজপুরি ভাষা (প্রায় ৮%), মুর্মি ভাষা, নেওয়ারি ভাষা, এবং মগর ভাষা উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

নেপালের সংস্কৃতি হিন্দু এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির মিশ্রণে হয়েছে। নেপালের প্রধান পর্ব বিজয়া দশমী, বুদ্ধ জয়ন্তী, তিহার, ল্হোসার আদি।নেপালের রাষ্ট্রীয় পোশাক দৌরা সুরুৱাল (পুরুষ) এবং সারী (মহিলা)।

নেপালের সংস্কৃতি অনেকগুলো দেশীয়, আদিবাসী গোষ্ঠীর সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, ফলে নেপাল এক বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। নেপালের সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ, বিশেষকরে নেওয়ার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। নেওয়ার জনগোষ্ঠী অনেকগুলো পার্বণ পালন করে এবং তারা তাদের গান ও নাচের জন্য সুপরিচিত।

নেপালের সাধারণ খাদ্যতালিকা- ডাল-ভাত-তরকারী, এর সাথে থাকে আচার বা চাটনী। নিচু সমতল ভূমিতে ঘরের কাঠামো তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ, গোবর মিশ্রিত কাদা দিয়ে ঘরের দেয়াল তৈরি করা হয়। এধরনের ঘর শীতের দিনে বেশ গরম এবং গরমের দিনে বেশ ঠান্ডা থাকে।

নেপালী বৎসর ১২ মাসে বিভক্ত এবং বছরের শুরু হয় মধ্য এপ্রিলে। নেপালে সাপ্তহিক ছুটির দিন হচ্ছে শনিবার।

নেওয়ারী সঙ্গীতে ঐকতান সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়, অধিকাংশই বাজাতে হয় ঘষে ঘষে, তবে বাঁশি ও বাঁশিজাতীয় আরো কিছু বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র খুব কম ব্যবহৃত হয়। সঙ্গীত রয়েছে বিভিন্ন ব্যঞ্জনার, যা ভিন্ন ভিন্ন ঋতু এবং উৎসবকে মূর্ত করে তোলে। যেমন, পাহান চারে সঙ্গীত পরিবেশিত হয় অত্যন্ত দ্রুত লয়ে এবং ডাপা সঙ্গীত পরিবেশিত হয় খুব ধীর লয়ে। কিছু বাদ্যযন্ত্র আছে যেগুলো শুধুমাত্র যন্ত্রসঙ্গীতেই ব্যবহৃত হয়, যেমন- ধিমাই ও ভুসিয়া। ধিমাই বাজে সবচেয়ে উচ্চগ্রামে। পাহাড়গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সঙ্গীত রয়েছে, লোকগীত বা লোক দোহারী অত্যন্ত জনপ্রিয়। লোকগাঁথা নেপালী সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। চিরায়ত লোকগল্পগুলোর মূলে রয়েছে দৈনন্দিন বাস্তবতা, প্রেম-ভালবাসা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দানব, দেবতা যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। অনেক নেপালী লোককাহিনী গান ও নাচ সহযোগে পরিবেশিত হয়।

বন্যপ্রাণী বৈচিত্র্যা নেপালের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ।অত্যন্ত ঠান্ডা থেকে উষ্ণপ্রধান আবহাওয়ার তারতম্যের জন্য ,নেপালে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে এক বিরাট বিভিন্নতা বা বৈচিত্র আছে। বন্যপ্রাণী পর্যটন এই দেশের অন্যতম পর্যটন।
এখানে কিছু বন্যপ্রাণী আছে যা  একমাত্র নেপালে দেখা যায় যেমন স্পিনি ব্যাব্লার। নেপালেই বিভিন্ন প্রজাতির রডোডেন্ড্রন দেখা যায়। নেপালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য অনেকগুলি জাতীয় উদ্যান স্থাপন করা হয়। যার মধ্যে গুরত্বপূর্ণ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হল সাগরমাতা রাষ্ট্রীয় উদ্যান ও চিতোয়ান রাষ্ট্রীয় উদ্যান

নেপাল থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার নামঃ কান্তিপুর ন্যাশনাল ডেইলি নেপাল সমাচারপত্র হিমালয়ান টাইমস কাঠমন্ডু পোস্ট রাজধানী ডেইলী বুধবার সাপ্তাহিক জন আস্থা সপ্তাহিক

পর্যটন কেন্দ্র

দর্শনীয় স্থান

নাগরকট, পোখরা, কাঠমান্ডু




#Article 38: মালদ্বীপ (948 words)


মালদ্বীপ বা মালদ্বীপ প্রজাতন্ত্র (, ধিবেহী রাজ্যে জুমহূরিয়া) ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম মালে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক এর সদস্য। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিচু দেশ। পর্যটনের জন্য বিখ্যাত এ দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা মাত্র দুই দশমিক তিন মিটার এবং গড় উচ্চতা মাত্র এক দশমিক পাঁচ মিটার। এক হাজার দুই শ’রও বেশি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপ।

মালদ্বীপ নামটি সম্ভবত মালে দিভেহী রাজ্য হতে উদ্ভূত যার অর্থ হল মালে অধিকৃত দ্বীপরাষ্ট্র। কারো কারো মতে সংস্কৃত 'মালা দ্বীপ' অর্থ দ্বীপ-মাল্য বা 'মহিলা দ্বীপ' অর্থ নারীদের দ্বীপ হতে মালদ্বীপ নামটি উদ্ভূত। প্রাচীন সংস্কৃতে যদিও এরকম কোনও অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন সংস্কৃতে লক্ষদ্বীপ নামক এক অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। লক্ষদ্বীপ বলতে মালদ্বীপ ছাড়াও লাক্কাদ্বীপ পুঞ্জ অথবা চাগোস দ্বীপপুঞ্জকেও বোঝানো হয়ে থাকতে পারে। অপর একটি মতবাদ হল তামিল ভাষায় 'মালা তিভু' অর্থ দ্বীপমাল্য হতে মালদ্বীপ নামটি উদ্ভূত ।

মধ্যযুগে ইবন বতুতা ও অন্যান্য আরব পর্যটকেরা এই অঞ্চলকে 'মহাল দিবিয়াত' নামে উল্লেখ করেছেন। আরবীতে মহাল অর্থ প্রাসাদ। বর্তমানে এই নামটিই মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে লেখা হয়।

শ্রীলঙ্কা হতে আনুমানিক ৪০০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে ১০১০টি প্রবাল দ্বীপ নিয়ে গঠিত।

মালদ্বীপের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ দাবি করেন মালদ্বীপ অর্থ হচ্ছে ‘মেল দ্বীপ রাজ’ বা পুরুষশাসিত রাজ্য। মূলত ‘দ্বীপ’ একটি সংস্কৃত শব্দ আর ‘মাল’ শব্দটি দেশটির রাজধানীর নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঔপনিবেশিক আমলে ডাচ্রা তাদের নথিপত্রে এ দ্বীপপুঞ্জের নাম মালদ্বীপ বলে উল্লেখ করেন। পরে ব্রিটিশরাও একই নাম ব্যবহার করেন, যা দেশটির স্থানীয় নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শ্রীলঙ্কান প্রাচীন সাহিত্য ‘মহাবংশ’-এ মালদ্বীপকে বলা হয়েছে ‘মহিলাদ্বীপ’ বা নারীদের দ্বীপ। তবে কিছু কিছু পণ্ডিত মনে করেন, মালদ্বীপ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত মালাদ্বীপ থেকে যার অর্থ ফুলের মালার দ্বীপ। তবে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে এ দ্বীপকে বলা হয়েছে ‘লাক্কাদ্বীপ’ বা শত হাজার দ্বীপ। তবে মালদ্বীপে এক হাজারের বেশি দ্বীপ থাকলেও এক লাখ দ্বীপ নেই। আবার আরব পর্যটক ইবনে বতুতা এ দ্বীপকে বলেছেন ‘মহল দ্বীপ’ বা রাজপ্রাসাদের দ্বীপ। আর মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে ইবনে বতুতার ব্যাখ্যার নিরিখে এখনো মহল বা রাজপ্রাসাদের ছবি ব্যবহৃত হয়।

মালদ্বীপ বা দ্বীপের মালা; সংস্কৃত শব্দ ‘দ্বীপমালা’ শব্দ থেকেই মালদ্বীপ। আবার কেউ কেউ বলে যে- ‘মালে দিভেই রাজে’-এই কথা থেকে মালদ্বীপ শব্দটির উদ্ভব। ‘মালে দিভেই রাজে’-এই কথার অর্থ, ‘দ্বীপরাজ্য’। অনেকে মালদ্বীপকে মহলদ্বীপও বলে। মহল মানের (আরবিতে ) প্রাসাদ। দ্বাদশ শতক থেকেই মালদ্বীপের মুসলিম শাসন। ইবনে বতুতা মালদ্বীপ গিয়েছিলেন ১৩৪৩ খ্রিস্টাব্দে। কাজী ছিলেন। সংস্কৃতে মালদ্বীপকে লক্ষদ্বীপও বলা হয়েছে। এর অর্থ লক্ষ দ্বীপের সমাহার। আসলে মালদ্বীপ লক্ষ দ্বীপের সমাহার নয়; রয়েছে ২৬টি অ্যাটোল। (অ্যাটোল মানে লেগুন ঘেরা প্রবালদ্বীপ) ২৬টি অ্যাটোল আর ১১৯২টি ক্ষুদ্র দ্বীপ। যার মধ্যে কেবল ২০০টি বাসযোগ্য। প্রাচীন শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক গ্রন্থে মালদ্বীপকে বলা হয়েছে মহিলা দ্বীপ। সম্রাট অশোকের সময়েই অর্থাৎ সেই খ্রিস্ট ৩য় শতকেই কতিপয় বৌদ্ধ ভিক্ষু নাকি গিয়েছিল লক্ষদ্বীপে । এরপর দ্রাবিড় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ওই দ্বীপে গিয়ে বাস করতে থাকে। দ্রাবিড় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী সম্ভবত ওখানে গিয়েছিল দক্ষিণ ভারত থেকে। এর পর সিংহলীরা মালদ্বীপ যায়। এরা ছিল বৌদ্ধ। এরপর মুসলিমরা ঐ দ্বীপে মুসলিম সংস্কৃতি প্রোথিত করে। সময়টা দ্বাদশ শতক। ১১৫৩ থেকে ১৯৫৩ অবধি -এই ৮০০ বছর ৯২ জন সুলতান নিরবিচ্ছিন্নভাবে শাসন করে দ্বীপটি ।

১৫০৭ সালে পর্তুগীজ পর্যটক দম লোরেনকো দে আলামেইদা মালদ্বীপে পৌঁছায়। সে সময় পশ্চিম ভারতের গোয়ায় ছিল পর্তুগীজদের বাণিজ্য কুঠি। পর্তুগীজরা বলপূর্বক কর আদায় করত । ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ। মালদ্বীপের সুলতান হলেন সুলতান থাকুরুফানি আল-আযম। তিনি পর্তুগিজ দের মালদ্বীপ থেকে বহিস্কার করেন। সুলতান থাকুরুফানি আল-আযম মালদ্বীপের নবযুগের দ্রষ্টা। তিনিই নতুন লেখনির প্রচলন করেন। গড়ে তোলেন সামরিক বাহিনী। ব্রিটিশরা ১৮১৫ সালে শ্রীলঙ্কা পদানত করে। এরপর পদানত করে মালদ্বীপও। যা হোক। ১৯৫৩ সালে সালতানাতএর অবসান হয় ও মালদ্বীপ হয়ে ওঠে রিপাবলিক। মালদ্বীপের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন আমিন দিদি। তিনি নারীস্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। গোঁড়ারা পিছু লাগল। ফলে আমিন দিদি উৎখাত হয়ে যান। এরপর আইনসভা পুনরায় সালতানাত এর পক্ষে রায় দেয়। নতুন সুলতান হন মোহাম্মদ দিদি। ইনি ব্রিটিশদের সামরিক ঘাঁটি  তৈরির  অনুমতি  দিলে  ব্যাপক জনবিক্ষোভ সংগঠিত হয়। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ন স্বাধীনতা লাভ করে।

দেশটিতে বর্তমানে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন সরকারপ্রধান। প্রেসিডেন্টই ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন এবং তিনি হচ্ছেন তাদের প্রধান। প্রেসিডেন্ট পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তবে দেশটিতে অমুসলিমদের কোনো ভোটাধিকার নেই। দেশটিতে ৫০ সদস্যের একটি মজলিসে সুরা আছে। এরা পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই ৫০ সদস্যের মধ্যে আটজন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হন। এই একটি উপায়েই মহিলারা সংসদে প্রবেশের সুযোগ পান। দেশটিতে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে ২০০৫ সালে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইউম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এ দলের নাম ‘দ্য মালদ্বীপিয়ান পিপলস পার্টি’। একই বছর আরেকটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয় ‘মালদ্বীপিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ হিসেবে। এভাবেই দেশটিতে বহুদলীয় রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়।

ক্ষুদ্র হলে দেশটিতে আছে নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। দ্য মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (এমএনডিএফ) নামে তাদের একটি নিজস্ব যৌথ প্রতিরক্ষা বাহিনী আছে। এই বাহিনীর মূল কাজ দেশের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা। এ বাহিনীর হাতে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতে পূর্বানুমোদন দেয়া আছে। কোস্টগার্ড, ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস, ইনফেন্ট্রি সার্ভিস, ডিফেন্স ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো এমএনডিএফ’র বাহিনী পরিচালনা করে থাকে।

প্রাচীনকাল থেকেই সামুদ্রিক মাছ হচ্ছে দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তবে বর্তমানে দেশটি পর্যটন শিল্পেও যথেষ্ট উন্নতি করেছে। বলা যায়, দেশটির সবচেয়ে বড় শিল্প এখন পর্যটন। মোট আয়ের ২৮ শতাংশ এবং মোট বৈদেশিক আয়ের ৬০ শতাংশই আসে পর্যটন শিল্প থেকে। ১৯৮৯ সালে দেশটির সরকার প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ সময় বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করা হয়। গত এক দশক যাবৎ দেশটির জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি গড়ে 7.8 শতাংশের বেশি।

মালদ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ । শতকরা ১০০ ভাগ মুসলমান।
ধিবেহী ভাষা বা মালদ্বীপীয় ভাষা মালদ্বীপের সরকারি ভাষা। এই দ্বীপগুলির প্রায় সবাই ধিবেহী ভাষার বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলেন। এছারাও এখানে সিংহলি ভাষা, আরবি ভাষা এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার প্রচলন আছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

যেহেতু মালদ্বীপে দীর্ঘ ৮০০ বছর যাবত ইসলামি সালতানাত প্রতিষ্ঠিত ছিল তাই স্বভাবতই মালদ্বীপের বর্তমান সংস্কৃতি অনেকটাই ইসলাাম   দ্বারা প্রভাবিত ।

ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মালদ্বীপ প্রধান প্রবেশদ্বার । সরকারি মালিকানাধীন আইল্যান্ড এভিয়েশন সার্ভিসেস ( মালদ্বীভিয়ান ) চেন্নাই ও তিরুবনন্তপুরম , ভারত ও বাংলাদেশ এ আন্তর্জাতিক পরিবহন করে থাকে ।




#Article 39: ইতিহাস (911 words)


ইতিহাস হল মানুষের অতীত ঘটনা ও কার্যাবলীর অধ্যয়ন। বৃহৎ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি কখনও মানবিক বিজ্ঞান এবং কখনও বা সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। অনেকেই ইতিহাসকে মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখেন। কারণ ইতিহাসে এই উভয়বিধ শাস্ত্র থেকেই পদ্ধতিগত সাহায্য ও বিভিন্ন উপাদান নেওয়া হয়। একটি শাস্ত্র হিসেবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকগুলো উপবিভাগের নাম চলে আসে: দিনপঞ্জি, ইতিহাস-লিখন, কুলজি শাস্ত্র, পালিওগ্রাফি এবং ক্লায়োমেট্রিক্‌স। স্বাভাবিক প্রথা অনুসারে ইতিহাসবেত্তাগণ ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন, যদিও কেবল লিখিত উপাদান হতে ইতিহাসে সকল তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যে উৎসগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়: লিখিত, মৌখিক এবং শারীরিক বা প্রত্যক্ষ করণ। ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত তিনটি উৎসই পরখ করে দেখেন। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে লিখিত উপাদান সর্বজন স্বীকৃত। এই উৎসটির সাথে লিখন পদ্ধতির ইতিহাস অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

ইতিহাস লিখনধারার সম্পর্কিত বেশ কিছু অর্থ রয়েছে। প্রথমত, এটি দিয়ে বুঝানো হয় কীভাবে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে: পদ্ধতি ও অনুশীলনের বিকাশের গল্প। দ্বিতীয়ত, এটি বুঝায় কি সৃষ্টি করেছে: ইতিহাস লিখনরীতির নির্দিষ্ট বিষয়। তৃতীয়ত, এটি দিয়ে বুঝানো হয় কীভাবে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে: ইতিহাসের দর্শন। অতীতের বর্ণনার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৃতীয় ধারণাটি প্রথম দুটি ধারণার সাথে সম্পর্কযুক্ত করা যায়, যা মূলত বর্ণনা, ব্যাখ্যা, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ, সাক্ষ্য বা প্রমাণের ব্যবহার, বা অন্যান্য ইতিহাসবেত্তাদের উপস্থাপন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। ইতিহাস কি একক বর্ণনা নাকি ধারাবাহিক বর্ণনা হিসেবে শিখানো হবে তা নিয়ে পেশাদারী ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

ইতিহাসের দর্শন হল দর্শনের একটি শাখা যেখানে ঘটনাবলীর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়, বিশেষ করে মানবীয় ইতিহাস। এছাড়া এই শাখায় এর বিকাশের সম্ভাব্য পরমকারণমূলক সমাপ্তির কথা বিবেচনা করা হয়, যেমন মানবীয় ইতিহাসের পদ্ধতিতে কোন নকশা, কারণ, নীতি, বা সমাপ্তি রয়েছে কিনা। ইতিহাসের দর্শনকে ইতিহাস লিখনধারার সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ইতিহাস লিখনধারায় ইতিহাসের পদ্ধতি ও অনুশীলন এবং ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক বিষয় হিসেবে এর বিকাশের উপর জোড় দেওয়া হয়। আবার ইতিহাসের দর্শনকে দর্শনের ইতিহাসের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না, কারণ দর্শনের ইতিহাস হল একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে দর্শনের ধারণাসমূহের বিকাশ।

ইতিহাস এক নির্দিষ্ট সময়ে ঘটা ঘটনাবলী ও উন্নয়নকে কেন্দ্র করে লিখিত হয়। ইতিহাসবেত্তাগত সেই সময় বা যুগকে একটি নির্দিষ্ট নাম দিয়ে চিহ্নিত করেন। ভৌগোলিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে এই নামসমূহ ভিন্ন হতে পারে, যেমন সেই যুগের শুরুর সময় এবং সমাপ্তির সময়। শতাব্দী ও দশক হল বহুল ব্যবহৃত যুগ নির্দেশক এবং কালপঞ্জি অনুসারে এই যুগ নির্ধারিত হয়। বেশিরভাগ যুগ পূর্ববর্তী ঘটনার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় এবং এর ফলে এতে পূর্ববর্তী সময়ে ব্যবহৃত মৌলিক ধারণা ও বিচারবুদ্ধির প্রতিফলন দেখা যায়। যে পদ্ধতিতে যুগসমূহের নাম দেওয়া হয় তা এই যুগসমূহকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে এবং কীভাবে অধ্যয়ন করা হচ্ছে তাকে প্রভাবিত করে।

নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, যেমন মহাদেশ, দেশ ও শহরও ইতিহাস অধ্যয়নের ক্ষেত্র। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী কেন ঘটেছিল তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণ জানার জন্য ইতিহাসবেত্তাগণ ভূগোল অধ্যয়ন করে থাকেন।

যদিও অর্থনৈতিক ইতিহাস উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, বর্তমান সময়ে অর্থনীতি বিভাগে এই বিষয়ক একাডেমিক শিক্ষা দান করা হয় এবং তা প্রথাগত ইতিহাস বিভাগ থেকে ভিন্ন। ব্যবসায় তত্ত্বে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক কৌশল, সরকারি নিয়মকানুন, শ্রম বিভাগের সম্পর্কের ইতিহাস ও সমাজে এর প্রভাব বর্ণিত হয়। এছাড়া এতে নির্দিষ্ট কোম্পানি, নির্বাহী, ও উদ্যোক্তাদের জীবনী নিয়ে আলোচনা করা হয়। ব্যবসায় তত্ত্ব অর্থনৈতিক ইসিহাসের সাথে সম্পর্কিত এবং তা ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ দান করা হয়।

ধর্মের ইতিহাস শতাব্দীকাল ধরে ধর্মবহির্ভূত ও ধার্মিক দুই শ্রেণীর ইতিহাসবেত্তাদের কাছে প্রধান বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, এবং সেমিনারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে তা শিখানো হচ্ছে। এই ধরনের ইতিহাস বিষয়ক প্রধান সাময়িকীসমূহ হল চার্চ হিস্ট্রি, দ্য ক্যাথলিক হিস্ট্রিক্যাল রিভিউ, এবং হিস্ট্রি অব রিলিজিওন্স। সাধারণত এর বিষয়বস্তু হয়ে থাকে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক দিক, এমনকি ধর্মতত্ত্ব ও প্রার্থনার বিধিও। এই বিষয়ের অধীনে পৃথিবীর যে সকল অঞ্চল ও এলাকায় মানুষ বসবাস করেছে, সে সকল অঞ্চল ও এলাকার ধর্ম নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়।

পরিবেশগত ইতিহাস হল ইতিহাসের একটি নতুন ক্ষেত্র, যা ১৯৮০ এর দশকে বিকাশ লাভ করে। এতে পরিবেশের ইতিহাস এবং পরিবেশের উপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করা হয়।

বিশ্বের ইতিহাস হল গত ৩০০০ বছর ধরে প্রধান প্রধান সভ্যতার বিকাশের অধ্যয়ন। বিশ্বের ইতিহাস মূলত শিক্ষার একটি ক্ষেত্র। বিষয়টি ১৯৮০ এর দশকের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য দেশে বিশ্বায়নের ফলশ্রুতিতে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

সংস্কৃতির ইতিহাস হল সমাজে শিল্পকলা ও মানুষের চিত্র ও দৃশ্য ধারণার অধ্যয়ন। ১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে এটি সামাজিক ইতিহাসের স্থলাভিষিক্ত হয়। এটি মূলত নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের সমন্বিত রূপ যেখানে ভাষা, জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রথা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকে। এতে অতীতে মানুষের জ্ঞানচর্চা, প্রথা ও শিল্পের নথি ও বর্ণনা পরীক্ষা করা হয়। অতীতে মানুষ কীভাবে তাদের স্মৃতি ধরে রেখেছিল তা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আলোচনার প্রধান বিষয়।

সেনাবাহিনীর ইতিহাস হল যুদ্ধবিগ্রহ, যুদ্ধ কৌশল, যুদ্ধ, অস্ত্র ও যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব বিষয়ক ধারণা। ১৯৭০ এর দশকের পর থেকে আবির্ভূত হওয়া নব্য সেনাবাহিনীর ইতিহাস সেনাপ্রধানদের চেয়ে সৈন্যদের প্রতি বেশি আলোকপাত করে, বিশেষ করে রণকৌশলের চেয়ে তাদের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজ ও সংস্কৃতিতে যুদ্ধ বিগ্রহের বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে।

পেশাদার ও অপেশাদার ইতিহাসবেত্তগণ পূর্ববর্তী ঘটনাবলী আবিষ্কার, সংগ্রহ, সংগঠিত ও উপস্থাপন করেন। তারা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, পূর্বের লিখিত মৌলিক উৎস ও অন্যান্য উপায়ে, যেমন স্থানের নামের তথ্য আবিষ্কার করেন। ইতিহাসবেত্তাদের তালিকায় ঐতিহাসিক যুগের কালক্রম অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, বিশেষ করে তাদের ইতিহাস লেখার সময় অনুসারে কারণ তিনি যে সময়ে বর্তমান ছিলেন সেই সময়ের ইতিহাস না লিখে অন্য কোন সময়ের ইতিহাস রচনায় বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। কালনিরূপক ও আখ্যানকারগণ যদিও ইতিহাসবেত্তা নন, কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকেও ইতিহাসবেত্তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

ছদ্মইতিহাস হল এমন লিখিত রূপ যার সারমর্ম ঐতিহাসিক প্রকৃতির, কিন্তু ইতিহাস লিখনধারার চিরাচরিত রূপ থেকে ভিন্ন এবং এতে পরিণতি ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি ঐতিহাসিক নেতিবাচকতার সাথে সম্পৃক্ত এবং জাতীয়, রাজনৈতিক, সেনাবাহিনী ও ধর্ম বিষয়ে নতুন, কল্পনাপ্রসূত ও বিরোধপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণের মাধ্যমে উপসংহার টেনে থাকে।




#Article 40: ব্রাজিলের ইতিহাস (592 words)


১৫০০ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল একটি পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। ১৮২২ সালে এটি স্বাধীনতা অর্জন করে। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় অনেক শান্তিপূর্ণভাবে উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ব্রাজিলের উত্তরণ ঘটে। এসময় দেশে কোন রক্তপাত বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেনি। স্বাধীন হবার পর একজন সম্রাট ব্রাজিল শাসন করতেন। ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৮৯ সালে সামরিক অফিসারেরা রক্তপাতহীন কু-এর মাধ্যমে সম্রাটকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে ব্রাজিলে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপন করেন।

১৯৩০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির জমিদারেরা দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই বছর ব্রাজিলে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে যার ফলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সামরিক স্বৈরশাসকেরা ব্রাজিল শাসন করেন। ১৯৪৫ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সালে অর্থনৈতিক সমস্যা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের রেশ ধরে আরেকটি সামরিক কু ঘটে। এই সামরিক জান্তাটি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল শাসন করে। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এই সরকার বিরোধীদের উপর বেশ নিপীড়ন চালায়। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে জান্তাটি কঠোরতা হ্রাস করে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে থাকে।

যখন ব্রাজিলে পর্তুগিজ অভিযাত্রী আসেন, তখন এই এলাকাটি শত বিভিন্ন ধরনের জাকুবু উপজাতিরা বসবাস করত। পর্তুগিজরা মিনাস গেরিসের উচ্চভূমিতে কমপক্ষে ১০,০০০ বছর আগের ইন্ডিয়ানস (یndios) নামে পরিচিত প্রথম বাসিন্দাদের বসতি খুজে পেয়েছিলেন, যা এখনও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে বিরোধের বিষয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় গোলার্ধে পাওয়া প্রাচীন দ্রব্যগুলি রেডিও কার্বন পরিক্ষায় প্রমাণ হয়েছে সেগুলি প্রায় ৮,০০০ বছর বয়সী । ব্রাজিলের আমাজন উপত্যকায় সান্তেরার নিকটবর্তী অঞ্চলে খনন করা হয়েছে এবং উষ্ণ অঞ্চলটি সম্পদের সমৃদ্ধ ছিল না এই ধারণাটি পাল্টে ফেলার প্রমাণ পাওয়া যায় সেখান।Science Magazine, 13 December 1991 নৃতাত্ত্বিক, ভাষাবিদ ও জেনেটিক্সবাদীদের বর্তমান সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিকোণ হল যে প্রারম্ভিক গোষ্ঠী অভিবাসী শিকারীদের প্রথম  অংশ ছিল যারা এশিয়া থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন, বেরিং প্রণালি অতিক্রম করে বা প্রশান্ত মহাসাগর বরাবর উপকূলবর্তী সমুদ্র পথ দ্বারা অথবা উভয় পথ ধরে।

আন্দিজ পর্বতমালা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর অঞ্চলের পর্বতশ্রেণীগুলি মহাদেশঝির পশ্চিম উপকূলে স্থায়ী কৃষি সভ্যতা এবং পূর্বের আধা-ভ্রাম্যমান উপজাতির মানুষের মধ্যে একটি তাতক্ষণিক ধারালো সাংস্কৃতিক সীমা তৈরি করেছিল, যারা কখনো লিখিত তথ্য বা স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভের স্থাপনা তৈরী করেনি। এই কারণে, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের আগে ব্রাজিলের ইতিহাস সম্পর্কে খুব সামান্যই জানা যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ (প্রধানত মৃৎপাত্র), অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের একটি জটিল নমুনা  আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং মাঝে মাঝে বড় রাষ্ট্রের মত ফেডারেশনগুলির নির্দেশ করে।

ইউরোপীয়দের দ্বারা ব্রাজিল আবিষ্কারের সময় ও তার আগে বর্তমান সময়ের ব্রাজিলে প্রায় ,০০০ টি আদিবাসী উপজাতি ছিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে বেশিরভাগই আধা-খাদকপূর্ণ উপজাতি ছিল যারা শিকার, মাছ ধরার, সংগ্রহ ও অভিবাসী কৃষিকাজে দ্বারা জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করত। যখন ১৫০০ সালে পর্তুগিজরা এসেছিল, সেই সময় মূলত উপকূলে এবং প্রধান নদীগুলির তীরে উপজাতির মানুষেরা বাস করত।

উপজাতীযগুলির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, নরহত্যা এবং ব্রাজিলউডের ধনতান্ত্রিক লাল রঙের পেছনে পর্তুগিজরা বিশ্বাস করেছিল যে ব্রাজিলের উপজাতী নাগরিকদেরকে খ্রিস্টধর্মে নিয়ে আসা উচিত। কিন্তু পর্তুগিজরা দক্ষিণ আমেরিকাতে স্প্যানিশদের মত অজ্ঞাতসারে তাদের সাথে রোগ নিয়ে আসে, যার ফলে চিকিৎসার অভাবের কারণে অনেক স্থানীয় মানুষ তথা আদিবাসী অসহায় ছিল। হাজার হাজার আদিবাসী মানুষের মৃত্যু হয় হাম, গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা, গনোরিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ফলে।  আদিবাসীদের মধ্যে বাণিজ্য রুটগুলির দ্বারা দ্রুত এই সব রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং সমগ্র উপজাতির মানুষেরা ইউরোপীয়দের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না করেই ধ্বংস হয়ে যায়।

জাতিসংঘের দ্বারা শরণার্থীদের ফিরে আসার পর ১৯৮৫ সালে তান্দ্রো নেভস একটি পরোক্ষ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শপথ গ্রহণের আগেই তিনি মারা যান এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জোসে সার্নি তার জায়গায় রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৮৯ সালের সামরিক শাসনের পর জনপ্রিয় ফার্নান্ডো কোলার ডি মেলো নির্বাচনের দ্বারা প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে দুই-দফা চূড়ান্ত রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনে  ৩৫ মিলিয়ন ভোটে পরাজিত করেন। কোলার সাও পাওলো রাজ্যে অনেক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে জিতেছে। ২৯ বছর বয়সে ব্রাজিলের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি কোলার ও তার সরকারের প্রাথমিক যুগের বেশিরভাগ সময় উচ্চ-মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল, এই  মুদ্রাস্ফীতির কখনো কখনো প্রতি মাসে ২৫% হারে পৌঁছেছিল। [45]




#Article 41: প্যারাগুয়ের ইতিহাস (293 words)


প্যারাগুয়ের পূর্বাংশে আদিতে স্থানীয় আদিবাসী গুয়ারানি জাতির লোকেরা বাস করত। ১৬শ শতকে এখানে স্পেনীয় ঔপনিবেশিকদের আগমন ঘটে। বর্তমানে প্যারাগুয়ে স্পেনীয় ও গুয়ারানি সংস্কৃতির মিলনস্থল।

প্যারাগুয়ে ১৮১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। এর আগে এটি একটি স্পেনীয় উপনিবেশ ছিল। প্যারাগুয়ের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস সংঘাতময় এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন এর মূল বৈশিষ্ট্য। দেশটি দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশের ইতিহাসের তিনটি প্রধান যুদ্ধে দুইটিতে অংশ নেয়। প্রথমটি ছিল ১৮৬৫ সাথে শুরু হওয়া ত্রি-মৈত্রী যুদ্ধ। ঐ বছর প্যারাগুয়ে তার শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের সাথে একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৮৭৯ সালে এই সহিংস যুদ্ধের অবসান ঘটলেও এতে প্যারাগুয়ের অর্ধেক লোকই মৃত্যবরণ করে। এছাড়াও যুদ্ধের ফলস্বরূপ প্যারাগুয়ে তার ভূ-আয়তনের এক-চতুর্থাংশ হারায়। ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত প্যারাগুয়ে বলিভিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, যার নাম ছিল চাকো যুদ্ধ। ১৯৪৭ সালে দেশটিতে একটি গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ২০শ শতকের মাঝামাঝি প্যারাগুয়ে সামরিক প্রধান আলফ্রেদো স্ত্রোসনারের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। স্ত্রোসনার ১৯৫৪ সালে ক্ষমতা দখল করেন এবং তার সময়ে অনেক ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক এবং জার্মানির নাৎসি রাজনৈতিক দলের প্রাক্তন সদস্যরা প্যারাগুয়েতে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভ করে। স্ত্রোসনার ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন, যে বছর একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তার পতন ঘটে। তখন থেকে প্যারাগুয়ে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করে। স্ত্রোসনার প্যারাগুয়ের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও নিজমত চেপে রাখার যে সংস্কৃতি সৃষ্টি করেন, তা থেকে তারা কেবল ২১শ শতকে এসেই উত্তরণ করতে শুরু করেছে। ১৯৯৩ সালে দেশটিতে ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবারের মত একজন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে প্যারাগুয়ে এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে নিমজ্জিত। ১৯৯৯ সালে উপরাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়। এছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুয়ান কার্লোস ওয়াসমোসি (১৯৯৩-১৯৯৮) এবং লুইস গোনসালেস মাকচি (১৯৯৯-২০০৩)-র বিচারে শাস্তি হয়। ২০০৮ সালে প্যারাগুয়ের কোলোরাদো পার্টি ১৯৪৭ সালের পরে প্রথমবারের মত ক্ষমতা হারায়; তার আগে এটি অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে দেশ শাসনকারী রাজনৈতিক দল ছিল। তবে ২০১৩ সালে দলটি আবার ক্ষমতায় ফেরত আসে।




#Article 42: সুরিনামের ইতিহাস (1437 words)


ইউরোপীয়দের আগমনের আগে বর্তমান সুরিনাম এলাকাটিতে আরাওয়াক, কারিব ও ওয়ার্‌রাউ নামের আদিবাসী আমেরিকান গোত্রগুলি বাস করত। বেশির ভাগ আদিবাসী আমেরিকান ছোট ছোট স্বাধীন গ্রামে বাস করত, যেখানে আত্মীয়তার বন্ধনে গঠিত হত সম্প্রদায়। এরা শিকার করে ও ক্ষেতখামার করে জীবন চালাত। মূলত কন্দ জাতীয় ফসলের আবাদ হত, যেমন কাসাভা। উপকূলের লোকেরা আরাওয়াক ভাষায় এবং অভ্যন্তরভাগের লোকেরা কারিবীয় ভাষায় কথা বলত।

১৬শ শতকের শেষভাগে এসে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকেরা সুরিনামের উপকূলে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। ১৭শ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজ বণিকেরা দেশটিতে বসতি স্থাপন শুরু করে। ১৬৫০ সালে সুরিনাম নদীর তীরে একটি ব্রিটিশ দল প্রথম স্থায়ী ইউরোপীয় বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ওলন্দাজ পশ্চিম ভারতীয় কোম্পানির একটি নৌবহর এই বসতিটি দখল করে। ১৬৬৭ সালে ব্রেডার চুক্তির মাধ্যমে ইংরেজরা উত্তর আমেরিকায় নিউ অ্যামস্টার্ডাম (বর্তমান নিউ ইয়র্ক শহর)-এর বিনিময়ে এই উপনিবেশটির একাংশ ওলন্দাজদের দিয়ে দেয়। ফলে সুরিনাম সরকারীভাবে ওলন্দাজ নিয়ন্ত্রণে আসে। তখন থেকে ওলন্দাজরা সুরিনামকে একটি উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে থাকে। তবে ১৭৯৫-১৮০২ এবং ১৮০৪-১৮১৬ যুদ্ধচলাকালে ব্রিটিশরা সাময়িকভাবে সুরিনামের দখল নিয়েছিল।

সুরিনামে ওলন্দাজ উপনিবেশের অর্থনীতির প্রাথমিক ভিত্তি ছিল প্ল্যান্টেশন কৃষি। ওলন্দাজেরা সুরিনামে অনেক প্ল্যান্টেশন স্থাপন করে এবং আফ্রিকা থেকে বিরাট সংখ্যক ক্রীতদাসকে এগুলিতে কাজ করাতে নিয়ে আসে। প্ল্যান্টেশনে চাষ করা শস্যের মধ্যে প্রধান ছিল আখ। তবে কিছু কিছু প্ল্যান্টেশনে কফি, কাকাও, নীল, তুলা, খাদ্যশস্য ও কাঠ উৎপাদনী বৃক্ষও উৎপাদন করা হত। ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত প্ল্যান্টেশন অর্থনীতি প্রসার লাভ করে। সেসময় এখানে ৫৯১টি প্ল্যান্টেশন ছিল, যাদের মধ্যে ৪৫২টি চিনি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শস্য উৎপাদন করত এবং এবং ১৩৯টি খাদ্যশস্য ও কাঠ উৎপাদন করত। ১৭৮৫ সালের পর কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে। প্ল্যান্টেশনের মালিকেরা অন্যত্র আরও বেশি আয় করা শুরু করে, এবং দাসদের মুক্তিলাভের ফলে প্ল্যান্টেশনের খরচ বেড়ে যায়। ১৮৬০ সাল নাগাদ মাত্র ৮৭টি চিনির খামার অবশিষ্ট ছিল এবং ১৯৪০ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪।

চিনি উৎপাদনকারী অন্যান্য দাসভিত্তিক উপনিবেশগুলির মত সুরিনামেও সমাজব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে উপরের স্তরে ছিল একটি ক্ষুদ্র অভিজাত ইউরোপীয় শ্রেণী। এরা ছিল মূলত সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, প্ল্যান্টেশনের মালিকেরা, যারা তাদের প্ল্যান্টেশনে বসবাস করত এবং প্ল্যান্টেশনের প্রশাসকেরা, যারা মালিকের অনুপস্থিতিতে সেগুলির দেখাশোনা করত। ইউরোপীয়দের সিংহভাগই ছিল ওলন্দাজ, তবে কেউ কেউ জার্মান, ফরাসি, বা ইংরেজও ছিলেন। অভিজাত শ্রেণীর ঠিক নিচের স্তরটিতে ছিল মুক্ত নাগরিকদের নিয়ে গঠিত মধ্যস্তর। জাতিগতভাবে বিচিত্র এই দলটির সদস্য ছিল সুরিনামে জন্ম নেওয়া ইউরোপীয় বংশদ্ভূত লোক, দাসী মহিলদের গর্ভে ইউরোপীয়দের ঔরসজাত সন্তানাদি, এবং যেসমস্ত দাসকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল বা যারা মুক্তি কিনে নিয়েছিল। সমাজের একেবারে নিম্নস্তরে ছিল দাসেরা, এবং এরাই ছিল সমাজের বৃহদংশ।

সুরিনামের দাসপ্রথা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির। দাসদেরকে সম্পত্তির মত ব্যবহার করা হত, এবং তাদের কোন আইনি অধিকার ছিল না। ঔপনিবেশিক আইন অনুসারে দাসদের মালিকদের ছিল সর্বময় একচ্ছত্র ক্ষমতা। কোন কোন দাস নদীপথে পালিয়ে দেশের অভ্যন্তরভাগের অতিবৃষ্টি অরণ্যে স্বাধীন গ্রাম স্থাপন করে বিছিন্নভাবে বসবাস করত। উপনিবেশের সেনাদল দিয়ে এদের ধরে আনার অনেক চেষ্টা করা হলেও তারা তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখে। এদের বংশধরেরা আজও সেসব এলাকায় বসবাস করে।

১৯শ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় মনোভাব দাসপ্রথা অবসানের প্রতি অনুকূল হয়। ১৯শ শতকের মধ্যভাগে ইংরেজ ও ফরাসিরা আইন করে তাদের দাসদের মুক্তির ব্যবস্থা করে। তখন ওলন্দাজেরাও তাদের উপনিবেশগুলিতে দাসদের মুক্তির ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে থাকে। সুরিনামের প্ল্যান্টেশন মালিকেরা ভয় করছিল যে মুক্তিপ্রাপ্ত দাসেরা আর প্ল্যান্টেশনে কাজ করতে চাইবে না। তাই আইন করে মুক্তির পরেও ১০ বছর ন্যূনতম ভাড়ায় সরকারী নির্দেশনায় দাসদের প্ল্যান্টেশনে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৮৬৩ সালে পূর্ণ মুক্তির পর প্রাক্তন দাসেরা ভাল বেতনের চাকরি ও উন্নত শিক্ষার আশায় পারামারিবো শহরে ভিড় জমাতে থাকে।

এই স্থানান্তরের ফলে সুরিনামের প্ল্যান্টেশনগুলিতে কর্মীর যে অভাব দেখা দেয়, তা পূরণ করতে এশিয়া থেকে শ্রমিক আমদানি করে নিয়ে আসা হয়। ১৮৫৩ ও ১৮৭৩ সালের মধ্যে ২৫০২ জন চীনা শ্রমিক এবং ১৮৭৩ থেকে ১৯২২ সালের ভেতর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আরও প্রায় ৩৪ হাজার, এবং ১৮৯১ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩২,৯৬৫ জন শ্রমিক নিয়ে আসা হয়। এই শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের জন্য প্ল্যান্টেশনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি সম্বলিত চুক্তি স্বাক্ষর করে এখানে কাজ করতে আসে। এদের অধিকাংশই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে এই এশীয় শ্রমিকদের বংশোদ্ভূতরা সুরিনামের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ গঠন করেছে।

ঔপনিবেশিক পর্বের অধিকাংশ সময় জুড়ে একজন ওলন্দাজ-নিযুক্ত গভর্নর সুরিনাম শাসন করতেন এবং তাকে এই কাজে দুইটি কোর্ট সাহায্য করত। এই কোর্টগুলির উপনিবেশের ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে থেকে ওলন্দাজরা কর্মচারী বেছে নিত। ১৮৬৬ সালে কোর্টগুলি বিলুপ্ত করে একটি আইনসভা গঠন করা হয়, যদিও গভর্নরের আইনসভার নির্দেশের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা ছিল। সম্পত্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে কঠোর নিয়মের কারণে প্ল্যান্টেশনের মালিকেরাই সুরিনামের আইনসভায় প্রথমদিকে আধিপত্য বিস্তার করতেন। ওলন্দাজ সরকার যোগ্যতার নিয়ম শিথিল করার সাথে সাথে উচ্চ- ও নিম্ন-শ্রেণীর ক্রেওলেরা ১৯০০ সালের পর থেকে আইনসভায় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। তবে ১৯৪৯ সাল পর্যন্তও যোগ্য ভোটারের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২%-এর বেশি ছিল না। ১৯৪৯ সালে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে ভোটপ্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়।

১৯২২ সালে সুরিনাম নেদারল্যান্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ১৯৫৪ সালে একটি নতুন সংবিধান করে এটিকে ওলন্দাজ রাজ্যের অন্যান্য সদস্যদের সমমানের একটি সদস্যের মর্যাদা দেয়া হয়। অন্য সদস্যগুলি ছিল নেদারল্যান্ড্‌স নিজে এবং ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত নেদারল্যান্ড্‌স অ্যান্টিল দ্বীপপুঞ্জ। এই নতুন সংবিধান মোতাবেক ওলন্দাজ সরকার সুরিনামের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্কের দেখাশোনা করত এবং সুরিনামের গভর্নর নিয়োগ করত, আর সুরিনামবাসীরা একটি আইনসভা নির্বাচন করত, যা সুরিনামের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারগুলি দেখাশোনা করত।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নেদারল্যান্ড্‌স থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা সমর্থনকারী একটি কোয়ালিশন জয়লাভ করে এবং প্রধানমন্ত্রী হেন্‌ক আরনের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। এই সরকার ওলন্দাজ সরকারের সাথে স্বাধীনতার বিষয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করে। ১৯৭৫ সালের ২৫শে নভেম্বর ওলন্দাজ সরকার সুরিনামকে স্বাধীনতা প্রদান করে। তবে প্রায় ৪০,০০০ লোক ওলন্দাজ নাগরিকত্বেই থেকে যান এবং সুরিনাম থেকে নেদারল্যান্ড্‌সে ফেরত চলে যান। ১৯৭৭ সালে নতুন স্বাধীন সুরিনাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে হেন্‌ক আরন তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখেন।

১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে আরন ক্ষমতাচ্যুত হন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেজিরে বুতের্সে-র নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার জাতীয় সেনা কাউন্সিল গঠন করেন। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই কাউন্সিল আইনসভা বিলোপ করে এবং সংবিধান স্থগিত করে। কাউন্সিল রাষ্ট্রপতি হেঙ্ক চিন সেনকেও ক্ষমতাচ্যুত করে। সেন ও আরও হাজার হাজার লোক নেদারল্যান্ড্‌সে পালিয়ে যান। বুতের্সে সুরিনামের জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সেনাপ্রধান হিসেবে দেশ চালাতে থাকেন। ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা এবং ১৯৮২ সালে একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী জোট গঠনের প্রচেষ্টাকে নিষ্ঠুর হাতে দমন করা হয়। ১৯৮৫ সালে সেনাবাহিনী ১৫ জন নাগরিকের উপর অত্যাচার চালায় ও তাদের হত্যা করে। এ ঘটনার পর নেদারল্যান্ড্‌স সুরিনামকে সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেনাবাহিনী একটি নতুন আইনসভা গঠনে সায় দেয়। রাজনৈতিক দলগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়া হয় এবং আরন আবার জাতীয় কাউন্সিলে যোগ দেন।

১৯৮৬ সালে দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। সুরিনামীয় মুক্তিবাহিনী নামের এই বিদ্রোহীরা সাংবিধানিক অবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। কয়েক মাসের মধ্যে তারা প্রধান প্রধান বক্সাইট খনি ও শোধনকারী শিল্পগুলি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়। এই সময় একটি নতুন সংবিধান রচনা করা হয় এবং ১৯৮৭ সালের গণভোটে ৯৩% ভোট পেয়ে এটি পাশ হয়।

১৯৮৭ সালের সংবিধান নাগরিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। নভেম্বরের নির্বাচনে বুতের্সের দল ৫১টি আসনের মধ্যে মাত্র ২টিতে জয়লাভ করে, অন্যদিকে ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামের বহুজাতিক দল ৪০টি আসন জেতে। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় আইনসভা প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী রামসেওয়াক শংকরকে রাষ্ট্রপতি এবং আরনকে উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। ১৯৮৮ সালে ওলন্দাজেরা আবার সুরিনামকে সাহায্য পাঠাতে শুরু করে এবং পরবর্তী সাত থেকে আট বছর ধরে ৭২১ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। বক্সাইট খনিগুলিতে আবার কাজ শুরু হয়।

সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও বুতের্সে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। তিনি ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে শংকরের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ১৯৯১ সালে নতুন করে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নিউ ফ্রন্ট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামের একটি কোয়ালিশন সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশনের নেতা রোনাল্ড ভেনেতিয়ান রাষ্ট্রপতি পদ লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচিনে ভেনেতিয়ানের কোয়ালিশন স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়। ন্যাশনাল ডেমোক্র‌্যাটিক পার্টির জুল উইডেনবশ নতুন রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সরকারী চাকুরেদের বেতন প্রদানে ব্যর্থতা, এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের মত অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং দলে উইডেনবশের সরকারের উপর অনাস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে দেশব্যাপী এক ধর্মঘট হয় ও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। উইডেনবশ এক বছর আগেই ২০০০ সালের মে-তে নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে ভেনেতিয়ানের নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশন বিজয়ী হয় এবং ২০০০ সালের আগস্টে ভেনেতিয়ান আবার রাষ্ট্রপতি পদলাভ করেন। জাতীয় সংসদে ভেনেতিয়ানের মূল বিরোধী দল ছিল মিলেনিয়াম কম্বিনেশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন বুতের্সে।

১৯৯৭ সালে ওলন্দাজ সরকার বুতের্সের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক গ্রেফতার ওয়ারেন্ট জারি করে। তার বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসে বিপুল পরিমাণে কোকেন পাচারের অভিযোগ আনা হয়। সুরিনাম বুতের্সেকে নেদারল্যান্ডসের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। ২০০০ সালের জুনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের এক আদালতে বুতের্সেকে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার ও শাস্তি প্রদান করা হয়। ২০০৪ সালে ওলন্দাজ ও সুরিনাম সরকার মাদক চোরাচালানি বন্ধের ব্যাপারে পরস্পরকে সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হয়।

২০০৫ সালে সুরিনামের সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচনে ভেনেতিয়ানের নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশন দশটি আসন হারায় এবং এর ফলে সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষুণ্ণ হয়। জুলাই মাসে ৫১-সদস্যবিশিষ্ট আইনসভা দুই দফা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্ণয়ের চেষ্টা করে, কিন্তু ভেনেতিয়ান কিংবা বিরোধী প্রার্থী রাবিন পারমেসার কেউই দরকারি দুই-তৃতীয়াংশ ভোট অর্জনে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে ৮৯১ সদস্যবিশিষ্ট প্রাদেশিক কাউন্সিলের সভায় এক বিশেষ ভোটে ভেনেতিয়ান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।




#Article 43: সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহের তালিকা (259 words)


এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহের তালিকা যা সারাবিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ওপর তথ্যসহ তাদের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে|

তালিকাটিতে ২০৬টি দেশ লিপিভুক্ত আছে| দেশগুলো বিভক্ত করা হয়েছে দুটি পদ্ধতির ব্যবহার করে:

এমন একটি তালিকা তৈরি করা একটি দুরূহ ও বিতর্কিত প্রক্রিয়া যেহেতু এমন কোনো সংজ্ঞা নেই যা জাতিগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রত্বের মানদণ্ড বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে| এই তালিকাটির বিষয়বস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত মানদণ্ড সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্যের জন্যে অনুগ্রহ করে নিচের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মানদণ্ড অনুচ্ছেদটি দেখুন|

The dominant customary international law standard of statehood is the declarative theory of statehood that defines the state as a person of international law if it possess[es] the following qualifications: (a) a permanent population; (b) a defined territory; (c) government; and (d) capacity to enter into relations with the other states. Debate exists on the degree to which recognition should be included as a criterion of statehood. The declarative theory of statehood, an example of which can be found in the Montevideo Convention, argues that statehood is purely objective and recognition of a state by other states is irrelevant. On the other end of the spectrum, the constitutive theory of statehood defines a state as a person under international law only if it is recognized as sovereign by other states. For the purposes of this list, included are all states that either:

Note that in some cases there is a divergence of opinion over the interpretation of the first point, and whether an entity satisfies it is disputed.

On the basis of the above criteria, this list includes the following 206 entities:




#Article 44: আবখাজিয়া (202 words)


আবখাজিয়া (আবখাজ ভাষায়: Аҧсны; জর্জীয় ভাষায়: აფხაზეთი; রুশ ভাষায়: Абха́зия) ককেসাস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত আইনত একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রশাসনিক অঞ্চল এবং কার্যত একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র। তবে এটি এখনও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। অঞ্চলটি কৃষ্ণ সাগরের পূর্ব উপকূলে জর্জিয়ার সীমান্তের অভ্যন্তরে অবস্থিত; উত্তরে এটি রাশিয়ার সাথে সীমান্ত গঠন করেছে। এর রাজধানী সুখুমি।

আবখাজিয়া জর্জিয়ার অভ্যন্তরে একটি স্বায়ত্বশাসিত সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালের আগস্টে এটি জর্জিয়ার অংশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু আবখাজিয়ার মুসলিম (মোট জনসংখ্যার ১৭.৮% ) এবং রুশ (১৪.৩%) সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দুইটি এই বন্দোবস্তের পক্ষে ছিল না। প্রতিবেশী স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রজাতন্ত্র চেচনিয়ার মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আবখাজিয়ার জর্জিয়া-বিরোধীরা জর্জিয়ার সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তারা আবখাজিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আবখাজিয়ায় বসবাসরত সংখ্যাগুরু জর্জীয় জনগোষ্ঠীকে (৪৫%) সেখান থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৪ সাল নাগাদ আবখাজিয়াতে জর্জীয় লোক তেমন অবশিষ্ট ছিল না। জর্জিয়া পরাজয় স্বীকার করে এবং আবখাজিয়াকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়।

বর্তমানে আবখাজিয়া একটি দ্বৈত শাসন চলছে। এখানকার ৮৩% এলাকা রুশ মদদ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আবখাজ সরকার শাসন করছে; এদের সদর দফতর সুখুমিতে অবস্থিত। উত্তর আবখাজিয়াতে প্রায় ১৭% এলাকায় জর্জীয় সরকারকে প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রাদেশিক সরকার শাসন করছে; এদের সদর দফতর কোদোরি উপত্যকায় অবস্থিত। বর্তমানে অঞ্চলটির ভবিষ্যত নিয়ে জর্জিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব্ব্ব চলছে।




#Article 45: আফগানিস্তান (4817 words)


আফগানিস্তান, যার সরকারি নাম আফগানিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র (: দে আফ্‌গ়ানিস্তান্‌ ইস্‌লামি জোম্‌হোরিয়াৎ‌;   জোম্‌হুরীয়ে এস্‌লমীয়ে অ্যাফ্‌গ়নেস্তন্‌ আ-ধ্ব-ব: [dʒomhuːɾije eslɒːmije æfɣɒːnestɒːn]) দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এটি ইরান, পাকিস্তান, চিন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যস্থলে একটি ভূ-বেষ্টিত মালভূমির উপর অবস্থিত। আফগানিস্তানকে অনেক সময় দক্ষিণ এশিয়া  এবং মধ্যপ্রাচ্যের  অংশ হিসেবেও গণ্য করা হয়। আফগানিস্তানের পূর্বে ও দক্ষিণে পাকিস্তান , পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে গণচীন। আফগানিস্তান শব্দটির অর্থ আফগান (তথা পশতুন) জাতির দেশ। আফগানিস্তান একটি রুক্ষ এলাকা যার অধিকাংশ এলাকা পর্বত ও মরুভূমি আবৃত।শুধু পার্বত্য উপত্যকা এবং উত্তরের সমভূমিতে গাছপালা দেখা যায়। এখানকার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া গরম ও শুষ্ক এবং শীতকালে প্রচণ্ড শীত পড়ে। কাবুল দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

আফগানিস্তান প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বহু প্রাচীন বাণিজ্য ও বহিরাক্রমণ এই দেশের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু লোক আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে চলাচল করেছেন এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। দেশটির বর্তমান জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য এই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। আফগানিস্তানে বসবাসরত সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হল পশতু জাতি। এরা আগে আফগান নামেও পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে আফগান বলতে কেবল পশতু নয়, বরং জাতি নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিককেই বোঝায়।

প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান খনন করে দেখা গেছে উত্তর আফগানিস্তানে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে মনুষ্যবসতি ছিল। ধারণা করা হয় আফগানিস্তানের কৃষি খামার সম্প্রদায় বিশ্বের প্রাচীনতম খামারগুলোর একটি।

আফগানিস্তানে অনেক সাম্রাজ্য ও রাজ্য ক্ষমতায় এসেছিল, যেমন গ্রেকো-বারট্রিয়ান, কুশান, হেফথালিটিস, কাবুল শাহী, সাফারি, সামানি, গজনবী, ঘুরি, খিলজি, কারতি, মুঘল, ও সবশেষে হুতাক ও দুররানি সাম্রাজ্য।

২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর মধ্য এশিয়া থেকে এই এলাকায় লোক আসতে শুরু করে। এদের অধিকাংশই ছিল আর্য, যারা ইরান ও ভারতেও বসতি স্থাপন করেছিল। তখন এই এলাকার নাম ছিল আরিয়ানা।

খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পারস্য সাম্রাজ্য আরিয়ানা দখল করে। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার পারস্যের সম্রাটকে পরাজিত করে আরিয়ানার পূর্ব সীমান্ত ও তারও পূর্বে চলে যেতে সক্ষম হন। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর অনেকগুলি রাজ্য তার এশীয় সাম্রাজ্যের দখল নেয়ার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে সেলুসিদ সাম্রাজ্য, বাকত্রিয়া সাম্রাজ্য ও ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্য উল্লেখযোগ্য।

খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীতে মধ্য এশীয় কুশান জাতি আরিয়ানা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। ৩য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। এই পর্বের অনেক বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসস্তুপ আজও আফগানিস্তানে দেখতে পাওয়া যায়। হুন নামের মধ্য এশীয় এক তুর্কি জাতি ৪র্থ শতাব্দীতে এসে কুশানদের পতন ঘটায়।

খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীতে আরব সৈন্যরা আফগানিস্তানে নতুন ধর্ম ইসলাম নিয়ে আসে। পশ্চিমের হেরাত ও সিস্তান প্রদেশ আরবদের নিয়ন্ত্রণে আসে, কিন্তু আরব সৈন্য চলে যাওয়া মাত্রই সেখানকার জনগণ তাদের পুরনো ধর্মে ফেরত যায়। ১০ম শতকে বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা থেকে সামানিদ নামের মুসলিম শাসকবংশ আফগান এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। ১০ম শতাব্দীতে গজনীতে গজনবী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এর পূর্ব পর্যন্ত মুসলমান ও অ-মুসলমানরা তখনও কাবুলে পাশাপাশি অবস্থান করত।

গজনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা মাহমুদ গজনভি ৯৯৮ থেকে ১০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ এলাকা শাসন করেন এবং তার সময়েই তিনি কাফিরিস্তান ব্যতীত বাকি হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র আফগানিস্তানে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। গজনী সাহিত্য ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং মাহমুদ বুদ্ধিজীবীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তন্মধ্যে রয়েছে ইতিহাসবিদ আল বিরুনী ও কবি ফেরদৌসী। মাহমুদের মৃত্যুর পর গজনীর প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে এবং ১২শ শতাব্দীতে পশ্চিম-মধ্য আফগানিস্তানের ঘুর শহরে ঘুরি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘুরিরা আবার ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজমি শাহদের কাছে পরাজিত হন।

১২১৯ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোল সেনাপতি চেঙ্গিস খান তার সৈন্যদল নিয়ে খোয়ারিজমি শহর হেতাত ও বালখ এবং বামিয়ানে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেন। মোঙ্গলদের এই ক্ষতিসাধনের ফলে অনেক স্থানীয় লোকজন কৃষিজমি পরিপূর্ণ গ্রামীণ এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়। ১৪শ শতাব্দীর শেষে মধ্য এশীয় সেনাপতি তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করেন ও ভারতে অগ্রসর হন। তার সন্তান ও পৌত্রেরা তার সাম্রাজ্যের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি, তবে তারা বর্তমান আফগানিস্তানের অধিকাংশ হেরাত থেকে শাসন করতে সক্ষম হয়।

ঘুরি থেকে তিমুরীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে এখানে ইসলামী স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে। এসময় তৈরি বহু মসজিদ ও মিনার আজও হেরাত, গজনী ও মাজার-ই-শরিফে দাঁড়িয়ে আছে। হেরাতে ১৫শ শতাব্দীতে ক্ষুদ্রাকৃতি চিত্রকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার বিকাশ ঘটে।

মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লঙের বংশধর জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবর ১৬শ শতাব্দীর প্রারম্ভে ১৫০৪ সালে আরঘুন রাজবংশের নিকট থেকে কাবুল দখল করেন। তারপর ১৫২৬ সালে তিনি ভারতে গিয়ে দিল্লি সালতানাতে আক্রমণ চালিয়ে লোদি রাজবংশককে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। বাবর। ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ভারতে অবস্থিত মুঘল সাম্রাজ্য, উজবেক বুখারা খানাত এবং পারস্যের সাফাভি রাজবংশের রাজারা আফগানিস্তানের দখল নিয়ে যুদ্ধ করেন। সাধারণত মুঘলেরা কাবুলের দখল রাখতো এবং পারসিকেরা হেরাত দখলে রাখতো আর কান্দাহারের শাসনভার প্রায়ই হাতবদল হত। এসময় পশতুন জাতি তাদের শক্তিবৃদ্ধি করে, তবে স্বাধীনতা লাভে ব্যর্থ হয়।

১৭০৯ সালে স্থানীয় ঝিলজাই গোত্রের নেতা মিরওয়াইস হুতাক সাফাভিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং গুরগিন খানকে পরাজিত করে স্বাধীন আফগানিস্তান স্থাপন করেন। মিরওয়াইস ১৭১৫ সালে মারা যান এবং তার স্থলে তার ভাই আবদুল আজিজ সিংহাসনে আরোহণ করেন। মিরওয়াইসের পুত্র মাহমুদ হুতাক তাকে রাষ্ট্রদোহিতার জন্য হত্যা করে। মাহমুদ ১৭২২ সালে পারস্যের রাজধানী ইস্পাহানে আক্রমন চালান এবং গুলনাবাদের যুদ্ধের পর নগরীটি দখল করে নিজেকে পারস্যের রাজা হিসেবে ঘোষণা দেন।

১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানি কান্দাহার শহরকে রাজধানী করে এখানে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন।  ১৭৭২ সালের অক্টোবরে দুররানির মৃত্যু হয় এবং তাকে কান্দাহারে সমাহিত করা হয়। তার পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং তিনি আফগানিস্তানের রাজধানী কান্দাহার থেকে কাবুলে স্থানান্তরিত করেন। এই সময় থেকে দেশটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির কাছে অনেক অঞ্চল হারাতে শুরু করে। ১৭৯৩ সালে তৈমুরের মৃত্যুর পর তার পুত্র জামান শাহ দুররানি ক্ষমতায় আসেন, এবং ধারাবাহিকভাবে মাহমুদ শাহ দুররানি, সুজা শাহ ও অন্যান্যরা সিংহাসনে আরোহণ করেন।

১৯শ শতাব্দীতে দেশটি ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যকার দ্বন্দ্বে মধ্যবর্তী ক্রীড়ানক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৭৩ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে সামরিক কর্মকর্তাগণ রাজার পতন ঘটান এবং প্রজাতন্ত্র গঠন করেন। ১৯১৯ সালে তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধশেষে আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানে এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিপ্রায়ে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং এর সাথে সাথে দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে তালেবান নামের একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী কাবুলের দখল নেয়। তালেবান সন্ত্রাসবাদী দল আল কায়েদাকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেয়। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং ২০০১-এর শেষে তালেবানদের উৎখাত করে। ২০০৪ সালে আফগানিস্তানের সংবিধান নতুন করে লেখা হয় এবং একটি রাষ্ট্রপতি-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু হয়।

১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত আফগানিস্তানের রাজা ও তার আত্মীয়েরা কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগত ও ধর্মীয় নেতারাও শাসনব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতেন। ১৯৬৩ সালে প্রথমবারের মত রাজপরিবারের বাইরের একজনকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেয়া হয় যাতে রাজপরিবার আইন প্রণয়নের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পায়। ১৯৬৪ সালের নতুন সংবিধানে দেশটিতে আরও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজা কেবল নির্বাচিত আইনসভার সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এসময় যাতে জাতিগত ও বামপন্থী দল যাতে গঠিত হতে না পারে সেজন্য রাজা রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করেন।

১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র হিসেবে আফগানিস্তানের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৮ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানে নিষিদ্ধ বামপন্থী দল পিপল্‌স ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান (পিডিপিএ) ক্ষমতায় আসে। এই দলের সাম্যবাদী শাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে। তবে ইসলামী বিদ্রোহী মুজাহেদিনেরা এই শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।

পিডিপিএ-কে সমর্থন করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি পূর্ণমাপের আক্রমণ পরিচালনা করে। এই আক্রমণের পরে একজন মধ্যপন্থী পিডিপিএ নেতাকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়, যাতে মুজাহেদিনেরা শান্ত হয়। কিন্তু মুজাহেদিনেরা সোভিয়ত অধিকৃতির বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা অব্যাহত রাখে। পিডিপিএ সরকার সোভিয়েত সরকারের কাছ থেকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেত, অন্যদিকে মুজাহেদিনেরা যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদী আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে সাহায্য পেত।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মুজাহেদিনেরা পিডিপিএ সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করে। অবশেষে ১৯৯২ সালে সরকারের পতন ঘটে, কিন্তু মুজাহেদিনদের ভিতরের দলীয় কোন্দলের কারণে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়নি। একদল মুজাহেদিন তালেবান নামের একটি ইসলামী মৌলবাদী দল গঠন করে এবং ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে। তাদের শাসনব্যবস্থাকে নৃশংস ও বর্বর শাসনব্যবস্থা হিসেবে সমালোচনা করা হয়। ২০০১-এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় উত্তরাঞ্চলীয় জোট তালেবানদের পতন ঘটায়।

তালেবানদের পতনের পর জাতিসংঘ দেশটিতে বহুজাতিগোষ্ঠীয় সরকার স্থাপনে উৎসাহ দেয়। জার্মানির বন শহরে এ নিয়ে সম্মেলনের পর ২০০১-এর ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তার ৬ মাস পরে একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠিত হয় যা ২০০৪ সালে একটি নতুন সংবিধান পাশ করে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট-ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আফগানিস্তানের প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

ভূমিবেষ্টিত সুউচ্চ পর্বতময় এবং উত্তর ও দক্ষিণ সীমান্তে সমভূমিবেষ্টিত আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত।  আয়তন-বিশিষ্ট দেশটি পৃথিবীর ৪১তম বৃহত্তম দেশ। এর পূর্ব-পশ্চিমে এর সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১,২৪০ কিমি (৭৭০ মাইল); উত্তর-দক্ষিণে সর্বোচ্চ ১,০১৫ কিমি (৬৩০ মাইল)। উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম ও দক্ষিণের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি মূলত মরুভূমি ও পর্বতশ্রেণী। উত্তর-পূর্বে দেশটি ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে হিমবাহ-আবৃত পশ্চিম হিমালয়ের হিন্দুকুশ পর্বতের সাথে মিশে গেছে। আমু দরিয়া নদী ও এর উপনদী পাঞ্জ দেশটির উত্তর সীমান্ত নির্ধারণ করেছে। আফগানিস্তানের উত্তর সীমানায় তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান; পূর্বে চীন এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর; দক্ষিণে পাকিস্তান এবং পশ্চিমে ইরান।

আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক এলাকার উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে ২,০০০ মিটার বা তার চেয়ে উঁচুতে অবস্থিত। ছোট ছোট হিমবাহ ও বছরব্যাপী তুষারক্ষেত্র প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত  উচ্চতা বিশিষ্ট নওশাক আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ও সর্বোচ্চ বিন্দু। এটি পাকিস্তানের তিরিচ মির পর্বতশৃঙ্গের একটি নিচু পার্শ্বশাখা। পর্বতটি আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বে হিন্দুকুশ পর্বতমালার অংশ, যেটি আবার পামির মালভূমির দক্ষিণে অবস্থিত। হিন্দুকুশ থেকে অন্যান্য নিচু পর্বতসারি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে প্রধান শাখাটি দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রসারিত হয়ে পশ্চিমের ইরান সীমান্ত অবধি চলে গেছে। এই নিচু পর্বতমালাগুলির মধ্যে রয়েছে পারোপামিসুস পর্বতমালা, যা উত্তর আফগানিস্তান অতিক্রম করেছে, এবং সফেদ কোহ পর্বতমালা, যা পাকিস্তানের সাথে পূর্ব সীমান্ত তৈরি করেছে। সফেকদ কোহ-তেই রয়েছে বিখ্যাত খাইবার গিরিপথ, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। অপেক্ষাকৃত নিম্নভূমিগুলি দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত। এদের মধ্যে রয়েছে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের হেরাত-ফেরা নিম্নভূমি, দক্ষিণ-পশ্চিমের সিস্তান ও হেলমন্দ নদী অববাহিকা এবং দক্ষিণের রিগেস্তান মরুভূমি। সিস্তান অববাহিকাটি বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক এলাকার একটি। আফগানিস্তানের সর্বনিম্ন বিন্দু জওজান প্রদেশের আমু নদীর তীরে অবস্থিত, যা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে  উচ্চতা বিশিষ্ট।

নদী উপত্যকা ও  কিছু ভূগর্ভস্থ পানিবিশিষ্ট নিম্নভূমি ছাড়া অন্য কোথাও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। মাত্র ১২ শতাংশ এলাকা পশু চারণযোগ্য। দেশটির মাত্র ১ শতাংশ এলাকা বনাঞ্চল, এবং এগুলি মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে অবস্থিত। যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বনভূমি দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আফগানিস্তান এত পর্বতময় যে এগুলির মধ্যকার রাস্তাগুলি দেশটির বাণিজ্য ও বহিরাক্রমণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার কুশান পাসের ভেতর দিয়ে এসে দেশটি আক্রমণ করেন এবং খাইবার পাস দিয়ে বের হয়ে গিয়ে ভারত আক্রমণ করেন। এই একই পথ ধরে মোঘল সম্রাট বাবর ১৫শ শতকে এসে আফগানিস্তান ও ভারত দুই-ই করায়ত্ত করেন। অন্যদিকে সোভিয়েতরা সালাং পাস ও কেন্দ্রীয় হিন্দুকুশে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখল করে।

আফগানিস্তানের বেশির ভাগ প্রধান নদীর উৎপত্তি পার্বত্য জলধারা থেকে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুমে বেশির ভাগ নদী শীর্ণ ধারায় প্রবাহিত হয়। বসন্তে পর্বতের বরফ গলা শুরু হলে এগুলিতে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। বেশির ভাগ নদীই হ্রদ, জলাভূমি কিংবা নোনাভূমিতে পতিত হয়। এদের মধ্যে কাবুল নদী ব্যতিক্রম; এটি পূর্বে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানের সিন্ধু নদের সাথে মেশে, যা পরে ভারত মহাসাগরে গিয়ে পতিত হয়। দেশটির একমাত্র নৌ-পরিবহনযোগ্য নদীটি হল উত্তর সীমান্তের আমু দরিয়া। তবে ফেরি নৌকার সাহায্যে অন্যান্য নদীর গভীর এলাকায় যাওয়া যায়। পামির মালভূমি থেকে উৎপন্ন পাঞ্জ ও বখ্‌শ্‌ উপনদী থেকে পানি আমু দরিয়ায় গিয়ে মেশে। হারিরুদ নদী মধ্য আফগানিস্তানে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ইরানের সাথে সীমান্ত সৃষ্টি করেছে। হারিরুদের পানি হেরাত অঞ্চলে সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। হেলমান্দ নদী কেন্দ্রীয় হিন্দুকুশ পর্বতমালায় উৎপন্ন হয়ে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ইরানে প্রবেশ করেছে। এই নদীটি ব্যাপকভাবে সেচকাজে ব্যবহৃত হয়, তবে ইদানিং এর পানিতে খনিজ লবণের আধিক্য দেখা যাওয়ায় শস্যে পানি দেয়ার কাজে এর উপযোগিতা কমে এসেছে।

আফগানিস্তানের হ্রদগুলি সংখ্যায় ও আকারে ছোট। এদের মধ্যে আছে তাজিকিস্তান সীমান্তে ওয়াখান করিডোরে অবস্থিত জার্কোল হ্রদ, বাদাখশানে অবস্থিত শিভেহ হ্রদ এবং গজনীর দক্ষিণে অবস্থিত লবণাক্ত হ্রদ ইস্তাদেহ-ইয়ে মোকোর। সিস্তান হ্রদ বা হামুন-ই-হেলমান্দ হেলমান্দ নদীর শেষসীমায় লবণাক্ত জলা এলাকায় ইরানের সীমান্তে অবস্থিত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু কিছু নদীতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আছে কাবুল শহরের পূর্বে কাবুল নদীর উপরে নির্মিত সারোবি ও নাগলু বাঁধ, হেলমান্দ নদীর উপর নির্মিত কাজাকি জলাধার, এবং কান্দাহার শহরের কাছে হেলমান্দ নদীর একটি উপনদীর উপর নির্মিত আর্গান্দাব বাঁধ।

আফগানিস্তানের উদ্ভিদরাজি সংখ্যায় অল্প কিন্তু বিচিত্র। পর্বতে চিরসবুজ বন, ওক, পপলার, হেজেলনাট ঝাড়, কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম ইত্যাদি দেখা যায়। উত্তরের সমতলভূমি মূলত শুষ্ক, বৃক্ষহীন ঘাসভূমি, আর দক্ষিণ-পশ্চিমের সমভূমি বসবাসের অযোগ্য মরুভূমি। শুষ্ক অঞ্চলের গাছের মধ্যে আছে ক্যামেল থর্ন, লোকোউইড, মিমোসা, ওয়ার্মউড, সেজব্রাশ ইত্যাদি। আফগানিস্তানের বন্য এলাকায় দেখতে পাওয়া প্রাণীর মধ্যে আছে আর্গালি (মার্কো পোলো ভেড়া নামেও পরিচিত), উরিয়াল (মাঝারি আকারের বন্য ভেড়া), আইবেক্স বা বুনো ছাগল, ভালুক, নেকড়ে, শেয়াল, হায়েনা ও বেঁজি। এছাড়াও বন্য শূকর, শজারু, ছুঁচা, বন্য খরগোশ, বাদুড় এবং অনেক তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে কিছু কিছু স্তন্যপায়ী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন গ্যাজেল হরিণ, চিতা, বরফ চিতা, মার্কর ছাগল, এবং বাকত্রীয় হরিণ। আফগানিস্তানে প্রায় ২০০ জাতের পাখিরও দেখা মেলে। ফ্লেমিংগো ও অন্যান্য জলচর পাখি গজনীর উত্তরে ও দক্ষিণে হ্রদ এলাকায় দেখতে পাওয়া যায়। হাঁস ও তিতিরজাতীয় পাখিও চোখে পড়ে। তবে পাখি অনেক শিকার করা হয় এবং ফলে কিছু কিছু পাখির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন, যেমন - সাইবেরীয় বক।

আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকাতেই অধঃ-সুমেরুদেশীয় পার্বত্য জলবায়ু বিদ্যমান। এখানে শীতকাল শুষ্ক। নিম্নভূমিতে জলবায়ু ঊষর ও অর্ধ-ঊষর। পর্বতগুলিতে ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী কিছু উপত্যকায় মৌসুমী বায়ু নিরক্ষদেশীয় সামুদ্রিক ভেজা বাতাস বহন করে নিয়ে আসে। আফগানিস্তানে মূলত দুইটি ঋতু। গরম গ্রীষ্মকাল এবং অত্যন্ত শীতল শীতকাল। উত্তরের উপত্যকায় গ্রীষ্মে ৪৯° সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা  রেকর্ড করা হয়েছে। শীতকালের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দুকুশ ও আশেপাশের ২০০০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট অঞ্চলে তাপমাত্রা -৯° সেলসিয়াসে নেমে পড়ে। অন্যান্য উঁচু এলাকায় উচ্চতাভেদে তাপমাত্রার তারতম্য ঘটে।

এমনকি একই দিনে তাপমাত্রার ব্যাপক তারতম্য ঘটতে পারে। বরফজমা ভোর থেকে দুপুরে ৩৫° তাপমাত্রা ওঠা বিচিত্র নয়। অক্টোবর ও এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টিপাত হয়। মরুভূমি এলাকায় বছরে ৪ ইঞ্চিরও কম বৃষ্টি পড়ে। অন্যদিকে পর্বত এলাকায় বছরে জলপাতের পরিমাণ ৪০ ইঞ্চিরও বেশি, তবে এর বেশির ভাগই তুষারপাত। পশ্চিমের হাওয়া মাঝে মাঝে বিরাট ধূলিঝড়ের সৃষ্টি করে, আর সূর্যের উত্তাপে স্থানীয় ঘূর্ণিবায়ু ওঠাও সাধারণ ঘটনা।

আফগানিস্তানে ছোট আকারে মণি, সোনা, তামা ও কয়লা উত্তোলনের ইতিহাস থাকলেও প্রণালীবদ্ধভাবে খনিজ আহরণ ১৯৬০-এর দশকের আগে শুরু হয়নি। ১৯৭০-এর দশকে দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুদ আবিষ্কৃত হয়। এছাড়া পেট্রোলিয়াম ও কয়লাও এখানে পাওয়া যায়। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তামা, লোহা, বেরাইট, ক্রোমাইট, সীসা, দস্তা, গণ্ধক, লবণ, ইউরেনিয়াম ও অভ্রের মজুদ আছে। তবে সোভিয়েত আক্রমণ এবং তৎপরবর্তী গৃহযুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান এই খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে এগুলি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।  বহু শতাব্দী ধরে আফগানিস্তান দুষ্প্রাপ্য ও অর্ধ-দুষ্প্রাপ্য পাথরেরও একটি উৎসস্থল, যাদের মধ্যে আছে নীলকান্তমণি, চুনি, নীলা ও পান্না।

আফগানিস্তানে বহু বিচিত্র জাতির বসবাস। এদের প্রায় সবাই মুসলিম। মধ্য এশিয়া, চীন, ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইরান - এই চার সাংস্কৃতিক অঞ্চলের মিলন ঘটেছে এখানে। ফলে দেশটিতে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল ভাষাগত ও জাতিগত বৈচিত্র্য। আফগানিস্তানের মানুষ ইরান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, চীন, আরব উপদ্বীপ ও আরও বহু জায়গা থেকে এসেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চলাচল, রাজনৈতিক বিপ্লব, আক্রমণ, রাজ্যবিজয় ও যুদ্ধ বহু মানুষকে এই অঞ্চলে নিয়ে আসে। এদেরই কেউ কেউ আফগানিস্তানকে নিজের মাতৃভূমি বানিয়ে নেয়। রাজনৈতিক দল ও জাতিসত্তার ধারণা বহু পরে এই বিচিত্র জাতি-সমাহারের ওপর অনেকটা চাপিয়ে দেয়া হয়। 
    
আফগানিস্তানের বর্তমান সীমারেখা ১৮শ শতকের শেষ দিকে দেশটিকে রুশ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী বাফার অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। এই কৃত্রিম সীমান্ত বহু জাতির ঐতিহ্যবাহী বাসস্থলকে ভাগ করে ফেলে, যাদের মধ্যে আছে পশতু, তাজিক ও উজবেক। বহু যুদ্ধ আফগানিস্তানে জাতিগত বিদ্বেষ জিইয়ে রাখে। এমনকি এখনও আফগানিস্তানে অনেকে জাতি ও আত্মীয়তার বন্ধন রাষ্ট্রীয় বন্ধনের চেয়ে বড় হিসেবে গণ্য করেন।

আফগানিস্তানে এ পর্যন্ত একটিমাত্র সরকারি আদমশুমারি সম্পন্ন হয়েছে, ১৯৭৯ সালে। সেটি অনুযায়ী আফগানিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি। ২০০৬ সালে এই জনসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লক্ষে গিয়ে পৌঁছেছে বলে ধারণা করে হয়।

১৯৭৯ সালের সোভিয়েত আক্রমণের ফলে অনেক আফগান দেশের বাইরে উদ্বাস্তু হিসেবে পাড়ি জমান। এদের মধ্যে ৩০ লক্ষ যান পাকিস্তানে, এবং প্রায় ১৫ লক্ষ চলে যান ইরানে। এছাড়া প্রায় দেড় লাখ আফগান স্থায়ীভাবে বিদেশে পাড়ি জমান এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে বসতি স্থাপন করেন। ২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর অনেক উদ্বাস্তু দেশে ফেরত আসতে থাকেন। ২০০২ সাল নাগাদ প্রায় ১৫ লক্ষ উদ্বাস্তু পাকিস্তান থেকে এবং প্রায় ৪ লক্ষ উদ্বাস্তু ইরান থেকে ফেরত আসেন। তবে এদের সঠিক পুনর্বাসন আফগান সরকারের জন্য সংকটের সৃষ্টি করেছে। বহু উদ্বাস্তু স্থলমাইন-সঙ্কুল, বিমান-আক্রমণে বিধ্বস্ত ও পানির অভাবগ্রস্ত খরা এলাকায় বাস করছেন।

২০০৬ সালে আফগানিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধরা হয় ২.৬৭%। আফগানিস্তানের শিশু মৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বোচ্চ - ১০০০-এ ১৬০ টি শিশু জন্মেই মারা যায়। এখানে গড় আয়ুষ্কাল ৪৩ বছর। আফগানিস্তানের প্রায় ৭৭ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করেন। শহরবাসীর অর্ধেক থাকেন রাজধানী কাবুলে।

আফগানিস্তান প্রশাসনিকভাবে ৩৪টি প্রদেশ বা ওয়েলায়েত-এ বিভক্ত। প্রতি প্রদেশের নিজস্ব রাজধানী আছে। প্রদেশগুলি আবার জেলায় বিভক্ত। একেকটি জেলা সাধারণত একটি করে শহর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে গঠিত।

অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী প্রতিটি প্রদেশে একজন করে গভর্নর নিয়োগ করেন। গভর্নর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্ত প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রদেশের পুলিশ প্রধানকেও অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী নিয়োগ দেন।

শুধুমাত্র কাবুল শহরে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। সেখানে শহরের মেয়রকে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন এবং শহরটির প্রশাসন কাবুল প্রদেশ থেকে স্বাধীন।

নিচে আফগানিস্তানের সবগুলি প্রদেশের নাম দেয়া হল (প্রদেশগুলির ক্রমিক সংখ্যা পাশের মানচিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)।

১. বাদাখশান,
২. বাদগিস,
৩. বাগলান,
৪. বাল্‌খ,
৫. বামিয়ান,
৬. দাইকুন্ডি, 
৭. ফারাহ, 
৮. ফারিয়াব,
৯. গজনি,
১০. ঘাওর,
১১. হেলমান্দ,
১২. হেরাত,
১৩. জোওয্‌জান,
১৪. কাবুল,
১৫. কান্দাহার,
১৬. কাপিসা,
১৭. খোস্ত,
১৮. কুনার,
১৯. কুন্দুজ,
২০. লাগমান,
২১. লোওগার,
২২. নানকারহার,
২৩. নিমরুজ,
২৪. নুরেস্তান,
২৫. ওরুজ্‌গান,
২৬. পাক্‌তিয়া,
২৭. পাক্তিকা,
২৮. পাঞ্জশির,
২৯. পারভান,
৩০. সামাংগান,
৩১. সারে বোল,
৩২. তাখার,
৩৩. ওয়ার্দাক,
৩৪. জাবুল

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দেশটির পূর্ব-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। অন্যান্য প্রধান শহরের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণের কান্দাহার, পশ্চিমের হেরত এবং উত্তরের মাজরে শরীফ। ছোট শহরগুলির মধ্যে আছে পূর্বের জালালাবাদ, কাবুলের উত্তরে অবস্থিত চারিকার, এবং উত্তরের কন্দোজ ও ফয়েজাবাদ। 
  
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময়ে ও ১৯৮৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরে গ্রামাঞ্চল থেকে বহু মানুষ জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এসে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নেয়। ১৯৮০-এর শেষের দিকে কাবুলের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০ লক্ষ হয়ে যায়। তবে ১৯৯০-এর শুরুর দিকের গৃহযুদ্ধের সময় অনেক লোক বিধ্বস্ত কাবুল ছেড়ে পালিয়ে যায়; ফলে ১৯৯৩ সালে এর জনসংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৭ লক্ষ। তবে ২০০১ সালের পর এর জনসংখ্যা আবার বেড়ে ২০ লক্ষে গিয়ে পৌঁছেছে। বেশির ভাগ শহরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানি শোধন ব্যবস্থা ও জনপরিবহন ব্যবস্থা নেই।

সোভিয়েত অধিকৃতির আগেই আফগানিস্তানে জীবনযাত্রার মান ছিল বিশ্বের সর্বনিম্ন। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ ও তার পরে গৃহযুদ্ধ দেশটির অর্থনীতির চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটায়। সোভিয়েত আমলে শহরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও শিল্প সুযোগ সুবিধা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শুরু থেকে আলাদা করে ফেলে। মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান চরমে পৌঁছে। 
   
আফগানরা মূলত কৃষক ও পশুপালক। ২০শ শতকে খনি ও ভারী শিল্পের উন্নতি ঘটে, তবে স্থানীয় হস্তশিল্প গুরুত্ব হারায়নি।

১৯৫৬ সালে সরকার অনেকগুলি পাঁচসালা পরিকল্পনার প্রথমটি শুরু করে। ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্যোগে নেয়া প্রকল্পগুলি সাফল্যের মুখ দেখে। অন্যান্য বড় দেশের সহায়তায় আফগানিস্তান রাস্তা, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিমানবন্দর, কারখানা ও সেচ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েতরা আসার পর পশ্চিমী সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত শাসনের মুক্তির পর আবার সাহায্য আসা শুরু হয়। ২০০১ সালে তালেবানদের পতনের পর আফগানিস্তানে নতুন করে আন্তর্জাতিক সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

২০০৩ সালে আফগানিস্তানের মোট শ্রমিক সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ। এদের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিকাজ বা পশুপালনের সাথে জড়িত। যুদ্ধের কারণে আরও অনেক ধরনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বেকারত্ব এবং দক্ষ শ্রমিক ও প্রশাসকের অভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা।

আফগানিস্তানের খুবই সামান্য এলাকায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপত্যকায় কৃষিকাজ সম্ভব এবং এই কৃষিভূমির সবগুলোতেই ব্যাপক সেচের প্রয়োজন হয়। ঝর্ণা ও নদী থেকে খাল (কারেজ বা গানাত) খুঁড়ে পানি আনা হয়।

গম আফগানিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য। এরপর রয়েছে যব, ভুট্টা, ও ধান। তুলাও ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। আফগানিস্তান থেকে রপ্তানিকৃত দ্রব্যের মধ্যে ফল ও বাদাম গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের আঙুর ও তরমুজ খুব মিষ্টি হয়; এগুলি দক্ষিণ-পশ্চিমে, হিন্দুকুশের উত্তরে ও হেরাতের আশেপাশের অঞ্চলে জন্মে। আফগানিস্তান কিশমিশও রপ্তানি করে। অন্যান্য ফলের মধ্যে রয়েছে এপ্রিকট, চেরি, ডুমুর, তুঁত, ও ডালিম।

উত্তর আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণে কারাকুল ভেড়া পালন করা হয়। এই ভেড়ার শক্ত, কোঁকড়া লোম দিয়ে পারসিক ভেড়ার কোট তৈরি করা হয়। অন্যান্য জাতের ভেড়া ও ছাগলও পালন করা হয়।

আফগানিস্তানের আরেকটি পরিচয় অবৈধ আফিম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে এটি মায়ানমারকে হটিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ আফিম উৎপাদক দেশে পরিণত হয়। এছাড়াও হাশিশও তৈরি হতো। ২০০০ সালের জুলাই মাসে তালেবান সরকার ইসলামে আফিমের ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে পপি গাছের চাষ বন্ধ করে দেয়। ২০০১ সালে তালেবানের পতনের গ্রামাঞ্চলের অনেক স্থানীয় দরিদ্র কৃষক আবার আফিম চাষ করা শুরু করে, যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আফিম পপি চাষ নিষিদ্ধ করেছিল।

তুর্কমেন ও উজবেকরা কার্পেট বানিয়ে থাকে। বালুচীরা জায়নামাজ, পশমের কার্পেট ইত্যাদি বানায়। উটের লোম ও তুলাও মাঝে মাঝে ব্যবহৃত হয়। বিয়ের কনের সাজপোষাকের সুন্দর সূচির কাজ দেখতে পাওয়া যায়।

১৯৬৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় উত্তর আফগানিস্তানে বড় আকারের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস আহরণ শুরু হয়। ১৯৮০-র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপুল পরিমাণে গ্যাস রপ্তানি করা হত, তবে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর তা থেমে যায়। একবিংশ শতকের প্রথম দশকে শেবেরগান শহরের কাছে অবস্থিত মূল গ্যাসক্ষেত্রগুলিতে আবার গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। আফগানিস্তান বিশ্বের উচ্চমানের নীলকান্তমণির অন্যতম সরবরাহকারী। এছাড়াও দেশটিতে অন্যান্য দামী পাথর যেমন পান্না, চুনি ইত্যাদি এবং খনিজ তামা ও লোহা পাওয়া যায়। একাধিক দশকব্যাপী যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ ও ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত ছিল। বর্তমানে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপসংস্থা (United States Geological Survey বা USGS) প্রাক্কলন করে যে উত্তর আফগানিস্তানে গড়ে ২৯০ শত কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত খনিজ তেল, ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৫৬ কোটি ব্যারেল  প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রাপ্ত তরল আছে।

২০১১ সালে আফগানিস্তান সরকার গণচীনের জাতীয় পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সাথে একটি খনিজ তেল অনুসন্ধান সংক্রান্ত ৭ শত কোটি ডলারের একটি চুক্তি সম্পাদন করে, যেখানে দেশটির উত্তরাংশে আমু দরিয়া নদীর পাড় ধরে তিনটি তেলক্ষেত্র স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।গণ কুরআন পড়া ও লেখা এবং প্রাথমিক গণিত শিক্ষা দেন। অন্য শিক্ষাব্যবস্থাটি ১৯৬৪ সালে আফগান সংবিধান অনুসারে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণে প্রবর্তন করা হয়, যেখানে সমস্ত বয়স স্তরে শিক্ষাগ্রহণ বিনামূল্য ও বাধ্যতামূলক ছিল। তবে এই ব্যবস্থার লক্ষ্য পূর্ণ হয়নি। পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষার উপর জোর দেয়া হয়। কাবুল ও অন্যান্য বড় শহরগুলিতে মাধ্যমিক স্কুলের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ আফগানই এমন এলাকায় বসবাস করতেন যেখানে কোন স্কুল ছিল না।

একাধিক দশকব্যাপী যুদ্ধ দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় ধ্বস নামায় এবং একটি  প্রজন্ম কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বড় হয়ে উঠে। গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের প্রায় সমস্ত বিদ্যালয় ও উচ্চতর বিদ্যাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বেশির ভাগ শিক্ষক চাকরি ছেড়ে আফগানিস্তান থেকে চলে যান। এর পরে তালেবানেরা এসে মাদ্রাসা ব্যতীত সকল ধরনের স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে এবং মহিলাদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। কেবল  কুরআন শরীফ মুখস্থ করা অণুমোদিত ছিল।

২০০১ সালে তালিবানের পতনের পর দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা আবার নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে শুরু হয়। ২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৪০ লাখ ছেলেমেয়ে দেশটির প্রায় ৯,৫০০ স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করে। প্রাথমিক শিক্ষা বিনামূল্য ঘোষণা করা হয়েছে। ১৫ বছরের বেশি বয়সের আফগানদের মধ্যে সাক্ষরতার হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হিসাব করা হয়েছে। তবে পুরুষদের সাক্ষরতার হার (৫১%) নারীদের (২১%) চেয়ে অনেক বেশি।

আফগান স্কুলগুলিতে দারি, পশতু ও অন্যান্য ভাষা, যেমন- উজবেক ভাষায় পড়ানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলি মূলত দারি ভাষায় পড়ানো হয়। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় দেশটির বৃহত্তম ও সবচেয়ে সম্মানিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৩৮ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে আরও নয়টি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। জালালাবাদে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ননগরহার বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। এছাড়া কান্দাহার, হেরাত, বাল্‌খ ও বামিয়ানে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। ১৯৬১ সালের আগে কেবল পুরুষেরাই স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা লাভ করতে পারতেন। এরপর থেকে সমস্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মহিলাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ২০০৬ সালে সহশিক্ষামূলক আফগানিস্তান মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়; এখানে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি ভাষা। মাজার-ই-শরীফ শহরে ৬০০ একর এলাকা জুড়ে বাল্‌খ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। 

আফগানিস্তানের জনগণ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। এই জাতিগুলির কতগুলি আবার আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলিতে বসবাস করে। পশতুন জাতি আফগানিস্তানের বৃহত্তম জাতি। তারা বহুদিন ধরে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় ছিল। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর তাজিক, উজবেক, হাজারা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগুলির একটি কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসে। তবে ১৯৯৬ সালে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করে পশতুন আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।

২০০১ সালের শেষে তালেবানদের পতনের পর দেশটির প্রধান প্রধান জাতিগত সম্প্রদায়গুলি সরকারী ক্ষমতা অংশীদারী করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৪ সালের আফগান সংবিধানে আফগানিস্তানের বৈচিত্র্যময় জাতিগুলির অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এতে সংখ্যালঘুদের যথেষ্ট ভাষাগত স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় ভাষা যেমন উজবেক ও তুর্কমেন ভাষাকে তাদের ভাষাভাষী স্থানীয় এলাকায় সরকারী ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষা পশতু ও দারি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় সরকারী ভাষার মর্যদা দেয়া হয়েছে।

আফগানিস্তানের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ জনগণ পশতুন জাতির লোক। হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণে এদের ঐতিহ্যবাহী আবাসস্থল। যদিও পশতুনরা আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে, তাদের মূল শক্তিকেন্দ্র দেশের দক্ষিণে কান্দাহার প্রদেশে। এছাড়া অনেক পশতুন উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তান সীমান্তে বাস করেন। পুরুষ পশতুনরা প্রাচীন জাতিগত আচার মেনে চলেন, যে আচারে সাহস, ব্যক্তিগত সম্মান, প্রতিজ্ঞা, স্বনির্ভরতা ও আতিথেয়তাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। পশতুনদের মাতৃভাষা পশতু, একটি ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা।

ধর্মই আফগানিস্তানের বিভক্ত জাতিসত্তার দৃঢ়তম বন্ধন। আফগানদের প্রায় ৯৯ শতাংশই মুসলিম। এদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ সুন্নি এবং প্রায় ১৫ শতাংশ শিয়া মুসলিম। শহরগুলিতে অল্পসংখ্যক হিন্দু, শিখ, পারসিক ও ইহুদী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ১৯৬০-এর দশক থেকে অনেক আফগান ইহুদী ইসরায়েলে পাড়ি দিয়েছেন। হযরত আলির কবর মাজার-এ-শরিফ অনেক মুসলিমের তীর্থস্থল।

আফগান জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন মোল্লা। যেকোন পুরুষ যিনি কুরআন শরীফ মুখস্থ বলতে পারেন, তিনি মোল্লা হওয়ার যোগ্য। মোল্লারা শুক্রবারের প্রার্থনা, বিয়ে ও দাফনকাজ পরিচালনা করেন। মোল্লারা মানুষদের ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দেন। তারা ইসলামী আইননুসারে সংঘাত নিরসন করেন এবং শারীরিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান দেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় মোল্লা ও স্থানীয় জমিদার (খান) মিলে নির্ধারণ করেন তাদের অনুসারীরা কী করতে পারবে বা পারবে না।

আফগানিস্তানে গল্প-গাঁথা বলার শিল্প এখনও সগৌরবে বিরাজমান, সম্ভবত ব্যাপক নিরক্ষরতার কারণেই এই শিল্পটি হারিয়ে যায়নি। সঙ্গীতের সাথে লোকগাঁথা বর্ণনা করার ঐতিহ্য আজও আদৃত। এই লোকগাথাগুলি বর্তমানের আফগানদেরকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আফগান জীবনের সমস্ত দিক নিয়েই এই গাথাগুলি রচিত এবং এগুলির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণ শিক্ষা দেয়া হয়।

ইসলামী পর্বে দারি ও পশতু উভয় ভাষার সাহিত্যের বিকাশ ঘটে এবং আরবি লিপির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। ১০১০ সালে ফেরদৌসী তার মহাকাব্য শাহনামা রচনা শেষ করেন। এতে দারি ভাষায় লেখা প্রায় ৬০,০০০ দুই-পঙক্তির ছড়া আছে। দারি ও তুর্কী-জাতীয় ভাষায় আরও অনেক কাব্য ও গাথা রচিত হয়। ১৩শ শতকে সুফীসাধক ও কবি জালাল আল-দীন রুমি মহাকাব্য মসনবী-ইয়ে মানাবী রচনা করেন, যা ইসলামী সাহিত্য ও চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। ১৭শ শতকের বিখ্যাত যোদ্ধা ও কবি খুশহাল কাট্টাক কবিতার মাধ্যমে উপজাতীয় আচার-আচরণের নিয়ম প্রদান করতেন।

আধুনিক আফগান সাহিত্যে আধুনিক বিশ্বের নানা ধারণা স্থান পেয়েছে। ১৯৭২ সালে সৈয়দ বোরহানউদ্দীন মাজরুহ বহুখণ্ডবিশিষ্ট ধ্রুপদী, ছন্দময় দারি গদ্য রচনা করেন, যাতে কারণ, যুক্তি, বিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আলোচিত হয়। সোভিয়েতদের সাথে যুদ্ধের সময় ইসলাম ও মুক্তি বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পায়। ১৯৮৩-তে গুলজারাক জাদরান পশতু ভাষায় জিহাদের ওপর বই লেখেন। আফগানিস্তান ইতিহাস সোসাইটি ও পশতু অ্যাকাডেমি নতুন লেখকদের উৎসাহিত করার জন্য সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতেন, তবে গৃহযুদ্ধের কারণে তাদের প্রচেষ্টা অনেকাংশেই ব্যাহত হয়।

আফগানিস্তানে সব যুগের স্থাপত্যকলার নিদর্শন পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে আছে গ্রিক ও বৌদ্ধ স্থাপত্যের ধ্বংসস্তুপ, মন্দির, খিলান, স্তম্ভ, সুক্ষ্ম কারুকাজময় ইসলামী মিনার ও দুর্গ। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হেরাত ও মাজার-ই-শরিফের মসজিদদ্বয়, পশ্চিম-মধ্য উঁচু এলাকার জাম শহরের একটি মসজিদের মিনার, ১০০০ বছরের পুরনো কালে-ইয়ে বোস্তের মহান খিলান, চেল জিনা (চল্লিশ ধাপ), কান্দাহারের সম্রাট বাবরের রেখে যাওয়া পাথরের খোদাইকর্ম, বামিয়ানের বুদ্ধ (যা ২০০১ সালের মার্চে তালেবানরা ধ্বংস করে ফেলে), গজনীর বিজয় চূড়া, বাবরের সমাধি ও কাবুলের বালা হিস্‌সার।

ক্ষুদ্র আকারের শিল্পকলার মধ্যে হেরাতের হালকা নীল-সবুজ টাইলের কাজ, রঙিন ক্যালিগ্রাফি বা হস্তলেখাশিল্প উল্লেখ্য। সোনা ও রূপার গয়না, সূচিশিল্প, ও চামড়ার বিভিন্ন দ্রব্য আজও ঘরে ঘরে বানানো হয়। তবে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম হল পারসিক-ধাঁচে বানানো কার্পেট।

আফগানিস্তানের সঙ্গীত মূলত ঐতিহ্যবাহী লোক সঙ্গীত, গাথা ও নৃত্য। তার দিয়ে তৈরি বাদ্যযন্ত্র রোহাবকে পশ্চিমের ভায়োলিন বা চেল্লোর পুরানো রূপ হিসেবে মনে করা হয়। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আছে সন্তুর, হারমোনিয়াম, চং, এবং তবলা ও ঢোল। পশতুন অঞ্চলের আত্তান নৃত্য জাতীয় নৃত্য। এতে নর্তকেরা একটি বড় বৃত্তে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন এবং দ্রুত লয়ে সঙ্গীতের ছন্দের সাথে পা নাড়ান। ছুটির দিনে বা সপ্তাহের শেষে আফগানেরা নদীর তীরে বা বনে পিকনিকে গিয়ে গান গাইতে ও শুনতে পছন্দ করেন।

স্বল্পসংখ্যক প্রধান গ্রন্থাগারগুলি কাবুলে অবস্থিত। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ১৯৩১ সালে স্থাপিত হয় এবং সোভিয়েতদের সাথে যুদ্ধে ও পরবর্তীকালে গৃহযুদ্ধের সময় এর বহু বই চুরি হয়ে যায়। জাতীয় আর্কাইভও লুট হয়। তালেবান সেনারা ইসলামী মৌলবাদ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে গ্রান্থাগার ও জাদুঘরের বহু বই পুড়িয়ে ফেলে। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত কাবুল জাতীয় জাদুঘর দেশটির সর্ববৃহৎ জাদুঘর এবং এটি প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শনের সংগ্রহের জন্য এককালে পরিচিত ছিল। এই সংগ্রহ থেকে কিছু উচ্চমূল্যের বৌদ্ধ নিদর্শন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাচার হয়ে যায়। ১৯৯৩ সালে রকেট হামলা করে যাদুঘরটি খুলে লুট করা হয়। বেশির ভাগ দোষ্প্রাপ্য দ্রব্য পাকিস্তান হয়ে চলে যায় এবং অন্য দেশের ধনী সংগ্রাহকদের কাছে বেচা হয়। আফগান প্রাচীন নিদর্শনের অবৈধ ব্যবসা এ সময় অবৈধ ড্রাগসের ব্যবসার পরেই সবচেয়ে বেশি অর্থের ব্যবসা ছিল। ২০০০ সালে তালেবান পুলিশ জাদুঘরের অবশিষ্ট ২৭০০ শিল্পকর্ম, যাদের মধ্যে অনেক প্রাচীন সাংস্কৃতিক সম্পদ ছিল, মূর্তিপূজা আখ্যা দিয়ে ইসলামের নামে ধ্বংস করে ফেলে। তালেবানের পতনের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিতে আরেক দফা লুটতরাজ ঘটে।

১৯৭৮ সালে জাপানি অর্থানুকূল্যে কাবুলে আফগানিস্তানের প্রথম টেলিভিশন স্টেশন সম্প্রচার শুরু করে। তবে তালিবানেরা ক্ষমতায় আসার পর টেলিভিশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০০১ সালে তালিবানদের পতনের পর আবার কাবুলে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়।

১৮৭৫ সালে আফগানিস্তানে প্রথম সংবাদপত্র ছাপা হয়, এবং ১৯০০ সালের ঠিক পরে আরও দুইটি ছোট ছোট সংবাদপত্র প্রকাশিত হত। ১৯১৯ সালে রাজা আমানুল্লাহ শাসনভার হাতে নেওয়ার পর প্রায় ১৫টি সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন বিকাশ লাভ করে। ১৯৫০-এর দিকে আফগানিস্তানের ৯৫% ছাপা বই ও সংবাদ সরকারিভাবে প্রকাশিত হত।

১৯৬২ সালে প্রথম ইংরেজি দৈনিক হিসেবে কাবুল টাইম্‌স আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়া বাখতার সংবাদ সংস্থাও অনেক বিদেশী খবর পরিবেশন করত। ১৯৭৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কাবুল টাইম্‌সের নাম বদলে কাবুল নিউ টাইম্‌স রাখা হয় এবং এতে সাম্যবাদী ধারার খবরাখবর প্রকাশিত হত। এই পত্রিকাটি ছিল ঘোর-পাশ্চাত্যবিরোধী। এর প্রতিবাদে গোপনে শবনম নামে একটি সরকারবিরোধী পত্রিকা কাবুলে প্রকাশিত হত। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে ১২টি দৈনিক পত্রিকা ছিল, কিন্তু তালিবানেরা ক্ষমতায় আসার পর এগুলির সবই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে তালিবানেরা এদের মধ্য থেকে দুইটিকে নিজস্ব প্রচারমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আবার চালু করে।

২০০২ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদানকারী আইন পাশ করে। এর পর প্রায় ১০০টি সংবাদপত্র আফগানিস্তানে প্রকাশিত হতে শুরু করে। বর্তমানে সাপ্তাহিক কাবুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সংবাদপত্র।

২। আফগানিস্তান সার্কভুক্ত একটি দেশ।

General information

সরকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ

সংস্কৃতি

News from Afghanistan

অন্যান্য




#Article 46: আলবেনিয়া (4176 words)


আলবেনিয়া (আলবেনীয় ভাষায় Shqipëri শ্চিপারি) দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। এটি বলকান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এ দেশটি পশ্চিম দিক থেকে আর্দ্রিয়াটিক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আইওনিয়ান সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। ২৮ হাজার ৭৪৮ বর্গকিলোমিটারের আলবেনিয়াতে উপকূল রয়েছে ৩৬২ কিলোমিটারের। দুই সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশটির ৭০ শতাংশ ভূমিই খুব বন্ধুর। দেশটির সর্বোচ্চ স্থান দিবারের কোরাব সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৭৫৩ মিটার ওপরে অবস্থিত। আলবেনিয় জাতির পিতা ইস্কান্দর বে  
    
আলবেনিয়া ইতিহাসে বহুবার পূর্বের ইতালীয় শক্তি ও পশ্চিমের বলকান শক্তির কাছে নত হয়েছে। ১৫শ শতকে আলবেনিয়া গ্রীস অধীনে আসে এবং ১৯১২ সালের আগ পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। ১৯৪৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯১ সালে দেশটি গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে রূপান্তর শুরু করে।

তিরানা আলবেনিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

আলবেনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র।

বর্তমান আলবেনীয়রা সম্ভবত ইলিরীয় জাতির লোকদের বংশধর। দক্ষিণ বলকান অঞ্চলে গ্রিক, রোমান ও স্লাভ জাতির লোকেরা অভিবাসন করার অনেক আগে থেকেই ইলিরীয় জাতির লোকেরা বাস করত। খ্রিস্টপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ শতকে গ্রিকেরা আলবেনিয়ার উপকূলে অনেকগুলি বসতি স্থাপন করে; এগুলির মধ্যে ছিল এপিদামনুস (বর্তমান দুররেস) এবং আপোল্লোনিয়া (বর্তমান ভ্‌লোরে)। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক নাগাদ এই বসতিগুলির পতন হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এগুলি বিলীন হয়ে যায়। গ্রিকেরা চলে যাবার পর এই এলাকায় আদিকাল থেকে বসবাসকারী ইলিরীয় সমাজের বিবর্তন ঘটে এবং এতে জটিলতর রাজনৈতিক সংগঠন যেমন ফেডারেশন, রাজ্য, ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটে। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইলিরীয় রাজ্যটি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম ও ২য় শতকের মধ্যবর্তী সময়ে টিকে ছিল।

একই সময়ে আড্রিয়াটিক সাগরের অপর তীরে ইতালীয় উপদ্বীপে রোমের বিস্তার ঘটছিল। রোমানরা ইলিরিয়াকে পূর্ব দিকের দেশগুলি বিজয়ের একটি আরম্ভকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করত। ২২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই রোমানরা আড্রিয়াটিক সাগর পাড়ি দিয়ে ইলিরিয়া আক্রমণ করে। ১৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইলিরিয়াতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। তারা এটিকে রোম সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করে এবং নাম দেয় ইলিরিকুম। রোমানরা এর পর প্রায় ৬ শতাব্দী ধরে এলাকাটি শাসন করে। কিন্তু ইলিরীয়রা রোমান সংস্কৃতির সাথে মিশে না গিয়ে নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি ও ভাষা ধরে রাখে। তা সত্ত্বেও অনেক ইলিরীয় রোমান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনে সক্ষম হন। অনেক ইলিরীয় বংশোদ্ভূত পরবর্তীকালে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাটও হন। এদের মধ্যে আছেন আউরেলিয়ান (২৭০-২৭৫ খ্রিষ্টাব্দ), দিওক্লেতিয়ান (২৮৪-৩০৫ খ্রিষ্টাব্দ), এবং মহান কন্সতান্তিন (৩০৬-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ)। ১ম শতকের মাঝামাঝি নাগাদ ইলিরিকুমে খ্রিস্টধর্ম প্রভাব ফেলতে থাকে এবং ৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সাধু পল এপিদামনুস নগরের জন্য একজন যাজক নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে আপোল্লোনিয়া এবং স্কোদ্রা (বর্তমান শ্‌কোদার) শহরে বিশপদের কর্মস্থল নির্মাণ করা হয়।

৩৯৫ সালে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিমে দুইটি সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। আধুনিক আলবেনিয়া এলাকাটি পূর্ব অংশে তথা বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যে পড়ে। অনেক ইলিরীয় পরবর্তীতে বাইজেন্টীয় সম্রাট হন। এদের মধ্যে ১ম জুস্তিনিয়ান (৫২৭-৫৬৫) অন্যতম। ৫ম শতক নাগাদ এখানে খ্রিস্টধর্ম একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মে পরিণত হয়। আলেবেনিয়ার খ্রিস্টানেরা বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যের প্রজা হয়েও রোমান পোপের অধীনে ছিলেন। ৫ম শতকে ভিজিগথ, হুন এবং অস্ট্রোগথেরা অঞ্চলটি আক্রমণ করে এর অশেষ ক্ষতিসাধন করে। ৬ষ্ঠ ও ৮ম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ইলিরিয়া অঞ্চলটিতে স্লাভ জাতির লোকেরা বসতি স্থাপন করে। বহু ইলিরীয় স্লাভদের সাথে মিশে যায় এবং বর্তমান স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া এলাকাগুলির মানুষদের পূর্বপুরুষ গঠন করে। কিন্তু দক্ষিণ ইলিরীয় অঞ্চলের লোকেরা, যার মধ্যে আধুনিক আলবেনিয়াও পড়েছে, স্লাভদের সাথে মিশ্রণ রোধ করে। ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টীয় সম্রাট ৩য় লিও আলবেনীয় গির্জার সাথে রোমের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং একে কন্সতান্তিনোপলের (বর্তমান ইস্তানবুল) ধর্মগুরুর অধীনে আনেন।

৮ম থেকে ১১শ শতকের মধ্যে ইলিরিয়া ধীরে ধীরে আলবেনিয়া নামে পরিচিত হতে শুরু করে। নামটি এসেছে মধ্য আলবেনিয়াতে বসবাসকারী আলবানোস জাতির লোকদের নাম থেকে। বর্তমান আলবেনীয়রা নিজেদের দেশকে শকিপারিয়া (ঈগলের দেশ) নামে ডাকে, কিন্তু এই নামটির উৎস নির্ধারণ করা যায়নি। তবে পণ্ডিতেরা একমত যে শকিপারিয়া নামটি ১৬শ শতকে আলবেনিয়া নামটিকে প্রতিস্থাপন করে। ৯ম শতকে বাইজেন্টীয় সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে শুরু করে। ফলে প্রথমে বুলগেরীয় স্লাভ, নর্মান ক্রুসেডার, ইতালীয় আঙ্গেভিন, সার্ব এবং ভেনিসীয় জাতির লোকেরা পর্যায়ক্রমে অঞ্চলটি আক্রমণ করে। ১০ম শতকের পরে এখানে একটি জমিদারী প্রথা গড়ে ওঠে। কৃষক সৈন্যরা যারা আগে সামরিক নেতাদের অধীনে যুদ্ধ করেছিল, তারা জমিদারদের খামারে কাজ করা শুরু করে। এসময় অঞ্চলটির কিছু প্রদেশ কন্সতানিনোপল থেকে প্রায় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলতে থাকে।

১০৫৪ সালে যখন খ্রিস্টান গির্জা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিম গির্জায় ভাগ হয়ে যায়, তখন দক্ষিণ আলবেনিয়া পূর্ব বা অর্থডক্স গির্জার সাথে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে। অন্যদিকে উত্তর আলবেনিয়া রোমের রোমান ক্যাথলিক গির্জার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। মধ্যযুগে (৫ম থেকে ১৫শ শতক) আলবেনিয়ার শহরগুলির প্রসার ঘটে এবং বাণিজ্যেরও উন্নতি হয়, বিশেষ করে আড্রিয়াটিক অঞ্চলে। শহরের উন্নতির সাথে সাথে শিল্পকলা, সংস্কৃতি, এবং শিক্ষারও উন্নতি ঘটে। আলবেনীয় ভাষা বেঁচে থাকলেও গির্জা, সরকার ও শিক্ষাব্যবস্থায় এটির ব্যবহার ছিল না। বরং গ্রিক ও লাতিন ভাষাই সাহিত্য ও সংস্কৃতির সরকারি ভাষা হিসেবে থেকে যায়।

১৩৪৭ সালে স্তেফান দুসানের অধীনে সার্বীয়রা আলবেনিয়া দখল করলে আলবেনীয়রা গণহারে গ্রিসে পালিয়ে যায়। ১৪শ শতকের মাঝামাঝি সময়েই বাইজেন্টীয় শাসনের পতন ঘটে এবং বর্তমান তুরস্ক-অঞ্চলভিত্তিক উসমানীয়রা ১৩৮৮ সালে আলবেনিয়া আক্রমণ করে। ১৪৩০ সালের মধ্যেই উসমানীয়রা আলবেনিয়া বিজয়ে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৪৪০-এর দশকে গিয়ের্গি কাস্ত্রিওতি দেশটির জমিদারদের একত্রিত ও সংগঠিত করে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। রোম, নাপোলি, এবং ভেনিসের সামরিক সাহায্য নিয়ে কাস্ত্রিওতি প্রায় ২৫ বছর সফলভাবে উসমানীয়দের ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আলেবেনিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং ১৫০৬ সালে উসমানীয়রা পুনরায় আলবেনিয়া দখলে সক্ষম হয়। দেশটির জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ লোক ইতালি, সিসিলি, এবং আড্রিয়াটিক সাগরের ডালমেশীয় উপকূলে পালিয়ে যায়। কাস্ত্রিওতি তথা স্কেন্দারবেগকে আজও আলবেনীয়রা তাদের জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরম শ্রদ্ধা করে।

উসমানীয়রা চার শতাব্দী ধরে শাসন করলেও সম্পূর্ণ আলবেনিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে কখনোই সক্ষম হয়নি। উচ্চভূমি অঞ্চলে উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল; সেখানকার আলবেনীয়রা কর প্রদানে এবং সামরিক সেবায় অংশ নিতে অসম্মতি প্রকাশ করত। আলবেনীয়রা অনেকগুলি বিদ্রোহে অংশ নেয়; খ্রিস্টধর্মের উপর বিশ্বাস রক্ষা করা এগুলির পেছনে আংশিক কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। ১৬শ শতকের শেষে উসমানীয়রা ভবিষ্যৎ বিদ্রোহ প্রতিরোধের লক্ষ্যে আলবেনীয়দের ইসলামীকরণের নীতি গ্রহণ করে। ১৭শ শতকের মাঝামাঝি আলবেনীয় জনগণের দুই-তৃতীয়াংশ ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। অনেকেই খ্রিস্টানদের উপর ধার্য অতিরিক্ত করের বোঝা এড়াতেই এমনটি করে। উসমানীয়রা একটি সামন্ত-সামরিক মিশ্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারিত করে; এই ব্যবস্থায় যেসব সামরিক নেতারা সাম্রাজ্যের অণুগত ছিলেন, তারা জমিদারি লাভ করতেন।

১৮শ শতকে উসমানীয় ক্ষমতার ক্ষয় ঘটতে শুরু করে এবং ফলে আলবেনিয়ার কিছু সামরিক নেতার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৭৫০ থেকে ১৮৩১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে উত্তর আলবেনিয়ার অধিকাংশ এলাকা ছিল বুশাতি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে আলি পাশা তেপেলিন ১৭৮৮ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আলবেনিয়া ও উত্তর গ্রিস নিয়ন্ত্রণ করেন। এই স্থানীয় শাসকেরা নিজেদের আলাদা রাজ্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু উসমানীয় সুলতান ২য় মাহমুদ তাদেরকে পরাজিত করেন। ১৮শ ও ১৯শ শতকে অনেক আলবেনীয় উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসনে উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়। দুই ডজনেরও বেশি আলবেনীয় বংশোদ্ভূত লোক উসমানীয় সুলতানের প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন।

১৯শ শতকে বলকান অঞ্চলের অনেক পরাধীন মানুষ নিজেদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ১৮৭৮ সালে 
আলবেনীয় নেতারা কসভোর প্রিজরেন শহরে মিলিত হন এবং প্রিজরেনের লিগ তথা আলবেনীয় লিগ গঠন করেন। লিগের উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত আলবেনীয় অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি একত্রিত আলবেনিয়া গঠন। লিগ আলবেনীয় ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নেরও লক্ষ্য হাতে নেয়। ১৯০৮ সালে আলবেনীয় নেতারা লাতিন লিপির উপর ভিত্তি করে একটি জাতীয় বর্ণমালা প্রবর্তন করেন। ১৯১০ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আলবেনীয় জাতীয়তাবাদীরা উসমানীয়দের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। প্রথম বলকান যুদ্ধ নামে পরিচিত এই যুদ্ধে সার্ব, গ্রিক ও বুলগেরীয় সেনারাও যোগ দেয় এবং উসমানীয়রা এতে পরাজয় বরণ করে। যুদ্ধ শেষ হবার পর পরই আলবেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও ইতালি (মহাশক্তিসমূহ) একটি সম্মেলনে আলবেনিয়ার স্বাধীনতা মেনে নেয়, কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলির প্রবল চাপের মুখে তারা আলবেনীয় অধ্যুষিত কসোভো অঞ্চলটি সার্বিয়াকে এবং কামেরিয়া অঞ্চলটির অধিকাংশ গ্রিসকে দিয়ে দেয়। এর ফলে আলবেনীয় জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই সদ্যপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে পড়ে যায়। মহাশক্তি রাষ্ট্রগুলি একজন জার্মান রাজপুত্র ভিলহেল্ম ৎসু ভিডকে আলবেনিয়ার শাসক নিয়োগ করে, কিন্তু তিনি মাত্র ছয় মাস ক্ষমতায় ছিলেন। এর পরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এসময় অস্ট্রীয়, ফরাসি, ইতালীয়, গ্রিক, মন্টেনেগ্রীয় এবং সার্বীয় সেনারা আলবেনিয়া দখল করে। দেশটিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বহীনতা দেখা দেয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন আলবেনিয়াকে ভাগ করে তার প্রতিবেশিদের দিয়ে দিয়ে দেবার ব্রিটিশ-ফরাসি-ইতালীয় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ভেটো দেন। ১৯২০ সালে আলবেনিয়াকে সদ্য সংগঠিত লিগ অফ নেশন্‌স-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, ফলে দেশটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯২০-এর দশকে আলবেনিয়ার জনগণ দুইটি বিরুদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির অধীনে গভীরভাবে দ্বিধাভক্ত ছিল। আহমেদ বেই জোগুর নেতৃত্বে জমিদার ও গোত্রপ্রধানদের একটি রক্ষণশীল শ্রেণী অতীতের সমাজকাঠামো ধরে রাখতে চাচ্ছিল। অন্যদিকে উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, ও ব্যবসায়ীরা আলবেনিয়ার আধুনিকীকরণ চেয়েছিলেন। উদারপন্থীদের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত অর্থডক্স গির্জার বিশপ ফান নোলি। ১৯২৪ সালে রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে এক গণবিপ্লবের ফলে জোগু ইউগোস্লাভিয়াতে পালিয়ে যান। নোলি নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন এবং পশ্চিমা ধাঁচের একটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মন দেন। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মাথায়, আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাবে ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে নোলি ক্ষমতাচ্যুত হন ও জোগু ইউগোস্লাভিয়ার সহায়তায় আবার ক্ষমতায় আসেন। জোগু এরপর ১৪ বছর শাসন করেন। প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে (১৯২৫-১৯২৮) এবং তারপর রাজা প্রথম জোগ হিসেবে (১৯২৮-১৯৩৯)। জোগের স্বৈরশাসনে আলবেনিয়ার অর্থনীতি ছিল স্থবির, তবে তিনি আলবেনিয়াতে একটি আধুনিক স্কুল ব্যবস্থা দিয়ে যান এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা আনেন। কিন্তু ভূমি সংস্কারের সমস্যা সমাধানে তিনি ব্যর্থ হন এবং কৃষকেরা দরিদ্র থেকে যায়।

জোগের শাসনের সময় আলবেনিয়ার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ইতালির এতটাই প্রভাব ছিল যে এ সময় আলবেনিয়া দৃশ্যত ইতালির একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার সামান্য আগে ইতালি আলবেনিয়া আক্রমণ ও দখল করে। জোগ পালিয়ে গ্রিসে চলে যান। ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি ইউগোস্লাভিয়া ও গ্রিসকে পরাজিত করলে কসোভো ও কামেরিয়াকে ঐ দেশগুলি থেকে নিয়ে আলবেনিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়। এই যুদ্ধকালীন আলবেনিয়া ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ইতালির অধীনে ছিল। এরপর জার্মান সেনারা এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৪ সালের নভেম্বরে জার্মানরা পিছু হটে গেলে এই যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রের পতন ঘটে। কসোভোকে সার্বিয়ার কাছে এবং কামেরিয়াকে গ্রিসের কাছে ফেরত দিয়ে দেয়া হয়।

যুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদী, রাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীরা আলবেনিয়াতে সক্রিয়ভাবে ইতালীয়, জার্মান, ও আলেবেনীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। সাম্যবাদীরা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, এবং ১৯৪৪ সালের নভেম্বর মাসে তারা আলবেনিয়ার ক্ষমতা দখল করে। এ ব্যাপারে তারা ইউগোস্লাভিয়ার সাম্যবাদীদের সাহায্য নেয়। সাম্যবাদী দলের মহাসচিব এনভার হোক্সহা দেশের নতুন নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দরিদ্র কৃষক এবং কিছু বুদ্ধিজীবীর সাহায্য নিয়ে সাম্যবাদী দল একটি আমূল সংস্কার প্রকল্প হাতে নেয় যা জমিদারদের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং শিল্প, ব্যাংক, এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তি জাতীয়তাকরণ করা হয়। এভাবে সাম্যবাদীরা তাদের শাসন শক্ত করে এবং রাষ্ট্রশাসিত একটি সমাজবাদী সমাজ গঠন করে। সোভিয়েত রাশিয়াতে স্তালিনের শুরু করা মডেল অণুসরণে কৃষির সমবায়ীকরণ করা হয়, এবং ১৯৬৭ সাল নাগাদ প্রায় সব কৃষক এই প্রকল্পের আওতায় আসে। হোক্সহার সরকার উত্তরের উচ্চভূমিতে শক্ত নিয়ন্ত্রণ স্থাপনে সক্ষম হয় এবং ঐতিহ্যবাহী পিতৃতান্ত্রিক বংশ ও গোত্রের প্রধানদের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় আইনের চোখে নারীরা পুরুষদের সমমর্যাদা লাভ করে।

শুরুর দিকে আলবেনিয়া আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের জন্য ইউগোস্লাভিয়ার উপর নির্ভর করত। কিন্তু দেশটি ইউগোস্লাভিয়ার রাজনৈতিক আগ্রাসনের ব্যাপারে ভীত ছিল। ১৯৪৮ সালে যখন স্তালিন ইউগোস্লাভিয়াকে সাম্যবাদী ব্লক থেকে আদর্শগত কারণে বহিস্কার করেন, আলবেনিয়া স্তালিনকে সমর্থন দেয়। হোক্সহা আলবেনিয়ার ইউগোস্লাভ-সমর্থক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করেন। এই দলগুলির নেতৃত্বে ছিল কোসি খোখে, হোক্সহার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বী। তবে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্ব্বী ভূমিকায় লিপ্ত হয়, আলবেনিয়া চীনকে সমর্থন দেয়, কেননা হোহক্সা চীনের আদর্শকে বেশি খাঁটি বলে মনে করতেন। হোহক্সা অন্যান্য সাম্যবাদী বন্ধু দেশের প্রতিও আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তিনি তাদেরকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ত্যাগ করার পুঁজিবাদী পশ্চিমের সাথে হাত মেলানোর অভিযোগ করেন। ১৯৬১ সালে আলবেনিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। যে সোভিয়েত সাহায্য ও কারগরি সহায়তা নিয়ে আলবেনিয়াতে আধুনিক শিল্প ও কৃষির ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বেড়ে গিয়েছিল, সেগুলি বন্ধ হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের জায়গায় চীন আলবেনিয়ার প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ও অর্থনৈতিক সাহায্যদাতায় পরিণত হয়।

১৯৬০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত আলবেনিয়া বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ১৯৬৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন চেকোস্লোভাকিয়া দখল করলে আলবেনিয়া নিজেকে রক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় দেশগুলির সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে এবং সোভিয়েত-নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ চুক্তি থেকে সরে আসে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের আঁতাতের প্রেক্ষিতে চীনের সাথে আলবেনিয়ার সম্পর্ক খারাপের দিকে মোড় নেয়। ১৯৭৮ সালে চীন আলবেনিয়ার সাথে বাণিজ্য চুক্তি ও সাহায্য রদ করে দেয়। আলবেনিয়া এরপর ইউরোপের সাথে ঘনিষ্ঠতর অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্তও আলবেনিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্র ছিল।

হোক্সহার অধীনে রাজনৈতিক নিপীড়নের পরিমাণ ছিল ভয়াবহ। বিরুদ্ধ মত দূর করার জন্য সাম্যবাদী দল বাদে বাকী সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সাম্যবাদী দলের অভ্যন্তরীণ বিরুদ্ধবাদীদেরও পর্যায়ক্রমিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়। হাজার হাজার লোককে চাকুরিচ্যুত করা হয়, শ্রম ক্যাম্পে অন্তরীণ করা হয়, কিংবা মেরে ফেলা হয়। সমস্ত সরকারি সংস্থার উপর সেন্সরশিপ জারি করা হয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক সিগুরিমি সব লোকের উপর নজরদারি করত এবং যেকোন ধরনের বিদ্রোহ দেখলেই তা দমন করত। ১৯৬৭ সালে সমস্ত ধর্মীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়, খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মালয়গুলির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং দেশটিকে বিশ্বের প্রথম নাস্তিক রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।

শাসক দলের মধ্যেই বিরোধিতার আভাস দেখা দেয়। ১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী মেহমেট শেহু অজানা রহস্যময় কারণে মারা যান। ধারণা করা হয় তিনি হোক্সহাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁয়তারা করছিলেন। ১৯৮৩ সালে সিগুরিমি বেশ কয়েকজন দলীয় কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেন। ১৯৮৫ সালের এপ্রিলে হোক্সহা মারা গেলে দলের প্রথম সচিব রামিজ আলিয়া তার পদে আসেন। আলিয়া সাম্যবাদী ব্যবস্থা বজায় রেখে অবনতিশীল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সংস্কারকাজ উপস্থাপন করেন।

১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে যখন সাম্যবাদী শাসনের অবসান ঘটে, তখন কিছু কিছু আলবেনীয় আরও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের দাবী তোলেন। এদের মধ্যে ছিলেন বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক শ্রেণীর সদস্য, এবং অসন্তুষ্ট তরুণেরা। বর্ধমান অশান্তি ও গণবিক্ষোভের মুখে আলিয়া ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন, সিগুরিমির ক্ষমতা খর্ব করেন এবং কিছু বাজার সংস্কার ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ হাতে নেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে সরকার স্বাধীন রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি বৈধ ঘোষণা করে, ফলে রাজনীতিতে সাম্যবাদী দলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়। বিচার ব্যবস্থা সংস্কার করে আইন মন্ত্রণালয় তৈরি করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিমাণ হ্রাস করা হয়। আলবেনীয়দের বিদেশ গমনের অণুমতি দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে হাজার হাজার আলবেনীয় পশ্চিমা দেশগুলির দূতাবাসের মাধ্যমে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ৫০০০ আলবেনীয়কে নিরাপদে সরিয়ে নিতে বহুদেশীয় ত্রাণ অপারেশন হাতে নেওয়া হয়। আরও ২০ হাজার আলবেনীয় নৌকায় করে অবৈধভাবে ইতালিতে পাড়ি জমায়।

একই সময়ে আলবেনিয়াতে গণপ্রতিবাদ চলতে থাকে। ফলে সরকার ও সাম্যবাদী দল থেকে অনেক চরম সাম্যবাদী নেতাকে বহিস্কার করা হয়। ১৯৯১ সালের এক মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে অনেকে নিহত হয়। মার্চে সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। একই মাসে আইনসভার জন্য বহুদলীয় নির্বাচন অণুষ্ঠিত হয়। সাম্যবাদী দল ও তাদের মিত্ররা ২৫০টি আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন জেতে। অন্যদিকে নবগঠিত ডেমোক্র‌্যাট দল ৭৫টি আসন জেতে। সাম্যবাদীদের বিজয়ের পর আরেক দফা বিক্ষোভ শুরু হয়। এবার শকোডার শহরে পুলিশের গুলিতে চার জন মারা যায়।

১৯৯১ সালের এপ্রিলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান পাস করা হয় এবং দেশের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী আলবেনিয়ার পরিবর্তে আলবেনিয়া প্রজাতন্ত্র রাখা হয়। আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্যবাদীরা আলিয়াকে নব্যসৃষ্ট রাষ্ট্রপতি পদে বসায় এবং অর্থনীতিবিদ ফাতোস নানো প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিকের সাধারণ ধর্মঘটের মুখে এই সরকার পদত্যাগ করেন এবং জুনে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়। এতে সাম্যবাদী, গণতন্ত্রী, প্রজাতন্ত্রী এবং সামাজিক গণতন্ত্রীরা অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু রাস্তায় মিছিল চলতে থাকে এবং প্রতিবাদকারীরা প্রাক্তন সাম্যবাদী নেতাদের গ্রেপ্তার ও গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবী করতে থাকে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে কোয়ালিশন সরকারের পতন ঘটে এবং একটী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯২ সালের মার্চে নতুন নির্বাচন অণুষ্ঠিত হয়, যাতে গণতন্ত্রীরা আইনসভার ১৪০টি আসনের মধ্যে ৯২টিতে বিজয়ী হয়। 
সমাজবাদীরা ৩৮টি, সমাজবাদী গণতন্ত্রীরা ৭টি এবং গ্রিক সংখ্যালঘু একতা দল ২টি আসন জেতে। আইনসভা গণতন্ত্রী দলের নেতা সালি বেরিশাকে রাষ্ট্রপতি বানায় এবং বেরিশা আলেক্সান্দর মেক্‌সিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। বেরিশার অধীনে বেশ কিছু প্রাক্তন সাম্যবাদী কর্মকর্তাকে, যাদের মধ্যে আলিয়া ও নানো-ও ছিলেন, গ্রেপ্তার করা হয়। তাদেরকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির দায়ে বিচার করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদের শাস্তি দেয়া হয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন এই বিচারগুলি ন্যায়বিচার ছিল না, বরং বেরিশা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বীদের সরিয়ে ফেলতে এগুলি ব্যবহার করেন। আলিয়া ও নানো উভয়েই কয়েক বছরের মধ্যেই ছাড়া পান। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে গণতন্ত্রীরা একটি নতুন সংবিধান প্রস্তাব করে কিন্তু জনগণ একটি গণভোটে তা প্রত্যাখ্যান করেন। বিরোধীরা বলে যে এই প্রস্তাবটিতে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতির হাতে আরও ক্ষমতা কুক্ষিগত করত। রাষ্ট্রপতিকে স্বৈরাচারী আখ্যা দেয়া হয় এই বলে যে তিনি প্রেসের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, প্রাক্তন সাম্যবাদী নেতাদের জুলুম এবং আদালতসমূহ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সরকারের সমর্থকেরা পাল্টা দাবি করে যে সমাজবাদীরা দেশের নতুন গণতন্ত্র বানচাল করে দিতে চাচ্ছে।

প্রাক্তন ইউগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্কও খারাপের দিকে মোড় নেয়, বিশেষ করে সার্বীয় প্রদেশ কসোভোর সংখাগরিষ্ঠ আলবেনীয় জনগণের উপর নিপীড়ন প্রসঙ্গে। ১৯৮৯ সালে সার্বিয়া কসভোর স্বায়ত্বশাসন রদ করে এবং ১৯৯১ সালে কসভোর আলবেনীয় নেতারা প্রদেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে কসোভো স্বীকৃতি পায়নি, আলবেনিয়া কসোভোকে সমর্থন দেয় এবং জাতিসংঘকে প্রদেশটিতে পর্যবেক্ষক পাঠাতে অণুরোধ জানায়। কিন্তু জাতিসংঘ এই অণুরোধে সাড়া দেয়নি। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি আলবেনিয়া ভয় করতে শুরু করে যে অশান্ত কসোভোতে সামরিক ধরপাকড় শুরু হবে এবং বহু লোক উদ্বাস্তু হয়ে গোটা বলকান অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। এছাড়া ম্যাসিডোনিয়াতে আলবেনীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারেও আলবেনিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে।

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি আলবেনিয়াতে সাধারণ নির্বাচন অণুষ্ঠিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রপতি সালি বেরিশার গণতন্ত্রী দল বিজয় লাভ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়। বিরোধী দলগুলি সংসদ বর্জন করে। ১৯৯৭ সালে এই সংসদ বেরিশাকে আরও ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করে। ১৯৯৭ সালের শুরুতে অনেকগুলি জাল বিনিয়োগ স্কিম ধরা পড়ে, যাতে হাজার হাজার আলবেনীয় তাদের সঞ্চয় হারান। সরকার বহু বিনিয়গকারীকে আংশিক ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও অর্থনীতিতে বিপর্যয় ও রাজনৈতিক স্ক্যান্ডালের প্রেক্ষিতে আলবেনীয়রা প্রথমে বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ শুরু করে ও পরে সেগুলি রায়টে রূপ নেয়। ১৯৯৭ সালের মার্চের মধ্যে দেহসব্যাপী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের অনেক অংশে প্রশাসন বিকল হয়ে যায়। দেশের দক্ষিণাংশ, বিশেষ করে ভলোরে এবং সারান্দে শহর, স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী ও সশস্ত্র নাগরিকেরা লুটেরাদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিজেদের হাতে তুলে নেন।

দেশব্যাপী গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয় এবং রাষ্ট্রপতি বেরিশা একটি অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠন করেন, যার প্রধান ছিলেন সমাজবাদী বাশকিম ফানো। বেরিশা জুনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন এবং তার দল হেরে গেলে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগের প্রতিশ্রুতি দেন। নতুন সরকার দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য কামনা করে। তবে ইতালীয় কমান্ডারের অধীনে আগত বহুজাতিক বাহিনীটিকে কেবল আলবেনিয়ার দুর্গম এলাকাগুলিতে ত্রাণ সরবরাহেই কাজে লাগানো হয়।

১৯৯৭ সালের জুনের নির্বাচনে সমাজবাদীরা ৬৫% ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসে। বেরিশা জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন। কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত নেতা ফাতোস নানো প্রধানমন্ত্রী হন। রেক্সহেপ মেজদানী নামের আরেকজন সমাজবাদী নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদ দেওয়া হয়। গণতন্ত্রীরা ১৯৯৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সংসদ বয়কট করেন। ১৯৯৭ সালের আগস্টে সরকার ঘোষণা দেন যে ভলোরে শহরে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই মাসেই বহুজাতিক বাহিনী আলবেনিয়া ত্যাগ করে। ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নানো কোয়ালিশন সরকারের সাথে মন্ত্রীসভায় পরিবর্তনের ব্যাপারে মতভেদের কারণে পদত্যাগ করেন। পান্ডেলি মাজকো নামের একজন সমাজবাদী নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়। কসোভোতে জাতিগত আলবেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বহু সার্বীয় পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করলে এর জের ধরে ১৯৯৮ সালের শুরুতে তৎকালীন ইউগোস্লাভিয়ার (বর্তমান সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো) সাথে আলবেনিয়ার সম্পর্ক খারাপের দিকে মোড় নেয়। সার্বীয় পুলিশ ও ইউগোস্লাভ সেনাবাহিনীর দল কসোভোর সাধারণ জনগণের উপর হামলা করে এবং ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের শুরুর অধিকাংশ সময় জুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কসভো মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে। ইউগোস্লাভিয়া কসোভোর ব্যাপারে শান্তিচুক্তিতে আসতে অসম্মতি জানালে ১৯৯৯ সালের মার্চে ন্যাটো ইউগোস্লাভ সামরিক স্থাপনাগুলিতে বিমান হামলা চালানো শুরু করে। এর জবাবে সার্বীয় সেনারা কসোভোর গ্রামগুলিতে আরও বেশি আক্রমণ শুরু করে, ফলে লাখ লাখ লোক নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে চলে যায়। ১৯৯৮ সাল থেকেই আলবেনিয়া কসোভো-আগত উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়ে আসছিল, কিন্তু ১৯৯৯- এর বিমান হামলার ফলে উদ্বাস্তুর ঢেউ সামলাতে আলবেনিয়া হিমশিম খেয়ে যায়। দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিতে চাপের সৃষ্টি হয়। জুন মাসের মধ্যেই প্রায় সাড়ে চার লাখ কসোভোবাসী আলবেনিয়াতে আশ্রয় নেয়। ঐ মাসেই ইউগোস্লাভ সরকার একটি আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়। চুক্তির শর্ত অনুসারে কসোভোতে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী স্থাপন করা হয় যাতে উদ্বাস্তুরা নিরাপদে দেশে ফিরে আসতে পারে।

১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে মাজকো সাম্যবাদী দলের অভ্যন্তরীণ আস্থা হারিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেন। তার স্থানে আসেন ইলির মেতা, একজন তরুণ ও সংস্কারপন্থী নেতা। মেতা মাজকো সরকারের নীতি ধরে রাখার ব্যাপারে শপথ করেন; এই নীতিগুলির মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেটোতে আলবেনিয়ার সদস্যপদ প্রাপ্তির ব্যাপারে কাজ করা। ২০০১ সালের জুন মাসে অণুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে।

কিন্তু ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে ফাতোস নানোর সাথে তিক্ত বিবাদের জের ধরে মেতা হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেন। সমাজতান্ত্রিক দলও এতে দুই ভাগ হয়ে যায়। নানো মেতার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন এবং মন্ত্রীসভাতে আমূল পরিবর্তন আনতে বলেন। মেতার পদত্যাগের পর পরই গণতন্ত্রী দলের সদস্যরা সাত মাসের বয়কট শেষ করে সংসদে ফেরত আসেন।

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সমাজতান্ত্রিক দলের নেতারা মাজকোকে মেতার উত্তরসূরী হিসেবে নির্বাচিত করেন এবং জুন মাসে সংসদ বিদায়ী রেক্সহেপ মেজদানির স্থলে আলফ্রেড মোইসিউ-কে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেয়। মোইসিউ একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এবং প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। তিনি জুলাই মাসে পদ গ্রহণ করেন। একই মাসে মাজকোকে সরিয়ে নানো প্রধানমন্ত্রী হন। নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করা হয় এবং আশা করা হয় সেটি সমাজতান্ত্রিক দলের অন্তর্কোন্দল বন্ধ করবে।

আলবেনিয়ার রাজনীতি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় পরিচালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী সরকার ও একটি বহু-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সরকার ও আইনসভা উভয়ের হাতে ন্যস্ত। আলবেনিয়ার আইনসভার নাম Kuvendi i Republikës së Shqipërisë। ১৯৯১ সাল থেকে দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রচলিত। তবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আলবেনিয়া এবং সোশালিস্ট পার্টি অফ আলবেনিয়া নামের দুইটি দল আলবেনিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে।

দেশটি ১৯৮৮ সালের ৬৫ হাজার সেনাসদস্য থেকে ২০০৯ সালে এ সংখ্যা নামিয়ে নিয়ে আসে ১৪ হাজার ৫০০-তে। ১৯৯০ সালে পুরনো বেশ কিছু অস্ত্র তারা ধ্বংস করে। ২০০৮ সালে দেশটি তার জিডিপি’র ২.৭ শতাংশ এ খাতে খরচ করেছিল। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটি ন্যাটোর সাথে কাজ করতে শুরু করে।

আলবেনিয়ার এক-তৃতীয়াংশের বেশি অংশজুড়ে আছে বনাঞ্চল। আর এর আয়তন হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই পুরো অংশটিই বেশ ঘন বনে আচ্ছাদিত। আলবেনিয়ায় তিন হাজারের অধিক প্রজাতির গাছ পাওয়া গেছে। এগুলোর অনেকগুলোই ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মধ্যসাগরীয় শান্ত জলবায়ুই এখানে বিরাজ করে থাকে। আলবেনিয়ার শীতকালটি তুলনামূলক উষ্ণ এবং রৌদ্রময়। আর গ্রীষ্মকাল সাধারণত অধিকতর শুষ্ক থাকে। যদিও অন্যান্য অংশের আবহাওয়া ঋতুর ওপর নির্ভর করে কিন্তু দেশটির এক হাজার ৫০০ মিটার ওপরের এলাকাগুলোতে শীতকালসহ বেশির ভাগ সময়েই তীব্র শীত অণুভূত হয়, অবিরাম তুষারপাতও দেখা যায় সেখানে। দেশের নিম্নাঞ্চল ও নদী তীরবর্র্তী এলাকাগুলোতে দুপুরে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলেও রাতে সবসময়ই শীতল থাকে।

আলবেনিয়া একটি দরিদ্র দেশ। বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবাদে দেশটি নতুন নতুন ব্যবসা খুলে নিজের অর্থনীতি চাঙ্গা করার দিকে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সালে এর প্রবৃদ্ধি হবে ২.৬ শতাংশ, যা ২০১১ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ৩.২ শতাংশে। আলবেনিয়াতে এখন বিনিয়োগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আলবেনিয়া ও ক্রোশিয়া মিলিতভাবে মন্টেনেগ্রোর সীমান্তে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের ফেব্র“য়ারিতে একটি ইতালীয় কোম্পানি আলবেনিয়াতে ৮০০ মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়। আর এগুলোর সাহায্যে আলবেনিয়া তার রফতানি খাতে বিদ্যুৎকে যুক্ত করতে চাইছে। দেশটিতে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি রয়েছে। তবে এখানে দৈনিক তেল উৎপাদনের হারটি বেশ কম। মাত্র ছয় হাজার ৪২৫ ব্যারেল। তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের যে মজুদের খবর পাওয়া গেছে তাতে দেশের জনগণের চাহিদা আপাতত মিটে যাওয়ার কথা। এর বাইরে দেশটিতে কয়লা, বক্সাইট, কপার এবং লোহার খনি রয়েছে। আলবেনিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে কৃষিরও। এ খাতে দেশটির ৫৮ শতাংশ লোক নিয়োজিত আর তা জিডিপিতে অবদান রাখছে ২১ শতাংশ । আলবেনিয়ার গম, ভুট্টা, তামাক, ডুমুর এবং জলপাইয়ের উৎপাদন মোটামুটি আলোচনায় আসার মতো।

দেশটির সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। সড়ক, রেল ও বিমান সব দিক দিয়েই যোগাযোগব্যবস্থায় ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে তারা। তবে সম্প্রতি দেশটির সরকার কসভো, মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোশিয়া ও গ্রিসের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে মনোযোগ দিয়েছে। এ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আলবেনিয়ার ৭৫৯ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক তৈরি হবে। এরই পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়নেরও ব্যবস্থা নিচ্ছে।

জানুয়ারী ২০১০-এর উপাত্ত অনুযায়ী আলবেনিয়ার জনসংখ্যা ৩১,৯৫,০০০। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ০.৫৪৬%। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে 
জনবসতির ঘনত্ব ১১১ জন।মাত্র ৩৫ লক্ষ লোকের দেশ আলবেনিয়ায় শতকরা ৯৫% শতাংশ লোক আলবেনীয় ভাষার কোন উপভাষায় (তোস্ক বা ঘেগ) কথা বলে থাকে। আলবেনীয়ার বাকী জনগণ সবচেয়ে বেশী যে ভাষায় কথা বলে, তা হল গ্রিক। এছাড়া ম্যাসিডোনীয় ভাষা ও সার্বো-ক্রোটীয় ভাষাতেও স্বল্পসংখ্যক লোক কথা বলেন। 
যাদের মাতৃভাষা আলবেনীয়, তারা মূলত দুইটি উপভাষার একটিতে কথা বলেন। এগুলি হল উত্তরের ঘেগ আলবেনীয় এবং দক্ষিণের তোস্ক আলবেনীয়। তোস্ক আলবেনীয় উপভাষা উপর ভিত্তি করে আদর্শ আলবেনীয় ভাষা গঠিত হয়েছে। আলবেনিয়ার বাইরে ম্যাসিডোনিয়া ও কসোভোতেও আলবেনীয় ভাষার প্রচলন আছে। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধের সময় প্রায় ৫ লক্ষ আলবেনীয়ভাষী কসোভোবাসী আলবেনিয়াতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেন। আলবেনিয়ার গণমাধ্যমের ভাষা আলবেনীয়। তবে রেডিও তিরানা আটটি ভাষায় প্রোগ্রাম সম্প্রচার করে। এছাড়া অনেক আলবেনীয় স্যাটেলাইটের সাহায্যে ইতালীয় ও গ্রিক টিভির অণুষ্ঠান দেখে থাকেন।

আলবেনিয়ার সরকারি ভাষা আলবেনিয়ান। গেগ ও তোস্কের মিলিত রূপই হচ্ছে আলবেনিয়ান ভাষা। এখানে সংখ্যালঘু গ্রিকদের ভাষাও বেশ প্রচলিত। এর পাশাপাশি সার্বিয়ান, মেসিডোনিয়ান, রোমানি এবং অ্যারোমেনিয়ান ভাষা দেশটিতে চালু আছে।

সরকারিভাবে আলবেনিয়ার জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের দেয়া তথ্য মতে, দেশটিতে ৭০ শতাংশ মুসলিম, ২০ শতাংশ অর্থোডক্স এবং ১০ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক মানুষ রয়েছে। ১১ শতকের সময়ের প্রথম যে ইতিহাস পাওয়া যায় তখন এ আলবেনিয়া পুরোটাই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ছিল। কিন্তু পরে তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে আসার পর দেশটিতে ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা খ্রিষ্টানদের ছাড়িয়ে যায়। ১৯১২ সালে তুর্কি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দেশটিতে বিভিন্ন মতাদর্শের শাসন বিশেষ করে কমিউনিস্ট শাসন চলায় দেশটিতে সেকুলার আদর্শ অনেকর মধ্যে প্রভাব ফেলে। ফলে মুসলিম বা খ্রিষ্টান থাকার পরও অনেকে কমিউনিস্ট আদর্শ লালন করেন। দেশটিতে সব ধর্ম পালনেরই সমান স্বাধীনতা রয়েছে। দেশটির পুরো অংশতেই মুসলমানদের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও রোমান ক্যাথলিকরা তাদের জন্য দেশটির উত্তরাঞ্চল এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা নিজেদের জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বেছে নিয়েছে।

আলবেনিয়া তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার সময় দেশটিতে শিক্ষার হার ছিল ৮৫ শতাংশ। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টুকুতে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ দেশের শাসকরা আবার দেশটির শিক্ষার হার বাড়াতে ব্যাপকাকারে উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১২ থেকে ৪০ বয়সসীমার মধ্যে থাকা সবাইকেই শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ফলাফল হিসেবে দেশটিতে বর্তমান শিক্ষার হার ৯৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষদের শিক্ষার হার ৯৯.২ শতাংশ এবং নারীদের শিক্ষার হার ৯৮.৩ শতাংশ। দেশটির প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে তিরানার ইউনিভার্সিটি অব আলবেনিয়া। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে এটি যাত্রা শুরু করে।

আলবেনিয়ার স্বকীয় সংস্কৃতি কালান্তরে গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টীয়, তুর্কি, স্লাভীয় ও ইতালীয় সংস্কৃতি থেকে বহু উপাদান ধার করেছে। ঐসব দেশ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বলকান অঞ্চল শাসন করত। এসব ভিন্ন ভিন্ন বৈদেশিক প্রভাব সত্ত্বেও আলবেনীয় সংস্কৃতি বেশ সমসত্ত্ব। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে আছে রঙিন, সূচির কারুকাজময় শার্ট ও মহিলাদের পোশাক। কোন কোন অঞ্চলে মহিলারা ঢিলেঢালা প্যান্ট পরেন। সাম্যবাদী শাসনের সময় এইসব ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় কারখানায় নির্মিত কমদামী, আধুনিক পোশাক পরাকে উৎসাহিত করা হয়। গণতন্ত্রের আগমনের পর থেকে লোকজন এসব ব্যাপারে আরও বেশি পছন্দ করার সুযোগ পেয়েছে। এখনও গ্রামাঞ্চলে ও উচ্চভূমি অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের চল দেখা যায়, বিশেষত মহিলাদের মধ্যে।

সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের জন্য দেশটি ১৯৩০ সালে গঠন করেছে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অব আলবেনিয়া। দেশটি ফিফার সদস্য এবং উয়েফার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। দেশটিতে অন্যান্য খেলাধুলার মধ্যে বাস্কেটবল, ভলিবল, রাগবি এবং জিমন্যাস্টিক উল্লেখযোগ্য।

সরকার




#Article 47: আলজেরিয়া (1732 words)


আলজেরিয়া উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। এর পূর্ণ সরকারী নাম আলজেরিয়া গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্র। দেশটির আয়তন প্রায় ২৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৭৪১ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ১৭ গুণ)। আয়তনের বিচারে আলজেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম ও বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র।  আলজেরিয়ার জনসংখ্যা প্রায়  ৪ কোটি ৩৬ লক্ষ; জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৬ জন। আলজেরিয়ার আরবি নাম আলজাজাইর (অর্থাৎ দ্বীপসমূহ); নামটি রাজধানীর তীর সংলগ্ন দ্বীপগুলিকে নির্দেশ করছে। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত আলজিয়ার্স দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী; এছাড়া ওরান, কন্সটান্টিন ও আন্নাবা কিছু গুরুত্বপূর্ণ নগরী।  ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের কারণে আলজেরিয়াকে আরব বিশ্বের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। আলজেরিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে তিউনিসিয়া, পূর্বে লিবিয়া। পশ্চিমে মরক্কো ও পশ্চিম সাহারা প্রজাতন্ত্র, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মালি ও মোরিতানিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বে নাইজার অবস্থিত। আলজেরিয়ার নাগরিকদেরকে আলজেরীয় বলা হয়। 

উত্তর আলজেরিয়ার ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলটির নাম তেল। এখানেই দেশের সিংহভাগ লোক বাস করে। আলজেরিয়ার তটরেখায় অনেক খাঁড়ি ও উপসাগর আছে। এখানে উর্বর সমভূমি ও অনুচ্চ পাহাড় আছে। নদীগুলি ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ধরনের। উত্তর আলজেরিয়াতে গ্রীষ্মকালীন জলবায়ু উষ্ণ ও শুষ্ক এবং শীতকালগুলি মৃদু ও বৃষ্টিবহুল। উত্তরের তেল অঞ্চলটির ঠিক দক্ষিণে অ্যাটলাস পর্বতমালা উত্তর আলজেরিয়ার পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রসারিত হয়েছে; এর সর্বোচ্চ বিন্দু চেলিয়া পর্বত (২৩২৮ মিটার)। অ্যাটলাস পর্বতমালা দুইটি সমান্তরাল পর্বতমালা নিয়ে গঠিত, উত্তরের তেলীয় অ্যাটলাস এবং দক্ষিণের সাহারা অ্যাটলাস।  অ্যাটলাস পর্বতমালার দক্ষিণে অবস্থিত মধ্য ও দক্ষিণ আলজেরিয়া মূলত সাহারা মরুভূমির উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত। সাহারা মরুভূমি আলজেরিয়ার প্রায় নয়-দশমাংশ এলাকা গঠন করেছে। সাহারাতে কিছু মালভূমি এবং মধ্য আলজেরিয়াতে আর্গ নামের বিশাল সুউচ্চ অনেক বালিয়াড়ি (বালির পাহাড়) আছে। আলজেরিয়ার সর্বোচ্চ বিন্দু তাহাত পর্বত (২৯১৮ মিটার) এখানেই অবস্থিত। সাহারা মরুভূমির জলবায়ু ঋতু বা দিবসের অহ্ন অনুযায়ী অত্যন্ত শীতল বা অত্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে; এখানে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত বিরল। আলজেরিয়ার উদ্ভিদগুলি পানি ছাড়াই বহুদিন বেঁচে থাকতে পারে। উত্তরের তেল অঞ্চলে চিরসবুজ গুল্ম ও অনুচ্চ বিভিন্ন বৃক্ষের দেখা মেলে। মরুভূমি অঞ্চলে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস, গুল্ম, আকাসিয়া বৃক্ষ ও জুজুবে বৃক্ষের আবাস। আলজেরিয়ার স্থানীয় হায়েনা, খ্যাঁকশিয়াল, বানর, বাজপাখি ও সাপ আছে। আরও আছে অ্যান্টিলোপ হরিণ, বুনো খরগোশ, তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী ও বন্য শূকর। সাহারা কাঁকড়াবিছার উপস্থিতি খুবই সাধারণ। 

আলজেরিয়ার সিংহভাগ (৭৫%) জনগণ নৃতাত্ত্বিকভাবে ও ভাষাগতভাবে আরব জাতির লোক; এছাড়া এখানে বার্বার (আমাজিগ) জাতির একটি বৃহৎ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বাস করে, যারা জনসংখ্যার প্রায় ২৪%। এখানে আরবদের আগমনের পূর্বে বার্বার জাতির লোকেরাই বাস করত। বর্তমানে বার্বার জাতির লোকেরা দেশের উত্তর-পূর্বভাগের কাবিলিয়া অঞ্চলে ঘনীভূত। সংখ্যালঘু বার্বারেরা ইসলাম গ্রহণ করলেও নিজ ভাষা ও রীতিনীতি বিসর্জন দেয় নি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বার্বারদেরকে অধিকতর জাতিগত অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সাহারা অঞ্চলে মাত্র ৫ লক্ষ লোক বাস করে। এরা হয় খনিজ তেলখনির শ্রমিক, অথবা মেষপালক বা ছাগলপালক যাযাবর তুয়ারেগ জাতির লোক। আরবি ও বার্বার (তামাজিগত) দুইটি সরকারী ভাষা। তবে ঔপনিবেশিক কারণে প্রশাসন, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার ভাষা হিসেবে ফরাসি ভাষা এখনও বহুল প্রচলিত। সরকারী ধর্ম ইসলাম, প্রায় সবাই (৯৯%) মুসলমান এবং সিংহভাগ মুসলমান সুন্নি মতাদর্শী। কুসকুস (গমের সুজিভিত্তিক পদ) ও ত্বজিন (মাটির পাত্রে অল্প পানিতে সিদ্ধ মসলা, বাদাম ও শুকনো ফল দেয়া মাছ, মাংস ও সবজির মিশ্রণ) দুইটি প্রধান স্থানীয় পদ। খেজুরের বীজ ভেজে গুঁড়ো করে কফি বানিয়ে খাওয়া হয়। আলজেরিয়া একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র যার একটি দ্বিকাক্ষিক আইনসভা আছে। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থাতে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান।    

আলজেরিয়া একটি উন্নয়নশীল দেশ, যার অর্থনীতি মূলত সাহারা মরুভূমি থেকে উত্তোলিত খনিজ তেল (পেট্রোলিয়াম) ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানির উপরে নির্ভরশীল, এই দুইটি দ্রব্য দেশটির রপ্তানিকৃত পণ্যের ৯৭% গঠন করেছে। আলজেরিয়া মূলত ফ্রান্স ও ইতালিতে গ্যাস রপ্তানি করে। দেশটির মুদ্রার নাম আলজেরীয় দিনার, যা আবার ১০০ সঁতিমে বিভক্ত। স্বাধীনতা লাভের পর দেশটি অর্থনীতির সিংহভাগ রাষ্ট্রায়ত্তধীন করলেও ১৯৮০-র দশক থেকে কিছু কিছু খাতের আংশিক বেসরকারীকরণ ঘটেছে। বেশিরভাগ আলজেরীয় সরকারী চাকুরি, সামরিক বাহিনী বা কৃষিখাতে (শ্রমশক্তির এক-চতুর্থাংশ) নিয়োজিত। এখানে গম, আলু, টমেটো, যব, খেজুর, ডুমুর, পেঁয়াজ, কমলা, জলপাই ও আঙুরের চাষ হয়। আলজেরিয়া খেজুর ও কর্ক (কর্ক ওক বৃক্ষের ছাল) উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলির একটি। গবাদি পশু হিসেবে মূলত ভেড়া ও ছাগল পালন করা হয়। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে আলজেরিয়াকে তিন-চতুর্থাংশ খাদ্য আমদানি করতে হয়। শিল্পখাতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, তামাকজাত দ্রব্য, সিমেন্ট, ইট, টালি, লোহা ও ইস্পাতের দ্রব্য উৎপাদন করা হয়।.২০১৯ সালে মাথাপিছু স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ৪২২৯ মার্কিন ডলার, যা বিশ্বে ১০৯তম। দেশটির মানব উন্নয়ন সূচক ০.৭৫৯ (অর্থাৎ উচ্চ), যা বিশ্বে ৮২তম।  

প্রাচীন যুগ থেকেই এখানে বার্বার জাতির লোকেরা বাস করত; বার্বারেরাই সম্ভবত প্রথম উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করেছিল। এরপর এখানে পালাক্রমে বিভিন্ন আক্রমণকারী জাতিদের আগমন ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দে আলজেরিয়া অঞ্চলে ফিনিসীয় বণিকেরা বসতি স্থাপন করেছিল। এরপর কার্থেজীয় জাতিরাও এখানে আক্রমণ করে। এর কয়েক শতাব্দী পরে রোমানরা অঞ্চলটি আক্রমণ করে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪০ অব্দ নাগাদ সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।  খ্রিস্টীয় ৫ম শতকে রোমের পতন ঘটলে ভ্যান্ডাল জাতির লোকেরা অঞ্চলটি আক্রমণ করে। পরে বাইজেন্টীয় (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্য অঞ্চলটি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে এখানে মুসলমানদের আক্রমণ শুরু হয় এবং ৭১১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকা উমাইদ রাজবংশীয় খলিফাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আরব মুসলমানেরা এখানে ইসলাম ধর্ম ও আরবি ভাষার প্রচলন করে।  এরপর বেশ কয়েকটি বার্বার মুসলমান রাজবংশ অঞ্চলটি শাসন করে; এদের মধ্যে আলমোরাভিদ রাজবংশটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। আলমোরাভিদরা ১০৫৪ থেকে ১১৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন এবং তাদের সাম্রাজ্য ইউরোপের স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপরে আলমোহাদ রাজবংশটিও ১১৩০-১২৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। ১৫১৮ সালে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্য উত্তর আলজেরিয়া দখলে নেয়। বার্বার উপকূলের জলদস্যুরা বহু শতাব্দী ধরে ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য হুমকি ছিল। জলদস্যুদের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে তাদেরকে দমনের মিথ্যা কারণ দেখিয়ে ফরাসিরা ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া আক্রমণ করে। ১৮৪৭ সালের মধ্যে ফ্রান্স অঞ্চলটির সিংহভাগ এলাকায় সামরিক শাসন জারি করে; আলজেরিয়া একটি ফরাসি উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯শ শতকের শেষে এসে ফরাসিরা আলজেরিয়াতে বেসামরিক শাসন চালু করে। এসময় প্রায় ১০ লক্ষ শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় (মূলত ফরাসি, স্পেনীয় ও ইতালীয়) আলজেরিয়াতে অভিবাসন করে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীত ১৯২০-এর দশক থেকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে, তারা আরও বেশি অধিকার দাবী করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ সালে ফ্রোঁ দ্য লিবেরাসিওঁ নাসিওনাল (এফএলএন, জাতীয় স্বাধীনতা ফ্রন্ট) নামের একটি দলের নেতৃত্বে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে একটি গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। আট বছর ধরে সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশটির অশেষ ক্ষতিসাধন হয়, প্রায় ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয় এবং যুদ্ধশেষে কয়েক হাজার বাদে প্রায় সব ইউরোপীয় আলজেরিয়া ছেড়ে চলে যায়। ফ্রোঁ দ্য লিবেরাসিওঁ নাসিওনাল নতুন সরকার গঠন করে। স্বাধীনতার সময়ে আলজেরিয়ার অর্থনীতি ছিল অনুন্নত ও কৃষিনির্ভর, তবে সরকার শীঘ্রই এটি আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে আলজেরিয়া আফ্রিকার ধনী দেশগুলির একটি, এবং এর অন্যতম কারণ পেট্রোলিয়ামের রপ্তানি। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো আলজেরিয়াতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এদের মধ্যে একটি দল ছিল ইসলামপন্থী ফ্রোঁ ইসলামিক দে সালভাসিওঁ (এফইএস); তারা আলজেরিয়াতে একটি একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। যখন প্রতিভাত হয় যে এফইএস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করবে, তখন ক্ষমতাসীন সরকার সামরিক বাহিনীর সাহায্য নিয়ে নির্বাচন বাতিল করে দেয় এবং দেশের শাসন করায়ত্ত করে। এর ফলে দেশটিতে  সামরিক বাহিনী ও ইসলামী মৌলবাদীদের মধ্যে এক বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বহু হাজার আলজেরীয় নাগরিক সন্ত্রাসী হামলায় মারা যায়। ১৯৯৯ সালে আরেকটি নির্বাচনে আলজেরীয়রা আবদেলাজিজ বুতেফিকাকে ১৯৬৫ সালের পরে প্রথমবারের মতো একজন বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। কিন্তু বিভিন্ন চরমপন্থী ইসলামী দলগুলির সাথে সরকারের সংঘাত অব্যাহত থাকে। রাজনৈতিক গণ্ডগোলের কারণে বহুসংখ্যক দক্ষ বিদেশী শ্রমিক আলজেরিয়া ত্যাগ করেছে। তবে সরকারী উদ্যোগের ফলে ২১শ শতকের শুরুতে এই যুদ্ধ অনেকাংশেই দমন সম্ভব হয়েছে। আলজেরিয়া জাতিসংঘ ও আরব লিগের সদস্য হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।                                  

আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি আলজেরিয়ার সামরিক বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক। ২০০৪ সালে আলজেরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল ১,৩৭,৫০০। এদের মধ্যে স্থল সামরিক বাহিনীতে আছেন প্রায় ১,২০,০০০ জন সেনা। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নিয়েই সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়। এই সামরিক বাহিনী উত্তর আফ্রিকার ২য় বৃহত্তম,যার আগে রয়ছে মিশর। 
আলজেরিয়ার বিমানবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১০ হাজার। এরা সোভিয়েত, চেক, মার্কিন ও ফরাসি-নির্মিত জেট বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। নৌবাহিনীতে প্রায় ৭,৫০০ জন কর্মরত আছেন।

আলজেরিয়ার উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া, দক্ষিণে নাইজার, মালি এবং মোরিতানিয়া, পশ্চিমে মরক্কো ও পশ্চিম সাহারা। এটি একটি বিশাল দেশ। এটি আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। দেশটিকে দুইটি সুস্পষ্ট ভৌগলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তরপ্রান্তে অবস্থিত অঞ্চলটি তেল নামে পরিচিত। এটি মূলত তেল অ্যাটলাস পর্বতমালাটি নিয়ে গঠিত, যা উপকূলীয় সমভূমিগুলিকে দক্ষিণের দ্বিতীয় অঞ্চলটি থেকে আলাদা করেছে। এখানকার জলবায়ু ভূমধ্যসাগর দ্বারা প্রভাবিত। দক্ষিণের দ্বিতীয় অঞ্চলটি প্রায় সম্পূর্ণই মরুভূমি আবৃত। এই অঞ্চলটি আলজেরিয়ার আয়তনের সিংহভাগ গঠন করেছে। এটি মূলত গোটা উত্তর আফ্রিকা জুড়ে বিস্তৃত সাহারা মরুভূমির পশ্চিম অংশ। 

আলজেরিয়ার ভূমিরূপের মূল গাঠনিক বৈশিষ্ট্যগুলি আফ্রিকান ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতগুলির মধ্যে সংঘর্ষের ফলে ভূমধ্যসাগরীয় সীমারেখা বরাবর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশটি দুইটি ভিন্ন ভৌগলিক অঞ্চলে বিভক্ত। উত্তরের তেল নামক অঞ্চলটিতে দেশের বেশির ভাগ নাগরিক বাস করেন। এখানে দুইটি ভৌগলিকভাবে নবীন স্তুপপর্বতমালা রয়েছে: তেল অ্যাটলাস পর্বতমালা এবং সাহারান অ্যাটলাস পর্বতমালা। এগুলি সমান্তরালভাবে পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে এবং উচ্চ মালভূমি দ্বারা এরা নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন। দক্ষিণের সাহারা মরুভূমি অঞ্চলটি একটি কঠিন, প্রাচীন, আনুভূমিক ও সুষম শিলাস্তরের উপর অবস্থিত। বেশ কিছু মরূদ্যান ছাড়া এখানে তেমন কোন জনবসতি নেই। তবে এখানে প্রচুর লুক্কায়িত খনিজ সম্পদ আছে, যার মধ্যে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস অন্যতম।

ক্রমাগত বৃক্ষ ও উদ্ভিদ নিধন এবং ভূমিক্ষয়ের কারণে উর্বর বাদামী মাটিযুক্ত এলাকার আয়তন কমে গেছে। কেবল কিছু উচ্চভূমিতেই এরকম উর্বর মাটি দেখতে পাওয়া যায়; সেখানে এখনও চিরহরিৎ ওকে অরণ্যের দেখা মেলে। উত্তর তেল পর্বতমালার অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলগুলিতে মূলত ভূমধ্যসাগরীয় লাল মাটি পাওয়া যায়। দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হবার সাথে সাথে আর্দ্রতা ও মাটির পরিপক্কতা ক্রমাগত কমতে থাকে। এই অঞ্চলে আবহাওয়ার কারণে রাসায়নিক  উপায়ে শিলাভাঙ্গন ও জৈবিক বস্তুর সঞ্চয় খুবই কম। মরু অঞ্চলগুলিতে প্রায় সার্বক্ষণিক শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়ের কারণে মাটি সৃষ্টির প্রক্রিয়া আরও ব্যহত হয়। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সাহারা মরুভূমির উত্তরমুখী দখল ঠেকানোর জন্য একটি সবুজ প্রতিবন্ধক বলয় তৈরির একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটিতে প্রায় ২০ কিমি প্রশস্ত এবং প্রায় ১৬০০ কিমি দীর্ঘ একটি ফিতাসদৃশ ভূমিকে বনে রূপান্তরিত করার কথা ছিল। প্রকল্পটি আংশিকভাবে সফল হয়। ১৯৮০-র দশকের মধ্যভাগে আরও প্রায় ৩৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বনায়ন করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

১৯৯০ সালে আরবি ভাষাকে সরকারীভাবে আলজেরিয়ার জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সিংহভাগ আলজেরীয় মানুষ প্রচলিত কথ্য আরবি ভাষার একাধিক উপভাষাগুলির কোনও একটিতে কথা বলেন। মরক্কো ও তিউনিসিয়ার যে অঞ্চলগুলি আলজেরিয়ার সীমানার কাছে অবস্থিত সেখানকার উপভাষাগুলির সাথে এই উপভাষাগুলির মোটামুটি মিল আছে। বিদ্যালয়গুলিতে আধুনিক আদর্শ বা প্রমিত আরবি ভাষা শেখানো হয়। আলজেরিয়ার ইমাজিগেন নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা আমাজিগ ভাষার বিভিন্ন ভৌগলিক উপভাষাতে কথা বলে, তবে এদের বেশিরভাগই আরবি ভাষাতেও সমানভাবে কথা বলতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকেই আলজেরিয়ার সরকারের নীতি ছিল আরবিকরণ, অর্থাৎ স্থানীয় আরবি ভাষাকে উৎসাহিত করা এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলি সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া। এর ফলশ্রুতিতে জাতীয় ভাষামাধ্যম হিসেবে আরবি ভাষা ফরাসি ভাষাকে  প্রতিস্থাপিত করেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষাদানের মূল ভাষা হিসেবে এখন আরবি ব্যবহার করা হয়। কিছু আমাজিক জাতিদল এই নীতির জোর বিরোধিতা করেছে, কেননা তাদের আশঙ্কা হল এর ফলে দেশে সংখ্যাগুরু আরবিভাষী জনগণ তাদেরকে দমন করবে। ২০০২ সালে আমিজাগ ভাষাকে জাতীয় ভাষা এবং ২০১৬ সালে এটিকে সরকারী ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।

আলজেরিয়ার সকল ব্যক্তি ইসলাম ধর্মাবলম্বী । সকলেই প্রায় সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী । শিয়া অনুসারী সংখ্যালঘু ।

আলজেরিয়ার সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূ্র্ণ|এখানের মানুষ আরবি,ফরাসি,বার্বার ভাষাসহ চতুর্থ ও পঞ্চম ভাষাতেও পারদর্শী হয়|




#Article 48: অ্যান্ডোরা (596 words)


অ্যান্ডোরা (কাতালান ভাষায় Andorra আন্দরা) দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ মহাদেশের একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। দেশটি পূর্ব পিরিনীয় পর্বতমালায় ফ্রান্স ও স্পেনের মাঝে অবস্থিত। অ্যান্ডোরা বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রগুলির একটি। এর আয়তন ৪৬৮ বর্গকিমি ও জনসংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। আন্দরা লা ভেলিয়া রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

অ্যান্ডোরা একটি রুক্ষ এলাকা; গভীর গিরিখাত, সরু উপত্যকা ও সুউচ্চ পর্বত এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। এর সর্বনিম্ন এলাকা সমুদ্র সমতল থেকে ৯১৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। শীতকালে প্রচুর বরফ পড়ে এর পাহাড়ি রাস্তাগুলি প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়, বিশেষত ফ্রান্সের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী রাস্তাটি। গ্রীষ্মে এর আবহাওয়া শীতল, শুষ্ক ও রোদেলা।

অ্যান্ডোরা বহু বছর ধরে অবহেলিত ছিল। ১৯৫০-এর দশকে এসে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ক্ষুদ্র হলেও অ্যান্ডোরাতে পিরিনীয় পর্বতমালার সেরা স্কি ও স্নোবোর্ডিঙের ব্যবস্থা আছে। হাইকিং, বাইকিং ও আল্পস পর্বতমালার অসাধারণ দৃশ্যাবলী গরমকালে পর্যটকদের ডেকে আনে। তবে অ্যান্ডোরার বেশির ভাগ অতিথিই দৈনিক ভিত্তিতে স্পেন বা ফ্রান্স থেকে প্রবেশ করেন, বিশেষত দেশটির করমুক্ত কেনাকাটার সুবিধা গ্রহণের জন্য। ব্যবসায়ীরা আন্দোররা লা ভেল্লা ও অন্যান্য শহরের রাস্তায় রাস্তায় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, মদ, তামাক ও অন্যান্য বিলাসদ্রব্য বিক্রি করেন।

পর্যটন অ্যান্ডোরার আয়ের মূল উৎস, তবে কিছু কিছু অ্যান্ডোরান আদিকালের মত এখনও ভেড়া ও গবাদি পশু পালন করেন। গ্রীষ্মে গ্রামের লোকেরা গবাদিপশুদের পর্বতের উঁচুতে আল্পীয় চারণভূমিতে নিয়ে যায়। আবাদযোগ্য জমিগুলোতে মূলত তামাকের চাষ হয়।

প্রায় ৭০০ বছর ধরে অ্যান্ডোরা ফ্রান্সের নেতা ও উত্তর-পশ্চিম স্পেনের উর্গেল অঞ্চলের বিশপ একত্রে শাসন করতেন। তাদেরকে একত্রে অ্যান্ডোরার যুবরাজগণ উল্লেখ করা হত। ১৯৩৩ সালে অ্যান্ডোরাবাসী স্বাধীন গণতান্ত্রিক এলাকা তাদের প্রথম সংবিধান পাশ করে। বর্তমানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও উর্গেলের বিশপ দেশটির কেবল নামেই শাসক।

অ্যান্ডোরার রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কাঠামোয় পরিচালিত। সরকার প্রধান দেশটির প্রধান নির্বাহী এবং বহুদলীয় ব্যবস্থার নেতা। সরকার ও আইনসভা উভয়ের হাতে আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ন্যস্ত। নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন।

১৯৯৩ সালে রচিত অ্যান্ডোরার নতুন সংবিধান অনুযায়ী অ্যান্ডোরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, যার রাষ্ট্রপ্রধান ফ্রান্স ও স্পেনের দুই রাজপুত্র, কিন্তু প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা সরকারপ্রধানের হাতে ন্যস্ত।

অ্যান্ডোরা স্পেন ও ফ্রান্সের সীমান্তে পিরিনীয় পর্বতমালার পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি ভূমিবেষ্টিত রাষ্ট্র। দেশটির অধিকাংশই পর্বতময়। সমুদ্রসমতল থেকে দেশটির গড় উচ্চতা ১৯৯৬ মিটার। এর সর্বোচ্চ বিন্দু কোমা পেদ্রোসার উচ্চতা ২৯৪৬ মিটার। অ্যান্ডোরার পাহাড়ী এলাকা ইংরেজি ওয়াই-আকৃতির তিনটি নদী উপত্যকা দ্বারা বিভক্ত, এবং এই নদীগুলি একত্রিত হয়ে ভালিরা নদী নামে স্পেনে প্রবেশ করেছে।

অ্যান্ডোরার জিডিপি ১৯৯৮ সালে $১, ২ বিলিয়ন, যার প্রধান বাণিজ্য খাত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। ফ্রান্স ও স্পেনের দোকানীদের কাছে আকর্ষণীয় এবং একটি উন্মুক্ত বন্দর হিসেবে গণ্য। দেশটি গ্রীষ্মকাল এবং শীতকালের জন্য সক্রিয় পর্যটক রিসোর্ট ও হোটেল বিকশিত করেছে। কিছু ২৭০ হোটেল সহ ৪০০ রেস্টুরেন্টে, অনেক দোকান নিয়ে এই পর্যটক বাণিজ্য চাকরিতে ঘরোয়া শ্রম হিসেবে একটি বাড়ন্ত অংশ। এতে আনুমানিক ১১ ৬০০ হাজার পর্যটক বার্ষিক পরিদর্শন করে।

অ্যান্ডোরার সরকারি নথিপত্র ও অণুষ্ঠানের একমাত্র ভাষা কাতালান ভাষা। তবে সাধারণ জনগণ স্পেনীয় ভাষায় প্রচুর কথা বলে। এছাড়া পর্তুগিজ ও ফরাসি ভাষাতেও লোকেরা কথা বলে। অ্যান্ডোরাতে মূলত অ্যান্ডোরার নিজস্ব কাতালানভাষী অধিবাসী, এবং স্পেনীয়, পর্তুগিজ ও ফরাসি অভিবাসীরা বসবাস করেন। এই চার সম্প্রদায়ের ভাষার ব্যবহারও ভিন্ন।

কাতালান অ্যান্ডোরার সরকারি ভাষা হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানে স্পেনীয় ভাষাই বহুল প্রচলিত। তাই কাতালান না জেনেও অ্যান্ডোরাতে বসবাস করা সম্ভব। তবে শুমারিতে দেখা গেছে অ্যান্ডোরার ৯৭% জনগণই কাতালান বুঝতে পারেন। অ্যান্ডোরার নিজস্ব কাতালান-ভাষী, স্পেনীয়, পর্তুগিজ -- সবাই ঘরের বাইরে হাটে-বাজারে স্পেনীয় ভাষাতেই কথাবার্তা বলেন। তবে অ্যান্ডোরার শিক্ষাব্যবস্থা ফরাসি শিক্ষা ব্যবস্থার মডেল অনুকরণ করে বলে এখানে ফরাসি ভাষারও যথেষ্ট সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে। বিশেষত ফ্রান্স ও অ্যান্ডোরার সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্যে ফরাসির প্রভাব বেশি।

অ্যান্ডোরার স্কুল-কলেজে বিদেশী ভাষা হিসেবে ফরাসি, স্পেনীয় ও ইংরেজি ভাষার শিক্ষা দেয়া হয়।

অ্যান্ডোরার বেশির ভাগ লোক সাতটি শহরে বাস করেন। এদের মধ্যে আন্দোররা লা বেল্লা রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এর জনসংখ্যা ২২ হাজার। শহরটি পশ্চিম কেন্দ্রীয় অ্যান্ডোরায় ভালিরা নদীর তীরে অবস্থিত। অন্যান্য শহরগুলির মধ্যে আছে এস্কালদেস-এনগোর্দানি, এনকাম্প, সাঁ জুলিয়া দ্য লোরিয়া, এবং লা মাস্‌সানা।




#Article 49: অ্যাঙ্গোলা (244 words)


অ্যাঙ্গোলা (পর্তুগিজ: Angola আঁগলা, কোঙ্গো: Ngola ঙ্গোলা) দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এটি পর্তুগালের অধীনে ছিল এবং পর্তুগিজ পশ্চিম আফ্রিকা নামেও এটি পরিচিত ছিল। ১৯৭৫ সালে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অ্যাঙ্গোলানদের প্রায় ১৫ বছর যুদ্ধের পর দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর পরই বিরোধী অ্যাঙ্গোলান দলগুলির মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং ২১ শতকের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

অ্যাঙ্গোলা নামটি ন্‌গোলা শব্দ থেকে এসেছে। উত্তর অ্যাঙ্গোলার ম্‌বুটু গোত্রের শাসকদের ন্‌গোলা নামে ডাকা হত। বর্তমান অ্যাঙ্গোলার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর লুয়ান্ডা। অ্যাঙ্গোলার সরকারি ভাষা পর্তুগিজ, যদিও বেশির ভাগ পর্তুগিজ দেশটি ছেড়ে চলে গেছেন। পোর্তুগিজ ছাড়াও অধিকাংশ অ্যাঙ্গোলান সাধারণত বান্টু ভাষাগুলির যেকোন একটিতে কথা বলেন।

অ্যাঙ্গোলা আফ্রিকান দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেশটিতে পেট্রোলিয়াম সম্পদ, জলবিদ্যুৎ নির্মাণের সুযোগ, উর্বর ক্ষেতখামার, হীরা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ --- এ সবই বিদ্যমান। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশটির ক্ষতিসাধন হয় এবং তারপর গৃহযুদ্ধের সময় পেট্রোডলারের অধিকাংশই অণুন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় হয়। ২০০২ সালে একটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং এখন দেশটি শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অ্যাঙ্গোলার সামরিক বাহিনী একজন সেনাপ্রধান দ্বারা পরিচালিত, যিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করেন। অ্যাঙ্গলার প্রতিরক্ষা বাহিনী তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত - স্থলসেনাবাহিনী, নৌবাহিনী (মারিনিয়া দি গেররা) এবং বিমান বাহিনী। মোট সেনাসংখ্যা প্রায় ১,১০,০০০। এদের মধ্যে স্থলসেনাবাহিনীতেই ১ লক্ষ নারী-পুরুষ কর্মরত। নৌবাহিনীতে ৩ হাজার এবং বিমানবাহিনীতে ৭ হাজার সেনা কর্মরত আছেন। বিমানবাহিনীতে রুশ-নির্মিত ফাইটার ও পরিবহন বিমান ব্যবহার করা হয়।

অ্যাঙ্গোলার স্থলসেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশ কঙ্গো ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে নিয়োজিত আছে।




#Article 50: আর্জেন্টিনা (1082 words)


আর্জেন্টিনা () দক্ষিণ আমেরিকার একটি রাষ্ট্র। বুয়েনোস আইরেস দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। দেশটি দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে অবস্থিত। আয়তনের দিক থেকে এটি দক্ষিণ আমেরিকার ২য় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম রাষ্ট্র।

আর্জেন্টিনায় ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু বিচিত্র। উত্তরের নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণের মেরু-উপদেশীয় অঞ্চল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিস্তার। এর মধ্যেই আছে রুক্ষ আন্দেস পর্বতমালা ও তার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আকোনকাগুয়া। তবে বেশির ভাগ লোক দেশটির মধ্যভাগে অবস্থিত বিশাল উর্বর প্রেইরি সমভূমির (যার নাম পাম্পাস) শহরগুলিতে বাস করেন। পাম্পাসেই দেশটির অধিকাংশ কৃষিসম্পদ উৎপন্ন হয় এবং এখানেই দক্ষিণ আমেরিকার বিখ্যাত কাউবয় গাউচো-দের আবাসস্থল। আর্জেন্টিনায় আরও আছে অরণ্যভূমি, মরুভূমি, তুন্দ্রাভূমি, সুউচ্চ সব পর্বতশৃঙ্গ, নদনদী এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূলভূমি। এছাড়া দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের অনেকগুলি দ্বীপ আর্জেন্টিনা নিজেদের বলে দাবী করে, যার মধ্যে ব্রিটিশ-শাসিত ফকল্যাণ্ড দ্বীপপুঞ্জ অন্যতম (আর্জেন্টিনীয়রা এগুলিকে মালবিনাস দ্বীপপুঞ্জ নামে ডাকে)। এর বাইরে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের একটি অংশও আর্জেন্টিনা নিজের বলে দাবী করে।

আর্জেন্টিনাতে আদি প্রস্তর যুগে মানব বসতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। আধুনিক আর্জেন্টিনার ইতিহাস ১৬শ শতকে স্পেনীয় উপনিবেশীকরণের মাধ্যমে সূচিত হয়। ১৭৭৬ সালে এখানে স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে রিও দে লা প্লাতা উপরাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই উপরাজ্যের উত্তরসূরী রাষ্ট্র হিসেবে আর্জেন্টিনার উত্থান ঘটে। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে ঔপনিবেশিক শাসনের পর ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৮১৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধবিজয় শেষ হয়। আর্জেন্টিনার জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা দক্ষিণ আমেরিকার অন্যত্রও বিপ্লবে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এরপরে দেশটিতে অনেকগুলি গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৬১ সালে অনেকগুলি অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেশন হিসেবে দেশটি পুনর্গঠিত হয়, যার রাজধানী নির্ধারিত হয় বুয়েনোস আইরেস। এর পরে দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরত আসে এবং ইউরোপ থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর আগমন ঘটে, যার ফলে সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেশটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৯শ শতকের শেষ ভাগ থেকে আর্জেন্টিনা প্রচুর পরিমাণে কৃষিদ্রব্য যেমন মাংস, পশম, গম, ইত্যাদি রপ্তানি করা শুরু করে। দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনাতেই প্রথম শিল্পায়ন শুরু হয় এবং এটি বহুদিন ধরে এই মহাদেশের সবচেয়ে ধনী দেশ ছিল। সে সময় এখানকার অধিবাসীরা ইউরোপীয় দেশগুলির সমমানের জীবনযাত্রা নির্বাহ করত। ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে দেশটি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের ৭ম ধনী দেশে পরিণত হয়। তবে ১৯৪০-এর দশকের পর থেকে আর্জেন্টিনা ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ বেকারত্ব ও বড় আকারের জাতীয় ঋণের সমস্যায় জর্জরিত।

আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক ইতিহাস সংঘাতময়। দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন শ্রমিক শ্রেণী ও দরিদ্রদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন একজন একনায়ক এবং সমস্ত বিরোধিতা কঠোর হাতে দমন করতেন। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ১৯৫৫ সালে পেরনের পতন ঘটে। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত কুখ্যাত সামরিক শাসনের সময় বহু আর্জেন্টিনীয়কে বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছেড়ে দেবার পর আর্জেন্টিনায় আবার গণতন্ত্র স্থাপিত হয় কিন্তু দেশটি অর্থনৈতিক সমস্যায় তখনও হাবুডুবু খেতে থাকে। ২১শ শতকের প্রথম দশকেও আর্জেন্টিনা তার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পাম্পাস এবং বিস্তীর্ণ ঊষর পাতাগোনীয় ভূপ্রকৃতির রোমান্টিক হাতছানি সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা মূলত একটি নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। দেশটির রাজধানী বুয়েনোস আইরেসকে ঘিরে থাকা আধুনিক ও ব্যস্ত শহরতলীগুলি পাম্পাসের পূর্ব অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। বুয়েনোস আইরেস দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক শহরগুলির একটি। উচ্ছল রাত্রিজীবন এবং স্থাপত্যশৈলীর কারণে এটিকে প্রায়ই প্যারিস ও রোমের সাথে তুলনা করা হয়। ১৯শ শতকের শেষভাগে ও ২০শ শতকের শুরুর দিকে ইতালি, স্পেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী এখানকার শিল্পকারখানাগুলিতে জীবিকা নির্বাহ করার লক্ষ্যে দেশান্তরী হন। বৃহত্তর বুয়েনোস আইরেস এলাকাতে আর্জেন্টিনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগণ বাস করে। দেশটির অন্যান্য প্রধান শহরগুলির মধ্যে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলস্থিত মার দেল প্লাতা, লা প্লাতা ও বাইয়া ব্লাঙ্কা এবং দেশের অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত রোসারিও, সান মিগেল দে তুকুমান, কর্দোবা ও নেউকেন।

আর্জেন্টিনার আয়তন  দেশটি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে অবস্থিত। আন্দেস পর্বতমালা দেশটির পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করেছে, যার অপর পার্শ্বে চিলি অবস্থিত। দেশটি উত্তরে বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ে, উত্তর-পূর্বে ব্রাজিল, পূর্বে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর। এবং দক্ষিণে ড্রেক প্রণালী। সব মিলিয়ে দেশটির স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য । রিও দে লা প্লাতা ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে দেশটির তটরেখার দৈর্ঘ্য 

মেন্দোসা প্রদেশে অবস্থিত আকোনকাগুয়া আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ পর্বত। এটি সমুদ্রতল থেকে ( উচ্চতায় অবস্থিত। এছাড়াও আকোনকাগুয়া দক্ষিণ গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধের সর্বোচ্চ পর্বত।
আর্জেন্টিনার সর্বনিম্ন বিন্দু হচ্ছে সান্তা ক্রুস প্রদেশে অবস্থিত লাগুনা দেল কার্বন, যা সান হুলিয়ান বৃহত্‌ অবনমনের একটি  অংশ। এটি সমুদ্র সমতল থেকে ( নিচে অবস্থিত। এছাড়াও এটি দক্ষিণ গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধের সর্বনিম্ন বিন্দু, এবং পৃথিবীর ৭ম সর্বনিম্ন বিন্দু।

আর্জেন্টিনার উত্তরতম বিন্দুটি রিও গ্রান্দে দে সান হুয়ান ও রিও মোহিনেতে নদী দুটির সঙ্গমস্থলে, হুহুই প্রদেশে অবস্থিত। দেশটির দক্ষিণতম বিন্দু হল তিয়ের্‌রা দেল ফুয়েগো প্রদেশের সান পিও অন্তরীপ। সর্বপূর্ব বিন্দুটি মিসিওনেস প্রদেশের বেরনার্দো দে ইরিগোইয়েন  শহরের উত্তর-পূর্বে এবং সর্বপশ্চিম বিন্দুটি সান্তা ক্রুস প্রদেশের লোস গ্লাসিয়ারেস জাতীয় উদ্যানের মধ্যে পড়েছে।
উত্তর থেকে দক্ষিণে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য প্রায় ; এর বিপরীতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে দেশটির সর্বোচ্চ প্রশস্ততা প্রায় .

আর্জেন্টিনার প্রধান প্রধান নদীর মধ্যে রয়েছে পারানা নদী ও উরুগুয়াই নদী (নদী দুটি একত্র হয়ে রিও দে লা প্লাতা নদী গঠন করেছে), সালাদো নদী, রিও নেগ্রো নদী, সান্তা ক্রুস নদী, পিকোমাইয়ো নদী, বের্মেহো নদী ও কোলোরাদো নদী। এই সব নদীর পানি আর্জেন্টিনীয় সাগরে গিয়ে পড়েছে। আটলান্টিক সাগরের যে অগভীর অংশটি আর্জেন্টিনীয় শেলফ বা সমুদ্র-তাকের  উপরে অবস্থিত, তাকেই আর্জেন্টিনীয় সাগর নামে ডাকা হয়। এটি একটি অস্বাভাবিকভাবে প্রশস্ত মহাদেশীয় মঞ্চ। এই সাগরের পানি দুইটি প্রধান মহাসাগরীয় স্রোতের প্রভাবাধীন: উষ্ণ ব্রাজিল স্রোত এবং শীতল ফকল্যান্ডস স্রোত। 

দক্ষিণে অবস্থিত ইসলা গ্রান্দে দে তিয়েররা দেল ফুয়েগো নামক দ্বীপের পূর্ব অর্ধাংশ আর্জেন্টিনার অন্তর্গত। এছাড়াও পূর্বের বেশ কিছু সামুদ্রিক দ্বীপ যেমন ইসলা দে লোস এস্তাদোস আর্জেন্টিনার অধীন।

আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

৩৮,৭৪৭,০০০
মোট জনসংখ্যার ৯১%লোকের ধর্ম খ্রিস্টান।
৪%  ধর্ম হিন্দু।
২% ইসলাম ।
এবং অন্যান্য ৩%.

রাউল আলফোনসিন (Raúl Alfonsín) ১৯৮৩ সালের আর্জেন্টিনার সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি একনায়কতান্ত্রিক প্রোসেসো (Proceso) পর্বে মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের পক্ষে প্রচারণা চালান। এর ফলশ্রুতিতে আলফোনসিনের শাসনামলে সামরিক জান্তা এবং অন্যান্য সামরিক আদালতের বিচার হয়, যাতে সামরিক ক্যু-এর সমস্ত নেতাদের শাস্তি হয়। তবে সামরিক চাপের মুখে আলফোনসিন ১৯৮৬ সালে শেষ বিন্দু বা “পুন্তো ফিনাল” ও ১৯৮৭ সালে প্রাপ্য আনুগত্য বা “ওবেদিয়েন্সিয়া দেবিদা”  নামের আইন দুটি প্রবর্তন করেন যার ফলে নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বিচার রহিত হয়।

অর্থনৈতিক সংকট খারাপ হতে শুরু করলে ও অতিমুদ্রাস্ফীতি ঘটলে আলফোনসিনের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে পেরনবাদী রাজনীতিবিদ কার্লোস মেনেম জয়লাভ করেন। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বিক্ষুব্ধ জনগণ দাঙ্গা শুরু করলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আলফোনসিন পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

নির্বাচিত হয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি মেনেম নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রয়োগ করেন: সুনির্দিষ্ট মুদ্রা বিনিময় হার, ব্যবসাসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ হ্রাস (deregulation), ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ (privatization) এবং সংরক্ষণবাদী বাধাগুলি দূরীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতি কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিক হয়ে আসে। আলফোনসিন সরকারের যেসব সামরিক অফিসারদের শাস্তি হয়েছিল, তাদের তিনি ক্ষমা করে দেন। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার সংবিধানের সংশোধনী আনা হয়, যার বদৌলতে ১৯৯৫ সালে মেনেম দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৯৫ সাল থেকে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি আবার খারাপের দিকে যেতে শুরু করে, বেকারত্বের হার বাড়তে থাকে এবং দেশটি  অর্থনৈতিক মন্দার নিমজ্জিত হয়। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে ফের্নান্দো দে লা রুয়ার নেতৃত্বে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আলফোনসিনের রাজনৈতিক দল উনিওন সিবিকা রাদিকাল আবার ক্ষমতায় ফেরত আসে।




#Article 51: আর্মেনিয়া (1100 words)


আর্মেনিয়া ( হায়াস্তান্‌) পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। জর্জিয়া ও আজারবাইজানের সাথে এটি দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের স্থলযোজকের উপর অবস্থিত। ইয়েরেভান দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। আর্মেনীয় জাতি। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের হায় (Հայ) বলে ডাকে এবং আর্মেনিয়ার ৯০% লোক হায় জাতির লোক। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯৫ সালে দেশটির প্রথম সোভিয়েত-পরবর্তী সংবিধান পাশ হয়।

আর্মেনিয়ার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে, উরার্তু বা ভান রাজ্যের অংশ হিসেবে। রাজ্যটি ককেসাস অঞ্চল ও পূর্ব এশিয়া মাইনর এলাকাতে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। সেলেউসিদ সাম্রাজ্যের ধ্বংসের পর ১৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম আর্মেনীয় রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯৫ থেকে ৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এই নবগঠিত রাষ্ট্রের চরম উৎকর্ষের সময়। এসময় আর্মেনিয়া সমগ্র ককেসাস অঞ্চল তো বটেই, এরও বাইরে বর্তমান পূর্ব তুরস্ক, সিরিয়া এবং লেবানন পর্যন্ত সীমানা বিস্তার করে। কিছু সময়ের জন্য আর্মেনিয়া ছিল রোমান পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য। ৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটি রোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক, দার্শনিক ও ধর্মীয়ভাবে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি অণুসরণ করা শুরু করে।

৩০১ খ্রিষ্টাব্দে আর্মেনিয়া ইতিহাসের প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে এবং আর্মেনীয় গির্জাব্যবস্থার পত্তন করে। আজও আর্মেনীয় গির্জা রোমান ক্যাথলিক গির্জাব্যবস্থা এবং পূর্ব অর্থডক্স গির্জাব্যবস্থা অপেক্ষা স্বাধীন একটি গির্জাব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান। পরবর্তীতে আর্মেনিয়ার রাজনৈতিক সংকটের সময় এই গির্জা আর্মেনিয়ার অদ্বিতীয় জাতীয় সত্তা সংরক্ষণে সাহায্য করে। আনুমানিক ১১০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আর্মেনীয় জাতীয়তাবাদের কেন্দ্র দেশের দক্ষিণদিকে সরে যায়। এসময় আর্মেনীয় সিলিসিয়া রাজ্য ইউরোপীয় ক্রুসেডার রাজ্যগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মাইনর এলাকাতে সমৃদ্ধি অর্জন করে, যদিও রাজ্যটি শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের করায়ত্ত হয়।

৪র্থ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত আর্মেনিয়া বিভিন্ন বড় শক্তির শাসনাধীনে আসে। এদের মধ্যে পারসিক, বাইজেন্টীয়, আরব, মোঙ্গল এবং তুর্কি জাতি উল্লেখযোগ্য। 

১৯১৫ সালে সংঘটিত আর্মেনিয় গণহত্যা দেশটির এক উল্লেখযোগ্য কালো অধ্যায়।

১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ক্ষুদ্র সময়ের জন্য এটি একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ছিল। ১৯২০ সালে স্থানীয় সাম্যবাদীরা ক্ষমতায় আসে এবং সোভিয়েত সেনাবাহিনী দেশটি দখল করে। ১৯২২ সালে আর্মেনিয়া আন্তঃককেশীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অংশে পরিণত হয়। ১৯৩৬ সালে এটি আর্মেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর আর্মেনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

আর্মেনিয়ায় ২০১৭ সালে একটি সাংবিধানিক গণভোট আয়োজিত হয়। সেখানে আর্মেনীয়রা সংসদীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। অতঃপর রাষ্ট্রপতি সার্জ সার্জিসান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়, যা আর্মেনীয় ভেলভেট বিপ্লব নামে পরিচিতি লাভ করেছে। সার্জিসান পদত্যাগ করলে বিরোধী নেতা নিকোল পাশিনিয়ান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তঁার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

আর্মেনিয়া রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের অন্তর্বর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। উত্তর আর্মেনিয়া জুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্রতর ককেশাস পর্বতমালা, যেটি সেভান হ্রদ ও আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে এবং আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সীমান্ত হয়ে ইরানে চলে গেছে। এই পর্বতগুলির কারণে আর্মেনিয়ার দক্ষিণ থেকে উত্তরে ভ্রমণ করা কষ্টকর। আর্মেনিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প হয় এবং এর ফলে অনেক প্রাণহানি ঘটে।

আর্মেনিয়ার প্রায় অর্ধেক এলাকা সমুদ্র সমতল থেকে ২০০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। দেশটির মাত্র ৩% ৬৫০ মিটারের নিম্ন উচ্চতায় অবস্থিত। আরাস নদী ও দেবেত নদীর উপত্যকাগুলি দেশের নিম্নতম এলাকা, এবং এগুলিও যথাক্রমে ৩৮০ মিটার ও ৪৩০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ককেশাস পর্বতমালার দক্ষিণে আছে আর্মেনীয় মালভূমি, যা দক্ষিণ-পশ্চিমে আরাস নদীর দিকে ঢালু হয়ে গেছে। মালভূমিটিতে পাহাড় পর্বত ও মৃত আগ্নেয়গিরি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্যে ৪৪৩০ মিটার উঁচু আরাগাৎস পর্বত আর্মেনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।

৩৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও সর্বোচ্চ ৭২.৫ কিলোমিটার প্রস্থবিশিষ্ট সেভান হ্রদ আর্মেনিয়ার ভূগোলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হ্রদটি সমুদ্রতল থেকে ২০৭০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। আরাস নদী প্রধানতম নদী। সেভান হ্রদ থেকে উপনদী রাজদান প্রবাহিত হয়ে আরাসে পড়েছে।
উল্লেখ্য বিতর্কিত নাগার্নো-কারাবাগ অঞ্চল নিয়ে আজারবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে সামরিক সংঘাত চলে আসছে।এতে এ পর্যন্ত দু দেশের প্রায় ৩০০ এর বেশি বেসামরিক লোকজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে।

চারদিকে স্থলবেষ্টিত হওয়ায় দেশটিতে মূলত স্থল বাহিনী ও বিমানবাহিনী রয়েছে। ভারতীয় সুখই-৩০ এর উন্নত ধরন সুখই-৩০এসএম এর ৪টি বিমান রয়েছে বাহিনীর কাছে। ৫০০ কিমি পরিসীমার 9K720 ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্রো ব্যবস্থা রয়েছে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আর্মেনিয়াতে অর্থনৈতক মন্দা দেখা দিলেও দেশটি ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠছে। তবে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং ১৯৯০-এর দশকে আজারবাইজানের সাথে নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে যুদ্ধ আর্মেনিয়ার অর্থনীতিতে আজও প্রভাব রেখে চলেছে।
২৭-০৯-২০ যুদ্ধে কারাবাখ আজারভাইজানের হাতে চলে যাবে..

আর্মেনিয়াতে নগরায়নের হার উচ্চ। এখানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লোক শহরে বাস করে। নদী উপত্যকায়, বিশেষত হ্রাজদান নদীর তীরে বসতির ঘনত্ব বেশি। হ্রাজদান নদীর তীরেই আর্মেনিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী ইয়েরেভান অবস্থিত। আর্মেনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হল গিয়ুম্‌রি। ১৯৮৮ সালে গিয়ুম্‌রি শহর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের শিকার হয়।

আর্মেনিয়ার ৯৮% অধিবাসী আর্মেনীয় ভাষায় কথা বলে থাকেন। আর্মেনীয় ভাষা দেশটির রাষ্ট্রভাষা। আর্মেনীয় ভাষাকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুইটি সাহিত্যিক আদর্শ ভাষায় ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে পূর্ব আর্মেনীয়কেই বর্তমানে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ১৯১৫ সালে আর্মেনিয়ার গণহত্যার সময় অনেক আর্মেনীয় পশ্চিম আর্মেনিয়াতে (বর্তমান তুরস্ক) পালিয়ে যান এবং বর্তমান আর্মেনিয়ার বাইরে বসতি স্থাপন করেন। তাদের ব্যবহৃত ভাষাই পশ্চিম আর্মেনীয় ভাষা। এছাড়াও আর্মেনীয় গির্জাগুলিতে গ্রাবার নামের একটি প্রাচীন লিখিত আর্মেনীয় ভাষা ব্যবহৃত হয়।

সংখ্যালঘুদের মধ্যে প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে আছে রুশ ভাষা, কুর্মান্‌জি (ইয়েজিদীয়) নামের একটি কুর্দি উপভাষা, নব্য-আসিরীয়, গ্রিক ও ইউক্রেনীয় ভাষা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের ভাষা ছাড়াও রুশ কিংবা আর্মেনীয়তে কথা বলতে পারে।

আর্মেনিয়ায় দ্বিবিধ ভাষারীতি (diglossia) বিদ্যমান। লিখিত মাধ্যমে, নথিপত্রে ও শিক্ষাক্ষেত্রে আর্মেনীয়রা আদর্শ পূর্ব আর্মেনীয় ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু প্রাত্যহিক কাজেকর্মে ও কথাবার্তায় স্থানীয় উপভাষাই বেশি চলে।

আর্মেনীয়দের ভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল প্রায় ৯০% আর্মেনীয় আর্মেনীয় ও রুশ উভয় ভাষাতেই স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন। আর্মেনিয়া যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল তখন রুশ ভাষার এখানে একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। রুশ ভাষার সাথে তুলনায় আর্মেনীয় ভাষার মর্যাদা ছিল কম। তবে আর্মেনিয়ার স্বাধীনতার পর দৃশ্যপট বদলেছে। বর্তমানে আর্মেনীয় ভাষাই দেশের মূল ভাষা।

আর্মেনীয়রা স্কুলে রুশ ও ইংরেজি এই দুই বিদেশী ভাষা সম্পর্কেই ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে। তবে ইদানিং ইংরেজির আধিপত্য বেড়েছে।

২০১১ এর আদমশুমারি অনুযায়ী আর্মেনিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ ১৮ হাজার।

খ্রিস্টানধর্ম, আরো বিশেষ করে বলতে গেলে, আর্মেনিয় অ্যাপসল গির্জার ধর্ম, আর্মেনিয়ার প্রায় ৯৫% অধিবাসীর ধর্ম। যিশুর দুই শিষ্য বার্থেলেমিউ ও থাদেউস প্রথম শতকেই এখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন। ৩য় শতকে আর্মেনিয়ার রাজা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং একে দেশটির রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রচলিত করেন। এছাড়া দেশটিতে স্বল্পসংখ্যক ইহুদি, ইয়াজিদি ও মুসলমান অধিবাসী বসবাস করেন।

আর্মেনীয়রা সাধারণত পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় রাখে এবং তাদের বিশেষ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখে। আর্মেনীয় সঙ্গীত ও রান্না অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলির মত। খাবারের মধ্যে দোলমা বা শর্মা এবং পানীয়ের মধ্যে ওয়াইন ও ব্র‌্যান্ডি গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের সময় আর্মেনীয়রা ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত গাইতে এবং বৃত্তাকারে গাইতে পছন্দ করে। বাস্কেটবল, ফুটবল ও টেনিস জনপ্রিয় খেলা। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আর্মেনীয়রা কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ, ভারোত্তোলন এবং জিমন্যাস্টিক্‌সে সাফল্য লাভ করেছে। আর্মেনীয়রা অবসর সময়ে দাবা ও অন্যান্য বোর্ড খেলা খেলতেও পছন্দ করে। শহরের বেশির ভাগ অধিবাসী সোভিয়েত আমলে নির্মিত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বাস করে; যেগুলির বর্তমান অবস্থা তেমন ভাল নয়। গ্রামের লোকেরা সাধারণত এক পরিবারের জন্য নির্মিত বাড়িতে বাস করে। অনেক সময় যৌথ পরিবারের অনেক সদস্য একই ছাদের নিচে বাস করে। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। আর বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রজন্মে প্রজন্মে সংযোগ স্থাপিত হয়।

বিখ্যাত ভারতীয় শাস্রীয় সঙ্গীত গায়িকা গওহর জান ছিলেন আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত। 




#Article 52: অস্ট্রেলিয়া (304 words)


অস্ট্রেলিয়া (ইংরেজি Australia; স্থানীয় উচ্চারণ আ-ধ্ব-ব-তে /ə.ˈstɹæɪ.ljə/, /ə.ˈstɹæɪ.liː.ə/ বা /ə.ˈstɹæɪ.jə/) একটি দ্বীপ-মহাদেশ। এটি এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। কাছের তাসমানিয়া দ্বীপ নিয়ে এটি কমনওয়েল্‌থ অফ অস্ট্রেলিয়া গঠন করেছে। দেশটির উত্তরে তিমুর সাগর, আরাফুরা সাগর, ও টরেস প্রণালী; পূর্বে প্রবাল সাগর এবং তাসমান সাগর; দক্ষিণে ব্যাস প্রণালী ও ভারত মহাসাগর; পশ্চিমে ভারত মহাসাগর। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪০০০ কিমি এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩৭০০ কিমি দীর্ঘ। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মহাদেশ, কিন্তু ৬ষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা। সিডনী বৃহত্তম শহর। দুইটি শহরই দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত। 
    
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর। এটি অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ধরে প্রায় ২০১০ কিমি জুড়ে বিস্তৃত। এটি আসলে প্রায় ২৫০০ প্রাচীর ও অনেকগুলি ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি। কুইন্সল্যান্ডের তীরের কাছে অবস্থিত ফেয়ারফ্যাক্স দ্বীপ গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অংশ। 
  
অস্ট্রেলিয়া ৬টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত - নিউ সাউথ ওয়েল্স, কুইন্সল্যান্ড, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া, ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া। এছাড়াও আছে দুইটি টেরিটরি — অস্ট্রেলীয় রাজধানী টেরিটরি এবং উত্তর টেরিটরি। বহিঃস্থ নির্ভরশীল অঞ্চলের মধ্যে আছে অ্যাশমোর ও কার্টিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলীয় অ্যান্টার্কটিকা, ক্রিসমাস দ্বীপ, কোকোস দ্বীপপুঞ্জ, কোরাল সি দ্বীপপুঞ্জ, হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ, এবং নরফোক দ্বীপ।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বসতিস্থাপক ছিল এখানকার আদিবাসী জাতিগুলি। এরা প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর আগে দেশটিতে অভিগমন করে। ১৭শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বহির্বিশ্বের কাছে দ্বীপটি অজানা ছিল। ১৭৮৮ সালে দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট জ্যাকসনে প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ সৃষ্টি করা হয়; এটি ছিল ব্রিটিশ কয়েদিদের উপনিবেশ। এটিই পরবর্তীকালে বড় হয়ে সিডনী শহরে পরিণত হয়। ১৯শ শতক জুড়ে অস্ট্রেলিয়া এক গুচ্ছ ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে কাজ করত। ১৯০১ সালে এগুলি একত্র হয়ে স্বাধীন অস্ট্রেলিয়া গঠন করে।

এখানে পার্লামেন্টেরিও গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র রয়েছে যেখানে দ্বিতীয় এলিজাবেথ রানী হিসেবে স্বীকৃত। রানীর প্রতিনিধি হিসেবে একজন গভর্নর জেনারেল থাকেন। প্রতি ৩ বছর সাধারণ নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়।

দেশটির সঙ্গে অন্যান্য দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই দেশের পাসপোর্টে ১০৯টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করা যায়, যা পাসপোর্ট শক্তি সূচকে ৭ম স্থানে রয়েছে।  

উন্নত অর্থনীতির দেশ এটি। দেশটির  স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মান ভারতের অর্ধেক।




#Article 53: অস্ট্রিয়া (1359 words)


অস্ট্রিয়া ( ও্যস্টারাইশ্‌, ক্রোয়েশীয় ভাষায়: Austrija আউস্ত্রিয়া, হাঙ্গেরীয় ভাষায়: Ausztria অউস্ত্রিয়, স্লোভেনীয় ভাষায: Avstrija আভ্‌স্ত্রিয়া) পশ্চিম ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। স্থলবেষ্টিত এই দেশের উত্তরে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র, পূর্বে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণে স্লোভেনিয়া ও ইতালি, এবং পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও লিশ্‌টেন্‌ষ্টাইন। অস্ট্রিয়া মূলত আল্পস পর্বতমালার উপরে অবস্থিত। দেশটির তিন-চতুর্থাংশ এলাকাই পর্বতময়।

অস্ট্রিয়া একটি সংসদীয় গণতন্ত্র। এখানে ৯টি ফেডারেল রাজ্য রয়েছে। এটি ইউরোপের ৬টি রাষ্ট্রের অন্যতম যারা স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেছে। অস্ট্রিয়া ১৯৫৫ থেকে জাতিসংঘের এবং ১৯৯৫ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।

অস্ট্রিয়া অতীতে হাবসবুর্গ রাজাদের অধীনস্থ একটি বিস্তৃত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ভিয়েনা ছিল সেই সাম্রাজ্যের রাজকীয় রাজধানী। ভিয়েনা এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শহর হিসেবে আদৃত। এর রাজকীয় রূপ, অসাধারণ বারোক স্থাপত্য, সঙ্গীত ও নাট্যকলা জগদ্বিখ্যাত। ভিয়েনা বর্তমানে অস্ট্রিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) শেষে অস্ট্রিয়ার অধীনস্থ বহুজাতিক সাম্রাজ্যটি ভেঙে যায় এবং তার স্থানে একাধিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। অস্ট্রিয়া নিজে একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নতুন রাষ্ট্রগুলি বাণিজ্য বাধার সৃষ্টি করলে অস্ট্রিয়া তার প্রাক্তন বৈদেশিক বাজার এবং জ্বালানির উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশটির অর্থনীতি বৈদেশিক সাহায্যের পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়াতে রক্ষণশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মন্দা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। যে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ভিয়েনাকে সামাজিক গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিল, ১৯৩৪ সালে তাদের পতন ঘটে এবং ডানপন্থী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সাথে সংযুক্ত করে নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তি অস্ট্রিয়া দখল করে। এসময় মার্কিন ও সোভিয়েত সেনারা এখানে অবস্থান করছিল। ১৯৫৫ সালে অস্ট্রিয়া আবার স্বাধীন হয় এবং তারপর থেকে দেশটির অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। বর্তমানে দেশটি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। রপ্তানি ও পর্যটন শিল্প দেশটির আয়ের বড় উৎস। ভিয়েনার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং অস্ট্রিয়ার অসাধারণ সৌন্দর্যময় পার্বত্য ভূদৃশ্যাবলীর টানে এখানে বহু পর্যটক বেড়াতে আসেন।

অস্ট্রিয়ার ইতিহাস ৯৭৬ সালে শুরু হয়। ঐ বছর লেওপোল্ড ফন বাবেনবের্গ বর্তমান অস্ট্রীয় এলাকার বেশির ভাগ অংশের শাসকে পরিণত হন। ১২৭৬ সালে রাজা প্রথম রুডলফ হাব্‌স্‌বুর্গ বংশের প্রথম রাজা হিসেবে অস্ট্রিয়ার শাসক হন।

হাব্‌স্‌বুর্গ রাজবংশের রাজারা প্রায় ৭৫০ বছর অস্ট্রিয়া শাসন করেন। রাজনৈতিক বিবাহ সম্পাদনের মাধ্যমে হাব্‌স্‌বুর্গেরা মধ্য ইউরোপের এক বিরাট এলাকা দখলে সক্ষম হন। তাদের ভূসম্পত্তি এমনকি আইবেরীয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৬শ ও ১৭শ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণের ফলে অস্ট্রীয় এলাকাটি ধীরে ধীরে দানিউব নদীর অববাহিকার কেন্দ্রীয় ইউরোপীয় অংশটিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৮৪৮ সালে প্রথম ফ্রান্‌ৎস ইয়োজেফ সিংহাসনে আরোহণ করেনে এবং ১৯১৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার আমলে অস্ট্রীয় ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। ১৮৬৭ সালে অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে হাঙ্গেরি আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পায়, ফলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় দ্বৈত রাজ্যব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে। ২০শ শতকে এসে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায় এবং ১ম বিশযুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ঐ সময় অস্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে, যার সীমানা ও বর্তমান অস্ট্রিয়ার সীমানা মোটামুটি একই রকম। ১৯১৯ সালে সাঁ জেরমাঁ-র চুক্তির ফলে হাব্‌স্‌বুর্গ রাজবংশ সরকারিভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং অস্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯১৮ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়াতে রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি পায়। ১৯২০-এর দশকের শেষে এবং ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে আধা-সামরিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলি হরতাল ও সহিংস সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বেকারত্বের হার বেড়ে ২৫% হয়ে যায়। ১৯৩৪ সালে একটি কর্পোরেশনবাদী স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে অস্ট্রীয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাৎসি) দল কু-এর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানির সামরিক আগ্রাসনের হুমকির মুখে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কুর্ট শুশনিগ অস্ট্রীয় নাৎসিদের সরকারে নিতে বাধ্য হন। ১৯৩৮ সালের ১২ই মার্চ জার্মানি অস্ট্রিয়াতে সৈন্য পাঠায় এবং দেশটিকে জার্মানির অংশভুক্ত করে নেয়। এই ঘটনাটির ঐতিহাসিক নাম দেয়া হয়েছে আন্‌শ্লুস (জার্মান ভাষায় Anschluss)। সেসময় বেশির ভাগ অস্ট্রীয় এই আনশ্লুস সমর্থন করেছিল।

১৯৩৮ সালের মার্চ থেকে ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে অস্ট্রিয়ার অধিকাংশ ইহুদীকে হয় হত্যা করা হয় অথবা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। সিন্তি, জিপসি, সমকামী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বীদেরও একই পরিণাম ঘটে। ১৯৩৮ সালের আগে অস্ট্রিয়াতে ২ লক্ষ ইহুদী বাস করত। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে এদের অর্ধেকের বেশি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। জার্মানরা ইহুদীদের ব্যবসা ও দোকানপাটে লুটতরাজ চালায়। প্রায় ৩৫ হাজার ইহুদীকে পূর্ব ইউরোপে গেটো বা বস্তিতে পাঠানো হয়। প্রায় ৬৭ হাজার ইহুদীকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়; যুদ্ধশেষে এদের মাত্র ২ হাজার বেঁচে ছিল।

১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তিরা অস্ট্রিয়াকে চারভাগে ভাগ করে। ১৯৫৫ সালের ২৫শে অক্টোবর নাগাদ এরা সবাই অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে এবং অস্ট্রিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায়।

অস্ট্রিয়ার রাজনীতি-র ভিত্তি একটি কেন্দ্রীয় সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা, যেখানে চ্যান্সেলর হলেন সরকারপ্রধান। এটি একটি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। সরকার নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। আইন প্রণয়ন ক্ষমতা দ্বি-কাক্ষিক সংসদ (জাতীয় কাউন্সিল ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিল) ও সরকার, উভয়ের হাতে ন্যস্ত। ১৯৪৯ সাল থেকে রক্ষণশীল দল Austrian People's party ও সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল Social Democratic Party of Austria দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রাধান্য বিস্তার করে আসছে।

অস্ট্রিয়াকে তিনটি অসম ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে বৃহত্তম অংশটি (৬২%) হল আল্পস পর্বতমালার অপেক্ষাকৃত নবীন পাহাড়গুলি। এদের পূর্বে আছে পানোনীয় সমভূমি, এবং দানিউব নদীর উত্তরে আছে বোহেমীয় অরণ্য নামের একটি পুরানো কিন্তু অপেক্ষাকৃত নিচু গ্রানাইট পাথরে নির্মিত পার্বত্য অঞ্চল।

দানিউব নদী দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির ডোনাএশিঙেনের কাছ থেকে উৎপত্তি লাভ করে অস্ট্রিয়ার ভেতর দিয়ে পূর্বমুখে প্রবাহিত হয়ে কৃষ্ণসাগরে পতিত হয়েছে। আল্পসের উত্তরের ইন নদী, ৎসালজাখ নদী ও এন্স নদী দানিউবের উপনদী। অন্যদিকে আল্পসের দক্ষিণের অর্থাৎ মধ্য ও পূর্ব অস্ট্রিয়ার গাইল নদী, ড্রাভা নদী, ম্যুর্ৎস নদী ও মুরা নদী সার্বিয়াতে গিয়ে দানিউবে পতিত হয়েছে।

আল্পসের তিনটি প্রধান শাখা, উত্তর চুনাপাথরীয় আল্পস, কেন্দ্রীয় আল্পস, ও দক্ষিণ চুনাপাথরীয় আল্পস অস্ট্রিয়ার পশ্চিম থেকে পূর্ব জুড়ে বিস্তৃত। ৩৭৯৭ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট গ্রোস্‌গ্লকনার অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। অস্ট্রিয়ার মাত্র ২৮% অঞ্চল সমতল বা অপেক্ষাকৃত কম পাহাড়ি।

দানিউব উপত্যকার উত্তরে অস্ট্রিয়ার প্রায় ১০% এলাকা জুড়ে অবস্থিত একটি গ্রানাইট মালভূমি এলাকা।

অস্ট্রিয়ার অর্থনীতি ব্যবস্থাকে একটি সামাজিক বাজার অর্থনীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। এর গঠন প্রতিবেশী জার্মানির অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতন।

২০০৪ সালের তথ্য অনুযায়ী অস্ট্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪র্থ ধনী দেশ। এখানকার মাথাপিছু স্থুল জাতীয় উৎপাদন প্রায় ২৭,৬৬৬ ইউরো। কেবন লুক্সেমবুর্গ, আয়ারল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ড্‌স এই দিক থেকে অস্ট্রিয়ার চেয়ে এগিয়ে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, ২০০২-২০০৬ সময়সীমাতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ১ থেকে ৩.৩%-এর মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। মধ্য ইউরোপে অবস্থিত বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন সদস্যরাষ্ট্রগুলির (যেগুলি বেশির ভাগই পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত) প্রবেশদ্বার হিসেবে অস্ট্রিয়া গুরুত্ব লাভ করেছে।

অস্ট্রিয়ার জনসংখ্যা বর্তমানে ৮,৭২৫,৯৩১ জন।

অস্ট্রিয়াতে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম প্রধান। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৭৩.৬% লোক এই ধর্মে বিশ্বাসী।  প্রায় ১১.৫% লোক প্রতি রোববারে গির্জায় যান। তবে গির্জায় যাওয়ার পরিমাণ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। লুথেরান খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা ২০০৬ সালে জনসংখ্যার ৪.৭% গঠন করেছে; এরা বেশির ভাগই দক্ষিণ অস্ট্রিয়ার কের্নটেন অঙ্গরাজ্যে বাস করে। অস্ট্রিয়াতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বর্তমানে এরা জনসংখ্যার ৪.২%। এছাড়াও অস্ট্রিয়াতে স্বল্পসংখ্যক হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও ইহুদীবাস করেন। 

অস্ট্রিয়াতে মূলত জার্মান ভাষার একটি পরিবর্তিত রূপ ব্যবহৃত হয়। এর নাম অস্ট্রীয় জার্মান। জার্মান ভাষায় এর নাম Schönbrunner Deutsch (শ্যোনব্রুনার ডয়চ অর্থাৎ রাজকীয় প্রাসাদের জার্মান)। অস্ট্রীয় জার্মান বর্তমান আদর্শ জার্মান ভাষা থেকে বেশ কিছু দিকে থেকে আলাদা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সমস্ত স্বরধ্বনি আদর্শ জার্মান ভাষায় উচ্চারিত হয়, অস্ট্রীয় জার্মান ভাষায় সেগুলি উচ্চারিত হয় না; কিংবা সামান্য ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়। অস্ট্রীয় জার্মান ভাষায় নিজস্ব প্রত্যয়েরও (suffix) ব্যবহার আছে। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে অস্ট্রীয় জার্মান খানিকটা নাসিক্য স্বরে (nasalized) বলা হয়ে থাকে।

অস্ট্রীয় জার্মান ভাষার উপভাষাগুলিকে আলেমানীয় উপভাষা ও দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষা - এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আলেমানীয় উপভাষা দেশটির পূর্ব এক-তৃতীয়াংশে প্রচলিত (ফোরার্লবের্গ প্রদেশে)। আর দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষাগুলি দেশের বাকি অংশে ব্যবহৃত। আলেমানীয় উপভাষাগুলি সুইজারল্যান্ডের জার্মান ও দক্ষিণ-পূর্ব জার্মানির ভাষাগুলির সাথে তুলনীয়। আর দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষাগুলি জার্মানির বাভারিয়ার বা বায়ার্নের ভাষাগুলির সাথে তুলনীয়।

এছাড়াও অস্ট্রিয়ায় অনেকগুলি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজস্ব ভাষায় কথা বলে থাকে। এগুলির মধ্যে অন্যতম হল ক্রোয়েশীয়, স্লোভেনীয়, হাঙ্গেরীয়, চেক, স্লোভাক এবং জিপসি ভাষাসমূহ।

অস্ট্রিয়ার পাঁচটি প্রধান শহর হল ভিয়েনা, গ্রাৎস, লিন্‌ৎস, জাল্‌ৎসবুর্গ এবং ইন্স‌ব্রুক।

ভিয়েনা অস্ট্রিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এটি অস্ট্রিয়ার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। শহরটি দানিউব নদীর দুই তীরে অবস্থিত। এর শহরতলীগুলি পশ্চিমে বিখ্যাত ভিয়েনা অরণ্য পর্যন্ত চলে গেছে। ভিয়েনা ইউরোপের সবচেয়ে রাজকীয় শহরগুলির একটি। এখানে অনেক জমকালো বাসভবন, রাজপ্রাসাদ, পার্ক ও গির্জা আছে। শহরের জনসংখ্যা ১৬ লক্ষের বেশি।
 
গ্রাৎস অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এটি ষ্টাইয়ারমার্ক প্রদেশের রাজধানী। শহরটি একটি উর্বত উপত্যকায় মুর নদীর তীরে অবস্থিত। গ্রাৎস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বাণিজ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের বাস।

লিন্‌ৎস ওবারঅস্টাররাইখ প্রদেশের রাজধানী। এটি দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত বন্দর শহর ও শিল্পকেন্দ্র।
   
জাল্‌ৎসবুর্গ অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে নয়নাভিরাম শহরগুলির একটি। এটি জাল্‌ৎসাখ নদীর তীরে আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। শহরটি বিখ্যাত সুরকার ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্টের জন্মস্থান। এখানকার বাৎসরিক সঙ্গীত উৎসবগুলি সারা বিশ্বে পরিচিত। এখানে অনেক পর্যটক বেড়াতে আসেন।

ইন্সব্রুক টিরোলিয়ান আল্পস পর্বতমালায় সমুদ্র সমতল থেকে বহু উঁচুতে অবস্থিত একটি শীতকালীন অবকাশ যাপন কেন্দ্র। এটি টিরোল প্রদেশের রাজধানী ও ইন নদীর তীরে অবস্থিত। ইন্সব্রুকের অবস্থান ও সৌন্দর্যের কারণে এখানেও অনেক পর্যটক বেড়াতে আসেন।




#Article 54: আজারবাইজান (754 words)


আজারবাইজান (আজারবাইজানি ভাষায়: Azərbaycan আজ়্যার্বায়জান্‌), সরকারী নাম আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র (আজারবাইজানি ভাষায়: Azərbaycan Respublikası) এশিয়া মহাদেশের একটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। এটি কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী স্থলযোটক দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত রাষ্ট্র। আয়তন ও জনসংখ্যার দিকে থেকে এটি ককেশীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বৃহত্তম। দেশটির উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে ইরান, পশ্চিমে আর্মেনিয়া, উত্তর-পশ্চিমে জর্জিয়া। এছাড়াও ছিটমহল নাখশিভানের মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আজারবাইজানের একচিলতে সীমান্ত আছে। আর্মেনিয়ার পর্বতের একটি সরু সারি নাখশিভান ও আজারবাইজানকে পৃথক করেছে। আজারবাইজানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি এলাকা নাগোর্নো-কারাবাখের আনুগত্য বিতর্কিত। কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থিত অনেকগুলি দ্বীপও আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত। আজারবাইজানের রাষ্ট্রভাষা আজারবাইজানি। কাস্পিয়ান সাগরতীরে অবস্থিত বন্দর শহর বাকু আজারবাইজানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

১৮শ ও ১৯শ শতকে ককেশীয় এই দেশটি পর্যায়ক্রমে রুশ ও পারস্যদেশের শাসনাধীন ছিল। রুশ গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯১৮ সালের ২৮শে মে তৎকালীন আজারবাইজানের উত্তর অংশটি একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯২০ সালে বলশেভিক লাল সেনারা এটি আক্রমণ করে আবার রুশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং ১৯২২ সালে দেশটি আন্তঃককেশীয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৩৬ সালে আন্তঃককেশীয় সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রটি ভেঙে তিনটি আলাদা প্রজাতন্ত্র আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়াতে ভেঙে দেওয়া হয়। তখন থেকেই আজারবাইজানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং নাগোর্নো-কারাবাখ এলাকার খ্রিস্টান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব্বের সূত্রপাত। নাগোর্নো-কারাবাখের জনগণ আর্মেনিয়ার সাথে একত্রিত হতে চায়। ১৯৯১ সালের ২০শে অক্টোবর আজারবাইজান স্বাধীনতা লাভ করলে এই দ্বন্দ্ব্ব সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ফলে নতুনভাবে স্বাধীন দেশটির প্রথম বছরগুলি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক অবনতি, এবং নাগোর্নো-কারাবাখের যুদ্ধে অতীবাহিত হয়। ১৯৯৪ সালের মে মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দীর্ঘ ২৮ বৎসর নগোর্নো কারাবাখ এবং সংলগ্ন ৭টি আজারবাইজানি জেলা বিচ্ছিন্নতাবাদী আর্মেনীয়দের নিয়ন্ত্রনাধীন ছিল,কিন্তু ২০২০ সালের ২৮শে অক্টোবর থেকে আজারবাইজান তাঁদের দখল হয়ে যাওয়া এলাকা উদ্ধারে সামরিক অভিযান শুরু করলে ৪৮ দিন পর এলাকাটি তাঁদের নিয়ন্ত্রনে আসে ।বর্তমানে নাগোর্নো-কারাবাখের কিছু অংশ এবং ১৯৯৪ সালে আর্মেনিয়া কতৃক দখল হয়ে যাওয়া ৭টি আজারবাইজানি জেলা আজারবাইজানের সামরিক নিয়ন্ত্রণে আছে। ১৯৯৫ সালে আজারবাইজানে প্রথম আইনসভা নির্বাচন অণুষ্ঠিত হয় এবং ঐ বছরই সোভিয়েত-উত্তর নতুন সংবিধান পাস করা হয়।

আজারবাইজানের বাকু তেলক্ষেত্রগুলি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। কিন্তু দুর্নীতি, সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ এবং দুর্বল সরকারের কারণে দেশটি খনিজ সম্পদ থেকে সম্ভাব্য মুনাফা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আজারবাইজানে রাজনীতি-র ভিত্তি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র, যেখানে আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রপ্রধান, এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারপ্রধান। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে, আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সরকার ও সংসদ উভয়ের হাতে ন্যস্ত। বিচার বিভাগ স্বাধীন।

আজারবাইজান ১০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল;৬৬ টি রেয়ন এবং ৭৭ টি শহরে বিভক্ত।

আজারবাইজান ইউরেশিয়ার ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত। এই দেশটির ভূগোলে তিনটি মূল বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়: 

আজারবাইজান মোটামুটি পর্তুগাল বা মার্কিন অঙ্গরাজ্য মেইন-এর সম-আয়তনবিশিষ্ট। দেশটির আয়তন প্রায় ৮৬,৬০০ বর্গকিলোমিটার।
রাজদান প্রবাহিত হয়ে আরাসে পড়েছে। 
উল্লেখ্য বিতর্কিত নাগার্নো- কারাবাগ অঞ্চল নিয়ে আর্মেনিয়ার সাথে আজারবাইজানের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে সামরিক সংঘাত চলে আসছে।এতে এ পর্যন্ত দু দেশের প্রায় ৩০০ এর বেশি বেসামরিক লোকজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে

আজারবাইজানের অর্থনীতি বর্তমানে একটি সন্ধি পর্যায়ে বিদ্যমান, যেখানে সরকার এখনও একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে চলেছে। আজারবাইজানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেলের ভাণ্ডার। বৈচিত্র‌্যময় জলবায়ু অঞ্চলের উপস্থিতির কারণে দেশটির কৃষি খাতের উন্নতির সম্ভাবনাও প্রচুর। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সহযোগিতায় আজারবাইজান একটি সফল অর্থনৈতিক সুস্থিতিকরণ প্রকল্প হাতে নেয়, যার ফলশ্রুতিতে ২০০০ সাল থেকে দেশটির অর্থনীতি ১০% হারে প্রবৃদ্ধি লাভ করে চলেছে। ২০০৭ সালে আজারবাইজানের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পায়। মূলত তেল খাতই এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। ২০০৭ সালের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) ৫২.৮% খনিজ তেল খাত থেকে আসে।

আজারবাইজানের মুদ্রার নাম মানাত।

আজারবাইজানে প্রায় ৯৮ লক্ষ ২৪ হাজার ৯০০ লোকের বাস। এদের মধ্যে ৯৫% লোক জাতিগতভাবে আজারবাইজানি। অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতির লোকের মধ্যে লেজগীয়, রুশ, আর্মেনীয় ও তালিশ জাতির লোক প্রধান।

আজারবাইজানের ৯৭ ভাগ মানুষ মুসলমান। এর মধ্যে ৮৫% শিয়া এবং ১৫% সুন্নি। আজারবাইজান বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক শিয়াবহুল দেশ।

দেশটির বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও রয়েছে। সংবিধানের ৪৮ তম ধারা অনুযায়ী আজারবাইজান একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যা সকল মতাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে থাকে। ২০০৬–২০০৮ সালের একটি গ্যালআপ ভোটগ্রহণ অনুসারে, অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ২১% মনে করেন যে ধর্ম তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দেশটির সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা প্রায় ২৮০,০০০ (৩.১%) যাদের বেশিরভাগ রুশ ও জর্জীয় অর্থডক্স এবং আর্মেনীয় প্রেরিতীয়। ২০০৩ সালে রোমান ক্যাথলিকদের সংখ্যা ছিল ২৫০। ২০০২ সালের জরিপমতে অন্যান্য খ্রিষ্টান মণ্ডলীগুলোর মধ্যে রয়েছে লুথারবাদী, বাপ্তিস্মবাদী ও মলোকান। এছাড়া দেশটিতে ছোট একটি প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ও রয়েছে। আজারবাইজানে একটি প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায়েরও বসবাস রয়েছে যাদের ইতিহাস অন্ততপক্ষে ২০০০ বছর পুরনো। ইহুদি সংগঠনসমূহের অনুমানমতে আজারবাইজানে মোট ইহুদিসংখ্যা ১২,০০০। এছাড়াও আজারবাইজানে বাহাই ধর্ম, ইস্কন ও জেহোভার সাক্ষীর পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায় ধর্মীয় স্বাধীনতার উপভোগের ক্ষেত্রে অদাফতরিক বাধার সম্মুখীন হয়। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি রিপোর্ট মতে নির্দিষ্ট কিছু মুসলমান ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আজারবাইজানে ধরপাকড়ের শিকার হন এবং অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় সংগঠন বিষয়ক জাতীয় পরিষদে (এসসিডাব্লিউআরএ) নিবন্ধিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়।




#Article 55: বাহামা দ্বীপপুঞ্জ (372 words)


বাহামা দ্বীপপুঞ্জ(দাপ্তরিকভাবে বাহামাস কমনওয়েলথ,) () মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে, কিউবা ও হিস্পানিওলা দ্বীপের উত্তরে অবস্থিত প্রায় ৭০০টি দ্বীপ ও হাজার খানেক কি (cay, এক ধরনের ক্ষুদ্র বালুময় দ্বীপ) নিয়ে গঠিত একটি শৃঙ্খলাকার দ্বীপপুঞ্জ। কমনওয়েল্‌থ অভ বাহামাস নামে সরকারীভাবে পরিচিত দেশটি কমনওয়েল্‌থ অভ নেশন্‌সের একটি স্বাধীন সদস্য। বাহামা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান, জলবায়ু ও ভূগোল এটিকে পর্যটকদের একটি জনপ্রিয় গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছে। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের কাছে অবস্থিত হওয়ায় সারা বছরই এখানকার জলবায়ু খুব মৃদু । এখানে নীল সমুদ্রের পাশে অনেক সুন্দর সুন্দর সমুদ্রসৈকত অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র ও আরও দূরের দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক এখানে বেড়াতে আসেন। দেশটির রাজধানী নাসাউ।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে যখন আমেরিকাতে আসেন, তখন প্রথম যে স্থানটিতে তিনি অবতরণ করেছিলেন, তা ছিল বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ। কলম্বাস দ্বীপটিকে স্পেনের সম্পত্তি বলে দাবী করেন এবং এর নাম দেন সান সালবাদোর। ১৭১৭ সালে এটিকে ব্রিটিশ উপনিবেশ করা হয়। বহু শতাব্দী ধরে রাজধানী নাসাউয়ের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৫৯ সালে সম্পত্তির উপর ভিত্তি করে পুরুষদের ভোটের আধিকার দেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে মহিলাদেরও ভোটের অধিকার দেওয়া হয়। প্রোগ্রেসিভ লিবারেল পার্টির লিন্ডেন অস্কার পিন্ডলিং প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। উপনিবেশটি ১৯৬৪ সালে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে স্বায়ত্তশাসন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ই জুলাই পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৮০-র দশকে পিন্ডলিং ও তার দল দুর্নীতি ও মাদক চোরাচালান কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েন। অর্থনীতির দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পিন্ডলিং দেশটিকে বৈদেশিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত করে দেন। এর ফলে ১৯৯২ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি রক্ষণশীল ফ্রি ন্যাশনাল মুভমেন্টের হুবার্ট ইনগ্রাহামের কাছে পরাজিত হন। ইনগ্রাহাম বর্তমানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডোরিয়ান নামের একটি ৫ম শ্রেণীর হারিকেন ঘূর্ণিঝড় বাহামাতে আঘাত হানে, যাতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ১৮৫ মাইল। ঘূর্ণিঝড়টির কারণে মূল বাহামা দ্বীপের প্রায় ৪৫% ঘরবাড়ি (প্রায় ১৩ হাজার ভবন) আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়।

১৯৬৪ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর শ্বেতাঙ্গ ও কৃষাঙ্গ রাজনৈতিক দলের মধ্যে রেষারেষি ছিল। ১৯৬৭ সালে কৃষ্ণাঙ্গ প্রোগ্রেসিভ লিবারেল পার্টি সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে। এর নেতা ছিলেন লিন্ডেন পিন্ডলিং। ১৯৭৩ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর পিন্ডলিং ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশক ধরে ক্ষমতা ধরে রাখেন। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ফ্রি ন্যাশনাল মুভমেন্ট জয়লাভ করলে হুবার্ট ইংগ্রাহাম প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৭ সালে ইঙ্গগ্রাহাম ও তার দল পুনর্নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০২ সালে প্রোগ্রেসিভ লিবারেল পার্টি আবার ক্ষমতায় আসে। এবার পেরি ক্রিস্টি নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।




#Article 56: বাহরাইন (1424 words)


বাহরাইন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। বাহরাইন পারস্য উপসাগরের পশ্চিম অংশের ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর পূর্বে কাতার ও পশ্চিমে সৌদী আরব। সবচেয়ে বড় দ্বীপটিও বাহরাইন নামে পরিচিত এবং এতে দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী মানামা অবস্থিত।

প্রায় ৫,০০০ বছর আগেও বাহরাইন একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। সবসময়ই এটি শক্তিশালী প্রতিবেশীদের অধীনস্থ ছিল। ১৭শ শতকে এটি ইরানের দখলে আসে। ১৭৮৩ সালে মধ্য সৌদী আরবের আল-খলিফা পরিবার নিজেদেরকে বাহরাইনের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং তখন থেকে তারাই দেশটিকে শাসন করে আসছে। ১৯শ শতকের কিছু সন্ধিচুক্তির ফলে যুক্তরাজ্য দেশটির প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব পায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বাহরাইন ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ছিল।

বাহরাইনের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি সেখানেই জন্ম-নেওয়া। এছাড়া বাহরাইনে শিয়া মুসলিমদের সংখ্যা সুন্নী মুসলিমদের প্রায় দ্বিগুণ। তবে সুন্নীরা বাহরাইনের সরকার নিয়ন্ত্রণ করেন।

১৯৩০-এর দশকে বাহরাইন পারস্য উপসাগরের প্রথম দেশ হিসেবে তেল-ভিত্তিক অর্থনীতি গঠন করে, কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকেই এর সমস্ত তেল ফুরিয়ে যায়। তবে দেশটি এই পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করে রেখেছিল এবং দেশটির অর্থনীতি এখনও উন্নতি করে যাচ্ছে।

বর্তমান বাহরাইন অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগে দিলমুন নামক সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। ৫ হাজার বছর আগেও বাহরাইন সিন্ধু অববাহিকা ও মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ অব্দের দিকে ভারত থেকে বাণিজ্য আসা বন্ধ হয়ে গেলে দিলমুন সভ্যতার পতন ঘটা শুরু করে। ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে আসিরীয় রাজার বাহরাইনকে ক্রমাগত নিজেদের বলে দাবী করতে শুরু করে। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কিছু পরে দিলমুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এরপর অনেক দিন যাবৎ বাহরাইনের কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে পারস্য উপসাগরে মহাবীর আলেকজান্ডারের পদার্পণ ঘটলে আবার এর হদিস পাওয়া যায়। যদিও আরব গোত্র বনি ওয়াএল এবং পারসিক গভর্নরেরা অঞ্চলটি শাসন করতেন, খ্রিস্টীয় ৭ম শতক পর্যন্তও এটি গ্রিক নাম তিলোস (Tylos) নামে পরিচিত ছিল। ঐ শতকে এখানকার অধিবাসীরা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। বাহরাইন ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য ও মুক্তা আহরণ কেন্দ্র। ৭ম শতক থেকে বিভিন্ন পর্বে এলাকাটি সিরিয়ার উমাইয়া বংশীয় খলিফাগণ, বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাগণ, পারসিক, ওমানি এবং পর্তুগিজদের দ্বারা শাসিত হয়। শেষ পর্যন্ত বনি উতবাহ গোত্রের আল খালিফা পরিবার ১৭৮৩ সালে ইরানীদের কাছ থেকে অঞ্চলটি দখল করে এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত তারা বাহরাইনের শাসক।

১৮৩০-এর দশকে আল খালিফা পরিবার একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাহরাইনকে একটি ব্রিটিশ প্রটেক্টোরেটে পরিণত করে, অর্থাৎ যুক্তরাজ্য বহিরাক্রমণ থেকে দেশটির সুরক্ষার দায়িত্ব নেয় এবং এর বিনিময়ে বাহরাইন যুক্তরাজ্যের অনুমতি ছাড়া অন্য কোন বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ হারায়। বাহরাইনে বড় আকারে খনিজ তেলের উৎপাদন শুরু হবার কিছু পরেই ১৯৩৫ সালে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটিটি বাহরাইনে নিয়ে আসা হয়।

১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকার পারস্য উপসাগরের শেখশাসিত রাজ্যগুলির সাথে ইতোমধ্যে করা চুক্তিগুলি রদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় বাহরাইন কাতার এবং বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৭টি শেখরাজ্যের সাথে মিলে একটি বৃহৎ সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সাল নাগাদ এই নয় রাজ্য সংযুক্তিকরণের বিভিন্ন ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। ফলে ১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট বাহরাইন একক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

নতুন রাষ্ট্র বাহরাইনের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচিত হয়, কিন্তু মাত্র দুই বছর পরে ১৯৭৫ সালে বাহরাইনের আমির সংসদ ভেঙে দেন, কেননা নির্বাচিত সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আল-খলিফা শাসনের অবসান এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে সেখান থেকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা করছিল।

১৯৯০-এর দশকে বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায়ের অসন্তুষ্টি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের আকারে প্রকাশ পায়। এর প্রেক্ষিতে বাহরাইনের আমির প্রায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত, ১৯৯৫ সালে, বাহরাইনের মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন, এবং আইন পর্যালোচনাকারী কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ৪০-এ বৃদ্ধি করেন। এর ফলে সংঘাতের পরিমাণ প্রথমে কিছু কমলেও ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে বেশ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁ-তে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে এবং এতে অনেকে নিহত হয়। পুলিশ প্রায় ১ হাজার লোককে এর জের ধরে গ্রেফতার করে এবং কোন বিচার ছাড়াই এদের শাস্তি দেয়া হয়। সম্প্রতি বাহরাইন সরকার এদের অনেককে ছেড়ে দিয়েছে।

বাহরাইন ১৯৭১ সালে স্বধীনতা লাভ করে। বাহার শব্দের অর্থ সাগর আর বাহরাইন হচ্ছে দু'টি সাগর। এটি একটি দ্বীপ রাষ্ট্র এর চারদিকে সাগর I

বাহরাইনের রাজনীতি একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র কাঠামোতে সংঘটিত হয়। রাজা শাইখ হামাদ বিন ইসা আল খালিফা সরকার চালানোর জন্য একজন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। বাহরাইনের আইনসভা দুই-কক্ষবিশিষ্ট। নিম্ন কক্ষের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। ঊর্ধ্বকক্ষ তথা শুরা কাউন্সিলের সদস্যদের রাজা নিয়োগ দেন। বর্তমানে খালিফা ইবন সুলমান আল-খালিফা দেশের প্রধানমন্ত্রী। রাজপুত্র শাইখ সালমান বাহরাইনের সেনাবাহিনীর কমান্ডার।

বাহরাইন রাষ্ট্রটি আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে ২৪ কিমি দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ৩২টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম বাহরাইন দ্বীপ। দ্বীপটির বেশির ভাগ অংশ মরুময় ঊষর নিম্নভূমি। কেবল উত্তরের উপকূলে এক চিলতে সমভূমি আছে যেখানে রাজধানী মানামা অবস্থিত।

বাহরাইনের অর্থনীতি প্রধানত পেট্টোলিয়াম উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রিফাইনিং এর উপর নির্ভরশীল। এই খাত ৬০% রপ্তানিতে ও ৩০% জিডিপিতে অবদান রাখে। এদেশের শ্রমবাজারের ৫ ভাগের ৩ ভাগ দখল করে আছে বিদেশি শ্রমিকেরা।
যোগাযোগব্যবস্থা ভাল হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে সদরদপ্তর স্থাপন করেছে।
পর্যটন খাত অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এই খাত জিডিপিতে ৯% অবদান রাখছে।
শুধুমাত্র ১% ভূমি চাষযোগ্য হওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরা উৎপাদনে অক্ষম। তারা এক্ষেত্রে আমদানির উপর নির্ভর করে। তাদের মাথাপিছু আয়ও অনেক বেশি। প্রায় ৫১,৯৫৬ মা.ডলার(২০১৭ অনুযায়ী)

২০১০ সালে বাহরাইনের জনসংখ্যা ১.২ মিলিয়ন হয়ে দাঁড়ায় যার মধ্যে ৫৬৮,৩৯৯ জন বাহরাইনি নাগরিক এবং ৬৬৬,১৭২ জন অনাগরিক। ২০০৭ সালে তা ১.০৫ মিলিয়ন (৫১৭,৩৬৮ অনাগরিক) অতিক্রম করে। ২০২০ সালের জানুয়ারি নাগাদ বাহরাইনের জনসংখ্যা ১.৬৯ মিলিয়নেরও উপরে গিয়ে দাঁড়ায়। যদিও জনসংখ্যার অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের লোক, তথাপি বাহরাইনিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ এশীয়। ২০০৮ সালে প্রায় ২৯০,০০০ ভারতীয় নাগরিক বাহরাইনে বসবাস করেন, যা তাদের দেশটির একক বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। এদের বেশিরভাগই ভারতের কেরল রাজ্য থেকে আগত। বাহরাইন বিশ্বের চতুর্থ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ যার জনসংখ্যার ঘনত্ব ২০১০ সালে ছিল প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,৬৪৬ জন। জনসংখ্যার একটি বড় অংশই দেশটির উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে, দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলক কম জনবহুল। দেশটির উত্তরাঞ্চল এতটাই নগরায়িত যে অনেকে একে একটি বৃহৎ মেট্রোপলিটন এলাকা বলে বিবেচনা করে।

বাহরাইনিরা জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময়। শিয়া বাহরাইনিরা দুটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত: বাহরানা এবং আজম। বাহরানারা হল আরব শিয়া, অন্যদিকে আজমরা হল পারসিক শিয়া। মানামা ও মুহররকের জনসাধারণের বড় অংশই পারসিক শিয়া। শিয়া বাহরাইনিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ হল আল-হাসা অঞ্চলের হাওয়াসি জনগোষ্ঠী।

সুন্নি বাহরাইনিরাও মূলত দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত: আরব ও হুওয়ালা। আরব সুন্নিরা বাহরাইনের সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠী, তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত এবং বাহরাইনি রাজতন্ত্রও আরব সুন্নিদের নিয়ন্ত্রণাধীন। সুন্নি আরবেরা ঐতিহ্যগতভাবে জাল্লাক, মুহররক, রিফা ও হাওয়ার দ্বীপসমূহে বসবাস করে আসছে। হুওয়ালারা হল ইরানি সুন্নিদের বংশধর; তাদের কেউ কেউ পারসিক সুন্নি, আর বাকিরা আরব সুন্নি। সুন্নিদের মধ্যে বেলুচি জাতিগোষ্ঠীর লোকেরাও রয়েছে। আফ্রিকান বাহরাইনিদের অধিকাংশই পূর্ব আফ্রিকা থেকে আগত এবং ঐতিহ্যগতভাবে মুহররক দ্বীপ ও রিফাতে বসবাস করে।

বাহরাইনের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং অধিকাংশ বাহরাইনি মুসলমান। বাহরাইনি মুসলমানদের বেশিরভাগই শিয়া। এটি মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি শিয়াপ্রধান দেশের অন্যতম, অন্য দুটি দেশ হল ইরাক ও ইরান। ২০১৭ সালের একটি আদমশুমারি অনুযায়ী বাহরাইনি জনগণের ৬২% শিয়া এবং ৩৮% সুন্নি।

শিয়ারা বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হলেও রাজপরিবার এবং অভিজাতদের বেশিরভাগই সুন্নি মতাবলম্বী। দেশটির এই প্রধান দুই মুসলিম সম্প্রদায় কিছু ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তীব্র মতবিরোধ ধারণ করে। শিয়ারা প্রায়শই রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক প্রান্তীকরণের অভিযোগ তুলেছে; ফলে ২০১১ সালের বাহরাইনি অভ্যুত্থানের অধিকাংশ বিক্ষোভকারীই ছিল শিয়া।

২০১০ সালের আদমশুমারি মতে, বাহরাইনের মুসলিম জনসংখ্যা ৮৬৬,৮৮৮।

বাহরাইনে স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। ২০১০ সালের শুমারি অনুযায়ী অমুসলিম বাহরাইনিদের সংখ্যা ৩৬৭,৬৮৩, যাদের বেশিরভাগই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। বাহরাইনের খ্রিস্টানদের বড় অংশই প্রবাসী, স্থানীয় খ্রিস্টান বাহরাইনিরা সে তুলনায় সংখ্যালঘু। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সাবেক বাহরাইনি রাষ্ট্রদূত আলীদ সামান একজন স্থানীয় খ্রিস্টান। বাহরাইনে একটি ক্ষুদ্র স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ও রয়েছে যাদের সংখ্যা ৩৭। বিভিন্ন সূত্রমতে বাহরাইনি ইহুদিদের সংখ্যা ৩৬ থেকে ৫০। বাহরাইনি লেখিকা ন্যান্সি খেদুরির মতে, বাহরাইনের ইহুদি সম্প্রদায় পৃথিবীর অন্যতম নবীন জনগোষ্ঠী। ১৮৮০-র দশকে তৎকালীন ইরাক ও ইরান থেকে বাহরাইন দ্বীপে অভিবাসন করা কয়েকটি ইহুদি পরিবার থেকে এই জনগোষ্ঠীর উৎপত্তিলাভ করে।

সাএশীয় দেশসমূহ থেকে, বিশেষত ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা থেকে, আগত অভিবাসী কর্মীদের ক্রমাগত আগমনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাহরাইনের সামগ্রিক মুসলিম সংখ্যার হার হ্রাস পেয়েছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, বাহরাইনের জনসংখ্যার ৮১.২% মুসলমান, ১০% খ্রিস্টান এবং ৯.৮% হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। বাহরাইনের জনসংখ্যার ১% বাহাই ধর্মাবলম্বী।

ইসলাম মূল ধর্ম এবং বাহরাইনীরা অন্যান্য ধর্মের অনুশীলনের প্রতি সহনশীলতার জন্য পরিচিত।বাহরাইনি এবং প্রবাসীদের মধ্যে বিবাহ অস্বাভাবিক নয়। ফিলিপিনো শিশু অভিনেত্রী মোনা মারবেলা আল-আলাওয়ের মতো অনেক ফিলিপিনো-বাহরাইনি রয়েছে।

মহিলাদের পোশাক সম্পর্কে বিধিগুলি সাধারণত আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের তুলনায় শিথিল করা হয়; মহিলাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক সাধারণত হিজাব বা আবায়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।  যদিও ঐতিহ্যবাহী পুরুষদের পোশাকটি থোবে যাতে কেফিয়েহ, ঘুতরা, তবে পশ্চিমা পোশাকগুলিও এ দেশে প্রচলিত। যদিও বাহরাইন সমকামিতাকে বৈধতা দিয়েছে।

বাহরাইনের সঙ্গীত অনেকটা এর প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের মতই। খালিজি (Khaliji) , এক প্রকার লোক সঙ্গীত সমগ্র বাহরাইন জুড়ে জনপ্রিয়। এছাড়া শহুরে ঘরানার সাওত (sawt) সঙ্গীতও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

আলি বাহার বাহরাইনের বিখ্যাত গায়কদের মধ্যে একজন। Al Ekhwa (আরবি অনুবাদ- দ্যা ব্রাদার্স) তার সঙ্গীত দলের নাম।

অ্যারাবস গট ট্যালেন্ট কর্তৃক ২০১১ সালে নির্বাচিত ক্ষুদে সংগীত শিল্পী হালা আল তুরক বাহরাইনে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাহরাইন ছাড়াও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়াও তার ইউটিউব মিউজিক ভিডিও সমূহ খুবই জনপ্রিয়।

উল্লেখ্য, পারসিয়ান গালফ স্টেটস সমূহের মধ্যে বাহরাইনেই সর্বপ্রথম recording studio স্থাপন করা হয়।

বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের তথা দেশের প্রধান ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। এটি অন্যতম হাব বিমানবন্দর।




#Article 57: বার্বাডোস (138 words)


বার্বাডোস ক্যারিবীয় সাগরে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপগুলির মধ্যে এটি সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত। বার্বাডোস প্রায় তিন শতাব্দী ধরে একটি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৯৬৬ সালে এটি যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। অ্যাংলিকান গির্জা থেকে শুরু করে জাতীয় খেলা ক্রিকেট পর্যন্ত দেশটির সর্বত্র ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ছাপ সুস্পষ্ট। বার্বাডোসের বর্তমান অধিবাসীদের বেশির ভাগই চিনির প্ল্যান্টেশনে কাজ করানোর জন্য নিয়ে আসা আফ্রিকান দাসদের বংশধর। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ব্রিজটাউন দেশটির বৃহত্তম শহর, প্রধান বন্দর ও রাজধানী।

বার্বাডোসের শুভ্র বালুর সৈকত ও দ্বীপের চারদিক ঘিরে থাকা প্রবাল প্রাচীর বিখ্যাত। বহু বছর ধরে আখ ছিল অর্থনীতির প্রধান পণ্য। ১৯৭০-এর দশকে পর্যটন শিল্প প্রধান শিল্পে পরিণত হয়। দ্বীপটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটক গন্তব্যস্থলের একটি। দ্বীপের সরকার বার্বাডোসলে অফশোর ব্যাংকিং এবং তথ্যপ্রযুক্তির একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

বার্বাডোসের বর্তমান জনসংখ্যা ২৮৭,৪৩২(২৭/০৭/২০২০-সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী)।প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বাস করেন ৬৬৮ জন। (উৎসঃ 




#Article 58: বেলারুশ (438 words)


বেলারুশ (বেলারুশীয় ভাষা: Беларусь এবং রুশ ভাষায়: Беларусь বিয়েলারুস্য্‌;), সরকারী নাম বেলারুশ প্রজাতন্ত্র (Рэспубліка Беларусь রেস্‌পুব্‌লিকা বিয়েলারুস্য্‌‌), মধ্য পূর্ব ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতন্ত্র।  এর উত্তরে ও পূর্বে রাশিয়া, দক্ষিণে ইউক্রেন, পশ্চিমে পোল্যান্ড, এবং উত্তর-পশ্চিমে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া। বেলারুশ মূলত অরণ্য (দেশের এক-তৃতীয়াংশ), হ্রদ ও জলাভূমিতে পূর্ণ একটি সমতল ভূমি। বেলারুশের প্রায় ৯৯ লক্ষ লোকের ৮০%-ই জাতিগতভাবে বেলারুশীয়; অন্যান্য জাতির মধ্যে পোলীয়, রুশ ও ইউক্রেনীয় উল্লেখযোগ্য। তিন-চতুর্থাংশ জনগণ নগর অঞ্চলে বাস করেন। দেশের মধ্যভাগে অবস্থিত মিন্‌স্ক রাজধানী ও বৃহত্তম নগর। অন্যান্য বড় শহরগুলির মধ্যে আছে ব্রেস্ত, হ্রোদনা, হোমিয়েল, মোগিলেফ, ভিতেভ্‌স্ক এবং বাব্‌রুইস্ক। ১৯৯৫ সালের একটি গণভোটের মাধ্যমে রুশ ও বেলারুশ ভাষা দেশের সরকারি ভাষা। রুশ অর্থডক্স খ্রিস্টধর্ম দেশের মানুষের প্রধান ধর্ম। বেলারুশে একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনীতি বিদ্যমান; সরকার নিয়ন্ত্রিত ভারী শিল্পকারখানাগুলি এই অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তবে কৃষিও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।

মধ্যযুগ থেকে বেলারুশ অঞ্চলটি বিভিন্ন বিদেশী শাসনের অধীনে ছিল। এদের মধ্যে আছে পোল্যান্ডের ডিউক রাজত্ব, লিথুয়ানিয়ার ডিউক রাজত্ব, এবং পোলীয়-লিথুয়ানীয় কমনওয়েলথ। ১৮শ শতকে এটিকে রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেবল মধ্য-১৯শ শতকে এসে বেলারুশে জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে। ১৯১৯ সালে বেলোরুশীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে বেলারুশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রের একটি ছিল। ১৯৩০ সালে ২য় পোলীয় প্রজাতন্ত্রের বেলারুশ জাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলি আধুনিক সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বেলারুশীয় ভূমিগুলির সম্পূর্ণ একত্রীকরণ সংঘটিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেশটির প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হয়; এ সময় বেলারুশের এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যার মৃত্যু ঘটে এবং দেশটি অর্ধেকেরও বেশি অর্থনৈতিক সম্পদ হারায়।  যুদ্ধপরবর্তী বছরগুলিতে বেলারুশ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠে। এটি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাষ্ট্রগুলির একটি ছিল। ১৯৯১ সালের ২৭শে জুলাই বেলারুশের আইনসভা দেশটির সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন। আগস্ট মাসে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং এর মাধ্যমে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ভূমিকা রাখে। বর্তমান বেলারুশ সরকার একটি রাষ্ট্রপতিভিত্তিক প্রজাতন্ত্র। ১৯৯৪ সাল থেকে আলেক্সান্দর লুকাশেঙ্কো দেশটির রাষ্ট্রপতি। বেলারুশ ও রাশিয়াকে একত্রিত করে একটি মাত্র রাষ্ট্র রুশ ও বেলারুশ ইউনিয়ন করার ব্যাপারে ১৯৯৬ সাল থেকে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা চলছে।

বেলারুশের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দ্বিকাক্ষিক আইনসভার উপর ন্যস্ত। তবে রাষ্ট্রপতি আইনের মতই অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা রাখেন। বেলারুশের দুটি বড় দলের নাম হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক দল ও গণ ফ্রন্ট। এছাড়াও সেখানে আরও কিছু ছোট দলও রয়েছে।

পূর্ব ইউরোপের স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র বেলারুশ মূলত একটি সমতল ভূমি যার কোন প্রাকৃতিক সীমানা নেই। দেশের মধ্যভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে চলে গেছে বেলারুশ পর্বতশ্রেণী। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জনবিরল অরণ্যে আবৃত। প্রায় ৩ হাজার নদী ও প্রায় ৪ হাজার হ্রদ দেশটির ভূগোলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বেলারুশ এবং রুশ ভাষা বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের সরকারি ভাষা। এর মধ্যে বেলারুশীয় ভাষাতে প্রায় ৯৮% জনগণ কথা বলে। ১০% লোক রুশ ভাষাতে কথা বলতে পারে। পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পোলীয় এবং জার্মান ভাষার প্রচলন আছে।




#Article 59: বেলজিয়াম (420 words)


বেলজিয়াম ( বেল্‌য়া,  ব্যল্‌ঝ়িক্‌,  বেল্‌গিয়েন্‌) উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একটি দেশ। এটি একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। এটি ইউরোপের ক্ষুদ্রতম ও সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির একটি। বেলজিয়াম ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এটি ইউরোপের সর্বাধিক নগরায়িত দেশ; এখানকার ৯৭% লোক শহরে বাস করে। নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবুর্গের সাথে মিলে বেলজিয়াম নিচু দেশগুলি গঠন করেছে। দেশটির নাম বেল্গায়ে নামের এক কেল্টীয় জাতির নাম থেকে এসেছে। এই জাতিটি এখানকার আদি অধিবাসী ছিল; খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে জুলিয়াস সিজার এলাকাটি দখল করে নেন। ব্রুসেল শহরটি বেলজিয়ামের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইউরোপীয় কমিশন, ন্যাটো এবং বিশ্ব শুল্ক সংস্থার সদর দপ্তর ব্রাসেল্‌স-এ অবস্থিত। এছাড়া ইউরোপীয় পার্লমেন্টের নতুন ভবন এখানে অবস্থিত। ইউরোপীয়  পার্লমেন্টের আদি ভবন ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে অবস্থিত। বেলজিয়াম ইউরো জোন-এ অবস্থিত এবং এর মুদ্রা ইউরো। ইউরো প্রবর্তনের পূর্বে বেলজিয়ামের মূদ্রার নাম ছিল  বেলজিয়াম ফ্রাঁ ।
ফ্রান্স এবং উত্তর ইউরোপের সমভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত। এর উত্তরে উত্তর সাগর। ইউরোপের একটি ভৌগোলিক সঙ্গমস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি মধ্যযুগ থেকেই একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। উত্তর সাগরের মাধ্যমে দেশটি বাকী বিশ্বের সাথে বাণিজ্য চালায়। বেলজিয়ামের অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহু যুদ্ধ হয়েছে। ১৮৩০ সালে বেলজিয়াম স্বাধীনতা লাভ করে।

বেলজিয়াম তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত- ফ্ল্যান্ডার্স, ওয়ালোনিয়া এবং ব্রাসেলস ক্যাপিটাল সিটি। ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলটি ব্রাসেলসের উত্তর ও পশ্চিমে অবস্থিত; এখানে বেশির ভাগ লোক ওলন্দাজ (ফ্লেমিশ) ভাষায় কথা বলেন এবং এরা ফ্লেমিং নামে পরিচিত। ওয়ালোনিয়া ব্রাসেলসের পূর্বে ও দক্ষিণে অবস্থিত এবং এখানকার বেশির ভাগ লোক ফরাসি ভাষায় কথা বলেন; এরা ওয়ালোন নামে পরিচিত। ব্রাসেলস অঞ্চলের উভয় জাতের লোকের বাস। প্রতিটি অঞ্চলই প্রায় স্বায়ত্তশাসিত; কিন্তু ফ্লেমিং ও ওয়ালোনদের মধ্যে এখনও তীব্র দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। ফ্ল্যান্ডার্স এলাকা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে আগ্রহী।

ভাষার জন্য বেলজিয়ানরা যুদ্ধ-বিগ্রহে পর্যন্ত লিপ্ত হয়েছে। প্রধান ভাষা দুটি ; যথাঃ ফ্লেমিশ এবং ফরাসী। তৃতীয় প্রচলিত ভাষা জার্মান। কেবল ব্রুসেল শহরে ফ্লেমিশ এবং ফরাসি উভয় ভাষাই সরকারীভাবে ব্যবহৃত হয়। ফ্ল্যান্ডার্স এলাকায় অবিমিশ্রভাবে ফ্লেমিশ ভাষা প্রচলিত ; ওয়ালোনিয়া এলাকায় প্রচলিত ফরাসি ভাষা। তবে দূতাবাসের শহর ব্রুসেলে ইংরেজি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বেলজিয়ামে দুইটি সরকারী ভাষা প্রচলিত: ওলন্দাজ এবং ফরাসি। বেলজিয়ামের প্রায় ৫৭% লোক ওলন্দাজ ভাষার একটি উপভাষা ফ্লেমিশে কথা বলে। ফরাসি ভাষা প্রায় ৩৩% লোকের মাতৃভাষা এবং ফরাসিভাষীরা মূলত দেশের দক্ষিণাংশে ওয়ালুন অঞ্চলের বাস করে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেল্‌স একটি দ্বিভাষিক এলাকা। এছাড়া পূর্বের অয়পেন-মালমেডি-সাংক্ত ভিট প্রদেশগুলিতে প্রায় দেড় লক্ষ জার্মান ভাষাভাষী বাস করে। বেলজিয়ামের সংখ্যালঘু ভাষাগুলির মধ্যে আরবি, তুর্কি, কাবিলে, স্পেনীয়, পর্তুগিজ এবং লেৎসেবুর্গেশ ভাষা অন্যতম।

বেলজিয়ামের রাজনীতি একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাজা বা রাণী হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত।

বেলজিয়ামকে তিনটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়: উত্তর-পশ্চিমের উপকূলীয় সমভূমি, মধ্যভাগের মালভূমি এবং দক্ষিণ-পূর্বের আর্দেন পর্বতমালা।




#Article 60: বেলিজ (469 words)


বেলিজ মধ্য আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অংশে, ক্যারিবীয় সাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। বেলিজ মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও স্বল্পবসতিপূর্ণ দেশগুলির একটি। এর উত্তরে মেক্সিকো, পশ্চিমে ও দক্ষিণে গুয়াতেমালা এবং পূর্বে ক্যারিবীয় সাগর। দেশটির তটরেখার দৈর্ঘ্য ২৮০ কিলোমিটার। উপকূল থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে সমুদ্রের মধ্যে একটি প্রবাল বাধ আছে, যার নাম বেলিজ প্রবাল বাধ। ভৌগোলিকভাবে বেলিজ ইউকাতান উপদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত। বেলিজের উত্তর অর্ধাংশ নিম্ন জলাভূমি প্রকৃতির; এখানে কৃষিকাজ দুরূহ। বেলিজের দক্ষিণ অংশটিতে একটি সরু উপকূলীয় সমভূমি আছে, যার পাশে হঠাৎ অনেক উঁচু পাহাড় ও পর্বত উঠে গেছে; পার্বত্য অঞ্চলটির নাম মায়া পর্বতমালা। দেশের তিন-চতুর্থাংশ এলাকা অরণ্যে আবৃত।

উপকূলীয় শহর বেলিজ সিটি দেশের বৃহত্তম শহর ও দেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।  ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এটি দেশটির রাজধানী ছিল। ১৯৬১ সালে একটি হারিকেন ঘূর্ণিঝড়ে শহরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করলে দেশের অভ্যন্তরে বেলিজ সিটি থেকে ৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে বেলমোপান শহরে নতুন রাজধানী নির্মাণ করা হয়।

বেলিজ জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে বিচিত্র দেশ। এখানকার অনেক লোক কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা মিশ্র আফ্রিকান-ইউরোপীয় রক্তের লোক, যাদেরকে ক্রেওল ডাকা হয়। এছাড়াও এখানে বহু মায়া আদিবাসী ও মেস্তিসো (আদিবাসী আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের মিশ্র জাতি) লোকের বাস। এছাড়াও এখানে ইউরোপীয় ও এশীয়রা স্বল্প সংখ্যায় বাস করেন। ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে কৃষাঙ্গ ও অর্ধ-কৃষ্ণাঙ্গ ক্রেওলদের তুলনায় মেস্তিসোদের অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেস্তিসোরা বর্তমানে বেলিজের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করছে।

বর্তমান বেলিজ এলাকাটি অতীতে মায়া সভ্যতার অংশ ছিল। মায়া সভ্যতা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিকাশ লাভ করে এবং ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মায়ারা ছিল দক্ষ কৃষক; তারা তখনকার যুগের সবচেয়ে অগ্রসর একটি সভ্যতা নির্মাণ করেছিল। তারা অনেক কারুকার্যময় মন্দির নির্মাণ করে। মায়া সভ্যতার প্রাচীন নগরগুলির ধ্বংসাবশেষ দেখতে অনেক পর্যটক এখন বেলিজে বেড়তে আসে। দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য ও মনোরম সৈকতগুলিও পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করে।

বেলিজ প্রায় দুই শতক ধরে  ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল। এটি আমেরিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত সর্বশেষ ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৯৭৩ পর্যন্ত এর নাম ছিল ব্রিটিশ হন্ডুরাস। প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুয়াতেমালা ঐতিহাসিক কারণে বেলিজকে নিজের অংশ বলে দাবী করে আসলেও বেলিজ নিজের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণা চালায়। ১৯৮১ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর এটি স্বাধীনতা অর্জন করে। বর্তমানে এটি কমনওয়েলথ অফ নেশনসের একটি সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের সাথে সম্পর্ক জিইয়ে রেখেছে। বেলিজের প্রধান ভাষা ইংরেজি। বেলিজের সরকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারী ভাষা তাই ইংরেজি ভাষাভাষী ব্রিটিশ ক্যারিবীয় দ্বীপগুলির মত। কিন্তু এর সংস্কৃতি আবার মধ্য আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলির মত। বেলিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি মধ্য আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক।

১৬৩৮ সালে পিটার ওয়ালেস নামের একজন স্কটল্যান্ডীয় জলদস্যু বেলিজ নদীর মোহনাতে একটি লোকালয় স্থাপন করেন বলে ধারণা করা হয়। ওয়ালেসের নামের স্পেনীয় উচ্চারণ থেকেই বেলিজ নামটি এসেছে বলে অনুমান করা হয়। আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী মায়া ভাষার শব্দ বেলিক্স থেকে এসেছে যার অর্থ কাদাপানি অথবা অন্য আরেকটি মায়া শব্দ বেলিকিন থেকে এসেছে যার অর্থ সমুদ্রমুখী দেশ।

বেলিজের অর্থনীতি মুক্তবাজার প্রকৃতির। ২০শ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কাঠ রপ্তানি ছিল এর অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বর্তমানে চিনি ও লেবু জাতীয় ফল রপ্তানি দেশটির আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমানে সেবাখাত দেশটির বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত। এছাড়া পর্যটন বিদেশী আয়ের অন্যতম একটি উৎস। বেলিজের মুদ্রার নাম বেলিজ ডলার।




#Article 61: বেনিন (274 words)


বেনিন (ফরাসি: Bénin বেনিন্‌) পশ্চিম আফ্রিকার একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর পূর্ব নাম ছিল দাহোমি। গিনি উপসাগরে দেশটির প্রায় ১২১ কিমি দীর্ঘ তটরেখা বিদ্যমান। কীলক আকারের দেশটি উত্তর দিকে আফ্রিকার অভ্যন্তরে প্রায় ৬৭০ কিলোমিটার প্রবেশ করেছে। এটি আফ্রিকার ক্ষুদ্রতর দেশগুলির একটি।

বেনিনের জলবায়ু ক্রান্তীয়। এর অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক। দেশের বেশির ভাগ কৃষক দিনমজুরি করেন। ১৯৯০-এর দশকে বেনিনের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেও এটি আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশগুলির একটি।

বেনিনে বিভিন্ন জাতের লোকের বাস। এদের ফন, ইয়োরুবা, ও আজা জাতির লোক সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফরাসি ভাষা দেশটির সরকারি ভাষা। তবে ফন এবং অন্যান্য আফ্রিকান ভাষা বহুল প্রচলিত।

১৮৯৯ সাল থেকে বেনিন ফরাসি পশ্চিম আফ্রিকার অংশ হিসেবে একটি ফরাসি উপনিবেশ ছিল। ১৯৬০ সালে দাহোমি নামে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। দাহোমি ১৮শ ও ১৯শ শতকে আফ্রিকার একটি বড় রাজ্য ছিল, যার কেন্দ্র ছিল বেনিন।

স্বাধীনতা লাভের পর অনেকগুলি সামরিক শাসক দেশটি শাসন করেন। ১৯৭২ সালে একটি মার্ক্সবাদী সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৭৫ সালে দেশটির নাম বদলে গণপ্রজাতন্ত্রী বেনিন করা হয়। ১৯৮০র দশকে অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত বেনিন পশ্চিমের দেশগুলির কাছে সাহায্য চায়। ১৯৮৯ সালে সরকার মার্কসবাদ পরিত্যাগ করে। ১৯৯০ সালে নতুন সংবিধান পাস করা হয় ও গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধন করা হয়। বর্তমানে বেনিন একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা; রাষ্ট্রপতি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।

ঔপনিবেশিক সময়ে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এই দেশটির নাম ছিলো দাহোমি। ১৯৭৫ সালের ৩০শে নভেম্বর তারিখে দেশটির নাম পালটে বেনিন রাখা হয়। এই নামটি এসেছে এই দেশের তীরের কাছের বেনিন উপসাগর থেকে, যার নাম আবার এসেছিলো বেনিন রাজ্য হতে।

নতুন নাম বেনিন বেছে নেয়া হয় নিরপেক্ষতার খাতিরে। দাহোমি নামটি এসেছিলো দাহোমি রাজ্য হতে, যা দেশটির দক্ষিণের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে ছিলো। কাজেই উত্তর-পশ্চিমের রাজ্য আতাকোরা কিংবা উত্তর পূর্বের রাজ্য বোর্গুর কোনো নিদর্শন দেশের নামে ছিলো না। সেজন্য দেশটির নাম রাখা হয় বেনিন।

বেনিনে জনসংখ্যা ১১,৩৯৬,৩৮০ (২০১৭)




#Article 62: ভুটান (1209 words)


ভুটান ( ড্রুক ইয়ুল আনুষ্ঠানিক নাম কিংডম অব ভুটান  ,) দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাজতন্ত্র। ভুটানের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে মাতৃভাষা জংখা ভাষায় 'দ্রুক ইয়ুল' বা 'বজ্র ড্রাগনের দেশ' নামে ডাকে। দেশটি ভারতীয় উপমহাদেশে হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত। ভুটান উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল, পশ্চিমে ভারতের সিকিম ও তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা, পূর্বে অরুণাচল প্রদেশ এবং দক্ষিণে আসাম ও উত্তরবঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভুটান শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ভূ-উত্থান থেকে যার অর্থ উঁচু ভূমি।সংস্কৃত ভাষায় ভোট বা ভোটান্ত বলতেও ভুুুটান দেশটিকে বোঝানো হয়।   ভুটান সার্কের একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং মালদ্বীপের পর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। ভুটানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর থিম্পু। ফুন্টসলিং ভুটানের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

অতীতে ভুটান পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত অনেকগুলি আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল। ১৬শ শতকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে। ১৯০৭ সাল থেকে ওয়াংচুক বংশ দেশটি শাসন করে আসছেন। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তবে এখনও এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলির একটি।

ভুটানের নাম এসেছে সংস্কৃত শব্দ ভূ-উত্থান (উচ্চভূমি) হতে। অন্য মতে, ভুটান এসেছে ভোটস-আন্ত, অর্থাৎ তিব্বতের শেষ সীমানা হতে, যেহেতু ভুটান তিব্বতের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত।

ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন সময়ে ভুটান বিভিন্ন নামে খ্যাত ছিলো। যেমন, লো মন (দক্ষিণের অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজ্য), লো সেন্দেঞ্জং (সেন্দেন সাইপ্রেস বৃক্ষমন্ডিত দক্ষিণের রাজ্য), লোমেন খাঝি (দক্ষিণের রাজ্য যাতে চারটি প্রবেশ পথ রয়েছে), ও লো মেন জং (দক্ষিণের রাজ্য যেখানে ওষধি বৃক্ষ পাওয়া যায়। 

ভুটানের আয়তন ৪৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার। থিম্পু এর রাজধানী শহর এবং এটি দেশের মধ্য-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। অন্যান্য শহরের মধ্যে পারো, ফুন্টসলিং, পুনাখা ও বুমথং উল্লেখযোগ্য। ভুটানের ভূপ্রকৃতি পর্বতময়। উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা, মধ্য ও দক্ষিণভাগে নিচু পাহাড় ও মালভূমি এবং দক্ষিণ প্রান্তসীমায় সামান্য কিছু সাভানা তৃণভূমি ও সমভূমি আছে। মধ্যভাগের মালভূমির মধ্যকার উপত্যকাগুলিতেই বেশির ভাগ লোকের বাস। ভুটানের জলবায়ু উত্তরে আল্পীয়, মধ্যে নাতিশীতোষ্ণ এবং দক্ষিণে উপক্রান্তীয়; জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়। স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানের আকার, আকৃতি ও পার্বত্য ভূ-প্রকৃতি সুইজারল্যান্ডের সদৃশ বলে দেশটিকে অনেক সময় এশিয়ার সুইজারল্যান্ড ডাকা হয়।

বহির্বিশ্ব থেকে বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ভুটান প্রাণী ও উদ্ভিদের এক অভয়ারণ্য। এখানে বহু হাজার দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। ভুটানের প্রায় ৭০% এলাকা অরণ্যাবৃত। এই অরণ্যই ভুটানের জীব বৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ করে চলেছে যুগ যুগ ধরে।

ভুটানের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা গুলট্রাম এবং এর বিনিময় হার ভারতীয় রুপীর সাথে সম্পর্কিত । ভুটানে ভারতীয় রুপীরও  প্রচলন রয়েছে।  ভুটানের অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অর্থনীতিগুলির একটি।  

২০১২ পর্যন্ত ভুটানের মাথাপিছু আয় ছিল ২,৪২০ মার্কিন ডলার। 

ভুটানের অর্থনীতি কৃষি, বনজ, পর্যটন এবং ভারতে জলবিদ্যুৎ বিক্রির উপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যার ৫৫.৪ শতাংশের জন্য কৃষিকাজ মূল জীবিকা সরবরাহ করে। কৃষিকাজ মূলত খামার এবং পশুপালন নিয়ে গঠিত। হস্তশিল্পগুলি, বিশেষত তাঁত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য ও পাহাড়ী অঞ্চল হবার  ফলে রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

সমুদ্রবন্দর না থাকায় ভুটান ব্যাবসা বাণিজ্যতে ভালো করতে পারেনি। ভুটানের কোনও রেলপথ নেই, যদিও ভারতীয় রেলপথ ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় দক্ষিণ ভুটানকে তার বিশাল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।  ২০০৮ সালে ভুটান এবং ভারত একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে,যা বিশ্বের যেকোনো    বাজার থেকে ভুটানে আমদানি ও রফতানি শুল্ক ছাড়াই অনুমতি দেয় ট্রানজিট এর মাধ্যমে । ১৯৬০ সাল নাগাদ ভুটানের সাথে  চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত অঞ্চলের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। শরণার্থীদের আগমনের পরে চীনের সাথে তার সীমানা বন্ধ করে দেয়।

শিল্প খাতটি একটি নবজাতক পর্যায়ে রয়েছে, যদিও বেশিরভাগ উৎপাদন কুটির শিল্প থেকে আসে, বৃহত্তর শিল্পগুলিকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং সিমেন্ট, ইস্পাত এবং ফেরো এলয় এর মতো  কয়েকটি শিল্প স্থাপন করা হয়েছে। বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন রাস্তা নির্মাণ, ভারতীয় চুক্তি শ্রমের উপর নির্ভর করে। কৃষি উৎপাদনের মধ্যে চাল, মরিচ, দুগ্ধ (কিছু ইয়াক, বেশিরভাগ গাভী) পণ্য, বেকওয়েট, বার্লি, সাইট্রাস এবং ভুট্টা পাহাড়ি নিম্ন ভূমিতে হয় । শিল্পের মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, কাঠের পণ্য, প্রক্রিয়াজাত ফল, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইড।

 
ভুটানের অধিবাসীরা ভুটানি নামে পরিচিত। ২০০৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভুটানে ৬,৭২,৪২৫ জনের বাস। প্রতি বছর জনসংখ্যা ২% হারে বাড়ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ জন। ভুটানে দ্রুপকা জাতির লোক প্রায় ৫০%। এর পরেই আছে নেপালি (৩৫%) এবং অন্যান্য আদিবাসী বা অভিবাসী জাতি। দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোক লামাবাদী বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। বাকীরা ভারত ও নেপালি ধারার হিন্দু ধর্ম পালন করে। জংখা  ভুটানের সরকারি ভাষা। এছাড়া বুমথাং-খা, শারচোপ-খা ও নেপালি ভাষা প্রচলিত। ইংরেজি ভাষাতে শিক্ষা দেওয়া হয়। ভুটানের সাক্ষরতার হার প্রায় ৬০%। জনগণের প্রায় ৯৪% শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। বেকারত্বের হার ৩.১% (২০০৫ সালের প্রাক্কলন)।জংখা ভাষা বা ভুটানি ভাষা ভুটানের সরকারি ভাষা। এছাড়াও এখানে আরও প্রায় ১০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে বহু লক্ষাধিক বক্তাবিশিষ্ট নেপালি ভাষা অন্যতম। আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

ভুটানের বাসিন্দারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। ভুটানের একটি সমৃদ্ধ এবং অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে যা বিশ শতকের মধ্যভাগ অবধি বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে মূলত অক্ষত রয়েছে। পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল দেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য। ভুটানদের ঐতিহ্য তার বৌদ্ধ ঐতিহ্যে গভীরভাবে বিস্তৃত। দক্ষিণ অঞ্চলে সর্বাধিক প্রচলিত হিন্দু ধর্ম ভুটানের দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্ম। সরকার দেশের বর্তমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বজায় রাখার জন্য ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এর জন্য ভুটান কে সর্বশেষ শ্যাংগ্রি-লা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও ভুটানের নাগরিকরা বিদেশ ভ্রমণে ক্ষেত্রে স্বাধীন,  অনেক বিদেশী ভুটানকে ভ্রমণযোগ্য হিসেবে  দেখে। এটি অজনপ্রিয় গন্তব্য হওয়ার অন্য কারণ হল ব্যয়, যা কঠোর বাজেটের পর্যটকদের জন্য বেশি। প্রবেশাধিকার ভারত, বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের নাগরিকদের জন্য নিখরচায়, তবে অন্য সমস্ত বিদেশিদের একটি ভুটান ট্যুর অপারেটরের সাথে সাইন আপ করতে হবে এবং তারা দেশে থাকতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ ডলার দিতে হবে, যদিও এই ফি বেশিরভাগ ভ্রমণ, থাকার ব্যবস্থা এবং খাবারের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে।

ভুটান ধূমপান নিষিদ্ধ করার জন্য বিশ্বের প্রথম দেশ। ভুটানের ২০১০ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে প্রকাশ্যে ধূমপান করা বা তামাক বিক্রি করা আইনত অবৈধ হয়েছে।

১৯৬০ এর দশকের প্রথম দিতে জিগমে দর্জি ওয়াংচুক মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রে আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম ত্রিশ মিনিটের জন্য বেতার সম্প্রচার হয়। টেলিভিশন সম্প্রচার আরম্ভ হয় ১৯৯০-এর দশকে, যদিও মাত্র কয়েকটি ধনী পরিবার তখন স্যাটেলাইট ডিশ এন্টেনা কিনতে সক্ষম ছিল। ২০০০ সালে ইন্টারনেট সেবা চালু হয়।

ভুটানের প্রধান খাবার হলো লাল চাল (বাদামী চালের মতো, কিন্তু এতে বাদামী স্বাদ থাকে, ধানের একমাত্র প্রকার যেটি উঁচু এলাকায় জন্মায়।), বাজরা, ভুট্টা ইত্যাদি। পাহাড়াঞ্চলের খাবারের তালিকায় আছে মোরগ, চমরী গাইয়ের মাংস, শুকনো গরুর মাংস, শুকরের মাংস এবং চর্বি এবং মেষশাবক ইত্যাদি। স্যুপ এবং সিদ্ধ মাংস, চাল, ফার্ন, মসুর ডাল, এবং শুকনো সবজি, লাল মরিচ এবং পনিরের সাথে মশলা ইত্যাদি ভুটানে শীতকালের প্রিয় খাবার।

দুগ্ধজাত খাবারের মধ্যে গরু এবং চমরী গাইয়ের দুধের তৈরি মাখন এবং পনির অত্যন্ত জনপ্রিয়, প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ দুধ দিয়েই মাখন এবং পনির বানানো হয়। জনপ্রিয় পানীয়র মধ্যে আছে: মাখন চা, কালো চা, স্থানীয় ভাবে প্রস্তুতকৃত আরা (ভাতের মদ) এবং বিয়ার। জনপ্রিয় মশলার মধ্যে আছে: এলাচ, আদা, থিংগে (সিচুয়ান মরিচ), রসুন, হলুদ, এবং কেওড়া।

যখর কেউ খাবারের জন্য অনুরোধ করে, তখন বলে মেশু মেশু, এবং ভুটানের ভদ্রতা অনুযায়ী অপরজন বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে, তখন দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার অনুরোধ করা হয়।

ভুটান ভ্রমন করার জন্য একটি সুন্দর জায়গা ৷ ভুটানের ভূ-প্রকতি প্রাকৃতিক ভাবেই খুব সুন্দর ।

বজ্র ড্রাগনের দেশ নামে পরিচিত ভুটান এশিয়ার সবচেয়ে সুখি দেশ। ভুটানের রাজার উপাধি ‘ড্রাগন রাজা’। স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানের আকার, আকৃতি ও পার্বত্য ভূ-প্রকৃতি সুইজারল্যান্ডের সদৃশ বলে দেশটিকে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড ডাকা হয়। ভুটানের প্রায় ৭০% এলাকা অরণ্যাবৃত। বহির্বিশ্ব থেকে বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ভুটান প্রাণী ও উদ্ভিদের এক অভয়ারণ্য। এখানে বহু হাজার দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। ভুটানের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা গুলট্রাম এবং এর বিনিময় হার ভারতীয় রুপীর সাথে সম্পর্কিত। ভুটানের সাক্ষরতার হার প্রায় ৬০%। জনগণের প্রায় ৯৪% শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত।

জংখা ভাষা বা ভুটানি ভাষা ভুটানের সরকারি ভাষা।  হিন্দি এবং ইংরেজি  ভাষাতেও তাদের দক্ষতা রয়েছে।




#Article 63: বলিভিয়া (458 words)


বলিভিয়া (স্পেনীয়: Bolivia বোলিব‌্‌য়া, কেচুয়া: Bulibya বুলিব্‌য়্যা, আইমারা: Wuliwya উলিউয়া) দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যভাগের একটি দেশ। আন্দেস পর্বতমালায় অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে দেশটিকে পৃথিবীর ছাদ নামেও অনেক সময় ডাকা হয়। বলিভিয়াতে আছে বরফাবৃত বহু পর্বতশৃঙ্গ, আর দেশটির উন্মুক্ত মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে যায় দুরন্ত হাওয়া। পর্বতমালার পূর্বে রয়েছে সবুজ তৃণভূমি এবং তারও নিম্নে আছে ক্রান্তীয় বনাঞ্চল। 
সরকারীভাবে বলিভিয়ার রাজধানীর নাম সুক্রে। তবে লা পাজ দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী ও সরকারের প্রধান কর্মস্থল। ৩,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লা পাজ বিশ্বের উচ্চতম রাজধানী।

বলিভিয়া দক্ষিণ আমেরিকার দরিদ্রতম দেশগুলির একটি। দেশের অধিকাংশ লোক আদিবাসী আমেরিকান। কিন্তু একটি ক্ষুদ্র স্পেনীয়ভাষী অভিজাত শ্রেণী ঐতিহ্যগতভাবে দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে এবং দেশের বেশির ভাগ সম্পদ এদের হাতে কুক্ষিগত। প্রথমে আন্দেস পর্বতমালায় প্রাপ্ত খনিজ ছিল এই সম্পদের উৎস। ১৯৯০-এর দশকে শেষের দিকে এসে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বলিভিয়ার প্রধান খনিজ সম্পদ। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে দেশটি কোকেনের উপকরণ কোকা পাতাও রপ্তানি শুরু করে।

বলিভিয়ার বেশির ভাগ লোক আন্দেস পর্বতমালার দুইটি পর্বতশ্রেণীর মাঝখানে অবস্থিত একটি মালভূমিতে বাস করেন। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে আন্দেস পর্বতমালা অবস্থিত। তবে ১৯৫০-এর দশক থেকে পূর্বের নিচু সমভূমিগুলিতে ধীরে ধীরে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ গড়ে উঠেছে। বিশেষত ঐ এলাকায় খনিজ তেল ও গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হবার পর এটি ঘটেছে। এছাড়াও দেশটির উর্বর খামারভূমিগুলি বসতির জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুতে এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা লা পাজকে ছাড়িয়ে বলিভিয়ার বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়।

১৬শ শতক থেকে ১৯শ শতকের শুরু পর্যন্ত বলিভিয়া স্পেনের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৮২৫ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫২ সালে এখানে একটি রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিপ্লবী নেতারা আদিবাসী আমেরিকানদের অধিকতর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সুবিধা প্রদানের প্রকল্প গ্রহণ করেন। সরকার তাদের ভোট দেবার সুযোগ দেন, এবং পল্লী এলাকাগুলিতে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। বড় বড় জমিদারীগুলি ভেঙে দেয়া হয় এবং আদিবাসী আমেরিকান চাষীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমি দেওয়া হয়। তবে এই সংস্কারগুলি বলিভিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। পরবর্তী সরকারগুলি অর্থনীতির বড় অংশ বেসরকারীকরণের চেষ্টা করলেও এখনও বলিভিয়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র।

বলিভিয়া মোট ৯টি ডিপার্মেন্টে (departamentos) বিভক্ত। এর রাজধানীগুলোকে বন্ধনীর মধ্যে দেখানো হয়েছে:

বলিভিয়ার এলাকার ক্ষেত্রফল ১,০৯৮,৫৮০ বর্গকিলোমিটার। এলাকার দিক থেকে এটি পৃথিবীতে ২৮তম। CIA World Factbook. Retrieved from 

১৮৭৯ হতে বলিভিয়া একটি ভূবেষ্টিত (land-locked) দেশ। ঐ বছর চিলির সাথে প্রশান্ত মহাসাগরের যুদ্ধে বলিভিয়া উপকূলবর্তী আন্তোফাগাস্তা এলাকাটির দখল হারায়। তবে প্যারাগুয়ে নদীর মাধ্যমে বলিভিয়া অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত।

বলিভিয়ার পরিবেশে ব্যাপক বৈচিত্র রয়েছে। পশ্চিমের পাহাড়ী এলাকা আন্দেজ পর্বতমালায় অবস্থিত। এখানে বলিভীয় আলতিপ্লানো এলাকা রয়েছে। পূর্বের সমতলভূমিতে আমাজন বনাঞ্চল এর চিরহরিৎ (??) বৃক্ষরাজি রয়েছে। বলিভিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশিখর হলো নেভাদো সাজামা যার উচ্চতা ৬৫৪২ মিটার। টিটিকাকা হ্রদ বলিভিয়া ও পেরুর সীমান্তে অবস্থিত। পৃথিবীর বৃহত্তম লবনাক্ত ভূমি সালার দি উইয়ুনি বলিভ্যার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ অবস্থিত।

বলিভিয়ার বৃহৎ শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে লা পাজ, এল্‌ অল্টো, সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা, এবং কোচাবাম্বা।

মাথাপিছু আয়া ৪,৪৪৪ মা,ডলার

বলিভিয়ার মোট জনসংখ্যা

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৬%




#Article 64: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (414 words)


বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (বসনীয় ও ক্রোয়েশীয় ভাষায়: Bosna i Hercegovina, সার্বীয় ভাষায়: Босна и Херцеговина বস্‌না ই খ়ের্ত্‌সেগভ়িনা) ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। অতীতে এটি যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ ছিল। ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। এর পরপরই বসনীয় মুসলমান, ক্রোয়েশীয় ও সার্বীয় জাতির লোকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৫ সালে যুদ্ধ শেষে সার্বীয়রা দেশের ৪৯% এলাকা দখলে সক্ষম হয় এবং এর নাম দেয় সার্ব প্রজাতন্ত্র। বসনীয় ও ক্রোয়েশীয়রা দেশের বাকী অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় যার নাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফেডারেশন। এই ফেডারেশন ও সার্ব প্রজাতন্ত্র একত্রে বর্তমানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রাষ্ট্র নামে পরিচিত। তবে বাস্তবে দেশটির বসনীয়, ক্রোয়েশীয় ও সার্বীয় জাতির লোকদের মধ্যে প্রবল বিভাজন ও বিদ্বেষ বর্তমান, যদিও এটি নিরসনের জন্য বহুবার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে।

১৪শ শতকে রাজপুত্র শাসিত বসনিয়া দক্ষিণের ডিউক শাসিত হার্জেগোভিনার সাথে মিলে একটি ক্ষণস্থায়ী মধ্যযুগীয় রাজ্য গঠন করেছিল। তারপর ১৫ শতকে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ এই বস্নিয়া কে ও
উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তারপর উনিশ শতকের শেষদিকে রাশিয়ার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ফলে দেশটি উসমানীয় সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অস্ট্রিয়হাঙ্গেরি রাজ্যের অধীনে চলে যায় তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল বিংশ শতাব্দীর শেষে তার স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমান বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রাষ্ট্রটিও অনুরূপ উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে বিভক্ত। দেশটির উত্তরে ও পশ্চিমে ক্রোয়েশিয়া এবং দক্ষিণে ও পূর্বে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো প্রজাতন্ত্র। আড্রিয়াটিক সাগরে ক্রোয়েশিয়ার মাঝ দিয়ে বসনিয়ার প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখা আছে।

সারায়েভো বসনিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

বসনিয়ার প্রথম সংরক্ষিত সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত উল্লেখ হ'ল De Administrando Imperio তে, যা দশম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন সপ্তম (৯৪৮থেকে ৯৫২এর মধ্যে) রচিত একটি পলিটিকো-ভৌগলিক বই যাতে বোসোনা (Βοσώνα) এর ছোট জমি (গ্রীক ভাষায় χωρίον) উল্লেখ পাওয়া যায়।

যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সার্বরা ১৯৯৫ সালের জুন মাসে সেব্রেনিচা শহরটি দখল করে নেয়। জাতিসংঘের ৮১৯ নম্বর প্রস্তাবে অনুযায়ী সেব্রেনিচা শহরটি নিরাপদ অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

কিন্তু সার্বরা জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের কোনো বাধা ছাড়াই শহরটি দখল করে সেখানে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যা করে এবং হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করে। রাতকো মিলাদিচের নেতৃত্বাধীন বর্বর সার্ব বাহিনী এই গণহত্যা চালায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান। ডাচ শান্তিরক্ষীদের নিস্ক্রিয়তার মুখে ও গ্রিক সেচ্ছাসেবী বাহিনীর সহায়তায় সার্বরা এই গণহত্যা চালায়। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর হাতে এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হন শিশুসহ ৮,৩৭২ জন।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। সরকারপ্রধান হলেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মন্ত্রিপরিষদ। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা হতে স্বাধীন।




#Article 65: ব্রাজিল (3699 words)


সংযুক্ত প্রজাতন্ত্রী ব্রাজিল (,  বা হেপুব্লিকা ফ়েদেরাচিভ়া দু ব্রাজ়িউ ), যা প্রচলিতভাবে ব্রাজিল (,  বা ব্রাজিউ) নামে পরিচিত, হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র। এছাড়াও জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। ৮,৫১৪,৮৭৭ বর্গকিলোমিটার (৫,২৯০,৮৯৯ বর্গমাইল) আয়তনের এই দেশটিতে বসবাসকৃত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি। এটি আমেরিকার একমাত্র পর্তুগিজভাষী দেশ, এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ পর্তুগিজভাষী রাষ্ট্র।

ব্রাজিলে পূর্বভাগ আটলান্টিক মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত। যার উপকূলীয়ভাগের দৈর্ঘ্য প্রায় । ব্রাজিলের উত্তরে রয়েছে ভেনেজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ও ফ্রান্সের সামুদ্রিক দেপার্ত্যমঁ ফরাসি গায়ানা। এছাড়াও এর উত্তর-পশ্চিমভাগে কলম্বিয়া; পশ্চিমে বলিভিয়া ও পেরু; দক্ষিণ-পশ্চিমে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে, এবং সর্ব-দক্ষিণে দক্ষিণে উরুগুয়ে অবস্থিত। ব্রাজিলীয় সীমানায় আটলান্টিক মহাসাগরের বেশকিছু দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত, যার মধ্যে রয়েছে ফের্নান্দু জি নরোনিঁয়া, রোকাস অ্যাটল, সেন্ট পিটার ও সেন্ট পল রকস, এবং ত্রিনিদাজি এ মার্চিঁ ভাজ। ব্রাজিলের সাথে চিলি ও ইকুয়েডর ব্যতীত দক্ষিণ আমেরিকার সকল দেশেরই সীমান্ত-সংযোগ রয়েছে।

১৫০০ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী পেদ্রু আলভারেজ কাবরাউয়ের ব্রাজিলে এসে পৌঁছানোর পর থেকে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রাজিল ছিলো একটি পর্তুগিজ উপনিবেশ। ১৮১৫ সালে এটি যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল, ও আলগ্রেভিজের সাথে একত্রিত হয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গঠন করে। মূলত ১৮০৮ সালেই ব্রাজিলের ‘পর্তুগিজ উপনিবেশ’ পরিচয়ে ফাটল ধরে, কারণ নেপোলিয়নের পর্তুগাল আক্রমণের রেশ ধরে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র লিসবন থেকে ব্রাজিলের রিও দি জানেইরুতে সরিয়ে নওয়া হয়। ১৮২২ সালে ব্রাজিল, পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। প্রাথমিক ভাগে এটি ব্রাজিলীয় সাম্রাজ্য হিসেবে সার্বভৌমত্ব অর্জন করলেও ১৮৮৯ সাল থেকে এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে শাসিত হয়ে আসছে। ১৮২৪ সালে ব্রাজিলের প্রথম সংবিধান পাশ হওয়ার পর থেকে দেশটিতে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সরকার ব্যবস্থা চলে আসছে, যা বর্তমানে কংগ্রেস নামে পরিচিত। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ব্রাজিল একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র। একটি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট, ২৬টি প্রদেশ, ও ৫,৫৬৪টি মিউনিসিপ্যালিটি নিয়ে এর যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়েছে।

ক্রয়ক্ষমতা সমতা ও মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ভিত্তিতে ব্রাজিলের অর্থনীতি বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম অর্থনীতি। ব্রাজিলের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। এর অর্থনৈতিক সংস্কার আন্তর্জাতিক বিশ্বে দেশটিকে একটি নতুন পরিচিতি দিয়েছে। ব্রাজিল জাতিসংঘ, জি-২০, সিপিএলপি, লাতিন ইউনিয়ন, অর্গানাইজেশন অফ ইবেরো-আমেরিকান স্টেটস, মার্কুসাউ ও ইউনিয়ন অফ সাউথ আমেরিকান নেশন্স, এবং ব্রিক দেশগুলোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ব্রাজিল জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি দেশ হিসেবে বিবেচিত। ব্রাজিলে বিভিন্ন প্রকারের প্রকৃতি সংরক্ষণকেন্দ্র ও অভয়ারণ্য বিদ্যমান। এছাড়াও দেশটি সমৃদ্ধ খনিজসম্পদের অধিকারী, যা বিভিন্ন সময়ে এর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

ব্রাজিলে বিভিন্ন জাতের লোকের বাস। আদিবাসী আমেরিকান, পর্তুগিজ বসতিস্থাপক এবং আফ্রিকান দাসদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ব্রাজিলের জাতিসত্তাকে দিয়েছে বহুমুখী রূপ। ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র পর্তুগিজ উপনিবেশ। ১৬শ শতকে পর্তুগিজদের আগমনের আগে বহু আদিবাসী আমেরিকান দেশটির সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে পর্তুগিজেরা কৃষিকাজের জন্য আফ্রিকা থেকে দাস নিয়ে আসা শুরু করে। এই তিন জাতির লোকেদের মিশ্রণ ব্রাজিলের সংস্কৃতি, বিশেষ করে এর স্থাপত্য ও সঙ্গীতে এমন এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য এনেছে কেবল ব্রাজিলেই যার দেখা মেলে। ১৯শ শতকের শেষ দিকে ও ২০শ শতকের গোড়ার দিকে ব্রাজিলে আগমনকারী অন্যান্য ইতালীয়, জার্মান, স্পেনীয়, আরব, ও জাপানি অভিবাসীরাও ব্রাজিলের সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। মিশ্র সংস্কৃতির দেশ হলেও কিছু কিছু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্রাজিলীয়, ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আগত অ-পর্তুগিজ অভিবাসী, এবং আদিবাসী আমেরিকানদের অংশবিশেষ এখনও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রীতিনীতি ধরে রেখেছে। তবে পর্তুগিজ সংস্কৃতির প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। পর্তুগিজ এখানকার প্রধান ভাষা এবং রোমান ক্যাথলিক প্রধান ধর্ম।

ব্রাজিল নামটির বুৎপত্তি পরিষ্কার নয়। ঐতিহ্যগতভাবে ধারণা করা হয় ‘ব্রাজিল’ নামটি এসেছে ব্রাজিলউড থেকে, যা এক প্রকার কাঠ উৎপাদনকারী গাছ। ১৬ শতকের দিকে ব্রাজিল থেকে নাবিকরা ইউরোপে এই কাঠ রপ্তানি করতো। পর্তুগিজ ভাষায় ব্রাজিলউডকে ‘পাউ-ব্রাজিউ’ (pau-brasil) নামে ডাকা হয়, আর ‘ব্রাজিউ’ শব্দটির বুৎপত্তি হয়েছে ‘জলন্ত কয়লার মতো লাল’ শব্দগুচ্ছ থাকে। লাতিন ভাষায় ‘ব্রাজা’ (brasa) শব্দের অর্থ কয়লা এবং শেষের ‘-il’ উপসর্গটি লাতিন ‘-iculum’ বা ‘-ilium’ থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে পর্তুগিজ ‘ব্রাজিউ’ শব্দটি থেকে ইংরেজিতে ব্রাজিল নামটি এসেছে। বুৎপত্তির এই তত্ত্বটি ব্রাজিল ও পর্তুগালের স্কুলগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ানো হয়।

ব্রাজিলীয় পণ্ডিত জুসে আদেলিনু দা সিলভা আজেভেদুর স্বীকার্য অনুসারে ‘ব্রাজিল’ শব্দটির বুৎপত্তিস্থল আরও অনেক পুরোনো এবং এর উৎপত্তি হয়েছে মূলত কেল্টিক বা ফিনিসিয়ীয় থেকে। ফিনিসিয়ীরা কেল্টিক দ্বীপগুলোর খনি থেক প্রাপ্ত এক প্রকার খনিজ দ্রব্য থেকে উৎপন্ন লাল রঞ্জন ইবেরিয়া থেকে আয়ারল্যান্ডে রপ্তানি করতো। আয়ারল্যান্ডীয় পুরাণে হাই-ব্রাজিল নামে পশ্চিমে অবস্থিত একটি দ্বীপের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। টলকিনসহ কারও কারও মতে এই দ্বীপটির নাম থেকেই ‘ব্রাজিল’ শব্দটির উৎপত্তি। ষোড়শ শতকে বিভিন্ন পণ্ডিতগণও এই তত্ত্বটিকে সমর্থন করেছেন।

দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী ভাষা গুয়ারানিতে ব্রাজিলকে ‘পিন্দুরামা’ নামে ডাকা হয়। অতীতে ব্রাজিল অঞ্চলটি আদিবাসীদের কাছে এই নামেই পরিচিত হতো। পিন্দুরামা শব্দের অর্থ ‘তাল গাছের ভূমি’।

১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে পর্তুগিজ অভিযাত্রী পেদ্রু আলভারেজ কাবরাউ পরিচালিত একটি পর্তুগিজ নৌবহর বর্তমানের ব্রাজিলে এসে পৌঁছায় এবং পর্তুগালের রাজা প্রথম মানুয়েলের নামে ভূখণ্ডটিতে পর্তুগালের অধিকার দাবি করে। সে সময় পর্তুগিজরা ব্রাজিলে বসবাসরত প্রস্তর যুগের আদিবাসীদের সাথে পরিচিত হয়। এসকল আদিবাসীদের বেশিরভাগ-ই কথা বলতো তুপি-গুয়ারানি পরিবারের বিভিন্ন ভাষায়, এবং আদিবাসী গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল।

১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলে প্রথম পর্তুগিজ উপনিবেশটি গোড়াপত্তন হয়। তবে ১৫৩৪ সালে ডম তৃতীয় জোয়াউঁ কর্তৃক সমগ্র অঞ্চলটি ১২টি পৃথক বংশানুক্রমিক নেতৃত্বে ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যকরভাবে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রথাটি সমস্যাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়, এবং ১৫৪৯ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগালের রাজা পুরো উপনিবেশ প্রশাসনের জন্য একজন গভর্নর-জেনারেল নিয়োগ দেন। পর্তুগিজরা কিছু আদিবাসী গোত্রকে নিজেদের দলে নেয়। অপরদিকে বাকিদেরকে তঁরা দাস হিসেবে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। এছাড়াও কিছু কিছু গোত্রকে দীর্ঘ যুদ্ধে হারিয়ে ও রোগ বিস্তারের মাধ্যমে নিঃশেষ করে দেয়। ইউরোপীয় রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় সেসকল আদিবাসীদের জানা ছিল না, তাই খুব সহজেই তারা রোগাক্রান্ত হয়। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে ঔপনিবেশিকেরা উত্তর-পূর্ব উপকূলের ভালো মাটি ও ক্রান্তীয় জলবায়ুর সুযোগ নিয়ে সেখানে চিনির প্ল্যান্টেশন স্থাপন করে। সে সময় চিনি ছিল ব্রাজিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। আন্তজার্তিক বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্তুগিজরা আফ্রিকান দাসদেরও ব্রাজিলে নিয়ে আসা শুরু করে।

 ফরাসিদের সাথে যুদ্ধের মাধ্যমে পর্তুগিজরা তাদের দখলকৃত ভূখণ্ড ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত করতে থাকে। ১৯৫৭ সালে তারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত রিউ দি জানেইরু ও ১৬১৫ সালে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সাউঁ লুইসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তারা আমাজন অরণ্য অভিমূখে অভিযান শুরু করে ও ঐ অঞ্চলে অবস্থিত ব্রিটিশ ও ওলন্দাজ উপনিবেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। নিয়ন্ত্রণ লাভের পর পর্তুগিজরা অঞ্চলগুলোতে নিজেদের গ্রাম ও দুর্গ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকে আরও সুসংহত করে। ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে তাদের এ অভিযান সর্ব দক্ষিণে বিস্তৃত হয়। সেখানে রিও দে লা প্লাতা নদীর তীরে তারা সাক্রামেন্তো শহরের গোড়াপত্তন করে, বর্তমানে যা উরুগুয়ের অংশ।

১৭ শতকের শেষভাগে ব্রাজিলের চিনি রপ্তানির পরিমাণ কমতে থাকে, তবে ১৬৯০-এর দশকে ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে বেশ কিছু স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হয়। পর্তুগিজ ভাষায় বান্দিরাঞ্চিস (Bandeirantes) নামে পরিচিত এই পর্তুগিজ স্কাউটরা বর্তমান ব্রাজিলের মাতু গ্রসো ও গোইয়াস অঞ্চলে স্বর্ণখনির সন্ধান পান। তৎকালীন সময়ে জায়গাটির নামকরণ করা হয় মিনাজ জেরাইস (বাংলা অর্থ ‘সাধারণ খনি’), যা বর্তমানে ব্রাজিলের একটি প্রদেশ। স্বর্ণখনি আবিস্কারের ফলে চিনি রপ্তানি কমে যাওয়া থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে পর্তুগিজ উপনিবেশ রক্ষা পায়। এছাড়াও স্বর্ণখনিতে কাজের উদ্দেশ্যে সমগ্র ব্রাজিলসহ পর্তুগাল থেকে হাজার হাজার অভিবাসী এ অঞ্চলে পাড়ি জমায়। এই সময় দেশের অভ্যন্তরভাগে বসতি স্থাপিত হয় এবং অর্থনীতি ও জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্র দেশের উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অংশে স্থানান্তরিত হয়।

স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসকগণ এ অঞ্চলে পর্তুগিজ উপনিবেশের সম্প্রসারণে বাঁধা প্রদান করে আসছিল। ১৪৯৪ সালে স্পেন অধিকৃত ভূখণ্ডে পর্তুগিজদের উপনিবেশ সম্প্রসারণ রোধে উভয়পক্ষের মধ্যে তোর্দিজিলাস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭৭ সালে স্পেনীয়রা পর্তুগিজ অধিকৃত বান্দা ওরিয়েন্টাল নিজেদের দখলে আনতে সমর্থ হয়। যদিও পরবর্তীকালে এ বিজয় নিষ্ফল বলে প্রতীয়মান হয়, কারণ ঐ বছরেই পর্তুগিজ ও স্পেনীয় সাম্রাজ্যের ভেতর প্রথম সান লিদিফোনসো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুসারে এ অঞ্চলের পর্তুগিজদের সম্প্রসারিত সকল অঞ্চলে পর্তুগালের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয়। বর্তমান ব্রাজিলের সীমানাও মূলত এই সম্প্রসারিত ভূখণ্ডের সীমানার প্রতি লক্ষ্য রেখেই নির্ধারিত হয়েছে।

১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ রাজ পরিবার, পর্তুগালে অনুপ্রবেশকৃত নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীকে তাড়ানোর চেষ্টা করছিল। সে সময় নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী পর্তুগালসহ মধ্য ইউরোপের বেশিরভাগ স্থানেই নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিল। প্রতিকুল পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে রাজ পরিবার নিজেদেরকে ব্রাজিলের রিউ দি জানেইরুতে সরিয়ে নেয়। ফলশ্রুতিতে এটি সম্পূর্ণ পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮১৫ সালে ডম ষষ্ঠ জোয়াউঁ, তার অকর্মক্ষম মায়ের পক্ষে রিজেন্ট হিসেবে ব্রাজিলকে পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে উন্নীত করে পর্তুগালের সাথে একত্রিত একটি সার্বভৌম যুক্তরাজ্যীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম হয় ইউনাইটেড কিংডম অফ পর্তুগাল, ব্রাজিল, অ্যান্ড দি আলগ্রাভিস। ১৮০৯ সালে পর্তুগিজরা ফরাসি গায়ানা দখল করে (যদিও পরবর্তীকালে ১৮১৭ সালে তা ফ্রান্সের কাছে ফিরিয়ে দেয়)। এছাড়ারও ১৮১৬ সালে ইস্টার্ন স্ট্রিপও তারা নিজেদের দখলে নেয়, ও কিসপ্লাতিনা নামে নামকরণ করে। কিন্তু ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিল এ অঞ্চলটির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারায়, এবং অঞ্চলটিতে উরুগুয়ে নামের একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়।

 ১৮২১ সালের ২৬ এপ্রিল রাজা ষষ্ঠ জোয়াউঁ ইউরোপে ফিরে যান, ও যাবার পূর্বে তার বড় ছেলে পেদ্রু জি কান্তারাকে ব্রাজিলের রিজেন্ট হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করেন। পরবর্তীতে পর্তুগিজ সরকার ব্রাজিলকে পুনরায় পর্তুগিজ উপনিবেশে পরিণত করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৮০৮ সাল থেকে চলে আসা অঞ্চলটির নিজেদের অর্জন থেকে বঞ্চিত ব্রাজিলীয়রা পুরনায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা করে। রিজেন্ট পেদ্রু পর্তুগালে ফিরতে অস্বীকৃত জানান ও ব্রাজিলীয়দের দাবির পক্ষে অবস্থান নেন। ১৮২২ সালের ৭ নভেম্বর পেদ্রু আনুষ্ঠানিকভাবে পর্তুগালের কাছে থেকে ব্রাজিলের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একই বছরের ১২ অক্টোবর ডম পেদ্রু ব্রাজিলের প্রথম সম্রাট হিসাবে স্থলাভিষিক্ত হন, এবং ১৮২২ সালের ১ ডিসেম্বর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এর মাধ্যমেই ব্রাজিলে ৩২২ বছর ধরে চলে আসা পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটে।

তৎকালীন সময়ে ব্রাজিলীয়রা রাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, এবং গণতন্ত্র ততোটা জনপ্রিয় ছিল না। স্বাধীনতার ঘোষণার ফলস্বরূপ ব্রাজিলের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, যা ব্রাজিলের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, ও দক্ষিণাঞ্চলসহ পর্তুগিজ অধিকৃত প্রায় সম্পূর্ণ অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়েছিল। অবেশেষে ১৮২৪ সালের ৮ মার্চ পর্তুগিজ সৈন্যরা ব্রাজিলীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করে, এবং ১৮২৫ সালের ২৯ আগস্ট পর্তুগাল ব্রাজিলের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়।

১৮২৪ সালের ১৫ মার্চ ব্রাজিলের প্রথম সংবিধানটি জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করার পূর্বে এটি মিউনিসিপ্যালিটি কাউন্সিলগুলোর অনুমোদন লাভ করে। ১৮৩১ সালের ১ এপ্রিল প্রথম পেদ্রু সিংহাসন ছেড়ে দেন ও তার কন্যার রাজত্ব পুনরায় দাবি করার উদ্দেশ্যে পর্তুগালে পাড়ি জমান। যাবার পূর্বে তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে নির্বাচিত করে যান, যিনি পরবর্তীতে ডম দ্বিতীয় পেদ্রু নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন। যেহেতু নতুন সম্রাটের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সাবালকত্ব অর্জনের জন্য সময়ের প্রয়োজন ছিল, তাই এ সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্দেশ্যে রিজেন্সি পদ্ধতি চালু করা হয় ও সম্রাটের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রিজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়।

রিজেন্সি চালুর পর ব্রাজিলের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্রোহে রূপ নেয়। এটি রিজেন্সি ব্যবস্থাটিকে বেশ অস্থিতিশীল করে তোলে ও রিজেন্টদের শাসনে ব্রাজিল প্রায় অরাজক একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বিদ্রোহের ফলস্বরূপ কিছু কিছু প্রদেশ ব্রাজিল থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গঠন করে, যদিও এসকল গোষ্ঠীর বিদ্রোহটি সত্যিকার অর্থে রাজতন্ত্রের বিপক্ষে ছিল না। তবে এসব কিছুই বলবৎ ছিল যতোদিন দ্বিতীয় পেদ্রু নিজে রাষ্ট্রভার গ্রহণে অসমর্থ ছিলেন। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় পেদ্রুর আইনগত সাবালকত্ব অর্জনের বয়স কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়, এবং তিনি শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৪ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি এক টানা ৫৮ বছর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার রাজত্বকালে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকার পাশাপাশি ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নও সাধিত হয়।

 দ্বিতীয় পেদ্রুর ৫৮ বছরের শাসনামলে ব্রাজিল তিনটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধে জয়লাভ করে। যুদ্ধগুলো ছিল প্লেটাইন যুদ্ধ, উরুগুয়েইয়ান যুদ্ধ, এবং ওয়ার অফ ট্রিপল অ্যালায়েন্স। এছাড়াও পেদ্রুর শাসনামলেই ব্রাজিল রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হয়। মূলত সফল নির্বাচন ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ফলেই এ অর্জন সম্ভব হয়। এই ৫৮ বছরের শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনটি ছিল দাস প্রথার বিলোপ সাধন। ১৮৫০ সালে আন্তর্জাতিকভাবে দাস পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। এর পরেই ব্রাজিল ধীরে ধীরে দাস প্রথা বিলোপের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, ও শেষ পর্যন্ত ১৮৮৮ সালে সম্পূর্ণরূপে দাস প্রথার বিলোপ সাধিত হয়। অবশ্য স্বাধীনতার পর থেকেই ব্রাজিলে দাসদের সংখ্যা ধীরে কমতে শুরু করেছিল। ১৮২৩ সালে মোট জনগণের ২৩% ছিল দাস, আর ১৮৮৭ সালে এই হার নেমে আসে মাত্র ৫%-এ।

১৮৮৯ সালে রাজতন্ত্রের অবলোপনের পর সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে কেউ ততোটা আগ্রহী ছিল না। দ্বিতীয় পেদ্রু তখনও জনসাধারণের মাঝে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু তার নিজের ইচ্ছাতেই রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে। তার দুই ছেলের মৃত্যুর পর পেদ্রুর মনে হয়েছিল এই রাজত্ব তার মৃত্যুর সাথেই শেষ হয়ে যাবে। রাজত্ব রক্ষার ব্যাপারে তিনি খুব আগ্রহী ছিলেন না। তাই তিনি নিজে এটি রক্ষার ব্যাপারে কিছু করেন নি ও কাউকে কিছু করতেও দেন নি। দাস প্রথা বিলোপের সময় এর বিরোধীতাকারীরা সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করে যাতে কোনো প্রকার সামরিক ক্যু ঘটাতে না পার তা ঠেকাতেই মূলত তিনি গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হন।

 ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলভাগের সবচেয়ে বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে, সেই সাথে মহাদেশটির সবচেয়ে বেশি অংশটিও এই দেশটির আওতাধীন। ব্রাজিলের দক্ষিণে উরুগুয়ে; দক্ষিণ-পশ্চিমে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে; পশ্চিমে বলিভিয়া ও পেরু; উত্তর-পশ্চিমে কলম্বিয়া; এবং উত্তরে ভেনেজুয়েলা, সুরিনাম, গায়ানা, এবং ফরাসি দেপার্ত্যমঁ ফরাসি গায়ানা অবস্থিত। ব্রাজিলের সাথে ইকুয়েডর ও চিলি ব্যতীত দক্ষিণ আমেরিকার সকল দেশের সাথেই সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। ব্রাজিলীয় সীমানায় বেশকিছু দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত, যার মধ্যে রয়েছে ফের্নান্দু জি নরোনিঁয়া, রোকাস অ্যাটল, সেন্ট পিটার ও সেন্ট পল রকস, এবং ত্রিনিদাজি এ মার্চিঁ ভাজ। এর সুবিশাল আকৃতি, জলবায়ু, এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য ব্রাজিলকে ভূ-তাত্ত্বিকভাবে একটি বৈচিত্রময় দেশে পরিণত করেছে। দেশটির আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জগুলো ধরলে ব্রাজিলের সীমানা ২৮° পশ্চিম থেকে ৭৪° পশ্চিম অক্ষরেখা থেকে, ৬° উত্তর থেকে ৩৪° দক্ষিণ দ্রাঘিমা রেখা পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ হিসেবে রাশিয়া, কানাডা, চীন, ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই ব্রাজিলের অবস্থান। কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এটি আমেরিকা মহাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। এর সর্বমোট আয়তন , যার ভেতর জলভাগের আয়তন প্রায় । দেশটিতে মোট তিনটি সময় অঞ্চল অবস্থিত। পশ্চিমের প্রদেশগুলো ইউটিসি-৪, পূর্বের প্রদেশগুলো ইউটিসি-৩ (এটি একই সাথে ব্রাজিলের সরকারি সময়), এবং আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জগুলো ইউটিসি-২ সময় অঞ্চলের অন্তর্গত।

ব্রাজিলে টপোগ্রাফি যথেষ্ট বৈচিত্রময়। দেশটিতে পাহাড়, পর্বত, সমভূমি, উচ্চভূমি, চরণভূমি প্রভৃতি বৈচিত্রের ভূভাগ বিদ্যমান। এর ভূখণ্ডের বেশিরভাগের উচ্চতা  থেকে -এর মধ্যে। দেশটির দক্ষিণ অর্ধাংশেই বেশিরভাগে উচ্চভূমি অবস্থিত। উত্তর-পশ্চিম অংশের সমভূমিগুলো ঢালু ও ভাঙা ভাঙা পাহাড় দিয়ে ঘেরা।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চল বেশ অমসৃণ, এবং বেশিরভাগ অঞ্চলই রিজ ও পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা  পর্যন্ত। এসকল পর্বতমালার মধ্যে রয়েছে মান্তিকিরা, এসপিনাসো পর্বতT এবং সেরা দু মার। উত্তরে গুয়াইয়ানা উচ্চভূমি একটি বড় নিষ্কাশন বিভক্তির মাধ্যমে আমাজন বেসিনের দিকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে ভেনেজুয়েলা থেকে উত্তর দিকের ওরিনোকো নদী ব্যবস্থায় এসে সমাপ্ত হওয়া নদীগুলোকে পৃথক করেছে। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ পর্বত হচ্ছে পিকু দা নেবলিনা যার উচ্চতা প্রায় , এবং সর্বনিম্ন অঞ্চল হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগর।

ব্রাজিলে ঘন ও বেশ জটিল নদী ব্যবস্থা বিদ্যমান, যা বিশ্বের অন্যতম জটিল নদী ব্যবস্থা। ব্রাজিলে মোট আটটি নদী নিষ্কাশন ব্যবস্থা অবস্থিত, যার সবকটি-ই আটলান্টিক মহাসাগরে এসে শেষ হয়েছে। ব্রাজিলের উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে আমাজন, যা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী ও নিষ্কাশিত জলের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী। এছাড়াও আছে পারান ও এর গুরুত্বপূর্ণ শাখানদী ইগুয়াসু (ইগুয়াসু জলপ্রপাত সহ), নিগ্রো, সাউঁ ফ্রান্সিসকু, শিজু, মেদেইরা, ও টাপাজুস নদী।

দেশটির সঙ্গে অন্যান্য দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই দেশের পাসপোর্টে ১১০টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করা যায়, যা পাসপোর্ট শক্তি সূচকে ১২তম স্থানে রয়েছে। 

 আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্রাজিলের অর্থনীতি দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ, বাজার বিনিময়ের ভিত্তিতে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম, ও ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি। ব্রাজিলের অর্থনীতি একটি মিশ্র অর্থনীতি। দেশটির যথেষ্ট পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা এর অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। গড় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, সামনের কয়েক দশকে ব্রাজিলের অর্থনীতি বিশ্বের পাঁচটি বৃহত্তম অর্থনীতির একটি হিসেবে পরিণত হবে। এর বর্তমান গড় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হচ্ছে ১০,২০০ মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ৬৪তম। ব্রাজিলের বৃহৎ ও উন্নত কৃষি, খনিশিল্প, উৎপাদন ব্যবস্থা, এবং সেবাখাত রয়েছে। সেই সাথে দেশটিতে শ্রমিকের প্রাচুর্যও বিদ্যমান।

ব্রাজিলর রপ্তানিখাত অত্যন্তু দ্রুত বিস্তৃত ও বিকশিত হচ্ছে, এবং টাইকুনের একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করছে। ব্রাজিলের মূল রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, গাড়ি, ইথানল, টেক্সটাইল, পাদুকা, লৌহ আকরিক, ইস্পাত, কফি, কমলার রস, সয়াবিন, এবং কর্নড বিফ। দেশটি ক্রমান্বয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ ও পণ্যবাজারে নিজের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করে চলেছে। এছাড়াও ব্রাজিল উত্থানশীল অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলোর সংগঠন ব্রিকের সদস্য।

১৯৯৪ সাল থেকে মুদ্রা হিসেবে ব্রাজিলীয় রিয়াল ব্যবহার করে আসছে। ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশিয়া, ১৯৯৮ সালে রাশিয়া, এবং এর রেশ ধরে বহুস্থানে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মুদ্রা নীতি সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে। বিনিময়ের হারের অব্যাহত দরপতনের ফলে সৃষ্ট মুদ্রা সংকট মোকাবেলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাময়িকভাবে মুদ্রা বিনিময় হার নির্দিষ্ট করে দেয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিল পুনরায় মুক্তবাজার বিনিয়ময় হারে ফিরে যায়।

অর্থনৈতিক জটিলতা কাটিয়ের ওঠার জন্য ব্রাজিল ২০০২-এর মধ্যভাগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৩০.৪ বিলিয়ন ডলারের একটি রেকর্ড পরিমাণ ঋণ সহায়তা লাভ করে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যংক ২০০৫ সালেই আইএমএফ-এই ঋণ পরিশোধ করে। সাম্প্রতিককালে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির যেসকল বিষয় মোকাবেলা করেছে তার মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগের পুজির পরিমাণ আনুমানের চেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট জটিলতা। এর ফলেই ঐ সময়কালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলীয় রিয়ালের দরপতন ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকৃত অর্থ অনুমানের চেয়ে কম হারে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল। ২০০৭ সালে এর আনুমানিক পরিমাণ ছিল ১৯৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদী ঋণে সুদের পরিমাণ মুদ্রানীতির আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে দেশটির মুদ্রস্ফীতির হার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ।

ব্রাজিলে বিস্তুত ও বৈচিত্রময় পরিবহন ব্যবস্থা বিদ্যমান। জনপরিহন ও পণ্যপরিবহনে মূলত সড়ক পথই ব্যবহৃত হয়। ২০০২ সালের হিসাব অনুযায়ী ব্রাজিলের বিদ্যমান সড়ক পথের মোট দৈর্ঘ্য্য ১৯ লক্ষ ৯০ হাজার কিলোমিটার (১২ লক্ষ ৩০ হাজার মাইল)। ১৯৬৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরে দেশটিতে পাকাকৃত সড়কের দৈর্ঘ্য্য ৩৫,৪৯৬ কিলোমিটার (২২,০৫৬ মাইল) থেকে বেড়ে হয়েছে ১,৮৪,১৪০ কিলোমিটার (১,১৪,৪২৫ মাইল)।

সড়ক পথের সম্প্রসারণের দিকে বেশি নজর দেওয়ায় ১৯৪৫ সাল থেকে ধীরে ধীরে ব্রাজিলের রেলপরিবহন ব্যবস্থার পরিধি সংকুচিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশটির রেললাইনের সর্বমোট দৈর্ঘ্য্য ছিলো ৩১,৮৪৮ কিলোমিটার (১৯,৭৮৯ কিলোমিটার), এবং ২০০২ সালে এসে এই দৈর্ঘ্য্য হয় ৩০,৮৭৫ কিলোমিটার (১৯,১৮৬)। রেলওয়ে ব্যবস্থার বেশিরভাগ অংশ সরকারি মালিকানাধীন ফেডারেল রেইলরোড কর্পোরেশনের আয়ত্তাধীন। কিন্তু ১৯৯৭ সালে সরকার ৭টি লাইন বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়। সাঁউ পাইলু মেট্রা ব্রাজিলের প্রথম পাতাল রেল পরিবহন ব্যবস্থা। অন্যান্য পাতাল রেল পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে আছে রিউ দি জানেইরু, পর্তু আলেগ্রে, হেসিফি, বেলু হরাইজন্তে, ব্রাসিলিয়া, তেরেসিনা, ফর্তালিজা, এবং সালভাদোর।

ব্রাজিলে প্রায় ২,৫০০ বিমানবন্দর ও বিমান অবতরণের স্থান রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সাঁউ পাউলু শহরে কাছে অবস্থিত সাঁউ পাউলু-গুয়ারুলহোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্রাজিলের সর্ববৃহৎ ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। দেশটির অভ্যন্তরীন জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক পরিবহনের একটি বড় ও বৈচিত্রময় অংশ এই বিমানবন্দরে সম্পন্ন হয়। এছাড়াও আন্তজার্তিকভাবে এই বিমান বন্দরটি ব্রাজিলকে বিশ্বের সকল বড় শহরগুলোর সাথে যুক্ত করেছে।

উপকূলের পরিবহন সংযোগগুলো দেশটির স্বত্বন্ত্র অংশ। বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ের সান্তোশের বন্দরগুলো মুক্তভাবে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। ব্রাজিলের ৩৬টি গভীর-জল বন্দর রয়েছে যার মধ্যে সান্তোশ, ইতাজাই, রিউ গ্রাঁদ, পারানাগুয়া, রিউ দি জানেইরু, সেপেতিবা, ভিতোরিয়া, সাউপে, মানাউশ, এবং সাঁউ ফ্রান্সিসকো দু সুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৮ সালের গণনা অনুযায়ী ব্রাজিলের জনসংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ২২.৩১ জন, এবং পুরুষ ও নারীর অনুপাত ০.৯৫:১। মোট জনসংখ্যার ৮৩.৭৫% ভাগ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। ব্রাজিলের বেশিরভাগ মানুষ বাস দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব (৭ কোটি ৯৮ লক্ষ) ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (৫ কোটি ৩৫ লক্ষ)। যদিও ভৌগোলিকভাবে দেশটির সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে এর মধ্য-পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চল, যা ব্রাজিলের মোট ভূখণ্ডের ৬৪.১২% ভাগ দখল করে আছে, কিন্তু সে অঞ্চলগুলোতে বসবাসকৃত মানুষের সংখ্যা মাত্র ২ কোটি ৯১ লক্ষ।

মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় ১৯৪০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে ব্রাজিলের জনসংখ্যা বেশ বেড়ে যায়। যদিও এ সময় জন্মহারও সামান্য পরিমাণে হ্রাস পায়। ১৯৪০-এর দশকে দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল ২.৪%। ১৯৫০-এর দশকে এসে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩.০%; ও ১৯৬০-এর দশকে এই হার ছিল ২.৯%। এ বছরগুলোতে মানুষের গড় আয়ু ৪৪ বছর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪ বছরে উন্নীত হয়। ২০০৭ সালে এসে ব্রাজিলের মানুষের গড় আয়ু হয় ৭২.৬ বছর। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে ব্রাজিলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৫০-৫০-এর মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল ৩.০৪%। ২০০৮ সালে এসে এ হার দাঁড়ায় মাত্র ১.০৫%-এ। ধারণা করা হয়, এমনভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ ব্রাজিলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক অঙ্কে পৌঁছাবে, এবং হার হবে -০.২৯%।

ব্রাজিলের ইন্সটিটিউট অফ জিওগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্সের ২০০৮ সালের গণনা অনুসারে মোট জনসংখ্যার ৪৮.৪৩% ভাগ (প্রায় ৯ কোটি ২০ লক্ষ) নিজেদেরকে শেতাঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করেছে; এবং ৪৩.৮০% ভাগ বাদামী (মিশ্র) (প্রায় ৮ কোটি ৩০ লক্ষ), ৬.৮৪% কৃষ্ণাঙ্গ (১ কোটি ৩০ লক্ষ), ০.৫৮% এশীয় (১১ লক্ষ), এবং ০.২৮% নিজেদের আমেরিন্ডিয়ান (৫ লক্ষ ৩৬ হাজার) হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। অপরদিকে ০.০৭% (প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার) মানুষ নিজেদের বর্ণ পরিচয় দেয়নি।

২০০৭ সালে জাতীয় ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে ব্রাজিলে ৬৭টি ভিন্ন উপজাতীয় গোত্রের অবস্থান উল্লেখ করা হয়, যাঁদের সাথে কোনো রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ নেই। ২০০৪ সালে যোগাযোগহীন এসকল গোত্রের সংখ্যা ছিল ৪০। ব্রাজিলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অযোগাযোগকৃত মানুষের বাস করে বলে ধারণা করা হয়।

ব্রাজিলের বেশিরভাগ মানুষ দেশটির আদিবাসী জনগণ, পর্তুগিজ উপনিবেশক, এবং আফ্রিকান দাসদের বংশদ্ভূত। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের আগমনের পর থেকে এই তিন জাতির মাঝে বৈবাহিক সম্পর্কের সৃষ্টি হতে থাকে, যা ব্রাজিলকে একটি বৈচিত্রময় জাতিসত্ত্বা উপহার দিয়েছে। ব্রাজিলের বাদামী বর্ণের জনগোষ্ঠীর (পর্তুগিজ ভাষায় এদেরকে ‘প্রাদু’ (prado) নামে সম্বোধন করা হয়) বিভিন্ন ভাগের সৃষ্টি হয়েছে। এই ভাগ গুলোর মধ্যে আছে শেতাঙ্গ ও ইন্ডিয়ান বংশদ্ভূত ‘কাবোক্লু’ (Caboclo), শেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বংশদ্ভূত ‘মুলাতু’ (Mulatto), এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও ইন্ডিয়ান বংশদ্ভূত ‘কাফুজু’ (Cafuzo)। বেশিরভাগ কাবোক্লু জনগণ দেশটির উত্তর, উত্তর-পূর্ব, এবং মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে। গরিষ্ঠ সংখ্যাক মুলাতু জনগণ বাস করে বায়া ও থেকে পারাইবা পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঘেঁষে চলে আসা পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল, উত্তর মারানাউঁ, দক্ষিণ মিনাস জেরাইস এবং পূর্ব রিউ দি জানেইরু অঞ্চলে। ১৯শ শতক থেকে অভিবাসীদের জন্য ব্রাজিলের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে ১৮০৮ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ব্রাজিলে বিশ্বের ৬০টি দেশ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের আগমন ঘটে। এসকল অভিবাসীর বেশিরভাগই এসেছিল পর্তুগাল, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, জাপান, এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে।

২০০৮ সালে ব্রাজিলে সার্বিক নিরক্ষরতার হার ছিল ১১.৪৮%, এবং তরুণদের ভেতর (বয়স ১৫–১৯) এই হার ছিল ১.৭৪%। এই হার সবচেয়ে বেশি ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (২০.৩০%), যেখানে বেশ বড় সংখ্যক গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস। গড় হিসাবে নিরক্ষতার হার গ্রামীণ জনগণের মাছে বেশি (২৪.১৮%) ও শহুরে জনগোষ্ঠীর মাঝে কম (৯.০৫%)।

 তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পতুগিজ ঔপনিবেশকদের শাসনের ফলে, ব্রাজিলের সংস্কৃতির মূল অংশটি এসেছে পর্তুগালের সংস্কৃতি থেকে। পর্তুগিজরা ব্রাজিলের সংস্কৃতির যেসকল স্থানে প্রভাব ফেলেছে তার মধ্যে আছে পর্তুগিজ ভাষা, ক্যাথলিক ধর্ম, এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশিল্প। এছাড়াও ব্রাজিলের সংস্কৃতি আফ্রিকান, ও আদিবাসী ইন্ডিয়ানের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য দ্বারাও বেশ প্রভাবান্বিত হয়েছে। এছাড়া ব্রাজিলে অভিবাসী হিসেবে আসা ইতালীয়, জার্মান, ও অন্যান্য ইউরোপীয় অভিবাসীদের সংস্কৃতিও ব্রাজিলীয় সংস্কৃতিতে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে। ১৮-১৯শত শতকের দিকে দলে দলে আসা এ সকল অভিবাসীরা ব্রাজিলের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বসবাস করা শুরু করেছিল, এবং বর্তমানেও ঐ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে সামগ্রিকভাবে আদিবাসী আমেরিন্ডিয়ানরা ব্রাজিলের ভাষা ও রন্ধনশিল্পে প্রভাব ফেলেছে; অপরদিকে আফ্রিকানরা প্রভাব ফেলেছে ব্রাজিলের রন্ধনশৈলী, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, ও ধর্মে।

১৬শ শতকের পর থেকে ব্রাজিলীয় চিত্রকলা বিভিন্ন ধারায় বিস্তৃত হতে থাকে। পূর্বে ব্রাজিলের চিত্রকলায় বারুকি ধারার প্রভাব ছিল খুব বেশি, কিন্তু ১৬শ শতকের পর বারুকি থেকে তা রোমান্টিকতা, আধুনিকতা, অভিব্যক্তিবাদ, কিউবিজম, পরাবাস্তবাদ, বিমূর্তবাদ প্রভৃতি দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তন হয় ১৯শ শতকের শেষ দিকে। অনেক অভ্যন্তরীণ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলের চলচ্চিত্র দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে।

ব্রাজিলীয় সাহিত্য বিশ্বে অন্যতম আলোড়ন তোলা সাহিত্য।ব্রাজিলের লেখক পাওলো কোয়েলহো বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত লেখক।এছাড়া মাচাদো দ্যে অ্যাসিস ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা লেখক হিসেবে সুপরিচিত।

ফুটবল খেলাই ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া হিসেবে পরিচিত। ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল ফিফা বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় দল হিসেবে চিহ্নিত। দলটি এ পর্যন্ত পাঁচবার বিশ্বকাপ জয়লাভ করেছে যা একটি রেকর্ড।

ভলিবল, বাস্কেটবল, অটো রেসিং এবং মার্শাল আর্ট ক্রীড়াও ব্যাপকভাবে দর্শকপ্রিয়। ব্রাজিলের পুরুষ জাতীয় ভলিবল দলটি ওয়ার্ল্ড লীগ, বিশ্ব ভলিবল গ্রাঁ চ্যাম্পিয়ন্স কাপ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ এবং বিশ্বকাপের বর্তমানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল।
ব্রাজিলের অন্যান্য খেলার মধ্যে রয়েছে - টেনিস, হ্যান্ডবল, সুইমিং এবং জিমন্যাসটিক্‌স যা গত কয়েক দশক ধরে চর্চা হচ্ছে। ব্রাজিলে বেশকিছু ক্রীড়ার উদ্ভব ঘটেছে। তন্মধ্যে - বীচ ভলিবল, ফুটসাল এবং ফুটভলি অন্যতম। মার্শাল আর্টে ক্যাপোইরা, ভ্যালে টুডো এবং ব্রাজিলিয়ান জি-জিতসু ক্রীড়ার প্রচলন ঘটিয়েছে। অটো রেসিংয়ে এ পর্যন্ত তিনজন ব্রাজিলীয় ড্রাইভার ফর্মুলা ওয়ানে আটবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেছে।




#Article 66: ব্রুনাই (353 words)


ব্রুনাই (মালয় ভাষায়: Negara Brunei Darussalam) দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। এটি একটি রাজতান্ত্রিক ইসলামী দেশ। দেশটি বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে অবস্থিত। এর উত্তরে দক্ষিণ চীন সাগর, এবং বাকী সব দিকে মালয়শিয়া। ব্রুনাই তেল সম্পদে সমৃদ্ধ একটি ধনী রাষ্ট্র। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এটি এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ হিসেবে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৪ সালে এসে দেশটি স্বাধীন হয়।

ব্রুনাই দুইটি আলাদা এলাকা নিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে পশ্চিমেরটি বৃহত্তর। দুই এলাকাতেই সমুদ্র বন্দর আছে। তবে দুইটিকেই মালয়শিয়ার সারাওয়াক প্রদেশ ঘিরে রেখেছে। বন্দর সেরি বেগাওয়ান ব্রুনাইয়ের রাজধানী। ব্রুনাইয়ের আয়তন মাত্র ৫,৭৬৫ বর্গকিলোমিটার।

ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রুনাই সালতানাত ছিল শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে জলদস্যুদের আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে এর শক্তি কমে আসতে থাকে। ১৮৮৮ সালে এক চুক্তি বলে ব্রুনাই ব্রিটেনের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৭৯ সালের ৭ জানুয়ারি ব্রুনাই সুলতান ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রুনাই পুরোপুরি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ ব্রুনাই জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে।

ব্রুনাইয়ের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোতে সংঘটিত হয়। ব্রুনাইয়ের সুলতান হলেন একাধারে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। ব্রুনাইয়ে ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন কাউন্সিল আছে, তবে এর সদস্যেরা আইন প্রণয়নে কেবল পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৯ সালের সংবিধান অনুযায়ী পাদুকা সেরি বাগিন্দা সুলতান হাজি হাসানাল বোলকিয়াহ মুইযাদ্দিন ওয়াদ্দাউল্লাহ হলেন দেশের প্রধান। ১৯৬০-এর দশকে একটি বিপ্লবের পর থেকে ব্রুনাইয়ে মার্শাল ল' জারি হয়ে আছে।

মালয় ভাষা ও ইংরেজি ভাষা ব্রুনাইয়ের সরকারি ভাষা। ব্রুনাইয়ের অর্ধেকেরও বেশি লোকের মাতৃভাষা মালয় ভাষা। অন্যদিকে ইংরেজি মাতৃভাষী লোকের সংখ্যা হাজার দশেক। এখানকার প্রায় ১২% লোক চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষাতে কথা বলেন। এছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যালঘু ভাষা প্রচলিত। মালয় ভাষা দেশটির সার্বজনীন ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা, তবে ইদানীং পর্যটন ও বাণিজ্যে ইংরেজি ভাষার প্রসার বেড়েছে।

ব্রুনাইয়ের সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে মালে সংস্কৃতির এবং ইসলামী ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়। সংস্কৃতি দেশের ডেমোগ্রাফিক মেকআপ দ্বারা প্রভাবিত হয়. জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মালে হয়, এবং বাকি চীনা, ভারতীয় ও যেমন ডায়াকস, দুসুন্স এবং কেদাযান্স যেমন আদিবাসী মালয় নিয়ে গঠিত যদিও স্টান্ডার্ট, মালাই ব্রুনাইয়ের সরকারী ভাষা, যেমন ব্রুনেই মালয় ও ইংরেজি ভাষায় আরো সাধারণভাবে বলা হয়।

ইসলাম ব্রুনাইয়ের সরকারী ধর্ম এবং ব্রুনেই ২০১৪ সাল থেকে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করেছে।




#Article 67: বুলগেরিয়া (524 words)


বুলগেরিয়া (বুলগেরীয় ভাষায়: България ব্যেল্‌গারিয়া আ-ধ্ব-ব: [bɤlˈgarijə]), সরকারী নাম বুলগেরিয়া প্রজাতন্ত্র (বুলগেরীয় ভাষায়: Република България রেপুব্লিকা ব্যেল্‌গারিয়া আ-ধ্ব-ব: [rɛˈpubliˌkə bɤlˈgarijə]), দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ মহাদেশের একটি রাষ্ট্র। দেশটি বলকান উপদ্বীপের পূর্ব পার্শ্বে ইউরোপ ও এশিয়ার ঐতিহাসিক সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এর পূর্বে কৃষ্ণ সাগর, দক্ষিণে গ্রিস ও তুরষ্ক, পশ্চিমে সার্বিয়া ও মন্টিনেগ্রো এবং ম্যাসিডোনিয়া, এবং রোমানিয়া অবস্থিত। এখানে প্রায় ৭৭ লক্ষ লোকের বাস। সোফিয়া বুলগেরিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

বুলগেরিয়া পর্বত, নদনদী ও সমভূমির দেশ। উত্তর বুলগেরিয়ার পূর্ব-পশ্চিম বরাবর বলকান পর্বতমালা প্রসারিত। বলকান পর্বতমালার নামেই অঞ্চলটির নাম হয়েছে বলকান। তবে বুলগেরীয়রা এগুলিকে Stara Planina বা প্রাচীন পর্বতমালা নামে ডাকে। ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউব বুলগেরিয়ার উত্তর সীমান্ত গঠন করেছে।

পশ্চিমে সোফিয়া এবং পূর্বে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত নিম্নভূমিটি গোলাপের উপত্যকা নামে পরিচিত। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এখানকার কৃষকেরা কাজালনুক গোলাপের চাষ করে আসছেন। এই গোলাপের তৈল নির্যাস অত্যন্ত দুর্লভ এবং বুলগেরিয়ার অন্যতম রপ্তানি পণ্য। বুলগেরিয়ার পূর্বে কৃষ্ণ সাগরের উপকূল উত্তরে খাড়া পার্বত্য ঢাল থেকে দক্ষিণে বালুকাময় সৈকতে নেমে এসেছে। এখানকার পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে সারা বিশ্ব থেকে লোক বেড়াতে আসে। উত্তরের পর্বতমালাতে শীতকালে ভারী বরফ পড়ে; ফলে শীতকালীন ক্রীড়ার জমজমাট আসর বসে এখানে।

ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বুলগেরিয়াকে নিয়ে বহু শক্তির প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা হয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে এটি একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। মধ্যযুগে এসে দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রধান শক্তি ছিল। প্রথম বুলগেরীয় সাম্রাজ্যের সময় (৬৩২/৬৮১—১০১৮) এখানকার শাসকেরা বলকান উপদ্বীপের অধিকাংশ এলাকা শাসন করেছেন। এখানকার খ্রিস্টান অর্থডক্স ধর্ম, সংস্কৃতি দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপীয় বহু স্লাভীয় জাতিকে প্রভাবিত করেছে। পূর্ব ইউরোপের ভাষাগুলির লিখন পদ্ধতিতে প্রচলিত সিরিলীয় লিপি বুলগেরিয়াতেই উদ্ভাবিত হয়। দ্বিতীয় বুলগেরীয় সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের শেষে ১৩৯৩ সালে দেশটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। প্রায় ৫০০ বছর উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত হবার পর ১৮৭৮ সালে সান স্তেফানোর চুক্তির মাধ্যমে বুলগেরিয়া একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯১২-১৯১৩ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধে জয়ী হলেও ২য় বলকান যুদ্ধে দেশটি হেরে যায় এবং গ্রিস, সার্বিয়া ও রোমানিয়ার কাছে অনেক এলাকা হারায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা দেশটির দখলে ছিল। এসময় সোভিয়েত সরকারের সমর্থনে একটি সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাম্যবাদী শাসনের সময় বুলগেরীয় নেতারা প্রধানত কৃষিভিত্তিক দেশটির অর্থনীতির আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি শিল্পায়ন প্রকল্প শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কারের আগ পর্যন্ত বুলগেরিয়া একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯০ সালে বুলগেরিয়াতে যুদ্ধের পর প্রথমবারের মত বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এর নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বুলগেরিয়া থেকে বদলে বুলগেরিয়া প্রজাতন্ত্র রাখা হয়।

গণতন্ত্র ও মুক্ত বাণিজ্যের পথে রূপান্তর বুলগেরিয়ার জন্য সুখপ্রদ হয়নি। সাম্যবাদের পতন এবং বুলগেরীয় পণ্যের সোভিয়েত বাজারের বিলোপ ঘটায় দেশটির অর্থনীতির প্রবল সংকোচন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের ঊর্ধগতি, অবারিত দুর্নীতি, এবং সমাজকল্যাণ ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটায় জীবনযাত্রার মানের চরম পতন ঘটে। অনেক বুলগেরীয় দেশ ছেড়ে চলে যান। বুলগেরীয় সরকার ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে গৃহীত সংস্কারগুলির ব্যাপারে অটল থাকলে ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়। দেশটি ২০০৪ সালের মার্চে নেটোর এবং ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়।

বুলগেরিয়ার ৮০%-এর বেশি লোক বুলগেরীয় অর্থোডক্স গির্জার খ্রিস্টধর্মের অনুসারী বা এর সাথে সম্পর্কিত। প্রায় ১২% লোক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। মূলত উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে আগত তুর্কি বসতিস্থাপকদের মধ্যে ইসলাম প্রচলিত।

বুলগেরীয় ভাষা বুলগেরিয়ার সরকারি ভাষা এবং এই ভাষাতে দেশটির প্রায় ৮৫% লোক কথা বলে। সংখ্যালঘু ভাষাগুলির মধ্যে তুর্কি, আলবেনীয়, আর্মেনীয়, গাগাউজ, গ্রিক, ম্যাসেডোনীয় এবং রোমানীয় ভাষা উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বুলগেরিয়াতে জিপসি বা রোমানি ভাষা ব্যবহারকারী একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী বাস করে। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে রুশ, জার্মান এবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।




#Article 68: বুর্কিনা ফাসো (1702 words)


বুর্কিনা ফাসো (ফরাসি, মোরে, ও দিউলা ভাষায়: Burkina Faso) আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিমভাগে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। এটি পূর্বে আপার ভোল্টা (ইংরেজি: Upper Volta) নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এটি একটি ফরাসি উপনিবেশ ছিল। ১৯৮৫ সালে দেশটির নাম বদলে রাখা হয় বুর্কিনা ফাসো, যার অর্থ নৈতিক জাতির দেশ। এর উত্তরে ও পশ্চিমে মালি, পূর্বে নাইজার, এবং দক্ষিণে বেনিন, টোগো, ঘানা ও আইভরি কোস্ট। উয়াগাদুগু (ফরাসি Ouagadougou উয়াগাদুগু, মোরে ভাষায় উয়াগ্যড্যগ্য) দেশের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

বুর্কিনা ফাসো আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলির একটি। প্রতি বছর এই দেশের হাজার হাজার লোক পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে, যেমন ঘানা বা আইভরি কোস্টে কাজ খুঁজতে বিশেষ করে মৌসুমী কৃষিকাজের জন্য পাড়ি জমায়।

বুর্কিনা ফাসো পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যস্থলে অবস্থিত খরাপ্রবণ তৃণভূমি নিয়ে গঠিত। এই স্থলবেষ্টিত দেশটির উত্তরাংশে সাহারা মরুভূমি এবং দক্ষিণে ক্রান্তীয় অতিবৃষ্টি অরণ্য। বুর্কিনাবে জাতির লোকেরা দেশের প্রধান জনগোষ্ঠী এবং এরা মূলত দেশের ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ ভাগে বাস করে। মাটির মান খারাপ এবং প্রচুর খরা হলেও এরা মূলত কৃষিকাজেই নিজেদের নিয়োজিত রাখে।

বুরকিনা ফাসোর মোসসি জাতির লোকেরা বহু শতাব্দী আগে এখানে যে রাজ্য স্থাপন করেছিল, তা ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে প্রাচীন রাজ্যগুলির একটি। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটিতে বারংবার সামরিক অভ্যুথান বা কু (coup) ঘটে এবং সামরিক শাসন চলে। ১৯৯১ সালে নতুন সংবিধান পাস হবার পর দেশটিতে বর্তমানে গণতন্ত্র বিদ্যমান।

বুর্কিনা ফাসো প্রশাসনিকভাবে বেশ কিছু রেজিওঁ (ফরাসি Région) বা অঞ্চলে বিভক্ত। প্রতিটি রেজিওঁ আবার কিছু প্রোভঁস (Provence) বা প্রদেশে বিভক্ত। প্রদেশগুলি একইভাবে কিছু দেপার্তমঁ (Département) বা জেলায় বিভক্ত। প্রতিটি রেজিওঁ একজন গভর্নর এবং প্রতিটি প্রোভঁস একজন উচ্চ-কমিশনার দ্বারা শাসিত হয়।

বুর্কিনা ফাসো উত্তরে ও পশ্চিমে মালি, উত্তর-পূর্বে নাইজার, দক্ষিণ-পূর্বে বেনিন এবং দক্ষিণে কোত দিভোয়ার, ঘানা এবং টোগো দ্বারা সীমাবদ্ধ। এটি একটি ভূমিবেষ্টিত রাষ্ট্র। 

দেশটি একটি বিস্তৃত মালভূমির উপর অবস্থিত, যা দক্ষিণ দিকে হালকা ঢালু হয়ে গিয়েছে। মালভূমিটির গভীরে রয়েছে কেলাসিত শিলার স্তর, যাকে উপরে আবৃত করে রেখেছে লাল ও লৌহসমৃদ্ধ ল্যাটেরাইটিক (lateritic) শিলাস্তর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছু বেলেপাথরের শিলা দিয়ে গঠিত মালভূমি রয়েছে। বানফোরা প্রবণভূমি (Banfora Escarpment) যাদের সীমানা নির্ধারণ করেছে। এটি দক্ষিণমুখী এবং প্রায় ৫০০ ফুট বা ১৫০ মিটার উঁচু। বুর্কিনা ফাসোর বেশির ভাগ মাটি অনুর্বর।       

মালভূমিটিকে গভীরে চিরে দেশটির তিনটি প্রধান নদী প্রবাহিত হচ্ছে - মুওঁ বা কালো ভল্টা, নাজিনোঁ বা লাল ভোল্টা এবং নাকাম্বে বা শ্বেত ভোল্টা। এই তিনটি নদীই দক্ষিণে ঘানাতে গিয়ে মিলিত হয়ে ভোল্টা নদী গঠন করেছে। ভোল্টা নদীর আরেকটি উপনদী ওতি নদী বুর্কিনা ফাসোর দক্ষিণ-পূর্বে উৎপত্তি লাভ করেছে। ঋতুভেদে নদীগুলির জলপ্রবাহে ব্যাপক তারতম্য ঘটে। শুস্ক মৌসুমে অনেক নদীই পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। 

বুর্কিনা ফাসোর জলবায়ু মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল, উষ্ণ এবং শুষ্ক। দেশটিকে দুইটি প্রধান জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তরের সহিলীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণের সুদানীয় অঞ্চল। সহিলীয় অঞ্চলটি মূলত একটি অর্ধ-অনুর্বর স্টেপ জাতীয় তৃণভূমি। এখানে তিন থেকে পাঁচ মাস অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। সুদানীয় অঞ্চলের জলবায়ু দক্ষিণের দিকে ক্রমান্বয়ে ক্রান্তীয় আর্দ্র-শুষ্ক জাতীয় হয়ে থাকে। এখানে তাপমাত্রার বৈচিত্র্য এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণের তারতম্য বেশি। উত্তরের চেয়ে এখানে সব মিলিয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।

বুর্কিনা ফাসোতে চারটি ঋতু দেখা যায়। মধ্য-নভেম্বর থেকে মধ্য-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক শীতকাল, যখন রাত্রীকালীন তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে। মধ্য-ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল, যখন ছায়াতেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি চলে যায়। এসময় সাহারা মরুভূমি থেকে হারমাতান নামের উত্তপ্ত, শুষ্ক, ধূলিময় বায়ুপ্রবাহ ধেয়ে আসে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস হচ্ছে বর্ষাকাল। এর পরে আসে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ঋতু, যা সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর পর্যন্ত বিরাজ করে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দক্ষিণে ১০০০ মিমি বা ৪০ ইঞ্চি থেকে উত্তরে ২৫০ মিমি বা ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে।

বুর্কিনা ফাসোর উত্তর অংশে সাভানা তৃণভূমি অবস্থিত, যেখানে কাঁটাময় ঝোপঝাড় এবং বামনবৃক্ষ দেখতে পাওয়া যায়; এগুলি মূলত বর্ষা মৌসুমে জন্মায় ও বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণের দিকে এগোলে ঝোপঝাড়ের বদলে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন বনভূমির আবির্ভাব ঘটে এবং এই বনভূমিগুলি চিরপ্রবহমান নদীগুলির তীরে আরও ঘন আকার ধারণ করে। ক্যারাইট বা শেয়া বৃক্ষ এবং বাওবাব বা হিবিস্কাস বৃক্ষ এই অঞ্চলের স্বজাত উদ্ভিদ।

প্রাণীর মধ্যে মহিষ, কৃষ্ণশার হরিণ, সিংহ, জলহস্তী, হাতি, কুমির ও বানরের দেখা মেলে। পাখী ও কীটপতঙ্গগুলি সমৃদ্ধ ও বিচিত্র। নদীগুলিতে বহু প্রজাতির মাছ রয়েছে। দেশেটিতে অনেক জাতীয় উদ্যান আছে যার মধ্যে দক্ষিণ-মধ্য অংশে অবস্থিত পো, দক্ষিণ-পূর্বে আর্লি এবং পূর্বে বেনিন-নাইজার সীমান্তে অবস্থিত উয় উদ্যান উল্লেখযোগ্য।

বুর্কিনা ফাসোর নয়-দশমাংশ মানুষ খাদ্যসংস্থানমূলক কৃষিকাজ এবং গবাদিপশুপালনের কাজে জড়িত। অর্থনৈতিক মন্দা, কিছুদিন পর পর অতিখরা, ইত্যাদি কারণে এখানকার বহু মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা অন্যান্য দেশে, বিশেষত কোত দিভোয়ার ও ঘানাতে পাড়ি জমিয়েছে। দেশের কর্মশক্তি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১৫ লক্ষ লোক কোনও না কোন সময় বিদেশে গিয়ে কাজ করেছে। ২১শ শতকের শুরুর দিকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে, বিশেষ করে কোত দিভোয়ারে গণ্ডগোল শুরু হলে, বুর্কিনাবেদের চাকরি পেতে সমস্যা হয়। বাজার অর্থনীতির আকার ছোট বলে এবং সমুদ্রের সাথে সরাসরি সংযুক্ত পথ না থাকায় এখানকার শিল্পক্ষেত্রের উন্নয়ন ব্যহত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে সরকার কিছু সরকার-নিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ করেন যার লক্ষ্য ছিল বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। 

কৃষিকাজ মূলত খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিয়োজিত। উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য অর্থকরী শস্য হিসেবে বিক্রি করা হয়। উওৃত্ত তুলা, শেয়া বাদাম, তিসি এবং আখ রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে সোরগোম, জোয়ার, ভুট্টা, চিনাবাদাম এবং ধান স্থানীয় ভোগের জন্য উৎপাদন করা হয়। এছাড়াও ফোনিও নামের এক ধরনের ঘাস, যার বিজদানাগুলি খাদ্যশস্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কাসাভা, মিষ্টি আলু এবং শীম জাতীয় বীচিও চাষ করা হয়। পশুপালন জীবিকার অন্যতম উৎস।  গবাদি পশু, ভেড়া, শূকর, গাধা, ঘোড়া, উট, মুরগী, হাঁস ও গিনি মুরগী পালন করা হয়।

বুর্কিনা ফাসোতে বেশ কিছু খনিজের সন্ধান মেলে, যাদের মধ্যে ম্যাঙ্গানিজ এবং স্বর্ণ অন্যতম। এগুলি দেশটির সম্পদের অন্যতম সম্ভাব্য উৎস। কুদুগু শহরের দক্ষিণ-পুর্বে পুরা শহরে স্বর্ণখনি আছে। এছাড়া দেশের উত্তরে সেব্বা এবং দোরি-ইয়লোগোতে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র আয়তনের স্বর্ণমজুদ  আছে। এছাড়াও দেশটিতে নিকেল, বক্সাইট, দস্তা, সীসা এবং রূপার মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। উত্তর-পূর্বে তামবাও শহরের কাছে অবস্থিত ম্যাঙ্গানিজের যে বিশাল মজুদ আছে, সেটি সম্ভবত দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এটি সারা বিশ্বেই ম্যাঙ্গানিজের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাণ্ডারগুলির একটি। তবে বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার অকার্যকারিতার কারণে এটি উত্তোলন-নিষ্কাশন এখনও সীমিত।

উৎপাদন শিল্পকারখানাগুলি সংখ্যায় সীমিত। এগুলি মূলত নগরী ও অপেক্ষাকৃত বড় শহরগুলিতে অবস্থিত। প্রধানত খাদ্যদ্রব্য, পানীয়, বস্ত্র, জুতা এবং বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ নির্মাণের কারখানা আছে।

বুর্কিনা ফাসোর মুদ্রার নাম সিএফএ ফ্রঁ (Communauté Financière Africaine franc) অর্থাৎ আফ্রিকান আর্থিক সম্প্রদায়ের ফ্রঁ। মুদ্রাটি সরকারীভাবে ইউরোর সাথে সংযুক্ত (peg) করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রাটি ছাপায়। ব্যাংকটি পশ্চিম আফ্রিকান অর্থনৈতিক ও মুদ্রা ইউনিয়নের একটি সংস্থা। এই ইউনিয়নে বুর্কিনা ফাসোসহ মোট আটটি দেশ আছে, যারা হল বেনিন, কোত দিভোয়ার, গিনি-বিসাউ, মালি, নাইজার, সেনেগাল এবং টোগো। এই সবগুলি দেশই অতীতে ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শাখাগুলি বুর্কিনা ফাসোর উয়াগাদুগু এবং বোবো দিউলাসো শহর দুইটিতে অবস্থিত। এছাড়াও আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে সরকার-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক আছে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বুর্কিনা আন্তর্জাতিক ব্যাংক (Banque Internationale du Burkina); এটি উয়াগাদুগুতে অবস্থিত।

এছাড়া বুর্কিনা ফাসো পশ্চিম আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের একটি সদস্যরাষ্ট্র। পশ্চিম আফ্রিকার অধিকাংশ রাষ্ট্র এই সম্প্রদায়ের সদস্য; অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলির সমন্বয় সাধন এবং সুষমীকরণ এই সম্প্রদায়ের লক্ষ্য।

বুর্কিনা ফাসো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির একটি। তাই এটি ব্যাপকভাবে বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থও দেশটির হিসাবের ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করে।

২১শ শতকে এসে বুর্কিনা ফাসো মূলত তুলা, স্বর্ণ, গবাদি পশু, চিনি এবং ফল রপ্তানি করছে। বেশিরভাগ দ্রব্যই পার্শ্ববর্তী আফ্রিকান দেশগুলিতে রপ্তানি করা হয়। তবে কিছু কিছু পণ্য, যেমন তুলা এবং খনিজ পদার্থসমূহ চীন, সিংগাপুর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে রপ্তানি হয়। আমদানিকৃত প্রধান পণ্যগুলি হল পেট্রোলিয়াম, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি এবং খাদ্যদ্রব্য। এগুলি মূলত পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ এবং ফ্রান্স থেকে আমদানি করা হয়।

আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম বলে দেশটির পরিশোধন-বিবরণীতে (balance of payments) ঘাটতি আছে। রপ্তানিকৃত দ্রব্যের অর্থমূল্য   ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি করা দ্রব্যের অর্থমূল্যের জন্য যথেষ্ট নয় বলে এমনটি ঘটেছে।

উয়াগাদুগু শহর রেলপথের মাধ্যমে কোত দিভোয়ারের আবিজান বন্দরের সাথে যুক্ত। রেলপথটি প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যার প্রায় ৫-- কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বুর্কিনা ফাসোর ভেতর দিয়ে চলে গেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে কোত দিভোয়ারের গৃহযুদ্ধের কারণে রেলপথটি একাধিক বছর বন্ধ ছিল। রেলপথটি বুর্কিনা ফাসোর ভেতরে দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রসারিত এবং কুদুগু, বোবো দিউলাসো এবং বানফোরা শহরগুলির সাথে এটি সংযুক্ত।

এছাড়াও রাজধানী শহর উয়াগাদুগু সড়কপথের মাধ্যমে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলির সাথে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলির রাজধানীগুলির সাথে সংযুক্ত। বুর্কিনা ফাসোর সড়ক ব্যবস্থাটি অনুন্নত; এর খুব ছোট একটি অংশ সারা বছর ধরে ব্যবহারোপযোগী থাকে। অবশিষ্টাংশ মূলত কাঁচা গ্রামীণ রাস্তা।

উয়াগাদুগু ও বোবো দিউলাসো শহরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। এছাড়ে দেশের বিভিন্ন অংশে বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নক্ষেত্র আছে।

বুর্কিনা ফাসোতে দশটিরও বেশি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী আছে। দেশটির প্রধান ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠীটি হল মোসি, যারা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তারা মোরে নামের একটি ভাষাতে কথা বলে। মোসি জাতির লোকেরা বহু শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে বাস করে। গুর্মা ও ইয়ার্সে নামের দুইটি জাতির মোসি জাতির সাথে মিলিত হয়ে গিয়েছে। ইয়ার্সে জাতির লোকেরা মূল মান্দে জাতি থেকে আসলেও এখন মোসি ভাষাতে কথা বলে। মোসি বা মোরে ভাষাটি নাইজার-কঙ্গো ভাষা পরিবারের গুর শাখার একটি ভাষা। এছাড়াও গুরুনসি, সেনুফো, বোয়া এবং লোবি নামের জাতিগুলি বিভিন্ন গুর ভাষাতে কথা বলে।

নাইজার-কঙ্গো ভাষাপরিবারের আরেকটি শাখা মান্দে ভাষাগুলিতে একাধিক জাতিগোষ্ঠী কথা বলে; এরা হল সামো, মারকা, বুসানসি এবং দিউলা।

এছাড়াও দেশটিকে আফ্রো-এশীয় ভাষা হাউসা ও তুয়ারেগভাষী জাতি, এবং ফুলা ভাষাতে (নাইজার-কঙ্গো পরিবারের আটলান্টিক শাখার ভাষা) কথা বলা ফুলানি জাতির লোকেরা বাস করে।

বুর্কিনা ফাসোর নাগরিকেরা জাতি নির্বিশেষে বুর্কিনাবে নামে পরিচিত। ফরাসি ভাষা সরকারী ভাষা হলেও মুখের ভাষা হিসেবে ব্যাপক প্রচলিত নয়। বেশির ভাগ লোক মোরে ভাষাতে কথা বলেন। ব্যবসা বাণিজ্যে দিউলা ভাষাটি অনেক ব্যবহৃত হয়।

দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মুসলমান। প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রোমান ক্যাথলিক খিস্টান এবং প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ প্রথাগত ধর্মগুলি পালন করে। বাকীরা মূলত প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান বা অধার্মিক। উয়াগাদুগু শহরে রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপের গির্জা অবস্থিত। এছাড়া সারা দেশজুড়ে অনেক বিশপশাসিত ধর্মীয় অঞ্চল রয়েছে।

বুর্কিনা ফাসোর জনসংখ্যা দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অসমভাবে বণ্টিত। পূর্বের ও কেন্দ্রের অঞ্চলগুলি ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বাস। দেশের বাকী অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে। জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ গ্রামে বাস করে। গ্রামগুলি ভোল্টা নদীগুলির উপত্যকা থেকে দূরে উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। ভোল্টা নদীগুলির দুই তীরের প্রায় বেশ কিছু মাইল ভেতর পর্যন্ত এলাকাতে কোন জনবসতি নেই, কেননা এই এলাকাতে ঘুমন্ত রোগের জীবাণু বহনকারী ৎসেৎসে মাছি এবং নদী অন্ধত্ব রোগের জীবাণু বহনকারী সিমুলিয়াম মাছির ব্যাপক প্রাদুর্ভাব রয়েছে।

উয়াগাদুগু দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী এবং সরকারের মূল কার্যালয় এখানেই অবস্থিত। এটি একটি আধুনিক শহর। এখানে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর অবস্থিত। এখানেই মোসি জাতির লোকদের মহান গুরু মোরহো নাবা বাস করেন। আফ্রিকাতে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রকল্পগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও শহরটি পরিচিত।

উয়াগাদুগু শহর ছাড়া অন্যান্য প্রধান শহরগুলি হল বোবো দিউলাসো, কুদুগু, বানফোরা, উয়াইগুইয়া, পুইতেংগা এবং কায়া। বোবো দিউলাসো শহরটি দেশের পশ্চিমে অবস্থিত। এটি অতীতে দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল; কোত দিভোয়ারের আবিজান শহর থেকে আসা রেলপথ এই শহরেই শেষ হয়েছিল। তবে ১৯৫৫ সালের পরে রেলপথটি সম্প্রসারিত করে উয়াগাদুগু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। তখন থেকে বোবো দিউলাসোর গুরুত্ব কিছু গুরুত্ব কমে গেলেও এখনও এটি দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

২১শ শতকের শুরুর দিকে বাৎসরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ ছিল। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৫ বছরের নিচে। গড় প্রত্যাশিত আয়ু ৫০ বছরের সামান্য বেশি, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কম হলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।




#Article 69: মানচিত্র (102 words)


মানচিত্র ভূমির সাংকেতিক প্রতিচ্ছবি। দেশের সার্ভে বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত নির্ধারিত রং এর ব্যবহারে কোন এলাকার ভূমির উল্লেখ যোগ্য প্রকৃতিক ও কৃত্তিম বস্তু সমূহকে নির্দিষ্ট সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে কাগজ বা কাপড়ের উপর ক্ষুদ্রাকারে মাপনী অনুযায়ী অঙ্কন করাকে ম্যাপ বা মানচিত্র বলে।

কোন স্থানে অবস্থিত বস্তু সমূহের অবস্থান এবং সম্পর্কের দৃষ্টিগ্রাহ্য সাধারণ প্রকাশ হচ্ছে মানচিত্র।

অনেক মানচিত্র স্থির, ত্রি-মাত্রিক স্থানের দ্বি-মাত্রিক প্রতিরূপ; আবার কিছু মানচিত্র পরিবর্তনশীল, এমনকি ত্রিমাত্রিকও হতে পারে। মানচিত্র বলতে সাধারণত ভৌগোলিক মানচিত্রকেই বোঝানো হয়, তবে মানচিত্র হতে পারে কোন স্থানের - বাস্তব বা কাল্পনিক, এতে স্কেল বা অন্যান্য অনুষঙ্গের প্রয়োজনীয়তা নাও থাকতে পারে; যেমন, ব্রেন মানচিoত্রকরণ, ডিএনএ মানচিত্রকরণ এবং মহাকাশের মানচিত্রকরণ।




#Article 70: চলচ্চিত্র (999 words)


চলচ্চিত্র এক প্রকারের দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম। চলমান চিত্র তথা মোশন পিকচার থেকে চলচ্চিত্র শব্দটি এসেছে। এটি একটি বিশেষ শিল্প মাধ্যম। বাস্তব জগতের চলমান ছবি ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করে বা এনিমেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। চলচ্চিত্রের ধারণা অনেক পরে এসেছে, ঊনবিংশ শতকএর শেষ দিকে। আর এনিমেশন চিত্রের ধারণা এসেছে আরও পরে। বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ছায়াছবি, সিনেমা, মুভি বা ফিল্ম শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

চলচ্চিত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে সংস্কৃতিতে তা নির্মিত হয় তাকেই প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম সেরা উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে চলচ্চিত্রের। ছায়াছবির সাথে ভিজ্যুয়াল বিশ্বের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সাথে সবচেয়ে ভাল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্য কোন শিল্পমাধ্যম সাধারণের সাথে এতোটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়। অন্য ভাষার চলচ্চিত্রের ডাবিং বা সাবটাইটেল করার মাধ্যমে নিজ ভাষায় নিয়ে আসার প্রচলন রয়েছে।

প্রথাগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় অনেকগুলো একক ছবি তথা ফ্রেমের ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই স্থিরচিত্রগুলি যখন খুব দ্রুত দেখানো হয় তখন দর্শক মনে করেন তিনি চলমান কিছু দেখছেন। প্রতিটি ছবির মাঝে যে বিরতি তা একটি বিশেষ কারণে দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। ধরা না পড়ার এই বিষয়টাকে দৃষ্টির স্থায়িত্ব বলে। সহজ কথা বলা যায়, ছবির উৎস সরিয়ে ফেলার পরও এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় ধরে দর্শকের মনে তার রেশ থেকে যায়। এভাবে চলমান ছবির ধারণা লাভের বিষয়টাকে মনোবিজ্ঞানে বিটা চলন নামে আখ্যায়িত করা হয়।

কৃত্রিমভাবে দ্বিমাত্রিক চলমান ছবি তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৮৬০-এর দশকে। তখন জোট্রোপ এবং প্র্যাক্সিনোস্কোপ নামক যন্ত্র দিয়ে এ ধরনের ছবি তৈরি করা যেতো। একেবারে সাধারণ আলোক যন্ত্রের (ম্যাজিক লণ্ঠন) উন্নতি সাধন করে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিক কতগুলো স্থিরচিত্র একটার পর একটা এতো দ্রুত পরিবর্তন করা যেতো যে দর্শকের চোখে পরিবর্তন খুব একটা ধরা পড়তো না। ছবিগুলোকে খুব যত্ন সহকারে ডিজাইন করতে হতো যাতে কোন খুঁত না থাকে। এই ধারণাটিই পরবর্তীতে এনিমেশন চিত্র নির্মাণের মূলনীতি হয়ে দেখা দিয়েছিলো।

স্থির চিত্রগ্রহণে সেলুলয়েড ফিল্ম আসার পর চলমান বস্তুর সরাসরি ছবি তোলা সম্ভব হলো। প্রাথমিক যুগে একটি ড্রামের মধ্যে বেশ কিছু ছবি লাগিয়ে ড্রামটিকে জোড়ে ঘুরানো হতো। একটা বিশেষ দিক থেকে দর্শক ড্রামের দিকে তাকালে চলমান চিত্র দেখতে পেতো। ড্রামের গতি ছিল সাধারণত সেকেন্ডে ৫ বা ১০ বার এবং ড্রামগুলো কয়েনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করতো। ১৮৮০'র দশকে চলচ্চিত্র ক্যামেরা উদ্ভাবিত হয়। এর মাধ্যমে অনেকগুলো স্থিরচিত্রকে একটি মাত্র রিলে সংরক্ষণ করা যেতো। এই রিলগুলোকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র রূপে দেখানো হতো প্রজেক্টরের মাধ্যমে। প্রজেক্টরের আলো রিলের উপর ফেলা হতো এবং রিলের ছবিগুলোকে বিবর্ধিত করে একটি বড় পর্দার উপর ফেলা হতো যা দর্শকরা দেখতে পেতো। প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলো সবই ছিল বাস্তব ঘটনার সরাসরি দৃশ্যায়ন এবং প্রদর্শন। সেখানে কোন সম্পাদনা বা চলচ্চিত্ররূপী উপস্থাপনার সুযোগ ছিল না।

১৮৯৪ সালের দিকেই ডিকসন শব্দ এবং ছবি একসাথে ধারণের পরীক্ষা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার সে প্রচেষ্টাকে এড়িয়ে গিয়ে নির্বাক চলচ্চিত্র প্রাধান্য বিস্তার করে এবং জনমনে বিশেষ ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়। ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত নির্বাক চলচ্চিত্রই ছিল একমাত্র চলমান শিল্প মাধ্যম। বিংশ শতকের শুরুতে চলচ্চিত্র বর্ণনামূলক ধারায় রূপ নিতে শুরু করে। অনেকগুলো দৃশ্যকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে এবং প্রত্যেকটির জন্য বর্ণনাভঙ্গি নির্দিষ্ট করে, প্রচার করা হতে থাকে। ধীরে ধীরে দৃশ্যগুলোকে বিভিন্ন আক্র এবং কোণ থেকে নেয়া অনেকগুলো শটে ভাগ করা হয়। এছাড়া চলমান ক্যামেরার মাধ্যমে চলচ্চিত্র গল্প ফুটিয়ে তোলার কৌশল আবিষ্কৃত হয়। তখনও ছবি নির্বাক ছিল। কিন্তু, প্রতিটি শটের সাথে মিল রেখে সঙ্গীত এবং বাজনা বাজানোর জন্য সিনেমা হলে বা মঞ্চে অর্কেস্ট্রা দল থাকতো। বড় বড় প্রযোজনা কোম্পানিগুলো এসবের ব্যবস্থা করতো।

হলিউডের উত্থানের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র বিকশিত হয়ে উঠলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইউরোপে এই শিল্পটি ততোটা বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনি। অবশ্য ১৯২০-এর দশক থেকে সের্গে আইজেনস্টাইন, এফ ডব্লিউ মার্নো এবং ফ্রিৎস ল্যাং এর মতো ইউরোপীয় পরিচালকরা ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ, চার্লি চ্যাপলিন, বুস্টার কিটন প্রমুখ মার্কিন পরিচালক ও অভিনেতাদের সাথে মিলে ইউরোপে চলচ্চিত্র বিস্তারের কাজ শুরু করেন। এই দশকেই প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে চলচ্চিত্রের শটগুলোর সাথে ঐকতান বজায় রেখে শব্দ, সঙ্গীত এবং কথোপকথন যুক্ত করা সম্ভব হয়। উদ্ভব হয় সবাক চলচ্চিত্রের। ইংরেজতে এগুলোকে টকিং পিকচার বা সংক্ষেপে টকি (talky) বলা হতো।

এর পরে চলচ্চিত্র শিল্পে সবচেয়ে বড় সংযোজন ছিল প্রাকৃতিক রঙ যুক্ত করা। শব্দ যুক্ত করার পর খুব দ্রুত নির্বাক চলচ্চিত্র এবং মঞ্চের বাদ্য-বাজনা বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সাদাকালোর বদলে চলচ্চিত্র রঙের ব্যবহার করার প্রচলন অনেক ধীরে ধীরে হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল রঙিন চলচ্চিত্রের খরচ এবং সামঞ্জস্য। প্রথমদিকে সাদা-কালো এবং রঙিন চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম ছিল। কিন্তু ক্রমাগত বেশি বেশি রঙিন চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় রঙিন চলচ্চিত্রই প্রাধান্য বিস্তার করে। কারণ প্রযোজকরা বুঝতে পারছিলেন, রঙিনের দিকে দর্শকদের ঝোঁক বেশি। আরও একটি কারণ ছিল, টেলিভিশন ১৯৬০-এর দশকের আগে রঙিন হয়নি। তাই টিভির সাদাকালোকে হারানোর জন্য চলচ্চিত্র রঙের সংযোজন আবশ্যক ছিল। ১৯৬০-এর দশকের পরে রঙিন চলচ্চিত্রই নির্মাতাদের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠে।

১৯৬০ এর দশকে স্টুডিও পদ্ধতির পতনের পর কয়েক দশক জুড়ে চলচ্চিত্র জগতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে চলচ্চিত্র শিক্ষা গুরুত্ব অর্জন করে। নব হলিউড, ফরাসি নবকল্লোল এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র স্কুলের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি ত্বরান্বিত হয়। আর ১৯৯০-এর দশকের পর ডিজিটাল প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠে।

চলচ্চিত্রের সুসংক্ষিপ্ত, সুষ্ঠু এবং পদ্ধতিগত ধারণা তৈরি করার নামই চলচ্চিত্র তত্ত্ব। এসব তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য চলচ্চিত্রকে একটি শিল্প হিসেবে অধ্যয়নের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। Ricciotto Canudo ১৯১১ সালে প্রকাশিত তার The Birth of the Sixth Art নামক মেনিফেস্টোতে প্রথম চলচ্চিত্র তত্ত্বের উল্লেখ করেন। এরপরে ফর্মালিস্ট তত্ত্ব দিয়ে এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন Rudolf Arnheim, Béla Balázs এবং Siegfried Kracauer। এই তাত্ত্বিকেরা চলচ্চিত্রকে দেখেছেন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রকৃত শিল্প মাধ্যম হিসেবে। André Bazin এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, চলচ্চিত্রের সার্থকতা যান্ত্রিক উপায়ে বাস্তবতাকে পুনঃনির্মাণ করার মধ্যে নিহিত। বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা কখনও চলচ্চিত্রের লক্ষ্য হতে পারে না। এই চিন্তাধারার ফলে চলচ্চিত্র রিয়েলিস্ট তথা বাস্তবিকতা তত্ত্বের জন্ম হয়। বর্তমানে Lacan এর মনোবিশ্লেষণ এবং Ferdinand de Saussure এর সেমিওটিক্স এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র নতুন কিছু তত্ত্বের জন্ম হয়েছে। এগুলো হল মনোবিশ্লেষণমূলক চলচ্চিত্র তত্ত্ব, স্ট্রাকচারালিস্ট চলচ্চিত্র তত্ত্ব, নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব ইত্যাদি।

বিষয়বস্তু, পরিপ্রেক্ষিত, পটভূমি আর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে যেকোন সাহিত্য মাধ্যমেরই ধরন নির্দিষ্ট করা যায়। চলচ্চিত্রেরও এরকম কিছু ধরন রয়েছে যাদেরকে ইংরেজিতে জেনার (genre) বলে। এই ধরনগুলো মূলত সারণীকরণের মাধ্যমে করা হয়। ধরন দিয়ে একটি চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটি চলচ্চিত্র আবার একাধিক ধরনের মধ্যে পড়তে পারে। জনপ্রিয় কিছু ধরনের মধ্যে রয়েছে হরর, রোমাঞ্চ, অ্যাকশন, থ্রিলার, ঐতিহাসিক, মহাকাব্যিক, রূপকথা, অপরাধ, কমেডি ইত্যাদি।




#Article 71: আইন (251 words)


মানুষকে সুষ্ঠু, স্বাধীন এবং সুশৃংখলভাবে পরিচালনার জন্য যে নিয়ম-কানুন তৈরি করা হয় তাকে আইন বলে। আইনের ইংরেজি প্রতিশব্দ Law যা Lag নামক শব্দ থেকে উদ্ভূত। Lag এর আভিধানিক অর্থ স্থির, অপরিবর্তনীয় এবং যা সর্বত্র সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আইন হলো সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক বলবৎযোগ্য বিধান, যা সকলের জন্য অবশ্য পালনীয়।

আইন হলো নিয়মের এক পদ্ধতি যাকে নাগরিক বাধ্যতা, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করতে ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্জকরী করতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া আইন বলতে সামাজিকভাবে স্বীকৃত লিখিত ও অলিখিত  বিধিবিধান ও রীতিনীতিকে বোঝায়। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিষ্টটল লিখেছিলেন, আইনের শাসন যেকোন ব্যক্তি শাসনের চেয়ে ভাল।
সামাজিক জীবনে যে রীতিনীতি বা বিধিবিধান মানুষ মেনে চলে তা হলো সামাজিক আইন। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় আইন হলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিভিন্ন জাতীয় নীতিমালার প্রেক্ষিতে সমাজে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধে সার্বজনীনভাবে সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন নির্দেশ।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আইনের অসংখ্য সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মেরিয়াম-ওয়েস্টার হতে তৃতীয় নতুন আন্তর্জাতিক অভিধান আইনটিকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করেন: আইন একটি সম্প্রদায়ের বাধ্যতামূলক রীতি; একটি নিয়ম বা আচরণের পদ্ধতি বা পদক্ষেপ যা একটি সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ দ্বারা বাধ্যতামূলক হিসাবে নির্ধারিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ; নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত, স্বীকৃত বা প্রয়োগের দ্বারা অনুমোদনের (বাধ্যতামূলক, ডিক্রি, রিসক্রিপ্ট, আদেশ, অধ্যাদেশ, আইন, সমাধান, বিধি, বিচারিক সিদ্ধান্ত বা ব্যবহার হিসাবে) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

১৯৭৩ সালে স্ক্রিবনার দ্বারা প্রকাশিত আইডিয়াস অফ হিস্ট্রি অফ আইডিয়াস আইন অনুসারে সংজ্ঞাটিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল: একটি আইনি ব্যবস্থা হলো মানব আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে সুস্পষ্ট, প্রাতিষ্ঠানিক এবং জটিল পদ্ধতি, একই সাথে এটি কেবল একটি অংশে ভূমিকা পালন করে, কম প্রাতিষ্ঠানিক ধরনের সামাজিক ও নৈতিক বিধিগুলির জন্য আচরণকে প্রভাবিত করে৷




#Article 72: গণিত (1586 words)


গণিত পরিমাণ, সংগঠন, পরিবর্তন ও স্থান বিষয়ক গবেষণা। গণিতের নিদিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই।গণিতে সংখ্যা ও অন্যান্য পরিমাপযোগ্য রাশিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়। গণিতবিদগন বিশৃঙ্খল ও অসমাধানযুক্ত সমস্যাকে শৃঙ্খলভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া খুঁজে বেড়ান ও তা সমাধানে নতুন ধারণা প্রদান করে থাকেন। গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে এই ধারণাগুলির সত্যতা যাচাই করা হয়। গাণিতিক সমস্যা সমাধান সম্পর্কিত গবেষণায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বা শত শত বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
গণিতের সার্বজনীন ভাষা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একে অপরের সাথে ধারণার আদান-প্রদান করেন। গণিত তাই বিজ্ঞানের ভাষা।

১৭শ শতক পর্যন্তও কেবল পাটীগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতিকে গাণিতিক শাস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হত। সেসময় গণিত দর্শন ও বিজ্ঞানের চেয়ে কোন পৃথক শাস্ত্র ছিল না। আধুনিক যুগে এসে গণিত বলতে যা বোঝায়, তার গোড়াপত্তন করেন প্রাচীন গ্রিকেরা, পরে মুসলমান পণ্ডিতেরা এগুলি সংরক্ষণ করেন,  অনেক গবেষণা করেন এবং খ্রিস্টান পুরোহিতেরা মধ্যযুগে এগুলি ধরে রাখেন। তবে এর সমান্তরালে ভারতে এবং চীন-জাপানেও প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগে স্বতন্ত্রভাবে উচ্চমানের গণিতচর্চা করা হত। ভারতীয় গণিত প্রাথমিক ইসলামী গণিতের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৭শ শতকে এসে আইজাক নিউটন ও গটফ্রিড লাইবনিৎসের ক্যালকুলাস উদ্ভাবন এবং ১৮শ শতকে অগুস্তঁ লুই কোশি ও তার সমসাময়িক গণিতবিদদের উদ্ভাবিত কঠোর গাণিতিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিগুলির উদ্ভাবন গণিতকে একটি একক, স্বকীয় শাস্ত্রে পরিণত করে। তবে ১৯শ শতক পর্যন্তও কেবল পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ ও প্রকৌশলীরাই গণিত ব্যবহার করতেন। 

১৯শ শতকের শুরুতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের যে আধুনিক ধারা সূচিত হয়, সে-সংক্রান্ত গবেষণাগুলির ফলাফল প্রকাশের জন্য জটিল গাণিতিক মডেল উদ্ভাবন করা হয়। বিশুদ্ধ গণিতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণায় জোয়ার আসে। অন্যদিকে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কম্পিউটারের আবিষ্কার এ-সংক্রান্ত সাংখ্যিক পদ্ধতিগুলির গবেষণা বৃদ্ধি করে।

গণনা করা ছিল আদিমতম গাণিতিক কর্মকাণ্ড। আদিম মানুষেরা পশু ও বাণিজ্যের হিসাব রাখতে গণনা করত। আদিম সংখ্যা ব্যবস্থাগুলি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ছিল এক বা দুই হাতের আঙুল ব্যবহার করে সৃষ্ট। বর্তমানের ৫ ও ১০-ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থার বিস্তার এরই সাক্ষ্য দেয়। মানুষ যখন সংখ্যাগুলিকে বাস্তব বস্তু থেকে পৃথক ধারণা হিসেবে গণ্য করা শিখল এবং যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ --- এই চারটি মৌলিক অপারেশন বা প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করল, তখনই পাটীগণিতের যাত্রা শুরু হল। আর জ্যামিতির শুরু হয়েছিল রেখা ও বৃত্তের মত সরল ধারণাগুলি দিয়ে। গণিতের পরবর্তী উন্নতির জন্য চলে যেতে হবে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে, যখন ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয় সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনীয়রা এবং নীল নদের অববাহিকায় প্রাচীন মিশরীয়রা সুশৃঙ্খল গণিতের প্রাচীনতম নিদর্শন রেখে গেছে। তাদের গণিতে পাটীগণিতের প্রাধান্য ছিল। জ্যামিতিতে পরিমাপ ও গণনাকে প্রাধান্য দেয়া হয়, স্বতঃসিদ্ধ বা প্রমাণের কোন নিদর্শন এগুলিতে পাওয়া যায় না।

ব্যাবিলনিয়ার গণিত সম্পর্কে আমরা জানতে পারি এই সভ্যতার নিদর্শনবাহী কাদামাটির চাঙড় থেকে, যেগুলির উপর ব্যাবিলনীয়রা কীলক আকৃতির খোদাই করে করে লিখত। এই লেখাগুলিকে কিউনিফর্ম বলা হয়। সবচেয়ে প্রাচীন চাঙড়গুলি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ সালের বলে ধারণা করা হয়। খোদাইগুলির বেশির ভাগ গণিতই ছিল বাণিজ্য বিষয়ক। ব্যাবিলনীয়রা অর্থ ও পণ্যদ্রব্য আদানপ্রদানের জন্য পাটীগণিত ও সরল বীজগণিত ব্যবহার করত। তারা সরল ও যৌগিক সুদ গণনা করতে পারত, কর গণনা করতে পারত, এবং রাষ্ট্র, ধর্মালয় ও জনগণের মধ্যে সম্পদ কীভাবে বন্টিত হবে তা হিসাব করতে পারত। খাল কাটা, শস্যাগার নির্মাণ ও অন্যান্য সরকারি কাজকর্মের জন্য পাটীগণিত ও জ্যামিতির ব্যবহার হত। শস্য বপন ও ধর্মীয় ঘটনাবলির জন্য পঞ্জিকা নির্ধারণেও গণিতের ব্যবহার ছিল।

বৃত্তকে ৩৬০টি ভাগে বা ডিগ্রীতে বিভক্ত করা এবং প্রতি ডিগ্রী ও মিনিটকে আরও ৬০টি ভাগে বিভক্ত করার রীতি ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে এসেছে। ব্যাবিলনীয়রাই একেক দিনকে ২৪ ঘণ্টায়, প্রতি ঘণ্টাকে ৬০ মিনিট ও প্রতি মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে ভাগ করে। তাদের সংখ্যা ব্যবস্থা ছিল ৬০-ভিত্তিক। ১-কে একটি কীলকাকৃতি খাঁজ দিয়ে নির্দেশ করা হত এবং এটি বারবার লিখে ৯ পর্যন্ত নির্দেশ করা হত। ১১ থেকে ৫৯ পর্যন্ত সংখ্যাগুলি ১ এবং ১০-এর জন্য ব্যবহৃত চিহ্ন ব্যবহার করে নির্দেশ করা হত। ৬০-এর চেয়ে বড় সংখ্যার জন্য ব্যাবিলনীয়রা একটি স্থাননির্দেশক চিহ্ন ব্যবহার করত। স্থানিক মানের এই ধারণার উদ্ভাবন গণনাকে অনেক এগিয়ে দেয়। এর ফলে একই প্রতীক বিভিন্ন স্থানে বসিয়ে একাধিক মান নির্দেশ করা সম্ভব হয়। ব্যাবলিনীয়দের সংখ্যা ব্যবস্থায় ভগ্নাংশও নির্দেশ করা যেত। তবে তাদের ব্যবস্থায় শূন্য ছিল না, এবং এর ফলে দ্ব্যর্থতার সৃষ্টি হয়।

ব্যাবিলনীয়রা বিপরীত সংখ্যা, বর্গ সংখ্যা, বর্গমূল, ঘন সংখ্যা ও ঘনমূল, এবং যৌগিক সুদের সারণী প্রস্তুত করেছিল। তারা ২-এর বর্গমূলের একটি ভাল আসন্ন মান নির্ধারণ করতে পেরেছিল। কিউনিফর্ম চাঙড়গুলি থেকে আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ব্যাবিলনীয়রা দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করেছিল এবং তারা দশটি অজানা রাশি বিশিষ্ট দশটি সমীকরণের ব্যবস্থা সমাধান করতে পারত।

খিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে এসে ব্যাবিলনীয়রা গণিত ব্যবহার করে চাঁদ ও গ্রহসমূহের গতি নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করে। এর ফলে তারা গ্রহগুলির দৈনিক অবস্থান পূর্বাভাসে সক্ষম হয়, যা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র --- দুই ক্ষেত্রেই তাদের কাজে আসে। 

জ্যামিতিতে ব্যাবিলনীয়রা সদৃশ ত্রিভুজের একই বাহুগুলির মধ্যে সমানুপাতিকতার সম্পর্কের ব্যাপারে অবহিত ছিল। তারা পীথাগোরাসের উপপাদ্য ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করতে পারত এবং অর্ধবৃত্তের উপর অঙ্কিত কোণ যে সমকোণ হয়, তা জানত। তারা সরল সমঢতলীয় বিভিন্ন চিত্র যেমন সুষম বহুভুজ, ইত্যাদির ক্ষেত্রফলের সূত্র এবং সরল ঘনবস্তুগুলির আয়তনের সূত্র বের করেছিল। তারা পাই-এর জন্য ৩-কে আসন্ন মান হিসেবে ব্যবহার করত।

মিশরীয়রা তাদের স্তম্ভগুলিতে হায়ারোগ্লিফের মাধ্যমে সংখ্যা অঙ্কিত করেছিল, কিন্তু মিশরীয় গণিতের আসল নিদর্শন হল আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দুইটি প্যাপিরাস। এগুলিতে পাটীগণিত ও জ্যামিতির নানা সমস্যা আছে, যার মধ্যে বাস্তব সমস্যা যেমন নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ তৈরির জন্য কতটুকু শস্য লাগবে, এক জাতের শস্য ব্যবহার করে মদের যে মান পাওয়া যায়, অন্য জাতের শস্য কতটুকু কাজে লাগিয়ে সেই একই মান পাওয়া যায়, তার সমস্যা।

মিশরীয় বেতন নির্ণয়ে, শস্যক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল ও শস্যাগারের আয়তন নির্ণয়ে, কর নির্ণয়ে ও নির্দিষ্ট কাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় ইটের সংখ্যা বের করতে গণিতকে কাজে লাগাত। এছাড়াও পঞ্জিকা গণনাতেও তারা গণিতভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহার করত। পঞ্জিকার সাহায্যে তারা ধর্মীয় ছুটির তারিখ ও নীল নদের বার্ষিক প্লাবনের সময় নির্দেশ করতে পারত।

মিশরীয়দের সংখ্যা ব্যবস্থা ছিল ১০-ভিত্তিক। তারা ১০-এর বিভিন্ন ঘাতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হায়ারোগ্লিফ প্রতীক ব্যবহার করত। তারা ১-এর প্রতীক পাঁচবার লিখে ৫, ১০-এর প্রতীক ৬ বার লিখে ৬০, আর ১০০-র প্রতীক ৩ বার লিখে ৩০০ নির্দেশ করত। একসাথে এই প্রতীকগুলি ৩৬৫ নির্দেশ করত।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে জার্মান গণিতবিদ ডাভিড হিলবের্ট একটি বক্তৃতায় তার তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করেন। হিলবের্ট গোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক আসনপ্রাপ্ত গণিতবিদ ছিলেন, যে আসনে এর আগে গাউস ও রিমান অধিষ্ঠিত ছিলেন। হিলবের্ট গণিতের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। জ্যামিতির ভিত্তি (১৮৯৯) নিয়ে তার ধ্রুপদী গবেষণা যেমন ছিল, তেমনি অন্যান্য গণিতবিদদের সাথে গণিতের ভিত্তি নিয়ে গবেষণাতেও তিনি অবদান রাখেন। প্যারিসের বক্তৃতায় হিলবের্ট ২৩টি গাণিতিক সমস্যা উপস্থাপন করেন এবং তার বিশ্বাস ছিল ২০শ শতকের গাণিতিক গবেষণার উদ্দেশ্য হবে এই সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে বের করা। বাস্তবিকপক্ষেই এই সমস্যাগুলি ২০শ শতকের সিংহভাগ গাণিতিক গবেষণাকর্মের জন্য উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছিল। যখনই কোনও গণিতবিদ একটি করে হিলবের্টের সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দিতেন, আন্তর্জাতিক গণিতবিদ সম্প্রদায় অধৈর্যের সাথে সেই সমাধানের বিশদ বিবরণের অপেক্ষায় থাকত।

যদিও উপরের সমস্যাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা সত্ত্বেও হিলবের্ট একটি ব্যাপার কল্পনায় আনতে পারেন নি, আর তা হল ডিজিটাল প্রোগ্রামযোগ্য গণকযন্ত্র তথা কম্পিউটারের উদ্ভাবন। কম্পিউটার গণিত নিয়ে গবেষণার প্রকৃতি পালটে দেয়। কম্পিউটারের উৎস হিসেবে পাস্কাল ও লাইবনিৎসের গণনাযন্ত্রিকা বা ক্যালকুলেটরকে গণ্য করা হলেও কেবল ১৯শ শতকে এসে ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজ এমন একটি যন্ত্র নকশা করতে সক্ষম হন যা কাগজের টুকরা বা ফিতাতে লেখা নির্দেশমালা অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাণিতিক ক্রিয়া সম্পাদন করতে সক্ষম ছিল। ব্যাবেজের কল্পনাপ্রসূত যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক প্রযুক্তি তার আমলে লভ্য ছিল না। রিলে, বায়ুশূন্য নল ও ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবনের পরে বড় মাপের প্রোগ্রামযোগ্য গণনা সম্পাদন করা সম্ভবপর হয়। এই প্রযুক্তিগত উন্নতি গণিতের বেশ কিছু শাখায় বড় ধরনের সাহায্য করে, যেমন সাংখ্যিক বিশ্লেষণ ও সসীম গণিতের মতো ক্ষেত্রগুলিতে। এছাড়া এর ফলে গণিতের নতুন নতুন শাখারও উদ্ভব হয়, যেমন অ্যালগোরিদমসমূহের গবেষণা। সংখ্যাতত্ত্ব, ব্যবকলনীয় সমীকরণ ও বিমূর্ত বীজগণিতের মত বিচিত্র সব ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এছাড়া কম্পিউটারের সুবাদে এমন সব গাণিতিক সমস্যা সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়, যেগুলি অতীতে করা সম্ভব ছিল না। যেমন ১৯শ শতকের মধ্যভাগে প্রস্তাবিত চার বর্ণ টপোগাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব হয়। চার বর্ণ উপপাদ্যটিতে বলা হয় যে যেকোনও মানচিত্র অঙ্কনের জন্য চারটি বর্ণ বা রঙই যথেষ্ট, সাথে শর্ত হল দুইটি পাশাপাশি দেশের বর্ণ ভিন্ন হতে হবে। ১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উচ্চ গণনক্ষমতাবিশিষ্ট কম্পিউটার ব্যবহার করে উপপাদ্যটি প্রমাণ করে দেখানো হয়।

আধুনিক বিশ্বে গণিতের ক্ষেত্রে জ্ঞান যে গতিতে অগ্রসর হয়েছে, তা অতীতে কখনও ঘটেনি। যেসমস্ত তত্ত্ব অতীতে একে অপর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হত, সেগুলিকে একীভূত করে সম্পূর্ণতর ও আরও বিমূর্ত তত্ত্ব গঠন করা হয়েছে। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলির সিংহভাগই সমাধান করা হয়েছে, বেশ কিছু সমস্যা যেমন রিমানের অনুমিতিটি এখনও মীমাংসিত হয়নি। একই সময়ে নতুন নতুন উদ্দীপনামূলক সমস্যা আবির্ভূত হয়ে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে গণিতের সবচেয়ে বিমূর্ত তত্ত্বগুলিও বাস্তবে প্রয়োগ খুঁজে পাচ্ছে।

গণিতে অঙ্ক হলো সংখ্যা প্রকাশক চিহ্ন। কোনো সংখ্যায় একটি অঙ্কের দুধরনের মান থাকে, নিজস্ব মান ও স্থানীয় মান। দশমিক সংখ্যা পদ্ধতিতে ০ থেকে শুরু করে ৯ পর্যন্ত দশটি অঙ্ক আছে। এছাড়াও রয়েছে আরো নানা ধরনের সংখ্যা পদ্ধতি যেমনঃ বাইনারি( দুই ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি), অক্টাল ( আট ভিত্তিক), হেক্সাডেসিমাল ( ষোলো ভিত্তিক)। তবে দশমিক সংখ্যা পদ্ধতিই বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংখ্যা পদ্ধতি ।

পরিমাণ বিষয়ক গবেষণার ভিত্তি হচ্ছে সংখ্যা। শুরুতেই আলোচিত হয় স্বাভাবিক সংখ্যা ও পূর্ণ সংখ্যা এবং এদের উপর সম্পন্ন বিভিন্ন গাণিতিক প্রক্রিয়া বা অপারেশন আলোচিত হয় পাটীগণিতে। পূর্নসংখ্যাগুলির গভীরতর ধর্মগুলি আলোচিত হয় সংখ্যাতত্ত্ব শাখায়। ফার্মার শেষ উপপাদ্য এই শাখার একটি বিখ্যাত ফলাফল। এখনও সমাধান হয়নি এরকম দুইটি সমস্যা হচ্ছে দ্বৈত মৌলিক সংখ্যা অনুমান এবং গোল্ডবাখের অনুমান।

আরও উন্নত সংখ্যাব্যবস্থায় পূর্ণসংখ্যাগুলি মূলদ সংখ্যার উপসেট হিসেবে পরিগণিত হয়। মূলদ সংখ্যাগুলি আবার বাস্তব সংখ্যার অন্তর্গত। বাস্তব সংখ্যাগুলি অবিচ্ছিন্ন রাশি বর্ণনা করতে ব্যবহার করা হয়। বাস্তব সংখ্যাগুলিকে আবার জটিল সংখ্যাতে সাধারণীকৃত করা হয়। জটিল সংখ্যাগুলিকে কোয়ার্টানায়ন ও অক্টোনায়োন-বিশিষ্ট সংখ্যাব্যবস্থায় সম্প্রসারিত করা যায়।

ফিল্ডস পদক হচ্ছে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার যেটি ১৯৩৬ সালে যাত্রা শুরু করে, বর্তমানে প্রতি চার বছর পরপর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরষ্কারটিকে গণিতে নোবেল পুরষ্কারের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তেইশটি উন্মুক্ত সমস্যার একটি বিখ্যাত তালিকা ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডাভিড হিলবের্ট তৈরি করেন যেটাকে বলা হয় Hilbert's problems. এই তালিকাটি গণিতবিদদের মধ্যে অনেক বড় আলোড়ন তৈরি করে। এই সমস্যা গুলোর মধ্যে নয়টি সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। সাতটি গুরুত্বর্পূণ সমস্যার একটি নতুন তালিকা Millennium Prize Problems নামে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়। এর প্রত্যেকটি সমস্যার সমাধানের জন্য এক মিলিওন ইউএস ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।




#Article 73: শ্রীনিবাস রামানুজন (1345 words)


শ্রীনিবাস রামানুজন (ডিসেম্বর ২২, ১৮৮৭ – এপ্রিল ২৬, ১৯২০) অসামান্য প্রতিভাবান একজন ভারতীয় গণিতবিদ। খুব অল্প সময় বাঁচলেও তিনি গণিতে সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে গেছেন। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে গাণিতিক বিশ্লেষণ, সংখ্যাতত্ত্ব, অসীম ধারা ও আবৃত্ত ভগ্নাংশ শাখায়, গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার রেখে যাওয়া নোটবুক বা ডায়েরি হতে পরবর্তীতে আরও অনেক নতুন সমাধান পাওয়া গেছে। ইংরেজ গণিতবিদ জি এইচ হার্ডি রামানুজনকে অয়েলার ও গাউসের সমপর্যায়ের গণিতবিদ মনে করেন। 
অবিভক্ত ভারতের মাদ্রাজের এক গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান রামানুজন ১০ বছর বয়সে গণিতের সঙ্গে পরিচিত হোন। তাকে এস এল লোনি লিখিত ‘’’ত্রিকোণমিতি’’’ পুস্তকটি দেওয়া হয় এবং তখন থেকে তিনি গণিতে সহজাত প্রতিভা প্রদর্শন করেন।  
১২ বছরের মধ্যে তিনি ঐ পুস্তকের বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জন করেন। এমন কি তিনি নিজে কিছু উপপাদ্য আবিস্কার করেন এবং স্বতন্ত্রভাবে অয়েলারের এককত্ব পুনরাবিষ্কার করেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি গণিতে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়ে পুরস্কার ও প্রশংসা লাভ করেন। ১৭ বছর বয়সে রামানুজন বার্নোলির সংখ্যা ও অয়েলার-মাসেরনি ধ্রুবকের ওপর নিজের গবেষণা সম্পন্ন করেন। কুম্বাকোটম সরকারি কলেজে পড়ার জন্য বৃত্তি পেলেও অ-গণিতীয় বিষয়ে ফেল করার কারণে তার বৃত্তি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি অন্য একটি কলেজে নিজের গাণিতিক গবেষণা শুরু করেন। এই সময় জীবন ধারণের জন্য তিনি মাদ্রাজ বন্দর ট্রাস্টের মহাহিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে কেরানি পদে যোগ দেন।

রামানুজন ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রদেশের তাঞ্জোর জেলার ইরেভদ শহরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কে শ্রীনিবাস ইয়েঙ্গার ছিলেন শহরের একটি কাপড়ের দোকানের হিসাবরক্ষক। তার মা কোমালাটাম্মাল একজন গৃহিণী ছিলেন এবং একটি স্থানীয় মন্দিরে গান গাইতেন। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন মহিলা। প্রচলিত আছে যে, রামানুজনের মায়ের বিয়ের পর বেশ কয়েকবছর কোন সন্তান না হওয়ায়, রামানুজনের মাতামহ নামাক্কল শহরের বিখ্যাত নামগিরি দেবীর নিকট নিজ কন্যা সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন। এরপরই জ্যেষ্ঠ সন্তান রামানুজন জন্মগ্রহণ করেন।

পাঁচ বছর বয়সে রামানুজনকে পাড়ার পাঠশালায় ভর্তি করা হয়। সাত বছর বয়সে তাকে কুম্ভকোনাম শহরের টাউন হাই স্কুলে ভর্তি করানো হয়। রামানুজন সাধারণত কম কথা বলতেন এবং মনে হতো তিনি কিছুটা ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তার অসাধারণ প্রতিভা স্কুল কর্তৃপক্ষের গোচরে আসে এবং তার প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে বৃত্তি দেওয়া হয়। তিনি বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বিভিন্ন গাণিতিক উপপাদ্য, গণিতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি  ও  এর মান যে কোন সংখ্যক দশমিক স্থান পর্যন্ত বলতে পারতেন। প্রথমে নিজের এই অদ্ভুত প্রতিভার বিচার তিনি নিজেই করতে পারেননি। তার এক বন্ধু তাকে জি. এস. কার (G S Carr)-এর লেখা সিনপসিস অফ এলিম্যনটারি রেজাল্ট ইন পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেম্যাটিক্‌স (Synopsis of elementary results in Pure and Applied Mathematics) বইটি পড়তে দেন। মূলত এই বইটি পড়েই তার গাণিতিক প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে। রামানুজন এই বইয়ে প্রদত্ত বিভিন্ন গাণিতিক সূত্রগুলির সত্যতা পরীক্ষা শুরু করেন। তার কাছে এগুলো ছিল মৌলিক গবেষণার মত, কারণ তার কাছে অন্য কোন সহায়ক গ্রন্থ ছিল না।

তিনি ম্যাজিক স্কোয়ার গঠনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এরপর তিনি জ্যামিতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর কাজ শুরু করেন। বৃত্তের বর্গসম্পর্কীয় তার গবেষণা পৃথিবীর বিষুবরৈখিক পরিধির দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতিতে নির্ণীত বিষুবরৈখিক পরিধির দৈর্ঘ্য এবং প্রকৃত মানের পার্থক্য মাত্র কয়েক ফুট ছিল। জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে তিনি বীজগণিতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। শোনা যায়, রামানুজন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার নোট বুকে কিছু লিখতেন। কী লিখছেন জিজ্ঞাসা করলে বলতেন যে, নামাক্কলের দেবী স্বপ্নে তাকে এই সব সূত্র দিয়ে প্রেরণা দিচ্ছেন। স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত এ সকল সূত্র তিনি পরীক্ষণ করতেন, যদিও তার পরীক্ষা পদ্ধতি খুব আনুষ্ঠানিক ছিলনা।

১৬ বছর বয়সে রামানুজন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ  হন ও জুনিয়র শুভ্রামানায়াম বৃত্তি লাভ করে কুম্ভকোনাম সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু গণিতের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার ফলে পরের পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হন এবং তার বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি কুম্ভকোনাম ত্যাগ করে প্রথমে বিশাখাপত্তনম এবং পরে মাদ্রাজ যান। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ফার্স্ট এক্সামিনেশন ইন আর্টস (F.A. বা I.A.) পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন এবং অকৃতকার্য হন। তিনি আর এই পরীক্ষা দেননি। এরপর কয়েক বছর তিনি নিজের মত গণিত বিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যান।

১৯০৯ সালে রামানুজন বিবাহ করেন। কিন্তু তার কোন স্থায়ী কর্মসংস্থান ছিলনা। প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি স্বভাবের বিপরীতে জীবিকা অন্বেষণের চেষ্টা চালাতে থাকেন। এ সময় তার ঘনিষ্ঠ একজন একটি পরিচয়পত্র দিয়ে চাকুরির সুপারিশ করে তাকে মাদ্রাজ শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে নিলোর শহরের কালেক্টর দেওয়ান বাহাদুর রামচন্দ্র রাও-এর কাছে প্রেরণ করেন। রামচন্দ্র রাও গণিতের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। রামানুজনের দুটি নোটবুক তার সকল গাণিতিক সূত্রের প্রতিপাদন ও এ-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় লিপিবদ্ধ ছিল। রামানুজন সম্পর্কে রামচন্দ্র রাও নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। নিচে কিছুটা তুলে ধরা হলো,

রামচন্দ্র রাও কিছুদিনের জন্য রামানুজনের সকল ব্যয়ভার বহন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু তার জন্য কোন বৃত্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় এবং রামানুজন দীর্ঘকাল অপরের গলগ্রহ হয়ে থাকতে সম্মত না হওয়ায় তিনি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে একটি সামান্য পদের চাকুরিতে যোগদান করেন। কিন্তু তার গবেষণা কর্ম এসবের জন্য কখনো ব্যহত হয়নি। পোর্ট ট্রাস্টে কাজ করার সময় কিছু লোকের সাথে তার পরিচয় হয় যারা তার নোটবুক নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন। এর সূত্র ধরে গণিত বিষয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সাথে তার যোগাযোগ হয়। ১৯১১ সালে তার প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ Journal of the Mathematical Society পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংখ্যাতত্ত্বের উপর তার গবেষণালব্ধ Some Properties of Bernoulli's Numbers নামে তার প্রথম দীর্ঘ প্রবন্ধ একই বছর প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে একই পত্রিকায় তার আরো দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং সমাধানের জন্য কিছু প্রশ্নও প্রকাশিত হয়।

রামচন্দ্র রাও মাদ্রাজ প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের মি. গ্রিফিথ-কে রামানুজনের ব্যাপারে বলেন। মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং-এর সঙ্গে মি. গ্রিফিথ এর আলাপ হওয়ার পর থেকেই রামানুজনের প্রতিভার স্বীকৃতি শুরু হয়। মাদ্রাজ শহরের বিশিষ্ট পন্ডিত শেশা আইয়ার এবং অন্যান্যদের পরামর্শে কেমব্রিজের ত্রিনিত্রি কলেজের ফেলো জি.এইচ. হার্ডির সঙ্গে রামানুজন যোগাযোগ শুরু করেন এবং তার বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে ইংরেজি ভাষায় একটি পত্র লেখেন। এই পত্রের সঙ্গে ১২০ টি উপপাদ্য সংযোজিত ছিল, তার ভিতর থেকে নমুনাস্বরূপ হার্ডি ১৫টি নির্বাচন করেন। হার্ডি মন্তব্য করেন
 এরপর হার্ডি ওই ১২০ টির মধ্যে কয়েকটি ইতিপূর্বে অন্য কোন গণিত বিশারদ প্রমাণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন। 

একটি গাণিতিক পদের জন্য ব্যবহৃত প্রতীক (notation) ১৯০৮ সালে এডমুন্ড ল্যান্ডাউ প্রথম উদ্ভাবন করেন। ল্যান্ডাউয়ের মত এত কিছু রামানুজনের ছিলনা। তিনি ফরাসী বা জার্মান ভাষায় কোন পুস্তক কখনো দেখেন নি, এমন কি ইংরেজি ভাষায় তার জ্ঞান এত দুর্বল ছিল যে কোন ডিগ্রির জন্য কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াও তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তিনি এমন কিছু বিষয় ও সমস্যার উপস্থাপনা করেছেন যা ইউরোপের অসামান্য প্রতিভাধর বিজ্ঞানীরা ১০০ বছর ধরে সমাধান করেছেন- এমন কি কিছু এখনো সমাধান হয়নি।

অনেকদিন ধরে হার্ডি রামানুজনকে ইংল্যান্ড নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন । রামানুজনের অনেক বন্ধু ও হিতৈষীর প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালের মে মাসে মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের কেরানির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং একটি বৃত্তি মঞ্জুর করা হয়। ঠিক এমনি সময়ে তিনি কেমব্রিজ থেকে  একটি আমন্ত্রণ পান। চাকুরিগত সমস্যার সমাধান হলেও জাতিপ্রথা ও মায়ের অনুমতির অভাবে প্রথমে রামানুজন দেশের বাইরে যেতে অসম্মতি জানান। হার্ডি লিখেছেন,
 কেমব্রিজ এর আমন্ত্রণে বিদেশে আসার অল্পদিন পরই রামানুজন ত্রিনিত্রি কলেজের ফেলোশিপ পেয়ে যান। এই সময় মাদ্রাজ থেকে প্রাপ্ত বৃত্তির পরিমাণ ছিল বার্ষিক ২৫০ পাউন্ড; তার ৫০ পাউন্ড দেশে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য দিতে হত। এছাড়া ত্রিনিত্রি কলেজ থেকে ভাতা বাবদ ৫০ পাউন্ড পেতেন। রামানুজন সম্পর্কে হার্ডি লিখেছেন,
গণিতবহির্ভূত বিষয়ে রামানুজনের আগ্রহে অদ্ভুত বৈপরীত্য ছিল। শিল্প ও সাহিত্যে তার প্রায় কোনরূপ উৎসাহ ছিলনা।

তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু। ধর্মীয় অনুশাসন পালনে তিনি যথেষ্ট কঠোরতা অবলম্বন করতেন। তার মতে, পৃথিবীর সব ধর্মই কমবেশি সত্য। তিনি নিরামিষভোজী ছিলেন। তিনি যতদিন কেমব্রিজ ছিলেন, সবসময় স্বপাক আহার করতেন এবং বাইরের পোশাক পরিধান করতেন।

১৯১৭ সালের বসন্তকালের প্রথমে রামানুজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে কেমব্রিজের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়। এরপর তিনি আর কখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন নি। তাকে ওয়েলস, ম্যালটক এবং লন্ডন শহরের স্বাস্থ্যনিবাসে ভর্তি করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর তার শারীরিক কোন উন্নতি দেখা যায়নি। এই সময় রামানুজন রয়েল সোসাইটি-র সদস্য নির্বাচিত হন। গবেষণা কাজে অধিক মনোযোগ দেওয়ার ফলে তার সবচেয়ে মূল্যবান উপপাদ্যগুলো এই সময় আবিষ্কৃত হয়। তিনি নির্বাচিত ত্রিনিত্রি ফেলো ছিলেন। ১৯১৯ সালে রামানুজন ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। কিছুকাল যক্ষ্মারোগে ভোগার পর ১৯২০ সালের ২৬ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

রামানুজনের কিছু গোপন রহস্য ছিল ধারণা করা হলেও হার্ডি তার মন্তব্যে এ কথা ভিত্তিহীন বলেছেন। তবে একথা হার্ডি অস্বীকার করেন নি যে রামানুজনের স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। রামানুজন অদ্ভুত উপায়ে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে পারতেন। 
মি. লিট্‌লউড মন্তব্য করেছেন যে, প্রত্যেক ধনাত্নক সংখ্যা রামানুজনের বন্ধু ছিল। 
হার্ডি লিখেছেন

গণিতের ক্ষেত্রে, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রামানুজন এমন অনেক গাণিতিক সূত্রের উদ্ভাবন করেন যেগুলো বহুকাল পরে প্রমাণ হয়। প্রমাণ করতে গিয়ে গবেষণার অনেক নতুন দিকের সূচনা হয়। রামানুজন  এর অনন্ত ধারা উদ্ভাবন করেন। রামানুজনের  এর ধারা  সম্পর্কীয় সকল ধারাকে এত দ্রুত একত্রিত করেছে যে, আধুনিক অ্যালগরিদমের সকম ক্ষেত্রে তার ধারা-ই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ,




#Article 74: আর্কিমিডিস (2177 words)


আর্কিমিডিস (প্রাচীন গ্রিক ভাষায়: Ἀρχιμήδης আর্খিম্যাদ্যাস্‌, বর্তমান গ্রিক ভাষায় Αρχιμήδης আর্খ়িমিদ়িস্‌) বা সিরাকাসের আর্কিমিডিস (খ্রি.পূ. ২৮৭-২১২) একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। যদিও তার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে, তবুও তাকে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদার্থবিদ্যায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে স্থিতিবিদ্যা আর প্রবাহী স্থিতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন এবং লিভারের কার্যনীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যাপ্রদান। পানি তোলার জন্য আর্কিমিডিসের স্ক্রু পাম্প, যুদ্ধকালীন আক্রমণের জন্য সীজ (ইংরেজি: siege সীঝ়্‌) ইঞ্জিন ইত্যাদি মৌলিক যন্ত্রপাতির ডিজাইনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তার নকশাকৃত আক্রমণকারী জাহাজকে পানি থেকে তুলে ফেলার যন্ত্র বা পাশাপাশি রাখা একগুচ্ছ আয়নার সাহায্যে জাহাজে অগ্নিসংযোগের পদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

আর্কিমিডিসকে সাধারণত প্রাচীন যুগের সেরা এবং সর্বাকালের অন্যতম সেরা গণিতজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি মেথড অফ এক্সহশন ব্যবহার করে অসীম ধারার সমষ্টিরূপে প্যারাবোলার বক্ররেখার অন্তগর্ত ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করেন এবং পাই -এর প্রায় নিখুঁত একটি মান নির্ণয় করেন। এছাড়াও তিনি আর্কিমিডিসের স্পাইরালের সংজ্ঞা দেন, বক্রতলের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের সূত্র প্রদান করেন এবং অনেক বড় সংখ্যাকে সহজে প্রকাশ করার একটি চমৎকার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

যদিও রোমানরা আর্কিমিডিসের কোন ক্ষতি করার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু রোমানদের সিরাকিউজ অবরোধের সময় এক রোমান সৈন্যের হাতেই আর্কিমিডিস নিহত হন। রোমান দার্শনিক সিসেরো আর্কিমিডিসের সমাধীর উপরে একটি সিলিন্ডারের ভেতরে আবদ্ধ একটি গোলকের উল্লেখ করেছেন। আর্কিমিডিস প্রমাণ করেছিলেন যে সিলিন্ডারের ভেতর আবদ্ধ গোলকটির আয়তন এবং ভূমির ক্ষেত্রফল উভয়ই সিলিন্ডারের দুই তৃতীয়াংশ, যা আর্কিমিডিসের সেরা গাণিতিক অর্জনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

প্রাচীনকালে আর্কিমিডিসের গাণিতিক রচনাগুলি তার উদ্ভাবনগুলোর মত পরিচিত ছিল না। আলেকজান্দ্রিয়ার গণিতবিদরা তার লেখা পড়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখও করেছেন, কিন্তু আনুমানিক ৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিক
স্থপতি ইসেডোর অফ মিলেতাস সর্বপ্রথম তার সকল রচনা একত্রে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিক গণিতবিদ ইউতোশিয়াস আর্কিমিডিসের কাজের উপর একটি বিবরণ প্রকাশ করেন, যা তাকে প্রথমবারের মত বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পরিচিত করে তোলে। আর্কিমিডিসের কাজের খুব কম লিখিত দলিল মধ্যযুগের পর অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু সেই অল্পকিছু দলিলই পরবর্তীকালে রেনেসাঁ যুগের বিজ্ঞানীদের কাছে খুবই উপকারী বলে বিবেচিত হয়। ১৯০৬ সালে আর্কিমিডিসের একটি নতুন পাণ্ডুুুলিপি আবিষ্কৃত হয় যা তার গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতির উপর নতুনভাবে আলোকপাত করে।

আর্কিমিডিস আনুমানিক ২৮৭ খৃস্টপূর্বাব্দে তৎকালীন বৃহত্তর গ্রিসের উপনিবেশ সিসিলি দ্বীপের সিরাকিউজ নামের বন্দর নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাইজান্টাইন গ্রিক ঐতিহাসিক জন যেতজেসের বিবরণ অনুযায়ী আর্কিমিডিস পঁচাত্তর বছর বয়সে মারা যান, সেখান থেকে তার জন্মসাল সম্পর্কে ধারণা করা হয়। দ্য স্যান্ড রেকোনার নামক দলিলে আর্কিমিডিস তার বাবার নাম ফিডিয়াস বলে উল্লেখ করেন। ফিডিয়াস একজন জ্যোতির্বিদ ছিলেন, যাঁর সম্পর্কে আর কিছু জানা সম্ভব হয়নি। ঐতিহাসিক প্লুটার্খ তার দ্য প্যারালাল লাইভস নামক জীবনী গ্রন্থে আর্কিমিডিসকে সিরাকিউজের রাজা দ্বিতীয় হিয়েরোর আত্মীয় বলে উল্লেখ করেন।
আর্কিমিডিসের বন্ধু হেরাক্লিডিস তার একটি জীবনী লিখেছিলেন, কিন্তু সেটি পরবর্তীতে হারিয়ে যায়।  আর্কিমিডিসের জীবনের অনেক খুঁটিনাটি তথ্য তাই আর জানা যায়নি। যেমন তিনি বিয়ে করেছিলেন কিনা, তার কোন সন্তান ছিল কিনা এগুলো এখনো অজানা। যৌবনে আর্কিমিডিস সম্ভবত মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পড়াশুনা করেছিলেন, যেখানে কোনোন অভ সামোস এবং এরাতোস্থেনেস অফ সিরেন তার সহপাঠী ছিলেন। তিনি কোনোন অভ সামোসকে তার বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন; অপরদিকে তার দুটি কাজের ( দ্য মেথোড অভ মেকানিক্যাল থিওরেমস এবং দ্য ক্যাটল প্রবলেম) শুরুতে এরাতোস্থেনেসের উদ্দেশ্যে কিছু নির্দেশনা ছিল।

২১২ খৃস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় আর্কিমিডিস নিহত হন, যখন রোমান সেনাপতি জেনারেল মার্কাস ক্লডিয়াস মার্সেলাস দুই বছর ধরে অবরোধের পর সিরাকিউজ শহর দখল করেন। প্লুটার্খের বিবরণ অনুযায়ী, সিরাকিউজের পতনের সময় আর্কিমিডিস একটি গাণিতিক চিত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এক রোমান সৈন্য তাকে কাজ বন্ধ করে জেনারেল মার্সেলাসের সাথে দেখা করতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আর্কিমিডিস তার কাজ শেষ না করে যেতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষিপ্ত সৈনিক তার তলোয়ার দিয়ে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করে। অন্য একটি স্বল্প প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, আর্কিমিডিস এক রোমান সৈন্যের কাছে আত্মসমর্পণের সময় নিহত হন। এই মতবাদ অনুসারে, তিনি কিছু গাণিতিক সরঞ্জাম বহন করছিলেন যেগুলোকে সৈন্যটি মূল্যবান সম্পদ ভেবে বিভ্রান্ত হয় এবং লোভে পড়ে তাকে হত্যা করে। বলা হয়ে থাকে যে, জেনারেল মার্সেলাস আর্কিমিডিসের বৈজ্ঞানিক প্রতিভা সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তিনি তার কোন ক্ষতি না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর্কিমিডিসের মৃত্যুসংবাদ তাই তাকে ক্ষুব্ধ করে।

আর্কিমিডিসের সমাধিফলকে একটি ভাস্কর্য রয়েছে যা সমান উচ্চতা ও ব্যাসের একটি গোলক ও একটি সিলিন্ডার নিয়ে গঠিত, যা তার সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কারগুলোর একটিকে নির্দেশ করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সমান উচ্চতা ও ব্যাসবিশিষ্ট একটি গোলক ও একটি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে গোলকটির আয়তন ও পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সিলিন্ডারের আয়তন ও পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফলের দুই তৃতীয়াংশ। আর্কিমিডিসের মৃত্যুর ১৩৭ বছর পর ৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বক্তা সিসেরো সিরাকিউজের এগ্রিজেনটিন গেইটের কাছে ঝোপঝাড় পরিবেষ্টিত অবস্থায় আর্কিমিডিসের কবর আবিষ্কার করেন।

আর্কিমিডিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি ছিল অনিয়মিত আকারের বস্তুর আয়তন পরিমাপের পদ্ধতি। ভিট্রুভিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, রাজা দ্বিতীয় হিয়েরোর জন্য লরেল পাতার মুকুটের মত দেখতে একটি সোনার মুকুট প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর্কিমিডিসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মুকুটটি খাঁটি সোনার কিনা সেটা নিশ্চিত করার। সহজ পদ্ধতি ছিল মুকুটটি গলিয়ে তার ঘনত্ব নির্ণয় করা, কিন্তু রাজা মুকুটটি নষ্ট করতে রাজি ছিলেন না। আর্কিমিডিস যখন এ সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন, তখন হঠাৎ গোসল করতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন যে তিনি পানিতে নামা মাত্রে বাথটাবের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারেন যে পানির এই ধর্মকে ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহার করা সম্ভব। যেহেতু ব্যবহারিক কাজের জন্য পানি অসংকোচনশীল, তাই পানিতে নিমজ্জিত মুকুট তার আয়তনের সমান পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত করবে। এই অপসারিত পানির আয়তন দ্বারা মুকুটের ভরকে ভাগ করে মুকুটের ঘনত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। যদি মুকুটের উপাদানে সোনার সাথে অন্য কোন কম ঘনত্বের সস্তা ধাতু যোগ করা হয় তাহলে তার ঘনত্ব খাঁটি সোনার ঘনত্বের চেয়ে কম হবে। বলা হয়ে থাকে যে এই আবিষ্কার আর্কিমিডিসকে এতই উত্তেজিত করেছিল যে তিনি নগ্ন অবস্থায় শহরের রাস্তায় ইউরেকা (গ্রিক: εὕρηκα! ; অর্থ আমি পেয়েছি!) বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে শুরু করেছিলেন।

বাস্তবে আর্কিমিডিসের আবিষ্কৃত এই পদ্ধতিটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল, কারণ ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে যে পরিমাণ পানি অপসারিত হবে সেটি সঠিকভাবে নির্নয় করা একটি কষ্টসাধ্য কাজ। এই সমস্যার সমাধান করা হয় fluid statics এর মাধ্যমে যেটি আর্কিমিডিস তত্ত্ব নামে পরিচিত। তত্ত্বটি তার On Floating Bodies প্রবন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। তত্ত্বে বলা হয়েছে যে , কোন বস্তুর ওজন এটি দ্বারা অপসারিত পানির ওজনের সমান। 

আর্কিমিডিসের প্রকৌশল কাজের অধিকাংশই ছিল তার নিজ শহর সিরাকিউজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। গ্রিক লেখক অথেনিয়াস অভ নক্রেটিসের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজা দ্বিতীয় হিয়েরো আর্কিমিডিসকে একটি বিশাল জাহাজ তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সিরাকিউসা নামের এই জাহাজটিকে প্রয়োজনানুযায়ী প্রমোদতরী, রসদ-সরবরাহকারী এবং রণতরী হিসেবে ব্যবহার করে যেত। বলা হয়ে থাকে যে ক্লাসিকাল যুগে নির্মাণ করা সকল জাহাজের মধ্যে সিরাকিউসা ই ছিল সর্ববৃহৎ। অথেনিয়াসের ধারণামতে, এই জাহাজে একসাথে ছয়শো যাত্রী বহন করা যেত এবং জাহাজটিতে সাজানো বাগান, একটি ব্যায়ামাগার এবং দেবী আফ্রোদিতির মন্দির ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এত বৃহদাকৃতির একটি জাহাজে প্রচুর পানি চুঁইয়ে ঢুকতো। সেই পানি নির্গমণের জন্য আর্কিমিডিস তার বিখ্যাত আর্কিমিডিসের স্ক্রু তৈরি করেন। এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি সিলিন্ডারের ভেতরে আবদ্ধ একটি স্ক্রু আকৃতির ঘূর্ণায়মান ধাতব ব্লেড যাকে হাত দিয়ে ঘুরানো হত। এই যন্ত্রটি খাল থেকে উঁচু জমিতে সেচের জন্যও ব্যবহার করা হত। বর্তমানকালেও পানি এবং কয়লা, শস্যদানা জাতীয় ক্ষুদ্রাকৃতির পদার্থ উত্তোলনের জন্য আর্কিমিডিসের স্ক্রু ব্যবহার করা হয়। ভিট্রুভিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, আর্কিমিডিসের স্ক্রু সম্ভবত প্রাচীন ব্যবিলনের শুন্যোদ্যানে জলসেচনের জন্য ব্যবহৃত স্ক্রু পাম্পের একটি উন্নততর রূপ ছিল। 

দ্বিতীয় শতকের লেখক লুসিয়ানের বর্ণনা অনুযায়ী, সিরাকিউজ যখন আক্রান্ত হয়, আর্কিমিডিস শত্রুপক্ষের জাহাজ আগুনে ভস্মীভূত করেন। ট্রেলসের এনথেমিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, আর্কিমিডিস অনেকগুলি আয়নার সাহায্যে আক্রমণকারী জাহাজের উপর সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত করে সেগুলোতে অগ্নিসংযোগ করেন।

রেনেসাঁ যুগ থেকেই অবশ্য এই জনশ্রুতির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। রেনে দেকার্ত একে অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যদিও বর্তমানকালের বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র আর্কিমিডিসের যুগে সহজলভ্য যন্ত্রপাতির সাহায্যে এই প্রক্রিয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনেকের ধারণা, সারিবদ্ধভাবে সাজানো অনেকগুলো চকচকে পলিশ করা ব্রোঞ্জ বা তামার পাতের সাহায্যে জাহাজের উপর সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব। এতে প্রকৃতপক্ষে সৌরচুল্লীতে ব্যবহৃত পরাবৃত্তিক প্রতিফলনের নীতি ব্যবহার করা হবে।

১৯৭৩ সালে গ্রিক বিজ্ঞানী ইওয়ান্নিস সাক্কাস আর্কিমিডিসের সূর্যরশ্মি নিয়ে একটি পরীক্ষা চালান। এ পরীক্ষায় তিনি সত্তুরটি আয়না ব্যবহার করেন। প্রতিটি আয়নার আকার ছিল পাঁচ ফুট বনাম তিন ফুট এবং এগুলো তামা দ্বারা পালিশ করা ছিল। আয়নাগুলো একশো ষাট ফুট দূরবর্তী একটি প্লাইউড নির্মিত জাহাজের দিকে তাক করা ছিল। আয়নাগুলো ঠিকমত ফোকাস করার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। অবশ্য জাহাজটিতে আলকাতরার প্রলেপ ছিল, যা সম্ভবত অগ্নিসংযোগের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। 

২০০৫ এর অক্টোবরে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অভ টেকনোলজির একদল ছাত্র ১২৭টি এক ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট আয়না প্রায় ১০০ ফুট দূরবর্তী একটি কাঠের ডামি জাহাজের উপর ফোকাস করে একটি পরীক্ষা চালায়। প্রায় দশ মিনিট উজ্জ্বল সূর্যালোকে এক জায়গায় থাকার পর জাহাজটিতে আগুন জ্বলে ওঠে। এ পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্তে আসা হয় যে এ প্রক্রিয়ায় অগ্নিসংযোগ সম্ভব তবে তা শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে। মিথবাস্টার্স টেলিভিশন শোতে এমআইটির এই শিক্ষার্থীরা পুনরায় একই পরীক্ষা চালায়, এবার সানফ্রান্সিসকো ঊপকূলে একটি কাঠের মাছধরা নৌকার উপর। এবারও বেশ কিছু সময় পর ছোট আকারে নৌকাটিতে আগুন জ্বলে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে আগুন জ্বলে ওঠার জন্য কাঠকে তার দহন তাপমাত্রায় পৌছতে হয় যা প্রায় তিনশো ডিগ্রি সেলসিয়াসের সমান।

২০০৬ এর জানুয়ারিতে অণুষ্ঠানটি সম্প্রচারের সময় মীথবাস্টার্স সিদ্ধান্ত দেয় যে এটি প্রকৃতপক্ষে জনশ্রুতি, সত্য নয়। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে অগ্নিসংযোগের জন্য দীর্ঘ সময় এবং ঊজ্জ্বল সূর্যালোকের প্রয়োজনীয়তার দিকে নির্দেশ করা হয়। এছাড়াও বলা হয় যে সিরাকিউজ পূর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়েছিল, সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র সকাল বেলার আক্রমণই এ পদ্ধতিতে মোকাবেলা করা সম্ভব। মীথবাস্টার্সে এ কথাও মনে করিয়ে দেয়া হয় যে সেসময় প্রচলিত অন্যান্য অস্ত্র, যেমন অগ্নিসংযোগ করা তীর অথবা ক্যাটাপোল্টের বোল্ট ব্যবহার করে আরো সহজে কোন জাহাজে দূর থেকে অগ্নিসংযোগ করা সম্ভব ছিল।

যদিও আর্কিমিডিস নিজে লিভার উদ্ভাবন করেননি, তিনিই প্রথম লিভারের কার্যনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাপ্পাস অভ আলেকজান্দ্রিয়ার কথা অনুযায়ী, লিভারের মূলনীতি বোঝাতে গিয়ে আর্কিমিডিস বলেছিলেন, আমাকে একটা দাঁড়ানোর জায়গা দাও, আমি পৃথিবীকে তুলে সরিয়ে দেব। প্লুটার্খ ব্যাখ্যা করেছেন আর্কিমিডিস কিভাবে ব্লক-এন্ড-ট্যাকল পুলি ডিজাইন করেন, যা নাবিকদের লিভারের মুলনীতি ব্যবহার করে অনেক ভারী বস্তু সরাতে সাহায্য করে। এছাড়াও আর্কিমিডিস ক্যাটাপোল্টের ক্ষমতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করেন এবং প্রথম পিউনিক যুদ্ধের সময় ওডোমিটার আবিষ্কার করেন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ওডোমিটার ছিল একটি গীয়ারযুক্ত ঠেলাগাড়ি যা প্রতি মাইল চলার পর একটি পাত্রে ছোট একটি গোলক ফেলে দিত।

সিসেরো (খৃষ্টপূর্ব ১০৬ - ৪৩) তার De re publica নামক কাল্পনিক কথোপকথনে আর্কিমিডিসের উল্লেখ করেন। সিরাকিউজ দখলের পর রোমান সেনাপতি মার্কাস ক্লদিয়াস মার্সেলাস রোমে দুটি যন্ত্র নিয়ে যান। এই যন্ত্রগুলির সাহায্যে সূর্য, চাঁদ এবং পাঁচটি গ্রহের স্থান পরিবর্তন দেখানো যেত, যা জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যবহৃত হত। একসময় ধারণা করা হত যে এমন যন্ত্র তৈরি করার জন্য যে পরিমাণ যন্ত্রকৌশলগত জ্ঞান থাকা লাগে তা এত প্রাচীনকালে ছিল না, কিন্তু ১৯০২ সালে এন্টিকাইথেরা মেকানিজমের খোঁজ পাওয়ার পর বোঝা যায় যে প্রাচীন গ্রিকদের এসব বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল।

যদিও আর্কিমিডিসকে বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হয়, কিন্তু তিনি গণিতেও অনেক অবদান রাখেন। প্লুটার্খ লিখেছেন, তাঁর সমুদয় ভালোবাসা এবং উচ্চাকাঙ্খা ছিল সেসব তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতি যেখানে তাঁকে বাস্তব জীবনের প্রয়োজন নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না।

আর্কিমিডিস বর্তমানে ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাসে ব্যবহৃত অতিক্ষুদ্র সংখ্যার ধারণা ব্যবহার করতে সক্ষম ছিলেন। প্রুফ অভ কন্ট্রাডিকশন ব্যবহার করে তিনি নিখুঁতভাবে বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারতেন, সেই সাথে সেসব সমাধানের লিমিটও উল্লেখ করতেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় মেথড অভ এক্সহশন, যার সাহায্যে তিনি পাইয়ের মান যথেষ্ট নিখুঁতভাবে নির্ণয় করেন। তিনি এই কাজের জন্য বৃত্তের বাইরে একটি বড় বহুভুজ এবং ভেতরে একটি ছোট বহুভুজ আঁকেন। বহভুজের বাহুর সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, তা আকৃতিতে বৃত্তের তত কাছাঁকাছি আসতে থাকে। যখন প্রতিটি বহুভুজের ৯৬টি করে বাহু, তিনি বহুগুলির দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেন এবং দেখান যে পাইয়ের মান ২২/৭ (প্রায় ৩.১৪২৯) এবং ২২৩/৭১ (প্রায় ৩.১৪০৮) এর মাঝে, যা প্রকৃত মান ৩.১৪১৬ এর খুবই কাছাঁকাছি। তিনি আরও প্রমাণ করেন যে বৃত্তের ক্ষেত্রফল তার ব্যাসার্ধের বর্গের পাই গুণিতকের সমান। অন দ্য স্ফীয়ার এন্ড সিলিন্ডার বইতে তিনি মতবাদ প্রদান করেন যে, যে কোন মানকে তার নিজের সাথে যথেষ্ট সংখ্যক বার যোগ করলে তা যে কোন নির্দিষ্ট মানকে অতিক্রম করবে। এই মতবাদ বাস্তব সংখ্যার আর্কিমিডিয়ান বৈশিষ্ট্য নামে পরিচিত।

মেজারমেন্ট অভ সার্কেল বইতে আর্কিমিডিস ৩ এর বর্গমূল ২৬৫/১৫৩ (প্রায় ১.৭৩২০২৬১) এবং ১৩৫১/৭৮০ (প্রায় ১.৭৩২০৫১২) এর মাঝে বলে উল্লেখ করেন, যা প্রকৃত মান ১.৭৩২০৫৮ এর খুবই কাছাঁকাছি। তিনি অবশ্য কোন পদ্ধতিতে এই মান নির্ণয় করেছিলেন সে প্রসঙ্গে কোন কিছুই উল্লেখ করেননি।

কোয়াড্রেচার অভ প্যারাবোলা বইতে আর্কিমিডিস প্রমাণ করেন যে একটি পরাবৃত্ত এবং একটি সরলরেখা দ্বারা আবদ্ধ ক্ষেত্রে ক্ষেত্রফল একই ক্ষেত্রের অন্তঃস্থ ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের ৪/৩ গুণিতকের সমান, যা পাশের চিত্রে দেখানো হয়েছে। তিনি এ সমস্যার সমাধানটিকে একটি অসীম ধারা হিসেবে প্রকাশ করেন যার সাধারণ অণুপাত ১/৪।

দ্য স্যান্ড রেকোনার বইতে আর্কিমিডিস এই মহাবিশ্ব মোটা কতগুলো ধূলিকণা ধারণ করতে সক্ষম তা গণনা করার চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে তিনি ধূলিকণার সংখ্যা গণনা করার জন্য অনেক বেশি বড় এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তিনি মিরিয়াডের ভিত্তিতে গণনা করার একটি পদ্ধতি বের করেন। মিরিয়াড শব্দটি গ্রিক μυριάς murias থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ১০,০০০। তিনি ১০০ মিলিয়নকে (মিরিয়াডের মিরিয়াড) ভিত্তি করে একটি নাম্বার সিস্টেম প্রস্তাব করেন এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে মহাবিশ্বকে সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ করতে ৮ ভিজিনটিলিয়ন ( ৮ x ১০৬৩) ধূলিকণা প্রয়োজন।

আর্কিমিডিস তার কাজের লিখিত রূপের জন্য ডরিক গ্রিক ভাষা ব্যবহার করতেন, যা প্রাচীন সিরাকিউজের আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে প্রচলিত ছিল। . আর্কিমিডিসের অধিকাংশ কাজ ইউক্লিডের কাজের মত সংরক্ষিত হয়নি; তার সাতটি থীসিসের কথা জানা যায় কেবলমাত্র অন্যদের কাজের রেফারেন্স থেকে। পাপ্পাস অভ আলেকজান্দ্রিয়া আর্কিমিডিসের অন স্ফীয়ার মেকিং এবং বহুতল বিশিষ্ট বস্তুর উপর আরএকটি কাজের কথা উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে থেরন অভ আলেকজান্দ্রিয়া প্রতিসরণ সম্পর্কে আর্কিমিডিসের হারিয়ে যাওয়া একটি লেখনী Catoptrica এর উল্লেখ করেন। জীবদ্দশায় আর্কিমিডিস তার কাজের প্রচারের জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার গণিতবিদদের উপর নির্ভর করতেন। বাইজান্টাইন স্থপতি ইসিডোর অভ মিলেতাস আর্কিমিডিসের লেখনীগুলোকে একত্রিত করেন; পরবর্তীতে ষষ্ঠ শতকে ইউতোশিয়াস অভ আসকালোন তার কাজের উপর লিখিত বিবরণ প্রকাশ করার পর আর্কিমিডিসের কাজ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। আর্কিমিডিসের কাজ থাবিত ইবনে কুররা (৮৩৬-৯০১ খ্রিষ্টাব্দ) আরবিতে এবং জেরার্ড অভ ক্রেমোনা (১১৪৭-১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। রেনেসাঁর সময় ১৫৪৪ সালে জোহান হেরওয়াগেন সুইজারল্যান্ডের বাজল শহর থেকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় আর্কিমিডিসের কাজ সহ এডিটিও প্রিন্সেপস (Editio Princeps) বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেন।  ১৫৮৬ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি বাতাস ও পানিতে ধাতব বস্তুর ওজন নির্ণয়ের জন্য একটি হাইড্রোস্ট্যাটিক নিক্তি উদ্ভাবন করেন, যা আর্কিমিডিসের কাজ দ্বারা অণুপ্রাণিত বলে বলা হয়ে থাকে। 

 




#Article 75: জন ভন নিউম্যান (344 words)


জন ভন নিউম্যান (ইংরেজি: John von Neumann জন্‌ ভ়ন্‌ নিউমান্‌, হাঙ্গেরীয়: Margittai Neumann János Lajos মর্গিত্তই ন্যাউমান্‌ য়ানোশ্‌ লয়োশ্‌) (২৮শে ডিসেম্বর, ১৯০৩ - ৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭) একজন হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভুত মার্কিন গণিতবিদ যিনি সেটতত্ত্ব, জ্যামিতি, প্রবাহী গতিবিদ্যা, অর্থনীতি, যোগাশ্রয়ী প্রোগ্রামিং, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান সহ আরো অনেক ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। নিউম্যান কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় অপারেটর তত্ত্ব ব্যবহারের পথিকৃৎ।

ভন নিউম্যান হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ব্যাংকের উকিল ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ভন নিউম্যান ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। ৬ বছর বয়সে তিনি ৮-অঙ্কের সংখ্যা মনে মনে ভাগ করতে পারতেন এবং বাবার সাথে প্রাচীন গ্রিকে কথা বলতে পারতেন। তিনি ৮ বছর বয়সেই ৪৪ খন্ডের বিশ্বের ইতিহাস পড়া শেষ করে ফেলেন। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হবার আগে ভন নিউম্যান মাইকেল ফেকেটের সাথে মিলে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। হেরমান ভাইল ও এরহার্ড শ্মিট-এর কাজ তাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বার্লিন ও হামবুর্গে শিক্ষকতা করেন। ১৯৩০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ও ১৯৩৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ-এ অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি মার্কিন অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন।

ভন নিউম্যান হাড়ের ক্যান্সারে অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় ভুগে মারা যান। ধারণা করা হয় মার্কিন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পরীক্ষার সময় তেজস্ক্রিয় বিকিরণে তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত হন। তিনি প্রায় ১৫০টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ৬০টি বিশুদ্ধ গণিত, ২০টি পদার্থবিজ্ঞান ও ৬০টি ফলিত গণিতের ওপর লেখা। মৃত্যুর আগে তিনি মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের ওপর একটি তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন।

ভন নিউম্যান প্রথমে সেট তত্ত্ব, বাস্তব চলকের ফাংশনসমূহের তত্ত্ব এবং গণিতের ভিত্তি-র ওপর আগ্রহী ছিলেন। তিনি সেট তত্ত্বের স্বতঃসিদ্ধায়নে (Axiomatization) অবদান রাখেন। একই সাথে তিনি কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের গাণিতিক ভিত্তির ওপরেও আগ্রহী ছিলেন। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি হিলবার্ট জগতসমূহ অধ্যয়ন করেন এবং এগুলোর রিং অপারেটর সংক্রান্ত তত্ত্বের মৌলিক ফলাফলগুলো বের করেন। রিং অপারেটরের তত্ত্ব আরো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অবিচ্ছিন্ন জ্যামিতির ধারণা উপস্থাপন করেন। এছাড়া তিনি গ্রুপসমূহের প্রায় পর্যায়বৃত্ত ফাংশনসমূহের তত্ত্ব দেন এবং কমপ্যাক্ট গ্রুপ সংক্রান্ত হিলবার্টের ৫ম সমস্যার সমাধান করেন। কর্মজীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ক্রীড়া তত্ত্ব (Game Theory) ও কম্পিউটার নকশাকরণে (Computer design) অবদান রাখেন। আধুনিক কম্পিউটারের মূল স্থাপত্যকে তার নামানুসারে ভন নিউম্যান স্থাপত্য বা Von neumann architecture বলা হয়ে থাকে।




#Article 76: এভারিস্ত গালোয়া (812 words)


এভারিস্ত গালোয়া (ফরাসি ভাষায়:Évariste Galois) (অক্টোবর ২৫, ১৮১১ - মে ৩১, ১৮৩২) একজন ফরাসি গণিতবিদ। গ্রুপ থিওরী তিনি শুরু করেন। তার একটি মাত্র চিঠিতে (কশির কাছে লেখা) তিনি প্রমাণ করেন যে, পঞ্চম বা তার বেশি মাত্রার পলিনমিয়ালের সাধারণ সমাধান মূলকের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আবিষ্কারটি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি যে উপায়ে প্রমাণ করেন সেই উপায়টি। গ্যালোয়ার জন্ম ২৫অক্টোবর, ১৮১১। তার বয়স যখন ১৪ তখন তার প্রথমবারের মত পরিচয় ঘটে গণিতের সাথে । যেদিন প্রথম ক্লাশে গণিত পড়ানো হয়, তার মধ্যে যেন একটা বিপর্যয় ঘটে যায় । তিনি গণিতে এতই মজে ছিলেন যে, অন্য সব কিছু পড়া একেবারে ছেড়ে দিলেন। সব কিছুতে খুব খারাপ করতে লাগলেন । আগে তেমন খারাপ ছাত্র ছিলেন না, ল্যাটিন ভাষায় দক্ষতার জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেনও , কিন্তু এখন অন্য বিষয় গুলোতে তার পাশ করার বেশ কঠিন হয়ে গেল। গণিত চর্চায় এতই এগিয়েছিলেন ,যে তার হঠাত মনে হওয়া শুরু হল, যে গণিতে তাকে শেখানর মত স্কুলের শিক্ষকদের কাছে আর অবশিষ্ট কিছুই নেয় । ফলে নিজেই নিজের মত বই কিনে গণিত চর্চা শুরু করলেন । কিন্তু এইবার ভিন্ন সমস্যা শুরু হল। গ্যালোয়া যেই পরিমানে গণিত বুঝেন , তত গণিত আসলেও তার শিক্ষকরা বুঝতেন না । ফলে পরিক্ষার খাতায় গ্যালোয়া যা উত্তর করেন তার কিছুই তাদের বোধগম্য হয় না । এবার গ্যালোয়া গণিতেও খারাপ করা শুরু করলেন। 
১৮২৮ সালে তিনি École Polytechnique নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন। এটা ছিলো গণিতের জন্য ততকালীন ফ্রান্সের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান । এরই মধ্যে তিনি পড়ে ফেলেছেন Adrien Marie Legendre' এর Éléments de Géométrie, Joseph Louis Lagrangeএর Réflexions sur la résolution algébrique des équations (এটি পরবর্তিতে তাকে ইকুয়েশন থিওরীতে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে), Leçons sur le calcul des fonctions ইত্যাদি । কিন্তু মৌখিক পরিক্ষায় গিয়ে তিনি পরীক্ষকদের কোন প্রশ্নের উত্তরেই সন্তুষ্ট করতে পারলেন না । আসলে তিনি তাদেরকে উত্তর এমন অল্পকথায় ব্যাখ্যা ছাড়া দিয়েছিলেন যে কেউ তা বুঝতে পারে নি । ফলে তিনি École Polytechnique তে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি অপেক্ষাকৃত নিম্ন র‍্যাংকিং এর বিশ্ববিদ্যালয় l'École préparatoire তে ভর্তি হন সেই বছর।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ গ্যালোয়া তার সমস্ত জিদ যেন ঢেলে দেন গণিতের উপরে । তুমুল উৎসাহে মেতে ওঠেন ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত আর পঞ্চঘাত সমীকরনে । ১৮২৯ সালে তার প্রথম গবেষণা পত্র প্রকাশ হয় Annales de mathematiquesএ continuous fraction এর উপরে । অনেক পরিস্রম করে ২ টি রিসার্চ পেপার তৈরি করে জমা দেন Academy of Sciencesএ । তখন Academy of Sciences. এর প্রধান ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ Augustin Louis Cauchy । তিনি পেপার দুটির নিজেই সুপারিশ করেছিলেন, একই সাথে তিনি গ্যালোয়ার কাছে পেপার দুটি ফেরত পাঠান পুনর্বিন্যাস ও ব্যাখ্যা করে লেখা জন্য ।
বছর ঘুরতেই(১৮২৯) রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গ্যালোয়ার বাবা আত্মহত্যা করেন। পিতার মৃতদেহ সতকার করে গ্যালোয়া প্যারিস ফিরলেন, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তার পেপার দুটি জমা দিলেন একাডেমির সেক্রেটারি স্যার জসেফ ফুরিয়ারে কাছে । কিন্তু সেবার গ্যালোয়া পুরস্কার পান নি । পুরস্কার ঘোষণার কিছু দিন আগে ফুরিয়ার মারা যান এবং তার পেপার যে জমা হয়েছে এমন কোন ডকুমেন্টের অস্তিত্বই ছিল না । ফলে রাজনৈতিক কারণে গ্যলয়ার পেপার গায়েব হয়েছে বলে তার সন্দেহ হল । এই সন্দেহ পুরোপুরি বাস্তবে প্রমাণিত হল যখন তার পরে একাধিক গবেষণা পত্র একাডেমি অফ সায়েন্স ফেরত পাঠাল অযৌক্তিক ও অবোধ্য এর খোড়া যুক্তি দেখিয়ে (১৮৩০)। সে বছর গ্যালোয়া মোট ৩টি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন , যার মধ্যে একটি বিখ্যাত Galois theory এর ভিত্তি গরে দেয় , অন্য দুইটি ছিল আধুনিক উপায়ে সমিকরনের মুল নির্ণয় সম্পর্কিত এবং নাম্বার থিওরি নিয়ে । শেষক্তটি বেশ গুরুত্ববাহি কারণ finite field এর এর ধারণা প্রথম এখানে পাওয়া যায় ।
সে বছর গ্যালোয়া তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টরকে গালিগালাজ করে একটি প্রতিবেদন লেখেন । ডিরেক্টর ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক। সুতরাং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয় । এর পর তিনি যেন পুরোই উচ্ছনে গেলেন । বছর ঘুরতেই(১৮৩১) মদ আর সন্ত্রাস তার নিত্যসঙ্গী। কখনও চাকু হাতে সম্রাটকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন খোলা রাস্তায়, তো পরক্ষনে গ্রেফতার। ছাড়া পেয়ে আবার নিষিদ্ধ ন্যাশ্নাল গার্ডের পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে তার জেল হয়ে যায় । এক মাস পর গ্যালোয়া জেল থেকে ছাড়া পান ।
কিছুদিন পর তার প্রনয়ের খবর চাঊর হয়ে গেল। প্রয়সী স্টাফানি ফেলিসি । স্টাফানি এক বিখ্যাত ডাক্তারের মেয়ে, প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে পেশ্চু ডি’হেরবিনভিল এর বাগদত্তা । পেশ্চু এই ঘটনায় খুব রেগে গেলেন। অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দেন গ্যালোয়াকে । 
ডুয়েলের আগের রাতে(১৮৩২) নিজের মৃত্যু সম্পর্কে গ্যালোয়া এতই নিশ্চিত ছিলেন যে সারারাত জেগে তার থিওরেমগুলো লিখে ফেলেন। তার সে রাতের কাজের মধ্যে দিয়ে আলোর মুখ দেখে গ্রুপ থিওরি। সাথে একটি চিঠি লিখেন যে তার যদি পরদিন ডুয়েলে মৃত্যু হয় তাহলে যেন তার কাজগুলোকে ইউরোপের বড় বড় গণিতবিদদের কাছে পৌছে দেয়া হয়। 
পরদিন,৩০মে,১৮৩২, ডুয়েলে গ্যালোয়াকে নিখুত নিশানায় ভুলুন্ঠিত করে পেশ্চু । ৩১মে মৃত্যু হয় গ্যালোয়ার । 
কিন্তু মাত্র একরাতে গ্যালোয়া যা লিখছিলেন তার মর্ম উদ্ধার করতে গাউস,জ্যাকোবিদের অনেক গলদঘর্ম হতে হয়েছে । গ্যালোয়ার মৃত্যুর ১৪ বছর পর, ১৮৪৬ সালে লিউভিল সেই কাগজগুলো থেকে যে থিওরি উদ্ধার করেন তা তিনি গ্যালোয়ার থিওরি নামে প্রকাশ করেন । 
তার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে গ্যালোয়া থিওরি এবং গ্রুপ থিওরি, যা কিনা Abstract Algebra এর দুটি প্রধান শাখা ।




#Article 77: ডাভিড হিলবের্ট (256 words)


ডেভিড হিলবার্ট্ ( ডেভ়িড্ হিল্‌বায়াট্‌, জানুয়ারি ২৩, ১৮৬২ - ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৯৪৩) একজন জার্মান গণিতবিদ, যাঁকে ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণিতবিদদের অন্যতম হিসাবে গণ্য করা হয়। ফরাসি গণিতবিদ অঁরি পোয়াঁকারের সাথে ডেভিড হিলবার্টকে গাণিতিক বিশ্বজনীনবাদীদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।

ডেভিড হিলবার্ট গণিতের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন, যেমন অব্যয় তত্ত্ব (Invariant theory), হিলবের্টের প্রস্তাবনা, এবং হিলবার্ট জগতের ধারণা। তিনি বিশুদ্ধ গণিতের বিভিন্ন শাখা যেমন বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি, ব্যবকলন সমীকরণসমূহ ও ব্যবকলনীয় বিশ্লেষণ, যুক্তিবিজ্ঞান ও গণিতের ভিত্তি, ইত্যাদিতে অবদান রাখেন। তিনি প্রমাণ তত্ত্ব ও গাণিতিক যুক্তিবিজ্ঞানের অন্যতম স্রষ্টা এবং গেয়র্গ কান্টরের সেট তত্ত্বের সমর্থক। ১৮৯৯ সালে তিনি গ্রুন্ডলাগেন ডের গেওমেট্রিক (জ্যামিতির মৌলিক ধারণাসমূহ) নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে ১৯শ শতকের শেষে জ্যামিতি অধ্যয়নে যে পরিবর্তনগুলি এসেছিল, তা লিপিবদ্ধ আছে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ২৩টি অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার একটি তালিকা প্রদান করেন, যার নাম হিলবার্টের সমস্যাতালিকা। তালিকাটি বিংশ শতকের গাণিতিক গবেষণার দিক নির্দেশনা করেছে। এগুলির অনেকগুলির জন্য আজও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ডেভিড হিলবার্ট তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপারেও আগ্রহী ছিলেন। ডেভিড হিলবার্ট ও তার ছাত্ররা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্যবহৃত গণিত উদ্ভাবন করে গেছেন। ডেভিড হিলবার্ট পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলির স্বতঃসিদ্ধ নির্মাণের যে প্রকল্পটি পরিচালনা করেন, তার ফলে গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্র রচিত হয়। হিলবার্ট ও আইনস্টাইনের মধ্যে আলোচনার সূত্র ধরেই ১৯১৫ সালে মহাকর্ষের ক্ষেত্র সমীকরণগুলির সূত্রায়ন সম্ভব হয়।

ডেভিড হিলবার্ট ১৮৬২ সালে ভেলাউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ক্যোনিগসবের্গ ও হাইডেলবের্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি ডক্টরেট সনদ লাভ করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি গোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৩০ সালে অবসরগ্রহণের আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।




#Article 78: উইকিপিডিয়া (1510 words)


উইকিপিডিয়া  একটি সম্মিলিতভাবে সম্পাদিত, বহুভাষিক, মুক্ত প্রবেশাধিকার, মুক্ত কন্টেন্ট সংযুক্ত একটি ইন্টারনেট বিশ্বকোষ, যা অলাভজনক উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন কর্তৃক সমর্থিত, আয়োজিত এবং পরিচালিত। স্বেচ্ছাসেবীরা বিশ্বব্যাপী সম্মিলিতভাবে ৩০১টি ভাষার উইকিপিডিয়ায় প্রায় ৪০ মিলিয়ন নিবন্ধ রচনা করেছেন, যার মধ্যে শুধু ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় রয়েছে  নিবন্ধ। যে কেউ ওয়েবসাইটে প্রবেশের মাধ্যমে যে কোনো নিবন্ধের সম্পাদনা করতে পারেন, যা সম্মিলিতভাবে ইন্টারনেটের সর্ববৃহৎ এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় সাধারণ তথ্যসূত্রের ঘাটতি পূরণ করে থাকে। ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায় উইকিপিডিয়া সব ওয়েবসাইটের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে, মাসিক প্রায় ১৮ বিলিয়ন পৃষ্ঠা প্রদর্শন এবং প্রায় ৫০০ মিলিয়ন স্বতন্ত্র পরিদর্শক নিয়ে..., উইকিপিডিয়ায় ইয়াহু, ফেসবুক, মাইক্রোসফট এবং  গুগলের পথানুসরণ করে, সর্বাধিক ১.২ বিলিয়ন স্বতন্ত্র পরিদর্শক রয়েছে।

জানুয়ারি ১৫, ২০০১ সালে জিমি ওয়েলস এবং ল্যারি স্যাঙ্গার উইকিপিডিয়া চালু করেন, পরবর্তীতে  তৈরি করেন, একটি পিন্ডারিশব্দে উইকি (এটি সম্মিলিত ওয়েবসাইটের এক প্রকার নাম, হাওয়াইয়ান ভাষায় ) এবং বিশ্বকোষ। 'উইকি উইকি' মানে দাঁড়িয়ে ছোট-ছোট পায়ে হাঁটা। উইকি ওয়েব সংস্কৃতিতে সবার ছোট-ছোট অবদান যুক্ত হয়েই এই সাইটটির মত ক্রমবর্ধমান সংগ্রহ গড়ে ওঠে। বর্তমানে এটি সব থেকে বড় এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় ইন্টারনেট ভিত্তিক তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার হয়।

২০০৬ সালে, টাইম ম্যাগাজিন স্বীকৃতি দেয় যে, উইকিপিডিয়ায় (ইউটিউব, রেডিট, মাইস্পেস, এবং ফেসবুক-এর পাশাপাশি) বিশ্বব্যাপী লাখ-লাখ মানুষের অংশগ্রহণে অনলাইন সহযোগিতা ও মিথস্ক্রিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও উইকিপিডিয়া নিবন্ধের তাৎক্ষণিক খবর সংক্রান্ত দ্রুত হালনাগাদের কারণে এটি একটি সংবাদ সূত্র হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছে।

উইকিপিডিয়া ওয়েবসাইট উন্মুক্ত প্রকৃতির হওয়ায় এখানে লেখার মান, ধ্বংসপ্রবণতা এবং তথ্যের নির্ভুলতা রক্ষা করতে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে, কিছু নিবন্ধে অপরীক্ষিত বা অযাচাইকৃত বা অসঙ্গত তথ্য থাকতে পারে।

উইকিপিডিয়া শুরু করা হয়েছিল নুপিডিয়া'র একটি বর্ধিত প্রকল্প হিসাবে। নুপিডিয়া হল ইংরেজি ভাষার একটি মুক্ত বিশ্বকোষ যেখানে অভিজ্ঞরা লিখে থাকেন এবং একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী লেখাগুলি সম্পাদনা করা হয়। Bomis, Inc নামের একটি ওয়েব পোর্টাল প্রতিষ্ঠান ৯ মার্চ ২০০০ নুপিডিয়ার কার্যক্রম শুরু করে। এখানে মূল ব্যক্তিত্ব ছিলেন Bomic-এর নির্বাহী পরিচালক জিমি ওয়েলস এবং প্রধান সম্পাদক ল্যারি স্যাঙ্গার, যারা পরবর্তীকালে উইকিপিডিয়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হন। নিউপিডিয়া মুক্ত তথ্য লাইসেন্সের অধীনে পরিচালনা করা হচ্ছিল ; তবে রিচার্ড স্টলম্যান উইকিপিডিয়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হবার পর গণ্যু মুক্ত ডকুমেন্টেশন লাইসেন্সে পরিবর্তন করা হয়।

ল্যারি স্যাঙ্গার এবং জিমি ওয়েলস হলেন উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। সকলে সম্পাদনা করতে পারে এমন একটি বিশ্বকোষ তৈরির জন্য এর লক্ষ্যগুলি নির্ধারণের কাজটি করেন জিমি ওয়েলস এবং উইকি প্রকল্প প্রয়োগের মাধ্যমে এটি সার্থকভাবে সম্পাদনের কৌশল নির্ধারণের কৃতিত্ব দেয়া হয় ল্যারি স্যাঙ্গারকে। ১০ জানুয়ারি ২০০১ জিমি ওয়েলস নুপিডিয়ার মেইলিংলিস্টে নুপিডিয়ার সহপ্রকল্প হিসাবে একটি উইকি তৈরির প্রস্তাব করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার জন্য www.wikipedia.com ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়  এবং স্যাঙ্গার এটি নুপিডিয়ার মেইলিংলিস্টে ঘোষণা করেন। উইকিপিডিয়া কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি সংক্রান্ত নিয়মটি চালু করা হয়, এই নিয়মটি নুপিডিয়ার পক্ষপাত এড়িয়ে চলা সংক্রান্ত নিয়মটির সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়াও এই বিশ্বকোষটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে আরও কিছু নীতিমালা ও নির্দেশাবলী তৈরি করা হয়েছিল এবং সেইসাথে উইকিপিডিয়া নুপিডিয়া থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মত কাজ শুরু করেছিল।

উইকিপিডিয়ার প্রথমদিকের নিবন্ধগুলি নুপিডিয়া, স্ল্যাসডট পোস্টিং এবং সার্চ ইঞ্জিন ইনডেক্সিং-এর মাধ্যমে তৈরি করা হয়। ২০০১ সালের মধ্যে উইকিপিডিয়ায় ১৮ ভাষার প্রায় ২০,০০০ নিবন্ধ তৈরি করা হয়। ২০০৩ সালের শেষের দিকে ২৬টি ভাষায় কাজ শুরু হয় এবং ২০০৩ সালের মধ্যে মোট ৪৬ ভাষার উইকিপিডিয়া চালু হয়। ২০০৪ সাল শেষ হবার আগেই ১৬১টি ভাষার উইকিপিডিয়া প্রকল্প শুরু করা হয়। ২০০৩ সালে সার্ভারে সমস্যা হবার আগ পর্যন্ত নিউপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া আলাদা ছিল এবং এরপর সকল নিবন্ধ উইকিপিডিয়ার সাথে সমন্বয় করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭ ইংরেজি উইকিপিডিয়া ২০ লক্ষ নিবন্ধের সীমানা পার করে। এটি তখন ১৪০৭ সালে তৈরি করা Yongle Encyclopedia-কে ম্লান করে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষে পরিণত হয়। গত ৬০০ বছরের মধ্যে Yongle Encyclopedia ছিল পৃথিবী সবচেয়ে সমৃদ্ধ বিশ্বকোষ।

প্রথাগত অন্যান্য বিশ্বকোষ থেকে ভিন্ন, উইকিপিডিয়ায় শুধুমাত্র বিভিন্ন মাত্রায় সুরক্ষিত বিশেষ স্পর্শকাতর এবং/অথবা ধ্বংসপ্রবণ পাতা ব্যতীত অন্যান্য যে কোন পাতায় সম্পাদনা করা যায়, এমনকি কোনো অ্যাকাউন্ট ব্যতীত যে-কোনো পাঠক অনুমতি ছাড়াই যে-কোন লেখা সম্পাদনা করতে পারেন। যদিও, বিভিন্ন ভাষার সংস্করণে এই নীতি কিছুটা সংশোধিত বা পরিবর্তিত হয়ে থাকে; উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি সংস্করণে শুধুমাত্র নিবন্ধিত ব্যবহারকারী একটি নতুন নিবন্ধ তৈরি করতে পারেন। কোন নিবন্ধই, উক্ত নিবন্ধ সৃষ্টিকারী বা অন্য কোন সম্পাদকের মালিকানাধীন হিসেবে গণ্য হয় না। পরিবর্তে, মূলত সম্পাদকদের ক্ষমতাপ্রদানের মাধ্যমে নিবন্ধের বিষয়বস্তু ও কাঠামো সম্পর্কে  প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।

উইকিপিডিয়ায় বর্তমানে ৩০১টি ভাষা সংস্করণ রয়েছে; এর মধ্যে, পনেরটি ভাষার প্রতিটিতে এক মিলিয়নের বেশি নিবন্ধ রয়েছে (ইংরেজি, সুইডিশ, ওলন্দাজ, জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, পোলিশ, স্পেনীয়, রুশ, সুইডিশ, ভিয়েতনামী, জাপানি, চীনা, পর্তুগীজ, ওয়ারে-ওয়ারে এবং
বাংলা), আরো চারটি ভাষায় ৭০০,০০০-এর বেশি নিবন্ধ রয়েছে (সেবুয়ানো, চীনা, জাপানি, পর্তুগিজ), ৩৭টি ভাষায় ১০০,০০০-এর বেশি নিবন্ধ রয়েছে, এবং ৭৩টি ভাষায় রয়েছে ১০,০০০ নিবন্ধ। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায়, সর্বাধিক ৪.৫ মিলিয়নের বেশি নিবন্ধ রয়েছে। জুন, ২০১৩ সালে আলেক্সা অনুযায়ী, ইংরেজি সাবডোমেন (en.wikipedia.org; ইংরেজি উইকিপিডিয়া) উইকিপিডিয়ার সর্বমোট ৫৬% ট্রাফিক গ্রহণ করে, অন্যান্য ভাষার মধ্যে যথাক্রমে (স্পেনীয়: ৯%; জাপানি: ৮%; রুশ: ৬%; জার্মান: ৫%; ফরাসি: ৪%; ইতালিয়: ৩%)। ডিসেম্বর ২০১৩ অনুযায়ী, ছয়টি বৃহত্তম ভাষা সংস্করণের মধ্যে রয়েছে (নিবন্ধ গণনা অনুযায়ী) ইংরেজি, ওলন্দাজ, জার্মান, সুয়েডীয়, ফরাসি এবং ইতালীয়। উইকিপিডিয়ার বহুভাষিক কন্টেন্ট সহাবস্থান মূলত ইউনিকোডের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে। এই সুবিধা জানুয়ারি ২০০২ সাল থেকে উইকিপিডিয়ায় বিরন ভিকার কর্তৃক প্রথম চালু করা হয়।

অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছাত্রদেরকে একাডেমিক কাজে কোন বিশ্বকোষ থেকে তথ্যসূত্র দিতে নিষেধ করেন, এর বদলে প্রাথমিক উৎসকে একাজে বেছে নিতে বলেন, অনেকে আবার সুস্পষ্টভাবে উইকিপিডিয়া থেকেই তথ্যসূত্র দিতে নিষেধ করেন। ওয়েলস জোর দিয়ে বলেন, যে কোন প্রকারের বিশ্বকোষ সাধারণত তথ্যসূত্র উদ্ধৃতির জন্য সঠিক নয়, এবং প্রামাণ্য হিসেবে এগুলোর উপর নির্ভর করা উচিৎ নয়। ওয়েলস একবার (২০০৬ বা তার আগে) বলেন তিনি প্রতি সপ্তাহে দশ হাজার ইমেইল পাচ্ছেন যারা বলে তারা তাদের পেপারে ফেল গ্রেড পাচ্ছে কসরণ তারা উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিল; তিনি ছাত্রদেরকে বলেন তারা তাদের প্রাপ্য নম্বরই পেয়েছে। ঈশ্বরের দোহাই লাগে, তোমরা এখন কলেজে পড়ছো, উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃতি দিয়ো না। তিনি বলেন। 

সচিত্র যৌন বিষয়বস্তু অনুমোদনের জন্য উইকিপিডিয়া সমালোচিত হয়েছে। শিশু নিরাপত্তা অধিকারকর্মীগণ বলেন উইকিপিডিয়ার অনেক পাতাতেই সচিত্র যৌন বিষয়বস্তু দেখা যায়, কোন সতর্কবার্তা বা বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছাড়াই।

উইকিপিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেছে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি উইকিপিডিয়ার অন্যান্য সহপ্রকল্পগুলি পরিচালনা করে, যেমন: উইকিবই, উইকিঅভিধান। উইকিমিডিয়া চ্যাপ্টার হল উইপিডিয়ানদের স্থানীয় সংগঠন। যার মাধ্যমে প্রচার, প্রসার এবং প্রকল্প পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহের মত কাজগুলি করা হয়।

উইকিপিডিয়ার কাজগুলি মিডিয়াউইকির উপর নির্ভর করে করা হয়ে থাকে। মিডিয়াউইকি হল একটি মুক্ত এবং ওপেন সোর্স উইকি সফটওয়্যার প্লাটফর্ম যেটি পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় লেখা এবং এটি তথ্যভান্ডারের ভিত্তি হিসাবে মাইসিকোয়েল ব্যবহার করা হয়েছে।  সফটওয়্যারটিতে বিভিন্ন প্রোগ্রামিং বৈশিষ্ট একত্রিত করা হয়েছে, যেমন ম্যাক্রো ভাষা, চলক, টেমপ্লেট এর সমন্বয়করণের মাধ্যমে ব্যবহার এবং ইউআরএল পুনর্নির্দেশনা ইত্যাদি। মিডিয়াউইকি গণু জেনারেল পাবলিক লাইসেন্স এর অধিনে প্রকাশ করা হয়েছে যা সকল উইকিমিডিয়া প্রকল্পে এবং প্রায় সবধরনের উইকি প্রকল্পেই ব্যবহার করা হয়। বিশেষভাবে বলতে গেলে উইকিপিডিয়া Clifford Adams এর পার্ল প্রোগ্রামিং ভাষায় লেখা UseModWiki নামের একটি সফটওয়্যার দিলে চালানো হতো (ধাপ ১)। প্রবন্ধের হাইপারলিংক সঠিক ভাবে কাজ করানোর জন্য প্রাথমিকভাবে একটি বিশেষ পদ্ধতি অণুসরন করা হয়েছিল। তখন একাধিক শব্দের কোন হাইপারলিংক তৈরি করার সময় শব্দগুলির মাঝের ফাকা জায়গাগুলি মুছে দিয়ে একটি শব্দ তৈরি কর সেটির সাথে লিংক তৈরি করা হত। দুই জোড়া তৃতীয় বন্ধনি ব্যবহার করে লিংক তৈরির পদ্ধতিটি পরবর্তীকালে সফটওয়্যারটিতে সংযুক্ত করা হয়। জানুয়ারি ২০০২ সালে উইকিপিডিয়াতে পিএইচপি উইকি ইঞ্জিন এবং মাইসিকোয়েল ডাটাবেজ ব্যবহার শুরু করা হয় (ধাপ ২)। উইকিপিডিয়ার জন্য বিশেষ এই পদ্ধতিটি তৈরি করে দেন Magnus Manske । ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী এই সর্বশেষ সংস্করণের সফটওয়্যারটিতে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে। জুলাই ২০০২-এ উইকিপিডিয়াতে Lee Daniel Crocker এর লেখা মিডিয়াউইকি নামের তৃতীয় প্রজন্মের এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার শুরু করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মিডিয়াউইকির বৈশিষ্ট বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের বর্ধিতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে।  এপ্রিল ২০০৫ -এ মিডিয়াউইকি সার্চ অপশনের জন্য Lucene এর একটি বর্ধিতাংশ যুক্ত করা হয়, এবং তথ্য খোঁজার এই বিশেষ এই সুবিধার জন্য উইকিপিডিয়া মাইসিকোয়েল এর পরিবর্তে Lucene ব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে উইকিপিডিয়াতে জাভা প্রোগ্রামিং ভাষায় লেখা Lucene Search 2  ব্যবহার করা হচ্ছে যেটি Lucene library 2.0  এর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

উইকিপিডিয়ায় তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য লিনাক্সের (প্রধানত উবুন্টু)বহুস্তর বিশিষ্ট বিস্তৃত একগুচ্ছ সার্ভার ব্যবহার করা হয়, তবে ZFS এর বিশেষ সুবিধার জন্য কিছু ওপেন সোলারিস সার্ভারও ব্যবহার করা হয়েছে।  ফেব্রুয়ারি ২০০৮ পর্যন্ত এই সার্ভারগুলির ৩০০টি ছিল ফ্লোরিডায়, ২৬টি আর্মস্টার্ডাম এবং ২৩টিইয়াহুর কোরিয়ান হোস্টিং সুবিধার আওতায় সিউলে ছিল।  ২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত উইকিপিডিয়া একটি মাত্র সার্ভার থেকে পরিচালনা করা হত। এর পরপরই বহুস্তর বিশিষ্ট বিস্তৃত গঠনকৌশল ব্যবহার শুরু করা হয়। জানুয়ারি ২০০৫ এ প্রকল্প পরিচালনার জন্য ফ্লোরিডাতে ৩৯টি সার্ভার ছিল। এরমধ্যে ছিল একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সার্ভার যেটি মাইসিকোয়েল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। এছাড়াও ছিল অ্যাপাচি এইচটিটিপি সার্ভার এর উপর ভিত্তি করে ২১টি ওয়েব সার্ভার ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং ৭টি ছিল স্কুইড ওয়েব প্রক্সি ক্যাশ সার্ভার।

উইকিপিডিয়ায় দিনের বিভিন্ন সময় প্রতি সেকেন্ডে ২৫০০০ থেকে ৬০০০০ পর্যন্ত পাতা দেখার অণুরোধ আসে। এই সকল অণুরোধ একটি স্কুইড ওয়েব প্রক্সি ক্যাশ সার্ভারের কাছে আসে এবং এখান থেকেই অণুরোধকারীকে নির্দিষ্ট পাতা দেখার ব্যবস্থা করা হয়। যেসব অণুরোধ এখানে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না সেগুলি load-balancing সার্ভারে পাঠানো হয় । লিনাক্স ভার্চুয়াল সার্ভার সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত এই সার্ভার অণুরোধগুলি অ্যাপাচি ওয়েব সার্ভারের পাঠিয়ে দেয়। এই ওয়েবসার্ভরগুলি মূল তথ্যভান্ডার থেকে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটি প্রদর্শন করে। উইকিপিডিয়ার সকল ভাষার সংস্করণের জন্য এই একই পদ্ধতি অণুসরন করা হয় । পাতাগুলি দ্রুত ওপেন করার জন্য প্রদর্শন যোগ্য পাতাগুলি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ক্যাশ মেমরীতে রেখে দেয়া হয়। এমন কিছু পাতা রয়েছে যেগুলির জন্য অনেক বেশি পরিমাণ অণুরোধ এসে থাকে তাই সেগুলি যদি প্রতিবার উপরে উল্লেখিত পদ্ধতি অনুযায়ী তথ্যভান্ডার খুজে প্রদর্শন করতে হয় তাহলে অনেক বেশি সময় লাগবে। সেকারণে ক্যাশ মেমরীতে রেখে দেয়ার পদ্ধতিটি অণুসরন করা হয়। নেদারল্যান্ড ও কোরিয়াতে উইকিপিডিয়ার সবথেকে বড় দুটি গুচ্ছ সার্ভার রয়েছে যেগুলি উইকিপিডিয়ার অধিকাংশ ওয়েব ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে।




#Article 79: বিশ্বকোষ (174 words)


বিশ্বকোষ () একটি জ্ঞানসংগ্রহ যাতে বিশ্বজগতের সকল বিষয় সম্বন্ধে সাধারণ তথ্য থাকে বা কোন একটি বিশেষ বিষয় সম্বন্ধে বিস্তারিত ও গভীর আলোচনা থাকে । বিশ্বকোষের নিবন্ধগুলো বিভিন্ন ভাবে সাজানো হয়। বিশ্বকোষের লেখাগুলো অভিধানের তুলনায় অধিক তথ্যদ্বারা পূর্ণ থাকে। সাধারণ কথোপকথন, অভিধানের ন্যায় হয় না- যা শব্দ সম্পর্কে ভাষাগত তথ্যকে গুরুত্ব দেয়, যেমন তাদের  অর্থ, উচ্চারণ, ব্যবহার, এবং ব্যাকরণগত রুপ -বিশ্বকোষ নিবন্ধগুলো শিরোনামের সাথে যুক্ত বিষয়ের তথ্যগুলিকে অধিক গুরুত্ব দেয়।

ইংরেজি encyclopedia শব্দটি প্রাচীন গ্রিক ἐγκύκλιος(এঙ্গিক্লোস- চক্রাকার,সাধারণ) ও  παιδεία(পেদিয়া-শিক্ষা)  শব্দদ্বয়ের সমন্বিত রূপ এবং রোমান লেখক প্লিনি ল্যাটিন ভাষায় ব্যবহার করেছিলেন।ল্যাটিন থেকেই এটি ইংরেজিতে প্রবেশ করেছে।

নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত 'বিশ্বকোষ' নামে বিশ্বকোষের কাজ ১৯০২ সালে আরম্ভ হয়ে ১৯১১ সালে এর প্রকাশনা শেষ হয়। প্রায় সতের সহস্র পৃষ্ঠার এই বিশ্বকোষটি ২২ খণ্ডে সঙ্কলিত হয়েছিল। তবে বাংলা ভাষায়'ভারতকোষ' নামে (প্রকাশকাল ১৮৯৬-১৯০৬)তিন খণ্ডে প্রকাশিত 'ভারতকোষ'-এর সঙ্কলক ছিলেন রাজকৃষ্ণ রায় ও শরচ্চন্দ্র দেব। এছাড়াও ১৯৭২ সালে খান বাহাদুর আবদুল হাকিমের সম্পাদনায় ঢাকা হতে প্রকাশিত ৪ খণ্ডে মুক্তধারার বাংলা বিশ্বকোষ নাম উল্লেখযোগ্য।ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কৃর্তক ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকাশ করে ৷ যেটির কাজ শুরু হয় ১৯৮০ সালে শেষ হয় ২০০০ সালে ৷




#Article 80: ইন্টারনেট (225 words)


আন্তর্জাল বা ইন্টারনেট হল সারা পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত, পরস্পরের সাথে সংযুক্ত অনেকগুলো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমষ্টি যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং যেখানে আইপি বা ইন্টারনেট প্রটোকল নামের এক প্রামাণ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করা হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অনেকে ইন্টারনেট এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবকে সমার্থক শব্দ হিসেবে গণ্য করলেও প্রকৃতপক্ষে শব্দদ্বয় ভিন্ন বিষয় নির্দেশ করে।

ইন্টারনেট হচ্ছে ইন্টারকানেক্টেড নেট্ওয়ার্ক(interconnected  network) এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা বিশেষ গেটওয়ে বা রাউটারের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলো একে-অপরের সাথে সংযোগ করার মাধ্যমে গঠিত হয়। ইন্টারনেটকে প্রায়ই নেট বলা হয়ে থাকে।

যখন সম্পূর্ণ আইপি নেটওয়ার্কের আন্তর্জাতিক সিস্টেমকে উল্লেখ করা হয় তখন ইন্টারনেট শব্দটিকে একটি নামবাচক বিশেষ্য মনে করা হয়।

ইন্টারনেট এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব দৈনন্দিন আলাপচারিতায় প্রায়ই কোন পার্থক্য ছাড়া ব্যবহৃত হয়। যাইহোক, ইন্টারনেট এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব একই নয়। ইন্টারনেটের হার্ডওয়্যার এবং সফ্টওয়্যার পরিকাঠামো কম্পিউটারসমূহের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করে। বিপরীতে, ওয়েব ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রদত্ত পরিষেবাগুলির একটি। এটা পরস্পরসংযুক্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য সম্পদ সংগ্রহের, হাইপারলিংক এবং URL-দ্বারা সংযুক্ত।

১৯৬০-এর দশকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গবেষণা সংস্থা অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি বা আরপা (ARPA) পরীক্ষামূলকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। প্যাকেট সুইচিং পদ্ধতিতে তৈরি করা এই নেটওয়ার্ক আরপানেট (ARPANET) নামে পরিচিত ছিল। এতে প্রাথমিকভাবে যুক্ত ছিল। ইন্টারনেট ১৯৮৯ সালে আইএসপি দ্বারা সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে 
১৯৯০ এর পরবর্তি সময়ের দিকে পশ্চিমাবিশ্বে ইন্টারনেট ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত হতে থাকে।




#Article 81: টেলিভিশন (452 words)


টেলিভিশন এমন একটি যন্ত্র যা থেকে একই সঙ্গে ছবি দেখা যায় এবং শব্দও শোনা যায়। টেলিভিশন শব্দটি ইংরেজি থেকে এসেছে, মূলতঃ প্রাচীন গ্রিক শব্দ τῆλε (ত্যালে অর্থাৎ দূর) এবং লাতিন শব্দ Vision (ভিসিওন্‌, অর্থাৎ দর্শন) মিলিয়ে তৈরি হয়ে। তাই টেলিভিশনকে বাংলায় কখনও দূরদর্শন যন্ত্র বলা হয়।

গ্রিক শব্দ 'টেলি' অর্থ দূরত্ব , আর ল্যাটিন শব্দ 'ভিশন' অর্থ দেখা। ১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানো সম্ভব হয়। এরপর ১৮৭৩ সালে বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ইলেকট্রনিক সিগনালের মাধ্যমে ছবি পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশবিজ্ঞানী জন লগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন এবং সাদা কালো ছবি দূরে বৈদ্যুতিক সম্প্রচারে পাঠাতে সক্ষম হন। এর পর রুশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। টেলিভিশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে। অতপর ১৯৪৫ সালে যন্ত্রটি পূর্ণতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়। গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে টেলিভিশন গনমাধ্যমের ভূমিকায় উঠে আসে।

টেলিভিশনের মূল ধারণা হচ্ছে শব্দ ও ছবিকে প্যাটার্নে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে ট্রান্সমিট করা। মূলত তিনটি প্রযুক্তির সমন্বয়ে সৃষ্ট হয় টেলিভিশনের আউটপুট : টিভি ক্যামেরা যার কাজ হচ্ছে শব্দ ও ছবিকে তড়িৎ-চৌম্বকীয় সংকেতে রূপান্তর করা, টিভি ট্রান্সমিটার যার কাজ হচ্ছে এই সংকেতকে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে প্রেরণ করা এবং টিভি সেট (রিসিভার) যার কাজ হচ্ছে এই সংকেত গ্রহণ করে তাকে আগের ছবি ও শব্দে রুপান্তরিত করা। সাধারনত ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবিকে দুইভাগে ভাগ করা যায়: স্থিরচিত্র (still picture) ও চলচ্চিত্র (moving picture)। স্থিরচিত্রের জন্য সাধারণ ক্যামেরা ও চলচ্চিত্রের জন্য মুভি/ভিডিও ক্যামেরা ব্যবহার হয়। প্রকৃতপক্ষে অনেকগুলো স্থিরচিত্রের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় চলচ্চিত্র। ভিডিও ক্যামেরা দ্রুত গতিতে পরপর অনেকগুলো স্থিরচিত্র (24 pic/sec or more) গ্রহণ করে। এই ছবিগুলোকে যখন একই গতিতে পরপর প্রদর্শন করা হয় তখন আমাদের চোখে এগুলো চলচ্চিত্র বলে মনে হয়। ফ্রেমে এই দ্রুতগতিতে ছবি পরিবর্তনের কারগরি কৌশলটি আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। চলচ্চিত্রকে খুবই স্লো মোশানে দেখলে এইসব স্থিরচিত্রগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। অ্যানালগ টিভি ক্যামেরা এইসব ছবির পিক্সেলকে সাধারনত ৫২৫টি লাইনে ভাগ করে লাইন বাই লাইন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে প্রেরণ করে। একইসাথে শব্দ তরঙ্গকে আলাদা সিগনালের মাধ্যমে প্রেরণ করে। ছবি ও শব্দের সিগনাল অ্যান্টেনা/কেবল/স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টিভি গ্রহণ করে বিশেষ পদ্ধতিতে আবার ছবি ও শব্দে রুপান্তরিত করে।টেলিভিশন হতে নির্গত রশ্মি গামা।

ডিসপ্লে বা প্রদর্শনীর প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে টেলিভিশনকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা যায়। যেমন : সিআরটি (CRT), প্লাজমা (Plasma), এলসিডি (LCD), এলইডি (LED) ইত্যাদি। সম্প্রচার থেকে প্রদর্শন পর্যন্ত টেলিভিশনের সম্পূর্ণ পদ্ধতিকে আবার তিনভাগে ভাগ করা যায় : এনালগ টেলিভিশন (সনাতন পদ্ধতি), ডিজিটাল টেলিভিশন (DTV) ও এইচডিটিভি (HDTV)।

এনালগ তথা সনাতন টিভি পদ্ধতি অর্থাৎ টিভি ক্যামেরা, ট্রান্সমিটিং সিস্টেম এবং টিভিসেট সবগুলোই কাজ করে এনালগ পদ্ধতিতে। এ ধরনের টিভিতে PAL স্ট্যান্ডার্ড ছবির পিক্সেল হয় মাত্র (720×576) 414,720 এবং ছবির aspect ratio 4 : 3 যার অর্থ স্ক্রীনে ছবির সাইজ ৪ একক প্রশস্ত ও ৩ একক উচ্চতার। অর্থাৎ ২৫ ইঞ্চি ডায়াগোনাল টিভি স্ক্রীনে ২০×১৫ ইঞ্চি হবে।




#Article 82: যুক্তি (437 words)


যুক্তিবিজ্ঞান (গ্রিক λογικήLog baবা লোগোস,ইংরেজি Logic) দুটি অর্থ আছে: প্রথমত, এতে কিছু কার্যকলাপ বৈধ যুক্তি ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে; দ্বিতীয়ত, এটি যুক্তি আদর্শ গবেষণা বা তার একটি শাখার নাম, যেখানে ভাষায় প্রকাশিত চিন্তা সম্পর্কে যুক্তিসম্মত আলোচনা বা যুক্তিতর্ক করা হয়। আধুনিক অর্থে- দর্শন, গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্টরূপে যুক্তিবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যগুলি উপস্থিত রয়েছে।

যুক্তিবিজ্ঞান ভারতের বেশ কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে চর্চিত হয়, চীন, পারস্য এবং গ্রীস। পশ্চিমের দেশগুলোতে যুক্তিবিদ্যাকে একটি প্রথাগত শৃঙ্খলা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ও দর্শন এর মধ্যে এটি একটি মৌলিক জায়গা দিয়েছেন এরিস্টটল। যুক্তি গবেষণা শাস্ত্রীয় ট্রিভিয়ামের অংশ ছিল। পূর্বের দেশগুলোতে, যুক্তিবিজ্ঞান বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বিদের দ্বারা উন্নত হয়েছিল।
যুক্তিবিজ্ঞান প্রায়ই তিনটি অংশে- আবেশক যুক্তি, মনন যুক্তি, এবং ন্যায়িক যুক্তি- বিভক্ত করা হয়।

যৌক্তিক রুপ বা বিন্যাস হলো যুক্তিবিজ্ঞানের কেন্দ্র। কোনো আলোচনা বা যুক্তিতর্কের বৈধতা বা দৃঢ়তা নির্ধারিত হয় এর যৌক্তিক বিন্যাস এর উপর নির্ভর করে, এর বিষয়বস্তুর উপর নয়। পরম্পরাগত এরিস্টটলিয় আনুমানিক যুক্তিবিজ্ঞান ও আধুনিক প্রতীকমূলক যুক্তিবিজ্ঞান হলো প্রথাগত যুক্তির উদাহরণ।

অপ্রথাগত যুক্তিবিজ্ঞান হলো সাধারণ ভাষায় করা যুক্তিতর্কের গবেষণা। সামান্য বিষয়ে যেই যুক্তিতর্ক করা হয় তার চর্চা করা অপ্রথাগত যুক্তিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্লেটো-র কিছু উদ্ধৃতি এই যুক্তিবিজ্ঞানের উপযুক্ত উদাহরণ।

যুক্তি সাধারনত আনুষ্ঠানিক রুপে বিবেচিত হয়, যখন এটি বিশ্লেষিত ও প্রতিনিধিত্ব করে কোনো বৈধ আলোচনার। একটি আলোচনার প্রকৃতি প্রদর্শিত হয় তখনই, যখন এর বাক্যগুলো কোনো যৌক্তিক ভাষার প্রথাগত ব্যাকরণ ও প্রকৃতি মেনে চলে, যেন আলোচনাটির বিষয়বস্তু সাধারন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। কেউ যদি যৌক্তিক বিন্যাস-এর ধারণাটিকে দার্শনিকতায় ভরপুর মনে করে অর্থাৎ এই ধারনাটি যদি তার জন্য জটিল হয় তবে সেই ক্ষেত্রে, সহজভাবে বিন্যাস করা হলো কোন বাক্যকে সরাসরি 'যুক্তির ভাষায়' অনুবাদ করা।

এটিই কোন আলোচনার যৌক্তিক রূপ। এটি প্রয়োজনীয় কারণ সাধারনত যে কোন ভাষায় ব্যাক্ত একটি বাক্য নানান বিভিন্নতা ও জটিলতা প্রদর্শন করে থাকে, যা তাদের অর্থের পরিবর্তন ঘটায় এবং বাক্যটি যেই অর্থ প্রকাশ করতে ব্যাক্ত হয়েছে তার চেয়ে অবাস্তব রুপে পরিনত হয়। বাক্যকে যৌক্তিক রুপে বিবেচনা করার জন্য কিছু ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করা প্রয়োজন- যেসব শব্দ যুক্তির সাথে সম্পৃক্ত নয় (যেমন, একটি লাতিন আলোচনায় লিঙ্গ ও বিশেষ্য-বিশেষন অপ্রয়োজনীয়) তাদের উপেক্ষা করা, কিছু সংযুক্তি শব্দ প্রতিস্থাপন করা (যেমন, কিন্তু অযৌক্তিক। এর পরিবর্তে এবং ব্যবহার করা) এবং সাধারণত যেসব অভিব্যক্তি (সকল বা সর্বজনীন ইত্যাদি)এর পরিবর্তে কিছু যৌক্তিক অভিব্যক্তি (কোন, প্রতি ইত্যাদি) বা দ্ব্যর্থক শব্দ ব্যবহার করা।

লজিক গ্রীক শব্দ লোগোস থেকে এসেছে, যার অর্থ শব্দ বা যা বলা হয়, তবে এর অর্থ আদতে চিন্তা বা কারণ। পশ্চিমা বিশ্বে, যুক্তি প্রথমে অ্যারিস্টটল বিকাশ করেছিলেন, যিনি বিষয়টিকে 'বিশ্লেষণ' বলে অভিহিত করেছিলেন। অ্যারিস্টটোলিয়ান যুক্তি বিজ্ঞান ও গণিতে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এবং ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পশ্চিমে বিস্তৃতভাবে ব্যবহৃত হয়। অ্যারিস্টটলের লজিক সিস্টেমটি অনুমানমূলক সিলোজিস্ম, টেম্পোরাল মডেল যুক্তি এবং ইন্ডাকটিভ যুক্তি -  পাশাপাশি প্রভাবশালী শব্দভাণ্ডার যেমন বিভিন্ন টার্ম, প্রেডিক্টেবল, সিলোজিস্ম এবং প্রোপোজিশনের অগ্রদূত ছিল।




#Article 83: বীজগণিত (327 words)


বীজগণিত () গণিতের একটি শাখা যেখানে গাণিতিক সমীকরণে অজানা সংখ্যাকে প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়।

ইংরেজি Algebra নামটি এসেছে আরবি শব্দ আল-জাবর () থেকে, যার অর্থ ভাঙা জিনিস পুনঃগঠিত করা। আল-জাবর শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ফার্সি গণিতবিদ আল খারিজমি। মধ্য যুগীয় লাতিন ভাষায় শব্দটি আলজেবরাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

বাংলাতে বীজগণিত শব্দটির উৎস বীজ শব্দমূল, অজানা সংখ্যার সমীকারণিক মানকে বীজ বলে। বীজ-সম্পর্কিত (সমাধান ও শুদ্ধিপরীক্ষার মাধ্যমে গাণিতিক বীজ বের করার পদ্ধতি) এ আলোচনাই গণিত শাস্ত্রে বীজগণিত নামে পরিচিত।

বীজগণিতে পাটিগণিতের মৌলিক অপারেশনগুলি যেমন—যোগ (), বিয়োগ (), গুণ (), ভাগ () ইত্যাদি প্রক্রিয়া প্রতীক বা নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার না-করেই সম্পাদন করা যায়। বীজগণিতে অনেক সমস্যা সমাধানে বীজগাণিতিক সূত্র ব্যবহৃত হয়। আবার অনেক বীজগাণিতিক রাশি বিশ্লেষণ করে উৎপাদকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, প্রক্রিয়া চিহ্ন এবং সংখ্যানির্দেশক অক্ষর প্রতীক এর অর্থবোধক বিন্যাসকে বীজগাণিতিক রাশি বলা হয়। প্রাত্যহিক জীবনের নানা গণনায় বীজগণিত কাজে আসে। 
কোনো গাণিতিক সম্পর্ককে সাধারণ সূত্রের আকারে পাটিগণিতের সাহায্যে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পাটিগণিত এরকম কোনো সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ প্রকাশ করতে সক্ষম। কিন্তু বীজগণিতে প্রতীকের সাহায্যে কোনো গাণিতিক সম্পর্ক একটি সাধারণ বিবৃতি আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। যেমন, একটি সংখ্যা -এর পাঁচগুণ থেকে  বিয়োগ করলে বিয়োগফল হবে । এই গাণিতিক সম্পর্কটির বীজগাণিতিক প্রকাশ হবে ।

১৯ শতকের শুরুতে বীজগণিত আধুনিক যুগে পদার্পণ করে। এর প্রথম উদ্ভব হয় গণিতবিদ মুসা আল-খোয়ারিজমির হাত ধরে। তার লেখা 'কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা' বই এ তিনি সর্বপ্রথম রৈখিক বীজগণিত ধারণার অবতারনা করেন। সংখ্যা ও বহুপদী রাশি সমাধানের পরিবর্তে বীজগণিতবিদদের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয় বিভিন্ন বিমূর্ত গাণিতিক সংগঠনের উপর, যেগুলির আচরণবিধি অন্যান্য গাণিতিক বস্তুর আচরণের সাথে সম্পর্কিত। এরকম একটি বিমূর্ত গাণিতিক সংগঠন হল গ্রুপ; গ্রুপ হচ্ছে কতগুলি উপাদান ও অপারেশনের একটি সেট, যা যেকোন সেট থেকে দুইটি উপাদান নেয় ও ৩য় একটি উপাদান গঠন করে। গ্রুপসমূহ সংখ্যা ব্যবস্থাসমূহের কিছু কিছু ধর্ম অনুসরণ করে, কিন্তু অনেক দিক থেকে এগুলির চেয়ে আলাদা। ১৯শ শতকের গণিতে গ্রুপ প্রধান একীকারক ধারণার একটিতে পরিণত হয়। ফরাসি গণিতবিদ এভারিস্ত গালোয়া ও ওগুস্তাঁ কোশি, ব্রিটিশ গণিতবিদ আর্থার কেলি, নরওয়েজীয় গণিতবিদ নিল্‌স হেনরিক আবেল ও সোফুস লি গ্রুপসমূহের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।




#Article 84: পাটীগণিত (152 words)


পাটিগণিত হচ্ছে গণিতের অন্যতম প্রাচীন একটি শাখা যেখানে বস্তুর গণনা সংক্রান্ত হিসাব নিকাশ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের মাধ্যমে সরাসরি করা হয়। পদ্যে রচিত একটি পাটিগণিতের সমস্যা এ রকম: 

চৌবাচ্চা ছিল এক প্রকাণ্ড বিশাল
দুই নলে জল আসে সকাল-বিকাল 
এক নলে পূর্ণ হতে বিশ মিনিট লাগে
অন্য নলে পূর্ণ হয় না আধা ঘণ্টার আগে
চৌবাচ্চা পূর্ণের সময় করোগো নির্ণন
দুই নল খুলে দিলে লাগে কতক্ষণ।

পাটীগণিত গণিতের একটি শাখা। প্রাচীন কাল থেকে মানুষ নানান রকমের হিসাব-নিকাশ করেছে বিভিন্ন পদ্ধতিতে । পাটীগণিত সেসব পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন কালের অনেক মণীষী পাটিগণিতের উৎকর্ষ সাধন করে। তাদের মধ্যে পিথাগোরাস, গ্যালিলিও, মহাবীর, রামানুজম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট গণিতবিদ ছিলেন যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী যিনি সচারচর যাদব বাবু নামে অভিহিত ছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে “গণিত সম্রাট” উপাধি দিয়েছিল।  ১৮৯০ সালে তিনি প্রকাশ করেন গণিতশাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই “Arithmetic”। এটি সাধারণ্যে “যাদবের পাটিগণিত” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং বিভিন্ন দেশে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গৃহীত হয়। 




#Article 85: জ্যামিতি (4342 words)


জ্যামিতি গণিতের একটি শাখা যেখানে আকার ও আকৃতি এবং এতদসম্পর্কিত বিভিন্ন আঙ্গিকের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা হয়। জ্যামিতিকে স্থান বা জগতের বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা যায়। পাটিগণিতে যেমন গণনা সংক্রান্ত আমাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়, তেমনি জ্যামিতিতে স্থান বা জগৎ নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়। প্রাথমিক জ্যামিতিকে কাজে লাগিয়ে দ্বি-মাত্রিক বিভিন্ন আকারের ক্ষেত্রফল ও পরিসীমা এবং ত্রিমাত্রিক বস্তুসমূহের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয় করা সম্ভব।

জ্যামিতিতে কতগুলি সরল ধারণা ব্যবহার করে যুক্তিভিত্তিক জটিলতর কাঠামো গঠন করা হয়। এই সরল ধারণাগুলিকে মোটামুটি তিনটি বড় শ্রেণীতে ভাগ করা সম্ভব - অসংজ্ঞায়িত পদসমূহ, সংজ্ঞায়িত পদসমূহ এবং স্বতঃসিদ্ধসমূহ।

জ্যামিতির কিছু কেন্দ্রীয় ধারণার কোন সরল সংজ্ঞা নেই। এই অসংজ্ঞায়িত ধারণাগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল বিন্দু, রেখা ও তলের ধারণা। 
 
এই মৌলিক ধারণাগুলি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত। একটি বস্তু কোথায়? - এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট, স্থির অবস্থানের কথা চিন্তা করতে হয়। বিন্দু পদটি দিয়ে আমাদের এই স্বজ্ঞাভিত্তিক (intuitive) স্থির, নির্দিষ্ট অবস্থানের ধারণাকেই নির্দেশ করা হয়। অনেক ভৌত বস্তুই বিন্দুর ধারণা নির্দশ করে। যেমন কোন ব্লক আকৃতির বস্তুর কোনা, পেন্সিলের ডগা, কিংবা কাগজের উপর ফুটকি। এই জিনিসগুলিকে বিন্দু নামক মানসিক, বিমূর্ত ধারণাটির বাস্তব, মূর্ত প্রতিরূপ বা মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়। একইভাবে একটি টানটান সুতা, টেবিলের ধার, পতাকাবাহী দণ্ড, ইত্যাদি পরপর সাজানো অনেকগুলি বিন্দুকে নির্দেশ করে। যদি কল্পনা করা যায় যে এই বিন্দুসারি দুই দিকে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে আমরা যে মানসিক ধারণাতে উপনীত হই, জ্যামিতিতে তার নাম দেয়া হয়েছে রেখা। আর তল পদটি কোন চ্যাপ্টা পৃষ্ঠ যেমন মেঝে, টেবিলের উপরটা, কিংবা ব্ল্যাকবোর্ড ইত্যাদি ভৌত বস্তু দিয়ে নির্দেশ করা যায়, কিন্তু আমাদেরকে কল্পনা করে নিতে হবে যে এটি চারিদিকে অসীম পর্যন্ত সম্প্রসারিত, অর্থাৎ রেখার যেমন কোন শেষবিন্দু নেই, ঠিক তেমনি তলের কোন ধার নেই।

জ্যামিতির অন্যান্য অসংজ্ঞায়িত পদগুলি বিন্দু, রেখা ও তলের মধ্যে সম্পর্কের বর্ণনা দেয়। যেমন - একটি রেখার উপর অবস্থিত একটি বিন্দু বাক্যাংশটি একটি অসংজ্ঞায়িত সম্পর্ক। অর্থাৎ এটিকে আরও কোন সরলতর ধারণার সাহায্য নিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

অসংজ্ঞায়িত পদগুলিকে একত্র করে অন্যান্য পদের সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব, যেগুলিকে বলা হয় সংজ্ঞায়িত পদ। যেমন অসমরেখ বিন্দু বলতে সেইসব বিন্দুকে বোঝায় যারা একই রেখার উপর অবস্থিত নয়। একটি রেখাংশ বলতে বোঝায় কোন দুইটি নির্দিষ্ট বিন্দু ও এদের মধ্যবর্তী সমস্ত বিন্দু নিয়ে গঠিত কোন রেখার অংশ। আবার রশ্মি বলতে বোঝায় একটি আংশিক রেখাকে বোঝায় যার একটিমাত্র শেষবিন্দু আছে এবং বাকি সমস্ত বিন্দু ঐ শেষবিন্দু থেকে কোন এক দিকে অসীম পর্যন্ত প্রসারিত।

সংজ্ঞায়িত পদগুলিকে একে অপরের সাথে এবং অসংজ্ঞায়িত পদের সাথে একত্র করে আরও অনেক পদের সংজ্ঞা দেয়া যায়। যেমন - কোণ বলতে দুইটি রশ্মিকে বোঝায় যাদের একটি সাধারণ শেষবিন্দু আছে। একইভাবে ত্রিভুজ ধারণাটিকে তিনটি অসমরেখ বিন্দু এবং এদের মধ্যে অবস্থানকারী রেখাংশের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা যায়।

স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধগুলি হচ্ছে অপ্রমাণিত কিন্তু সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত কিছু অনুমান, যেমন - দুইটি ভিন্ন বিন্দুর মধ্য দিয়ে একটি এবং কেবলমাত্র একটি রেখা গমন করতে পারে। যে ব্যবস্থা বা সংশ্রয়ে বিন্দু, রেখা ও তল সম্পর্কিত কতগুলি বিরোধিতাহীন স্বতঃসিদ্ধ প্রস্তাব করা হয় এবং এই স্বতঃসিদ্ধগুলি থেকে বিভিন্ন উপপাদ্য প্রমাণ করা হয়, সেই সংশ্রয়কে একটি জ্যামিতিক ব্যবস্থা (বা সংক্ষেপে জ্যামিতি) বলা হয়। স্বতঃসিদ্ধসমূহের বিভিন্ন সেট ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জ্যামিতিক ব্যবস্থায় উপনীত হওয়া সম্ভব।

যদি ভৌত স্থান বা জগতের অভিজ্ঞতার সাথে স্বতঃসিদ্ধগুলির মিল থাকে, তবে যৌক্তিকভাবে আশা করা যায় যে ঐ স্বতঃসিদ্ধগুলি ব্যবহার করে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলিও ভৌত জগতের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবে। তবে যেহেতু যেকোন স্বতঃসিদ্ধের সেটই খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে পছন্দ করা হয়, সুতরাং তাদের সিদ্ধান্তগুলিও বাস্তব জগতের সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে না। তাই কিছু কিছু জ্যামিতিক ব্যবস্থা বাস্তব জগতে সম্পূর্ণ প্রয়োগ না-ও করা যেতে পারে।

উপপাদ্যগুলি স্বতঃসিদ্ধগুলি থেকে যুক্তিভিত্তিক আরোহী পদ্ধতিতে বের করা হয়। আর এই আরোহী পদ্ধতিকে বলা হয় উপপাদ্যটির প্রমাণ। কোন প্রমাণের প্রতিটি ধাপকে হয় কোন স্বতঃসিদ্ধ অথবা কোন পূর্ব-প্রমাণিত উপপাদ্য দিয়ে সমর্থিত হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপপাদ্য বলে যে, যদি একটি রেখা কোন সমান্তরাল রেখাজোড়ের যেকোন একটির সাথে সমান্তরাল হয়, তবে সেটি রেখাজোড়ের অপর রেখাটির সাথেও সমান্তরাল। এখানে সমান্তরাল রেখা বলতে সেই সব রেখাকে বোঝায় যারা একে অপরের থেকে তাদের গোটা দৈর্ঘ্য বরাবর সমান দূরত্ব্ব বজায় রাখে।

আমরা যখন জ্যামিতিতে কোন উপপাদ্য প্রমাণ করি, তখন আমরা কতগুলি অনুমানের একটি সেট থেকে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই।

বিভিন্ন জ্যামিতিক ব্যবস্থার মধ্যে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সাথেই আমরা বেশি পরিচিত। ইউক্লিডীয় জ্যামিতি আমাদের চারপাশের প্রাত্যহিক জগতের বেশির ভাগ অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে পারে। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের নামে এই জ্যামিতিক ব্যবস্থার নামকরণ করা হয়েছে, কেননা তিনিই প্রথম এই জ্যামিতিক ব্যবস্থার বিবরণ দেন। যদিও ইউক্লিডীয় জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধগুলির সাথে বাস্তব জগতের অনেক মিল পাওয়া যায়, প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এগুলি পুরোপুরি নিখুঁত নয়।

দ্বি-মাত্রিক ইউক্লিডীয় জ্যামিতিকে অনেকসময় সমতলীয় জ্যামিতি এবং ত্রি-মাত্রিক ইউক্লিডীয় জ্যামিতিকে অনেক সময় ঘন জ্যামিতি নামে ডাকা হয়। সমতলীয় জ্যামিতিতে কেবল সেইসব জ্যামিতিক বস্তু নিয়ে আলোচনা করা হয় যেগুলি কেবল একটি তলের উপর অবস্থিত। এগুলির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ - এই দুইটি মাত্রা আছে। অন্যদিকে ঘন জ্যামিতিতে সেইসব জ্যামিতিক বস্তু নিয়ে আলোচনা করা হয় যেগুলির তিনটি মাত্রা আছে: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা।

ত্রিমাত্রিক ফাঁপা কোণককে একটি তল দিয়ে কাটলে যে দ্বিমাত্রিক রেখা পাওয়া যায়, তাকে কনিক ছেদ বলে; এটি জ্যামিতির একটি অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

ইউক্লিড খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকের জ্যামিতিবিদ ছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে তার সময়কার বিভিন্ন জ্যামিতিক উপপাদ্যগুলিকে খুবই অল্প সংখ্যক স্বতঃসিদ্ধের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তিনি নির্ণয় করেন যে নিচের মাত্র পাঁচটি স্বতঃসিদ্ধ থেকে সমস্ত উপপাদ্যতে উপনীত হওয়া যায়:

উপরের পাঁচটি স্বতঃসিদ্ধকে অনান্য সংজ্ঞায়িত পদের সাথে বিভিন্নভাবে সমন্বিত করে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক বস্তুর ধর্মগুলি (যেমন ক্ষেত্রফল, পরিধি, ইত্যদি) প্রমাণ করা সম্ভব। এই ধর্মগুলি আবার আরও জটিল জ্যামিতিক উপপাদ্যের প্রমাণে ব্যবহার করা যায়।

দ্বিমাত্রিক জ্যামিতিতে প্রায়শই দেখা যায় এমন জ্যামিতিক আকৃতির মধ্যে আছে বৃত্ত, বহুভুজ, ত্রিভুজ, এবং চতুর্ভুজসমূহ। ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজ দুইটি বিশেষ ধরনের বহুভুজ।

বৃত্ত একটি সমতলীয় বক্ররেখা যার প্রতিটি বিন্দু একই সমতলের উপর অবস্থিত একটি নিদিষ্ট বিন্দু থেকে সমদূরবর্তী, এই নির্দিষ্ট বিন্দুকে বৃত্তের কেন্দ্র বলে।তিনটি অসমরেখ বিন্দুর মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র একটি বৃত্ত আঁকা সম্ভব। অনেকসময় বৃত্ত বলতে শুধু বক্ররেখাটিকে না বুঝিয়ে রেখাটি দ্বারা সম্পূর্ণ ক্ষেত্রকেও বোঝানো হয়।

যেসব বৃত্তের একটি সাধারণ কেন্দ্র আছে তাদেরকে সমকেন্দ্রিক বৃত্ত বলা হয়। যেসব কোণের শীর্ষবিন্দু বৃত্তের কেন্দ্র এবং দুই বাহু বৃত্তের দুইটি ব্যাসার্ধ, সেগুলিকে বৃত্তের কেন্দ্রীয় কোণ বলে। বৃত্তের পরিধিকে ৩৬০টি সমান ভাগ বা ডিগ্রিতে ভাগ করা হয় এবং কোন কেন্দ্রীয় কোণের ডিগ্রি পরিমাপ ঐ কোণটি বৃত্ত থেকে যে চাপ ছেদ করে তাতে অন্তর্গত ডিগ্রির সংখ্যার সমান।

বৃত্তের পরিধি (C) ও ব্যাসের (d) গুণফলকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে এর ক্ষেত্রফল A পাওয়া যায় অর্থাৎ  । পরিধি ও ব্যাসের অনুপাতের আসন্ন মান ৩.১৪১৫৯২৬৫। দশমিকের পরে অসীমসংখ্যক অ-পর্যায়বৃত্ত অঙ্কবিশিষ্ট এই ধ্রুবকটিকে পাই নামে ডাকা হয়। বৃত্তের ক্ষেত্রফলকে আকারেও লেখা যায়, যেখানে r হল ব্যাসার্ধ। একইভাবে, বৃত্তের পরিধি হল ব্যাস ও পাই-এর গুণফল ।

সরলরেখা দ্বারা আবদ্ধ সমতল যেকোন চিত্রকে বহুভুজ বলা হয়। যদি বহুভুজের সবগুলি বাহু ও কোণ সমান হয়, তবে সেটিকে সুষম বহুভুজ বলে। সুষম বহুভুজের কেন্দ্র থেকে যেকোন বাহুর দূরত্বকে apothem বলে। কোন সুষম বহুভুজের ক্ষেত্রফল হল এর apothem (a) ও পরিসীমার (p) গুণফলের অর্ধেক, অর্থাৎ ।

ত্রিভুজ হল সমতলের উপর অঙ্কিত একটি চিত্র যা তিনটী সরলরেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ। যদি ত্রিভুজের তিনটি বাহুই অসম হয়, তবে একে বিষমবাহু ত্রিভুজ বলে। আর কেবল দুই বাহু সমান হলে তাকে সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ এবং তিনটি বাহুই সমান হলে তাকে সমবাহু ত্রিভুজ বলা হয়। সমদ্বিবাহু ত্রিভুজে সমান বাহুদ্বয়ের বিপরীত কোণগুলি সমান। আর সমবাহু ত্রিভুজের সবগুলি কোণ সমান।

যে ত্রিভুজের একটি কোন সমকোণ তাকে সমকোণী ত্রিভুজ বলে। সমকোণী ত্রিভুজের সমকোণের বিপরীত বাহুর নাম অতিভুজ। পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্য অনুযায়ী সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ এর সমকোণ-সংলগ্ন দুই বাহুর বর্গের যোগফলের সমান। অর্থাৎ 

ত্রিভুজের ভিতরের কোনগুলিকে অন্তঃস্থ কোণ বলে, আর ত্রিভুজের বাহুগুলিকে বাড়িয়ে দিয়ে যে কোণগুলি পাওয়া যায়, তাদেরকে হলে বহিঃস্থ কোণ। ত্রিভুজের তিনটি অন্তঃস্থ কোণের সমষ্টি ১৮০°। এছাড়াও, যেকোন বহিঃস্থ এর অন্তঃস্থ বিপরীত কোণদ্বয়ের সমষ্টির সমান।

ত্রিভুজের কোন শীর্ষবিন্দু থেকে বিপরীত বাহুর মধ্যবিন্দু পর্যন্ত আঁকা রেখাকে বলা হয় ত্রিভুজটির একটি মধ্যমা। ত্রিভুজের তিনটি মধ্যমা একই বিন্দুতে ছেদ করে এবং এটি প্রতিটি মধ্যমার শীর্ষবিন্দু থেকে দুই-তৃতীয়াংশ দূরত্বে অবস্থিত। ত্রিভুজের কোন শীর্ষবিন্দু থেকে বিপরীত বাহুর উপর অঙ্কিত লম্বকে ঐ ত্রিভুজের উচ্চতা বলে।

দুইটি ত্রিভুজকে সর্বসম বলা হয় যদি এগুলি নিচের তিনটি শর্তের সেটের যেকোনটি পূরণ করে: (১) একটি ত্রিভুজের এক বাহু ও দুইটি কোণ অন্যটির অনুরূপ বাহু ও দুইটি কোনণর সমান; (২) কোন একটি ত্রিভুজের দুই বাহু এবং এদের অন্তর্ভুক্ত কোণ অন্য ত্রিভুজটির দুই বাহু ও অন্তর্ভুক্ত কোণের সমান; অথবা (৩) একটি ত্রিভুজের তিনটি বাহু অপর ত্রিভুজের তিন বাহুর সমান। যদি একই সমতলে অবস্থিত দুইটি ত্রিভুজকে নিখুঁতভাবে একটির উপর আরেকটিকে বসিয়ে দেয়া যায়, তবে তারা সরাসরি সর্বসম। আর যদি বসানোর আগে একটিকে উল্টে নিতে হয়, তবে ত্রিভুজ দুটি বিপরীতভাবে সর্বসম।

যদি দুইটি ত্রিভুজের একটির সবগুলি কোণ অন্যটির সবগুলি কোণের সমান হয়, তবে তাদেরকে সদৃশ ত্রিভুজ বলা হয় এবং এদের অনুরূপ বাহুগুলি সমানুপাতিক হয়।

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল এর ভূমি (b) ও এই ভূমির উপর অঙ্কিত উচ্চতার (h) গুণফলের অর্ধেক ()। যেকোন বাহুকেই ভূমি ধরা যায়। যদি ত্রিভুজটি সমবাহু হয়, তবে এর ক্ষেত্রফল , যেখানে a যেকোন বাহুর দৈর্ঘ্য। যদি কোন ত্রিভুজের তিনটি বাহু a, b এবং c হয়, তবে গ্রিক গণিতবিদ আর্কিমিডিসের দেয়া সূত্র অনুযায়ী এর ক্ষেত্রফল , যেখানে s ত্রিভুজের পরিসীমার অর্ধেক (s = ½ (a + b + c)।

চতুর্ভুজ হল চারটি সরলরেখা দ্বারা আবদ্ধ সমতল ক্ষেত্র। যেসব বিভিন্ন চতুর্ভুজের সাথে আমরা অতিপরিচিত তাদের মধ্যে আছে ট্রাপিজিয়াম, যার দুইটি সমান্তরাল কিন্তু অসমান। সামান্তরিকের বিপরীত বাহুগুলি সমান ও সমান্তরাল। রম্বস এক ধরনের সামান্তরিক যার সবগুলি বাহু সমান। আয়তক্ষেত্র এক ধরনের সামান্তরিক যার কোণগুলি সমকোণ। বর্গক্ষেত্র হল সমান বাহুবিশিষ্ট আয়তক্ষেত্র। সামান্তরিকের কর্ণদ্বয় পরস্পরকে সমদ্বিখণ্ডিত করে। আয়োতক্ষেত্রের কর্ণদ্বয় সমান। যেসব চতুর্ভুজের বাহুগুলি অসমান ও অসমান্তরাল, তাদেরকে বিষম চতুর্ভুজ বলে।

ট্রাপিজিয়ামের ক্ষেত্রফল এর সমান্তরাল বাহুদ্বয়ের সমষ্টি ও উচ্চতার গুণফলের অর্ধেক: A = [(b1 + b2)/2]h। সামান্তরিকের ক্ষেত্রফল এর ভূমি ও উচ্চতার গুণফলের সমান: A = bh।
 
বিষম চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল গণনার জন্য চতুর্ভুজটিকে সাধারণত কর্ণের সাহায্যে দুইটি ত্রিভুজে ভাগ করে নেয়া হয় এবং তারপর ত্রিভুজ দুইটির ক্ষেত্রফল আলাদা করে বের করে যোগ করে সম্পূর্ণ চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল বের করা হয়।

ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিতে যে বস্তুগুলি প্রায়োই আলোচিত হয় তাদের মধ্যে আছে গোলক, বহুতলক, ত্রিশিরা বা প্রিজম, বেলন বা সিলিন্ডার, ও কোণক। বেলন আসলে প্রিজমেরই একটি বিশেষ রূপ; আর কোণক পিরামিডের বিশেষ রূপ।

গোলক একটি তল যার সমস্ত বিন্দু কেন্দ্র নামের একটি বিন্দু থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত। গোলককে একটি সমতল দিয়ে ছেদ করলে ছেদবিন্দুগুলি একটি বৃত্ত গঠন করে। তলটি গোলকের কেন্দ্র দিয়ে গেলে এরূপ বৃহত্তম বৃত্তটি পাওয়া যায়। পৃথিবীর বিষুবরেখা এরকম একটি বৃহত্তম বৃত্ত (যদি পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করি)। গোলকের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল A = 4pr2, এবং আয়তন V = 4/3pr3 সমীকরণ দিয়ে পাওয়া যায়।

সমতল পৃষ্ঠ দ্বারা আবদ্ধ যেকোন ঘনবস্তুকে বহুতলক বলে। যদি কোন বহুতলকের পৃষ্ঠগুলির প্রতিটি সর্বসম সুষম বহুভুজ হয়, তবে এটিকে সুষম বহুতলক বলা হয়। প্রমাণ করা হয়েছে যে কেবল পাঁচ রকমের বহুতলকের জন্য সুষম বহুতলক সম্ভব। এগুলি হল চতুস্তলক (চারটি তল), ঘনক (ছয়টি তল), অষ্টতলক (আটটি তল), দ্বাদশতলক (১২টি তল), এবং বিশতলক (২০টি তল)। প্রাচীন গ্রিক জ্যামিতিবিদেরা এই পাঁচটি বহুতলক সম্পর্কে জানতেন। সুষম কিংবা অসম, যেকোন বহুতলকের একটি বিশেষ ধর্ম হচ্ছে এর তলের সংখ্যা ও শীর্ষবিন্দুর সংখ্যা যোগ করে ২ বিয়োগ করলে এর ধারের সংখ্যা পাওয়া যায়। সাম্প্রতিককাল পর্যন্তও বহুতলকগুলির সাথে প্রকৃতির রহস্যময়তার সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হত।

প্রিজম হচ্ছে এমন এক ধরনের বহুতলক যার দুইটি পৃষ্ঠ পরস্পর সমান্তরাল ও সর্বসম (এদেরকে ভূমি বলে) এবং যার অন্য সব পৃষ্ঠ সামান্তরিক। parallelepiped এক ধরনের প্রিজম যার ভূমিদ্বয় সামান্তরিক। একটি সমকোণী প্রিজমের তলগুলি আয়তাকার(ভূমিগুলি আয়তাকার হতেও পারে নাও হতে পারে)। প্রিজমের আয়তন এর যেকোন ভূমির ক্ষেত্রফল ও উচ্চতার গুণফল: V = bh.

পিরামিড একটি বহুতলক যার ভূমি একটি বহুভুজ এবং পার্শ্বগুলি একই শীর্ষবিন্দুবিশিষ্ট ত্রিভুজ। যদি কোন পিরামিডের ভূমি সুষম বহুভুজ হয় এবং এর শীর্ষ ও ভূমির কেন্দ্রবিন্দুকে সংযোগকারী রেখা ভূমির উপর লম্ব হয়, তবে এটিকে সুষম সমকোণী পিরামিড বলে। পিরামিডের ক্ষেত্রফল এর ভূমির ক্ষেত্রফলের এক-তৃতীয়াংশ ও এর উচ্চতার গুণফলের সমান।

বেলন বা সিলিন্ডার হল বৃত্তাকার ভূমিবিশিষ্ট প্রিজম। এর আয়তনের সূত্রও তাই প্রিজমের মত ভূমির ক্ষেত্রফল ও উচ্চতার গুণফল দিয়ে বের করা হয়। যদি দুইটি ভূমির কেন্দ্রকে সংযোগকারী রেখা ভূমিদ্বয়ের উপর লম্ব হয়, তবে সেই সিলিন্ডারকে সমকোণী সিলিন্ডার বলা হয়। নতুবা একে তির্যক সিলিন্ডার বলে। 
 
কোণক (cone) হল বৃত্তাকার ভূমিবিশিষ্ট পিরামিড। পিরামিডের শীর্ষ ও ভূমির কেন্দ্রকে সংযোগকারী রেখা ভূমির উপর লম্ব হলে তাকে সমকোণী কোণক বলে। b ক্ষেত্রফলের ভূমি ও h উচ্চতার কোণকের আয়তনের সূত্র পিরামিডের অনুরূপ: V = bh

কোণকের পৃষ্ঠতলকে সমতল একটি তল দিয়ে ছেদ করলে যে বক্ররেখা পাওয়া যায়, তাকে কনিক ছেদ বলে (উল্লেখ্য এখানে কোণক বলতে আসলে দুইটি সমকোণী বৃত্তভূমিক কোণকের একটিকে উল্টিয়ে দুই শীর্ষবিন্দু একত্রে স্থাপন করলে যে জ্যামিতিক চিত্রটি তৈরি হয়, তাকে বোঝাচ্ছে)। শীর্ষবিন্দুর দুইপাশের কোণকের যেকোন পৃষ্ঠকে nappe বলে।

যদি কোণকের অক্ষ ও এর পৃষ্ঠের অন্তর্বর্তী কোণ A হয় এবং কোণকটিকে একটি তল A-এর চেয়ে বড় কোণে ছেদ করে, তবে ছেদরেখাটি হয় একটি বদ্ধ বক্ররেখা যার নাম উপবৃত্ত। যদি তলটি কোণককে অক্ষের সাথে লম্বভাবে ছেদ করে, তবে যে আবদ্ধ বক্ররেখাটি পাওয়া যায়, তার নাম বৃত্ত। বৃত্ত তাই উপবৃত্তের একটি বিশেষ রূপ।

যদি তলটি অক্ষের সাথে A কোণের সমান কোণ করে ছেদ করে, অর্থাৎ কোণকের পৃষ্ঠতলের সমান্তরালে ছেদ করে, তবে যে উন্মুক্ত ও অসীমে বিস্তৃত বক্ররেখাটি ছেদরেখা হিসেবে পাওয়া যায়, তাকে পরাবৃত্ত বলে। আর যদি তলটি অক্ষের সমান্তরালে বা A কোণের চেয়ে ক্ষুদ্রতর কোণে ছেদ করে, তবে যে বক্ররেখাটি পাওয়া যায়, তাকে অধিবৃত্ত বলে। এইক্ষেত্রে কোণকটির উভয় nappe-ই ছিন্ন হয়, ফলে অধিবৃত্তের দুইটি শাখা থাকে, যাদের প্রতিটি অসীম পর্যন্ত প্রসারিত।

যেহেতু কনিক ছেদগুলি দ্বিমাত্রিক বক্ররেখা, তাই এদের সংজ্ঞায় ত্রিমাত্রিক কোণকের উল্লেখ না করে অন্য উপায়ে সংজ্ঞা দেয়া হয়। দ্বিমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোণকীয় ছেদ হল সেই সমস্ত বিন্দুর চলনপথ একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে যেগুলির দূরত্ব এবং ঐ নির্দিষ্ট বন্দুর বহিঃস্থ একটি নির্দিষ্ট রেখা থেকে ঐ একই বিন্দুগুলির দূরত্ব একটি ধ্রুব অনুপাত বজায় রাখে। নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে বলা হয় ফোকাস বা উপকেন্দ্র, এবং নির্দিষ্ট রেখাটিকে বলা হয় নিয়ামক বা দিগাক্ষ। ধ্রুব অনুপাতটিকে বলা হয় কনিক ছেদের উৎকেন্দ্রিকতা এবং একে e দিয়ে নির্দেশ করা হয়। যদি P একটি বিন্দু হয় এবং Q বিন্দুটি P থেকে দিগাক্ষরেখার উপর অঙ্কিত লম্বের পাদবিন্দু হয়, তবে P বিন্দুটির F ফোকাসবিশিষ্ট একটি কনিক ছেদের উপর অবস্থিত হওয়ার একমাত্র শর্ত হল [FP] = e[QP]। যখন e = ১ তখন কনিকটি একটি পরাবৃত্ত; যখন e  ১, তখন এটি অধিবৃত্ত; এবং যখন e  ১, এটি একটি উপবৃত্ত।
 
কনিকের অনেক গাণিতিক বৈশিষ্ট্য গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে কাজে আসে। উদাহরণস্বরূপ, কোন কনিকের আকারে নির্মিত দর্পণে আলো নির্দিষ্ট ধর্ম অনুযায়ী প্রতিফলিত হয়। বৃত্তাকার দর্পণের ফোকাস থেকে উৎসারিত রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে আবার ফোকাসে ফিরে আসে। উপবৃত্তাকার দর্পণের দুইটি ফোকাসের যেকোন একটি থেকে উৎসারিত রশ্মি প্রতিফলনের পর অন্য ফোকাসটি দিয়ে গমন করে। পরাবৃত্তীয় দর্পণে ফোকাস থেকে উৎসারিত আলো প্রতিফলনের পর সমান্তরাল রেখায় গমন করে, এ কারণে স্পটলাইটে পরাবৃত্তীয় দর্পণ ব্যবহার করা হয়, যেন আলো চারপাশে বিক্ষিপ্ত না হয়। অধিবৃত্তের একটি ফোকাস থেকে উৎসারিত আলোকরশ্মি প্রতিফলনের পর এমনভাবে গমন করে যেন মনে হয় এগুলি অন্য ফোকাসটি থেকে উৎসারিত হচ্ছে।

কিছু কিছু সাংখ্যিক ও বীজগাণিতিক সমীকরণ দিয়ে বিন্দু, রেখা এবং অন্যান্য জ্যামিতিক আকৃতি নির্দেশ করা যায়, এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্লেষণী জ্যামিতির জন্ম। অক্ষ ও স্থানাঙ্ক ব্যবহার করে সমীকরণগুলির চিত্রলেখ অঙ্কনের মাধ্যমে বিন্দু, রেখা ও অন্যান্য আকৃতি নির্দেশ করা সম্ভব। যেমন, লম্বভাবে অবস্থিত দুইটি অক্ষ থেকে দূরত্ব নির্দেশ করে কোন একটি বিন্দুর অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব। যদি কোনো বিন্দু x-অক্ষ থেকে ৫ একক দূরে এবং y-অক্ষ থেকে ৭ একক দূরে অবস্থিত হয়, তবে এটির অবস্থান x = 7, y = 5, এই সমীকরণ দুইটি দিয়ে নির্দেশ করা সম্ভব। একইভাবে, একটি সরলরেখাকে সবসময় ax + by + c = 0 আকারের একটি সমীকরণ দিয়ে নির্দেশ করা যায়। বৃত্ত, উপবৃত্ত, কোণীয় ছেদ ও অন্যান্য আকৃতির জন্য আরও জটিল সমীকরণ আছে।

বিশ্লেষণী জ্যামিতিতে দুই ধরনের সমস্যা খুবই সাধারণ। প্রথম ধরনের সমস্যাতে কতগুলি বিন্দুর জ্যামিতিক বিবরণ দেয়া থাকে, এবং সেখান থেকে এই বিন্দুগুলিকে সিদ্ধ করে এমন বীজগাণিতিক সমীকরণ করতে হয়। দ্বিতীয় ধরনের সমস্যা এর বিপরীত: প্রদত্ত বীজগাণিতিক সমীকরণ থেকে এমন কোন বিন্দু সমাহার বের করতে হয় যেগুলি একটি জ্যামিতিক বিবৃতি মেনে চলে। উদাহরণস্বরূপ ৩ ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটি বৃত্ত যার কেন্দ্র x ও y অক্ষের ছেদবিন্দু তথা মূলবিন্দুতে অবস্থিত, সেটির সমস্ত বিন্দু  সমীকরণ মেনে চলবে। এই ধরনের সমীকরণ ব্যবহার করে জ্যামিতিক অন্যান্য সমস্যা যেমন কোন কোণ বা রেখাংশের সমদ্বিখণ্ডক বের করা, বা কোন রেখার নির্দিষ্ট বিন্দুতে লম্ব আঁকা, তিনটি প্রদত্ত অসমরেখ বিন্দুর মধ্য দিয়ে বৃত্ত আঁকা, ইত্যাদি সম্পাদন করা যায়।

একইভাবে তিনটি অক্ষ ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক জগতে বিন্দু, রেখা ও অন্যান্য চিত্র নির্দেশ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে তৃতীয় অক্ষ বা z অক্ষটি পর দুইটি অক্ষের উপর লম্বভাবে অবস্থিত থাকে।

গণিতের উন্নয়নে বিশ্লেষণী জ্যামিতি মূল্যবান ভূমিকা রাখে। এটি সংখ্যার সম্পর্ক তথা বিশ্লেষণী গণিতের সাথে জ্যামিতি তথা স্থানিক সম্পর্কের যোগসূত্র স্থাপন করে। বিশ্লেষণী জ্যামিতির কৌশলগুলি সংখ্যা ও বীজগাণিতিক রাশিমালার জ্যামিতিক উপস্থাপন সম্ভব করে। ফলে ক্যালকুলাস, ফাংশনের তত্ত্ব, ও উচ্চতর গণিতের অন্যান্য সমস্যা নতুন আলোকে দেখার সুযোগ হয়। বিশ্লেষণী জ্যামিতি ছাড়া অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি ও তিনের অধিক মাত্রার জ্যামিতির আলোচনা সম্ভবপর হত না।

জার্মান গণিতবিদ কার্ল ফ্রিড্‌রিশ গাউস ভূমি জরিপ ও প্রভূমিতি (geodesy) সংক্রান্ত ব্যাবহারিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্তরক জ্যামিতি শাখা শুরু করেন। এতে তিনি অন্তরক ক্যালকুলাস ব্যবহার করে বক্ররেখা ও বক্রতলসমূহের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি গাণিতিকভাবে দেখান যে একটি বেলনের স্বকীয় বক্রতা ও একটি সমতলের স্বকীয় বক্রতা একই, কেননা একটি ফাঁপা বেলনকে অক্ষ বরাবর কেটে চ্যাপ্টা করলে এটি একটি সমতলে পরিণত হয়, কিন্তু গোলকের ক্ষেত্রে রূপবিকার না করে এটি করা যায় না।

ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ বলে যে কোনো প্রদত্ত রেখার বহিঃস্থ একটি বিন্দু দিয়ে ঐ রেখার সমান্তরাল কেবল একটি রেখা আঁকা সম্ভব এবং এই সমান্তরাল রেখা কখনোই প্রদত্ত রেখাটিকে স্পর্শ করবে না, অসীম পর্যন্ত সমান্তরালে চলতে থাকবে। ১৯শ শতকের শুরুর দিকে জার্মান গণীতবিদ কার্ল ফ্রিড্‌রিশ গাউস, রুশ গণিতবিদ নিকলাই ইভানভিচ লোবাচেভ্‌স্কি এবং হাঙ্গেরীয় গণিতবিদ ইয়ানোশ বলিয়ই একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে দেখান যে এমন একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্যামিতিক ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব যেখানে ইউক্লিডের এই পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধটিকে অন্য একটি স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব যেটি বলে যে কোন প্রদত্ত রেখার বহিঃস্থ কোন বিন্দু দিয়ে রেখাটির সমান্তরাল অসীম সংখ্যক রেখা আঁকা সম্ভব। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে জার্মান গণিতবিদ গেয়র্গ ফ্রিড্‌রিশ বের্নহার্ট রিমান দেখান যে আরেকটি জ্যামিতিক ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব যেখানে এরকম কোনো সমান্তরাল রেখাই আঁকা সম্ভব নয়।

উপরের দুই ধরনের অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির বিস্তারিত বিবরণ বেশ জটিল, তবে দুটিকেই সহজ মডেলের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব। বলিয়াই-লোবাচেভ্‌স্কি জ্যামিতিতে (যাকে অনেক সময় অধিবৃত্তীয় জ্যামিতিও বলা হয়) এমন একটি জ্যামিতিক ব্যবস্থা আলোচনা করা হয় যার সমস্ত বিন্দু একটি বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং যার সমস্ত সম্ভাব্য রেখা বৃত্তটির জ্যা। যেহেতু সংজ্ঞা অনুসারে দুইটি সমান্তরাল রেখাকে যতই প্রসারিত করা হোক না কেন, এর কখনোই মিলবে না, এবং অধিবৃত্তীয় জ্যামিতিতে যেহেতু রেখাগুলি বৃত্তের ধারের বাইরে প্রসারিত করা সম্ভব নয়, সে কারণে যেকোন রেখার সমান্তরাল অসীম সংখ্যক রেখা রেখাটির বহিঃস্থ বিন্দু দিয়ে আঁকা সম্ভব।

একইভাবে রিমানীয় বা উপবৃত্তীয় অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে জ্যামিতিক বিশ্ব বা জগত একটি বিশাল গোলকের পৃষ্ঠ যেখানে সব সরলরেখা একেকটি বৃহত্তম বৃত্ত। এই জ্যামিতিতে এক জোড়া সমান্তরাল রেখা আঁকা অসম্ভব।

অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের জন্য, অর্থাৎ আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে, ইউক্লিডীয় ও অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে মহাজাগতিক দূরত্ব এবং আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা যেমন আপেক্ষিকতার সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য ইউক্লিডীয় জ্যামিতির চেয়ে অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি পর্যবেক্ষণকৃত ঘটনাবলির আরও সূক্ষ্ম ও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বক্রতলের একটি রিমানীয় জ্যামিতির উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত।

বিভিন্ন জ্যামিতিক বস্তু ও এদের অভিক্ষেপের মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে ১৭শ শতকে জ্যামিতির আরেকটি শাখা শুরু হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কনিকগুলিকে অভিক্ষেপের মাধ্যমে একটি থেকে আরেকটিতে রূপান্তরিত করা যায়। কোন ফ্ল্যাশলাইটকে দেয়ালের সাথে লম্বভাবে ধরলে বৃত্তাকার আলোকপট্টি ফেলে, কিন্তু কোণ করে হেলিয়ে ধরলে দেয়ালে উপবৃত্তাকার আলোকপট্টির সৃষ্টি হয়।

অভিক্ষেপী রূপান্তরের পরেও জ্যামিতিক চিত্রের কিছু কিছু ধর্ম অপরিবর্তনশীল থাকে। এই অপরিবর্তনশীল ধর্মগুলি কী, তাই অভিক্ষেপী জ্যামিতির বিভিন্ন উপপাদ্যের আলোচ্য।

অভিক্ষেপী ও বিশ্লেষণী জ্যামিতির উন্নয়ন গণিতবিদদেরকে তিনের বেশি মাত্রার জগতের জ্যামিতি অধ্যয়নে উৎসাহী করে। অনেকে মনে করেন এ ধরনের বহুমাত্রিক জগৎ নিয়ে চিন্তা করা খুব কঠিন। কিন্তু আসলে গণিতবিদেরা এগুলি আরও সহজ উপায়ে কল্পনা করেন।

ভৌত বিশ্বের যেকোন বিন্দুর অবস্থান তিনটি অক্ষের (সাধারণত x, y, ও z-অক্ষ নামে পরিচিত) সাপেক্ষে নির্দেশ করা সম্ভব। ভৌত বিশ্বের স্থান বিষয়ক জ্যামিতি তাই ত্রিমাত্রিক।

এই ত্রিমাত্রিক জগতের প্রতিটি বিন্দুকে কল্পনায় যদি একটি গোলক দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে নেওয়া হয়, তবে এটি একটি চতুর্মাত্রিক জগতে পরিণত হয়। কেননা তখন প্রতিটি বিন্দু-গোলকের অবস্থান নির্দেশ করার জন্য চারটি নির্দেশক লাগবে: গোলকের কেন্দ্র নির্দেশকারী x, y, ও z-স্থানাংক এবং গোলকটির ব্যাসার্ধের দৈর্ঘ্য।

একইভাবে দ্বিমাত্রিক জগৎ দিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক জগতকে উপস্থাপন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিক জগতের প্রতিটি বিন্দুকে একটি বৃত্ত দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়, এবং ত্রিমাত্রিক জগতের তিনটি মাত্রা হল বৃত্তের কেন্দ্র নির্দেশক দুইটি স্থানাংক এবং এর ব্যাসার্ধ। 
 
তিনের বেশি মাত্রার জগৎ নিয়ে জ্যামিতিক ধারণাগুলি ভৌত বিজ্ঞানে, বিশেষ করে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চার বা তার বেশি মাত্রার জগতের সুষম জ্যামিতিক বস্তুগুলির অধ্যয়নে বিশ্লেষণী জ্যামিতির পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হয়। এই জ্যামিতিকে বলে সাংগঠনিক জ্যামিতি (structural geometry)। সাংগঠনিক জ্যামিতির একটি সরল উদাহরণ হল শুন্য, এক, দুই, তিন, চার বা তার বেশি মাত্রার জগতের সরলতম জ্যামিতিক বস্তুটির সংজ্ঞা বের করা, যাকে সবচেয়ে কম সংখ্যক শীর্ষ, ধার ও পৃষ্ঠ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এদের মধ্যে শুন্য, এক, দুই ও তিন মাত্রার জন্য বস্তুগুলি হচ্ছে আমাদের পরিচিত বিন্দু, রেখা, ত্রিভুজ ও চতুস্তলক। চার মাত্রার জগতের জন্য দেখানো যায় যে সরলতম জ্যামিতিক বস্তুটির পাঁচটি শীর্ষ, ১০টি ধার এবং ১০টি পৃষ্ঠ আছে।

প্রাচীন জ্যামিতিবিদেরা ভূমিক্ষেত্রসমূহের ক্ষেত্রফল ও ঘরবাড়ি নির্মাণের সময় সঠিকভাবে সমকোণ নির্ণয়ের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতেন। প্রাচীন মিশরে প্রতি বছর নীল নদের বন্যায় জমিসমূহের সীমানা নষ্ট হয়ে যেত এবং এই সীমানাগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য জ্যামিতির সাহায্য নেয়া হত। এই ধরনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্যামিতি প্রাচীন মিশর, সুমের এবং ব্যাবিলনিয়াতে বিকাশ লাভ করে এবং পরবর্তীতে গ্রিকদের হাতে পরিশীলিত ও নিয়মাবদ্ধ হয়।

ইতিহাসের সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ জ্যামিতিবিদ হিসেবে যার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন মিলেতুসের থালেস। থালেস ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে গ্রিসে বাস করতেন। থালেসকে অনেকগুলি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্যের জনক হিসেবে গণ্য করা হয়; এদের মধ্যে অন্যতম হল অর্ধবৃত্তস্থিত কোণ যে সমকোণ, তার প্রমাণ।

থালেসই প্রথম দেখান যে কতগুলি সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত বিবৃতি তথা স্বতঃসিদ্ধ থেকে যৌক্তিকভাবে অগ্রসর হয়ে একটি জ্যামিতিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই স্বতঃসিদ্ধগুলিকে থালেস ও তার পরবর্তী গ্রিক জ্যামিতিবিদেরা স্ব-প্রমাণিত সত্য বলে মনে করতেন। তবে আধুনিক গাণিতিক চিন্তাধারায় এগুলিকে কতগুলি সুবিধাজনক কিন্তু যথেচ্ছ অনুমান বলে গণ্য করা হয়। থালেসের এই আরোহী পদ্ধতির ধারণা সমস্ত জ্যামিতিক গবেষণায়, এমনকি সমস্ত গাণিতিক গবেষণায় বর্তমান কাল পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেছে।

থালেসের এক বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন পিথাগোরাস। পিথাগোরাস ও তার সহযোগীরা ত্রিভুজ, বৃত্ত, অনুপাত, ও কিছু কিছু ঘনবস্তুর জন্য অনেক নতুন নতুন উপপাদ্য প্রমাণ করেন। পিথাগোরাসের সবচেয়ে বিখ্যাত উপপাদ্যটি বর্তমানে তার নামে নামান্বিত এবং বলে যে, সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ বাকি বাহুদ্বয়ের বর্গের যোগফলের সমষ্টি।

গ্রিকদের প্রস্তাবিত ও স্বীক্রৃত স্বতঃসিদ্ধগুলি ছিল এই জাতীয়: “দুইটি বিন্দুর মধ্যবর্তী ক্ষুদ্রতম পথ সরলরেখা।” এই ধরনের স্বতঃসিদ্ধ থেকে বিন্দু, রেখা, কোণ, বক্ররেখা ও তলসমূহ সম্পর্কে বিভিন্ন উপপাদ্যে যৌক্তিকভাবে উপনীত হওয়া যেত। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে ইউক্লিডই সর্বপ্রথম বিভিন্ন ছড়িয়ে থাকা উপপাদ্য ও স্বতঃসিদ্ধগুলি একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে এনে তার Elements গ্রন্থতে প্রকাশ করেন। ১৩টি পার্চমেন্ট রোল বা পুস্তকে লেখা এই গ্রন্থ মানবমনের চরম উৎকর্ষের একটি নিদর্শন। প্রকাশের প্রায় ১০০০ বছর গণিতবিদের এগুলোতে সামান্যই কোন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন যোগ করতে পেরেছিলেন। বিংশ শতাব্দীতেও জ্যামিতির প্রাথমিক পাঠ্য হিসেবে ইউক্লিডের বইটি অবিকৃতভাবে ব্যবহার করা হত। ইউক্লিডের কাজের গুরুত্ব তার ফলাফলে নয়, বরং তার পদ্ধতিতে। তার প্রমাণিত বেশির ভাগ উপপাদ্যই বহু বছর আগেই জানা ছিল, কিন্তু তার আগে কেউই দেখাতে পারেনি যে এগুলি সব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত এবং সামান্য কিছু প্রাথমিক স্বতদঃসিদ্ধ থেকে এগুলিতে উপনীত হওয়া সম্ভব। ইউক্লিড এভাবে তার কাজের মাধ্যমে আরোহী পদ্ধতির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন।

গ্রিকরা কেবল রুলার ও কাঁটা-কম্পাস ব্যবহার করে জ্যামিতিক চিত্র আঁকার সমস্যা (সমপাদ্য) উদ্ভাবন করেছিল। সরল সমস্যাগুলির মধ্যে আছে কোন প্রদত্ত রেখাংশের দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যের রেখাংশ আঁকা, কোন একটি কোণকে সমদ্বিখণ্ডিত করা, ইত্যাদি। গ্রিকদের এ সংক্রান্ত তিনটি বিখ্যাত সমস্যা বহু বছর ধরে গণিতবিদেরা সমাধান করতে পারেন নি: প্রদত্ত ঘনকের দ্বিগুণ আয়তনের ঘনক আঁকা, প্রদত্ত বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সমান ক্ষেত্রফলের বর্গ আঁকা, এবং একটি কোণকে সমত্রিখণ্ডিত করা। এগুলির কোনটিই রুলার ও কাঁটাকম্পাসের সাহায্য নিয়ে আঁকা সম্ভব নয়। এদের মধ্যে বৃত্তের বর্গীকরণের অসম্ভাব্যতা ১৮৮২ সালের আগে প্রমাণিত হয়নি।

গ্রিক গণিতবিদ পের্গার আপোল্লনিয়ুস কনিক ছেদগুলি নিয়ে গবেষণা করেন এবং এগুলির অনেক মৌলিক ধর্ম খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দেই আবিষ্কার করেন। কনিকগুলি ভৌত বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে কাজে আসে। যেমন যেকোন খ-বস্তুর কক্ষপথ, যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এমন গ্রহ বা ধূমকেতুর গতিপথ সবসময় কোন এক ধরনের কনিকের উপর অবস্থান করে। ক্রৃত্রিম উপগ্রহগুলিও পৃথিবীকে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে।

মহান গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিদিস খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে জ্যামিতিতে অনেকগুলি অবদান রাখেন। তিনি অনেকগুলি বক্ররেখাবদ্ধ আকৃতির ক্ষেত্রফল এবং বক্রতলাবদ্ধ ঘনবস্তুর, যেমন সিলিন্ডারের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয় করার সূত্র বের করেন। এছাড়াও পাই-এর আসন্ন মান নির্ণয়ের একটি পদ্ধতি বের করেন এবং বলেন যে এই মান ৩ ১০/৭০ ও ৩ ১০/৭১ এর মধ্যবর্তী।

৫ম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৫শ শতক পর্যন্ত ইউরোপে জ্যামিতির তেমন উন্নতিসাধন হয়নি।এসময় ইউরোপ অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে এবং উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা এবং ভারতের হিন্দুরা জ্যামিতির বেশির ভাগ উন্নতি সাধন করেন।গ্রিক গণিতের বেশির ভাগই ছড়িয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। তবে এদের কিছু কিছু, যেমন ইউক্লিডের Elements মুসলমান ও হিন্দুরা অনুবাদ করে সংরক্ষণ করেন ও অধ্যয়ন করেন। ৬ষ্ঠ শতকের ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্ট সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের সূত্র পুনরাবিষ্কার করেন। এছাড়াও তিনি পাই-এর অত্যন্ত সঠিক মানের একটি সূত্র দান করেন; তিনি পাই-এর মান ধরেন ৬২৮৩২/২০০০০, বা ৩.১৪১৬, যা দশমিকের পর চার ঘর পর্যন্ত পাইয়ের সঠিক মান। ৪র্থ ও ১৩শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে জ্যামিতির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ত্রিকোণমিতি শাস্ত্রের উন্নতি সাধন করা হয়।

১২শ ও ১৩শ শতকে ইউক্লিডের এলিমেন্টস গ্রিক ও আরবি থেকে লাতিনে ও আধুনিক ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং ধর্মীয় শিক্ষালয়ে জ্যামিতি শিক্ষা যোগ করা হয়।

ফরাসি দার্শনিক ও গণিতবিদ রেনে দেকার্তে জ্যামিতিকে সামনের দিকে এগিয়ে দেন। ১৬৩৭ সালে তার প্রভাবশালী রচনা Discourse on Method প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার সাহায্যে জ্যামিতিক আকৃতি প্রকাশের পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। তার কাজ জ্যামিতি ও বীজগণিতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে। এই যোগসূত্রই বিশ্লেষণী জ্যামিতি এবং আধুনিক জ্যামিতির ভিত্তি।

১৭শ শতকের জ্যামিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল অভিক্ষেপী জ্যামিতির উদ্ভাবন। অভিক্ষেপী জ্যামিতিতে কোন জ্যামিতিক বস্তুর এক তল থেকে আরেক তলে অভিক্ষেপ ফেললে এর ধর্মের কী পরিবর্তন ঘটে তা নিয়ে গবেষণা করা হয়। জেরার দ্যজার্গ নামের এক ফরাসি প্রকৌশলী perspective নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অভিক্ষেপী জ্যামিতি উদ্ভাবন করেন। ১৮শ শতকে গাসপার মোঁজ নামের ফরাসি এক গণিতের অধ্যাপক বিবরণমূলক জ্যামিতি নামে জ্যামিতির আরেকটি শাখা উদ্ভাবন করেন। বিবরণমূলক জ্যামিতিতে দ্বি-মাত্রিক চিত্রের সাহায্যে ত্রিমাত্রিক বস্তুসমূহকে কীভাবে ত্রুটিহীনভাবে উপস্থাপন করা যায় এবং এর সাহায্যে কীভাবে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির নানা সমস্যা সমাধান করা যায়, তার আলোচনা করা হয়। প্রকৌশল ও স্থাপত্যের অঙ্কনের ভিত্তি হল এই বিবরণমূলক জ্যামিতি।

ইউক্লিডীয় জ্যামিতির কাঠামোর ভেতরেই বিশ্লেষণী, অভিক্ষেপী ও বিবরণমূলক জ্যামিতির আবর্ভাব ঘটে। বহু শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা বিশ্বাস করতেন যে অনন্য সমান্তরাল রেখা সংক্রান্ত ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধটি বাকী চারটি স্বতঃসিদ্ধ থেকে প্রমাণ করা যাবে, কিন্তু এই প্রমাণ বের করার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু ১৯শ শতকে এসে নতুন নতুন জ্যামিতিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা হয় যেগুলিতে ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধটিকে অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। এইসব নতুন ধরনের অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেন কার্ল ফ্রিড্‌রিশ গাউস, ইয়ানোশ বলিয়ই, নিকলাই লবাচেভ্‌‌স্কি এবং গেয়র্গ ফ্রিড্‌রিশ বের্নহার্ট রিমান।

১৮৭২ সালে জার্মান গণিতবিদ ফেলিক্স ক্লাইন গণিতের একটি অপেক্ষাকৃত নবীন শাখা গ্রুপ তত্ত্ব ব্যবহার করে তার সময়কার সমস্ত জ্যামিতিক ব্যবস্থাগুলিকে এক ব্যবস্থার অধীনে আনেন। ১৮৯৯ সালে আরেকজন জার্মান গণিতবিদ ডাভিড হিলবের্ট তার Foundations of Geometry বইটি প্রকাশ করেন, যাতে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির জন্য স্বতঃসিদ্ধসমূহের একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রদান করা হয় এবং এটি গণিতের অন্যান্য শাখায় গভীর প্রভাব ফেলে।

১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে দেখা যায় অনেক ভৌত ঘটনা জ্যামিতিক মূলনীতি থেকে উপনীত হওয়া সম্ভব। এই তত্ত্বের সাফল্য অন্তরক জ্যামিতি ও টপোগণিতের গবেষণায় জোয়ার আনে।

১৯শ শতকের ব্রিটিশ গণিতবিদ আর্থার কেলি চার বা তারও বেশি মাত্রার জ্যামিতি প্রবর্তন করেন। ১৯শ শতকে ফ্র্যাক্টাল মাত্রার আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭০-এর দশকে ফ্র্যাক্টালের ধারণা কাজে লাগিয়ে জ্যামিতির নতুন শাখা ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতির উদ্ভব হয়।




#Article 86: কম্পিউটার বিজ্ঞান (3745 words)


কম্পিউটার বিজ্ঞান কম্পিউটারের  প্রয়োগের জন্য গণনা এবং ব্যবহারিক কৌশলগুলির তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করে

কম্পিউটার বিজ্ঞান জ্ঞানের একটি শাখা যেখানে তথ্য ও গণনার তাত্ত্বিক ভিত্তির গবেষণা করা হয় এবং কম্পিউটার নামক যন্ত্রে এসব গণনা সম্পাদনের ব্যবহারিক পদ্ধতির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।  কম্পিউটার বিজ্ঞান ক্ষেত্রে গবেষণাকারী বিজ্ঞানীদেরকে কম্পিউটার বিজ্ঞানী বলা হয়। একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী গণনার তত্ত্ব ও সফটওয়্যার পদ্ধতির নকশার ব্যবহার সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন।

কম্পিউটার বিজ্ঞানকে প্রায়শই অ্যালগরিদমীয় পদ্ধতির একটি বিধিবদ্ধ অধ্যয়ন হিসেবে অভিহিত করা হয়, যে পদ্ধতির সাহায্যে তথ্য সৃষ্ট, বর্ণিত ও পরিবর্তিত হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞানের অনেক উপশাখা আছে। কিছু শাখা, যেমন কম্পিউটার গ্রাফিক্‌সে নির্দিষ্ট ফলাফল গণনাটাই মূল লক্ষ্য। আবার কিছু শাখা, যেমন গণনামূলক জটিলতা তত্ত্বে বিভিন্ন গণনা সমস্যার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করাই আলোচ্য। এছাড়াও কিছু শাখা আছে যেখানে বিভিন্ন ভৌত ব্যবস্থায় গণনা বাস্তবায়ন করার পদ্ধতি সমূহ আলোচিত হয়; যেমন প্রোগ্রামিং ভাষা তত্ত্বে একটি গণনামূলক পদ্ধতিকে কীভাবে কম্পিউটারের ভাষায় প্রকাশ করা যায় তা আলোচনা করা হয়। কম্পিউটার প্রোগ্রামাররা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গণনামূলক সমস্যা সমাধান করে থাকেন। অন্যদিকে মানুষ-কম্পিউটার মিথস্ক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো কম্পিউটার এবং গণনা-ফলাফলসমূহ ব্যবহারোপযোগী, কার্যকর এবং মানুষের কাছে সার্বিকভাবে সহজলভ্য করা।

সাধারণ মানুষ অনেক সময় কম্পিউটার বিজ্ঞানকে কম্পিউটার সম্পর্কিত অন্যান্য পেশার (যেমন তথ্যপ্রযুক্তি) সাথে মিলিয়ে ফেলে, অথবা তারা মনে করে এটা কম্পিউটার সম্পর্কিত তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা যেমন গেমিং, ওয়েব ব্রাউজিং এবং ওয়ার্ডপ্রসেসিং ঘরানার কিছু। কিন্তু কম্পিউটার বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যেসব প্রোগ্রামের সাহায্যে কম্পিউটার গেম, ওয়েব ব্রাউজার ধরনের সফটওয়্যারসমূহ তৈরি করা, তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করা এবং এ থেকে অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে এখনকার চেয়ে ভালো নতুন নতুন প্রোগ্রাম সৃষ্টি করা।

কম্পিউটার বিজ্ঞান হয়ে উঠার প্রাথমিক ভিত্তিগুলো আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটারের আবিষ্কারকে পূর্বাভাস দিয়েছিল। গুণ এবং ভাগের মতো গণনাগুলিতে সহায়তা করতে অ্যাবাকাসের মতো গণনাকারী যন্ত্রগুলি প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। উপরন্তু, কম্পিউটিং সম্পাদনের জন্য অ্যালগরিদম অত্যাধুনিক কম্পিউটিং সরঞ্জামগুলির বিকাশের আগেই প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান ছিল।

১৬২৩ সালে ভিলহেল্ম শিকার্ড প্রথম যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়, যদিও এটি প্রোগ্রামযোগ্য ছিল না। ১৬৭৩ সালে গট‌ফ্রিড লাইব‌নিৎস ডিজিটাল যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরি করেন যা 'স্টেপড রেকোনার' নামে পরিচিত ছিল। বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করার জন্য তাকে প্রথম কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও তথ্য তাত্ত্বিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৮২০ সালে চার্লস জেভিয়ার টমাস অফিসে কাজ করার মত একটি যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর বাজারে ছাড়েন যার নাম ছিল এরিথোমিটার।

আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের উৎস হিসেবে ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজের কাজকে উল্লেখ করা যায়। ব্যাবেজ ১৮৩৭ সালে একটি প্রোগ্রামযোগ্য যান্ত্রিক গণনাযন্ত্র বা ক্যালকুলেটর প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯ শতকে জর্জ বুল উদ্ভাবিত বুলিয়ান বীজগণিত দ্বিমিক বা বাইনারি পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বর্তনী তৈরির গাণিতিক ভিত্তি প্রদান করে।

১৯৪০-এর দশকে ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটারের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত কম্পিউটার বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বা প্রকৌশলবিদ্যার চেয়ে একটি আলাদা শাস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হত না। তবে এর পর থেকে এটি অনেক শাখা প্রশাখার জন্ম দিয়েছে, যেগুলো একান্তই কম্পিউটার বিজ্ঞান সম্বন্ধীয়।

অ্যালগোরিদম তত্ত্ব, গাণিতিক যুক্তিবিজ্ঞান, ও প্রোগ্রাম সংরক্ষণের ক্ষমতাবিশিষ্ট ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারের উদ্ভাবন - এই তিনের সম্মিলনে ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে কম্পিউটার বিজ্ঞানের জন্ম হয়। ১৯৩০-এর দশকে অ্যালান টুরিং, আলোন্‌জো চার্চ ও কুর্ট গ্যোডেলের অ্যালগোরিদম তত্ত্বসমূহ ও এগুলো যন্ত্রে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গবেষণা, তারও ৬০ বছর আগে অগাস্টা অ্যাডা কিং (কাউন্টেস অফ লাভলেস)-এর উদ্ভাবিত অ্যালগোরিদম, ১৯২০-এর দশকে ভ্যানিভার বুশের উদ্ভাবিত অ্যানালগ কম্পিউটার, এবং ১৯৩০-এর দশকে হাওয়ার্ড আইকেন ও কনরাড ৎসুজে কর্তৃক উদ্ভাবিত ইলেকট্রনিক কম্পিউটার - এ সবই কম্পিউটার বিজ্ঞানের জন্মে ভূমিকা রাখে। ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে জন ভন নিউম্যানের রচনাবলি নতুন এই শাস্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। মার্কিন তড়িৎ প্রকৌশলী জন প্রেস্‌পার একার্ট ও মার্কিন পদার্থবিদ জন মক্‌লি ১৯৪৬ সালে বিশ্বের সর্বপ্রথম টুরিং-সম্পূর্ণ সাধারণ ব্যবহারোপযোগী ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটার এনিয়াক উদ্ভাবন করেন। তারা ১৯৫১ সালে বিশ্বের সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক কম্পিউটার ইউনিভ্যাক-১-ও তৈরি করেন। এর আগে জন প্রেস্‌পার একার্ট ১৯৪৬ সালে পেন্সিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা স্তরে ইতিহাসের সর্বপ্রথম কম্পিউটার বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কোর্স পরিচালনা করেন; এটি মুর স্কুল লেকচার্স নামে বিখ্যাত।

১৯৪০-এর দশকের শেষে ও ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের আদি পর্যায়ে গবেষণার লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের জন্য ব্যবহৃত গণনা করার প্রক্রিয়াগুলোকে স্বয়ংক্রিয় রূপ দেওয়া। কোন প্রক্রিয়ায় গণনা করলে তাড়াতাড়ি সঠিক ফল পাওয়া যাবে, তা বের করার জন্য বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা গণনার বিভিন্ন তাত্ত্বিক প্রতিমান (মডেল) তৈরি করেন। এসময় কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং গণিতের সাংখ্যিক বিশ্লেষণ নামক শাখার মধ্যে বহু মিল ছিল, যে শাখায় গণনার নির্ভুলতা ও যথার্থতা নিয়ে গবেষণা করা হত।

১৯৫০ ও ১৯৭০-এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে কম্পিউটারের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এসময় কম্পিউটারের ব্যবহার সরল করার উদ্দেশ্যে এক ধরনের কৃত্রিম ভাষা তথা প্রোগ্রামিং ভাষাসমূহের উদ্ভাবন করেন এবং কম্পিউটার ও কম্পিউটার ব্যবহারকারীর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী অপারেটিং সিস্টেম প্রোগ্রামের প্রচলন করেন। তারা কম্পিউটারের নতুন ব্যবহারিক ক্ষেত্র সন্ধান ও নতুন ধরনের কম্পিউটার নকশায়ন নিয়েও গবেষণা চালান। এসময় প্রথম কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা হয় এবং গণনা ও মনের চিন্তাধারার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার পরীক্ষাগারে পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার বিজ্ঞানে সনদ প্রদানকারী এক বছর মেয়াদী একটি শিক্ষাক্রম চালু হয়। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সনদ এবং ১৯৬৮ সালে স্নাতক পর্যায়ে সনদ প্রদানকারী শিক্ষাক্রম চালু হয়।

১৯৭০-এর দশকে কম্পিউটার চিপ প্রস্তুতকারকেরা ব্যাপকভাবে মাইক্রোপ্রসেসর উৎপাদন করতে শুরু করেন। মাইক্রোপ্রসেসর হল কম্পিউটারের ভেতরে অবস্থিত প্রধান তথ্য প্রক্রিয়াকারী কেন্দ্র। এই নতুন প্রযুক্তি কম্পিউটার শিল্পব্যবস্থায় বিপ্লব আনে; কম্পিউটার তৈরির খরচ বহুলাংশে কমে যায় এবং কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াকরণের দ্রুতি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মাইক্রোপ্রসেসরের ওপর ভিত্তি করেই সৃষ্টি হয় ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা পিসি। পিসি-র আবির্ভাবের পর কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে যায়। ১৯৭০-এর শুরু থেকে ১৯৮০-র দশকের পুরোটা জুড়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানের পরিধির ব্যাপক প্রসার ঘটে। কম্পিউটিং শিল্পে উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রযুক্তি চালনার জন্য এবং ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ব্যবহার্য নতুন অ্যাপ্লিকেশনগুলো তৈরির জন্য এর কোন বিকল্প ছিল না। এভাবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের অতীতের গবেষণাগুলোর ফলাফল ব্যক্তিগত কম্পিউটারের প্রসারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা অনবরত কম্পিউটার ও তথ্য ব্যবস্থাসমূহের উন্নতি সাধন করে চলেছেন। তারা আরও জটিল, নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী কম্পিউটার নকশা করছেন, এমন সব কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন যেগুলো দিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য দক্ষতার সাথে আদান প্রদান করা যায় এবং কম্পিউটারকে কীভাবে বুদ্ধিমান সত্তার মত আচরণ করানো যায়, তার উপায়গুলো খুঁজে বের করছেন। কম্পিউটার ক্রমে আধুনিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে, ফলে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা বর্তমান সমস্যাগুলোর আরও ভাল সমাধান উদ্ভাবন করছেন এবং নতুন নতুন সমস্যার রসদও পাচ্ছেন।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের লক্ষ্য বিচিত্র। জনসাধারণকে বর্তমান কম্পিউটারগুলো চালনা শিক্ষা দেয়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যতমুখী প্রযুক্তি, যেগুলো কয়েক দশকেও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই, সেগুলো নিয়ে গবেষণা – এ সবই কম্পিউটার বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে। সব বিশেষ বিশেষ লক্ষ্যেরই মূল লক্ষ্য তথ্যের উন্নত ব্যবহারের মাধ্যমে মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের উন্নতিসাধন।

তত্ত্ব, প্রকৌশল ও পরীক্ষা নিরীক্ষা – এ তিনের সমন্বয়েই কম্পিউটার বিজ্ঞান। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা একটি তত্ত্ব দাঁড় করান, তারপর সেই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বয়ে একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি করেন এবং তারপর সেটি পরীক্ষা করে দেখেন।

অনেকের মনে হতে পারে যে কম্পিউটার পরীক্ষানিরীক্ষার আবার প্রয়োজন কি? কম্পিউটারকে যা আদেশ দেওয়া হয় তা-ই সে পালন করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাস্তব বিশ্বে কম্পিউটারের নানা জটিল ব্যবহারের সময় কম্পিউটারের অনেক অজানা আচরণ পরিলক্ষিত হয় যেগুলোর পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। পরীক্ষা নিরীক্ষা আর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ তাই কম্পিউটার বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কম্পিউটার বিজ্ঞানকে কতগুলি বৃহত্তর শাখায় ভাগ করা যায়। যেমন - বিচ্ছিন্ন গণিত, অ্যালগোরিদম ও উপাত্ত সংগঠন, প্রোগ্রামিং ভাষা, কম্পিউটার স্থাপত্য, অপারেটিং সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার প্রকৌশল, ডাটাবেস ও তথ্য আনয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটবিজ্ঞান, কম্পিউটার গ্রাফিক্‌স, মানুষ-কম্পিউটার মিথষ্ক্রিয়া, গণনামূলক বিজ্ঞান, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যবিজ্ঞান, এবং জৈব-তথ্যবিজ্ঞান। নিচে এগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হল।

বিচ্ছিন্ন গণিতের ধারণাগুলি কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভিত্তি। খুব কম সংখ্যক কম্পিউটার বিজ্ঞানীই বিচ্ছিন্ন গণিতের উপর বিশেষ জোর দিয়ে গবেষণা করেন, কিন্তু কম্পিউটার বিজ্ঞানের বহু এলাকায় বিচ্ছিন্ন গণিতের ধারণাগুলি ঘুরেফিরে আসে। সেট তত্ত্ব, গাণিতিক যুক্তিবিজ্ঞান, গ্রাফ তত্ত্ব, এবং গুচ্ছবিন্যাসতত্ত্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বিচ্ছিন্ন গণিতের আলোচ্য।

উপাত্ত সংগঠন এবং অ্যালগোরিদমের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন গণিতের ধারণাগুলির সর্বাধিক প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। তবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও এর ব্যবহার আছে। যেমন বিধিবদ্ধ সংজ্ঞায়ন, প্রোগ্রামের যাচাইকরণ এবং তথ্যগুপ্তিবিদ্যায় গাণিতিক প্রমাণ সৃষ্টি ও অনুধাবনের ক্ষমতা অত্যন্ত দরকারি একটি দক্ষতা। গ্রাফ তত্ত্বের ধারণাগুলি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, অপারেটিং সিস্টেম এবং কম্পাইলারের গবেষণায় কাজে আসে। সেট তত্ত্বের ধারণাগুলি সফটওয়্যার প্রকৌশল এবং ডাটাবেজের গবেষণায় কাজে লাগে।

বিচ্ছিন্ন গণিতে আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে আছে:

অ্যালগোরিদম ও উপাত্ত সংগঠনসমূহ ব্যবহার করেই কম্পিউটার প্রোগ্রাম রচনা করা হয়। প্রথীতযশা কম্পিউটার বিজ্ঞানী নিকলাউস ভির্টের একটি সুবিখ্যাত বইয়ের নাম ছিল Algorithms + Data Structures = Programs (১৯৭৫)। অ্যালগোরিদম (algorithm) হল সুনির্দিষ্ট ও সসীম সংখ্যক ধাপবিশিষ্ট পদ্ধতি, যা সসীম সময়ের মধ্যে ও সসীম পরিমাণ কম্পিউটার মেমরি ব্যবহার করে কোন সমস্যার সমাধান করে। অতিব্যবহৃত অ্যালগোরিদমগুলোর মধ্যে আছে কোন উপাত্ত সংগ্রহ অনুসন্ধান (searching), উপাত্ত বিন্যস্তকরণ (sorting), ম্যাট্রিক্স গুণন ও অন্যান্য সাংখ্যিক অপারেশনসমূহ, ইত্যাদি। কোন উপাত্ত সংগঠন (data structure) হল তথ্যের একটি নির্দিষ্ট ধরনের সুবিন্যস্ত রূপ, যা উপাত্তের বিভিন্ন মানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। লিস্ট, অ্যারে, রেকর্ড, স্ট্যাক, কিউ, ট্রি, ইত্যাদি কিছু বহু-ব্যবহৃত উপাত্ত সংগঠন।

অ্যালগোরিদম কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি মৌলিক বিষয়। কোন্‌ অ্যালগোরিদম পছন্দ করা হয়েছে এবং সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে --- এই দুইটি বিষয় বাস্তব বিশ্বে যেকোন সফটওয়্যার ব্যবস্থার কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করে। ভাল অ্যালগোরিদমের নকশায়ন তাই সফটওয়্যারের সাফল্যের চাবিকাঠি। তাছাড়া অ্যালগোরিদম নিয়ে গবেষণা প্রোগ্রামিং ভাষা, ঘরানা, কিংবা কম্পিউটার হার্ডওয়্যার নির্বিশেষে বিভিন্ন সমস্যার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের অন্যতম একটি লক্ষ্য হল কোন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্য কোন্‌ অ্যালগোরিদমটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও উপযোগী, কিংবা এরকম আদৌ কোন অ্যালগোরিদম আছে কি না, তা বের করা। অ্যালগোরিদমের সব ধরনের আলোচনায় তাই দক্ষতার পরিমাপের ব্যাপারটি ঘুরে ফিরে আসে। 
  
অ্যালগোরিদম তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে গণনাযোগ্যতার তত্ত্ব, গণনামূলক জটিলতা, তথ্য-ভিত্তিক জটিলতা, সহবর্তমানতা তত্ত্ব, সম্ভাবনাভিত্তিক অ্যালগোরিদম, আরোহী ডাটাবেস তত্ত্ব ও সাম্পর্কিক ডাটাবেস তত্ত্ব, দৈবকৃত অ্যালগোরিদম, বিন্যাস-মিলানো অ্যালগোরিদম, গ্রাফ ও নেটওয়ার্ক অ্যালগোরিদম, বীজগাণিতিক অ্যালগোরিদম, গুচ্ছবিন্যাসতাত্ত্বিক সর্বোচ্চ অনুকূলীকরণ, এবং তথ্যগুপ্তিবিদ্যা। অ্যালগোরিদম তত্ত্ব অন্যান্য যেসব জ্ঞানের শাখার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো হল বিচ্ছিন্ন গণিত (যার মধ্যে পড়ে গ্রাফ তত্ত্ব, পৌনঃপুনিক ফাংশন, পুনর্ঘটন সম্পর্কসমূহ, গুচ্ছবিন্যাস তত্ত্ব), ক্যালকুলাস, আরোহী পদ্ধতি, বিধেয় যুক্তিবিজ্ঞান, সময়ভিত্তিক যুক্তিবিজ্ঞান, অর্থবিজ্ঞান, সম্ভাবনা ও পরিসংখ্যান।

জটিল অ্যালগোরিদম এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক সমস্যাগুলির ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সহায়তা নেয়া হয়। অ্যালগোরিদমসমূহকে টেস্ট কেসের সুইট দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। বিভক্তি-ও-বিজয় অ্যালগোরিদম, লোভী অ্যালগোরিদম, ডাইনামিক প্রোগ্রামিং, সসীম অবস্থার যন্ত্র ইন্টারপ্রেটার, স্ট্যাক যন্ত্র ইন্টারপ্রেটার, অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুসন্ধান ও দৈবকৃত অ্যালগোরিদমের আচরণ নির্ধারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাপক সাহায্য করেছে। এছাড়াও পরীক্ষার মাধ্যমে সমান্তরাল ও বিতরণকৃত অ্যালগোরিদমের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব হয়েছে।

অ্যালগোরিদম ও উপাত্ত সংগঠন এলাকায় আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে আছে:

অ্যালগোরিদম ও উপাত্ত সংগঠনগুলো কম্পিউটারে বাস্তবায়িত করার জন্য সফ্‌টওয়্যার প্রকৌশলীরা প্রোগ্রাম রচনা করেন। এই প্রোগ্রামগুলো লিখতে গিয়ে তারা যেসব কৃত্রিম ভাষার সাহায্য নেন, তাদেরকে প্রোগ্রামিং ভাষা বলা হয়। মানুষের মুখের স্বাভাবিক ভাষা দ্ব্যর্থবোধক এবং এ ভাষার পদসংগঠন ও শব্দার্থ বহুভাবে অনুধাবন করা যায়, তাই এটি প্রোগ্রাম লেখার জন্য উপযুক্ত নয়। এর পরিবর্তে সরল ও দ্ব্যর্থহীন কৃত্রিম প্রোগ্রামিং ভাষার আশ্রয় নেয়া হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এমন প্রোগ্রামিং ভাষা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন, যা দিয়ে সহজে প্রোগ্রাম লেখা যায় এবং প্রোগ্রামে ভুলের পরিমাণ কম হয়। প্রোগ্রামিং ভাষাগুলোকে যন্ত্রের ভাষায় ভাষান্তরিত করে নিতে হয়, যাতে কম্পিউটার প্রোগ্রামের নির্দেশগুলো পালন করতে পারে। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা আরও ভাল ভাষান্তরকরণ অ্যালগোরিদম বের করার চেষ্টা করেন, যাতে যন্ত্রের ভাষায় ভাষান্তরিত প্রোগ্রামগুলো আরও দক্ষভাবে সম্পাদন করা যায়।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের একেবারে আদি পর্যায়ে বাইনারী সংখ্যাভিত্তিক যান্ত্রিক ভাষায় (machine language) কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারকে নির্দেশ দেয়া হত। এরপর কাজের সুবিধার জন্য প্রথম যেসব প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি করা হয়, তাদের নাম অ্যাসেম্বলি ভাষা। এগুলি যান্ত্রিক ভাষা থেকে খুব একটা বেশি পৃথক ছিল না। ১৯৫০-এর দশক থেকে ব্যবহারকারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ী প্রোগ্রামিং ভাষা লেখা শুরু করেন। এদের মধ্যে ফোরট্রান ভাষাটি ছিল অন্যতম। ফোরট্রান প্রোগ্রামারদেরকে গাণিতিক অপারেশন ছাড়াও বীজগাণিতিক এক্সপ্রেশন লেখার সুযোগ দেয়। ১৯৬০-এর দশকে ফোরট্রানের একটি সরলীকৃত সংস্করণ বেসিক তৈরি করা হয়, এবং এটি নতুনদের শেখার জন্য প্রথম প্রোগ্রামিং ভাষা হিসেবে স্কুল-কলেজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফোরট্রান উদ্ভাবনের কাছাকাছি সময়ে আরেকটি ভাষা কোবোল তৈরি করা হয়, যেটি সাধারণ ব্যবসায়িক রেকর্ড, নথিপত্র, ও অন্যান্য ব্যাবসায়িক প্রক্রিয়া দেখাশোনা করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

কোবোল ও ফোরট্রান এবং এদের উত্তরসূরী প্যাসকাল ও সি হল নির্দেশমূলক ভাষা (Imperative language)। অর্থাৎ এগুলোতে কম্পিউটারকে কতগুলি প্রত্যক্ষ নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে কাজ করানো হয়; এটা যান্ত্রিক ভাষার সাথে অনেকটাই তুলনীয়। এই ধারার আরও দুটি ভাষা হল অ্যাডা ও অ্যালগল। এছাড়াও আরেক ধরনের ভাষা আছে যেগুলি ফাংশনভিত্তিক (Functional), অর্থাৎ প্রোগ্রামের ভিতরের অংশবিশেষ বা ফাংশন কল করে প্রোগ্রামিং-এর লক্ষ্য পূরণ করা হয়। ফাংশনভিত্তিক ভাষার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হচ্ছে লিস্প; এমএল ও হ্যাস্কেল-ও ফাংশনভিত্তিক ভাষা। পরবর্তীকালে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং (Object Oriented অব্জেক্ট-ওরিয়েন্টেড) ভাষা উদ্ভাবন করা হয় যেখানে উপাত্ত ও মেথড আধারে আবৃত করা হয়, এবং এই আধারকে বলা হয় অবজেক্ট বা বস্তু। এই ধারায় একাধিক অবজেক্টের মধ্যে বার্তা আদানপ্রদান করে প্রোগ্রামিঙের লক্ষ্য পূরণ করা হয়। স্মলটক, সি++, আইফেল, ভিজুয়াল বেসিক, জাভা, ইত্যাদি বস্তু-সংশ্লিষ্ট ভাষার উদাহরণ। এছাড়াও আছে উপাত্ত-প্রবাহ (Dataflow ডাটাফ্লো) ভাষা যেমন সিসাল, ভাল, ইদ নুভো, লজিক প্রোগ্রামিং ভাষা যেমন প্রোলগ, স্ট্রিং প্রসেসিং ভাষা যেমন - স্নোবল ও আইকন, এবং সহবর্তমানতাভিত্তিক (concurrency-based) প্রোগ্রামিং ভাষা যেমন - কনকারেন্ট প্যাসকাল, অকাম, এসআর, মডুলা-৩।

প্রোগ্রামিং ভাষার তত্ত্বে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে:

কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কম্পিউটার নামের যন্ত্র। কম্পিউটার না থাকলে কম্পিউটার বিজ্ঞান গণিতের একটি তাত্ত্বিক শাখা হয়ে থাকত। কম্পিউটার বিজ্ঞানীদেরকে তাই কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশ, তাদের কাজ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। কম্পিউটার স্থাপত্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে কোন প্রোগ্রামের কাঠামো যাতে এটি একটি একটি বাস্তব মেশিনে দ্রুত নির্বাহ করা যায়। কোন কাজের জন্য কম্পিউটার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিপিইউ ক্লকের দ্রুতি, মেমরির আকার, ইত্যাদি ব্যাপার বুঝতেও কম্পিউটার স্থাপত্যের জ্ঞান কাজে আসে।

কম্পিউটার স্থপতিরা নতুন নতুন কম্পিউটার ব্যবস্থা নকশায়ন ও বিশ্লেষণ করেন। তারা কম্পিউটারের গতি, সংরক্ষণ ক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা কীভাবে বাড়ানো যায় এবং খরচ ও শক্তির ব্যবহার কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেন। এ কাজে তারা হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার প্রতিমানের (মডেল) সাহায্য নেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা কম্পিউটার হার্ডওয়্যার প্রকৌশলীদের সাথে মিলে নতুন কম্পিউটার বানানোয় অংশ নেন, কেননা তাদের স্থাপত্য প্রতিমানগুলি (মডেলগুলি) অনেকাংশেই কম্পিউটারের বর্তনীবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। অনেক কম্পিউটার স্থপতি বিশেষায়িত প্রয়োগ যেমন ছবি প্রক্রিয়াকরণ, সিগনাল প্রক্রিয়াকরণ, ইত্যাদির জন্য কম্পিউটার নকশায়ন করেন, যাতে বেশি কর্মক্ষমতা, নিম্ন দাম কিংবা উভয়ই সম্ভব হয়। কম্পিউটার স্থাপত্যে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে:

অপারেটিং সিস্টেম হল কম্পিউটারের সার্বিক পরিচালনায় নিয়োজিত বিশেষ প্রোগ্রামসমষ্টি বা সফটওয়্যার। অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারী ও কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারের মধ্যকার যোগসূত্র (interface) প্রদান করে, কম্পিউটারের স্মৃতিতে অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম স্থাপন করতে সাহায্য করে, কম্পিউটার কীভাবে অ্যাপ্লিকেশনগুলি চালাবে তা দেখাশোনা করে, কম্পিউটারের বিভিন্ন সম্পদ (resource), যেমন - ডিস্ক পরিসর (disk space) ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে, অননুমোদিত ব্যবহার থেকে কম্পিউটারকে রক্ষা করে, এবং সংরক্ষিত উপাত্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অপারেটিং সিস্টেম ও তাদের সাথে সম্পর্কিত বিমূর্তায়নগুলি সাধারণ অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের তুলনায় জটিলতর রূপ পেয়েছে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা কীভাবে অপারেটিং ব্যবস্থা আরও সহজে ব্যবহার করা যায়, সংবেদনশীল উপাত্তের ব্যবহারাধিকার প্রতিরোধ করে কীভাবে অন্যান্য উপাত্ত অংশীদারযোগ্য করা যায়, কীভাবে কম্পিউটারের স্মৃতি ও সময়ের আরও দক্ষ ব্যবহার করা যায়, তার চেষ্টা করেন।

 
একাধিক কম্পিউটার সংযুক্ত হলে একটি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গঠিত হয়। নেটওয়ার্কের কম্পিউটারগুলি কীভাবে একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে ও তথ্যের আদান-প্রদান সম্পাদন করে, তার বিভিন্ন প্রোটোকল নিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন। এ ব্যাপারে তারা টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও হার্ডওয়্যার প্রকৌশল ক্ষেত্রগুলি থেকে অনেক তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সাহায্য নেন। ল্যান, ওয়্যান, তারহীন (ওয়্যারলেস) নেটওয়ার্ক --- এই তিন ধরনের নেটওয়ার্কই বেশি দেখা যায়। ইন্টারনেট বিশ্বের সর্ববৃহৎ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক।

কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা পুরানো নেটওয়ার্কসমূহ ও ইন্টারনেটের বিবর্তন অধ্যয়ন করেন। তারা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক অ্যাপ্লিকেশন যেমন ইমেইল, টেলনেট, এফটিপি, নিউজগ্রুপ, ওয়েব ব্রাউজার, ইন্সট্যান্ট মেসেজিং, ইত্যাদি কীভাবে কাজ করে তার সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। তারা নেটওয়ার্ক স্থাপত্যের স্তরক্রমিক গঠন ও বিভিন্ন নেটোওয়ার্ক স্টান্ডার্ড বা মান সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করেন। তারা আধুনিক উদীয়মান নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিগুলির উপযোগিতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সীমা সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অধীত বিষয়গুলির মধ্যে আছে:

ব্যবহারকারী ও ক্রেতাদের চাহিদা মিটিয়ে কীভাবে দক্ষ ও কার্যকরী উপায়ে সফটওয়্যার ব্যবস্থাসমূহ নির্মাণ করা যায়, সফটওয়্যার বিজ্ঞানে সে-সম্পর্কিত তত্ত্ব ও কৌশল আলোচিত হয়। সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও সহজে ভেঙ্গে পড়ে না, এমন প্রোগ্রাম তৈরির পদ্ধতি ও কলাকৌশল নিয়ে গবেষণা করেন। এতে সফটওয়্যারের জীবনচক্রের সমস্ত দশা, যথা - বিধিগত পদ্ধতিতে সমস্যার বিবরণ তৈরি, সমাধানের নকশায়ন, প্রোগ্রাম আকারে সমাধানটির বাস্তবায়ন, প্রোগ্রামটির ভুলত্রুটি পরীক্ষা, ও প্রোগ্রামটির রক্ষণাবেক্ষণ - এই সব কিছু আলোচনা করা হয়। সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা প্রোগ্রামিং পরিবেশ নামের হাতিয়ার-সংগ্রহ বানিয়ে থাকেন, যার সাহায্যে দ্রুত ও উন্নত উপায়ে প্রোগ্রাম লেখা যায়।

সফটওয়্যার বিজ্ঞানীরা প্রকৌশলের বিভিন্ন পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, কলাকৌশল ও পরিমাপ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। সফটওয়্যার উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনা, সফটওয়্যারের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ ও প্রতিমান (মডেল) নির্মাণ, মান যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ, সফটওয়্যারের বিবর্তন ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি সংক্রান্ত বিভিন্ন সরঞ্জাম ও উপকরণ তারা ব্যবহার করেন। কোন্‌ শরনের সফটওয়ার উন্নয়নে কোন্‌ ধরনের সরঞ্জাম, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য, তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজও করে থাকেন তারা। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নের যেসব ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, মান, শিডিউল ও ব্যয়ের গুরুত্ব বেশি, সেসমস্ত ক্ষেত্রে সফটওয়্যার প্রকৌশল অবশ্য-প্রয়োজনীয়।

কীভাবে বিপুল পরিমাণ স্থায়ী ও অংশীদারযোগ্য উপাত্ত সুবিন্যস্ত করা যায়, যাতে এগুলো দক্ষভাবে ব্যবহার করা যায় ও হালনাগাদ করা যায়, তা-ই এই শাখার আলোচ্য। ডাটাবেস (database) হচ্ছে একাধিক রেকর্ডের সমষ্টি যা বিভিন্ন উপায়ে অনুসন্ধান ও হালনাগাদ করা যায়।

তথ্য আনয়ন ব্যবস্থা (information retrieval system) বলতে এক ধরনের ডকুমেন্ট-সমষ্টিকে বোঝায় যে ডকুমেন্টগুলো পরিষ্কারভাবে বিন্যস্ত নয়,অথচ এগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য বা উপাত্ত অনুসন্ধান করা প্রয়োজন,যেমন - কোন সংবাদপত্রে প্রকাশিত বহু নিবন্ধের সমষ্টি। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এই ডকুমেন্টগুলো থেকে উপাত্তের নির্ঘণ্ট (index) বের করার অ্যালগোরিদম রচনা করেন। নির্ঘণ্ট রচনার পর এগুলো থেকে সহজে উপাত্ত ও তথ্য আনয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়। তথ্য আনয়ন ব্যাবস্থার সাথে সম্পর্কিত আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে উপাত্ত খনন (data mining), যেখানে বিপুল পরিমাণ উপাত্তের মধ্য থেকে বিভিন্ন বিন্যাস (pattern) শনাক্ত করার উপায়গুলো বের করা হয়; এই শনাক্তকৃত বিন্যাসগুলো পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।

ডাটাবেস ও আনয়ন ব্যবস্থাসমূহের গবেষণায় যে সমস্ত তত্ত্ব প্রয়োগ করা হয়, তাদের মধ্যে আছে সাম্পর্কিক বীজগণিত (relational algebra), সাম্পর্কিক ক্যালকুলাস (relational calculus), সহবর্তমানতা তত্ত্ব (concurrency theory), ক্রমায়নযোগ্য আদান-প্রদান (serialiable transaction), ডেডলক প্রতিরোধ (deadlock prevention), সময়-সামঞ্জস্যীকৃত হালনাগাদ (synchronized upadte), নিয়ম-ভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ (rule-based inference), বিন্যস্তকরণ (sorting), অনুসন্ধান (searching), নির্ঘণ্ট তৈরিকরণ (indexing), কর্মদক্ষতা বিশ্লেষণ (performance analysis), তথ্যের গোপনীয়তা (information privacy) ও তথ্য ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাইকরণ (authentication)।

উপাত্তের যৌক্তিক গঠন ও বিভিন্ন উপাত্ত উপাদানের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার জন্য বিভিন্ন উপাত্ত প্রতিমান (মডেল) ব্যবহার করা হয়, যেমন - বস্তুভিত্তিক, রেকর্ডভিত্তিক ও বস্তু-সাম্পর্কিক।

প্রতিষ্ঠানের কর্মপ্রক্রিয়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতায় সহায়তাকারী তথ্যব্যবস্থাসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। বিশ্ববাজারে সাফল্য লাভের জন্য যেকোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে তথ্যব্যবস্থার ব্যবহার অপরিহার্য। যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম মানুষেরা করে থাকেন, তাই তথ্যব্যবস্থাসমূহের নকশায়নের সময় মানুষের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব প্রাতিষ্ঠানিক সুবিন্যস্তকরণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতে পারে। সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ, নৃবিজ্ঞান, বোধ বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, প্রাতিষ্ঠানিক গতিবিদ্যা, ইত্যাদি সবই কর্মক্ষেত্রে মানুষের আচরণ অনুধাবনে সহায়তা করে, এবং এই-সংক্রান্ত বেশির ভাগ তত্ত্বই কম্পিউটার প্রতিমান (মডেল), বিমূর্তায়ন ও ছদ্মায়নে ব্যবহার করে পূর্বাভাস বের করতে কাজে লাগানো হয়।

জীব-তথ্যবিজ্ঞান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন আন্তঃশাস্ত্রীয় ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের বিজ্ঞানীরা এমন সব প্রতিমান (মডেল) ও স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছেন যেগুলো কম্পিউটিং, জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আনতে পারে। ডিএনএ রসায়ন ব্যবহার করে গুচ্ছবিন্যাসতাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। স্ট্রিং বিশ্লেষক অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে মনুষ্য জিনোম প্রকল্পের বিরাট ডাটাবেস খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন খণ্ডাংশের সমন্বয়ে মানুষের পূর্ণাঙ্গ জিনোম পাওয়া গেছে। কম্পিউটার স্থাপত্যবিদ ও চিকিৎসকেরা একসাথে বিভিন্ন কৃত্রিম জীব-যান্ত্রিক বা বায়োনিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করছেন। জিন প্রকৌশলে কম্পিউটার বিশ্লেষণ ব্যবহার করে রোগ প্রতিষেধক এনজাইমের সঠিক রাসায়নিক গঠন বের করা হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে কম্পিউটারে ব্যবহৃত স্মৃতির চেয়ে বহুগুণ বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধরনের জৈব স্মৃতি নিয়েও গবেষণা চলছে।

মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ইন্দ্রিয়ের কার্যপদ্ধতি কীভাবে কম্পিউটার ও যন্ত্রের সাহায্যে অনুকরণ করা যায়, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাখার আলোচ্য বিষয়। বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও উন্নত করার জন্য এই শাখায় মানুষের আচরণের কম্পিউটার প্রতিমান (মডেল) তৈরি করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাখার বিভিন্ন উপশাখার মধ্যে রয়েছে যান্ত্রিক জ্ঞানার্জন (machine learning), সিদ্ধান্ত উপনয়ন (inference), বোধন (cognition), জ্ঞান উপস্থাপন (knowledge representation), সমস্যা সমাধান (problem solving), ঘটনাভিত্তিক যুক্তিপ্রদান (case based reasoning), স্বাভাবিক ভাষা অনুধাবন (natural language understanding), বচন শনাক্তকরণ (speech recognition), কম্পিউটার দর্শন (computer vision), কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক (artificial neural network), ইত্যাদি।

রোবট বা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রসমূহ নকশায়ন ও উৎপাদন সংক্রান্ত বিদ্যা হল রোবটবিজ্ঞান। খেলনা রোবট কিংবা কারখানায় ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় পণ্য নির্মাণ ব্যবস্থা - এ সবই রোবটবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। রোবট বানানোর অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে পুনরাবৃত্তিমূলক, বিপজ্জনক ও কঠোর পরিশ্রমের কাজ থেকে রেহাই দেওয়া এবং যেসব কাজে দ্রুতি, নির্ভুলতা ও পরিচ্ছন্নতা জরুরি, সেগুলো রোবটকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া। রোবটবিজ্ঞানীরা রোবটের ভৌত বিশিষ্ট্য নির্ধারণ, রোবটের কাজের পরিবেশের প্রতিমান (মডেল) বানানো, রোবটের কর্মপন্থা নির্ধারণ, রোবটের যান্ত্রিক কর্মকৌশলের দক্ষতা বৃদ্ধি, রোবটের আচরণ ও মানুষের নিরাপত্তা, ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করেন। তারা রোবট নিয়ন্ত্রক প্রোগ্রাম লেখেন, এই প্রোগ্রাম কীভাবে সরল করা যায় তার চেষ্টা করেন এবং সেন্সরের ব্যবহারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক প্রোগ্রামের কাছে ফিডব্যাক প্রদানের ব্যবস্থা করেন। তারা রোবটদেরকে দিয়ে কীভাবে মানুষের মত কোন কিছু সুচারুভাবে সম্পাদন করা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতা অনুকরণ করানো যায়, তা নিয়েও গবেষণা করেন, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাখার বিজ্ঞানীদের সাথে এ নিয়ে মিলিতভাবে কাজ করেন।

ভৌত এবং কাল্পনিক বস্তু ও তাদের গতি দ্বিমাত্রিক পর্দা বা ত্রিমাত্রিক হলোগ্রামে কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রদর্শনের গবেষণাকে কম্পিউটার গ্রাফিক্‌স বলা হয়। কীভাবে দক্ষভাবে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে বস্তুসমূহের ছবি তৈরি করা যায়, কীভাবে বাস্তব সময়ে (real time) জটিল বস্তুসমূহের চলন পর্দায় দেখানো যায়, কীভাবে তথ্যসেটসমূহ প্রদর্শন করা যায় যাতে মানুষের বুঝতে সুবিধা হয়, কীভাবে এমন ছদ্মায়ন তৈরি করা যায় যাকে বাস্তব থেকে আলাদা করতে কষ্ট করতে হয়, ইত্যাদি এই শাখার আলোচ্য বিষয়।

কম্পিউটার গ্রাফিক্‌স গণিতের গণনামূলক জ্যামিতি শাখার প্রভূত সহায়তা নিয়ে থাকে। প্রদর্শন পর্দায় কীভাবে বস্তুসমূহের অভিক্ষেপ ফেলা যায়, অভিক্ষেপ থেকে লুকানো রেখাগুলি কী করে সরানো যায়, কীভাবে মসৃণতা, ছায়া, প্রতিফলন ও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করা যায়, ইত্যাদি সংক্রান্ত নতুন নতুন অ্যালগোরিদম এ শাখায় উদ্ভাবন করার চেষ্টা করা হয়। জটিল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর অনুকরণ করার জন্য বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের সাহায্য নেয়া হয়। পর্দায় আলোর রঙের ব্যাপারে রঙ তত্ত্বের সাহায্য নেয়া হয়। নমুনা তত্ত্ব ব্যবহার করে অবাঞ্ছিত কোলাহল দূর করে পরিচ্ছন্ন ছবি তৈরি করা হয়। এছাড়া রৈখিক বীজগণিত, পদার্থবিজ্ঞান, গাণিতিক বিশ্লেষণ, অরৈখিক ব্যবস্থা, এ সবই কম্পিউটার গ্রাফিক্‌সে কাজে আসে।

মনিটরের পর্দায় ছবি বা বর্ণ-সাংখ্যিক ক্যারেক্টার (Alphanumeric) দুই-ই প্রদর্শিত হতে পারে। কম্পিউটারের মেমরিতে যেকোন ছবি সাধারণত দুইভাবে সংরক্ষিত হতে পারে: র‌্যাস্টার গ্রাফিক্‌স ও ভেক্টর গ্রাফিক্‌স। র‌্যাস্টার গ্রাফিক্‌সে যেকোন ছবি অনেকগুলি বিন্দুসমষ্টির একটি মেট্রিক্স হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতিটি বিন্দুর রঙ, উজ্জ্বলতা ও অন্যান্য তথ্য মেমরিতে এক বা একাধিক বিট আকারে রক্ষিত থাকে। একেকটি ছবির জন্য এভাবে যে বিপুল সংখ্যক মেমরির প্রয়োজন হয়, তা দক্ষভাবে ব্যবহারের জন্য কম্পিউটার গ্রাফিক্‌সের বিশেষায়িত প্রোগ্রামগুলিতে বিশেষ ধরনের অ্যালগোরিদম ব্যবহার করা হয়। ভেক্টর গ্রাফিক্‌সে একটি ছবি অনেকগুলি রেখার সমষ্টি হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রতিটি রেখা-সংক্রান্ত তথ্য মেমরিতে রক্ষিত থাকে। ৯০-এর দশক থেকে কম্পিউটার মনিটরে র‌্যাস্টার প্রযুক্তিই ব্যবহৃত হয়। এমনকি ভেক্টর প্রযুক্তিতে তৈরি ছবিও র‌্যাস্টারে পরিণত করে নেয়া হয়। র‌্যাস্টার পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হল এতে কোনাকুনি রেখাগুলি কাছ থেকে খাঁজ-কাটা দেখায়।

কম্পিউটার গ্রাফিক্‌সের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় বিনোদন শিল্পে। স্পেশাল ইফেক্ট, কম্পিউটার অ্যানিমেশন, ছদ্মায়ন, ইত্যাদি কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই শাখার অবদান। কম্পিউটার গ্রাফিক্‌সের গবেষণা বেশ কিছু গ্রাফিক্‌স মান বা স্ট্যান্ডার্ডের জন্ম দিয়েছে যেমন GKS, PHIGS, VDI, ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে মান প্রিন্টার ভাষা যেমন- পোস্টস্ক্রিপ্ট। ওয়েব পেজে অপ্রকৃত বাস্তবতার জন্য মান ভাষা VRML সৃষ্টি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছে ত্রিমাত্রিক ভিজুয়ালাইজার।

মানুষ কীভাবে ইন্টারঅ্যাকটিভ অর্থাৎ আন্তঃক্রিয়াশীল বস্তুর সাথে আচরণ করে, তার উপর ভিত্তি করে মানুষের দ্বারা সহজে ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যার নকশায়ন, নির্মাণ ও মূল্যায়নের নীতিগুলি মানুষ-কম্পিউটার আন্তঃক্রিয়া নামের ক্ষেত্রে আলোচিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার ও ব্যবহারকারীর মধ্যবর্তী চিত্রলৈখিক পৃষ্ঠতল (গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস বা গুই) নকশায়ন, মাল্টিমিডিয়া আন্তঃক্রিয়া, উক্তি শনাক্তকরণ ও অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উপায়সমূহ, কম্পিউটার-জালের (নেটওয়ার্কের) মাধ্যমে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, ইত্যাদি ব্যাপারগুলি।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের আদি যুগ থেকেই বৈজ্ঞানিক কম্পিউটিং-এর বিভিন্ন কলাকৌশল এবং গণনামূলক পদ্ধতিসমূহ কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষণার একটি বড় অংশ। সময়ের সাথে কম্পিউটারসমূহের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে এই ক্ষেত্রটির গুরুত্ব ও প্রসার দুই-ই বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক কম্পিউটিং একটি আলাদা শাস্ত্র হিসেবে স্বীকৃত হলেও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সাথে এর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। গণনামূলক বিজ্ঞানে আগ্রহী কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও কলাকৌশল নিয়ে অধ্যয়ন করেন, যাদের মধ্যে রয়েছে সাংখ্যিক উপস্থাপনের যথার্থতা, ত্রুটি বিশ্লেষণ, সাংখ্যিক কলাকৌশল, সমান্তরাল স্থাপত্য ও অ্যালগোরিদমসমূহ, প্রতিমানির্মাণ ও ছদ্মায়ন, এবং বৈজ্ঞানিক দৃশ্যায়ন (ভিজুয়ালাইজেশন)। তারা এই জ্ঞান বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্ষেত্র যেমন - আণবিক গতিবিজ্ঞান, প্রবাহী বলবিজ্ঞান, জ্যোতিষ্কসমূহের বলবিজ্ঞান, অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, অপটিমাইজেশন সমস্যা, পদার্থের গাঠনিক বিশ্লেষণ, জীবতথ্যবিদ্যা, গণনামূলক জীববিজ্ঞান, ভূতাত্ত্বিক প্রতিমানির্মাণ, কম্পিউটারায়িত টমোগ্রাফি, ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ পান। গণনামূলক বিজ্ঞানে অধীত বিষয়গুলির মধ্যে আছে:




#Article 87: অর্থনীতি (6527 words)


অর্থনীতি  বা ‌‌‌অর্থশাস্ত্র সামাজিক বিজ্ঞান এর একটি শাখা যা পণ্য এবং কৃত্যের উৎপাদন, সরবরাহ, বিনিময়, বিতরণ এবং ভোগ ও ভোক্তার আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।   সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অফুরন্ত– এই মৌলিক পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অর্থনীতির প্রধান উদ্দেশ্য৷ অর্থনীতি শব্দটি ইংরেজি 'Economics' শব্দের প্রতিশব্দ। Economics শব্দটি গ্রিক শব্দ 'Oikonomia' থেকে উদ্ভূত যার অর্থ গৃহস্থালী পরিচালনা। 
এল.রবিন্স এর প্রদত্ত সংজ্ঞাটি বেশিরভাগ আধুনিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিনি বলেন, অর্থনীতি মানুষের অসীম অভাব ও বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের সম্পর্ক বিষয়ক মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে। এল.রবিন্সের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি মানব জীবনের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্টের উপর প্রতিষ্ঠিত, যথা অসীম অভাব, সীমিত সম্পদ ও বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সম্পদ।
অর্থনীতির পরিধিসমূহ বিভিন্ন ভাগে বা শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যেমনঃ

আধুনিক অর্থনীতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, (১)ব্যষ্টিক অর্থনীতি ও (২)সামষ্টিক অর্থনীতি৷ ব্যষ্টিক অর্থনীতি মূলত ব্যক্তি মানুষ অথবা ব্যবসায়ের চাহিদা ও যোগান নিয়ে আলোচনা করে থাকে৷ অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জাতীয় আয়, কর্মসংস্থান, মুদ্রানীতি, ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে৷ অন্য ভাবে বলা যায় যে, Micro Economics বা ব্যষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্য হলো অর্থনীতির একটি বিশেষ অংশ বা একককে ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা এবং Macro Economics বা সামষ্টিক অর্থনীতি অর্থনীতির সামগ্রিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ করে থাকে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে আলফ্রেড মার্শাল, 'রাজনৈতিক অর্থনীতি' থেকে অর্থনীতি বিজ্ঞানের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে 'অর্থনীতি' তে পুনঃনামকরণ করেন। এই সময়ে এটা শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তাভাবনার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং গণিতের ব্যাবহার ব্যাপকহারে বেড়ে যায়, যা এটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বাইরে বিজ্ঞানের আলাদা একটি শাখা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করে।

আধুনিক অর্থনীতির বিভিন্ন ধরনের সংজ্ঞা রয়েছে; কিছু এই বিষয়ের বিবর্তিত চেহারা প্রতিফলিত করে এবং বিভিন্ন অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে। আলফ্রেড মার্শাল তার বই  Principles of Economics (1890) এ অর্থনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতি মানুষের জীবনের সাধারণ ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করে। এটা সম্পদ আহরণ এবং এর ব্যাবহার নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং একদিক দিয়ে এটা মানুষের সম্পদ নিয়ে আলোচনা করে অন্যদিকে এর গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটা মানুষের জীবনের একটি অংশ নিয়ে আলোচনা করে।

উৎপাদন ও বণ্টন আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও অর্থনীতির জনক হিসেবে খ্যাত অ্যাডাম স্মিথ কর্তৃক ১৭৭৬ খ্রীস্টাব্দে রচিত গ্রন্থ 'An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations' নামীয় গ্রন্থে অর্থনীতিকে ‌‌‌সম্পদের বিজ্ঞান‌ আখ্যায়িত করে বলেন,' Economics is Science  of wealth'। তার সংজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু হল সম্পদ উৎপাদন ও ভোগ।

অর্থনীতির সাথে উন্নয়ন সরাসরি সম্পর্কিত। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন- জনসাধারণের সক্ষমতার নামই উন্নয়ন।

ব্যষ্টিক অর্থনীতি মূলত ব্যক্তি এবং ফার্ম এর অর্থনৈতিক আচরণ নিয়ে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বাজার, বিরাজমান দুষ্প্রাপ্যতা ও সরকারি নিয়মাবলির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে।
ব্যষ্টিক অর্থনীতি হচ্ছে অর্থনীতির একটি শাখা যা ব্যক্তি, পরিবার ও ফার্ম কিভাবে বাজারে তাদের বণ্টনকৃত সীমিত সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা নিয়ে আলোচনা করে। বাজার বলতে এখানে দ্রব্য অথবা সেবাসমূহকে বোঝায় যা কেনা-বেচা করা হয়। দ্রব্য অথবা সেবাসমূহের চাহিদা ও যোগান এইসব সিদ্ধান্ত ও আচরণের উপর কী-ভাবে প্রভাব ফেলে ব্যষ্টিক অর্থনীতি তা নিরীক্ষা করে। বাজারে অবশ্যই একটি দ্রব্য বিদ্যমান থাকবে। এই তত্ত্বে প্রতিটি উপাদানকে ক্রেতা সামগ্রিক চাহিদার পরিমাণকে বিবেচনা করে এবং বিক্রেতা সামগ্রিক যোগানের পরিমাণকে বিবেচনা করে। দাম ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে বাজার ভারসাম্য পৌছে। বৃহৎ দৃষ্টিতে একে চাহিদা এবং যোগানের বিশ্লেষণ বলা হয়। বাজার কাঠামো যেমন পূর্ণ প্রতিযোগিতা এবং একচেটিয়া বাজার আচরণ ও অর্থনৈতিক ইফিসিয়েন্সি এর জন্য বাধাস্বরূপ। সাধারণ অনুমিত শর্ত থেকে যখন বিশ্লেষণ আরম্ভ হয় এবং বাজারের আন্যান্য আচরণ অপরিবর্তিত থাকে, তাকে আংশিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ বলা হয়। সাধারণ ভারসাম্য তত্ত্বে বিভিন্ন বাজারের পরিবর্তন এবং সকল বাজারের সামগ্রিক পরিবর্তন এবং ভারসাম্যের বিপরীতে তাদের গতিবিধি ও আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনা করা হয়।

সামষ্টিক অর্থনীতি অর্থনীতির নিয়ামকসমূহকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে। সামগ্রিক বলতে জাতীয় আয় ও জাতীয় উৎপাদন, বেকারত্বের হার ও মূদ্রাষ্ফীতিকে এবং আংশিক সামগ্রিক মোট ভোগ, বিনিয়োগ ব্যয় ও তাদের উপাদানকে বুঝায়। আর্থিক নীতি ও রাজস্ব নীতিকেও ইহা অধ্যয়ন করে। ১৯৬০ সাল থেকে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও অনেক ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ বৃদ্ধি করে যেমন, বিভিন্ন খাতের ব্যষ্টিকভিত্তিক মডেল, ভোক্তার যৌক্তিকতা, বাজার তথ্যের সঠিক ব্যবহার, অসম্পূর্ণ  প্রতিযোগিতা। এছাড়াও সামষ্টিক অর্থনীতি বিবেচনাধীন উপাদানসমূহের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং একটি দেশের ও দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি নিয়েও বিশ্লেষণ করে। উপাদানসমূহের মধ্যে মূলধন, প্রযুক্তি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

ব্যষ্টিক  অর্থনীতি সম্পর্কিত সাম্প্রতিক উন্নয়নে আচরণিক অর্থনীতি ও পরীক্ষামূলক অর্থনীতি নামে দুটি শাখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেমন, অর্থনৈতিক ভূগোল, অর্থনৈতিক ইতিহাস, সাধারণ পছন্দ, সাংস্কৃতিক অর্থনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি।
অন্যভাবে অর্থনীতিকে দুই ভাবে ভাগ করা হয়। নীতিবাচক অর্থনীতি অর্থনৈতিক আচরণকে ব্যাখ্যা করে, অন্য দিকে ইতিবাচক অর্থনীতি পছন্দ এবং মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়।
আবার অর্থনীতিকে মেইনষ্টীম অর্থনীতি ও হেটারোডক্স অর্থনীতি এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
'Journal of Economic Literature' এ প্রকাশিত 'JEL classification codes' প্রবন্ধে অর্থনীতির শ্রেণীবিভাগ ও প্রবন্ধ ভিত্তিক অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং 'The New Palgrave: A Dictionary of Economics' বইটিতে অর্থনীতির বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ ও উপশ্রেণীবিভাগ বিদ্যমান তা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতি একটি অধীতব্য বিষয় যা কখনও জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে, কখনও সাহিত্যিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। পল স্যামুয়েলসন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Foundations of Economics Analysis'(১৯৪৭)-এ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি সাধারণ গাণিতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন।

ইকোনোমেট্রিক্স অর্থনৈতিক মডেলসমূহের উপাত্ত সম্পর্কিত বিশ্লেষনে গাণিতিক ও পরিসংখ্যানিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয়। উদাহরনস্বরূপ বলা যায় যে, একটি তত্ত্বে অণুমিত শর্ত ধরা হয় যে অন্যান্য সব কিছু অপরিবর্তিত থেকে একজন বেশি শিক্ষিত ব্যক্তি একজন কম শিক্ষিত ব্যক্তির চাইতে বেশী আয় করবে। অর্থনৈতিক পরিমাপকগুলো বিভিন্ন সম্পর্কের গাণিতিক ও পরিসংখ্যানিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে। ইকোনোমেট্রিক্স পরিমাণগত পরিমাপের চিত্র তুলে ধরতে পারে। এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয় বিভিন্ন তত্ত্ব পরীক্ষার বা পরিশোধনের জন্য, বিগত চলক গুলোকে বর্ণনা এবং আগামীতে আসবে এ ধরনের চলকের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য।

জাতীয় পরিমাপগুলো হচ্ছে একটি জাতির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহের সংক্ষেপে প্রকাশিত করার পদ্ধতি। জাতীয় পরিমাপ হচ্ছে দ্বৈত গণনা পদ্ধতি যাতে কিছু তথ্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ থাকে। এগুলো জাতীয় আয় ও দ্রব্য পরিমাপ (NIPA)কে অন্তর্ভুক্ত করে, যা এক বছর বা বছরের একটি অংশে উৎপাদিত দ্রব্য এবং আয়কে অর্থ আকারে পরিমাপ করে। নিপা(NIPA) একটি অর্থনীতির গতিপথের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে থাকে এবং বাণিজ্য চক্র বা দীর্ঘ সময় ধরে তা পরিমাপ করে। দ্রব্যমুল্যের তথ্যসমূহ সাধারণ ও প্রকৃত পরিমাপের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, যা অতিরিক্ত সময়ের মূল্যস্তর পরিবর্তনের জন্য মোট অর্থের পরিমাণ সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে। এই জাতীয় পরিমাপগুলো বিনিয়োগ মজুত, জাতীয় সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক মুলধন প্রবাহের হিসাবকেও অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।

অর্থনীতির পরিধি

কৃষি অর্থনীতি হচ্ছে অর্থনীতির একটি সর্বপ্রাচীন এবং সুপ্রতিষ্ঠিত শাখা। ইহা কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী অর্থনৈতিক শক্তিসমূহ এবং অর্থনীতির বাকী অংশে প্রভাব বিস্তারকারী কৃষি ক্ষেত্র সমূহকে নিয়ে আলোচনা করে। ইহা হচ্ছে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা জটিল বিশ্বের প্রকৃত অবস্থার নিরিখে ব্যষ্টিক অর্থনীতির তত্ত্ব প্রয়োগে প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এবং অনেক সাধারণ আবেদনকে খুব বেশি গুরুত্ব  দেয়; ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা, গৃহস্থালি আচরণ এবং সম্পদের অধিকার ও প্রাপ্যতার মধ্যে সম্পর্ক। সম্প্রতি এর পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক দ্রব্য বাণিজ্য এবং পরিবেশ নীতি অন্তর্ভুক্তি হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি অর্থনীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপাদানগুলোকে নিয়ে আলোচনা করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে একটি দীর্ঘকালীন সময়ে একটি দেশের মাথাপিছু উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ। বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য দেখানোর জন্য এক ধরনের একক ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ উপাদানই বিনিয়োগ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের হারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই উপাদানগুলো তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক ভাবে (নিওক্লাসিক্যাল প্রবৃদ্ধি মডেল অনুসারে) এবং প্রবৃদ্ধি পরিমাপে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। নির্দিষ্ট কিছু স্তরে, উন্নয়ন অর্থনীতি স্বল্প আয়ের দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন, দারিদ্রতা এবং অর্থনৈতিক প্রগতিকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক হাতিয়ার সমূহকে বিশ্লেষণ করে। উন্নয়ন অর্থনীতি কর্পোরেটবিহীন সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদানসমূহকে কাজে লাগায়।

অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া হচ্ছে অর্থনীতির শাখা যা সামাজিক মালিকানা, পরিচালনা এবং অর্থনৈতিক সম্পদ বণ্টনে পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করে। সমাজের একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া হচ্ছে বিশ্লেষনের একক। আধুনিক পদ্ধতিতে সংগঠনকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদ ব্যাবস্থা ভাগে ভাগ করা হয়, যাহাতে বেশির ভাগ উৎপাদন হয়ে থাকে যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ও বেসরকারী এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে। উভয় ব্যাবস্থা প্রচলিত থাকলে তাকে মিশ্র অর্থনীতি বলা হয়। একটি সাধারণ উপাদান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিসমুহকে সংমিশ্রন করে, যাকে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা হয়। তুলনামূলক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া বিভিন্ন অর্থনীতি বা প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্কযুক্ত শক্তি ও আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।

অর্থব্যবস্থাবিষয়ক অর্থনীতি আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে আর্থিক সম্পদ বণ্টন কিভাবে করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করে। তাই অর্থব্যবস্থাবিষয়ক অর্থনীতি অর্থ বাজার, আর্থিক সরঞ্জামসমূহ ও কোম্পানীসমূহের আর্থিক কাঠামো সন্বন্ধে আলোকপাত করে।

ক্রীড়া তত্ত্ব ফলিত গণিতের একটি শাখা যা উপাদান সমূহের মধ্যে কৌশলগত প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষণ করে। কৌশলগত ক্রীড়ায় খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের আরোপিত কৌশলসমূহের মধ্যে যেটি তার সুবিধা সর্বোচ্চ করণ  করবে সেটি গ্রহণ করবে। ইহা সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী তার প্রতিপক্ষের সহিত ক্রীড়াক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রচলিত নিয়ম ব্যাখ্যা করে থাকে। ক্রীড়া তত্ত্ব বাজার বিশ্লেষণের জন্য সর্বোচ্চ করণ আচরণ উন্নয়নের ধারণা দেয় যেমন চাহিদা ও যোগান মডেল। ১৯৪৪ সালে জন ভন নিউম্যান ও অস্কার মরগেন্সটেরন এর Theory of Games and Economic Behavior এর মাধ্যমে 'ক্রীড়া তত্ত্ব' এর সুত্রপাত হয়। অর্থনীতি ছাড়াও পারমাণবিক কৌশল, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ক্রীড়া তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়।

শিল্প সংস্থা ফার্মসমূহের কৌশলগত আচরণ, বাজার কাঠামো এবং তাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। সাধারণ বাজার কাঠামোসমূহ হচ্ছে পূর্ণ প্রতিযোগিতা বাজার, একচেটিয়া প্রতিযোগিতা, অলিগোপলির বিভিন্ন ধরন এবং একচেটিয়া বাজার।

তথ্য অর্থনীতি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কিভাবে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষন করে। তথ্য অসংগতি ধারণাটি এক্ষেত্রে গুরুত্ত্বপূর্ন যখন এক পক্ষের অন্য পক্ষের তুলনায় বেশী বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে। তথ্য অসংগতি নৈতিক অবক্ষয়, বিরুপ নির্বাচনের মত সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে, যা চুক্তি মতবাদে বিশ্লেষন করা হয়। তথ্য অর্থনীতি অর্থব্যবস্থা, বীমা, চুক্তি মতবাদ এবং ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আন্তর্জাতিক সীমান্তসমূহের মধ্যে দ্রব্য ও সেবা প্রবাহ নির্ণয় নিয়ে বিশ্লেষন করে। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা সামষ্টিক অর্থনীতির একটি অংশ যা আন্তর্জাতিক সীমান্তসমূহের মধ্যে মূলধন প্রবাহ ও এক্সচেঞ্জ রেটের উপর ইহা কি প্রভাব ফেলে তা নিয়ে আলোচনা করে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্রব্য, সেবা ও মূলধনের বাণিজ্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়ন।

শ্রম অর্থনীতি শ্রম বাজার কার্যক্রম ও শ্রম প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে। শ্রমিক ও মালিকের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রম বাজার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। শ্রম অর্থনীতি শ্রম সেবা প্রদানকারী (শ্রমিক), যে ব্যক্তির শ্রমের চাহিদা রয়েছে (মালিক), মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, কর্মরত ও বেকার শ্রমিক এবং বেকার সমস্যা সমাধান নিয়ে পর্যালোচনা করে।

কল্যাণ অর্থনীতি হচ্ছে অর্থনীতির একটি শাখা যা ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে একটি অর্থনীতির বণ্টনকৃত দক্ষতা নির্ধারণ ও ইহা সংশ্লিষ্ট আয় বণ্টন নিয়ে আলোচনা করে। ইহা ব্যক্তি ও সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরীক্ষার মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণ পরিমাপের চেষ্টা করে।

পরিবেশ অর্থনীতি পরিবেশ দূষণ, উৎসাহ প্রদান বা পরিবেশ রক্ষার জন্য সচেতনতা নিয়ে আলোচনা করে। বাস্তবিক পক্ষে উৎপাদন বা ভোগের উপর খারাপ প্রভাব যেমন বায়ু দূষণ বাজার ব্যাবস্থাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। পরিবেশ অর্থনীতি মূলতঃ সরকারী নীতি এইসব ব্যর্থতাকে কিভাবে সমাধান করবে তা নিয়ে আলোচনা করে। সরকারী নীতি কিছু নিয়মকে প্রতিফলিত করে যা ব্যয়-মূনাফা বিশ্লেষন নামে পরিচিত বা বাজার এসব সমাধান করে বিভিন্ন ফি পুনঃনির্ধারণের মাধ্যমে বা সম্পদের অধিকারের সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে।

আইন ও অর্থনীতি অথবা আইনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষন হচ্ছে প্রকৃত তত্ত্বের প্রতিফলন যা আইনে অর্থনৈতিক পদ্ধতিকে প্রয়োগ করে। ইহা প্রকৃত আইনের প্রভাব ব্যাখ্যার অর্থনৈতিক ধারণা, কোন আইন প্রয়োগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও কোনটি প্রয়োগে কি প্রভাব ফেলে এইসব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৬১ সালে রোনাল্ড কজ এর একটি নিবন্ধে পরামর্শ দেয়া হয় যে, সম্পত্তির অধিকার সঙ্গায়িত করা যায় বাহ্যিকতার সমস্যা দিয়ে।

ব্যবস্থাপনা অর্থনীতি সামষ্টিক অর্থনীতি বিশ্লেষণে বিশেষ করে ব্যবসায়ী ফার্মসমূহ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। ইহা পরিমাণগত পদ্ধতি যেমন গবেষণা কার্যক্রম ও প্রোগ্রামিং এবং পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি যেমন সংশ্লেষাংক বিশ্লেষণ কোন ঝুঁকি ছাড়াই ও সঠিক প্রক্রিয়ায় তুলে ধরতে পারে। একটি ভাল ধারণা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সফলের সাথে সাথে উৎপাদন খরচ সর্বনিম্নকরণ, মূনাফা সর্বোচ্চকরণ, ফার্মের উদ্দেশ্য এবং প্রযুক্তি ও বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উৎপাদন পদ্ধতি নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।

সরকারী অর্থব্যাবস্থা অর্থনীতির একটি শাখা যা সরকারী বিভিন্ন খাতের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট নিয়ে আলোচনা করে। এই বিষয়টি করদাতা নির্ধারণ, সরকারী বিভিন্ন কর্মসূচীর ব্যয়-মুনাফা বিশ্লেষন, বিভিন্ন প্রকার ব্যয় ও করের অর্থনৈতিক দক্ষতা ও আয় বণ্টন এবং রাজস্ব নীতি নিয়ে আলোচনা করে। ইহা ছাড়াও সরকারি পছন্দ তত্ত্ব, সরকারী ক্ষেত্রসমূহে ব্যষ্টিক অর্থনীতির আচরণ এবং ভোটার, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।

চাহিদা ও যোগান তত্ত্ব একটি কাঠামোগত যা দ্রব্যের দাম ও পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করে এবং বাজার অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। সামষ্টিক অর্থনীতি তত্ত্বসমূহে একটি প্রতিযোগিতামুলক বাজারে দ্রব্যের দাম ও পরিমাণ নির্ণয়ে ইহা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইহা একটি বাজার গঠনে অন্য বাজারের কাঠামো ও তত্ত্বগত আচরণের উপর নির্ভর করে স্তম্ভের মত কাজ করে।

একটি দ্রব্যের বিদ্যমান বাজারে দ্রব্যের পরিমাণ নির্ভর করে তার চাহিদার উপর যেখানে সকল ক্রেতা দ্রব্যটির প্রতিটি একক মূল্যে ক্রয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে। চাহিদা মূলতঃ একটি টেবিল বা একটি চিত্রের প্রতিফলন যা দ্রব্যের দাম ও পরিমাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত (চিত্রটি লক্ষ করুন)। চাহিদা তত্ত্ব আলোচনা করে যে, ভোক্তা বিদ্যমান আয়, দাম, পছন্দ ইত্যাদিতে যৌক্তিকভাবে প্রতিটি দ্রব্যের বিভিন্ন পরিমাণ পছন্দ করবে। এক্ষেত্রে 'উপযোগ সর্বোচ্চকরণ প্রতিবন্ধক' শব্দটি ব্যবহৃত হয় (চাহিদার জন্য আয় একটি প্রতিবন্ধক)। এখানে 'উপযোগ' প্রতিটি ভোক্তার পছন্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত। উপযোগ এবং আয় অণুসিদ্ধান্তমূলক বৈশিষ্ট্যের মডেলে দ্রব্যের দামের পরিবর্তনে চাহিদার পরিবর্তন নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়। চাহিদা তত্ত্বে বলা হয় যে, একটি বিদ্যমান বাজারে সাধারণত দাম ও চাহিদা বিপরীত সম্পর্কযুক্ত। অন্যভাবে বলা যায় যে, দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে কম ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতা ও ক্রয়ের ইচ্ছা থাকবে (অন্যান্য সব কিছু অপরিবর্তিত থেকে)। দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় (আয় প্রভাব) এবং ভোক্তা কম মূল্যের পরিবর্তিত দ্রব্যের দিকে ঝুঁকবে (পরিবর্তক প্রভাব)। অন্যান্য উপাদানও চাহিদার উপর প্রভাব ফেলে; উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আয় বৃদ্ধি পেলে চাহিদা রেখা মূলবিন্দু থেকে দূরে সরবে।

যোগান হচ্ছে দ্রব্যের দাম ও ঐ দামে বিক্রেতার কাছে থাকা দ্রব্যের পরিমাণের মধ্যে সম্পর্ক। যোগান মূলতঃ একটি টেবিল বা একটি চিত্রের প্রতিফলন যা দ্রব্যের দাম ও সরবরাহকৃত পরিমাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত । উৎপাদক মূনাফা সর্বোচ্চকরণ অণুসিদ্ধান্ত গ্রহণ করে,যার অর্থ উৎপাদক সেই পরিমাণ দ্রব্য উৎপাদন করবে যা তার মূনাফা সর্বোচ্চ করবে। যোগান মূলতঃ দাম ও সরবরাহকৃত দ্রব্যের পরিমাণের অণুপাত (অন্যান্য সব কিছু অপরিবর্তিত থেকে)। অন্যভাবে বলা যায় যে, দ্রব্যটির সর্বোচ্চ দামে বিক্রয় করা যাবে, বেশির ভাগ উৎপাদক সেই পরিমাণ দ্রব্য সরবরাহ করে। দাম বৃদ্ধি দ্রব্যের মূনাফা বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। ভারসাম্যের কম দামে দ্রব্যের চাহিদার তুলনায় সরবরাহের পরিমাণ কম থাকবে। ইহা দাম বৃদ্ধি করবে। ভারসাম্যের বেশি দামে দ্রব্যের চাহিদার তুলনায় দ্রব্যের সরবরাহের পরিমাণ বেশি থাকবে। ইহা দাম কমাবে। চাহিদা ও যোগান মডেলে চাহিদা ও যোগান রেখায় নির্ধারিত হয়, দাম ও পরিমাণ স্থির হবে একটি দামে যেখানে দ্রব্যের চাহিদা ও যোগান সমান হবে। ইহা চিত্রে দুটি রেখার পরস্পর ছেদ বিন্দু, যাকে বাজার ভারসাম্য বলা হয়।

একটি দ্রব্যের বিদ্যমান পরিমাণ চাহিদা রেখায় দাম বিন্দুতে দাম নির্দেশিত হবে বা দ্রব্যের সেই পরিমাণে ভোক্তার প্রান্তিক উপযোগ নির্দেশিত হবে। ইহা দ্রব্যটির উল্লিখিত পরিমাণে কি পরিমাণ খরচ করতে প্রস্তুত আছে তা পরিমাপ করে। যোগান রেখায় দাম বিন্দু প্রান্তিক খরচ নির্ণয় করে অর্থাৎ সেই পরিমাণ দ্রব্য উৎপাদনে উৎপাদকের মোট ব্যয় বৃদ্ধি নির্ণয় করে। চাহিদা ও যোগান ভারসাম্য দাম নির্ধারণ করে। একটি পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাহিদা ও যোগান ভারসাম্য অবস্থায় উৎপাদন খরচ ও দাম সমান করে।

চাহিদা ও যোগান উৎপাদনের উপাদানের মধ্যে আয়ের বণ্টন তত্ত্বে ব্যবহার করা হয়, যেখানে বাজার উপাদানের মাধ্যমে শ্রম ও বিনিয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শ্রম বাজারের উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, নিয়োগকৃত শ্রমিকের পরিমাণ ও শ্রমের দাম শ্রমের চাহিদা (উৎপাদকের ক্ষেত্রে) এবং শ্রমের সরবরাহ (শ্রমিকের ক্ষেত্রে) নির্ধারণ করবে।

চাহিদা ও যোগান পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের আচরণ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু বিভিন্ন প্রকার বাজারের কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য ইহার প্রয়োজনীয়তা আদর্শ হিসেবে কাজ করে। চাহিদা ও যোগান বাজার অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির চলকসমূহ ব্যাখ্যাও করে, যেমন দ্রব্যের মোট পরিমাণ ও সাধারণ মূল্যস্তর।

চাহিদা ও যোগান বিশ্লেষনে দাম (দ্রব্য বিনিময়ের হার) উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। দাম ও পরিমাণকে বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সবচাইতে বেশী প্রতক্ষ পর্যবেক্ষণ চলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যোগান, চাহিদা ও বাজার ভারসাম্য তত্ত্বভাবে দাম ও দ্রব্যের পরিমাণের সহিত সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দাম ও চাহিদা পরিবর্তনের পরিমাপে উপাদানের প্রভাব নির্ণয় করা হয়—তাদের মাধ্যমে, দাম ও পরিমাণ—ফলিত ব্যষ্টিক অর্থনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে আদর্শ চলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থনৈতিক তত্ত্বসমুহ বিদ্যমান পরিমাণে দাম কি হবে তা নির্ধারণ করে। বাস্তবিকপক্ষে, দাম ও পরিমাণের পরিবর্তনের ফলে যোগান ও চাহিদা কতটুকু পরিবর্তন হবে তা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়।

চাহিদা ও যোগান তত্ত্ব ভারসাম্য নির্ণয় করে কিন্তু চাহিদা ও যোগানের পরিবর্তনে ভারসাম্য কি গতিতে পরিবর্তিত হয়ে তা নির্ধারিত হবে তা পারেনা। অনেক ক্ষেত্রে, 'দামের স্থিরতা' এর বিভিন্ন কাঠামো দামের চাইতে চাহিদা ও যোগানের পরিবর্তনে স্বল্পকালে দ্রব্যের পরিমাণ নির্ধারণে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। ইহা সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাণিজ্য চক্র বিশ্লেষনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দাম স্থিরতার প্রভাব সমাধানে কখনও কখনও বিশ্লেষন করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্যের অনূসিদ্ধান্ত ইহা প্রতিবন্ধকতা হিসাবে ধরা হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে,একটি বাজারের দাম স্থিরতা শ্রম বাজারের শ্রম হারকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং পূর্নপ্রতিযোগিতা মূলক বাজার থেকে ঐ বাজারে সরবরাহ করে।

অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে সকল সামাজিক ব্যয় ও মুনাফা গননা করার জন্য বাজার বিশ্লেষন করা হয়। কখনও কখনও বাহ্যিকতা শব্দটি উৎপাদন ও ভোগ হতে সামাজিক ব্যয় ও মুনাফা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যা বাজার মূল্য থেকে প্রতিফলিত হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে, বায়ু দূষন ঋনাত্বক বাহ্যিকতা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষা ধনাত্বক বাহ্যিকতা সৃষ্টি করে। দ্রব্য বিক্রিয়ে সরকারী কর এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধক সমূহ ঋনাত্বক বাহ্যিকতা এবং ভূর্তকি ও অন্যান্য সূবিধা সমুহ দ্রব্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ধনাত্বক বাহ্যিকতা সৃষ্টি করে সঠিক দাম নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।

প্রান্তিক অর্থনৈতিক তত্ত্বে আয় ও সম্পদকে প্রতিবন্ধক বিষয় ধরে ভোক্তা অধিক পছন্দ অবস্থানে পৌঁছতে চেষ্টা করে, তা নিয়ে বিশ্লেষন করা হয়। ইহা উৎপাদক তাদের নিজস্ব প্রতিবন্ধক ( ভালো পণ্যের চাহিদা, প্রযুক্তি এবং উপাদান মূল্য)কে বিষয় ধরে মূনাফা সর্বোচ্চ করতে চেষ্টা করে, তা নিয়েও আলোচনা করে। তাই একজন ভোক্তার একটি দ্রব্যের দামের বিপরীতে প্রান্তিক উপযোগ যখন শুন্য হয়, সেই বিন্দুতে ঐ ভোগপন্যের উৎপাদন বৃদ্ধি থেমে যায়। একই ভাবে একজন উৎপাদক প্রান্তিক আয় ও প্রান্তিক ব্যয় তুলনা করে, যাকে প্রান্তিক মূনাফা বলা হয়। যে বিন্দুতে প্রান্তিক মূনাফা শুন্য হয় সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি থেমে যায়। ভারসাম্যের দিকে গমন ও ভারসাম্যের মধ্যে পরিবর্তনের ফলে প্রান্তিক বিন্দুসমূহও পরিবর্তিত হয়, তা কখনও কম-বেশী হতে পারে আবার নাও হতে পারে।

যেকোন অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় যেখানে দূস্প্রাপ্যতা বিদ্যমান সম্পর্কযুক্ত শর্তসমূহ ও বিবেচ্য বিষয়সমূহ সাধারণ ভাবেই প্রয়োগ করা হয়, তা বাজার নির্ভর হোক কিংবা না হোক। দূস্প্রাপ্যতা বলতে উৎপাদন যোগ্য বা বিনিময় যোগ্য দ্রব্যের পরিমাণ যা প্রয়োজনীয় উৎপাদনে প্রয়োজন কিংবা প্রত্যাশিত। উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা এক ধরনের শর্তের ধরন যা বিদ্যমান নির্দিষ্ট সম্পদের করনে তৈরি হয়। এ ধরনের সম্পদ প্রতিবন্ধকতা গুলো উৎপাদন সম্ভাবনার তালিকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভোক্তা বা অন্য প্রতিনিধির ক্ষেত্রে যদি সম্পদের পূর্ন ব্যবহার করা হয় উৎপাদন সম্ভাবনা ও দূস্প্রাপ্যতার ব্যবধান কমে আসবে, যেমন আয়ের ক্ষেত্রে বেকার সময়, সরকারী পণ্যের জন্য বেসরকারী পণ্য, ভবিষ্যৎ ভোগের জন্য বর্তমান ভোগ। প্রান্তিকতাবাদীরা বাণিজ্য-বন্ধ অবস্থাকে পরিমাপের ক্ষেত্রে সূযোগ ব্যয় এর কথা উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের ব্যয়সমূহ বাজার অর্থনীতিতে দামের প্রতিপফলন ঘটায় এবং বাজার অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক দক্ষতা বিশ্লেষনে বা বণ্টন ব্যবস্থা পূর্বনির্ধারিত করতে ব্যবহার করা হয়। একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণকারী অর্থনীতিতে তুলনামুলক ছায়া-মূল্য সম্পর্ক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে সম্পদের ব্যবহারের দক্ষতা অবশ্যই পরিপূর্ন করতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রান্তিকতাবাদ বিভিন্ন পদ্ধতিতে হাতিয়ার হিসেবে শুধুমাত্র ভোক্তা বা বাজারের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়না, এমনকি ভিন্ন অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া এবং আয়ের বৃহৎ বণ্টন ব্যবস্থায় চলক সমূহের সাথে সম্পর্ক ও তাদের প্রভাব নির্নয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।

অর্থনীতি হচ্ছে একটি বিষয় যা যুক্তিকে সংশ্লেষাংক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করে। ইহার লক্ষ্য বস্তুতে তত্ত্ব প্রস্তুতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা অন্যান্য তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা সহজ, অধিক ফলদায়ক এবং দক্ষতাপূর্ন হতে হবে। কখনও কখনও চলক সমূহের সম্পর্ক ব্যাখ্যার জন্য সাধারণ পদ্ধতিতে বিশ্লেষন আরম্ভ করা হয়। জটিলতাকে ceteris paribus (অন্যান্য সবকিছু অপরিবর্তিত থেকে) অণুমিত শর্ত চিহ্নিত করা হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে, অর্থ অনূসিদ্ধান্তের পরিমাণ তত্ত্বে অন্যান্য সবকিছু অপরিবর্তিত থেকে মূল্যস্তর ও অর্থের যোগান ধনাত্বক সম্পর্কযুক্ত। এই তত্ত্বে অর্থনৈতিক তথ্য পরীক্ষা করা যায়, যেমন জিডিপির দামের সূচী ও অর্থের যোগান যা নগদ অর্থ ও ব্যাংক ডিপোজিটের যোগফল। অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমূহ নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার অনূপস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলক ব্যাখ্যার প্রতিক্রিয়া এবং অন্য চলক সৃষ্টি বিশৃংখলা দূরীকরনের চেষ্টাকে অনূমোদন করে। সাম্প্রতিক কালে অর্থনীতিতে পরীক্ষামূলক পদ্ধতিকে বৃহৎ আকারে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যা অর্থনীতি হতে কিছু প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বৈশিষ্টগত পার্থক্য সৃষ্টিকারী ঐতিহাসিক মতবাদকে চ্যালেঞ্চ ছুঁড়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমূহে সমস্যা বলতে তত্ত্বগত সম্পর্কের জন্য এখানে দ্বি-মাত্রা বিশিষ্ট চিত্র ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে উচ্চ স্তরের ক্ষেত্রে পল সামুয়েলশন অর্থনৈতিক বিশ্লেষনের অবকাঠামোর সমালোচনা করে দেখান যে, বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য কিভাবে গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় যাকে অর্থনীতিতে পরিচালক অর্থপূর্ন তত্ত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এবং এইসব তত্ত্বসমূহ জটিল তথ্য বিতারন করে।

অষ্ট্রিয়ান স্কুল অব ইকোনোমিক্সের কিছু বাতিলকৃত গাণিতিক অর্থনীতিতে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, অর্থনৈতিক বিশ্লেষনে যেকোন অপ্রয়োজনীয় ও ঠিক নয় এমন সরল যুক্তি প্রয়োগ করা যায়। এখনও অর্থনীতিতে মতবাদ ও পদ্ধতি গঠনে বাস্তব-বিশ্ব অবস্থা বর্ণনার জন্য অণুসিদ্ধান্ত-বিয়োজন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে, পরবর্তী সময়ের ব্যষ্টিক অর্থনীতি বিশ্লেষন অর্থনীতি বহির্ভুত বিষয়াদির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, যাকে অর্থনৈতিক রাজতন্ত্র নামে অভিহিত করা হয়।

প্রাচীন অর্থনীতিতে চিন্তাধারা মেসোপটেমিয়া, গ্রিক, রোমাক, ভারতীয়, চৈনিক, পারস্য এবং আরব সভ্যতার সমসাময়িক। অর্থনৈতিক চিন্তা-ভাবনার প্রাচিন লেখকবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন অ্যারিস্টটল, চানক্য, কিন সি হুয়াং, টমাস একুইনাস, ইবনে খালদুন প্রমুখ। জোসেফ সুম্পেটার ১৪শ শতক থেকে ১৭শ শতকের মধ্যে সময়কালকালের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের বিবেচনা করেছেন আগত অন্যান্য পক্ষের চাইতে বেশী নিকস্থ বৈজ্ঞানিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যেমন প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে আর্থিক, সুদের হার এবং মূল্যতত্ত্ব উদ্ভাবন। ইবনে খালদুনের আল মুকাদ্দিমাহ আবিষ্কারের পরে সুম্পেটার ইবনে খালদুনকে আধুনিক অর্থনীতির সবচাইতে নিকটস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তার অনেকগুলো অর্থনৈতিক তত্ত্ব অদ্যাবধি ইউরোপে অপরিচিত।

অন্য দুটি পক্ষ যাদের পরবর্তীতে 'বাণিজ্যবাদী' ও 'বাস্তববাদী' নামে অভিহিত করা হয় এবং এরা অর্থনীতির অবশিষ্ট উন্নয়নে প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখেন। উভয় পক্ষই ইউরোপে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক পুঁজিবাদ উত্থানের সাথে একমত প্রকাশ করেন। বাণিজ্যবাদ (মার্কেনটাইলিজম) যা উৎপাদনমূলক নীতিগত সাহিত্যে অর্থনৈতিক মূলনীতি হিসেবে ১৬শ শতক থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত পরিচিত ছিল। এই মতবাদে একটি জাতির সম্পদ নির্ভর করে তাদের সংগৃহীত স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওপর। একটি জাতি খনি থেকে না হলেও বিদেশে পণ্য রপ্তানী এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যতীত অন্য পণ্য আমদানীর উপর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে স্বর্ণ ও রৌপ্য সংগ্রহ করতে পারে। এই মূলনীতিতে রপ্তানীযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য সস্তা কাঁচামাল আমদানী এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে বৈদেশিক পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ ও উপনিবেশগুলোতে উৎপাদন বন্ধ করার নীতিকে উৎসাহিত করা হয়।

১৮ শতকের একদল চিন্তাবিদ ও লেখক আয় এবং উৎপাদনের চক্রাকার প্রবাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার উন্নয়ন ঘটান। অ্যাডাম স্মীথ তাদের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ভুল বলে ব্যাখ্যা করেন যদিও সেগুলো এখনও অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মতে, একমাত্র কৃষি উৎপাদনই খরচের বেশি মুনাফা বয়ে আনতে পারে; সুতরাং কৃষির ওপরই সম্পদের বিষয়টি নির্ভরশীল। তাই, তারা উৎপাদন বৃদ্ধি ও শুল্ক আরোপ মতবাদে বিশ্বাসী বাণিজ্যবাদীদের বিরোধিতা করেন। তারা কর সংগ্রহের প্রশাসনিক ব্যয়বহূল ব্যবস্থা থেকে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহের পরামর্শ দেন। সমসাময়িক অর্থনীতিবিদগণ ভূমি কর-এর প্রকারভেদকে রাজস্ব করের গঠনমূলক উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। বাণিজ্যবাদীদের বাণিজ্য নীতির প্রতিক্রিয়ায় লেইসেজ-ফেয়ার নীতি সমর্থন করেন, যাকে অর্থনীতিতে ন্যূনতম সরকারি হস্তক্ষেপ বলে গণ্য করা হয়।

১৭৭৬ সালে এ্যাডাম স্মীথের “The Wealth of Nations” গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর অর্থনীতি একটি আলাদা বিষয় হিসেবে কার্যকরী ভাবে প্রচলিত হয় বলে বর্ণনা করা হয়। এই বইটিতে উৎপাদনের উপাদান হিসেবে ভূমি, শ্রম ও পুঁজিকে নির্ধারণ এবং জাতীয় সম্পদের মূল বণ্টন নিয়ে আলোচনা করা হয়।স্মীথের দৃষ্টিতে আদর্শ অর্থনীতি হচ্ছে একটি স্ব-চালিত বাজার প্রক্রিয়া যা সয়ংক্রিয়ভাবে জনগনের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটায়। তিনি বাজার প্রক্রিয়াকে “অদৃশ্য হাত” বলে বর্ণনা করেন যা প্রতিটি চলককে তাদের স্ব-ইচ্ছায় পরিচালিত করে এবং সমাজের জন্য বৃহৎ মূনাফা বয়ে আনে। এ্যাডাম স্মীথ “লেইসেজ ফেয়ার” নীতি সহ আদর্শবাদী ধারণা সমূহের সমন্বয় ঘটান কিন্তু একমাত্র কৃষি উ ৎপাদনশীল ধারণা প্রত্যাখান করেন।

তার বিখ্যাত “অদৃশ্য-হাত” দর্শনে স্মীথ যুক্তি দেখান যে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার সামাজিক মূনাফার অগ্রগামী প্রান্তের দিকে ধাবিত হয় যদিও ইহা নিম্নমূখী মূনাফার দিকে ধাবিত করে। সাধারণভাবে স্মীথ একে রাজনৈতিক অর্থনীতি ও পরে বুনিয়াদী অর্থনীতি নামকরণ করেন। ১৭৭০ সাল থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখকগন হচ্ছেন থমাস মালথাস, ডেভিড রিকার্ডো এবং জন ষ্টুয়ার্ট মিল।

যখন এ্যাডাম স্মীথ আয়ের উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তখন ডেভিড রিকার্ডো ভূমি মালিক, শ্রমিক ও পুঁজির মধ্যে আয়ের বণ্টন বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। রিকার্ডো ভূমি মালিক একদিকে এবং অন্যদিকে শ্রম ও পুঁজির মধ্যে বৈপরীত্য লক্ষ্য করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, নির্দিষ্ট ভুমির পরিমাণের বিপরীতে জনসংখ্যা ও পুঁজির বিপরীতে খাজনা বৃদ্ধি পায় এবং শ্রমিকের বেতন ও মূনাফা হ্রাস পায়।

থমাস রবার্ট ম্যালথাস নিম্ন জীবনযাত্রার নিম্নমূখীতার ধারণাকে ব্যবহার করেন। তা যুক্তিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় গাণিতিক হারে। তার মতে, শ্রমিকের প্রাপ্য কমে তার করন নির্দিষ্ট জমির বিপরীতে জনসংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শ্রমিকের বেতন কমতে থাকে যা জনগনের জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণ করে।

ম্যালথাস বাজার অর্থনীতিতে পূর্ননিয়োগের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেন। তিনি অর্থনৈতিক গতিধারার উপর অপূর্ননিয়োগের প্রভাব কম এবং ১৯৩০ সালের জন মায়নার্ড কেইন্স কর্তৃক ব্যবহৃত একটি ধারণা দেন।
বুনিয়াদী অর্থনীতির শেষের দিকে জন স্টুয়ার্ট মিল বাজার প্রক্রিয়ার সৃষ্ট বণ্টন ব্যবস্থার অত্যাবশকীয় বিষয় সমূহ নিয়ে পূর্ববর্তী বুনিয়াদী অর্থনীতিবিদদের সহিত অংশগ্রহণ করেন। মিল বাজার ব্যবস্থার দুটি মূলনীতির পার্থক্য নিয়ে উল্লেখ করেনঃ সম্পদের শ্রেণীবিভাগ ও আয়ের বণ্টন। বাজারকে অবশ্যই সম্পদের সুসম বণ্টন করতে হবে কিন্তু আয়ের বণ্টন নয়। তিনি বলেন, ইহা সমাজের জন্য সময়োপযোগী হতে হবে।
বুনিয়াদী তত্ত্বসমুহের মধ্যে মূল্য তত্ত্ব গুরুত্ত্বপূর্ন। স্মীথ লেখেন যে, “real price of every thing ... is the toil and trouble of acquiring it যা দূস্প্রাপ্যতা থেকে সৃষ্ট হয়। স্মীথের মতে, জমির খাজনা ও মূনাফার সাথে শ্রমের মূল্যের মত অন্যান্য খরচও পণ্যের মূল্যের সহিত যুক্ত হয়। অন্যান্য বুনিয়াদী অর্থনীতিবিদ গণ স্মীথের মতামতে বিভিন্নতা লক্ষ্য করে ‘মুল্যের শ্রম তত্ত্ব’ নামে একটি তত্ত্ব দেন। বুনিয়াদী অর্থনীতিতে বাজার দীর্ঘ মেয়াদী ভারসাম্যের দিকে ধাবিত হয় বলে নির্ধারণ করা হয়।

জার্মান অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স-এর রচনার ভিত্ততে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার মার্ক্সীয় চিন্তাভঙ্গির উৎপত্তি হয়। বুনিয়াদী অর্থনীতির চিন্তাধারায় মার্ক্সীয় অর্থনীতির আগমন একটি যুগস্রষ্টা ঘটনা। কার্ল মার্ক্সের কাজের মাধ্যমেই ইহা পরিচালিত হয়। তার মূল্যবান কাজের মধ্যে “Capital” এর প্রথম খন্ড ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে জার্মানীতে প্রকাশিত হয়। এই খণ্ডে তিনি ‘মূল্যের শ্রম তত্ত্ব’ এবং পুঁজির দ্বারা শ্রম ব্যবহারে তার চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করেন। তাই, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রম ব্যবহার পরিমাপে সাধারণ মূল্য তত্ত্ব থেকে ‘মূল্যের শ্রম তত্ত্ব’ বেশী কার্যকরী যদিও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এটি ঊহ্য রাখা হয়।

১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত কিছু তত্ত্বের সমষ্টি হিসেবে ‘নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতি’ বা ‘প্রান্তিক অর্থনীতি’ গড়ে উঠে।নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শালের মাধ্যমে ‘অর্থনীতি’ শব্দটি জনপ্রিয়তা লাভ করে, যা পূর্বে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নামে পরিচিত ছিল। নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতি বাজার ভারসাম্যে দাম ও পরিমাণের যুগ্ম নির্নায়ক হিসেবে চাহিদা ও যোগানকে প্রক্রিয়া করন করে, যা উৎপাদিত পণ্য শ্রেণীবিন্যাস ও আয়ের বণ্টনকে প্রভাবিত করে। ইহা চাহিদার ক্ষেত্রে মুল্যের প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্বের সমর্থনে বুনিয়াদী অর্থনীতি থেকে মুল্যের শ্রম তত্ত্ব এবং যোগানের দিক হতে আরও সাধারণ ব্যয় তত্ত্ব বিশ্লেষন করে।
ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতি মূনাফা ও ব্যয় নির্ধারণ করে বিশাল অবদান রেখেছে। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে, ব্যক্তিগত চাহিদার ‘ভোগ তত্ত্ব’ কিভাবে দাম এবং আয় পরিমাণগত চাহিদা উপর প্রভাব ফেলে তা পৃথকীকরন করে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইহা তড়িৎ প্রতিফলিত হয় এবং কেন্সীয়ান সামষ্টিক অর্থনীতির সহিৎ নব্য বুনিয়াদী মূলনীতি স্থায়িত্ত্ব হয়। 
নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতি কখনও কখনও ধর্মীয় অর্থনীতিকে অণুসরন করে যখন ইহা সমালোচনা কিংবা সহানুভুতির সম্মুক্ষীন হয়। আধুনিক ‘মেইনষ্ট্রীম অর্থনীতি’ গঠিত হয় নব্য বুনিয়াদী অর্থনীতি থেকে কিন্তু অনেক বাছাই প্রক্রিয়ায় দেখা যায় যে, ইহা পূর্বের বিশ্লেষনের খন্ড বা উৎঘাটিত যেমন ইকোনোমেট্রিক্স, ক্রীড়া তত্ত্ব, বাজার ব্যর্থতার বিশ্লেষন ও অপূর্ন প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় আয়ের প্রভাবক দীর্ঘমেয়াদী চলক সমূহ বিশ্লেষনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নব্য বুনিয়াদী মডেল।

কেন্সীয় অর্থনীতি জন মেনার্ড কেইন্স-এর, বিশেষ করে তার বই ‘The General Theory of Employment, Interest and Money’ (1936), এর মাধ্যমে সৃষ্ট, যা ১৯৩০-এর অর্থনৈতিক মহামন্দা-র প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি বিশেষ তত্বের সূচনা করে। কেন্সীয় অর্থনীতি মূল প্রস্তাব অর্থনৈতিক মন্দা নিরসনার্থে সরকারের তরফে সম্প্রসারণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। বইটি স্বল্প কালে যেখানে মূল্য সম্পর্কযুক্তভাবে অবাধ সেখানে জাতীয় আয়ের নিণায়ক নির্ধারণের উপর বিষয়ের প্রতিফলিত করে। নিম্ন সক্রিয় চাহিদার কারণে শ্রম বাজারে উচ্চ বেকারত্ব অবশ্যই নিবারণ হবেনা এবং কখনও মূল্য গ্রহণযোগ্যতা ও আর্থিক নীতি অকার্যকর হয় কেন কেইন্স তা বৃহৎ আকারে তাত্ত্বিক বিশ্লেষনের চেষ্টা করেছেন। তাই অর্থনৈতিক বিশ্লেষনণ প্রভাবিত করনের ক্ষেত্রে এই বইটিকে বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয়।

কেইন্সিয়ান অর্থনীতির দুইটি সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কেইন্সিয়ান-পরবর্তী অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির চলক সমূহ ও প্রক্রিয়া সমন্বয়ের উপর জোড় দেওয়া হয়। তাদের মডেল গুলোর জন্য ব্যষ্টিক কাঠামোর বিশ্লেষনে সরল সর্বোচ্চকরন মডেল থেকে বাস্তব জীবন অভ্যাস বেশি মূলভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। ইহা সাধারণত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও জন রবিনসনের কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত। নব্য কেইন্সিয়ান অর্থনীতিও কেইন্সিয়ান প্রথা উন্নয়নের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এই গ্রুপের গবেষক গণ ব্যষ্টিক কাঠামোতে ব্যবহৃত মডেল সমূহ ও আচরণ উন্নয়নে অন্য অর্থনীতিবিদদের সহিত প্রচেষ্টা ভাগাভাগি করতেন কিন্তু আদর্শ কেইন্সিয়ান প্রতিচ্ছবির নিম্ন প্রতিফলন যেমন দাম ও শ্রমিকের বেতনের অস্থিতিস্থাপকতা ইত্যাদির কারণে তা এগোতে পারেনি। এগুলো স্বাভাবিকভাবে তৈরি করা হয় মডেলসমূহের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্টের জন্য যতটা না কেইন্সিয়ান-অভিব্যক্তির জন্য সাধারণ অণুমিত শর্তের জন্য।

অন্যান্য সু-পরিচিত স্কুল বা ধারণার প্রকৃতি সমুহ বিশেষ করে অর্থনীতির বিশেষ ক্ষেত্রে গবেষণা ও যেসব বিশ্বব্যপী পরিচিত ছড়িয়ে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক গ্রুপ সমুহ হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ান স্কুল, শিকাগো স্কুল, ফ্রেইবুর্গ স্কুল, লাউসান্নে স্কুল ও স্টকহম স্কুল।
সামষ্টিক অর্থনীতি প্রতিফলিত হয়েছে যাদের সাহিত্যেঃ বুনিয়াদি অর্থনীতি, কেইন্সিয়ান অর্থনীতি, নব্য কেইন্সিয়ান চিন্তাধারা, কেইন্সিয়ান-পরবর্তী অর্থনীতি, আর্থিক অর্থনীতি, নব্য বুনিয়াদি অর্থনীতি এবং যোগান-ভিত্তিক অর্থনীতি।নতুন বিকল্প উন্নয়ন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়ঃ পরিবেশ অর্থনীতি, পরিবর্তন সম্পর্কিত অর্থনীতি, নির্ভরশীলতা অর্থনীতি, কাঠামোগত অর্থনীতি এবং বিশ্ব প্রক্রিয়া তত্ত্ব।

এই বিষয়টি প্রবন্ধের প্রথমে আলোচনা করা হয়েছে।

সম্পদকে বৃহৎ পরিসরে সংজ্ঞায়িত করার সাথে ডেভিড হিউম ও এডাম স্মিথ কর্মের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রাথমিক আলোচনা সম্পর্কযুক্ত। হিউম যুক্তি দেন যে, উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যতীত অতিরিক্ত স্বর্ণ মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে। স্মিথ অবশ্য প্রকৃত সম্পদ বলতে বোঝান যে, অতিরিক্ত স্বর্ণ ও রৌপ্য নয়, সমাজে শ্রম ও ভূমির বার্ষিক উৎপাদনই সম্পদ।

জন স্টুয়ার্ট মিল অর্থনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে , the practical science of production and distribution of wealth অর্থাৎ অর্থনীতি হচ্ছে উৎপাদন ও সম্পদ বণ্টনের ব্যবহারিক বিজ্ঞান। এই সংজ্ঞাটি Concise Oxford English Dictionary কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এমনকি ভোগের মূলনীতিও এর অন্তর্ভূক্ত হয়নি। মিলের কাছে সম্পদ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের ভান্ডার।
সম্পদকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে উৎপাদন ও ভোগের উপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই গুরুত্বারোপকে সমালোচকরা মানুষকে নেপথ্য ভুমিকায় রেখে সম্পদের উপর বেশি আলোকপাত করা হয়েছে বলে সমালোচনা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, জন রাস্কিন রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ধনীদের বিজ্ঞান ও জারজ বিজ্ঞান বলে আখ্যায়িত করেছেন।

পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে মানুষ, মানবীয় কার্যাবলী ও মানব কল্যাণের বিষয়টি সংঙ্গার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে, যতটা না সম্পদ অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৯০ সালে আলফ্রেড মার্শাল তার ‘Principles of Economics’ বইয়ে লিখেন যে,

বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, এর অনুসিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ বাণী করতে পারে যার উপাত্ত সমূহ পরীক্ষা করা যায় এবং যেখানে একই শর্তের বিপরীতে ফলাফল প্রতিবার একই আসবে। অর্থনৈতিক পরীক্ষার বেশ কিছু ফলিত ক্ষেত্র সমুহে পরিচালনায়ঃ পরীক্ষামুলক অর্থনীতি ও ভোক্তার আচরণ, পরীক্ষায় মানবীয় বিষয়ের আলোকপাত; এবং ইকোনোমেট্রিক্সের শাখা সমুহ নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মাধ্যমে অনুপস্থিত উপাত্তের পরীক্ষায় আলোকপাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কখনও কখনও একই বিষয়ে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানে কি বলা হচ্ছে অর্থনীতিবিদদের জন্য মানবীয় বিষয় সংশ্লিষ্ট আদর্শ ও ব্যবহারিক সংক্রান্ত নিয়মিত পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সামাজিক বিজ্ঞান হচ্ছে পর্যবেক্ষণমুলক বিজ্ঞান বা কখনও বিজ্ঞান, ইহা বিংশ শতাব্দীর একটি বিতর্কের বিষয়। কিছু দার্শনিক ও বিজ্ঞানী বিশেষ করে কার্ল পপ্পার ঘোষণা করেন যে, পর্যবেক্ষণমূলক অণুসিদ্ধান্ত, অণুপাত বা তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক বলা যাবেনা যতক্ষন ইহা পর্যবেক্ষণে প্রত্যাখান, মিথ্যে প্রমাণিত হবেনা। সমালোচনা কারীরা অভিযোগ করেন যে, অর্থনীতি সবসময় সঠিক ফলাফল ধার্য করতে পারেনা, কিন্তু অর্থনীতিবিদগণ নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার অনেক উদাহরণ দেন যে এগুলো পরীক্ষাগার ছাড়াই সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
অর্থনীতিতে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা সামাজিক আচরণের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কযুক্ত এবং অর্থনীতি অ-দৈহিক যুক্তির কারণে প্রাকৃতিক আইন বা চিরন্তন সত্য নয়। এটাই অর্থনীতিকে বিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করাকে সমালোচিত করে। সাধারণত অর্থনীতিবিদ 
গণ কঠিন পরিস্থিতির বর্তমানে ই ঘটতে পারে তারই উত্তর দেন, ইকোনোমেট্রিক্স এর মত পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি এবং বাস্তব জগতের উপাত্ত ব্যবহার করে অণুসিদ্ধান্ত পরীক্ষা করেননা। পরীক্ষামুলক অর্থনীতি গবেষণাগার কাঠামোয় অর্থনৈতিক তত্ত্ব সমুহের অন্তত কিছু ভবিষ্যদ্বাণী পরীক্ষার প্রচেষ্টা করে- যা ভেরন স্মিথ ও ডানিয়েল কানমানকে ২০০২ সালে Bank of Sweden Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel পুরস্কার এনে দেয়।

তবুও বিশ্লেষনের মাধ্যমে বিশ্বের সাথে  অর্থনৈতিক মডেলের যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ডিরড্রে ম্যকক্লোস্কি ‘ম্যকক্লোস্কি বিশ্লেষন’ এর মাধ্যমে ইকোনোমেট্রিক্সের][ অন্যান্য অধ্যাপকগণের মত মডেলের সারমর্ম প্রয়োগ প্রমাণিত ও অপ্রমাণিত করার জন্য কিছু উপাত্ত ব্যবহার করতে সমর্থ হন। তিনি যুক্তি দেন যে, বিশ্লেষনধর্মী সমীকরনের সম্প্রসারণে অর্থনীতি বিদদের বৃহৎ প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রচেষ্টা হয়ে থাকে। ইকোনোমেট্রিক্সবিদগণ উত্তর দেন যে, এটা শুধুমাত্র অর্থনীতি নয় বিজ্ঞানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ। ম্যকক্লোস্কি জটিল বিশ্লেষনের সমালোচনায় বলা হয় যে, অন্যান্য জিনিসের সাথে অর্থনৈতিক বিশ্লেষন সারমর্ম ধর্মী এ ধরনের উদাহরন তিনি এড়িয়ে গেছেন এবং তার অভিযোগ অযৌক্তিক।
 
নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ও দার্শনিক ফ্রেডরিক হায়েক বলেন যে, অর্থনীতি হচ্ছে একটি সামাজিক বিজ্ঞান, কিন্তু যুক্তি দেওয়া হচ্ছে দৈহিক বিজ্ঞানের মত পদ্ধতি অর্থনীতিতে ব্যবহার করা হলে তা ভুল ফলাফল বয়ে আনবে এবং একে অবৈজ্ঞানিক মনে করা হয় যখন যান্ত্রিক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের চিন্তাধারার আচরণের সরল বিষয় গঠিত হয়।

কৌতুক করে অর্থনীতিকে “দূর্ভাগ্য বিজ্ঞান” বলা হয়। এতদ্বসত্তেও উনিশ শতকে তর্কযুক্তির মাধ্যমে ইহার সঠিক ভিত্তি গড়ে উঠে যদিও অর্থনীতি নামকরণ নিয়ে কটুক্তি করা হয়।

অর্থনীতিতে অর্থনীতিবিদদের কর্তৃক কতিপয় মডেল ব্যবহৃত হওয়ায়, আবার কখনও অন্যান্য অর্থনীতিবিদ যারা অবাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত, পর্যবেক্ষণ বিহীন বা পর্যালোচনা বিহীন অণুসিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে, ফলে ইহা সমালোচিত হয়। গুরুত্ত্বপূর্ন নয় এমন বিষয়ের ফলাফল থেকে গৃহীত অবাস্তব অণুসিদ্ধান্ত সমালোচনায় সাড়া মেলে এবং জটিলতা পূর্ণ বিশ্বে ইহার প্রয়োজন রয়েছে যা, অর্থনীতির দার্শনিক মতবাদের সহিৎ সামঞ্জস্যপুর্ন অবাস্তব অণুমিত শর্তের অধিক গ্রহণযোগ্য, কেননা এ ধরনের অণুমিত শর্ত অর্থনৈতিক জ্ঞানের জন্য অপরিহার্য। একটি গবেষণায় ইহাকে “গৃহীত প্রতিরক্ষা” নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সারমর্মে বলা হয়েছে এই “গৃহীত প্রতিরক্ষা” অবাস্তব অণুমানকে সমালোচনার অগ্রহণযোগ্য হয়না। কখনও কখনও ইহা গুরুত্ত্বপূর্ন যে, একটি স্কুলের বিষয়সমুহের মধ্যে ইহা অধিকতর বিবেচ্য, সেখানে সকল অর্থনৈতিক বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং অন্তর্নিহিত সত্য অণুধাবনে পর্যবেক্ষণমুলক-বিবেচনা অধিক বলে বহু সংখ্যক পরিবর্তক ক্ষেত্র অভিযোগ করে।

অর্থনীতির সমালোচনার অধিকাংশই এই ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে বিচরন করে যে, অর্থনীতির কাঠামোগত অভিযোগ গুলো পরীক্ষামূলক প্রমাণ ছাড়াই প্রশ্নাতীত অণুমান। অনেক অর্থনীতিবিদ এইসব ধারণার উদাহরন দিয়ে প্রতিউত্তরে বলেছেন যে, অর্থনীতিতে ব্যবহারের জন্য “গৃহীত মূলনীতি” কে বিবেচনা করা হয়েছে এবং যা পরীক্ষামুলক পর্যবেক্ষণের সহিৎ সামঞ্জস্যপূর্ন ( নিম্নের তিনটি উদাহরন দেখুন), কখনও কখনও একমত পোষন করেছেন যে, এই পর্যবেক্ষণ গুলোর মূল অণুমিত শর্ত মুলতঃ অধিক সরলতা সমস্যা সংবলিত।

অনেক অর্থনীতিবিদ “অণুমিত শর্ত” থেকে পর্যবেক্ষণ মুলকে পরিবর্তিত হওয়া ধারণার উদাহরন দিয়েছেন, তা নিম্নরুপঃ

......... আয় বৃদ্ধি প্রবণতা = ভোগঃ ইহাকে একটি গৃহীত মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা যায় এবং অনেক মেইনস্ট্রীম অর্থনীতিবিদ ধারণা পোষন করেন যে, মানব জাতি ভোগে সূখী এবং ভোগ ব্যতীত অসূখী। সন্তুষ্ট করতে সমর্থ্য নয় এমন বিষয়ের অন্যান্য সাধারণ অণুমিত শর্ত যোগ করা যায় যা মানুষকে কখনও সূখী করতে পারেনা। যদিও মূল মতাদর্শ অধিক সরলতা সমস্যা যুক্ত ( বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদদের প্রতনিধিগণ আজকের দিনে বিশ্বাস না করতেও পারেন), বর্তমানে পর্যবেক্ষণমুলক পরীক্ষা আয় বৃদ্ধি প্রবনতার ধারণা ও আয়ের এরকম উপাদানের সম্পর্ক নিশ্চিত করে। 
......... স্বয়ংক্রিয়তাঃ কিছু মেইনস্ট্রীম অর্থনীতিবিদ ইহা নিয়ে ধারণা পোষন করেন যে, মানব জাতি আদর্শবাদী, তারা স্বাধীনতা পছন্দ করে। ইহা অর্থনীতি ও অর্থনীতিবিদদের বিশেষ কিছু ধারণার অন্য ধরনের সরলতা প্রকাশ করে। প্রতিনিধি নির্ভর মডেল তৈরি ও পরীক্ষামুলক অর্থনীতি ফলাফল দেয় যা এই তত্ত্বকে নির্দেশনা করে।

গৃহীত মূলনীতির সাধারণ প্রতিরক্ষা হচ্ছে যে ইহা সমস্যার সমধান তৈরি করতে পারে। কখনও কখনও নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় অর্থনৈতিক গবেষণার মাধ্যমে বিশেষ পর্যবেক্ষণের পর মূল অণুমিত শর্ত সমুহ আরও বাছাই করা করা হয় এবং আদর্শবাদী অর্থনীতিতে কৌশলগত ভাবে “গৃহীত মূলনীতি” দীর্ঘস্থায়ী হয়না।

অর্থনীতি হচ্ছে বিভিন্ন স্কুল ও চিন্তাধারা গবেষণার একটি ক্ষেত্র। ফলে ইহাতে বিবেচনাধীন মতামত, আচরণ ও তত্ত্ব বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান লাভ করে। কিছু বিরোধী বিষয়বস্তু বা ভিন্ন অণুমিত শর্তের অংশসমুহের কারণে পারস্পরিক বিরোধিতা হয়ে থকে।

অর্থনীতির সংজ্ঞার সমালোচনায় বলা হয়েছে ইহা অতি নিম্ন বস্তুগত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একজন ডাক্তার বা নৃত্য শিল্পীর সেবা ইহাতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি শ্রমতত্ত্বে অবস্তুগত সেবার পারিশ্রমিকের যোগফলে সম্পূর্ন এড়িয়ে যায় যা অসম্পূর্ন। কল্যাণকে সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায়না, কারণ ধনী ও গরিবের কাছে অর্থের প্রান্তিক গুরুত্ত্ব ভিন্ন ( যেমন ১০০ টাকা গরিবের কাছে ধনীর চাইতে অনেক বেশি গুরুত্ত্বপূর্ন)। তারপরও এ্যালকোহল এবং ধূমপানের মত পণ্যের উৎপাদন ও বণ্টন কার্যক্রম মানব কল্যাণে সাহায্য করেনা কিন্তু এইসব অপর্যাপ্ত পণ্য প্রাকৃতিক ভাবে মানুষের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পুরন করে।
মার্ক্সীয় অর্থনীতিতে এখনও কল্যাণ সংজ্ঞার উপর আলকপাত করা হয়। ইহা ছাড়াও আদর্শবাদী অর্থনীতি শুরুতে কিছু সমালোচনায় যুক্তি দেওয়া হয় যে, বর্তমান অর্থনৈতিক চর্চা কল্যাণ পরিমাপে যথোপযুক্ত নয়, কিন্তু একমাত্র মুদ্রাবাদীদের কল্যাণের অপর্যাপ্ত সাফল্য রয়েছে। 
নব্য-বুনিয়াদী অর্থনীতিতে চলমান নিয়ন্ত্রণে দুস্প্রাপ্যতার উপর আলোকপাত করা হয় যা বেশির ভাগ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি বিভাগে প্রচলিত করা হয়। সম্প্রতি বছর গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থনীতি উদ্বৃত্ত অর্থনীতি সহ ইহা বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হচ্ছে।

জন স্টুয়ার্ট মিল বা লিওন ওয়ালার্স এর মত কিছু অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন যে, সম্পদ উৎপাদনকে ইহার বণ্টনের সহিত আবদ্ধ করা যায়না। “ফলিত অর্থনীতি” এর প্রাথমিক ক্ষেত্রে যা পরবর্তীতে “সামাজিক অর্থনীতি” নামে পরিচিত হয়েছে এবং এতে ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থনীতি একটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে কোন সরকার বা অন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। কখনও কখনও উচ্চপদস্থ নীতি নির্ধারক বা ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিদের প্রভাবিত করতে পারে যারা অর্থনৈতিক তত্ত্বের ধারণা অধিক ব্যবহারকারী এবং নীতিগত এজেন্ডা ও মূল্য প্রক্রিয়ার বাহক হিসেবে পরিচিত এবং তাদের দায়িত্ব সম্পর্কিত বিষয় উল্লেখকে সীমিত করেনা। অর্থনৈতিক তত্ত্বের সহিৎ নিবিড় সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট চর্চা হচ্ছে একটি যৌক্তিক প্রতিফলন যা অর্থনীতির অধিকাংশ সরল মূলনীতির ছায়া অথবা বিপরীত আকৃতির এবং তা কখনও কখনও বিশেষ সামাজিক এজেন্ডা ও মূল্য পদ্ধতিকে বিভ্রান্তি করে। 
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়ের মত একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারী বিবৃতি বা সামষ্টিক অর্থনীতির মূলনীতি (আর্থিক নীতি ও রাজস্ব নীতি) হচ্ছে যুক্তি এবং সমালোচনার প্রতিফলন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২১ শতকে ইউএস গনতন্ত্র উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সমন্মিত করতে সম্ভব করে, ১৯ শতকে কার্ল মার্ক্সের অবদান বা পুঁজিবাদ বনাম সমাজবাদ বিতর্ক নিয়ে ঠান্ডা যুদ্ধ অর্থনীতির বিবেচ্য বিষয়। তারপরেও অর্থনীতি কোন ধরনের মূল্য অভিযোগ সৃষ্টি করেনা, ফলে ইহা একটি কারণ হতে পারে যে, অর্থনীতি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা এবং অণুসিদ্ধান্ত পরীক্ষার উপর ভিত্তি না করেই পূর্বাভাস দেয়। একটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ ফলাফলের উপর এবং একই পদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় গঠন ও মূল্য বিচার ছাড়াই অন্যান্য অর্থনৈতিক পদ্ধতির দক্ষতা আলোকপাত করতে চেষ্টা করে। উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে, স্বত্বাধিকারী পদ্ধতি, সমঅধিকার পদ্ধতি বা সমাজের উচ্চ শ্রেণীর পদ্ধতির অর্থনীতিতে তাদের যোগ্যতা বাচ-বিচার ছাড়াই প্রয়োগ করা হয়।

অর্থনীতি ও দর্শনের সম্পর্ক জটিল। অনেক অর্থনীতিবিদ পছন্দ এবং মূল্য বিচারকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে যেমন অর্থনীতির পরিধির বাইরে প্রয়োজন বা অভাব বা সমাজের জন্য কোনটা উত্তম, রাজনৈতিক হবে না ব্যক্তিগত হবে। কোন সময়ে একজন ব্যক্তি বা সরকার তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে অর্জন কতটুকু হওয়া উচিত অর্থনীতি ইহার অন্তর্নিহিত সত্য প্রকাশ করতে পারে।
অন্য দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক ধারণার প্রভাব যেমন, আধুনিক পুঁজিবাদে অন্তর্নিহিত বিষয়াদি, মূল্য প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ঘটাতে পারে যদিও ইহা কাম্য কিংবা অকাম্য হউক ( উদাহরন দেখুন, ভোগবাদ এবং ক্রয় বিহীন দিবস)। কিছু চিন্তাবিদের মতে, অর্থনীতির একটি তত্ত্ব বা ব্যবহার করা হচ্ছে একটি মানবিক বিচার তত্ত্ব।
মানবিক ভোগবাদের পূর্ব অণুমান হচ্ছে একজন যখন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিবে অবশ্যই মানবিক ও পরিবেশ ধারণাকে বিবেচনায় আনবে, এছাড়াও আর্থিক ও বাণিজ্যিক অর্তনীতি বিবেচনা করবে।
অন্য দিকে, যৌক্তিক সীমিত সম্পদের বণ্টন সাধারণ কল্যাণ ও অর্থনীতির একটি ক্ষেত্রের অভাব পুরন করে। কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে গবেষণার উত্তম পন্থা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সন্তুষ্ট, পরিবেশ, বিচার বা মহাদূর্যোগে সহায়তার মত লক্ষ্য পুরনে সম্পদের বণ্টন হচ্ছে ঐচ্ছিক লুকায়িত যা, সাধারণ কল্যাণ কিংবা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ভোগান্তির চাইতে কম। এই ধারণায় মনে করা হয় যে, ইহা অমানবিক এবং এ ধরনের বিষয় অর্থনীতিতে আসতে পারেনা। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য প্রতিনিধিগণ নিয়মিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষন গবেষণায় মিলিত হন।

কেউ বলতে পারেন যে, অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী বাজার কাঠামো ও দুস্প্রাপ্য পণ্য বণ্টনের অন্যান্য উপায় সমুহ শুধুমাত্র লক্ষমাত্রা ও অভাবের উপর প্রভাব ফেলেনা, চাহিদা ও আচরণের উপরও প্রভাব ফেলে। অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় যে, পছন্দ হচ্ছে অতীতের ইচ্ছা ব্যতিরেকে বিবেচ্য, কখনও সামাজিক শর্তারোপ করা হয় কারণ মানুষ মানসম্পন্ন জীবন যাপন কামনা করে। অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে ইহা একটি চরম বিতর্কের বিষয় যাকে কল্যাণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ও কাম্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক প্রভাবক সমুহের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তারা যুক্তি দেখান যে, সম্পদের পুনঃবণ্টন মানবিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ভুল। সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে সামাজিক ক্ষেত্রে ইহা একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। তারা যুক্তি দেখান যে,সম্পদের অসমতা প্রাথমিক আলোচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।ইহা উনিশ শতকে শ্রম অর্থনীতি ও বিশ শতকে কল্যাণ অর্থনীতি উভয়কে মানব উন্নয়ন তত্ত্বে প্রবেশের পূর্বে পরিচালিত করে।

অর্থনীতির পুরনো বিষয় ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বিশেষ করে কিছু অর্থনীতিবিদ যেমন মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদগন দ্বারা অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। ইহা বাজার অর্থনীতির বিশেষ বিষয়ের বা উদাহরনের সাথে সমোঝতা বিহীন নির্দেশনা প্রকাশ করে। রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থনৈতিক বিশ্লেষনে সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে অন্তভূক্ত করে এবং সেখানে উন্মুক্ত ভাববাদ বিদ্যমান, যদিও আদর্শবাদের অভিযোগ থাকলেও ইহাকে বৃহৎ অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যমুলক নির্দেশনা বলা হয়। কিছু মুলবাদী বিশ্ববিদ্যালয়ে ( বেশির ভাগ যুক্তরাজ্যে) ‘অর্থনীতি’ বিভাগের তুলনায় ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বিভাগ বেশি রয়েছে।

মার্ক্সবাদী অর্থনীতি সাধারণত অর্থের বাণিজ্য সময়কে পরিহার করে। মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে, বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সম্পদের বণ্টনের জন্য মুল উৎস উৎপাদনের হাতিয়ারের উপর সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ। কোন নির্দিষ্ট বস্তুগত সম্পদের দুস্প্রাপ্যতা উৎপাদনের হাতিয়ারে শক্তি ভিত্তিক সম্পর্ক তৈরির কেন্দ্রীয় আলোচনায় গৌন বিষয়।

অর্থনীতির বাস্তব ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়, যা আলোচিত হয়ে আসছে “১৯০০ সাল হতে অর্থনীতির মুল পরিবর্তন” নামে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের একটি মূল, বিদ্যালয় বা বিভাগ থাকে যা বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়, যেমন কলা বিভাগ, বাণিজ্য বিভাগ। “Bank of Sweden Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel” (যাকে অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার বলা হয়) হচ্ছে অর্থনীতিবিদদের জন্য একটি বাৎসরিক পুরস্কার যা এই বিষয়ে জ্ঞান সমৃদ্ধ অবদানের জন্য দেয়া হয়। বেসরকারী খাতে যেমন শিল্প, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে অর্থনীতিবিদগন পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। অর্থনীতিবিদগন সরকারি বিভিন্ন বিভাগে এবং প্রকল্পে যেমন রাজস্ব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পরিসংখ্যান ব্যুরো ইত্যাদিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

মরিয়ম-ওয়েবস্টার অভিধানে ব্যবসায়ে প্রতিযোগিতা বলতে দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যেকার অন্য কোন তৃতীয়পক্ষের অংশগ্রহণে অধিকতর ভালো পণ্য বা সেবার আশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হওয়াকে বুঝায়। এ বিষয়ে ১৭৭৬ সালে দি ওয়েলথ অব নেশন্স গ্রন্থে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ উল্লেখ করেছেন।
বাজার অর্থনীতিতেও প্রতিযোগিতা বৃহৎ ভূমিকা পালন করে এবং একই স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গ্রাহকদেরকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়। অনেক সময় অর্থনীতিতে তা অসুস্থ প্রতিযোগিতা নামে আখ্যায়িত হয়। উন্নয়নশীল দেশে প্রায়শঃই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনার কাছে দেশী ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারে না। সভা-সমাবেশ, উন্নততর পণ্য, সেবা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সচেষ্ট হয়।




#Article 88: বিজ্ঞান (6258 words)


ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরীক্ষণযোগ্য  ও যাচাইযোগ্য, তার সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা ও সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানভাণ্ডারের নাম বিজ্ঞান।

ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া (scientia) থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে কোন বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিদ কিংবা বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত হয়ে থাকেন।

বিজ্ঞানীরা বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে জ্ঞান অর্জন করেন এবং প্রকৃতি ও সমাজের নানা মৌলিক বিধি ও সাধারণ সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। বর্তমান বিশ্ব এবং এর প্রগতি নিয়ন্ত্রিত হয় বিজ্ঞানের মাধ্যমে। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপক অর্থে যেকোনো জ্ঞানের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণকে বিজ্ঞান বলা হলেও এখানে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করা হবে।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্র মূলত দুটি: সামাজিক বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ এ ধরনের সকল বিজ্ঞান প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে মানুষের আচার-ব্যবহার এবং সমাজ নিয়ে যে বিজ্ঞান তা সমাজ বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। তবে যে ধরনেরই হোক, বিজ্ঞানের আওতায় পড়তে হলে উক্ত জ্ঞানটিকে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে। আর একই শর্তের অধীনে যে গবেষকই পরীক্ষণটি করুন না কেন ফলাফল একই হতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তি চেতনা অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষণের ফলাফল কখনও পরিবর্তিত হতে পারে না।

গণিতকে অনেকেই তৃতীয় একটি শ্রেণি হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ তাদের মতে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান আর গণিত এই তিনটি শ্রেণি মিলে বিজ্ঞান। ঐ দৃষ্টিকোণে গণিত হলো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান আর প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞান হলো পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞান। প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে গণিতের মিল-অমিল উভয়ই রয়েছে। গণিত একদিক থেকে পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, উভয়টিই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করে। আর পার্থক্য হচ্ছে, পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করা হলেও গণিতে কোনো কিছু প্রতিপাদন করা হয় আগের একটি সূত্রের ওপর নির্ভর করে। এই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান, যার মধ্যে পরিসংখ্যান এবং যুক্তিবিদ্যাও পড়ে, অনেক সময়ই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে উন্নতি করতে হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের প্রসার আবশ্যক। কিভাবে কোনো কিছু কাজ করে (প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) বা কীভাবে মানুষ চিন্তা করে (সামাজিক বিজ্ঞান) তাই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে। 

বিজ্ঞান ব্যাপক অর্থে জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ শব্দ যা আধুনিক যুগের আগে অনেক ঐতিহাসিক সভ্যতার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আধুনিক বিজ্ঞান এর পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র এবং ফলাফলের মধ্যে সফল।

বিজ্ঞান শব্দটি উৎপত্তিগত অর্থে এক ধরনের জ্ঞান বোঝাতো কিন্তু বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন বুঝাতো না । বিশেষ করে, এটি ছিল এক ধরনের জ্ঞান যা মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যবহৃত হত। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক বিষয়গুলির জ্ঞান সম্পর্কে রেকর্ড ইতিহাসের অনেক আগেই সংগৃহীত হয়েছিল এবং জটিল বিমূর্ত ধারণাগুলির উন্নয়ন ঘটেছিল । এটি জটিল ক্যালেন্ডার নির্মাণ, কৌশলগত উপায়ে বিষাক্ত উদ্ভিদকে খাবার উপযোগী করে তৈরি করার কৌশল এবং পিরামিডের মতো ভবনগুলি নিয়ে গবেষণা করার কাজে ব্যবহৃত হত । যাইহোক, এই ধরনের জিনিসগুলির জ্ঞানের মধ্যে কোন সঙ্গতিপূর্ণ বিশিষ্ট পার্থক্য তৈরি করা হয়নি যা প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সত্য এবং অন্যান্য ধরনের সাম্প্রদায়িক জ্ঞানের মতো, যেমন: পৌরাণিক কাহিনী এবং আইনি ব্যবস্থা ।

প্রাকাদিকালের শেষের দিকে এটি আরো বিস্তৃতি পেতে শুরু করে।যদিও তা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়।আরো জানতে 

সক্রেটিস পূর্ব দার্শনিকগণ দ্বারা প্রকৃতি (প্রাচীন গ্রিক ফোসিস) এর ধারণার উদ্ভাবনের আগে, একই শব্দটি ব‍্যবহার করা হত একটি প্রাকৃতিক পথ যেভাবে একটি উদ্ভিদ বৃদ্ধি পায় বোঝাতে অথবা একটি উপজাতি যেভাবে একটি নির্দিষ্ট ঈশ্বরকে পূজা করে বোঝাতে ।  এই কারণেই এই দাবি করা হত যে, কঠোর অর্থে এই পুরুষরা প্রথম দার্শনিক ছিল। এমনকি ধারণা করা হত প্রথম মানুষটি প্রকৃতি এবং রীতি প্রভৃতির পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিল । বিজ্ঞান প্রকৃতির জ্ঞান হিসাবে বিশিষ্ট ছিল এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য যা ছিল সত্য জিনিস, এবং এই ধরনের বিশেষ জ্ঞান সাধনার নাম ছিল দর্শন - প্রথম দার্শনিক-পদার্থবিজ্ঞানীর আলোচ্য বিষয় । তারা প্রধানত ছিল তত্ত্ববিদ, বিশেষ করে জ্যোতির্বিদ্যাতে আগ্রহী ছিল । এর বিপরীতে, প্রকৃতির জ্ঞানকে ব‍্যবহার করে প্রকৃতির অনুকরণ করার চেষ্টা , শাস্ত্রীয় বিজ্ঞানীদের দ্বারা নিম্ন শ্রেণির কারিগরদের জন্য আরও উপযুক্ত স্বার্থ হিসাবে দেখা হত ।  প্রথাগত এবং গবেষণামূলক বিজ্ঞান মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য প্রাক-সক্রেটিস দার্শনিক পার্মিনাইডস (প্রায় ছয় শতকের প্রথম দিকে বা পঞ্চম শতকের প্রথম দিকে ) তৈরি করে ছিলেন । যদিও তার কাজটি ছিল পেরি ফিসুয়েস (প্রকৃতির উপর) একটি কবিতা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পদ্ধতিতে একে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রবন্ধ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পার্মিনাইডস ' একটি প্রথাগত পদ্ধতি বা ক্যালকুলাসকে নির্দেশ করে যা প্রাকৃতিক ভাষাগুলির তুলনায় প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা করতে পারে। ফিজিস  এর অনুরূপ হতে পারে ।

প্রথম দিকে দার্শনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হল সক্রেটিস কর্তৃক মনুষ্য প্রকৃতি, রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রকৃতি এবং মানব জ্ঞানের সাথে মানবিক বিষয়গুলির গবেষণায় দর্শন প্রয়োগের বিষয় বিতর্কিত কিন্তু সফল প্রচেষ্টা ছিল। তিনি পুরাতন ধরনের পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার সমালোচনা করেছিলেন যেমনটা কেবল বিশ্লেষণেই এবং স্ব-সমালোচনার অভাব ছিল । তিনি বিশেষ করে সচেতন ছিলেন যে কিছু প্রাথমিক পদার্থবিজ্ঞানী প্রকৃতিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন যেখানে এর কোন বুদ্ধিমান শৃঙ্খলা নেই, যা কেবল গতি ও বস্তুর ক্ষেত্রকেই ব্যাখ্যা করে ।

মানবকেন্দ্রিক অধ্যয়ন ছিল পৌরাণিক এবং ঐতিহ্য ভিত্তিক, সক্রেটিস এর বাহিরে গিয়ে জ্ঞানদান করতে চেয়েছিলেন, তাই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। অ্যারিস্টটল সক্রেটিসের চেয়ে কম বিতর্কিত পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন।  তিনি পূর্বের বিজ্ঞানীদের অনেক মীমাংসিত বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন । উদাহরণস্বরূপ, তার পদার্থবিজ্ঞানে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে এবং অনেকগুলো প্রকৃতির অংশ হিসাবে যা ছিল মানুষের জন্য। প্রতিটি জিনিসের একটি আনুষ্ঠানিক কারণ এবং চূড়ান্ত কারণ থাকে এবং তার সাথে যুক্তিসঙ্গত মহাজাগতিক ক্রমের একটি ভূমিকা আছে । গতি এবং পরিবর্তনকে ইতিমধ্যে সম্ভাব্য  বাস্তবায়ন হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল তাদের ধরনটা কেমন তার উপর ভিত্তি করে । সক্রেটিস যখন দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে মানুষের জন্য জীবিত থাকার সর্বোত্তম উপায় (একটি অধ্যয়ন অ্যারিস্টটল একে নৈতিকতা ও রাজনৈতিক দর্শনে বিভক্ত করেছিলেন) এর ব্যবহারিক প্রশ্ন বিবেচনা করার জন্য দর্শনের ব্যবহার করা উচিত, তখন তারা অন্য কোনও ধরনের প্রযোজ্য বিজ্ঞানের পক্ষে তর্কবিতর্ক করে না।

অ্যারিস্টটল বিজ্ঞান এবং কারিগরদের ব্যবহারিক জ্ঞানের মধ্যে তীক্ষ্ণ পার্থক্য বজায় রেখেছিলেন । তাত্ত্বিক ধারণাকে মানবীয় ক্রিয়াকলাপের সর্বোচ্চ ধরন হিসাবে তিনি বিবেচনা করতেন । কম জীবনধারা হিসাবে ব্যবহারিক চিন্তাভাবনা ভাল জীবনযাপনের জন্য উঁচুমানের এবং কারিগরদের জ্ঞান নিম্ন শ্রেণির জন্য উপযুক্ত বলে তিনি মনে করতেন ।

প্রাক-প্রাচীন এবং প্রাথমিক মধ্যযুগে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির অনুসন্ধানে অ্যারিস্টটলীয় পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছিল । রোমান সাম্রাজ্য পতনের সময় এবং পর্যায়ক্রমিক রাজনৈতিক সংগ্রামের সময় কিছু প্রাচীন জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছিল, অথবা কিছুটা অস্পষ্ট অবস্থায় রাখা হয়েছিল। যাইহোক, বিজ্ঞানের সাধারণ ক্ষেত্র (বা প্রাকৃতিক দর্শন যেটিকে বলা হয়) এবং প্রাচীন বিশ্বের অধিকাংশ সাধারণ জ্ঞান সেভিলের ইসিডোরের মতো প্রাথমিক ল্যাটিন এনসাইক্লোপিডীয়দের কাজগুলির মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অনেক গ্রীক বিজ্ঞানের গ্রন্থগুলি নেস্টোরিয়ান্স এবং মনোফিসিটস গোষ্ঠী দ্বারা সম্পন্ন সিরিয়াক অনুবাদগুলিতে সংরক্ষিত ছিল।  এইগুলির মধ্যে বেশিরভাগই পরবর্তীতে খলিফাদের অধীনে আরবিতে অনূদিত হয়েছিল, যার মধ্যে অনেক ধরনের শাস্ত্রীয় শিক্ষা সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হয়েছিল।

উইসডম হাউস আব্বাসীয় যুগে ইরাকের বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । একে ইসলামিক গোল্ডেন এজের সময় একটি প্রধান জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র বলে বিবেচিত হয়, যেখানে বাগদাদে আল-কিন্ডি এবং ইবনে সাহল এর মত মুসলিম পণ্ডিত এবং কায়রোতে ইবনে আল-হায়তাম নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমৃদ্ধ হয়েছিল বাগদাদ মোঘলদের দ্বারা ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত । । ইবনে আল-হায়থাম যিনি পশ্চিমে আলহাজেন হিসেবে পরিচিত, তিনি পরীক্ষামূলক তথ্যের উপর জোর দিয়ে অ্যারিস্টটলীয় দৃষ্টিকোণকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ।

পরে মধ্যযুগীয় সময়ের মধ্যে, অনুবাদের জন্য চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছিল (উদাহরণস্বরূপ, টলেডো অনুবাদকদের বিদ্যালয়), পশ্চিমা ইউরোপীয়রা শুধুমাত্র ল্যাটিন ভাষায় নয় বরং গ্রিক, আরবি এবং হিব্রু থেকে ল্যাটিন অনুবাদ লিখিত সংগ্রহগুলি সংগ্রহ করতে শুরু করেছিল । বিশেষত, অ্যারিস্টটল, টলেমী,  এবং ইউক্লিডের গ্রন্থগুলো উইসডম এর ঘরগুলিতে সংরক্ষিত ছিল যা ক্যাথলিক পণ্ডিতদের মধ্যে চাওয়া হয়েছিল । ইউরোপে, আলহাজেনের বুক অফ অপটিকস এর ল্যাটিন অনুবাদ সরাসরি ইংল্যান্ডে রজার বেকনকে (ত্রয়োদশ শতকে) প্রভাবিত করেছিল, যিনি আলহাজেনের দ্বারা প্রকাশিত আরও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান সম্পর্কে যুক্তি দিয়েছিলেন। মধ্যযুগ যুগ ধরে, পশ্চিমা ইউরোপে ক্যাথলিকবাদ ও আরিস্টোলেটিয়ালিজমের একটি সংশ্লেষণের উদ্ভব হয় যা পশ্চিমা ইউরোপে উদ্দীপ্ত ছিল, যেখানে বিজ্ঞান একটি নতুন ভৌগোলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ।  কিন্তু পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে পণ্ডিতবাদের সকল দিক নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল।
i also greatly developed the science of Medicine with the former writing the Canon of Medicine, a medical encyclopedia used until the 18th century and the latter discovering multiple compounds like alcohol. Avicenna's canon is considered to be one of the most important publications in medicine and they both contributed significantly to the practice of experimental medicine, using clinical trials and experiments to back their claims.

In the Classical antiquity Greek and Roman taboos had meant that dissection was usually banned in ancient times, but in Middle Ages it changed: medical teachers and students at Bologna began to open human bodies, and Mondino de Luzzi (ca. 1275–1326) produced the ﬁrst known anatomy textbook based on human dissection.

By the eleventh century most of Europe had become Christian; stronger monarchies emerged; borders were restored; technological developments and agricultural innovations were made which increased the food supply and population. In addition, classical Greek texts started to be translated from Arabic and Greek into Latin, giving a higher level of scientific discussion in Western Europe.

By 1088, the first university in Europe (the University of Bologna) had emerged from its clerical beginnings. Demand for Latin translations grew (for example, from the Toledo School of Translators); western Europeans began collecting texts written not only in Latin, but also Latin translations from Greek, Arabic, and Hebrew. Manuscript copies of Alhazen's Book of Optics also propagated across Europe before 1240, as evidenced by its incorporation into Vitello's Perspectiva. Avicenna's Canon was translated into Latin. In particular, the texts of Aristotle, Ptolemy, and Euclid, preserved in the Houses of Wisdom and also in the Byzantine Empire, were sought amongst Catholic scholars. The influx of ancient texts caused the Renaissance of the 12th century and the flourishing of a synthesis of Catholicism and Aristotelianism known as Scholasticism in western Europe, which became a new geographic center of science. An experiment in this period would be understood as a careful process of observing, describing, and classifying. One prominent scientist in this era was Roger Bacon. Scholasticism had a strong focus on revelation and dialectic reasoning, and gradually fell out of favour over the next centuries, as alchemy's focus on experiments that include direct observation and meticulous documentation slowly increased in importance.

মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের হেলেনিস্ট সভ্যতার মতামত বহন করে, যেমন আলহাজেনের হারানো কর্মের একটি বইয়ে দেখানো হয়েছে যেখানে 'আমি ইউক্লিড ও টলেমীর দুই বই থেকে অপটিক্সের বিজ্ঞান সমন্ধে তুলেছি, যা আমি যোগ করেছি প্রথম বক্তৃতা যা ইবনে আবি যোসেবিয়া এর ক্যাটালগ থেকে টলেমীর বই থেকে হারিয়ে যাওয়া (স্মিথ ২০০১): ৯১ (ভল .১), পি. এক্স. ভি । আলহাজেন নিছক টলেমীর দৃষ্টি তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি অ্যারিস্টটলের তত্ত্ববিদ্যা বজায় রেখেছিলেন; রজার বেকন, ভিটেল্লো এবং জন পেখাম প্রত্যেকে আলহাজেনের বুক অফ অপটিক্স-এর উপর একটি তত্ত্ববিদ্যা রচনা করেছিলেন ।  একটি সংবেদন চিহ্নের শৃঙ্খলে সেন্সেশন, ধারণা এবং শেষ পর্যন্ত অ্যারিস্টটলের ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন ফর্মগুলির স্বীকৃতি দিয়েছিলেন । দৃষ্টি তত্ত্বের এই মডেল Perspectivism হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে, যা রেনেসাঁ শিল্পীদের দ্বারা ব্যবহৃত এবং অধ্যয়ন করা হয়েছিল ।

এ .মার্ক স্মিথ দৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নির্দেশ করেছিল যা অ্যারিস্টটলের চারটির মধ্যে তিনটি কারণ আনুষ্ঠানিক, পদার্থ এবং চূড়ান্ত দোষে দায়ী,   যা মূলত অর্থনৈতিক, যুক্তিসঙ্গত এবং সুসঙ্গত। যদিও আলহাজেন জানতেন যে একটি দৃশ্য  একটি অ্যাপারচারের মাধ্যমে চিত্রিত করা হয়েছে যা হল তার বিপরীত । তিনি যুক্তি দেন যে দৃষ্টি হল উপলব্ধি সম্পর্কিত । যা কেপলার দ্বারা উল্টানো হয়েছিল , যিনি প্রবেশপথের ছাত্রকে মডেল করার জন্য এটির সামনে একটি অ্যাপারচার সহ একটি জলভর্তি কাঁচের মতো চোখের মডেল করেছিলেন । তিনি দেখেছিলেন যে, একক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত আলো এক গ্লাসে কাচের গোলকের পিছনে চিত্রিত হয়েছিল । অপটিক্যাল শিকল চোখের পেছনে রেটিনাতে শেষ হয় এবং ছবিটি উল্টে যায়।

কোপার্নিকাস টলেমীর আলমাজেস্টের পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেলের বিপরীতে সৌরজগতের একটি সূর্যকেন্দ্রিক মডেল তৈরি করেছিলেন।

গালিলিও পরীক্ষামূলক ও গণিতের উদ্ভাবনী ব্যবহার করেছিলেন । যাইহোক, তিনি অষ্টম পোপ আরবান দ্বারা কোপার্নিকাসের ব্যবস্থার বিষয়ে লিখতে আশীর্বাদ পুষ্ট হয়েছিলেন । গালিলিও পোপের কাছ থেকে আর্গুমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন এবং তাদেরকে ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেম এ কাজটি সহজবোধ্যতার জন্য দিয়েছিলেন যা তাকে অনেকটা হতাশ করেছিল।
উত্তর ইউরোপে প্রিন্টিং প্রেসের নতুন প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে বহু আর্গুমেন্ট প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়েছিল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃতির সমসাময়িক ধারণাগুলির সাথে ব্যাপকভাবে মতবিরোধে ছিল। রেনি ডেসকার্টেস এবং ফ্রান্সিস বেকন একটি নতুন ধরনের অ-অ্যারিস্টটলীয় বিজ্ঞানের পক্ষে দার্শনিক আর্গুমেন্ট প্রকাশ করেছিলেন । Descartes দাবী করেন যে গ্যালিলিওর মত প্রকৃতির অধ্যয়ন করার জন্য গণিত ব্যবহার করা যেতে পারে এবং বেকন চিন্তার উপর গবেষণার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন । বেকন  Aristotelian আনুষ্ঠানিক কারণ এবং চূড়ান্ত কারণের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং বিজ্ঞানকে সহজ প্রকৃতির নিয়মগুলির মাধ্যমে অধ্যয়ন করা উচিত, যেমন- তাপকে কোনও নির্দিষ্ট প্রকৃতি বা আনুষ্ঠানিক কারণ বলে অভিহিত করা যায় না। এই নতুন আধুনিক বিজ্ঞান নিজেকে প্রাকৃতিক আইন হিসাবে বর্ণনা করতে শুরু করেছিল । প্রকৃতির গবেষণায় এই আপডেট পদ্ধতিটিকে যান্ত্রিক হিসাবে দেখা হয় । বেকন যুক্তি দেন যে বিজ্ঞানের উচিত সমস্ত মানব জীবনের উন্নতির জন্য ব্যবহারিক আবিষ্কারগুলির উপর জোর দেয়া  ।

In the sixteenth century, Copernicus and

formulated a heliocentric model of the solar system unlike the geocentric model of Ptolemy's Almagest. This was based on a theorem that the orbital periods of the planets are longer as their orbs are farther from the centre of motion, which he found not to agree with Ptolemy's model. Kepler modelled the eye as a water-filled glass sphere with an aperture in front of it to model the entrance pupil. He found that all the light from a single point of the scene was imaged at a single point at the back of the glass sphere. The optical chain ends on the retina at the back of the eye. Kepler is best known, however, for improving Copernicus' heliocentric model through the discovery of Kepler's laws of planetary motion. Kepler did not reject Aristotelian metaphysics, and described his work as a search for the Harmony of the Spheres.

Galileo made innovative use of experiment and mathematics. However, he became persecuted after Pope Urban VIII blessed Galileo to write about the Copernican system. Galileo had used arguments from the Pope and put them in the voice of the simpleton in the work Dialogue Concerning the Two Chief World Systems, which greatly offended him.

In Northern Europe, the new technology of the printing press was widely used to publish many arguments, including some that disagreed widely with contemporary ideas of nature. René Descartes and Francis Bacon published philosophical arguments in favor of a new type of non-Aristotelian science. Descartes emphasized individual thought and argued that mathematics rather than geometry should be used in order to study nature. Bacon emphasized the importance of experiment over contemplation. Bacon further questioned the Aristotelian concepts of formal cause and final cause, and promoted the idea that science should study the laws of simple natures, such as heat, rather than assuming that there is any specific nature, or formal cause, of each complex type of thing. This new modern science began to see itself as describing laws of nature. This updated approach to studies in nature was seen as mechanistic. Bacon also argued that science should aim for the first time at practical inventions for the improvement of all human life.

সপ্তদশ  ও অষ্টাদশ শতকের মধ্যে আধুনিকতার প্রকল্প বেকন ও রেনে দেকার্তের দ্বারা উন্নত করা হয়েছিল যা দ্রুত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়েছিল এবং একটি নতুন ধরনের প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, গাণিতিক, পদ্ধতিগতভাবে পরীক্ষামূলক এবং ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্ভাবনী এর সফল উন্নয়নের দিকে পরিচালিত হয়েছিল । নিউটন ও লিবনিজ একটি নতুন পদার্থবিজ্ঞান তৈরিতে সফল হয়েছিলেন যা এখন ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স হিসাবে পরিচিত, যা পরীক্ষা দ্বারা নিশ্চিত করা যায় এবং গণিত ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করা যায় । লিবনিস এরিস্টটলিয়ান পদার্থবিদ্যা থেকে পদটি নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন এটি একটি নতুন অ-টেলিওলজিকাল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ, শক্তি এবং সম্ভাব্যতা (Aristotelian Energeia এবং potentia এর আধুনিক সংস্করণ) । বেকনের শৈলীতে তিনি ধারণা করেছিলেন যে, বিভিন্ন ধরনের জিনিস প্রকৃতির একই সাধারণ সূত্র অনুযায়ী কাজ করে যার প্রতিটি ধরনের কোন বিশেষ আনুষ্ঠানিক বা চূড়ান্ত কারণ নেই। এই সময়ের মধ্যে বিজ্ঞান শব্দটি ধীরে ধীরে এক প্রকারের জ্ঞান বিশেষ করে প্রাকৃতিক জ্ঞানের প্রেক্ষাপট হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়েছিল যা  পুরাতন শব্দ প্রাকৃতিক দর্শনের অর্থের কাছাকাছি চলে আসছে।

জন হার্শেল এবং উইলিয়াম হুইয়েল উভয়ে মিলে প্রণালী বিজ্ঞানকে একটি সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন পরে শব্দটি  বিজ্ঞানীকে বুঝানো হত । যখন চার্লস ডারউইন  'দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ' প্রকাশ করেছিলেন তখন তিনি বিবর্তনকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন প্রচলিত জৈবিক জটিলতার ব্যাখ্যা হিসাবে । তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বটি কীভাবে প্রজাতি উৎপন্ন হয়েছিল তার প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিল । তবে এটি কেবল শত বছর পরে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছিল । জন ডাল্টন পরমাণুর ধারণাটির উন্নয়ন করেছিলেন । ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাপবিদ্যুৎ এবং তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্বের আইনগুলিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফলে নতুন প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয়েছিল যা নিউটনের কাঠামো ব্যবহার করার মাধ্যমেও সহজেই উত্তর মেলেনি । উনিশ শতকের শেষ দশকে পরমাণুর বিভাজনকে পুনর্নির্মাণ করার ঘটনাটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ।  এক্স-রশ্মি আবিষ্কার তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। পরের বছর প্রথম উপপারমানবিক কণা ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়েছিল ।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এর বিকাশের ফলে একটি নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সাথে শাস্ত্রীয় বলবিজ্ঞানগুলির প্রতিস্থাপনের সৃষ্টি হয় যার দুটি অংশ রয়েছে।তাদের মাধ্যমে প্রকৃতির বিভিন্ন ধরনের ঘটনা বর্ণনা করা যায়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কৃত্রিম সারের উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী  জনসংখ্যার বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে পরমাণু এবং নিউক্লিয়াস এর গঠন আবিষ্কার করা হয়েছিল, যার ফলে পারমাণবিক শক্তি (নিউক্লীয় ক্ষমতা) মুক্ত করা  সম্ভব হয়েছিল। উপরন্তু, এই শতাব্দীর যুদ্ধ দ্বারা অনুপ্রাণিত বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের ব্যাপক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার সহজসাধ্য করেছিল যার ফলে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাছাড়া পরিবহন বিপ্লব (অটোমোবাইল এবং বিমান), ICBM এর বিকাশ, মহাকাশ নিয়ে প্রতিযোগিতা, এবং  পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে প্রতিযোগিতা, সবকিছুই আধুনিক বিজ্ঞানের উপহার যা সবাই গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে।

বিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে যোগাযোগের উপগ্রহগুলির সাথে সংযুক্ত ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটগুলির বিস্তৃত ব্যবহার তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব বয়ে নিয়ে আসে যার ফলে স্মার্টফোন সহ বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট এবং মোবাইল কম্পিউটিংয়ের উত্থান ঘটেছে।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রাকৃতিক ঘটনাগুলিকে একটি প্রজনন পদ্ধতিতে  করার চেষ্টা করে। একটি ব্যাখ্যামূলক চিন্তাধারা পরীক্ষা বা অনুমানকে প্যারাসিমনির মত নীতিগুলি (কামের ক্ষুর নামেও পরিচিত) ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করা হয় এবং সাধারণত অনুভূতি খোঁজার আশা করা হয়, ঘটনা সম্পর্কিত অন্যান্য স্বীকৃত তথ্য যাদের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। এই নতুন ব্যাখ্যাটি  falsifiable পূর্বাভাস করতে ব্যবহৃত হয় পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা পরীক্ষনীয় হয়। কোন নিশ্চিত পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের আগে পূর্বাভাসগুলি করা হবে এবং প্রমাণ হিসাবে দেখা হবে যে এর মধ্যে কোন হেরফের হয়নি। ভবিষ্যদ্বাণীর অপ্রমাণ করাই হল অগ্রগতির প্রমাণ। এটি প্রাকৃতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আংশিকভাবে করা হয়, কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত অবস্থার অধীনে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয় (পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানগুলির মধ্যে যেমন-জ্যোতির্বিদ্যা বা ভূতত্ত্ব যেখানে পূর্বাভাস পর্যবেক্ষণ একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মাধ্যমে সংগঠিত হতে পারে) বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে (পারস্পরিক সম্পর্কের ভুলত্রুটি এড়াতে)।

যখন কোন অনুমান অসন্তোষজনক প্রমাণিত হয় তখন এটি সংশোধন বা বাতিল করা হয়। যদি প্রকল্প পরীক্ষায় টিকে যায়  তবে এটি একটি প্রাকৃতিক তত্ত্বের কাঠামোতে রূপান্তরিত হতে পারে, যা নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির আচরণের বর্ণনা দেওয়ার জন্য একটি যৌক্তিক, যুক্তিযুক্ত এবং স্বতন্ত্র মডেল বা কাঠামো হিসাবে বিবেচিত হয়। একটি তত্ত্ব সাধারণত একটি প্রকল্পের চেয়ে অনেক বিস্তৃত সেটের আচরণকে বর্ণনা করে। সাধারণভাবে, একটি বৃহৎ সংখ্যক অনুমান একক তত্ত্ব দ্বারা একত্রে আবদ্ধ হতে পারে। সুতরাং একটি তত্ত্ব হল এক ধরনের অনুমান যা আরও ব্যাপক সংখ্যক অনুমানের ব্যাখ্যা করতে পারে। সেই সূত্রে,  তত্ত্বগুলি হ'ল অনুমান যার বেশিরভাগই বৈজ্ঞানিক নীতিমালাগুলির অনুসারে প্রণয়ন করা হয়। অনুমান পরীক্ষা করার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা একটি মডেল তৈরি করতে পারে যার মাধ্যমে  যৌক্তিক, ভৌত বা গাণিতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে প্রপঞ্চকে বর্ণনা বা চিত্রিত করার প্রচেষ্টা করবে যাতে পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনাগুলির উপর ভিত্তি করে তারা নতুন প্রকল্প তৈরি করতে পারবে। হাইপোথিসিস পরীক্ষা করার সময় বিজ্ঞানীদের একটি ফলাফলের জন্য অন্যের উপর অগ্রাধিকার থাকতে পারে। তাই এটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে বিজ্ঞান সম্পূর্ণভাবে এই পক্ষপাতকে দূর করতে পারে। এটি সতর্কভাবে পরীক্ষামূলক নকশা, স্বচ্ছতা, এবং পরীক্ষামূলক ফলাফলগুলির একটি সম্পূর্ণ পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া এবং উপসংহার দ্বারা অর্জন করা যেতে পারে। পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত বা প্রকাশিত হওয়ার পর স্বাধীন গবেষকদের কাজ হল গবেষণাটি কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল তা দুইবার পরীক্ষা করা এবং ফলাফলগুলি নির্ভরশীল কিনা তা নির্ভর করে অনুরূপ পরীক্ষাগুলি অনুসরণ করার জন্য এটি সাধারণ অনুশীলন পরিচালনা করা। তাদেরকে তখনই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা হবে যখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দ্বারা পুরোপুরি পক্ষপাতমূলক পক্ষপাতের প্রভাবকে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। If you like our writing, whatever it is. This is corona time, so stay outside. Cause I like outside world. 

গণিত বিজ্ঞানের জন্য অত্যাবশ্যক । বিজ্ঞান ক্ষেত্রে গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল এটি  বৈজ্ঞানিক মডেলকে প্রকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । পর্যবেক্ষণ এবং পরিমাপ সংগ্রহ,  পাশাপাশি প্রকল্প রচনা করা এবং পূর্বাভাস প্রদানের ক্ষেত্রে প্রায়ই ব্যাপকভাবে গণিত ব্যবহারের প্রয়োজন হয় । উদাহরণস্বরূপ, পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, এবং ক্যালকুলাস সব পদার্থবিজ্ঞানের জন্য অপরিহার্য । কার্যত বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় গণিতের প্রয়োগ করা হয়, যেমন  বিশুদ্ধ এলাকা হিসাবে তত্ত্ব এবং টপোলজির কথা বলা যায় ।

পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিগুলি, যা বিজ্ঞানীদের গাণিতিক কৌশল অবলম্বন করে বিশ্বস্ততার সাথে পরীক্ষামূলক ফলাফলগুলির পরিমাণ মূল্যায়ন করার অনুমতি দেয় । পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে।

কম্পিউটেশনাল বিজ্ঞান বাস্তব বিশ্বে পরিস্থিতি অনুকরণ করার জন্য কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োগ করে যা গঠনগত গণিতের তুলনায় বৈজ্ঞানিক সমস্যাজনিত বিষয়গুলো খুব ভালভাবে বোঝার জন্য সাহায্য করতে পারে । সোসাইটি ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড ম্যাথম্যাটিকসের মতে, গণিতের জ্ঞান বৈজ্ঞানিক প্রবর্তনের তত্ত্ব এবং গবেষণার মতোই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।

গণিতবিদ ও দার্শনিকদের মধ্যে বিবর্তিত তত্ত্বের উত্থান এবং গণিতের ভিত্তিগুলির জন্য এটির ব্যবহারের জন্য বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আনুষ্ঠানিক যুক্তিবিজ্ঞানের গবেষণায় অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল । উল্লেখযোগ্য গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক যারা এই ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন গটলব ফ্রেজ,জিউসেপ পেয়ানো,জর্জ বুল,আর্নেস্ট জেরমেলো, আব্রাহাম ফ্রাংকেল,ডেভিড হিলবার্ট, বারট্রান্ড রাসেল এবং আলফ্রেড হোয়াইটহেড। প্যানানো গণিতের মতো বিভিন্ন স্বতন্ত্র সিস্টেমগুলি, যেমন-  জেরেমো-ফেনেকেলের সেটমার্ক পদ্ধতি এবং প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা​ব্যবস্থার পাশাপাশি গণিতের ভিত্তি প্রমাণ করার জন্য অনেকের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছিল । যাইহোক, ১৯৩১ সালে কার্ট গডেলের অসম্পূর্ণতা তত্ত্বের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বেশিরভাগ প্রচেষ্টা হ্রাস পেয়েছিল।গণিত,দর্শন ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও সাংগঠনিক যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করে। উদাহরণস্বরূপ, বুলিয়ান বীজগণিত দ্বারা সমস্ত আধুনিক কম্পিউটারগুলি কার্যকরী হয় এবং এই শাখার জ্ঞান প্রোগ্রামারদের জন্য অত্যন্ত দরকারী।

বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রগুলি সাধারণত দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, যা প্রাকৃতিক ঘটনা (জীববিজ্ঞান সহ) এবং সামাজিক বিজ্ঞান, যা মানবিক আচরণ ও সমাজের অধ্যয়ন করে । এই উভয় বিজ্ঞান গবেষণামূলক বিজ্ঞান, যার মানে তাদের জ্ঞানটি দৃশ্যমান ঘটনা এবং তার অবস্থার জন্য একই অবস্থার অধীনে কাজ করে এমন অন্যান্য গবেষকদের দ্বারা যাচাই করার জন্য সক্ষম হতে হবে ।  এছাড়াও সম্পর্কিত বিষয়গুলি যেমন আন্তঃসম্পর্কিত প্রয়োগ বিজ্ঞান হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়, যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান । এই বিভাগগুলি ছাড়াও আরও  বিশেষ বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র রয়েছে যাদেরকে অন্যান্য বৈজ্ঞানিক শাখার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে যদিও প্রায়ই তাদের নিজস্ব নামকরণ এবং দক্ষতা থাকে ।

গণিতকে একটি সাংগঠনিক বিজ্ঞান হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।এর সাথে গবেষণামূলক বিজ্ঞান (প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞান)  উভয়ের সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্য আছে। এটি পরীক্ষামূলক অনুষঙ্গের অনুরূপ যেহেতু এটি জ্ঞানের একটি ক্ষেত্রের উদ্দেশ্যমূলক,সতর্ক এবং নিয়মানুগ গবেষণার সাথে জড়িত; অভিজ্ঞতানির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে অগ্রাধিকারের ব্যবহার করে তার জ্ঞান যাচাইয়ের পদ্ধতির কারণে এটি ভিন্ন ।  সাংগঠনিক বিজ্ঞান যা পরিসংখ্যান এবং যুক্তিবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করে, পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।সাংগঠনিক বিজ্ঞানে বড় বড় অগ্রগতি  সবসময় প্রধান পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় । সাংগঠনিক বিজ্ঞান অনুমান, তত্ত্ব ও সূত্রের গঠনের জন্য অপরিহার্য।তাছাড়া কোন জিনিস কিভাবে কাজ করে (প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) এবং মানুষ কীভাবে চিন্তা করে এবং কাজ করে (সামাজিক বিজ্ঞান) উভয়েরই আবিষ্কার এবং বর্ণনার জন্য সাংগঠনিক বিজ্ঞান অপরিহার্য।

বিজ্ঞানের বিস্তৃত অর্থের বাইরেও,                   

বিজ্ঞান শব্দটি কখনও কখনও বিশেষভাবে মৌলিক বিজ্ঞান (গণিত এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) বোঝাতে ।ে । অনেক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান স্কুল বা অেনুষদ চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিভাগকে পৃথক করে দেখা হ় । তাদের প্রতিটিকে একটিা প্রিকয়োগ বিজ্ঞান হিসাবে ধরা হয় ।

Scientific fields are commonly divided into two major groups: natural sciences, which study natural phenomena (including biological life), and social sciences, which study human behavior and societies. These are both empirical sciences, which means their knowledge must be based on observable phenomena and capable of being tested for its validity by other researchers working under the same conditions. There are also related disciplines that are grouped into interdisciplinary applied sciences, such as engineering and medicine. Within these categories are specialized scientific fields that can include parts of other scientific disciplines but often possess their own nomenclature and expertise.

Mathematics, which is classified as a formal science, has both similarities and differences with the empirical sciences (the natural and social sciences). It is similar to empirical sciences in that it involves an objective, careful and systematic study of an area of knowledge; it is different because of its method of verifying its knowledge, using a priori rather than empirical methods. The formal sciences, which also include statistics and logic, are vital to the empirical sciences. Major advances in formal science have often led to major advances in the empirical sciences. The formal sciences are essential in the formation of hypotheses, theories, and laws, both in discovering and describing how things work (natural sciences) and how people think and act (social sciences).

Apart from its broad meaning, the word science sometimes may specifically refer to fundamental sciences (maths and natural sciences) alone. Science schools or faculties within many institutions are separate from those for medicine or engineering, each of which is an applied science.

রেনেসাঁসকালীন সময় থেকে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ও গবেষণার প্রচার এবং গবেষণার জন্য শিক্ষিত সমাজগুলি বিদ্যমান ছিল । প্রাচীনতম জীবিত সংস্থাটি ইতালির অ্যাক্রেডেমিয়া দে লিন্সি যা ১৬০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট জাতীয় একাডেমী কয়েকটি দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । যেমন-১৬৬০ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটির এবং ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের অ্যাকাডেমি ডি সাইন্স যাত্রা শুরু করেছিল ।

ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্সের মতো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংগঠনগুলি বিভিন্ন জাতির বিজ্ঞানীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য গঠিত হয়েছে। অনেক সরকার বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমর্থনে সংস্থাগুলিকে উৎসর্গ করেছে । বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক সংস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, আর্জেন্টিনায় ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিকাল রিসার্চ কাউন্সিল, অস্ট্রেলিয়ায় সিএসআইআরও, ফ্রান্সের সেন্ট্রাল ন্যাশনাল দে লা রিচার্স সায়েন্টিফিক, ম্যাক্স প্লাংক সোসাইটি এবং জার্মানিতে ডয়েশ ফোর্শংজেমিনসচফ্ট এবং স্পেনের সিএসআইসি অন্যতম।

বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের (Scientific literature) একটি বিশাল পরিসর প্রকাশিত হয়েছে । বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলগুলি  ডকুমেন্ট আকারে প্রকাশ করে, যা বিজ্ঞানের একটি আর্কাইভ রেকর্ড হিসাবে কাজ করে। প্রথম বৈজ্ঞানিক পত্রিকা জার্নাল দেসভভানস দর্শনশাস্ত্র অনুসরণ করে ১৬৬৫ সালে প্রকাশনা শুরু করেছিল । সেই সময় থেকে সক্রিয় সাময়িকীর মোট সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে । ১৯৮১ সালে প্রকাশ্যে প্রকাশিত বিজ্ঞানী ও কারিগরি জার্নালগুলির সংখ্যা ছিল ১১,৫০০ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল চিকিৎসা লাইব্রেরী  বর্তমানে ৫,৫১৬ জার্নালকে সূচিত করে যা জীবন বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়ের উপর নিবন্ধ রয়েছে । যদিও জার্নালগুলি ৩৯ টি ভাষায় হয়, তবুও সূচকের ১১২ শতাংশ নিবন্ধ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ।

বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক পত্রিকা একক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সেই ক্ষেত্রের মধ্যেই গবেষণা প্রকাশ করে; গবেষণা সাধারণত একটি বৈজ্ঞানিক কাগজের আকারে প্রকাশ করা হয় । আধুনিক সমাজে বিজ্ঞানের এত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে যে সাধারণভাবে বিজ্ঞানীদের কাছে কৃতিত্ব, খবর এবং যোগাযোগ করার জন্য এটি ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

বিজ্ঞানের ম্যাগাজিন যেমন নিউ সায়েন্টিস্ট, সায়েন্স এন্ড ভিই, এবং বৈজ্ঞানিক আমেরিকান অনেক বেশি পাঠকের প্রয়োজনগুলি পূরণ করে এবং গবেষণার কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার এবং অগ্রগতি সহ গবেষণার জনপ্রিয় অঞ্চলের একটি অ-টেকনিকাল সারসংক্ষেপ প্রদান করে । বিজ্ঞানের বইগুলি আরও অনেক লোকের আগ্রহের সাথে জড়িত । তাত্পর্যপূর্ণভাবে, বৈজ্ঞানিক কথাসাহিত্য রীতি, প্রাথমিকভাবে প্রকৃতির চমৎকার, পাবলিক কল্পনা এবং ধারণা প্রচার করে, যদিও তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয় ।

সাহিত্য বা আরও নির্দিষ্টভাবে কবিতার মত বিজ্ঞান ও অ-বৈজ্ঞানিক শাখার মধ্যবর্তী লিঙ্কগুলিকে তীব্রতর করার বা বিকাশের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টায় রয়্যাল লিটারারি ফান্ডের মাধ্যমে  ক্রিয়েটিভ রাইটিং সায়েন্স রিসোর্স অনেক উন্নত হয়েছে।

কর্মরত বিজ্ঞানীরা সাধারণভাবে মৌলিক ধারণাগুলির একটি সেট মঞ্জুর করেন যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন: (১) যে সকল যুক্তিপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষকদের দ্বারা শেয়ার করা হয়েছে তাদের প্রকৃত বাস্তবতা থাকতে হবে ; (২) এই উদ্দেশ্যগুলি প্রাকৃতিক আইন দ্বারা আবিষ্কৃত হতে হবে; (৩) এই আইনগুলি পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হতে পারে। বিজ্ঞানের দর্শনশাস্ত্র এই অন্তর্নিহিত অনুমানের অর্থ কি এবং সেগুলি বৈধ কিনা তা গভীর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে।

বিশ্বাস যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক বাস্তবতা হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে যা বাস্তববাদ নামে পরিচিত । এটা বাস্তবতাবাদ এর বিপরীত হতে পারে, বিজ্ঞানের সাফল্য যেমন ইলেকট্রন হিসাবে unobservable সত্ত্বার উপর নির্ভর করে না । একটি বাস্তবতাবাদ বিরোধী গঠন হল আদর্শবাদ, বিশ্বাস যে মন বা চেতনা হল সবচেয়ে মৌলিক সূত্র, এবং প্রতিটি মন তার নিজস্ব বাস্তবতা উৎপন্ন করে । একটি আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হল একটি মনের জন্য যা সত্য তা অন্য মনের জন্য সত্য কি সত্য নয় ।

বিজ্ঞানের দর্শনের মধ্যে চিন্তার বিভিন্ন স্কুল আছে । সবচেয়ে জনপ্রিয় পজিশন হচ্ছে প্রয়োগবাদ, ধারণা করা হয় যে জ্ঞানটি পর্যবেক্ষণের একটি প্রক্রিয়া দ্বারা তৈরি করা হয় এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো এই পর্যবেক্ষণ থেকে সাধারণীকরণের ফলাফল হিসাবে গণ্য। প্রয়োগবাদ সাধারণত inductivism কে অন্তর্ভুক্ত করে, একটি পজিশন যা ব্যাখ্যা করতে পারে যে সাধারণ তত্ত্বগুলি পরিমাপের সংখ্যা দ্বারা মানুষ তাকে যথাযথভাবে যাচাই করতে পারবে এবং সেইজন্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলি নিশ্চিত করার জন্য উপলব্ধ প্রামাণিক প্রমাণগুলির সীমাবদ্ধ পরিমাণ উপলব্ধ করা হয়। এটি অপরিহার্য কারণ এই তত্ত্বগুলির পূর্বাভাসের সংখ্যা অসীম, যার অর্থ হল যে কেবলমাত্র নিখুঁত লজিক ব্যবহার করে প্রমাণের সীমাবদ্ধ পরিমাণ থেকে তা জানা যাবে না । প্রয়োগবাদের অনেক সংস্করণ বিদ্যমান রয়েছে, যার মধ্যে প্রধানত বেইসিয়ানিজম এবং হাইপোথেটিকো ন্যায়ত পদ্ধতি অন্যতম ।

প্রয়োগবাদ যুক্তিবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে, অবস্থানটি মূলত ডেসকার্টেসের সাথে সম্পর্কযুক্ত , যা এই ধারণাকে ধারণ করে যে মানব বুদ্ধি দ্বারা জ্ঞান তৈরি হয় পর্যবেক্ষণের দ্বারা নয় । বিংশ শতাব্দীর দিকে জটিল যুক্তিবাদ বিজ্ঞানের বৈপরীত্যে অবস্থান নিয়েছিল তা প্রথম  সংজ্ঞায়িত হয়েছিল অস্ট্রিয়ান-ব্রিটিশ দার্শনিক কার্ল পপার দ্বারা । পপার তত্ত্ব এবং পর্যবেক্ষণের মধ্যে সংযোগের বিষয়টিকে প্রয়োগবাদ যেভাবে বর্ণনা দেয় তা পরিত্যাগ করেছিলেন । তিনি দাবি করেন যে তত্ত্বগুলি পর্যবেক্ষণ দ্বারা উৎপন্ন হয় না, তবে ঐ পর্যবেক্ষণ তত্ত্বের আলোকে তৈরি করা হয় এবং একমাত্র উপায়টি পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে যখন এটির সাথে বিরোধও একসাথে আসে ।  পপার প্রস্তাব করেছিলেন যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ল্যান্ডমার্ক হিসাবে মিথ্যাকে যাচাইয়ের সাথে যাচাইযোগ্যতাকে প্রতিস্থাপিত করা দরকার এবং পরীক্ষামূলক পদ্ধতি হিসাবে জালিয়াতির সঙ্গে ন্যায়তাকে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে ।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হল পরীক্ষামূলক এবং নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে এটি সর্বদা জালিয়াতিকে উন্মুক্ত করে দেয় । অর্থাৎ কোন তত্ত্বকে কখনোই কঠোরভাবে নির্দিষ্ট বা নিশ্চিত বলে বিবেচিত হয় না কারণ বিজ্ঞান ফ্যালিবিলিজমের ধারণাকে গ্রহণ করে।  বিজ্ঞানের দার্শনিক কার্ল পপার সুনির্দিষ্টভাবে সত্যকে থেকে নিশ্চিতকে আলাদা করেছিলেন । তিনি লিখেছেন যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সত্যের সন্ধানে গঠিত, কিন্তু এটি নিশ্চিততার সন্ধান করেনা ...মানুষের সমস্ত জ্ঞান ভ্রমপ্রবণ এবং সেইজন্য তা অনিশ্চিত।

নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খুব কমই আমাদের বোঝার মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে । মনস্তাত্ত্বিক কিথ স্ট্যানোভিচের মতে, বিপ্লব শব্দটি  মিডিয়াগুলির দ্বারা অত্যধিক ব্যবহৃত হতে পারে যার ফলে জনসাধারণ কল্পনা করে যে বিজ্ঞান ক্রমাগত প্রতিটা মিথ্যাকে বলে সত্য বলে প্রমাণ করে । যদিও বিখ্যাত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যা সম্পূর্ণ পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বলে মনে করে যাকে চরম ব্যতিক্রম বলা যায় । বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন গবেষকরা গবেষণার মাধ্যমে স্নাতকোত্তর জ্ঞান অর্জন করেন; এটি অনেকটা আরোহণ করার তুলনায় লাফ দেয়া বুঝায় ।  তত্ত্বগুলি ভালোভাবে পরীক্ষা এবং যাচাই করা হয়েছে কিনা, সেইসাথে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের দ্বারা তারা স্বীকৃতি পেয়েছে কিনা তার উপর ভিত্তি করে তারা পরিবর্তিত হয় । উদাহরণস্বরূপ, সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব,  বিবর্তন তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং জীবাণু তত্ত্ব এখনও তত্ত্ব নাম বহন করে যদিও প্রথাগতভাবে এটি বাস্তবিক বলে মনে করা হয় ।  দর্শনশাস্ত্র ব্যারি স্ট্রাউড যোগ করেন যে, যদিও জ্ঞান এর জন্য সর্বোত্তম সংজ্ঞাটি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছে এবং একটি ভুলটি সঠিক হওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে । তদ্ব্যতীত, বিজ্ঞানীরা সঠিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে এমনকি সত্যের পরেও তারা তা নিয়ে সন্দেহ করবে ।  ফ্যাল্লিবিলিস্ট সি.এস. পিয়ারস যুক্তি দেন যে তদন্তটি সঠিক সন্দেহ সমাধানের জন্য সংগ্রাম এবং কেবল নিছক দ্বন্দ্বপূর্ণ, মৌখিক বা অতিপ্রাকৃত সন্দেহের ফলশ্রুতি । কিন্তু অনুসন্ধানকারীকে সাধারণ জ্ঞানের পরিবর্তে প্রকৃত সন্দেহ অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে । তিনি মনে করেন যে সফল বিজ্ঞানগুলি কোন একক শৃঙ্খলার অনুভূতিতে বিশ্বাস করে না (তারা দুর্বলতম লিঙ্কের চেয়ে শক্তিশালী নয়) কিন্তু একত্রে সংযুক্ত বহুবিধ এবং বিভিন্ন আর্গুমেন্টের ক্যাবলের সাথে তারা যুক্ত থাকে ।

এটি গবেষণায় বা অনুমানমূলক একটি ক্ষেত্র যা  বিজ্ঞান হিসাবে বৈধতা দাবি করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও  তারা বিজ্ঞানের মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হবে না কখনও কখনও তাদেরকে ছদ্মবিজ্ঞান, fringe বিজ্ঞান, বা জাঙ্ক বিজ্ঞান হিসাবে উল্লেখ করা হয়।  পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান cargo cult science শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাদের ক্ষেত্রে যে গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে তারা বিজ্ঞানের কাজ করছেন কারণ তাদের কার্যক্রমগুলিতে বিজ্ঞানের বাহ্যিক চেহারা রয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নির্গত সততার অভাব রয়েছে যার ফলে তাদের ফলাফল অক্ষরে অক্ষরে মূল্যায়ন করা যায় ।  বিভিন্ন ধরণের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন হাইপ থেকে জালিয়াতি পর্যন্ত এই বিভাগগুলির মধ্যে পড়তে পারে ।

বৈজ্ঞানিক বিতর্কে সকল পক্ষের উপর রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত পক্ষপাতের একটি উপাদানও থাকতে পারে। কখনও কখনও গবেষণায় একে খারাপ বিজ্ঞান হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যা গবেষণায় ভালভাবে ধারণা করা যায় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি আসলেই ভুল, অপ্রচলিত, অসম্পূর্ণ, বা বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলির সরলীকৃত ব্যাখ্যা । বৈজ্ঞানিক অপব্যবহার শব্দটি এমন পরিস্থিতিতে বোঝায় যখন গবেষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্রকাশিত তথ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন বা ভুলভাবে ভুল ব্যক্তির কাছে একটি আবিষ্কারের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন ।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে ঐতিহাসিকভাবে একটি পুরুষ-আধিপত্যের ক্ষেত্র রয়েছে যদিও এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম রয়েছে । বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নারীরা অনেক বৈষম্যের স্বীকার হয়েছিল । তবে নারীরা সমাজের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন পুরুষ-শাসিত সমাজের প্রায় সব কাজই করেছিলেন । তাছাড়া তাদের কাজের কৃতিত্বকে প্রায়ই অস্বীকার করা হত । উদাহরণস্বরূপ, ক্রিস্টিন লেড (১৮৪৭-১৯৩০) পিএইচডি প্রোগ্রামে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন সি লেড; ক্রিস্টিন কিটটি লেড ১৮৮২ সালে সব প্রয়োজনীয়তা সম্পন্ন করেছিলেন কিন্তু ১৯২৬ সালে  ডিগ্রি লাভ করেছিলেন ।  তার কর্মজীবনের পর তিনি লজিক, বীজগণিত (সত্য সারণি), রঙ দর্শন, এবং মনস্তত্ত্ব নিয়েও গবেষণা করেছিলেন । তার কাজগুলি উল্লেখযোগ্য গবেষক Ludwig Wittgenstein এবং চার্লস স্যান্ডার্স Peirce মত বিখ্যাত হয়েছিল । বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নারীদের কৃতিত্বকে গার্হস্থ্য গোলকের মধ্যে শ্রমিক হিসাবে অভিহিত করা হত ।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নারীর সক্রিয় নিয়োগ এবং লিঙ্গ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করার ফলে নারী বিজ্ঞানীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে । তবে বেশিরভাগ লিঙ্গ বৈষম্য কিছু ক্ষেত্রে থেকেই গেছে ; অর্ধেকের ও বেশি নতুন জীববিজ্ঞানী হচ্ছে নারী, আর যেখানে ৮০% পিএইচডি পুরুষ পদার্থবিদের দেওয়া হয় । নারীবাদীরা দাবি করে যে লিঙ্গ বৈষম্যের পরিবর্তে সংস্কৃতির ফলাফলের পার্থক্যই হল মূল বিষয় । কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে যে বাবা-মা মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের উপর বেশি গুরুত্বারোপ করে যার প্রভাব তাদেরকে গভীরভাবে এবং যুক্তিযুক্তভাবে প্রতিফলিত করে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে আমেরিকাতে ৫০.৩% স্নাতক ডিগ্রি, ৪৫.৬% মাস্টার ডিগ্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ক্ষেত্রে ৪০.৭% পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে । নারীদের অর্ধেকেরও বেশি তিনটি ক্ষেত্রে ডিগ্রি অর্জন করে, যেমন- মনোবিজ্ঞানে (প্রায় ৭০%), সামাজিক বিজ্ঞানে (প্রায় ৫০%) এবং জীববিজ্ঞানে (প্রায় ৫০-৬০%)। যাইহোক, যখন শারীরিক বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, গণিত, প্রকৌশল এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান আসে, তখন মহিলাদের অর্ধেকেরও কম ডিগ্রি অর্জন করে ।  যাইহোক, লাইফস্টাইল পছন্দের বিষয়টি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে ।  কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য জনিত সমস্যাগুলির কারণে ছোট শিশুদের সঙ্গে মেয়েদের বয়স ২৮% কম থাকে,  এবং গ্র্যাজুয়েট স্কুলের কোর্সে ছাত্রীদের স্নাতক আগ্রহের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়, যদিও তাদের পুরুষ সহকর্মীদের ক্ষেত্রে তা অপরিবর্তিত রয়ে যায় ।

বিজ্ঞান নিয়ে জনসচেতনতা ,যোগাযোগের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক, বিজ্ঞান উৎসব, নাগরিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান আউটরিচ,গণ বিজ্ঞান, এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞানের মতো জনসাধারণ এবং বিজ্ঞান / বিজ্ঞানীর মধ্যে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ডগুলি উন্নত করা হয়েছে।

বিজ্ঞান নীতি হচ্ছে জনসাধারণের নীতির সাথে সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র যা বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের আচরণকে প্রভাবিত করে তাছাড়া গবেষণা তহবিল সহ অন্যান্য জাতীয় নীতির লক্ষ্যসমূহ যেমন বাণিজ্যিক পণ্য উন্নয়ন, অস্ত্র উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ উন্নত করার জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন পর্যবেক্ষণ অন্যতম । বিজ্ঞান নীতি জনসাধারণের নীতিগুলি উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং ঐক্যমত্য প্রয়োগের আইনটিকেও উল্লেখ করে । এইভাবে বিজ্ঞান নীতি বিষয়গুলি এমন সমস্ত বিষয়গুলির সাথে সম্পর্কিত হয় যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করে ।  জনগণের নীতিমালা অনুযায়ী বিজ্ঞানের নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য হল জনগণের কল্যাণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জনসাধারণের জন্য কিভাবে সর্বোত্তমভাবে সেবা প্রদান করে তা বিবেচনা করা ।

রাষ্ট্রীয় নীতিমালা হাজার হাজার বছর ধরে জনকল্যাণ ও বিজ্ঞানকে আর্থিকভাবে প্রভাবিত করেছে, কমপক্ষে মোহিস্টদের সময় থেকে যারা  হান্ড্রেড স্কুল অফ থট দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, এবং চীনে Warring রাজ্যের সময় রক্ষণাত্মক দুর্গসমূহের অধ্যয়ন গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন । গ্রেট ব্রিটেনে সপ্তদশ শতাব্দীতে রয়্যাল সোসাইটির সরকারি অনুমোদনটি একটি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দিয়েছিল যা আজকের দিনেও বিদ্যমান । বিজ্ঞানের পেশাদারিত্ব উনিশ শতকে শুরু হয়েছিল এবং  বৈজ্ঞানিক সংস্থার সৃষ্টি দ্বারা আংশিকভাবে সক্রিয় করা হয়েছিল । যেমন-জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমী, কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউট, এবং তাদের নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির রাষ্ট্রীয় তহবিলের মাধ্যমে পরিচালিত হত । পাবলিক পলিসি শিল্প গবেষণা জন্য পুঁজি সরঞ্জাম এবং বৌদ্ধিক অবকাঠামোর জন্য যে তহবিল দরকার তা গবেষণা ফান্ডের মাধ্যমে বা ঐ সংস্থাকে কর প্ররোচনা প্রদান করার মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারেন । ভানিভার বুশ ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অগ্রদূত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের পরিচালক ১৯৪৫ সালের জুলাই লিখেছিলেন যে বিজ্ঞান সরকারের একটি সঠিক উদ্বেগের বিষয়।

অনেক বিষয় বিজ্ঞানের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদদের দ্বারা বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আর্গুমেন্টগুলি ব্যবহার করার ফলে । খুব বিস্তৃত সাধারণীকরণের হিসাবে অনেক রাজনীতিক নিশ্চয়তা এবং সত্য খোঁজেন আর বিজ্ঞানীরা সাধারণত সম্ভাব্যতা এবং caveats অফার করেন । যাইহোক,  রাজনীতিবিদদের দ্বারা গণমাধ্যম শোনার সামর্থ্য প্রায়ই জনসাধারণের দ্বারা বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি বোঝার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে । উদাহরণ হিসাবে যুক্তরাজ্যের এমএমআর ইস্যুতে সৃষ্ট বিতর্ককে অন্তর্ভুক্ত করা যায় । ১৯৮৮ সালে সরকারী মন্ত্রী এডউইন কুরিয়েকে জোর পূর্বক পদত্যাগের জন্য বাদ্য করা হয়েছিল কারণ তিনি প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে ব্যাটারিজাত ডিমকে সালমোনেলা দিয়ে দূষিত করা হয়েছিল ।

জন হরগান, ক্রিস মুনে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গবেষকগণ বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেট আর্গুমেন্টেশন পদ্ধতি (এসএএনএএম) বর্ণনা করেছেন, যেখানে কোনও প্রতিষ্ঠান বা চিন্তাধারা তাদের সমর্থিত বিজ্ঞাপনের উপর সন্দেহ করার জন্য তাদের একমাত্র লক্ষ্য করে কারণ এটি রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলির সাথে বিরোধিতা করে ।  হ্যাঙ্গক ক্যাম্পবেল এবং মাইক্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স বিয়ারজো রাজনীতিতে ব্যবহৃত বিশেষত বামপন্থী feel-good fallacies বর্ণনা করেছেন যেখানে রাজনীতিবিদরা এমন একটি পজিশন তৈরি করেন যা মানুষকে কিছু নীতি সমর্থন করার ব্যাপারে স্বাবাভিক করে তুলে , এমনকি যখন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখায় যে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই বা বর্তমান কর্মসূচিতে নাটকীয় পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই।

যদিও কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা নির্দিষ্ট সমস্যাগুলির মধ্যে গবেষণা প্রয়োগ করা হয়, আমাদের বোঝার অনেক বিষয় মৌলিক গবেষণার উদ্দীপনামূলক উদ্যোগ থেকে আসে।  এটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকে নিয়ে যায় যা পরিকল্পিত বা কখনও কখনও এমনকি কল্পনাপ্রসূত ছিল না । এই পয়েন্টি মাইকেল ফ্যারাডে দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল মৌলিক গবেষণার ব্যবহার কী? তিনি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন যে : স্যার, নতুন জন্মানো শিশুটির ব্যবহার কী? উদাহরণস্বরূপ, মানুষের চোখের রড সেলগুলোতে লাল আলোর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণায় কোন বাস্তব উদ্দেশ্য নেই বলে মনে হয়; অবশেষে, আবিষ্কার হয় যে আমাদের রাতের দৃষ্টি লাল আলো দ্বারা আক্রান্ত হয় না তবে অনুসন্ধান এবং রেসকিউ দল (অন্যদের মধ্যে) জেট এবং হেলিকপ্টার ককপিটের মধ্যে লাল আলো গ্রহণ করতে পারে ।  সংক্ষিপ্তভাবে, মৌলিক গবেষণা হল জ্ঞানের জন্য অনুসন্ধান করা এবং ফলিত গবেষণা হল এই জ্ঞান ব্যবহার করে ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানের জন্য অনুসন্ধান । অবশেষে, এমনকি মৌলিক গবেষণায় অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং এমন কিছু ধারণা রয়েছে যা বৈজ্ঞানিক ভাগ্য নির্ধারণের জন্য নির্মিত ।

যদিও প্লিনির প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কিত এনসাইক্লোপিডিয়াগুলি (৭৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) গভীর সত্যের প্রমাণ দেয়, তবে তারা অবিশ্বস্ত প্রমাণিত হয়েছিল । একটি সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রমাণের একটি পদ্ধতির দাবি করে যা অবিশ্বস্ত জ্ঞান মোকাবেলা করার জন্য গৃহীত বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। যেমন ১০০০ বছর আগে আলহাজেন (টলেমীর বিষয়ে সন্দেহ করেছিলেন), রজার বেকন, উইটেলো, জন পেখাম, ফ্রান্সিস বেকন (১৬০৫) এবং সি .এস. পিয়ারস (১৮৩৯-১৯১৪) এর মত পণ্ডিতরা অনিশ্চয়তার এই বিষয়গুলি সম্প্রদায়কে মোকাবেলা করতে দিয়েছিলেন । বিশেষ করে, প্রতারণাপূর্ণ যুক্তি প্রকাশ হতে পারে, যেমন পরিণাম দৃঢ় করা।

একটি সমস্যা তদন্তের পদ্ধতি হাজার বছর ধরে পরিচিত এবং অনুশীলনের তত্ত্ব অতিক্রম চর্চার দিকে প্রসারিত হয়েছে । উদাহরণস্বরূপ, পরিমাপের ব্যবহার, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধের নিষ্পত্তি করার একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।

জন জিমান নির্দেশ করে যে আন্তঃবৈচিত্র্যিক প্যাটার্ন শনাক্তকরণটি সকল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সৃষ্টির জন্য মৌলিক বিষয়।  জিমান দেখায় যে বিজ্ঞানীরা শত শত শতাব্দী ধরে একে অপরের পরিমাপ কিভাবে চিহ্নিত করতে পারে; তিনি এই ক্ষমতাটিকে চেতনাগত যৌক্তিকতা বলে উল্লেখ করেন। তারপর তিনি ঐকমত তৈরি করেন, ঐক্যমত্যের দিকে অগ্রসর হন এবং অবশেষে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের আশ্রয় নেন ।




#Article 89: পিংক ফ্লয়েড (10764 words)


পিংক ফ্লয়েড () ১৯৬৫ সালে গঠিত লন্ডন ভিত্তিক ব্রিটিশ রক ব্যান্ড। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীত থেকে উঠে এসে সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড হিসেবে তাদের দার্শনিক গানের কথা, সম্প্রসারিত সুরারোপ (কম্পোজিশন), ধ্বনিত নিরীক্ষণ এবং বিস্তৃত সরাসরি পরিবেশনার জন্য দলটি প্রোগ্রেসিভ রক ধারার শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড হয়ে উঠে। তারা জনপ্রিয় সঙ্গীত ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে সফল এবং প্রভাবশালী দল।

পিংক ফ্লয়েড ১৯৬৫ সালে স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী সিড ব্যারেট (গিটার ও মূল কন্ঠ), নিক মেইসন (ড্রাম), রজার ওয়াটার্স (বেস ও কন্ঠ) এবং রিচার্ড রাইট (কিবোর্ড ও কন্ঠ)- এই চারজন তরুণের সমন্বয়ে গঠিত হয়। ব্যারেটের নেতৃত্বাধীনে দলটি দুটি চার্ট তালিকাভুক্ত একক এবং দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেট্‌স অব ডউন (১৯৬৭) নামে একটি সফল আত্মপ্রকাশ অ্যালবাম প্রকাশ করে। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে, পঞ্চম সদস্য হিসেবে গিটারবাদক ডেভিড গিলমোর দলে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালের এপ্রিলে, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় ব্যারেট দল ত্যাগ করেন। ওয়াটার্স, ব্যান্ডের প্রাথমিক গীতিকার এবং ধারণাগত নেতা হয়ে ওঠেন, পাশাপাশি তাদের সমালোচনাপূর্ণ এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন (১৯৭৩), উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার (১৯৭৫), অ্যানিম্যাল্‌স (১৯৭৭), দ্য ওয়াল (১৯৭৯) এবং দ্য ফাইনাল কাট (১৯৮৩) অ্যালবামের ধারণা উদ্ভাবন করেন। ব্যান্ডটি এছাড়াও সাতটি চলচ্চিত্রের স্কোর পরিচালনা করেছিল।

ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তায় থাকার দরুন, ১৯৭৯ সালে রাইট পিংক ফ্লয়েড ত্যাগ করেন; ১৯৮৫ সালে একই পথ অনুসরণ করেন ওয়াটার্স। গিলমোর এবং মেইসন পিংক ফ্লয়েড হিসাবে নিজেদের অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে সক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রাইট পুনরায় ব্যান্ডে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর তারা তিনজন উৎপাদন করেন আরো দুটি অ্যালবাম— অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন (১৯৮৭) ও দ্য ডিভিশন বেল (১৯৯৪)— এবং পরবর্তীতে দীর্ঘকাল নিস্ক্রিয় থাকার আগ পর্যন্ত দলটির সঙ্গীত সফর অব্যাহত রাখেন। প্রায় দুই দশক সময় পরে, ২০০৫ সালে লাইভ এইট নামে বৈশ্বিক সচেতনতা অনুষ্ঠানে পিংক ফ্লয়েড হিসেবে পরিবেশন করতে ব্যারেট ব্যাতীত দলের বাকি সদস্যরা সর্বশেষবার একত্রিত হয়েছিলেন। ব্যারেট মারা যান ২০০৬ সালে, এবং রাইট ২০০৮ সালে। পিংক ফ্লয়েডের সর্বশেষ স্টুডিও অ্যালবাম দি এন্ডলেস রিভার (২০১৪), ওয়াটার্সকে ছাড়াই রেকর্ড করা হয়, এবং যা মূলত তাদের অপ্রকাশিত সঙ্গীত উপাদানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।

পিংক ফ্লয়েডকে ব্রিটিশ সাইকিডেলিয়ার শীর্ষ দলগুলির একটি বিবেচনা করা হয় এবং প্রোগ্রেসিভ রক ও চারিপার্শ্বিক সঙ্গীতের মতো ধারাগুলির বিকাশে অনুপ্রেরণা সৃষ্টির কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তাদের চারটি অ্যালবাম যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য রেকর্ড চার্টে শীর্ষে ছিল; সি এমিলি প্লে (১৯৬৭) এবং অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল, অংশ ২ (১৯৭৯) গানগুলি উভয় অঞ্চলেই দলটির একমাত্র গান হিসাবে শীর্ষ ১০টি এককের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে ব্যান্ডটি মার্কিন রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের এবং ২০০৫ সালে ইউকে মিউজিক হল অব ফেমের অর্ন্তভুক্ত হয়। ২০১৩ সালের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে এযাবৎ ব্যান্ডটির প্রায় ২৫০ মিলিয়ন রেকর্ড বিক্রি হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪.৫ মিলিয়ন কেবল যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়াও দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন এবং দ্য ওয়াল অ্যালবাম দুটি ছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ-বিক্রি হওয়া অ্যালবাম।

রজার ওয়াটার্স এবং নিক মেইসনের সাক্ষাত ঘটে, যখন তারা দুজনই রিজেন্ট স্ট্রিটে লন্ডন পলিটেকনিকে স্থাপত্যবিদ্যায় অধ্যয়ন করছেন। তারা প্রথম কিশ নোবল ও ক্লাইভ মেটক্যাফ পরিচালিত একটি দলে নোবলের বোন শেইলাঘের সঙ্গে একসঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পরবর্তী বছর স্থাপত্যবিদ্যার আরেক সতীর্থ ছাত্র, রিচার্ড রাইট তাদের সঙ্গে যুক্ত হন, এবং দলটি হয়ে ওঠে 'সিগমা সিক্স' নামক একটি সেক্সটেট। ওয়াটার্স লিডগিটার বাজান, মেইসন ড্রাম, এবং রাইট রিদম গিটার (যেহেতু তখন পর্যন্ত কিবোর্ডের উপলভ্য সীমিত ছিল)। সে সময়ে ব্যান্ডটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে পরিবেশন করতো এবং রিজেন্ট স্ট্রিটে পলিটেকনিকের ভূগর্ভস্থ অংশে বা বেসমেন্টে একটি চাঘরে মহড়া দিতো। সে সময়ে তারা সার্চার্স ব্যান্ড কর্তৃক এবং তাদের ব্যাবস্থাপক ও গীতিকার সহকর্মী কেইন চ্যাপম্যান রচিত উপাদানের মাধ্যমে সঙ্গীত পরিবেশন করতো।

১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে, ওয়াটার্স ও মেইসন লন্ডনে ক্রাউচ এন্ডের নিকট ৩৯ স্ট্যানহোপ গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে স্থানান্তরিত হন, যেটি ছিল নিকটবর্তী হর্নসি কলেজ অব আর্ট ও রিজেন্ট স্ট্রিট পলিটেকনিকের খণ্ডকালীন শিক্ষক মাইক লিওনার্ডের মালিকানাধীন। ১৯৬৪ সালের শিক্ষাবর্ষ সমাপ্তির পর মেইসন স্থানান্তরিত হন, এবং ১৯৬৪-এর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যুক্ত হন গিটারবাদক বব ক্লোসা, যিনি ওয়াটার্সকে বেস গিটার বাজাতে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। সিগমা সিক্স বিভিন্ন নামের মধ্য দিয়ে, যার মধ্যে মেগাডেথ্‌স, আব্দাবাস অ্যান্ড দ্য স্কাইমিং আব্দাবাস, লিওনার্ড'স লজার্স, স্পেকট্রাম ফাইভ অন্তর্ভুক্ত, শেষে টি সেট নামে প্রতিষ্ঠাপিত হয়। ১৯৬৪ সালে, মেটকাল্ফ ও নোবল তাদের নিজস্ব ব্যান্ডে চলে যায়, গিটারবাদক সিড ব্যারেট স্টানহোপ গার্ডেনে ক্লোসা ও ওয়াটার্সের সঙ্গে যুক্ত হন। দুই বছরের কনিষ্ঠ, ব্যারেট, ১৯৬২ সালে ক্যাম্বারওয়েল কলেজ অব আর্টসে অধ্যয়নের জন্য লন্ডনে আসেন। ওয়াটার্স ও ব্যারেট ছিল শৈশব বন্ধু। ওয়াটার্স প্রায়ই ব্যারেটর মায়ের বাড়িতে যেতেন এবং সেখানে তাকে গিটার বাজাতে দেখা যেত। ব্যারেট সম্পর্কে মেইসন বলেন: একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, যখন সকলে ঠান্ডায় আত্মসচেতন উপায়ে শিশুর মতোন হয়ে উঠত, তখন ব্যারেট অবাঞ্ছিতভাবে বাইরে বেরতো; আমাদের প্রথম সাক্ষাতের স্থায়ী স্মৃতি রয়েছে, যখন সে নিজেকে আমার সঙ্গে পরিচিত করে নিতে কিছুটা বিরক্তও হচ্ছিল।

১৯৬৩ সালের শেষের দিকে নোবল ও মেটকাল্ফ টি সেট ত্যাগ করেন, এবং ক্লোসা, গায়ক ক্রিস ডেনিসের সঙ্গে ব্যান্ডটির পরিচয় করিয়ে দেন। ডেনিস ছিলেন রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) প্রযুক্তিবিদ। ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে, ওয়েস্ট হ্যাম্পস্টেডের একটি স্টুডিওতে তারা দলটির প্রথম রেকর্ডিংয়ের সময় নির্ধারণ করে। সেখানে রাইটের এক বন্ধু তাদেরকে বিনামূল্যে কিছু বাড়তি সময় প্রাপ্তির সুযোগ করে দিয়েছিল। রাইট সে সময়ে পড়াশোনা থেকে বিরতি নিয়েছিলেন, এবং সেই অধিবেশনে তিনি অংশগ্রহণ করেন নি। ১৯৬৫ সালের প্রথম দিকে আরএএফ যখন ডেনিসকে বাহরাইনে একটি পদে নিয়োগ দেয়, তখন ব্যারেট ব্যান্ডের মুখপাত্র ছিলেন। পরবর্তী বছর, তারা লন্ডনে কেনসিংটন হাই স্ট্রিটের নিকট কাউন্টডাউন ক্লাবের একটি আবাসিক ব্যান্ড হয়ে ওঠে, যেখানে শেষ রাত থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত তারা ৯০ মিনিটের তিনটি সেট পরিবেশন করতো। এই সময়ের মধ্যে, দলের প্রয়োজনীয়তা স্বত্তে গানের পুনরাবৃত্তি হ্রাস করার লক্ষে তারা তাদের নির্ধারিত সেটসমূহ দীর্ঘ করতে অনুপ্রাণিত হতো। সে সময় ব্যান্ডটি বুঝতে পারে যে, সুরের মধ্য দিয়েই গান দীর্ঘ হতে পারে, মেইসন বলেন। বাবা-মায়ে চাপ ও কলেজ শিক্ষকের পরামর্শের পর, ক্লোসা ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্যান্ড ত্যাগ করেন এবং ব্যারেট লিড গিটারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে ব্যান্ডটি প্রথম নিজেদের 'পিংক ফ্লয়ড সাউন্ড' হিসেবে পরিচিত করে। যদিও ব্যারেট সে সময়ে টি সেট নামের অন্য আরেকটি ব্যান্ডের উপস্থিতি আবিষ্কার করেন, এবং দ্রুততার সঙ্গে ব্যান্ডের নতুন নাম তৈরি করেন। দলের নতুন নামটি পিংক অ্যান্ডারসন ও ফ্লয়েড কাউন্সিল নামে দুজন ব্লুজ সঙ্গীতশিল্পীর নামের প্রথম অংশের সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি, যাদের প্যাডমন্ট ব্লুজ রেকর্ড ব্যারেটের সংগ্রহে ছিল।

১৯৬৬ সালের দিকে, দলটি প্রধানত রিদম অ্যান্ড ব্লুজ গান মঞ্চস্থ করবে ঠিক করেছিল এবং এজন্য অগ্রিম বুকিংও পেতে শুরু করে তারা। যার মধ্যে ১৯৬৬-এর মার্চে মার্কি ক্লাবে একটি পরিবেশনা উল্লেখযোগ্য; যেখানে তারা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের প্রভাষক পিটার জেনারের নজরে আসে। জেনার, ব্যারেট ও রাইটের নির্মিত ধ্বনিত প্রভাবে অভিভূত হন, এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধু অ্যান্ড্রু কিংয়ের সঙ্গে ব্যান্ডটির ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠেন। এই জুটির সঙ্গীত শিল্পে সামান্য অভিজ্ঞতা থাকলেও ব্ল্যাকহিল এন্টারপ্রাইজেস প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কিংয়ের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ব্যয় করেন এবং ব্যান্ডের জন্য প্রায় £১,০০০ () মূল্যের নতুন যন্ত্র-সরঞ্জাম ক্রয় করেন। এই সময়ে জেনার, ব্যান্ডের নাম থেকে সাউন্ড অংশটি বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন, এইভাবে তারা পিংক ফ্লয়েড হয়ে ওঠে। জেনার ও কিংয়ের নির্দেশনার অধীনে, ব্যান্ডটি লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীত দৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে, পাশাপাশি আর অল সেইন্টস হল এবং মার্ককিউ সহ বিভিন্ন ভেন্যুতে পরিবেশন করতে থাকে। কাউন্টডন ক্লাবে পরিবেশনের সময়, ব্যান্ডটি দীর্ঘ যন্ত্রসঙ্গীত বাজানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়, এবং প্রাথমিক তবে কার্যকরীভাবে রঙিন স্লাইড ও গার্হস্থ্য আলোর ব্যবহারের মাধ্যমে অভিক্ষিপ্ত আলোক প্রদর্শনীর চর্চাও শুরু করে। জেনার ও কিংয়ের সামাজিক সংযোগগুলি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে ব্যান্ডটির অভিক্ষিপ্ত কাভারেজ লাভ করতে সহায়তা করেছিল, এবং সানডে টাইমসের একটি নিবন্ধ যেখানে বলা হয়েছে: নতুন আইটি ম্যাগাজিনটি চালু করার সময়, আরেকটি পপ দল বলে যে পিংক ফ্লয়েড পরিবশেনকালে তাদের পেছনে বিশাল পর্দায় বিচিত্র রঙের অবয়বগুলি ছড়িয়ে পাড়ার সময় কম্পান্বিত সঙ্গীত বাজিয়েছিল ... যা দৃশ্যত খুবই সাইকেডেলিক।

১৯৬৬ সালে, ব্যান্ডটি ব্ল্যাকহিল এন্টারপ্রাইজেসের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শক্তিশালী করে তোলে। জেনার ও কিংয়ের সঙ্গে ব্যান্ড সদস্যদের প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক ভাগ শেয়ারের সমান অংশীদার হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালের শেষের দিকে, তাদের সেটে আরঅ্যান্ডবি মান হ্রাস পাওয়ায় মূল ব্যারেটের অন্তর্ভুক্তি বাড়তে থাকে, যার বেশিরভাগই পরবর্তীতে তাদের প্রথম অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের পরিবেশনায় পৌনঃপুনিকতা বাড়তে থাকা স্বত্ত্বেও ব্যান্ডটি তখনো ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে নি। একটি ক্যাথলিক যুব ক্লাবে পরিবেশনার পর, এর মালিক তাদের অর্থ প্রদান করতে অসম্মতি জানিয়ে দাবি করেন যে তাদের পরিবেশনা কোনো সঙ্গীত-ই ছিল না। ব্যন্ডটির ব্যবস্থাপক যুব প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করার পরও ব্যর্থ হয়, এবং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট মালিকের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে ব্যান্ডটি লন্ডনে ইউএফও ক্লাবে চমৎকারভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যেখানে তারা ভক্তদের একটি ভিত নির্মাণ করতে শুরু করে। ব্যারেটের পরিবেশনা উৎসাহী ছিল, চারপাশে লাফানো ... পাগলামি ... তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন ... [অনুপ্রাণিত] তার বিগত সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যায় এবং যে স্থানের মধ্যে ছিল ... তা খুবই আগ্রহব্যাঞ্জক। যা অন্যদের মধ্যে কেউ করতে পারে না, লিখেছেন জীবনী লেখক নিকোলাস শ্যাফনার।

১৯৬৭ সালের দিকে, পিংক ফ্লয়েড সঙ্গীত শিল্পের মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করে। রেকর্ড কোম্পানিগুলির সঙ্গে আলোচনার সময়, আইটি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ইউএফও ক্লাবের ব্যবস্থাপক জো বয়েড এবং পিংক ফ্লয়েডের বুকিং এজেন্ট ব্রায়ান মরিসন লন্ডনের ওয়েস্ট হ্যাম্পস্টেডের সাউন্ড টেকনিক্স স্টুডিওতে একটি রেকর্ডিং অধিবেশনের আয়োজন করে। এর তিন দিন পরে, পিংক ফ্লয়েড ইএমআই রেককর্ডসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে, এবং অগ্রিম £৫,০০০ ডলার গ্রহণ করে (২০১৮-এর হিসেবে £৮৯,১০০ এর সমতুল্য )। ১৯৬৭ সালের ১০ মার্চ, ইএমআই তাদের কলাম্বিয়া লেবেলের অধীনে ব্যান্ডটির প্রথম একক গান আরনল্ড লেইন, সঙ্গে বি-পাশে ক্যান্ডি অ্যান্ড অ্যা কারেন্ট বান গানের সঙ্গে মুক্তি দেয়। দুটি ট্র্যাকই রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২৯ জানুয়ারি। আরনল্ড লেইন গানের বেশান্তর সূত্রসমূহ সে সময়ে বিভিন্ন রেডিও স্টেশন কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল; যদিও, সঙ্গীত ব্যবসার বিক্রয় পরিসংখ্যান সরবরাহকারী খুচরা বিক্রেতাদের সৃজনশীল কারচুপি থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত অনুসারে জানা যায় যে এই একক গানটি ইউকে চার্টে ২০ নম্বর স্থানে অবস্থান নিয়েছিল।

ইএমআই-কলাম্বিয়া পিংক ফ্লয়েডের দ্বিতীয় একক সি এমিলি প্লে, প্রকাশ করে ১৯৬৭ সালের ১৬ জুন। এটি আরনল্ড লেইন এককের তুলনায় কিছুটা অধিক গ্রহণযোগ্যভাবে ইউকে চার্টে ৬তম স্থান অবস্থান নিয়েছিল। ব্যান্ডটি বিবিসি'র লুক অব দ্য উইক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিল, যেখানে ওয়াটার্স ও ব্যারেট, পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং চিত্তাকর্ষকভাবে, হান্স কেলারের কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ব্যান্ডটি এছাড়াও উপস্থিত হয়েছিল বিবিসি'র জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান টপ অব দ্য পপ্‌স-এ, যেখানে বিতর্কিতভাবে শিল্পীদের নিজেদের গান গেয়ে এবং বাজিয়ে পরিবেশন করার প্রয়োজন হয়ে থাকে। যদিও পিংক ফ্লয়েড-কে আরো দুটি পরিবেশনার জন্য ফিরে আসতে হয়, আর তৃতীয় পরিবেশনার মধ্য দিয়ে, ব্যারেটের নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটতে শুরু করে, এবং প্রায় একই সময়ে প্রথম ব্যান্ডটির সঙ্গীতাচরণেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নজরে আসে। ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে, ব্যারেট নিয়মিত এলএসডি গ্রহণ করতেন, এবং এ-সম্পর্কে মেইসন বর্ণনা করেছিলেন, সাম্প্রতিক সবকিছু থেকেই সে (ব্যারেট) তখন সম্পূর্ণরূপে দূরে অবস্থান করতো।

মরিসন ও ইএমআই-এর প্রযোজক নরম্যান স্মিথ পিংক ফ্লয়েডের প্রথম রেকর্ডিং চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন, এবং চুক্তির অংশ হিসাবে, ব্যান্ডটি লন্ডনে ইএমআই স্টুডিওতে তাদের প্রথম অ্যালবাম রেকর্ড করতে সম্মত হয়। মেইসন এই সেশনটিকে ঝামেলাহীন ছিল বলে স্মরণ করেন। স্মিথ মতবিরোধ জানিয়ে উল্লেখ করেন, ব্যারেট সে সময়ে তার পরামর্শ এবং গঠনমূলক সমালোচনায় অপ্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন। ১৯৬৭ সালের আগস্টে ইএমআই-কলাম্বিয়া দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেট্‌স অব ডউন মুক্তি দেয়। অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ১৪ সপ্তাহ অতিক্রম করে ৬ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল। এক মাস পর, অ্যালবামটি টাওয়ার রেকর্ডস লেবেলের অধীনে পুনরায় মুক্তি পায়। একই সাথে পিংক ফ্লয়েড ইউএফও ক্লাবে বৃহত্তর জনসাধারণকে আকর্ষণ করে চলেছে; যদিও, ব্যারেটের মানসিক ভাঙ্গন সে সময়ে গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। দলটি প্রাথমিকভাবে ভেবেছিল যে ব্যারেটের এই অনিয়মিত আচরণ ক্ষণস্থায়ী হবে, তবে কেউ কেউ এ-ব্যাপারে ক্ষীণ আশাবাদী ছিলেন, যাদের মধ্যে জেনার ও তার সহকারী অন্তর্ভুক্ত, জুন চাইল্ড, মন্তব্য করেন যে: আমি তাকে [ব্যারেটকে] সাজঘরে খুঁজে পেয়েছি এবং সে তখন প্রায় নেই... এমন অবস্থা। ওয়াটার্স ও আমি তাকে টেনে তুলি, [এবং] মঞ্চের বাইরে নিয়ে যাই;... ব্যান্ডের বাকিরা পুনরায় বাজাতে শুরু করে এবং সিড তখন শুধু সেখানে দাঁড়িয়েই ছিলো। তার গলায় গিটার ছিল এবং তার বাহু ছাড়া অবস্থায় ছিল।

ক্রমান্বয়ে জাতীয় জ্যাজ ও ব্লুজ উৎসবে পিংক ফ্লয়েডের উপস্থিতি বাতিল করতে বাধ্য করে, পাশাপাশি অন্যান্য আনুষ্ঠানগুলিও। কিং, সঙ্গীত গগণমাধ্যগুলোয় অবগত করেন যে, ব্যারেট স্নায়বিক অবসাদে ভুগছিলেন। ওয়াটার্স মনোবিজ্ঞানী আর. ডি. লাইংয়ের সঙ্গে সিডের সাক্ষাতের আয়োজন করেন, এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যারেটের সাক্ষাত স্থির করেন, যদিও ব্যারেট তখন গাড়ি থেকেই বের হতে অসম্মতি জানান। ফোরমেন্টেরায় থাকাকালীন, স্যাম হাটের সঙ্গে, একজন চিকিৎসক যিনি আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীত ধারণায় প্রতিষ্ঠিত, ব্যারেটের দৃশ্যত কোনো উন্নতি ঘটে নি। সেপ্টেম্বরে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর ব্যান্ডটি ইউরোপে অক্টোবর মাসের দিকে কয়েকটি কনসার্ট নির্দিষ্ঠ করে। ইউএস সফরের সময়, ব্যারেটের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হয়ে ওঠে। নভেম্বর মাসে ডিক ক্লার্ক এবং প্যাট বুন অনুষ্ঠানগুলিতে উপস্থাপনের সময়, ব্যারেট তার আয়োজকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সাড়া না দিয়ে তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলে। বুনয়ের অনুষ্ঠানে সি এমিলি প্লে পরিবেশনের সময় ব্যারেট ঠোঁট মিলাতে অসম্মতি জানান। এই হতবুদ্ধিকর পর্বের পর, কিং তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে ইতি টানেন এবং অবিলম্বে তাদের লন্ডনে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ফেরার পর শীঘ্রই তারা, ইংল্যান্ড সফরের সময়  জিমি হেন্ডরিক্সের সহযোগী ছিল; যদিও, ব্যারেটের বিষণ্ণতা নেতিবাচকভাবে তাদের সফর অব্যাহত রাখতে বিঘ্ন ঘটালে, ডিসেম্বর মাসে দলটি একরকম সঙ্কট মুহূর্তে পৌঁছোয়, যখন ব্যান্ডটি তাদের লাইন-আপে নতুন একজন সদস্য যোগদান করানোর উদ্যোগ নেয়।

১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে, দলটি গিটারবাদক ডেভিড গিলমোরকে পিংক ফ্লয়েডের পঞ্চম সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করে। গিলমোর ইতোমধ্যেই ব্যারেটকে জানতেন, ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে ক্যামব্রিজ টেকে (টেকনোলজি) তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছিলেন। শিক্ষানবিশকালীন তারা দুইজন একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের সময়ে গিটার ও হারমোনিকার মাধ্যমে পরিবশেন করতেন এবং পরবর্তীতে হিচ-হাইকে আর ফ্রান্সের দক্ষিণ জুড়ে তারা পথ পরিবেশনাও (বাস্কিং) করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে, জোকার্স ওয়াইল্ড ব্যান্ডের সদস্য থাকাকালীন গিলমোর প্রথম টি সেট প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মরিসনের সহকারী, স্টিভ ও'রোর্ক, সপ্তাহে £৩০ পাউন্ডের (২০১৮-এর হিসেবে £৫,০০ এর সমতুল্য) বিনিময়ে নিজের বাড়ির উপরে একটি কক্ষে গিলমোরকে নিযুক্ত করেন, এবং ১৯৬৮ সালের জানুযারিতে, ব্ল্যাকহিল এন্টারপ্রাইজেস গিলমোরকে ব্যান্ডের নতুন; দ্বিতীয় গিটারবাদক এবং পঞ্চম সদস্য হিসেবে ঘোষণা করে। আর ব্যান্ডটি একজন অ-কর্মক্ষম গীতিকার হিসেবে ব্যারেটের সঙ্গে দল চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। জেনার মন্তব্য করেছেন: ধারণা ছিল যে ড্যাভ (ডেভিড) ... [ব্যারেটের] খামখেয়ালীর ক্ষতি পুরণ করবে এবং যখন এটি কার্যকর হবে না শুধু তখনই সিডের সাহায্য নেয়া হবে। এটা শুধু সিডকে নামমাত্র দলে জড়িত রাখার চেষ্টা। ব্যারেট হতাশা প্রকাশ করেন, যিনি আরনল্ড লেইন এবং সি এমিলি প্লে গানের পর আরো হিট গান লেখার প্রত্যাশা করেছিলেন, তার পরিবর্তে তিনি হ্যাব ইউ গট ইট ইয়েট? গানটি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিটি কর্মক্ষমতার উপর এমন কাঠামো পরিবর্তন করেছিলেন যাতে গানটি শেখা এবং অনুকরণ করা দূরহ হয়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে পিংক ফ্লয়েডের পাঁচজন সদস্যের আলোকচিত্রে, ব্যারেটকে বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন দেখা যায়।

ব্যারেটের সঙ্গে কাজ করা অবশেষে কঠিন প্রমাণিত হয়, এবং জানুয়ারিতে বিষয়টি উপসংহারে পৌছে, যখন সাউথহ্যাম্পটনে একটি পরিবশেনায় যাত্রা পথে এক ব্যান্ড সদস্য ব্যারেটকে রাখার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন। গিলমোরের মতে, এর উত্তর ছিল নাহ, আর বিরক্তি চাই না, যা ছিল পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গে ব্যারেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ব সংকেত। ওয়াটার্স পরবর্তীতে এক স্বীকারোক্তিতে জানান যে, সে আমাদের বন্ধু ছিল, কিন্তু বেশিভাগ সময় আমরা তাকে গলা টিপে ধরতে চেয়েছিলাম। ১৯৬৮ সালের মার্চের প্রথমদিকে, পিংক ফ্লয়েড, ব্যান্ডের ভবিষ্যত বিষয়ে আলোচনা করবার জন্য ব্যবসা অংশীদার জেনার এবং কিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত করে; ব্যারেট দল ছেড়ে যেতে রাজি হয়।

জেনার ও কিং, ব্যারেটকে ব্যান্ডের সৃজনশীল প্রতিভা বলে বিশ্বাস করেন, এবং তার প্রতিনিধিত্ব করতে ও পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন। মরিসন এরপর তার ব্যবসা এনইএমএস এন্টারপ্রাইজের নিকট বিক্রি করেন এবং ও'রোর্ক ব্যান্ডের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠেন। ১৯৬৮ সালের ৬ এপ্রিল, ব্ল্যাকহিল ব্যারেটের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান ঘোষণা করেন। ব্যারেটের প্রস্থানের পর, গান রচনা এবং সৃজনশীল নির্দেশনাদানের ভার অধিকাংশে ওয়াটার্সের উপর বর্তায়। প্রাথমিকভাবে, গিলমোর, দলটির ইউরোপিয় টেলিভিশনে উপস্থিতিতে ব্যারেটের কন্ঠে মুকাভিনয় করেন; যদিও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কিটে বাজানোর সময়, তারা ওয়াটার্স ও রাইটের ইট উড বি সো নাইস এবং কেয়ারফুল উইথ দ্যাট এক্স, ইউজিন গানের মাধ্যমে ব্যারেটের গানগুলি পরিহার করেছিলেন।

১৯৬৮ সালে, পিংক ফ্লয়েড তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম অ্যা সোসারফুল অব সিক্রেট্‌স রেকর্ডের জন্য অ্যাবি রোড স্টুডিওসে ফিরে আসে। তাদের ডিস্কোগ্রাফির এই অ্যালবামটিতে ছিল ব্যারেটের চূড়ান্ত অবদান, জাগব্যান্ড ব্লুস। ওয়াটার্স তার স্বরচিত গানে উন্নয়ন ঘটাতে শুরু করে, সেট দ্য কন্ট্রোল্‌স ফর দ্য হার্ট অব দ্য সান, লেট দেয়ার বি মোর লাইট এবং কর্পোরাল ক্লেগ গানসমূহ অবদান রাখার মাধ্যমে। রাইট রচনা করেন সি-স এবং রিমেম্বার অ্যা ডে। নরম্যান স্মিথ দলটিকে তাদের স্ব-উৎপাদিত সঙ্গীত করতে উৎসাহিত করেন, এবং তারা তাদের বাড়িতেই নতুন উপাদান ডেমো রেকর্ড করতো। অ্যাবি রোডে স্মিথের নির্দেশে, তারা নিজেদের শৈল্পিক দৃষ্টি উপলব্ধ করতে রেকর্ডিং স্টুডিওর ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করে। যদিও, স্মিথ তাদের সঙ্গীতে অপ্রত্যয়ী ছিল, এবং যখন মেইসন রিমেম্বার অ্যা ডে গানে তার ড্রাম অংশ পরিবেশনে সংগ্রাম করছিল, স্মিথ তখন তার প্রতিস্থাপনের বিষয়ে এগুচ্ছিলেন। রাইট এই সেশন সম্পর্কে স্মিথের মনোভাব স্মরণ করে উল্লেখ করেন, নরম্যান দ্বিতীয় অ্যালবামের উপর ছেড়ে দিয়েছিল ... তিনি সব সময় এমনটাই ইঙ্গিত করতেন, 'আপনি বিশ মিনিট যাবৎ এই হাস্যকর শব্দ করতে পারেন না'। কেনোনা ওয়াটার্স কিংবা মেইসন সঙ্গীত পড়তে পারতেন না, অ্যালবামের শিরোনাম ট্র্যাক কাঠামো চিত্রিত করতে, তারা তাদের নিজস্ব স্বরলিপি পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। গিলমোর পরবর্তীতে তাদের পদ্ধতি সম্বন্ধে বর্ণনা করেন, একটি স্থাপত্য ডায়াগ্রামের মতো।

জুন ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, অ্যালবামটি হিপনোসিসের স্টর্ম থরগের্সন এবং অউব্রে পাওয়েল কর্তৃক নকশাকৃত একটি সাইকেডেলিক প্রচ্ছদ উপস্থাপন করে। এটি পিংক ফ্লয়েডের বেশিরভাগ অ্যালবামের মধ্যে প্রথম, যেটি হিপনোসিস নকশা করে নি। এবং এটি দ্বিতীয় বারের মতো ইএমআই তাদের একটি দলকে অ্যালবামের মোড়ক পরিকল্পনার জন্য নকশাকারীদের চুক্তিবদ্ধ করতে অনুমতি দিয়েছিল। অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ১১ সপ্তাহ অতিক্রম করে ৯ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল। রেকর্ড মিরর অ্যালবামটির সামগ্রিক অনুকূল পর্যালোচনা প্রকাশ করে, যদিও শ্রোতাদের কোনো পার্টি ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত হিসেবে এটি না শোনার আহ্বান জানান। জন পিল শিরোনাম ট্র্যাকের সরাসরি পরিবেশনা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, একটি ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মত, যেখানে এনএমই গানটিকে দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর ... [সাথে] একঘেঁয়ে হিসেবে বর্ণনা করেছে। অ্যালবামটির ইউকে মুক্তির পর দিন, পিংক ফ্লয়েড প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে হাইড পার্ক কনসার্টে পরিবেশন করে। জুলাই ১৯৬৮ সালে, তারা দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে সফর করে। সফ্ট মেশিন ও দ্য হু ব্যান্ডের সাথে এটি পিংক ফ্লয়েডের প্রথম উল্লেখযোগ্য সফর হিসেবে বিবেচিত। সেই বছরের ডিসেম্বরে, তারা মুক্তি দেয় পয়েন্ট মি অ্যাট দ্য স্কাই; যেটি সি এমিলি প্লে পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি এককের তুলনায় খুব একটা সফল ছিলো না, যা ব্যান্ডের মানি-এর পর ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ একক।

উমাগুমা মূলত তাদের পূর্বের অপ্রকাশিত কাজসমূহের প্রতিনিধিত্ব করেছে। ইএমআইয়ের হার্ভেস্ট লেবেলে একটি যুগল-এলপি (লং প্লে) হিসেবে অ্যালবামটি মুক্তি পেয়েছিল। এর প্রথম দুই সাইডে ম্যানচেস্টার কলেজ অব কমার্স এবং বার্মিংহামের মাদার্স ক্লাবে অনুষ্ঠিত সরাসরি পরিবেশনাগুলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় এলপিতে ব্যান্ডের প্রতি সদস্যের একটি করে একক গানের পরীক্ষামূলক অবদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে মুক্তির পর উমাগুমা ইতিবাচক পর্যালোচনা লাভ করে। অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ২১ সপ্তাহ অতিক্রম করে ৫ নম্বর স্থানে অবস্থান নিয়েছিল।

১৯৭০ সালের অক্টোবরে, পিংক ফ্লয়েড অ্যাটম হার্ট মাদার মুক্তি দেয়। গানটির একটি প্রাথমিক সংস্করণ জানুয়ারিতে ফ্রান্সে প্রিমিয়ার হয়েছিল, কিন্তু রন গীসিন মতানৈক্যের ভিত্তিতে শব্দ সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানায়। গীসিন স্কোর উন্নতির জন্য খাটতে শুরু করেন, কিন্তু ব্যান্ডের ক্ষুদ্র সৃজনশীল ইনপুটের কারণে উৎপাদন কিছুটা অসুবিধাজনক ছিল। গীসিন, শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেন জন আলদিসের সাহায্যে, যিনি ছিলেন রেকর্ডে কয়ার পরিবেশনের জন্য নিযুক্ত পরিচালক। স্মিথ, নির্বাহী প্রযোজকের কৃতিত্ব অর্জন করেন, এবং অ্যালবামটি ব্যান্ডের ডিস্কোগ্রাফিতে তার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবদান হিসেবে চিহ্নিত হয়। গিলমোর বলেন এটি ছিলো বলার পরিস্কার উপায় যে তিনি কিছুই ... করেন নি। ওয়াটার্স অ্যাটম হার্ট মাদার-এর সমালোচনা করেছিলেন, দাবী জানান যে, এটি ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলা হলে এবং কখনোই আর কাউকে শুনতে না হলে তিনি তাই পছন্দ করতেন। গিলমোরও অ্যালবামটি সম্পর্কে সমধারণা পোষণ করেন এবং একবার এটিকে, আবর্জনার স্তুব হিসাবে বর্ণনা করে বলেন: আমি মনে করি আমরা সে সময়ে কিছুটা নিরূদ্যম ছিলাম। পিংক ফ্লয়েডের প্রথম নম্বর ১ অ্যালবাম, অ্যাটম হার্ট মাদার ব্রিটেনে ব্যাপকভাবে সফল হয়েছিল, এবং ইউকে চার্টে ১৮ সপ্তাহ অতিক্রম করেছিল। এটি ১৯৭০ সালের ২৭ জুন, বাথ উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল।

পিংক ফ্লয়েড, ১৯৭০ সালের দিকে ব্যাপকভাবে আমেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে সঙ্গীত সফর করে। ১৯৭১ সালে, পিংক ফ্লয়েড মেলোডি মেকার নামে পাঠকের একটি জনমত সমীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান নিয়েছিল, এবং প্রথমবারের মত তারা মুনাফা তৈরি করতে সক্ষম হয়। মেইসন ও রাইট বাবা হন এবং লন্ডনে বাড়ি ক্রয় করেন। অন্যদিকে গিলমোর তখনো একা, যখন এসেক্সে একটি ১৯-শতকের খামারে স্থানান্তরিত হন তিনি। ওয়াটার্স ইসিলিংটনে তার বাড়িতে বাগানের পেছনে একটি রূপান্তরিত টুল ছাউনির হোম রেকর্ডিং স্টুডিও স্থাপন করেন।

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে, তাদের অ্যাটম হার্ট মাদার সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর পিংক ফ্লয়েড নতুন উপাদান তৈরির জন্য কাজ শুরু করে। একটি কেন্দ্রীয় ভাবনাবিহীন তারা কয়েকটি অনুৎপাদিত পরীক্ষার চেষ্টা চালায়। প্রকৌশলী জন ল্যাকি বর্ণনা করেছেন, যে প্রায়ই এই সেশন বিকালে শুরু হয়ে পরদিন ভোরে সমাপ্ত হত, যে সময়ে কিছুই পাওয়া [সম্পন্ন করা] যাচ্ছিল না। তখন তাদের লেবেল ব্যবস্থাপককে দুই বোতল ওয়াইন এবং দুইটি জয়েন্ট সহকারে দেখা যাওয়া ব্যতীত তখন তাদের কোনো রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল না। ব্যান্ডটি প্রাথমিক শব্দ বা গিটার রিফের ওপর কাজ করে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। এছাড়াও তারা এয়ার স্টুডিওসে কয়েকদিন সময় ব্যয় করেছিল। গৃহস্থ বস্তুর বিভিন্ন সমন্বিত ব্যবহারে সঙ্গীত তৈরি করার প্রচেষ্টা চালায় তারা। একটি প্রকল্প যা দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন (১৯৭৩) এবং উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার (১৯৭৫) অ্যালবামে প্রতিয়মান।

১৯৭১ সালের অক্টোবরে মুক্তিপ্রাপ্ত, মেডল শুধুমাত্র দলের সঙ্গে বাস্তব কার্যকরী সংমিশ্রণের মাধ্যমে লিড গিটারবাদক ডেভিড গিলমোরের উত্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি জোরাল এবং সঠিকভাবে দলটিকে পুনরায় সমৃদ্ধ করে তোলে, লিখেছেন রোলিং স্টোন-এর জ্যান-চার্লস কোস্টা। এনএমই মেডল-কে একটি অসাধারণ ভাল অ্যালবাম মন্তব্য করে, একোস গাওয়ার জন্য তারা রীতিমত কঠোর পরিশ্রম করেছিল। যদিও, মেলোডি মেকার'র মাইকেল ওয়াট্‌স এটিকে অনভিভূত হিসাবে আবিষ্কার করে বলেন, অ্যালবামটি একটি অস্তিত্বহীন চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাক, এবং পিংক ফ্লয়েডকে তাচ্ছিল্ল সুরে বলেন অধিক শব্দ এবং উন্মত্ততা, যা কোনো কিছুই প্রকাশ করে না। মেডল ১৯৬০-এর দশকের শেষে ব্যারেট-প্রভাবশালী দল এবং উদীয়মান পিংক ফ্লয়েডের মধ্যে একটি অর্ন্তবর্তীকালীন অ্যালবাম হিসাবে বিবেচিত। অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ৮২ সপ্তাহ অতিক্রম করে ৩ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল।

পিংক ফ্লয়েড ১৯৭২-এর মে থেকে ১৯৭৩-এর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন রেকর্ড করেছিল, অ্যাবি রোডে ইএমআই কর্মচারী প্রকৌশলী অ্যালান পারসন্স সহযোগে। শিরোনামটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিবর্তে বরং খ্যাপামিরর ইঙ্গিত। যুক্তরাজ্য, জাপান, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ সফরের সময় ব্যান্ডটি ডার্ক সাইড-এর উপাদান রচনা এবং পরিমার্জিত করেছিল। প্রযোজক ক্রিস থমাস পারসন্সকে সহায়তা করেন। অ্যালবাম মোড়কিকরণনের নকশা করেছিল হিপনোসিস, যেটি জর্জ হার্ডির কিংবদন্তি প্রতিসরণধর্মী প্রিজম নকশা অন্তর্ভুক্ত। থরগের্সনের ডার্ক সাইড অ্যালবাম প্রচ্ছদে একতার প্রতিনিধিত্বকারী সাদা আলোর একটি রশ্মি একটি প্রিজমের ভেতর অতিবাহিত হচ্ছে, যা সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে। ফলপ্রসুত রঙিন আলোর প্রতিসৃত রশ্মি একতা বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ছে বলে প্রতীয়মান, অর্থাৎ এখানে একতা অনুপস্থিত। ওয়াটারস অ্যালবামের গানের একমাত্র লেখক।

মার্চ ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, এই এলপি ইউকে এবং সমগ্র ইউরোপ চার্ট জুড়ে তাৎক্ষণিক সাফল্য লাভ করে, এবং সমালোচকদের কাছ থেকে উত্সাহী প্রতিক্রিয়া অর্জন করে। রাইট ব্যতীত পিংক ফ্লয়েডের সকল সদস্য দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন-এর সংবাদ লিপি বর্জন করেছিল, কারণ সে সময় পর্যন্ত তাদের একটি কোয়াড্রোফোনিক মিশ্রণ সম্পন্ন হয় নি বলে, এবং নিম্ন-মানের স্টেরিও পিএ সিস্টেমের মাধ্যমে অ্যালবামের উপস্থাপন অপর্যাপ্ত ছিল বলে তারা মনে করেছিল। মেলোডি মেকারর রায় হোলিংওর্থ অ্যালবামটির প্রথম অংশকে একচেটিয়া বিভ্রান্তি ... [এবং] অনুসরণ করা জটিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তবে দ্বিতীয অংশের প্রশংসা করে লিখেছেন: গান, শব্দ ... [এবং] ছন্দ একেবারে নিরেট ... স্যাক্সফোন যেনো বাতাসে আঘাত করেছে, [আর] ব্যান্ডটি- রক অ্যান্ড রোল। রোলিং স্টোনর লয়েড গ্রসম্যান এটিকে বর্ণনা করেছে, এটি একটি বিন্যাস্ত এবং ধারণাগত সমৃদ্ধ অ্যালবাম যেটি শুধুমাত্র আমন্ত্রণই জানায় না, বরং এর সঙ্গে একাত্ম হতেই দাবী জানায়।

১৯৭৩ সালের মার্চ জুড়ে, দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন পিংক ফ্লয়েডের মার্কিন সফরের অংশ হয়ে ওঠে। এটি সর্বকালের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিকভাবে সফল রক অ্যালবামের একটি; চৌদ্দ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলবোর্ড চার্টে তালিকাধীন থেকে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৫ মিলিয়ন কপি বিক্রির সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে ইউএস চার্টে ১ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল। ব্রিটেনে, অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ৩৬৪ সপ্তাহ অতিক্রম করে ২ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল। ডার্ক সাইড বিশ্বের তৃতীয় সেরা-বিক্রিত অ্যালবাম, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ-বিক্রিত অ্যালবামে তালিকায় একুশতম স্থানে অবস্থান করে নেয়।  অ্যালবামটির সাফল্য পিংক ফ্লয়ডের সদস্যদের জন্য বিপুল সম্পদ নিয়ে আসে। ওয়াটার্স এবং রাইট বড় কান্ট্রি হাউস ক্রয় করেছিলেন অন্যদিকে মেইসন হয়ে উঠেছিলেন দামি গাড়ি সংগ্রাহক। মার্কিন রেকর্ড কোম্পানি, ক্যাপিটল রেকর্ডসের সঙ্গে তাদের মোহমুক্তির পর, পিংক ফ্লয়েড এবং ও'রুরকে কলাম্বিয়া রেকর্ডসের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন, যারা তাদের $১,০০০,০০০ (US$ in  dollars) ডলারের অগ্রিম রেকর্ড সম্মানী প্রদান করে। ইউরোপে, তারা হার্ভেস্ট রেকর্ডস কর্তৃক প্রতিনিধিত্ব শুরু করে।

যুক্তরাজ্যে ডার্ক সাইড পরিবেশনার সফর শেষে, ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি পিংক ফ্লয়েড স্টুডিওতে ফিরে আসে তাদের নবম স্টুডিও অ্যালবাম উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার-এর কাজ শুরু করতে। পারসন্স তাদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, মূলত তার অ্যালান পারসন্স প্রকল্প সফল হয়ে উঠতে শুরু করায়। তাই ব্যান্ডটি ব্রায়ান হ্যামফ্রিসের স্মরণাপন্ন হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে, নতুন উপাদান রচনা তাদের পক্ষে জটিল হয়ে উঠেছিল; দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন-এর সাফল্য পিংক ফ্লয়ডকে কিছুটা শারীরিক ও মানসিকভাবে নিষ্কশিত করে। রাইট পরবর্তীতে এই সেশনটিকে প্রাথমিকভাবে একটি কঠিন সময়ের মধ্যে পতন বলে বর্ণনা করেছিলেন, এবং ওয়াটার্স নিজেদেরকে অসরল মন্তব্য করেছিলেন। গিলমোর ব্যান্ডের বিদ্যমান উপাদান উন্নয়নে অধিক আগ্রহী ছিলেন। অসমর্থিত বিয়ে মেইসনকে সাধারণ অসুবিধার মধ্যে রেখে তার মধ্যে উদাসীন অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল, উভয় কারণের ফলে তার ড্রাম পরচিালনার ক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটেছিল।

সৃজনশীলতার অভাব সত্ত্বেও, কয়েক সপ্তাহ পরে ওয়াটার্স দলের কাছে একটি নতুন ধারণার দৃষ্টিগোচর করতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালের মধ্যে, পিংক ফ্লয়েড তিনটি মূল রচনা সম্পন্ন করে, এবং তাদের ইউরোপে কনসার্টের একটি ধারাবাহিকে সেগুলো পরিবেশন করে। এই রচনাগুলি একটি নতুন অ্যালবাম শুরুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, যার উদ্বোধনী চার-নোটের গিটার ফ্রেস, গিলমোর কর্তৃক বিশুদ্ধরূপে রচিত হয়েছিল, যা ওয়াটার্সকে বারেটের স্মরণ করিয়ে দেয়। গানগুলি তাদের প্রাক্তন ব্যান্ড সদস্যের উত্থান ও পতনের একটি উপযুক্ত সারসংক্ষেপ প্রদান করে। ওয়াটার্স মন্তব্য করেছেন: কারণ আমি যতোটা সম্ভব গূঢ়ভাবে সিডের অন্তর্ধান সম্পর্কে অনির্দিষ্ট, অনিবার্য বিষাদ তুলে আনতে চেয়েছিলাম ... [যা] আমি অনুভব করেছি।

যদিও পিংক ফ্লয়েড যখন অ্যালবামে কাজ করছিল, তখন স্টুডিওতে একবার ব্যারেটের অপ্রত্যাশিত আগমন ঘটে। থরগের্সন সে ঘটনা স্মরণ করে বলেন, ব্যারেট সেখানে বসেছিল এবং স্বল্প আলাপ করেছিল, তবে সে সত্যিই যেন সেখানে ছিল না। তার চেহারায় উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন ঘটেছিল, এর মাত্রা এতো অধিক ছিল যে ব্যান্ডটি শুরুতে তাকে চিনতে ব্যার্থ হয়। ওয়াটার্স এই অভিজ্ঞতায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিল বলে জানা যায়। অধিকাংশ উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার ৫ জুলাই ১৯৭৫ সালে, নিবওর্থে একটি মুক্ত-মঞ্চ সঙ্গীত উৎসবে পরিবেশিত হয়। সেপ্টেম্বরে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যালবামটি ইউকে এবং ইউএস চার্টে ১ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল।

১৯৭৫ সালে, পিংক ফ্লয়েড ইসিলিংটনে ৩৫ ব্রিটানিয়া রো একটি বহৃতলবিশিষ্ঠ গির্জা হলের সমষ্টি ক্রয় করে এবং ভবনটিকে একটি রেকর্ডিং স্টুডিও ও সংরক্ষণাগারে রূপান্তর করে। ১৯৭৬ সালে, তারা তাদের দশম অ্যালবাম অ্যানিম্যাল্‌স-এর রেকর্ড সমাপ্ত করে, নতুন ২৪-ট্যাক স্টুডিওতে। অ্যানিম্যাল্‌স-এর ধারণাটি মূলত ওয়াটার্সের সঙ্গে সম্ভূত হয়েছিল, কিছুটা জর্জ অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্ম (১৯৪৫) রাজনৈতিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে। অ্যালবামের গানগুলি কুকুর, শূকর ও ভেড়া হিসাবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির বর্ণনা করেছে। হিপনোসিস অ্যানিম্যাল্‌স-এর মোড়কিকরণের কৃতিত্ব অর্জন করে; যদিও, ওয়াটার্স চূড়ান্ত ধারণার নকশা করেছিলেন, প্রবীণ বাটারসি পাওয়ার স্টেশনের একটি ছবি নির্বাচন করেন, যার ওপর তারা একটি উড়ন্ত শূকরের ছবি স্থাপন করেছিল।

ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যে রয়্যালটি ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের উৎস ছিল, যারা প্রতি-গানের ভিত্তিতে রয়্যালটি অর্জন করতো। যদিও, গিলমোর ডগ্‌স গানের জন্য অধিকাংশে দায়বদ্ধ ছিল, যা অ্যালবামের প্রথম দিকে প্রায় সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে। যদিও গিলমোরের প্রাপ্য ওয়াটার্সের চাইতে কম ছিল, যিনি অ্যালবামের বিপরীত পাশে তুলনামূলক ছোটো অংশের পিগ্‌স অন দ্য উইং গানে অবদান রেখেছেন। রাইট মন্তব্য করেন: এটা আংশিকভাবে আমারই ভুল ছিল যে আমি নিজের উপাদানের জন্য জোড় খাটাই নি ... কিন্তু ডেভের (ডেভিড) প্রস্তাব রাখার কিছু থাকায় সে তা করেছিল, এবং শুধুমাত্র সেখানে দুইটি জিনিসের ব্যবস্থা সে করতে পেরেছিল। মেইসন স্মরণ করে জানান: সম্পূর্ণ ধারণা রজারের ছিল, কিন্তু তিনি সত্যিই ডেভকে (ডেভিড) অনেকটা অবমূল্যায়ন করেছিলেন, এবং ভেবেচিন্তে তাকে হতাশ করে তুলেছিলেন। গিলমোর, তার প্রথম সন্তানের জন্মে বিক্ষিপ্তচিত্ত থাকায় অ্যালবামে সামান্য অবদান রেখেছিলেন। একইভাবে, মেইসন, রাইট কেউই অ্যানিম্যাল্‌স-এ ব্যাপক অবদান রাখেন নি। রাইট সে সময়ে বৈবাহিক জটিলতায় ভুগছিলেন, এবং এছাড়াও ওয়াটার্সের সঙ্গে তার সম্পর্কেরও ছিল দুর্দশা অবস্থা। অ্যানিম্যাল্‌স পিংক ফ্লয়েডের প্রথম অ্যালবাম যেখানে রাইটের একটি রচনার কৃতিত্ব অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি, পরবর্তীতে তিনি এ-বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন: অ্যানিম্যাল্‌স... নির্মাণ করবার জন্য উপভোগ্য রেকর্ড ছিল না ... যখন রজার সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করছিলেন যে তিনিই ব্যান্ডের একমাত্র লেখক ... এটি ছিল শুধুমাত্র তার কারণেই যে [আমরা] এখনও চালিয়ে যাচ্ছি ... যখন তিনি তার অহংবোধ চর্চা শুরু করেন, তার শুধু আমারই সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।

১৯৭৭ সালের জানুযারিতে মুক্তিপ্রাপ্ত, অ্যালবামটি ইউকে চার্টে ২ নম্বরে এবং ইউএস চার্টে ৩ নম্বরে অবস্থান নিয়েছিল। এনএমই অ্যালবামটির বর্ণনায় উল্লেখ করেছে, সবচেয়ে চরম, নিরবধি, মর্মভেদী এবং সঙ্গীতের নিতান্ত প্রতিমাচূর্ণকারী, এবং মেলোডি মেকারর কার্ল ডালাস বলেছেন এটি এমন এক মাধ্যমের মধ্যে বাস্তবতার অস্বাচ্ছন্দ্য স্বাদ যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরিণত হয়ে ক্রমেই ক্রিয়াশীল থাকবে।

পিংক ফ্লয়েড তাদের ইন দ্য ফ্লেশ সফরের সময় অ্যালবামের অনেক উপাদান পরিবেশন করেছে। এটি ছিল কোনো বড় স্টেডিয়ামে তাদের বাজানোর প্রথম অভিজ্ঞতা, যার আকারে প্রায়ই তাদের অস্বস্তি হয়েছিল। ওয়াটার্স প্রতিটি ভেন্যুতে একা পৌঁছাতে মুরু করলেন, পরিবেশনের পর অবিলম্বে আবার প্রস্থান করতেন। এক অনুষ্ঠান থেকে রাইট ইংল্যান্ডে ফিরে এসে ব্যান্ড ছাড়ার হুমকি দেন। মন্ট্রিয়ল অলিম্পিক স্টেডিয়ামে, শ্রোতাদের সামনের সারিতে উচ্চণ্ড ও উত্সাহী ভক্তদের এক দল ওয়াটার্সকে এত অতিষ্ঠ করেছিল যে তিনি তাদের একজনের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। সফর শেষে গিলমোরের জন্য একটি নিম্ন পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছিল, অনেকেই মনে করেছে যে ব্যান্ডটি তারা কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হলেও, নিজেদের জন্য কিছুই বাকি রাখে নি।

১৯৭৮ সালের জুলাইয়ে, অবহেলিত বিনিয়োগের ফলে আর্থিক সংকটে আবর্তীত হওয়ায়, ওয়াটার্স তাদের পরবর্তী অ্যালবামের জন্য দুটি মূল ধারণা দলের কাছে উপস্থাপন করেন। প্রথমটি ছিল ৯০-মিনিটের একটি ডেমো যার কাজের শিরোনাম ব্রিক্‌স ইন দ্য ওয়াল, এবং অন্যটি পরবর্তীতে ওয়াটার্সের প্রথম একক অ্যালবাম দ্য প্রস অ্যান্ড কন্স অব হিচ হাইকিং-এ পরিণত হতে দেখা যায়। যদিও মেইসন ও গিলমোর উভয়ই প্রথমে সচেতন ছিলেন, এবং তারা প্রথম ধারণাটিই তাদের আসন্ন অ্যালবামের জন্য নির্বাচন করেন। বব এজরিন অ্যালবামটির সহ-প্রযোজক, যিনি এই নতুন অ্যালবামের জন্য চল্লিশ-পাতার চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। এজরিন গল্পটি রচনা করেছেন কেন্দ্রীয় চরিত্র পিংক-এর ওপর ভিত্তি করে— এটি একটি ধাঁচ চরিত্র যা ওয়াটার্সের শৈশব অভিজ্ঞতা থেকে অধিকাংশে অনুপ্রাণিত, যেখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবার মৃত্যু। এই প্রথম রুপকশোভিত ইট আরো সমস্যার নেতৃত্ব দিতে থাকে; পিংক মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে এবং সঙ্গীত শিল্পের প্রতি বিষণ্ণ বোধ করে, অবশেষে একটি মেগালোমিনিয়াক অবস্থার মধ্যে তার রূপান্তর ঘটতে থাকে, যা আরো উন্নতরূপে সিড ব্যারেটের পতনের সঙ্গে আংশিকভাবে অনুপ্রাণিত। অ্যালবামের শেষে, ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী শ্রোতা হিসেবে দেখানো হয় পিংক প্রাচীরের তল বিদীর্ণ করে দেয়, আরো একবার একজন নিয়মিত এবং যত্নশীল ব্যক্তি হয়ে উঠতে।

দ্য ওয়াল রেকর্ডিংয়ের সময়, অ্যালবামে রাইটের উল্লেখযোগ্য অবদানের অভাবের কারণে ওয়াটার্স, গিলমোর এবং মেইসন ক্রমশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। গিলমোর বলেন যে রাইট অ্যালবামে কোনো মূল্যের বিশেষে অবদান রাখে নি—সে রেখেছে অতি, অতি সামান্য এবং এই কারণেই তিনি বাদ পড়েছিলেন। মেইসনের মতানুযায়ী, রিকের অবদান দ্রুত শুরু হয়, এবং কিছু না করা ছাড়াই সেশনে বসে থাকত, শুধু 'একজন প্রযোজক হওয়া ছাড়া'। ওয়াটার্স মন্তব্য করেছেন: [রাইট] রেকর্ড তৈরিতে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত ছিল না ... [এবং] এটি সকলের দ্বারা সম্মত ছিল ... [সে] হয়তো একটি দীর্ঘ সংগ্রামী হতে পরতো বা [সে] অ্যালবামটি সম্পন্ন করতে ... সম্মত হতে পারতো, [তার] সম্পূর্ণ ভাগ রাখা হতো ... কিন্তু শেষে [তিনি চাইলেন] শান্তভাবে চলে যেতে। রিক এ-বিষয়ে একমত হয়েছিলেন।

অ্যালবামটি অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল (অংশ ২) দ্বারা সমর্থিত, এবং মানি গানের পর এটি পিংক ফ্লয়েডের প্রথম একক গান যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে চার্টে শীর্ষ স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ৩০ নভেম্বর অ্যারমাবটির আনুষ্ঠানিক মুক্তির পর, দ্য ওয়াল ১৫ সপ্তাহ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড চার্টে শীর্ষ অবস্থানে, এবং যুক্তরাজ্যে চার্টে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৩ মিলিয়ন প্রত্যয়িত সংখ্যক কপি বিক্রির মাধ্যমে দ্য ওয়াল আরআইএএ-এর সর্বকালের সেরা ১০০টি অ্যালবামের তালিকায় তৃতীয় স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। অ্যালবামের প্রচ্ছদ ছিলো তাদের ইতোপূর্বের পরিমিত নকশার মধ্যে একটি, যেটি শুধুমাত্র একটি সাদা ইটের প্রাচীর এবং তাতে কোনও ট্রেডমার্ক বা ব্যান্ডের নামও নেই। এটি ব্যান্ডটির দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেটস্ অব ডউন অ্যালবামের পর আরেকটি অ্যালবাম প্রচ্ছদ যেটি হিপনোসিস নকশা করে নি।

জেরাল্ড স্কার্ফ পরবর্তী সরাসরি অনুষ্ঠান, দ্য ওয়াল সফরের জন্য অ্যানিমেশনের একটি ধারাবাহিক তৈরি করেছিলেন। তিনি মা, প্রাক্তন স্ত্রী এবং বিদ্যালয় শিক্ষক সহ কাহিনি থেকে বর্ণিত চরিত্রের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহৎ পুতুল নির্মাণ করেছিলেন। পিংক ফ্লয়েড অ্যালবামটির জন্য তাদের পরিবেশনার সময় পুতুলগুলির ব্যবহার করে। ব্যান্ডের মধ্যেকার সম্পর্ক সেখানে সব সময় কম ছিল; তাদের চারটি উইনেবেগোস একটি বৃত্তে পার্ককৃত ছিল, আর সেগুলোর দরজা কেন্দ্র থেকে দূরে মুখোমুখি অবস্থায় ছিল। ওয়াটার্স ভেন্যুতে পৌঁছানোর জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন ও ব্যান্ডের বাকিদের থেকে আলাদা হোটেলে অবস্থান করেন। রাইট একমাত্র শিল্পী হিসাবে মুনাফা লাভ করেন এবং বাকি চারজনের মধ্যে তিনি একমাত্র মুনাফা পান, যেখানে এই উদ্যোগটি প্রায় $৬০০,০০০ ডলার () হারায়।

দ্য ওয়াল ধারণাটি একটি চলচ্চিত্রের জন্ম দেয়, যেটির মূল ধারণা ছিল সরাসরি কনসার্টের ফুটেজ এবং অ্যানিমেটেড দৃশ্যাবলীর সমন্বয়ে তৈরি। তবে, কনসার্টের ফুটেজ চলচ্চিত্রে ব্যবহারের জন্য অবাস্তব হিসাবে প্রমাণিত হয়। অ্যালান পার্কার সরাসরি সম্মত হন এবং একটি ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেন। যেখানে অ্যানিমেটেড ক্রমগুলি থাকবে, কিন্তু দৃশ্যাবলী কোন প্রকার সংলাপ ছাড়াই পেশাদার অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত হবে। ওয়াটার্সের স্ক্রিন পরীক্ষা করা হলেও দ্রুত তাকে বাদ দেয়া হয় এবং তারা বব গেল্ডফকে পিংক চরিত্রের জন্য চুড়ান্ত করেন। গেল্ডফ প্রাথমিকভাবে এটি উড়িয়ে দিয়েছিলেন, এবং দ্য ওয়াল-এর কাহিনিকে বোললকস হিসাবে নিন্দা করেছিলেন। অবশেষে একটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণের প্রত্যাশায় এবং তার কাজের জন্য একটি উচ্চ পারিশ্রমিক পাবার কারণে গেল্ডফ কাজ করতে সম্মত হন। ১৯৮২ সালের মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনীর পর, পিংক ফ্লয়েড – দ্য ওয়াল ১৯৮২ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের মুক্তি পায়।

১৯৮২ সালে, ওয়াটার্স স্পেয়ার ব্রিক্‌স কাজের শিরোনামের সাথে একটি নতুন বাদ্যযন্ত্র প্রকল্পের প্রস্তাব জানায়, যা মূলত পিংক ফ্লয়েড – দ্য ওয়ালের সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম হিসাবে বিবেচিত। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সূত্রপাতের পর ওয়াটার্স দিক পরিবর্তন করে নতুন উপাদান রচনা শুরু করেন। তিনি দেখেন যে, ফকল্যাণ্ডস আক্রমণে মার্গারেট থ্যাচারের প্রতিক্রিয়া মূলত উগ্র দেশপ্রেম ও অপ্রয়োজনীয়। তিনি অ্যালবামটি তার মৃত পিতাকে উৎসর্গ করেছিলেন। ওয়াটার্স এবং গিলমোরের মধ্যে তাৎক্ষণিক বিতর্ক দেখা দেয়, গিলমোর মনে করেন দ্য ওয়াল অ্যালবামের জন্য গৃহীত পুনরাবৃত্তি গানগুলির পরিবর্তে সমস্ত নতুন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ওয়াটার্স অনুভব করেছিলেন যে গিলমোর ব্যান্ডটির গীতিকার হিসাবে সামান্য অবদান রেখেছিলেন। দ্য ওয়াল-এর অর্কেস্ট্রাল ব্যবস্থাপনার একজন অবদানকারী মাইকেল কামেন দুইজনের মধ্যকার মধ্যস্থতা করেন এবং ঐতিহ্যগতভাবে অনুপস্থিত রাইটের ভূমিকা পালন করেন। ব্যান্ডটির মধ্যে চিন্তার বৃদ্ধি ঘটে। ওয়াটার্স এবং গিলমোর স্বাধীনভাবে কাজ করছেন; যদিও, গিলমোর স্ট্রেন অনুভব করতে শুরু করেছিলেন, মাঝে মাঝে তার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে। চূড়ান্ত সংঘর্ষের পর, গিলমোরের নাম অ্যালবামের কৃতিত্ব তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়, যেহেতু ওয়াটার্সের মনে হয়েছিলো যে গীতিকবিতায় গিলমোরের অবদানের ঘাটতি ছিল।

যদিও মেইসনের সাঙ্গীতিক অবদান স্বল্প ছিল, তিনি অ্যালবামে ব্যবহারযোগ্য একটি পরীক্ষামূলক হোলোফোনিক পদ্ধতি রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময়ে মেইসনের বৈবাহিক সমস্যা চলছিলো। এবার পিংক ফ্লয়েড প্রচ্ছদ নকশার জন্য থোরজ্রেসনের সরণাপন্ন হন নি। ওয়াটার্স নিজেই প্রচ্ছদ নকশার পরিকল্পনা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে মুক্তির পর, দ্য ফাইনাল কাট সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে এক নম্বর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চার্টে ছয় নম্বর স্থানে অবস্থান নেয়। ওয়াটার্স সমস্ত গান রচনার পাশাপাশি অ্যালবামের সমস্ত সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। গিলমোরের অ্যালবামের জন্য কোনও উপাদান সে সময়ে প্রস্তুত না থাকায় তিনি ওয়াটার্সকে কিছু গান লিখতে না পারা পর্যন্ত রেকর্ডিং বিলম্ব করতে বলেছিলেন, কিন্তু ওয়াটার্স তা করতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে গিলমোর মন্তব্য করেছেন: অলসতার জন্য আমি অবশ্যই দোষী ছিলাম ... কিন্তু দ্য ফাইনাল কাট-এ কিছু খসরা ট্র্যাক রাখতে চাওয়া তার [ওয়াটার্স] উচিৎ হয় নি। রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন অ্যালবামটিকে পাঁচ তারকা প্রদান করে। যেখানে কার্ট লোডার এটি একটি অসাধারণ অর্জন ... আর্ট রকের চরম মাষ্টারপিস মন্তব্য করেন। লোডার দ্য ফাইনাল কাট-কে মূলত রজার ওয়াটার্সের একক অ্যালবাম হিসাবে বিবেচনা করেন।

১৯৮৪ সালে গিলমোর তার দ্বিতীয় অ্যালবাম, অ্যাবাউট ফেইস রেকর্ড করেন এবং জন লেননের হত্যাকাণ্ড থেকে ওয়াটার্সের সাথে তার সম্পর্ক পর্যন্ত, বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তার অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য এটি ব্যবহার করেছিলেন। পরে বলেছিলেন যে, পিংক ফ্লয়েড থেকে নিজের দূরত্ব তৈরি করতে অ্যালবামটি ব্যবহার করেছেন তিনি। খুব শীঘ্রই, ওয়াটার্স তার প্রথম একক অ্যালবাম দ্য প্রস অ্যান্ড কন্স অব হিচ হাইকিং সফর শুরু করেন। রাইট ডেভ হ্যারিসের সাথে জী গঠন করেছিলেন এবং আইডেন্টিটি অ্যালবাম রেকর্ড করেছিলেন, যা মুক্তির পরে প্রায় অপরিচিতই ছিল। ১৯৮৫ সালে আগস্টে মেইসন তার দ্বিতীয় একক প্রকাশ প্রোফাইল্‌স প্রকাম করেছিলেন।

দ্য প্রস অ্যান্ড কন্স অব হিচ হাইকিং অ্যালবাম মুক্তির পর, ওয়াটার্স প্রকাশ্যে জোর দিয়ে বলেন যে পিংক ফ্লয়েড আর পুনর্মিলন করবে না। তিনি ভবিষ্যত রয়্যালটি পারিশ্রমিক নিষ্পত্তি বিষয়ে আলোচনা করতে 'ও'রউরকের সাথে যোগাযোগ করেন। 'ও'রউরকে, মেইসন এবং গিলমোরকে বিষয়টি অবহিত করা আবশ্যক মনে করেন, ফলে ওয়াটার্স রাগ হন এবং ব্যান্ড ব্যবস্থাপক হিসাবে তাকে বরখাস্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি 'ও'রউরকের সাথে তার ব্যবস্থাপনা চুক্তি বাতিল করেন এবং পিটার রুজকে তার বিষয়গুলি পরিচালনা করার জন্য নিযুক্ত করেন। ওয়াটার্স ইএমআই এবং কলাম্বিয়াকে তার ব্যান্ড ত্যাগ করার ঘোষণা দিতে লিখেছিলেন, এবং তাদেরকে তাদের চুক্তিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করার জন্য বলেছিলেন। গিলমোর বিশ্বাস করেন যে ওয়াটার্স পিংক ফ্লয়েডের ধ্বংসের আগেই দ্রুত চলে গেছেন। ওয়াটার্স পরবর্তীতে বলেছিলেন, নতুন অ্যালবাম তৈরি না করে পিংক ফ্লয়েড চুক্তির লঙ্ঘন করবে—যার ফলে রয়্যালটি পারিশ্রমিক স্থগিত করা হবে—এবং ব্যান্ডের অন্য সদস্যরা দলের কাছ থেকে তাকে মামলা করার হুমকি দিয়ে বাধ্য করেছিল। এরপর তিনি ব্যান্ডের নিষ্পত্তি ঘটাতে এবং পিংক ফ্লয়েড নাম ব্যবহার বন্ধ করার প্রচেষ্টায় উচ্চ আদালতে গিয়েছিলেন, পিংক ফ্লয়েডকে সৃজনশীলভাবে একটি ব্যয়বহুল শক্তি ঘোষণা করে। যখন ওয়াটার্সের আইনজীবী আবিষ্কার করেন যে দলের অংশীদারত্বটি কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয় নি, তখন তিনি দলের নামের ব্যবহারে কর্তৃত্ববলে নিযেধাজ্ঞা (ভেটো) পাওয়ার চেষ্টা করতে উচ্চ অদালতে ফিরে আসেন। গিলমোর একটি সাবধানবাণীযুক্ত প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানান যে পিংক ফ্লয়েড বিদ্যমান থাকবে। গিলমোর পরে দ্য সানডে টাইমসকে বলেছিলেন: রজার একজন গর্তের কুকুর এবং আমি তার সঙ্গে লড়তে যাচ্ছি। ২০১৩ সালে ওয়াটার্স বলেছিলেন যে তিনি পিংক ফ্লয়েড নামের ব্যান্ড সদস্যের বাণিজ্যিক মূল্যের স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন এবং অন্যদের দ্বারা এর ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালে, ওয়াটার্স ব্যতীত পিংক ফ্লয়েডের প্রথম অ্যালবাম অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন-এর জন্য গিলমোর সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়োগ করতে শুরু করেছিলেন। রাইটের ব্যান্ডে পুনরায় প্রবেশের আইনি বাধা ছিল, কিন্তু হ্যাম্পস্টেডের একটি বৈঠকের পর, পিংক ফ্লয়েড রাইটকে আসন্ন অধিবেশনগুলিতে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। গিলমোর পরে বলেছিলেন যে রাইটের উপস্থিতি তাদের আইনি ও সাঙ্গীতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে, এবং পিংক ফ্লয়েড সাপ্তাহিক $১১,০০০ ডলারের বিনিময়ে রাইটকে নিযুক্ত করেছিল। রেকর্ডিং সেশন টেম্‌স নদীর পাড়ে গিলমোরের অ্যাস্টোরিয়া হাউসবোটে রেকর্ডিং শুরু হয়। গিলমোর এরিক স্টুয়ার্ট এবং রজার ম্যাকগফ সহ বেশকয়েকজন গীতিকারদের নিয়ে কাজ করলেও, অবশেষে অ্যালবামের গানগুলি লেখার জন্য এন্থনি মুরকে নির্বাচন করেছিলনে। পরবর্তীতে গিলমোর স্বীকার করেছিলেন যে প্রকল্পটি ওয়াটার্সের সৃজনশীল দিকনির্দেশনা ব্যাতীত কঠিন ছিল। মেইসন, অ্যালবামে পরিবেশনার জন্য খুব-বেশি অনুশীলন করেন নি, তিনি ড্রামের অনেক অংশ সম্পন্ন করার জন্য সেশন সঙ্গীতশিল্পীদের ব্যবহার করেছেন। পরিবর্তে তিনি অ্যালবামের সাউন্ড এফেক্টে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন।

১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন মুক্তি পায়। অ্যালবামের প্রচ্ছদ নকশা করেছেন স্টর্ম থরগের্সন, যার সৃজনশীল অন্তর্ভুক্তি দ্য ওয়াল এবং দ্য ফাইনাল কাট অ্যালবামের পর থেকে অনুপস্থিত ছিল। ওয়াটার্স ব্যান্ড ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাকে ছাড়াই, মেডেল অ্যলবামের এই প্রথম তারা অভ্যন্তরীন প্রচ্ছদে একটি দলগত আলোকচিত্র অন্তর্ভুক্ত করেছিল। অ্যালবামটি ইউকে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি তিন নম্বর অবস্থানে স্থান করে নিয়েছিল। ওয়াটার্স মন্তব্য করেছেন: আমার মনে হয়েছে এটি বেশ সাবলীল, কিন্তু বেশ চতুর জালিয়াতি ... গানগুলি সাধারণত দরিদ্রমানের ... [এবং] গিলমোরের গানগুলি তৃতীয় স্তরের। যদিও গিলমোর প্রাথমিকভাবে অ্যালবামটি ব্যান্ডের শীর্ষ ফর্মটিতে ফিরে এসেছে হিসেবে বিবেচনা করেন, রাইট ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, রজারের সমালোচনাগুলি ন্যায্য। সবমিলিয়ে এটি ব্যান্ডের অ্যালবাম নয়। কিউ ম্যাগাজিন অ্যালবামটি মূলত গিলমোরের একটি একাক অ্যালবাম হিসাবে বর্ণনা করেছে।

এয়াটার্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবর্তকদের সাথে যোগাযোগ করে অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন সফর বাতির করার চেষ্টা চালিয়েছিল এবং যদি তারা পিংক ফ্লয়েড নামটি ব্যবহার করে তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছিল। মেইসনের জামানতবিহীন ফারারি ২৫০ জিটিও ব্যবহার করে গিলমোর এবং মেইসন দুজনই সমভাবে প্রারম্ভিক খরচগুলি অর্থায়ন যোগাড় করেছিলেন। আসন্ন সফরের প্রাথমিক মহড়াগুলি অনেকটা বিশৃঙ্খল ছিল, মেইসন এবং রাইটের মহড়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজে অনেক-বেশি দ্বায়িত্ব নিয়েছেন অনুভব করে গিলমোর ইজরিনকে সাহায্য করার জন্য বললেন। পিংক ফ্লয়েড উত্তর আমেরিকা সফর সম্পন্ন করে, ওয়াটার্সের রেডিও কেএএওএসএস সফর আয়োজনও কাছাকাছি ছিল, যদিও প্রাক্তন ব্যান্ডের  পারফরম্যান্স আয়োজনের তুলনায় তা অনেক ছোট স্থানে আয়োজিত হয়েছিল। উড়ন্ত শূকর ব্যবহার করায় কপিরাইট ফির জন্য ওয়াটার্স একটি রিট জারি করেন। ওয়াটার্সের নকশা থেকে আলাদা করার জন্য পিংক ফ্লয়েড অন্তর্নিহিত অংশে পুরুষ জননেন্দ্রিয়ের একটি বড় সেট সংযুক্ত করে প্রতিক্রিয়া জানান। ২৩ ডিসেম্বরে দুইপক্ষ একটি আইনি চুক্তিতে পৌঁছেছিল; মেইসন এবং গিলমোর চিরকালের জন্য পিংক ফ্লয়েড নাম ব্যবহার করার অধিকার অর্জন করে এবং ওয়াটার্স অন্যান্য বিষয়ের মধ্যরে দ্য ওয়াল-এর একচেটিয়া অধিকার লাভ করে।

বেশকয়েক বছর ধরে পিংক ফ্লয়েড তাদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিল, যেমন লা ক্যার্রিয়া পানামেরিকানাতে চিত্রগ্রহণ ও প্রতিযোগিতা এবং ইভেন্টের উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাক রেকর্ডিং। জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে, তারা একটি নতুন অ্যালবামে কাজ শুরু করতে ব্রিটানিয়া রো স্টুডিওসে ফিরে আসে, যেখানে গিলমোর, মেইসন এবং রাইট বেশকিছুদিন ধরে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করেছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ পরে, তারা গান তৈরি শুরু করার জন্য যথেষ্ট ধারনা লাভ করেছিল। এজরিন অ্যালবামের সহ-প্রযোজনা করতে এগিয়ে আসেন এবং প্রযোজনাটি অ্যাস্টোরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়, যেখানে ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত তারা প্রায় ২৫টি ধারণা নিয়ে কাজ করে।

চুক্তিবদ্ধভাবে, রাইট সে সময়ে ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন না এবং বলেন, এটি এমন একটি বিন্দুতে পৌছেছিলো যেখানে আমি এই অ্যালবামতে কাজ করছি না। যাইহোক, তিনি এই অ্যালবামে পাঁচটি সহ-রচনার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার-এর এটি তার প্রথম পিংক ফ্লয়েড অ্যালবাম। অ্যালবামে আরেকটি গান রচনার কৃতিত্ব পান গিলমোরের ভবিষ্যত স্ত্রী পলি স্যামসন। এজরিনের মতে, হাই হোপ্‌স, যা তিনি প্রাথমিকভাবে, সমগ্র অ্যালবামটি একসঙ্গে টেনে নিয়েছিলেন, বেশকয়েকটি ট্র্যাক লিখতে সাহায্য করেছিলেন। অ্যালবামের অর্কেস্ট্রার অংশগুলি পরিচালনার জন্য তারা মাইকেল কামেনকে নিয়োগ দেয়; ডিক প্যারি এবং ক্রিস টমাসও এতে যুক্ত ছিলেন। লেখক ডগলাস অ্যাডামস অ্যালবামের শিরোনাম ঠিক করেন এবং থরগের্সন প্রচ্ছদের শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন। থরগের্সন ইস্টার দ্বীপের মোয়াই মোনোলিথ বা একপ্র্রস্তরস্তম্ভগুলি থেকে অ্যালবামেরের প্রচ্ছদ অনুপ্রেরণা অর্জন করেছেন; দুইটি মুখোমুখি মুখ মিলে একটি তৃতীয় মুখ তৈরি করে যার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন: অনুপস্থিত মুখ—পিংক ফ্লয়েডের অতীত, বাকি দুইটি সিড এবং রজারের মুখ। অ্যালবাম মুক্তির প্রতিযোগিতা এড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন, যেমনটা  অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন অ্যালবামের সময় ঘটেছে। পিংক ফ্লয়েড ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে মুক্তির সময়সীমা নির্ধারণ করে, যে সময়ে তাদের সফর শুরু হবে অ্যালবাম যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ নম্বর স্থানে পৌঁছেছিল। পাশাপাশি এটি ইউকে চার্টে ৫১ সপ্তাহ অতিবাহিত করেছিল।

২০০৯ সালের ২৯ মার্চ মিয়ামিতে সান বার্নার্ডিনো, ক্যালিফোর্নিয়ার নর্টন এয়ার ফোর্স বেসের হ্যাঙ্গারে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মহড়া দেন, মিয়ামিতে প্রায় একই রাস্তার নিযুক্ত কর্মীবৃন্দ তাদের অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন সফরে কাজ করেছিল। তারা বিভিন্ন ধরনের পিংক ফ্লয়েড পছন্দ তালিকা থেকে গান পরিবেশ্ন করে এবং পরে দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তাদের সম্পূর্ণ তালিকাটি পরিবর্তন করআ হয়। এটি ছিল পিংক ফ্লয়েডের সর্বশেষ সফর, যা ১৯৯৪ সালের ২৯ অক্টোবর সমাপ্ত হয়।

২০০৫ সালের ২ জুলাই, ওয়াটার্স, গিলমোর, মেইসন এবং রাইট লন্ডনের হাইড পার্কে লাইভ এইট কনসার্টে ২৪ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো পিংক ফ্লয়েড হিসাবে একসাথে পরিবেশন করেছেন। আয়োজক বব গেলডফ দ্বারা লাইভ এইট পুনর্মিলনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শুরুতে গিলমোরের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর, গেলডফ মেইসনকে অনুরোধ করলেন, ওয়াটার্সের সাথে যোগাযোগ করতে। প্রায় দুই সপ্তাহ পরে, ওয়াটার্স গিলমোরকে সাক্ষাতের জন্য আহবান জানায়, এবং দুই বছরের বেশি সময় পর সেই প্রথম তাদের কথোপকথন হয়। পরের দিন গিলমোর কনসার্টের বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। প্রেসের এক বিবৃতিতে, ব্যান্ডটি লাইভ এইট ঘটনার প্রসঙ্গে তাদের সমস্যাগুলির গুরুত্বহীনতার উপর জোর দেয়।

তারা লন্ডনের কনট হোটেলে তাদের সেটতালিকা তালিকাভুক্ত করেন। এরপর ব্ল্যাক আইল্যান্ড স্টুডিওসে তিন দিনের মহড়া দেন। তাদের অনুশীলন করা গানগুলির শৈলী এবং গতির বিষয়ে মতবিরোধ থাকায় সেশনগুলি সমস্যাযুক্ত ছিল; পরিবেশনার প্রাক্কালে চলমান ক্রমধারার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। পরিবেশনার শুরুতে ছিল উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার, ওয়াটার্স দর্শকদের বলেছিলেন: [এটা] বেশ আবেগপ্রবণ, আনেক বছর পরে এই তিনজনের সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়েছি, দাঁড়িয়েছি বাকিদের সাথে নিজেকে গণনা করার জন্য ... আমরা এসব করছি যারা এখানে নেই তাদের এবং বিশেষত সিডের জন্য। শেষ পর্যন্ত, গিলমোর শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানালেন এবং মঞ্চে ছেড়ে চলে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন। ওয়াটার্স তাকে ফিরে ডাকেন, এবং তারা সকলে আলিঙ্গন করেন। লাইভ এইট কনসার্টের পর সানডে সংবাদপত্রে তাদের এই আলিঙ্গনের ছবিটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। ওয়াটার্স তাদের প্রায় ২০ বছরের বিদ্বেষ সম্পর্কে বলেন: আমার মনে হয় যে ১৯৮৫ সালের পর থেকে আমাদের কেউ কোনও কৃতিত্বের জন্য আজ এখানে আসে নি ... এটি মন্দ ছিল, নেতিবাচক সময়, এবং আমি সেই নেতিবাচকতায় আমার অংশের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।

যদিও চূড়ান্ত সফরের জন্য পিংক ফ্লয়েড £১৩৬ মিলিয়ন মূল্যের চুক্তি স্থগিত করে দেয়। ওয়াটার্স পরিবেশন বাতিল না করে, এটি শুধুমাত্র একটি দাতব্য অনুষ্ঠান হওয়া উচিত বলে মনে করেছেন। তবে, গিলমোর এসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান যে পুনর্মিলন ঘটবে না: [লাইভ এইট] মগড়া আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল [যে] এটি এমন কিছু ছিল না যে আমি অনেক কিছু করতে চেয়েছিলাম ... মানুষের জীবন এবং কর্মজীবনে বিদায়ের মুহূর্তের সকল প্রকার এখানে ছিল যা তারা পরে অবরুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমি মনে করি আমি মোটামুটি পরিষ্কারভাবে বলতে পারি যে কোনও সফর বা অ্যালবামে আমাদের পুনরায় অংশ নিতে হবে না। এটা বিদ্বেষ বা এমন কিছু নয়। এটা শুধুমাত্র ... আমি সেখানে ছিলাম, আমি যা করার করেছি। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, গিলমোরের ইটালিয় সংবাদপত্র লা রেপুব্লিকার গিনো কাস্টাল্ডোর এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেছেন: ভক্তদের জন্য শোকের ধৈর্য। সংবাদটি প্রাতিষ্ঠানিক। পিংক ফ্লয়েড ব্র্যান্ড বিলুপ্ত, সমাপ্ত, নিশ্চিতভাবে মৃত। পিংক ফ্লয়েডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে গিলমোর প্রতিক্রিয়া জানায়: এটা শেষ হয়ে গেছে ... আমার যথেষ্ট করেছি। আমি ৬০ বছর বয়সী ... এখন আমার নিজের কাজ করার জন্য এটি বেশি আরামদায়ক। গিলমোর এবং ওয়াটার্স বার-বার বলেছিলেন যে তাদের পূর্বের সদস্যদের সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

ব্যারেট ২০০৬ সালের ৭ জুলাই কেমব্রিজে তার বাড়িতে ৬০ বছর বয়সে মারা যান। ২০০৬ সালের ১৮ জুলাই কেমব্রিজ ক্রিমেটোরিয়ামে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়; পিংক ফ্লয়েডের কোন সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। রাইট মন্তব্য করেছেন: সিড ব্যারেটের মৃত্যুতে ব্যান্ড খুব স্বাভাবিকভাবেই মর্মাহত এবং দুঃখিত। সিড গোড়ার দিকে ব্যান্ডের লাইন-আপের পথনির্দেশক আলো ছিল এবং একটি লিগ্যাসি রেখে যান যা অনুপ্রাণিত করা অব্যাহত রেখেছিল। যদিও ৩৫ বছর ধরে ব্যারেট অস্পষ্টতায় পড়ে গিয়েছিলেন, তবে সঙ্গীততে তার অবদানের জন্য জাতীয় প্রেস তাকে প্রশংসা করেছিল। ২০০৭ সালের ১০ মে, ওয়াটার্স, গিলমোর, রাইট এবং মেইসন লন্ডনের বার্বিনিকান সেন্টারে বারেটের শ্রদ্ধাসূচক কনসার্ট ময়াডকাপ'স লাস্ট লাফ এ পরিবেশন করেন। গিলমোর, রাইট এবং মেইসন ব্যারেটের সুরোচিতো বাইক এবং আরনল্ড লেইন এবং ওয়াটার্স তার ফ্লিকারিং ফ্লেম-এর একটি একক সংস্করণ পরিবেশন করেন করেন।

২০০৮ সারের ২৫ সেপ্টেম্বর, ৬৫ বছর বয়সে ক্যান্সারে রাইট মারা যান। তার প্রাক্তন ব্যান্ড সহচারী তার জীবন ও কাজে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিল। গিলমোর বলেন: পিংক ফ্লয়েড কে বা কী ছিল তা নিয়ে বিতর্কের সূচনায়, রিকের (রাইট) বিশাল অর্ন্তভূক্তি প্রায়শই বিস্মৃত। তিনি ছিলেন অমায়িক, নিরভিমান এবং নিভৃত কিন্তু তার গভীর বা উচ্চ ভাবপূর্ন কণ্ঠ এবং বাজানো ছিলো অত্যাবশ্যক, যা আমাদের সবচেয়ে স্বীকৃত পিংক ফ্লয়েড শব্দের ঐন্দ্রজালিক উপাদান ছিল। রাইটের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর, গিলমোর অ্যা সোসারফুল অব সিক্রেট্‌স অ্যঅলবাম থেকে রাইটের রচিত এবং গাওয়া রিমেমবার অ্যা ডে গানটি পরিবেশন করেছিলেন, রাইটের সম্মানে। কিবোর্ডবাদক কীথ এমারসন রাইটকে পিংক ফ্লয়েডের কশেরুকা হিসাবে প্রশংসা করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।

২০১০ সালের ১০ জুলাই, ওয়াটার্স এবং গিলমোর হোপিং ফাউন্ডেশনের জন্য একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে একসাথে পরিবেশন করেন। প্যালেস্টাইনের শিশুদের জন্য অর্থোপার্জন করা এই অনুষ্ঠানটি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারের কিডিংটন হলে প্রায় ২০০ জন দর্শকের উপস্থিতি ছিল। এই অনুষ্ঠানে ওয়াটার্সের ফিরে আসার বিনিময়ে, ২০১১ সালের ১২ মে লন্ডনের ওটু এরিনায় ওয়াটার্সের দ্য ওয়াল পরিবেশনায় গিলমোর কমফোর্টেবলি নাম্ব পরিবেশনা করেছিলেন, যেখানে তিনি গিটার সলো বাজানোর পাশাপাশি কোরাস গেয়েছিলেন। মেইমেসনও যোগ দেন, গিলমোরের সাথে আউটসাইড দ্য ওয়াল গানে ম্যান্ডোলিনের জন্য টাম্বোরিন বাজান।

২০১১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হোয়াই পিংক ফ্লয়েড ...? শিরোনামে পিংক ফ্লয়েড এবং ইএমআই একটি সম্পূর্ণ পুনঃপ্রকাশ প্রচারণা শুরু করেছিল। এক্সপেরিয়েন্স এবং ইমমের্শন মাল্টি-ডিস্ক মাল্টি-ফর্ম্যাট সংস্করণ সহ তাদের ব্যাক ক্যাটালগুলি পুনরায় নতুন রিমাস্টার করা সংস্করণে প্রকাশ করে। অ্যালবামগুলির রিমাস্টার করেছিলেন দ্য ওয়াল-এর সহ-প্রযোজক জেমস গাথরি। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে, পিংক ফ্লয়েড  শিরোনামে একটি সীমিত সংস্করণ ইপি প্রকাশ করেছিল, যাতে দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেট্‌স অব ডউন-এ রেকর্ড করা ছয়টি গান রয়েছে।

২০১২ সালে, প্রধানত দ্য ডিভিশন বেল অ্যালবামের সেশনগুলির সময়ে গিলমোর এবং মেইসন রাইটের সাথে তৈরি রেকর্ডিং পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেন, একটি নতুন পিংক ফ্লয়েড অ্যালবাম তৈরির জন্য। তারা নতুন অংশ রেকর্ড করতে এবং সাধারণত হারনেস স্টুডিও প্রযুক্তি-তে সাহায্য করার জন্য সেশন সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়োগ দেন। ওয়াটার্স একাজে জড়িত ছিলের না। মেইসন অ্যালবামটিকে রাইটের প্রতি শ্রদ্ধা হিসাবে বর্ণনা করেছেন: আমি মনে করি তিনি [রাইট] যা করেছেন এবং তার কাজ কীভাবে পিংক ফ্লয়েড সাউন্ডের হৃদয়ে স্বীকৃতি প্রদানের এই রেকর্ডটি একটি ভাল উপায়। পারানো সেশনে শুনতে গিয়ে, এটা সত্যিই মনে হয় যে তিনি একজন বিশেষ বাদক চিলেন যা আমাকে ঘরে ফিরিয়ে আনে।

দি এন্ডলেস রিভার ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর মুক্তি পায়। ২০১৪ সালে দ্য ডিভিশন বেল-এর ২০তম বার্ষিকী সংস্করণ প্রকাশের পর পার্লোফোন কর্তৃক পরিবেশিত এটি পিংক ফ্লয়েডে দ্বিতীয় অ্যালবাম। যদিও এটি মিশ্র পর্যালোচনা লাভ করলেও, এটি অ্যামাজন ইউকে-এর সর্বকালের সর্বাধিক প্রি-অর্ডার অ্যালবাম হয়ে উঠে, এবং বেশ কয়েকটি দেশে এটি প্রথম স্থানে অবস্থান নেয়। এটির ভাইনাল সংস্করণ ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যালবামের মধ্যে দ্রুততম বিক্রি হওয়া ইউকে ভাইনাল মুক্তি এবং ১৯৯৭ সাল থেকে দ্রুততম বিক্রি হওয়া ভাইনাল সংস্করণ ছিলো। গিলমোর দ্য এন্ডলেস রিভার-কে পিংক ফ্লয়েডের সর্বশেষ অ্যালবাম হিসেবে মন্তব্য করেন: আমি মনে করি আমরা সফলভাবে যা অর্জন করেছি তার সফলদতার অধিকার আমাদের রয়েছে ... এটি লজ্জাজনক, কিন্তু এটাই শেষ। অ্যালবামটি সমর্থন করার জন্য এর কোন সফর ছিল না, এ বিষয়ে গিলমোর মনে করেন যে রাইট ছাড়া এটি এক ধরণের অসম্ভব বিষয়। ২০১৫ সালের আগস্টে, গিলমোর পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন যে পিংক ফ্লয়েড সম্পন্ন হয়েছে এবং রাইট ছাড়া এর পুনর্মিলন করা ভুল হবে।

২০১৬ সালের নভেম্বরে, পিংক ফ্লয়েড দ্য আর্লি ইয়ার্স ১৯৬৫–১৯৭২ শিরোনামে একটি বক্সসেট মুক্তি দেয়, যেখানে আউটটেক, সরাসরি রেকর্ডিং, রিমিক্স, এবং তাদের প্রাথমিক কর্মজীবন থেকে চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত। ২০১৯ সালের নভেম্বরে এটির পরবর্তী সংস্করণ দ্য লেটার ইয়ার্স ১৯৮৭–২০১৯ প্রকাশ করা হবে, যেখানে থাকবে ওয়াটার্স পরবর্তী পিংক ফ্লয়েডের কাজের সংকলন, রাইট এবং মেইসনের বিস্তৃত অবদানসহ অ্যা মৌমানট্রি ল্যাপ্‌স অব রিজন (১৯৮৭) অ্যালবামের একটি হালনাগকৃত ও রিমিক্সকৃত সংস্করণ, এবং মূল প্রকাশ থেকে বাদ দেওয়া ট্র্যাক সহ ১৯৮৮ সালের ডেলিকেট সাউন্ড অব থান্ডার সরাসরি অ্যালবামের একটি বর্ধিত পুনঃপ্রকাশ।

২০১৮ সালে, মেইসন পিংক ফ্লয়েডের প্রাথমিক উপাদান পরিবেশনের উদ্দেশ্যে নিক মেইসন'স অ্যা সোসারফুল অব সিক্রেট্‌স নামে একটি নতুন ব্যান্ড গঠন করেন। ব্যান্ডটি স্প্যান্ডাউ ব্যালের গ্যারি কেম্প এবং দীর্ঘদিনের পিংক ফ্লয়েড সহযোগি গাই প্র্যাটকে অন্তর্ভুক্ত দলে করে। তারা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপ, এবং ২০১৯ সালে উত্তর আমেরিকা সফর করেছিল, নিউ ইয়র্ক সিটির বীকন থিয়েটারে ওয়াটার্স যখন  সেট দ্য কন্ট্রোল্‌স ফর দ্য হার্ট অব দ্য সান পরিবেশনের জন্য ভোকাল হিসেবে ব্যান্ডে যোগ দিয়েছিলেন।

যুক্তরাজ্যের প্রথম দিককার সাইকেডেলিক সঙ্গীত দলগুলির একটি হিসাবে বিবেচিত, পিংক ফ্লয়েড অগ্রদূত হিসাবে তাদের সঙ্গীতজীবন শুরু করেছিল লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীতের মাধ্যমে। কেউ-কেউ তাদের কাজকে স্পেস রক হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করে। রোলিং স্টোনের মতে: ১৯৬৭ থেকে, তারা অভ্রান্তচিত্তে সাইকেডেলিক শব্দ বিকাশে অবদান রাখছে, বিস্তৃত পরিবেশনা, উচ্চতর সুটেলাইক রচনা যা হার্ড রক, ব্লুজ, দেশাত্ববোধক, লোক এবং ইলেকট্রনিক সঙ্গীতকে স্পর্শ করেছে। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কেয়ারফুল উইথ দ্যাট এক্স, ইউজিন গানটি আর্ট রক দল হিসাবে তাদের খ্যাতি আরো বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। ব্যান্ডের ক্ষেত্রে বিবেচিত অন্যান্য ধারাগুলির মধ্যে রয়েছে পরীক্ষামূলক রক, অ্যাসিড রক, প্রোটো-প্রোগ, পরীক্ষামূলক পপ (ব্যারেটের অধীনে থাকাকালীন), এবং সাইকেডেলিক পপ। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে, গণমাধ্যমগুলি তাদের সঙ্গীতকে প্রগ্রেসিভ রক লেবেল যুক্ত করতে শুরু করেছিল। ও'নিল সার্বার পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গীত সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন:

Rarely will you find Floyd dishing up catchy hooks, tunes short enough for air-play, or predictable three-chord blues progressions; and never will you find them spending much time on the usual pop album of romance, partying, or self-hype. Their sonic universe is expansive, intense, and challenging ... Where most other bands neatly fit the songs to the music, the two forming a sort of autonomous and seamless whole complete with memorable hooks, Pink Floyd tends to set lyrics within a broader soundscape that often seems to have a life of its own ... Pink Floyd employs extended, stand-alone instrumentals which are never mere vehicles for showing off virtuoso but are planned and integral parts of the performance.

১৯৬৮ সালে রাইট পিংক ফ্লয়েডের ধ্বনিত খ্যাতি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: আমদের প্রথম ব্রিটিশ সাইকিডেলিক দল হিসাবে দেখা মুশকিল। কেনোনা আমরা কখনও নিজেদের সেভাবে দেখিনি ... সবশেষে, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা ছিলাম, কেবল মজা করে বাজিয়েছিলাম ... গানের কোনও বিশেষ রূপের মধ্যে আবদ্ধ ছিলাম না, আমরা যা চেয়েছিলাম তা করতে পারতাম ... দৃঢ়ভাবে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলাম। ওয়াটার্স ব্যান্ডের প্রাথমিক শাব্দিক উৎপাদন সম্পর্কে কম উৎসাহী মূল্যায়ন জানিয়েছেন: এ সম্পর্কে 'মহান' কিছুই ছিল না। আমরা হাস্যকর ছিলাম। আমরা অকেজো ছিলাম। আমরা মোটেও বাজাতে পারতাম না তাই আমেদের নির্বোধ এবং 'পরীক্ষামূলক' কিছু করতে হয়েছিল... সিড ছিল প্রতিভাবান, তবে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারস্টেলার ওভারড্রাইভ বাজাতে ফিরে যেতে চাই না। প্রচলিত পপ গঠন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, পিংক ফ্লয়েড ছিল ১৯৭০-এর দশকে প্রোগ্রেসিভ রক এবং ১৯৮০-এর দশকে পরিবেষ্টিত সঙ্গীতের উদ্ভাবক।

রোলিং স্টোন-এর সমালোচক অ্যালান ডি পেরনা গিলমোরের গিটারের কাজকে পিংক ফ্লয়েডের শব্দের সাথে অবিচ্ছেদ্য বলে প্রশংসা করেছিলেন, এবং তাকে ১৯৭০-এর দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গিটারবাদক হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, হেন্ডরিক্স এবং ভ্যান হ্যালেনের মধ্যে অনুপস্থিত সংযোগ। রোলিং স্টোন তাকে সর্বকালের ১৪তম শেষ্ঠ গিটারবাদক হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২০০৬ সালে, গিলমোর তার কৌশল সম্পর্কে বলেছিলেন: [আমার] আঙ্গুলগুলি স্বতন্ত্র শব্দ করে ... [তারা] খুব বেগবান নয়, তবে আমি মনে করি আমি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্তসক্ষম ... আমি যেভাবে সুরগুলি বাজিয়েছি তা হ্যাঙ্ক মারভিন এবং দ্য শ্যাডো-এর সুরের সাথে সংযুক্ত। গিলমোরের সামর্থ বা সৌন্দর্যের ত্যাগ ছাড়াই নিজেকে প্রকাশ করার জন্য সবচেয়ে কম নোট ব্যবহারের ক্ষমতা জ্যাজ ট্রাম্পটার মাইলস ডেভিসের তুলনায় অনুকূল বিবেচিত।

২০০৬ সালে, গিটার ওয়ার্ল্ড-এর লেখক জিমি ব্রাউন গিলমোরের গিটারের শৈলীকে সরল, হিউজ-সাউন্ডিং রিফস; ঔদরিক, সু-গতিযুক্ত সলো এবং সমৃদ্ধ, পরিবেষ্টিত কর্ডাল টেক্সচারের দ্বারা চিহ্নিত বলে বর্ণনা করেছিলেন। ব্রাউনের মতে, মানি, টাইম এবং কমফোর্টেবলি নাম্ব গানে গিলমোরের সলো কুয়াশার মাধ্যমে লেজার রশ্মির মতো মিশ্রণ ভেদ করতে সক্ষম। ব্রাউন টাইম গানটিকে কেবল বাচনভঙ্গি এবং অনুপ্রেরণা বিকাশের একটি মাস্টারপিস হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন ... গিলমোর তার প্রাথমিক ধারণাটি নিয়ে নিজের গতিতে বাজিয়ে গেছেন। ব্রাউন গিলমোরের বাচনভঙ্গিকে স্বজ্ঞাত এবং সম্ভবত লিড গিটারবাদক হিসাবে এটিই তার সেরা সম্পদ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। নিজের স্বাতন্ত্র স্বর অর্জন করার প্রসঙ্গে গিলমোর ব্যাখ্যা করেছেন: আমি সাধারণত একটি ফাজ বাক্স, একটি বিলম্ব এবং একটি উজ্জ্বল ইকিউ সেটিং ব্যবহার করি ... গাওয়ার গতি ধরে রাখতে ... প্রতিক্রিয়া প্রান্তিকের কাছাকাছি—আপনাকে উচ্চস্বরে বাজাতে হবে। এটি বাজানো আরো মজাদার ... যখন বাঁকানো নোটগুলি আপনার কাছে একটি রেজার ব্লেডের মতো ঠিক টুকরো টুকরো হয়ে ওঠে।

পুরো কর্মজীবন জুড়ে, পিংক ফ্লয়েড তাদের শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিল। তাদের দ্বিতীয় একক, সি এমিলি প্লে লন্ডনের কুইন এলিজাবেথ হলে ১২ মে ১৯৬৭ সালে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরিবেশনের সময়, ব্যান্ডটি প্রথমে অ্যাজিমুথ কো-অর্ডিনেটর নামে পরিচিত একটি প্রাথমিক চতুষ্কোণ যন্ত্রের ব্যবহার করেছিল। যন্ত্রটিতে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিলো, যা সাধারণত রাইটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত এবং ব্যান্ডের প্রশস্ত শব্দ, রেকর্ড কৃত টেপগুলির সাথে মেলাতে, অনুষ্ঠানস্থানের প্রায় ২৭০ ডিগ্রি অংশে শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম ছিল যা একটি ধ্বনিত ঘূর্ণায়মান প্রভাব সৃষ্টি করে। ১৯৭২ সালে, তারা একটি প্রছন্দসই নির্মিত পিএ কিনেছিল যা একটি উন্নততর চার-চ্যানেল এবং ৩৬০-ডিগ্রি ব্যবস্থা সম্পন্ন।

পিংক ফ্লয়েডের অন দ্য রান, ওয়েলকাম টু দি মেশিন, এবং ইন দ্য ফ্লেশ?-এর মতো অংশে এয়াটার্স ভিসিএস থ্রি সিন্থেসাইজার পরীক্ষা করেছিলেন। ওয়ান অব দিস ডেস গানের জন্য তার বেস-গিটার ট্র্যাকের উপর বিনসন ইকোরাক ২ বিলম্বের এফেক্ট ব্যবহার করেছিলেন।

দ্য ফাইনাল কাট অ্যালবাম রেকর্ডিংয়ের সময় পিংক ফ্লয়েড অভিনব সাউন্ড এফেক্ট এবং আর্ট অডিও রেকর্ডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। অ্যালবামে মেইসনের অবদানগুলি প্রায় সম্পূর্ণরূপে পরীক্ষামূলক হলোফোনিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এটি একটি ত্রি-মাত্রিক প্রভাব অনুকরণ করতে ব্যবহৃত অডিও প্রক্রিয়াকরণ কৌশল। এই ব্যবস্থায় এমন একটি এফেক্ট তৈরি করতে প্রচলিত স্টেরিও টেপ ব্যবহার করা হয়েছিল যার ফলে শব্দ শ্রোতাদের মাথার চারপাশে আবর্তিত হয়েছে যেনো হেডফোন কানে শোনার অনুভূতি। প্রক্রিয়াটিতে একজন প্রকৌশলী শ্রোতার কানের উপরে বা পাশে পিছনে, শব্দটিকে সরাতে সক্ষম ছিল।

পিংক ফ্লয়েড, ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে, দ্য কমিটি  সহ আরো কয়েকটি চলচ্চিত্রের সুর রচনা করেছে। ১৯৬৯ সালে, তারা বারবেট শ্রোডার পরিচালিত মোর চলচ্চিত্রের সুর রেকর্ড করেছে। এই সাউন্ডট্র্যাক লাভজনক প্রমাণিত; এটি শুধুমাত্র যে ভাল আয় করেছিল তাই নয়, তবে, এ্যা সোসারফুল অব সিকরেট্‌স-এর পাশাপাশি সরাসরি পরিবেশনার প্রয়োজনে তৈরি সঙ্গীত উপাদানও এতে সংযোজিত হয়েছে। পরিচালক মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি'র জাবরিস্কি পয়েন্ট (১৯৭০) চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাক রচনা করার সময়, দলটি প্রায় এক মাস রোমের অভিজাত হোটেলে অবস্থান নিয়েছিল। ওয়াটার্স অভিযোগ করে বলেন, আন্তোনিওনির ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রবণতা না থাকলে তারা এক সপ্তাহের কম সময়ে কাজ সমাপ্ত করতে পারতো। অবশেষে আন্তোনিওনি শুধুমাত্র তাদের তিনটি রেকর্ডিং ব্যবহার করেছিলেন। আন্তোনিওনির বাদ দেয়া একটি অংশ, দ্য ভায়োলেন্ট সিকোয়েন্স, পরবর্তীতে আস অ্যান্ড দ্যাম, শিরোনামে ১৯৭৩-এর দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন অ্যালবামে সংযোজিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে, দলটি দ্বিতীবারের মত শ্রোডারের সঙ্গে লা ভ্যালে চলচ্চিত্রে কাজ করে, যার জন্য তারা ওবসক্যুর্ড বাই ক্লাউড্‌স নামে একটি সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম প্রকাশ করেছিল। তারা প্যারিসের কাছাকাছি Château d'Hérouville অঞ্চলে প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী সময়নাগাদ এর সঙ্গীত উপাদান গঠন করে, এবং মুক্তির পর, এটি পিংক ফ্লয়ডের প্রথম অ্যালবাম হিসাবে ইউএস বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষ ৫০ ছড়িয়ে যায়।

সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশনায় পিংক ফ্লয়েড তাদের বুহুলব্যায়ী মঞ্চ প্রদর্শনীর জন্য খ্যাত, এছাড়াও শব্দ মানের ক্ষেত্রে উচ্চতর মান স্থাপন, উদ্ভাবনী শব্দ এফেক্ট এবং চতুর্ভুজ স্পিকার সিস্টেম ব্যবহারের পথিকৃৎ হিসাবে পরিচিত। দলের শুরুর দিকের সময় থেকেই লন্ডনের ইউএফও ক্লাবের মতো স্থানে পরিবেশন করার সময় তারা তাদের সাইকেডেলিক রক সঙ্গীতের সাথে ভিজ্যুয়াল এফেক্ট ব্যবহার শুরু করেছিল। তাদের স্লাইড-লাইট শো ছিল ব্রিটিশ শৈলীর অন্যতম একটি প্রদর্শনী এবং যটি লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড সঙ্গীত জগতে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে তাদের সহায়তা করেছিল।

১৯৬৬ সালে লন্ডন ফ্রি স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল টাইমস ম্যাগাজিনের উদ্বোধন উদযাপনের জন্য, তারা রাউন্ডহাউসে উদ্বোধনকালে তারা ২ হাজার মানুষের সামনে পরিবেশন করেছিলেন, যেখানে পল ম্যাককার্টনি এবং মারিয়ান ফেইথফুল সহ খ্যাতিমান ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিল। ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে, রোড ব্যবস্থাপক পিটার ওয়াইন-উইলসন তাদের রোড ক্রুতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সমবর্তিত, আয়না এবং প্রসারিত কনডমের ব্যবহার সহ কিছু উদ্ভাবনী ধারণার মাধ্যমে ব্যান্ডের আলোকশৈলী উন্নততর করেছিলেন। ইএমআই-এর সাথে তাদের রেকর্ড চুক্তির পরে, পিংক ফ্লয়েড একটি ফোর্ড ট্রানজিট ভ্যান কিনেছিল, যা তখন বহির্মুখী ব্যান্ড পরিবহন হিসাবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৬৭ সালের ২৯ এপ্রিল তারা লন্ডনের আলেকজান্দ্রা প্রাসাদে দ্য ফর্টিন আওয়ার টেকনিকালার ড্রিম নামে একটি রাতব্যাপী অনুষ্ঠানের তারা শিরোনাম হয়েছিলেন। সূর্য উঠতে শুরু করার সাথে সাথে মঞ্চে উঠার উদ্দেশ্যে নেদারল্যান্ডস থেকে ভ্যান ও ফেরিতে করে দীর্ঘ যাত্রা শেষে শেষরাত তিনটার দিকে পিংক ফ্লয়েড উৎসবে উপস্থিত হয়। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে, তাদের মহাকাশ-সম্পর্কিত সঙ্গীত এবং গানের সুরের জন্য তারা অ্যাপোলো ১১ মহাকাশযানের চাঁদে অবতরণের সরাসরি বিবিসি টেলিভিশনের কভারেজে যুক্ত হয়, যেখানে তাদের ইন্সট্রুমেন্টাল মুনহেড ব্যবহৃত হয়েছিলো।

১৯৭৮ সালের নভেম্বরে, তারা প্রথমবারের মতো বৃহতাকার বিজ্ঞপ্তি পর্দা নিযুক্ত করেছিল যা তাদের সরাসরি অনুষ্ঠানগুলির চলাকালীন প্রদর্শিত হবে। ১৯৭৭ সালে, তারা অ্যালজি নামে একটি বৃহত ফাঁফানো ভাসমান শূকরের বেলুন তৈরি করে। এই হিলিয়াম ও প্রোপেন দিয়ে ভর্তি অ্যালজি ইন দ্য ফ্লেশ সফর চলাকালীন শ্রোতাদের উপরে ভেসে ওঠার সময় উচ্চ শব্দে বিস্ফোরিত হবে। সফরকালীন দর্শকদের আচরণ এবং ভেন্যুগুলির বৃহত আকার তাদের দ্য ওয়াল ধারণা অ্যালবামটিকে শক্তিশালীভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী দ্য ওয়াল সফরে ব্যান্ড এবং দর্শকদের মাঝে কার্ডবোর্ডের ইট থেকে নির্মিত একটি  উচ্চ প্রাচীর বানানো হয়। দর্শকদের গল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ন দৃশ্য দেখাতে তারা প্রাচীরের উপরে অ্যানিমেশন প্রদর্শন করেছিল। গল্পের চরিত্রগুলিকে উপস্থাপন করার জন্য তারা বেশ কয়েকটি ফাঁফানো দৈত্য বাানিয়েল। এই সফরের একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল কমফোর্টেবলি নাম্ব গানের পরিবেশনা। ওয়াটার্স তার উদ্বোধনী শ্লোক গাওয়ার সময়, অন্ধকারে, গিলমোর প্রাচীরের উপরে তার অংশ বাজানোর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। যখন গিলমোরের বাজানোর সময় এলো, উজ্জ্বল নীল এবং সাদা আলোগুলি হঠাৎ তাকে প্রকাশ করল। গিলমুর ক্যাসেটরগুলির একটি ফ্লাইটকেসের উপর দাঁড়িয়েছিলেন, যেটি ছিল একজন প্রযুক্তিবিদের নিয়ন্ত্রণে পিছনে থেকে বাঁধা একটি অনিরাপদ সেটআপ। একটি বৃহৎ হাইড্রোলিক প্ল্যাটফর্ম গিলমোর এবং প্রযুক্তিবিদ উভয়কেই প্রতিরক্ষা প্রদান করে।

ডিভিশন বেল সফর চলাকালীন, পাব্লিয়াস নাম ব্যবহার করে অজ্ঞাতপরিচয়ধারী ব্যক্তি একটি সংবাদ গ্রুপে অনুরাগীদের নতুন এই অ্যালবামে লুকিয়ে থাকা একটি ধাঁধা সমাধান করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি বার্তা পোস্ট করেন। পূর্ব রাদারফোর্ডের পিংক ফ্লয়েডের কনসার্টে মঞ্চের সামনে সাদা বাতিগুলি একসঙ্গে এনিগমা পাবলিয়াস (Enigma Publius) শব্দটির বানান। ১৯৯৪ সালের ২০ অক্টোবর আর্লস কোর্টে একটি টেলিভিশনের কনসার্ট চলাকালীন, কেউ একজ মঞ্চের পটভূমিতে বড় অক্ষরে এনিগমা শব্দটির অনুমান করেছিলেন। মেইসন পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে তাদের রেকর্ড সংস্থাটি ব্যান্ডের চাইতে অধিক পাবলিয়াস এনিগমা রহস্যকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ওয়াটার্সের দার্শনিক গীতিকবিতার আঙ্গিকে চিহ্নিত, রোলিং স্টোন পিংক ফ্লয়েডকে স্বতন্ত্র অন্ধকার দৃষ্টির সীমারেখা হিসাবে বর্ণনা করেছে। লেখক জেরে ও'নেইল সার্বার লিখেছেন: তাদের আগ্রহ সত্য এবং মায়া, জীবন এবং মৃত্যু, সময় এবং মহাকাশ, কার্যকারণ এবং সুযোগ, সমবেদনা এবং উদাসীনতা। পিংক ফ্লয়েডের গানের একটি কেন্দ্রীয় ভাব হিসাবে ওয়াটার্স সমানুভূতি শনাক্ত করেছে। লেখক জর্জ রিশ বর্ণনা করেছেন, মেডল-এর সাইকেডেলিক রচনা, ইকোস, সত্যিকারের যোগাযোগ, সহানুভূতি, এবং অন্যদের সাথে সহযোগিতার মূল ধারণাটির সংস্পর্শে নির্মিত। লেখক ডিনা ওয়েইনস্টাইন, ওয়াটার্সকে একজন অস্তিত্ববাদী হিসাবে উল্লেখ করেন।

উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার-এর হ্যাব অ্যা সিগার গানে ওয়াটার্সের পঙ্‌ক্তিতে রয়েছে সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের আন্তরিকতাবোধহীনতার কথা। গানটি ব্যান্ড এবং একটি রেকর্ড লেবেল নির্বাহীর মধ্যে অকার্যকর গতিশীলতা চিত্রায়ন করেছে যারা তাদের বর্তমান বিক্রয় সাফল্যের জন্য দলটিকে অভিনন্দন জানায়, বোঝায় যে তারা একই দলে রয়েছেন এবং প্রকাশ্যে যে ভুলক্রমে বিশ্বাস করেন যে পিংক ব্যান্ডের অন্যতম সদস্যের নাম। লেখক ডেভিড ডেটমারের মতে, অ্যালবামের গানে বাণিজ্য জগতের অমানবিক দিকগুলি বিষয়ক কথাগুলি, এমন পরিস্থিতি যেখানে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য শিল্পীদের সহনশীল হতে হয়।

পিংক ফ্লয়েডের স্বভাবত গীতি দর্শনের একটি হলো অনুপস্থিতি। উদাহরণস্বরূপ ১৯৬৮ সালের পরে ব্যারেটের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ওয়াটার্সের নিহত পিতা। এছাড়াও ওয়াটার্সের গানে অসাধিত রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা পাওয়া যায়। তাদের চলচ্চিত্রের স্কোর, অব্‌সকিওর্ড বাই ক্লাউড্‌স, তারুণ্যের প্রফুল্লতা হ্রাসের কথা বলে যা কখনও কখনও বার্ধক্য বা সুপরিণতির ইঙ্গিত করে। পিংক ফ্লয়েডের অ্যালবামের প্রচ্ছদের দীর্ঘকালীন ডিজাইনার, স্টর্ম থরগের্সন, উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার গানের প্রসঙ্গে বলেছেন: এখানে অস্তির ধারণা প্রতিসংহৃত হয়েছে, যেভাবে লোকেরা নিজেদের উপস্থিতি দেখানোর ভান করে অথচ তাদের মন সত্যিই অন্য কোথাও রয়েছে এবং তাদের উপস্থিতির পুরো শক্তিটি দমন করতে তাদের যন্ত্রাংশ এবং অনুপ্রেরণাগুলি মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রলিপ্ত হয়, অবশেষে ফলাফল দাঁড়াচ্ছে অনুপস্থিতি: অর্থাৎ ব্যক্তির অনুপস্থিতি, তার অনুভূতির অনুপস্থিতি। ওয়াটার্স মন্তব্য করেছিলেন: it's about none of us really being there ... [it] should have been called Wish We Were Here.

ও'নিল সার্বার পিংক ফ্লয়েডের গানের বিশ্চেষণ করে জানিয়েছেন তাদের সঙ্গীতে অনুপস্থিতির বিষয়টি একটি বিশেষ ধারণা। ওয়াটার্স দ্য ওয়াল-এর কমফোর্টেবলি নাম্ব গানে অনুপস্থিতি বা অনস্তিত্বের আহ্বান জানিয়েছে: I caught a fleeting glimpse, out of the corner of my eye. I turned to look, but it was gone, I cannot put my finger on it now, the child is grown, the dream is gone. ব্যারেট ব্যান্ডের সাথে তার সর্বশেষ দিকের গান জাগব্যান্ড ব্লুজ-এ অনুপস্থিতি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন: I'm most obliged to you for making it clear that I'm not here.

লেখক প্যাট্রিক ক্রস্কারি, অ্যানিম্যাল্‌স অ্যালবামটিকে শক্তিশালী শব্দ এবং পরামর্শমূলক ধারণার একটি অনন্য মিশ্রণ হিসাবে দ্য ওয়াল-এর সাথে ডার্ক সাইড-এর শৈল্পিক বিচ্ছিন্নতার চিত্রায়নের বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যালবামের রাজনৈতিক ধারণা এবং অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্মের মধ্যে একটি সমান্তরাল সদৃশ আঁকেন। একটি চিন্তার পরীক্ষণের মধ্য দিয়ে অ্যানিম্যাল্‌স শুরু হয়, যা জিজ্ঞাসা করে: If you didn't care what happened to me. And I didn't care for you, তারপরে প্রত্যেকের মনের স্বতন্ত্র অবস্থা প্রতিবিম্বিত করতে সঙ্গীত ব্যবহার করে অ্যানথ্রোপমর্ফাইজড চরিত্রগুলির ভিত্তিতে পশুর উপকথার বিকাশ ঘটে। গানের কথাগুলি শেষ পর্যন্ত ডাইস্টোপিয়ায় একটি চিত্র অঙ্কন করে, সমবেদনা এবং করুণাবিহীন একটি পৃথিবীর অনিবার্য পরিণতি, শুরুর পঙ্‌ক্তিতে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

অ্যালবামের অন্তর্ভুক্ত চরিত্রগুলিতে রয়েছে কুকুর, যারা পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিত্ব করে, শূকর, যারা রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতীক, এবং ভেড়া, যারা শোষিতদের প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রস্ক্যারি ভেড়া-কে একটি বিভ্রান্তিকর সাংস্কৃতিক পরিচয় দ্বারা সৃষ্ট বিভ্রমের অবস্থা হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, এটি একটি ভ্রান্ত চেতনা। কুকুর, তার স্বার্থ এবং সাফল্যের অক্লান্ত সাধনায়, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাস করার মতো কাওকে খুঁজে পায় না। শোষণের পরেও পুরোপুরি মানসিক তৃপ্তির অভাব বোধ করে। ওয়াটার্স মেরি হোয়াইটহাউসকে শূকরের উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন; তার অনুমান অনুসারে, যারা সরকারের শক্তি প্রয়োগ করে সমাজে নিজের মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার ভূমিকা নেয়। অ্যালবামের সমাপ্তিতে ওয়াটার্সের গীতিময় বক্তব্য সহানুভূতিতে ফিরে আসে: You know that I care what happens to you. And I know that you care for me too.। তবে, তিনি আরো স্বীকার করেছেন যে শূকরগুলি একটি অব্যাহত হুমকি স্বরূপ এবং শেষে তারা দেখে যে কুকুর যার আশ্রয় প্রয়োজন, যে রাষ্ট্র, বাণিজ্য এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছিল, তাদের মধ্যেকার চলমান যুদ্ধের বিপরীতে।

ও'নিল সার্বার দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন-এর ব্রেইন ড্যামেজ গানের there's someone in my head, but it's not me পঙ্‌ক্তির সঙ্গে কার্ল মার্কসের স্ব-বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের তুলনা করেছেন। উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার-এর ওয়েলকাম টু দি মেশিন গান মার্কসের বস্তুর বিচ্ছিন্নতার সুপারিশ করে; গানের মূল চরিত্র বস্তুগত ভাবের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত ছিল যে, তিনি নিজেকে, নিজ এবং অন্যদের থেকে বিছিন্ন ভাবছেন। মানব প্রজাতির বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে জবানবন্দি পাওয়া যেতে পারে অ্যানিম্যাল্‌স অ্যালবামের মধ্যে; যেখানে কুকুর অ-মানব হিসাবে প্রবৃত্তিগতভাবে বসবাস হ্রাস করে। দিয়েটমার লিখেছেন, কুকুরেরা নিজেদের থেকে এই পরিমাণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যে তারা প্রয়োজনীয় এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান হিসাবে সহানুভূতি বা নৈতিক নীতির কোনও জায়গা ছাড়াই একটি সাংঘাতিক (কাটথ্রোট) ভুবন হিসাবে তাদের সত্যতার অভাবকে ন্যায্যতা দেয়। পিংক ফ্লয়েডের গানগুলির মধ্যে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে একটি ধারাবাহিক ধারণা, এবং যা মূলত দ্য ওয়াল অ্যালবামের প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

যুদ্ধ, অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা প্রকাশের সবচেয়ে মারাত্মক পরিণতি হিসাবে দেখা, মূলত দ্য ওয়াল-এর মূল উপাদান এবং ব্যান্ডের সঙ্গীতের একটি পুনরাবৃত্ত থিম। ওয়াটার্সের বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন, এবং তার রচনাগুলি প্রায়শই যুদ্ধের ব্যয়কে নির্দেশ করে, যার মধ্যে কর্পোরাল ক্লেগ (১৯৬৮), ফ্রি ফোর (১৯৭২), আস অ্যান্ড দেম (১৯৭৩), হোয়েন দ্য টাইগার্স ব্রোক ফ্রি এবং দ্য ফাইনাল কাট (১৯৮৩) থেকে দ্য ফ্লেচার মেমোরিয়াল হোম, যে অ্যালবামটি তিনি তার বাবাকে উৎসর্গ করেছেন এবং শিরোনামে লিখেছেন অ্যা রেকুয়েম ফর দ্য পোস্টওয়ার ড্রিম। দ্য ওয়াল-এর থিম এবং রচনায় প্রকাশ পায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইংরেজ সমাজে পুরুষদের বিচ্ছিন্নতাবস্থায় ওয়াটার্সের বেড়ে ওঠা, এবং এমন একটি অবস্থা যা নারীদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন-এ ওয়াটার্সের লিরিক আধুনিক জীবনের চাপগুলির সাথে মোকাবিলা করেছিল এবং কীভাবে সেই চাপগুলি মাঝে মধ্যে উন্মাদনার কারণ হতে পারে। তিনি অ্যালবামটির মানসিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশকে সর্বজনীন অবস্থা আলোকিত হিসাবে দেখেন। তবে, ওয়াটার্স চেয়েছিলেন অ্যালবামটির ইতিবাচকতা জানাতে, এর ইতিবাচকতা আলিঙ্গন এবং নেতিবাচকতা প্রত্যাখ্যান করার আহবান করেন। রিশ দ্য ওয়াল-কে অভ্যাস, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক কাঠামো যা পাগলামি তৈরি করে বা সৃষ্টি করে তার চেয়ে উন্মাদ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত কম বলে বর্ণনা করেছেন। দ্য ওয়াল-এর নায়ক, পিংক, তার জীবনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে অক্ষম, এবং অপরাধবোধের দ্বারা কাটিয়ে উঠা, ধীরে ধীরে নিজের তৈরি বাধার ভিতরে নিজেকে বাইরের জগত থেকে আবন্ধ করে তোলে। পৃথিবী থেকে তার বিচরণ সম্পন্ন করার পরে, পিংক বুঝতে পারে যে তিনি উন্মাদ, রংধনুর ওপরে (crazy, over the rainbow)। তারপরে তিনি (পিংক) এই সম্ভাবনাটি বিবেচনা করেন যে তার এই অবস্থা তার নিজের দোষে হতে পারে: আমি কি এতক্ষণ অপরাধবোধে ছিলাম? (have I been guilty all this time?) তার সবচেয়ে বড় ভয় বুঝতে পেরে, পিংক বিশ্বাস করেন যে তিনি সবাইকে হতাশ করেছেন, তার কর্তৃত্বপ্রয়াসী মা বুদ্ধি করে তাকে হতাশার উপায় বেছে নিয়েছে, শিক্ষকরা তার কাব্যিক আকাঙ্ক্ষার যথাযথভাবে সমালোচনা করেছেন এবং তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়াকে ন্যায়সঙ্গত করেছেন। তারপরে তিনি প্রায় মানুষের প্রকৃত অনুভূতি দেখানোর জন্য বিচারের মুখোমুখি হন, আরো প্রজাতির সত্তার বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে তোলেন। রিশের মতে, রিচার মত দার্শনিক মিশেল ফুকোর রচনার মতো, ওয়াটার্সের গানে বোঝা যায় যে পিংক-এর উন্মাদনা আধুনিক জীবনের একটি পণ্য, যার উপাদানগুলি, পছন্দসই, সহনির্ভরতা এবং সাইকোপ্যাথোলজি, যা তার ক্রোধের সুষ্টি করে।

পিংক ফ্লয়েড সর্বকালের সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে সফল এবং প্রভাবশালী রক ব্যান্ডগুলির একটি। বিশ্বব্যাপী তাদের প্রায় ২৫০ মিলিয়নের অধিক রেকর্ডের বিক্রি হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ মিলিয়ন প্রত্যায়িত একক কেবল যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ৩৭.৯ মিলিয়ন অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে। সানডে টাইমস ধনী তালিকা, সঙ্গীত মিলিয়নিয়ার ২০১৩ (ইউকে), তালিকায় রজার ওয়াটার্সকে আনুমানিক £১৫০ মিলিয়নের (১৫ কোটি) হিসেবে ১২তম, ডেভিড গিলমোরকে £৮৫ মিলিয়নের (৮.৫ কোটি) হিসেবে ২৭তম, এবং নিক মেইসনকে £৫০ মিলিয়নের (৫ কোটি) হিসেবে ৩৭তম স্থানে অর্ন্তভুক্ত করেছে।

২০০৪ সালে, এমএসএনবিসি তাদের দ্য টেন বেস্ট রক ব্যান্ডস এভার তালিকায় পিংক ফ্লয়েডকে ৮তম স্থানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। রোলিং স্টোন তাদের দ্য হান্ড্রেড গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট অব অল টাইম তালিকায় ৫১তম স্থানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিউ তাদের সংকলনে সর্বকালের বৃহত্তম ব্যান্ড হিসেবে পিংক ফ্লয়েডের নাম উল্লেখ করেছে। ভিএইচওয়ান হান্ড্রেড গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট অব অল টাইম তালিকায় তাদের ১৮তম স্থানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কলিন লারকিন তার 'টপ ফিফ্টি আর্টিস্ট অব অল টাইম' তালিকায় পিংক ফ্লয়েডকে ৩য় স্থানে অন্তর্ভুক্ত করেছে, এটি তার অল টাইম টপ হান্ড্রেড অ্যালবাম্‌স তালিকায় প্রতিটি শিল্পীর অ্যালবামের জন্য সংযোজনী ভোটের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত।

পিংক ফ্লয়েড বিভিন্ন পুরস্কার জিতেছে। ১৯৮১ সালে অডিও প্রকৌশলী জেমস গাথরি দ্য ওয়াল গানের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী নন-ক্লাসিক্যাল অ্যালবাম বিভাগে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন, এবং ১৯৮৩ সালে রজার ওয়াটার্স দ্য ওয়াল চলচ্চিত্রের অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল গানের জন্য চলচ্চিত্রের জন্য রচিত শ্রেষ্ঠ মূল গান বিভাগে ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস পুরস্কার  লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে, পিংক ফ্লয়েড মরুন্ড গানের জন্য শ্রেষ্ঠ রক যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশনা বিভাগে গ্র্যামি পুরষ্কার লাভ করে। ২০০৮ সালে, সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ আধুনিক সঙ্গীতে তাদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পিংক ফ্লয়েডকে পোলার মিউজিক প্রাইজ প্রদান করেন; ওয়াটার্স এবং মেইসন অনুষ্ঠানে যোগদান পূর্বক পুরস্কার গ্রহণ করেন। পিংক ফ্লয়েড ১৯৯৬ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম, ২০০৫ সালে ইউকে মিউজিক হল অব ফেমের, এবং ২০১০ সালে হিট পারাডে হল অব ফেম-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গীত বহু শিল্পীদের প্রভাবিত করেছে; ডেভিড বোয়ি একটি উল্লেখযোগ্য অনুপ্রেরণার জন্য ব্যারেটর নাম উল্লেখ করেছেন, এবং ইউটু ব্যান্ডের দ্য এজ মূলত অ্যানিম্যাল্‌স-এর ডগ্‌স গানের শুরুর গিটার কর্ড শোনার পর প্রথম ডিলে প্যাডেলে ক্রয় করেছিলেন। অন্যান্যদের ব্যান্ড যারা তাদের উদ্ধৃত প্রভাবের হিসাবে পিংক ফ্লয়েডের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার মধ্যে কুইন, টুল, রেডিওহেড, ক্রাফ্টরেক, ম্যারিলিয়ন, Queensrÿche, নাইন ইঞ্চ নেইলস, দ্য অর্ব এবং দ্য স্মাশিং পাম্পিনস অর্ন্তভূক্ত। পিংক ফ্লয়েড নব্য-প্রোগ্রেসিভ রক উপশাখার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে যা ১৯৮০-এর দশকে আবির্ভূত হয়েছিল। ইংরেজ রক ব্যান্ড মোস্টলি অটাম তাদের শব্দে জেনেসিস এবং পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গীত একীভূত করেছে।

পিংক ফ্লয়েড এছাড়াও মন্টি পাইথন কমেডি দলের প্রশংসাকারী ছিল। ফ্লয়েড তাদের ১৯৭৫ সালের মন্টি পাইথন অ্যান্ড দ্য হিল গ্রিল চলচ্চিত্রে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য করেছিল।

২০১৬ সালে, ব্যান্ডটির প্রধান একটি কাজ লন্ডনে ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট জাদুঘরে অন্তর্ভূক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়, পরবর্তী বছর দলটির প্রথম একক প্রকাশের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে। মে ২০১৭ সালে, অডিও-ভিজুয়াল প্রদর্শনী, দেয়ার মর্টাল রিমেইন্স, অ্যালবাম প্রচ্ছদ শিল্প বিশ্লেষণ, মঞ্চ শো এবং নিক মেইসনের ব্যক্তিগত সংরক্ষণ থেকে আলোকচিত্রশিল্পের ধারণাগত প্রতিরূপের বৈশিষ্টায়িত করা হয়েছিল; এর জনপ্রিয়তার কারণে, এটি ১ অক্টোবরে বন্ধের তারিখ অতিক্রমের পর দুই সপ্তাহের জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

বইসমূহ




#Article 90: সঙ্গীত (346 words)


সংগীত দ্বারা গীত, বাদ্য, নৃত্য এই তিনটি বিষয়ের সমাবেশকে উল্লেখ করা হয়। গীত এক ধরনের শ্রবণযোগ্য কলা যা সুসংবদ্ধ শব্দ ও নৈশব্দের সমন্বয়ে মানব চিত্তে বিনোদন সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্বর ও ধ্বনির সমন্বয়ে গীতের সৃষ্টি। এই ধ্বনি হতে পারে মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত ধ্বনি, হতে পারে যন্ত্রোৎপাদিত শব্দ অথবা উভয়ের সংমিশ্রণ। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সুর ধ্বনির প্রধান বাহন। সুর ছাড়াও অন্য যে অনুষঙ্গ সঙ্গীতের নিয়ামক তা হলো তাল।

অর্থযুক্ত কথা, সুর ও তালের সমন্বয়ে গীত প্রকাশিত হয়। সুর ও তালের মিলিত ভাব এ বাদ্য প্রকাশিত হয়। ছন্দের সাথে দেহ ভঙ্গিমার সাহায্যে নৃত্য গঠিত ।

পাথরযুগের মানুষও সঙ্গীত গাইতো। সম্ভবত প্রথম সঙ্গীত তৈরির চেষ্টা হয়েছিল শব্দ ও ছন্দ দ্বারা প্রকৃতির সাহায্যে।

ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী, টপ্পা, গজল, কাওয়ালী, কালোয়াতী

সংগীত বা সুর বা স্বর এর প্রকাশ পদ্ধতিতে সাত (৭) টি চিহ্ন ( সংকেত ) ব্যবহৃত হয়, যথা :

সা রে গা মা পা ধা নি

এই সাতটি চিহ্ন দ্বারা সাতটি কম্পাংক নির্দেশ করা হয় ।  এছাড়াও আরও ৫টি স্বর রয়েছে ; যাদেরকে বিকৃত স্বর বলা হয় । যথা :

ঋ জ্ঞ হ্ম দ ণ

সঙ্গীত সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হয় তখনই, যখন তাল, মাত্রা, লয় সহকারে নির্দিষ্ট প্রণালীতে সম্পন্ন হয়। বলা হয়ে থাকে বেসুরো সঙ্গীত তবুও শ্রবনযোগ্য, তবে তাল-হীন গান সহ্য করা সম্ভব নয়। তাল হল সঙ্গীতের কঙ্কাল স্বরুপ। বিভিন্ন রকম তাল এর নাম ও মাত্রাঃ

বিভিন্ন প্রকার যান্ত্রীয় সঙ্গীত:

প্রাচীনকাল থেকে এ বঙ্গঅঞ্চলে কীর্তন বা ঈশ্বরের নামে গান  করার প্রচলন চলে আসছে। চর্যাগীতির পরে বাংলা সঙ্গীতে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে নাথগীতি। যদিও সঙ্গীতকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট হয়েছে এক ধরনের ব্যবসার। এতে সঙ্গীত রচনা করে গ্রাহক কিংবা প্রচার মাধ্যমে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানী, ব্রান্ড এবং ট্রেডমার্ক সহযোগে লেবেল এবং বিক্রেতা। ২০০০ সালের পর থেকে গানের শ্রোতার সংখ্যা অসম্ভব আকারে বৃদ্ধি পেয়েছ। শ্রোতারা ডিজিটাল মিউজিক ফাইলগুলোকে এমপি-থ্রী প্লেয়ার, আইপড, কম্পিউটার এবং অন্যান্য বহনযোগ্য আধুনিক যন্ত্রে সংরক্ষণ করছেন। গানগুলো ইন্টারনেট থেকে বিনামূল্যে কিংবা ক্রয় করে সংগ্রহ করা যায়। ডিজিটাল মাধ্যমে গান সংগ্রহ ও দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে বর্তমান সঙ্গীত শিল্প প্রসারিত হয়েছে।

তবে ইন্টারনেট থেকে অবাধে বিনামূল্যে গান ডাউনলোড করার ফলে গানের সিডি বিক্রয়ের ব্যবসায় এক ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক শিল্পীরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছেন না।




#Article 91: সংস্কৃতি (1742 words)


সংস্কৃতি (বা কৃষ্টি) হলো সেই জটিল সামগ্রিকতা যাতে অন্তর্গত আছে জ্ঞান, বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিল্প, আইন, আচার এবং সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মানুষের দ্বারা অর্জিত অন্য যেকোনো সম্ভাব্য সামর্থ্য বা অভ্যাস।ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপিকা হেলেন স্পেনসার-ওটেইয়ের মতে, সংস্কৃতি হলো কিছু বুনিয়াদি অনুমান, মূল্যবোধ ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির, বিশ্বাস, নীতিমালা, প্রক্রিয়া এবং আচরণিক প্রথার অস্পষ্ট সমষ্টি–যা এক দল মানুষ ভাগ করে নেয় এবং সেই সমষ্টি দলের প্রত্যেক সদস্যের আচরণকে এবং তার নিকট অন্য সদস্যের আচরণের 'অর্থ' বা সংজ্ঞায়নকে প্রভাবিত করে (কিন্তু নির্ধারিত করে না)।

সংস্কৃতি শব্দটির আভিধানিক অর্থ চিৎপ্রকর্ষ বা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন। ইংরেজি Culture-এর প্রতিশব্দ হিসেবে সংস্কৃতি শব্দটি ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয়।

বর্ণনা

সংস্কৃতিকে নৃবিজ্ঞানের একটি প্রধান ধারণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেসব ঘটমান বিষয় একে ঘিরে আছে তা সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের সমাজে প্রবাহিত হয়। সংস্কৃতির সার্বজনীন উপাদান সকল মানব সমাজে দেখা যায়; এর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত রূপ যেমন: শিল্প, সঙ্গীত, নৃত্য, অনুষ্ঠান, ধর্ম এবং প্রযুক্তি যেমন: যন্ত্রপাতির ব্যবহার, রান্না করা, ঘর, বাড়ি এবং কাপড় চোপড়। বস্তুগত সংস্কৃতি এর মধ্যে সংস্কৃতির কায়িক বা ভৌত রূপ রয়েছে যেমন: প্রযুক্তি, স্থাপত্য ও শিল্প রয়েছে অপর পক্ষে অবস্তুগত দিক থেকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম নীতি (রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুশীলন রয়েছে), পুরাণ, দর্শন, সাহিত্য, (লিখিত এবং মৌখিক), এবং বিজ্ঞান নিয়ে একটি সমাজের অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গঠিত হয়।

মানবিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সংস্কৃতির একটি মানে হলো কোন একক ব্যক্তির শিল্প, বিজ্ঞান, শিক্ষা, ভদ্রতায় নির্দিষ্ট মাত্রায় সূক্ষতা অর্জন। সাংস্কৃতিক সূক্ষতার মাত্রা কখনো কখনো সভ্যতাগুলো থেকে কম জটিল সমাজগুলোকে পার্থক্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই উঁচু নিচু ক্রমানুসারে সমাজ সাজানোর বিষয়টি সাংস্কৃতিক পুঁজিতে কার কতোটুকু অধিকার আছে তার ভিত্তিতে  অভিজাতদের জন্য উঁচু সংস্কৃতি এবং নিচু শ্রেণীর জন্য নিচু সংস্কৃতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, বা লোক সংস্কৃতি এই  শ্রেণী ভিত্তিক পার্থক্যে খুঁজে পাওয়া যায়। গণ সংস্কৃতি বিংশ শতাব্দীতে গণের দ্বারা উৎপাদিত ভোগবাদী সংস্কৃতি’র গণমাধ্যমে প্রচারিত রূপকে নির্দেশ করে। কিছু দর্শন যেমন: মার্ক্সীয় দর্শন বা ক্রিটিক্যাল থিউরি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে সংস্কৃতি কখনো কখনো নিচু শ্রেণীর লোকদের কাজে লাগানোর জন্য বা মিথ্যা সচেতনতা তৈরির জন্য অভিজাতদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কালচারাল স্টাডিজ এ এ ধরণের দৃষ্টিকোন দেখতে পাওয়া যায়। বিস্তৃত সামাজিক বিজ্ঞান এ তাত্ত্বিক সামাজিক বস্তুবাদের দৃষ্টিকোন থেকে মানুষের জীবনের বস্তুগত অবস্থান থেকে মানুষের প্রতিকায়িত সংস্কৃতি উদ্ভূত হয় কারণ মানুষ তার শরীরগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই অবস্থার তৈরি করেছে, এবং মানুষের বিবর্তনের স্বভাব দ্বারা সংস্কৃতির ভিত্তি পাওয়া যায়।

যখন সংস্কৃতিকে গণনার যোগ্য সংখ্যা হিসেবে দেখা হয় তখন সংস্কৃতি মানে হচ্ছে প্রথা, ঐতিহ্য, সমাজ বা সম্প্রদায় যেমন একটি নৃগোষ্ঠিগত দল বা জাতির মূল্যবোধ। বিভিন্ন সময়ে যে জ্ঞান আহৃত হয় তার সমষ্টিই সংস্কৃতি। এই ধারণায় বহুসংস্কৃতিবাদ শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান এবং একই গ্রহে বসবাসরত বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে মূল্যায়ন করে। কখনো কখনো একটি দেশের উপদলের নির্দিষ্ট অনুশীলনকে “সংস্কৃতি” বলা হয়, উদাহরণস্বরূপ: ব্রো কালচার বা মূলধারা বিরোধী সংস্কৃতি। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান এ কোন মানুষের সংস্কৃতি তার বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং অনুশীলন তার নিজের সংস্কৃতির ভিত্তিতে করা হয় এ ধারায় সংস্কৃতি সহজে নিরপেক্ষভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয় না বা মূল্যায়ন করা হয় না কারণ যেকোন মূল্যায়ন ওই সংস্কৃতির মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে স্থাপিত হয়।

কোন স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়, তাই সংস্কৃতি। উক্ত বিষয়গুলোকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগ নিত্যদিনকার জীবনযাপনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়ভাগ জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পকির্ত।  সংস্কৃতি হল টিকে থাকার কৌশল এবং পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র সংস্কৃতিবান প্রাণী। মানুষের এই কৌশলগুলো ভৌগোলিক, সামাজিক, জৈবিকসহ নানা বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। পূর্বপুরুষদের যেমন এই কৌশলগুলো ছিল তা থেকে উত্তরপুরুষেরা এই কৌশলগুলো পেয়ে থাকে। অধিকন্তু সময় ও যুগের প্রেক্ষিতেও তারা কিছু কৌশল সৃষ্টি করে থাকে। তাই বলা যায় সংস্কৃতি একদিকে যেমন আরোপিত অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত তেমনি তা অর্জিতও বটে।
নৃবিজ্ঞানী টেইলরের ভাষ্যমতে,

ম্যালিনোস্কির বক্তব্যমতে,

স্যামুয়েল পুফেনডর্ফের সংজ্ঞা অনুযায়ী,

প্রাচীন রোমের বাগ্মী সিসেরো তার তুসকালেনে ডিসপুটেশনস (Tusculanae Disputationes) নামক গ্রন্থে প্রথম আধুনিক “সংস্কৃতি” (culture) শব্দটি ব্যবহার করেন, আত্মার চর্চা’র কথার কথা লিখেন, সেখানে তিনি একটি দার্শনিক আত্মার উন্নয়নে কৃষিভিত্তিক রূপক ব্যবহার করেন, যেখানে পরমকারণবাদের দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে আত্মার চর্চা মানুষের উন্নয়নের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য আদর্শ। স্যামুয়েল পুফেনডর্ফ এই রূপকটিকে একই ধরণের অর্থ করে আধুনিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন কিন্তু কখনোই এটি মানুষের সম্পূর্ণতার দর্শন বলে ধারণা করেন নি। তার ব্যবহার, এবং তার পরে বহু লেখক “মানুষ কিভাবে উৎসগত বর্বরতা কাটিয়ে ওঠে , আর কিভাবে দক্ষতার মাধ্যমে পুরোপুরি মানুষ হয়ে ওঠে তা নির্দেশ করেন“[৮]

১৯৮৬ সালে দার্শনিক এডওয়ার্ড এস. ক্যাসে লেখেন, “ আদতে সংস্কৃতি শব্দটির মানে মিডেল ইংলিশে হচ্ছে “জমি চাষ করা, লাতিনে এই শব্দটি হচ্ছে কোলে(colere) ‘বাস করা, যত্ন করা, চাষ করা, প্রাথনা করা’ এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি নীতি, ‘কোন বিশ্বাস বিশেষ করে ধর্মীয় বিশ্বাস’ সাংস্কৃতিক হওয়া মানে হচ্ছে, একটি সংস্কৃতি থাকা, প্রগাঢ়তা নিয়ে কোন স্থানে বাস করে সে যায়গাটিকে চাষাবাদ করা-যায়গাটির দায়িত্বে থাকা, সেটিতে সাড়া দেওয়া, যত্ন সহকারে জমিটিতে যোগ দেওয়া।”[৯]

রিচার্ড ভেল্কলে (Richard Velkley) সংস্কৃতিকে নিম্নোক্তভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:[৮]

...সত্যিকারের মানে হচ্ছে আত্মা বা মনের কর্ষণ, ১৮-শতকের জার্মান চিন্তাবিদদের লেখার অধিকাংশ পরবর্তী আধুনিক অর্থ গ্রহন করে যারা (জার্মান চিন্তাবিদ) যারা “আধুনিক উদারনীতিবাদ এবং দীপনবাদ” নিয়ে করা রুশো’র সমালোচনাকে বিভিন্ন মাত্রায়িউন্নীত করেছিলেন। এভাবে এই সব লেখকদের লেখায় “সস্কৃতি” ও সভ্যতার মধ্যে বৈপরীত্য অন্তর্নিহিত ছিল, এমনকি যখন তা প্রকাশ করা হয় নি তখনও এমনটা প্রকাশ পেত।

নৃ বিজ্ঞানী ই. বি. টেইলরের ভাষ্যমতে, এটা হচ্ছে “সেই জটিল পুরোটা যার মধ্যে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নৈতিকতা, আইন, প্রথা, নৈতিকতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা ও স্বভাবগুলো যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে আহরণ করে।”[১০]

ক্যামব্রিজ ইংলিশ ডিকশনারি বর্ণনা করেছে যে সংস্কৃতি হচ্ছে “জীবন যাপনের পন্থা, বিশেষকরে নির্দিষ্ট একটি সময়ে নির্দিষ্ট একটি দলের মানুষদের সাধারণ প্রথাসমূহ ও বিশ্বাসগুলো।[১২]

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য থেকে ধারণা করা হয়েছে ক্রমবর্ধমান সংস্কৃতির জন্য মানুষের ক্ষমতা প্রায় ৫০০, ০০০-১৭০, ০০০ বছর আগে উদ্ভুত হয়েছে।

রেইমন পানিক্কার ২৯টি উপায়ে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়েছিল বলে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, বিবর্তন, উদ্ঘাতন, নবরূপদান, নতুন ভাবনা, সংস্কার, নতুন ভাব, প্রথা, রীতি উদ্ভাবন, পুনর্জাগরণ, বিপ্লব, পরিব্যক্তি, উন্নতি, বিকিরণ, আত্মীকরণ, ধার করা, মানসিক ঔদার্য, সমন্বয় প্রচেষ্টা, আধুনিকীকরণ, দেশিয়করণ, এবং রূপান্তকরণ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, আধুনিকীকরণকে আলোকিত যুগের বিশ্বাস এবং অনুশীলন যেমন: বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, শিল্প, বানিজ্য, গণতন্ত্র, এবং উন্নতির লক্ষণকে গ্রহন করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে।

সাংস্কৃতিক আবিষ্কারের অর্থ হচ্ছে যে কোন নতুন বিষয় প্রবর্তন যা নতুন আর যা একটি দলের মানুষের জন্য দরকারী আর তাদের আচরণে তা প্রকাশিত কিন্তু তা দেখার মতো কোন বস্তু না। মানবতা বৈশ্বিক “তরান্বিত সংস্কৃতি পরিবর্তন সময়” এর মধ্যে রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, গণমাধ্যম, এবং সর্বোপরি অন্যান্য উপাদানের মধ্যে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রয়েছে। সংস্কৃতি পুর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়া মানে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক ধারণাকে পুনরায় নির্মাণ করা।

সংস্কৃতিগুলো  উভয় শক্তি যা পরিবর্তনের কথা বলছে আর যা পরিবর্তনকে প্রতিহত করছে তাদের দ্বারা অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই শক্তিগুলো সামাজিক কাঠামো আর প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর সাথে সম্পর্কিত আর সাংস্কৃতিক ভাবের চিরস্থায়ীকরণ এবং অনুশীলনসহ পরিবর্তনের অধীন বর্তমান কাঠামোগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

সামাজিক দন্দ্ব এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন একটি সমাজের মধ্যে সামাজিক গতি পরিবর্তন করে এবং নতুন সাংস্কৃতিক আদর্শ উন্নীত করে, এবং উৎপাদনক্ষম কর্ম তরান্বিত করে বা সক্ষম করে  সমাজের পরিবর্তন করতে পারে। এই সামাজিক পরিবর্তনগুলো আদর্শ পরিবর্তনগুলোর এবং অন্যান্য ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গী হয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলন নতুন অনুশীলনে অন্তর্ভূক্ত করে যা লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন তৈরি করে লিঙ্গ এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দুটোকেই পরিবর্তন করে। পরিবেশগত অবস্থাও উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বরফ যুগের শেষে ক্রান্তীয় বনাঞ্চল ফিরে আসায় গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তোলার উপযুক্ত গাছপালা সহজপ্রাপ্য হয়, যা কৃষিকাজ আবিষ্কারের পথ প্রদর্শন করে, যা পালাক্রমে অসংখ্য সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বা নতুন সংস্কৃতির উদ্ভাবন  এবং সামাজিক অগ্রসরমানতায় পরিবর্তন আনে।

বিভিন্ন সমাজের সংযোগের মাধ্যমে সংস্কৃতি বাহ্যিকভাবে প্রভাবিত হয়, যা সামাজিক পরিবর্তন তৈরি করতে পারে বা বাধা দিতে পারে আর সংস্কৃতির অনুশীলনে পরিবর্তন আনতে পারে। যুদ্ধ বা সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা প্রযুক্তিগত  উন্নয়ন বা সামাজিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সেইসাথে, সাংস্কৃতিক ভাব বা আদর্শ আশ্লেষ বা সাংস্কৃতিক অভিযোজনের মাধ্যমে এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে বদল হতে পারে। আশ্লেষের ক্ষেত্রে কোন কিছুর রূপ (এর অর্থ হতে হবে এমন না) এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে চালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা রেস্তোরার চেইন এবং রান্নার ব্র্যান্ড চীনের মানুষের কাছে কৌতূহল ও মুগ্ধতা ছড়িয়েছে যে কারণে চীন বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে দেশটির অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উন্মুক্ত করেছে। “উদ্দীপক আশ্লেষ” (ভাবনা বা আদর্শের ভাগাভাগি) একটি সংস্কৃতির একটি উপাদানকে নির্দেশ করে যা অন্য সংস্কৃতির উদ্ভাবনে বা প্রসারে নেতৃত্ব দেয়। অন্যদিকে “সরাসরি ধার করা,” এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে প্রযুক্তিগত বা  বাস্তব আশ্লেষ নির্দেশে সহায়ক। উদ্ভাবনের আশ্লেষ তত্ত্ব কেন এবং কখন স্বতন্ত্র ব্যক্তি এবং সংস্কৃতিগুলো নতুন ভাবনা, অনুশীলন, এবং দ্রব্য গ্রহণ করে তার একটি গবেষণা-ভিত্তিক মডেল উপস্থাপন করে।

সাংস্কৃতিক অভিযোজনের বিভিন্ন অর্থ আছে, কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে একটি সংস্কৃতির সঙ্গে আরেকটি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের বদলকে নির্দেশ করে, যেমন ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার সময়ে বিশ্ব জুড়ে নেটিভ অ্যামেরিকান গোষ্ঠিগুলো এবং অসংখ্য আদিবাসীদের বেলায় যা ঘটেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় আত্তীকরণ করে ( একজন ব্যক্তির বিভিন্ন সংস্কৃতি গ্রহণ) এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলে যাওয়া বা সমকেন্দ্রি হওয়া। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশে যাওয়া এবং চিন্তা, ভাবনা, এবং বিশ্বাসের ভাগাভাগিতে সংস্কৃতির বহুজাতিক প্রবাহ  ‍গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

যদিও পৃথিবীজুড়ে নৃবিজ্ঞানীরা সংস্কৃতি বিষয়ে টেইলরের সংজ্ঞা নির্দেশ করেন।[৩১] ২০ শতকে অ্যামেরিকার নৃবিজ্ঞানে “সংস্কৃতি” প্রধান ও সমন্বয় সাধনের ধারণা হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে, যেখানে এটি সাধারণভাবে  মানুষের চিরন্তন ক্ষমতাকে নির্দেশ করে শ্রেণীবদ্ধ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রতীকায়িতভাবে সংকেতাবদ্ধ করতে এবং সামাজিক সংকেতাবদ্ধ অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রতীকায়িতভাবে যোগাযোগ করতে। অ্যামেরিকার নৃবিজ্ঞান চারটি ক্ষেত্রে সংঘঠিত, যার প্রতিটি সংস্কৃতির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: জীববিজ্ঞানগত নৃবিজ্ঞান, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান আর অ্যামেরিকার প্রত্নতত্ত্ব বিজ্ঞান[৩২][৩৩][৩৪][৩৫] কালচারব্রিল্লি  (Kulturbrille) বা “সাংস্কৃতিক আয়না” শব্দটি জার্মান অ্যামেরিকান নৃবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ বোয়াস Franz Boas উদ্ভাবন করেন, এতে নিজের দেশকে যে আয়না’য় দেখা যায় তার কথা নির্দেশ করা হয়। মার্টিন লিন্ডস্ট্রম দাবি করেন যে  কালচারব্রিল্লি যে সংস্কৃতিতে আমরা বাস করি তা সহজে বুঝতে সাহায্য করে, সেইসাথে “আমাদের এমন কিছু দিয়ে বাঁধে যা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে বহিরাগতরা সহজে কিছু শিখতে পারে।”[৩৬]

সংস্কৃতির সমাজবিজ্ঞান সমাজে প্রদর্শিত সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত করে।সমাজবিজ্ঞানী জিঅরগ সিমমেল Georg Simmel (১৮৫৮–১৯১৮) এর মতে, সংস্কৃতি নির্দেশ করে “কোন ব্যক্তির ইতিহাসে যা বিমূর্ত হয়ে আছে তার বাহ্যিক রূপের চর্চা।” [৩৭] চিন্তার ধারা, কার্য সম্পাদনের ধারা, এবং বস্তু  যা একসঙ্গে মানুষের জীবন ধারা তৈরি করে তাকে সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতি দুই ধরনের হতে পারে, অবস্তুগত সংস্কৃতি ও বস্তুগত সংস্কৃতি। [৬] অবস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে শারীরিক অবয়বহীন ভাবনা, যা প্রতিটি ব্যক্তি’র তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কিত, মূল্যবোধ, বিশ্বাস প্রক্রিয়া, নিয়ম নীতি, আদর্শ, নৈতিকতা, ভাষা, সংঘঠন, এবং প্রতিষ্ঠান কিন্তু বস্তুগত সংস্কৃতি বস্তু ও স্থাপত্যের মধ্যে সংস্কৃতির শারীরিক উপস্থিতি । এই পদটি শুধুমাত্র প্রত্নতত্ত্ব ও নৃ-বিজ্ঞান পাঠে প্রাসঙ্গিক কিন্তু নির্দিষ্টভাবে সকল বাস্তবিক উপস্থিতি সংস্কৃতি, অতীত ও বর্তমানে আরোপ করা যায়।

উইমার জার্মানিতে (১৯১৮-১৯৩৩) প্রথম সাংস্কৃতিক সমাজবিজ্ঞান উদ্ভূত হয়, সেখানে সমাজবিজ্ঞানী আলফ্রেড ওয়েবার কালচারসোজিওলজি (Kultursoziologie) শব্দটি ব্যবহার করেন। এরপরে ১৯৬০ সালে ইংরেজিতে কথা বলা দেশগুলোতে কালচারাল টার্ন-এর একটি পণ্য হিসেবে সাংস্কৃতিক সমাজবিজ্ঞান “পুনরায় আবিষ্কৃত” হয়।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের সমাজবিজ্ঞানীগণ এবং স্টুয়ার্ট হল ও রেইমন্ড উইলিয়ামসের মত মার্ক্সবাদে প্রভাবিত কিছু পণ্ডিত সংস্কৃতি অধ্যয়ন-র উন্মেষ ঘটান। মার্ক্সবাদ ও সমালোচক তত্ত্বের মত দর্শনের কিছু পাঠশালা দাবি করে যে, সংস্কৃতিকে প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে অভিজাত-শ্রেণীর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় যা নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং একটি ভ্রান্ত চেতনার সৃষ্টি করে; সংস্কৃতি অধ্যয়নের পাঠ্যক্রমে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বহুলভাবে প্রচলিত।




#Article 92: ভূগোল (3737 words)


ভূগোল (, যেটি এসেছে গ্রীক শব্দ “”, বা, geographia, থেকে; যার শাব্দিক অর্থ: পৃথিবী সম্পর্কিত বর্ণনা বা আলোচনা) হচ্ছে বিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে পৃথিবীর ভূমি, এর গঠন বিন্যাস, এর অধিবাসী সম্পর্কিত সমস্ত প্রপঞ্চ (phenomenon / ক্রিয়া-প্রক্রিয়া) সংক্রান্ত বিষয়াদি আলোচিত হয়। এই শব্দটি খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে গ্রিক জ্ঞানবেত্তা এরাটোসথেনিস (২৭৬–১৯৪ খ্রিস্টপূর্ব) প্রথম ব্যবহার করেন। ভূগোলে মানুষের বসবাসের জগৎ ও তার সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপঃ ভৌত ভূগোলে জলবায়ু, ভূমি ও জল নিয়ে গবেষণা করা হয়; সাংস্কৃতিক ভূগোলে কৃত্রিম, মনুষ্যনির্মিত ধারণা যেমন দেশ, বসতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন, দালান, ও ভৌগোলিক পরিবেশের অন্যান্য পরিবর্তিত রূপ আলোচনা করা হয়। ভূগোলবিদেরা তাদের গবেষণায় অর্থনীতি, ইতিহাস, জীববিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব এবং গণিতের সহায়তা নেন।
সাধারণতঃ প্রায়শই এটিকে প্রাকৃতিক ভূগোল ও মানবীয় ভূগোল নামক দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। ভূগোলের চারটি ঐতিহাসিক গবেষণা পদ্ধতি হচ্ছেঃ প্রকৃতি ও মানবজাতি সম্পর্কিত স্থানিক বিশ্লেষণ, স্থান ও অঞ্চল সম্পর্কিত এলাকা পঠন, মানব-ভুমি সম্পর্ক পঠন এবং ভূবিজ্ঞান। ভূগোলকে পৃথিবী পঠন-বিভাগ ও মানুষ এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মধ্যকার সেতু-বন্ধন বলেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত এরাটোসথেনিস (২৭৬-১৯৪ খ্রীস্টপূর্ব) পৃথিবীর বর্ণনা অর্থে সর্বপ্রথম এ Geography শব্দটির ব্যবহার করেছিলেন। Geography→Geo (পৃথিবী)+ graphos (বর্ণনা বা বিবরণ) অর্থাৎ Geography শব্দের অর্থ হলো পৃথিবীর বর্ণনা । বাংলা ভাষায় প্রাচীন হিন্দু পুরাণে ব্যবহৃত ভূগোল শব্দটি ‘জিওগ্রাফি’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; যদিও ভূগোল শব্দটি ‘জিওগ্রাফি’ শব্দের মর্মার্থ প্রকাশ করে না। এ ছাড়া বর্তমান জিওগ্রাফির সংজ্ঞা অনুসারে ‘ভূগোল শব্দটি দিয়ে জিওগ্রাফি শব্দটিকে ধারণ করা যায় না। বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধানে (তৃতীয় সংস্করণ, ২০১৫) জিওগ্রাফির প্রতিশব্দ ‘ভূগোলবিদ্যা’ বা ‘ভূবিজ্ঞান’ করা হয়েছে, ‘ভূগোল’ নয়। এ কারণে বাংলাভাষা সচেতন অনেক ভূগোলবিদ জিওগ্রাফির প্রতিশব্দ হিসেবে ‘ভূবিদ্যা’ শব্দটির ব্যবহারে অধিক আগ্রহী।

মানচিত্রাঙ্কনবিদ এবং বিভিন্ন স্থানের নাম ও সংখ্যা বিষয়ক অধ্যয়নকারীকে ভূগোলবিদদের সাথে মিলিয়ে ফেলা ঠিক নয়; যদিও অনেক ভূগোলবিদ ভূসংস্থান ও মানচিত্রাঙ্কন বিষয়ে অধ্যয়ন করে থাকেন, তবুও প্রকৃতপক্ষে এটা তাদের মূল বিচরণক্ষেত্র নয়।

ভূগোলের মূল বিষয়বস্তুকে বর্ণনা এবং বিশ্লেষণের সুবিধার্থে:

প্রাকৃতিক ভূগোল হলো ভূগোলের সেই অংশ যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ ও  তাদের গাঠনিক উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এটি মূলত: অশ্মমন্ডল, বারিমন্ডল, বায়ুমন্ডল, ভূপৃষ্ঠ, এবং বৈশ্বয়িক উদ্ভিদ জগৎ এবং প্রাণী জগত (জীবমন্ডল) নিয়ে গঠিত এবং তাদের সমস্যা এবং তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করে থাকে। প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন শাখা গুলো নিম্বরুপ:

ভূত্বকের উপরিভাগের ভৌত পরিবেশ এবং এতে কার্যরত বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়াসমূহ বিজ্ঞানের যে শাখায় সমীক্ষা করা হয়, তাকে প্রাকৃতিক ভূগোল বলে। অধিকাংশ ভূগোলবিদ ভূগোলকে প্রাকৃতিক ও মানবিক নামক দুই শাখায় বিভক্ত করতে আগ্রহী। আবার অনেকে ভূপৃষ্ঠে জীবমণ্ডলের বাস্তুসংস্থানকে উপেক্ষা করা সমীচীন নয় বিধায় ভূগোলকে প্রাকৃতিক, মানবিক ও জীবভূগোল নামক তিন শাখায় বিভক্ত করে থাকেন। বিগত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক ভূগোলের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু এবং পঠনপাঠন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শুরুতে প্রাকৃতিক ভূগোল বলতে কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশের (ভূমিবন্ধুরতা, পানি ও বায়ু) অধ্যয়নকে বুঝাতো। যেমন- আর্থার হোমসের  (Arther Holmes, 1960) মতে, ‘পৃথিবী পৃষ্ঠের  বন্ধুরতা, সাগর-মহাসাগর এবং বায়ুমণ্ডলের বিষয়াদি যা নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ গঠিত, তার সমীক্ষাই হচ্ছে প্রাকৃতিক ভূগোল। কার্ল রিটারের (Carl Ritter, 1779-1859) মতে, ‘প্রাকৃতিক ভূগোল হচ্ছে বিজ্ঞানের সেই শাখা যা পৃথিবীর সমস্ত অবয়ব, বৈচিত্র্য ও সম্পর্কসহ একটি স্বতন্ত্র একক হিসেবে বিবেচনা করে।’ হার্টশোর্ন বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের সঠিক, সুবিন্যস্ত ও যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রদান করা প্রাকৃতিক ভূগোলের কাজ।’

এ দিক থেকে বিবেচনা করলে, প্রাকৃতিক ভূগোল কেবল কতিপয় ভূবিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়ের একীভবনই নয়, এটি প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানুষের কর্মকাণ্ডের আন্তঃক্রিয়ার ধরনও পর্যালোচনা করে। ভূগোলের একটি প্রতিষ্ঠিত শাখা হিসেবে প্রাকৃতিক ভূগোল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে পারিসরিক (spatial) ধরন এবং ভূপৃষ্ঠের পরিবেশের উপাদানগুলোর পারিসরিক সম্পর্ক সমীক্ষা করে। এ ছাড়াও এটি আঞ্চলিক ধরনের সাথে পারিসরিক সম্পর্কের কারণ, একই সাথে পরিবেশের উপাদানগুলোর পরিবর্তনের কারণও ব্যাখ্যা করে থাকে। এ থেকে বলা যায়, ভূমি, বায়ু, পানি এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনধারণের সহায়ক যে জীবমণ্ডল, তার বিস্তারিত সমীক্ষাই হচ্ছে প্রাকৃতিক ভূগোল।

প্রাকৃতিক বিশ্ব সম্পর্কিত জ্ঞানের আলোচনার ক্ষেত্র বোঝাতে প্রাকৃতিক ভূগোল শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রটি ভূগোল জ্ঞানের পুরো শাখাটির মতোই প্রাচীন। চিরায়ত গ্রিক যুগে বিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে ভূগোলের উৎপত্তি এবং উনবিংশ শতকের শেষভাগে নৃভূগোল (Anthropogeography) বা মানবিক ভূগোলের উৎপত্তির পূর্ব পযর্ন্ত ভূগোল ছিলো মূলত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান : অবস্থানের সমীক্ষা ও জ্ঞাত পৃথিবীর সকল স্থানের ধারাবাহিক বর্ণনা।

প্রাচীন ভারতে ভুগোল তথা ভূবিদ্যা-র আলোচনা পাওয়া যায় বেদ ও প্রাচীন । বেদ-এর লিখিত-রচনা কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয় ভাগ। -এ প্রাচীন পুরাণ-এর উৎস সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। বিদ্বজ্জনদের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ - ১০০০ অব্দে অথর্ববেদ এর স্তোত্র গুলি রচিত হয়েছিল। প্রাচীন পুরাণের রচয়িতাগণ পৃথিবীকে সাতটি মহাদেশীয় দ্বীপে ভাগ করেছিলেন - জম্বু দ্বীপ, ক্রৌঞ্চ দ্বীপ, কুশ দ্বীপ, প্লক্ষ দ্বীপ, পুষ্কর দ্বীপ, শক দ্বীপ ও শাল্মলী দ্বীপ ও সেই সব দ্বীপের জলবায়ু আর ভূ-প্রকৃতির বিবরণ দিয়েছিলেন।  পৃথিবীতে জল-এর সৃষ্টি, মেঘ ও বৃষ্টিপাত, মহাজাগতিক গ্রহ সম্পর্কিত বস্তু সমূহের অবস্থান আর সঞ্চারণ পথ সম্পর্কে লিখেছিলেন। প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট সেই সময়ে পৃথিবীর পরিধি ২৪৮৩৫ মাইল গণনা করেছিলেন যা প্রকৃত পরিধি থেকে ০.২ % কম ছিল।

প্রাচীন চীনে  ভূবিদ্যা-র আলোচনা পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে। ভৌগোলিক মানচিত্র গঠিত হত তৎকালীন সাম্রাজ্য সমূহের অবস্থান ও বিস্তৃতি, নদী অববাহিকা, নদীপথ ও বাণিজ্য পথের অবস্থান ইত্যাদি সহ। শুই জিং নামে তৃতীয় শতকের এক অজ্ঞাতনামা লেখকের একটি বই পাওয়া গেছে যেখানে চীনের ১৩৭ টি নদীর তৎকালীন বিবরণ পাওয়া যায়।

জিয়া ড্যানের (৭৩০ ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দ) মতো চীনা ভৌগোলিকের বিভিন্ন বৈদেশিক অঞ্চলের যথাযথ বর্ণনায় সমুদ্রপথে পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথের বিবরণ ও মধ্যযুগীয় ইরানীদের দ্বারা সৃষ্ট সমুদ্রমধ্যে আলংকারিক স্তম্ভের কথা আছে যেগুলো আসলে জাহাজদের পথ দেখানোর বাতিঘর ছিল।

নবম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সোঙ সাম্রাজ্য এবং ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত মিঙ সাম্রাজ্যের আমলে নিয়মানুগ ভৌগোলিক চর্চা সম্পর্কে জানা যায়। সোঙ সাম্রাজ্যের প্রখ্যাত কবি, পণ্ডিত এবং সরকারি আধিকারিক ফান চেংদা (১১২৬ - ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) চীনের দক্ষিণ প্রদেশগুলির বিভিন্ন অঞ্চলের ভূসংস্থান, কৃষি ও আর্থ বাণিজ্যিক পণ্যের উপর ভূ-বিদ্যার সনদ লিখেছিলেন। বহুবিদ্যাজ্ঞ চীনা বৈজ্ঞানিক শেন কুও (১০৩১ - ১০৯৫  খ্রিষ্টাব্দ) দেশের অভ্যন্তরে পাওয়া সামুদ্রিক জীবাশ্ম এবং বাঁশ গাছের এলাকা থেকে বহুদূরে পাওয়া বাঁশ গাছের জীবাশ্ম থেকে ভূমি-র গঠনের উপর আনুমানিক ধারণা সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখে গেছেন। এই সোঙ সাম্রাজ্যের সময়কালে কোরিয়া এবং মধ্যযুগীয় কম্বোডিয়া-ও উপর ভৌগোলিক বিবরণ সমন্বিত বই পাওয়া যায়।

মিঙ সাম্রাজ্যের ভূগোলবিদ, জু জিয়াকে (১৫৮৭ - ১৬৪১  খ্রিষ্টাব্দ) চীনের বহু প্রদেশে ভ্রমণ করেছিলেন (অনেকসময় পদব্রজে)। তিনি একটি বৃহৎ ভৌগোলিক এবং ভূসংস্থানিক সনদ লিখেছিলেন যেখানে ছোটো ছোটো গিরিখাত, অভ্র ও স্ফটিক মিশ্রিত শ্লেটপাথরের মতো খনি গর্ভের অবস্থান ইত্যাদি তথ্য সম্বলিত তার ভ্রমণপথের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। চৈনিক লেখাগুলিতে মধ্য প্রাচ্য, ভারতবর্ষ এবং মধ্য এশিয়া-র বিভিন্ন সভ্যতার বর্ণনা আছে যেহেতু খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পর্যটক ঝ্যাং কিয়ানের সত্যনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা থেকে বৈদেশিক অঞ্চলের ভূসংস্থান ও ভৌগোলিক বিশেষত্ব সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

ঈজিপ্ট ও ব্যাবিলনেও প্রাচীন আলোচনা ছিল ভূবিদ্যা সম্পর্কে। ইজিপ্ট-এ নীলনদের অববাহিকা, ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের মানচিত্র এবং ব্যাবিলনে পৃথিবীর মানচিত্রের অন্যতম প্রাচীন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে।

গ্রিক-রোমান যুগে ভূবিদ্যা-র আলোচনা অনেক বিস্তার লাভ করে। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ-উচ্চতা সম্পর্কিত তথ্য, নগর-পরিকল্পনা চিত্র, ভূমির জরীপ ও প্রকারভেদ, নদী-র দৈর্ঘ্য-প্রস্থের পরিমাপ ইত্যাদি বিষয়ে উন্নত অনুশীলন ও ব্যবহারবিধি-র প্রচলন ছিল। আনুমানিক ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে রোমে পিউটিন্জার টেবিল হিসাবে পরিচিত এক গোটানো মানচিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যের সড়কপথগুলি দেখানো আছে এবং রোমান সাম্রাজ্যের বাইরে ব্রিটেন থেকে মধ্য-প্রাচ্য হয়ে আফ্রিকা এবং তারপর ভারত, শ্রীলংকা, চীন দেশের তখনকার জ্ঞাত অংশ সমূহ নিবদ্ধ আছে। একশোটির ও বেশি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছিল এই মানচিত্রটি-তে।

প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত ইরাটোসথেনেস (Eratosthenese, 276-194 BC) প্রাকৃতিক ভূগোলের অগ্রপথিক। তিনি এমন এক সময় এ বিষয়ে অবদান রাখেন যখন পণ্ডিতগণ পৃথিবীর আকার ও আকৃতি সম্পর্কেই অনিশ্চিত ছিলেন। মিশরের বিভিন্ন স্থানের দূরত্বের সাথে সূর্যের আলোক রশ্মির পতনকোণের পার্থক্য হিসাব করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ের মাধ্যমে ইরাটোসথেনেস প্রাকৃতিক ভূগোলবিদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিরস্তায়ী আসন করে নিয়েছেন। এটিই ছিলো বর্তমানে পরিচিত ভূআকৃতিবিদ্যার (Geodesy) প্রথম গবেষণা। ইরাটোসথেনেসের বহু মূল্যবান ভূগোলবিষয়ক কাজের মধ্যে এটি অন্যতম। তিনি মানচিত্রের গুরুত্বের কথা উপলব্ধি করেছিলেন এবং নিজেকে একজন দক্ষ কার্টোগ্রাফার (cartographer) হিসেবে গড়ে তুলেন। যখন পণ্ডিতগণ পৃথিবী গোলাকার না চেপ্টা এ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত, তখন ইরাটোসথেনেস গোলাকার পৃথিবীর কোন কোন স্থান সূর্যালোক দ্বারা অপর মণ্ডল অপেক্ষা অধিক উষ্ণ- এ বিষয়টি উপলব্ধি করেন এবং পৃথিবীকে কতিপয় পরিবেশমণ্ডলে বিভক্ত করে মানচিত্র তৈরি করেন। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, গোলাকার পৃথিবীতে একটি নিরক্ষীয় বলয়, দুটি মেরু বলয় এবং এদের মাঝে দুটি নাতিশীতোষ্ণ বলয় বিদ্যমান রয়েছে। ইরাটোসথেনেসের মৃত্যুর বহু শতাব্দি পর্যন্ত অনেক পণ্ডিত ইরাটোসথেনেসের জ্ঞানকে যথার্থ বলে মেনে নিতে পারেননি (ব্লিজ, ১৯৯৩)।

বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস (Herodotus, 485-424 BC) মিসর ভ্রমণের সময় মিসরকে ‘নীল নদের দান’ বলে মন্তব্য করেন এবং নীল নদের মোহনায় পলি সঞ্চয়ের আকৃতির মাঝে গ্রিক অক্ষর ডেল্টার Δ সাদৃশ্য খুঁজে পান এ ধরনের ভূবৈচিত্র্যকে তিনি ডেল্টা (বাংলায় বদ্বীপ) নামকরণ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দে প্লিনি জুনিয়র (প্লিনি সিনিয়র একজন বিজ্ঞানী ছিলেন) নেপলস উপসাগরে একটি নৌকায় দাঁড়িয়ে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রত্যক্ষ করে যে লিপিবদ্ধ করেছেন, তা সত্যই বিষ্ময়কর। তিনি বর্ণনা করেছেন, আগ্নেয়গিরির উপর ব্যাঙের ছাতার আকৃতির মেঘ কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং পম্পেই ও হারকোলিয়াম শহর দুটিকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলো। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আগ্নেয়গিরির ধ্বংসযজ্ঞ দেখছিলেন, তখন তিনি জানতেন না তারই মামা/মায়ের বড় ভাই ()(যিনি আবার তারই দত্তক পিতা-ও ছিলেন), ভিসুভিয়াসের লাভাস্রোতে পড়ে মারা যাচ্ছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, প্রাচীন ভূগোলবিদদের অধিকাংশ রচনা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পণ্ডিতদের সামান্য কিছু রচনা যা আমাদের পর্যন্ত এসেছে তা থেকে আমরা জাতে পারি, তখনকার নদীগুলো কত প্রশস্ত আর কত খরস্রোতা ছিলো, বর্তমানে ঘুমিয়ে আছে এরূপ কিছু আগ্নেয়গিরির কর্মকাণ্ড এবং তৎকালীন কিছু উদ্ভিদের কথা, যা বর্তমানে সেসব স্থান থেকে হারিয়ে গেছে। রোমান যুগের অবসানে ইউরোপে দীর্ঘ সময়ব্যাপী অন্ধকার যুগের শুরু হয়। মধ্যযুগে ভূগোল চর্চার দীপশিখা জ্বালিয়ে রেখেছিলো আরব অঞ্চলের মুসলিম এবং চৈনিক পণ্ডিতরা। মধ্যযুগে যুদ্ধ, আগুন এবং অবহেলার কারণে প্রাচীন অনেক মূল্যবান বই, মানচিত্র, রচনা চিরতরে হারিয়ে গেছে।

পঞ্চদশ শতকে ইউরোপীয়দের সামুদ্রিক অভিযান এবং ব্যাপক আবিষ্কারের যুগে প্রাকৃতিক ভূগোলের পুনর্জাগরণ ঘটে। পর্তুগিজরা আফ্রিকার উপকূল ঘুরে এশিয়ার পূর্বপ্রান্তে এবং কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ফিরে এসে জানায় পশ্চিমের ভূখণ্ডের কথা। মানচিত্রাঙ্কনবিদগণ সংগ্রহকৃত জ্ঞানের ভিত্তিতে সঠিক মানচিত্র তৈরি করতে শুরু করেন। নতুন আবিষ্কৃত দেশগুলো সম্পর্কে ইউরোপের শহরগুলোতে কখন বড় বড় নদী, বরফাবৃত সুউচ্চ পর্বতমালা, বোনো উপকূল, বিস্তীর্ণ সমতলভূমি, ভয়াল ভৃগুতট, সুউচ্চ বৃক্ষপূর্ণ গভীর বনভূমি, অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর বন্যপ্রাণি এবং অজানা সব মানুষের কথা প্রচার হতে শুরু করে। ইউরোপীয় অভিযাত্রী ও ভাগ্যন্বেষীরা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজসম্পদ নিয়ে ফিরে আসেন। ভৌগোলিক জ্ঞান সম্পদ লাভের চাবিকাঠিতে পরিণত হয়।

ইউরোপীয়রা যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের স্থাপিত উপনিবেশগুলোতে সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে ছুটে চলছে, তখন কিছুসংখ্যক বিজ্ঞানী প্রাপ্ত নতুন নতুন তথ্যগুলো যাচাইয়ের জন্য ভ্রমণে বের হন। আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট তাদের মধ্যে অন্যতম, যিনি সম্পদ নয়- জ্ঞান আহরণের জন্য নতুন মহাদেশ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়ছিলেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশের ওরিনোকো নদী পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন এবং ইকোয়েডর, পেরুতে মাঠজরিপ করেন। ১৮০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পূর্বে তিনি কিউবা ভ্রমণ করেন এবং মেক্সিকো পাগড় দেন। পরবর্তীতে তিনি সােইবেরিয়াসহ রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। পরবর্তীতে প্যারিসে স্থায়ী হয়ে তিনি আমেরিকা ভ্রমণের ওপর ৩০টি বই লেখেন এবং উনিশ শতকের বংশগতিসংক্রান্ত সেরা বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ হিবে পরিচিত ছয় খণ্ডের ‘কসমস’ সিরিজটি প্রকাশ করেন।

হামবোল্টের রচনা থেকে আমরা তার সময়ের প্রাকৃতিক ভূগোলের রাজ্য সম্পর্কে জানতে পারি। এটি প্রমাণিত হয় যে, প্রাকৃতিক ভূগোল কেবলমাত্র পৃথিবীর পৃষ্ঠসম্পর্কিত বিষয়াদিই অধ্যয়ন করে না, এটি এখন মৃত্তিকা, উদ্ভিজ্জ, প্রাণী, সমুদ্র এবং বায়ুমণ্ডল প্রভৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করে সমীক্ষা করে। যদিও ‘ফিজিক্যাল জিওগ্রাফি’ শব্দটি সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছে, তথাপি ব্যাপক বিস্তৃত ক্ষেত্রের জন্য এর নাম ‘ন্যাচারাল জিওগ্রাফি’ হলেই অধিক মানানসই হতো।

প্রাকৃতিক ভূগোলের উন্নয়নে তৎকালীন সম্পদশালী রাশিয়ার জারগণ (সম্রাটগণ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অষ্টাদশ শতাব্দির মদ্যভাগে রাশিয়ার শাসকরা অনেক ভূগোলবিদকে মেরুপ্রদেশীয় সাইবেরিয়ার বিভিন্ন সম্ভাব্যতা জরিপের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। রাশিয়ান ভূগোলবিদগণের মধ্যে মিখাইল লমোনোসোভ (Mikhail Lomonosov, 1711-1765)-কে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি সাইবেরিয়ার গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার উল্লেখযোগ্য অবদানগুলো হচ্ছে- মৃত্তিকার জৈবিক উৎস উদঘাটন, বরফখণ্ড বিচলনের একটি সমন্বিত নতির বিকাশসাধন, যা অদ্যাবধি মৌলিক হিসেবে বিবেচিত এবং তদানুযায়ী হিমবিজ্ঞান (Glaciology) নামে ভূগোলের একটি নতুন শাখার গোড়াপত্তন। লমোনোসোভের পথ ধরে উনবিংশ শতকে রাশিয়ার ভাসিলিভিচ ডকোচেভ (Vasily Vasili'evich Dokuchaev, 1846 –1903)-এর মতো বিখ্যাত ভূগোলবিদের জন্ম হয়। তিনি ‘ভূখণ্ড বা অঞ্চলের সমন্বিত নীতি’ (principle of comprehensive analysis of the territory) এবং রাশিয়ান শেরনোজেম (Russian Chernozem)-এর ওপর অবদান রাখেন, যা পরবর্তী সময়ে সহজে চিহ্নিতকরণযোগ্য ভূত্বকীয় স্তর মৃত্তিকা সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ধারণার সাথে পরিচিত করে| তিনি প্রথম মৃত্তিকার শ্রেণিবিন্যাস এবং মৃত্তিকা গঠনের পাঁচটি উপাদান চিহ্নিত করেন। এভাবে নতুন ভৌগোলিক সমীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে মৃত্তিকাবিজ্ঞান (Pedology) প্রতিষ্ঠিত হয়। একারণে ভিসিলি ডকোচেভকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। রাশিয়ান পণ্ডিতদের অবদানে জলবায়ুবিজ্ঞানও ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হয়। রাশিয়ার জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মধ্যে জার্মান বংশোদ্ভুত ভ্লাদিমির কোপেন (Wladimir Köppen)  সকলের অগ্রগণ্য। তিনি বিশ্বের জলবায়ু অঞ্চলের শ্রেণিবিভাগ করেন, যা আজও সঠিক হিসেবে সমাদৃত। যাহোক, এ মহান ভূগোলবিদ তার কাজের মাধ্যমে পুরাজলবায়ুবিজ্ঞানে (Paleoclimatology) অবদান রাখেন। ‘ভূতাত্ত্বিক অতীতের জলবায়ু’ (The climates of the geological past) নামে তার গবেষণার জন্য তাকে পুরাভূগোলের (Paleogeography) জনক বলা যায় (আলম, কে. আশলাফুল-২০১৪)।

উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথমভাগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ভূগোলবিদ উইলিয়াম মরিস ডেভিস (W.M. Davis)-এর অবদান। ভূগোলের সাধারণ তত্ত্ব হিসেবে তার প্রদত্ত ‘ভৌগোলিক চক্র’ (geographical cycle) কেবল বিষয় হিসেবে ভূগোলকে তার দেশে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে একটি মহামডেল (paradigm) হিসেবে কাজ করে। ডেভিসের মতানুসারে, সময়ের বিবর্তনে ভূগঠন পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যায়। (উইলিয়াম মরিস ডেভিসের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফলে ভূরূপবিজ্ঞান (Geomorphology) নামে ভূগোলের একটি নতুন শাখা বিকাশ লাভ করে।

প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রকৃতি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তীত হয়েছে। ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে জ্ঞানের এ শাখায় চারটি প্রধান ধারণা খুবই জোড়ালোভাবে প্রভাববিস্তার করেছিলো; যথা- (১) সমতাবাদ (Uniformitarianism) : এ তত্ত্ব পৃথিবীর বর্তমান অবস্থর জন্য বিপর্যয় শক্তি (catastrophic force) দায়ী এ ধারণা বাতিল করে দেয়। এর পরিবর্তে ধারণা দেয় যে, অবিরত সমতাসাধনের বিদ্যমান প্রক্রিয়াসমূহ আমাদের গ্রহটির অতীত ও বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। (২) বিবর্তনবাদ (Evolution theory) : চার্লস ডারোউনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বে প্রভাবিত হয়ে প্রকৃতিবিজ্ঞানীগণ প্রাকৃতিক প্রপঞ্চের (phenomena) বিভিন্নতার বিবর্তনমূলক ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করেন। (৩) তথ্যানুসন্ধান ও জরিপ (Exploration and Survey) : ১৯০০ সালের পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান আবিষ্কার ও সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুসন্ধান ও জরিপ কাজে প্রাকৃতিক ভূগোলের সকল ক্ষেত্র সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলো। (৪) সংরক্ষণ (Conservation) : ১৮৫০ সালের প্রথম দিক থেকে একসময়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যবিশিষ্ট এলাকায় মানবিক উন্নয়নের ফলশ্রুতিতে পরিবেশ সংরক্ষণের চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

১৯৫০ সালের পর থেকে দুটি শক্তি প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রকৃতি নির্ধারণে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখে। যথা- (১) সংখ্যাতাত্ত্বিক বিপ্লব (Quantitative Revolution) : এসময়ে প্রাকৃতিক ভূগোলে সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ কেন্দ্রীয় মনোযোগের বিষয়ে পরিণত হয়। মানচিত্রায়ন, মডেলসমূহ, পরিসংখ্যান, গণিত ও প্রকল্প পরীক্ষণ সবকিছু আসে পরিমাপ থেকে। (২) মানব-ভূমি সম্পর্ক (Human/Land Relationships) : পরিবেশের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ১৯৫০ এর দশকের পর থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে প্রাকৃতিক ভূগোলের বহু গবেষক পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাবের বিষয়ে সমীক্ষা শুরু করেন (আলম, কে. আশরাফুল-২০১৫)।

পৃথিবী সম্পর্কে তথ্য আহরণের মধ্যদিয়ে ভৌগোলিক জ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছিলো। বর্তমান যুগে মানুষের জ্ঞানের পরিধি এতো ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে যে, কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে সমস্ত ভৌগোলিক জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব নয়। ফলে দেখা দিয়েছে বিশেষায়নের ঝোঁক। আলেকজান্ডার ফন হামবোল্টের মতো প্রাকৃতিক জগতের বিষয়ে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আজকের দিনে বিরল। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ভৌগোলিক জ্ঞানের সন্ধানে উত্তরোত্তর জটিল-কঠিন পদ্ধতি বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশেষায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞানে বিশেষায়নের প্রয়োজন আছে। প্রথমে সামগ্রিক জ্ঞানকে কতকগুলো বিষয়ে খণ্ড করা হয়, আবার প্রতিটি বিষয়কে কতিপয় বিশেষীকরণে ভাগ করা হয়। এভাবেই বিজ্ঞানের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃতি লাভ করে। বিগত শতকে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন বিষয় একটি গুচ্ছ হিসেবে বিকশিত হয়েছে (ব্লিজ-১৯৯৩)।

১. ভূরূপবিজ্ঞান (Geomorphology) : ভূদৃশ্যের ভূগোল ‘ভূরূপবিজ্ঞান’ বা ভূমিরূপবিজ্ঞান প্রাকৃতিক ভূগোলের সর্বাপেক্ষা উৎপাদনশীল একটি ক্ষেত্র। মূল ইংরেজি পরিভাষাটি চয়ন করেন জার্মান ভূতত্ত্ববিদ আলবার্ট প্যাঙ্ক (Albert Penck)। গ্রিক তিনটি শব্দ Geo অর্থ পৃথিবী, morph অর্থ গঠন বা আকার এবং logos অর্থ বর্ণনা দিয়ে ভূপৃষ্ঠের গঠনকাঠামো সম্পর্কিত আলোচনার ক্ষেত্রকে বোঝানো হয়েছে। ভূপৃষ্ঠের অবয়বসমূহের উৎপত্তি, বিকাশ, প্রকৃতি এবং এগুলোর উদ্ভবের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল কার্যকারণ প্রভৃতির বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনাই হচ্ছে ভূরূপবিজ্ঞান। ভূরূপবিজ্ঞান হচ্ছে ভূগোলের সেই শাখা, যাতে অভ্যন্তরীণ অবস্থাসহ পৃথিবীর উপরিভাগের ভূদৃশ্য পরিবর্তনকারী প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করে।

ভূরূপবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু মূলত (১) ভূমির বন্ধুরতা বা ভূগঠনের দিক এবং স্কেল, (২) পদ্ধতি- যা ভূপৃষ্ঠের আকৃতি প্রদান করে, এবং (৩) যে দৃষ্টিভঙ্গিতে ভূমিরূপ পর্যালোচনা করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে (আলম, ২০১৪)।

২. জলবায়ুবিজ্ঞান (Climatology) : আবহবিদ্যা ও প্রাকৃতিক ভূগোল যৌথভাবে জলবায়ু ও তার বিস্তৃতি আলোচনার জন্য জলবায়ুবিজ্ঞান গঠন করেছে। জলবায়ুবিজ্ঞান কেবলমাত্র জলবায়ুর শ্রেণিবিভাগ বা বিস্তৃতিই পর্যালোচনা করে না, বৃহত্তরভাবে এটি মানব সমাজের সাথে জলবায়ুর সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, উদ্ভিজ্জের ধরন, মৃত্তিকা গঠনসহ পরিবেশের বিভিন্ন প্রশ্ন ও অন্তর্ভুক্ত করে। পৃথিবীকে বেষ্টনকারী বায়ুমণ্ডলের উপাদন এবং এদের বৈশিষ্ট্যের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাই হচ্ছে আবহবিদ্যা ও জলবায়ুবিজ্ঞান। নির্দিষ্ট সময়ে কোনো স্থানের বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলোর সমষ্টিগত অবস্থাকে আবহাওয়া বলে। অপরদিকে, কোনো স্থানের আবহাওয়ার দীর্ঘকালীন গড় অবস্থা পর্যালোচনা করলে যে সাধারণ অবস্থা দেখা যায়, তাকে জলবায়ু বলে। জলবায়ুবিজ্ঞানের তিনটি শাখা রয়েছে। এগুলো হলো : (১) প্রাকৃতিক জলবায়ুবিজ্ঞান, (২) আঞ্চলিক জলবায়ুবিজ্ঞান ও (৩) ফলিত জলবায়ুবিজ্ঞান।

৩. জীবভূগোল (Biogeography) : জীববিজ্ঞানের দিক থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান, বাস্তুবিদ্যা ও প্রাণিবিজ্ঞান- এ তিনটি উপক্ষেত্র প্রাকৃতিক ভূগোলের সাথে সম্পর্কিত। যখন জীববিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক ভূগোল উপরিস্থাপিত (overlap) হয়, তখন বৃহৎ উপক্ষেত্র জীবভূগোলের সৃষ্টি হয়, কিন্তু সেখানে জীবভূগোল নিজেই বিশেষায়িত। প্রাকৃতিক ভূগোল উদ্ভিদবিদ্যার সমন্বয়ে উদ্ভিদভূগোল গঠন করে এবং প্রাণিবিদ্যার সাথে সমন্বয়ে প্রাণিভূগোল উপক্ষেত্রের সৃষ্টি করে। স্মর্তব্য যে, জীবভূগোল নিজেই বাস্তুবিদ্যার সংযোজক, যা এই উপক্ষেত্র দুটির মধ্যে অবস্থান করে; বাস্তবে প্রাণিভূগোল ও উদ্ভিদ ভূগোল উভয়েই জীবভূগোলের অন্তর্ভুক্ত। জীবমণ্ডলের পর্যালোচনাই হচ্ছে জীবভূগোল, যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশ, মৃত্তিকা, প্রাণী ও উদ্ভিদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জীবভূগোল শব্দটি দ্বারা জীববিজ্ঞান ও ভূবিদ্যা উভয়কে একত্রে নির্দেশ করে। অশ্মমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও বারিমণ্ডলে জীবের বসবাসের উপযোগী অংশ যা জীবমণ্ডল নামে পরিচিত- এর আলোচনার ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। জীবমণ্ডলের জৈব বিষয়গুলো উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণ-রসায়ন প্রভৃতি শাখায় পর্যালোচনা করা হলেও জ্ঞানের পৃথক শাখা হিসেবে ভূগোল এর অর্থ ও বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোকপাত করে থাকে।

৪. মৃত্তিকা ভূগোল (Soil Geography) : প্রাকৃতিক ভূগোলের উপক্ষেত্র মৃত্তিকা ভূগোলের সম্পর্ক রয়েছে মৃত্তিকাবিজ্ঞানের (Soil Science) বা পেডোলজির (Pedology) সাথে। পেডোলজিস্টরা মৃত্তিকার অভ্যন্তরীণ গুণাবলি এবং মৃত্তিকার গঠন প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে থাকেন। মৃত্তিকা ভূগোলে মৃত্তিকার পারিসরিক ধরন, বিস্তৃতি এবং জলবায়ু, উদ্ভিজ্জ ও মানুষের সাথে সম্পর্কের বিষয় আলোচনা করা হয়।

৫. সমুদ্র ভূগোল (Marine Geography) : সমুদ্র ভূগোল সমুদ্রবিজ্ঞানের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে, এটি গঠনে সহায়তাকারী অন্যতম উপাদান যেমন মানবীয়, তেমনি প্রাকৃতিক। যে শাস্ত্রে বারিমণ্ডলের সমীক্ষা করা হয়, তাকে সমুদ্রবিজ্ঞান বলে। এটি বারিমণ্ডলের প্রাকৃতিক ও জৈবিক বিষয়গুলো বর্ণনা করে। সমুদ্রবিজ্ঞান অনেকগুলো উপক্ষেত্রে বিভক্ত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্র ভূতত্ত্ব, সমুদ্র ভূরূপবিজ্ঞান, প্রাকৃতিক সমুদ্রবিদ্যা, সমুদ্রের জলের রসায়ন, জৈব সমুদ্রবিদ্যা ইত্যাদি (আলম, ২০১৪)।

বায়ু, জল, জীব, মৃত্তিকা এবং ভূগঠন প্রাকৃতিক ভূগোল আলোচনার প্রধাণ উদ্দেশ্য এবং মানুষ কর্তৃক ভূপৃষ্ঠে এসবের ব্যবহার সাধারণভাবে  আলোচনা করা হয়। আবার পৃথিবীকে মানুষের সর্বোত্তম ব্যবহারের স্বার্থে বিজ্ঞানীগণ আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করে থাকেন। প্রাকৃতিক ভূগোল আলোচনার উদ্দেশ্যকে তাদের মাত্রা (dimension) এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে ভাগ করা যায়।

আমরা যে ভূপৃষ্ঠে বসবাস ও হাঁটাচলা করি, প্রাকৃতিক ভূগোলে ভূপৃষ্ঠ বলতে তারও থেকে বেশি কিছু বোঝায়। ভূপৃষ্ঠ কেবল একটি আয়তন (volume) নয়, বরং এর সাথে মানুষের সম্পর্ক ও অনুভবের দ্বারা একে চিহ্নিত করতে হবে।

এ আয়তনের কেন্দ্রে রয়েছে ভূপৃষ্ঠ, যেখানে আমরা বসবাস করি। এরসাথে ভূপৃষ্ঠের ঠিক নিচে ভূত্বকের একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভূমিরূপ ভূত্বকের পৃষ্ঠকে সজ্জিত করেছে, যা মূলত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রাকৃতিক শক্তির কর্মকাণ্ডের ফলাফল। ভূপৃষ্ঠের উপরের বায়ুমণ্ডলের কিছু অংশ এ আয়তনের অন্তর্ভুক্ত, যা প্রাকৃতিক ভূগোলে আলোচনা করা হয়। বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া ও অবস্থা ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন আবহাওয়া ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে ভূপৃষ্ঠের উপর ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, ভূত্বকের নিচের কিছু অংশ, জল ও স্থলভাগসহ সমগ্র ভূপুৃষ্ঠ এবং এর উপরের প্রায় ২০ কিমি ব্যাপী বায়ুমণ্ডল এ আয়তনের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে প্রাকৃতিক ভূগোলে স্থলভাগ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। কারণ এটি হাতের কাছে এবং মানুষের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। যাহোক, খাদ্য, খনিজ, জ্বালানি ইত্যাদির প্রধাণ উৎস এবং ভূপৃষ্ঠে পরিবহনের প্রধাণ মাধ্যম হিসেবে মহাসাগরগুলো ক্রমবর্ধমানহারে মনোযোগ আকর্ষণ করছে।  

অশ্মমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও জীবমণ্ডলের প্রতিটি পদার্থ কিছুসংখ্যক উপাদান দ্বারা গঠিত। যেমন- বায়ুমণ্ডলকে আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রেক্ষিতে বিবেচনা করা হয়। শিলা, ভূমিরূপ, মৃত্তিকা ইত্যাদি অশ্মমণ্ডলের উপাদান। নদী, হ্রদ, হিমবাহ, বরফাবরণ, মহাসাগর ইত্যাদি বারিমণ্ডলের অংশ এবং উদ্ভিজ্জ ও প্রণী জীবমণ্ডলের অংশ (জেমস, এস. গার্ডনার, ১৯৭৭)।১০ প্রকৃতপক্ষে, বিভিন্ন উপাদানের সন্বেয়ে প্রাকৃতিক ভূগোলের অনেক প্রপঞ্চ (phenomenon / ক্রিয়া-প্রক্রিয়া) গঠিত হয়।

প্রাকৃতিক ভূগোলে এরসব উপাদানগুলোর নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দ্বারা পৃথিবীর বর্ণনা করা যায়। এগুলো সময়ে বা একস্থান থেকে অন্যস্থানে প্রায়শ পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যেমন- তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বর্ষণ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ হচ্ছে বায়ুমণ্ডীয় চলরাশি বা সূচক, যা কোনো নির্দিষ্ট স্থানের ও সময়ের আবহাওয়া অবস্থা প্রকাশ করে। এদের প্রকৃতি এবং দীর্ঘ সময়কালে এগুলোর পরিবর্তন জলবায়ুর অবস্থা বর্ণনা করে। তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, বর্ষণ ইত্যাদির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটায়। এসব চলরাশি বা সূচক ভৌগোলিক পার্থক্য প্রদর্শন করে, একই সাথে এর দ্বারা জলবায়ু অঞ্চল নির্ধারণ করা যায় (আলম, ২০১৪)।

যখন একটি চলরাশি বা সূচকের পরিবর্তন অপর একটি চলরাশি বা সূচকের পরিবর্তন ঘটায়, তখন উপাদানগুলোর মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটে।চলরাশি বা সূচক গুলো কীভাবে একে অপরের ওপর প্রভাববিস্তার করে তা জানা থাকলে প্রপঞ্চ (ক্রিয়া-প্রক্রিয়া) গুলোর পরিবর্তন ও ভৌগোলিক ব্যাখ্যা করা যায়।

এরূপ মিথস্ক্রিয়া সাধারণত অনেক বেশি জটিল হয়ে থাকে। বাস্তবে অসংখ্য চলরাশি বা সূচক একসাথে মিথস্ক্রিয়া করে। সিস্টেমগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ সম্পর্কগুলোকে মডেলরূপে তৈরি করার প্রয়াস চালানো হয়। প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রধাণ উদ্দেশ্য হচ্ছে ভূপৃষ্ঠ বা আয়তনকে বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল, অশ্মমণ্ডল, জীবমণ্ডল এবং মানুষের পারস্পরিক মিথস্কিয়াকে একটি পদ্ধতি (system) হিসেবে উপস্থাপন করা (জেমস, এস. গার্ডনার, ১৯৭৭).

প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এতে অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও জীবমণ্ডল- এ চারটি মণ্ডলের উপাদানগুলোর বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে ও গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হয়।

উল্লেখিত চারটি উপাদান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভের জন্য পৃথিবীর উৎপত্তি, বয়স, ভূঅভ্যন্তরের গঠন এবং সমুদ্রের পর্যঙ্ক প্রভৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ সমীক্ষা করা হয়। ভূআলোড়নের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃজ শক্তির অধ্যয়ন, উভয়বিধ শক্তির মিথস্ক্রিয়া এবং এদের ফলাফল সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তি ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন ধরনের উঁচুনিচু ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, বায়ুমণ্ডল থেকে সৃষ্ট বহিঃজ শক্তি ভূপৃষ্ঠের উঁচু স্থানগুলোকে সমুদ্র সমতলে নামিয়ে আনার কাজে সবসময় ব্যস্ত থাকে।

প্রাকৃতিক ভূগোলে ভূপৃষ্ঠের পর্বতমালা, ভাঁজ, চ্যুতি প্রভৃতি বন্ধুর ভূপ্রকৃতির উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য এবং বিস্তৃতি বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, এদের বিস্তৃতি এবং অগ্ন্যুঃপাতের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ ও বিপর্যয়, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর প্রভাববিস্তার করে সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। বহিঃজ শক্তির দ্বারা (বিচূর্ণীভবন, ক্ষয়ীভবন, নগ্নীভবন) সৃষ্ট ভূপৃষ্ঠের অবয়বগুলোর পর্যালোচনা থেকে ভূমিরূপ পদ্ধতি এবং এর কাজের ধরন (প্রবহমান জলরাশি, ভূগর্ভস্থ জল, সমুদ্র ঢেউ, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ ইত্যাদি দ্বারা ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয় কাজ) সম্পর্কে জানা যায় (আলম, ২০১৪)।

বারিমণ্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলোর পর্যালোচনায় সমুদ্র তলের বন্ধুরতা, সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, সমুদ্রের সঞ্চয়, জোয়ার-ভাটা, সমুদ্র স্রোত, প্রবাল প্রাচীর, এটল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানগুলোর পর্যালোচনায় বায়ুমণ্ডলের সংমিশ্রণ, গঠন, উপাদান, জলবায়ু ও আবহাওয়ার নিয়ামক, সৌরতাপ, সৌর বিচ্ছুরণ, তাপসমতা, ভূপৃষ্ঠের তাপ বিকিরণ, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বর্ষণ, বায়ুভর, বায়ুপুঞ্জ, ঘূর্ণিঝড়, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, মৃত্তিকা ক্ষয় ও সঞ্চয়ন, পরিবেশ দূষণ, দুর্যোগ ও বিপর্যয় ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, প্রাকৃতিক পরিবেশের ধারাবাহিক পর্যালোচনা একই সাথে মানুষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের আন্তঃক্রিয়ার সম্পর্ক প্রাকৃতিক ভূগোলের সমীক্ষার বিষয়। নিম্নলিখিত কারণে প্রাকৃতিক ভূগোলের পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুতে প্রধাণ পরিবর্তনগুলো সূচিত হয়ে থাকে :

১.  প্রাকৃতিক ভূগোল মানুষের কল্যাণে অধিকতর অর্থবহ ও প্রায়োগিক এবং মানবীয় ভূগোলের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রাকৃতিক ভূগোল সংবদ্ধ এবং সমাজের সাথে অধিকতর সম্পর্কিত করার ইচ্ছা সর্বজনীন।

২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের প্রতি মানুষের অধিকতর মনোযোগ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানুষের বৈরী আচরণের ফলে পরিবেশগত ভরেসাম্য বিনষ্ঠ এবং প্রতিকারের উপায় অনুসন্ধান।

৩. বহিরাঙ্গন ও গবেষণাগারে যান্ত্রিকায়ন ও বিভিন্ন ভূমিরূপ পদ্ধতি পরিমাপের ক্রিয়াপদ্ধতি এবং উপাত্তসমূহের গাণিতিক বিশ্লেষণের প্রতি অধিকতর গুরুত্বারোপ।

৪. কতিপয় বিশেষ অবয়ব, যেমন- বাস্তুপদ্ধতি এবং বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও অস্থিতিশীলতা, জলবিজ্ঞান, প্লেট টেকটোনিক্স ইত্যাদির প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেওয়া।

৫. সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাক্রো-টেম্পোরাল (macro-temporal) স্কেলের পরিবর্তে মাইক্রো-টেম্পোরাল (micro-temporal) স্কেল এবং বৃহৎ ম্যাক্রো-স্পেশিয়াল (macro-spatial) স্কেলের পরিবর্তে ক্ষুদ্র মাইক্রো-স্পেশিয়াল (micro-spatial) স্কেল; ভূমিরূপ ও পারিবেশিক (environmental) পদ্ধতির সমীক্ষায় সমাজের সাথে অধিক সম্পর্কযুক্ত পারিবেশিক সমস্যাসমূহ সমাধনের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে (আলম, ২০১৪)।

মানবীয় ভূগোল হল ভূগোলের এমন একটি শাখা যা মানব সমাজের আকৃতিগত পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। এতে মানুষ, তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, এবং আর্থনৈতিক দিক নিয়ে পর্যালোচনাভূক্ত।

মানবিক ভূগোলে পৃথিবীপৃষ্ঠে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা, স্থানিক পার্থক্য এবং এই পার্থক্যের পেছনে প্রাকৃতিক প্রভাবকের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়।

কালে কালে মানবীয় ভূগোল গবেষণা করার বিভিন্ন পন্থা উদ্ভাবিত হয়েছে এবং এর অন্তর্ভুক্ত পদ্ধতিগুলো হচ্ছে:




#Article 93: সমাজ (117 words)


সমাজ বলতে মূলত এমন এক ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে। মানুষের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি একত্র হয়ে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ম-কানুন তৈরি করে; এরকম একত্র বসবাসের অবস্থাকে সমাজ বলে। মানুষ ছাড়াও ইতর প্রাণীর ক্ষেত্রে সমাজের অস্তিত্ব দেখা যায়, তবে সেখানে মানুষের মতো কাঠামোবদ্ধ সমাজের দৃষ্টান্ত নজরে আসে না।

সমাজের দুটো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো:

সমাজের মধ্যে যেমন সদস্যদের মধ্যে থাকে পরস্পর সৌহার্দ্য, সহযোগিতা, মমত্ব ; তেমনি তৈরি হতে পারে ঘৃণা, লোভ, জিঘাংসা। তাই সমাজের মধ্যে শৃংখলা ধরে রাখার স্বার্থে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অলিখিতভাবে তৈরি হয় কিছু নিয়ম, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার লঙ্ঘন চরম অসম্মানজনক, এবং সমাজের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য। তবে নিঃসন্দেহে সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থার জন্য সৌহার্দ্য, সহযোগিতা একান্ত দরকার।




#Article 94: প্রযুক্তি (135 words)


প্রযুক্তি বলতে কোন একটি প্রজাতির বিভিন্ন যন্ত্র এবং প্রাকৃতিক উপাদান প্রয়োগের ব্যবহারিক জ্ঞানকে বোঝায়। নিজের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে প্রজাতিটি কেমন খাপ খাওয়াতে পারছে এবং তাকে কিভাবে ব্যবহার করছে তাও নির্ধারণ করে প্রযুক্তি। মানব সমাজে প্রযুক্তি হল বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের একটি আবশ্যিক ফলাফল। অবশ্য অনেক প্রাযুক্তিক উদ্ভাবন থেকেই আবার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অনেক জ্ঞানের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। মানব সমাজের প্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সংজ্ঞায় বলা যায়, প্রযুক্তি হল কিছু প্রায়োগিক কৌশল যা মানুষ তার প্রতিবেশের উন্নয়নকার্যে ব্যবহার করে। যেকোন যন্ত্র এবং প্রাকৃতিক উপাদান সম্বন্ধে জ্ঞান এবং তা দক্ষভাবে ব্যবহারের ক্ষমতারকেও প্রযুক্তি বলা হয়।

আমরা যে পৃথিবী তে বাস করি তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করি। প্রযুক্তি হল জ্ঞান, যন্ত্র এবং তন্ত্রের ব্যবহার কৌশল যা আমরা আমাদের জীবন সহজ করার স্বার্থে ব্যবহার করছি।

প্রযুক্তির জীবন চক্রের চারটি পর্যায় রয়েছে। পাশের চিত্রে এটি বোঝা যাচ্ছে। ধাপ চারটি হচ্ছে:




#Article 95: সাহিত্য (263 words)


সাহিত্য বলতে যথাসম্ভব কোনো লিখিত বিষয়বস্তুকে বুঝায়। সাহিত্য শিল্পের একটি অংশ বলে বিবেচিত হয়, অথবা এমন কোনো লেখনী, যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায়, অথবা যা বিশেষ কোনো প্রকারে সাধারণ লেখনী থেকে আলাদা৷  মোটকথা, ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। ধরন অনুযায়ী সাহিত্যকে কল্পকাহিনি বা বাস্তব কাহিনি কিংবা পদ্য, গদ্য এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। পদ্যের মধ্যে ছড়া, কবিতা ইত্যাদি, গদ্যের মধ্যে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এছাড়াও অনেকে নাটককে আলাদা প্রধান শাখা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেন।  নাটকের মধ্যে নাটিকা, মঞ্চনাটক ইত্যাদিকে ভুক্ত করা যায়।

পদ্য (ইংরেজি: Poetry) হলো সাহিত্যিক ধারার একটি রূপ, যা কোনো অর্থ বা ভাব প্রকাশের জন্য গদ্যছন্দে প্রতীয়মান অর্থ না ব্যবহার করে ভাষার নান্দনিক ও ছন্দোবদ্ধ গুণ ব্যবহার করে থাকে। পদ্যে ছন্দোবদ্ধ বাক্য ব্যবহারের কারণে গদ্য থেকে ভিন্ন। গদ্য বাক্য আকারে লেখা হয়, পদ্য ছত্র আকারে লেখা হয়। গদ্যের পদবিন্যাস এর অর্থের মাধ্যমে বুঝা যায়, যেখানে পদ্যের পদবিন্যাস কবিতার দৃশ্যমান বিষয়বস্তুর উপর নির্ভরশীল।

গদ্য হলো ভাষার একটি রূপ, যা সাধারণ পদবিন্যাস ও স্বাভাবিক বক্তৃতার ছন্দে লেখা হয়। গদ্যের ঐতিহাসিক বিকাশ প্রসঙ্গে রিচার্ড গ্রাফ লিখেন, প্রাচীন গ্রিসের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, গদ্য তুলনামূলকভাবে অনেক পরে বিকশিত হয়েছে, এই আবিষ্কার ধ্রুপদী যুগের সাথে সম্পর্কিত।

নাটক হলো এমন এক ধরনের সাহিত্য, যার মূল উদ্দেশ্য হলো তা পরিবেশন করা। সাহিত্যের এই ধারায় প্রায়ই সঙ্গীত ও নৃত্যও যুক্ত হয়, যেমন গীতিনাট্য ও গীতিমঞ্চ। মঞ্চনাটক হলো নাটকের একটি উপ-ধরন, যেখানে একজন নাট্যকারের লিখিত নাটকীয় কাজকে মঞ্চে পরিবেশন করা হয়ে থাকে। এতে চরিত্রগুলোর সংলাপ বিদ্যমান থাকে এবং এতে পড়ার পরিবর্তে নাটকীয় বা মঞ্চ পরিবেশনা হয়ে থাকে।




#Article 96: নৃত্য (179 words)


নৃত্য শব্দটি সাধারণত শারীরিক নড়াচড়ার প্রকাশভঙ্গীকে বোঝায়। এ প্রকাশভঙ্গী সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা মনোরঞ্জন ক্ষেত্রে দেখা যায়। গীতবাদ্যের ছন্দে অঙ্গভঙ্গির দ্বারা মঞ্চে চিত্রকল্প উপস্থাপনের ললিত কলাই নৃত্য বা নাচ।

নৃত্যকলার সংজ্ঞা নির্ভর করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নন্দনতত্ত্বিক, শৈল্পিক এবং নৈতিক বিষয়ের উপর।

প্রাচীন মানুষের ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন বস্তু নিদর্শনের মতো নৃত্যকলার তেমন কোন বস্তু না পাওয়া গেলেও নৃত্যকলা প্রাচীন মানবের বিভিন্ন আচার উৎসবে নৃত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে প্রগৈতিহাসিক কালে নৃত্যকলার প্রমাণ পাওয়া যায়। খৃষ্টপূর্ব ৩৩০০ সালে মিশরীয় দেয়াল চিত্রে এবং ভারতের গুহা চিত্রে নৃত্যকলার ভঙ্গী উৎকীর্ণ রয়েছে। দেয়ালচিত্রে খোদিত ভঙ্গীগুলো হতে মনে হয় যে কিংবদন্তির কাহিনী পরিবেশনের জন্যই ঔ চিত্রগুলো উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে লিখিত বর্ণমালা প্রচলনের আগে নৃত্যকলার এই পদ্ধতির মাধ্যমেই এই সব গল্প বংশ পরম্পরায় চলে আসতো । 

নৃতকলার আরো একটি প্রাচীন প্রকাশ দেখা যায় অতীন্দ্রিয় চেতনায় বিভিন্ন কু-প্রভাব হতে মুক্ত করার আচার অনুষ্ঠানে । আজো নৃত্যকলার এই ব্যবহার ব্রাজিলীয় চিরহরিৎ বনাঞ্চলের সংস্কৃতি হতে কালাহারি মরুভুমির সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত । .

নৃত্যকলার ইতিহাসে ভারতীয় নৃত্যকলা হচ্ছে প্রাচীন নৃত্যকলার অন্যতম । খৃষ্টপূ্র্ব প্রথম সহস্রাব্দের বহু ভারতীয় গ্রন্থে ভারতীয় নৃত্যকলার বিষয়ে বর্ণনা দেখা যায়।




#Article 97: উৎসব (3465 words)


উৎসব বলতে সাধারণত সামাজিক, ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপটে পালিত আনন্দ অনুষ্ঠানকে বোঝায়।

বাংলায় প্রচলিত লোকায়িত উৎসবের মধ্যে রয়েছে পহেলা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তি,বর্ষা উৎসব শরৎ উৎসব
  নবান্ন উৎসব, পৌষ মেলা ও পৌষ পার্বণ বসন্ত উৎসব ইত্যাদি।  হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক উৎসবের মধ্যে রয়েছে জন্মাষ্টমী, রথযাত্রা, দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা।মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।

উৎসব আনন্দ প্রকাশ ও লাভের মাধ্যম, এক কথায় যাকে বলা যায় আনন্দানুষ্ঠান; ইংরেজিতে একে ‘এ জয়ফুল অব অনারিফিক সেলিব্রেশন’ বলে সংজ্ঞায়িত করা যায়। উৎসব পরিবারকেন্দ্রিক হতে পারে, আবার ব্যাপকভাবে সমাজকেন্দ্রিকও হতে পারে। কালের বিবর্তনে এসব উৎসবের কোনোটির রূপ বদলায়, কোনোটি বিলুপ্ত হয়, আবার কোনোটি নতুন সৃষ্টি হয়। উৎসবসমূহের কোনোটিতে থাকে সমাজ ও জাতীয়তার ছাপ, কোনোটিতে ধর্মের ছাপ, আবার কোনোটিতে থাকে রাজনীতির ছাপ। আদিম সমাজে মানুষের খাদ্যকামনাকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের শুরু হয়েছিল, আজ তা নানা বর্ণ ও বৈচিত্র্যে পূর্ণ। তবে সব অনুষ্ঠানের মূলেই রয়েছে আনন্দ লাভ।

উৎসবের মূল ভিত্তি এবং অধিকাংশ প্রাচীন আচার অনুষ্ঠানই যৌথ কর্ম। মানুষের প্রধান কর্ম কৃষির সঙ্গেও যোগ ছিল অনেক অনুষ্ঠান বা উৎসবের এবং সেসব নিয়ন্ত্রিত হতো চান্দ্রমাস দ্বারা। প্রাচীনকালের আচার অনুষ্ঠানগুলি ছিল অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে বশে আনার এক ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া; পরবর্তীকালের সংস্কৃতিতে তার চারিত্রিক উপাদান রয়ে গেছে। প্রাচীনকালের কৃষিভিত্তিক উৎসবগুলি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, যা পরবর্তীকালে অনেক আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠায় তার স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়।

এখানে যেসব উৎসব আলোচিত হবে সেগুলির সঙ্গে ধর্মের যোগ থাকলেও মূলত সেগুলি ধর্মীয় কারণে উদ্ভূত হয় নি, হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবেই; পরে সেগুলি আনুষ্ঠানিক উৎসবে পরিণত হয়। যেমন মুসলমানদের ঈদে কয়েক বছর আগেও গান-বাজনা ছিল একটি প্রধান উপাদান যা স্বতঃস্ফূর্ততার প্রতীক। কিন্তু বর্তমানে তা লোপ পেয়েছে। তবে বর্তমানে এসব উৎসব অনেকটা ফর্মাল হলেও কখনও কখনও তা কেবল ধর্মীয় মাত্রায় আবদ্ধ থাকে না; হয়ে ওঠে সামাজিক কর্মকান্ড এবং যোগাযোগের মাধ্যম।

বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় উৎসবগুলির উৎস প্রাচীনকালের লোকবিশ্বাস, পরে ধর্ম সেগুলিকে ফর্মাল করেছে। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের ঈদ ও মুহররম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; সে সঙ্গে রমজানের কথাও বলা যেতে পারে। কালে কালে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি এসবের ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং তাতে বদল হয়েছে ধর্মের শুদ্ধ রূপেরও, যে কারণে বাংলাদেশের মুসলমান ও মধ্যপ্রাচ্য বা ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনচর্চা এক নয়।

বাংলাদেশের মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে  ঈদুল ফিত্‌র ও  ঈদুল আযহা। রমজান শেষে ঈদুল ফিত্‌র পালিত হয়। ঈদের সামাজিক অর্থ উৎসব, আর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বারবার ফিরে আসা। অন্যান্য সামাজিক উৎসবের মতো ঈদও বারবার ফিরে আসে। একই কথা প্রযোজ্য ঈদুল আযহা ও হজ্জ সম্পর্কেও।

আদি যুগে এ দুটি উৎসব পালনে কৃষিজীবী মানুষের লোকায়ত বিশ্বাসের প্রভাব ছিল, পরে কিছু ধর্মীয় রীতি-নীতি যুক্ত হয়। বর্তমানে উৎসব দুটি যতটা গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হচ্ছে, আগে সেভাবে হতো না; কারণ তখন ঔপনিবেশিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ছিল, সে সঙ্গে ছিল জনগণের দারিদ্র্য এবং ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা।

মুগল যুগে ঈদের দিন যে হৈ চৈ বা আনন্দ হতো তা বহিরাগত উচ্চপদস্থ এবং ধনাঢ্য মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ছিল ব্যবধান। তবে মুগলরা যে ঈদের গুরুত্ব দিতেন তা বোঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় শাহী ঈদগাহর ধ্বংসাবশেষ দেখে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দ হিসেবে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান লোকায়ত মেলা। সে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে এবং বর্তমানে ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমপক্ষে বারোটি মেলার আয়োজন করা হয়। বিগত একশ বছরে বাঙালি মুসলমানরা যেভাবে ঈদ পালন করতেন তার বিবরণে দেখা যায়, ঈদ উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ ছিল বিশেষ ধরনের খাওয়া-দাওয়া। মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের খাবারের মধ্যে থাকত কোরমা-পোলাও, ঘরে প্রস্ত্তত নানা রকমের পিঠা, সেমাই ও শিউলি বোটার রঙে মাখানো জরদা। অবিবাহিত মেয়েরা পিঠার ওপর অাঁকতেন প্রজাপতি, যা বহুকাল ধরে বাঙালিদের কাছে বিয়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে শহরে এ দেশিয় উপাদানের অভাব ছিল। ঈদের খাওয়ার তালিকায় প্রধান হয়ে উঠত ঘরে তৈরী মিষ্টান্ন। ঢাকায় উনিশ শতকে ঈদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ঈদ মিছিল। সম্ভবত ঢাকার নায়েব-নাজিমগণ ঢাকার বিখ্যাত জন্মাষ্টমী মিছিলের অনুপ্রেরণায় এ মিছিল চালু করেছিলেন। মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কয়েক বছর আগে থেকে আবার এ মিছিল চালু হয়েছে।

পরবর্তীকালে ঈদের সঙ্গে কিছু স্থানীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে, যার অনেকগুলি এসেছে বিভিন্ন লোকাচার থেকে, যেমন ঈদের চাঁদ দেখে সালাম দেওয়া, কদমবুসি করা, মেলা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়।

অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বা শহুরে সংস্কৃতিও প্রভাব ফেলেছে এ উৎসবে। বিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশ দশকে ঢাকায় ঈদের দিন রমনা, আরমানিটোলা বা অন্যান্য মাঠে ‘খটক’ নাচ অনুষ্ঠিত হতো। এ ছাড়া ছিল নৌকা বাইচ, ঘুড়ি ওড়ানো, ঘোড়দৌড়, হিজরা নাচ ইত্যাদি। ঘোড়দৌড় ও হিজরা নাচ ছিল ঢাকার বাবু কালচারের অঙ্গ, যা যুক্ত হয়েছিল ঈদ উৎসবের সঙ্গে। এ শতকের শুরুতে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য আন্দোলন শুরু হলে ঈদ উৎসব নতুন গুরুত্ব লাভ করে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাদেশে দ’ুটি ঈদই জাতীয় ধর্মোৎসবে রূপান্তরিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে।

বিশ শতকে তিনদিনের ঈদুল আয্হা পালন উপলক্ষে কোরবানি, বিশেষত গরু কোরবানিতে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে বাধা দেওয়া হতো। কিন্তু সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠলে সে বাধা আর থাকে নি। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে অনেক মধ্যবিত্তের পক্ষে অন্তত একটি খাসি কোরবানি দেওয়া সম্ভব ছিল, কারণ তা পঞ্চাশ থেকে একশো টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। গ্রামে অনেকে পোষা খাসি বা গরু কোরবানি দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরে বিত্তবান ও বিত্তহীনের তফাৎ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরবানি এখন সামাজিক মর্যাদার সূচক হয়ে উঠেছে। গ্রামে এখন কোরবানি ধনী এবং মাঝারি চাষীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। শহরের পেশাজীবীদের অধিকাংশই ভাগে গরু কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেকের পক্ষে তাও সম্ভব নয়। বিত্তবানরা নিজেরাই গরু, খাসি কিংবা উভয়ই কোরবানি করেন।

কোরবানির কয়েকদিন আগে থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পশু বেচা-কেনার হাট বসে। হূষ্টপুষ্ট দামি গরুর গলায় ঝোলানো হয় কাগজের মালা। আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদ উৎসবের এ বৈশিষ্ট্যগুলি এখন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। নগরায়ণ, মধ্যবিত্তের প্রসার প্রভৃতি উৎসবের আমেজে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কোরবানিতে প্রাণীর বৈচিত্র্য এসেছে। খাসি এবং গরুর পাশাপাশি এখন উট ও দুম্বাও সীমিত সংখ্যায় কোরবানি দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের ঈদ মানে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া, নতুন কাপড় কেনা এবং ঈদের দিন যথাসাধ্য উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করা।

বাংলাদেশে শিয়া সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কম হলেও উনিশ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে মুহররম পালিত হয়েছে, যার রেশ এখনও বিদ্যমান। সুষক্ষ্ম মতাদর্শী মুগল শাসকদের অনেকেই মুহররমের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। মুর্শিদকুলী খান থেকে মুবারকউদ্দৌলা সবাই ছিলেন শিয়া সমর্থক।  সিরাজউদ্দৌলা তাদের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছিলেন ইমামবারা। শুধু তাই নয়, নওয়াবগণ মুহররম শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণও করতেন এবং মুহররমের ব্যয় নির্বাহ হতো সরকারি কোষাগার থেকে। ইংরেজ আমলে তা রহিত করা হয়। ঢাকার নায়েব-নাজিমরা ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই আঠারো ও উনিশ শতকে ঢাকায় শিয়া আধিপত্য প্রবল হয়। বাংলাদেশে তখন ঢাকা ছিল মুহররম পালনের প্রধান কেন্দ্র। গ্রামাঞ্চলে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে উনিশ শতকে। মুহররম নিয়ে গ্রামাঞ্চলে অনেক পুঁথি রচিত হয়েছে। সেগুলি মুহররম ছাড়া অন্যান্য সময়েও সুর করে পড়া হয়। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু  প্রকাশের (১৮৮৫-৯১) পর বাংলাদেশে মুহররম নতুন মাত্রা লাভ করে।

বাংলাদেশে যে মুহররম পালিত হয় তাতে বিভিন্ন সময়ে এখানকার হিন্দু ও লোকায়ত অনেক আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত হয়। ইরানে মুহররমের মিছিলে একটি শবযান বহন করা হয়, কিন্তু বাংলা তথা ভারতে থাকে দুটি। কারণ ভারতীয়সহ বাঙালি মুসলমানরাও বিশ্বাস করেন যে, হযরত আলীর দুছেলেই কারবালার যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেছিলেন; তাই আশুরার দিন ‘হায় হাসান! হায় হোসেন!’ বলে শোক প্রকাশ করা হয় এবং রোজা রাখা হয় দুজনের সম্মানেই। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তা নয়; হাসানকে বিষপানে হত্যা করা হয়েছিল মদীনায় ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আর হোসেন শাহাদত বরণ করেন কারবালায় ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে।ঢাকা ব্যতীত বাংলাদেশে অন্যান্য অঞ্চলের মুহররম পালন সম্পর্কে তেমন প্রাচীন তথ্য পাওয়া যায় না। উনিশ শতকের শেষার্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলমান গ্রামে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে তাজিয়া মিছিল বের করা হতো।

ঢাকায় এখন মুহররম পালনের মূল কেন্দ্র শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামবারা হোসেনী দালান। তবে ঢাকার সবচেয়ে পুরনো ইমামবারা ফরাশগঞ্জের বিবিকা রওজা মহল্লায় অবস্থিত। জনৈক আমীর খান ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। ১৮৬৯ সালের ঢাকার মানচিত্রে একটি পুরনো হুসেনী দালানের উল্লেখ আছে; ফুলবাড়িয়ার কাছে ছিল মীর ইয়াকুবের হুসেনী দালান। আরও দুটি পুরনো হুসেনী দালান ছিল ছোট কাটরা এবং মুকিম কাটরায়।

মুহররম মোটামুটি ১০ দিনের অনুষ্ঠান। আশুরার বা দশম দিনের অনুষ্ঠানটিই উল্লেখযোগ্য। ওই দিন ঢাকার আজিমপুরে বসত বিরাট মেলা, যা এখনও টিকে আছে। বিভিন্ন ইমামবারা থেকে ওই দিন তাজিয়া নিয়ে মিছিল করে সবাই আসে আজিমপুরের হুসেনাবাদে। সেখানে তাজিয়াগুলি কালো কাপড়ে ঢেকে নিঃশব্দে নিয়ে আসা হয় হুসেনী দালানে।

মুহররমের প্রধান অঙ্গ তার মিছিল। মিছিলে থাকে সাজানো তাজিয়া, দুলদুল ঘোড়া, নানা রঙের হাজারো নিশান, ‘হায় হাসান, হায় হুসেন’ ধ্বনি আর তাজিয়ার ওপর থাকে হাজার জালালী কবুতর। কিন্তু জন্মাষ্টমীর মিছিল যেমন হিন্দু-মুসলমান, নারী-পুরুষ সকলের নিকটই প্রিয় ছিল, মুহরমের মিছিল তেমনটি ছিল না। তখন মুহররমের মিছিলের অগ্রভাবে চলত লাঠি ঘোরানো, তলোয়ার খেলা আর পেছনে থাকত জ্বলন্ত ইটের মিছিল। অতীতে ঢাকায় শিয়া মুসলমানদের সংখ্যা কম হলেও শান-শত্তকতের সঙ্গে মিছিল বের করা হতো।

ষাটের দশক পর্যন্ত মুহররম মিছিলে জাঁকজমক ছিল, ক্রমে তা কমতে থাকে। এখন মূল যে মিছিল বের হয় তা সকালে শুরু হয় হুসেনী দালান থেকে। সেখান থেকে বখশীবাজার, আজিমপুর, পুরানা পল্টন হয়ে বিকেলে ধানমন্ডির লেকে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তাজিয়া বির্সজন দেওয়া হয়। আগে করা হতো আজিমপুরের কারবালার ঝিলে, এখন সে ঝিল আর নেই।

ঢাকার মুহররমের একটি প্রধান আকর্ষণ মেলা। মুহররম উপলক্ষে মেলা বসে হুসেনী দালান, বখশীবাজার, ফরাশগঞ্জ ও আজিমপুরে। এর মধ্যে আজিমপুরের মেলাটিই সবচেয়ে বড়। এ ছাড়া বাংলাদেশের যে কোনো অঞ্চলেই মুহররম পালিত হোক না কেন, এর আনুষঙ্গিক উপাদান হিসেবে মেলা থাকবেই।

বর্তমানে ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছুটা ভিন্ন মাত্রায় মুহররম পালিত হয়। কোনো কোনো এলাকায় নির্ধারিত বাড়িতে বংশ-পরম্পরায় বিভিন্ন লৌকিক পীর-ফকিরের অনুষ্ঠান ও শির্নী মানতের তারিখ অনুযায়ী মুহররম উদযাপিত হয়ে থাকে। উল্লিখিত বাড়িগুলিতে মুহররম মাসের প্রথম তারিখেই বাড়ির প্রাঙ্গণ বা বাড়ি সংলগ্ন একটি স্থানে মাটি দিয়ে চতুষ্কোণ বিশিষ্ট তিনতাকের একটি বেদি তৈরি করা হয়। বেদিটির সামনেই খনন করা হয় ছোট একটি পুকুর। বেদির চারকোণায় চার রঙের চারটি পতাকা গেঁথে তার মাঝে মাঝে কাঁচা মাটির ওপর পেতল বা রুপার তৈরী ছোট ছোট চাঁদ, তারা, চোখ ইত্যাদি লাগান হয় এবং সামনের পুকুরটি সাধ্যানুযায়ী দুধ বা পানিতে পূর্ণ করার পর বেদির একপাশে একটি ধারালো ছুরি বা তীর বিদ্ধ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ এ বেদিটিকে বলা হয় ‘বরকত মা’র থল। বেদির চারপাশে রঙ্গিন কাগজের ঝালর ও ছোট ছোট নিশান পুতে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তারপর একে কেন্দ্র করেই শুরু হয় অনুষ্ঠান। এখানে সবাই এসে মানত করে এবং জিনিসপত্র দিয়ে যায়। যিনি ‘থল’ পরিচালনা করেন তিনি দশদিন শুধু নিরামিষ খেয়ে রোজা রাখেন। এ ছাড়া মুহররমের বাকি অনুষ্ঠান যেমন, মর্সিয়া, জারি গাওয়া, লাঠি খেলা এসব অন্যান্য অঞ্চলের মতোই। তবে এসব গ্রামে মুহররমের সব অনুষ্ঠানের কেন্দ্রই ‘থল’ এবং দশই মুহররম মাটির বেদিটিকেই বিসর্জন দেওয়া হয়।

মুহররমে শুধু মুসলমানরাই নয়, এক  সময় হিন্দুরাও ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ১৮৩১ সালের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, বাংলায় বছরে ১৪ হাজার তাজিয়া নির্মিত ও প্রদর্শিত হতো, তার মধ্যে ৬০০টিই হিন্দুদের তৈরি। আসলে উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ধর্মীয় উৎসবগুলি ছিল সর্বসাধারণের জন্য এক ধরনের আনন্দোৎসব বা মিলনোৎসব, যে কারণে দুর্গাপূজা সহ হিন্দুদের উৎসবেও মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

মুহররমের অনুষ্ঠানের একটি প্রধান উপাদান মর্সিয়া,ভাটিয়ালি এবং জারি গাওয়া। এর একটি কারণ হলো হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলার লোকসমাজের সঙ্গীতপ্রিয়তা। মুহররম উপলক্ষে মর্সিয়া ও জারি গান তাই সাধারণ মানুষকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এক সময় যখন ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণের ওপর ততটা গুরুত্ব আরোপ করা হয় নি এবং হিন্দু ও মুসলমানের পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে নি, তখন গ্রামাঞ্চলে দুর্গাপূজায় যোগ দিতেন আপামর পল্লীবাসী। তখন ধর্মীয় ভেদাভেদ বর্তমানের মতো প্রখর না থাকায় তাতে উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিতেন সবাই। ওই একটি দিন গ্রামীণ সমাজের একঘেয়ে জীবনযাপনে আসত বৈচিত্র্য। এ উপলক্ষে উন্নতমানের ভোজ এবং থিয়েটারসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং সকলে আপনবোধে সেসব উপভোগ করত।

দুর্গাপূজা একটি প্রাচীন উৎসব, তবে কত প্রাচীন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। মহিষমর্দিনী দুর্গার সবচেয়ে প্রাচীন যে মূর্তিটি পাওয়া গেছে তা পনেরো শতকের। প্রাচীনকালে যে দুর্গাপূজা হতো তার প্রকৃতি ও রূপ ছিল ভিন্ন। এখন বাংলাদেশে যে দুর্গাপূজা প্রচলিত তা সম্পূর্ণ বঙ্গীয় ব্যাপার, প্রাচীন পদ্ধতিরই লৌকিকরূপ, যা বর্তমানে পরিণত হয়েছে শারদীয় উৎসবে। এটি অকালবোধন নামেও পরিচিত, কারণ অতীতে দুর্গাপূজা হতো বসন্তকালে এবং ওটাই ছিল দেবীপূজার প্রশস্ত সময়, কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাম কর্তৃক অকালে (শরৎকালে) দেবীর পূজা করার প্রসঙ্গ থেকেই শারদীয় পূজার প্রচলন হয়।

বাংলাদেশে দুর্গাকে অবলম্বন করে উৎসবের একটি পরম্পরা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন হয়। তারপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এ তিনদিন পূজা হয় এবং বিজয়া দশমীতে হয় বিসর্জন। বিজয়ার পরদিন থেকে পনের দিন ধরে চলে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। এর পরের পূর্ণিমা তিথিতে হয় লক্ষ্মীপূজা; কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকপূজা এবং মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে হয় সরস্বতী পূজা; এর আগে সাধারণত কার্তিক মাসের আমাবস্যা তিথিতে হয় দুর্গারই আরেক রূপ কালীর পূজা। আশ্বিনে দুর্গাপূজা দিয়ে যার শুরু, মাঘে সরস্বতী পূজা দিয়ে তার শেষ। এভাবে সকল দেবদেবীর আলাদা আলাদা পূজার বিধান থাকলেও গণেশ পূজার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই, তবে অন্য যে কোনো দেবদেবীর পূজার আগে গণেশ পূজা করে নিতে হয়; ‘ওঁ গণেশায় নমঃ’ না বলে কোনো দেবদেবীরই পূজা করা চলে না।

বঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের চোপদার রাজা কংসনারায়ণ (বাংলার দীউয়ান এবং তাহিরপুরের রাজা) ষোল শতকে। দীউয়ান হওয়ার পর কংসনারায়ণ চেয়েছিলেন মহাযজ্ঞ করতে। তখন রাজপুরোহিত ছিলেন বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্য বংশ। এ বংশের রমেশ শাস্ত্রী সে সময় সমগ্র বাংলা-বিহারে শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি রাজাকে বলেন, যে চাররকমের যজ্ঞ করার নিয়ম আছে তার কোনোটিই এ আমলে করা সম্ভব নয়; রাজা যেন বরং দুর্গাপূজা করেন; এ পরামর্শ দিয়ে তিনি দুর্গাপূজার পদ্ধতিও লিখে দিয়েছিলেন। তখন রাজা প্রায় আট-নয় লক্ষ টাকা খরচ করে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেন। সে থেকে দুর্গাপূজার শুরু।

বাংলাদেশে দুর্গাপূজা হিন্দুদের সর্বজনীন এবং সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হতে প্রায় তিনশ বছর লেগেছিল। দুর্গাপূজা জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব হিসেবে প্রথম পালিত হয় কলকাতায় উনিশ শতকে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং একে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত করার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখেন জমিদাররা।

তৎকালে ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় দুর্গাপূজার একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় কৃষ্ণকুমার মিত্রের আত্মজীবনী থেকে। তার বর্ণনা অনুযায়ী ঢাকের বাদ্য ও প্রতিমা গড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হতো পূজোর উৎসব। শরৎকালে মাঠময় জল থই থই করত এবং তার মধ্য দিয়েই প্রায় ঘরে ঘরে দুর্গোৎসব পালিত হতো। পূজায় প্রচুর পাঁঠাবলি হতো; অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়িতে তার সংখ্যা হতো কমপক্ষে ষাট। ঢাক, ঢোল ইত্যাদির বাদ্যে পাঁচ-ছয় দিন ওই জলময় অঞ্চল থাকত মুখরিত। গান, বাদ্য, আহার, বিহার এবং আমোদ-প্রমোদে নারী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ সকলে মাতোয়ারা হয়ে যেত। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তখন আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে থিয়েটার, কীর্তন, ঢপ, যাত্রা প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হতো।

এভাবে ময়মনসিংহের মুক্তগাছা ও গৌরীপুরের জমিদাররাও ১৯৪০-৪১ সাল পর্যন্ত মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেছেন। পূজা উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো যাত্রা, কবিগান, ঢপকীর্তন ইত্যাদি। মুক্তাগাছায় বিজয়ার দিন হাতির মিছিল হতো। প্রজারা পূজা উপলক্ষে একদিন রাজবাড়ির ভোজে আমন্ত্রিত হতেন। রাজবাড়ি ছাড়া সাধারণ গৃহস্থদের ঘরেও পূজা অনুষ্ঠিত হতো। পূজার সময় প্রবাসী সকলে নিজ নিজ বাড়ি এসে আনন্দোৎসবে যোগ দিতেন। দুর্গাপূজায় কোনো বর্ণভেদ নেই; সব সম্প্রদায়ের হিন্দুরাই পূজা করতে এবং পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন। তবে বর্ণপ্রথার কিছুটা প্রভাব থাকতই।

উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকায় দুর্গাপূজা পালনের বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্তের আত্মজীবনীতে। তখন মৈশুন্ডির এক বাড়িতে লাল দুর্গার প্রতিমা তৈরি করা হতো। সূত্রাপুরে ‘ঢাকার বাবু নন্দলালের’ বাড়িতে দোতলার সমান উঁচু প্রতিমা হতো। তবে  রামকৃষ্ণ মিশনএর পূজাই ছিল বিখ্যাত। সেখানে দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড় হতো; সন্ন্যাসীরা কীর্তন করতেন। এ সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে ব্রাহ্মণেতর মানুষদের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ ঘটে। তারা ব্রাহ্মণদের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করেন এবং কেউ কেউ পুরোহিত ছাড়া নিজেরাই পূজা করেন। নেত্রকোণার চন্দপাড়ায় এরকম কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল।

১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে বাংলাদেশের অনেক অবস্থাপন্ন হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে এককভাবে পূজা অনুষ্ঠান করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই গ্রামাঞ্চলে বর্ণবিভেদ ভুলে ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সকলে একত্রিত হয়ে চাঁদা তুলে পূজার অনুষ্ঠান শুরু করেন যা এখন ‘সর্বজনীন পূজা’ হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে যত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার প্রায়ই সব সর্বজনীন। তবে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগেও পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিণত হয়েছে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রধান কেন্দ্রে। এখানে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় পূজা কমিটির মাধ্যমে প্রতিবছর দুর্গপূজাসহ অন্যান্য পূজাও অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশে দুর্গোৎসবে এক সময় সব সম্প্রদায়ের মানুষই যোগ দিতেন, এখনও দেন, তবে আগের মতো নয়। বাঙালি হিন্দুর কাছে দুর্গা কন্যারূপে পরিগণিত। প্রতিবছর তিনদিনের জন্য তিনি পুত্রকন্যাসহ পিত্রালয়ে আসেন ‘নাইয়র’ কাটাতে। এ উপলক্ষে তাই রচিত হয়েছে অনেক আগমনী-বিজয়া গান।

এক সময় এ অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে ঢাকাবাসীরা আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করতেন জন্মাষ্টমীর মিছিলের জন্য। জন্মাষ্টমী পালন এ অঞ্চলের একটি প্রাচীন উৎসব, বিশেষ করে ঢাকা শহরের; এতে এক সময় হিন্দু-মুসলমান সবাই অংশগ্রহণ করতেন। জন্মাষ্টমীর সময় ঢাকা শহরে যে মিছিল বের হতো তা সারা বাংলায় বিখ্যাত ছিল। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে কথিত হয়, তাই এ দিনটি হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট অতিশয় পবিত্র। উপমহাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কোনো না কোনোভাবে এ তিথি উদযাপিত হয় ধর্মীয় উৎসব হিসেবে। তবে অনেকেই ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলের উল্লেখ করায় মনে হয় বিভিন্ন জায়গায় এটি অন্যান্য ধর্মীয় তিথির মতো সাধারণভাবে পালিত হলেও ঢাকায় বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হতো।

জন্মাষ্টমী পালনের প্রধান অঙ্গ ছিল এর মিছিল। তবে কেন এবং কখন এর শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। ১৯১৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ভুবনমোহন বসাকের একটি পুস্তিকা থেকে এ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায়। সে অনুযায়ী ১৫৫৫ সালে (ভাদ্র, ৯৬২ বঙ্গাব্দ) জনৈক সাধুর নেতৃত্বে ‘শ্রীশ্রী রাধাষ্টমী’ উপলক্ষে হলুদ পোশাক পরিহিত বালক ও ভক্তদের এক মিছিল বের হয়। এর দশ বছর পরে তাদেরই নেতৃত্বে ১৫৬৫ সালে (ভাদ্র মাসে) শ্রীকৃষ্ণের জন্ম উপলক্ষে প্রথম জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হয়। পরে এর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব অর্পিত হয় নওয়াবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাকের পরিবারের ওপর।

কালক্রমে সে মিছিল একটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে এবং প্রতি বছর জন্মাষ্টমী উৎসবের নিয়মিত অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। মুসলমানরা এ মিছিলের নামকরণ করেছিলেন ‘বাল গোপালের মিছিল’ বলে। এরপর নওয়াবপুরের অন্যান্য অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি নিজ নিজ উদ্যোগে মিছিল বের করতে শুরু করেন। প্রায় একশ বছর পরে উর্দু বাজারের গঙ্গারাম ঠাকুর নামে জনৈক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণও নওয়াবপুরের বসাকদের অনুকরণে জন্মাষ্টমীর মিছিল বের করা শুরু করেন। তার মিছিল আসত উর্দু রোড থেকে নওয়াবপুর পর্যন্ত। অন্যান্য মিছিলও সাধারণত নওয়াবপুর থেকে বাংলা বাজার হয়ে নওয়াবপুরেই প্রত্যাবর্তন করত। তবে গঙ্গারাম ঠাকুরের মিছিল বেশি দিন চলে নি। সম্ভবত এক সময় নওয়াবপুরের বিভিন্ন মিছিল সমন্বিত করে একটি মিছিলে রূপ দেওয়া হয়েছিল, যা পরিচিত হয়ে ওঠে নওয়াবপুরের মিছিল নামে।

১৭২৫ সালের দিকে গদাধর ও বলাইচাঁদ বসাকের নেতৃত্বে ইসলামপুর থেকেও জন্মাষ্টমীর একটি মিছিল বের হতে থাকে। এর সঙ্গে নওয়াবপুরের মিছিলের একবার সংঘর্ষ হলে বাংলার তৎকালীন লেঃ গভর্নর স্যার সিসিল বিডন একেক দিন একেক দলের মিছিল বের করার বিধান করে দেন। এর পর উনিশ শতকে ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিল জমকালো হয়ে ওঠে এবং এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। তখন দূরদূরান্ত থেকে লোক আসত ঢাকায় জন্মাষ্টমীর মিছিল দেখতে। সমগ্র ঢাকা তখন হয়ে উঠত উৎসবের নগরী। জন্মাষ্টমীর মিছিলের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে সুস্পষ্ট যে, আদিতে এটি ছিল একান্তভাবে ধর্মীয়, পরে ধর্মীয় প্রভাব অনেকটাই শিথিল হয় এবং হিন্দু-মুসলিম সকলের অংশগ্রহণে তা সর্বজনীন রূপ লাভ করে।

জন্মাষ্টমী মিছিলের প্রধান আকর্ষণ ছিল সঙের নাচ-গান। সঙরা বিভিন্ন রকম গান গাইত ও নাচত। সময়ের বিবর্তনে তাদের গানের পরিবর্তনও ঘটত এবং তা থেকে বিশেষ বিশেষ সময়ে জন্মাষ্টমীর স্বরূপগত পরিবর্তনটা বোঝা যেত। ১৮৬৪ ও ১৮৭২ সালের বর্ণনা থেকে দেখা যায়, দুটি মিছিলে এক পক্ষ অন্য পক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করছে। এতে বিশেষ বিশেষ ঘটনার বর্ণনাও স্থান পেত এবং এ ধারা অব্যাহত ছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাবু কালচারের উপাদানসমূহ, যেমন অশ্লীল গান, নাচ ও খেমটা।

বিশ শতকের তিন এর দশকে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি ঘটলে মিছিলের জাঁকজমক অনেকটা হ্রাস পায় এবং পাকিস্তান আমলে সরকারি আদেশে তা বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া তখন নানা কারণে মিছিল বের করার পরিবেশও ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরে ঢাকায় আবার জন্মাষ্টমীর মিছিল বের হতে শুরু করে।

বাংলাদেশে হিন্দু ছাড়া আরও দুটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদেরও বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়। তবে সেগুলি কখনও মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল না এবং এখনও নয়। বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা। বুদ্ধদেবের জন্ম, গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব লাভ, পরিনির্বাণ সবই বৈশাখী পূর্ণিমায় ঘটেছিল, তাই এ উৎসব বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র উৎসব। বাংলাদেশে সহস্রাধিক বছর আগে থেকেই মহাসমারোহে বৈশাখী পূর্ণিমা পালিত হতো বলে অনুমান করা হয়।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে খ্রিস্টানদের ক্রিস্টমাস বা যিশু এর জন্মদিন (বড়দিন) সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো, বিশেষ করে কলকাতায়। এ উপলক্ষে দেশিয়রাও নানারকম অনুষ্ঠান করতেন। বড়দিনের উৎসব একদিনের। গির্জায় গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা, ভোজসভা এবং উপহার বিতরণ এ উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে বাংলাদেশে বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানদের সংখ্যা নগণ্য, তাই তাদের উৎসবও পালিত হয় অনেকটা নীরবে।

বর্তমান বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে আরেকটি উৎসব যার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই, সেটি হলো বাংলা নববর্ষ। বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ মহাসমারোহে পালিত হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য এ যে, এটি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একটি সামাজিক উৎসব। এর চরিত্র সর্বজনীন। ধর্মভিত্তিক নয় অথচ সর্বজনীন এমন উৎসব পৃথিবীতে বিরল। বিগত ৪০০ বছরে কৃষি ও ঋতুর সঙ্গে যুক্ত অনেক অনুষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং এভাবে আবর্তিত হয়ে পহেলা বৈশাখ রূপান্তরিত হয় নববর্ষে। বিশ শতকের ষাটের দশক থেকে বাংলা নববর্ষ এক নতুন মাত্রা লাভ করে। আইয়ুব আমলে (১৯৬৪) রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ শুরু হলে ছায়ানট পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালন উপলক্ষে রমনার বটমূলে আয়োজন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান। ছায়ানটের এ প্রচেষ্টা ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা নববর্ষ ঘোষিত হয় সরকারি ছুটির দিন হিসেবে। বাংলা নববর্ষ এখন বাংলাদেশের একটি প্রধান সামাজিক উৎসব।

কালে কালে এ নববর্ষের সঙ্গে জড়িত হয়েছে আরও অনেক আনুষঙ্গিক বিষয়। সেসবের কোনোটি এখন বিলুপ্ত, কোনোটি লুপ্তপ্রায় এবং কোনো কোনোটি আবার অঞ্চলবিশেষে প্রচলিত আছে। লুপ্তপ্রায় একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে পুণ্যাহ। এর উদ্ভবকাল সঠিকভাবে জানা যায় না, তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি প্রচলিত ছিল। এদিন প্রজারা ভালো পোশাক-পরিচ্ছদ পরে জমিদারের কাচারিতে যেতেন খাজনা-নজরানা দিতে, যেন পুণ্য কাজ করতে যাচ্ছেন। তাই এর নাম হয়েছে পুণ্যাহ।

হালখাতা অনুষ্ঠানটি অবশ্য এখনও প্রচলিত আছে। প্রধানত ব্যবসায়ী মহল এটি পালন করে। নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব-নিকাশ সমাধা করেন। এ জন্য অনেকে লাল কাপড়ের মলাটের এক বিশেষ খাতা ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় খেরো পাতা। এদিন ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করান। শুধু তাই নয়, সাধারণ লোকদের মধ্যেও অনেকেই আজকাল নববর্ষ পলক্ষে মিষ্টিসহ ভালো খাবারের আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চট্টগ্রামের জববারের বলীখেলা বা কুস্তি। রাজশাহীর গম্ভীরাও এমনি একটি অনুষ্ঠান। ঢাকার মুন্সিগঞ্জে এক সময় গরু দৌড় প্রতিযোগিতার প্রচলন ছিল। তবে পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড়ো অনুষ্ঠান মেলা। কোথাও কোথাও এ মেলা সপ্তাহ কিংবা পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। নববর্ষের এ মেলাগুলি দেশের প্রাচীন আর্তব উৎসব, কৃষি উৎসব প্রভৃতির বিবর্তিত রূপ; কেননা এগুলিতে এখন পর্যন্ত স্থানীয় কৃষিজাত ও কুটিরশিল্পজাত দ্রব্যাদির বেচাকেনা হয়। বৈশাখী মেলার আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো অন্যান্য মেলার মতো এতে ধর্মীয় প্রভাব নেই। সমগ্র বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ ও বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ২০০ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাসহ অন্যান্য শহর বা শহরাঞ্চলে আয়োজিত মেলায় মাটির ও কুটিরজাত পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থমেলারও আয়োজন করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান নববর্ষের শুভেচ্ছা হিসেবে মক্কেলদের বই উপহার দেয়।




#Article 98: খেলনা (109 words)


খেলনা ভালুক

খেলাধূলায় ব্যবহৃত সামগ্রীই খেলনা। সাধারণতঃ শিশুরা আর ঘরে পোষা জীবজন্তুরাই খেলনা নিয়ে খেলে, যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের বা বন্য প্রাণীদের খেলনা নিয়ে খেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। খেলনা হিসেবে প্রচুর কিছু বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা হয়। আবার খেলার জন্য তৈরি করা হয়নি এমন যে কোন কিছুকেই খেলনা হিসেবে কল্পনা করে তা নিয়ে কেউ খেলতে পারে — ঘরের যে কোন জিনিসকে এরোপ্লেন ভেবে নিয়ে 'উড়িয়ে' নিয়ে যেতে পারে একটি শিশু, আবার একটা পাইন কোনকে থাপড়ে, চাপড়ে, তাড়া করে, শূন্যে ছুঁড়ে খেলতে পারে কোন প্রাণী। কিছু কিছু খেলনা আবার প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র খেলনা সংগ্রহকারীর জন্যই তৈরি করা হয়, খেলার জন্য নয়।

খেলনার সৃষ্টি প্রাগৈতিহাসিক কালে; বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে শিশুদের খেলনার উপকরণ খুঁজে পাওয়া গেছে।




#Article 99: সংখ্যা (364 words)


সংখ্যা হলো পরিমাপের একটি বিমূর্ত ধারণা । সংখ্যা প্রকাশের প্রতীকগুলিকে বলা হয় অঙ্ক ।
এর প্রকৃত উদাহরণগুলি হল স্বাভাবিক সংখ্যা ১, ২, ৩, ৪ এবং আরও অনেক কিছু।

বর্তমান গণিতের জন্ম হয়েছে গণনা থেকে। গণনার ধারণা থেকেই প্রথম সংখ্যা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল যদিও সংখ্যার জন্ম হয়েছে অনেক সময়ের ব্যবধানে। প্রাচীন প্রস্তর যুগে মানুষ যখন গুহায় বসবাস করতো তখনও এক-দুই পর্যন্ত গণনা চালু ছিল বলে ধারণা করা হয়। তখন পারিবারিক বা সামাজিক জীবন ভালো করে শুরু না হলেও পদার্থের রূপ সম্বন্ধে তারা ওয়াকিবহাল ছিল। নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ খাদ্য আহরণ, উৎপাদন এবং সঞ্চয় করতে শুরু করে। মৃৎ, কাষ্ঠ এবং বয়ন শিল্পের প্রসার ঘটে যার অনেক নমুনা বর্তমানে আবিষ্কৃত হয়েছে। অধিকাংশের মতে এ সময়েই ভাষার বিকাশ ঘটে। তবে ভাষা যতটা বিকশিত হয়েছিল তার তুলনায় সংখ্যার ধারণা ছিল বেশ অস্পষ্ট। সংখ্যাগুলো সর্বদাই বিভিন্ন বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতো। যেমন, পশুটি, দুটি হাত, একজোড়া ফল, এক হাঁড়ি মাছ, অনেক গাছ, সাতটি তারা ইত্যাদি। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং আফ্রিকার অনেক গোত্র আজ থেকে মাত্র দুশো বছর আগেও এ অবস্থায় ছিল।

বিশুদ্ধ সংখ্যা বলতে বস্তু নিরপেক্ষ সংখ্যার ধারণাকে বুঝায়। প্রস্তর যুগ পেরিয়ে আরও অনেক পরে এ ধারণার বিকাশ ঘটেছে। এক বা দুইয়ের গণ্ডী পেরিয়ে আরও বড় সংখ্যা নির্দেশ করতে প্রথম কেবল যোগ ব্যবহার করা হতো। পরে ধীরে ধীরে যোগ এবং গুণনের সাহায্যে ছোট থেকে বড় সংখ্যার দিকে যাওয়া শুরু হয়। দুটি অস্ট্রেলীয় গোত্রের উদাহরণ এখানে উল্লেখ্য:

সংখ্যার ধারণা স্পষ্ট হতে শুরু করে বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে। কারণ এ সময় হিসাব সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন পড়ে এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের তথ্যের আদান প্রদান জরুরি হয়ে উঠে। একটি স্পষ্ট সংখ্যা ধারণার উদাহরণ হিসেবে বাংলা সংখ্যা পদ্ধতির কথা বলা যেতে পারে। দশমিক প্রণালী ব্যবহার করে এখানে সংখ্যা গণনা করা হয়ে থাকে। এক থেকে দশ পর্যন্ত হল মূল সংখ্যা।

সংখ্যাকে বিভিন্ন ব্যবস্থায় প্রকাশ করা সম্ভব:

এই ব্যবস্থায় সংখ্যার একেকটি অঙ্ক দশের এককটি গুণিতক।

অনেক একককে দশের বিভিন্ন গুণিতকে প্রকাশ করার জন্য বিশেষ উপসর্গ আছে:

বাইনারি সংখ্যা ব্যবস্থায় শুধু দুইটি অঙ্ক, ০ ও ১ ব্যবহার করা হয়। যেমন, দশমিক ৬ সংখ্যাটি বাইনারিতে প্রকাশিত হবে ১১০ হিসাবে। প্রতিটি অবস্থানের গুরুত্ব (weight) ২ করে, অর্থাৎ ৬ = ১* ২২+১* ২১+১* ২০। এই সংখ্যা পদ্ধতির সুবিধা হল ইলেক্ট্রনিক বর্তনীতে খুব সহজেই বাইনারি সংখ্যার হিসাব করা যায়, ফলে কম্পিউটার ও ডিজিটাল বর্তনীতে এই সংখ্যা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।




#Article 100: উপপাদ্য (182 words)


উপপাদ্য হলো এক প্রকারের প্রস্তাবনা, যা কিছু প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে প্রমাণ করা হয়। গণিতের ভাষায়, উপপাদ্যের দুইটি অংশ রয়েছে -

	
উপপাদ্যকে গাণিতিক সমীকরণের সাহায্যে প্রকাশ করা যায় তবে বাংলা,ইংরেজির মত সাধারণ ভাষাতেও প্রকাশ করা যায়।

বেশিভাগ উপপাদ্যও পূর্বের কোনো হাইপোথিসিসের উপর নির্ভরশীল। যেমন যদি ক সত্য হয় তবে খ সত্য,এই উপপাদ্যটিতে বলা হয়নি খ সত্য,এখানে বলা হয়েছে খ সত্য হবেই যদি ক সত্য হয়। এখানে ক হলো হাইপোথিসিস এবং খ হলো সিদ্ধান্ত।

উপপাদ্যকে প্রায়ই তুচ্ছ,কঠিন,গভীর এমনকি সুন্দর উপাধি দেয়া হয়। এ ধরনের উপাধি মানুষ থেকে মানুষে পরিবর্তিত হয়, এমনকি সময়ের সাথে সাথেও পরিবর্তিত হয়। যেমন আরো সহজ প্রমাণ আবিষ্কৃত হলে একটি কঠিন উপপাদ্য তুচ্ছ উপাধি পেতে পারে। গভীর উপপাদ্যগুলো খুব সাধারণ ভাবে বর্ণনা করা হয় কিন্তু সেগুলোর প্রমাণে আশ্চর্যজনক ভাবে গণিতের বিভিন্ন জটিল অংশের সংযোগ থাকতে পারে, ফের্মার শেষ উপপাদ্য এধরনের উপপাদ্যের একটি পরিচিত উদাহরণ।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যানের মতে একটি উপপাদ্য প্রমাণ করা যত কঠিনই হোক না কেনো প্রমাণ করার পর সেটা গণিতবিদদের নিকট তুচ্ছ। ফলে গাণিতিক স্বত্ত্বা দুই রকমেরঃ তুচ্ছ এবং অপ্রমাণিত।

গণিতবিদ রোনাল্ড গ্রাহাম ধারণা করেন প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গাণিতিক উপপাদ্য প্রকাশিত হয়।




#Article 101: ত্রিকোণমিতি (434 words)


ত্রিকোণমিতি গণিতের একটি শাখা, যাতে ত্রিভুজের কোণ, বাহু ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হয়। ত্রিকোণমিতি শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Trigonometry। এই শব্দটি আবার গ্রিক শব্দ trigōnon ত্রিভুজ এবং metron পরিমাপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

বিশেষ করে ত্রিভুজের তিনটি কোণের অপেক্ষকগুলো নানা পরিমাপের কাজে লাগানো যায়। ত্রিভুজের একটি কোণের ছয়টি অপেক্ষক বা ফাংশন থাকে যথা সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্ট, কোট্যান্জেন্ট, সেক্যান্ট এবং কোসেক্যান্ট। এগুলো ব্যবহার করে অজানা কোণ ও দূরত্ব পরিমাপ করা হয়।

ত্রিকোণমিতির অপেক্ষকগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন মানের পাল্লার প্রতিরূপ দেয়া যায় বা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। এগুলো পুনরাবৃত্ত প্রতিভাসের প্রতিরূপে, যেমন সরল দোলকের গতি অথবা পরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহের বিশ্লেষণে উদ্ভূত হয়। ত্রিকোণমিতির ব্যবহার করে দৈর্ঘ্যের এক বিশাল জালি পাওয়া যায় যা সাধারণ পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে মাপা যায় না। ত্রিকোণমিতি নিজের মত করে ‌ ব্যাবহার করেও মনে রাখা যায়।

ত্রিকোণমিতির জন্ম প্রাচীন মিশরে হলেও এর আদি উদ্ভাবক একজন গ্রিক জ্যোতির্বিদ যার নাম হিপারকাস (ইং:Hipparchus)। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে গ্রিক হিপারকাস  গ্রহ-নক্ষত্র ও তাদের মধ্যবর্তী বেগ এবং দুরত্ব নির্ণয় ও বিচার করতে গিয়ে এই বিদ্যার চর্চা শুরু করেন। তিনি কাজ করতেন আলেকজান্দ্রিয়ার একটি জাদুঘরে। তবে আমরা বর্তমান যুগে ‘থেটা’, ‘সাইন’, ‘কস’, ‘কোসাইন’, ‘কোসেক’ ইত্যাদি দিয়ে যে ত্রিকোণমিতি করে থাকি তার উদ্ভাবক মুসলিম গণিতবিদেরা। নবম খ্রিষ্টাব্দে আবু আবদুল্লাহ আল-বাতানি, হাবাস আল-হাসিব ও আবুল ওয়াফা আল-বুজানি নামের তিন গণিতবিদের যৌথ উদ্যোগের ফসল আধুনিক ত্রিকোণমিতি। তবে তারা গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপারকাসের মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এ বিষয়টিকে আরও আধুনিক করে গড়ে তুলেছিলেন।

যদি ত্রিভুজের একটি কোণ সমকোণ হয় এবং অপর কোণের মান জানা থাকে তবে তৃতীয় কোণের পরিমাপ নির্ণয় করা যায়। এবার আমরা জানি ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি ১৮০ ডিগ্রি। কাজেই সমকোণ বাদে বাকি কোণদ্বয়ের সমষ্টি ৯০ ডিগ্রি। তিনটি কোণের পরিমাপ জানা থাকলে ত্রিভুজের বাহুত্রয়ের পরিমাপের নির্ণয় করা যায়। আর যে কোনো এক বাহুর দৈর্ঘ্য জানা থাকলে বাকি বাহুর দৈর্ঘ্যও জানা যায়। এই অনুপাতগুলো জানা যায় কোন θ এর ত্রিকোণোমিতীয় অপেক্ষক বা ফাংশন থেকে।

সাইন ফাংশনঃ এটি ত্রিভুজের লম্ব ও অতিভুজের অনুপাত প্রকাশ করে

sin θ = লম্ব/অতিভুজ

কোসাইনঃ এটি ত্রিভুজের ভূমি ও অতিভুজের অনুপাত প্রকাশ করে

cos θ = ভূমি/অতিভুজ

ট্যানঃ এটি ত্রিভুজের লম্ব ও ভূমির অনুপাত প্রকাশ করে

tan θ= লম্ব/ভূমি = লম্ব/অতিভুজ x অতিভুজ/ভূমি = sinθ/cosθ

সা-ল-তি ...... ক-ভূ-তি ...... টে-ল-মি

(১) সা- তে sinθ, ল- তে লম্ব, অ- তে অতিভুজ, 

সুতরাং sinθ = লম্ব ÷ অতিভুজ 

(২) ক- তে cosθ, ভূ- তে ভূমি, অ- তে অতিভুজ,

সুতরাং cosθ = ভূমি ÷ অতিভুজ 

(৩) টে- তে tanθ, ল- তে লম্ব, ভূ- তে ভূমি

সুতরাং tanθ = লম্ব ÷ ভূমি 

সতর্কতাঃ

Sinθ এর বিপরীত cosecθ, তাই cosecθ = অতিভুজ ÷ লম্ব 

cosθ এর বিপরীত secθ, তাই secθ = অতিভুজ ÷ ভূমি 

θ এর বিপরীত cotθ, তাই cotθ = ভূমি ÷ লম্ব

 




#Article 102: পরিসংখ্যান (230 words)


পরিসংখ্যান বা সংখ্যায়ন ( statistics) এক ধরনের গাণিতিক বিজ্ঞান (Mathematical Science) যা মূলত উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও উপাত্ত সহজে পরিবেশন নিয়ে কাজ করে।বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক এবং আরো নানা শাখায় পরিসংখ্যানের ব্যবহার রয়েছে। উপাত্ত বিশ্লেষন করে তা থেকে তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত (informed decision) গ্রহণে পরিসংখ্যানের ভূমিকা অপরিহার্য। যে কোনো ধরনের গবেষণার জন্য পরিসংখ্যান এর মৌলিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তবে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে পরিসংখ্যানের অপব্যবহারও হয়ে থাকে।

যারা পরিসংখ্যানের চর্চা করেন তাদেরকে সাধারনভাবে পরিসংখ্যানবিদ বলা হয়। পরিসংখ্যানের সমস্যা গুলো সাধারনত কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সমষ্টি নিয়ে আবর্তিত হয়। তথ্যের প্রাপ্যতা বা ব্যবস্থাপনা যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে সেই সমষ্টির প্রত্যেককে নিয়ে অথবা তার একটা অংশকে নিয়ে কোন চয়ন পদ্ধতিতে বিশ্লেষন করা হয়।

পরিসংখ্যানের ইংরেজি 'Statistics' শব্দটি খুব সম্ভবত ল্যাটিন শব্দ 'Statuss', ইতালীয় শব্দ 'Statista' বা জার্মান শব্দ 'Statistik' হতে উৎপত্তি হয়েছে। 'Statuss' এবং 'Statistik' শব্দের অর্থ রাষ্ট্র আর 'Statista' শব্দের অর্থ রাষ্ট্রের কার্যাবলী । এ থেকে বুঝা যায় যে রাষ্ট্রের কাজ পরিচালনা থেকেই পরিসংখ্যানের উৎপত্তি হয়েছে । রাষ্ট্রের বিভিন্ন তথ্য যেমন - লোকসংখ্যা, রাজ্যবসের পরিমাণ, জন্মমৃত্যু প্রভৃতি হিসাবের জন্য এটি ব্যবহৃত হত।

১-গড়
২-মধ্যক
৩-প্রচুরক
৪-আয়তলেখ
৫-অজিবরেখা
৬-গনসংখ্যা বহুভুজ

প্রাচীণ কালে পরিসংখ্যানের ব্যবহার কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় কার্যাদি পরিচালনার মধ্যে সীমিত থাকলেও বর্তমানে এর ব্যবহার মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি পরিসংখ্যানের বিভিন্ন কলা- কৌশলকে অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহারের দ্বার উন্মোচন করেছে। পরিসংখ্যান আধুনিক মানব সভ্যতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিরুপ ভূমিকা পালন করছে,তা নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ 

সসসস




#Article 103: শিক্ষা (4220 words)


শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়।
সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‍'শাস' ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ এডুকেশন এসেছে ল্যাটিন শব্দ এডুকেয়ার বা এডুকাতুম থেকে। যার অর্থ বের করে আনা অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা।

হেরা গুহায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সর্বপ্রথম যে ওহী নাযিল হয় তা হচ্ছে, ‘পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে।’-সূরা আলাক : ১-২।হজরত ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন, ‘মুনাফিক জ্ঞানের পরিচয় দেয় মুখে আর মুমিনের জ্ঞানবত্তা প্রকাশ হয় তার আমলের মাধ্যমে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি জ্ঞানের অধিকারীগণ জ্ঞানকে সংরক্ষণ করতেন এবং যথার্থ স্থানে তাকে রাখতেন তবে তারা দুনিয়াবাসীর ওপর জয়লাভ করতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তারা জ্ঞানকে দুনিয়াদারদের কাছে সমর্পণ করেছেন দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের অভিপ্রায়ে। ফলে তারা অপদস্ত হয়েছেন। -কিতাবুল উম : ১/১৫৬

সক্রেটিসের ভাষায় “শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” এরিস্টটল বলেন “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।”

শিক্ষা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত শাস ধাতু থেকে। সাধারণভাবে বলা যায় মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত, বাঞ্চিত এবং ইতিবাচক পরির্বতনই হলো শিক্ষা। যুগে যুগে নানা মনীষী নানাভাবে শিক্ষাকে সজ্ঞায়িত করেছেন। আবার সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার সজ্ঞা বা ধারণাও পরির্বতন এসেছে।

ইংরেজিতে ব্যাকরণগতভাবে, এডুকেশন শব্দটি লাতিন ēducātiō (যার অর্থ প্রজনন এবং লালন পালন করা), ēducō (যার অর্থ আমি শিক্ষাদান করি, আমি প্রশিক্ষণ দেই) যা হোমোনিম ēdūcō এর সাথে সম্পর্কিত (যার অর্থ আমি এগিয়ে নিয়ে যাই, আমি উত্থাপন করি) এবং Dōcō ( যার অর্থ আমি নেতৃত্ব দেই, আমি পরিচালনা করি ) থেকে উৎপত্তি হয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক কালে শিক্ষা শুরু হয়েছিল বয়স্ক ব্যক্তিদের দ্বারা যুবকদের সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে। প্রাক-শিক্ষিত সমাজ মূলত মৌখিকভাবে এবং অনুকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গল্প-বলার মাধ্যমে জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং দক্ষতা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। সাংস্কৃতিক দক্ষতা প্রসারিত হতে পারে অনুকরণের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নত করার মধ্যমে। মিশরে মিডল কিংডম এর সময় স্কুল বিদ্যমান ছিল।

প্লেটো এথেন্সে একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ছিল ইউরোপের উচ্চতর শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান। ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এথেন্সের বুদ্ধিবৃত্তিক প্যাড হিসাবে এটি প্রাচীন গ্রিসে বিখ্যাত হয়ে ওঠেছিল। সেখানে, আলেকজান্দ্রিয়ার বৃহত্তর গ্রন্থাগারটি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পতনের পর ইউরোপীয় সভ্যতায় সাক্ষরতা এবং সংগঠনের পতন ঘটেছিল।

চীনে কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), লূ এর রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাচীন দার্শনিক ছিলেন, যার শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গি চীনের সমাজ এবং কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনামের মত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কনফুসিয়াস শিষ্যদের একত্রিত করেন এবং একটি শাসককে নিরর্থকভাবে অনুসন্ধান করেন, যিনি সুশাসনের জন্য তার আদর্শগুলি গ্রহণ করবে। তার Analects অনুসরণকারীদের দ্বারা লিখিত হয়েছিল যা পূর্ব এশিয়ায় আধুনিক যুগেও শিক্ষার উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

রোমের পতনের পর, ক্যাথলিক চার্চ পশ্চিম ইউরোপে সাক্ষরতার ও স্কলারশিপের একমাত্র রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিল। চার্চ ক্যাথিড্রাল স্কুলকে আধুনিক যুগের শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানগুলি শেষ পর্যন্ত মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউরোপের বিভিন্ন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অগ্রদূত হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। উচ্চ মধ্যযুগে সময় চার্টার্স ক্যাথিড্রাল দ্বারা বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী Chartres ক্যাথিড্রাল স্কুল পরিচালিত হয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে সুসংহত ছিল, যা তদন্তের স্বাধীনতাকে উত্সাহিত করে, এবং একদল পণ্ডিত ও প্রাকৃতিক দার্শনিকদের সৃষ্টি করেছিল , যেমন, নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস অ্যাকুইনাস , অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির রবার্ট গ্রোসেটেস্ট এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার পদ্ধতিগত পদ্ধতির প্রারম্ভিক প্রকাশক, এবং জৈবিক গবেষণার অগ্রদূত সেন্ট অ্যালবার্ট গ্রেট ছিলেন অন্যতম। ১০৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বলোনি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথম এবং প্রাচীনতম অপারেটিং ইউনিভার্সিটি বলে মনে করা হয়।

মধ্যযুগীয় সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক বিজ্ঞান ও গণিত সমৃদ্ধ হয়েছিল ইসলামিক খলিফার অধীনে, যা পশ্চিম আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে পূর্ব সিন্ধু পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আলমোরাভিড রাজবংশ ও মালির সাম্রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল।

ইউরোপে রেনেসাঁ প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তদন্ত এবং উপলব্ধির নতুন যুগের সূচনা করেছিল। প্রায় ১৪৫০ সালের দিকে জোহানেস গুটেনবার্গ একটি প্রিন্টিং প্রেস তৈরি করেন, যা সাহিত্যের কাজকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের যুগে ইউরোপীয় দর্শন, ধর্ম, শিল্প ও বিজ্ঞান বিষয়ক ধারণাগুলি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। মিশনারি ও পণ্ডিতরা অন্যান্য সভ্যতা থেকে নতুন ধারণা নিয়ে আসছিল - জেসুইট চীন মিশনের সাথে যারা চীন ও ইউরোপের মধ্যে জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইউরোপ থেকে কাজগুলি অনুবাদ করে যেমন চীনের পণ্ডিতদের জন্য ইউক্লিডের এলিমেন্টস অনুবাদ এবং ইউরোপীয় শ্রোতাদের জন্য কনফুসিয়াসের চিন্তা চেতনা কথা বলা যায়। আলোকায়নের যুগের মাধ্যমে ইউরোপ আরও নিরপেক্ষ শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ছিল।

বেশিরভাগ দেশে আজ নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সব শিশুদের জন্য পূর্ণ-সময়ের শিক্ষা স্কুলে বা অন্যত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কারণে বাধ্যতামূলক শিক্ষার বিস্তার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে মিলিতভাবে, ইউনেস্কো গণনা করে লক্ষ্য করেছে যে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে আরও মানুষ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করবে যা মানব ইতিহাসে বিরল ঘটনা হবে এটি।

শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগে মূহুর্ত পর্যন্ত শেখে। তাই শিক্ষার লাভের ধরন বিভিন্ন।যেমন:

আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এমন একটি কাঠামোগত পরিবেশে ঘটে থাকে যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান । সাধারণত, একটি স্কুলের পরিবেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সঞ্চালিত হয় যেখানে শ্রেণীকক্ষে একাধিক শিক্ষার্থীদের জন্য একজন প্রশিক্ষিত এবং প্রত্যয়িত শিক্ষকের প্রয়োজন পড়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য । বেশিরভাগ স্কুলে একটি মানসম্মত আদর্শ ডিজাইন করা হয় যার মাধ্যমে সিস্টেমে সমস্ত শিক্ষাগত পছন্দগুলি নিয়ন্ত্রণ করা হয় । এই ধরনের পছন্দগুলি পাঠ্যক্রম, সাংগঠনিক মডেল, শারীরিক শিক্ষার স্থানগুলির (যেমন শ্রেণীকক্ষ) নকশা, ছাত্র-শিক্ষক ইন্টারঅ্যাকশন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শ্রেণীর আকার, শিক্ষাগত কর্মকাণ্ড, এবং আরও অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত করে।শিক্ষকদের কাছ বেল বাজাতে পারেন।

প্রাকস্কুলগুলি প্রায় তিন থেকে সাত বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রদান করে যা দেশের উপর নির্ভর করে যখন শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রবেশ করে । এইগুলি নার্সারি স্কুল এবং কিন্ডারগার্টেন হিসাবেও পরিচিত । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে কিন্ডারগার্টেন শব্দটি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত শব্দ । কিন্ডারগার্টেন তিন থেকে সাত বছরের জন্য একটি শিশু-কেন্দ্রিক প্রাক পাঠ্যক্রম প্রদান করে । এখানে মূলত শিশুদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক প্রকৃতির উদ্ঘাটন করার জন্য চেষ্টা করা হয় ।

প্রাথমিক শিক্ষা আনুষ্ঠানিক ও কাঠামোগত যা প্রথম পাঁচ থেকে সাত বছর নিয়ে গঠিত। সাধারণত, প্রাথমিক শিক্ষা পাঁচ থেকে ছয় বছর এবং ছয় থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়ে থাকে, যদিও এর মধ্যে, মাঝে মাঝে দেশ ভেদে ভিন্নতা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী, ছয় থেকে বারো বছর বয়সী প্রায় ৮৯% শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হয় এবং এই অনুপাত বেড়েই চলেছে। ইউনেস্কো দ্বারা চালিত ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বেশিরভাগ দেশ এই প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে এবং অনেক দেশে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে বিভাজন কিছুটা আলাদা, তবে এটি সাধারণত প্রায় এগারো বা বারো বছর বয়সের মধ্যে ঘটে । কিছু শিক্ষা ব্যবস্থায় পৃথক মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে স্থানান্তর করা হয় । প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের স্কুলগুলি প্রাথমিকভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসাবে পরিচিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আবার শিশু এবং জুনিয়র স্কুলের মধ্যে বিভক্ত করা হয়।

ভারতে, উদাহরণস্বরূপ, বারো বছর ধরে বাধ্যতামূলক শিক্ষা, আট বছরে প্রাথমিক(elimentary) শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঁচ বছর এবং উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তিন বছর করা হয়েছে । ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং দ্বারা পরিকল্পিত একটি জাতীয় পাঠ্যক্রমের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ১২ বছরের বাধ্যতামূলক স্কুল শিক্ষা প্রদান করা হয়।

বিশ্বের বেশিরভাগ সমসাময়িক শিক্ষা ব্যবস্থায়, মাধ্যমিক শিক্ষায় বয়ঃসন্ধির সময় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত মাধ্যমিক উত্তর বা উচ্চতর শিক্ষা (যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়, বৃত্তিমূলক স্কুল) থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক । এই সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে এই সময়ের জন্য বিদ্যালয়গুলি, বা এর একটি অংশকে সেকেন্ডারি বা উচ্চ বিদ্যালয়, জিমন্যাশিয়াম, লিসিম, মধ্যম স্কুল, কলেজ বা বৃত্তিমূলক স্কুল বলা যেতে পারে। এই পদগুলির কোনও সঠিক অর্থ এক সিস্টেম থেকে অন্যটিতে পরিবর্তিত হতে পারে । প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে সঠিক সীমাও দেশ ভেদে আলাদা হতে পারে । তবে সাধারণত সপ্তম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া হয় । মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধানত কিশোর বয়সের মধ্যেই ঘটে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সাথে কখনও কখনও K-12 নির্দেশ করা হয় , এবং নিউজিল্যান্ডে বছরে ১-১৩ বছর পর্যন্ত ধরা হয়। মাধ্যমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে সাধারণ জ্ঞান দান , উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা, অথবা সরাসরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে পেশার জন্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার প্রচলন ছিল না । বড় কর্পোরেশনের উত্থান এবং কারখানায় প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে দক্ষ শ্রমিকদের প্রয়োজন ছিল । এই নতুন চাকরির চাহিদা পূরণের জন্য উচ্চ বিদ্যালয়গুলি তৈরি করা হয়েছিল, কারিকুলামটি বাস্তব পেশাগত কাজের দক্ষতার উপর নিবদ্ধ ছিল যা ছাত্রদেরকে সাদা কলার বা দক্ষ নীল কলারের কাজের জন্য ভালভাবে প্রস্তুত করবে। এটি নিয়োগকর্তাদের এবং কর্মীদের উভয়ের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে, যেহেতু উন্নত মানবাধিকারের ফলে নিয়োগকর্তার খরচ কম হচ্ছিল, অন্যদিকে দক্ষ শ্রমিকরা উচ্চতর বেতন ও পাচ্ছিল ।

ইউরোপে মাধ্যমিক শিক্ষার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে । যেখানে ষোড়শ শতকের গোঁড়ার দিকে ব্যাকরণ স্কুল বা একাডেমী , পাবলিক স্কুলগুলির আকারে, বিনা বেতনে পড়ার জন্য স্কুল বা দাতব্য শিক্ষাগত ফাউন্ডেশনগুলির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল ।

কমিউনিটি কলেজ পরিবর্তনশীল পর্যায়ে অন্য একটি বিকল্প প্রস্তাব করে । তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের nonresidential জুনিয়র কলেজ কোর্স প্রদান করে।

উচ্চশিক্ষা হল তৃতীয় পর্যায়, বা পোষ্টসেকন্ডারি শিক্ষা, এটি একটি অ-বাধ্যতামূলক শিক্ষাগত স্তর যা উচ্চ বিদ্যালয় বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেমন স্কুল সমাপ্তি অনুসরণ করে । তৃতীয়তঃ স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষা সহ বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানত উচ্চ শিক্ষা প্রদান করে। সমষ্টিগতভাবে এইগুলি উচ্চ বিভাগ হিসাবে পরিচিত। উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করা ব্যক্তি সাধারণত সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা, বা একাডেমিক ডিগ্রী প্রাপ্ত হয়ে থাকে ।

উচ্চ শিক্ষা সাধারণত একটি ডিগ্রী-স্তর বা ডিগ্রী যোগ্যতা জড়িত থাকে। অধিকাংশ উন্নত দেশগুলিতে জনসংখ্যা (৫০% পর্যন্ত) এখন তাদের জীবনের কোন একটা সময় উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে। জাতীয় অর্থনীতির জন্য উচ্চশিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, উভয়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং বাকি প্রশিক্ষিত এবং শিক্ষিত কর্মীরা অর্থনীতির উৎস হিসাবে গণ্য ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শিক্ষাদান, গবেষণা এবং সামাজিক সেবা কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে, এবং এটি স্নাতক পর্যায়ে উভয়ই অন্তর্ভুক্ত (কখনও কখনও উচ্চতর বিভাগ হিসাবে উল্লেখ করা হয়) এবং স্নাতক (বা স্নাতকোত্তর) স্তর (কখনও কখনও স্নাতক স্কুল হিসাবে পরিচিত)। বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণত বেশ কিছু কলেজ নিয়ে গঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটিগুলি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ব্যক্তিগত এবং স্বাধীন হতে পারে; সরকারি এবং স্টেট নিয়ন্ত্রিত পেনসিলভানিয়া উচ্চ মাধ্যমিকের সিস্টেমের মতো রাজ্য শাসিত; বা স্বাধীন, কিন্তু ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্টেট থেকে তহবিল প্রাপ্ত হতে পারে । এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজলভ্য বেশ কিছু ক্যারিয়ার নির্দিষ্ট কোর্স পাওয়া যায়।

উদার শিল্প শিক্ষা(liberal arts education) নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার একটি কোর্স আছে যাকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যার মূল কাজ হল সাধারণ জ্ঞান প্রদান এবং একটি পেশাদার, বৃত্তিমূলক বা কারিগরি পাঠ্যক্রমের বিপরীতে সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষাদান করা । ইউরোপে উদার শিল্প শিক্ষার( liberal arts education) সূচনা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে liberal arts college শব্দটির সাথে যুক্ত।

বৃত্তিমূলক শিক্ষা হচ্ছে সরাসরি এবং বাস্তব প্রশিক্ষণের উপর নিবদ্ধ শিক্ষার একটি ফর্ম । পেশাগত শিক্ষা একটি শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্নশিপের পাশাপাশি চলতে পারে এমন একটি কাঠামো যেমন , কৃষি, প্রকৌশল, ঔষধ, স্থাপত্য এবং কলা এর অন্তর্ভুক্ত।

অতীতে  অক্ষম ছিল তারা প্রায়ই সরকারি শিক্ষার জন্য যোগ্য ছিল না । প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা বার বার চিকিৎসক বা বিশেষ টিউটর দ্বারা অস্বীকৃত হত । এই প্রারম্ভিক চিকিৎসক (ইটারড, সেগোইন, হাউ, গালাদেডের মত মানুষ) আজকে বিশেষ শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছে । তারা স্বতন্ত্র এবং কার্যকরী দক্ষতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন । তার প্রাথমিক বছরগুলিতে, বিশেষ শিক্ষা শুধুমাত্র গুরুতর অক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রদান করা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি এটি সবার জন্য খোলা হয়েছে ।

যদিও আজকাল তা বিকল্প হিসাবে বিবেচিত, অধিকাংশ বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান ছিল । উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে পাবলিক স্কুল ব্যবস্থার ব্যাপকভাবে উন্নত হওয়ার পর, কিছু বাবা-মা নতুন ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়। অনুন্নত সীমাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া এবং ঐতিহ্যগত শিক্ষার ব্যর্থতার অংশ হিসেবে বিকল্প শিক্ষাটি উন্নত হয় । বিস্তৃত পরিসরে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে  বিকল্প বিদ্যালয় সহ , স্ব-শিক্ষণ, গৃহে শিক্ষাদান এবং বিদ্যালয়ের বাহিরে শিক্ষাদান । বিকল্প স্কুলের মধ্যে মন্টেসরি স্কুল, ওয়াল্ডর্ফ স্কুল (বা স্টেনার স্কুল), ফ্রেন্ডস স্কুল, স্যান্ডস স্কুল, সামারলিল স্কুল, ওয়ালডেনের পথ, পিপল গ্রোভ স্কুল, সডবেরি ভ্যালি স্কুল, কৃষ্ণমূর্তি স্কুল এবং ওপেন ক্লাসরুম স্কুল রয়েছে । চার্টার স্কুল বিকল্প শিক্ষার অন্য একটি উদাহরণ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যুক্ত হয়েছে এবং  পাবলিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তা অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে, এই পরীক্ষা এবং দৃষ্টান্তের চ্যালেঞ্জ থেকে কিছু ধারনা শিক্ষা ক্ষেত্রে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে, ঠিক যেমন উনবিংশ শতকের জার্মানিতে  ফ্রেডরিখ ফ্রোবেলের শৈশব শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি সমসাময়িক কিন্ডারগার্টেন শ্রেণীকক্ষে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । অন্যান্য প্রভাবশালী লেখক ও চিন্তাবিদরা সুইস মানবতাবাদী  জোহান হেনরিচ পেস্টলজ্জীকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন; আমেরিকান ট্রানস্যানডেন্টালিস্ট আমোস ব্রোনসন অ্যালকোট, রালফ ওয়াল্ডো এমারসন এবং হেনরি ডেভিড থোরো; প্রগতিশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠাতা, জন ডুয়ি এবং ফ্রান্সিস পার্কার; এবং মারিয়া মন্টেসরি এবং রুডলফ স্টিনারের মত শিক্ষাবিদদের অগ্রদূত, এবং সম্প্রতি জন কেলডওয়েল হোল্ট, পল গুডম্যান, ফ্রেডেরিক মেয়ার, জর্জ ডেনিসন এবং ইভান ইলিচ।

আদিবাসী শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আদিবাসী জ্ঞান, মডেল, পদ্ধতি,  আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে ।  উপনিবেশ উত্তর প্রেক্ষাপটে, উপনিবেশবাদ প্রক্রিয়ায় আদিবাসী শিক্ষা পদ্ধতির বর্ধিত স্বীকৃতি এবং ব্যবহারের মাধ্যমে আদিবাসী জ্ঞান জ্ঞান চর্চা বেড়ে যেতে পারে। অধিকন্তু, এটি আদিবাসী সম্প্রদায়গুলিকে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ এবং পুনর্বিন্যস্ত করতে পারে এবং আদিবাসী ছাত্রদের শিক্ষাগত সাফল্যের উন্নতি সাধন করতে পারে।

ইকোনোমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সংস্থা দ্বারা নির্ধারিত শিক্ষার তিনটি পদ্ধতির মধ্যে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা অন্যতম । অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিভিন্ন জায়গায় যেমন বাড়িতে, কাজের মধ্যে , এবং দৈনিক ইন্টারঅ্যাকশন যা  সমাজের সদস্যদের মধ্যে শেয়ারে মাধ্যমে পরিচালিত হয় । অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ভাষা অধিগ্রহণ, সাংস্কৃতিক নিয়ম এবং আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় । অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া যা বিভিন্ন জায়গায় , যেমন স্কুলের সময়ের বাহিরে , কমিউনিটি সেন্টারে এবং মিডিয়া ল্যাবগুলিতে পরিচালিত হয়ে থাকে।

অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাহিরে ঘটে থাকে যা নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের অনুসরণ করে না । বিশেষ করে বাস্তবের পরিবর্তনের সাথে ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে এর উৎপত্তি ঘটতে পারে । এটা অপরিহার্যভাবে তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনুসরণ করেনা। শিক্ষণীয়ভাবে সচেতন, নিয়মানুবর্তিতা এবং বিষয় অনুযায়ী, কিন্তু অজ্ঞানভাবে আনুষ্ঠানিক, holistically সমস্যা সম্পর্কিত, এবং পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা এবং জীবনের জন্য ফিটনেস সম্পর্কিত পরিকল্পনা করা হয় না। এটা মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে অর্জন করে।

উনবিংশ শতকে শৈশবের বিকাশে 'বিনোদন দ্বারা শিক্ষা' ধারণার প্রয়োগ করা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তরুণ প্রজন্মকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ধারণাটি আরও বিস্তৃত করা হয়েছিল কিন্তু  বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল শারীরিক কার্যকলাপের উপর ।  এল.পি জ্যাকস, জীবনযাত্রার শিক্ষার প্রথম প্রবর্তক, বিনোদন দ্বারা শিক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন: জীবন যাপনের শিল্পে একজন মাস্টার তার কাজের এবং খেলার মধ্যে, তার শ্রম এবং অবসরের মধ্যে , তার মন এবং শরীরের মধ্যে , তার শিক্ষা এবং বিনোদনের মধ্যে কোন পার্থক্য খোঁজেন না । তিনি জানেননা যে তিনি কী কাজ করছেন । এবং অন্য যে কোনও কাজ তিনি করেন বা খেলেন তা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করার জন্য চেষ্টা করেন। নিজের জন্য তিনি সবসময়ই উভয় কাজ করছেন বলে মনে করেন। যা করছেন তা নিজের জন্য ভাল ।  বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা একটি সুযোগ যেখানে জীবনের সমস্ত কর্মের মাধ্যমে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে ।  চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রদের এনাটমি শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর ইউনিভার্সিটি এই ধারণাটি পুনর্বিন্যস্ত করেছে।

অটোডাইডেকটিক্সিজম একটি চিত্তাকর্ষক গ্রহণ প্রক্রিয়া যেখানে  নিজে নিজে শেখা বা নিজের দ্বারা বা স্ব-শিক্ষক হিসাবে ভূমিকা পালন করতে হয় । কিছু অটোডাইডেক্টস( স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত) প্রচুর সময় ব্যয় করে লাইব্রেরী ও শিক্ষাগত ওয়েবসাইটগুলির সম্পদগুলি পর্যালোচনা করার মাধ্যমে । একজন লোক তার  জীবনের প্রায় যেকোনো সময় অটোডাইডেক্ট হতে পারে। যদিও কেউ কেউ একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এবং একটি প্রচলিত পদ্ধতিতে  তারা নিজেদেরকে আনরিলেটেড বিষয় অবহিত করতে পারে । উল্লেখযোগ্য অটোডাইডেক্টসের( স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত) মধ্যে আব্রাহাম লিঙ্কন (ইউএস প্রেসিডেন্ট), শ্রীনিবাস রামানুজন (গণিতবিদ), মাইকেল ফ্যারাডে (রসায়নবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী), চার্লস ডারউইন (প্রফেসর), টমাস আলভা এডিসন (আবিষ্কারক), তাদো আন্ডো (স্থপতি), জর্জ বার্নার্ড শ (নাট্যকার), ফ্রাঙ্ক জাপ্পা (সুরকার, রেকর্ডিং প্রকৌশলী, চলচ্চিত্র পরিচালক) এবং লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি(প্রকৌশলী, গণিতবিদ) অন্যতম ।

২০১২ সালে ইলেকট্রনিক শিক্ষাগত প্রযুক্তি (ই-লার্নিং নামেও পরিচিত) এর আধুনিক ব্যবহারটি প্রথাগত শিক্ষার হার থেকে ১৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । ওপেন এডুকেশন ক্রমবর্ধমান শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পরিণত হয়েছে । ঐতিহ্যগত  শিক্ষা পদ্ধতির তুলনায় তার দক্ষতা এবং ফলাফলই তার মূল কারণ । শিক্ষার খরচ সমগ্র ইতিহাস জুড়ে একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, এবং এটি এখন বেশিরভাগ দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক বিষয় । অনলাইন কোর্স প্রায়ই মুখোমুখি ক্লাসের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। ২০০৯সালে মোট ১৮২ টিরও বেশি কলেজের উপর জরিপ করে দেখা যায় যে  প্রায় অর্ধেক সংখ্যক লোকই বলেছে যে অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষার খরচ ক্যাম্পাস ভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে উচ্চতর ছিল ।  অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলি বর্তমানে হার্ভার্ড, এমআইটি এবং বার্কলে যেমন ফ্রি বা প্রায় বিনামূল্যে বিনামূল্যে কোর্স অফার করছে EDX গঠন করার জন্য । উন্মুক্ত শিক্ষা প্রদানের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় হল স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, ডিউক, জনস হপকিন্স, এডিনবার্গ, ইউ. পেন, ইউ.মিশিগান, ইউ ভার্জিনিয়া, ইউ.ওয়াশিংটন, এবং ক্যালটেক । মুদ্রণযন্ত্র প্রকাশ হবার পর থেকে এই ব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে ।  কার্যকারিতার উপর অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নির্বাচন করতে চায়।

উন্মুক্ত শিক্ষার ডিগ্রী প্রদান প্রচলিত মেধা-পদ্ধতির ডিগ্রী প্রদানের মতো সাধারণ নয় এমনকি এটি ক্যাম্পাস ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ও নয় । যদিও কিছু উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ইউনাইটেড কিংডমে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রচলিত ডিগ্রী প্রদান করে আসতেছে । বর্তমানে বেশিরভাগ উন্মুক্ত শিক্ষা উৎসগুলি তাদের নিজস্ব গঠনের সনদপত্র প্রদান করে। উন্মুক্ত শিক্ষার জনপ্রিয়তার কারণে, এই নতুন ধরনের একাডেমিক সার্টিফিকেটগুলি ঐতিহ্যগত ডিগ্রির মতো আরও সম্মান এবং সমান একাডেমিক মূল্য অর্জন করছে।  অনেক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জন্য মান সংবলিত পরীক্ষা এবং ঐতিহ্যগত ডিগ্রী প্রদান করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে ।

একটি নতুন সংস্কৃতি শুরু হচ্ছে এমন ব্যক্তিদের জন্য যারা ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে আসক্ত সামাজিক সংযোগগুলি খুঁজছেন । উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা অধ্যয়নের জন্য গ্রুপ তৈরি করতে পারে, মিলিত হতে পারবে যেমন তারা UnCollege নাম কলেজ  তৈরি করতে পারে।

 প্র

১৯০৯ সাল থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের শিশুদের স্কুলে অংশগ্রহণের অনুপাত বৃদ্ধি পেয়েছে । এর আগে, ছেলেদের একটি ছোট্ট অংশ স্কুলে পড়ত। একবিংশ শতকের শুরুতে  বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে অধিকাংশ শিশু স্কুলে যেতে শুরু করে ।

ইউনিভার্সাল প্রাইমারী এডুকেশন আটটি আন্তর্জাতিক মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এর মধ্যে একটি, যা পূর্ববর্তী দশকে যে অগ্রগতি হয়েছে, তারপরেও কিছু বাধা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য দাতাদের কাছ থেকে দাতব্য তহবিল সুরক্ষিত করা একটি স্থায়ী সমস্যা । ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে শিক্ষার জন্য তহবিলের প্রধান বাধাগুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সমস্যাযুক্ত দাতাদের অগ্রাধিকার দেয়া,  সাহায্য প্রদানের অপরিপক্ষ ব্যবস্থাপনা  এবং এই বিষয়ের পক্ষে প্রমাণ সমর্থনের অভাব ।  এ ছাড়া, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকার সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য একটি প্রধান বাধা হিসেবে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিষয়টিকে চিহ্নিত করেছে । উপরন্তু,  উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নততর শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকারের জন্য বিদেশীরা যা আশা করে চাহিদার তা এখনও অপ্রতুল । আদিবাসী সরকার  চলমান শিক্ষার জন্য যে খরচ হয় তার দায়ভার নিতে অনিচ্ছুক । কিছু পিতামাতার কাছ থেকে অর্থনৈতিক চাপও রয়েছে, যারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি উপকারের  পরিবর্তে স্বল্প মেয়াদী অর্থ উপার্জন করাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয় ।

ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এডুকেশনাল প্ল্যানিং দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষণায় ইঙ্গিত দেয় যে, শিক্ষাগত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী ক্ষমতা শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।  স্থায়ী ক্ষমতা বিকাশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক, সাংগঠনিক ও স্বতন্ত্র পর্যায়ে জটিল হস্তক্ষেপের প্রয়োজন যা কিছু মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে হতে পারে:

জাতীয় নেতৃত্ব এবং মালিকানা যেকোনো হস্তক্ষেপের টাচস্টোন হওয়া উচিত;
কৌশলগুলিকে প্রাসঙ্গিক এবং নির্দিষ্ট করা আবশ্যক; 
পরিকল্পনাগুলিতে একটি সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন , যদিও পদক্ষেপের মধ্যে বাস্তবায়ন মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে;
অংশীদারদের ক্ষমতা উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা উচিত, স্বল্প মেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়;
বাইরের হস্তক্ষেপের বিভিন্ন স্তরে জাতীয় ক্ষমতার প্রভাব মূল্যায়ন শর্তাধীন হওয়া উচিত;
শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট শতাংশ শিক্ষার সংস্কারের জন্য সরানো উচিত (সাধারণত দশম শ্রেণির তা পরে স্কুলগুলিতে অনুশীলন করা হয়) ।

প্রায় সব দেশে এখন সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে।

সমতা-পদ্ধতিতে বা এমনকি ধারণাগুলি-যেগুলি আন্তর্জাতিকভাবে আন্তর্জাতিক স্কুলগুলিতে আন্তর্জাতিক ছাত্র বিনিময় বৃদ্ধি করেছে ।  ইউরোপীয় সক্রেটিস-ইরাসমাস প্রোগ্রাম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে বিনিময় সহজতর করে তুলেছে । সোরোস ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা প্রদান করে । International Baccalaureate প্রোগ্রামের মতো প্রোগ্রামগুলি শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে ব্যাপক অবদান রেখেছে । আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নেতৃত্বে পরিচালিত The global campus online, প্রকৃত ক্লাস চলাকালীন সময়ে ক্লাস সামগ্রী এবং রেকর্ডকৃত বক্তৃতার ফাইলগুলিতে বিনামূল্যে প্রবেশের অনুমতি দেয় ।

দরিদ্র এলাকায় এবং উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার উন্নত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসতেছে । One Laptop per Child এর মতো দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি অবকাঠামো প্রদানের জন্য নিবেদিত যার মাধ্যমে সুবিধা-বঞ্চিত ছেলেমেয়েরা শিক্ষাগত সামগ্রীগুলি সহজেই হাতের কাছে পেতে পারে ।

OLPC ফাউন্ডেশন MIT Media Lab এর একটি গ্রুপ যা বেশ কয়েকটি বড় কর্পোরেশনের দ্বারা সমর্থিত যাদের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য হলো  $১০০ ডলারের ল্যাপটপ শিক্ষা সফটওয়্যার জন্য প্রদান করা । ২০০৪ সালে ল্যাপটপগুলি সব জায়গায় পাওয়া যেত । তারা দানের দামের উপর ভিত্তি করে বিক্রি হয় ।

আফ্রিকাতে, দ্য নিউ পার্টনারশিপ ফর আফ্রিকার ডেভেলপমেন্ট (এনইপিএডি) ই-স্কুল প্রোগ্রাম চালু করেছে ১০ বছরের মধ্যে ৬০০০০০ প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়কে কম্পিউটার সরঞ্জাম, শেখার সামগ্রী এবং ইন্টারনেট এক্সেস সহ আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে  । এনবিইউইউ ডটকম নামে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্রকল্প যা সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সহায়তায় শুরু হয়েছিল ,  এটি মূলত সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক কাজে যারা জড়িত তাদের ইন্টারনেট ব্যবহার করার সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে ।

ভারত প্রযুক্তিগুলিকে বিকশিত করতেছে যা সরাসরি স্থল-ভিত্তিক টেলিফোন এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষামূলক বিষয়গুলো প্রচার করবে  । ২০০৪ সালে ভারতীয় স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন এডুসেট নামে একটি সাবস্ক্রিপশন উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে, যা শিক্ষাগত উপকরণগুলি অনেক কম খরচে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পৌঁছাতে পারবে।

শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান হচ্ছে কিভাবে মানুষ কিভাবে শিক্ষাগত পদ্ধতিগুলো, শিক্ষামূলক হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা, শিক্ষার মনোবিজ্ঞান এবং স্কুলগুলি সামাজিক মনোবিজ্ঞান হিসাবে কীভাবে সংগঠিত হয় তা শিখে । যদিও শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান এবং স্কুল মনোবিজ্ঞান শব্দগুলি প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে গবেষকরা এবং থিয়োরিস্টরা  শিক্ষামূলক মনোবৈজ্ঞানিক হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে, যদিও স্কুল বা স্কুল-সম্পর্কিত সেটিংসের অনুশীলনকারীদের স্কুল মনোবৈজ্ঞানিক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান সাধারণ জনসংখ্যার মধ্যে শিক্ষাগত অর্জনের প্রক্রিয়ায় এবং উপ-জনসংখ্যার যেমন প্রতিভাধর শিশুদের এবং নির্দিষ্ট অক্ষমতার সাথে যারা সম্পর্কিত তাদেরকে নির্দেশ করে ।
শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান অন্যান্য শাখায় সঙ্গে তার কেমন সম্পর্ক তার মাধ্যমে বোঝা যাবে । এটা মূলত মনোবিজ্ঞান দ্বারা জানানো হয়, এটি এমন একটি সম্পর্ক বহন করে যা চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জীববিদ্যা মধ্যে যে সম্পর্ক তার অনুরূপ ।  শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান একটি বিস্তৃত বিশেষত্বকে বুঝায় যা শিক্ষামূলক নকশা, শিক্ষাগত প্রযুক্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, সাংগঠনিক শিক্ষা, বিশেষ শিক্ষা এবং শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনা সহ শিক্ষাগত গবেষণার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় । শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান cognitive science এবং learning sciences থেকে উদ্ভূত । বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে, শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান বিভাগগুলি সাধারণত শিক্ষার অনুষদগুলির মধ্যেই থাকে, যা সম্ভবত প্রচলিত মনোবিজ্ঞান এর প্রতিনিধিত্ব মূলক যে লেকনেছ আছে তা অনুসন্ধান করে উদাহরণস্বরূপ পরিচিতিমূলক মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত পাঠ্যপুস্তক (লুকা, ব্লেজ, এবং রালে, ২০০৬) এর কথা উল্লেখ করা যায় ।

শিক্ষাগত স্নায়ুবিজ্ঞান একটি উদ্ভূত বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র যা জৈবিক প্রক্রিয়া ও শিক্ষার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া খোঁজার জন্য জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞান, বিকাশমূলক জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞান, শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাগত প্রযুক্তি, শিক্ষা তত্ত্ব এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে একত্রিত করে । শিক্ষাগত স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষকরা  স্নায়োবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পড়াশোনা, সংখ্যাসূচক চেতনা,  মনোযোগ এবং ডিসলেকসিয়া, ডিসক্যালকুলিয়া এবং এডিএইচডি সহ তাদের সহকারী সমস্যাগুলি অনুসন্ধান করে যা শিক্ষার সাথে সম্পর্কযুক্ত। সারা বিশ্বে বেশ কয়েকটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান শিক্ষাগত স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে ।

একটি একাডেমিক ক্ষেত্র হিসাবে, শিক্ষা দর্শন হল শিক্ষা এবং এর সমস্যাগুলির দার্শনিক অধ্যয়ন । এর কেন্দ্রীয় বিষয় হল শিক্ষা, এবং এর পদ্ধতিগুলো হল দর্শনের বিষয় । শিক্ষার দর্শন মূলত শিক্ষার প্রক্রিয়ার দর্শন বা শিক্ষার শৃঙ্খলার দর্শন হতে পারে। শৃঙ্খলা, লক্ষ্য, গঠন, পদ্ধতি বা ফলাফলগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার অনুভূতিই হল শিক্ষা দর্শনের আলোচ্য বিষয় । শিক্ষার প্রসার বা শিক্ষিত হওয়া, অথবা শিক্ষার ধারণা, লক্ষ্য ও পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্টতার পরিপ্রেক্ষিতে এটি মেটাডিসিপ্লিনারি হতে পারে।  যেমন, এটি শিক্ষার ক্ষেত্র এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির সাথে জড়িত এমনকি শিক্ষা নীতি এবং পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শেখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করার জন্য দর্শনশাস্ত্রের ক্ষেত্র, আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রসমূহ, প্রবন্ধমালা, এবং দার্শনিক পন্থা (অনুমানমূলক, প্রবিধানিক বা বিশ্লেষণাত্মক) থেকে সাহায্য নিতে পারে । উদাহরণস্বরূপ, এটি কিভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা বেড়ে ওঠে তা পর্যালোচনা করতে পারে যা উন্নত ও শিক্ষামূলক প্রথাগুলির মাধ্যমে শিক্ষার মানদণ্ড এবং শিক্ষার বৈধতা, এবং শিক্ষার তত্ত্ব ও অনুশীলনের মধ্যে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশিত মূল্যবোধ ও নিয়মসমূহকে অধ্যয়ন করতে সাহায্য করে ।

এটি যুক্তি প্রদান করেছে যে, উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য দেশে উচ্চ শিক্ষার হার অপরিহার্য । সমালোচকদের বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক জ্ঞান পূর্বাভাস দেয় যে, দরিদ্র দেশগুলিকে ধনী দেশগুলির তুলনায় দ্রুততর হওয়া উচিত কারণ তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলি ইতিমধ্যে ধনী দেশগুলির দ্বারা পরীক্ষিত এবং পরিচালিত হয়েছে তা সহজেই গ্রহণ করতে পারে । যাইহোক, প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য নতুন মেশিন বা উৎপাদন পদ্ধতি পরিচালনা করতে সক্ষম এমন জ্ঞানী পরিচালকদের এবং ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজন হয় যার মাধ্যমে অনুকরণ করার ফাঁকটা বন্ধ করা যাবে । অতএব একটি দেশ শিক্ষক থেকে যা শিখতে পারে একে human capital বলে মনে করা হয় । সমষ্টিগত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নির্ধারকদের সাম্প্রতিক গবেষণার মাধ্যমে মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্ব এবং জ্ঞানীয়(cognitive) দক্ষতার ভূমিকার উপর জোর দেয়া হয়েছে ।

ব্যক্তিগত স্তরে, একটি বড় সাহিত্য আছে যা জ্যাকব মিন্সারের কাজের সাথে সম্পর্কিত যা শিক্ষার এবং অন্যান্য মানব মূলধনের সাথে কিভাবে আয়ের সম্পর্ক আছে তা পর্যালোচনা করে । এই কাজটির মাধ্যমে বেশ কয়েকটি গবেষণা অনুপ্রাণিত হয়েছে, কিন্তু বিতর্কিতও বটে । প্রধান বিতর্কগুলি হচ্ছে কিভাবে শিক্ষার প্রভাব ব্যাখ্যা করতে হয় ।  কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা উচ্চ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হয়ে থাকে কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তাদের পূর্ণ একাডেমিক সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে না।

অর্থনীতিবিদ শ্যামুয়েল বোলস এবং হরবার্ট গিন্টস ১৯৭৬ সালে যুক্তি দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সাম্যবাদী লক্ষ্য এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন অব্যাহত মুনাফা দ্বারা প্রভাবিত বৈষম্যগুলির মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব অব্যাহত আছে ।

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। বৈশ্বিক কিংবা জাতীয় শিক্ষা পদ্ধতিতে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের সৃষ্টি করা হয়। এক্ষেত্রে বৃত্তি প্রদান অন্যতম মানদণ্ডস্বরূপ। ইংল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের ন্যায় উন্নত দেশগুলোয় বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ ছাত্রদেরকে নির্বাচিত করে শিক্ষা ব্যয় থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। শিক্ষাক্রমিক ফলাফলে ছাত্রদের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে সেরা ছাত্রকে গ্রেডের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।

অনেকক্ষেত্রে কিছুসংখ্যক দেশে অতি উচ্চমাত্রায় চাপ প্রয়োগের ফলে ছাত্রদের মাঝে বুদ্ধি-বৃত্তি চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকসময় পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার দরুন তা আত্মহত্যার পর্যায়ে এসে পৌঁছে যায়। এক্ষেত্রে জাপানের শিক্ষাপদ্ধতি প্রধান উদাহরণ হিসেবে বিবেচ্য। আলফি কন শিক্ষা ব্যবস্থায় এজাতীয় প্রতিযোগিতার সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ‘ছাত্রদের যোগ্যতা নির্ধারণে প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এটি আমাদের সবাইকে পরাজয়ের দিকে নিয়ে যায়’। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রিচার্ড লেয়ার্ডও প্রতিযোগিতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতার ফলে ছাত্ররা এক ধরনের চাপ উপলদ্ধি করে। তারা মনে করে যে তাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে অন্যান্যদের তুলনায় সেরা হওয়া। তরুণেরা তাদের প্রাত্যহিক বিদ্যালয় জীবনে কি শিখছে তাই মুখ্য বিষয়। এবং এ ধরনের প্রতিযোগিতা সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে না।




#Article 104: পরিবার (464 words)


 

পরিবার পিতা মাতা ও তাদের সন্তান-সন্ততিদের কেন্দ্র করে হতে পারে, দ্বিতীয়ত একসঙ্গে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজন সমবায়ে একটি প্রসারিত পরিবারও হতে পারে। তৃতীয় ধরনের পরিবার হলো একটি বৃহৎ সংসার, যেখানে অন্যান্য আত্মীয় ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কিংবা তাদের ছাড়া অনাত্মীয়রাও যুক্ত হয়। 
পরিবার প্রায়শ সন্তানসহ বা সন্তানবিহীন এক বা একাধিক দম্পতির ছোট সংসার নিয়ে গঠিত। এর আর্থিক ভিত্তি রয়েছে। এই ভিত্তিকে কেন্দ্র করে আত্মীয়, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং ঐক্যবদ্ধ কাজের মাধ্যমে তা রূপায়িত হয়। পরিবারের বিকাশে সন্ধানযোগ্য বংশগত সম্পর্ক সাধারণত জ্ঞাতি সম্পর্কের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। এই শৃঙ্খলার মধ্যে সদস্যরা সমাজের আর্থিক ও সামাজিক উপ-প্রথাগুলি গড়ে তোলে।

বিশ্বের পরিবারও রক্তসম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বের যেকোন পরিবারের অধিকাংশই স্বামী-স্ত্রী ও তাদের অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের নিয়ে গঠিত। স্বামী ও স্ত্রী, অথবা বিবাহিত জীবনের এই দুই অংশীদারের যে-কেউ একজন সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ-কর্মের চালক। পরিবার প্রধানের দিক থেকে বংশানুক্রমিক সদস্যদের মধ্যে দাদা, দাদি, বাবা, মা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ছেলের বউ, নাতি, নাত-বউ এবং নাতনি অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে, জ্ঞাতি সদস্যদের মধ্যে রয়েছে চাচা ও চাচী, চাচার ছেলে ও মেয়ে, ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী, ভাইয়ের ছেলেমেয়ে এবং এই ধারাবাহিকতায় অন্যান্যরা। বংশীয় ও জ্ঞাতিগত উভয় শ্রেণীতে পরিবার প্রধানের সকল সন্ধানযোগ্য পূর্ব-পুরুষ ও উত্তরপুরুষ বিগত দিনের অব্যাহত সদস্যতা এবং ঘনিষ্ঠতার পারস্পরিক অনুভবের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্য হওয়ার স্বীকৃতি লাভ করতে পারে।

বিশ্বে বংশের পরিজনরা পিতা থেকে পুত্র ক্রমিকতায় অর্থাৎ পুরষ পরম্পরার নিম্নগামী ধারায় সংজ্ঞায়িত ও পরিচিত। পিতৃতান্ত্রিক সূত্র নববিবাহিত দম্পতিকে স্বামীর ঘরে ও সংসারে বসবাসের প্রথার সঙ্গে যুক্ত করে। এই উপ-প্রথাসমূহ অনেকগুলো খণ্ডরূপে প্রতিফলিত, যেমন বাড়ি (একটি উঠানকে কেন্দ্র করে বহু লোকজন নিয়ে গঠিত), পাড়া (চারদিকে অনেকগুলি বাড়ি নিয়ে গঠিত প্রতিবেশ) এবং সমাজ (ক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠী যেখানে সাধারণভাবে সামাজিক, আর্থিক ও ধর্মীয় সুবিধাদি লভ্য)। সম্ভবত সমাজ সদস্যদের খুঁজে নেওয়া যায় কয়েকটি সাধারণ পূর্বপুরুষের বংশ-পরম্পরায়। বাংলাদেশের মানব সম্প্রদায়গুলোর এই বিভাজিত সংগঠনকে এক সূত্রীয় বংশগতির নিয়ম অবলম্বন করতে হয়েছিল। বিশ্বের পরিবারগুলি পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অনুশীলনকারী। ব্যাপক অর্থে তারা এক একটি মুক্ত দল। বিবাহিত দম্পতির বন্ধন আত্মীয়বর্গের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত। স্বামী-স্ত্রী দুজনের যেকোন একজন আত্মীয়দের দায়-দায়িত্ব বহন করে।

বিশ্বে পরিবারের লোকজনদের চেনা যায় একই খানা বা চুলার অংশীদার হিসেবে। একজন বিবাহিত পুরুষ ও নারী মিলিয়ে একটি সমাজ একক। তাদের সংহতি, অভিন্ন স্বার্থ ও কর্তব্য তাদের যেকোন একজনের অন্যবিধ সম্পর্কজাত দায় ও স্বার্থ থেকে অধিক পূর্বাধিকার পায়। তাদের বংশধররা পারস্পরিক স্বার্থে যুক্ত এবং বিবাদরত। পরিবারের সদস্যরা একে-অপরের ওপর নির্ভরশীল এবং সম্পদ, শ্রম ও আবেগ-অনুভূতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা জীবনের সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক দিকগুলি পরিচালনা করে।

নির্দিষ্ট বংশধারায় সাধারণত একজন নারী বিভিন্ন বংশের কোন একজন পুরুষের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়। বিয়ের পর সে নিজের বাপের বাড়ি ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়িতে যুক্ত হয় এবং সন্তান লাভ করে। শিশুটি পিতা-মাতা উভয় দিকের বংশানুগতির অংশী হয়। উভয় দিক থেকে পরিজাত বলে পিতা-মাতার এই সন্তান মামার বাড়িতে গিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। বিবাহিত কন্যার বংশ-পরিচিতি অভিব্যক্ত হয় পিতৃসম্পত্তিতে তার অধিকারে এবং প্রধানত তার প্রথম সন্তানের জন্ম, ঘরে ধান আসা, ভাই-বোনের বিয়ে ও প্রধান প্রধান নৈমিত্তিক উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাপের বাড়িতে আগমনে।

পরিবার প্রধানত ৬ প্রকার ৷ যথা :-




#Article 105: খাদ্য (973 words)


 

আমরা যে সব বস্তু আহার করি তাকে আহার্য সামগ্রী বলে। কিন্তু সব আহার্য সামগ্রীই খাদ্য নয়। যেমন, থোড় সেলুলোজ দিয়ে গঠিত হওয়ায় আমাদের পরিপাক নালীতে পাচিত হয় না। ফলে [পুষ্টি] সহায়ক নয়। সেই সব আহার্য সামগ্রীকেই খাদ্য বলা যাবে, যা দেহের [পুষ্টি] ও বৃদ্ধি সহায়ক এবং তাপশক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে।

জীবদেহে শক্তির উৎস হল খাদ্য। সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াকালে সৌরশক্তি খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিক শক্তিরুপে আবদ্ধ হয়। জীবকোষে শ্বসনের সময় স্থৈতিক শক্তি তাপ শক্তি বা গতিশক্তি রুপে মুক্ত হয়, জীবদেহের যাবতীয় বিপাক ক্রিয়া, যেমন : শ্বসন, রেচন,পুষ্টি গ্রহণ ইত্যাদি এবং শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ, যেমন-বৃদ্ধি, চলন-গমন, জনন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং প্রানধারনের জন্য প্রত্যেক জীবকেই খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তাই, যে সব আহার্য সামগ্রী গ্রহণ করলে জীবদেহের বৃদ্ধি, পুষ্টি, শক্তি উৎপাদন ও ক্ষয়পূরন হয়, তাকেই খাদ্য বলে।

জীবদেহে খাদ্যের কার্যকারিতা অনুযায়ী খাদ্য কে দু'ভাগে ভাগ করা হয়, যেমন-

খাদ্যে ছ'টি উপাদান থাকে, যথা- শর্করা, আমিষ বা প্রোটিন, স্নেহপদার্থ, ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, খনিজ লবণ এবং পানি।

উপাদান :
কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন—এই তিনটি উপাদান নিয়ে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট গঠিত। শর্করায় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন ২:১ অনুপাতে থাকে। শর্করার আণবিক সংকেত ; যেমন গ্লুকোজ , সুক্রোজ  ইত্যাদি।
  
উৎস :
ধান বা চাল, গম, ভূট্টা, বাজরা, আলু, ওলকপি, কচু, বীট, গাজর ইত্যাদিতে স্বেতসার বা স্টার্চ; খেজুর, আঙ্গুর, আপেল ইত্যাদিতে দ্রাক্ষাশর্করা বা গ্লুকোজ; শাক-সবজি, বেল, তরমুজ, থোড় ইত্যাদিতে সেলুলোজ; আম, কলা, কমলালেবু প্রর্ভতি পাকা ফলে ফলশর্করা বা ফুক্টোজ; চিনি, গুড়, মিছরী ইত্যাদিতে ইক্ষুশর্করা বা সুক্রোজ; দুধে দুগ্ধ শর্করা বা ল্যাক্টোজ এবং পাঁঠার যকৃৎ ও পেশীতে গ্লাইকোজেন বা প্রাণীজ শ্বেতসার পাওয়া যায়।
 
শ্রেণীবিভাগ :
কার্বোহাইড্রেটের প্রত্যেক অণুতে সরল শর্করার এক বা একাধিক এককের উপস্থিতি অনুসারে কার্বোহাইড্রেটকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ছে। যথা :

১. মনোস্যাকারাইড :যেসব শর্করা একটি মাত্র অণু দ্বারা গঠিত, তাকে মনোস্যাকারাইড বলে। যথা: গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও গ্যালাকটোজ।

২. ডাইস্যাকারাইড :যেসব শর্করা দুটি অণু দ্বারা গঠিত, তাকে ডাইস্যাকারাইড বলে। যেমন: সুক্রোজ, ল্যাকটোজ ও মলটোজ।

৩. পলিস্যাকারাইড :যেসব শর্করা অনেক অণু দ্বারা গঠিত, তাকে পলিস্যাকারাইড বলে। যেমন: স্টার্চ, গ্লাইকোজেন ও সেলুলোজ।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : 

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ না করেও শুধুমাত্র প্রচুর পরিমাণে শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য খেয়ে মানুষ সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন যাবৎ বেঁচে থাকতে পারে। এই জন্য শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যকে প্রোটিন বাঁচোয়া খাদ্য বলে

উপাদান :
কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন সমন্বয়ে প্রোটিন গঠিত। অনেক সময় সালফার এবং ফসফরাসও প্রোটিনে থাকে। প্রোটিন-অণু অসংখ্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে গঠিত হয়।
  
উৎস :
মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ছানা ইত্যাদিতে প্রাণিজ প্রোটিন এবং ডাল, সয়াবিন, বীন, গম ইত্যাদিতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন পাওয়া যায়। প্রানিজ প্রোটিনে অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রায় সব গুলিই থাকে বলে প্রাণিজ প্রোটিনকে প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন বালা হয়।
 
শ্রেণীবিভাগ : 
প্রোটিনকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১. সরল প্রোটিন :যে সব প্রোটিন অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে না, তাদের সরল প্রোটিন বলে। যথা: অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন, প্রোটমিন, হিস্টোন, গ্লায়াডিন, গ্লুটেলিন ইত্যাদি সরল প্রোটিনের উদাহরণ।
 
২. সংযুক্ত প্রোটিন :সরল প্রোটিন যখন অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন তাদের সংযুক্ত প্রোটিন বলে। যথা: হিমোগ্লোবিন, হিমোসায়ানিন, ফসফোপ্রোটিন, লাইপোপ্রোটিন ইত্যাদি।

৩. লব্ধ প্রোটিন :যে সব প্রোটিন পরিপাক নালীতে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য পরিপাকের সময় উদ্ভূত হয়, তাদের লব্ধ প্রোটিন বলে। যথা: পেপটন, পেপটাইড ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : 

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, ১ গ্রাম প্রোটিন অণু দহন হলে ৪.১ কেসিএল তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রত্যহ প্রায় ১০০-১৫০ গ্রাম প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের প্রয়োজন।

উপাদান :
কার্বন, হাইড্রোজেন, এবং অক্সিজেন নিয়ে স্নেহপদার্থ বা ফ্যাট গঠিত হয়। এখন অক্সিজেন অনুপাত শর্করা তুলনায় কম এবং শর্করার মত হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন ২:১ অনুপাতে থাকে না। ফ্যাট প্রকৃতপক্ষে অ্যাসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে গঠিত এস্টার বিশেষ।

উৎস :
বাদাম, নারিকেল, সরষে, রেড়ী বীজ, তুলা বীজ ইত্যাদিতে উদ্ভিজ্জ ফ্যাট এবং মাখন, ঘি, চর্বি ইত্যাদিতে প্রানিজ ফ্যাট থাকে। সাধারন উত্তাপে যে সমস্ত ফ্যাট তরল অবস্থায় থাকে, তাদের তেল বলে।
 
শ্রেণীবিভাগ : 
ফ্যাট সাধারনত দু;রকমের হয়। যথা: 
১. সরল ফ্যাট :যে সব ফ্যাট অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে না, তাদের সরল ফ্যাট বলে। যথা: ওয়াক্স বা মোম, ল্যানোলিন ইত্যাদি সরল ফ্যাটের উদাহরণ।
 
২. যৌগিক ফ্যাট :সরল ফ্যাট যখন অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন তাদের যৌগিক ফ্যাট বলে। যথা: ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, অ্যামাইনো-লিপিড ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : 

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, ১ গ্রাম অণু ফ্যাট দহন হলে ৯.৩ কেসিএল তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রত্যহ প্রায় ৫০ গ্রাম স্নেহপদার্থ প্রয়োজন।

যে বিশেষ জৈব পরিপোষক সাধারণ খাদ্যে অতি অল্প পরিমাণে থেকে দেহের স্বাভাবিক পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং রোগপ্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধি করে, তাকে ভিটামিন বলে।

শ্রেণীবিভাগ : 
দ্রাব্যতা অনুসারে ভিটামিনগুলিকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা: 
১. তেল বা স্নেহপদার্থে দ্রবনীয় ভিটামিন :যে সব ভিটামিন তেল বা স্নেহপদার্থে দ্রবীভূত হয়, তাদের স্নেহপদার্থে দ্রবনীয় ভিটামিন বলে। যথা: A, D, E, K।
 
২. জলে দ্রবনীয় ভিটামিন :যে সব ভিটামিন জলে দ্রবীভূত হয়, তাদের জলে দ্রবনীয় ভিটামিন বলে॥ যথা: B, C এবং P।

উৎস :
ভিটামিন দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, প্রানীদের যকৃৎ, মাছের যকৃৎ নিঃসৃত তেল, মাখন, উদ্ভিজ্জ তেল, বাদাম, ঢেঁকিছাটা চাল, লাল আটা, ছোলা, মুগ, বীট, গাজর, মটরশুঁটি, পালংশাক, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেবু, আম, আমলকি, আপেল ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। ভিটামিনের এই সব উৎসের মধ্যে দুধ, ডিম, পালংশাক, টমেটো, মটরশুঁটি, কলা, আপেল ইত্যাদিতে বেশীর ভাগ ভিটামিন পাওয়া যায়। ভিটামিন A এবং D এর উৎস মোটামুটি এক, যেমন : কড্, হ্যালিবাট যকৃত নিঃসৃত তেল (লিভার অয়েল), মাখন, দুধ, ডিম,গাজর, বাঁধাকপি, ইত্যাদি। নারিকেল, সরষে, রেড়ী বীজ, তুলা বীজ ইত্যাদিতে উদ্ভিজ্জ ফ্যাট এবং মাখন, ঘি, চর্বি ইত্যাদিতে প্রাণিজ ফ্যাট থাকে। সাধারন উত্তাপে যে সমস্ত ফ্যাট তরল অবস্থায় থাকে, তাদের তেল বলে।
 
পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : 

খনিজ লবণ হল খাদ্য উপাদন এরা শক্তি সরবরাহ করে না। খনিজ লবণ হল অজৈব। 
 
খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা-

১৷ পুষ্টি - জীব দেহের স্বাভাবিক পুষ্টির জন্য খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা আছে।

২৷ বৃদ্ধি - জীব দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য খনিজ লবণের প্রয়োজন।

৩৷ রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা - রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জনের জন্য খনিজ লবণের গ্রহণের প্রয়োজন আছ।

পানি খাদ্যের একটি উপাদান। মানবদেহের জন্য 
পানি অপরিহার্য। দেহের গঠন এবং অভ্যন্তরীণ কাজ  জল ছাড়া চলতে পারে না। আমাদের দৈহিক ওজনের ৬০-৭০% পানি। আমাদের রক্ত মাংস, স্নায়ু, দাঁত, হাড় ইত্যাদি প্রতিটি অঙ্গ গঠনের জন্য পানি প্রয়োজন।
দেহকোষ গঠন ও কোষের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো পানি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।




#Article 106: স্বাস্থ্য (104 words)


মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিজ্ঞানের জন্য দেখুন স্বাস্থ্য বিজ্ঞান

স্বাস্থ্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ১০টি মানদন্ড হল—একঃ কর্মশক্তি-সম্পন্ন, স্বাভাবিকভাবে জীবনের বিভিন্ন কাজ মোকাবেলা করতে পারে। দুইঃ আশাবাদী, সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করতে পারে। তিনঃ নিয়মিত বিশ্রাম নেয়, ঘুম ভাল। চারঃ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে, বিভিন্ন অবস্থার মোকাবেলা করতে পারে। পাঁচঃ সাধারণ সর্দি ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধক শক্তি আছে। ছয়ঃ ওজন সঠিক, শরীরের সংগঠনিক দিক সঠিক। সাতঃ চোখ উজ্জ্বল, কোনো প্রদাহ রোগ নেই। আটঃ দাঁত পরিষ্কার এবং সতেজ, ব্যাথা নেই, দাঁতের মাঢ়ির রং স্বাভাবিক। নয়ঃ চুলে উজ্জ্বতা আছে, খুশকি নেই। দশঃ হাড় স্বাস্থ্যবান, পেশি ও ত্বক নমনীয়, হাঁটাহাঁটি করলে কোনো অসুবিধা নেই।




#Article 107: ঘর (222 words)


ঘর বলতে মানুষের বসবাসের জন্য নির্মিত কাঠামোকে বোঝায়।
গৃহ শব্দ থেকে ঘর শব্দটি এসেছে। ঘর শব্দের অন্যান্য সমার্থক শব্দগুলো হচ্ছে - ভবন, আলয়, আবাস, নিবাস ইত্যাদি।

আদিকালে মানুষ প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্য পাহাড়-পর্বতের গুহায় অবস্থান করতো। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ ঐ গুহাকেই নিজের ঘর হিসেবে ভাবতে শেখে। পরবর্তীতে মানুষ তার তীক্ষ্ণ বিচার-বুদ্ধি, ক্ষমতা, দক্ষতা প্রয়োগ করে কালের পরিক্রমায় বর্তমানে ঘরে অবস্থান করছে।

ঘর তৈরী করে মানুষ সংসারী হয়েছে। সাধারণতঃ বসবাস উপযোগী ঘর তৈরীতে বাঁশের খুঁটি, টিনসহ অন্যান্য সহায়ক সামগ্রীর দরকার পরে। ঘর বাঁধা কিংবা কুটীর নির্মাণে কুঁড়েঘরে ধানের খড় কিংবা পাটকাঠির প্রচলন ছিল তিন/চার দশক পূর্বে। বর্তমানে এগুলোর পাশাপাশি ইট, বালু, সিমেন্ট, লোহার প্রচলন বেশ বেড়ে গেছে।

ঘরের প্রকারভেদ হিসেবে - কুঁড়েঘর, টিনের ঘর, দালান, মাটির ঘর, আধা-পাকা ঘর ইত্যাদি প্রয়োগ করা হয়। ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার উপর ঘরের স্তরগুলো লক্ষ্য করা যায়।

সামাজিকভাবে নিজস্ব ঘরকে বাড়ী এবং যারা অন্যের বাড়ীতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন, তাদেরকে ঘর শব্দের পরিবর্তে বাসা হিসেবে আখ্যায়িত করতে দেখা যায়।

ব্যক্তি হিসেবে পুরুষ তার স্ত্রীকে ঘরনী কিংবা গৃহলক্ষ্মী হিসেবে দেখে থাকে। গৃহিণী হিসেবে পুরুষের সাথে থাকাকে ঘর করা বলে। এছাড়ও, বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনের উপযোগী বংশ অন্বেষণকে ঘর খোঁজা বলে। দুঃখজনক সংবাদ হিসেবে ঘর ভাঙানো শব্দটি সত্যিকার অর্থেই বেশ কষ্টকর। কুমন্ত্রণা, ব্যক্তির চরিত্র, মানসিক ভারসাম্য ইত্যাদি ঘর ভাঙানোর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী।

ঘরের রক্ষণাবেক্ষনে পুরুষের ভূমিকাই বেশি। তবে সাংসারিক শান্তিসহ সামাজিক ভারসাম্যতা রক্ষার্থে স্ত্রীর ভূমিকাও কোন অংশেই কম নয়।




#Article 108: মন (768 words)


মন দর্শনশাস্ত্রের একটি অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা। মন বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যে, বুদ্ধি এবং বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মন কি এবং কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে অনেক রকম তত্ত্ব প্রচলিত আছে। এসব তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে মূলতঃ প্লেটো, অ্যারিস্টটল এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের সময়কাল থেকে।

জড়বাদী দার্শনিকগণ মনে করেন যে, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে উঠে।

মন এর সঠিক সংজ্ঞা সম্ভব নয়। তবে এই ভাবে বলা যেতে পারে, মন হলো এমন কিছু যা নিজের অবস্থা এবং ক্রিয়াগুলি সম্পর্কে সচেতন। মনের সরুপ লক্ষণ হলো চেতনা যার থেকে মনকে জড়ো থেকে আলাদা করা হয়।

মন চেতনা উপলব্ধি চিন্তা রায় ভাষা এবং মেমরি সহ জ্ঞানীয় অনুষদ একটি সেট। এটা সাধারণত একটি সত্তা এর চিন্তাভাবনা এবং চেতনা অনুষদ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এটি কল্পনা স্বীকৃতি এবং অনুগ্রহের ক্ষমতা ধারণ করে, এবং মনোভাব এবং কর্মের ফলে অনুভূতি ও আবেগ প্রক্রিয়াকরণের জন্য দায়ী।

দর্শনের ধর্ম মনোবিজ্ঞান এবং জ্ঞানের বিজ্ঞানের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে যা মনকে গঠন করে এবং তার বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলি কি।

মনের প্রকৃতির বিষয়ে একটি খোলা প্রশ্ন হলো মস্তিষ্কের সমস্যা যা শারীরিক মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কাছে মনের সম্পর্কের তদন্ত করে। পুরাতন দৃষ্টিভঙ্গি দ্বৈতবাদ এবং আদর্শবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে যা মনকে কোনভাবে অ শারীরিক বলে মনে করে। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলি প্রায়ই শারীরিকতা এবং কার্যকারিতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে যা মনে করে যে মন মস্তিষ্কের সাথে প্রায় অনুরূপ এবং স্নায়ুসংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপ যেমন সংক্রমনের কার্যকলাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।, যদিও দ্বৈতবাদ ও আদর্শবাদে অনেক সমর্থক রয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন উদ্বেগ যে মানুষের মধ্যে কি ধরনের মন থাকতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, মন যে সমস্ত বাস্তবসম্মত জিনিসগুলি দ্বারা কিছু বা সমস্ত প্রাণী দ্বারা মনুষ্যদের কাছে একচেটিয়াভাবে হয়, তা সবই একটি কঠোরভাবে সুনির্দিষ্ট চরিত্রগত কিনা বা মন মনুষ্য বানানো মেশিনগুলির কিছুও হতে পারে।

যাই হোক না কেন এর প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবেই সম্মত হয় যে মন এমন একটি বিষয় যার ফলে ব্যক্তিবিশেষ সচেতনতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের পরিবেশের দিকে নজর দেওয়া এবং কোনো ধরনের এজেন্সিগুলির সাথে উদ্দীপনাকে প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং চিন্তা ও অনুভূতি সহ চেতনা থাকতে পারে।

বিভিন্ন ধারণা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের দ্বারা বিভিন্ন ধারণা থেকে বোঝা যায়। কিছু মানুষ মনুষ্যদের জন্য এক সম্পত্তি হিসাবে মনকে দেখতে পায় কিন্তু অন্যেরা প্রাণীদের এবং দেবতাদের কাছে নন জীবিত সত্তা (যেমন প্যান্সিসিজম এবং প্রাণিবিজ্ঞান) মনের বৈশিষ্ট্যগুলিকে সমর্পণ করে। মৃত্যুর পরে জীবন এবং জীববিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক আদেশের উভয় তত্ত্বের সাথে জোরারদার বুদ্ধ প্লাটো অ্যারিস্টটল এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রীক ভারতীয় এবং পরবর্তীতে ইসলামিক মতবাদের তত্ত্বের উদাহরণ হিসাবে মনস্তাত্ত্বিক কিছু কিছু রেকর্ডকৃত ধারণাগুলি (মনুষ্য বা আত্মার সাথে একরকমভাবে বর্ণনা করা হয়েছে) মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় দার্শনিক।

মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকরা প্লাতো, ডেসকার্টস, লিবিনিজ, লক, বার্কলে, হিউম, কান্ট, হিগসেল, শোপেনহেওর, সিয়ারেল, ডেনেট, ফডর, নাগেল এবং ক্লামার্স।

সাধারণত মনকে তিনটি ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করা হয়
 

প্রথম টি হলো মন এর অভিজ্ঞতামূলক মতবাদ পরেরটা আধ্যাত্মিক-মতবাদ, শেষেরটা ভাববাদীদের মতবাদ।

মন ও চেতনা

মন ও চেতনা এক নয়। যদিও চেতনা হল মনের স্বরুপ লক্ষণ।

মন এক আধ্যাত্মিক ধারণা। যা মানুষ শুধু কল্পনা করতে পারে যাকে স্পর্শ করা যায় না। মানুষ কাউকে উপলব্ধি করতে চাইলে মানুষ ভাবে সে মন থেকেই করছে। কোন বিষয়ের প্রতি সম্পর্কিত হতে হলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ধ্যান- ধারণা বা সুখ-দুঃখ অনুভতির প্রয়োজন হয় যা মানুষ মন থেকে শরীরের আচরণের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। 
মানুষের বেশকিছু জৈবিক চাহিদা রয়েছে। এগুলো পূরণ করার জন্য মানুষে বিভিন্ন সম্পর্কে যায় এবং নানা ধরনের আচরণ করে থাকে। জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধা, তৃঞ্চা, ঘুম, যৌনতা ও রেচন প্রভৃতি। এ চাহিদাগুলো যখন পূরণ হয়ে যায়, তখন মানুষ মানবিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নানারকম কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে। এভাবে মানুষ কখন কেন জৈবিক আচরণগুলো করে এবং তারপর কখন কিভাবে কেন সে মানবিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণগুলো করা শুরু করে সেটি মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে সুপরিচিত।

মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণ করেই মানবিক বৈশিষ্ট্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। সাংস্কৃৃতিক চর্চা, বৈজ্ঞানিক চর্চা, দার্শনিক চর্চা, সাহিত্য চর্চা, গল্প করা, আয়েশ করা প্রভৃতি মানবিক পদক্ষেপজনিত আচরণ। এ সব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রেমপ্রীতি, স্নেহ, ভালোবাসা, মমতা ও প্রশান্তি, প্রভৃতি ধনাত্মক বিষয়গুলো বিকশিত হয় এবং ক্রোধ, হিংসা প্রভৃতি ঋণাত্মক বিষয়গুলো দূরীভূত হয়। তবে জৈবিক চাহিদা পূরণ না হলে মানুষ মানবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য অগ্রসর হতে চায় না। যেমন, যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ব্যাপকভাবে রয়েছে সেখানে সঙ্গীত চর্চা, বিজ্ঞান চর্চা প্রভৃতি সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না।

খ্রিস্টপূর্বকালীন সময় থেকেই দার্শনিকেরা মনের চারিত্র্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। মানব মন এবং দেহের যে সম্পর্ক তা নিয়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশের দার্শনিকরা ভাবিত হয়েছেন এবং তাদের মত প্রকাশ করেছেন। দার্শনিকদের চিন্তাবলী দুটি স্রোতে বিভক্ত:  এক দিকে মন এবং দেহ পৃথক এই দ্বৈততা এবং বিপরীতে মন এবং দেহ অভিন্ন এই একসূত্রিতা।

মনের রোগ হলো সেই সমস্ত রোগ যেগুলোর অস্তিত্ব কেবল মনে অর্থাৎ শরীরে কোনো রোগ নাই কিন্তু মন খারাপ বা মনের মধ্যে দুঃখ-বেদনা, অশান্তি-হতাশা ইত্যাদির কারণে মানসিকভাবে সুস্থ নয় ফলে শরীরের উপরও তার প্রভাব পড়ে। 
মনের রোগ হলে মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। এক্ষেত্রে তাকে মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।




#Article 109: জাদুঘর (282 words)


জাদুঘর বা সংগ্রহালয় বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে।

জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলি প্রদর্শ আধার বা ডিসপ্লে কেসের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড় জাদুঘরই প্রধান প্রধান শহরগুলিতে অবস্থিত। অবশ্য ছোটো শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় জাদুঘর গড়ে উঠতে দেখা যায়।

অতীতকালে জাদুঘরগুলি গড়ে উঠত ধনী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগে অথবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে। এই সব জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকত শিল্পকর্ম, দুষ্প্রাপ্য ও আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক বস্তু বা পুরাবস্ত।

সারা বিশ্বেই জাদুঘর দেখা যায়। প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘর ছিল আধুনিককালের স্নাতক প্রতিষ্ঠানগুলির সমরূপ।

বিশিষ্ট অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশের মতে, বাংলায় জাদুঘর কথাটি আরবি আজায়ব্ [ঘর/খানা] শব্দটির সঙ্গে তুলনীয়। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হল, যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখিয়া মন্ত্রমুগ্ধবৎ হ’তে হয়। আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান মতে, জাদুঘর শব্দের অর্থ, যে-ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে।

ইংরেজি museum (মিউজিয়াম) শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। ইংরেজি বহুবচনে এই শব্দের রূপটি হল museums (বা অপ্রচলিত শব্দ, musea)। শব্দটির মূল উৎস গ্রিক শব্দ Μουσεῖον (Mouseion); যার অর্থ গ্রিক পুরাণের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউজদের মন্দির। প্রাচীন গ্রিসে এই জাতীয় মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে পাঠাগার ও শিল্প পুরাকীর্তির সংগ্রহশালাও গড়ে উঠতে দেখা যেত। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ায় টলেমি প্রথম সোটার প্রতিষ্ঠিত দর্শন মিউজিয়াম (প্রতিষ্ঠান) ছিল এই জাতীয় একটি জাদুঘর। অ্যাথেন্সে প্লেটো প্রথম একটি মিউজিয়াম গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। যদিও পসেনিয়াসের রচনায় অন্য একটি স্থানকে মিউজিয়াম বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটি হল ধ্রুপদি অ্যাথেন্সে অ্যাক্রোপোলিশের বিপরীত দিকে অবস্থিত একটি ছোটো পাহাড়। কথিত আছে, মউসিয়াস নামে এক ব্যক্তি এই পাহাড়ে বসে গান গাইতেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি সেখানেই মারা যান এবং সেই পাহাড়েই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার নামানুসারে পাহাড়টির নামকরণ হয়েছিল মউসিয়ন (Mouseion)।




#Article 110: প্রত্নতত্ত্ব (2004 words)


বাংলা প্রত্নতত্ত্ব শব্দটি 'প্র+ত্ন= প্রত্ন' অর্থ- পুরাতন ও 'তৎ+ত্ব= তত্ত্ব'অর্থ-বিজ্ঞান। সমষ্টিগত অর্থ হল, পুরাতন  বিষয়ক জ্ঞান। প্রচলিত ধারণায়, বস্তুগত নিদর্শনের ভিত্তিতে অতীত পুনঃনির্মাণ করার বিজ্ঞানকেই প্রত্নতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করা হয়। অতীতের সংস্কৃতি ও পরিবেশগত নিয়ে চর্চা করে এমন অন্যান্য বিজ্ঞান বা বিষয়গুলোর (যেমন- ভূতত্ত্ব, পরিবেশ বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি) মধ্যে প্রত্নতত্ত্বের বিশেষত্ব হলো- এটি কেবল বস্তুগত নিদর্শন অর্থাৎ প্রামাণ্য তথ্য নিয়ে কাজ করে এবং তার সাথে মানুষের জীবনধারার সম্পর্ক নির্ণয় করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্রাচীন ভূমিরূপ ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইনামগাঁওয়ের কয়েকহাজার বছরের বৃষ্টিপাতের ধরনের একটি উপাত্ত হাজির করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন ভূমিরূপ ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য উদ্ধারের এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকলেও ওই বিশেষ বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতিতে মানুষ কিভাবে বসবাস ও জীবনযাপন, এই বিশেষ বিশ্লেষণটি প্রত্নতাত্ত্বিকরা করে থাকেন। ইনামগাওয়ের পরিবৈশিক তথ্য ও গর্তবসতিগুলো এই দুই প্রাচীন উপাদান মিলিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই সময়ের মানুষের জীবনপ্রণালি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেন। তাই প্রত্নতত্ত্বের অধ্যয়নের মূল বিষয়গুলো হলো- ভৌত ধ্বংসাবশেষ, পরিবেশগত তথ্য, জৈব অবশেষ বা জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যাবলী ইত্যাদি। আর প্রত্নতত্ত্বের কাজ হলো- এইসব বিষয়কে বিশ্লেষণ করে প্রাচীনকালের মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির তৎকালীন চিত্র বোঝা এবং তার মাধ্যমে মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের মানুষ এবং পরিবেশের রূপরেখা নির্মাণ করা। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব প্রধানত ইতিহাস ও পরিবেশ বিজ্ঞানের এক সহযোগী। তবে পরিবৈশিক প্রেক্ষিতের চেয়ে মানুষের সংস্কৃতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এমন বিষয়েই দীর্ঘকাল ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। কাজেই সাধারণত প্রত্নস্থান ও পুরাতন জিনিসপত্র আবিষ্কার, স্থান ও বস্তু চিহ্নিতকরণ ও নথিভুক্তকরণ এবং বস্তু ও কাঠামোর বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ ও তা জনসমক্ষে উপস্থাপন এর মধ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চা সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাকৃতিক ও পরিবৈশিক প্রেক্ষিত এবং অবস্তুগত ভাবগত নিদর্শন যেমন সামাজিক সম্পর্ক ও মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বর্তমানে প্রত্নতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব বর্তমানে মানুষের অতীত ইতিহাসের গৃহবন্দী চর্চার বদলে পরিবেশ, ভূপ্রকৃতি এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের অন্যান্য বিষয়ের অতীত অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যত নির্মাণের বিজ্ঞান হিসেবে চর্চিত হচ্ছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৬-খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে বেবিলনের সিপপুরে সামাথ নামক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের নির্মাতার নাম জানার উদ্দেশ্যে সম্রাট নবনিডাস () ধ্বংসস্তুপের মধ্যে খননকাজ পরিচালনা করেন। তার এই কীর্তির জন্য তাকে পৃথিবীর প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক বলে অভিহিত করা হয়। সম্রাটের কন্যা এন্নিগালডি নান্না () খননে প্রাপ্ত এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সংগৃহীত নিদর্শনাদি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন।

গ্রিক ঐতিহাসিক থুকিডাইডেস ()-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০- খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৬ অব্দে এথেন্সের প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেলস ()-এর ঈজিয়ান দ্বীপের () প্রাচীন সমাধিগুলোতে খনন পরিচালনা করে খননে প্রাপ্ত নিদর্শনাদি সম্পর্কে সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। অন্য দিকে, প্রাচীন চীনে পূর্ব-প্রজন্মের নিদর্শনাদি সংরক্ষণের মাধ্যমে পারিবারিক ও মৌখিকভাবে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। রোমান দার্শনিক লুকরেটিয়াস () খ্রিষ্টপূর্ব ৯৯-খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ অব্দে এবং চীনা দার্শনিক ইউয়ান কং () খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে চীনাদের প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণের এই চর্চা এবং এই নিদর্শনগুলোর বিশ্লষেণ করে প্রাচীন চীনা সংস্কৃতির রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।

ভারতে সুলতানী শাসনামলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ ও এর ভিত্তিতে ইতিহাস চর্চার সূচনা হয়। মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৪-১৩৫১) ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুশীলন করেন। তিনি সারা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ করেন এবং এগুলোর আলোকে ইতিহাস রচনার জন্য পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়োগ করেন। অশোকস্তম্ভসমূহের শিলালিপির পাঠোদ্ধারের জন্য তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা পৃথিবীর প্রথম পেশাদারী প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

চতুদর্শ শতক থেকে ইউরোপের রেনেসাঁ পর্বে অভিজাতদের মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়; ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রত্ন-লুটেরা উভয় সম্প্রদায় মূলত যেকোনো উপায়ে প্রত্ন নিদর্শন সংগ্রহ করার জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠেন। মিশরের পিরামিড ও ইউরোপের প্রাচীন সমাধিগুলোতে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার নামে এক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়। ইতালিতে (রোম) যাচ্ছেতাই খনন এবং নিদর্শন বাণিজ্য এতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, সেখানে বেশকিছু প্রত্ননিদর্শন বিক্রির বাজার ও বার্ষিক প্রত্ননিদর্শন বিক্রয় মেলা আয়োজন করা হতো।

এই প্রথায় প্রথম বিপরীতমুখী প্রয়াস চালান ইংরেজ গবেষক জন লিল্যান্ড ()। ১৫৩৩ থেকে ১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি প্রাচীন নথিপত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। অপর ইংরেজ গবেষক উইলিয়াম কার্ডেন () ১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ইংল্যান্ডের প্রাচীন নিদর্শনসমূহের এক বিস্তারিত তালিকা প্রণয়ন করেন যা ব্রিটানিয়া নামে প্রকাশিত হয়। তার গবেষণাকর্মটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, তিনি স্থানিক প্রেক্ষিতের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং উদ্ভিদের দেহবৃদ্ধির ধরনের পার্থক্যের ভিত্তিতে মাটির নিচে চাপা পড়া প্রত্নস্থান শনাক্তকরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। প্রত্নস্থান চিহ্নিতকরণ ও বিশ্লেষণের এই এরিয়াল পদ্ধতি (প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের কারণে বিবর্তিত হলেও) আজো অত্যন্ত জনপ্রিয়। অপর ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক জন অব্রে () Stonehenge ও Abebury নামে দুটি প্রত্নস্থানের বিশদ বিবরণ ও বিশ্লেষণ করেন। তার বিবরণের ওপর নির্ভর করে ১৭০৯ খ্রিষ্টাব্দে হারকুল্যুনেউম ও পম্পেই অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালিত হয়। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এখানে একটানা খনন পরিচালিত হয়, এবং প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের অদ্ভুত ধাঁধায় খনন পরিত্যাক্ত হয় এবং তা থেকে কোনো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে খনন আবার শুরু হয়, এখনো সেখানে খনন চলছে।

১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ও কিউরেটর সি জে থমসন থ্রি এজ সিস্টেম আবিষ্কার করলে ইতিহাসের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে। ফলে প্রত্নতত্ত্ব চর্চা এক নতুন গতি পায়। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসকে পাথর যুগ, ব্রোঞ্জের যুগ ও লোহার যুগ - এই তিনটি ভাগে ভাগ করলে, পাথরের হাতিয়ার ও ব্রোঞ্জের হাতিয়ারগুলো আসলে কী তা বোঝা সম্ভব হয়, এবং ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রদানের হাত থেকে প্রত্নতত্ত্ব রক্ষা পায়। অপর ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জে জে ওয়ারসাই ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে এই গবেষণাকে একটি একক প্রত্নস্থানের স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। একটি প্রত্নস্থানের বিভিন্ন গভীরতায় বিভিন্ন ধরনের প্রত্নসামগ্রী যে একই সময়ের ব্যক্তিরা ব্যবহার করেনি, তা যে মানুষের ইতিহাসের বিকাশের ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা এই তথ্য প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এক অভাবনীয় গতি দেয়।

১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে পম্পেই ও হারকুল্যুনেউম-এ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয় এবং এইবার প্রত্নতাত্ত্বিকরা উক্ত প্রত্নস্থলের মানুষের জীবনপ্রণালি ব্যাখ্যায় অগ্রগতি লাভ করেন। এই সাফল্য দেশ-বিদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের এক উৎসবের সূচনা করে। কার্টিয়াস গ্রিসের অলিম্পিয়ায়, কোল্ডওয়ে এবং ওয়াল্টার মেসোপটেমিয়ায়, হার্বাট কনসট্যান্টিন্যাপল ও তুরস্কের বিভিন্ন জায়গায়, পিট রিভার্স ইংল্যান্ডে এবং হুইলার ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন সূচনা করেন। এই প্রত্যেকটি খনন পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব চর্চা শুরু হয় জার্মানদের হাতে। জার্মান মানবতাবাদী ও প্রাক-ইতিহাসবেত্তা (প্রিহিস্টোরিয়ান) গুস্তাফ কোসিনা ১৮৯৫ হতে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বসতি প্রত্নতত্ত্ব (সেটেলমেন্ট প্রত্নতত্ত্ব) নামে প্রত্নতত্ত্বের এক আধুনিক মতবাদের বিকাশ ঘটান। এর মূল ভিত্তি ছিল, বস্তুনিদর্শনের (আর্টিফ্যাক্ট) ধরনের মাধ্যমে মানব সংস্কৃতি নির্ণয় এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অঞ্চলকে প্রাচীন ট্রাইব বা এথনিক গ্রুপের বসতি এলাকা বলে চিহ্নিত করা। তার পদ্ধতির সবচে সমস্যাযুক্ত বিষয় হলো বর্তমান মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে অতীত সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে সরাসরি বর্ণনা করা। এর মাধ্যমে তিনি বর্তমান জার্মানদেরকেই নর্ডিক, আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় (ইন্দো-জার্মান)-দের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন। তিনি অন্য সংস্কৃতি ও মানুষদের ওপরে জার্মানদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের পর তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে যুক্তি করতে থাকেন, লৌহ যুগে পোল্যান্ড জার্মানদের বসতির একটি অংশ ছিল। কোসিনার মৃত্যুর পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিকদের উদ্ভব হলে তারাও তার এই ডগমা গ্রহণ করে। থার্ড রাইখের সময় (হিটলারের নাজী শাসনামলকে থার্ড রাইখ বলা হয়) এই মতবাদ পৃষ্ঠপোষকতা পায়। নাজী শাসনে এটি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পায়। আলফ্রেড রোজেনবার্গ এবং হাইনরিখ হিমলার এই মতবাদ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের চেষ্টা করেন। এডলফ হিটলার এদের উভয়কে সরাসরি সাহায্য করেন। হিমলার গড়ে তোলেন Deutsches Ahnenerbe (জার্মান বংশগতির উত্তরাধিকার) নামক একটি সংস্থা। এরা কোসিনার বসতি প্রত্নতত্ত্বের বাধ্যতামূলক ব্যবহার করে (Jones ১৯৯৮:৩)। তারা জার্মানীর পূর্বদিকে বিস্তার আবিষ্কার করে। এই বিস্তার ছিল পোল্যান্ড, দক্ষিণ রাশিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলে। প্রত্নতত্ত্বের এই ধারার সঙ্গে আরও যারা এই দলে যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে হ্যান্স রাইনার্থ ও হারমান উইর্থের নাম উল্লেখযোগ্য। ইউরোপ বা বৈশ্বিকভাবে ব্যাপারটি যেমন-ই হোক না কেন, এই গবেষণা জার্মানদের জাতীয় চেতনা ও অহমবোধ বিকাশে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে, পোলিশ প্রত্নতাত্ত্বিক Konrad Jazdewski ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপের প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যাটলাস প্রকাশ করেন, তাতে তিনি ব্রোঞ্জ যুগে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে স্লোবানিক জাতির সম্প্রসারনকে চিত্রিত করেন (Kristiansen ১৯৯২:১৮), অর্থাৎ এক অর্থে তিনি পোলিশ (স্লোবানিক)-দেরকেই ইউরোপের প্রকৃত মালিক হিসেবে উপস্থাপন করেন; এটি পোলিশদের আত্মশ্লাঘার একটি হাতিয়ার হিসেবে আজো ক্রিয়াশীল।

একই ভাবে ফ্রান্সে রোমান সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ প্রতিহতকরণে গলদের প্রতিরোধের প্রত্নতাত্ত্বিক নথিগুলো ফরাসি জাতীয় চেতনা বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটেছে লা টেনে-র ওপরে প্রত্নতত্ত্বের গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর। যদিও জার্মানদের মতো এখানেও তা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণ ঘটায়, কিন্তু আইরিশ জাতীয় প্রেরণার এক উৎস হিসেবেই থেকে যায়। একই ভাবে ইসরাইলের মাসাদা অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পর দেখা যায়- সেখানে রোমান সাম্রাজ্যের বিরোধিতাকারী একদল ইহুদি গণ-আত্মহত্যা করেছিল; এই ঘটনা এবং স্থানটি ইসরাইল রাষ্ট্রটির জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে তৈরি হয়েছে, স্থানটি সামরিক অনুষ্ঠানাদির কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে (Zarubavel ১৯৯৪)।

প্রত্নতত্ত্বের এই ধারার বিকাশ উত্তর আফ্রিকা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে তুলতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (Mattingly ১৯৯৬:৫৬-৯ এবং Paddayya ১৯৯৫:১৪১)। সাম্প্রতিক সময়ে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ-রামমন্দির বিতর্কেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে (Rao ১৯৯৪, Pollock ১৯৯৬)।

বসতি প্রত্নতত্ত্বের পর প্রত্নতত্ত্বের যে মতবাদটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব-বিস্তারী ছিল তা হলো সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব। গর্ডন চাইল্ড এই মতবাদের প্রধান উদ্যোক্তা। প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় তার ব্যাপক অবদানের জন্য অনেকে তাকে প্রত্নতত্ত্বের জনক-ও বলে থাকেন। যেসব বিষয় সাধারণভাবে সংস্কৃতির অংশ বলে গণ্য হয় এবং প্রায়ই যা প্রাচীন সামাজিক সত্তার বিভিন্ন খণ্ডাংশের ফল হিসেবে গণ্য হয় তার এককের স্থানিক ও সময়গত কাঠামোর মধ্যে তৈরি বস্তুগত নিদর্শনের অভিজ্ঞতাবাদী সারসংক্ষেপ, বর্ণনা এবং শ্রেণীকরণের (ক্লাসিফিকেশন) বৈশিষ্ট্যকেই সংস্কৃতি-ইতিহাস বলা যেতে পারে। সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্বের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় ঐতিহ্যের ভিন্নতা (বা বৈচিত্র্য) সত্ত্বেও এটাই ছিল বিশ শতকের ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যত্র প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক মতবাদ। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অতীত জনগণ বা জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস তৈরি করা হয়, যা আসলে নাজি জার্মানীর প্রত্নতাত্ত্বিক কাঠামোর মূলনীতির সঙ্গে একই।

জাপানের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও কৃষিনির্ভর সংস্কৃতির প্রতি জাতীয় গুরুত্ব আরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্নতত্ত্বের এই ঘরানার গবেষণাগুলো অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে।

১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় তাসকান শহরে ড. উইলিয়াম রাথজে পরিচালিত ফেলনাময়লা প্রকল্প () আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের এক মাইলস্টোন। শহরের অধিবাসীদের ফেলে দেওয়া ময়লা-আবর্জনা থেকে শহরের মানুষের স্বভাব-চরিত্র-সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি প্রাচীন নিদর্শন থেকেও যে প্রাচীন মানুষের সংস্কৃতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব তা প্রমাণ করেন। এর ফলে প্রত্নতত্ত্ব শুধু বিজ্ঞানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তা-ই নয়, বরং পদ্ধতি হিসেবেও প্রত্নতত্ত্ব যে বৈজ্ঞানিক তা প্রমাণিত হয়। এই গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে তথ্য আহরণ করা শুরু হয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব জনপ্রিয় বিষয় হিসেবে চালু করা হয়। এর ফলে আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাপী প্রত্নতত্ত্ব চর্চা ব্যাপক বৃদ্ধি পেলে এর মতাদর্শিক ঘরানারও ব্যাপক বিস্তার ঘটে। কাঠামোবাদী, প্রক্রিয়াবাদী, উত্তর-প্রক্রিয়াবাদী, নির্মাণবাদী ইত্যাদি নানা ঘরানা দ্রুত প্রকাশিত হয়। আপাত অর্থে বিভিন্ন ছোট ছোট ইস্যুতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে আলাদা আলাদা গ্রুপ সৃষ্টি হয়, পিটার আকো একে বলছেন ঘেটো। এই সময় প্রথমবারের মতো মানুষের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে পরিস্থিতি (সিচুয়েশন) এবং প্রেক্ষিত (কনটেক্সট) এর নিরিখে গবেষণা করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। আরো পরিষ্কার করে বললে, প্রত্নতত্ত্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়; অতীত মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠী, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক-সূত্র ও সম্পর্কের সামর্থ্য, রাজনৈতিক সংগঠন ও সামাজিক স্তরায়নকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঊনিশশো আশির দশকের বিশ্ব পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করার ও সমাধানের পথনির্দেশের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাদের অবস্থান থেকে অবদান রাখার চেষ্টা করেন। গোষ্ঠী, শ্রেণী, সীমানা, আদিবাসী, জাতিত্ব ইত্যাদি প্রকরণগুলো প্রত্নতত্ত্বে আলোচিত হতে থাকে। এই সময় আকো, জোনস ও আরো কিছু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিকের উদ্যোগে কাজের তত্ত্ব বলে এক তত্ত্বহীন ঘেটো-র উদ্ভব ঘটে, এদের মূল বক্তব্য হলো- কাজ করতে করতেই একজন গবেষক তার তত্ত্ব খুঁজে পাবেন, যার সাথে পৃথিবীতে প্রচলিত অন্য তত্ত্বসমূহের কোনো মিল না-ও থাকতে পারে। কিন্তু অন্য তত্ত্বের প্রতি পূর্ব-ধারণার (প্রি-কনসেপ্ট) ফলে তিনি যদি ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন, সেটি সত্যিই বিপজ্জনক।

উৎখননের সম্ভাব্যতা বা বাস্তবতা যাচাই করার জন্যই জরিপ করা হয়।পদ্ধতিগতভাবে,প্রত্নস্থান বা প্রত্ননির্দশন শনাক্ত করা, খুঁজে বের করা,তা ভূ-পৃষ্ঠে চিহ্নত করা, মানচিত্রে শনাক্ত করা,এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করাকে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বলে।
জরিপ গবেষণা ২ ধরনের হয়ে থাকে।যথাঃ
১.pre-Survey Researc. 
২.Field Survey Researc.

কোন প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পূর্বে প্রাকখনন গবেষণা সম্পাদন করতে হয়। এর জন্য প্রথম Archaeo- book study বা library work কার্য সম্পর্কে ধারনা অর্জন এর পর কোন জায়গায় প্রত্ননিদর্শন আছে কিনা বা ঐ স্থানটি প্রত্নস্থান কিনা তা পায়ে হেটে জরিপ/ খুজে বের করার মাধ্যমকে অনুসন্ধান বলে।

কোনো গবেষণার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের ঠিক পরের স্থানটি দখল করে আছে উৎখনন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোনো পুস্তকে লিপিবদ্ধ নয়। উৎখনন হলো এমন একটি বিষয় যা কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদও পুনঃপুন খনন কার্য সম্পাদনের মাধ্যমেও কোনো প্রত্নস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার বিশেষ প্রক্রিয়া। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেমন; grid পদ্ধতি, এরিয়াল ইমেজ, স্যাটেলাইট ইমেজ ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করে উৎখনন কার্য সম্পন্ন করা যায়।

আমরা যখন কোনো প্রত্নস্থান থেকে কোন প্রকার প্রত্নবস্তুু পাই সেটাকে নানা প্রকার পদার্থ দ্বারা এটিকে তার সাথে মানানসই করে এটিকে কোন একটি জাদুঘর বা প্রত্নতাত্ত্বিক দর্শনীয় জায়গায় রাখি এটাই সংরক্ষন।আবার যাতে কোনো প্রকার বিলুপ্তির আশংক্ষা না থাকে সে পর্যায়ে রাখাকে সংরক্ষন বলে।

আমরা যখন কোনো প্রত্নবস্তু পাই সেটি কিভাবে পেলাম,সেটি কোন সময়ের,তার ওজন কত,তার উচ্চতা,তার রং,তার নাম,কতটুকু মাটির নিচে পেলাম,কোন অঞ্চলের,এভাবে খুঁটিনাটি সব লিখাকেই বলে নথিভুক্তকরন।

প্রত্নতত্ত্বের উপাদান হিসেবে সাধারণভাবে ভৌত ধ্বংসাবশেষ, পরিবেশগত তথ্য, জৈব অবশেষ বা জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যাবলী ইত্যাদিকে বিবেচনা করা হয়। তবে ভাবগত নিদর্শন যার আপাত অর্থে কোনো বহনযোগ্য, বাণিজ্যযোগ্য বা দৃশ্যমান অস্তিত্ব নাই এমন কোন বিষয়ও হতে পারে প্রত্নতাত্ত্বিকের প্রধান সূত্র।ক

প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাস ও নীতিমালা




#Article 111: জ্যোতির্বিজ্ঞান (7352 words)


জ্যোতির্বিজ্ঞান (ইংরেজি Astronomy প্রতিশব্দটি  শব্দটি থেকে উদ্ভূত) হল প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি শাখা। এই শাখায় গ্রহ, প্রাকৃতিক উপগ্রহ, তারা, ছায়াপথ ও ধূমকেতু ইত্যাদি মহাজাগতিক বস্তু এবং অতিনবতারা বিস্ফোরণ, গামা রশ্মি বিচ্ছুরণ ও মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ প্রভৃতি ঘটনাবলি এবং সেগুলির বিবর্তনের ধারাটিকে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান , রসায়ন ও  ভূগোল এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা করা হয়। সাধারণভাবে বললে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে ঘটা সকল ঘটনাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। ভৌত বিশ্বতত্ত্ব নামে আরেকটি পৃথক শাখাও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। এই শাখায় সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্ব নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা করা হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান হল প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাগুলির অন্যতম। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে দেখা যায় প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, গ্রিক, ভারতীয়, মিশরীয়, নুবিয়ান, ইরানি, চিনা, মায়া ও বেশ কয়েকটি আমেরিকান আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী নিয়মবদ্ধ প্রণালীতে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতির্মিতি, সেলেস্টিয়াল নেভিগেশন, পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পঞ্জিকা প্রণয়নের মতো নানা রকম বিষয় ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্তর্গত। তবে আজকাল পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানকে প্রায়শই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের সমার্থক মনে করা হয়।

পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞান দু’টি উপশাখায় বিভক্ত: পর্যবেক্ষণমূলক ও তাত্ত্বিক। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুগুলিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই সব তথ্য পদার্থবিজ্ঞানের মূল সূত্র অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ। অন্যদিকে তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই সব বস্তু ও মহাজাগতিক ঘটনাগুলি বর্ণনার জন্য কম্পিউটার বা অন্যান্য বিশ্লেষণধর্মী মডেল তৈরির কাজ করা হয়।  জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই দু’টি ক্ষেত্র পরস্পরের সম্পূরক। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের ফলাফলগুলির ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করে। অন্যদিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাত্ত্বিক ফলাফলগুলির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

বিজ্ঞানের অল্প কয়েকটি শাখায় এখনও অপেশাদারেরা প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান এই শাখাগুলির অন্যতম। মূলত অস্থায়ী ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। নতুন ধূমকেতু আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

ইংরেজি ভাষায় অ্যাস্ট্রোনমি (Astronomy) শব্দটির অর্থ নক্ষত্রের নিয়ম (অথবা অনুবাদের তারতম্য অনুযায়ী নক্ষত্র চর্চা)। অ্যাস্ট্রোনমি শব্দটি প্রাচীন গ্রিক  শব্দটি থেকে উদ্ভূত। গ্রিক  (উচ্চারণ: astron) শব্দটির অর্থ নক্ষত্র এবং -νομία (উচ্চারণ: ) শব্দটি গ্রিক  (উচ্চারণ: nomos) শব্দটি থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নিয়ম বা চর্চা। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের উৎস এক হলেও বর্তমানে এই দু’টিকে সম্পূর্ণ পৃথক বিষয় হিসেবেই ধরা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনাবলির বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করেন। অন্যদিকে জ্যোতিষীগণ দাবি করেন, মহাজাগতিক বস্তুগুলির অবস্থান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

আলোচ্য বিষয়টিকে বোঝাতে পারিভাষিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান শব্দ দু’টিই ব্যবহার করা যেতে পারে। সুস্পষ্ট আভিধানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, জ্যোতির্বিজ্ঞান হল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে অবস্থিত বস্তু ও সংঘটিত ঘটনাবলি এবং সেগুলির প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক গুণাবলির পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান বলতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেই শাখাটিকে বোঝায়, যেটিতে মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনাবলির আচরণ, প্রাকৃতিক গুণাবলি ও গতিবিদ্যা-সংক্রান্ত পদ্ধতিগুলি আলোচিত হয়। ফ্র্যাঙ্ক শু রচিত দ্য ফিজিক্যাল ইউনিভার্স নামক প্রাবেশিক পাঠ্যপুস্তকের ভূমিকা প্রভৃতি কয়েকটি ক্ষেত্রে বলা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দটির দ্বারা বিষয়টির গুণগত পর্যালোচনা বোঝানো যেতে পারে। অন্যদিকে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান শব্দটি ব্যবহা্র করা যেতে পারে বিষয়টির পদার্থবিদ্যা-সংক্রান্ত পর্যালোচনাকে। আধুনিক কালে জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত অধিকাংশ গবেষণা যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান-সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে নিয়ে করা হয়। সেই কারণে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বস্তুত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানও বলা যেতে পারে। জ্যোতির্মিতির মতো কয়েকটি বিষয় অবশ্য খানিকটা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান হলেও বিশুদ্ধভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান। এই বিষয়টির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা যে বিভাগে গবেষণা করছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান শব্দ দু’টি ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ব্যবহারের নেপথ্যেও দু’টি কারণ থাকে। প্রথমত, যদি বিভাগটি ঐতিহাসিকভাবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শাখা হিসেবে স্বীকৃত হয়, সেক্ষেত্রে বিষয়টি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে; এবং দ্বিতীয়ত কোনো পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিবর্তে পদার্থবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করে এই বিভাগে যোগ দেন, সেক্ষেত্রেও বিভাগটিকে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা যেতে পারে। এই বিষয়ের কয়েকটি অগ্রণী বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িক পত্রিকা হল দি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল, দি অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল ও অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স।

প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান সীমায়িত ছিল খালি চোখে দৃশ্যমান মহাজাগতিক বস্তুগুলির পর্যবেক্ষণ ও সেগুলির গতিবিধি সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যেই। অনুমিত হয়, একাধিক প্রাচীন সভ্যতার অধিবাসীবৃন্দ জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রচুরি যন্ত্রপাতি জোগাড় করেছিল। প্রথাগত আকাশ পর্যবেক্ষণের কাজ ছাড়াও সেই যুগের মানমন্দিরগুলিতে ঋতুনির্ণয়ের মাধ্যমে শস্যরোপনের সময় নির্ধারণ ও বছরের দৈর্ঘ্য মাপার কাজও চলত। কৃষিকার্যের ক্ষেত্রে এই দু’টি কাজ সেকালে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেলিস্কোপ প্রভৃতি যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের কাজটি করা হত খালি চোখে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, পারস্য, ভারত, মিশর ও মধ্য আমেরিকায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একাধিক মানমন্দির গড়ে তোলা হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছিল। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান উপজীব্য বিষয় ছিল গ্রহ ও নক্ষত্রগুলির অবস্থানগত মানচিত্র অঙ্কন। এই বিজ্ঞানটিই আধুনিক যুগে জ্যোতির্মিতি নামে পরিচিত। এই জাতীয় পর্যবেক্ষণের ফলেই গ্রহগুলির গতি সম্পর্কে মানুষের আদিম ধারণাগুলি গড়ে ওঠে এবং মহাবিশ্বে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর প্রকৃতি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা শুরু হয়। সেই যুগে মনে করা হত, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং সূর্য, চাঁদ ও তারাগুলি পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। এই তত্ত্বটি ভূকেন্দ্রিক মডেল বা গ্রিক দার্শনিক টলেমির নামানুসারে টলেমীয় বিশ্বতত্ত্ব নামে পরিচিত।

প্রাচীন কালে গাণিতিক ও বিজ্ঞানসম্মত জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সূচনা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যাবিলনীয়রা এই ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অন্যান্য সভ্যতাগুলিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার যে প্রথার সূত্রপাত ঘটে, তার ভিত্তিপ্রস্তর ব্যাবিলনীয়েরা স্থাপন করেছিলেন। তারাই প্রথম আবিষ্কার করেন যে, সারোস নামে একটি পুনরাবৃত্ত চক্রে চন্দ্রগ্রহণ ঘটে থাকে।

ব্যাবিলনীয়দের পথ অনুসরণ করে প্রাচীন গ্রিস ও হেলেনীয় বিশ্বেও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। মহাজাগতিক ঘটনাবলির যুক্তিসংগত বাস্তব ব্যাখ্যার অনুসন্ধানের সূত্রপাত ছিল গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে অ্যারিস্টারকাস অফ সামোস চাঁদ ও সূর্যের আয়তন ও দূরত্ব হিসেব করেন এবং সৌরজগতের সূর্যকেন্দ্রিক রূপের ধারণাটি প্রস্তাব করেন। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে হিপারকাস অয়নচলন আবিষ্কার করেন এবং চাঁদের আয়তন ও দূরত্ব গণনা করেন। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা সংক্রান্ত যে সব যন্ত্রগুলি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে জানা যায়, তার মধ্যে অ্যাস্ট্রোল্যাবের মতো কয়েকটি যন্ত্র উদ্ভাবনও করেছিলেন হিপারকাস। হিপারকাস ১০২০টি তারার একটি পূর্ণাঙ্গ সুবিন্যস্ত তালিকা প্রস্তুত করেন এবং উত্তর গোলার্ধ থেকে দৃশ্যমান অধিকাংশ তারামণ্ডল গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকেই উদ্ভূত। অ্যান্টিক্যাথেরা মেকানিজম (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০-৮০ অব্দ) ছিল একটি প্রাচীন অ্যানালগ কম্পিউটার, যা প্রস্তুত করা হয়েছিল নির্দিষ্ট তারিখে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলির অবস্থান গণনা করার জন্য। এই ধরনের জটিল প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি খ্রিস্টীয় ১৪শ শতাব্দীতে ইউরোপে যান্ত্রিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘড়ি আবিষ্কারের আগে আসেনি।

মধ্যযুগের ইউরোপে খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা থমকে ছিল। অবশ্য এই সময় ইসলামি বিশ্বে এবং অন্যান্য অঞ্চলে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছিল। ৯ম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইসলামি বিশ্বে প্রথম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরগুলি গড়ে ওঠে। ৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যদেশীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আজোফি তার বুক অফ ফিক্সড স্টারস গ্রন্থে স্থানীয় জোটের বৃহত্তম ছায়াপথ অ্যান্ড্রোমিডার বর্ণনা দেন। ১০০৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশরীয় আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলি ইবন রিদওয়ান ও চিনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লিপিবদ্ধ ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অ্যাপারেন্ট ম্যাগনিচিউড তারাজাগতিক ঘটনা এসএন ১০০৬ অতিনবতারা পর্যবেক্ষণ করেন। বিজ্ঞানের এই শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামি (অধিকাংশ স্থলেই পারস্যদেশীয় বা আরব) জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ হলেন আল-বাট্টানি, থেবিট, আজোফি, আলবুমাসার, বিরুনি, আলজাকেল, আল-বিরজন্দি এবং মারাঘেহ ও সমরকন্দ মানমন্দিরের জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ। 
সেই যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ তারাগুলির আরবি নাম রেখেছিলেন। সেগুলি এই যুগে স্বতন্ত্র তারার নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এও মনে করা হয় যে গ্রেট জিম্বাবোয়ে ও টিম্বাকটুর ধ্বংসাবশেষে হয়তো একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত মানমন্দির ছিল। আগে ইউরোপীয়েরা বিশ্বাস করত প্রাক-ঔপনিবেশিক মধ্যযুগে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের কাজ চলত না। তবে আধুনিক আবিষ্কারগুলি সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রোমান ক্যাথলিক চার্চ জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতা প্রদান করেছিল। প্রাচীন জ্ঞানচর্চার পুনরুদ্ধারের সময় থেকে মধ্যযুগের শেষভাগে সংঘটিত বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণের আগে পর্যন্ত অপর কোনো প্রতিষ্ঠান জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে এতটা সহযোগিতা করতে পারেনি। চার্চের উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল ইস্টারের তারিখটি নির্ণয় করা।

রেনেসাঁর সময় নিকোলাস কোপারনিকাস সৌর সিস্টেমের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং জোহানেস কেপলারের দ্বারা তার কাজকে প্রসারিত এবং সংশোধন করা হয়েছিল। গ্যালিলিও তার পর্যবেক্ষণকে উন্নত করার জন্য টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছিলেন।

কেপলারই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সূর্যকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গ্রহগুলির গতির বিষয়টি সঠিকভাবে বর্ণনা করেছিলেন । যাইহোক, কেপলার তার সূত্রগুলো দ্বারা  একটি তত্ত্ব প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অবশেষে নিউটন তাঁর সেলেস্টিয়াল গতিবিদ্যা এবং মাধ্যাকর্ষণ সূত্র দ্বারা গ্রহের গতি ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন। নিউটন প্রতিফলক দূরবীনের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন ।

দূরবীনের আকার এবং গুণগত মানের উন্নয়নের ফলে আরো আবিষ্কার সম্ভবপর হয়েেছিল।

ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ফ্লামস্টেড ৩০০০ এরও বেশি নক্ষত্রকে তালিকাভুক্ত করেছিলনও বিস্তৃত তারকা ক্যাটালগ লাকাইল দ্বারা তৈরি হয়েছিল । জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল নেবুলাসিটি এবং ক্লাস্টারগুলির একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছিলেন এবং ১৭৮১ সালে তিনি ইউরেনাস গ্রহটি আবিষ্কার করেছিলেন। একটি স্টারের দূরত্ব প্রথম ১৮৩৮ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ৬১ সাইগনি এর প্যারালাক্স ফ্রেডরিক বিসেল দ্বারা পরিমাপ করা হয়েছিল।

আঠারো-উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অয়লার, ক্লায়র্ট এবং ডি'আলেমবারটের তিনটি গঠনগত সমস্যার গবেষণা চন্দ্র এবং গ্রহের গতি সম্পর্কে আরও নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল । এই কাজটিকে লাগরানজ এবং ল্যাপলেস দ্বারা আরও পরিমার্জিত করা হয়েছিল, যার ফলে গ্রহগুলির এবং চন্দ্রের গতিবিধি তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে অনুমান করা যায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিটি মূলত নতুন প্রযুক্তি স্পেকট্রোস্কোপ এবং ফটোগ্রাফি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছিল। ১৮১৪-১৫ সালে সূর্যের বর্ণালীতে ফ্রানহোফার প্রায় ৬০০ ব্যান্ড আবিষ্কার করেছিলেন, যা ১৮৫২ সালে কারশফ বিভিন্ন উপাদানগুলির উপস্থিতিতে এর নামকরণ করেছিলেন । তারা পৃথিবীর নিজস্ব সূর্যের সমতুল্য প্রমাণিত হয়েছে কিন্তু বিস্তৃত তাপমাত্রা এবং আকারের ভিন্নতা আছে ।

পৃথিবীর ছায়াপথের অস্তিত্ব, নীহারিকা, নক্ষত্রগুলির একটি পৃথক দল হিসেবে বাইরের ছায়াপথের অস্তিত্ব বিংশ শতাব্দীতে প্রমাণিত হয়েছিল। ঐ গ্যালাক্সির নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের বিষয়টি আবিষ্কার হয়েছিল। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বস্তুর অস্তিত্ব যেমন কালপুরুষ এবং নিউট্রন তারা, তাছাড়া পরিলক্ষিত ঘটনা ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়েছে কোয়াসারস, পালসার, ব্লাজার, এবং রেডিও ছায়াপথ । বিংশ শতাব্দীর সময় মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, হাবলের সূত্র  এবং বিগ ব্যাং এর গঠন, মহাজাগতিক প্রাচুর্য দ্বারা উপলব্ধ প্রমাণ দ্বারা ব্যাপকভাবে সমর্থিত, যার ফলে ভৌত কসমোলজিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়।
 

মহাকাশগত বিষয় এবং অন্যান্য বস্তু সম্পর্কে আমাদের তথ্যের প্রধান উৎস হল দৃশ্যমান আলো আরও সাধারণভাবে বলা যায় ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ।  ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্ণালীর পরিমার্জিত অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে অবলোকন জ্যোতির্বিজ্ঞানকে ভাগ করা যেতে পারে। মহাকর্ষের কিছু অংশ পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দেখা যেতে পারে এবং অন্য অংশগুলি উচ্চতর উচ্চতা বা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণযোগ্য। এই উপ-ক্ষেত্রগুলির উপর নির্দিষ্ট তথ্য নিচে দেওয়া হল।

রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান দৃশ্যমান পরিসীমার বাইরে বিকিরণ ব্যবহার করে যা প্রায় এক মিলিমিটারের চেয়ে বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্য। রেডিও জ্যোতির্বিদ্যা বেশিরভাগ পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে আলাদা, যেটি পর্যবেক্ষণকৃত রেডিও তরঙ্গকে আলাদা ফোটনসের পরিবর্তে তরঙ্গ হিসেবে গণ্য করা যায়। অতএব, রেডিও তরঙ্গের দিক এবং প্রশস্ততা পরিমাপ করা তুলনামূলকভাবে সহজ, যদিও এটি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যে সহজেই করা যায় না।

যদিও কিছু রেডিও তরঙ্গ জ্যোতির্বিদ্যাগত বস্তুর দ্বারা সরাসরি নির্গত হয়, তেজস্ক্রিয় নির্গমনের একটি পণ্য, বেশিরভাগ রেডিও নিঃসরণ দেখা যায় যা হল সিঙ্ক্রোট্রন বিকিরণের ফলাফল, যখন ইলেকট্রন চুম্বক ক্ষেত্রকে অতিক্রম করে তখন এটি উৎপন্ন হয়।  উপরন্তু, ২১ সেমি এ হাইড্রোজেন বর্ণালী লাইন হল আন্তঃলেখ গ্যাস দ্বারা উৎপন্ন বর্ণালী লাইনের একটি সংখ্যা যা রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যে পর্যবেক্ষণযোগ্য।

 বিভিন্ন ধরনের বস্তু রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে, যেমন-সুপারনোভা, আন্তঃলেখার গ্যাস, পালসার এবং সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়াস সহ পর্যবেক্ষণযোগ্য।

ইনফ্রারেড জ্যোতির্বিদ্যা ইনফ্রারেড বিকিরণ সনাক্তকরণ এবং বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাছাড়া তরঙ্গদৈর্ঘ্য যা লাল আলোর চেয়ে ব্যাপক এবং আমাদের দৃষ্টি পরিসীমার বাইরে তা সনাক্ত করার জন্য এই জ্যোতির্বিদ্যা ব্যবহৃত হয় । ইনফ্রারেড বর্ণালী এমন বস্তুগুলি অধ্যয়ন করতে সহায়ক যা এত বেশি ঠাণ্ডা যে দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করতে পারেনা, যেমন গ্রহ, পারসেসেলার ডিস্ক বা নিবোলা যার আলোটি ধূলিকণা দ্বারা আটকে যায়। ইনফ্রারেডের দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যটি ধুলোর মেঘকে ভেদ করতে পারে যা দৃশ্যমান আলোকে ব্লক করে, যার ফলে আণবিক মেঘ এবং আকাশে আচ্ছাদিত ছোট বড়  ছায়াপথগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ওয়াইড-ফিল্ড ইনফ্রারেড সার্ভে এক্সপ্লোরার (ডব্লিউআইএসই) থেকে পর্যবেক্ষণগুলি অসংখ্য গ্যালাক্টিক প্রোটোস্টার এবং তাদের হোস্ট স্টার ক্লাস্টারগুলির উন্মোচন করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর। দৃশ্যমান আলোর কাছাকাছি ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিকিরণ বায়ুমণ্ডল দ্বারা ব্যাপকভাবে শোষিত হয় বা মুখোশযুক্ত তাছাড়া বায়ুমণ্ডল নিজেই উল্লেখযোগ্য ইনফ্রারেড নির্গমন উৎপাদন করে। ফলস্বরূপ, ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে পৃথিবীর মধ্যে শুষ্ক বা উচ্চতর স্থানে বা মহাকাশে অবস্থিত হতে হবে। কিছু অণু ইনফ্রারেড এর মধ্য দিয়ে দৃঢ়ভাবে বিকিরণ ঘটে। এটি মহাকাশ গবেষণা করতে এমনকি আরও বিশেষভাবে এটি ধূমকেতুর মধ্যে জল সনাক্ত করতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে অপটিক্যাল জ্যোতির্বিজ্ঞানকে দৃশ্যমান আলো জ্যোতির্বিদ্যা নামেও অভিহিত করা হয়, এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাচীনতম রূপ। পর্যবেক্ষণের ছবিগুলো মূলত হাত দ্বারা অঙ্কিত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতকের দিকে বেশিরভাগ সময় ছবিগুলি ফোটোগ্রাফিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক চিত্রগুলি ডিজিটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, বিশেষ করে চার্জ-সংযুক্ত ডিভাইস (সিসিডি) ব্যবহার করে এবং আধুনিক মিডিয়ায় রেকর্ড করা হয়। যদিও দৃশ্যমান আলো নিজেই প্রায় ৪০০০ থেকে ৭০০০ Å (৪০০ এনএম থেকে ৭০০ এনএম) পর্যন্ত বিস্তৃত, কিছু কাছাকাছি অতিবেগুনী এবং নিকটবর্তী-ইনফ্রারেড বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একই সরঞ্জাম ব্যবহার করা যেতে পারে।

অতিবেগুনী জ্যোতির্বিদ্যা প্রায় ১০০ এবং ৩২০০ এ (১০ থেকে ৩২০ এনএম) মধ্যে অতিবেগুনী তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে কাজে লাগায়। এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্বারা শোষিত হয়, এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য পর্যবেক্ষণের জন্য উপরিভাগের বায়ুমণ্ডলে বা মহাকাশ প্রয়োজন। অতিবেগুনী জ্যোতির্বিজ্ঞান তরল বিকিরণ এবং বর্ণালী নির্গমনের বিষয়গুলি নীল নক্ষত্র (ওবি নক্ষত্র) থেকে গবেষণা করা যায় যার তরঙ্গ ব্যান্ড খুব উজ্জ্বল হয় । অন্যান্য ছায়াপথের নীল নক্ষত্রগুলি তার অন্তর্ভুক্ত, যা বিভিন্ন অতিবেগুনী সার্ভের লক্ষ্যমাত্রা হয়েছে। অতিবেগুনী আলোর মাধ্যমে সাধারণত যাদের দেখা যায় তাদের মধ্যে গ্রহীয় নীহারিকা, সুপারনোভা অবশিষ্টাংশ এবং সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিও অন্যতম। যাইহোক, অতিবেগুনি রশ্মিটি সহজেই মহাজাগতিক ধুলো দ্বারা শোষিত হয়, তাই অতিবেগুনী পরিমাপের একটি সমন্বয় প্রয়োজন।

এক্স-রে জ্যোতির্বিজ্ঞান এক্স-রে তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে। সাধারণত, এক্স-রে বিকিরণটি সিঙ্ক্রোট্রন নির্গমন ( ইলেকট্রনগুলির চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর ঘূর্ণনের ফলাফল), ১০৭ (১০ মিলিয়ন) কেলভিনের উপরে পাতলা গ্যাস থেকে তাপ নির্গমন, এবং ১০৭ কেলভিনের উপরে পুরু গ্যাস থেকে তাপ নির্গমন দ্বারা উৎপন্ন হয়। যেহেতু এক্স-রেগুলি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্বারা সঞ্চারিত হয়, তাই এক্স-রে পর্যবেক্ষণগুলি উচ্চ-উচ্চতার বেলুন, রকেট বা এক্স-রে জ্যোতির্বিদ্যা উপগ্রহগুলি থেকে সম্পাদিত হবে। উল্লেখযোগ্য এক্স রে উৎসগুলো হল এক্স-রে বাইনারি, পালসার, সুপারনোভার অবশিষ্টাংশ, উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সির ক্লাস্টার এবং সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়াস।

গামা রশ্মি জ্যোতির্বিজ্ঞান ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্ণালীর সংক্ষিপ্ততম তরঙ্গদৈর্ঘ্যে জ্যোতির্বিদ্যাগত বস্তুগুলি পর্যবেক্ষণ করে। গামা রশ্মিগুলি সরাসরি উপগ্রহগুলি দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে, যেমন কম্পটন গামা রে অবজারভেটরি বা বায়ুমণ্ডলীয় চেরেনকভ টেলিস্কোপ নামে বিশেষ দূরবীন দ্বারা। চেরেনকোভ টেলিস্কোপগুলি গামা রশ্মিকে সরাসরি সনাক্ত করতে পারে না বরং গামা রশ্মি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্বারা নিঃসৃত হয় ঠিক তখনি দৃশ্যমান আলোর আলোকে সনাক্ত করতে পারে ।

সর্বাধিক গামা-রে নির্গত উৎসগুলি আসলে গামা-রে বিস্ফোরণ, বস্তু যা শুধুমাত্র গামা রশ্মি উৎপাদন করে বিকল হয়ে যাওয়ার কয়েক মিলিসেকেন্ডের এবং  হাজার হাজার সেকেন্ড আগে। শুধুমাত্র ১০% গামা-রে উৎসগুলি হল অস্থায়ী উৎস। এই স্থির গামা-রে নির্গমনকারীর মধ্যে পালসার, নিউট্রন স্টার এবং ব্ল্যাক হোলের মত প্রার্থী যেমন- সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়িও অন্তর্ভুক্ত।

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ ছাড়াও আরও কিছু ঘটনাগুলি পৃথিবী থেকে দেখা যায়।

নিউট্রিনো জ্যোতির্বিদ্যাতে নিউট্রিনো সনাক্তকরণের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তীব্রভাবে পরিলক্ষিত ভূগর্ভস্থ সুবিধাসমূহ যেমন  এসএজিই, গাল্লেক্স এবং কামোকো ২/ ৩ ব্যবহার করে। পৃথিবীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নিউট্রিনোগুলির অধিকাংশই সূর্য থেকে উৎপন্ন হয়, তবে ২৪টি নিউট্রিনোও সুপারনোভা ১৯৮৭এ থেকে পাওয়া গিয়েছিল । মহাজাগতিক রশ্মি, যা খুব উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা (পারমাণবিক নিউক্লিয়াস) দ্বারা গঠিত যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে ক্ষয় বা শোষিত হতে পারে, এর ফলে দ্বিতীয় কণাগুলির একটি ধারাপ্রবাহ হয় যা বর্তমান পর্যবেক্ষণকারীদের দ্বারা সনাক্ত করা যায়।  কসমিক দণ্ড পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করলে কিছু ভবিষ্যতের নিউট্রিনো ডিটেক্টরগুলিও কণার সংস্পর্শে স্পর্শকাতর হতে পারে।

মহাকর্ষীয়-তরঙ্গ জ্যোতির্বিদ্যা একটি উদীয়মান ক্ষেত্র যা মহাকর্ষীয়-তরঙ্গ ডিটেক্টরগুলি দূরবর্তী বিশাল বস্তুর সম্পর্কে পর্যবেক্ষণীয় তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করে। কিছু পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যেমন লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্ৰাভিটেশনাল অবসার্ভেটরি বা লাইগো (LIGO)। ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে লিগোর প্রথম আবিষ্কারটি বাইনারি ব্ল্যাক হোল থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল । দ্বিতীয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গটি ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে সনাক্ত করা হয়েছিল এবং অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকা দরকার তবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রের প্রয়োজন।

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, নিউট্রিনো বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং অন্যান্য পরিপূরক তথ্য ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের সংমিশ্রণটি করা হয়েছে যা মাল্টি-ম্যাসেঞ্জার জ্যোতির্বিজ্ঞান নামে পরিচিত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাচীনতম ক্ষেত্রগুলির মধ্যে এটি একটি এবং সমস্ত বিজ্ঞানের মধ্যে স্বর্গীয় বস্তুর পরিমাপের জন্য তার প্রয়োজন হয়। ঐতিহাসিকভাবে, সূর্য, চাঁদ, গ্রহ এবং নক্ষত্রগুলির সঠিক অবস্থানের জন্য মহাকাশীয় বস্তু (মহাকাশীয় বস্তুগুলির ব্যবহার নির্দেশিকা পরিচালনা) এবং ক্যালেন্ডার তৈরির ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োজনীয়।

গ্রহের অবস্থানের সঠিক পরিমাপ মাধ্যাকর্ষণ বিষয়ক বিষয়গুলোকে ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করেছে এবং অতীত এবং ভবিষ্যতের নির্ভুল অবস্থান নির্ধারণ করার ক্ষমতা যার আছে তাকে মহাকাশ বলবিদ্যা বলা হয়। সম্প্রতি নিকটবর্তী পৃথিবীর বস্তুর ট্র্যাকিংগুলি বস্তুর সাথে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাত বা পৃথিবীর সম্ভাব্য সংঘর্ষের পূর্বাভাস দিবে।

নিকটবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জের ঊর্ধ্বগামী র পরিমাপ মহাবিশ্বের স্কেল পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা মহাকাশমুখী দূরত্বের একটি মৌলিক ভিত্তি প্রদান করে। নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলির প্যারালাক্স পরিমাপ আরও দূরবর্তী নক্ষত্রগুলির বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেস-লাইন প্রদান করে কারণ তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি তুলনা করা যায়। রাডিয়াল বেগের পরিমাপ এবং তারার সঠিক গতিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশগঙ্গার ছায়াপথের আন্দোলনকে সংগঠিত হতে সহায়তা করে। জ্যোতির্বিদ্যাগত ফলাফলগুলি ছায়াপথের অনুমানকৃত কৃষ্ণ বস্তুর(Dark matter) বণ্টন গণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয় ।

১৯৯০-এর দশকে মাঝামাঝি সময়ে নক্ষত্রপুঞ্জের কাছাকাছি বড় পরিমাপের ঘূর্ণনকারী গ্রহের সন্ধানের জন্য স্টেলার উবল পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণাত্মক মডেল এবং গণনীয় সংখ্যাসূচক সিমুলেশন সহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে ; প্রতিটির নিজস্ব বিশেষ সুবিধা আছে।  বিশ্লেষণাত্মক মডেল হল একটি প্রক্রিয়া যা সাধারণত যা চলছে তার কেন্দ্রে বৃহত্তর অন্তর্দৃষ্টি প্রদানের জন্য ভাল। সংখ্যাসূচক মডেলগুলি ঘটনার অস্তিত্ব প্রকাশ করে এবং অপর্যবেক্ষিত প্রভাবগুলি প্রকাশ করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে তত্ত্ববিদরা তাত্ত্বিক মডেল তৈরির চেষ্টা করেন এবং ঐ ফলাফলগুলি থেকে সেই মডেলগুলির পর্যবেক্ষণগত ফলাফলগুলির পূর্বাভাস প্রদান করে । একটি মডেল দ্বারা পূর্বাভাস দেওয়া  ঘটনাটির পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ঘটনাটি বর্ণনা করতে বেশ কিছু বিকল্প বা বিবাদমূলক মডেল মধ্যে নির্বাচন করতে পারবেন যা ঘটনাকে ভালভাবে বর্ণনা করতে সক্ষম।

থিয়োরিস্টরা নতুন ডেটা গ্রহণ করার জন্য মডেল তৈরি বা সংশোধন করারও চেষ্টা করে। তথ্য এবং মডেল এর ফলাফলের অসঙ্গতির ক্ষেত্রে, সাধারণ প্রবণতা মডেলের ন্যূনতম পরিবর্তন করতে চেষ্টা করা হয় যাতে করে এটি তথ্য মাপসই ফলাফল উৎপাদন করতে পারে । কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ উপাত্ত সম্পূর্ণ মডেলটিকে নষ্ট করে দিতে পারে।

তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিদদের দ্বারা পরিচালিত ঘটনার অন্তর্ভুক্ত হল: স্টেলার ডাইনামিক্স এবং বিবর্তন; ছায়াপথ গঠন; মহাবিশ্বের বৃহৎ পরিসরে বস্তুর বণ্টন; মহাজাগতিক রশ্মির উৎপত্তি; সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং শারীরিক ব্রহ্মবিদ্যা, স্ট্রিং বিশ্বতত্ত্ব এবং এ্যাস্ট্রোপার্টিকেল পদার্থবিদ্যা । মহাজাগতিক আপেক্ষিকতা একটি বৃহৎ স্কেলে স্ট্রাকচারের বৈশিষ্ট্যগুলি হিসাব করার জন্য একটি হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে, যার জন্য মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে শারীরিক ঘটনাগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ব্ল্যাক হোল (অ্যাস্ট্রো) পদার্থবিদ্যা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গবেষণার ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে কিছু ব্যাপকভাবে গৃহীত তত্ত্ব ও গবেষণা এবং মডেলগুলি, এখন লাম্বা-সিডিএম মডেলের মধ্যে রয়েছে বিগ ব্যাং, মহাজাগতিক মুদ্রাস্ফীতি, কৃষ্ণ বস্তু (dark matter) এবং পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বসমূহ।

এই প্রক্রিয়াটির কয়েকটি উদাহরণ:

প্রায় আট আলোক মিনিটের দূরত্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অধ্যয়নরত তারাটি হল সূর্য, সাধারণ ধারার বামন তারার শ্রেণী হল জি২ ভি যা প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর (জিওয়াইআর) পুরানো। সূর্য একটি ভ্যারিয়েবল তারকা বলে বিবেচিত হয় না, তবে এটি সূর্য-স্পট চক্র হিসাবে পরিচিত কার্যকলাপের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের দ্বারা পরিচালিত হয়। সূর্য-স্পট সংখ্যাটিতে এটি ১১ বছরের দোলন সম্পন্ন। সূর্য -স্পটগুলি গড় তাপমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয় যা তীব্র চুম্বকীয় কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

সূর্য একটি প্রধান-ধারার তারকা হয়ে উঠার পর ধীরে ধীরে তার উজ্জ্বলতা প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে । সূর্য এমন উজ্জ্বলতার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে যা পৃথিবীর উপর একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে । উদাহরণস্বরূপ, মাধ্যাকর্ষণ সর্বনিম্ন হওয়ার ফলে মধ্যযুগের সময় ছোট বরফ যুগের ঘটনাটি ঘটেছিল বলে মনে করা হয়।

সূর্যের দৃশ্যমান বাইরের পৃষ্ঠাকে ফটোস্ফিয়ার বলা হয়। এই স্তরের উপরে পাতলা একটি অঞ্চল যা ক্রোমোস্ফিয়ার নামে পরিচিত । এটি দ্রুত বর্ধনশীল তাপমাত্রার একটি সংক্রমণ অঞ্চল দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং অবশেষে এটি সুপার উত্তাপ করোনা দ্বারা বেষ্টিত।

সূর্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি হল মূল, পারমাণবিক ফিউশনের জন্য যথেষ্ট তাপমাত্রা এবং চাপের একটি ভলিউম এখানে বিদ্যমান । কোরের উপরে হল বিকিরণ রশ্মির জোন, যেখানে শক্তি প্রবাহ প্লাজমা বিকিরণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়য় । উপরে হল পরিচলন জোন যেখানে গ্যাসের উপাদান প্রাথমিক ভাবে গ্যাসের শারীরিক স্থানচ্যুতির মাধ্যমে উত্তোলন করে যাকে বলা হয় পরিচলন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে পরিচলন জোনের মধ্যে ভরের গতির চুম্বকীয় কার্যকলাপ তৈরি করে যা সান-স্পট তৈরি করে।

প্লাজমা পার্টিকেলের একটি সৌর বায়ু ক্রমবর্ধমানভাবে বাষ্পীভূত হতে থাকে সূর্যের বাইরের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত এটি হেলিওপোজ পর্যন্ত পৌঁছায়। সৌর বায়ু পৃথিবী অতিক্রম করে এটি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে মিথষ্ক্রিয়া ঘটায় এবং সৌর বায়ুকে অগ্রাহ্য করে, কিন্তু ফাঁদ কিছু ভ্যান এলেন বিকিরণ বেল্ট তৈরি করে যা পৃথিবীকে ঢেকে দেয়। অরোরা তৈরি করা হয় তখন যখন সৌর বায়ু কণা চুম্বকীয় প্রবাহ লাইন দ্বারা পরিচালিত হয় পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে যেখানে লাইনগুলি বায়ুমণ্ডলে অবতরণ করে।

গ্রহ বিজ্ঞান হল গ্রহ, চাঁদ, বামন গ্রহ, ধূমকেতু, গ্রহাণু, এবং সূর্যের পাশে ঘূর্ণনশীল অন্যান্য বস্তুর সমাহার এবং সেইসাথে এক্সট্রাসোলার গ্রহগুলির সমাহার নিয়ে গবেষণা সংক্রান্ত বিজ্ঞান। সোলার সিস্টেম অপেক্ষাকৃত ভালভাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে টেলিস্কোপের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মহাকাশযান দ্বারা। এগুলো কিভাবে গ্রহ গঠিত এবং বিবর্তিত হয়েছে সেই ব্যাপারে ধারণা প্রদান করেছে, যদিও অনেক নতুন আবিষ্কার এখনও করা হচ্ছে।

সৌর সিস্টেমকে ভিতরের গ্রহ, গ্রহাণু বেল্ট এবং বাইরের গ্রহগুলি নিয়ে উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়। ভূপৃষ্ঠের পার্থিব গ্রহগুলি বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গল নিয়ে গঠিত। বাইরের গ্যাসীয় বৃহৎ গ্রহগুলি হল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন। নেপচুনের বাইরে কুইপার বেল্ট এবং অবশেষে ওর্ট ক্লাউড রয়েছে যা আলোক বর্ষ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে।

সূর্যের চারপাশে প্রোটোপ্লেনেটানারি ডিস্কের মধ্যে ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে গ্রহগুলি গঠিত হয়েছিল। মহাকর্ষীয় আকর্ষণ, সংঘর্ষ এবং সংশ্লেষণের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ডিস্কটি বস্তুর সংমিশ্রণ সৃষ্টি করে যা সময়ের সাথে সাথে প্রোটোপ্লানেট হয়ে ওঠে। সৌর বায়ুর রশ্মির চাপ তখন অসমর্থিত বস্তু ত্যাগ করে, এবং ঐ যথেষ্ট সংখ্যক গ্রহই তাদের গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল বজায় রেখেছিল। চাঁদের উপরিভাগে প্রভাবশালী ক্রুটার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে তীব্র বোমা বর্ষণের সময় গ্রহগুলি ক্রমাগত ঝাঁকানি খায় যায় বা বের করে দেয়। এই সময়কালে কিছু প্রোটোপ্ল্যানেট সংঘর্ষের শিকার হতে পারে এবং এই ধরনের সংঘর্ষের ফলে চাঁদের সৃষ্টি হতে পারে।

একটি গ্রহ একবার যথেষ্ট ভরে পৌঁছলে গ্রহের পার্থক্যের সময় বিভিন্ন ঘনত্বের উপাদান বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়াটি একটি পাথুরে বা ধাতব কেন্দ্র গঠন করতে পারে যা একটি আচ্ছাদন এবং বাইরের স্ফীত দ্বারা ঘিরে থাকতে পারে । কোর দৃঢ় এবং তরল অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং কিছু গ্রহের কোরা তাদের নিজস্ব চৌম্বকীয় ক্ষেত্র উৎপন্ন করে, যা তাদের বায়ুমণ্ডলকে সৌর বায়ু প্রবাহ থেকে রক্ষা করতে পারে।

একটি গ্রহ বা চাঁদের অভ্যন্তরে তাপ উৎপন্ন হয় তেজস্ক্রিয় পদার্থসমূহের (যেমন ইউরেনিয়াম, তেজস্ক্রিয় ধাতু, এবং ২৬এল) মিথস্ক্রিয়া দ্বারা সৃষ্ট জোয়ারের তাপ দ্বারা। কিছু গ্রহ এবং চন্দ্র আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাত এবং টেকটনিকস এর  ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া চালানোর জন্য যথেষ্ট তাপ জমা করে। যে বায়ুমণ্ডল জমা বা বজায় রাখে তাও বায়ু বা জল থেকে পৃষ্ঠ ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোধগম্যতার জন্য নক্ষত্র এবং বড় বড় বিবর্তনের বিষয় নিয়ে গবেষণা মৌলিক। পর্যবেক্ষণ, তাত্ত্বিক বোধগম্যতা এবং অভ্যন্তর ভাগের কম্পিউটার সিমুলেশন থেকে তারকাগুলির জ্যোতিঃপদার্থ নির্ধারণ করা হয়েছে । চন্দ্র গঠন ধুলো এবং গ্যাসের ঘন অঞ্চলে ঘটে যা দৈত্য আণবিক মেঘ হিসাবে পরিচিত। যখন অস্থিতিশীল হয়ে যায় তখন ক্লাউড টুকরা মাধ্যাকর্ষণ প্রভাবের কারণে একটি প্রোটোস্টার গঠন করতে পারে।  যথেষ্ট ঘন, এবং গরম কোর অঞ্চল নিউক্লিয়ার ফিউশন বৃদ্ধি করবে, এইভাবে একটি প্রধান-ধারার তারকা তৈরি করবে।

প্রায় সব উপাদান যা হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের তুলনায় ভারী তারা নক্ষত্রগুলির কোর অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল ।

ফলপ্রসূ উপাদানের বৈশিষ্ট্য মূলত তার ভরের শুরুর উপর নির্ভর করে। আরও বৃহৎ তারকা যার উজ্জ্বলতা আরও ব্যাপক, এবং আরও দ্রুতভাবে তার হাইড্রোজেন জ্বালানি তার হিলিয়ামের মধ্যে সঞ্চালন করে। সময়ের সাথে সাথে এই হাইড্রোজেন জ্বালানি সম্পূর্ণ হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয় এবং তারকাটি বিবর্তিত হতে শুরু করে। হিলিয়াম এর ফিউশনের জন্য উচ্চ কোর তাপমাত্রার প্রয়োজন। একটি তারকা খুব বেশি তাপমাত্রার সঙ্গে বাইরের স্তরে ধাক্কা দিবে তার ফলে এর কোরের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। হিলিয়ামের জ্বালানীটি হ্রাসপ্রাপ্ত হওয়ার আগে বাইরের স্তরের দ্বারা গঠিত লাল দৈত্যটি একটি সংক্ষিপ্ত জীবনযাত্রা উপভোগ করে। খুব বড় বড় তারা বিবর্তনীয় পর্যায়েও আসতে পারে কারণ তারা ক্রমবর্ধমান ভারী উপাদানগুলিকে ফিউজ করে।

সূর্যের চূড়ান্ত ভাগ্য তার ভরের উপর নির্ভর করে, সূর্যের মূল কোর সুপারনোভার চেয়ে আট গুন বড় হয় ; যখন ছোট তারা তাদের বাহ্যিক স্তরগুলিকে উড়িয়ে দেয় এবং একটি সাদা রঙের বামন তারার আকারে নিষ্ক্রিয় কোরের পিছনে চলে যায় । বাইরের স্তরের নিক্ষেপ একটি গ্রহের নিবোলা গঠন করে। একটি সুপারনোভার অবশিষ্টাংশ হল একটি ঘন নিউট্রন স্টার, অথবা, তারা কমপক্ষে তিন গুন বড় হতে পারে সূর্য থেকে, একে বলা কালপুরুষ।  কাছাকাছি ঘূর্ণায়মান বাইনারি তারাগুলি আরও জটিল বিবর্তনীয় পথ অনুসরণ করতে পারে, যেমন একটি সাদা বামন সহচরের উপর ভর স্থানান্তর যা সম্ভাব্য একটি সুপারনোভা সৃষ্টি করতে পারে। গ্রহের নিবোলা এবং সুপারনোভা ফিউশন সংমিশ্রণে উৎপাদিত ধাতু বিতরণ করে; তাদের ছাড়া, সব নতুন তারা (এবং তাদের গ্রহের সিস্টেম) হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম থেকে গঠিত হবে।

আমাদের সোলার সিস্টেম আকাশগঙ্গার মধ্যে আবর্তিত হয় , এই নিষ্ক্রান্ত সর্পিল ছায়াপথটি হল স্থানীয়  গ্যালাক্সি গ্রুপের একটি বিশিষ্ট সদস্য। এটা হল পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণ দ্বারা একসঙ্গে বিদ্যমান একটি ঘূর্ণন ভর,গ্যাস, ধুলো, তারা এবং অন্যান্য বস্তু। যেহেতু পৃথিবী বাইরের ধূলোযুক্ত বাহুর মধ্যে অবস্থিত, তাই আকাশগঙ্গার বেশির ভাগ অংশগুলি অদৃশ্য মনে হয়।

আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থলে বার-আকৃতির একটি বুজ অবস্থিত যাকে অতিবড় কালপুরুষ বলে মনে করা হয় । এটি চারটি প্রাথমিক বাহু দ্বারা আবৃত যা কেন্দ্র থেকে সর্পিল বলে মনে হয়। এটি হল সক্রিয় তারকা গঠনের একটি অঞ্চল যার রয়েছে অনেক ছোট আই তারাগুচছ। এই তারাগুচ্ছ ডিস্কটি আই ২ নক্ষত্রের একটি গোলকধাঁধার অন্ধকার দ্বারা ঘিরে রয়েছে, সেইসাথে গ্লবুলার ক্লাস্টার নামে পরিচিত নক্ষত্রগুলির অপেক্ষাকৃত ঘন ঘনত্ব লক্ষ করা যায়।

আন্ততারাগুচ্ছের লাইনের মধ্যে স্পার্স ক্ষেত্রের একটি অঞ্চল রয়েছে। অপেক্ষাকৃত ঘন অঞ্চলে আণবিক হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য উপাদানের আণবিক মেঘগুলি তারকা-গঠন অঞ্চল তৈরি করে। এটি কম্প্যাক্ট প্রাক-সৌর কোর বা গাঢ় নীহারিকা নিয়ে শুরু হয়, যা কম্প্যাক্ট প্রোটোস্টার গঠন (যা জিন্স দৈর্ঘ্য দ্বারা নির্ধারণ করা হয়) এবং পতনে মনোনিবেশ করে ।

বৃহত্তর তারাগুলি প্রদর্শিত হলে, তারা মেঘকে গ্লুইং গ্যাস এবং প্লাজমা  এইচ ২ অঞ্চলে (আয়োনাইজড পারমাণবিক হাইড্রোজেন) রূপান্তরিত করে। এই নক্ষত্রগুলির কাছ থেকে উত্তেজনাপূর্ণ বায়ু এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণগুলি মেঘকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় এবং প্রায়ই তারা এক বা একাধিক তরুণ মুক্ত বড় ক্লাস্টারের পিছনে চলে যায়। এই ক্লাস্টারগুলি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারাগুলি আকাশগঙ্গার সাথে যোগ দেয়।

আকাশগঙ্গার এবং অন্যান্য ছায়াপথের বিষয়বস্তুর কিনেমেটিক অধ্যয়নে প্রমাণিত হয়েছে যে দৃশ্যমান বস্তুর চেয়ে আরও বেশি বস্তু আছে যা হিসাব করা অসম্ভব। অন্ধকার বিষয়টি হালো ভর আয়ত্তে প্রদর্শিত হয়, যদিও এই অন্ধকার বিষয়টির প্রকৃতি এখনও অনির্দিষ্ট রয়ে গেছে।

আমাদের ছায়াপথের বাইরে বস্তুর অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করা হল জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি শাখা যা মূলত গ্যালাক্সির গঠন এবং বিবর্তন , তাদের বর্ণনা পদ্ধতি(বর্ণনা) এবং শ্রেণীবদ্ধকরণ, বৃহত্তর স্কেলে সক্রিয় ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ, ছায়াপথের গ্রুপ এবং ক্লাস্টারগুলির সাথে সম্পর্কিত। অবশেষে, মহাবিশ্বের বৃহৎ-স্তরের কাঠামোটি বোঝার জন্য এটি খুবি গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বাধিক ছায়াপথগুলি স্বতন্ত্র আকারে সংগঠিত হয় যা শ্রেণীবদ্ধকরণ স্কিমের জন্য অনুমতি দেয়। তারা সাধারণত সর্পিল, উপবৃত্তাকার এবং অনিয়মিত ছায়াপথগুলিতে বিভক্ত।

নামটি নির্দেশ করে উপবৃত্তাকার ছায়াপথের একটি ক্রস বিভাগীয় উপবৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে। কোন প্রারম্ভিক দিকবিন্যাস ছাড়াই নক্ষত্রপুঞ্জ কক্ষপথে বরাবর পরিভ্রমণ করে। এই ছায়াপথগুলি অল্প বা কোন আন্তঃধরীয় ধূলিকণা ছাড়া, কয়েকটি তারকা গঠনকারী অঞ্চল এবং সাধারণত পুরনো তারা নিয়ে গঠিত। উপবৃত্তাকার ছায়াপথগুলিকে সাধারণত গ্যালাকটিক ক্লাস্টারের মূল অংশে পাওয়া যায় এবং তারা বৃহৎ ছায়াপথগুলির মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে থাকতে পারে।

সর্পিল ছায়াপথটি সংগঠিত হয় একটি ফ্ল্যাট, ঘূর্ণায়মান ডিস্ক, সাধারণত একটি বিশিষ্ট বুজ বা কেন্দ্রের বার নিয়ে এবং পিছনে তার বাহ্যিক উজ্জ্বল বাহু প্রদর্শন করে । বাহুগুলি হল স্টার গঠনের ধূলিমলিন অঞ্চল যার মধ্যে বিশাল নক্ষত্ররা একটি নীল রং তৈরি করে। স্পাইরাল ছায়াপথ সাধারণত হালো আকৃতির পুরনো নক্ষত্রপুঞ্জ দ্বারা ঘিরে থাকে। আকাশগঙ্গা এবং আমাদের নিকটবর্তী ছায়াপথের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি উভয়ই সর্পিল ছায়াপথ।

অনিয়মিত ছায়াপথের চেহারা বিশৃঙ্খল হয় এবং তারা সর্পিল বা উপবৃত্তাকার হয় না। সমস্ত ছায়াপথের প্রায় এক চতুর্থাংশ অনিয়মিত, এবং ছায়াপথের অদ্ভুত আকৃতি মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়ার ফলে হতে পারে।

সক্রিয় ছায়াপথ হল একটি গঠন যা এর নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাস ব্যতীত অন্য উৎস থেকে তার শক্তির একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নির্গত করে। এটি মূলত একটি কম্প্যাক্ট অঞ্চলের দ্বারা পরিচালিত হয়, একে একটি অতি-বৃহদায়তন কালপুরুষ বলে মনে করা হয় যা ভেতরের অংশ থেকে বেরিয়ে আসা বিকিরণ নির্গত করে।

রেডিও ছায়াপথ হল একটি সক্রিয় ছায়াপথ যা স্পেকট্রামের রেডিও অংশে খুব আলোকিত হয় এবং গ্যাসের বিশাল প্লাম বা লোবগুলি নির্গত করে। সক্রিয় ছায়াপথ ক্ষুদ্র ফ্রিকোয়েন্সি নির্গত করে এবং উচ্চ শক্তি বিকিরণ করে তাদের মধ্যে সেইফার্ট ছায়াপথ, কোয়াসার্স, এবং ব্লাজার অন্যতম । কোয়াসার্সগুলিকে জ্ঞাত মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুদৃঢ় আলোকিত বস্তু বলে মনে করা হয়।

সৃষ্টিতত্ত্ব(ইংরেজি ভাষায় Cosmology) (গ্রিক κόσμος (কোসোমস) থেকে বিশ্ব, মহাবিশ্ব এবং λόγος (লোগো) শব্দ, অধ্যয়ন বা আক্ষরিক অর্থে যুক্তিবিজ্ঞান) মহাবিশ্ব বিশ্লেষণ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

মহাবিশ্বের বৃহৎ-স্কেল কাঠামো পর্যবেক্ষণ করে যা দৈহিক সৃষ্টিতত্ত্ব হিসাবে পরিচিত, এটি মহাজাগতিক গঠনের এবং বিবর্তনের একটি গভীর উপলব্ধি প্রদান করেছে। আধুনিক কসমোলজির মূল ভিত্তি হল বিগ ব্যাং তত্ত্ব যা খুব ভালোভাবে স্বীকৃত , যেখানে আমাদের মহাবিশ্ব এক সময়ে এক বিন্দু থেকে শুরু হয়েছিল এবং তারপরে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে প্রসারিত হয়ে এর বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে । ১৯৬৫ সালে মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন আবিষ্কারের পরে বিগ ব্যাং এর ধারণাটি খুঁজে পাওয়া যায়।

এই সম্প্রসারণের সময় মহাবিশ্বকে বিভিন্ন বিবর্তনমূলক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। খুব প্রারম্ভিক মুহূর্তে এটি তাত্ত্বিকভাবে মেনে নেয়া হয় যে মহাবিশ্ব খুব দ্রুত মহাজাগতিক মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছিল, যা শুরু হওয়া অবস্থার সমন্বয় সাধন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। তারপরে, নিউক্লিওসিনথেসিস প্রথম বিশ্বজগতের মৌলিক প্রাচুর্য উৎপন্ন করেছিল।

প্রথম নিরপেক্ষ পরমাণু আদিম আয়নগুলির সমুদ্র থেকে গঠিত হয়েছিল, তখন মহাশূন্য বিকিরণের জন্য স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল, যাকে আজকাল মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ হিসাবে দেখা হয়। ক্রমবর্ধমান ইউনিভার্স তারপর অত্যাবশ্যক সোর শক্তির উৎস অভাবের কারণে একটি অন্ধকার যুগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।

বস্তুর একটি হায়ারারকিকাল গঠন শুরু হয়েছিল মহাশূন্যের গণ ঘনত্বের মিনিট বৈচিত্র্য থেকে। ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে বস্তু জমা হয়েছিল , গ্যাসের মেঘ তৈরি হচ্ছিল এবং নিকটতম নক্ষত্রগুলি যা তৃতীয় নক্ষত্রমণ্ডলি হিসাবে পরিচিত । এই বৃহৎ নক্ষত্রগুলি পুনরাবৃত্তি প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করে এবং প্রাথমিক মহাবিশ্ব অনেকগুলি ভারী উপাদানের সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্বাস করা হয়, যা পারমাণবিক ক্ষয় দ্বারা হালকা উপাদান তৈরি করে এবং নিউক্লিওসিনথেসিসের চক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পথ তৈরি করে দেয়।

মহাকর্ষীয় সমষ্টিগুলিকে ফিলামেন্টে ক্লাস্টার করে যার মধ্যে একটি ফাঁক রেখে দেয় । ধীরে ধীরে গ্যাস এবং ধূলিকণা সংস্থাগুলির মধ্যে প্রথম আদিম ছায়াপথ গঠন করা হয়। সময়ের সাথে সাথে এইগুলি আরও বেশি বস্তুকে টানে এবং প্রায়ই গ্যালাক্সির গোষ্ঠী এবং ক্লাস্টারগুলিতে সংগঠিত হয়েছিল, তারপর বৃহত্তর স্কেলে সুপারক্লাস্টারগুলিতে রূপান্তরিত হয়েছিল ।

মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামো মূলত অন্ধকার বিষয় এবং অন্ধকার শক্তির অস্তিত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে । এই মহাবিশ্বের ৯৬% ভর প্রভাবশালী উপাদান দ্বারা গঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই কারণে এই উপাদানগুলির সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে অনেক প্রচেষ্টা ব্যয় করা হচ্ছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিঃপদার্থ অন্যান্য প্রধান বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রগুলির সাথে উল্লেখযোগ্য আন্তঃশিক্ষার সংযোগ তৈরি করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান হল  প্রাচীন বা ঐতিহ্যগত জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যয়ন যা তাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ ব্যবহার করে। জ্যোতির্জীববিজ্ঞান হল ইউনিভার্সের জৈবিক পদ্ধতির আবির্ভাব এবং বিবর্তন নিয়ে গবেষণা সংক্রান্ত বিদ্যা যা অস্থায়ী জীবনযাপনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশেষ জোর দিয়ে। জ্যোতিঃপরিসংখ্যান হল জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার পরিসংখ্যানগত প্রয়োগ যা পর্যবেক্ষণ মহাকাশবিজ্ঞান সংক্রান্ত  বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে ।

মহাশূন্যে প্রাপ্ত রাসায়নিক উপাদান তাদের গঠন, মিথস্ক্রিয়া এবং ধ্বংস সহ যে বিষয়ে গবেষণা করা হয় তাকে জ্যোতিঃরসায়ন বলা হয়। এই পদার্থগুলো সাধারণত আণবিক মেঘে পাওয়া যায়, যদিও তারা কম তাপমাত্রার নক্ষত্র, বাদামী ড্যাফোর্ড এবং গ্রহগুলিতেও পাওয়া  যেতে পারে। কসমোকেমিস্ট্রি হল সৌরজগতের মধ্যে পাওয়া রাসায়নিকের অধ্যয়ন সংক্রান্ত বিদ্যা যার মধ্যে রয়েছে উপাদানের উৎস এবং আইসোটোপ অনুপাতের বৈচিত্র্য। এই ক্ষেত্রগুলি উভয় জ্যোতির্বিদ্যা এবং রসায়ন বিষয়গুলির একটি ওভারল্যাপ হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করে। ফরেনসিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিশেষে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলি আইন ও ইতিহাসের সমস্যার সমাধান করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের যুগোপযোগী চর্চার ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিসর বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। মূলত বিংশ শতাব্দীকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূচনা, বিকাশ এবং পরিপক্বতার যুগ বলে অভিহিত করা চলে। তার উপর পারমাণবিক বিক্রিয়ার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে বিভিন্ন নক্ষত্রের অভ্যন্তরে কিভাবে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে তার স্বরূপ বোঝা গেছে। এর অব্যবহিত ফল হিসেবেই মহাবিশ্বের শক্তির উৎস সম্বন্ধে বিস্তারিত গবেষণা করা সম্ভব হয়েছে এবং জন্ম হয়েছে বিশ্বতত্ত্বের (Cosmology)। বিশ্বতত্ত্বের মূল আলোচ্য বিষয় মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং বিবর্তন। এ সব কিছুর ফলেই আমরা আজ জানি যে, পৃথিবীতে প্রাপ্ত পরমাণুগুলো মহাবিশ্বের বিবর্তনের এমন একটি সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল যখন ধূলিমেঘ ছাড়া আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। আর সেই ধূলিমেঘের মধ্যে প্রথমে কেবল হাইড্রোজেনেরই অস্তিত্ব ছিল। এভাবেই এই বিজ্ঞান অনেকদূর এগিয়ে গেছে যা একই সাথে মানুষকে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে; কারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমেই সবচেয়ে সফল ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বপ্রধান সীমাবদ্ধতা বা অন্য যাই বলা হোক না কেন তা হল এটি এখনও একটি খাঁটি পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞান। অনেক দূরবর্তী বস্তুসমূহ নিয়ে গবেষণা করতে হয় বিধায় এতে পরীক্ষণের সুযোগ খুবই সীমিত। তাছাড়া যে বস্তুসমূহ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয় সেগুলোর তাপমাত্রা, চাপ বা রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে কোনও তথ্যকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ থাকা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান যুগে এই বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষণ চালনা সম্ভব হয়েছে; যেমন: ভূপৃষ্ঠে পতিত উল্কাপিণ্ড, পাথর বা চাঁদ থেকে নিয়ে আসা মাটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা সম্ভব হয়েছে। এর সাথে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে প্রাপ্ত ধূলিকণা নিয়ে গবেষণাও এর অন্তর্ভুক্ত। এভাবে জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্রেও প্রসিদ্ধি লাভ করছে। ভবিষ্যতে হয়তোবা ধূমকেতুর ধূলিকণা বা মঙ্গল গ্রহের মাটি নিয়ে মহাশূন্যযানে বসেই গবেষণা করা যাবে। তবে এসব গবেষণার বেশির ভাগই পৃথিবীকেন্দ্রিক। পর্যবেক্ষণকাজে বিজ্ঞানের অন্য শাখাসমূহের সাহায্য এখানে মুখ্য। সহযোগী শাখাসমূহের মধ্যে আছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, অণুজীববিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি।

Unsöld, Albrecht; Baschek, Bodo (2001). Classical Astronomy and the Solar System - Introduction. p. 1.
Jump up ^ Unsöld, Albrecht; Baschek, Bodo (2001). Classical Astronomy and the Solar System. pp. 6–9.
Jump up ^ Official Web Site of the Sydney Observatory
Jump up ^ Official Web Site of one of the oldest Observatories in South America, the Quito Astronomical Observatory
Jump up ^ Losev A., (2012), 'Astronomy' or 'astrology': a brief history of an apparent confusion, Journal of Astronomical History and Heritage, Vol. 15, No. 1, p. 42-46 .
Jump up ^ Unsöld, Albrecht; Baschek, Bodo (2001). The New Cosmos: An Introduction to Astronomy and Astrophysics. Translated by Brewer, W.D. Berlin, New York: Springer. .
^ Jump up to: a b Scharringhausen, B. Curious About Astronomy: What is the difference between astronomy and astrophysics?. Archived from the original on 9 June 2007. Retrieved 17 November 2016.
^ Jump up to: a b Odenwald, Sten. Archive of Astronomy Questions and Answers: What is the difference between astronomy and astrophysics?. astronomycafe.net. The Astronomy Cafe. Archived from the original on 8 July 2007. Retrieved 20 June 2007.
^ Jump up to: a b Penn State Erie-School of Science-Astronomy and Astrophysics. Archived from the original on 1 November 2007. Retrieved 20 June 2007.
Jump up ^ Merriam-Webster Online. Results for astronomy. Archived from the original on 17 June 2007. Retrieved 20 June 2007.
Jump up ^ Merriam-Webster Online. Results for astrophysics. Retrieved 20 June 2007.
^ Jump up to: a b c Shu, F. H. (1983). The Physical Universe. Mill Valley, California: University Science Books. .
Jump up ^ Forbes, 1909
Jump up ^ DeWitt, Richard (2010). The Ptolemaic System. Worldviews: An Introduction to the History and Philosophy of Science. Chichester, England: Wiley. p. 113. .
Jump up ^ Aaboe, A. (1974). Scientific Astronomy in Antiquity. Philosophical Transactions of the Royal Society. 276 (1257): 21–42. Bibcode:1974RSPTA.276...21A. JSTOR 74272. doi:10.1098/rsta.1974.0007.
Jump up ^ Eclipses and the Saros. NASA. Archived from the original on 30 October 2007. Retrieved 28 October 2007.
Jump up ^ Krafft, Fritz (2009). Astronomy. In Cancik, Hubert; Schneider, Helmuth. Brill's New Pauly.
Jump up ^ Berrgren, J.L.; Nathan Sidoli (May 2007). Aristarchus's On the Sizes and Distances of the Sun and the Moon: Greek and Arabic Texts. Archive for History of Exact Sciences. 61 (3): 213–254. doi:10.1007/s00407-006-0118-4.
Jump up ^ Hipparchus of Rhodes. School of Mathematics and Statistics, University of St Andrews, Scotland. Archived from the original on 23 October 2007. Retrieved 28 October 2007.
Jump up ^ Thurston, H., Early Astronomy. Springer, 1996.  p. 2
Jump up ^ Marchant, Jo (2006). In search of lost time. Nature. 444 (7119): 534–8. Bibcode:2006Natur.444..534M. PMID 17136067. doi:10.1038/444534a.
Jump up ^ Kennedy, Edward S. (1962). Review: The Observatory in Islam and Its Place in the General History of the Observatory by Aydin Sayili. Isis. 53 (2): 237–239. doi:10.1086/349558.
Jump up ^ Micheau, Francoise. Rashed, Roshdi; Morelon, Régis, eds. The Scientific Institutions in the Medieval Near East. Encyclopedia of the History of Arabic Science. 3: 992–3.
Jump up ^ Nas, Peter J (1993). Urban Symbolism. Brill Academic Publishers. p. 350. .
Jump up ^ Kepple, George Robert; Glen W. Sanner (1998). The Night Sky Observer's Guide. 1. Willmann-Bell, Inc. p. 18. .
^ Jump up to: a b Berry, Arthur (1961). A Short History of Astronomy From Earliest Times Through the 19th Century. New York: Dover Publications, Inc. .
Jump up ^ Hoskin, Michael, ed. (1999). The Cambridge Concise History of Astronomy. Cambridge University Press. .
Jump up ^ McKissack, Pat; McKissack, Frederick (1995). The royal kingdoms of Ghana, Mali, and Songhay: life in medieval Africa. H. Holt. .
Jump up ^ Clark, Stuart; Carrington, Damian (2002). Eclipse brings claim of medieval African observatory. New Scientist. Retrieved 3 February 2010.
Jump up ^ Cosmic Africa explores Africa's astronomy. Science in Africa. Archived from the original on 3 December 2003. Retrieved 3 February 2002.
Jump up ^ Holbrook, Jarita C.; Medupe, R. Thebe; Urama, Johnson O. (2008). African Cultural Astronomy. Springer. .
Jump up ^ Africans studied astronomy in medieval times. The Royal Society. 30 January 2006. Archived from the original on 9 June 2008. Retrieved 3 February 2010.
Jump up ^ Stenger, Richard Star sheds light on African 'Stonehenge'. CNN. 5 December 2002. Archived from the original on 12 May 2011.. CNN. 5 December 2002. Retrieved on 30 December 2011.
Jump up ^ J. L. Heilbron, The Sun in the Church: Cathedrals as Solar Observatories (1999) p. 3
^ Jump up to: a b Forbes, 1909, pp. 58–64
Jump up ^ Forbes, 1909, pp. 49–58
Jump up ^ Chambers, Robert (1864) Chambers Book of Days
Jump up ^ Forbes, 1909, pp. 79–81
Jump up ^ Forbes, 1909, pp. 147–150
Jump up ^ Forbes, 1909, pp. 74–76
Jump up ^ Belkora, Leila (2003). Minding the heavens: the story of our discovery of the Milky Way. CRC Press. pp. 1–14. .
Jump up ^ Electromagnetic Spectrum. NASA. Archived from the original on 5 September 2006. Retrieved 17 November 2016.
^ Jump up to: a b c d e f g h i j k l m n Cox, A. N., ed. (2000). Allen's Astrophysical Quantities. New York: Springer-Verlag. p. 124. .
Jump up ^ In Search of Space. Picture of the Week. European Southern Observatory. Retrieved 5 August 2014.
Jump up ^ Wide-field Infrared Survey Explorer Mission. NASAUniversity of California, Berkeley. 30 September 2014. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Majaess, D. (2013). Discovering protostars and their host clusters via WISE, ApSS, 344, 1 (VizieR catalog)
Jump up ^ Staff (11 September 2003). Why infrared astronomy is a hot topic. ESA. Retrieved 11 August 2008.
Jump up ^ Infrared Spectroscopy – An Overview. NASA California Institute of Technology. Retrieved 11 August 2008.
^ Jump up to: a b Moore, P. (1997). Philip's Atlas of the Universe. Great Britain: George Philis Limited. .
Jump up ^ Penston, Margaret J. (14 August 2002). The electromagnetic spectrum. Particle Physics and Astronomy Research Council. Archived from the original on 8 September 2012. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Gaisser, Thomas K. (1990). Cosmic Rays and Particle Physics. Cambridge University Press. pp. 1–2. .
Jump up ^ Abbott, Benjamin P.; et al. (LIGO Scientific Collaboration and Virgo Collaboration) (2016). Observation of Gravitational Waves from a Binary Black Hole Merger. Phys. Rev. Lett. 116 (6): 061102. Bibcode:2016PhRvL.116f1102A. PMID 26918975. arXiv:1602.03837 Freely accessible. doi:10.1103/PhysRevLett.116.061102.
Jump up ^ Tammann, G.A.; Thielemann, F.K.; Trautmann, D. (2003). Opening new windows in observing the Universe. Europhysics News. Archived from the original on 6 September 2012. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ LIGO Scientific Collaboration and Virgo Collaboration; Abbott, B. P.; Abbott, R.; Abbott, T. D.; Abernathy, M. R.; Acernese, F.; Ackley, K.; Adams, C.; Adams, T. (2016-06-15). GW151226: Observation of Gravitational Waves from a 22-Solar-Mass Binary Black Hole Coalescence. Physical Review Letters. 116 (24): 241103. PMID 27367379. doi:10.1103/PhysRevLett.116.241103.
Jump up ^ Planning for a bright tomorrow: Prospects for gravitational-wave astronomy with Advanced LIGO and Advanced Virgo. LIGO Scientific Collaboration. Retrieved 31 December 2015.
Jump up ^ Xing, Zhizhong; Zhou, Shun (2011). Neutrinos in Particle Physics, Astronomy and Cosmology. Springer. p. 313. . Extract of page 313
Jump up ^ Calvert, James B. (28 March 2003). Celestial Mechanics. University of Denver. Archived from the original on 7 September 2006. Retrieved 21 August 2006.
Jump up ^ Hall of Precision Astrometry. University of Virginia Department of Astronomy. Archived from the original on 26 August 2006. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Wolszczan, A.; Frail, D. A. (1992). A planetary system around the millisecond pulsar PSR1257+12. Nature. 355 (6356): 145–147. Bibcode:1992Natur.355..145W. doi:10.1038/355145a0.
Jump up ^ Roth, H. (1932). A Slowly Contracting or Expanding Fluid Sphere and its Stability. Physical Review. 39 (3): 525–529. Bibcode:1932PhRv...39..525R. doi:10.1103/PhysRev.39.525.
Jump up ^ Eddington, A.S. (1926). Internal Constitution of the Stars. Cambridge University Press. .
Jump up ^ Dark matter. NASA. 2010. Archived from the original on 30 October 2009. Retrieved 2 November 2009. third paragraph, There is currently much ongoing research by scientists attempting to discover exactly what this dark matter is
^ Jump up to: a b Johansson, Sverker (27 July 2003). The Solar FAQ. Talk.Origins Archive. Archived from the original on 7 September 2006. Retrieved 11 August 2006.
Jump up ^ Lerner, K. Lee; Lerner, Brenda Wilmoth (2006). Environmental issues : essential primary sources. Thomson Gale. Archived from the original on 10 July 2012. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Pogge, Richard W. (1997). The Once  Future Sun. New Vistas in Astronomy. Archived from the original (lecture notes) on 27 May 2005. Retrieved 3 February 2010.
Jump up ^ Stern, D. P.; Peredo, M. (28 September 2004). The Exploration of the Earth's Magnetosphere. NASA. Archived from the original on 24 August 2006. Retrieved 22 August 2006.
Jump up ^ Bell III, J. F.; Campbell, B. A.; Robinson, M. S. (2004). Remote Sensing for the Earth Sciences: Manual of Remote Sensing (3rd ed.). John Wiley  Sons. Archived from the original on 11 August 2006. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Grayzeck, E.; Williams, D. R. (11 May 2006). Lunar and Planetary Science. NASA. Archived from the original on 20 August 2006. Retrieved 21 August 2006.
Jump up ^ Montmerle, Thierry; Augereau, Jean-Charles; Chaussidon, Marc; et al. (2006). Solar System Formation and Early Evolution: the First 100 Million Years. Earth, Moon, and Planets. Springer. 98 (1–4): 39–95. Bibcode:2006EMP...98...39M. doi:10.1007/s11038-006-9087-5.
Jump up ^ Montmerle, 2006, pp. 87–90
Jump up ^ Beatty, J.K.; Petersen, C.C.; Chaikin, A., eds. (1999). The New Solar System. Cambridge press. p. 70edition = 4th. .
^ Jump up to: a b Harpaz, 1994, pp. 7–18
^ Jump up to: a b Smith, Michael David (2004). Cloud formation, Evolution and Destruction. The Origin of Stars. Imperial College Press. pp. 53–86. .
Jump up ^ Harpaz, 1994
Jump up ^ Harpaz, 1994, pp. 173–178
Jump up ^ Harpaz, 1994, pp. 111–118
Jump up ^ Audouze, Jean; Israel, Guy, eds. (1994). The Cambridge Atlas of Astronomy (3rd ed.). Cambridge University Press. .
Jump up ^ Harpaz, 1994, pp. 189–210
Jump up ^ Harpaz, 1994, pp. 245–256
Jump up ^ Ott, Thomas (24 August 2006). The Galactic Centre. Max-Planck-Institut für extraterrestrische Physik. Archived from the original on 4 September 2006. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Smith, Michael David (2004). Massive stars. The Origin of Stars. Imperial College Press. pp. 185–199. .
Jump up ^ Van den Bergh, Sidney (1999). The Early History of Dark Matter. Publications of the Astronomical Society of the Pacific. 111 (760): 657–660. Bibcode:1999PASP..111..657V. arXiv:astro-ph/9904251 Freely accessible. doi:10.1086/316369.
Jump up ^ Keel, Bill (1 August 2006). Galaxy Classification. University of Alabama. Archived from the original on 1 September 2006. Retrieved 8 September 2006.
Jump up ^ Active Galaxies and Quasars. NASA. Archived from the original on 31 August 2006. Retrieved 17 November 2016.
Jump up ^ Zeilik, Michael (2002). Astronomy: The Evolving Universe (8th ed.). Wiley. .
Jump up ^ Cosmic Detectives. The European Space Agency (ESA). 2013-04-02. Retrieved 2013-04-15.
^ Jump up to: a b c Dodelson, Scott (2003). Modern cosmology. Academic Press. pp. 1–22. .
Jump up ^ Hinshaw, Gary (13 July 2006). Cosmology 101: The Study of the Universe. NASA WMAP. Archived from the original on 13 August 2006. Retrieved 10 August 2006.
Jump up ^ Dodelson, 2003, pp. 216–261
Jump up ^ Galaxy Clusters and Large-Scale Structure. University of Cambridge. Archived from the original on 10 October 2006. Retrieved 8 September 2006.
Jump up ^ Preuss, Paul. Dark Energy Fills the Cosmos. U.S. Department of Energy, Berkeley Lab. Archived from the original on 11 August 2006. Retrieved 8 September 2006.
Jump up ^ Mims III, Forrest M. (1999). Amateur Science—Strong Tradition, Bright Future. Science. 284 (5411): 55–56. Bibcode:1999Sci...284...55M. doi:10.1126/science.284.5411.55. Astronomy has traditionally been among the most fertile fields for serious amateurs [...]
Jump up ^ The American Meteor Society. Archived from the original on 22 August 2006. Retrieved 24 August 2006.
Jump up ^ Lodriguss, Jerry. Catching the Light: Astrophotography. Archived from the original on 1 September 2006. Retrieved 24 August 2006.
Jump up ^ Ghigo, F. (7 February 2006). Karl Jansky and the Discovery of Cosmic Radio Waves. National Radio Astronomy Observatory. Archived from the original on 31 August 2006. Retrieved 24 August 2006.
Jump up ^ Cambridge Amateur Radio Astronomers. Retrieved 24 August 2006.
Jump up ^ The International Occultation Timing Association. Archived from the original on 21 August 2006. Retrieved 24 August 2006.
Jump up ^ Edgar Wilson Award. IAU Central Bureau for Astronomical Telegrams. Archived from the original on 24 October 2010. Retrieved 24 October 2010.
Jump up ^ American Association of Variable Star Observers. AAVSO. Archived from the original on 2 February 2010. Retrieved 3 February 2010.
Jump up ^ Kroupa, Pavel (2002). The Initial Mass Function of Stars: Evidence for Uniformity in Variable Systems. Science. 295 (5552): 82–91. Bibcode:2002Sci...295...82K. PMID 11778039. arXiv:astro-ph/0201098 Freely accessible. doi:10.1126/science.1067524.
Jump up ^ Rare Earth: Complex Life Elsewhere in the Universe?. Astrobiology Magazine. Archived from the original on 28 June 2011. Retrieved 12 August 2006.
Jump up ^ Sagan, Carl. The Quest for Extraterrestrial Intelligence. Cosmic Search Magazine. Archived from the original on 18 August 2006. Retrieved 12 August 2006.
Jump up ^ 11 Physics Questions for the New Century. Pacific Northwest National Laboratory. Archived from the original on 3 February 2006. Retrieved 12 August 2006.
Jump up ^ Hinshaw, Gary (15 December 2005). What is the Ultimate Fate of the Universe?. NASA WMAP. Archived from the original on 29 May 2007. Retrieved 28 May 2007.
Jump up ^ FAQ - How did galaxies form?. NASA. Retrieved July 28, 2015.
Jump up ^ Supermassive Black Hole. Swinburne University. Retrieved July 28, 2015.
Jump up ^ Hillas, A. M. (September 1984). The Origin of Ultra-High-Energy Cosmic Rays. Annual Review of Astronomy and Astrophysics. 22: 425–444. doi:10.1146/annurev.aa.22.090184.002233. This poses a challenge to these models, because [...]
Jump up ^ Howk, J. Christopher; Lehner, Nicolas; Fields, Brian D.; Mathews, Grant J. (6 September 2012). Observation of interstellar lithium in the low-metallicity Small Magellanic Cloud. Nature. 489 (7414): 121–123. ISSN 0028-0836. PMID 22955622. doi:10.1038/nature11407.
Jump up ^ Orwig, Jessica (15 December 2014). What Happens When You Enter A Black Hole?. Business Insider International. Retrieved 17 November 2016.




#Article 112: রসায়ন (1799 words)


রসায়ন পদার্থের উপাদান, কাঠামো, ধর্ম ও পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া সংক্রান্ত বিজ্ঞান।  রসায়নবিদেরা মনে করেন বিশ্বের যাবতীয় বস্তু পরমাণু দিয়ে গঠিত। দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ হয়ে অণুর সৃষ্টি করে। এক বা একাধিক ইলেকট্রন পরমাণু বা অণু থেকে সরিয়ে নিলে বা যোগ করলে আধানযুক্ত কণা তথা আয়ন সৃষ্টি হয়। ধনাত্মক আয়ন ও ঋণাত্মক আয়নের সংযোগে সৃষ্টি হয় আধান-নিরপেক্ষ লবণ(মূলত এটি ক্লোরিন বা সালফেটের যৌগ)। রসায়নবিদেরা আণবিক ও পারমাণবিক স্তরে পদার্থ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান দিয়ে কীভাবে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ একে অপরের সাথে ক্রিয়া করে এবং এগুলি কীভাবে বিভিন্ন অবস্থায় রূপান্তরিত হয়, তা ব্যাখ্যা করতে পারেন। রসায়নবিদেরা পদার্থের পরিবর্তন সাধন করতে পারেন ও নতুন নতুন যৌগ সৃষ্টি করতে পারেন যাদের মধ্যে আছে ঔষধ, বিস্ফোরক, প্রসাধনী ও খাদ্য। রাসায়নিক সংশ্লেষণ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্পে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন করা হয়।

পদার্থের প্রকারভেদ কিংবা গবেষণার সাদৃশ্য বিবেচনা করে রসায়নের বিভিন্ন শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রসায়নের প্রধান শাখাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অজৈব রসায়ন অর্থাৎ রসায়নের যে শাখায় অজৈব যৌগ নিয়ে আলোচনা করা হয়, জৈব রসায়ন বা যে শাখায় জৈব যৌগ নিয়ে আলোচনা করা হয়, প্রাণরসায়ন, রসায়নের যে শাখায় জীবদেহের রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়, ভৌত রসায়ন, এই শাখায় আণবিক পর্যায়ে শক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত রাসায়নিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়, বিশ্লেষণী রসায়ন, এক্ষেত্রে পদার্থের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের গঠন, সংযুক্তি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাম্প্রতিক কালে রসায়নের আরও অনেক নতুন শাখার উদ্ভব হয়েছে, যেমন- স্নায়ু রসায়ন, স্নায়ুতন্ত্রের রাসায়নিক গঠন নিয়ে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।

ল্যাবরেটরি, ইন্সটিটিউট অফ বায়োকেমিস্ট্রি, ইউনিভার্সিটি অফ কনজ  এই সকল প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঐতিহ্যবাহী রসায়ন  চর্চা শুরু হয়। এখানে মৌলিক উপাদান, পরমাণু, পদার্থ, গলন, ক্রিস্টাল ও পদার্থ একত্র করা,কঠিন পদার্থ, তরল, বায়বীয় পদার্থ, যৌগ তৈরির নীতি, কথাবার্তা, বিক্রিয়া এবং রূপান্তর ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা হয়।

রসায়নের ইতিহাস একটি অনেক বড় বিষয়।এটি প্রাচীন ও প্রধান বিজ্ঞানগুলোর অন্যতম। বলা চলে আগুন আবিষ্কারের পর থেকেই মানব সভ্যতার হাত ধরে এগিয়ে চলেছে রসায়ন। ভারতবর্ষে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বেই কাপড়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে রঙের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। রসায়ন চর্চায় প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অবদান অনেক। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় রসায়ন চর্চা আল-কেমি (Alchemy) নামে পরিচিত। আল-কেমি আরবি আল-কিমিয়া থেকে উদ্ভূত, যা দিয়ে মিশরীয় সভ্যতাকে বুঝানো হতো। জাবির ইবন হাইয়ানকে রসায়ন শাস্ত্রের ও লাভোয়াজিয়েকেকে আধুনিক রসায়ন শাস্ত্রের জনক বলা হয়ে থাকে।  মধ্যযুগে ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে পারার পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রচেষ্টায় শুরু হয় আলকেমি বিদ্যা, যা লাভোয়াজিয়ে, মেন্ডেলিফদের হাতে পূর্ণতা লাভ করেছে।

রসায়ন শব্দের ইংরেজি Chemistry (কেমিস্ট্রি)। মধ্যযুগে পরশ পাথরের সন্ধানে পরীক্ষারত মুসলিম বিজ্ঞানীরা একটি শাস্ত্র বা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এটাকে তারা বলতেন আলকামিস্তা বা আলকেমি। আলকেমি এসেছে আরবী শব্দ আল-কিমিয়া থেকে। আল-কিমিয়া শব্দটি এসেছে 'কিমি' থেকে। কিমি থেকেই chemistry শব্দের উৎপত্তি। আলকেমি  আল অর্থ দি(The), এবং কেমি বা কিমি অর্থ ব্লাক সয়েল বা কালো মাটি। এই কালো মাটি আসলে মিশরের নীল নদের তীরের মাটি। প্রাচীন মিশরকে রসায়নের জন্মক্ষেত্র বলা যায়। কারণ, মিশরীয়রা সভ্যতার আদি লগ্নে যে মমি তৈরি করতো তাতেই তারা নানান রকমের রাসায়নিক ব্যবহার করতো। প্রাচীন গ্রীসেও রসায়নের চর্চা শুরু হয়েছে সুপ্রাচীনকাল থেকেই।

তারা চিন্তা করতো এ্যালিক্সির বা জীবন সঞ্জিবনীর কিভাবে তৈরি করা যায়! কারণ, মানুষ চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় অমর হতে চায়। ভারতীয় উপমহাদেশের ঋষিরাও চাইতেন তেমন কিছু তৈরি করার। তারা একে বলতেন পরশ পাথর!

গ্রিসদের এই চিন্তা ভাবনা ও কাজের সাথে পরিচিত ছিলেন জাবির ইব্নে হাইয়ান। তাঁর পিতা ইবনে হাইয়ানও একজন গুপ্তবিদ্যাচর্চাকারী ছিলেন। প্রাচীনকালে রসায়ন গুপ্ত বিদ্যা বলে পরিচিত ছিলো। কারণ রসায়নবিদরা লোক চক্ষুর অন্তরালে তাদের পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতেন। কারণ সাধারণ মানুষের  কৌতুুহল বেশি থাকে এবং তারা কাজে বাঁধা সৃষ্টি করতে তৎপর থাকে।

পরবর্তী সময়ে জাবির ইবনে হাইয়ান তাঁর নিজ বাসভূমি আরবীয় অঞ্চলে ফিরে আসেন এবং রসায়ন শাস্ত্রের উপর ১০৮ খানা গ্রন্থ লেখেন। তাঁর এই মহামূল্য গ্রন্থগুলো রসায়ন গবেষণায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তাকে প্রাচীন রসায়নের জনক বলে অভিহিত করা হয়।

আমরা জানি যে, যার ভর আছে, কোন স্থান দখল করে অবস্থান করে এবং যা স্থিতিশীল বা গতিশীল অবস্থার বাধা প্রদান করে, তাকে পদার্থ বলে। পদার্থের মধ্যে অণু থাকে যা আবার পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত। পরমাণু সমূহ গঠিত হয় ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন এর সমন্বয়ে। এসব ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন পদার্থের অনুর সাথে কিভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকে এবং এদের বিক্রিয়ার সময় এরা কি ধরনের আচরণ করে সেসব নিয়ে আলোচনা করা হয় রসায়নে।

রসায়ন শাস্ত্রে অনেক গুলো মৌলিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে

মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যা ঐ পদার্থের বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে। যাকে বিশ্লেষিত করলে আরো ক্ষুদ্রতম কণা ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন পাওয়া যায়। পরমাণুকে দুটি ভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা যায়। একটিকে কেন্দ্র বলা হয়- যে অংশে পরমাণুর সকল ভর ও ধনাত্বক চার্জ পুঞ্জীভূত থাকে। অর্থাৎ নিরপেক্ষ নিউট্রন ও ধনাত্বক প্রোটন একত্রে কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে থাকে আর দ্বিতীয়টিকে বলা হয় বহিঃঅঞ্চল- যে অংশে নির্দিষ্ট শক্তির কতক শক্তিস্তর থাকে আর ঐ শক্তিস্তরে নির্দিষ্ট শক্তির ঋণাত্বক চার্জ যুক্ত ইলেক্ট্রন পরিক্রমণরত অবস্থায় থাকে।

যার ভর আছে, কোন স্থান দখল করে অবস্থান করে এবং যা স্থিতিশীল বা গতিশীল অবস্থার বাধা প্রদান করে, তাকে পদার্থ বলে। পৃথিবীর সমস্ত পদার্থকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে । যথা:কঠিন,তরল ও বায়বীয় ।এছাড়া ও পদার্থের আরেকটি অবস্থা ও হিসাব করা হয়, যাকে প্লাজমা বলে।এটিকে উচ্চ তাপমাত্রায় আয়নিত গ্যাস বলা হয়।

একাধিক মৌলের সমন্বয়ে গঠিত নতুন পদার্থকে যৌগ বলে। যেমন: সোডিয়াম ক্লোরাইড, কার্বন‌ ডাই অক্সাইড সালফিউরিক এসিড ইত্যাদি।

যেকোন পদার্থের নির্দিষ্ট একটা অংশকে বস্তু বলে। যেমনঃ মৌল, এক অণু বিশিষ্ট যৌগ। অর্থাৎ হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, পানি ইত্যাদি।

দুই বা ততোধিক পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত ক্ষুদ্র কণাকে বলা হয় অণু।
যেমন: হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে অণু গঠন করে।

হাইড্রোজেনের পরমাণু H  এবং 
হাইড্রোজেনের অণু H2।

কোনো পদার্থের পারমাণবিক ভর বা আণবিক ভরকে গ্রাম এককে প্রকাশ করলে যে পরিমাণ পাওয়া যায়, তাকে ঐ পদার্থের এক মোল বলে।
১ mole=৬.০২x১০ ২৩   টি অণু/পরমাণু/আয়ন।

এই সংখ্যাটিকে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা বলা হয়। কোন পদার্থের যে পরিমাণের মধ্যে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার সমান সংখ্যক অণু/পরমাণু/আয়ন বিদ্যমান থাকে তাকে ঐ পদার্থের একমোল বলে।

কার্বনের পারমাণবিক ভর ১২ 

একে গ্রাম এককে প্রকাশ করলে,

১২ গ্রাম কার্বন = ১ মোল কার্বন

আবার পানির আণবিক ভর ১৮

সুতরাং ১ মোল পানি = ১৮ গ্রাম পানি।

অম্ল বা ক্ষারের কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে; তার মধ্যে সবচেয়ে চেয়ে সহজতর তত্ত্বটি হচ্ছে 'আরহেনিয়াসের তত্ত্ব'।  তার মতে, অম্ল হচ্ছে এমন ধরনের বস্তু যা পানির সাথে দ্রবীভুত হলে হাইড্রনিয়াম আয়ন উৎপন্ন করে এবং ক্ষার হল যা পানির সাথে দ্রবীভূত হলে হাইড্রোক্সাইড আয়ন উৎপন্ন করে। ব্রনস্টেড-লাউরি‘র অম্ল-ক্ষার সূত্রানুসারে, রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় যদি একটি মৌল অন্য একটি মৌলকে ধ্ণাত্মক হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে তবে তাকে অম্ল বলে; অপরপক্ষে ক্ষার হচ্ছে ঐ বস্তুু যা ঐ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে। এ সম্বন্ধে লুইস এর অম্ল-ক্ষার তত্ত্ব নামে তৃতীয় একটা তত্ত্ব রয়েছে,যার ভিত্তি হল নতুন রাসায়নিক বন্ধন গঠন করা। লুইসের তত্ত্বানূসারে অম্ল হচ্ছে ঐ মৌল যা বন্ধন গঠনের সময় অন্য মৌল হতে এক জোড়া ইলেক্ট্রন গ্রহণ করতে সক্ষম; অন্যদিকে ক্ষার হচ্ছে ঐ মৌল যা নতুন বন্ধনে এক জোড়া ইলেক্ট্রন দিতে পারে। তাছাড়া আরো অনেক ভাবেও অম্ল ও ক্ষার কে সঙ্গায়িত করা হয়ে থাকে।

অম্লের ক্ষমতা প্রধানত ২ পদ্ধতিতে পরিমাপ করা হয়ে থাকে।একটা পদ্ধতি হচ্ছে আরহেনিয়াসের অম্লত্বের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে, pH ,যেটা দ্রবণে ঘণীভূত হাইড্রোনিয়াম আয়ন কে বোঝায়,যেটাকে ঋণাত্মক লগারিদ্মিক স্কেল এ প্রকাশ করা হয়। এভাবে,যে দ্রবণের pH এর মান কম ও উচ্চ ঘণীভূত হাইড্রনিয়াম আয়ন তবে সেটা অধিক অম্লীয়। অন্য পদ্ধতি টা হচ্ছে, ব্রনস্টেড-লাউরি‘র বর্ণনার উপর ভিত্তি করে,যে বস্তুর ka এর মান অধিকতর এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় নিম্নতর ka মানের তুলনায় অত্যধিক পরিমাণে হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে। ব্রনস্টেড-লাউরি‘র অম্ল-ক্ষার সূত্রানুসারে, রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় যদি একটি মৌল অন্য একটি মৌলকে ধ্ণাত্মক হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে তবে তাকে অম্ল বলে; অপরপক্ষে ক্ষার হচ্ছে ঐ বস্তু যা ঐ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে। এ সম্বন্ধে লুইস এর অম্ল-ক্ষার তত্ত্ব নামে তৃতীয় একটা তত্ত্ব রয়েছে,যার ভিত্তি হল নতুন রাসায়নিক বন্ধন গঠন করা। লুইসের তত্ত্বানূসারে অম্ল হচ্ছে ঐ মৌল যা বন্ধন গঠনের সময় অন্য মৌল হতে এক জোড়া ইলেক্ট্রন গ্রহণ করতে সক্ষম; অন্যদিকে ক্ষার হচ্ছে ঐ মৌল যা নতুন বন্ধনে এক জোড়া ইলেক্ট্রন দিতে পারে। তাছাড়া আরো অনেক ভাবেও অম্ল ও ক্ষার কে সঙ্গায়িত করা হয়ে থাকে।

অম্লের ক্ষমতা প্রধানত ২ পদ্ধতিতে পরিমাপ করা হয়ে থাকে।একটা পদ্ধতি হচ্ছে আরহেনিয়াসের  অম্লত্বের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে, pH ,যেটা দ্রবণে ঘণীভূত হাইড্রোনিয়াম আয়ন কে বোঝায়,যেটাকে ঋণাত্মক লগারিদ্মিক স্কেল এ প্রকাশ করা হয়। এভাবে,যে দ্রবণের pH এর মান কম ও উচ্চ ঘণীভূত হাইড্রনিয়াম আয়ন তবে সেটা অধিক অম্লীয়।  
অন্য পদ্ধতি টা হচ্ছে, ব্রনস্টেড-লাউরি‘র বর্ণনার উপর ভিত্তি করে,যে বস্তুর ka এর মান অধিকতর এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় নিম্নতর ka মানের তুলনায় অত্যধিক পরিমাণে হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে।

পদার্থের নির্দিষ্ট  ভৌত অবস্থাকে (কঠিন, তরল,গ্যাসীয় ও প্লাজমা ) নির্দেশ করা হয়।

যে বিক্রিয়ায় ইলেক্ট্রন আদান প্রদান হয় তাকে জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া বলে ।
যে বিক্রিয়ায় ইলেক্ট্রন ত্যাগ বা বর্জন করা হয় তাকে জারণ বলে । আবার যে বিক্রিয়ায় ইলেক্ট্রন গ্রহণ করা হয় তাকে বিজারণ বলে ।
জারক ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে নিজে বিজারিত হয় এবং অপরকে জারিত করে আর বিজারক ইলেক্ট্রন ত্যাগ করে নিজে জারিত হয় এবং অপরকে বিজারিত করে ।

অনুতে পরমাণু সমূহ পরস্পর যেভাবে বন্ধন শক্তিতে যুক্ত থাকে, তাকে রাসায়নিক বন্ধন বলে।

রসায়নের পরিভাষায় যে পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক মৌল বা যৌগ পরস্পর যুক্ত হয়ে এক বা একাধিক নতুন যৌগ উৎপন্ন করে তাকে বিক্রিয়া বলে। যদি একাধিক মৌল বা যৌগ পরস্পর যুক্ত নতুন যৌগ উৎপন্ন না-করে তবে তাকে বিক্রিয়া বলা যাবে না। বিক্রিয়ায় মূলত পরমাণু বা ইলেকট্রনের আদান প্রদান ঘটে।

রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করার জন্য রাসায়নিক সমীকরণ ব্যবহার করা হয় ৷ অর্থাৎ সমীকরণ হলো রাসায়নিক শর্টহ্যান্ড (Chemical Shorthand ) ও কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে রসায়নের ভাষায় প্রকাশ৷ রাসায়নিক সমীকরণ লেখার নিয়ম:

হলে (s), তরল (Liquid) হলে (l) এবং গ্যাসীয় (Gaseous) হলে (g) লেখা হয় ৷ বিক্রিয়ক এবং উৎপাদ হিসেবে কোনো যৌগের জলীয় দ্রবণ (Aqueous solution) থাকলে (aq) লেখা হয় ৷

উভমুখী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে সময়ের সাথে এক সময় বিক্রিয়ার সম্মুখবেগ ও পশ্চাৎবেগ সমান হয়। এ অবস্থাকে রাসায়নিক সাম্যাবস্থা বলে। সাম্যাবস্থা তখনই হয়, যখন কোনো পদার্থের বিভিন্ন ধরনের গঠন সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বিভিন্ন যৌগের একটি মিশ্রণ যারা একজন আরেকজন এর সাথে বিক্রিয়া করতে পারে অথবা যখন একটি যৌগ একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে সেটাই সাম্যাবস্থা।

বস্তুর শক্তি হচ্ছে ঐ বস্তু মোট যতখানি কাজ করতে পারে।

রসায়ন বিজ্ঞানের একটি অন্যতম দিক । রসায়নের অনেক গুলো বিভাগ রয়েছে । যা বিজ্ঞান এর জন্য মঙ্গলজনক

সবুজ রসায়ন হলো রসায়নের একটি শাখা যাতে কম পরিবেশ দূষণ করে এবং ঝুঁকি হ্রাস করে এমন রাসায়নিক প্রক্রিয়া বা উৎপাদন-পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হয়। কার্যত: 'সবুজ রসায়ন' এমন একটি গবেষণাদর্শন যার উদ্দেশ্য এমন রাসায়নিক পদ্ধতির উদ্ভাবন ও অবলম্বন করা যাতে শিল্পজাত বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস পায়, ঝুকিঁপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং শক্তির অপচয় হ্রাস পায়। এটি রসায়নের একটি নবতর শাখা। এর লক্ষ্য মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান বর্জিত পণ্য ও পদ্ধতি আবিষ্কার। এটি পরিবেশ রসায়ন থেকে ভিন্ন।

১. কাচ শিল্প

২. জ্বালানি শিল্প

৩. সিরামিক শিল্প

৪. পেট্রোলিয়াম শিল্প

৫. ঔষধ শিল্প

৬. সিমেন্ট শিল্প

৭. সার শিল্প

৮. পলিমার শিল্প

৯. চিনি শিল্প

১০. কাগজ শিল্প

১১. রং শিল্প

১২. কীটনাশক শিল্প

১৩. তেল শিল্প

১৪. সাবান ও ডিটারজেন্ট শিল্প

১৫. চামড়া শিল্প

১৬. লৌহ শিল্প

১৭. বিস্ফোরক শিল্প

কিছু রাসায়নিক উপাদান খুবই ক্ষতিকারক ও বিপজ্জনক। মার্কারী (২) ক্লোরাইড অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ। ক্রোমেট ক্যান্সার সৃষ্টি করে। টিন (২) ক্লোরাইড খুব সহজেই পানি দূষণ করে থাকে। হাইড্রোক্লোরিক এসিড শরীরের চামড়া পুড়িয়ে ফেলে। হাইড্রোজেনের মতো পদার্থ বিস্ফোরক কিংবা অগ্নিসংযোগে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাই, যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা রসায়ন পরীক্ষাগারে করা উচিত। সেখানে বিশেষ নিরাপত্তামূলক উপকরণ এবং কাপড়ের ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও রাসায়নিক উপকরণসমূহ সুবিন্যস্ত আকারে রাখা হয়। ঔষুধাদি তৈরীতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ব্লিচের ন্যায় পদার্থের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয় যে রাসায়নিক পদার্থটি নিরাপদ।




#Article 113: বিজ্ঞানের ইতিহাস (232 words)


বিজ্ঞানের ইতিহাস বলতে আমরা এখানে বুঝব এমন ধরনের ঐতিহাসিক নিদর্শন বা ঘটনাসমষ্টি যা যুগে যুগে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বিস্তার লাভ করেছে এবং যার ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থেকেছে সবসময়। মূলত বিজ্ঞান কখনোও থেমে থাকেনি, বরং বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার মাধ্যমেই পৃথিবী এগিয়েছে এবং বিভিন্ন যুগ অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানের সূচনা মানব জন্মের শুরু থেকেই, পার্থক্য এই যে সে সময় মানুষ জানত না যে সে কি করেছে বা কোন সভ্যতার সূচনা ঘটতে চলেছে তার দ্বারা। প্রথম যে মানুষটি পাথরে পাথর ঘষে আগুন সৃষ্টি করেছিল সে কষ্মিনকালেও ভাবেনি যে সে একটি নব সভ্যতার জন্ম দিলো। এভাবেই চলেছিল অনেকটা কাল। তারপর একসময় যখন মানুষ তার কর্ম দেখে তার কাজের অর্থ ও গুরুত্ব বুঝতে পারল তখন সে তার কাজগুলোকে গুছিয়ে আনার চেষ্টা করল। আর এভাবেই জন্ম নিলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। তারপরের ইতিহাস হল বিপ্লবের ইতিহাস যার পরে আর মানব সভ্যতাকে আর কখনও পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা হয় তখন মানুষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে জ্ঞানের বিবর্তনকেও পরিচালনা ও প্রত্যক্ষ করার যোগ্যতা অর্জন করে। এধরনের জ্ঞান এতটাই মৌলিক ছিল যে অনেকে (বিশেষত বিজ্ঞানের দার্শনিকরা) মনে করেন এই পরিবর্তনটি প্রাক বৈজ্ঞানিকতাকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ যখন মানব মন বিকশিতই হয়নি তখনকার সময়কেও এটি অন্তর্ভুক্ত করে এবং নিগূঢ় অনুসন্ধান করে।

বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে তার অধিকংশই ছিল কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মধ্যে আবর্তিত। প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিজ্ঞান কি, বিজ্ঞান কিভাবে কাজ করে, এর মধ্যে কি কি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয় ইত্যাদি।




#Article 114: রাজনীতি (2178 words)


রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি বা রাজগতি বা রাজবুদ্ধি হলো হল দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি, উদাহরণস্বরুপ সম্পদের বণ্টন হল এমন একটি কর্মকাণ্ড। রাজনীতি নিয়ে আকাদেমিক অধ্যয়নকে রাজনীতিবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে।

রাজনীতি একটি বহুমুখী শব্দ। এটি আপোষের ও অহিংস রাজনৈতিক সমাধান প্রসঙ্গে ইতিবাচক অর্থে, অথবা সরকার বিষয়ক বিজ্ঞান বা কলা হিসেবে বিশদভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি এটি প্রায়শই একটি নেতিবাচক অর্থও বহন করে। উদাহরণস্বরুপ, উচ্ছেদবাদী উইনডেল ফিলিপস ঘোষণা দেন আমরা রাজনৈতিক চাল চালি না, দাসপ্রথার বিরোধিতা নিয়ে হাসি তামাশা করা আমাদের স্বভাবে নেই। রাজনীতিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, এবং বিভিন্ন পরিসরে মৌলিকভাবে এবিষয় নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে, যেমন এটি কিভাবে ব্যবহার করা উচিৎ, বিস্তৃতভাবে নাকি সীমিতভাবে, রাজকীয়ভাবে নাকি সাধারণভাবে, এবং কোনটি এক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবীঃ সংঘাত নাকি সমবায়।

রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, যার মধ্যে আছে কারও নিজস্ব রাজনৈতিক অভিমত মানুষের মাঝে প্রচার করা, অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময়, আইন প্রনয়ন, এবং বলপ্রয়োগের চর্চা করা, যার মধ্যে আছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা লড়াই। সামাজিক বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত পরিসরে রাজনীতির চর্চা করা হয়, ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থাসমূহের গোত্র ও গোষ্ঠী থেকে শুরু করে আধুনিক স্থানীয় সরকার, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত। আধুনিক জাতি রাষ্ট্রগুলোতে, মানুষ প্রায়ই নিজস্ব মতবাদ তুলে ধরতে রাজনৈতিক দল গঠন করে। কোন দলের সদস্যগণ প্রায়শই বিভিন্ন বিষয়ে সহাবস্থানের ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করে এবং আইনের একই পরিবর্তন ও একই নেতার প্রতি সমর্থনে সহমত হয়। এক্ষেত্রে নির্বাচন হল সাধারণত বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা হল কোন কাঠামো যা কোন সমাজের মধ্যকার গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পদ্ধতিসমূহকে সংজ্ঞায়িত করে। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্রাথমিক প্রাচীন যুগে, যেখানে প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের রাজনীতি, চাণক্যর অর্থশাস্ত্র ও চাণক্য নীতি (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী), এবং কনফুসিয়াসের  লেখার ন্যায় দিগন্ত উন্মোচনকারী কাজগুলো পাওয়া যায়।

এর দ্বারা সাধারণত নাগরিক সরকারের অনুরূপ কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়, তবে অন্যান্য অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেখান মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান, সেখানেও রাজনীতি চর্চা করা হয়। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। উইলিয়াম কেরি তার বাংলা অভিধানে রাজনীতি শব্দের অর্থ করেছেন রাজন্য (the king) + নীতি (justice), অর্থাৎ রাজার ন্যায়বিচার।

হ্যারোল্ড ল্যাজওয়েলের মতে, রাজনীতি হল যে যা, যখন, যেভাবে পায় সেটাই।

ডেভিড ইস্টনের মতে, এটি হল কোন সমাজের জন্য মূল্যবান বিষয়গুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ সুষম বন্টন।

ভ্লাদিমির লেনিনের কাছে, রাজনীতি হল অর্থনীতির সবচেয়ে ঘণীভূত বহিঃপ্রকাশ।

বার্নার্ড ক্রিক দাবি করেন যে, রাজনীতি হল নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্রময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে।

আড্রিয়ান লেফ্টউইচ সংজ্ঞা দেন যে, রাজনীতি সমাজে ও সমাজসমূহের মধ্যে সমবায়, মতবিনিময় ও দ্বন্দ্বের সকল কাজের জন্ম দেয়, যার দ্বারা মানুষ তাদের জৈবিক ও সামাজিক জীবনের উৎপাদন ও প্রজননের নিমিত্তে মানবীয়, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার, উৎপাদন ও বন্টনের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে।

রাজনীতির কিছু দৃষ্টিকোণ এটিকে অভিজ্ঞতাকে ক্ষমতার অনুশীলন হিসাবে দেখেন, আবার অন্যরা এটিকে আদর্শিক ভিত্তিতে সামাজিক ক্রিয়া হিসাবে দেখেন। এই পার্থক্যকে বলা হয় রাজনৈতিক নৈতিকতাবাদ এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদ এর মধ্যে পার্থক্য। নৈতিকতাবাদীদের কাছে, রাজনীতি হল নীতিশাস্ত্রের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত বিষয় এবং অতি আদর্শ চিন্তার ক্ষেত্রে এর অবস্থান সর্বোচ্চ পর্যায়ের। উদাহরণস্বরূপ, হান্নাহ এ্যারেন্ড্টের মতে, এরিস্টোটলের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে রাজনৈতিক হওয়ার অর্থ হল সবকিছুই কথা ও যুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়।, যেখানে বার্নার্ড ক্রিকের মতে রাজনীতি হল উন্মুক্ত সমাজ পরিচালনার পন্থা। রাজনীতি হল রাজনীতি আর অন্য প্রকারের নীতিনিয়মগুলো হল অন্যকিছু।। অপরদিকে, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, থমাস হবস, এবং হ্যারল্ড ল্যাজওয়েলের ন্যায় বাস্তববাদীদের কাছে, রাজনীতির ভিত্তি হল ফলাফল বিবেচনা ছাড়াই ক্ষমতার ব্যবহার করা।

রাজনীতির ইতিহাসে এর উৎপত্তি, বিকাশ, এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতি বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।

রাজনীতির উদ্ভব মানবসভ্যতার বিকাশ এর সাথে সাথে রাজার রাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে ঘটেছে ও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে,
রাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা এবং রাজনৈতিক কলা কৌশল ও পরবর্তীকালের আধুনিক রাজনীতির শ্রেণী বিভাজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানমূলক চিন্তাধারার উত্থান ঘটিয়েছে। মেকিয়াভেলী রচিত The Prince গ্রন্থটি রাজতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়ীত্ব নিয়ে বলিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছে । রাজনীতি হলো এককথায় এক বিশেষ রাজত্ব কেন্দ্রিক নীতি বা রাজার নীতি এটি একটা বিশেষ চেতনা বা আদর্শ।

প্রারম্ভিক রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে একাধিক বিভিন্ন তত্ত্ব এবং অনুমান রয়েছে, যা শুধু কিছু জায়গায় রাষ্ট্র কেন বিকশিত হয়েছিল, অন্যান্য যায়গায় নয়, তা ব্যাখ্যা করার জন্য সরলীকরণের চেষ্টা করে। অন্যান্য পণ্ডিতরা বিশ্বাস করেন যে সরলীকরণগুলি কোন কাজে আসে না এবং প্রাথমিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিটি উদাহরণকেই আলাদাভাবে বিচার করা করা উচিত।

প্রাচীন ইতিহাসে সভ্যতার আজকের মতো নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না এবং তাদের সীমানাকে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত হিসাবে আরও সঠিকভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। প্রারম্ভিক রাজবংশীয় সুমের এবং আদি রাজবংশীয় মিশর ছিল তাদের সীমান্ত নির্ধারণ করার জন্য প্রথম সভ্যতা।  তদুপরি, বিংশ শতাব্দী অবধি, বহু লোক রাজ্যহীন সমাজে বাস করত। এগুলি তুলনামূলক সমতাবাদী গোত্র এবং উপজাতি থেকে শুরু করে জটিল এবং উচ্চ স্তরীভূত স্তরের ন্যায় দলীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

পিস অব ওয়েস্টফালিয়াকে (১৬৪৮)  রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা বলে মনে করেন, যাতে একটি দেশের আভ্যন্তরীন বিষয়ে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ বর্জনীয় বলে বিবেচিত হয়। অন্যদেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতিটি ১৮-শতকের মাঝামাঝি সুইস আইনবিদ এমার ডি ভেটেল কর্তৃক প্রবর্তিত হয়। রাষ্ট্রগুলো একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক-ব্যবস্থায় প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিতে পরিনত হয়। বলা হয়, পিস অব ওয়েস্টফালিয়া ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে অতিরাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় ইতি টানে। স্বাধীন প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের ওয়েস্টফালীয় মতাদর্শ ১৯ শতকের জাতীয়তাবাদী চিন্তা দ্বারা মদদপুষ্ট হয়, যার অধীনে বৈধ রাষ্ট্রগুলো ভাষা ও সংষ্কৃতিভিত্তিক বহুদেশীয় সমবায় সংঘগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে শুরু করে।

ইউরোপে, ১৮ শতকে ধ্রুপদী অ-জাতীয় রাজ্যগুলি ছিল বহুজাতিক সাম্রাজ্য, এরা হলঃ অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্য, ফ্রান্স রাজ্য, হাঙ্গেরি রাজ্য, রুশ সাম্রাজ্য, স্পেনীয় সাম্রাজ্য, উসমানীয় সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।  এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকাতেও এ জাতীয় সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল। মুসলিম বিশ্বে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরপরই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা বহু-জাতিগত রুপান্তরিত-জাতীয় সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। বহুজাতিক সাম্রাজ্য ছিল এক রাজা, সম্রাট বা সুলতান দ্বারা শাসিত নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র। জনগণ ছিল বহু নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, এবং তারা অনেক ভাষায় কথা বলতো। সাম্রাজ্যের একটি জাতিগত গোষ্ঠী দ্বারা আধিপত্য ছিল, এবং তাদের ভাষা সাধারণত জনপ্রশাসনের ভাষা ছিল। ক্ষমতাসীন রাজবংশ সাধারণত এই গোষ্ঠীর থেকেই ছিল, তবে সবসময় নয়। কিছু ছোট ইউরোপীয় রাজ্য জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় ছিল না, তবে রাজপরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাজবংশীয় রাষ্ট্রও ছিল। কয়েকটি ছোট রাষ্ট্র বেঁচে গিয়েছিল, যেমন লিচটেনস্টাইন, আন্ডোরা, মোনাকো এবং সান মেরিনো প্রজাতন্ত্রের স্বতন্ত্র রাজত্ব।

আন্তঃসরকারী সংস্থা এবং বহুরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধতার মাধ্যমে বিশ শতকে রাজনৈতিক বিশ্বায়নের সূচনা হয়েছিল। লীগ অব নেশনস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটি জাতিসংঘ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আঞ্চলিক সংহতকরণের উদ্দেশ্যে তৈরি হয় আফ্রিকান ইউনিয়ন, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মারকোসু। আন্তর্জাতিক স্তরের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

সমাজবিজ্ঞানের যে শাখায় রাজনীতি রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয় তাকে রাজনীতিবিজ্ঞান (পলিটিকাল সায়েন্স) বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে। এরিস্টটল উক্ত বিজ্ঞানকে রাষ্ট্র সম্পর্কীয় বিজ্ঞান নামে উল্লেখ করেছেন। এতে তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক দর্শন, জনপ্রশাসন, জননীতি এবং রাজনৈতিক পদ্ধতি সহ অসংখ্য উপক্ষেত্র রয়েছে। তদুপরি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান অর্থনীতি, আইন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, মনোবিজ্ঞান বা মনোচিকিৎসা, নৃবিজ্ঞান, এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এবং নির্ভরশীল।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থার দ্বারা সরকারের দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। 
একে সাধারণত আইন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। ডেভিড ইস্টনের মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কোন সমাজের জন্য মূল্যবোধসমূহকে কর্তৃত্বপূর্ণ পন্থায় বরাদ্দকারী মিথষ্ক্রিয়ারূপে গণ্য করা যেতে পারে। প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাই কোন একটি সমাজের অংশ যার নিজস্ব রাজনৈতিক সংষ্কৃতি আছে, এবং ফলশ্রুতিতে তারা সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যস্থ মিথষ্ক্রিয়া হল বৈশ্বিক রাজনীতির ভিত্তি।

সরকার হলো কোনো দেশের সর্বোচ্চ সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ যার মাধ্যমে দেশটির শাসন কার্য পরিচালিত হয়। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের নিরাপত্তা বিধান করা, সমাজের শান্তি বজায় রাখা, মানুষের জান-মাল রক্ষা করা এবং বিবাদের ক্ষেত্রে বিচারকার্য পরিচালনা করা। সরকার তার ওপর আরোপিত দায়িত্বসমূহ পালনের স্বার্থে রাজস্ব আহরণ করে এবং শাসনকার্য পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তা ব্যয় করে থাকে।

ক্ষমতার উৎসের ভিত্তিতে সরকারে প্রকারভেদ নিম্নে বর্নিত হলঃ

রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। যদিও একথা ঠিক যে রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা পাওয়া না পাওয়া বহুলাংশে নির্ভর করে, রাষ্ট্র হিসেবে তার উপর প্রভাব রাখা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির উপর।

সংবিধান কোন শাসনব্যবস্থার মূল গ্রন্থ যাতে স্বায়ত্তশাসিত কোন রাজনৈতিক সত্তার কর্তব্য নির্ধারণের মৌলিক নিয়ম ও সূত্রসমূহ লিপিবদ্ধ থাকে। কোন দেশের ক্ষেত্রে এই শব্দ সেই দেশের জাতীয় সংবিধানকে বোঝায় যা রাজনৈতিক মৌলিক নিয়ম ও সরকারের পরিকাঠামো, পদ্ধতি, ক্ষমতা ও কর্তব্যকে প্রতিস্তাপিত করে। সংবিধান দুই ধরনের হতে পারে এক,লিখিত দুই, অলিখিত ৷

সংস্কৃতি কীভাবে রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে, তার বিবরণ দেয় রাজনৈতিক সংষ্কৃতি। প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংষ্কৃতির অন্তর্গত বিষয়।  লুসিয়ান পাইয়ের সংজ্ঞা হল রাজনৈতিক সংস্কৃতি হল মনোভাব, বিশ্বাস এবং অনুভূতিগুলির সমষ্টি, যা একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এবং অর্থ দেয় এবং যা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এমন অন্তর্নিহিত ধারণা এবং নীতি সরবরাহ করে।

আস্থা হল রাজনৈতিক সংষ্কৃতিতে একটি মুখ্য উপাদান, কারণ এর মাত্রাই রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতা নির্ধারণ করে। উত্তর-বস্তুবাদ হল এমন একটি পর্যায়, যেখানে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন বিষয়গুলির সাথে সম্পর্কিত যা মানবাধিকার এবং পরিবেশবাদের মত তাৎক্ষণিক শারীরিক বা বৈষয়িক উদ্বেগের বিষয় নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধর্মেরও প্রভাব রয়েছে।

রাজনৈতিক নেতারা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য প্রায়শই বিভিন্ন অনৈতিক ও অমানবিক পথ অবলম্বন করে এবং এতে তাদের আপত্তি বা সংকোচ হয় না। মানুষ হত্যা,নারীদের যৌন নির্যাতন এবং কোন সমস্যা তৈরি করতে তারা সক্রিয় হয় এবং এর জন্য সমাজের অনেক ক্ষতি হয়।

বিশ্ব রাজনীতি বলতে বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাবলির একটি বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক চিত্রকে বোঝায় যেখানে কেবলমাত্র বিশ্ব পর্যায় নয়, বরং বৈশ্বিক, জাতীয়, আঞ্চলিক, ইত্যাদি সমস্ত স্তরের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও তাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব রাজনীতির গবেষণা তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গবেষণা অপেক্ষা ভিন্ন একটি ক্ষেত্র, এবং এগুলি একে অপরের পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিগত দশকগুলিতে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সনাতনি রাষ্ট্র ও জাতীয় সরকারগুলির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন নতুন অংশগ্রহণকারীর আবির্ভাব ঘটেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তঃসংযুক্ততা ও আন্তঃনির্ভরশীলতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে সর্বত্র সমভাবে নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৈরাজ্যমূলক পরিস্থিতিকে প্রতিস্থাপন করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সুশাসনের একটি পরিকাঠামোর উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য পর্যায়ে যে জটিল আন্তঃসংযুক্ততার জালিকাব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে, সেই ব্যাপারটিকে বিশ্বায়ন নাম দেওয়া হয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের যেকোনও স্থানের মানুষের দৈনন্দিন জীবন বহুদূরে অবস্থিত ঘটনাবলি বা গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্বারা উত্তরোত্তর প্রভাবিত হচ্ছে। বিশ্বায়নকে মূলত অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন, সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন ও রাজনৈতিক বিশ্বায়ন - এই তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করে আলোচনা করা হয়। তবে বিশ্বায়ন বলে আদৌ কিছু আছে কি না, থাকলেও কোনও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কি না এবং বিশ্ব রাজনীতির রূপান্তরে এর ভূমিকা কতটুকু - এসব ব্যাপারে প্রচুর বিতর্ক বিদ্যমান।

বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে দুইটি মূলধারার দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান-- বাস্তববাদ ও উদারপন্থীবাদ। দুইটিতেই বিশ্বায়নকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় এবং রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্কের মধ্যে সংঘাত ও সহযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করা হয়, যদিও উক্ত ভারসাম্যের প্রকৃতি সম্পর্কে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। মূলধারার বিপরীতে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা তত্ত্বসম্ভারও বিদ্যমান। এগুলিতে বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে বিরাজমান স্থিতাবস্থার (status quo)-র নেতিবাচক সমালোচনা করা হয় এবং এই ব্যবস্থাতে প্রান্তিক বা নিপীড়িত দলগুলির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়।

মধ্যবর্তী রাজনীতিতে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরের মাধ্যমিক অবকাঠামোসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়, যেমন জাতীয় রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনসমূহ।

একটি রাজনৈতিক দল হল একটি রাজনৈতিক সংগঠন  যা সাধারণত রাজনৈতিক প্রচারণা, শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম অথবা আন্দোলনমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সরকারি রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ হাসিল করতে চায়। দলগুলো প্রায়ই নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্বলিত কোন লিখিত কর্মপন্থা দ্বারা সমর্থিত কোন প্রকাশ্য মতাদর্শ বা দর্শনের পক্ষাবলম্বন করে।

কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যস্থ রাজনৈতিক দলগুলো একত্রে দলীয় ব্যবস্থা তৈরি করে। এটি হতে পারে কোন বহুদলীয় ব্যবস্থা, একটি দুই দলীয় ব্যবস্থা, একটি কেন্দ্রীয় দল ব্যবস্থা অথবা একটি একদলীয় ব্যবস্থা, যা দলের সংখ্যার মাত্রার উপর নির্ভর করে। এটি এর নির্বাচনী ব্যবস্থা সহ সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয়। ডুবার্গারের নীতি অনুযায়ী, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ব্যবস্থা সাধারণত দুই দলীয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়, অপরদিকে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় বহুদলীয় ব্যবস্থা তৈরীর সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ক্ষুদ্র রাজনীতি বা মাইক্রোপলিটিক্স দ্বারা রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝে স্বতন্ত্র কর্মীদের কাজকর্মকে বোঝানো হয়। একে প্রায়শই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়।  উক্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিভিন্ন রকমের পারে, যেমন:

গণতন্ত্র বলতে কোনও জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনও সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরীর ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সু্যোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। গণতন্ত্র পরিভাষাটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হলেও অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হতে পারে, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

রাজনৈতিক তত্ববিদদের মতে বর্তমানে তিনটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক মতবাদ আছে। এগুলো হলঃ সামষ্টিক গণতন্ত্র, সুচিন্তিত গণতন্ত্র ও মৌলবাদী গণতন্ত্র।

বামপন্থী রাজনীতি হচ্ছে সেই রাজনৈতিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ড যা সামাজিক অসাম্য ও সামাজিক ক্রমাধিকারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সামাজিক সাম্যকে গ্রহণ বা সমর্থন করে। এই রাজনীতি বিশেষভাবে জড়িত থাকে সমাজে যারা অন্যের তুলনায় কম পায় বা সুযোগহীন থাকে তাদের ব্যাপারে এবং পূর্বধারনা করে যে অসাম্যের অবিচার কমানো বা বিলুপ্ত করা উচিত।

রাজনীতিতে ডানপন্থা বা ডানপন্থী বিশেষণগুলো ব্যবহৃত হয় এমন মতাদর্শের ক্ষেত্রে, যা মানুষের অর্থনৈতিক বা ঐতিহ্যগত বা সামাজিক শ্রেণীগত বিভেদ বা ধাপবিন্যাসকে সমর্থন করে। ভিন্ন ভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দল বিভিন্ন মাত্রায় বামপন্থী রাজনীতি সমর্থিত সাম্যবাদের বিরোধিতা করে থাকে, এবং সার্বিক সাম্য চাপিয়ে দেওয়াকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে থাকে।

রক্ষণশীলতাবাদ হল দ্রুত পরিবর্তনের বিরোধিতা, এবং এটি সমাজে ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে। গ্র্যাজুয়ালিজম বা পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনবাদ এর একটি প্রকরণ।

উদারপন্থী মতবাদ সাম্য ও মুক্তির উপর নির্ভর করে সৃষ্ট একধরনের বৈশ্বিক রাজনৈতিক দর্শন। এ দুইটি নীতির উপর ভিত্তি করে উদারতাবাদকে অনেক বিস্তৃত আকার দেওয়া হয়েছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, জনগণের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মুক্তবাণিজ্য, ব্যক্তিগত মালিকানা প্রভৃতি ধারণার উদ্ভব ঘটেছে এ দর্শনের উপর ভিত্তি করে।




#Article 115: মনোবিজ্ঞান (738 words)


মনোবিজ্ঞান বা মনস্তত্ত্ববিদ্যা হল , মানসিক প্রক্রিয়া ও আচরণ সম্পর্কিত বিদ্যা ও অধ্যয়ন। এটি বিজ্ঞানের একটি তাত্ত্বিক ও ফলিত শাখা যাতে মানসিক কর্মপ্রক্রিয়া ও আচরণসমূহ নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করা হয়। বিভিন্ন বিজ্ঞানী মনোবিজ্ঞানকে মানুষ এবং প্রানী আচরণের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আবার অনেক বিজ্ঞানী একে সংজ্ঞায়িত করেছেন আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান হিসেবে।।

মনোবিজ্ঞান মূলত মানুষের সাথে সম্পর্কিত, তবে অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হয়। মনোবিজ্ঞানকে সম্পূর্ণভাবে অধ্যয়ন করা কঠিন হওয়ার কারণে, মনোবিজ্ঞানীগণ প্রায়শই বিভিন্ন সময়ে এর বিভিন্ন অংশের দিকে নজর দেন। বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যোগসূত্র রয়েছে। এর কিছু ক্ষেত্র হল মেডিসিন, উআচরণবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, এবং ভাষাবিজ্ঞান।

মনোবিজ্ঞানের কর্মক্ষেত্রে, একজন পেশাগত প্রশিক্ষণার্থী বা গবেষককে মনোবিজ্ঞানী এবং সামাজিক, আচরণিক ও চেতনাবিজ্ঞানী বলে ডাকা হয়। মনোবিজ্ঞানী ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে মানসিক কর্মপ্রক্রিয়ার ভূমিকাকে বোঝার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তারা চেতনাগত প্রক্রিয়া ও আচরণের পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়াকেও অনুসন্ধান করেন।

উনিশ শতকের আগে মন সম্পর্কীয় সকল অধ্যয়ন দর্শনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দার্শনিকগণ মানসিক আচার-আচরণ বা ক্রিয়া-কলাপ সম্পর্কে কেবল অনুমান করেছিলেন। মন সম্পর্কে গ্রীক দার্শনিক প্লেটো সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা করেন। তিনি মনকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসাবে গণ্য করেন। আধুনিক যুগে স্নায়ুবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে মনোবিজ্ঞানেরও নব বিকাশ ঘটে ও আধুনিক বিজ্ঞানের এক অন্যতম শাখা হিসাবে মনোবিজ্ঞানের বিকাশ আরম্ভ হয়। স্নায়ুবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানের মধ্যেই যে মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক ভিত্তি নিহিত হয়ে আছে সেই কথা সর্বপ্রথম বলেন জার্মান শরীর বিজ্ঞানী জোহানেস পিটার মুলার। অবশ্য মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারটি করেছিলেন আরেকজন জার্মান বিজ্ঞানী হারমেন ভন হেল্মল্টজ্। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী টমাস ইয়ঙের প্রস্তাবিত রং সংক্রান্ত নীতি নিয়ে গবেষণা করে তিনি ইয়ং-হেল্মল্টজ্ সূত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সূত্র দ্বারা তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনটে বিভিন্ন রঙের (সবুজ, নীল ও লাল) অনুভূতির সৃষ্টি হয় মানুষের চোখের রেটিনার সাথে সংযুক্ত তিন ধরনের স্নায়ুর কর্ম-তৎপরতার ফলে। এরপর পরবর্তী আধুনিক মনোবিজ্ঞান একের পর আরেক আমাদের মন সম্পর্কীয় রহস্য উদঘাটন করে এর জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।

আচরণবাদের জন্ম হয়েছিল বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। আচরণবাদের মুখ্য প্রবক্তা ছিলেন জন বি.ওয়াটসন এবং বি. এফ. স্কীনার। এছাড়া, রাশিয়ার আইভান পাভলভ, বেখটার্ভ ইত্যাদি মনোবিজ্ঞানী আচরণবাদ নিয়ে বহু উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। আচরণবাদীদের মতে, প্রাণীর উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর কার্যই হল আচরণ; এবং যে তত্ত্বের সহায়তায় এই আচরণের অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করা হয় তাই হল আচরণবাদ।

আচরণবাদী মানুষেরা কাশি, হাঁচি ইত্যাদি সাধারণ শারীরিক কার্যের থেকে আরম্ভ করে মানুষের উচ্চতম বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চা পর্যন্ত সকল কাজই উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একপ্রকারের সংযোগ স্থাপন করে বলে বিশ্বাস করেন। আচরণবাদের দরুন ওয়াটসন মনোবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন জোয়ার আনেন। তিনি মানুষ ও জীবজন্তুর আচরণকে এক জড়বাদী অছিলা হিসাবে মনোবিজ্ঞানের জগতে নিয়ে আসেন।

বিংশ শতকের শুরুতেই সমগ্র বিশ্বকে আন্দোলিত করা একটি তত্ত্ব হল মনোবিশ্লেষণ বা মনঃসমীক্ষণ। এই তত্ত্বের প্রভাবেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংযোজিত হয়েছিল এক নতুন শাখা; সেটি হল চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বা মনোরোগ বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞানের জনক ছিলেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের শারীরবিজ্ঞানী ডাঃ সিগমুন্ড ফ্রয়েড। ফ্রয়েডের পরে মনোবিশ্লষণের জগতে অবদান রেখে যাওয়া কয়েকজন জগতবিখ্যাত মনোবিদের ভিতর কার্ল গুষ্টাভ য়ুং, আলফ্রেড এডলার, এরিক এরিকসন উল্লেখযোগ্য। এই তত্ত্ব কেবল মনোবিজ্ঞানের জগতকেই প্রভাবিত করে ক্ষান্ত থাকেনি, এটি মানুষের মন, সমাজ, সাহিত্য, জীবনাদর্শের ওপরেও গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। মানুষ নামক প্রাণীটির সম্পর্কে এই তত্ত্বই মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। এই তত্ত্বই আমাদেরকে নতুন করে শেখায় যে মানুষ অমৃতের সন্তান নয়, এমনকি আগেকার পণ্ডিতদের ভাবনা-চিন্তা অনুযায়ী মানুষ যুক্তিবাদী প্রাণীও নয়। মানুষ আসলে কিছু জৈবিক প্রবৃত্তি ও আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়; এবং সবচেয়ে জরুরি কথাটি হল দূর-দূরান্তের গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে জানলেও মানুষ কিন্তু বেশিরভাগ নিজের বিষয়েই অন্ধ হয়ে থাকে। মনোবিশ্লেষণ মানুষের মনোজগতের বহু গোপন রহস্য আমাদের কাছে তুলে ধরেছিল। মানুষের মন সম্পর্কে আবিষ্কৃত এই অপ্রিয় কিন্তু সত্যি শোনানো কথাগুলি সেই সময়ের বহু লোক মেনে নিতে পারেনি, যদিও এমনসব কথাই জীবন সম্পর্কে উৎসুক নবপ্রজন্মকে উল্লসিতও করেছিল। যদিও মনোবিশ্লেষণবাদ প্রয়োগিক ক্ষেত্রে সফল ও সর্বগ্রহণযোগ্য, তবুও একে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করতে অনেক যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা চলে আসে। এককথায় বলতে গেলে মনোবিশ্লেষণ বা ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান মানুষের অবচেতন মনের এক দার্শনিক অনুমানভিত্তিক অধ্যয়ন। মানসিক রোগ নিরাময়, মনের অস্বাভাবিক ভাব-অনুভূতির বিশ্লেষণ, স্বপ্ন বিশ্লেষণ, নারী ও শিশুমনের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ আজও প্রভাবশালী ও অপ্রতিদ্বন্দী।

১৯৫৫ সালে প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানীত্রয় - ভিক্টোরিয়া মেডভেক, স্কট ম্যাদে এবং থমাস গিলোভিচ আধুনিক অলিম্পিক ক্রীড়ায় বিপরীতধর্মী চিন্তা-ভাবনা সম্বলিত প্রতিক্রিয়া গবেষণা আকারে তুলে ধরেন। তারা দেখিয়েছেন, যে সকল প্রতিযোগী ব্রোঞ্জপদক জয় করে তারা রৌপ্যপদক জয়ী ক্রীড়াবিদের তুলনায় অধিকতর সুখী। রৌপ্যপদক জয়ী ক্রীড়াবিদ মানসিক অবসাদগ্রস্ততায় ভোগেন, কেননা তারা অল্পের জন্য স্বর্ণপদক প্রাপ্তি থেকে নিজেকে বিচ্যুত করেছেন। সে তুলনায় ব্রোঞ্জপদক জয়ী খেলোয়াড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে কমপক্ষে একটি পদক জয়ে সক্ষমতা ও পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। চতুর্থ স্থান অধিকারী প্রতিযোগীকে সাধারণত কোন পদক দেয়া হয় না। নক-আউটভিত্তিক প্রতিযোগিতা হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে পুণরায় ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণ করে ব্রোঞ্জপদক অর্জন করতে হয়। চূড়ান্ত খেলায় পরাজিত হবার প্রেক্ষাপটে পরাজিত দলকে রৌপ্যপদক প্রদান করা হয়।




#Article 116: মহাশূন্য (530 words)


মহাশূণ্য অথবা মহাকাশ বলতে সাধারণভাবে মাথার উপরকার অনন্ত আকাশ বোঝানো হলেও বস্তুত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলসমৃদ্ধ আকাশকে পৃথিবীর আকাশ বলা হয়। তাই পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে মহাকাশ হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরের অনন্ত স্থান। এ আকাশসীমায় অতি অল্প ঘনত্বের বস্তু বিদ্যমান। অর্থাৎ শূন্য মহাশূন্য পুরোপুরি ফাঁকা নয়। প্রধানত, অতি অল্প পরিমাণ হাইড্রোজেন প্লাজমা, তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং নিউট্রিনো এই শূন্যে অবস্থান করে। তাত্ত্বিকভাবে, এতে কৃষ্ণবস্তু এবং কৃষ্ণশক্তি বিদ্যমান।মহাশূন্য এমন অনেক কিছু আছে যা মানুষ এখনও কল্পনা করতে পারেনি।

বাংলায় নভঃ, ব্যোম ইত্যাদি শব্দেও মহাকাশকে সূচিত করা হয়।

মহাশূন্য সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষের কৌতূহলের বিষয়। প্রত্যেক সভ্যতা ও মানুষ সবসময় মহাকাশকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে দেখেছে। প্রাচীন সভ্যতা সমূহ ও মানুষেরা মহাশূন্যের ব্যাপারে নানা কাল্পনিক ব্যাখ্যা দিত। যথাঃ হাতির উপর উল্টানো থালা, বিশাল চাদর, পবিত্র আত্মা ও দেবতাদের বাসস্থান ইত্যাদি। প্রাচীন গ্রিক, রোমান, মিশরীও, বেবিলনীয়, ভারতীয়, চীনা, মায়া ইত্যাদি সভ্যতা মহাশূন্যকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু সকল সভ্যতাই মহাকাশকে বিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে কম-বেশি গ্রহণ করেছিলো।

প্রাচীনকালের মহাকাশ আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ

প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করেছে। প্রাচীন গ্রীসে মহাকাশ কে দর্শনশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তারা নক্ষত্র সমূহকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে নানা রুপ দিয়েছিল এবং এগুলোর অধিকাংশের নাম গ্রিক ও রোমান দেবতাদের নামে রাখা হয়। যা এখনও বিজ্ঞানী ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারীদের নানা ভাবে সাহায্য করছে। চাঁদ এবং খালি চোখে দৃশ্যমান গ্রহগুলোর গতিপথও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন গ্রিক ও অন্যান্য সভ্যতা সমূহ এর মাধ্যমে রাশিচক্র আবিষ্কার করে। নক্ষত্র, চাঁদ, ধুমকেতু ইত্যাদি প্রাচীনকাল থেকে পর্যবেক্ষণ করে আসছে মানুষ। ঋতুর পরিবর্তন, দিন-রাত, নক্ষত্রের স্থান পরিবর্তন (পরবর্তীতে যা গ্রহ প্রমাণিত হয়) ইত্যাদির হিসাব ও গাণিতিক ব্যাখ্যার সাহায্যে সুপ্রাচীনকাল ও প্রাচীনকালে অনেক সমৃদ্ধি লাভ করে।

মধ্যযুগের মহাকাশ আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ

মধ্যযুগে দূরবীক্ষণ যন্ত্রর আবিষ্কারের ফলে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। হান্স লিপারশে (Hans Lippershey) এবং জাকারিয়াস জেন্সেন (Zacharias Janssen) এর নির্মিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র আরও উন্নত করে তুলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। গ্যালিলি তার দুরবিনের মাধ্যমে বৃহস্পতি গ্রহর উপগ্রহ এবং শনি গ্রহর বলয় পর্যবেক্ষণ করতেপেরেছিলেন। ১৬১১ সালে ইয়োহানেস কেপলার একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র নির্মাণ করেন যা দ্বারা জ্যোতির্বিজ্ঞানএ নতুন যুগের সূচনা হয়। এ সময় বুধগ্রহ, শুক্রগ্রহ, মঙ্গলগ্রহ, বৃহস্পতিগ্রহ, শনিগ্রহ সহ অগণিত নক্ষত্র ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ এবং আবিষ্কার করা হয়। মধ্যযুগের শেষ পর্যায় ইউরেনাস গ্রহ, নেপচুন গ্রহ, প্লুটো গ্রহ আরও অনেক নক্ষত্র ও ধূমকেতু আবিষ্কার, পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করা হয়।

মধ্যযুগের শেষ পর্যায় পদার্থ, রাসায়ন ও গণিত ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হয় জ্যোতিষশাস্ত্রে। মহাজাগতিক বস্তুর গঠন, আকার-আকৃতি, বায়ু মণ্ডল (গ্যাসীয় পদার্থ সমূহ), কক্ষ পথ, আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি ইত্যাদি নির্ণয়র জন্য এসব শাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে শুধু গণিতশাস্ত্র ব্যবহার হত।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (মহাকাশ আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ)

১৯৬৯ খ্রীস্টাব্দের ১৬ই জুলাই জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ আবিষ্কারের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অভিযান, প্রথম মনুষ্যবাহী মহাকাশযান অ্যাপোলো ১১, যা ২০ জুলাই চাঁদে অবতরণ করে। এই অভিযানে অংশনেন দলপ্রধান নীল আর্মস্ট্রং, চালক মাইকেল কলিন্স, এডুইন অল্ড্রিন জুনিয়র এবং কমান্ড মডিউল। পরবর্তীতে আবিষ্কার হয়েছে প্লুটো সহ অন্যান্য বামন গ্রহ, নেহারিকা, ধূমকেতু, কৃষ্ণগহ্বর।বিজ্ঞান ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী কৃত্রিম উপগ্রহ, দূরবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি। যথাঃ হাবল টেলিস্কোপ। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান মহাবিশ্বকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর কারণে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। তাদের মধ্যে স্টিফেন হকিং (Stephen Hawking) জাম কেনন (Annie Jump Cannon), মারিয়া মিশেল (Maria Mitchell), সি.ডব্লীউ থমবারগ(C.W. Tombaugh) হানরিটা সোয়ান লেভিট (Henrietta Swan Leavitt) প্রমুখ।

প্রাথমিক বিবেচনায় মহাকাশূন্যে পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ রয়েছে। তবে বিশদ বিবেচনায় মহাকাশূন্যের উপাদানসমূহ হলো:




#Article 117: ব্যবসা (150 words)


অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় ব্যাবসায় এক ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড (বিজ্ঞান) যেখানে নির্দিষ্ট সৃষ্টিশীল ও উৎপাদনীয় লক্ষ্যকে সামনে রেখে বৈধভাবে সম্পদ উপার্জন বা লাভের উদ্দেশ্যে লোকজনকে সংগঠিত করা হয় ও তাদের উৎপাদনীয় কর্মকাণ্ড রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ব্যক্তির মুনাফা পাওয়ার আশায় পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম উৎপাদনের মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি এবং মানুষের বস্তুগত ও অবস্তুগত অভাব পূরণের লক্ষ্যে সেগুলো বণ্টন এবং এর সহায়ক সবরকম বৈধ, ঝুঁকিবহুল ও ধারাবাহিক কার্যকে ব্যাবসা বলে।

আইনানুসারে, ব্যাবসা বলতে সেই সংগঠনকে বুঝায়, যা অর্থের বিনিময়ে ভোক্তাকে পণ্য বা সেবা কিংবা, দুটো সুবিধাই প্রদান করে। পুঁজিবাদ অর্থনীতিতে ব্যবসায় লণীয়ভাবে বিদ্যমান এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখানে প্রায়, সব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত হয়, যা গঠন করা হয় মূলত মুনাফা অর্জন করে মালিকের পুঁজি বৃদ্ধির জন্যে। ব্যবসায় মুনাফার জন্য ব্যক্তি মালিকানার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গুলোর মালিক বা পরিচালকবৃন্দের মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হলো, ঝুঁকি গ্রহণ ও কার্যের বিপরীতে বিনিয়োগকৃত পুঁজি ফেরত পাওয়া। মুনাফাবিহীন বা রাষ্ট্র মালিকানার অধীনেও ব্যবসায় করা যায়।

ব্যবসায় মূলত চার ধরনের হয়:




#Article 118: যোগাযোগ (430 words)


যোগাযোগ হল  আদান প্রদানের উপায়। মানুষ  থেকে মানুষ বা যন্ত্র  থেকে যন্ত্রে তথ্য   আদান প্রদান হতে পারে।

মাধ্যম-ও তথ্য

হতে পারে তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ বা রেডিও-ওয়েভ

এছাড়াও যোগাযোগের মাধ্যমে মনের ভাব আদান প্রদান করা হয়। যোগাযোগ করার জন্য যে ধরনে মিডিয়া ব্যবহার করা হয় তা নিচে দেওয়া হলঃ

যোগাযোগ ভার হতে পারে কথ্য বা অ কথ্য। অনেকসময় অনেক ভাবে যোগাযোগ হয়। শুধু প্রাণী জগতে মানুষেরা যোগাযোগ করেনা। প্রতেক্য পশু পাখি যোগাযোগ করতে পারে।

যোগাযোগ বলতে অনেকেই কথা বলা বা দেখা করাকে বুঝে থাকি। যদি বই থেকে উদৃতি দিতে চাই, তাহলে মনের ভাব প্রকাশের জন্য অন্যের কাছে বার্তার আদান প্রদানকে যোগাযোগের প্রাথমিক পরিচয় হিসেবে বলা যায়।কিন্তু এর বাহিরেও একটু মজার আলাপ রেয়েছে। চলুন দেখে নেয়া যাক,

প্রচলিত ধারণামতে মানুষ শুধু কথা বলেই যোগাযোগ করতে পারে বলে জেনে এসেছি। আসলে কথা না বলেই আমরা সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগ করে থাকি।

যোগাযোগ শুধু কথা বলার মত সাংকেতিক মাধ্যমে সিমাবদ্ধ নয়।কথা বলা শুধু একটি মাধ্যম মাত্র। যোগাযোগ বাস্তবায়ন হওয়ার জন্য বিপরীত দিকে অবস্থিত মানুষটির ফিডব্যাকই যথেষ্ট। এই ফিডব্যাক কথার মাধ্যমেও হতে পারে অথবা যোগাযোগকৃতদের মাঝে প্রচলিত সিম্বল দিয়েও হতে পারে। যেমন একজন ছেলে আরেকজন মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মাঝে কথা না হলেও অনুভূতির আদানপ্রদান পর্যায়ক্রমিকভাবে ঘটেই চলেছে কিন্ত।

মোবাইলগুলো টাওয়ারের সাথে যুক্ত থাকতে সবসময় নেটওয়ার্ক বাউন্ডারি বানিয়ে রাখে। আশেপাশের টাওয়ারগুলোর সাথে নিজে নিজে যুক্ত হয়ে যায়। 

মানুষের যোগাযোগ সিষ্টেমটাও ঠিক এরকমি। মানুষ সার্বক্ষণিক একটি নেটওয়ার্ক জালের মাঝে বিচরণ করে আর নিজের অজান্তেই বিপরীত দিকের মানুষগুলোর সাথে যোগাযোগ করে থাকে।

গ্রামের রাস্থা দিয়ে হেটে গেলে বলতে হয়না যে আমি শহর থেকে এসেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে যে তরঙ্গের মত বার্তাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে এটাই এর কারণ।

আমারা প্রচিত ধারণায় শুধু কথা বলেই যোগাযোগ রক্ষা করা যায় বলে জেনে এসেছি। কিন্তু কথা না বলেও যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। আর এই সকল যোগাযোগই একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের জন্য হয়ে থাকে। ছোটভাবে বলতে গেলে, যোগাযোগ শুরুই হয় একটি নিদৃষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। এই উদ্দেশ্যগুলো হতে পারে নিজের অবস্থান বা উপস্থিতি প্রকাশের জন্য।

তবে যোগাযোগের মৌলিক উদ্দেশ্য বিপরীত দিকের (যোগাযোগককৃত) মানুষের বুঝতে পারা। এছাড়াও যোগাযোগের মাধ্যমে চিন্তাধারা, অনুভূতি, এবং জানার পরিধিরর পরিবর্তন করা যায়।

আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চক্রে সকল যোগাযোগ আবার সফল হয় না। একটি সফল যোগাযোগের জন্য বিপরীত দিকে অবস্থিত ব্যক্তির ফিডব্যাক আবশ্যক। কারণ যোগাযোগ হলো ভাবের আদান প্রোদান। বিপরীত দিক থেকে ফিডব্যাক ছাড়া এই যোগাযোগ সম্ভব নয়। তবে এই ফিডব্যাক শুধুমাত্র বিপরীত দিকের ব্যক্তির বুঝতে পারার মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে পারে।

যোগাযোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর এই চলমান প্রক্রিয়াকে নিয়মিত করতে সিম্বল ব্যবহার করা হয়। যেমন ভাষা, লেখা,অঅঙ্গভঙ্গি এগুলো প্রচলিত সিম্বল। তবে এই সিম্বল আমাদের সামাজিক অবস্থান, চলাফেরা, এলাকাভেদে আলাদা আলাদা অর্থ বহন করতে পারে।যেমন একই সিম্বল এলাকার ভিন্নতার কারণে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে। একটা কথা প্রচলিত আছে, এক দেশের বুলি আরেক দেশের গালি।




#Article 119: সরকার (194 words)


 
সরকার বা শাসনব্যবস্থা (ইং: Government) হলো কোনো দেশের সর্বোচ্চ সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ যার মাধ্যমে দেশটির শাসন কার্য পরিচালিত হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি যেমন সংসদ সদস্যদের দ্বারা গঠিত হয়। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের নিরাপত্তা বিধান করা, সমাজের শান্তি বজায় রাখা, মানুষের জান-মাল রক্ষা করা এবং বিবাদের ক্ষেত্রে বিচারকার্য পরিচালনা করা। সরকার তার ওপর আরোপিত দায়িত্বসমূহ পালনের স্বার্থে রাজস্ব আহরণ করে এবং শাসনকার্য পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তা ব্যয় করে থাকে। 
 
সাধারণত সরকার শব্দটির দ্বারা একটি সাধারণ সরকার বা সার্বভৌম রাষ্ট্রকে বোঝায়। সরকার স্থানীয়, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক হতে পারে। যদিও বাণিজ্যিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয়, বা অন্যান্য বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলিও নিজস্ব পরিচালন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শাসিত হয়। এই জাতীয় কর্তৃপক্ষ বোর্ড অফ ডিরেক্টর, ম্যানেজ‍ার, গভর্নর নামে পরিচিত; এগুলিকে প্রশাসন (যেমন বিদ্যালয় প্রশাসন) বা কাউন্সিল অফ এল্ডার্স (যেমন খ্রিষ্টান চার্চে) নামেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সরকারের আকার অঞ্চল বা উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়।

সংগঠনের আয়তন বৃদ্ধি হলে সরকারের জটিলতাও বাড়ে। তাই ছোটো শহর বা ছোটো-মাঝারি বেসরকারি সংস্থাগুলিতে আধিকারিকের সংখ্যা বড়ো বড়ো বহুজাতিক কর্পোরেশনের তুলনায় কম রাখা হয়। বড়ো সংস্থায় বহুমুখী দপ্তর ব্যবস্থা ও প্রশাসনের ক্রমপর্যায়ে লক্ষিত হয়। জটিলতা বাড়লে সরকারের কাজ-কর্মের প্রকৃতিও জটিল হয়ে পড়ে। তাই আনুষ্ঠানিক নীতি ও কার্যপদ্ধতি ঘোষণারও প্রয়োজন হয়।




#Article 120: রাষ্ট্র (2124 words)


রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। যদিও একথা ঠিক যে রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা পাওয়া না পাওয়া বহুলাংশে নির্ভর করে, রাষ্ট্র হিসেবে তার উপর প্রভাব রাখা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির উপর। 
 
ম্যাক্স ওয়েবারের প্রভাববিস্তারী সঙ্গানুযায়ী রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আইনানুগ বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাদের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্রবাহিনী, নাগরিক, সমাজ, আমলাতন্ত্র, আদালত এবং আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়ে মতভিন্নতার কারণে তাত্ত্বিক মহলে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে যে ঠিক কিভাবে একটি “সার্থক রাষ্ট্র” এর অভ্যুদয়কে সমর্থন করা যেতে পারে।

ব্যাপকার্থে সরকার বা প্রাচীন-আধুনিক সব অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানকেই রাষ্ট্র প্রত্যয়টির অংশ হিসেবে ধরা হয়। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যাদের সমন্বিত পদ্ধতির অংশ হয়ে ওঠাটা প্রথম স্পষ্টভাবে দেখা যায় ১৫ শতক নাগাদ। আর ঠিক সেসময়ই রাষ্ট্র প্রত্যয়টি তার আধুনিক অর্থ পরিগ্রহ করে। তাই রাষ্ট্র প্রত্যয়টি প্রায়ই নির্দিষ্ট করে শুধু আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় থাকলেও তারা সম্পূর্ণভাবে সার্বভৌম নয়। এদের কর্তৃত্বের সীমা সেই সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে যা একই সাথে আংশিক বা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সমান সার্বভৌমত্ব থাকা সংশ্লিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রটির রূপরেখা নির্ধারণ করে। রাষ্ট্র কাঠামোর রূপ বিভিন্ন স্তরে বিভিন্নভাবে সংগঠিত হতে পারে, যেমন – স্থানীয়/পৌর, প্রাদেশিক/আঞ্চলিক, যুক্তরাষ্ট্রীয় এমনকি সাম্রাজ্য বা জাতি-সংস্থার মত আন্তর্জাতিক রূপেও তা থাকতে পারে।

চলতি ধারণা অনুযায়ী দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র প্রত্যয়গুলি প্রায়ই এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন তারা সমার্থক; কিন্তু আরো সুচারু ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে

কন্সটিটুটিভ থিওরি অফ স্টেটহুড - উনিশ শতকে বিকাশ লাভ করা এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে যে কোনটি রাষ্ট্র আর কোনটি রাষ্ট্র নয়। এই তত্ত্বানুযায়ী – কোন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতির উপর। একারণে সদ্যজাত রাষ্ট্র তৎক্ষণাৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে উঠতে পারেনা বা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য হতে পারেনা। একই সাথে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোও ওই রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য থাকবেনা।

 এই তত্ত্বের উল্লেখ্যযোগ্য একটি সমালোচনা হচ্ছে এই যে এটি সেসব ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে যেসব ক্ষেত্রে স্বীকৃত রাষ্ট্রসমূহের একাংশ নতুন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেয় কিন্তু আরেক অংশ দেয় না। অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়াটা সংশ্লিষ্ট নতুন রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব, সমালোচনার জবাবে এই মত দেন তত্ত্বের প্রস্তাবকদের কেউ কেউ। যাহোক, একটি রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে যেকোন মানদণ্ড বেছে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কেবলমাত্র স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকলেই একটি রাষ্ট্র নতুন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দিতে পারে।

স্বীকৃতি পাওয়া প্রসঙ্গে ক্ষুদ্রজাতিসমূহ কর্তৃক উপস্থাপিত দলিলগুলোর অন্যতম একটি হলো মোন্তেবিদেও সমঝোতা। মোন্তেবিদেও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয় ১৯৩৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, হাইতি, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, মেক্সিকো, পানামা, বলিভিয়া, গুয়েতেমালা, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া, কলম্বিয়া, চিলি, পেরু এবং কিউবার সম্মতিতে। যদিও এই সমঝোতা কোন আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। মোন্তেবিদেও সমঝোতায় চারটি শর্ত আছে যা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ইচ্ছুক “রাষ্ট্র”কে পূরণ করতে হবে –

এই শর্তগুলো পূরণ সহজসাধ্য বলে, মন্তেবিদেও সমঝোতা কখনোই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, বরং বেশিরভাগ দেশ আদর্শ হিসেবে কন্সটিটুটিভ থিওরি অফ স্টেটহুডকেই ব্যবহার করে।

বাংলা ভাষায় রাষ্ট্র শব্দটি ইংরেজি স্টেট শব্দের পারিভাষিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি স্টেট শব্দটি মূলত ল্যাটিন স্ট্যাটাস শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ অবস্থা। যা কখনো আইনানুগভাবে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব থাকা, কখনো বা রাজার অবস্থা আবার কখনো বা প্রজাতন্ত্রের অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

রাষ্ট্র শব্দের প্রায়োগিক ও আইনি উভয় রকমের অর্থ আছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র হিসেবে কোন কিছুর অস্তিত্বকে প্রায়োগিক দৃষ্টিতে বা আইনি দৃষ্টিতে অথবা উভয় দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

প্রায়োগিক দিক থেকে দেখতে গেলে, ম্যাক্স ওয়েবারের প্রভাবশালী সঙ্গানুযায়ী- এটি এমন একটি সংস্থা , নির্দিষ্ট এলাকার ভেতর আইনসিদ্ধ বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যার রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। এমন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিজস্ব আইনি আদেশ আরোপ করতে পারে, এমনকি যদি সেই কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে অপরাপর রাষ্ট্র দ্বারা, রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নাও হয় তবুও। উদাহরন হিসেবে সোমালিল্যান্ডের সোমালি অঞ্চলের কথা বলা যেতে পারে।

আইনি দিক থেকে দেখতে গেলে, কোন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্র হতে পারে যদি অপরাপর রাষ্ট্রসমূহ তাকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, এমনকি তেমন ক্ষেত্রেও যেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপর আইনসিদ্ধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব আসলে তার নেই। শুধুমাত্র আইনগতভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমঝোতায় অংশ নিতে পারে।

রাষ্ট্রের ধারণাকে প্রাসঙ্গিক অপর দুটি বিষয় থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করা যেতে পারে, যে দুটিকে প্রায়ই রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই বিষয় দুটি হচ্ছে সরকারপদ্ধতি (গণতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র) এবং রাজনৈতিক কাঠামো। সরকার পদ্ধতি রাষ্ট্রের একটি মাত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে – সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ের বিভিন্ন কর্তা নির্ধারিত হয় এবং একই সাথে তাদের পারস্পারিক সম্পর্কের স্বরূপ ও জনগণের সাথে তাদের সম্পর্কের স্বরূপ নির্ধারিত হয়। এটি রাষ্ট্রের অন্যান্য দিকগুলো তুলে ধরে না যেগুলো রাষ্ট্রের প্রতিদিনকার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উদাহরণ হিসেবে আমলাতন্ত্রের মানের কথা বলা যেতে পারে। দুটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরস্পরের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন হতে পারে যদি তাদের একটির প্রশিক্ষিত ও কার্যকর আমলাতন্ত্র বা বেসামরিক প্রশাসন থাকে কিন্তু অপরটির তা না থাকে। সাধারণভাবে বলতে গেলে রাষ্ট্র প্রত্যয়টি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ারগুলোকে বোঝায়। অপর দিকে সরকারপদ্ধতি বলতে সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায় যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলো ব্যবহৃত হয় এবং নিয়োজিত হয়।

কোন কোন তাত্ত্বিকের মতে রাষ্ট্র প্রত্যয়টি অযথার্থ এবং রাষ্ট্র প্রত্যয়টির বদলে আরো বেশি অর্থবহ – রাজনৈতিক কাঠামো প্রত্যয়টি ব্যবহার করা উচিত।

রাজনৈতিক কাঠামো প্রত্যয়টি সামগ্রিকভাবে সব সামাজিক কাঠামোকে নির্দেশ করে যারা যৌথভাবে পারস্পারিকভাবে সম্পর্কিত সামাজিক সিদ্ধান্তগুলি নির্ধারণ করে। আধুনিক সময়ে যা রাজনৈতিক শাসনতন্ত্র , রাজনৈতিক দল এবং আরো অন্যান্য সংস্থাকে নির্দেশ করে। ফলে রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রের তুলানায় ব্যাপকার্থ ধারণ করে।

প্রাথমিক স্তরের রাষ্ট্রের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায় যখনই ক্ষমতাকে টেকসইভাবে কেন্দ্রীভূত করা যায়। “কৃষি ও কলম” প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। কৃষি, উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদন ও তার সঞ্চয়কে সম্ভব করে তুলেছে। এটাই পর্যায়ক্রমে এমন এক শ্রেণীর উদ্ভব সম্ভব করে তুলেছে যারা কৃষি উদ্বৃত্তের মজুত নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করতো। একই সাথে এই কাজে সময় ব্যয় করায় তারা ক্রমেই তাদের নিজেদের জীবিকানির্বাহী কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়াও রয়েছে লেখনীর বিকাশের ব্যাপারটি, যা প্রয়োজনীয় তথ্যের একত্রিত উপস্থাপন সম্ভব করেছে।

অনেক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বিশ্বাস করেন যে রাষ্ট্রের মূলসূত্র আদিবাসীদের সংস্কৃতিতে প্রোথিত। সে সংস্কৃতি মানুষের বোধের সাথে সাথে সেই কাঠামোকে উন্নত করেছে যা আদি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষুদ্রসমাজের নজির, যেখানে দুর্বলের উপর সবলের দাপটই মুখ্য ছিলো। যাহোক, নৃবিজ্ঞানীদের মতে আদিবাসী গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজে উল্ল্যেখ করা মত কোন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছিল না। আর সেটাই সমাজগুলোকে বহুস্তরবিশিষ্ট করে তুলেছিলো।

পশ্চিমে রাষ্ট্রের ইতিহাস শুরু হয় গ্রিক ও রোমান সভ্যতাকালে। সেইসময়কালে রাষ্ট্রকে বিভিন্ন রূপে দেখতে পাওয়া যায়। যদিও তাদের কোনটিকেই আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে মেলানো যায় না। তখন স্বাধীন শাসকদের এমন এক শ্রেণী ছিল যাদের ক্ষমতা মূলত রাজার ধর্মীয় কর্মকান্ড ও কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীতে তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল ছিলো। সেখানে রোমান সাম্রাজ্যের মত আমলাতন্ত্রনির্ভর বৃহৎ সাম্রাজ্যও ছিলো যা রাজার ধর্মীয় প্রভাব দ্বারা ছিল কম প্রভাবিত। কার্যকর সেনাবাহিনী ও আইনি প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং সুদৃঢ় অবস্থানে থাকা অভিজাততন্ত্রের উপরই নির্ভরতা ছিলো বেশি।

মনে করা হয় যে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় সবচেয়ে বড় রাজনীতি সংক্রান্ত উদ্ভাবন ছিলো গ্রিক নগর-রাষ্ট্র এবং রোমান প্রজাতন্ত্র। চতুর্দশ শতকেরও আগে গ্রিক নগর-রাষ্ট্র তার মুক্ত বাসিন্দাদের জন্য নাগরিকত্ব প্রদাণ করে। এথেন্সে এই অধিকার স্বীকৃতি পায় গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতির প্রত্যক্ষ রূপের মাধ্যমে যা পরবর্তীতে ইতিহাস ও রাষ্ট্র চিন্তায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে রোমে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্র, যা রোমান অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত সদস্যসভা দ্বারা শাসিত হত। রোমান রাজনৈতিক কাঠামো, আইন ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের উন্নতিতে অবদান রাখে এবং একই সাথে অধিকার-কর্তব্যের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ক্ষেত্রের মাঝে সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেয়।

পশ্চিমে সুনির্দিষ্টভাবে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে রোমান সাম্রাজ্যের অবলুপ্তি ঘটার মাধ্যমে। এর ফলে সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভাজিত হয়ে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণবিহীন স্থানীয় জমিদারদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যাদের রাজনৈতিক, আইনি ও সামরিক সিদ্ধান্তগুলো ছিলো স্থানীয় উৎপাদন কাঠামোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নির্ধারিত। মার্ক্সবাদীদের মতে এমন পরিস্থিতিতেই সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সামন্তযুগের ইউরোপে একজন স্বাধীন শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা কাঠামোর উপরে থাকলেও তার একক ইচ্ছা পুরো শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বরং কেন্দ্রীয় খাজনা আদায় ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে স্বাধীন শাসক ও জমিদারদের ভেতর পারস্পারিক নির্ভরতার সম্পর্ক ছিলো। এ অবস্থা ম্যাক্স ওয়েবার বর্ণিত রাষ্ট্র এর সাথে পুরোপুরি মেলে না যেহেতু এমতাবস্থায় না আইন তৈরি আর না তো বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজার একচ্ছত্র অধিকা ছিলো। আইনের তৈরির ব্যাপারে গির্জার প্রভাব ছিলো আর বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে “নোবল্‌” পদাধিকারীদের প্রভাব ছিলো।

খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে রাজা ও অন্যান্য ক্ষমতা উৎসগুলোর ভেতর টানাপোড়েন এর জের ধরে স্ট্যান্ডেস্ট্যাট এর জন্ম হয় যেখানে সংসদ এর মত আলোচনার পরিবেশে রাজা ও ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আইনি ও অর্থনৈতিক বিষয়ে দেন-দরবারের মীমাংসা হত। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই দেন-দরবারের ব্যাপারে রাজারই প্রাধান্য থাকতো।

নির্দিষ্ট ভূখন্ডে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রের জনসম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ইউরোপে প্রাতিষ্ঠানীকিকরণের ক্রমোন্নতির হাত ধরে, যার সূচনা হয় পনের শতকের শেষভাগে, যা স্বৈরতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের উত্থানের সাথে সাথে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।

ইউরোপের পরিবারতান্ত্রিক রাজ্যগুলো ( ইংল্যান্ডের, স্পেনের এবং ফ্রান্সের) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রণীত বিভিন্ন পরিকল্পনার আত্মীকরণ করে যা ক্রামাগত আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলিকেই সামনে নিয়ে আসে।

ইউরোপিয়ান রাজতন্ত্রগুলো ক্রমান্নয়ে ক্ষমতার অন্যান্য উৎসগুলোর কোন কোন্টিকে দমন আবার কোন কোনটিকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করায় (চার্চ, সীমিত নোবলিটি) ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ একই সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতা কর্তব্যের সীমানা স্পষ্ট করে এঁকে দেয়।

প্রায় ক্ষেত্রেই সীমানা নিয়ে বিবাদ ছিলো যে সামন্ত শাসনে, তার বদলে গড়ে ওঠে এককেন্দ্রীক রাষ্ট্রের, যার নির্দিষ্ট এলাকার উপর ব্যাপক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়া, ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত এবং ক্রমশ আমলাতন্ত্র নির্ভরপ্রবণ বিভিন্ন প্রকার একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের জন্ম দেয়। সতের এবং আঠারো শতকে এটি ঘটে, যখন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমকালীন বৈশিষ্ট্যগুলো কাঠামোবদ্ধ রূপ লাভ করে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয় নিয়মিত সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় কর ব্যবস্থা, স্থায়ী দূতাবাসগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির উন্নয়ন ।

সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তার অভিন্নতা আধুনিক রাষ্ট্রের উথ্থানে ব্যাপকবিস্তারী ভূমিকা রেখেছে। একনায়কতান্ত্রিক সময়কাল থেকেই রাষ্ট্রের সংগঠন বহুলাংশে জাতীয়তা নির্ভর। একথা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে জাতীয় রাষ্ট্র আর জাতি-রাষ্ট্র এক বিষয় নয়। এমন কি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ঐক্য সবচেয়ে বেশি এমন সমাজেও রাষ্ট্র ও জাতির বৈশিষ্ট্য সমভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। ফলে প্রায়ক্ষেত্রেই ষেয়ার্ড সিম্বল ও জাতীয় পরিচয়ের উপর জোর দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র জাতীয়বাদের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে।

এই সময়কালেই রাষ্ট্র ব্যাপারটি বর্তমান অর্থের কাছাকাছি অর্থে রাষ্ট্র তত্ত্বের আলোচনায় ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৫৩২ সালে প্রকাশিত দ্য প্রিন্স গ্রন্থে, আধুনিক অর্থে নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডে সার্বভৌম সরকারক অর্থে রাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয় ম্যাকিয়াভেলিকে। যদিও ব্রিটিশ চিন্তাবিদ থমাস হব্স ও জন লক এবং ফরাসি চিন্তাবিদ জেন বডিনের হাত ধরেই রাষ্ট্রের বর্তমান অর্থ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমানকালের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই ম্যাক্স ওয়েবারের পলিটিক্স এ্যাজ ভোকেশন-এ বর্ণিত সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। ওয়েবারের মতে আধুনিক রাষ্ট্র নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের ভেতর বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

বলপ্রয়োগের এই যে একচ্ছত্র ক্ষমতা, তার আবার বিশেষ ধরনের। কারণ একে আবার আমধারণা অনুযায়ী আইনসিদ্ধ হতে হবে যে আইন ব্যক্তি স্বার্থানু্যায়ী প্রণিত নয়।

আবার এমন রাষ্ট্রেরও অস্তিত্ব আছে যা ওয়েবারের সঙ্গার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্দিষ্ট এলাকায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই বা সেই বলপ্রয়োগের আমধারণা অনু্যায়ী আইনি ভিত্তি নেই এমন রাষ্ট্রও আছে যাদেরকে সামন্তসমাজের মত অন্যান্য কাঠামো থেকে পৃথক করা যায় আমলাতন্ত্রের উপর তাদের নির্ভরতা এবং বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করার বৈশিষ্ট্যের কারণে।

মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকেরা আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করেন সামাজিক শ্রেণীগুলোর ভেতর উপস্থিত শ্রেণী সংঘাতের ধারণার উপর ভিত্তি করে।

আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক সমাজের সংযুক্ত-বিযুক্ত থাকা প্রসঙ্গে থমাস হব্স, জে. জে. রোসাও, ইমানুয়েল কান্ট এর মত ধ্রুপদী চিন্তাবিদেরা যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের পরিচয় নির্দিষ্ট করার কাজে মনোযোগ দিয়েছেন, সেখানে জি. ডাব্লুউ. এফ. হেগেল ও অ্যালেক্সিস ডি টোকভিল থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদেরা বরং দু’টি ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা হিসেবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের স্বরূপ নিরূপণে মনোযোগ দিয়েছেন।

১৯ শতকের শেষভাগ থেকে পৃথিবীর আবাসযোগ্য সমগ্র ভূমি কম-বেশি নির্ধারিত সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের নামে চিহ্নিত হয়ে যায়। আগে বেশ বড় বড় এলাকা হয় নির্দাবিকৃত ছিল না হয় অনাবাসকৃত ছিল অথবা যাযাবরদের এমন আবাসস্থল ছিল যা রাষ্ট্র হিসেবে সংগঠিত ছিল না। বর্তমানে ২০০ এর ও বেশি রাষ্ট্রকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গঠিত যাদের সিংহভাগই জাতিসংঘের সদস্য দেশ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকদের মতে এই রাষ্ট্রগুলো এমন একটি ব্যবস্থাপনার ভেতর আছে যেখানে রাষ্ট্র নিজে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অপরাপর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে। এদিক থেকে দেখতে গেলে আন্তঃ ও বহিঃ নিরাপত্তার ব্যাপারে ও বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র উভয় সংকটে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলতে এমন রাষ্ট্রসমূহের গোষ্ঠীকে বোঝায় যারা তাদের সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বিধি, কার্যপ্রণালী ও প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, আনুষ্ঠানিক রেজিম এবং সংগঠনগুলোর ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

বিশ শতকের শেষভাগ থেকে পৃথিবীর অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব, শ্রম ও মূলধনের প্রবাহ এবং বহুসংখ্যক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভবের যৌথ প্রভাবে রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে গিয়েছে। স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হল পশ্চিম ইউরোপ যেখানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঐক্যের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও ১৬ শতক থেকে এখনো রাষ্ট্রই বিশ্বের রাজনৈতিক একক। ফলে রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক পঠন পাঠনের মূল কেন্দ্রীয় বিষয় বলে মনে করা হয় এবং এর সংজ্ঞা নিয়েই তাত্ত্বিকদের মাঝে পাণ্ডিত্বপূর্ণ বিতর্ক সবচেয়ে বেশি হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও আইন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে দাবী করার ব্যাপারে কূটনৈতিক স্বীকৃতি থাকা না থাকার উপর। স্বীকৃতি ও সার্বভৌমত্বের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

রাষ্ট্র হওয়ার জন্য আইনি শর্তাবলী অবশ্য পালনীয় নয়। প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আইনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই যে দলিলের কথা উল্লেখ করা হয় তা হলো ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও সমঝোতার প্রথম ধারা যাতে আছেঃ

আন্তর্জাতিক আইনের একটি অংশগ্রহণকারী পক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রকে নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে-
 
ক. স্থায়ী জনগণ  খ. নির্ধারণকৃত এলাকা  গ. সরকার	  ঘ. অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরির সক্ষমতা




#Article 121: যুদ্ধ (144 words)


যুদ্ধ বা সমর বলতে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর মধ্যে সুসংগঠিত এবং কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষকে বোঝায়। চারিত্রিক দিক দিয়ে এটি প্রচণ্ড সহিংস এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। যুদ্ধকে সবসময় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে একটি বাস্তব, প্রায়োগিক ও বিস্তৃত সশস্ত্র সংঘর্ষ হিসেবে দেখা হয়। সেকারণে এটি অনেকসময় রাজনৈতিক সহিংসতা ও হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য। এ সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রত্যেক পক্ষের চরম ও পরম লক্ষ্য থাকে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে পদানত করে সম্পূর্ণ নির্মূল বা স্বীয় শর্তাধীনে শান্তি স্থাপন করতে বাধ্য করা। তাই কোন পক্ষ একতরফাভাবে সশস্ত্র আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে গেলে এবং তার প্রত্যুত্তরে অপর পক্ষ কোন পদক্ষেপ না নিলে তাকে যুদ্ধ বলা যায় না। কোন একটি পক্ষ যুদ্ধে যে পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করে, তাকে সমরকৌশল বলে। যুদ্ধহীন সময়কে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শান্তির সাথে তুলনা করা হয়।

নোবেল বিজয়ী রবার্ট ই. স্ম্যালি ২০০৩ সালে আগামী পঞ্চাশ বছরে মানবজাতি যে দশটি হুমকির সম্মুখীন হবে তার মধ্যে যুদ্ধের অবস্থান ষষ্ঠ।




#Article 122: টেলিযোগাযোগ (1530 words)


টেলিযোগাযোগ বলতে মূলত বোঝায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে দূরবর্তী কোনো স্থানে সংকেত তথা বার্তা পাঠানো। এই যোগাযোগ তারের মাধ্যমে অথবা তারবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও হতে পারে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ থেকে দূর পাল্লার যোগাযোগ প্রচলিত হয়। পরবর্তীতে তারযুক্ত ও তারহীন বার্তা প্রেরণের হরেক মাধ্যম বিবর্তিত হয়েছে। টেলিফোন বা  রেডিও যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমানে বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে তড়িচ্চুম্বক‌ তরঙ্গ পাঠানো হচ্ছে। এ যুগে টেলিযোগাযোগ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এবং এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত যন্ত্র যেমন টেলিফোন, রেডিও, টেলিভিশন এবং ওয়াকিটকি সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। এ সকল যন্ত্রকে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। যেমন: পাবলিক টেলিফোন নেটওয়ার্ক, বেতার নেটওয়ার্ক, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এবং টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেট এর মাধ্যমে একটি কম্পিউটারের সাথে আরেকটি কম্পিউটারের সংযোগ স্থাপনও একপ্রকার টেলিযোগাযোগ।

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মূল অংশগুলো হলো তিনটি:

উদাহারণস্বরূপ, বেতার সম্প্রচারের কথা বলা যায়। এই ক্ষেত্রে, সম্প্রচার টাওয়ারটি হলো ট্রান্সমিটার, রেডিও হলো রিসিভার এবং প্রচার মাধ্যম হলো শূন্যস্থান। অনেক ক্ষেত্রেই টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা উভমুখী যোগাযোগ রক্ষা করে এবং একই যন্ত্র ট্রান্সমিটার ও রিসিভার হিসেবে কাজ করে। এগুলোকে বলা হয় ট্রান্সিভার। যেমন: মোবাইল ফোন একটি ট্রান্সিভার। ফোনের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগকে বলা হয় পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট যোগাযোগ, কারণ এ ক্ষেত্রে একটি মাত্র ট্রান্সমিটার ও রিসিভারের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে। বেতার সম্প্রচারের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ বলা হয় ব্রডকাস্ট (সম্প্রচার) যোগাযোগ, কারণ এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার ও অসংখ্য রিসিভারের মধ্যে সংযোগ ঘটছে।

সিগনাল অ্যানালগ ও ডিজিটাল দু’ধরনের হতে পারে। অ্যানালগ সিগনালের ক্ষেত্রে তথ্যের পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে সংকেতের শক্তি ক্রমাগত পরিবর্তন করা হয়। ডিজিটাল সিগনালের বেলায় তথ্যকে কিছু নির্দিষ্ট মানের (যথা ০ এবং ১) সমন্বয়ে সংকেত এ পরিণত করা হয়।

পরস্পরের সাথে সংযুক্ত এক গুচ্ছ ট্রান্সমিটার, রিসিভার বা ট্রান্সিভারের সমন্বয়ে গঠিত হয় নেটওয়ার্ক। ডিজিটাল নেটওয়ার্কে এক বা একাধিক রাউটার থাকে, যার কাজ হলো একটি নির্দিষ্ট বাবহারকারীর কাছে তথ্য পাঠানো। অ্যানালগ নেটওয়ার্কে এ এক বা একাধিক সুইচ থাকে যা দুই বা ততোধিক ব্যবহারকারীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। দুই ধরনের নেটওয়ার্ক  ক্ষেত্রেই বহু দূরে সিগনাল পাঠাতে রিপিটার প্রয়োজন হয়, যাতে দুর্বল অ্যানালগ সিগনালকে বিবর্ধিত করে শক্তিশালী এবং বিকৃত ডিজিটাল সিগনালকে পুনর্গঠন করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো শব্দ (যা নয়েজ নামে পরিচিত) যাতে সিগনালকে বিকৃত করতে না পারে, সেজন্য এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

চ্যানেল হলো এক ধরনের প্রচার মাধ্যম যার মধ্য দিয়ে একই সময়ে একাধিক তথ্য প্রবাহ পাঠানো যায়। যেমন, একটি বেতার কেন্দ্র ৯৬ মেগাহার্জ বেতার তরঙ্গে, আবার আরেকটি বেতার কেন্দ্র একই সময়ে ৯৪.৫ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাধ্যমকে তরঙ্গ কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি অনুসারে বিভক্ত করা হয়েছে এবং একেকটি বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য এক একটি ফ্রিকোয়েন্সি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আবার সম্প্রচারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেও একটি চ্যানেল নির্দিষ্ট করা যায়।

তথ্য পাঠানোর উদ্দেশ্যে সিগনালের আকার পরিবর্তন করার পদ্ধতিকে বলা হয় মডুলেশন (উপযোজন)। মডুলেশন হলো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণ। একটি সিগনালে উপস্থিত তথ্য আরেকটি সিগনালের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য সর্বদাই মডুলেশন পদ্ধতি বাবহৃত হয়। মডুলেশন ব্যবহার করা হয় সিগনালের কম্পাঙ্ক বাড়ানোর জন্য। কারণ বায়ু মাধ্যমে নিম্ন কম্পাঙ্কের সিগনাল খুব বেশি দূরে পাঠানো সম্ভব নয়। তাই সিগনাল পাঠানোর পূর্বে একে উচ্চ কম্পাঙ্কের আরেকটি সিগনালের উপর স্থাপন করা হয়। এটি করা হয় মূল সিগনালে বা ইনফরমেশন সিগনালে অবস্থিত তথ্য অনুসারে উচ্চ কম্পাঙ্কের সিগনালের কম্পাঙ্ক, বিস্তার () অথবা দশা (phase) পরিবর্তনের মাধ্যমে। সাধারণত মূল সিগনালের বিস্তারের পরিবর্তনের মধ্যে তথ্য উপস্থিত থাকে। উচ্চ কম্পাঙ্কের সিগনালটিকে বলা হয় বাহক সিগনাল বা ক্যারিয়ার সিগনাল। মিশ্র সিগনালটিকে বলে মডুলেটেড সিগনাল।

মডুলেশন অ্যানালগ ও ডিজিটাল দুই প্রকার হতে পারে। ইনফরমেশন সিগনাল অনুসারে বাহক সিগনালের কোন বৈশিষ্ট্যটি পরিবর্তিত হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে অ্যানালগ মডুলেশন ৩ প্রকার হতে পারে।

১। বিস্তার উপযোজন পদ্ধতি(amplitude modulation): এ পদ্ধতিতে মূল সিগনালের বিস্তারের পরিবর্তনের সাথে সাথে যদি বাহক সিগনালের বিস্তার পরিবর্তিত হয়।

২। কম্পাঙ্ক উপযোজন পদ্ধতি(frequency modulation): এ পদ্ধতিতে মূল সিগনালের বিস্তার পরিবর্তনের সাথে সাথে বাহক সিগনালের কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যায়।

৩। দশা উপযোজন পদ্ধতি(phase modulation): এ পদ্ধতিতে মূল সিগনালের বিস্তারের সাথে সাথে বাহক সিগনালের দশা পরিবর্তিত হয়। এটিও এক প্রকার কম্পাঙ্ক উপযোজন পদ্ধতি।

উপরোল্লিখিত তিনটি মডুলেশন প্রক্রিয়াই এনালগ সিগনালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি একটি মূল অ্যানালগ সিগনাল থেকে নির্দিষ্ট সময় পর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং সেই নমুনায় সিগনালের বিস্তারের মান (value)-কে ডিজিটাল সংখ্যায় রূপান্তর করা হয়, তবে তাকে ডিজিটাল সিগনাল বলা হয়।

ডিজিটাল তথ্যকে অ্যানালগ তরঙ্গাকারে উপস্থাপন করতে মডুলেশন করা হয়। একে বলা হয় “কীয়িং”। বিভিন্ন ধরনের কীয়িং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যেমন- ফেজ শিফ্‌ট কীয়িং, অ্যাম্পলিচ্যুড শিফ্‌ট কীয়িং, মিনিমাম শিফ্‌ট কীয়িং। ব্লুটুথ প্রযুক্তিতে দু’টি যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ফেজ শিফ্‌ট কীয়িং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।

মডুলেশনের উদাহারণ: মানুষের কণ্ঠস্বরের উপর উপযোজিত কম্পাঙ্ক সাধারণত ৩০০–৩৪০০ হার্জের মাঝে। এই কম্পাঙ্কের শব্দ খুব বেশি দূরে থেকে শুনতে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যদি মানুষের এই কম্পাঙ্কের কথা একটি ৯৬ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কের বাহক সিগনালের তবে তা দূরে প্রেরণ করা সম্ভব হয়। এভাবেই বেতার সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।

প্রাচীন যুগে মানুষ দুরে অবস্থানকারী কোনো মানুষের সাথে ধোঁয়ার সংকেত দিয়ে বা ঢোল বাজিয়ে যোগাযোগ করত। আফ্রিকা, নিউ গিনি এবং দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় উপজাতিরা ঢোল বাজিয়ে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করত। চিন ও উত্তর আমেরিকার অধিবাসীরা ধোঁয়ার সংকেত দিয়ে দূরে খবর পাঠাত।
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় এমনই এক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মালির আক্কাদিয়ান নগরীতে আলোক সংকেতের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করত।

১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি পদার্থবিদ জাঁ-আন্তোয়িন নুলে () বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন উদ্ভাবন করেন।

১৭৯২ সালে ক্লদ শাপে (Claude Chappe) নামে একজন ফরাসি প্রকৌশলী প্রথম দৃশ্যমান টেলিগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করেন যা লিল ও প্যারিস এর মাঝে সংযোগ স্থাপন করে। এ ক্ষেত্রে সেমাফোর পদ্ধতি ব্যবহৃত হত। সেমাফোর পদ্ধতিতে দুটি পতাকার বিভিন্ন অবস্থানের মাধ্যমে বিভিন্ন বর্ণ নির্দেশ করে সংকেত পাঠানো হয়। লিল থেকে প্যারিস পর্যন্ত স্থাপিত প্রথম সংযোগটি পরে স্ট্রাসবার্গ পর্যন্ত বর্ধিত হয়। ১৭৯৪ সালে সুইডিশ প্রকৌশলী আব্রাহাম এডেলক্রান্টজ সামান্য ভিন্ন একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টকহোম থেকে ড্রটিংহোম পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করেন। শাপে-র যন্ত্রে কপিকলের মাধ্যমে কাঠের তক্তা ঘওরার ব্যাবস্থা ছিল। অপরদিকে ক্রান্টজের যন্ত্রে কেবল হালকা শাটার ব্যবহৃত হওয়ায় এর গতি ছিল বেশি। কিন্তু সেমাফোর পদ্ধতি ব্যবহার করে যোগাযোগ করা অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া অসম্ভব ছিল। এছাড়াও অল্প দূরত্ব (১০-৩০ কি.মি.) পরপর টাওয়ার নির্মাণের বিশাল খরচের কারণে ১৮৮০ সালের পর থেকে বাণিজ্যিকভাবে এ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্যার চার্লস হুইটস্টোন এবং স্যার উইলিয়াম ফদারগিল কুক সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করেন। এতে একটি নির্দেশক কাঁটার বিক্ষেপের মাধমে বার্তা পাঠানো হতো। ১৮৩৯ সালের ৯ই এপ্রিল তারিখে গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের ২১ কি.মি. দূরত্বে যোগাযোগ স্থাপন করতে এর ব্যবহার শুরু হয়। একই সময়ে আটলান্টিকের অপর পারে স্যামুয়েল মোর্স আলাদাভাবে একটি বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করেন এবং ১৮৩৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। কিন্তু যন্ত্রটি সফলভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি আলফ্রেড় ভেইল নামে একজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে আরেকটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন যেটি টেলিগ্রাফ বার্তাকে কাগজের ফিতায় সংরক্ষণ করতে পারে। ১৮৩৮ সালের ৬ই জানুয়ারি তাদের এই যন্ত্রটি প্রথমে ৫ কিলোমিটার ও পরে ২৪মে,১৮৪৪ তারিখে ওয়াশিংটন ও বাল্টিমোরের মাঝে ৬৪ কি.মি. দূরত্বে সফলভাবে কাজ করে। তারা তাদের এই যন্ত্রটি পেটেন্ট করেন। ১৮৫১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২০,০০০ মাইল দীর্ঘ টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপিত হয়। ১৮৬৬ সালে প্রথম সফলভাবে আটলান্টিকের দু'প্রান্তের মাঝে টেলিগ্রাফ সংযোগ স্থাপিত হয়। এর পুর্বে ১৮৫৭ ও ১৮৫৭ সালেও এ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ পরেই তা অচল হয়ে পড়ে।

১৮৫৭ সালে আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করেন। অবশ্য এর আগে ১৮৪৯ সামে অ্যান্টোনিও মেউচ্চি একটি যন্ত্র আবিষাক্র করেন যার মাধ্যমে লাইনের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিকভাবে কন্ঠ প্রেরণ করা যেত। এই যন্ত্রটি শব্দবৈদ্যুতিক প্রভাবের উপর নির্ভর করত। কিন্তু এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা অসম্ভব ছিল কারণ ব্যবহারকারীকে গ্রাহক যন্ত্রটি মুখে ঢুকিয়ে কথা শুনতে হত।

১৮৭৮ ও ১৮৭৯ সালে আটলান্টিকের উভয় পারে নিউ হ্যাভেন ও লন্ডোন শহরে বাণিজ্যিক টেলিফোন ব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থা চালু করার জন্য আলেক্সান্ডার বেল উভয় দেশেই পেটেন্ট লাভ করেন। এরপর অতি দ্রুত প্রযুক্তির প্রসারণ হয়। ১৮৮০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শহরগুলোতে এক্সচেঞ্জ এবং আন্তঃশহর টেলিফোন লাইন স্থাপিত হয়। সংযোগ স্থাপন করার জন্য সুইচিং প্রযুক্তিও উন্নত হয়। তা সত্বেও আটলান্টিকের দু'পারের মাঝে কন্ঠ আদান প্রদান করা সম্ভব ছিল না। ১৯২৭ সালের ৭ই জানুয়ারি প্রথম বেতার সংযোগের মাধ্যমে কন্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৫৬ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ট্রান্স-আটলান্টিক-টেলিফোন লাইন স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দুই ভুখন্ডের মাঝে কোন তার সংযোগ ছিল না। এই টেলিফোন লাইন্টিতে ৩৬টি টেলিফোন সার্কিট ছিল।

১৮৩২ সালে জেমস লিন্ডসে শ্রেনীকক্ষে তার ছাত্রদের সামনে তারবিহীন টেলিগ্রাফ সংযোগ উপস্থাপন করেন। ১৮৫৪ সালে তিনি পানিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ডান্ডি থেকে উঢ্যাভেন পরযন্ত দুই মাইল দূরত্বে তার বিহীন সংযোগ স্থপন করে দেখান। ১৮৯৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ইন্সটিটিউটে এক বক্তৃতায় নিকোলা টেসলা উদাহারণসহ তারবিহীন টেলিগ্রাফি প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। ভ্যাকুয়াম টিউব আবিষ্কারের পুর্বে বেতার ব্যবস্থায় যে সকল যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হত সে সব উপকরণ ব্যবহার করেই তিনি এ উদাহারণ উপস্থাপন করেন। ১৯০০ সালে রেগিনাল্ড ফেসেন্ডেন প্রথম তার ছাড়া মানুষের কন্ঠস্বর প্রেরণ করতে সক্ষম হন। ১৯০১ সালে গুগলিয়েলমো মার্কনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে তার বিহীন সংযোগ স্থাপন করেন, যা তাকে ১৯০৯ সালে নোবেল পুরস্কার এনে দেয় (তিনি কার্ল ব্রাউন এর এর সাথে যুগ্মভাবে এ পুরস্কার পান)।

১৯২৫ সালের ২৫শে মার্চ, লন্ডনের সেলফ্রিজ নামের একটি মনিহারী দোকানে জন লগি বেয়ার্ড চলন্ত ছবি প্রেরণ করে দেখান। অবশ্য তার যন্ত্রটি সম্পুর্ণ ছবি দেখাবার বদলে ধারণকৃত ছবির একটি অস্পষ্ট ছায়া প্রদর্শন করেছিল কিন্তু অবিলম্বে অক্টোবর মাসেই তিনি এ সমস্যার সমাধান করেন এবং ১৯২৬ সালের ২৬শে জানুয়ারী পুনরায় ঐ সেলফ্রিজ দোকানেই আবার টেলিভিশন উপস্থাপন করেন। বেয়ার্ডের তৈরি টেলিভিশন নিপকও চাকতি(nipkow disk) ব্যবহার করে ছবি গ্রহণ ও প্রদর্শন করা হতো, তাই একে বলা হয় যান্ত্রিক টেলিভিশন। এই যন্ত্রের উপর নির্ভর করেই ১৯২৯ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বা বিবিসি এর পরীক্ষামুলক সম্প্রচার চালু হয়। বিংশ শতকের অধিকাংশ টেলিভিশনে ব্যবহৃত হয় কার্ল ব্রাউন এর আবিষ্কৃত ক্যাথোড রে টিউব প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিলো ফার্ন্সওয়র্থ প্রথম একটি কার্যকরী মডেল তৈরি করে তার পরিবারের সদস্যদের দেখান ১৯২৭ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর। একই সময়ে ভলাদিমির যোরিকিনও এই রযুতিতে ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক টেইভিশন আবিষ্কার করেন। পরে আদালতে ফয়সালা করে ফার্ন্সওয়র্থকে এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয়।

 




#Article 123: শব্দ (393 words)


শব্দ এক ধরনের তরঙ্গ। এই শক্তি সঞ্চালিত হয় শব্দ-তরঙ্গের মাধ্যমে । শব্দ তরঙ্গ হলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। কোনো মাধ্যমের কণাগুলোর বা স্তরসমূহের সংকোচন ও প্রসারণের সৃষ্টির মাধ্যমে এই তরঙ্গ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চালিত হয়। শব্দের প্রতিফলন ও প্রতিসরন ঘটে। শব্দের একক হলো জুল। কারন শব্দ হলো এক প্রকার শক্তি। আর বিশ্বের সকল শক্তির একক জুল।

শব্দ হলো এক ধরনের তরঙ্গ যা পদার্থের কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয়। মানুষের কানে এই কম্পন ধৃত হলে শ্রুতির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গ বায়বীয়, তরল এবং কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত শব্দের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৬৮.১ মাইল তথা প্রতি সেকেন্ডে ৩৪৩.৪ মিটার। পদার্থের মধ্য দিয়ে শব্দ তরঙ্গ প্রবাহিত হওয়ার সময় ঐ পদার্থের সকল কণা স্পন্দিত হতে থাকে। প্রতি সেকেণ্ড একবার স্পন্দনকে বলা হয় ১ Hz। সকল স্পন্দন মানুষের কানে ধরা পড়ে না তথা শ্রুতির অনুভূতি সৃষ্টি করে না। সাধারণভাবে মানুষের কানে ২০ থেকে ২০,০০০ হার্জ স্পন্দনের শব্দ তরঙ্গ শ্রুত হয়।‌‌ পরিবেশের জন্য স্বাস্থ্যকর শব্দের তীব্রতা ৬০ ডেসিবল। এই পরিধির কম হলে শব্দকে হলা হয় ইনফ্রা সাউন্ড এবং এর বেশি হলে বলা হয় আল্ট্রা সাউন্ড। কোন বস্তু শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে বাতাসের মধ্য দিয়ে ধাবিত হলে তাকে বলা হয় সুপারসনিক।

কোনো বস্তুর কম্পনের ফলে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। শব্দ উৎস থেকে মস্তিস্কে বা কানে আসতে কিছুটা সময় নেয়। শব্দ কোনো মাধ্যমে একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে শব্দের গতি বলে।কঠিন পদার্থে শব্দের গতি সবচেয়ে বেশি। এসআই পদ্ধতিতে শব্দের গতির একক মিটার প্রতি সেকেন্ড(মিটার/সেকেন্ড বা মি/সে)।
শব্দ সঞ্চালনের জন্য স্থিতিস্থাপক জড় মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। শব্দের বেগ জড় মাধ্যমের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। তাই বিভিন্ন মাধ্যমে শব্দের বেগ বিভিন্ন হয়। এজন্য কঠিন, তরল ও বায়বীয় মাধ্যমে শব্দের বেগের তারতম্য হয়। ২০°C তাপমাত্রায় বায়ুতে, পানিতে ও লোহায় শব্দের বেগ যথাক্রমে ৩৪৪মি/সে, ১৪৫০মি/সে ও ৫১৩০মি/সে। বায়ুতে শব্দের বেগ কম, তরলে তার চেয়ে বেশি এবং কঠিন পদার্থে সবচেয়ে বেশি। মাধ্যমের প্রকৃতি ছাড়াও তাপমাত্রা, বায়ুর আর্দ্রতার উপরেও শব্দের বেগ নির্ভর করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বায়ুতে শব্দের বেগ বৃদ্ধি পায় এবং একইভাবে বায়ুর আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলেও শব্দের বেগ বৃদ্ধি পায়।

শব্দ গ্যাস, প্লাজমা এবং তরলের মধ্য দিয়ে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ হিসাবে সঞ্চারিত হয়, যাকে সংক্ষেপণ বা সংকোচন তরঙ্গও বলা হয়। এটির প্রবাহের জন্য একটি মাধ্যম প্রয়োজন। কঠিন মাধ্যমে, তবে এটি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ এবং অনুপ্রস্থ তরঙ্গ উভয় ভাবেই সঞ্চালিত হতে পারে। অনুদৈর্ঘ্যিক শব্দ তরঙ্গগুলি অসম চাপ থেকে পরিবর্তিত চাপ বিচ্যুতির তরঙ্গ, সংকোচন এবং বিরলতার স্থানীয় অঞ্চলগুলির কারণ , যখন অনুপ্রস্থ তরঙ্গ (কঠিন পদার্থে) ডান কোণে পরিবর্তনের দিকের সাথে সঞ্চালন করে।




#Article 124: আলো (480 words)


আলো এক ধরনের শক্তি বা বাহ্যিক কারণ, যা চোখে প্রবেশ করে দর্শনের অনুভূতি জন্মায়।By the International Lighting Vocabulary, the definition of light is: Any radiation capable of causing a visual sensation directly. আলো বস্তুকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু এটি নিজে অদৃশ্য। আমরা আলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু আলোকিত বস্তুকে দেখি। আলো এক ধরনের বিকীর্ণ শক্তি। এটি এক ধরনের তরঙ্গ। আলো তির্যক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের আকারে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমন করে। মাধ্যমভেদে আলোর বেগের পরিবর্তন হয়ে থাকে। আলোর বেগ মাধ্যমের ঘনত্বের ব্যস্তানুপাতিক। শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি, আলোর বেগ অসীম নয়। শূন্যস্থানে আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে  ২৯,৯৭,৯২,৪৫৪ মিটার বা ১,৮৬,০০০ মাইল। কোন ভাবেই আলোর গতিকে স্পর্শ করা সম্ভব নয়। আলোর কোনো আপেক্ষিক বেগ নেই ।আলোর বেগ সর্বদা সমান। দৃশ্যমান আলো মূলত তড়িৎ চুম্বকীয়  বর্ণালির ছোট একটি অংশ মাত্র। সাদা আলো সাতটি রঙের মিশ্রণ, প্রিজম এর দ্বারা আলোকে বিভিন্ন রঙে (৭টি রঙ) আলাদা করা যায়। যা আমরা রামধনু দেখতে পাই। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরন, আপবর্তন, ব্যাতিচার হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আলোর একই সাথে কণা ধর্ম ও তরঙ্গ ধর্ম বিদ্যমান। 

দীপ্তমান বস্তু থেকে আলো কীভাবে আমাদের চোখে আসে তা ব্যাখ্যার জন্য বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত চারটি তত্ত্ব প্রদান করেছেন। যথা- 
১. স্যার আইজ্যাক নিউটনের কণা তত্ত্ব (Corpuscular Theory)
২. বিজ্ঞানী হাইগেন এর তরঙ্গ তত্ত্ব (Wave Theory)
৩. ম্যাক্সওয়েলের তড়িতচৌম্বক তত্ত্ব (Electromagnetic Theory)
৪. ম্যাক্স প্লাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্ব (Quantum Theory)
১৯০৫ সালে আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে আইন্সটাইন এ ঘটনার  ব্যাখ্যা দেন, সেজন্য তাকে ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

১৬৫০ সালে পিয়েরে ফার্মাট আলোকপথ সংক্রান্ত একটি নীতি দেন যা ফার্মাটের নীতি নামে পরিচিত। এই নীতি অনুসারে যখন কোন আলোক রশ্মি প্রতিফলন বা প্রতিসরণের সূত্র মেনে কোন সমতল পৃষ্ঠে প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়, তখন তা সর্বদা ক্ষুদ্রতম পথ অনুসরণ করে।

আমরা জানি, আলোকরশ্মি কোন একটি বিন্দু হতে চলে সমতল পৃষ্ঠ কর্তৃক প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর অন্য কোন দূরত্বে পৌঁছাতে যদি কম দূরত্ব অতিক্রম করে তবে ঐ দূরত্বে পৌঁছাতে যে সময় লাগে তাও সর্বাপেক্ষা কম সময় হয়। এখন  আলোকরশ্মির ক্ষুদ্রতম পথ বা নূন্যতম সময় বিষয়ক যে নীতি তা কেবল সমতল পৃষ্ঠের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। গোলকীয় তলে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়,তখন আলোকরশ্মি হয় ক্ষুদ্রতম না হয় দীর্ঘতম পথ অতিক্রম করবে। তবে আলোকপথ সর্বদা স্থির থাকবে।

আলো যখন বায়ু বা অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় অন্য কোনো মাধ্যমে বাধা পায় তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতল থেকে কিছু পরিমাণ আলো প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, একে আলোর প্রতিফলন বলে। 
যে পৃষ্ঠ থেকে বাধা পেয়ে আলোক রশ্মি ফিরে আসে তাকে আলোক পৃষ্ঠ বলে।
আপতিত আলোর কতটুকু প্রতিফলিত হবে তা দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে; যথাঃ-
১. আপতিত আলো প্রতিফলকের উপর কত কোণে আপতিত হচ্ছে; এবং
২. প্রথম ও দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রকৃতি। 

আলোর প্রতিফলনের সূত্র—

প্রতিফলক পৃষ্ঠের প্রকৃতি অনুসারে প্রতিফলন দুই প্রকারের হতে পারে; যথা– 
১. নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection)
২. ব্যাপ্ত প্রতিফলন (Diffused Reflection)

বিভিন্ন ঘনত্বের দুইটি স্বচ্ছ মাধ্যমের বিভেদ তলে আলো যদি তির্যকভাবে আপাতিত হয়, তাহলে দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রবেশের সময় রশ্মির দিক পরিবর্তিত হয়। এ দিক পরিবর্তন হওয়াকে আলোর প্রতিসরণ বলে।
আলোর প্রতিসরণের সূত্র

সুতরাং, sin i/sin r = মেউ




#Article 125: শক্তি (284 words)


পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় শক্তি বলতে কাজ করার সামর্থ্যকে বুঝায়। প্রধানত শ‌ক্তি হ‌চ্ছে পদা‌র্থের এমন একটি বৈ‌শিষ্ট্য যার সৃ‌ষ্টি বা  ধ্বংস নেই , এক রূপ থে‌কে অন্য রূপ নি‌তে পা‌রে এবং এক বস্তু থে‌কে অন্য বস্তুতে যেতে পারে। বিখ্যাত E=mc² অনুযা‌য়ী শ‌ক্তি পদা‌র্থে নি‌হিত থাক‌তে পা‌রে । যেমন ফিসন বি‌ক্রিয়া ।  কাজ বা কার্য হচ্ছে বল(force) ও বলের দিকে সরণের (displacement) গুণফল। কৃতকাজের পরিমাণ দিয়েই শক্তি পরিমাপ করা হয়। অর্থাৎ বস্তুর শক্তি হচ্ছে ঐ বস্তু মোট যতখানি কাজ করতে পারে। সুতরাং কাজের একক ও শক্তির একক অভিন্ন - জুল। ১ জুল = ১ নিউটনХ ১ মিটার। শক্তি একটি অদিক রাশি।

শক্তির বিভিন্ন রূপ আছে। মোটামুটিভাবে শক্তির নয়টি রূপ দিয়ে প্রাকৃতিক সব ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া হয়। শক্তির রূপগুলি হলঃ

শক্তির রূপগুলোকে সাধারণত সংশ্লিষ্ট বল অনুসারে অভিহিত করা  হয়।

শক্তির যে কোন রূপকে অন্য যে কোন রূপে রূপান্তরিত করা যায়, কিন্তু মোট শক্তির পরিমাণ একই থাকে। একে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি বা শক্তির নিত্যতা সূত্র বলা হয়। শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতিকে এভাবে বিবৃত করা যায়ঃ

শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, শক্তি কেবল একরূপ থেকে অপর এক বা একাধিকরূপে পরিবর্তিত হতে পারে। মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়।

শক্তি একরূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হলে শক্তির কোনো​ ক্ষয় হয় না। একটি বা একাধিক বস্তু যে পরিমাণ শক্তি হারায়, অন্য এক বা একাধিক বস্তু ঠিক একই পরিমাণ শক্তি পায়। নতুন করে কোনো​ শক্তি সৃষ্টি হয় না বা কোন শক্তি ধ্বংসও হয়না। সুতরাং এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্তে যে পরিমাণ শক্তি ছিল, এখনও ঠিক সেই পরিমাণ শক্তিই আছে।

কোন বস্তুর উপর কৃত কাজ তার গতিশক্তির পরিবর্তনের সমান। অর্থাৎ যেহেতু কোন বস্তুর উপর কাজ করলে তা বস্তুকে গতি দেয়, আবার যেহেতু ঐ গতিকে কাজে রূপান্তর করা সম্ভব (তাকে থামিয়ে দিতে গিয়ে), সেহেতু আমরা বলি ঐ বস্তুতে (গতি)শক্তি এসেছে।

পদার্থবিজ্ঞান,নবম-দশম শ্রেণি,পৃষ্ঠা নং ১০২, এনসিটিবি (




#Article 126: ইলেকট্রন বিজ্ঞান (340 words)


ইলেকট্রন বিজ্ঞান ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও তড়িৎ প্রকৌশলের একটি আন্তঃক্ষেত্রীয় শাখা যেখানে বায়ুশূন্য নল (ভ্যাকিউম টিউব), গ্যাস অথবা অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক সঙ্কেত বহনকারী ইলেক্ট্রনের নিঃসরণ, প্রবাহ, নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহারিক আচরণ ও প্রক্রিয়া আলোচিত হয়। ১৯০৪ সালে জন অ্যামব্রোস ফ্লেমিং দুইটি তড়িৎ ধারক বৈশিষ্ট সম্পূর্ণ বদ্ধ বায়ুশূন্য কাচের নল (vacuum tube) উদ্ভাবন করেন ও তার মধ্য দিয়ে একমুখী তড়িৎ পাঠাতে সক্ষম হন। তাই সেই সময় থেকে ইলেকট্রন বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছে বলা যায়। ইংরেজি পরিভাষাতে একে ইলেকট্রনিক্স (ইংরেজি Electronics ইলেকট্রনিক্‌স্‌) বলা হয়।

ইলেকট্রন বিজ্ঞান ক্ষেত্রে প্রধানত ইলেকট্রনীয় বর্তনীর নকশা প্রণয়ন এবং পরীক্ষণ করা হয়। ইলেকট্রনীয় বর্তনী সাধারণত রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ইন্ডাক্টর, ডায়োড প্রভৃতি দ্বারা কোন নির্দিষ্ট কার্যক্রম সম্পাদন করার জন্য তৈরি করা হয়। বেতার যন্ত্রের টিউনার যেটি শুধুমাত্র আকাংক্ষিত বেতার স্টেশন ছাড়া অন্যগুলোকে বাতিল করতে সাহায্য করে, সেটি ইলেকট্রনীয় বর্তনীর একটি উদাহরণ। পাশে আরেকটি উদাহরণের (নিউমেটিক সংকেত কন্ডিশনারের ) ছবি দেওয়া হলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে  ইলেকট্রন বিজ্ঞান রেডিও প্রকৌশল বা বেতার প্রকৌশল নামে পরিচিত ছিল। তখন এর কাজের পরিধি রাডার, বাণিজ্যিক বেতার (Radio) এবং আদি টেলিভিশনে সীমাবদ্ধ ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন ভোক্তা বা ব্যবহারকারী-কেন্দ্রিক যন্ত্রপাতির উন্নয়ন শুরু হল, তখন থেকে প্রকৌশলের এই শাখা বিস্তৃত হতে শুরু করে এবং আধুনিক টেলিভিশন, অডিও ব্যবস্থা, কম্পিউটার এবং মাইক্রোপ্রসেসর (অণুপ্রক্রিয়াকারক বা সমন্বিত বর্তনী) এই শাখার অন্তর্ভুক্ত হয়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বেতার প্রকৌশল নামটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে দশকের শেষ নাগাদ  ইলেকট্রন বিজ্ঞান (ইলেকট্রনিক্‌স) নাম ধারণ করে।

উইলিয়াম ব্র্যাডফোর্ড শকলি, জন বারডিন এবং ওয়াল্টার হাউজার ব্র্যাটেইন একসাথে যৌথভাবে ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন। ১৯৪৮ সালে ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন ও ১৯৫৯ সালে সমন্বিত বর্তনী (integrated circuit or IC) উদ্ভাবনের আগে ইলেকট্রনীয় বর্তনী তৈরি হতো বড় আকারের পৃথক পৃথক বায়ুশূন্য নল যন্ত্রাংশ দিয়ে। এই সব বিশাল আকারের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি বর্তনীগুলো বিপুল জায়গা দখল করত এবং এগুলো চালাতে অনেক শক্তি লাগত। এই যন্ত্রাংশগুলির গতিও ছিল অনেক কম। অন্যদিকে সমন্বিত বর্তনী বা আইসি অসংখ্য (প্রায়ই ১০ লক্ষেরও বেশি) ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তড়িৎ যন্ত্রাংশ, যাদের বেশিরভাগই মূলত ট্রানজিস্টর দিয়ে গঠিত হয়। এই যন্ত্রাংশগুলোকে একটি ছোট্ট পয়সা আকারের সিলিকন চিলতে বা চিপের উপরে সমন্বিত করে সমন্বিত বর্তনী তৈরি করা হয়। বর্তমানের অত্যাধুনিক কম্পিউটার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনীয় যন্ত্রপাতি সবই প্রধানত সমন্বিত বর্তনী বা আই সি দ্বারা নির্মিত।




#Article 127: জলবায়ু (419 words)


জলবায়ু (climate) : কোনো নির্দিষ্ট স্থানের দীর্ঘ সময়ের, সাধারণত ২০-৩০ বছরের আবহাওয়ার বিভিন্ন অবস্থার গড়পড়তা হিসাবকে জলবায়ু বলে। সাধারণত বৃহৎ এলাকাজুড়ে জলবায়ু নির্ণীত হয়ে থাকে।

জলবায়ু কতিপয় বিষয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে, যেগুলোকে জলবায়ুর নিয়ামক বলা হয়ে থাকে। যথা:

অক্ষাংশের ভিন্নতা ও পরিবর্তনের সাথে সাথেই জলবায়ুরও তারতম্য ঘটে। সূর্য কিরণ সারা বছর লম্ব ভাবে পরার কারণে  নিরক্ষিয় অঞ্চলে  উষ্ণ জলবায়ু  বিরাজ করে ।এবং  মেরু অঞ্চলের দিকে সূর্য রশ্মি ক্রমশ তির্যক হতে থাকে এবং জলবায়ু শিতল হয়। ফলে নিরক্ষিয় অঞ্চলে ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলেও মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে।  নিরক্ষরেখা বরাবর স্থানসমূহে সূর্যরশ্মি খাড়াভাবে পড়ে বিধায় ঐসকল অঞ্চলে উষ্ণতা বেশি। নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে তাপমাত্রা ক্রমেই কমতে থাকে। ১ °সে অক্ষাংশে উষ্ণতা 0.২৮ °সে হ্রাস পায় বলেই নিরক্ষরেখা থেকে সবচেয়ে দূরবর্তি উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে বরফ রয়েছে।

উচ্চতার বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.8° সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এমনকি উচ্চতার তারতম্যে একই অক্ষাংশে অবস্থিত দুই অঞ্চলের তাপমাত্রা দুরকম হয়।

কোনো স্থান সমুদ্র থেকে কতটা দূরে তার প্রেক্ষিতে বাতাসের আর্দ্রতার মাত্রা নির্ভর করে আর আর্দ্রতার প্রেক্ষিতে জলবায়ুর উষ্ণতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। সমুদ্র নিকটবর্তি এলাকার বায়ুতে গরমকালে আর্দ্রতা ও শীতকালে মৃদু উষ্ণতা বিরাজ করে। এধরনের জলবায়ুকে সমভাবাপন্ন জলবায়ু বলে।

সমুদ্র থেকে প্রবাহিত জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু যে অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়, সে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। কিন্তু স্থলভাগ থেকে প্রবাহিত শুষ্ক বায়ু আবার উষ্ণতা বাড়ায়।

কোনো স্থানে বৃষ্টিপাত হলে সেখানকার উত্তাপ কমে আবার বৃষ্টিপাতহীন অঞ্চলে উষ্ণতা বেশি থাকে। তাই মরুভূমি এলাকায় জলবায়ু উষ্ণ। তাছাড়া বৃষ্টিপাতের মাত্রার উপর আর্দ্রতার মাত্রাও নির্ভরশীল, যা জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শীতল বা উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের কারণে উপকূলবর্তি এলাকার আবহাওয়ায়ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এর উদাহরণ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির প্রবাহ এল নিনোর কথা উল্লেখ করা যায়, যার প্রভাবে উপকূলবর্তি দেশগুলোতে দীর্ঘ খরা পর্যন্ত দেখা দিয়েছে।

উঁচু পর্বতে বায়ুপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে আবহাওয়া ও জলবায়ুগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মৌসুমী জলবায়ু বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

গাছের প্রস্বেদন ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। বনভূমির প্রগাঢ়তার কারণে কোনো কোনো স্থানে সূর্যালোক মাটিতে পড়ে না, ফলে ঐসকল এলাকা ঠান্ডা থাকে। তাছাড়া বনভূমি ঝড়, সাইক্লোন, টর্নেডো ইত্যাদির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার রূপ বদলে দেয়।

সূর্যকীরণ উঁচু স্থানের ঢাল বরাবর পড়লে ভূমি উত্তপ্ত হয়ে তাপমাত্রা বাড়ে আবার ঢালের বিপরীত দিকে পড়লে তাপমাত্রা অতোটা বাড়ে না। তাছাড়া ঢাল বরাবর লম্বভাবে সুর্যালোকের পতন, তীর্যকভাবে সূর্যালোক পতনের তুলনায় তুলনামূলক উত্তপ্ত আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।

বেলেমাটির বিশেষত্ব হলো তা যত দ্রুত গরম হয়, তত দ্রুত ঠান্ডাও হয়। সেই তুলনায় কর্দমযুক্ত পলিমাটি দ্রুত গরমও হয়না, গরম হলে ঠান্ডা হতেও দেরি হয়। তাই কোনো স্থানের মাটির বিশেষত্বের উপর আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য দেখা দিতে পারে।




#Article 128: জুলিয়াস সিজার (182 words)


জুলিয়াস সিজার (পুরো নাম - গাইও জুলিও কায়েসার; লাতিন: CAIVS IVLIVS CAESAR, উচ্চারণ: [ˈɡaː.i.us ˈjuːli.us ˈkaɪsar], প্রাচীন গ্রিক Καίσαρ, Kaisar; জন্ম ১৩ জুলাই ১০১ অথবা ১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ - রো্ম - মৃত্যু ১৫ মার্চ ৪৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) ছিলেন রোম সাম্রাজ্যের একজন সেনাপতি এবং একনায়ক; এছাড়া লাতিন ভাষায় রচিত তাঁর লেখা গদ্যসাহিত্যও উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁকে ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলে বিবেচনা করা হয়। যে সমস্ত ঘটনার ফলে তাঁর সমসাময়িক ও ঠিক তার পরবর্তী যুগে রোমের প্রশাসনিক চরিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় ও রোম একটি গণতন্ত্র থেকে একটি একনায়ককেন্দ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়, সেইসমস্ত ঘটনায় জুলিয়াস সিজারের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।এলাম দেখলাম জয় করলামএটি ছিলো জুলিয়াসের বানী।অবাক করা বিষয় রোমান সভ্যতা নদী মাতৃক ছিলো না।

৪৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের শেষপর্যন্ত তিনি রোমের একনায়ক ছিলেন; ৪৭ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে প্রায় দশ বছরের দায়িত্বে এবং ৪৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ অনন্ত একনায়কত্ব হিসেবে। কিছু ইতিহাসবিদের দ্বারা বিবেচনা করা হয়েছিল রোমের প্রথম সম্রাট।

গাল্লীয়া জয়ের সঙ্গে যা আটলান্টিক মহাসাগর এবং রাইনতে, রেস রোমান জনগণ শাসন প্রসারিত করেছিল, প্রথম বারের মত ব্রিটেন এবং জার্মানিদের আক্রমণের জন্য সেখানে রোমান সৈন্যবাহিনী নিয়ে যায় এবং স্পেন, গ্রিস, আফ্রিকা, মিশর এবং পন্তুসতেও যুদ্ধ করে।




#Article 129: ন্যানোপ্রযুক্তি (1398 words)


ন্যানোপ্রযুক্তি (ন্যানোটেকনলজি বা সংক্ষেপে ন্যানোটেক) পদার্থকে আণবিক পর্যায়ে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করবার বিদ্যা। ন্যানোটেকনোলজি বা ন্যানোপ্রযুক্তিকে সংক্ষেপে ন্যানোটেক বলা হয়। ন্যানোটেকনোলজি পদার্থকে আণবিক পর্যায়ে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করার বিদ্যা।
 
সাধারণত ন্যানোপ্রযুক্তি এমন সব কাঠামো নিয়ে কাজ করে যা অন্তত একটি মাত্রায় ১০০ ন্যানোমিটার থেকে ছোট। ন্যানোপ্রযুক্তি বহুমাত্রিক, এর সীমানা প্রচলিত সেমিকন্ডাকটর পদার্থবিদ্যা থেকে অত্যাধুনিক আণবিক স্বয়ং-সংশ্লেষণ প্রযুক্তি পর্যন্ত; আণবিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ থেকে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ন্যানোপদার্থের উদ্ভাবন পর্যন্ত বিস্তৃত। রিচার্ড ফাইনম্যানকে ন্যানোপ্রযুক্তির জনক বলা হয়।

ন্যানোপ্রযুক্তির ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক্স, শক্তি উৎপাদনসহ বহু ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। অপরদিকে পরিবেশের উপর এর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব নিয়েও সংশয় রয়েছে। তারপরও পৃথিবীর বহু দেশে ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে।

১৯৫৯ সালের ২৯ জানুয়ারি রিচার্ড ফাইনম্যান ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির এক সভায় There's Plenty of Room at the Bottom শীর্ষক এক বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতাটিই সর্বপ্রথম ন্যানোপ্রযুক্তির ধারণা দেয়। 
১৯৮৯ সনের নভেম্বরের ৯ তারিখ ন্যানোটেকনলজির জন্য একটা অন্যতম স্মরণীয় দিন হিসবে বিবেচিত হবে। এই দিনে ক্যালিফোর্নিয়ার IBM এর Almaden Research Center এ Don Eigler এবং Erhard Schweizer ৩৫ টি Xenon অণু দিয়ে IBM এর লগোটি তৈরি করেছিলেন। সেইদিনই প্রথম অণুকে ইচ্ছেমত সাজিয়ে পছন্দমত কিছু তৈরি করা সম্ভব হয় মানুষের পক্ষে। এইদিনই প্রথম মানুষ প্রকৃতির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি অণুর কাঠামোকে ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। অণুর গঠনকে ইচ্ছেমত তৈরি করে অনেক কিছু করা সম্ভব। এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার মানুষের সামনে উন্মোচিত হল। শুধু মাত্র অণুর কাঠামোগত পার্থক্য হবার কারণেই কয়লা এত সস্তা আর হীরক এত দামী। দুটি জিনিসের মূল উপাদান হল কার্বণ। শুধু মাত্র অণুর গঠনের পার্থক্যের কারণে হীরক পৃথিবীর সবথেকে শক্ত দ্রব্য আর কয়লা কিংবা পেন্সিলের শীষ নরম।

১৯৯৯ সনে Cornell বিশ্ববিদ্যালয়ের Wilson Ho এবং তার ছাত্র Hyojune Lee অণুকে জোড়া লাগানোর প্রক্রিয়া প্রদর্শন করেন। এতদিন পর্যন্ত অণু-পরমাণুর সংযোগ শুধু মাত্র রাসয়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই সংগঠিত হত। কিন্তু ন্যানোটেকনলজির মাধ্যমে অণু-পরমাণুকে ভেঙে কিংবা জোড়া লাগিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভবনার দ্বার খুলে দিল।

ন্যানো একটি মাপার একক। ম্যাট্রিক একক এর শুরুটা হয়েছিল ১৭৯০ সনে ফ্রান্সে। ফ্রান্স জাতীয় পরিষদ এককগুলিকে সাধারণ করবার জন্য কমিটি গঠন করে এবং তারাই প্রথম ডেসিমাল কিংবা দশ একক এর ম্যাট্রিক পদ্ধতির প্রস্তাব করেন। এবং দৈর্ঘ্যের একক এক মিটার এর সূচনা করেন। তারা পৃথিবীর পরিধির ৪০,০০০,০০০ ভাগের এক ভাগকে এক মিটার বলেন। মিটার শব্দটি গ্রিক শব্দ metron থেকে এসেছে যার অর্থ হল, পরিমাপ। এছাড়া মিটার এর ১০০ ভাগের এক ভাগকে সেন্টিমিটার বলা হয়। ১৭৯৩ সনে ফ্রান্সে আইন করে তা প্রচলন করা হয়। ১৯৬০ সনে এই মিটার এর সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়। ক্রিপটন ৮৬ এর কমলারঙের রেডিয়েশন এর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ১,৬৫০,৭৬৩.৭৩ ভাগের এক ভাগকে মিটার বলা হয়। ১৯৮৩ সনে মিটার এর সংজ্ঞা পুনরায় পরিবর্তিত করা হয়, বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী, বায়ুশুন্যে আলোর গতির ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ ভাগের এক ভাগকে মিটার বলা হয়। এই মিটার এর ১,০০০,০০০,০০০ (১০০ কোটি) ভাগের এক ভাগকে ন্যানোমিটার বলা হয়। ন্যানো শব্দটি গ্রিক nanos শব্দ থেকে এসেছে যার অভিধানিক অর্থ হল dwarft কিন্তু এটি মাপের একক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এই ন্যানোমিটার স্কেলে যে সমস্ত টেকনোলজি গুলি সর্ম্পকিত সেগুলিকেই বলে ন্যানোপ্রযুক্তি।

মিটার এককটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত। বাড়িঘর আসবাবপত্র সবই আমরা মাপি এই মিটার এককে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত মিলিমটার স্কেলে যন্ত্রপাতির সূক্ষতা মাপা হত। মিলিমিটার এর ছোট কোন কিছু নিয়ে চিন্তা ভাবনার অবকাশ ছিলনা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা হল। সেমিকণ্ডাকটর তার পথযাত্রা শুরু করল। আর এর শুরুটা হল, ট্রানজিস্টর আবিষ্কার দিয়ে। তখন মাইক্রোমিটার একক দিয়ে আমাদের চিন্তভাবনা শুরু হল। বলা যায় যাত্রা শুরু হল, মাইক্রোটেকনোলজির।

এর পরে টেকনোলজি এগুতে লাগলো প্রচন্ড গতিতে। নানা জিনিসপত্র, যার মধ্যে টেলিভিশন, রেডিও, ফ্রিজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তা কিভাবে আরো ছোট করা যায় তা নিয়েই প্রচন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কোন কম্পানি কত ছোট আকারের এই সমস্ত ভোগ্য জিনিস আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে, তার প্রতিযোগিতা শুরু হল। আর এই সমস্ত ব্যাপারটা সম্ভব হল, সেমিকণ্ডাকটর সংক্রান্ত প্রযুক্তির কল্যাণে। প্রথম দিকের রেডিও কিংবা টিভির আকার দেখলে আমাদের এখন হাসি পাবে। এত বড় বড় জিনিস মানুষ ব্যবহার করত কিভাবে? সেই প্রশ্নটি হয়তো এসে দাড়াবে। কিন্তু এখন বাজারে দেয়ালে ঝুলাবার জন্য ক্যালেন্ডারের মত পাতলা টিভি এসেছে। সামনে হয়তো আরো ছোট আসবে।

১৯৮০ সনে IBM এর গবেষকরা প্রথম আবিষ্কার করেন STM(Scanning Tunneling Microscope) এই যন্ত্রটি দিয়ে অণুর গঠন পর্য়ন্ত দেখা সম্ভব। এই যন্ত্রটির আবিষ্কারই ন্যানোপ্রযুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। কিভাবে কাজ করে এই STM। এই যন্ত্রে খুব সূক্ষ পিনের মত সুচাল টিপ আছে এবং তা যখন কোন পরিবাহী বস্তুর খুব কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তা থেকে টানেলিং নামে খুব অল্প পরিমাণে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়। এবং এই বিদ্যুৎ এর পরিমাণ দিয়েই সেই বস্তুটির বাহিরের স্তরের অণুর চিত্র তৈরি করা হয়। তবে এই STM এর ক্ষেত্রে যা দেখতে চাইবো তাকে অবশ্যই বিদ্যুৎ পরিবাহী হতে হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ অপরিবাহীর অণুর গঠন কিভাবে দেখা যাবে? না মানুষ বসে থাকেনি। অসম্ভবকে সম্ভব করেই মানুষ যেভাবে এতদূর এসেছে, তেমনি ভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেল AFM দিয়ে। STM এর ক্ষেত্রে টানেলিং বিদ্যুৎ দিয়ে কাজ করা হয় এবং AFM দিয়ে সূক্ষ্ম পিন দিয়ে অণুর গঠন দেখা সম্ভব।

ন্যানোটেকনোলজির ক্ষেত্র দুটি প্রক্রিয়া আছ। একটি হল উপর থেকে নিচে (Top to Bottom)ও অপরটি হল নীচ থেকে উপর (Bottom to top)। টপডাউন পদ্ধতিতে কোন জিনিসকে কেটে ছোট করে তাকে নির্দিষ্ট আকার দেয়া হয়। এই ক্ষেত্র সাধারণত Etching প্রক্রিয়াটি সর্ম্পকিত। আর ডাউনটুটপ হল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারের ছোট জিনিস দিয়ে বড় কোন জিনিস তৈরি করা। আমাদেরর বর্তমান ইলেক্ট্রনিক্স হল, টপডাউন প্রযুক্তি। আর ন্যানোটেকনোলজির হল, বটমটপ প্রযুক্তি। ন্যানোমিটার স্কেলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুর উপাদান দিয়ে তৈরি করা হবে এই ন্যানোপ্রযুক্তিতে। সহজে বুঝবার জন্য একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন, আপনার একটা বিশেষ ধরনের DNA এর প্রয়োজন। সুতরাং বটমটপ প্রযুক্তিতে, সেই DNA এর ছোট ছোট উপাদান গুলিকে মিশ্রন করে সেই কাঙ্খিত DNA টি তৈরি করা হবে। তবে নানোপ্রযুক্তিতে শুধু মাত্র বটমটুটপ প্রযুক্তিই নয়, বরং টপটুবটম প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই দুটির সংমিশ্রন করা হবে।

আমরা যারা কম্পিউটার ব্যবহার করছি তারা জানি যে, প্রতি বছরই কম্পিউটার এর মূল্য কমছে। প্রতিবছরই আগের তুলনায় সস্তায় আরো ভাল কার্যক্ষমতার কম্পিউটার পাওয়া যাচ্ছে। আসলে এই কম্পিউটার এর সাথেও ন্যানোটেকনোলজি সম্পর্কিত রয়েছে। কম্পিউটার এর ভিতর যে প্রসেসর আছে, আপনারা প্রায় সবাই ইন্টেল প্রসেসর এর নাম শুনে থাকবেন? এই প্রসেসর এর ভিতরে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ন্যানোমিটার স্কেলের সার্কিট। আর তাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানোটেকনলজি। ইন্টের প্রসেসরে, সিলিকন এর উপর প্যাটার্ণ করে সার্কিট বানান হয় তার বর্তমান সাইজ হল ১০০ ন্যানোমিটার। সামনের তিন বছরে এর আকার হবে ৭০ ন্যানোমিটার। এবং সাতবছরে এর আকার হবে ৫০ ন্যানোমিটার। ইন্টেল আশা করছে যে ২০১০ সনে তারা ৩০ ন্যানোমিটার সাইজে নিয়ে আনতে পারবে। আর আজকের থেকে তখন এই প্রসেসর এর আকার অর্ধেক হয়ে আসবে। সেই দিনটা খুব বেশি দূরে নয় যেদিন আপনার মোবাইলটি কাজ করবে কম্পিউটারের মত। (বর্তমানেই এই ধরনের কিছু মোবাইল বাজারে এসেছে)। এছাড়া রয়েছে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক। এই হার্ডডিস্কের তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা দিন দিন বড়ছে। এই হার্ডডিস্কেও ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানোটেকনলজি। এখন বাজারে ৪ টেরাবাইটের হার্ডডিস্ক পাওয়া যাচ্ছে। অথচ এই ব্যাপারটা আজ হতে ১০ বছর আগেও ছিল কল্পনার বাহিরে।

ন্যানোটেকনলজি দিয়ে সার্কিট বানান যতটা সোজা বলে মনে করা হয়, ব্যাপারটা ততটা সোজা নয়। সেইখানে প্রধান যে বাধা এসে দাড়াবে তা হল, স্থির বিদ্যুৎ। শীতের দিনে বাহির থেক এসে দরজার নবে হাত দিয়েছেন? এমনি সময় হাতে শক লাগল কিংবা অন্ধকারে সুয়েটার খুলতে গেছেন এমনি সময় বিদ্যুৎ এর মত কণা সুয়েটারে দেখা গেল। এইগুলি সবই আমাদের প্রাত্যাহিক দিনে ঘটে, আর এইগুলিই হল স্থির বিদ্যুতের কারসাজি। সাধারণ ইলেক্ট্রিক সার্কিটের মধ্যে এই স্থির বিদ্যুৎ থেকে সার্কিটটিকে রক্ষা করার ব্যবস্থা থাকে। যদি তা না করা হত, তাহলে কোন একটা কারণে স্থির বিদ্যুৎ আপনার বৈদ্যুতিক সারঞ্জামকে নষ্ট করে দিত। কিন্তু ন্যানোটেকনলজির ক্ষেতে বৈদ্যুতিক সার্কিট কল্পনাতিত ছোট হয়ে যায় বলে গতানুগতিক পদ্ধতিতে রক্ষা করা সম্ভব নয়। কিভাবে ন্যানোস্কেলেও এই সার্কিটগুলিকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। স্থির বিদ্যুৎ সার্কিটে কীরকম ক্ষতি করতে পারে? প্রকৃতপক্ষে ছোটসার্কিটে স্থিরবিদ্যুত প্রায় ১৫০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এর মত তাপ সৃষ্টি করে। এই তাপে সার্কিট এর উপকরণ গলে, সেই সার্কিটটিকে নষ্ট করে দিতে পারে। এই কারণে ১৯৯৭ এর পরে IC সার্কিটে গতানুগতিক ভাবে ব্যবহৃত এলুমিনিয়ামের পরিবর্তে তামা ব্যবহৃত হয়। কেননা তামার গলনাঙ্ক ১০৮৩ যেখানে এলুমিনিয়ামের গলনাঙ্ক ৬৬০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। ফলে অধিক তাপমাত্রাতেও তামা এ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় ভাল কাজ করবে।

ন্যানোটেকনলজির ভিত্তিতে অনেক অনেক নতুন নতুন টেকনলজির উদ্ভব হচ্ছে। নতুন নতুন দ্রব্য এর সূচনা করছে এবং সেই সাথে ব্যবসায়িক সুযোগের দ্বার উন্মোচন করছে। আশা করা হচ্ছে যে আমেরিকাতে ২০১০ সনের আগে ন্যানোটেকনলজি সম্পর্কিত পণ্যের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌছবে এবং ৮ লক্ষ নতুন চাকরির সুযোগ করে দেবে। ন্যানোটেকনলজির গুরুত্বের কথা চিন্তা করে আমেরিকার সরকার বর্তমানে ন্যানোটেকনলজি সংক্রান্ত গবেষণাতে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ৪২২ মিলিয়ন ডলার এবং ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৭১০ মিলিয়ন ডলার ব্যবহৃত হয়েছিল। শুধু সরকারই নয়, পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ন্যানোটেকনলজি গবেষণায় অর্থ সরবরাহ করছে। তার কারণ হল: ন্যানোটেকনলজি সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে যাচ্ছে। যদিও ন্যানোটেকনলজি খুব ক্ষুদ্র টেকনলজি সংক্রান্ত জিনিসগুলি নিয়ে কাজ করে যার ব্যাস একটি চুলের ব্যাসের ৮০ হাজার ভাগের এক ভাগ, কিন্তু এর ক্ষেত্র দিন দিন আরো বর্ধিত হচ্ছে। ১৯৯৬ সনের নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত রিচার্ড স্মলি বলেছেন,




#Article 130: রিচার্ড ফাইনম্যান (1359 words)


রিচার্ড ফিলিপ্‌স ফাইনম্যান (১১ই মে, ১৯১৮ - ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮) একজন নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি তার কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পাথ ইন্টিগ্রাল ফর্মুলেশন, কোয়ান্টাম তড়িৎ-গতিবিজ্ঞান তত্ত্ব এবং অতিশীতলকৃত তরল হিলিয়ামের চরমপ্রবাহমানতা ক্রিয়াকৌশল ব্যাখ্যা করেছেন ও কণা পদার্থবিজ্ঞানে তার কাজের জন্য (তিনি পার্টন মডেল প্রস্তাব করেন।) খ্যাত। কোয়ান্টাম তড়িৎ-গতিবিজ্ঞানে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৫ সালে ফাইনম্যান মার্কিন বিজ্ঞানী জুলিয়ান শুইঙার এবং জাপানি বিজ্ঞানী সিন-ইতিরো তোমোনাগার সাথে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। ফাইনম্যান অতিপারমাণবিক কণাসমূহের আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী গাণিতিক প্রকাশের বহুল ব্যবহৃত একটি চিত্ররূপ প্রদান করেন, যা ফাইনম্যান চিত্র নামে পরিচিত। জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও ফাইনম্যান পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ও বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত।

ফাইনম্যান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর অন্যান্য অনেক তরুণ পদার্থবিদের সাথে নিউ মেক্সিকোর লস আলামোসে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সাহায্য করেন। যুদ্ধশেষে প্রথমে তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীকালে ক্যালটেকে শিক্ষকতা করেন। তাকে কোয়ান্টাম গণনা এবং ন্যানোপ্রযুক্তির (আণবিক স্তরে যন্ত্রপাতি তৈরি) ধারণার জনক বলা হয়।. 
 
ফাইনম্যান তার বিভিন্ন বই ও লেকচারের মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার কাজ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৫৯ সালে ন্যানোপ্রযুক্তির ওপর প্রদত্ত ভাষণ দেয়ার্স প্লেনটি অফ রুম অ্যাট দা বটম, এবং দ্য ফাইনম্যান লেকচার্স অন ফিজিক্স। ফাইনম্যান তার আধা-আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ শিওরলি ইউ আর জোকিং, মি. ফাইনম্যান! এবং হোয়াট ডু ইউ কেয়ার হোয়াট আদার পিপল থিংক? ইত্যাদির জন্যেও খ্যাত। তিনি ছিলেন একজন প্রাঙ্কস্টার, জাগলার, সেফক্রাকার, শখের চিত্রশিল্পী ও বঙ্গোবাদক। তিনি ছিলেন মুক্ত চিন্তার অধিকারী একজন সুরসিক ব্যক্তি। পদার্থবিজ্ঞান ছাড়াও তার জীববিজ্ঞান, চিত্রকলা, মায়ান স্ক্রিপ্ট এবং সেফক্রাকিং-এ আগ্রহ ছিল।

ফাইনম্যানের জীববিজ্ঞানে গভীর আগ্রহ ছিল; তার জিনবিজ্ঞানী ও অণুজীববিজ্ঞানী এস্থার লিডারবার্গের বন্ধুত্ব ছিল, যিনি রেপ্লিকা প্লেটিং ও ব্যাকটেরিওফায ল্যামডা আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের বেশ কিছু বিজ্ঞানী সাথে সখ্যতা ছিল, যাঁরা নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে ক্যারিয়ার শুরু করলেও নৈতিক কারণে জিনতত্ত্বে আগ্রহী হন—তাদের মধ্যে লিও জিলার্ড, গুইদো পনটেকরভো, এরন রোভিক এবং কার্ল সাগান উল্লেখযোগ্য।

রিচার্ড ফিলিপ ফাইনম্যান ১১ মে, ১৯১৮ সালে নিউ ইয়র্কের ফার রকওয়ে, কুইনসে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা রাশিয়া ও পোল্যান্ডের আদি অধিবাসী ছিলেন এবং তার পিতামাতা উভয়েই ছিলেন ইহুদি, তবে তারা গোঁড়া ছিলেন না। ফাইনম্যান (দুই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও এডওয়ার্ড টেলারের মতো) দেরিতে কথা বলা শুরু করেছিলেন; তিন বছর পূর্ণ হবার আগ পর্যন্ত তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। শৈশবে ফাইনম্যান তার বাবা মেলভিল ভীষণভাবে প্রভাবিত করেন, তিনিই তাকে প্রচলিত চিন্তা-ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখিয়েছিলেন। আর মা লুসিলের কাছ থেকে ফাইনম্যান পেয়েছিলেন রসবোধ। ছোটোবেলা থেকেই তার বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ছিল; তিনি রেডিও মেরামত করে আনন্দ পেতেন এবং প্রকৌশলেও তার প্রতিভার কমতি ছিল না। তার বোন জোয়ানও একজন পেশাদার পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন।

ফাইনম্যান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, তার আইকিউ ছিল ১২৫। কলেজে প্রবেশের আগেই তিনি ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস জানতেন। গণিতে তার অপার আগ্রহ ছিল, তিনি জুনিয়র স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে স্কুলের গণিত দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন এবং নিত্য নতুন সমস্যা সমাধান করার কৌশল আবিষ্কার করা তার নেশার মত ছিল। এছাড়া গণিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রতীকের নিজস্ব রূপ উদ্ভাবন করাটাও তার শখ ছিল, তার আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন ত্রিকোণমিতির সাইন, কোসাইন এবং অন্যান্য অনেক প্রচলিত প্রতীকের নিজস্ব রূপ তিনি ব্যবহার করতেন। অবশ্য পরবর্তীকালে তিনি এ শখটি পরিত্যাগ করেন, কারণ অন্য মানুষজন তার প্রতীকের সাথে পরিচিত ছিল না। 
  
ফাইনম্যান ফার রকওয়ে হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন, যাতে নোবেল বিজয়ী বার্টন রিখটার ও বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ পড়েছিলেন। ফাইনম্যান তার হাই স্কুলে পড়াশোনার শেষ বছরে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ম্যাথ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন; তার প্রাপ্ত নম্বরের সাথে নিকটতম প্রতিযোগীর নম্বরের ব্যবধান বিচারকদের বিস্মিত করেছিল। তিনি ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ১৯৩৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক অর্জন করেন এবং এরপর তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে যান। প্রিন্সটনে নির্বাচনী পরীক্ষায় তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পারফেক্ট স্কোর করেন, যা ছিল একটি রেকর্ড - তবে ইতিহাস ও ইংরেজি ভাষা অংশে তিনি অতটা ভালো করতে পারেননি। তিনি ১৯৪২ সালে জন আর্কিবাল্ড হুইলারের অধীনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল প্রিন্সিপাল অফ স্টেশনারি একশান। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এই কাজই তার পাথ ইন্টিগ্রালের ভিত্তি ছিল, যার মাধ্যমে দ্য প্রিন্সিপাল অফ লিস্ট একশান ইন কোয়ান্টাম মেকানিকস গড়ে ওঠে।

প্রিন্সটনে থাকাকালীন সময়ে পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট আর. উইলসন ফাইনম্যানকে ম্যানহাটন প্রকল্পে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান— যা ছিল লস আলামসে যুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প। জার্মানিতে অ্যাটম বোমা তৈরির পূর্বেই কাজটি সম্পন্ন করার গুরূত্ব অনুধাবন করে ফাইনম্যান এর সাথে যুক্ত হন। তাকে হানস বেথের অধীনে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়, এবং বেথেকে চমৎকৃত করে তিনি একটি দলের নেতা নিযুক্ত হন। রবার্ট সার্বারের কাজের ওপর ভিত্তি করে ফাইনম্যান ও বেথে ফিশন বোমার বিধ্বংসী ফলাফল নির্ণয়ের জন্যে যৌথভাবে বেথে-ফাইনম্যান ফর্মুলা তৈরি করেন। ফাইনম্যান এই প্রকল্পে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করেছেন এবং ট্রিনিটি পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন। তার দাবী অনুযায়ী বিস্ফোরণ একমাত্র তিনিই খালি চোখে (সহায়ক কালো গ্লাস না লাগিয়ে) পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি একটি ট্রাকের উইন্ডশিল্ডের মধ্য দিয়ে বিস্ফোরণ অবলোকন করেছিলেন, যার কাচ ক্ষতিকর অতিবেগুনী তেজষ্ক্রিয়তা শুঁষে নেবে বলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

তখনকার সময়ে কম্পিউটার ছিল না বলে ম্যানহাটন প্রজেক্টে মানব কম্পিউটার ব্যবহার করা হত, আর ফাইনম্যান গণনার তত্ত্বাবধান করতেন। এছাড়াও তার কাজের মধ্যে ছিল নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটর ডিজাইন করা।

কাজটির নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তার কারণে লস আলামস ছিল জনবিরল। ফাইনম্যানের ভাষায়, ওখানে করবার মতো কিছুই ছিল না, বসে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে ফাইনম্যান নানানরকম মজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ম্যানহাটন প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীদের সব চিঠিপত্রই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করার পর (মানে প্রয়োজনীয় সম্পাদনার পর) প্রেরিত হত। ফাইনম্যান প্রায়ই তার সহকর্মীদের সাথে বাজি ধরতেন কোন কথাটা কাচির তলা পড়বে আর কোনটা পড়বে না তা নিয়ে। তিনি এ বিষয়ে একটা নিয়মও আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আবার একবার তিনি ল্যাবরেটরি আবেষ্টন করা কাঁটাতারের বেড়ায় একটি ফাঁক আবিষ্কার করলেন, যা কর্মচারীরা শর্টকাট হিসাবে ব্যবহার করতো। তিনি তা নিরাপত্তা কর্মীদের নজরে আনবার জন্যে বারবার গেট দিয়ে বের হয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আবার গেট দিয়ে বের হতে লাগলেন। এভাবে নিত্য নতুন ফন্দি আঁটা ফাইনম্যান কম্বিনেশন লক খোলার বিদ্যা শিখতে উঠে পড়ে লাগলেন। তিনি খেয়াল করেছিলেন বিজ্ঞানীরা ও কর্মকর্তারা পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত অতি গোপনীয় কাগজপত্র যেসব স্থানে তালাবন্ধ অবস্থায় রাখেন তা আদৌ নিরাপদ নয়। তিনি প্রায়ই এসব ক্যাবিনেট ও সেফের তালা খুলে সহকর্মীদের সাথে প্র্যাকটিকাল জোক করতেন। একসময় ব্যাপারটা তার নেশায় পরিণত হয় এবং তিনি সেফক্রাকিং এর ওপর রীতিমতো পড়াশোনা করে তালা খোলার বিদ্যা পারদর্শীতা অর্জন করেন। লস আলামসে কম্বিনেশন লকের নিরাপত্তা যাচাই করার জন্যে তার কাছে মতামত চাওয়া হতে শুরু করে। ফাইনম্যান কম্বিনেশন লকের কম্বিনেশন বের করার মজার এক বুদ্ধি বের করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তালা খুলে নানান হাস্যরসাত্মক ঘটনার জন্ম দিতেন।

১৯৪২ সালে ডক্টরেট করার পর ফাইনম্যান ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ম্যানহাটন প্রজেক্টে যোগদানের কারণে তার নিয়োগের পরপরই তিনি ছুটিতে চলে যান। ১৯৪৫ সালে তিনি ডিন মার্ক ইনগ্রাহামের কাছ থেকে একটি চিঠি পান, যাতে তাকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পাঠদানের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ফাইনম্যান এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু না বলায় তার নিয়োগ আর বর্ধিত করা হয়নি। পরবর্তীকালে ফাইনম্যান ইউডব্লুতে কয়েকটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি মন্তব্য করেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে কারণ আমাকে চাকরিচ্যুত করার সুবুদ্ধি বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে।

যুদ্ধের পর ফাইনম্যান প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্স স্টাডির আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন, কুর্ট গোডেল, জন ভন নিউম্যান প্রমুখ বাঘা বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর চাকরি গ্রহণ করেন। ফাইনম্যান ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পরযন্ত কর্নেলে পদার্থবিজ্ঞানে গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগের পাঠদান করেন। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর তার গবেষণায় একটু ভাঁটার টান চলে, তবে তার পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আনন্দময় গবেষণা করার অভ্যাসটি তিনি শীঘ্রই ফিরে পান। একবার ক্যাফেটেরিয়ায় বসে এক কর্নেলের লোগো আঁকা প্লেট নিয়ে এক দড়াবাজিকরের খেলা দেখতে দেখতে তিনি প্লেট ও লোগোর ঘূর্ণনের সম্পর্কের একটি জটিল হিসাব নিকাশ সম্পন্ন করেন, যা পরবর্তীকালে তার নোবেল পুরস্কার পাওয়া কাজের ভিত্তি।

ফাইনম্যান অসাধারণ ব্যাখ্যাদাতা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। ছাত্রদের কোন কিছু সহজভাবে বোঝানোর ব্যাপারটি তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন এবং পাঠ্য বিষয় ছাত্রদের হৃদয়ঙ্গম করাকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করতেন। তিনি মনে করতেন একজন প্রথম বর্ষের ছাত্রকে যেকোন বিষয় বোঝানো সম্ভব, তা না করতে পারার মানে হল শিক্ষক নিজে বিষটি সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারেন নি। তার বিভিন্ন লেকচার এবং বক্তৃতায় এ নীতির ছাপ স্পষ্ট লক্ষ করা যায়।

না বুঝে পদার্থবিজ্ঞান বা বিজ্ঞানের যে কোন বিষয় পড়াকে ফাইনম্যানের অর্থহীন মনে হত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়েই লক্ষ্য করেছিলেন তার সহপাঠীরা যা শেখে তা অনেকটাই গ্রন্থগত; পরবর্তীকালে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তির মধ্যেও এমন সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করেন। কর্নেলে অধ্যাপনারত অবস্থায় ফাইনম্যান কিছুদিনের জন্যে পরিদর্শক অধ্যাপক হিসেবে ব্রাজিলে যান। সেখনে গিয়ে তিনি খেয়াল করেন সেখানকার বিজ্ঞান শিক্ষার দৈন্যদশা এবং পাঠ্যপুস্তকের দুর্বলতা। তিনি সে দেশের শিক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় কনফারেন্সে অকুন্ঠচিত্তে এ বিষয়ে সমালোচনা করেন। তিনি যা ভালো মনে করতেন তা করতে তিনি কখনো দ্বিধাবোধ করতেন না। তিনি নির্বুদ্ধিতা বা ভান করা পছন্দ করতেন না এবং যারা তাকে বোকা বানাতে চাইত তাদের তিনি সহজে ছেড়ে দিতেন না।




#Article 131: ইয়োহান জেবাস্টিয়ান বাখ (336 words)


ইয়োহান জেবাস্টিয়ান বাখ () (২১শে মার্চ, ১৬৮৫ পু. প. – ২৮শে জুলাই, ১৭৫০ ন. প.) একজন জার্মান সুরকার ও অর্গানবাদক। তার কাজের পরিমাণ বিপুল। কয়ার, অর্কেস্ট্রা ও একক বাদনের জন্য লেখা তার ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সঙ্গীতকর্ম বারোক পর্বের বিভিন্ন সাঙ্গীতিক ধারাকে একত্রিত করে ও পূর্ণতা প্রদান করে। বাখ কোন নতুন ধরনের সঙ্গীত উদ্ভাবন করেননি। তবে তিনি কাউন্টারপয়েন্ট, ছোট থেকে বড় স্কেলে সুনিয়ন্ত্রিত প্রগমন, ইতালি ও ফ্রান্সের সঙ্গীত থেকে ঋণ করা ছন্দ ও টেক্সচারের প্রয়োগ, ইত্যাদি কৌশল ব্যবহার করে তার সমকালীন জার্মান সঙ্গীতকে ঋদ্ধ করেন। তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা সুরকার হিসেবে খ্যাত।

জীবিত অবস্থায় একজন দক্ষ অর্গানবাদক হিসেবে প্রচুর খ্যাতি লাভ করলেও সুরকার হিসেবে বাখ তেমন পরিচিতি পান নি। বাখের সমসাময়িক অন্যান্য সুরকাররা বারোক ঘরানার গঠন ও কনট্র্যাপচুয়াল ধরনের সঙ্গীতের প্রতি তার অণুরাগকে সেকেলে মনে করতেন‌- বিশেষ করে তার সঙ্গীতজীবনের শেষের দিকে, যখন মূলধারার সঙ্গীত ক্রমশ রকোকো, ও আরও পরবর্তীকালে ধ্রুপদী, রূপ গ্রহণ করতে থাকে। বাখের সঙ্গীত সম্পর্কে সঙ্গীতজ্ঞদের সত্যিকারের আগ্রহ দেখা যায় ১৯শ শতকের প্রথম দিকে; অন্যদের হাতে তার সঙ্গীতের চর্চাও শুরু হয় এ সময়েই।

বাখের সঙ্গীতকর্ম চিন্তার গভীরতা, কৌশলগত দক্ষতা ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। নিচে Weihnachtsoratorium থেকে নেয়া কোরাস Ehre sei Gott in der Höhe শুনুন। এটি বাখ ১৭৩৪-এ রচনা করেন।

সাংক্‌ত গেয়র্গেস গির্জার অর্গানবাদক ইয়োহান আমব্রোসেউস বাখ এবং মারিয়া এলিজাবেটা বাখের সবচেয়ে ছোট ছেলে ইয়োহান জেবাস্টিয়ান বাখ জার্মানির টুরিঙেন প্রদেশের আইজেনাখ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার হাতেই বেহালা এবং হারপসিকর্ড বাদনে বাখের হাতেখড়ি হয়। বাখের চাচারা সবাই ছিলেন পেশাদার সঙ্গীতবিদ; চার্চের অর্গানবাদক, রাজসভার বাজিয়ে, সুরকার হিসেবে নানা জায়গায় কর্মরত ছিলেন তারা। এই চাচাদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতিমান একজন, ইয়োহান ক্রিস্টফ বাখ (১৬৪৫‌-১৬৯৩), অর্গানের সাথে জেবাস্টিয়ান বাখের পরিচয় করান। সঙ্গীত বিষয়ে নিজের পরিবারের অর্জন নিয়ে বেশ গর্ব ছিলো বাখের, যার বহিঃপ্রকাশ ১৭৩৫ সালে তার নিজের হাতে করা বাখ সঙ্গীত পরিবারের উৎস নামক বংশপঞ্জিকার খসড়া।

বাখের মা ১৬৬৪ সালে মারা যান,এবং তার বাবা এর ৮ মাস পরেই মারা যান।১০ বছর বয়সের এতিম এই শিশু তার ভাইদের মধ্যে সবার বড় johann christopher bach(1671-1721) যিনি ছিলেন Michaeliskirche (Ohrdruf, Sachsen-Gotha-Altenburg এ অবস্থিত) এর একজন অর্গানবাদক।ঐ সময় তিনি তার ভাইয়ের কাছ থেকে সঙ্গীত সম্বন্ধে মূল্যবান জ্ঞান লাভ করেন এবংcalvichord বাজানো শেখেন।




#Article 132: দ্য বিটল্‌স (852 words)


দ্য বিটল্‌স (ইংরেজি: The Beatles) ছিল ইংল্যান্ডের লিভারপুলের একটি রক সঙ্গীত গ্রুপ। এর চার সদস্য ছিলেন জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন এবং রিঙ্গো স্টার। বিটল্‌স জনপ্রিয় ধারার সঙ্গীতের ইতিহাসে সমালোচক ও শ্রোতা উভয় দিক থেকেই শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীত দল ছিল। ১৯৬০ এর দশকের মধ্যভাগে বিটল্‌স অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৬৯ এ বিটল্‌স ভেঙ্গে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও সারা পৃথিবীতে বিটল্‌স এখন পর্যন্ত জনপ্রিয়।

প্রথম যুগের রক এন্ড রোল এবং পপ সঙ্গীতে তাদের প্রভাবের জন্য তাদের শিল্পসম্মত অর্জন ও বাণিজ্যিক সফলতা একটি মর্যাদাপূর্ণ আসনে আসীন হয়ে আছে। যদিও তাদের প্রাথমিক সাঙ্গীতিক ধরন ১৯৫০-এর রক এ্যান্ড রোল এর মূলে প্রোথিত ছিল, তারপরও বিভিন্ন সাঙ্গীতিক ধরন, যেমন, লোক সঙ্গীত, রকাবেলী সাইকেডেলিক এবং ভারতীয় সঙ্গীতের বিভিন্নতাকে ধারণ করেছিল বিটল্‌স।

বিটল্‌স্ এর প্রভাব সঙ্গীতের বাহিরেও ব্যাপ্ত ছিল। তাদের পোশাক-আশাক, কেশবিন্যাস, বক্তব্য, এমনকি তাদের পছন্দের সঙ্গীত যন্ত্রসমূহের প্রভাব ১৯৬০ দশকজুড়ে তাদেরকে দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী হিসেবে তৈরি করে ফেলেছিল। আজ পর্যন্ত বিটল্‌স অন্য যেকোন ব্যান্ড দলের চেয়ে বেশি অ্যালবাম বিক্রি করেছে। যুক্তরাজ্যে তাদের ৪০টি বিভিন্ন অ্যালবাম বেরিয়েছিল যা সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই বাণিজ্যিক সফলতার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল অন্যান্য অনেক দেশেই। ই.এম.আই. এর অনুমান অনুযায়ী ১৯৮৫ এর মধ্যে বিটল্‌স্ এর এক বিলিয়নের উপর ডিস্ক ও টেপ বিক্রি হয়েছিল। আমেরিকাতেও একক গান এবং অ্যালবাম বিক্রির ক্ষেত্রে বিটল্‌স ছিল সর্বকালের সেরা শিল্পী দল।

২০০৪ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন বিটল্‌সকে সর্বকালের সেরা ১০০ শ্রেষ্ঠ শিল্পীর তালিকার শীর্ষে স্থান দেয়।

১৯৫৭ সালের মার্চে লিভারপুলের কুয়েরি ব্যাংক গ্রামার স্কুলে পড়াকালীন সময়ে জন লেনন দ্য কোয়ারিমেন নামে একটি দল গঠন করেন। ১৯৫৭ সালের ৬ জুলাই সেইন্ট পিটার্স চার্চের উল্টন গার্ডেনে লেননের সাথে পল ম্যাককার্টনির সাক্ষাৎ হয় এবং এর কিছুদিন পর লেনন তাকে ব্যান্ডে যোগ দেবার আমন্ত্রণ জানান। ১৯৫৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তরুণ গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসনকে লিভারপুলের উইন্সটন হলে দলটির শো দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ম্যাককার্টনি ও হ্যারিসন ছিলেন একই এলাকার বাসিন্দা। লিভারপুল ইনস্টিটিউট থেকে ফেরার সময় তারা পরিচিত হন এবং ম্যাককার্টনির অনুরোধে জর্জ হ্যারিসন লিড গিটারিস্ট হিসেবে দ্য কোয়ারিমেন দলে যোগ দেন। লেনন শুরুতে কম বয়স্ক হবার কারণে হ্যারিসনকে নিতে না চাইলেও ১৯৫৮ সালের মার্চে দলের সাথে মহড়ার পর তিনি সন্তুষ্ট হন। সে সময় নিয়মিত সদস্য যোগ দিয়েছেন আবার বেরিয়েও গেছেন। ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে লেননের ক্লেজ জীবনের বন্ধু স্টুয়ার্ট সাটক্লিফ বেজ গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন। লেনন ও ম্যাককার্টনি উভয়েই রিদম গিটার বাজাতেন। দলে ড্রামারের সঙ্কট ছিল। পরে ১৯৬২ সালে রিঙ্গো স্টার দলটিতে যোগ দান করেন। রিঙ্গোকে সঙ্গে নিয়ে দলটি তাদের নিজস্ব একক গানগুলো বিভিন্ন কনসার্টে পরিবেশন করতে থাকে। ম্যাককার্টনি ও লেনন ম্যাককার্টনি/লেনন গান লেখায় জুটি গড়ে তোলেন। ইতোমধ্যেই তারা বেশ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন।

কোয়ারিমেন ব্যান্ডের নাম বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়— জনি অ্যান্ড দ্য মুনডগস, লং জন অ্যান্ড দ্য বিটল্‌স, দ্য সিলভার বিটল্‌স, এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে দ্য বিটল্‌স নামটি স্বীকৃতি পায়। ব্যান্ডের নাম ও নামের বানান নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। তবে সাধারণত লেননকেই নামকরনের কৃতিত্ব দেয়া হয়, যিনি বলেছিলেন নামটি বিটল (beetle) পোকা (বাডি হলির দ্য ক্রিকেটস নামে ব্যান্ড ছিল) ও বিট (beat) এর মিলনে তৈরি করা হয়েছে। সিনথিয়া লেননের মতে বিটল্‌স নামটি রর্যাাভেনশ হল বারের বিয়ার-পূর্ণ টেবিলে মাথা খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে। লেনন যিনি একই ঘটনার বিভিন্ন কাহিনী বলার জন্য বিখ্যাত, ১৯৬১ সালে মার্সি বিট ম্যাগাজিনকে বলেন, স্বপ্নে একটি মানুষ জলন্ত পাই নিয়ে তাদের কাছে আসে এবং বলে যে আজকে থেকে তারা এ বানানের বিটল্‌স। ২০০১ সালে এক সাক্ষাৎকারে পল ম্যাককার্টনি নামের বিদঘুটের বানানের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, জন বিটল্‌স (beetles) নামের প্রস্তাব করেছিল, তখন আমি বলি বিটল্‌স (beatles) হলে কেমন হয়? কারণ আমি ড্রামের বিট পছন্দ করি। তখন সবাই এটি বেশ পছন্দ করে।

১৯৬৩ সালের ২২ মার্চ দ্য বিটল্‌স এর প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম প্লিজ প্লিজ মি মুক্তি পায়। ১৯৬২ সালের জনপ্রিয় একক গানগুলোর পাশাপাশি নতুন কিছু গানসহ মোট ১৪টি গান এ অ্যালবামে স্থান পায়। এ অ্যালবামটি ইংল্যান্ডের সঙ্গীতের শীর্ষতালিকায় প্রথম স্থান দখল করে। ফলে দলটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তারা নিজেদের একটি লোগোও তৈরি করে ফেলে।

দ্য বিটল্‌স এর দ্বিতীয় স্টুডিও অ্যালবাম উইদ দ্য বিটল্‌স মুক্তি পায় ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সালে। এ অ্যালবামটির রেকর্ডিং চলেছে একই বছরের ১৮ জুলাই থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে জর্জ হ্যারিসনের প্রথম কম্পোজিশান করা গানটি রয়েছে। 
১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দলটি ইংল্যান্ড ত্যাগ করে আন্তর্জাতিক পরিসরে কনসার্ট করার জন্য। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এক টিভি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে । ৭৩ লক্ষ দর্শক— সে দেশের ৪০% মানুষ এ অনুষ্ঠান দেখেন।  এর ফলে তাদের আন্তর্জাতিক খ্যাতি আরও বেড়ে যায়। জন লেনন পরিচিত ছিলেন সুদর্শন বিটল হিসেবে, পল ম্যাককার্টনি মিষ্টি বিটল, জর্জ হ্যারিসন শান্ত বিটল, ও রিঙ্গো স্টার রসাত্নক বিটল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ হার্ড ডে’স নাইট ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায়। এতে ব্যান্ডটি তাদের রক অ্যান্ড রোল ধারা অব্যাহত রাখে। এটি প্রকৃতপক্ষে বিটল্‌সের সদস্যদের অভিনীত কয়েকদিন আগের মুক্তি পাওয়া একই শিরোনামের একটি হাস্যরসাত্নক চলচিত্রের গানের অ্যালবাম। চলচিত্রটি আন্তর্জাতিক ভাবে প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়। এ গানের অ্যালবামের রেকর্ডিং-এ জর্জ হ্যারিসন ব্যবহার করেন ১২ তারের রিকেনবেকার গীটারটি। একই বছরের একেবারে শেষভাগে, বড়দিনের আগে বিটল্‌স ফর সেল মুক্তি পায়। তারা সর্বমোট ১২ টি স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশ করে। তাদের সর্বশেষ অ্যালবাম 'লেট ইট বি' ১৯৭০ সালের মে মাসে মুক্তি পায়। ১৯৬০ দশক পুরটুকুই দ্য বিটল্‌স বিশ্ব সঙ্গীতজগতে রাজত্ব করেছে। 

দ্য বিটল্‌স-এর ভাঙ্গনের পেছনে একাধিক কারণ ছিল। মূলত ব্যক্তিগত মতের অমিলের রেশ ধরেই ১৯৬৮ সাল থেকে তাদের দলে ভাঙ্গনের সূত্রপাত হয়। ১৯৭০ সালে 'দ্য বিটল্‌স-এর আনুষ্ঠানিক ভাঙ্গন হয়। ভাঙ্গনের পর চার বিটল ব্যক্তিগত সঙ্গীত ক্যারিয়ারে প্রবেশ করেন। ১৯৮০ সালে জন লেনন-এর মৃত্যর পর ১৯৯৪ সালে বাকি তিন বিটল একত্রিত হয়েছিলেন।




#Article 133: লুডভিগ ফান বেটোফেন (145 words)


লুডভিগ ফান বেটহোফেন() (ডিসেম্বর ১৭, ১৭৭০ – মার্চ ২৬, ১৮২৭) একজন জার্মান সুরকার এবং পিয়ানো বাদক। তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুরকারদের একজন মনে করা হয়। তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ধ্রুপদী ও রোমান্টিক যুগের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার খ্যাতি ও প্রতিভা পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

বেটহোফেনের জন্ম জার্মানির বন শহরে। তরুণ বয়সে তিনি সেখান থেকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে আসেন ও সেখানেই বাকী জীবন কাটান। এখানে তিনি ইয়োসেফ হেইডন-এর অধীনে দীক্ষা নেন এবং শিঘ্রই অসামান্যকৌশলী পিয়ানোবাদক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। বয়স ত্রিশ ছোঁয়ার আগেই তিনি ধীরে ধীরে তার শ্রবণশক্তি হারাতে থাকেন, কিন্তু এই ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মাঝেও তিনি বিশ্বকে বহুদিন ধরে অসাধারণ সব মাস্টারপিস উপহার দিয়ে যান। বেইটোভেন ছিলেন প্রথম ফ্রি-ল্যান্স সুরকারদের একজন — তিনি ভাড়ায় কনসার্ট পরিচালনা করতেন, তার সুর প্রকাশকদের কাছে বিক্রি করতেন ও কিছু সহৃদয় ধনীর কাছ থেকে ভাতা পেতেন — গির্জা বা কোন রাজকীয় সভায় স্থায়ী চাকরি করা তার স্বভাবে ছিল না।




#Article 134: বাইবেল (272 words)


বাইবেল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। বাইবেল শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে কইনি গ্রীক τὰ βιβλία, tà biblía, বইগুলো থেকে; বাইবেল অর্থাৎ ধর্ম শাস্ত্র, লিপি বা পুস্তক, ঈশ্বরের বাক্য।

প্রচলিত প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেল ৬৬টি পুস্তকের (বা অধ্যায়ের) একটি সংকলন, যা দুটি প্রধান পর্বে বিভক্ত — ৩৯টি পুস্তক সম্বলিত পুরাতন নিয়ম বা ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং ২৭টি পুস্তক সম্বলিত নতুন নিয়ম বা নিউ টেস্টামেন্ট। তবে ক্যাথলিক বাইবেলে পুস্তকসংখ্যা প্রোটেস্ট্যান্টদের চেয়ে ৭টি বেশি, অর্থাৎ ৭৩টি। খ্রিস্টধর্ম মতে ১৬০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৪০জন লেখক বাইবেল লিপিবদ্ধ  করেছিলেন। বাইবেলের মুখ্য বিষয়বস্তু বা কেন্দ্রমণি হলেন যীশু।

পুরাতন নিয়ম মূলত হিব্রু ভাষায় লিখিত, তবে দানিয়েল ও ইষ্রা পুস্তক দুটির কিছু অংশ আরামীয় ভাষায় লিখিত। নতুন নিয়ম গ্রিক ভাষায় রচিত। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এই বাইবেল লিপিবদ্ধ করেছেন বলা হয়। অনেক খ্রিস্টান বিশ্বাস করেন, এই বাইবেল  লিপিবদ্ধ হয়েছিল খ্রিস্টীয় ত্রিত্ববাদের অন্যতম পবিত্র আত্মার সহায়তায়। পৃথিবীর অনেক ভাষায় বাইবেল অনুদিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণের ক্ষেত্রে বাইবেল ও কুরআন-এর ভাষ্য কিছুু ক্ষেত্রে অভিন্ন।

তবে কুরআনে বাইবেলের বিপরীত কথাও পাওয়া যায়।

আব্রাহামীয় ধর্মের মধ্যে ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্মের বাইবেলকে স্বীকার করে না, যেমনটা স্বীকার করে না 'যীশু' নামক ঈশ্বরের কোনো বাণীবাহককে। তবে খ্রিস্টানগণ যেখানে বাইবেলের পুরাতন নিয়ম বলতে ইহুদি ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলোকে বুঝিয়ে থাকেন, সেখানে ইহুদি ধর্মে এজাতীয় কোনো বিভাজন দেখা যায় না, বরং খ্রিস্টধর্মমতে পুরাতন নিয়মই ইহুদি ধর্মের ঐশ্বিক ধর্মগ্রন্থ তোরাহ।

ইসলাম ধর্মে বাইবেল বলে কোনো ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায় না। উল্লেখ পাওয়া যায়, আল্লাহর বাণীবাহক ঈসা এর প্রতি অবতীর্ণ ইঞ্জিল নামক ধর্মগ্রন্থের। কুরআনে বলা হয়েছে,  খ্রিস্টানদের যীশুকেই কুরআনে ঈসা (আ.) বলা হয়েছে। তবে মুসলিমদের মতে খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা আল্লাহর কিতাব ইনজিলে পরিবর্তন করেছে। তাই বর্তমান বাইবেলকে তারা আল্লাহর কিতাব হিসেবে মানে না, বরং আল্লাহর কিতাবের পরিবর্তিত রূপ বলে।
বাইবেলের বিষয়ে মুসলিমরা ইযহারুল হক সহ বিভিন্ন বই লিখেছে।




#Article 135: মস্তিষ্ক (288 words)


মস্তিষ্ক : মস্তিষ্ক হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ, যা করোটির অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং দেহের প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। ভ্রুণ অবস্থায় সুষুম্নাকান্ডের অগ্রবর্তী দন্ডাকার অংশ ভাঁজ হয়ে পর পর ৩টি বিষমাকৃতির স্ফীতি তৈরী করে৷ স্ফীতি ৩টি মিলেই গঠিত হয় মস্তিষ্ক৷ প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মস্তিষ্কের আয়তন ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটার, গড় ওজন ১.৩৬ কেজি এবং এতে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন থাকে মস্তিষ্ক মেনিনজেস নামক পর্দা দ্বারা আবৃত ।মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান তিনটি অংশ ।যথা- (ক) গুরুমস্তিষ্ক (খ) মধ্যমস্তিষ্ক (গ) লঘুমস্তিষ্ক

(ক) গুরুমস্তিষ্ক : মস্তিষ্কের প্রধান অংশ হলো গুরুমস্তিষ্ক ।এটি ডান ও বাম খন্ডে বিভক্ত ।এদের ডান ও বাম সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার বলে ।মানব মস্তিষ্কের সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার অধিকতর উন্নত ও সুগঠিত ।

(খ) মধ্যমস্তিষ্ক: গুরুমস্তিষ্ক ও পনস এর মাঝখানে মধ্যমস্তিস্ক অবস্থিত ।মধ্যমস্তিষ্ক দৃষ্টিশক্তি,শ্রবণশক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত । 

(গ) লঘুমস্তিষ্ক : লঘুমস্তিষ্ক গুরুমস্তিষ্কের নিচে ও পশ্চাতে অবস্থিত । এটা গুরু মস্তিষ্কের চেয়ে আকারে ছোট ।লঘুমস্তিষ্ক কথা বলা ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রন করে ।এর তিনটি অংশ যথা- (ক)সেরিবেলাম(খ) পনস (গ) মেডুলা

মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন-উপাদান হল স্নায়ুকোষ। মস্তিষ্কে মোট ১০০০ কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন থাকে। এই কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে। এদের দুই প্রান্তে যে শাখাপ্রশাখার মত প্রবর্ধক থাকে তারা হল ডেন্ড্রাইট, আর মূল তন্তুর মত অংশের নাম অ্যাক্সন। ডেন্ড্রাইট হল সংকেতগ্রাহক অ্যান্টেনার মত, যা অন্য নিউরন থেকে সংকেত গ্রহণ করে। অ্যাক্সন সেই সংকেত পরিবহন করে অপরপ্রান্তের ডেন্ড্রাইটে নিয়ে যায়। দুটি বা ততোধিক নিউরোনের সংযোগস্থলকে বলে সিন্যাপস, যেখানে এদের সংকেত বিনিময় হয়। মূলত একটি নিউরনের অ্যাক্সন এবং অপর একটি নিউরনের ডেনড্রাইটের মিলনস্থলকে স্নায়ুসন্ধি (সিন্যাপস) বলে। মানুষের করটেক্সে মোটামুটি ১০,০০০ এর মত সিন্যাপস থাকে। মানুষের সেরিব্রামের বাম অংশ তুলনামূকভাবে বেশি উন্নত৷ সেরিব্রামকে গুরুমস্তিষ্কও বলা হয়৷ সেরিব্রামের ভিতরের অংশে স্নায়ুতন্ত থাকে৷ এই অংশটি শ্বেত বর্ণের এবং বাইরের অংশ ধূসর বর্ণের। সেরিব্রামের ডান খণ্ড শরিরের বাম অঞ্চল এবং সেরিব্রামের বাম খণ্ড শরিরের ডান অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের মস্তিষ্ক ৩ভাগে বিভক্ত ৷ 




#Article 136: পঞ্জিকা (858 words)


পঞ্জিকা (বা পাঁজি) হল হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় পঞ্জিকা, ওড়িয়া, মৈথিলী, অসমীয়া এবং বাংলা ভাষায় প্রকাশিত। আড়ম্বরপূর্ণ ভাষায় একে ‘পাঁজি’ বলা হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে একে পঞ্চঙ্গম বলা হয়। এটি ভারতে প্রকাশিত সর্বাধিক জনপ্রিয় বার্ষিক বইগুলির মধ্যে অন্যতম এবং এটি পর্যবেক্ষক হিন্দুদের তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উত্সব, উদযাপন এবং বিবাহ, ভ্রমণ, ইত্যাদিসহ বিভিন্ন প্রকারের সাধনার জন্য সর্বাধিক শুভ সময় নির্ধারণ করার একটি সহজ রেফারেন্স। কোনও কোনও পুরোহিত বা জ্যোতিষীর কাছে বিশদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এটি কিছুটা প্রস্তুত-গণনাকারী বা প্রথম উত্স।  এমনকি হিন্দুদের মধ্যে ‘অবিশ্বাসী’ এবং যারা হিন্দু নন তারা প্রায়শই ব্যবহারিক তথ্যের জন্য একটি পঞ্জিকার প্রকাশিত তথ্যের পরামর্শ নেন। এটিতে মুসলমান, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য উত্সব, অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ লিপিবদ্ধ করে এবং জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কিত তথ্যমূলক নিবন্ধ থাকে। 

 মাদালাল পাঞ্জি দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার প্রথম পঞ্জিকা। এটি ওড়িশার ইতিহাসের মূল উৎস এবং প্রমাণ। পাঠানী সমন্ত চন্দ্র শেখর (১৮৩৫ থেকে ১৯০৪) বৈজ্ঞানিক উপায়ে ওড়িয়া পঞ্জিকা পুনরুদ্ধার করেছেন।  এবং গৌড়িয়া বিষ্ণব পাঞ্জিকা 

মাদালা পাঞ্জি (ওড়িয়া - ମାଦଳ ପାଂଜି) উড়িষ্যার পুরী জগন্নাথ মন্দিরের একটি ক্রনিকল। এটি জগন্নাথ এবং জগন্নাথ মন্দির সম্পর্কিত ওড়িশ্যার ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে। [1] মাদালা পাঞ্জি দ্বাদশ শতাব্দীর। মাদালা পাঞ্জি traditionতিহ্যগতভাবে বছর-বছর ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল। বিজয়া-দশমীর দিন করণাস (ওড়িশ্যার একটি পুরীর পুরির সরকারি ইতিহাস লেখকরা ইতিহাসের ইতিহাস রক্ষায় জড়িত। এই ক্রনিকলটি রাখার ঐতিহ্যটি ওড়িয়া রাজা অনন্তবর্মণ চোদাগঙ্গা দেব (1078-11150) এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

ঐতিহ্য অনুসারে, চোদাগঙ্গা মন্দিরের রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য ক্যারানাসের ২৪টি পরিবার তৈরি করেছিলেন। এর মধ্যে পাঁচজনকে মাদালা পাঞ্জির রচনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা হ'ল:

বাংলায় পঞ্জিকা নির্মাতাদের দুটি বিদ্যালয় রয়েছে – দৃকসিদ্ধান্ত (বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা) এবং দৃকসাদ্ধান্ত (গুপ্ত প্রেস, পিএম বাগচি  ইত্যাদি)। যে দিনগুলিতে উৎসব অনুষ্ঠিত হবে সেগুলি তারা নির্দেশ করে। কখনও কখনও, তারা বিশেষ উৎসব জন্য বিভিন্ন তারিখ নির্দিষ্ট। ২০০৫ সালে দুর্গাপূজার জন্য, দুটি পৃথক তারিখের মধ্য দিয়ে এসেছিল। কিছু সম্প্রদায় পূজা গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা অনুসরণ করেছিল, এর জনপ্রিয়তার কারণে। এটি সম্মেলনের সম্মানের সাথেই ছিল, বৈদিক পণ্ডিত ও পুরুষোহিত মহামিলন কেন্দ্রের সভাপতি পণ্ডিত নিতাই চক্রবর্তী নিশ্চিত করেছেন। বেলুড় মঠ বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার প্রতি অনুগত ছিলেন। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ (যিনি ১৯৩৭-৩৮ সালে গণিতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন), তিনি একজন জ্যোতিষী ছিলেন, যিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে রামকৃষ্ণ মিশন আরও বৈজ্ঞানিক হওয়ায় এই পঞ্জিকা অনুসরণ করবেন। 

এদের পার্থক্য দুটি স্কুল লুনি-সৌর আন্দোলনের ভিন্ন ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে যার তিথি উপর ভিত্তি করে। যদিও গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা ১৬ শতাব্দীতে অনুসরণ রঘুনন্দন রচিত  অষ্টবিংশতিতত্ত্ব ১৫০০ বছর বয়সী জ্যোতির্বিদ্যা গ্রন্থ উপর ভিত্তি করে সূর্যসিদ্ধান্ত। বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা, সূর্যসিদ্ধান্তের দেওয়া গ্রহের অবস্থানের একটি ১৮৯০ সংশোধনীর উপর ভিত্তি করে। 

প্রাচীনতম পঞ্জিকা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অবধি। এটি সময় বিশ্লেষণ করে তবে গণনাগুলি সব সময় খুব সঠিক হত না। সূর্যসিদ্ধান্ত, যে যুগে উৎপাদিত, সব পরের পঞ্জিকার এর অগ্রদূত ছিল। 

ব্রিটিশ শাসনামলে বিশ্বম্ভর আবার হাতে লেখা বই আকারে পঞ্জিকা প্রকাশের কাজ শুরু করেছিলেন। মুদ্রিত সংস্করণটি ১৮৬৯ সালে এসেছিল। বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা ১৮৯০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।  গুপ্ত প্রেস সূর্যসিদ্ধান্তকে মূল বিন্যাসের সাথে অনুসরণ করে যখন ‘সংশোধন’ শাস্ত্রের সংস্করণটিকে বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত বলা হয়। 

বিশুদ্ধসিদ্ধন্ত পঞ্জিকা অস্তিত্ব নিয়েছিলেন কারণ একজন জ্যোতির্বিদ মাধব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পঞ্জিকা অধ্যয়ন করার পরে প্রচলিতভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রকৃত এবং জ্যোতিষীয় অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক পাঠ অনুসারে পঞ্জিকা সংশোধন করেছিলেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য ব্যক্তিরাও ছিলেন যাঁরা পঞ্জিকার বৈজ্ঞানিক পুনর্বিবেচনার পদ্ধতিকে সমর্থন করেছিলেন। এটি উড়িষ্যার  এবং পুনেতে বল গঙ্গাধর তিলকের মতো লোককে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। 

১৯৫২ সালে পঞ্জিকার একটি বড় সংশোধনী ভারত সরকারের নেতৃত্বে গৃহীত হয়েছিল। 

গুপ্ত প্রেস, একজন বাঙালি পঞ্জিকা, ২০০৭ সালে একটি সিডি-সংস্করণ প্রকাশ করেছে যা ‘আপনার দিনটি জানুন’, ‘প্রতিদিনের রাশিফল’ এবং ‘কোষ্ঠী বিচার’ (রাশিফল) এর মত ইন্টারেক্টিভ বৈশিষ্ট্যযুক্ত। পঞ্জিকার মূল রূপান্তর রূপান্তর। সময়ের সাথে সাথে এটি আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পর্যটকদের আকর্ষণ, তীর্থস্থানগুলির স্থান, টেলিফোন কোড এবং সাধারণ মানুষ যে সাধারণ তথ্যের সন্ধান করে তার মতো তথ্য যুক্ত করেছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের জন্য এই ফর্ম্যাটটি আরও নমনীয় করা হয়েছে। ‘ডিরেক্টরি পঞ্জিকা’ (ম্যাগনাম ওপাস) ‘পূর্ণ পঞ্জিকা’ (পাতলা সংস্করণ) এবং ‘অর্ধ পঞ্জিকা’ (সংক্ষিপ্ত সংস্করণ) এবং ‘পকেট পঞ্জিকা’-এর মতো রূপগুলির আলাদা আলাদা দাম রয়েছে। পকেট পঞ্জিকা স্থানীয় ট্রেনগুলিতে হকারদের আনন্দ। 

১৯৩০ এর দশকে প্রকাশিত মদন গুপ্তের সম্পূর্ণ পঞ্জিকা বাহ্যিকভাবে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। পুরু গোলাপী কাগজে কভারটি এখনও একইরকম, তবে অভ্যন্তরটি খুব আলাদা। পৃষ্ঠাগুলি মোটা নিউজপ্রিন্ট থেকে মসৃণ সাদা কাগজে পরিবর্তিত হয়েছে, লেটার প্রেসগুলি অফসেট প্রিন্টিংয়ের পথ তৈরি করেছে, কাঠের ব্লকগুলি ধারালো ফটোগ্রাফ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হল বিজ্ঞাপন-সম্পাদকীয় অনুপাতের। পূর্বে বিজ্ঞাপনগুলি মুদ্রিত পদার্থের বেশিরভাগ অংশ তৈরি করেছিল - এবং খাঁটি আনন্দ ছিল। যখন টিভি ছিল না এবং এতগুলি সংবাদপত্র ছিল না, তখন পঞ্জিকা অনেকগুলি পণ্যের বিজ্ঞাপনের জায়গা ছিল। বিজ্ঞাপনের জন্য অনেকেই পঞ্জিকা কিনেছিলেন, মালিক মহেন্দ্র কুমার গুপ্ত বলেছেন, তারা অনেকগুলি 'অযোগ্য' রোগের সমাধান দিতে পারে। 1938 সংস্করণ একটি বৈদ্যুতিক সমাধান - এর একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে শুরু হয়েছিল, যা মৃত লোকদের পুনরুত্থিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন তারা লন্ডন, ওয়াশিংটন এবং নিউ ইয়র্কে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের ভিত্তিতে দুর্গাপূজার সময় প্রকাশ করে। 

গুপ্ত প্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরিজিৎ রায়চৌধুরির মতে, পূর্বের রাজ্যের পূর্ব অংশে বাজারটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ভারত বিভাগের পরে পঞ্জিকা বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে। যাই হোক, ফর্ম্যাট এবং সামগ্রীর অভিনব রূপান্তরের সাথে সাথে বিক্রয়ও বেড়েছে এবং ২০০৭ এর সামগ্রিক বার্ষিক বাজারটি ২০ লাখ কপি। চিত্রটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের বিক্রয় অন্তর্ভুক্ত। 

পাঞ্জিকরা আধুনিক দিনের শপিংমলগুলিতেও প্রবেশ করেছে। আরপিজি গ্রুপের এক প্রবীণ কর্মকর্তা মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যিনি নিজে একজন খ্যাতিমান লেখক, বলেছেন, “গুড়গাঁয়ে আমাদের স্পেনসারের স্টোর রেকর্ড সংখ্যক পাঞ্জিকা বিক্রি করেছে।”  বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ বাংলা ক্যালেন্ডার এবং মাসে আউট সাধারনত চৈত্র, তাই মানুষ এটা আগে ভাল কিনতে পারেন যে পহেলা বৈশাখ।

বিশুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ পাঞ্জিকা - প্রবোধ শর্মা




#Article 137: কানাডা (651 words)


কানাডা () উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশে অবস্থিত একটি দেশ। এটার দশটি প্রদেশ ও তিনটি অধীন অঞ্চল ও আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত (ইংরেজি: Pacific প্যাসিফিক) মহাসাগর এবং উত্তরে আর্কটিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, হা যা এটিকে মোট আয়তনের দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তর দেশে পরিণত করেছে।

কানাডার অধিকৃত ভূমি প্রথম বসবাসের জন্য চেষ্টা চালায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ। পঞ্চদশ শতকের শুরুতে ইংরেজ এবং ফরাসি অভিযাত্রীরা আটলান্টিক উপকূল আবিষ্কার করে এবং পরে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ফ্রান্স দীর্ঘ সাত বছরের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলস্বরূপ ১৭৬৩ সালে উত্তর আমেরিকায় তাদের সব উপনিবাস ইংরেজদের কাছে ছেড়ে দেয়। ১৮৬৭ সালে, মিত্রতার মধ্য দিয়ে চারটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ নিয়ে দেশ হিসেবে কানাডা গঠন করা হয়। এর ফলে আরো প্রদেশ এবং অঞ্চল সংযোজনের পথ সুগম, এবং ইংল্যান্ড থেকে স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ১৯৮২ সালে জারীকৃত কানাডা অ্যাক্ট অনুসারে, দশটি প্রদেশ এবং তিনটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত কানাডা সংসদীয় গণতন্ত্র এবং আইনগত রাজ্যতন্ত্র উভয়ই মেনে চলে। রাষ্ট্রের প্রধান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। কানাডার ভাষা (ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা দুটোই সরকারি ভাষা)

উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্বাংশে যে প্রাচীন শিলা গঠিত ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি অবস্থান করছে তাকে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল বলা হয়। বিরাট 'V' আকৃতির এই অঞ্চলটি কানাডার উত্তরাংশে হাডসন উপসাগরকে বেষ্টন করে রয়েছে। পৃথিবীর মোট ১১টি শিল্ড অঞ্চলের মধ্যে এটি বৃহত্তম। 'শিল্ড' কথার অর্থ বর্ম বা ঢাল, তবে এক্ষেত্রে এর অর্থ শক্ত পাথুরে তরঙ্গায়িত ভূমিরূপ।
অপর নাম - লরেন্সিয় মালভূমি।

কানাডায় ফরাসি উপনিবেশকে নব্য ফ্রান্স (New France) বলা হত, যার বিস্তৃতি ছিল সেন্ট লরেন্স নদী থেকে গ্রেইট লেইকসের উত্তর উপকূল পর্যন্ত। পরবর্তীতে, ১৮৪১ সাল পর্যন্ত, এটি যথাক্রমে উচ্চ কানাডা এবং নিম্ন কানাডা নামক দুটি ইংরেজ উপনিবেশে বিভক্ত থাকে। কানাডা অ্যাক্ট ১৯৮২ অনুসারে, কানাডাই একমাত্র আইনগত এবং দ্বিভাষিক নাম। ১৯৮২ সালে সরকারী ছুটি 'ডোমিনিয়ান ডে' কে পরিবর্তন করে 'কানাডা ডে' করা হয়।

কানাডা একটি ফেডারেশন যাতে সংসদীয় গণতন্ত্রভিত্তিক সরকারব্যবস্থা এবং একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রচলিত। কানাডার সরকার দুই ভাগে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক সরকার। প্রশাসনিক অঞ্চলগুলির তুলনায় প্রদেশগুলিতে স্বায়ত্তশাসনের পরিমাণ বেশি। কানাডার বর্তমান সংবিধান ১৯৮২ সালে রচিত হয়। এই সংবিধানে পূর্বের সাংবিধানিক আদেশগুলি একটিমাত্র কাঠামোয় একত্রিত করা হয় এবং এতে অধিকার ও স্বাধীনতার উপর একটি চার্টার যোগ করা হয়। এই সংবিধানেই প্রথম কানাডার নিজস্ব স্থানীয় সরকারকে তার সংবিধানের উপর পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। পূর্বে কানাডা ১৮৬৭ সালে প্রণীত ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকা অধ্যাদেশবলে পরিচালিত হত এবং এতে ও এর পরে প্রণীত আইনসমূহে ব্রিটিশ সরকারকে কিছু সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল।

আয়তনের বিচারে কানাডা বিশ্বের ২য় বৃহত্তম রাষ্ট্র। এটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের প্রায় ৪১% নিয়ে গঠিত। কানাডা হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং শীতলতম দেশ। উত্তর আমেরিকার এই  দেশটিতে ছয়টি সময় অঞ্চল বিদ্যমান।

এই দেশের জলবায়ুতে গ্রীষ্মকালে হালকা ভ্যাপসা ঠান্ডা, ভিজা কুয়াশা (কিছুসময়ে গরম রৌদ্রসম্পন্ন), শীতকালে ভীষণ ঠান্ডা, বরফাচ্ছন্ন, শুষ্ক এবং তুষারপাত ইত্যাদি দ্বারা থাকে। এ দেশে প্রতিদিন আর্কটিক বরফাচ্ছন্নের দ্বারা শৈত্যপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। এই জলবায়ুটি রাশিয়ার তুলনায় সমতুল্য। এই দেশে রাশিয়ার জলবায়ুর মত শৈত্যপূর্ণ এবং হিমশীতল। এই দেশে বছরে ৮ মাস বরফাচ্ছন্ন থাকে। বরং এদেশে থাকাটা কিছু অনুকূল আবার কিছু প্রতিকুল আছে এবং মানুষ ঠান্ডায় অভ্যস্ত।

কানাডা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির একটি। দেশটি অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এবং জি৮ গ্রুপের সদস্য। অন্যান্য উন্নতদেশগুলির মত কানাডার অর্থনীতির সিংহভাগ সেবামূলক শিল্প নিয়ে গঠিত। প্রায় তিন চতুর্থাংশ কানাডাবাসী কোন না কোন সেবা শিল্পের সাথে যুক্ত আছেন। কাঠ ও খনিজ তেল আহরণ শিল্প কানাডার প্রধানতম দুইটি ভারী শিল্প। এছাড়া দক্ষিণ ওন্টারিও-কে কেন্দ্র করে একটি উৎপাদন শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এগুলির মধ্যে মোটরযান উৎপাদন শিল্প প্রধানতম।

ইংরেজি ভাষা ও ফরাসি ভাষা যৌথভাবে কানাডার সরকারি ভাষা। কানাডার কেবেক (Quebec) প্রদেশে ফরাসি ভাষা প্রাদেশিক সরকারি ভাষা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাধারণত ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও বহু ইউরোপীয় অভিবাসী ভাষার প্রচলন আছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি জার্মান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাষা --- হাটারীয়, মেনোনীয়, এবং পেনসিলভেনীয়। কানাডার প্রায় দেড় লক্ষ আদিবাসী আমেরিকান ৭০টিরও বেশি ভাষাতে কথা বলে। এই স্থানীয় ভাষাগুলির মধ্যে ব্ল্যাকফুট, চিপেউইয়ান, ক্রে, ডাকোটা, এস্কিমো, ওজিবওয়া উল্লেখযোগ্য। এখানকার স্থানীয় প্রধান প্রধান ভাষাপরিবারের মধ্যে আছে আলগোংকিন, আথাবাস্কান, এস্কিমো-আলেউট, ইরোকোইয়ান, সিউয়ান এবং ওয়াকাশান ভাষাপরিবার। এছাড়াও অনেক বিচ্ছিন্ন ভাষাও রয়েছে।

বর্তমান কানাডীয় সামরিক বাহিনী ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিতে এখন প্রায় ৬২ হাজার সদস্য সক্রিয় আছেন। রিজার্ভে আছেন ২৫ হাজার সদস্য, যার মধ্যে ৪ হাজার কানাডীয় রেঞ্জার্সও আছেন।




#Article 138: ক্যানবেরা (817 words)


ক্যানবেরা () অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী শহর। প্রশাসনিকভাবে এটি অস্ট্রেলীয় রাজধানী অঞ্চলের উত্তর অংশটি গঠন করেছে। ক্যানবেরা একটি আধুনিক ও দ্রুত প্রসারমান শহর। আর্থ-ভৌগোলিকভাবে শহরটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বভাগে, অস্ট্রেলীয় আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে, একটি সমতল কৃষিপ্রধান অঞ্চলে, মোলোংলো নদীর (মারামবিজি নদীর একটি উপনদী) তীরে অবস্থিত। সিডনি শহর থেকে ২৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ও মেলবোর্ন থেকে ৬৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত শহরটি অস্ট্রেলিয়ার এই দুই প্রধানতম নগরীর মধ্যবর্তী একটি জায়গায় অবস্থিত। জনসংখ্যার বিচারে এটি অস্ট্রেলিয়ার ৮ম বৃহত্তম শহর ও অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরভাগের বৃহত্তম শহর; এখানে প্রায় ৪ লক্ষ লোক বাস করে।

ক্যানবেরার গ্রীষ্মকালগুলি উষ্ম ও শীতকালগুলি শীতল প্রকৃতির এবং চারপাশ ঘিরে থাকা উচ্চভূমির তুলনায় এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশ কম। শহরটিকে বার্লি গ্রিফিন নামের একটি কৃত্রিম হ্রদের চারপাশ ঘিরে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। মোলোংলো নদীর উপরে বাঁধ ফেলে ১৯৬৩ সালে এই হ্রদটি সৃষ্টি করা হয়। শহরটির আয়তন ও জনসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র শহরকেন্দ্র ও সংলগ্ন শহরতলীগুলিই মূল পরিকল্পনাকে মেনে চলছে। শহরের চারপাশের উপগ্রহ শহরগুলিতেই মূলত আবাসিক উন্নয়ন হয়েছে; এগুলির মধ্যে আছে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়েস্টন ক্রিক, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বেলকনেন এবং ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত টাগারানং। ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং নামক একটি সংস্থা শহরের প্রবৃদ্ধি দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত।

ক্যানবেরাতে অবস্থিত প্রধান কিছু দর্শনীয় স্থান হল ক্যাপিটাল হিল নামক এলাকায় অবস্থিত নতুন সংসদ ভবন (Parliament House পার্লামেন্ট হাউস, ১৯৮৮ সালে উন্মোচিত)। পুরাতন সংসদ ভবনটিতে ১৯২৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত অধিবেশন বসত, এবং সেটিকে বর্তমানে অস্ট্রেলীয় গণতন্ত্র জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। নতুন সংসদ ভবনের কাছেই অস্ট্রেলিয়ার উচ্চ আদালত ভবন (High Court of Australia হাই কোর্ট অফ অস্ট্রেলিয়া) ও অস্ট্রেলীয় জাতীয় চিত্রশালা (Australian National Gallery অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল গ্যালারি, ১৯৮২) অবস্থিত। চিত্রশালাটিতে অস্ট্রেলীয় ও অন্যান্য দেশের শিল্পীদের প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি শিল্পকর্ম সুরক্ষিত আছে। শহরের কেন্দ্রে বার্লি গ্রিফিন হ্রদের ভেতরে ক্যাপটেন কুক মেমোরিয়াল ওয়াটার জেট (Captain Cook Memorial Water Jet, ক্যাপ্টেন কুকের স্মরণিকা ফোয়ারা) অবস্থিত। হ্রদের তীরে ১৯৬০ (১৯৬৮?) সালে প্রতিষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গ্রন্থাগার (National Library of Australia ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ অস্ট্রেলিয়া) এবং জাতীয় রাজধানী প্রদর্শনীকেন্দ্র (National Capital Exhibition) অবস্থিত। ধর্মীয় স্থাপনার মধ্যে ১৮৪০-এর দশকে নির্মিত সন্তু জন দ্য ব্যাপ্টিস্টের গির্জা (Church of Saint John the Baptist চার্চ অফ সেইন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট) দর্শনীয়। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থানের মধ্যে আছে  অস্ট্রেলীয় জাতীয় যুদ্ধ স্মরণিকা কেন্দ্র (Australian National War Memorial অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল), যেখানে একটি জাদুঘর ও শিল্পকলা প্রদর্শনী কেন্দ্র আছে; রাজকীয় অস্ট্রেলীয় টাকশাল ও অস্ট্রেলিয়া ক্রীড়া ইন্সটিটিউট।

ক্যানবেরার প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি হল ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত অস্ট্রেলীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (Australian National University অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি), ক্যানবেরা সঙ্গীত বিদ্যালয় (Canberra School of Music ক্যানবেরা স্কুল অফ মিউজিক, ১৯৬৫), ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Canberra ইউনিভার্সিটি অফ ক্যানবেরা, প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯০; প্রাক্তন নাম Canberra College of Advanced Education ক্যানবেরা কলেজ অফ অ্যাডভান্সড এডুকেশন, ক্যানবেরা উচ্চ শিক্ষা মহাবিদ্যালয়), অস্ট্রেলীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (Australian Defence Force Academ অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্স অ্যাকাডেমি, ১৯৮১), অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি (Australian Academy of Science, অস্ট্রেলিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সাইয়েন্স, ১৯৫৪) এবং ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত অস্ট্রেলীয় মানববিদ্যা অ্যাকাডেমি (Australian Academy of the Humanities অস্ট্রেলিয়ান অ্যাকাডেমি অফ দ্য হিউম্যানিটিস)। এখানে আরও আছে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মাউন্ট স্ট্রমলো মানমন্দির (Mount Stromlo Observatory মাউন্ট স্ট্রমলো অবজারভেটরি)। অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমনওয়েলথ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা সংস্থার (Commonwealth Scientific and Industrial Research Organization, কমনওয়েলথ সাইয়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাসট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন) প্রধান কার্যালয় ক্যানবেরাতে অবস্থিত।

ক্যানবেরা শহরটি নিকটবর্তী ওডেন-ওয়েস্টন ক্রিক, বেলকনেন এবং কুইনবেইয়ান লোকালয়গুলির জন্য অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ক্যানবেরাতে সরকারী প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডই প্রধান। ক্যানবেরার সর্বপ্রধান কর্মসংস্থান প্রদানকারী সংস্থা হল অস্ট্রেলীয় সরকার। তবে পর্যটন ও হালকা শিল্পকারখানা খাত ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধিলাভ করছে। ২১শ শতকের শুরুতে এসে শহরটি উচ্চ-প্রযুক্তি যেমন তথ্য প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের নির্মাণকাজ শুরু করে।

ইউরোপীয়রা ১৮২৪ সালে বা তারও আগে প্রথম ক্যানবেরা অঞ্চলটিতে বসতি স্থাপন করে। এখানে তখন মেষপালকদের একটি ক্ষুদ্র বসতি ছিল, যার নাম ছিল ক্যানবেরি; নামটি সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী অধিবাসীদের মুখের এনগুন্নাওয়াল ভাষার একটি শব্দ কামবেরা থেকে এসেছে, যার সম্ভাব্য একটি অর্থ হল সম্মেলন স্থল। এই নামটিই পরে বিবর্তিত হয়ে ১৮৩৬ সালে ক্যানবেরা নামটির উৎপত্তি হয় বলে ধারণা করা হয়। ১৯০১ সালে অস্ট্রেলিয়া কমনওয়েলথ বা জোটরাষ্ট্রের উদ্বোধন হবার পর ১৯০৮ (মতান্তরে ১৯০৯) সালে তৎকালীন নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ইয়াস-ক্যানবেরা নামের জনবিরল অঞ্চলটিকে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীর অবস্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং অস্ট্রেলীয় রাজধানী অঞ্চলটির সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ১৯১১ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্য সরকার অঞ্চলটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। নতুন শহরটির নকশা প্রণয়ন করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যাতে মার্কিন স্থপতি দম্পতি ওয়াল্টার বার্লি গ্রিফিন ও ম্যারিয়ন ম্যাহোনি গ্রিফিন জয়লাভ করেন। তাদের নকশাতে বৃত্ত, ত্রিভুজ ও ষড়ভুজের প্রাধান্য ছিল এবং নকশাটিতে উদ্যান নগরী আন্দোলনের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য, যার কারণে শহরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবুজ ও প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ এলাকা আছে। ১৯১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যানবেরা নামের শহরটির নির্মাণকাজ শুরু হয়, কিন্তু ১ম বিশ্বযুদ্ধের কারণে (১৯১৪-১৯১৮) এই কাজ ব্যাহত হয়। কেবল ১৯২৭ সালের ৯ই মে তারিখে এসে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংসদকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলবোর্ন থেকে ক্যানবেরা শহরে স্থানান্তর করা হয়। এর আগে ১৯০১ সাল থেকে সংসদ ভবন অস্থায়ীভাবে মেলবোর্ন শহরে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ক্যানবেরার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০০৩ সালের শুরুর দিকে দাবানলের কারণে ক্যানবেরা শহর ও এর শহরতলীগুলির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রায় ৫০০টি বাসভবন ভস্মীভূত হয় এবং বেশ কয়েকজন লোক মারা যায়। আগুনের কারণে মাউন্ট স্ট্রমলো মানমন্দিরটিরও গুরুতর ক্ষতি হয়।

ক্যানবেরাতে দুইটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হল অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়।




#Article 139: কার্বন (464 words)


কার্বন বা অঙ্গারক (ল্যাটিন ভাষায়ঃ কার্বো কয়লা)(রাসায়নিক সংকেত C, পারমাণবিক সংখ্যা ৬) একটি মৌলিক পদার্থ। এটি একটি অধাতু এবং যদি চারটি মুক্ত ইলেক্ট্রন পায় তবে যা টেট্রাভেলেন্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে চারটি সমযোজী রাসায়নিক বন্ধন গঠন করতে সক্ষম। পর্যায় সারণীতে এর অবস্থান গ্রুপ ১৪তে ও এটি একটি পি-ব্লক মৌল এবং C ও C প্রকৃতিতে এটি দুইটি আইসোটোপ স্থায়ী রুপে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। কিন্তু অস্থায়ী C শুধুমাত্র রেডিওনিক্লিড রুপে পাওয়া যায়। এটি ক্ষয়িষ্‌নু হওয়ায়, যার অর্ধআয়ু (হাফ-লাইফ) প্রায় ৫,৭৩০ বছর। এটি পৃথিবীর জীবজগতের প্রধান গাঠনিক ও প্রাচীনতম মৌল উপাদানগুলির অন্যতম।

ভূত্বকের প্রাচুর্যতার দিক দিয়ে এটি ১৫তম অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু ভরের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, এবং অক্সিজেন-এর পরে চতুর্থতম এর স্থান।

কার্বন কবে আবিষ্কৃত হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ আগুন আবিষ্কারের আগে থেকেই মানুষ কার্বনের সাথে পরিচিত ছিল। বজ্রাঘাতের ফলে পুড়ে যাওয়া কাঠের মাধ্যমেই মানুষ প্রথম কার্বনের সাথে পরিচিত হয়। আগুন আবিষ্কারের পর কার্বন হয় মানুষের নিত্যসঙ্গী। কারণ এটি অতিমাত্রায় দাহ্য একটি বস্তু। কার্বন পদার্থটির সাথে পরিচিত থাকলেও এটি যে একটি মৌলিক পদার্থ তা মানুষ বেশিদিন আগে জানতে পারেনি। এমনকি কার্বন নামটির ইতিহাস বেশি প্রাচীন নয়। ১৭৮৯ সালে এন্টনি ল্যাভয়সিয়ে কর্তৃক সংকলিত মৌলিক পদার্থের তালিকায় কার্বন উপস্থিত ছিল। মূলত ল্যাভয়সিয়েই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রমাণ করেছিলেন কার্বন একটি মৌলিক পদার্থ। কয়লা ও অন্যান্য যৌগের দহন পরীক্ষা করে তিনি এই প্রমাণ পেয়েছিলেন।

প্রকৃতিতে কার্বনের দুইটি বহুরুপ রয়েছে। একটি হীরক এবং অন্যটি গ্রাফাইট। অনেক আগে থেকেই মানুষ এ পদার্থ দুটিকে চিনতো। এমনকি উচ্চ তাপমাত্রায় হীরাকে দহন করালে যে অবশেষ হিসেবে কিছু পাওয়া যায়না তাও মানুষের জানা ছিল। কিন্তু এই পদার্থ দুটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদার্থ হিসেবে মনে করা হতো। কার্বন ডাই অক্সাইড আবিষ্কারের পর এই সমস্যার সমাধান হয়। ল্যাভয়সিয়ে দেখেন যে, হীরক এবং কাঠকয়লা দুটির দহনেই কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়। এ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া গিয়েছিল যে এরা অভিন্ন পদার্থ। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে Methods of Chemical Nomenclature নামক গ্রন্থে (ল্যাভয়সিয়ে, এল. গুইটন ডি. মারভিউ, সি. বারথোলেট এবং এ. ফোউরক্রই কর্তৃক লিখিত) প্রথম কার্বনেয়াম (কার্বন) নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। ল্যাটিন নাম তথা কার্বনেয়াম আবার সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। সংস্কৃত ভাষায় ক্রা শব্দের অর্থ ফোটা। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে মৌলটির নাম কার্বন দেয়া হয়েছিল।

১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী এস. টেন্যান্ট আবিষ্কার করেন, সম পরিমাণ হীরক ও গ্রাফাইটের দহনে সমআয়তন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়। অবশেষে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে এল. গুইটন ডি. মারভিউ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেন যে হীরক, গ্রাফাইট এবং কোকের একমাত্র উপাদান হচ্ছে কার্বন। এর বিশ বছর পর তিনি সতর্কতার সাথে উত্তপ্ত করে হীরককে গ্রাফাইট এবং গ্রাফাইটকে কার্বন ডাই অক্সাইডে পরিণত করতে সমর্থ হন। কিন্তু গ্রাফাইট থেকে হীরক তৈরির মত প্রযুক্তি তখনও ছিলনা। অবশেষে ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের একটি দল ৩০০০° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা এবং ১০৯ প্যাসকেল চাপে গ্রাফাইট থেকে হীরক সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। এর কিছুদিন পর সোভিয়েত ইউনিয়নে কার্বন নামে আরেকটি পদার্থ তৈরি করা হয় যাকে কার্বনের তৃতীয় বহুরুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পদার্থের ক্ষেত্রে কার্বনের পরমাণুগুলো একটির সাথে আরেকটি সংযুক্ত হয়ে লম্বা শিকল তৈরি করে। এটি দেখতে অনেকটা ভূসিকালির মত।

বহিঃসংযোগ




#Article 140: ক্যাথলিক মণ্ডলী (336 words)


ক্যাথলিক মণ্ডলী বা রোমান ক্যাথলিক মণ্ডলী সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী খ্রীষ্টধর্মের বৃহত্তম মণ্ডলী বা শাখা। 
২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রায় ১৩০ কোটি লোক রোমান ক্যাথলিক মণ্ডলীতে দীক্ষিত বলে পরিগণিত হন। রোমান ক্যাথলিক মণ্ডলী বিশ্বের প্রাচীনতম নিরবচ্ছিন্নভাবে অদ্যাবধি সচল আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে পরিচিত। নাসরতীয় যীশু ও তাঁর বারোজন প্রেরিত কর্তৃক প্রবর্তিত প্রথম ও অবিভক্ত খ্রীষ্টান সম্প্রদায় থেকে শুরু করে নিরবচ্ছিন্ন প্রেরিতীয় উত্তরাধিকারের মাধ্যমে এই মণ্ডলী এখন পর্যন্ত টিকে আছে। মণ্ডলীটির সর্বোচ্চ নেতা হলেন রোমের বিশপ, যাঁকে পোপ উপাধি দেওয়া হয়। মণ্ডলীর কেন্দ্রীয় প্রশাসন, যার নাম পবিত্র পোপরাজ্য, ইতালির রোম শহরের অভ্যন্তরীণ একটি স্বতন্ত্র নগররাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটিতে অবস্থিত।

ক্যাথলিক শব্দটি গ্রীক কাতোলিকোস () থেকে এসেছে, যার অর্থ সর্বজনীন। খ্রীষ্টধর্মের ইতিহাসের প্রথম দিকে এই অর্থে ব্যবহৃত হলেও ৪র্থ শতকে এসে ক্যাথলিক বলতে রোমের পোপের অনুসারীদের বোঝানো শুরু হয়।

নিকীয় মতবাদটি ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি। ক্যাথলিক গির্জা দাবি করে যে এটি যীশুখ্রীষ্ট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অদ্বিতীয়, পবিত্র, সর্বজনীন (ক্যাথলিক) ও আদিপ্রচারকদের (যীশুর ১২ প্রেরিত) মণ্ডলী। এটি আরও দীক্ষা দেয় যে, ক্যাথলিক বিশপেরা হলেন যিশুখ্রিস্টের শিষ্যদের উত্তরসূরী প্রচারক। তারা আরও বলেন যে পোপ হলেন সন্তু পলের উত্তরসূরী এবং যিশুখ্রিস্ট নিজে সন্তু পলকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্পণ করেছিলেন। ক্যাথলিক মণ্ডলী দাবি করে যে এটি আদি খ্রিস্টধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে, তাদের বিশ্বাস অভ্রান্ত এবং পবিত্র ঐতিহ্যের মাধ্যমে এটি পরম্পরাক্রমে অদ্যাবধি চলে এসেছে।

ক্যাথলিক মণ্ডলীর সাতটি প্রধান অনুষ্ঠান আছে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হল যিশুর শেষ নৈশভোজ উদযাপন অনুষ্ঠান। বহু মানুষের উপস্থিতিতে স্ত্রোত্রপাঠের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করা হয়। একজন পুরোহিত ওয়াইন ও রুটি উৎসর্গ করেন, যেগুলি যথাক্রমে যিশুর রক্ত ও দেহের প্রতিনিধিত্বমূলক।

ক্যাথলিক মণ্ডলী পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাস ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি পশ্চিমা দর্শন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পকলার উপর প্রভাব ফেলেছে। ১০৫৪ সালে রোমের পোপের কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্কের ফলে পূর্ব অর্থডক্স মণ্ডলীটি আলাদা হয়ে যায়। ১৬শ শতকে খ্রিস্টধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রীষ্টানেরা ক্যাথলিক মণ্ডলী পরিত্যাগ করে। ২০শ শতক থেকে বেশির ভাগ ক্যাথলিক খ্রীষ্টান দক্ষিণ গোলার্ধে বাস করছে, যার কারণ ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে খ্রীষ্টানদের উৎপীড়ন বৃদ্ধি।

২০শ শতকের শেষে ও ২১শ শতকের প্রারম্ভে এসে ক্যাথলিক মণ্ডলী যৌনতা সংক্রান্ত মতবাদ, নারী পুরোহিত নিয়োগে অসম্মতি এবং ধর্মীয় নেতাদের যৌন অসদাচরণের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া, ইত্যাদি নিয়ে নিন্দিত হয়েছে।




#Article 141: চাদ (669 words)


চাদ (, ), সরকারী নাম চাদ প্রজাতন্ত্র, মধ্য আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। এর উত্তরে লিবিয়া, পূর্বে সুদান, দক্ষিণে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়া, এবং পশ্চিমে নাইজার। সমূদ্র থেকে দূরে অবস্থিত বলে এবং মরু জলবায়ুর কারণে চাদকে আফ্রিকার মৃত হৃদয় বলেও মাঝে মাঝে অভিহিত করা হয়।

চাদকে বাংলা ভাষা রীতিগত পরিবর্তনের কারণে শাদ বলেও অভিহিত করা হয়। চাদকে তিনটি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা যায়: উত্তরের সাহারা মরুভূমি অঞ্চল, মধ্যভাগের ঊষর সহিলীয় বেষ্টনী, এবং দক্ষিণের অপেক্ষাকৃত উর্বর সুদানীয় সাভানা তৃণভূমি অঞ্চল। চাদ হ্রদ দেশটির বৃহত্তম এবং আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাশয়। এই হ্রদের নামের দেশটির চাদ নামকরণ করা হয়েছে। সাহারা অঞ্চলে অবস্থিত তিবেস্তি পর্বতমালার এমি কৌসি চাদের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। রাজধানী এনজামেনা দেশটির বৃহত্তম শহর। চাদে ২০০ বেশি ধরনের জাতিগত ও ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠীর বাস। ফরাসি ও আরবি এখানকার সরকারি ভাষা। ইসলাম ধর্ম সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

খ্রিস্টপূর্ব ৭ম সহস্রাব্দের শুরুতে চাদ উপত্যকাতে বড় আকারের মনুষ্য বসতি স্থাপিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দ নাগাদ চাদের সহিলীয় অঞ্চলটিতে বহু রাজ্য ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটে; চাদের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া আন্তঃসাহারান বাণিজ্যপথটি নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এগুলির লক্ষ্য। ১৯২০ সাল নাগাদ ফ্রান্স দেশটি দখল করে এবং এটিকে ফরাসি বিষুবীয় আফ্রিকার অংশীভূত করে। ১৯৬০ সালে ফ্রঁসোয়া তোম্বালবাইয়ের নেতৃত্বে চাদ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু মুসলিম-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চল তোম্বালবাইয়ের নীতির বিরোধিতা করে এবং ১৯৬৫ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবীরা রাজধানী দখল করে এবং দক্ষিণের আধিপত্যের অবসান ঘটায়। কিন্তু বিপ্লবী নেতারা অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে; শেষ পর্যন্ত ইসেনে আব্রে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন। ১৯৯০ সালে তারই সামরিক জেনারেল ইদ্রিস দেবি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের দারফুর সংকট সীমানা পেরিয়ে চাদেও সংক্রমিত হয়েছে এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে দেশটিতে একটি অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

চাদে অনেকগুলি রাজনৈতিক দল থাকলেও রাষ্ট্রপতি দেবি ও তার রাজনৈতিক দল পেট্রিয়টিক স্যালভেশন মুভমেন্ট ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। রাজনৈতিক সহিংসতা ও অভ্যুত্থান বা কু-এর ঘটনা চাদের রাজনীতিকে জর্জরিত করে রেখেছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলির একটি। বেশির চাদীয় নাগরিক দিনমজুরি ও কৃষিকাজ করেন। ঐতিহ্যবাহী তুলা শিল্প একদা দেশের প্রধান রপ্তানিকারী শিল্প হলেও ২০০৩ থেকে খনিজ তেল দেশটির রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।

চাঁদ এর আয়তনের সাথে তাল মিলিয়ে এর জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে       ২০১৩ অনুসারে চাদ এর জনসংখ্যা দারিয়েছে ১৩,৬৭০,০৮৪ জন    ভাষাসমূহ

চাদ অন্যতম সরকারী ভাষা আরবি ও ফরাসি। কিন্তু ১০০টি ভাষা এবং উপভাষা ব্যাবহৃত হয়। ভ্রাম্যমাণ আরব ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের বসতি স্থাপন বণিকদের চরিত্রে অভিনয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কারণে চাদীয় আরবি একটি রীতি হয়ে গেছে।

চাদ ধর্মীয়ভাবে বিচিত্র দেশ। ১৯৯৩ সালের আদমশুমারী দেখা গেছে যে  ৫৪% চাদীয় লোক (একটি সংরক্ষিত আসনের অনুযায়ী এগুলোর মধ্যে প্রতিবেদন ৪৮%, সুন্নি হতে নামেমাত্র ২১% শিয়া, ৪% আহমাদী এবং ২৩% শুধুমাত্র মুসলিম) মুসলিম ছিল। যখন ৩% কোন ধর্মের মুক্তকণ্ঠে করা হয়নি চাদীয় লোক এর মোটামুটিভাবে ২০%, রোমান ক্যাথলিক, ১৪% প্রোটেস্ট্যান্ট, ১০% সর্বপ্রাণবাদী হয়। এই ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে কেউই একশিলা হয়। সর্বপ্রাণবাদ পূর্বপুরুষ এবং স্থান ভিত্তিক ধর্মের যার অভিব্যক্তি খুব নির্দিষ্টভাবে হয় বিভিন্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইসলাম বিচিত্র উপায়ে প্রকাশ করা হয়; উদাহরণস্বরূপ, উল্লিখিত মুসলিম চাদীয় লোক আগের ৫৫% সংরক্ষিত আসনের রিপোর্ট অনুযায়ী সুফি অন্তর্গত। খ্রীষ্টধর্ম ফরাসি ও আমেরিকান মিশনারি সঙ্গে চাদ আগত; চাদীয় লোক ইসলামের সাথে হিসেবে, এটা প্রাক খৃস্টান ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক সমগোত্রীয়।  মুসলমানদের উত্তর ও পূর্ব চাদ মধ্যে মূলত কেন্দ্রীভূত এবং আধ্যাত্ববাদ এবং খ্রিস্টান দক্ষিণ চাদ প্রাথমিকভাবে বাস। সংবিধান একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য উপলব্ধ করা হয় এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চয়তা; বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাধারণত সমস্যা ছাড়াই সহ-বিদ্যমান।

দেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রহস্যময় ইসলাম (সুফিবাদ) একটি মধ্যপন্থী শাখার অনুগামী হয়। তার সবচেয়ে সাধারণ অভিব্যক্তি Tijaniyah, যা স্থানীয় আফ্রিকান ধর্মীয় উপাদানের অন্তর্ভুক্ত Chadian মুসলমানদের 35% দ্বারা অনুসরণ একটি আদেশ হয়। দেশের মুসলমানদের একটি ছোট সংখ্যালঘু আরো মৌলবাদী চর্চা, যা, কিছু ক্ষেত্রে, সৌদি ওরিয়েন্টেড সালাফী আন্দোলন সাথে যুক্ত হতে পারে ধরে রাখুন। [60]

রোমান ক্যাথলিক দেশের সর্ববৃহত খ্রিস্টান আখ্যা প্রতিনিধিত্ব করে। নাইজেরিয়া-ভিত্তিক উইনার্স চ্যাপেল সমেত অধিকাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট, বিভিন্ন ধর্মপ্রচারক খ্রিস্টান গোষ্ঠীর সাথে জড়িত নই। বাহাই এবং যিহোবার সাক্ষিদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা দেশের মধ্যে উপস্থিত থাকে। উভয় ধর্মের 1960 সালে স্বাধীনতার পর চালু হয় এবং এর ফলে দেশে নতুন ধর্মের বলে মনে করা হয়। [60]

চাদ উভয় খ্রিস্টান ও ইসলামী দলের প্রতিনিধিত্বমূলক বিদেশী মিশনারীরা হোম। ভ্রাম্যমান মুসলিম প্রচারক, সুদান, সৌদি আরব, এবং পাকিস্তান থেকে প্রাথমিকভাবে, এছাড়াও এ যান। সৌদি তহবিল সাধারণত সামাজিক এবং শিক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্প এবং ব্যাপক মসজিদ নির্মাণ সমর্থন করে। [60] দেখুন




#Article 142: চিলি (228 words)


চিলি (স্পেনীয় ভাষায়: Chile চিলে) দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে একটি লম্বা ফিতার মত প্রসারিত একটি ভূখণ্ড। উত্তর-দক্ষিণে চিলির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,২৭০ কিলোমিটার, কিন্তু এর গড় বিস্তার ১৮০ কিলোমিটারেরও কম। উত্তরের ঊষর মরুভূমি থেকে শুরু করে দক্ষিণের ঝঞ্ঝাপীড়িত হিমবাহ ও ফিয়র্ডসমূহ চিলির ভূ-দৃশ্যাবলির বৈচিত্র‌্যের স্বাক্ষর বহন করছে। দেশটির মধ্যভাগে একটি উর্বর উপত্যকা অবস্থিত। পূর্বে আন্দেস পর্বতমালা আর্জেন্টিনার সাথে সীমান্ত তৈরি করেছে। চিলির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর সান্তিয়াগো মধ্যভাগের উপত্যকায় অবস্থিত।

চিলির অধিকাংশ জনগণ দেশের মধ্যাঞ্চলের উর্বর কেন্দ্রীয় উপত্যকায় বাস করেন। বেশির ভাগ লোক স্পেনীয় ও আদিবাসী আমেরিকানদের মিশ্র জাতির লোক। রোমান ক্যাথলিক ধর্ম এখানকার প্রধান ধর্ম। স্পেনীয় ভাষা এখানকার সরকারি ভাষা। 
  
চিলি দক্ষিণ আমেরিকার একটি নেতৃস্থানীয় শিল্পোন্নত দেশ। এর অর্থনীতি খনন শিল্প ও কৃষিভিত্তিক। চিলি বিশ্বের বৃহত্তম তামা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। এছাড়াও দেশটি ফলমূল ও শাকসবজি রপ্তানি। চিলির ওয়াইন অনেক দেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

চিলি ১৬শ শতক থেকে স্পেনের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯শ শতকের শুরুর দিকে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। গোটা ১৯শ শতক ধরে রপ্তানির মাধ্যমে এটি সমৃদ্ধি লাভ করে, কিন্তু এতে মূলত জমিদার উচ্চ শ্রেণীর লোকেরাই লাভবান হন। এখনও চিলিতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট।

১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চিলিতে কোন সামরিক কু (coup) ঘটেনি, যা ছিল লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ব্যতিক্রম। ১৯৭৩ সালে এক সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখন করে এবং ১৯৮৯ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগ পর্যন্ত চিলি শাসন করে। ২১শ শতকের শুরুতে এসেও চিলি সামরিক শাসনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।




#Article 143: ক্রোমোজোম (497 words)


প্রতিটি কোষে অবস্থিত একপ্রকার তন্তময় বস্তু যা ক্ষারীয় রঞ্জক দ্বারা রঞ্জিত হয় তাকে ক্রোমোজোম বলা হয়। ক্রোমোজোম হচ্ছে বংশগতির প্রধান উপাদান। ক্রোমাটিন তন্তু কোষ বিভাজনের প্রোফেজ দশায় দণ্ডাকার গঠনে রূপান্তরিত হয়ে ক্রোমোজোমে পরিণত হয় যা জীবের সকল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং এর মাধ্যমেই বৈশিষ্ট্যসমূহ বংশ পরস্পরায় সঞ্চারিত হয়। ক্রোমোজোম ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড বা ডিএনএ বা জীন অণু ধারণ করে এবং ডিএনএ-এর মাধ্যমে প্রোটিন সংশ্লেষ করে। ইহা নিউক্লিয়াসের মধ্যে অবস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানী স্ট্রাসবার্গার (Strasburger) (১৮৭৫) সর্বপ্রথম ক্রোমোজোম আবিষ্কার করেন। ১৮৮৮ সালে বিজ্ঞানী ওয়ালডেয়ার (Waldeyer) কোষ বিভাজনের প্রোফেজ দশায় প্রাপ্ত দণ্ডাকার গঠনের ক্রোমাটিনের নাম দেন ক্রোমোজোম। ১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী বোভেরি (Bovery) প্রমাণ করেন যে ক্রোমোজোমই বংশগতির ধারক ও বাহক। ১৯৩৫ সালে বিজ্ঞানী হেইজ (Heitz) সর্বপ্রথম ক্রোমোজোমের গঠনের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। ১৯৬৬ সালে বিজ্ঞানী ডুপ্রো (Dupraw) ক্রোমোজোমের সূক্ষ্ম গঠন বর্ণনা করেন।

দৈর্ঘ্যে ক্রোমোজোম ০.২ – ৫০ মাইক্রন (µ) বা মাইক্রোমিটার (µm) এবং প্রস্থ ০.২ –  ২ মাইক্রন (µ) বা মাইক্রোমিটার (µm)। মানুষের ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য ৬ মাইক্রন (µ) বা মাইক্রোমিটার (µm)।

কাজের উপর ভিত্তিকরে ক্রোমোজোম দুই প্রকার, দেহজ বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনকে ক্রোমোজোমকে অটোজম (Autosome) এবং যৌন বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী ক্রোমোজোমকে যৌন বা লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম (Sex chromosome) বলে। মানুষের দেহকোষে অটোজমের সংখ্যা ৪৪টি (২২ জোড়া) এবং যৌন বা লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোমের সংখ্যা ২টি (১ জোড়া) এবং জনন কোষে (শুক্রাণু বা ডিম্বাণু) অটোজমের সংখ্যা ২২ জোড়া এবং যৌন বা লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোমের সংখ্যা ১জোড়া।

কোষ বিভাজনের বিভিন্ন দশায় ক্রোমোজোমের আকৃতিতে পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। ইন্টারফেজ দশায় ক্রোমোজোম সরু ও প্যাঁচানো অবস্থায় থাকে অন্যদিকে প্রোফেজ দশায় এটি দণ্ডাকার হয়ে থাকে। মেটাফেজ ও অ্যানাফেজ দশায় এর আকৃতি সেন্ট্রোমেয়ারের অবস্থানের উপর নির্ভরশীল। মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমেয়ার ক্রোমোজোমের মাঝামাঝি থাকে ফলে এর উভয় বাহু সমান বা প্রায় সমান হয় যা অ্যানাফেজ দশায় দেখতে ইংরেজির ভি (V) অক্ষরের মত। সাব-মেটাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমেয়ার ক্রোমোজোমের মাঝামাঝি না থেকে সামান্য পাশের দিকে থাকে ফলে এর উভয় বাহু অসমান হয় যা অ্যানাফেজ দশায় দেখতে ইংরেজির এল (L) অক্ষরের মত। অ্যাক্রোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমেয়ার ক্রোমোজোমের প্রায় প্রান্তের দিকে থাকে ফলে এর উভয় বাহু অনেক বেশি ছোট-বড় হয় যা অ্যানাফেজ দশায় দেখতে ইংরেজির জে (J) অক্ষরের মত। টেলোসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমেয়ার ক্রোমোজোমের প্রান্তের দিকে থাকে ফলে এর ধরনের ক্রোমোজোমে একটিমাত্র বাহু দেখা যায় যা অ্যানাফেজ দশায় দেখতে ইংরেজির আই (I) অক্ষরের মত। এ ধরনের ক্রোমোজোম দুর্লভ। অ্যাসেন্ট্রিক ক্রোমোজোমে সেন্ট্রোমেয়ার থাকে না।

একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম সংখ্যা নির্দিষ্ট। একই প্রজাতির ক্ষেত্রে জনন (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) কোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা দেহকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যার অর্ধেক হয়ে থাকে যাকে গ্যামেটিক একক সংখ্যক বা হ্যাপ্লয়েড সেট (যা n দিয়ে প্রকাশ করা হয়) বলে। অন্যদিকে দেহকোষে গ্যামেটিক দ্বি-সংখ্যক বা ডিপ্লয়েড সেট (যা 2n দিয়ে প্রকাশ করা হয়) ক্রোমোজোম থাকে ফলে দেহকোষে ক্রোমোজোম জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। সবচেয়ে কম সংখ্যক ক্রোমোজোম পাওয়া যায় গোল কৃমিতে (Ascaris univalens) মাত্র ১ জোড়া (অর্থাৎ 2n = ২ ও n = ১)। অন্যদিকে অ্যামিবাতে (Amoeba proteus) ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৫০ জোড়া (অর্থাৎ 2n = ৫০০ ও n = ২৫০)।

ক্রোমোজোমের কাজ হলো মাতাপিতা হতে জিন সন্তানসন্ততিতে বহন করে নিয়ে যাওয়া। মানুষের চোখের রং, চুলের প্রকৃতি, চামড়ার গঠন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ক্রোমোজোম কর্তৃক বাহিত হয়ে বংশগতির ধারা অক্ষুন্ন রাখে। এ কারণে ক্রোমোজোমকে বংশগতির ভৌতভিত্তি (Physical basis of heredity) বলে আখ্যায়িত করা হয়৷




#Article 144: কেউটে সাপ (321 words)


কেউটে সাপ (Naja kaouthia), যাকে monocellate cobra বলা হয়, বাংলায় গোক্ষুর গোখরা গোখরা প্রজাতির একটি সাপ যা দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়া দেখা যায়। এটিকে আইইউসিএন কর্তৃক ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ গোখরোর ফণার পিছনে গরুর ক্ষুর বা পুরোনো দিনের ডাঁটি ছাড়া জোড়া-চোখো চশমার মত দাগ থাকে তার থেকে নাম গোক্ষুর। আবার ফণার পিছনে গোল দাগ থাকে তাই গোখরোর দুচোখার পরিবর্তে একচোখা চশমা বা মনোকল-এর উপমা দিয়ে এর ইংরেজি নাম মনোকল্ড কোবরা। গোখরা উত্তেজিত হলে ওদের ঘাড়ের লম্বা হাড় স্ফীত হয়ে ওঠে, তাতে চমৎকার ফণাটি বিস্তৃত হয়।

বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

কেউটে শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ কালকূট থেকে।

 
গোক্ষুর গোখরার ইংরেজি ও অক্ষরের মত ফণা রয়েছে যা প্রায় খইয়া বা খড়মপায়া গোখরার কাছাকাছি। ছোট সাপের রং স্থিত থাকে। গায়ে হলুদ, বাদামি, ছাই বা কাল ধরনের রংয়ের সাথে ক্রসব্যান্ড দেখা যায়। ফণার দুই ধারে নিচের দিকে কাল ছোপ দেখতে পাওয়া যায় এবং একটি বা দুটি ক্রস আকারের রেখা কালো ছোপের পেছন থেকে পেটের দিকে নামে। বয়সের সাথে সাথে সাপের গায়ের রং ফিকে হতে শুরু করে। এর দুটি সরু, লম্বা বিষ দাঁত আছে। সবচেয়ে বড় বিষ দাঁতের রেকর্ড হল । বিষদাঁতগুলো বিষছুঁড়ে মারার জন্য কিছুটা উপযুক্ত। পূর্ণ বয়স্ক গোক্ষুর গোখরা প্রায়  হয়, লেজ সহ তা দাঁড়ায় প্রায় । আরো অনেক বড় প্রজাতি পাওয়া গেছে তবে তা খুব বিরল। পূর্ণ বয়স্ক হলে এরা লম্বায় প্রায়  হয়।

গোক্ষুর গোখরা পাওয়া যায় ভারত এর পশ্চিম থেকে চীন, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়াতে। মালয় দ্বীপপুঞ্জ, বাংলাদেশ, ভুটান, মিয়ানমার, লাওস, নেপাল ও  থাইল্যান্ড এদের আদি নিবাস।

এরা নিশাচর। মানুষের বসতবাড়ির আশেপাশে, চাষের জমি, বনাঞ্চল বা ধানক্ষেতের আশেপাশের ইদুরের গর্তে থাকতে ভালবাসে। শিশু গোক্ষুর গোখরা উভচর প্রাণী আর বড়গুলো স্তন্যপায়ী প্রাণি, সাপ বা মাছ শিকার করে। যখন বিরক্ত হয় পালাতে পছন্দ করে। কিন্তু যদি তার কাছে কাউকে প্রাণ সংশয়কারী মনে হয় তাহলে ফণা তুলে জোরে হিস হিস শব্দ করে। আত্মরক্ষার্থে কামড়ও দিতে পারে।

এগুলোকে গাছের গুঁড়ির গর্ত বা যেখানে ইঁদুর রয়েছে এমন স্থানে পাওয়া যায়।

কিছু কিছু গোক্ষুর গোখরার বিষ নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রয়েছে।




#Article 145: কলম্বিয়া (317 words)


কলম্বিয়া (স্পেনীয় ভাষায়: Colombia কোলোম্বিয়া) বা কলম্বিয়া প্রজাতন্ত্র (República de Colombia রেপুব্লিকা দ়ে কোলোম্বিয়া) দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। কলম্বিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে আছে নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত, পর্বতমালা এবং নিবিড় সবুজ অতিবৃষ্টি অরণ্য। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী মাদক চোরাকারবারী চক্রের প্রভাবে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। যদিও দেশটির গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার ইতিহাস পুরনো, তা সত্ত্বেও দেশটিতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রেণীবৈষম্যমূলক একটি সমাজ বিদ্যমান।

কলম্বিয়া দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র দেশ যার ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর---উভয় জলভাগেই তটরেখা আছে। কলম্বিয়ার পূর্বে ভেনেজুয়েলা ও ব্রাজিল, দক্ষিণে ইকুয়েডর ও পেরু, এবং উত্তর-পশ্চিমে পানামা। বোগোতা দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ে ইউরোপীয়দের আগমনের আগে বর্তমান কলম্বিয়া যেখানে অবস্থিত, সেই অঞ্চলটিতে বেশ কিছু আদিবাসী আমেরিকান জাতি বাস করত। এদের মধ্যে চিবচা জাতি অন্যতম। ১৬শ শতক থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত কলম্বিয়া স্পেনের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৮১৯ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পরে এটি একটি নির্বাচিত সরকার-শাসিত প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

কলম্বীয় সমাজ উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণীতে বিভক্ত এবং এদের মধ্যে বর্ধমান শ্রেণীবৈষম্য বিদ্যমান। ২০শ শতকে দেশটির কফিভিত্তিক অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত ভূমিগুলির মালিকানা সম্প্রসারণের ফলে একটি উল্লেখযোগ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। ১৬শ শতকের স্পেনীয় সমাজব্যবস্থা থেকে কলম্বিয়ার প্রকট শ্রেণীবৈষম্যের বীজ বপিত হয় এবং ঔপনিবেশিক আমলে এটি কলম্বীয় সমাজের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। পারিবারিক বংশপরম্পরা, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, এবং জাতিগত পটভূমি কলম্বিয়াতে কোন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত ১০০ বছরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটলেও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা একটি ক্ষুদ্র বিত্তশালী শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত।

২০শ শতকের মধ্যভাগে গৃহযুদ্ধ কলম্বিয়ার সমাজব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বামপন্থী গেরিলা ও আধা-সামরিক বাহিনী এবং কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীর মধ্যে দেশের গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলিতে মাদকদ্রব্যের, বিশেষত কোকেনের চাহিদার ফলে কলম্বিয়াতে অবৈধ মাদক চোরাচালান ব্যবসা প্রসার লাভ করে। কলম্বীয় সরকার মাদক উৎপাদন সীমিত করার এবং বিরোধী গেরিলা বাহিনীর সাথে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২১শ শতকের শুরুতে এসেও সহিংসতা কলম্বীয় নাগরিকদের জীবনের নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা ছিল।

কলম্বিয়ান রেফারি উইলমার রোলদান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল রেফারি হিসেবে গণ্য ।




#Article 146: রঙ (বর্ণ) (319 words)


রঙ বা বর্ণ (ইংরেজি: coloure) হল মানুষের দৃষ্টি-সংক্রান্ত একটি চিরন্তন ধর্ম। আলোর বর্ণালি থেকে রঙ উৎপত্তি লাভ করে। বিভিন্ন কারণে মানুষের কাছে রঙ এর পার্থক্য হয়ে থাকে। সাধারনত বলা হয়ে থাকে মৌলিক রঙ তিনটি, যথা-লাল, সবুজ ও নীল। তবে এর মাঝে কিছু পার্থক্যও আছে, কারণ কোন কিছু প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে মৌলিক রঙ হিসেবে লাল, হলুদ ও নীল রঙ-কে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

বিদ্যুত চুম্বকীয় বিকিরণের  সাধারণ ধৰ্মসমূহ হচ্ছে তরঙ্গদৈৰ্ঘ্য , কম্পনাংক ও এর দ্বীপন প্ৰাবল্য। যত  বিকিরণ তরঙ্গ‌দৈৰ্ঘ্য দৃশ্যমান বৰ্ণালীর সীমার ভিতরে থাকে ততটুকু মানব চক্ষুতে  বিভিন্ন রঙ হিসেবে দেখা যায়। দৃশ্যমান বৰ্ণালীর সীমা প্ৰায় ৩৯০ ন্য়া‌নোমিটার থেকে ৭০০ ন্য়া‌নোমিটার। একে দৃশ্যমান আলো বলা হয়।

সব  আলোর উৎস‍ই সাধারণত একসঙ্গে বিভিন্ন তরঙ্গ‌দৈৰ্ঘ্যের আলো নিৰ্গত করে কোনো একটা উৎসের বৰ্ণালীতে এর পরে নিৰ্গত বিভিন্ন তরঙ্গদৈৰ্ঘ্যের আলোর প্ৰাবল্যের তথ্য দিয়ে।

স্পেকট্রামে রামধনুর পরিচিত রঙগুলি  আইজ্যাক নিউটন ১৬৭১ সালে ল্যাটিন শব্দটির উপস্থিতি বা সংশ্লেষের জন্য ব্যবহার করেছেন যা সেই সমস্ত রঙের অন্তর্ভুক্ত যা কেবলমাত্র একক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দৃশ্যমান আলো দ্বারা উত্পাদিত হতে পারে( খাঁটি বর্ণালী বা একরঙা বর্ণগুলি)। ডানদিকে টেবিলটি বিভিন্ন খাঁটি বর্ণালী বর্ণের জন্য আনুমানিক ফ্রিকোয়েন্সি (টেরেহার্টজে) এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য (ন্যানোমিটারগুলিতে) দেখায়। তালিকাভুক্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলি বায়ু বা ভ্যাকুয়াম হিসাবে পরিমাপ করা হয় (রিফ্রেসিভ সূচক দেখুন)।
রঙ টেবিলটিকে একটি নির্দিষ্ট তালিকা হিসাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয় — খাঁটি বর্ণালী বর্ণগুলি একটি ধারাবাহিক বর্ণালী গঠন করে এবং ভাষাগতভাবে এটি কীভাবে পৃথক বর্ণগুলিতে বিভক্ত করা হয় তা সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক আক্রমণের বিষয় (যদিও সর্বত্র লোকেরা বর্ণগুলি বর্ণ হিসাবে দেখানো হয়েছে) একইভাবে )। একটি সাধারণ তালিকা ছয়টি প্রধান ব্যান্ড সনাক্ত করে: লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল এবং বেগুনি। নিউটনের ধারণায় নীল এবং বেগুনি রঙের মধ্যে একটি সপ্তম রঙ, নীল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটা সম্ভব যে নিউটন যা নীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন তা আজ সায়ান হিসাবে পরিচিত, এবং সেই নীলটি কেবল সেই সময় নীল রঙের আমদানি করা নীল রঙের  নীল ছিল। 
বর্ণালী বর্ণের তীব্রতা, এটি যে প্রসঙ্গে দেখা হয়েছে তার সাথে তুলনামূলকভাবে তার উপলব্ধিটি যথেষ্ট পরিবর্তন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কম-তীব্রতার কমলা-হলুদ হল বাদামী এবং কম-তীব্রতার হলুদ-সবুজ হল জলপাই সবুজ।




#Total Article count: 145
#Total Word count: 199970